২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

একনজরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহান আলোকময় জীবন



রাসূল (সাঃ)এর জীবনী সংক্ষেপ
মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত। তার জন্ম যেমনিভাবে ছিল বিশ্ববাসীর জন্যে এক রহমত স্বরূপ তেমনিভাবে তার জন্মের সাথে সাথেই কিছু বিস্ময়কর ঘটনা ঘটি ছিল। যার মাধ্যমে বিশ্ববাসী বুঝতে পেরছিল যে এ কোন সাধারণ মানুষ নয়। তিনি অবশ্যই হবেন একজন মহামানব। তাঁর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে বায়তুল্লাহ আক্রমণকারী ইয়ামানের শক্তিশালী বাদশাহ আব্রাহা তার সৈন্যসহ সমূলে ধ্বংস হয়েছিল। মক্কায় তখন মহা দুর্ভিক্ষ চলছিলো, তিনি তাঁর মায়ের গর্ভে আসার সাথেই দুর্ভিক্ষ অবসান হয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া যমযম কূপের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর মা জননী আমেনা বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ তার পেটে অবস্থান নেয়ার সাথেই সারা বিশ্বে আলোক রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছিল, যার সাহায্যে তিনি সুদূর সিরিয়ার রাজ প্রাসাদসমূহ পরিস্কার দেখতে ছিলেন। এমনিভাবে আরো অসংখ্য ঘটনা পৃথিবীতে ঘটতেছিল।

তিনি যখন জন্মগ্রহণ করলেন, মক্কায় তখন ভূ-কম্পনের দ্বারা মূর্তিগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। জ্বিনদের আসমান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অপরদিকে পারস্য সম্রাটের রাজমহলে ভূ-কম্পনের আঘাতে রাজমহলের ১৪ টি স্তম্ভ ধ্বসে পড়েছিলো। এক দিকে শান্তির আগমন অপর দিকে বাতিলের মাথায় আঘাত। তাইতো আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন, 'আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর, ফলে সত্য মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।' ( সূরা: আম্বিয়া-১৮)। নিচে সে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত তুলে ধরছি। 

১. রাসূল (সাঃ)এর বংশ পরিচয়
 
তিনি মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম। হাশেমের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে নবীজীর বংশ হাশেমী বংশ হিসেবে পরিচিত। আর হাশেম ছিলেন কুরাইশ গোত্রের যা আদনান পর্যন্ত পৌঁছেছে। 

২. জন্ম ও শৈশব
 
মুহাম্মদ (সাঃ) ৫৭০ সালে , হস্তী বাহিনী ধ্বংসের বছর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের ৬ মাস পূর্বেই তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব সফররত অবস্থায় মদিনায় ইন্তেকাল করেন । সে সময়ের ঐতিহ্য অনযায়ী সম্ভান্ত আরব পরিবারের সন্তানদেরকে অন্য গোত্রে লালন-পালন করতে দেওয়া হত। সে হিসেবে নবী করীম (সাঃ) বনী সা‘দ গোত্রে লালিত- পালিত হন এবং চার অথবা পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন। আর সেখানেই তাঁর বুক বির্দীণের ঘটনা ঘটে। 
নবী করীম (সাঃ)এর মাতা ও দুধ মাতা গণ : 

  •  স্বীয় মাতা আমেনা বিনতে ওয়াহাব 
  •  হালিমা -তু- সা‘দিয়াহ 
  •  আবূ লাহাবের বাঁদী সুয়াইহাব 

৩. মায়ের মৃত্যু 
নবী করীম (সাঃ)এর মাতা আমেনা মদিনা মুনাওয়ারায় নিজ স্বামী আব্দুল্লাহ এর কবর যিয়ারতের পর ফেরার পথে মক্কা ও মদিনার মাঝে অবসি'ত আবহাওয়া নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। তখন নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। 

৪. দাদা ও চাচার তত্ত্বাবধানে 
মাতা- পিতার মৃত্যুর পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের দায়িত্ব ভর গ্রহণ করেন। তিনি তাকে খুবস্নেহ করতেন। এমনকি নিজের ছেলেদের উপরও তাঁকে প্রাধান্য দিতেন। নিজের আসনে বসাতেন। দাদার মৃত্যুরপূর্ব পর্যন্ততিনি তাঁর তত্ত্বাবধানেই ছিলেন।
দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন। তখন তার বয়স ছিল আট বছর। তিনি স্বীয় চাচাকে বকরী লালন-পালন ও শাম দেশের ব্যবসায়ে সহযোগিতা করতেন। 

৫. খাদীজা (রা) এর সাথে বিবাহ এবং সন্তানাদি
 
পঁচিশ বছর বয়সে খাদীজা (রা) কে বিবাহ করেন। একমাত্র ইবরাহীম ব্যতীত তাঁর সব কয়টি সন্তান খাদীজার (রা) এর গর্ভ থেকেই হয়েছে। কাসেম তাঁর প্রথম সন্তান। এর নামেই তাঁর উপনাম আবুল কাসেম। অতঃপর যয়নব, রূকাইয়া, উম্মে কুলসুম,ফাতেমা ও আব্দুল্লাহর জন্ম হয়।
তাঁর ছেলেরা সকলেই বাল্য বয়সে মারা যান। মেয়েদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে হিযরত করার সুযোগ পান। ফাতেমা (রাঃ) ব্যতীত তাদের সকলেই নবীজীর জীবদ্দশায় মারা যান। তিনি নবীজীর ইন্তেকালের ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করেন। 

৬. নবুওয়্যাত পূর্ব গুণাবলি 
তিনি ছিলেন চিন্তায় সঠিক, সিদ্ধান্তে নির্ভুল, ব্যক্তিত্বে অনন্য, চরিত্রে শ্রেষ্ঠতর, প্রতিবেশী হিসেবে অতি মর্যাদাবান,সহনশীলতায় সুমহান, সত্যবাদিতায় মহত্ত্বর, সচ্চরিত্র, বদান্যতা, পুণ্যকর্মা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও বিশ্বস্ততায় অনুপম আদর্শ। এসব গুণে মুগ্ধ হয়ে তার গোত্র তাঁকে আল-আমীন উপাধিতে ভূষিত করে। 

৭. ওহী নাযিলের সূচনা 
তিনি মক্কায় অবস্থিত হেরা গুহায় ইবাদত করতেন। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন। 
জিবরাইল আ. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে অবতরণ করেন।
أول ما نزل عليه قوله تعالى : اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ﴿১﴾ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ ﴿২﴾ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ﴿৩﴾ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ﴿৪﴾ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ﴿৫﴾ (سورة العلق )
সর্ব প্রথম সূরা ‘আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিল হয় : যার অর্থ- পাঠ করূন, আপনার পালন কর্তার নামে,যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করূন, আপনার পালনকৃত মহা দয়ালু।যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা আলাক:১-৫) 

৮. দাওয়াতের আদেশ 
أمر الله تعالى خاتم رسله وأنبيائه صلى الله عليه وسلم أن يدعو الناس إلى الإســلام، قال تعالي : يَاأَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ ﴿১﴾ قُمْ فَأَنْذِرْ ﴿২﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ ﴿৩﴾ . (سورة المدثر) 
আল্লাহ তাআলা সর্বশেষ নবী (সাঃ)কে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচারের আদেশ করেন। এ মর্মে তিনি ইরশাদ করেন, হে চাদরাবৃত ব্যক্তি! ওঠ এবং সতর্ক কর। (সুরা-মুদ্দাসির:১-২) 

৯. গোপনে দাওয়াত 
নবী করীম (সাঃ) স্বীয় প্রতিপালকের আদেশ যথাযথ পালন করেন এবং গোপনে গোপনে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। যাতে করে কুরাইশদের বিরোধিতা প্রকট না হয়। তিনি সর্বপ্রথম আপন পরিবার- পরিজন ও বন্ধুদের ইসলামের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম খাদীজা (রা) তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম আবু বকর সিদ্দীক (রা) ছোটদের মধ্যে আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এবং ক্রীতদাসদের মধ্যে যায়েদ ইবনে হারেসা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি খাদিজা (রা) এর ক্রীতদাস ছিলেন। রাসূল (সাঃ) তিন বছর পর্যন্ততার নিকটস্থ লোকদের মাঝে ইসলাম প্রচারে গোপনীয়তা অবলম্বন করেন। তিনি দারূল আরকাম তথা কুরাইশ নেতা আরকাম ইবনে আবু আরকামের বাড়িটি মুসলমানদের সম্মেলনস্থল হিসেবে নির্বাচিত করেন। 

১০. প্রকাশ্যে দাওয়াত 
ثم أمر الله تعالى : النبي صلى اللع عليه وسلم بإعلان الدعوة على الناس قال تعالى : فاصدع بما تؤمر وأعرض عن المشركين. (سورة الحجر)
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা প্রকাশ্যে দ্বীন প্রচারের আদেশ করলেন- ইরশাদ হচ্ছে, অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়েদিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।” (সূরা হিজর : ৯৪)
وأنذر عشيرتك الأقربين. (الشعراء:২১৪) 
“আপনি নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করূন।” (সূরা শু‘আরা : ২১৪)
امتثل النبي صلى الله عليه وسلم لأمر الله، ودعا عشيرته والمقربين له إلى اجتماع عند جبل الصفا. ثم أخبرهم بأنه قد جمعهم ليبلغهم رسالة ربه، بترك عبادة الأصنام وأن يعبدوا الله وحده. فقام من بين الحاضرين عمه أبو لهب غاضبا وقال له : تبالك ؟ لهذا جمعتنا؟ فأنزل الله سبحانه فيه وفي زوجته أم جميل: تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ ﴿১﴾ مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ ﴿২﴾ سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ ﴿৩﴾ وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ ﴿৪﴾ فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِنْ مَسَدٍ ﴿৫﴾ (سورة المسد)
আল্লাহ তাআলার আদেশ পেয়ে নবী মুহাম্মদ (সাঃ)তাঁর নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদেরকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একত্রিত করেন। অতঃপর তাদেরকে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ‘ইবাদত করতে আহ্বান করেন। সমবেত লোকদের মধ্য থেকে তাঁর চাচা আবূ লাহাব বলে উঠল: তোমার ধ্বংস হোক, এ জন্যেই কি আমাদেরকে একত্রিত করেছে? এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামীল সম্পর্কে সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেন, “আবূ রাহাবের দু’হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খেজুরের পাকানো রশি নিয়ে।” (সূরা লাহাব : ১-৫) 

১১. ঠাট্টা-বিদ্রূপ 
মুশরিকরা নবী আকরাম (সাঃ) কে বিভিন্ন উপায়ে উপহাস করত। কখনো কখনো তাকে পাগল ও যাদুকর বলত। আবার কখনো বলত কবি ও গণক। অগান্তুক লোকদেরকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে অথবা কথা শুনতে বাধা দিত। তাঁর চলাচলের রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রাখত এবং সালাতরত অবস্থায় তাঁর উপর ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করত।

১২. নির্যাতন নিপীড়ন 
মুশরিকরা তাদের মুসলিম গোলামদের উপর কঠিন নির্যাতন চালাতো। তাদেরকে হাত-পা বেঁধে ভর দুপুরে উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে দিত এবং ভারী পাথর দ্বারা তাদের বুক চাপা দিত এবং ছড়ি দ্বারা প্রহার করত ও আগুনের সেঁকা দিত। নির্যাতনের এমন কোন পদ্ধতি নেই যা তারা মুসলমানদের উপর প্রয়োগ করেনি। 

১৩. ধৈর্য ও অবিচল 
মুসলমানগণ মুশরিকদের সকল নির্যাতন ও নিপীড়ন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করতেন। কেননা নবী করীম (সাঃ) তাদেরকে সাওয়াব ও জান্নাত লাভের আশায় বিপদে ধৈর্য ধারণ ও অনড় থাকার পরামর্শ দেন। মুশরিকদের নির্যাতন ভোগ করেছেন এমন কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সাহাবী হলেন : বিলাল ইবনে রাবাহ ও আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) প্রমুখ । তাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হয়েছেন ইয়াসির ও সুমাইয়া (রা)। ইসলামের ইতিহাসে এরাই সর্বপ্রথম শহীদ। 

১৪. হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) হিজরত 
রাসূল (সাঃ) কাফেরদের অনবরত নির্যাতনের কারণে সাহাবাগণের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে হাবশাতে হিজরত করার নির্দেশ দেন। হাবশার বাদশা নাজ্জাশী ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু ছিলেন বলে হাবশাকেই হিজরতের জন্যে মনোনীত করা হল। নাজ্জাশী ঈসা (আ) এর অনুসারী ছিলেন। নবুয়্যাতের পঞ্চম বছর প্রথম মুহাজিরদের এ দলে ছিলেন দশ জন পুরূষ ও চার জন মহিলা। তারা কুরাইশদের অজান্তে চুপিসারে হাবশার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
 
কিছুদিন পর আরো একটি মুহাজির দল তাদের সাথে মিলিত হলেন। পুরূষ, মহিলা, শিশু সহ তাদের মোট সংখ্যাছিল প্রায় একশো জন। বাদশা নাজ্জাশী তাদের সম্মান এবং সুন্দর ব্যবহার করেন পাশাপাশি সেখানে নিরাপদে বসবাস করার অনুমতি দেন। 

১৫. তায়েফ গমন
রাসূল (সাঃ) এর আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিবের মৃত্যুকে কুরাইশরা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল। তার উপর নির্যাতনের মাত্রা পূর্বের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দেয়। এ কঠিন পরিস্থিতিতে সহযোগিতাও আশ্রয় পাওয়ার আশায় তিনি তায়েফ গমন করলেন। কিন্তু সেখানে উপহাস ও দুর্ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। তারা রাসূল (সাঃ) কে পাথর নিক্ষেপ করে মারাত্মক আহত করে। বাধ্য হয়ে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। 

১৬. বিভিন্ন গোত্রের নিকট রাসূলের উপস্থিতি
রাসূল (সাঃ) হজ্বের মৌসুমে মক্কায় আগত বিভিন্ন গোত্রের নিকট দাওয়াত নিয়ে উপস্থিত হন। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং শত্রুদের থেকে আত্মরক্ষা ও দাওয়াতের নিরাপত্তা বিধানে সহযোগিতা কামনা করেন।
তবে কোন গোত্রই এতে সাড়া দিল না। কারণ, কুরাইশরা তাদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং তাদেরকে তার নিকট হতে দূরে রাখার কৌশল অবলম্বন করে। ইতিমধ্যে মদীনার নেতৃস্থানীয় ছয়জন লোক রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং কুরাইশদের ভয়ে গোপনে তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তারা নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেমানুষের সাথে ইসলাম সম্পর্কে এবং রাসূল (সাঃ)এর চরিত্র ও দাওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। এবং মদীনাবাসীদের মাঝে ইসলাম প্রচারের কাজ করেন। ফলে অনেকেই ইসলামগ্রহণ করেন। 

১৭. আকাবার প্রথম বাইয়াত
নবুয়্যাতের দ্বাদশ বছর হজ্জের মৌসুমে বার জন লোক মদীনা হতে বের হয়ে মিনাতে আকাবার প্রথম বাইআতের সময় রাসূল (সাঃ) এর সাথে দেখা করে এবং বাইয়াতে অংশ গ্রহণ করেন। এ বাইয়াতকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল আকাবাতুল উলা’ প্রথম বাইয়াত বলা হয়। মদীনায় ফিরে যাবার সময়রাসূল তাদের সাথে মুস‘আব ইবনে উমায়ের (রা)কে কুরআন তিলাওয়াত এবং দ্বীন শিখানোর জন্য পাঠান। 

১৮. আকাবর দ্বিতীয় বাইয়াত
 
আকাবর প্রথম বাইয়াতের পরবর্তী বছর নবুয়্যাতের তেরোতম বছর হজের মৌসুমে সত্তুর জন পুরূষ, দুই জনমহিলা মক্কার উদ্দেশ্যে হজ পালনের লক্ষ্যে মদীনা হতে রওয়ানা হন এবং কুরাইশদের অগোচরে গোপনে মিনাতে রাসূল (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করেন যাতে করে কুরাইশরা না দেখে। আর তারা সকলে রাসূলের চাচা আব্বাস, আবূ বকর এবং আলী ইবনে আবু তালিবের (রা) উপস্থিতিতে রাসূল (সা)এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন। এ বাইয়াতকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল-আকবাতুস সানীয়াহ’ বলা হয়। এতে তারা জান-মালের বিনিময়ে রাসূল (সা) কে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেন। তারা তাঁকে এ মর্মে আশ্বস-করলেন যে, তিনি যদি তাঁদের দেশে তাঁদের নিরাপত্তায় হিজরত করেন তাহলে তারা স্বাগত জানাবেন। রাসূলে (সা) এর নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে তাদের দেশে হিজরত করাকে স্বাগত জানানো হবে। 

১৯. হিযরত ও মক্কা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত
কুরাইশরা রাসূল (সাঃ)কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু' তারা ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহ তাআলাকে তাকে হেফাযত করেন। রাসূল (সাঃ)স্বীয় ঘর থেকে বের হন এবং আল্লাহ তাআলা কাফেরদের চক্ষু অন্ধ করেদেন যাতে তারা রাসূল (সাঃ) কে দেখতে না পারে। তিনি চলতে চলতে মক্কার বাইরে বন্ধু আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর সাথে মিলিত হন। অতঃপর তারা উভয়ে এক সাথেই পথ চলা আরম্ভ করেন। ‘সওর’ নামক পাহাড়ে পৌঁছে একটি গুহায় তিন দিন পর্যন্ত আত্মগোপন করেন। আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর (রা) তাদের নিকট কুরাইশদের সংবাদ পৌঁছাতেন এবং তার বোন আসমা (রা) খাদ্য ও পানীয় পৌঁছাতেন। তারপর নবী করীম (সাঃ) ও তার সঙ্গী গুহা হতে বের হন এবং ইয়াসরিব (মদীনা) অভিমুখে যাত্রা শুরূ করেন।
২০.ইয়াসরিবে (মদীনা) নতুন অধ্যায়ের সূচনা 
রাসূল (সাঃ) মদীনায় পৌঁছে তাকওয়ার ভিত্তিতে ইসলামের সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে মদীনা শরীফে এ মসজিদটি “মসজিদে কু’বা” নামে পরিচিত। মদীনাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সর্বপ্রথম যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হচ্ছে মসজিদে নববী নির্মাণ এবং মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন। 

২১. ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ
 আবূ সুফিয়ানের কাফেলা
কুরাইশদের একটি ব্যবসায়ী দল সিরিয়া থেকে বিশাল যুদ্ধসামগ্রী কিনে মক্কা প্রত্যাবর্তন করছে মর্মে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এ ব্যাপারে অবগত হলে তাকে বাধা দিতে চাইলেন। কারণ ইতিপূর্বে মক্কা বাসীরা মুহাজিরদের সম্পদ দখল করে নিয়েছিল। ঐ দলনেতা আবু সুফিয়ান রাসূল (সাঃ) এর সংকল্পের কথা জানতে পেরে এক লোককে কুরাইশদের নিকট পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদদানের জন্য পাঠালেন। সংবাদ পেয়ে কুরাইশরা বাণিজ্যিক কাফেলা রক্ষার্থে দ্রুত বের হয়ে আসল। এদিকে আবূ সুফিয়ান আগেই কাফেলা সহ পলায়ন করতে সক্ষম হয় এবং বেঁচে যায়। 

কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যেতে চাইল কিন্তু কুরাইশ নেতারা বিশেষত আবু জাহেল মুসলমানদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দেয় এবং প্রায় এক হাজার যোদ্ধার একটি সেনাদল মদীনাভিমুখে পাঠায়।
 
 যুদ্ধের অনুমতি
لما ازداد طغيان المشركين على المسلمين، أمر الله رسوله صلى الله عليه وسلم بقتالهم بقوله تعالى: وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ ﴿১৯০﴾ (البقرة : ১৯০)
মুসলমানদের বিরূদ্ধে মুশরিকদের নির্যাতন যখন অসহনীয় পর্যায়ে বেড়ে গেল আল্লাহ তাআলা তখন আপন রাসূলকে তাদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন : যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তোমরাআল্লাহর পথে তাদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ কর। অবশ্য কারো প্রতি বাড়বাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারাহ : ১৯০)

নবী আকরাম (সাঃ) পরামর্শ করে মুহাজির ও আনসারগণের নিয়ে গঠিত প্রায় তিনশত তের জনের একটি সেনাদল নিয়ে মুশরিকদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে বের হলেন।
হিজরী দ্বিতীয় সনের ১৭ রামাযান বদর নামক স্থানে উভয় দল মুখোমুখি হয় এবং সেখানেই বদর যুদ্ধ সংঘটিতহয়। এ যুদ্ধে মুসলমানরা মহা বিজয় লাভ করেন। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ অনেক গনিমতের সম্পদ লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের মাঝে সেগুলো বণ্টন করে দেন। এ যুদ্ধে মোট সত্তর জন মুশরিক নিহত হয় এবং সত্তর জন বন্দী হয় আর মুসলমানদের শহীদের সংখ্যা মাত্র চৌদ্দজন। 

২২. উহুদ যুদ্ধ 
 কুরাইশদের প্রতিশোধ প্রস্তুতি
বদর যুদ্ধে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় এবং নিজেদের বড় বড় নেতা হারিয়ে দুঃখ ভারাক্রান- হৃদয়ে মক্কায়প্রত্যাবর্তন করার পর তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য মুসলমানদের পক্ষ হতে হুমকির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করে। ফলে তারা পূর্ণ এক বছর যাবৎ সৈন্য ও সম্পদ সঞ্চয় এবং প্রতিবেশী গোত্রীয় মিত্রদেরকে সহায়তা প্রদানের আহ্বানসহ জোর প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজারের অধিক একটি বিশাল সেনাদল গঠন করে।
 উহুদ অভিমুখে যাত্রা 
নবী আকরাম (সাঃ)এর নিকট কুরাইশদের আগমন বার্তা পৌঁছোলে তিনি মুহাজির ও আনসার নিয়ে গঠিত এক হাজার যোদ্ধার একটি সেনাদল নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করার জন্য বের হনএবং উহুদ পাহাড়ের ঢালুতে অবস্থান গ্রহণ করেন। পাহাড় পিছনে রেখে তিনি সৈন্যদের সুসংগঠিত ও বিন্যস্থ করেন। যে কোন পরিসি'তিতে স্থান ত্যাগ না করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন।
 প্রাথমিক বিজয় ও তিরন্দাজদের দায়িত্বে অবহেলা 
ঐ যুদ্ধের শুরুর দিকে মুসলমানদের জয় হল এবং মুশরিকরা পিছু হটল। কিন্তু মুসলিম তীরান্দাজগণ গনিমতের মাল সংগ্রহণ করতে গিয়ে নিজেদের স্থান ত্যাগ করে বসলেন।
 শরিকদের জড়ো হওয়া ও সুযোগ গ্রহণ 
কাফেররা এ সুযোগে তীর নিক্ষেপের স্থানগুলো দখল করে নিল এবং মুসলমানদের পিছন দিক থেকে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। যার কারণে মুসলমানদের কাতার ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এতে অনেক মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। তাদের মধ্যে শহীদগণের সরদার হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা) ছিলেন। এ যুদ্ধে রাসূল (সাঃ)এর মুখমন্ডল এবং দন্তমুবারক মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরী সনের তৃতীয় বছর শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখ রোজ শনিবার। 

২৩. খন্দকের যুদ্ধ
 ইয়াহুদীদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও কুরাইশদের ষড়যন্ত্র 
কুরাইশরা মদীনার মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করে দিতে চাইল। যুদ্ধের প্রকৃত কারণ: মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, তাদের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হিংসাত্মক আচরণের কারণে যে সব ইয়াহুদীদের রাসূল (সাঃ) মদীনা হতে তাড়িয়ে দেন তারা মক্কায় কুরাইশদের দলভুক্ত হয়। কুরাইশদেরকে মুসলমানদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার প্রেরণা জোগায় এবং তাদেরকে জনবল, টাকা-পয়সা ও অস্ত্র-শস্ত্র দিয়েসহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
 ধন সম্পদ একত্রিকরণ এবং বিভিন্ন গোত্রকে উৎসাহ প্রদান
ইয়াহুদীদের পরামর্শ অনুসারে মক্কাবাসী ধন-সম্পদ জোগাড় করতে আরম্ভ করল। কুরাইশরা ও ইয়াহুদীরান তাদের স্বীয় গোত্র ও মিত্রদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানাল। পঞ্চম হিজরীতে আবূ সুফিয়ানের নেতৃত্বে দশহাজারেরও বেশি যোদ্ধা মদীনাভিমুখে রওয়ানা হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করা ওতাদের নিশ্চিহ্ন করা।
 সাহাবীদের সাথে মত বিনিময় ও সালমান (রা)-এর পরিখা খননের পরামর্শ প্রদান 
রাসূল (সাঃ) কুরাইশদের প্রস'তি ও প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর করণীয় নির্ধারণে সহাবাগণের সাথে পরামর্শ করেন। তারা সিদ্ধান্ত করেন মুসলমানগণ মদীনায় অবস্থান করে প্রতিরোধ করবে। মদীনার উত্তর পার্শ্বের সীমান্ত অরক্ষিত থাকায় সালমান ফারসী (রা) মদীনায় দুশমনদের প্রবেশে বাধাগ্রস্থ করার লক্ষ্যে উত্তর পার্শ্বে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। রাসূল (সাঃ) সালমান ফারসী(রা) এর পরামর্শ গ্রহণ করেন।
মুসলমানগণ পরিখা খনন আরম্ভ করেন এবং রাসূল (সাঃ) নিজেই মুসলমানগণের সাথে কাজে অংশগ্রহণ করেন। পনেরো দিনের মধ্যে পরিখা খনন সম্পন্ন হয়। রাসূল (সাঃ) মহিলা ও শিশুদের দুর্গে আশ্রয় গ্রহণের নির্দেশ দেন। এক হাজারেরও বেশি মুসলিম যোদ্ধা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করেন এবং মদীনা প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত হন।
 
 কাফের সেনাদের অবস্থান
মুশরিক সৈন্যরা পরিখার অদূরে মদীনার বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। কেননা তাদের অশ্বগুলো পরিখা অতিক্রম করতে পারেনি। অতঃপর তাদের অশ্বারোহীরা নিহত হলে অন্যরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। এসময় পিছন দিক থেকে মুসলমানদেরকে আক্রমণের লক্ষ্যে বনু কুরাইযার ইয়াহুদীরা তাদের নিরাপত্তাবিধানকারী দুর্গগুলোর ফটক উন্মুক্ত করতে সম্মত হল। নুয়াইম বিন মাসউদ (রা) যার ইসলাম গ্রহণের খবর কুরাইশ ও ইয়াহুদীরা জানত না তাকে রাসূল (সাঃ) তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির অনুমতি দেন। তিনি উক্ত কাজে সফল হন।

 আল্লাহর সৈনিক
এক মাস পর্যন্ত মদীনা অবরুদ্ধ ছিল। প্রচন্ড শীতের গভীর অন্ধকার রাত্রিতে প্রবল বাতাস ও তুফান প্রবাহিত হল। এতে মুশরিকদের তাবু ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সহ যাবতীয় সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন।
আবু সুফিয়ান তার উটে আরোহন করল এবং দৌড়ে পলায়ন করল। অন্যান্য সৈন্যরাও তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করল। এভাবে মুশরিকদের ব্যর্থতা ও রণক্ষেত্র থেকে পলায়নের মাধ্যমে আহযাব যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটল। 
وصدق الله حيث يقول: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا ﴿৯﴾ (الأحزاب)
আল্লাহ তাআলা সত্যিই বলেছেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়া’মতের কথা স্মরণ কর,যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরূদ্ধে ঝঞ্ঝা বায়ু এবং এমনসৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন।” (সূরা আহযাব : ৯) 

২৪. হুদাইবিয়ার সন্ধি 
যষ্ঠ হিজরীতে রাসূল (সাঃ) উমরা করার লক্ষ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। এ সফরে তাঁর যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছা ছিল না। চৌদ্দ শত আনসারী ও মুহাজির সাহাবী তাঁর সফরের সাথী হন। যখন তারা হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন সকলে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় অবতরণ করেন। কুরাইশরা এসংবাদ জানতে পেরে শপথ করল যে, তারা নবী করীম (সাঃ)ও তার সাথীদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। 

রাসূল (সাঃ )উসমান (রা) কে কুরাইশদের নিকট এ খবর দিয়ে প্রেরণ করেন যে, তারা যুদ্ধের জন্য মক্কার দিকে রওয়ানা হননি। বরং তারা শুধুমাত্র উমরার উদ্দেশ্যেই মক্কায় প্রবেশ করতে চান। তারপর তারা আলোচনায় বসার জন্য সম্মত হয়।
 
আলোচনা আরম্ভ হলে তা সন্ধির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। এ সন্ধিকেই হুদাইবিয়ার সন্ধি বলা হয়। সিদ্ধান্ত হয় রাসূল (সাঃ) তার উমরা পালনকে এক বছর পিছিয়ে দেবেন এবং দশ বছর যাবত যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। আর যে কোন গোত্র তাদের ইচ্ছানুসারে যে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। এ চুক্তির ফলে খোযাআ’ গোত্র মুসলমানদের সাথে মিলিত হল এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে মিলিত হল। সন্ধি চুক্তিসম্পন্ন হওয়ার পর রাসূল (সাঃ)পশু জবেহ করেন এবং মাথা মুড়িয়ে ফেলেন। মুসলমানগণ তাঁর অনুকরণ করেন। অতঃপর তিনি মুসলমানদেরকে নিয়ে মদীনায় ফেরত আসেন। 

২৫. মক্কা বিজয় 
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী আকরাম (সাঃ) বিভিন্ন গোত্রে তাঁর দাওয়াতী কর্মসূচী অধিক পরিমাণে বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হন। ফলে এক বছরের মাথায় মুসলমানদের সংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পেল। এরই মাঝে কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ বনু বকর মুসলমানদের মিত্র কবীলায়ে খুযা‘আর উপর আক্রমণ করল। এর অর্থ দাঁড়াল করাইশ এবং তার মিত্ররা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করল। 
নবী আকরাম (সাঃ) এ সংবাদ পেয়ে অত্যধিক ক্রুদ্ধ হন এবং মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে দশহাজার যোদ্ধার একটি বিশাল সেনাদল গঠন করেন।
তখন ছিল হিজরী অষ্টম বর্ষের রমাযান মাস। এদিকে কুরাইশরা নবী আকরাম (সাঃ) এর মক্কাভিমুখে অভিযানের সংবাদ পেয়ে তাদের নেতা ও মুখপাত্র আবু সুফিয়ানকে ক্ষমা প্রার্থনা, সন্ধি চুক্তি বলবৎ এবং চুক্তির মেয়াদ আরো বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে নবী আকরাম (সাঃ) এর নিকট প্রেরণ করেন। নবী করীম (সাঃ) তাদের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দিলেন। কেননা তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ ভিন্ন বাঁচার আর কোন উপায় না দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর সেনাদল (মক্কাভিমুখে) রওয়ানা হয়ে মক্কার কাছাকাছি আসলে মক্কাবাসী বিশাল দল দেখে আত্মসমর্পণ করে। আর নবী আকর (সাঃ)মুসলমানগণকে সঙ্গে নিয়ে বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। 
(وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا ﴿৮১﴾ سورة الإسراء : ৮১) 

নবী করীম (সাঃ) বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করেন এবং নিজ হাতের ছড়ি দ্বারা কা‘বার আশেপাশে রাখা সকল প্রতিমা ভেঙে চুরমার করে দেন। আর স্বীয় রবের শেখানো আয়াত পাঠ করতে থাকেন,যার অর্থ :
“বল: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” (সূরা ইসরা : ৮১) 
অতঃপর নবী আকরাম (সাঃ) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ঘোষণা করেন মক্কাপবিত্র ও নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র তাঁর নবীর খাতিরেই কিঞ্চিৎ সময়ের জন্যে (যুদ্ধ) হালাল করেছেন।তাঁরপর আর কারো জন্যে কখনো হালাল করা হবে না।

قوله تعالى :
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ ﴿১﴾ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا ﴿২﴾ فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا ﴿৩﴾ (سورة النصر )

এরপর সমবেত মক্কাবাসীর প্রতি লক্ষ্য করে বললেন: আমি তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করব বলে তোমাদের ধারণা? তারা বলল: সহানুভূতিশীল, উদাহরণ ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ। আপনি মহৎ মহানুভবের ভ্রাতুষ্পুত্র। নবী করীম (সাঃ) তাদের সকলকে ক্ষমা করে দিয়ে বললেন : তোমরা সকলেই মুক্ত। এরপর মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হতে লাগল। আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: “যখন আল্লাহর সাহায্যও বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে আল্লাহর দ্বীনে দলে দলে প্রবেশ করতে দেখবেন।” (সূরা নাসর : ১-৩) 

২৬. বিদায় হজ্জ
দশম হিজরী সনে নবী (সাঃ) মুসলমানদেরকে তাঁর সাথে হজব্রত পালন ও হজের আহকাম শিক্ষা গ্রহণ করতে মক্কা যাবার আহ্বান জানা। 
قول الله تعالى : الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا (سورة المائدة : ৩) 
তাঁর আহ্বানে এক লক্ষের মত লোক সাড়া দিল। তাঁরা যুলকা’দাহ্ মাসে পঁচিশ তারিখ তাঁর সাথে মক্কা পানে বের হন। বাইতুল্লাহতে পৌঁছে প্রথমে তওয়াফ করেন। অতঃপর যিলহজ্জ মাসের আট তারিখ মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানাহন। এরপর নয় তারিখ জাবালে আরাফাহ অভিমুখে যাত্রা করেন। রাসূল (সাঃ) সেথায় অবস্থান করেন এবং মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক অমর ভাষণ দান করে তাদেরকে ইসলামী বিধি-বিধান ও হজের আহকাম শিক্ষা দেন এবং আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী তিলাওয়াত করে শুনান- আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নিয়াআমত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

২৭. রাসুল (সা) এর জীবনে যুদ্ধ
রাসূল (সঃ) স্বীয় জীবনে সর্বোমোট তেইশটি জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। এ সকল জিহাদকে 'গাযওয়া' বলা হয়। তন্মধ্যে মোট নয়টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। যথা- (১) বদরের যুদ্ধ (২)উহুদের যুদ্ধ, (৩)আহযাবের যুদ্ধ (৪) বনী কুরাইযা যুদ্ধ (৫) মুত্তালিক যুদ্ধ (৬) খাইবার যুদ্ধ (৭) ফাতহে মক্কা যুদ্ধ (৮) হুনাইনের যুদ্ধ এবং (৯) তায়িফের যুদ্ধ। আর রাসূল (সাঃ) নিজে সশরীরে অংশগ্রহণ না করে অপর কাউকে সিপাহসালার নিযুক্ত করে সাহাবায়ে কেরামকে যে জিহাদ অভিযানে প্রেরণ করেছেন,তাকে 'সারিয়্যা' বলে। এ ধরনের জিহাদের সংখ্যা ৪৩টি।


২৮. আল্লাহর সান্নিধ্যে 
বিদায় হজ্জ পরবর্তী বছর নবী আকরাম স. জ্বরাক্রান্ত হয়ে অসুস্থ' হয়ে পড়েন এবং প্রিয় সহধর্মিণী আশেয়া (রা) এর ঘরে শয্যা গ্রহণ করেন। রাসূল (সঃ) ৬৩ বছর বয়সে ১১ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার দুপুরের পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিয়ে ইহকাল ত্যাগ করে পরপারে গমন করেন । অতঃপর খলীফা নির্বাচনের কাজ সমাধা করে ১৪ই রবিউল আউয়াল রাতে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর গৃহে (রওযা মুবারকে ) রাসুল্ (সাঃ) কে সমাহিত করা হয়।

قوله تعالى: وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ ﴿১৪৪﴾ (سورة آل عمران : ১৪৪)

রাসূল (সাঃ) এর ইন্তেকালে মুসলমানগণ একবারেই নিরাশ ও হতাশ হয়ে যান। এ পরিস্থিতিতে আবুবকর (রা) ভাষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন : যাঁরা মুহাম্মাদের উপাসনা করত তারা জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ(সাঃ) আজ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করে, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা চিরঞ্জীব, কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না। এরপর নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন : “আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ কিছুই নন। তার পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরন করবে? বস্তুত: কেউ যদি পশ্চাদপসরন করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবেনা। আর যারা কৃতজ্ঞ আল্লাহ তাদের সাওয়াব দান করবেন।” 
(সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)

#সংগৃহীত 

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

৭১ এর গণহত্যাঃ চাপা পড়া কিছু ইতিহাস


১৯৭০ সাল থেকেই এদেশে গণহত্যা শুরু হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা বাঙ্গালীরাই এই গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের সূচনা করেছি। এরপর পাল্লা দিয়ে শুরু হয় পাকিস্তানী সৈন্যদের নারকীয় হত্যাকাণ্ড। কেউ যেন কম যায়না। ইয়াহিয়া খান নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যখন গড়িমসি করছিল তখন জনগণের প্রতিবাদ অব্যাহত ছিল। সেই স্বৈরাচার বিরোধী প্রতিবাদের উসিলায় এদেশের বামপন্থী সম্প্রদায় ও আওয়ামীলীগে ঘাপটি মেরে থাকা সমাজতন্ত্রবাদীরা পরিবেশকে আরো অশান্ত করার জন্য সচেষ্ট ছিল। অবশ্য এতে প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান করেছি “র” (RAW)।  চাপা পড়ে যাওয়া বাঙ্গালী কর্তৃক গণহত্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করবো।

বাঙ্গালীরা রংপুর, সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৯৪৭ সালে ভারতের বিহার থেকে আসা মুসলিমদের হত্যা করতে থাকে। কারন এসব অবাঙ্গালী বিহারীরা কখনোই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গঠিত হতে যাওয়া কোন রাষ্ট্রকে সমর্থন জানাবে না। পয়লা মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করলে মুজিব ধর্মঘট আহবান করেন। সেই থেকে ২৫ দিন চলে তান্ডবলীলা। মুজিব একদিকে উত্তেজনাকর বক্তব্য বিবৃতি দিচ্ছেন অন্যদিকে অবাঙ্গালী ও সংখ্যালঘুদের ভাই আখ্যায়িত করে তাদের জান-মাল রক্ষার আহবান করছিলেন। রাজনৈতিক সমাবেশেও আওয়ামীলীগের কর্মীরা বন্দুক, ছোরা, দা সহ সব ধরণের অস্ত্রশস্ত্রসহ হাজির হচ্ছিল। 

৩ ও ৪ মার্চ চট্টগ্রামের ফিরোজ শাহ কলোনীতে ও ওয়্যারলেস কলোনীতে প্রায় ৭০০ অবাঙ্গালীদের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এখানে বসবাসকারী বহু শিশু, নারী, পুরুষ নিহত হয়। সে সময় সরকারি হিসেবে ৩০০ লাশ দাফন করা হয়। 

দ্যা টাইমস অফ লন্ডন ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল রিপোর্ট করেছিলো, হাজার হাজার সহায় সম্বলহীন মুসলিম উদ্বাস্তু যারা ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানে এসে আশ্রয় গ্রহন করে তারা গত সপ্তাহে বিক্ষুব্ধ বাঙ্গালীদের দ্বারা ধ্বংসাত্মক আক্রমনের শিকার হয়। বিহারী মুসলিম উদ্বাস্তু যারা সীমানা পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং ভারতে প্রবেশকারী একজন বৃটিশ টেকনিশিয়ান এই খবর নিশ্চিত করেন। উত্তর পূর্ব শহর দিনাজপুরে শত শত অবাঙ্গালী মুসলিম মারা গিয়েছে। 

খুলনায় টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৪ মার্চ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়, ৫ মার্চ খালিশপুর ও দৌলতপুরে ৫৭ জনকে অবাঙ্গালীকে ছোরা দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সামরিক বাহিনীর কঠোর সমালোচক সাংবাদিক মাসকারেনহাসও স্বীকার করেছেন অবাঙ্গালীদের এই অসহায়ত্বের কথা। অবাঙ্গালীদের জান মাল রক্ষায় শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে বাহ্যত নির্দেশ থাকলেও কোন কার্যকর উদ্যোগ ছিলনা। আওয়ামীলীগের কর্মীরা অদৃশ্য ইঙ্গিতে হত্যা খুন লুটতরাজ করে যাচ্ছিল অবারিতভাবে। সারাদেশেই চলছিল নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। সেই হিসেবে ঢাকা অনেক ভালো ছিল। 

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসসহ অনেক দূতাবাসে হামলা চালায় বিদ্রোহীরা। ১২ মার্চ ও ১৫ মার্চ মার্কিন কনসুলেট লক্ষ্য করে বোমা হামলা ও গুলি করা হয়। ১৯ মার্চ হোটেল ইন্টারকন্টিনালে বোমা হামলা ও গুলি করে বিদ্রোহীরা। এগুলো ছিল শান্তি আলোচনার জন্য বড় অন্তরায়। তারপরও বলা চলে ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও মুজিব আলোচনা ফলপ্রসুই হতে যাচ্ছিল। পরিস্থিতির উপর মুজিবসহ কারোই নিয়ন্ত্রণে ছিলনা। সেনাবাহিনীও সরকারি আদেশের বাইরে কোন জোরালো ভূমিকা রাখতে পারছিল না। 

আর এদিকে RAW, এদেশীয় বাম ও আওয়ামীলীগে ঘাপটি মেরে থাকা সমাজতন্ত্রবাদীরা এদেশকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও মুজিবের আলোচনাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য একের পর এক অবাঙ্গালী গণহত্যা চালিয়েছে, সারা দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অনেক বিহারীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে বিশেষ করে জগন্নাথ হল এবং ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল) আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। 

সারাদেশে সেনাবাহিনীর উপর বিনা উস্কানীতে আক্রমন করেছিলো বাঙ্গালীদের একটা অংশ। সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে জয়দেবপুরে। গাজিপুরে সমরাস্ত্র কারখানার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে একদল সৈন্য সেখানে পৌঁছানোর আগে আওয়ামীলীগ কর্মীরা জয়দেবপুরে ব্যরিকেড সৃষ্টি করে। ব্যরিকেডের জন্য তারা একটি ট্রেনের বগি ব্যবহার করে। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে জাহানজেবের নেতৃত্বে সৈন্যদল। তারা ব্যরিকেড সরিয়ে সেখানে পৌঁছায়। নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখে জাহানজেব আরবাব আবার যখন হেডকোয়ার্টারে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন বিশৃংখলাকারীরা সৈন্যদলকে আবারো ঘিরে ফেলে। বন্দুক, শর্টগান, লাঠি, বোমা ইত্যাদি নিয়ে হামলা চালায়। জাহানজেব বাঙ্গালী অফিসার লে. ক. মাসুদকে গুলি চালাতে নির্দেশ দিলেন। মাসুদ ইতস্তত করলে অপর বাঙ্গালী অফিসার মঈন তার সৈন্যদের নিয়ে পাল্টা আক্রমন চালালে কিছু মানুষ নিহত হয় বাকীরা পালিয়ে যায়। মাসুদকে পরে ঢাকায় এসে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় আরেক বাঙ্গালী অফিসার কে এম সফিউল্লাহকে। 

এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কে এম সফিউল্লাহ বলেন, ১৯ মার্চ সকাল দশটায় তার ইউনিটকে জানানো হয় ব্রিগেড কমান্ডার মধ্যহ্নভোজে আসছেন এবং নিকটবর্তী গাজিপুর সমরাস্ত্র কারখানা পরিদর্শন করবেন। কিন্তু জনতা প্রায় ৫০০ ব্যরিকেড বসিয়ে সৈন্যদের আটকে দেয়। এগুলো সরিয়ে তারা আসলেও ফিরে যাওয়ার সময় জয়দেবপুরে মজবুত ব্যরিকেড সৃষ্টি করলে লে. ক. মাসুদ তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। এমন সময় দুজন বাঙ্গালী সৈনিক জাহানজেবকে জানায় তাদেরকে বেধড়ক পিটিয়েছে, অস্ত্র গোলাবারুদ ছিনিয়ে নিয়েছে। এবার জাহানজেব গুলি করার নির্দেশ দিলে মঈন তার সৈন্যদের গুলি করতে বলে। তবে বাংলায় বলে দেয় ফাঁকা গুলি করার জন্য। এরপরও পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রনে না এলে এবার জাহানজেব কার্যকরভাবে গুলি করার নির্দেশ দেন। তারাও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। দু’জন নিহত হয়। সফিউল্লাহ আরো জানান, গাজিপুরের পরিস্থিতিও ছিল উত্তেজনাকর। রাস্তায় ব্যরিকেড দেয়া হয়েছিল। সমরাস্ত্র কারখানার আবাসিক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাকে আটকে ফেলে বাঙ্গালীরা। আবাসিক পরিচালককে উদ্ধার করতে আমরা সেনা প্রেরণ করেছিলাম। 

এভাবে সারাদেশে সেনাবাহিনীকে নানাভাবে উস্কে দিয়ে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করেছিলো বাঙ্গালীদের একটা অংশ। ইয়াহিয়া বিদ্রোহ দমন করার জন্য টিক্কা খানকে এদেশে আনলেও সেনাবাহিনীকে শুধুমাত্র আক্রান্ত হওয়া ছাড়া কোন ভূমিকা নিতে বারণ করেন। ২৫ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই ধৈর্য্যের প্রশংসা করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কট্টর সমালোচক সাংবাদিক মাসকারেনহাস। এসব ঘটনায় মুজিব বেশ চাপ পড়েছিলেন। সমঝোতাও পড়েছিলো হুমকির মুখে। তারপরও হয়তো সমঝোতা হত। কিন্তু একটা ছবি যা বিদেশী পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো এরপর আর কোন আলোচনাতে অংশ নিতে রাজি হয়নি ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো। সেটি ছিল ঢাকা ভার্সিটি এলাকায় যুবক ছেলে মেয়েদের যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে মার্চপাস্টের ছবি।  

এই রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডের জন্য ও আটক বিহারীদের উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সমূহে অভিযান চালায়। বিদ্রোহী কিছু ছাত্র প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও সেটা ছিল বালির বাঁধের মত। সেদিন হলে যারা সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে চেয়েছিলো তাদের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে সেনাবাহিনী। কিন্তু এরপরও থেমে থাকেনি অবাঙ্গালী হত্যা। 

ওয়াশিংটনস্থ সানডে স্টার ৯ মে ১৯৭১ এ সংবাদ বেরিয়েছে। যার বঙ্গানুবাদ, “খুলনায় সেনাবাহিনীর সহায়তায় সফরকারী এক সংবাদকর্মী গতকাল জানান যে, তিনি একটি বিহারীদের বাড়ি দেখেছেন যাকে মানুষের কসাইখানা হিসেবে বর্ণনা দেন। যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী ভারত থেকে আগত বিহারী, পশ্চিম পাকিস্তানী এবং অন্যান্য অবাঙ্গালীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বাঙ্গালীদের দ্বারা নৃশংসভাবে মরতে হয়”। 

স্বাধীনতার পরপরই অবাঙ্গালী হত্যা সব ধরণের সীমা ছাড়িয়েছে যাদের অধিকাংশই ছিল নিরাপরাধ বেসামরিক মানুষ। ঢাকা, খুলনা, সৈয়দপুর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক স্থানে চলে গণহত্যা। এর কোন পরিসংখ্যান কোথাও নেই। আদমজী কোর্ট ও বাওয়ানী বিল্ডিঙের উর্দুভাষী দারোয়ানগুলোকে হত্যা করা হয়েছে ১৭ ডিসেম্বর। যারা অধিকাংশই ছিল বৃদ্ধ এবং যাদের একমাত্র অপরাধ ছিল বাঙ্গালী না হওয়া। সাদ আহমদ তার বইতে বলেন, দারোয়ানদের সংখ্যা ১৫-১৬ জন হবে। 

মুজিব ক্ষমতা নেয়া পর্যন্ত এই ধরণের হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যেই চলতে থাকে। মুজিব সরকারের প্রাথমিক সাফল্য ছিল এই ধরণের ঢালাও হত্যাকাণ্ড বন্ধ হওয়া। যদিও মাঝে মধ্যেই সংঘবদ্ধ আক্রমন হত বিহারীদের বিরুদ্ধে। এই ধরণের একটি ঘটনা ঘটে বাহাত্তরের মার্চে। বাঙ্গালীদের দ্বারা নিহত হয় প্রায় দুইশ বেসামরিক অবাঙ্গালী নারী-পুরুষ। 

যশোর হত্যাকাণ্ডের কিছু ছবি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতা প্রামণের জন্য ব্যবহৃত হয়। অথচ ব্যাপারটা ভিন্ন। সেগুলো ছিল বাঙ্গালীদের দ্বারা সংগঠিত অবাঙ্গালী হত্যাকাণ্ড। 

স্বাধীনতার পর শুধু অবাঙ্গালী নয় নির্বিচারে খুন করা হয়েছে বেসামরিক বাঙ্গালীদেরও। 

ভারতীয় মিত্র বাহিনী যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিল। তাই ১৪ই ডিসেম্বর তারা চীনপন্থী বুদ্ধিজীবীদের কৌশলে হত্যা করে RAW এবং এদেশীয় মার্ক্সবাদী বামপন্থীয়দের সহায়তায় এবং কৌশলে এসব দোষ চাপিয়ে দেয় রাজাকার আর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর উপর। এই বিষয়ে আরো জানতে এই লিখাটি পড়তে পারেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তারা সমস্যায় পড়ে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কাদের সিদ্দিকী ও মুজিব বাহিনীর কর্মকান্ড। তারা ঠান্ডা মাথায় বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করতে থাকে স্বাধীনতা বিরোধীদের। এই ছবিগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং কাদের সিদ্দিকী পরিচালিত মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা পায়। যা মিত্রবাহিনীর অংশ হিসেবে ভারতীয় বাহিনীকে সমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। 

ওরিয়ানা ফ্যালাসি ১৮ ডিসেম্বরের হত্যাকান্ড নিয়ে শেখ মুজিবের সাথে দীর্ঘ বাকযুদ্ধে লিপ্ত হন। তার কিছু অংশ পড়ুন। ফ্যালাসি ১৮ ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে...
- ম্যাসাকার? হোয়াট ম্যাসাকার? 
- ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকান্ডটি।
- ঢাকা স্টেডিয়ামে কোন ম্যাসাকার হয়নি, তুমি মিথ্যে বলছো।
- মিঃ প্রাইম মিনিস্টার। আমি মিথ্যাবাদী নই। সেখানে আরো সাংবাদিক ও হাজার হাজার লোকের সাথে আমি হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছি। আপনি চাইলে ছবি দেখাতে পারি। আমার পত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছে। 
- মিথ্যেবাদী, ওরা মুক্তিবাহিনী নয়। 
- মিঃ প্রাইম মিনিস্টার দয়া করে মিথ্যেবাদী শব্দটা আর উচ্চারণ করবেন না, তারা মুক্তিবাহিনী তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আবদুল কাদের সিদ্দিকী। 
- তাহলে হয়তো তারা রাজাকার ছিল, যারা প্রতিরোধের বিরোধীতা করেছিল এবং কাদের সিদ্দিকী তাদের নির্মূল করতে বাধ্য হয়েছিলো। 
- মিঃ প্রাইম মিনিস্টার, কেউ প্রমাণ করেনি যে, লোকগুলো রাজাকার ছিল এবং বিরোধীতা করেছিল। তারা ভীতসন্ত্রস্ত্র ছিল, হাত-পা বাঁধা ছিল তারা নড়া ছড়াও করতে পারছিলোনা। 
-মিথ্যেবাদী
- শেষবারের মত বলছি, আমাকে “মিথ্যাবাদী” বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না। 
- আচ্ছা সে অবস্থায় তুমি কি করতে? 
- আমি নিশ্চিত হতাম, ওরা রাজাকার এবং অপরাধী, তারপর ফায়ারিং স্কোয়াডে দিতাম এবং খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এভাবে ঘৃন্য হত্যাকাণ্ড এড়াতাম। 
- ওরা এভাবে করেনি, হয়তো আমার লোকেদের কাছে বুলেট ছিলনা। 
- হ্যা তাদের কাছে বুলেট ছিল। প্রচুর বুলেট ছিল, এখনো তাদের কাছে প্রচুর বুলেট রয়েছে। তা দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গুলি ছোঁড়ে। ওরা গাছে, মেঘে, আকাশে, মানুষের প্রতি গুলি ছোঁড়ে শুধু আনন্দ করার জন্য। 

সাদ আহমেদ বলেন, খেলাফত ভাইকে হত্যা করে টাঙ্গিয়ে রাখা হয়, কুমারখালীর আজিজুল হক ভাইকে নদীর চরে নিয়ে মুখের মধ্যে বালু ভর্তি করে হত্যা করা হয়। ভেড়ামারার প্রসিদ্ধ আলেম আলহাজ্ব মাওলানা আহমদ হোসেন সাহেবকে তিন খন্ড করে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। এভাবে সারাদেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের কোন অপরাধ ছাড়াই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মসজিদ মাদ্রাসা থেকে শত শত আলেমদের ধরে এনে উন্মুক্ত মাঠে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে আর সেই মৃত মানুষগুলোর মাথা নিয়ে পৈচাশিক আনন্দ করে মুজিব বাহিনী ও কাদের সিদ্দিকীর লোকজন। এভাবেই চলতে থাকে গণহত্যা। যার কোন সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছে নেই।

তথ্যসূত্রঃ
১- বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধঃ বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ, এম আই হোসেন।
২- দ্যা ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ, আর্চার ব্লাড
৩- The 1971 Indo-Pak war, A soldier's Narrative, Hakim Arshad Koreshi
৪- The Crisis in East Pakistan, Govt of Pakistan, 5 August, 1971.
৫- Anatomy Of Violence, Sarmila Bose
৬-The event in East Pakistan, 1971- International Commission of Jurists, Geneva.
৭- The Telegraph, India, March 19, 2006
৮- আমি বিজয় দেখেছি, এম আর আখতার মুকুল
৯- ওরিয়ানা ফ্যালাসির জন্মদিন ও বাংলাদেশী নেতাদের নিয়ে তার মূল্যায়ন- আবু জুবায়ের
১০- ডেড রেকনিং, শর্মিলা বসু 
১১- মুজিবের কারাগারে পৌণে সাতশ দিন। সা'দ আহমদ, ১ম প্রকাশ ১৯৯০

১১ ডিসেম্বর, ২০১৫

একনজরে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা



জন্মঃ ১৯৪৮ সালের ২রা ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলাস্থ সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গী গ্রামে নিজ মাতুলালয়ে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সানাউল্লাহ মোল্লা ও মাতার নাম বাহেরুন্নেসা বেগম। আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন নয় ভাইবোনের মাঝে ৪র্থ। তার জন্মের কিছুকাল পরে তার পিতা-মাতা সদরপুরেরই আমিরাবাদ গ্রামে এসে বাড়ি করে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন।

প্রাথমিক শিক্ষাঃ তিনি মেধাবী একজন ছাত্র হিসেবে ১৯৫৯ ও ১৯৬১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনিষ্টিটিউট থেকে প্রথম শ্রেণীতে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরিক্ষায় উত্তীর্ন হন। ১৯৬৮ সালে তিনি একই কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেন। কিন্তু প্রবল আর্থিক সংকটের কারনে এরপর তাকে শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া হয়নি তখন আর। ফরিদপুরের শিব সুন্দরী (এস এস) একাডেমি নামক একটি স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন কিছু কাল।

উচ্চশিক্ষাঃ ১৯৬৯ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি করার জন্যে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণকালে তিনি ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।মুক্তিযুদ্ধের কারনে ১৯৭১ সালে তিনি মাস্টার্স পরীক্ষা না হওয়ায় তিনি বাড়ি চলে যান। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭২ এর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। যুদ্ধের সময় প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেকের মত আবদুল কাদের মোল্লার লেখাপড়াতেও ছন্দ পতন ঘটে। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর (ইন্সিটিউট অব এডুকেশনাল রিসার্চ) বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের ডিপ্লোমায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে আবার ১৯৭৭ সালে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রীতে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম হন। 

কর্মজীবনঃ আব্দুল কাদের মোল্লা ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকার বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। এমএড পরীক্ষার রেজাল্টের পরে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন এবং পরে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ সংস্কৃতি কর্মকর্তা হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে রিসার্চ স্কলার হিসাবে বাংলাদেশ ইসলামী সেন্টারে যোগ দেন। গৌরব-সাফল্যের ধারাবহিকতায় উদয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, রাইফেল পাবলিক স্কুল এবং মানারাত স্কুলের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮১ সালে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকায় সাব-এডিটর পদে যোগদান করেন তিনি। শিক্ষকতা পেশায় যে সত্যের পরশ পেয়েছিলেন, তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তিনি সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এ সময়ে তাঁর ক্ষুরধার ও বস্তুনিষ্ঠ লেখা প্রকাশ হতে থাকে দেশের জাতীয় দৈনিকসমূহে। বীক্ষণ ছদ্মনামে তার লেখা আর্টিকেল গুলো সচেতন পাঠক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। 

বৈবাহিক জীবনঃ জনাব মোল্লা দিনাজপুর নিবাসী বেগম সানোয়ার জাহানের সাথে ১৯৭৭ সালের ৮ অক্টোবর তারিখে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বেগম সানোয়ার জাহান ইডেন কলেজ থেকে পড়াশুনা করেছেন। তিনিও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার মত বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন ও ইডেন কলেজের ছাত্রী ইউনিয়নের জিএস ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বেগম সানোয়ার জাহান তার বাবার সাথে কুষ্টিয়াতে ছিলেন ও সক্রিয় ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন। বেগম সানোয়ার জাহানদের বাসা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খাবার যেত। দুই পুত্র ও চার কন্যার সুখী সংসার তাদের। সব সন্তানই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করেছেন। পরিবারের সকলেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত। বেগম সানোয়ার জাহান জামায়াতের রুকন ও দায়িত্বশীলা । 

সাংবাদিক কাদের মোল্লাঃ সেসময়েরই একজন নির্ভীক সাংবাদিক শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা। বর্ণাঢ্য জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যে তিনি আমাদের কাছে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হলেও জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জল সময়টা অতিবাহিত করেছেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে।
সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে যে প্রত্রিকাগুলো তখন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে সর্বমহলের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছিল তাদের মধ্যে ‘দৈনিক সংগ্রাম’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আর এ পত্রিকাটিতে দক্ষ হাতে দায়িত্ব পালনের ফলে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য মনোনীত হন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকদের দাবী আদায়ের সংগ্রামে। ফলে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য মনোনীত হন। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ ও ১৯৮৪ সালে পরপর দু’বার তিনি ঐক্যবদ্ধ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্তরে দ্রোহ আর বিপ্লবের চেতনা লালন করেও সদা হাস্যোজ্জল এ মানুষটি ছিলেন সাংবাদিক আড্ডার প্রাণ-ভ্রমরা। তার রসময় গল্পকথার সজীবতায় ভরে উঠতো গনমানুষের চেতনার প্রতীক জাতীয় প্রেসক্লাব।
কিন্তু একজন সাংবাদিকের জীবন সাধারণভাবেই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। কখনো সমাজের বিপথগামী অংশ, কখনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল, আবার কখনওবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির রোষানলে পড়তে হয় তাকে। সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দন্দ্বে উৎসর্গিত হয় সাংবাদিকের জীবন। চারপাশের চেনাজন, পরিচিত বন্ধুমহল একসময়ে পরিণত হয় তার শত্রুতে। হানে প্রাণঘাতি ছোবল। যে ছোবলের রূপ হয় নানারকম। মানসিক যন্ত্রণায় বিপন্নতা, শারিরিক আঘাতে পঙ্গুত্ববরণ, প্রাণঘাতি হামলায় মৃত্যু, কারাবন্দিত্বের নিঃসঙ্গ যাতনা কিংবা প্রহসনের বিচারে জীবনাবসান। এসবই ছিল যুগে যুগে সাংবাদিক জীবনের অনিবার্য উপাদান। শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার জীবনেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় একসময় সাংবাদিকতার পেশাকে বিদায় জানাতে হয় তাঁকে। কিন্তু যে পেশা তার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে এর মহত্বকে তিনি ধারণ করতেন সবসময়। তাইতো তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবে ছিলেন সাংবাদিক সমাজের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে। দৈনিক সংগ্রাম অফিসের প্রতিটি ধুলিকণা এখনো বহন করে বেড়াচ্ছে কাদের মোল্লার স্মৃতি ।

রাজনৈতিক জীবনঃ শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার রয়েছে সংগ্রামী রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যায়ন কালেই তিনি কম্যূনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার পর তাফহীমুল কুরআনের হৃদয়স্পর্শী ছোঁয়ায় তিনি ইসলামের প্রতি প্রবল আকর্ষিত হন এবং আলোকিত জীবনের সন্ধান পেয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে তিনি ছাত্রসংঘের তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান শাখায় যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি এ সংগঠনের সদস্য হন। ছাত্রসংঘের শহিদুল্লাহ হল শাখার সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি, ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারী ও একই সাথে কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতের রুকন হন। তিনি অধ্যাপক গোলাম আযমের ব্যাক্তিগত সেক্রেটারি এবং ঢাকা মহানগরীর শূরা সদস্য ও কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অল্পদিনের ব্যাবধানেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশ-এ-শূরার সদস্য হন। ১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারী ও পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের প্রথম দিকে ঢাকা মহানগরীর নায়েব-এ-আমীর, অতঃপর ১৯৮৭ সালে ভারপ্রাপ্ত আমীর এবং ১৯৮৮ সালের শেষ ভাগে তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন যা বাতিলের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাড়ায়।
১৯৯১ সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রধান নির্বাচনী মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ২০০০ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত হন। তিনি ২০০৪ সালের মার্চ মাসে স্বল্প সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত দায়িত্বের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলনে তিনি চারদলীয় জোটের লিয়াজো কমিটির গুরুত্বপূর্ন সদস্য হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা। বিশেষ করে ৯০এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে লিয়াঁজো কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। তখন কমিটিতে গৃহীত আন্দোলনের কর্মসূচি সম্পর্কে ব্রিফিং করতেন আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম এবং তা বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করতেন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা। লিয়াঁজো কমিটিতে বিভিন্ন সময়ে নানা দায়িত্ব পালন করার কারনে বিএনপি দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা সহ উভয় দলের সিনিয়র নেত্রীবৃন্দের সাথে আন্দোলনের নীতি নির্ধারণী সভাতে মিলিত হতেন তিনি। 
জনাব মোল্লাকে বিভিন্ন মেয়াদে চার চারবার জেলে যেতে হয়। আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়ে ১৯৬৪ সালে প্রথম বারের মত তিনি বাম রাজনীতিক হিসেবে গ্রেপ্তার হন। ১৯৭১ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। কিন্তু স্থানীয় জনতার বিক্ষোভের মুখে পুলিশ তাকে স্থানীয় পুলিশ স্টেশন কাস্টোডী থেকেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। জেনারেল এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারনে আব্দুল কাদের মোল্লাকে আবারও আটক করে রাখা হয় ১৯৮৫ সালের ২২শে এপ্রিল থেকে ১৪ই অগাস্ট । প্রায় চারমাস আটক থাকার পরে উচ্চ আদালত তার এ আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করলে তিনি মুক্ত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী তত্তাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদের সাথে একই দিনে গ্রেফতার হন। সাত দিন পরে তিনি মুক্ত হন। 

শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার কূটনীতিকদের সাথে ছিল গভীর সম্পর্ক। সদা হাস্যোজ্জল ও রসময় কাদের মোল্লার কথা ছাড়া কোন প্রোগ্রাম জমজমাট হতো না। জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নানা কূটনীতিক প্রোগ্রামে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। জনাব মোল্লা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমন করেছেন। তিনি আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, ভারত সহ নানা দেশ সফর করেছেন।

জনাব মোল্লা সক্রিয় ভাবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংস্থার সাথে যুক্ত ছিলেন। যার মধ্যে বাদশাহ ফয়সাল ইন্সটিটিউট, ইসলামিক এডুকেশন সোসাইটি ও এর স্কুল, সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী, সদরপুর মাদরাসা ও এতিমখানা, ফরিদপুর জেলার হাজিডাঙ্গি খাদেমুল ইসলাম মাদরাসা ও এতিমখানা, সদরপুর আল-আমিন অন্যতম। এছাড়াও তিনি ঢাকার গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন। 
জনাব মোল্লা দেশ বিদেশের সমসাময়িক বিষয়ের উপর একাধিক কলাম ও প্রবন্ধ লিখেছেন। দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংগ্রাম, পালাবদল, মাসিক পৃথিবী, কলম ইত্যাদি নানা জায়গায় তার লেখা ছাপা হয়েছে। প্রত্যাশিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দেশে বিদেশে তিনি বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের উপরে তার গুরুত্বপূর্ণ লেখা পাওয়া যায়। তার লেখা কলাম ও প্রবন্ধ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ও বস্তুবাদ ও কম্যূনিজমের উপরে তার বৈজ্ঞানিক সমালোচনা শিক্ষিত মহলের কাছে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় তিনি প্রথমে আব্দুল কাদের নামে লেখা শুরু করেন।পরবর্তীতে তিনি বীক্ষণ ছদ্মনামে লেখা শুরু করেন ও উনার লেখা গুলো খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সমসাময়িক সমস্যা ইত্যাদি নানা বিষয়ে তার লেখা মানুষের চিন্তা-চেতনার জগতে ঢেউ তুলতে শুরু করে। 

জনাব মোল্লা নিয়মিত কুরআন পড়তে ও কুরআন তেলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি সাংগঠনিক ব্যস্ত সময় মধ্যেও তিনি বিভিন্ন বিখ্যাত লেখক, কবি যেমন আল্লামা ইকবাল, সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী, সাইয়্যেদ কুতুব ইত্যাদি নানা লোকের লেখা পড়তে পছন্দ করতেন।

৫ ডিসেম্বর, ২০১৫

মাওলানা মওদুদীকে একটি প্রশ্ন ও তার অসাধারণ জবাব।


মাওলানা মওদুদীর কাছে প্রশ্ন,
আপনি তাফহীমুল কুরআনে 'আল্লাহু আকবার’ বলে গুলি করার মাধ্যমে শিকারকৃত মৃত প্রাণীকে হালাল আখ্যা দিয়ে এক অভিনব কথা আবিষ্কার করলেন। আপনার এ বক্তব্যের ভিত্তিতে নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলোর উদয় হয়, মেহেরবানি করে এগুলোর জবাব দিয়ে সন্তুষ্ট করবেন। 
১. চারজন ইমামই এ ব্যাপারে একমত যে, গুলির দ্বারা মৃত শিকার ‘চোট’ লেগে মারা গেলে না জায়েজ ও হারাম। কাজেই কোন দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে আপনি এটাকে জায়েজ লিখেছেন।
২. বন্দুকের গুলিতে ধারল কিছুই থাকে না, বরঞ্চ কেবল একটা তীব্র আঘাতের দ্বারাই প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। সাধারণত কার্টিজের উপর লেখা থাকে, এটার শক্তি এতো পাউন্ড। কিন্তু এটাতো লেখা থাকে না যে, এটার ধার এতোটা তীক্ষ্ম! আঘাত দ্বারা মৃত শিকার অবৈধ এবং এটা সর্বস্মত।
৩. তাফসীরে হক্কানীতে লেখা হয়েছে, কাজী শওকানী বন্দুকের গুলিতে মৃত শিকার হারাম হবার ব্যাপারে মতবিরোধ করেছেন। কিন্তু কাজী সাহেবের মতবিরোধ মানদন্ড হতে পারেনা। কারণ তিনি মাজরূহ (ত্রুটিপূর্ণ) হাদীস বর্ণনাকারী হওয়া ছাড়াও শিয়া মতবাদের প্রতি আসক্ত।
৪. এ বিষয়টাকে ক্ষুদ্র বা খুঁটিনাটি বিষয় আখ্যায়িত করা জনসাধারণকে ধোঁকা দেয়া ছাড়া কিছু নয়। হারামকে হালাল করাটাও কি প্রাসাংগিক ব্যাপার?

এ প্রসঙ্গে মাওলানার জবাবঃ
সর্ব প্রথম আমি আপনার চতুর্থ প্রশ্নে উল্লেখিত ভুল ধারণার আপনোদন করতে চাই। আপনি প্রশ্ন করেছেনঃ হারামকে হালাল করাটাও কি প্রাসাংগিক ব্যাপার?

এ ব্যাপারে আপনার জানা থাকা দরকার যে, এক প্রকার হালাল হারাম হলো তা, যা সরাসরি (কুরআন ও হাদীসের) অকাট্য দলীল প্রমাণের মাধ্যমে হালাল বা হারাম বলে নিরুপিত হয়েছে। আর সেগুলো হলো মৌলিক ও মূলনীতিগত বিষয়। এগুলোতে কোন প্রকার রদবদল করা কুফরী। দ্বিতীয় প্রকার হালাল হারাম হলো তা, যা সরাসরি কুরআন হাদীসের অকাট্য দলীল প্রমাণ দ্বারা নয়, বরঞ্চ তার ইশারা ইঙ্গিতের আলোকে চাহিদা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে গবেষণা ও ইজতিহাদ করে বের করা হয়। আর এগুলোই হলো প্রাসংগিক বিষয়। এসব বিষয়ে সব সময়ই মুসলিম উম্মাহর আলিম ও ফকীহগণের মধ্যে এমনকি সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং তাবেয়ীন রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মধ্যেও মতভেদ চলে আসছে। একই জিনিসকে কেউ হালাল বলেছেন, আবার কেউ হারাম বলেছেন। কিন্তু এমন কখনো হয়নি যে, ইজতিহাদী হালাল ও হারামের বিষয়ে তাঁরা তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হয়ে একে উপরের বিরুদ্ধে এই বলে অভিযোগ করেছেন যে, তোমার দ্বীন পরিবর্তন হয়ে গেছে, কিংবা তুমি আল্লাহর হারাম করা জিনিসকে হালাল করে ফেলেছো। বড়ই পরিতাপের বিষয়, এটা কেবল আমাদেরই দেশে নয় বরঞ্চ গোটা পৃথিবীর মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ শরয়ী মাসায়েলের ক্ষেত্রে স্বাধীন গবেষণা ইজতিহাদ বন্ধ হয়ে আছে এবং সব লোকেরাই কোন না কোন ফিকহী মাযহাবের অনুকরণ ও অনুবর্তনে এতোটা অটল হয়ে আছে যে, প্রত্যেকেই নিজের অনুসৃত সেই বিশেষ মাযহাবকেই মূল শরীয়ত মনে করতে শুরু করেছে। এ কারণেই লোকদের সামনে তাদের অনুসৃত সেই বিশেষ মযহাবের বিপরীত কোন গবেষণা ইজতিহাদ পেশ করা হলে তারা তাতে এমন নাট সিটকাতে আরম্ভ করেন যেনো মূল দ্বীনের মধ্যেই কোন রদবদল করে ফেলা হয়েছে। অথচ অতীত বুযুর্গদের মধ্যে যখন স্বাধীন গবেষণা ইজতিহাদের দরজা খোলা ছিলো, তখন উলামায়ে কিরামের মধ্যে হালাল হারাম এবং ফরজ ও গায়েরে ফরজের মধ্যে পর্যন্ত মত পার্থক্য হয়ে যেতো এবং এগুলো তারা কেবল বরদাশতই করতেন না, বরঞ্চ তারা প্রত্যেকেই নিজেরা যেটাকে শরয়ী বিধান বলে মনে করতেন সেটার উপর আমল করতেন এবং অন্যেরা যেটাকে শরয়ী বিধান বলে মনে করতো তাদেরকে সেটার উপর আমল করার অধিকার দিতেন।

এই পানাহারের বিষয়ে অতীতের উলামায়ে কিরামের মধ্যে যেসব মত পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল তার কয়েকটি উদাহরণ আমি এখানে উদ্ধৃত করছি এবং এইসব মতভেদের ব্যাপারে আপনার নিকট আমার জিজ্ঞাসা এই যে, আপনি এই বুযুর্গদের কার প্রতি হারাম হালাল করার এবং হালালকে হারাম করার অভিযোগ আরোপ করতে পারবেন ?

হযরত আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিতঃ তিনি হিংস্র জন্তুর গোশত এবং তাদের শিরার উপরে যে রক্ত থেকে যায় তার ব্যবহারকে দোষণীয় মনে করতেন না। তাঁর এ মতের দলিল ছিল নিম্নোক্ত আয়াতঃ

হে নবী বলে দাওঃ আমার নিকট প্রেরিত ওহীর মধ্যে কোনো আহার গ্রহণকারীর আহারে হারাম কিছু পাই না ----- আর এই আয়াতেরই ভিত্তিতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসও কুরআনে ঘোষিত চারটি জিনিস (শূকর, মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত এবং যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে বধ করা হয়েছে তা ব্যতীত আর কোন জিনিসকেই হারাম মনে করতেন না। দ্রষ্টব্যঃ আহকামুল কুরআনঃ জাসসাসঃ তয় খন্ড, পৃষ্ঠাঃ ২০

গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়ার ব্যাপারে একদলের মত হলঃ নবী করিম সাঃ খায়বার যুদ্ধের সময় বিশেষ কারণে তা খেতে নিষেধ করেছিলেন। তাঁর এ সাময়িক নিষেধাজ্ঞা একথা প্রমাণ করেনা যে গাধার গোশত মুলতই হারাম। (দেখুন ঐ বই এর পৃষ্ঠা ২১ )

ইমাম আবু হানীফা ও তার সাথীদের মতে হিংস্র পশু এবং শিকারী পাখি পুরোপুরি হারাম। ইমাম মালিক হিংস্র পশুকে হারাম মনে করেন বটে কিন্তু শকুন ঈগল প্রভৃতি শিকারি পাখীকে হালাল বলে মত প্রকাশ করেছেন, এগুলো মৃত জীব ভক্ষক হোক কিংবা নাহোক। ইমাম আওযায়ী কেবলমাত্র শকুনকে মাকরূহ মনে করতেন । তাঁর মতে অন্য সকল প্রকার পাখি হালাল। ইমাম লাইস বিড়ালকে হালাল মনে করতেন, তবে শবখোর বনবিড়ালকে মাকরূহ মনে করতেন। ইমাম শাফেয়ীর নিকট কেবলমাত্র মানুষের উপর হামলাকারী বন্যপশু এবং মানুষের পালিত জন্তুর উপর হামলাকারী শিকারী পাখি হারাম। বন বিড়াল ও খেকশিয়াল এ সংজ্ঞার আওতামুক্ত থাকে।ইকরামার নিকট কাক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এটাতো মাংসল মোরগ আর বনবিড়াল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেনঃ এটা মোটা দুম্বা । (দেখুন ঐ বই এর পৃষ্ঠা ২১ )

এভাবে ভূ গর্ভে বসবাসকারী প্রাণীর গোশত খাওয়া সম্পর্কেও মতভেদ আছে। হানাফীগণ ভূ-গর্ভে বসবাসকারী সকল প্রাণী মকরূহ মনে করেন। ইবনে আবী লাইলারমতে সাপ খাওয়াতে তেমন কোন দোষ নেই। তবে তিনি যবেহ করে খাবার শর্ত আরোপ করেছেন। ইমাম মালেকের মতেও সাপ খাওয়া জায়েজ। কিন্তু ইমাম আওযায়ী যবেহ করার শর্তকেও উড়িয়ে দিয়েছেন। ইমাম লাইসের মতে জংলী ইদুর (সজারু) খাওয়া যায়েজ। ইমাম মালেকের মতের ব্যাঙ খাওয়া জায়েজ। ইমাম শাফেয়ী বলেন, আরববাসী যেসব জিনিস খেতে ঘৃনা করতো সেগুলোই নোংরা নাপাক। আর তারা যেহেতু বন বিড়াল এবং খেকশিয়ালের গোশত খেতো সুতরাং এ উভয় প্রাণীই হালাল। (দেখুন ঐ বই এর পৃষ্ঠা ২১ )
এ উদাহরণ ক’টি থেকে একথা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, যেসব ক্ষেত্রে সরাসরি কুরআন হাদীসের বিধান মওজুদ নেই সেসব ক্ষেত্রে গবেষণা ইজতিহাদের ভিত্তিতে হালাল হারামের যে পার্থক্য দেখা দেয়, তা শরীয়তের কোন মৌলিক বিষয় নয়, বরং তুচ্ছ ও খুটি নাটি ব্যাপার। কোনো ফিকহী মযহাবে ইজতিহাদের ভিত্তিতে কোন জিনিস হারাম হবার অর্থ কখনো এ নয় যে, মূল খোদায়ী শরয়ীতেই তা হারাম। কেউ যদি এ ধরণের কোন জিনিসকে তার গবেষণা ইজতিহাদের ভিত্তিতে হালাল বলে মত প্রকাশ করে, তবে এ ব্যাপারে বিতর্ক অবশ্যই চলতে পারে। কিন্তু এটা এমন কোনো ব্যাপারই নয় যে, এজন্য ক্ষিপ্ত হতে হবে এবং এটাকে দ্বীনের মধ্যে রদবদল ও আল্লাহর হারামকৃত জিনিসকে হালাল করার অভিযোগ করা যেতে পারে।

এবার আমি মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাচ্ছি, যার প্রেক্ষিতে আপনি এসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।
আমার কাছে অবাক লাগছে, একথা আপনি কোথা থেকে জানতে পারলেন যে, বন্দুকের গুলিতে মৃত জন্তু হারাম হবার ব্যাপারে চারজন ইমামই এক মত ! চারজন ইমামের কোনো একজনের যুগেও কি বন্দুক আবিষ্কার হয়েছিল? চারজন ইমামের অনুবর্তনকারী আলিমগণের কয়েকজন কিংবা তাদের সকলের ইমাম চতুষ্টয়ের গবেষণালদ্ধ কোনো মাসয়ালা আলোকে কোনো হুকুম বা ফায়সালা বের করা একটা ভিন্ন জিনিস আর স্বয়ং ইমামগণের কোনো হুকুম ফায়সালা বিবৃত করা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। বন্দুক তো পরবর্তী ফকীহদের যুগে আবিষ্কার হয় এবং তার গঠন প্রণালীতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। ফকীহগণ এ সম্পর্কে কোনো বিধান যদি বর্ণনা করেও থাকেন, তবে তা করেছেন অতীত ইমামগণের ইজতিহাদী বিধানের ভিত্তিতে গবেষণার উপর গবেষণা চালিয়ে। এ ভিত্তিতে কি করে এ দাবী করা যেতে পারে যে ইমাম চতুষ্টয় এ জিনিস হারাম হবার ব্যাপারে একমত ছিলেন? 

বন্দুক দ্বারা শিকার করা প্রাণী হালাল হবার ব্যাপারে আমি যে মাসআলা বর্ণনা করেছি, তা কাযী শওকানী থেকে গ্রহণ করিনি। বরঞ্চ আমি সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ থেক বিষয়টি চয়ন করেছি। ইসলামী শরীয়তে প্রাণীকে শরীয়ত সম্মত পন্থায় যবেহ করার যেসব বিধান রয়েছে, মৌলিকভাবে সেগুলোকে দুইভাগে ভাগ করা যায়ঃ 

১. এক প্রকার প্রাণী আছে আমাদের আয়ত্বাধীন। এগুলোকে আমরা সুনির্দিষ্ট পন্থায় যবেহ করতে পারি। এগুলোর যবেহ শুদ্ধ হবার শর্ত সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এ যবেহকে প্রচলিত অর্থে আমরা ইচ্ছে মাফিক যবেহ বলতে পারি। 

২. দ্বিতীয় প্রকার প্রাণী হলো সেগুলো, যেগুলো আমাদের আয়ত্বের বাইরে। যেমন বন্য পশু, কিংবা এমন গৃহপালিত পশু যা বন্ধন ছুটে বেরিয়ে গেছে এবং বন্য পশু সম্পর্কিত বিধানের আওতাভুক্ত হয়ে গেছে। অথবা এমন পশু যা কোন গর্তে নিপতিত হবার কারণে শরয়ী বিধিসম্মত ভাবে যবেহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কিংবা এমন পশু যা কোনো কারণে মুমূর্ষ অবস্থায় পৌছে গেছে এবং তাকে যবেহ করার ছুরি খুজতে খুজতে তার মৃত্যু হবার আশংকা রয়েছে। এরূপ সকল পশুর জবেহ করার শর্ত ভিন্ন রকম, এ রকম যবেহকে প্রচলিত অর্থে আমরা অনিবার্য যবেহ বলতে পারি।
প্রথম প্রকার পশুর যবেহর স্থান হলো কন্ঠনালী। এরূপ পশু যবেহ করার জন্যে তাদের গলা এমনভাবে কেটে ফেলা জরুরী শর্ত, যাতে করে তাদের খাদ্যনালী ও শিরাসমূহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বাকী থাকলো দ্বিতীয় প্রকার পশুর কথা। এ ধরণের পশুর যবেহর স্থান সেগুলোর গোটা দেহ। যে কোন জিনিস দিয়ে, তা যাই হোক না কেন, শরীরের যে কোন স্থানে এমন পরিমাণ ছিদ্র করে দেয়াই যথেষ্ট, যাতে রক্ত প্রবাহিত হয়। এ বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে যেসব প্রমাণ পাওয়া যায়, তা ধারাবাকহিকভাবে নিম্নে প্রদত্ত হলোঃ

يَسۡـَٔلُوۡنَكَ مَاذَاۤ اُحِلَّ لَهُمۡ‌ؕ قُلۡ اُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبٰتُ‌ۙ وَمَا عَلَّمۡتُمۡ مِّنَ الۡجَوَارِحِ مُكَلِّبِيۡنَ تُعَلِّمُوۡنَهُنَّ مِمَّا عَلَّمَكُمُ اللّٰهُ‌ فَكُلُوۡا مِمَّاۤ اَمۡسَكۡنَ عَلَيۡكُمۡ وَاذۡكُرُوۡا اسۡمَ اللّٰهِ عَلَيۡهِ‌ وَاتَّقُوۡا اللّٰهَ‌ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَرِيۡعُ الۡحِسَابِ 

সূরা আল মায়েদা – ৪ নং আয়াত
১. তোমাদের জন্য সমস্ত পবিত্র জিনিস হালাল করে দেয়া হয়েছে। এবং যেসব শিকারী জন্তুকে তোমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়েছো যাদেরকে আল্লাহর দেওয়া ইলমের ভিত্তিতে তোমরা শিকার করার নিয়ম শিক্ষা দিয়ে থাকো সেগুলো তোমাদের জন্য যেসব জন্তু ধরে রাখবে তাও তোমরা খেতে পার। অবশ্য তার উপর আল্লাহর নাম নেবে। 

এ থেকে জানা গেল যে, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিকারী পশুকে আল্লাহর নামে ছাড়া হলে নখ ও দাঁত দ্বারা বন্য পশুর শরীরে যে ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং তা থেকে যে রক্ত প্রবাহিত হয়ে পড়ে তাতেই অনিবার্য যবেহর শর্ত পূর্ণ হয়ে যায়। এরূপ শিকারকৃত জন্তু যদি জীবিত পাওয়া না যায় এবং তা যদি নিয়মমাফিক যবেহ করার সুযোগও না থেকে তবু তা হালাল। 

২. হযরত আদী ইবনে হাতেম নবী করীম সাঃ নিকট আরয করলেনঃ আমরা কি মে’রাদ নিক্ষেপ করে শিকার করতে পারি? তিনি তাকে জবাব দেনঃ

তা যদি জন্তুর দেহ ছিদ্র করে দেয় তবে খাও। কিন্তু তা যদি চওড়া দিক দিয়ে লেগে জন্তু মারা যায়, তবে তা চোট লেগে মরা জন্তু। তা খেয়োনা।

মে’রাদ হচ্ছে এক প্রকার ভারী কাষ্ঠ বা লাঠি যার অগ্রভাগে হয়তো লোহার শলাকা লাগানো হয়েছে নয়তো ঐ কাঠকেই শুঁচালো করে নেওয়া হয়েছে। এটার আঘাত লেগে যদি জন্তুর শরীরে কোনো অংশ এতটা পরিমাণ কেটে যায় বা ছিদ্র হয়ে যায়, যার ফলে রক্ত প্রবাহিত হয় তবে যবেহর শর্ত পূর্ণ করার জন্য এটাই যথেষ্ট। 

৩. রাফে’ ইবনে খাদীজ বলেন, আমি আরয করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল! কাল শত্রুদের সাথে আমাদের মোকাবেলা হবে কিন্তু পশু যবেহ করার মত ছুরি আমাদের সংগে নেই। এমতাবস্থায় কি আমরা ফাটা বাঁশের চটি দিয়ে যবেহ করতে পারবো? জবাবে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
“আল্লাহর নাম নিয়ে যে জিনিস দিয়েই রক্ত প্রবাহিত করা হোকনা কেন তা খেয়ে নাও। অবশ্য দাঁত এবং নখ দিয়ে একাজ করবেনা”।
এ থেকে জানা গেলো যে, আসল জিনিস সেই অস্ত্র নয় যা দিয়ে যবেহর কাজ সম্পন্ন করা হয়। বরঞ্চ যবেহর শর্ত পূর্ণ করার জন্য রক্ত প্রবাহিত করাটাই মুখ্য কথা। নিম্নোক্ত হাদীসটি এ কথাই সমর্থন করেঃ

হযরত আদী ইবেন হাতেম জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ যদি কোনো শিকার পেয়ে যায় আর তার কাছে কোনো ছুরি না থাকে, তবে সে পাথরের ধার কিংবা চেরা কাঠ দ্বারা যবেহ করতে পারবে কি? তিনি বললেনঃ 
“ যে জিনিস দিয়ে ইচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করে দাও এবং আল্লাহর নাম নাও”।

৪. আবুল উশরা তার পিতা থেকে শুনে বর্ণনা করেন। তিনি রাসূল সাঃ এর নিকট আরয করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল সাঃ যবেহর স্থান শুধু হলক এবং শিরাসমূহের সমন্বয় স্থল নয় কি? তিনি বলেনঃ তুমি যদি তার উরুতেও ছিদ্র করে দাও, তাই যথেষ্ট ।

এতে প্রমাণ হলো, আমাদের আওতা বহির্ভূত যে কোন জন্তুর যবেহর স্থান তার দেহের প্রতিটি অংশ। এর দ্বারা এটাও প্রমাণ হলো যে, কোন অস্ত্র দিয়ে যবেহ করা হলো তা আসল বিবেচ্য বিষয় নয়। প্রকৃত বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, প্রাণীর দেহে এমন পরিমাণ ছিদ্র করে দেয়া যাতে রক্ত প্রবাহিত হয়।

৫. কাআব ইবনে মালিক বলেনঃ সিলা নামক স্থানে আমাদের বকরীগুলো চরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ আমাদের দাসী দেখতে পেলো একটা বকরীর মৃতপ্রায় অবস্থা। সংগে সংগে সে একটা পাথর ভেঙ্গে তা দ্বারা বকরীটা যবেহ করে দিলো। নবী করীম সাঃ সে বকরি খাবার অনুমতি দান করেন। (বুখারী)

আতা ইবনে ইয়াসার বলেনঃ বনি হারেসার জনৈক ব্যক্তি অহুদের নিকটবর্তী ঘাটিতে একটি উট চরাচ্ছিল। হঠাৎ সে দেখতে পেলো উটটি মরে যাচ্ছে। কিন্তু যবেহ করার মত কোনো অস্ত্র তার কাছে ছিল না। শেষ পর্যন্ত সে তাবু পোতার একটি খুটি নিয়ে উটের গলায় ছিদ্র করে দিলো এবং এতে রক্ত প্রবাহিত হয়ে গেলো। অতঃপর বিষয়টা নবী করীম সাঃকে জানানো হলে তিনি তা খাওয়ার অনুমতি দান করেন।

ভাংগা পাথেরর ধার তো মুটামুটি ধারের সংজ্ঞায় পড়ে কিন্তু কাঠের সূচালো খুঁটিকে ধারালো অস্ত্রের সংজ্ঞায় কতটা আনা যায় তাতো পরিষ্কার ।

উপরোক্ত অকাট্য দলীল সমূহ সম্মুখে রেখে বন্দুকের মাসআলাটি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন। বন্দুকের গুলিকে গুলতির ঠান্ডা গোল্লার মত মনে করা ঠিক নয় এবং এর ভিত্তিতে বন্দুক দ্বারা শিকারকৃত মৃত জন্তুকে পাথর বা কাষ্ঠ খন্ডের পার্শ্বদেশের আঘাতে মৃত জন্তুর মতো মনে করাও ঠিক হবে না। বন্দুক থেকে গুলি যে শক্তিতে বের হয় এবং যতটা তীব্র গতিতে লক্ষ্যস্থলের দিকে ধাবিত হয়, তাতে করে সেটা আর ঠান্ডা পাথুরে হয়ে থাকে না, বরঞ্চ অনেকটা নরম ও প্রায় শাণিত হয়ে দেহ ছিদ্র করে ভিতরে প্রবেশ করে আর এতে করে রক্ত প্রবাহিত হয়ে জন্তুর মৃত্যু ঘটে। এটা শিকারী জন্তুর নখ, দাঁত কিংবা মে’রাদ ও কাঠের খুঁঠি অগ্রভাগের ধার থেকে বেশী কিছু ভিন্নতর নয়। বরঞ্চ রক্ত প্রবাহিত করার ব্যাপারে সেগুলো থেকেও অধিকতর কার্যকর হওয়া মোটেই অস্বাভিক নয়। 

এসব কারনে আমার মতে, আল্লাহর নাম নিয়ে বন্দুক চালানোর পর তার গুলি বা ছররা দ্বারা কোনো প্রাণীর মৃত্যু ঘটলে তা হালাল না হওয়ার কোনো কারন নেই। কিন্তু এ মতের উপর যদি কেউ নিশ্চিন্ত হতে না পারেন এবং এরূপ জন্তুকে হারামই মনে করেন, তাতেও আমার কোনো আপত্তি নাই। এমনটি আমি কখনো বলবনা যে, অবশ্যি তাকে হালাল বলে স্বীকার করতে হবে এবং অবশ্যি খেতে হবে। আমার ইজতিহাদ অনুযায়ী আমি আমল করবো। অন্যদের ইজতিহাদ অনুযায়ী তা আমল করবেন, কিংবা যে কেউ যে কোন মুজতাহিদের অনুবর্তন করতে চাইলে তা করতে পারেন। এ ইজতিহাদী মত পার্থক্য দ্বারা যদিও আমার এবং তাদের মধ্যে হালাল হারামের পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু তা সত্বেও উভয় পক্ষই একই দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত। এতে কেউ পৃথক পৃথক দ্বীনের অনুসারী হয়ে যায় না।

(প্রথম প্রকাশঃ তরজমানুল কুরআনঃ রবীউল আউয়াল ১৩৬৫, ফেব্রুয়ারী ১৯৪৬। রাসায়েলও মাসায়েল প্রথম খন্ড-৭৯ ) 

মতভেদযুক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত কিভাবে নেবেন তা মাওলানা মওদুদী সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছে। ছোটখাটো মতভেদের মাধ্যমে কেউ দ্বীন হতে খারিজ হয়ে যায়না। মতভেদ সহই আমরা এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ইসলামী আন্দোলনের জন্য কাজ করতে পারি।

৩ ডিসেম্বর, ২০১৫

"রানী কাউয়া প্রসব করতেই আছে"


ছোটবেলার একটি গল্প নিয়ে বেশ হাসাহাসি করতাম। গল্পটি ছিল এরকম। একবার এক দেশে রাজপুত্র জন্মগ্রহন করলো। বিচলিত রাজা ঘরের বাইরে পায়চারি করছেন। এমন সময় দাইমা রাজপুত্রকে কোলে নিয়ে এসে রাজাকে সুসংবাদ দিলেন এবং বললেন “আলামপনা, আমাদের রাজপুত্র এসেছে, তবে সে আপনার মত ফর্সা না”। রাজা অত্যন্ত খুশি হয়ে রাজদরবারে এলেন এবং বললেন “আমার পুত্রসন্তান জন্মগ্রহন করেছে তবে সে একটু কালো”। 

এর কিছুক্ষন পর সভাসদরা বেরিয়ে পড়লেন এই সংবাদ প্রচারের জন্য। তারা বলতে লাগলেন আমাদের একটি কালো রাজপুত্র জন্মগ্রহন করেছে। আরো কয়েক কান পর সংবাদটি দাঁড়ালো রাজার একটি কুচকুচে কালো সন্তান হয়েছে। আরো কিছুসময় পর সংবাদ হলো রাজার একটি কাউয়ার মত কালো সন্তান হয়েছে। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর সংবাদ হলো “রানী একটা কাউয়া প্রসব করেছে”। কিছুসময় পর সংবাদটি হলো “রানী কাউয়া প্রসব করতেই আছে”। 

সারাদেশের জনগন ছুটে আসলো রাজাপ্রাসাদে। আসে আর ঘুরেফিরে কাউয়া গুনে। কেউ বলে পঞ্চাশটা কাউয়া, কেউ ষাট, সত্তর, কেউ একশও ছাড়িয়ে গেলো। 

আমাদের দেশেও এই আঁতেল সমাজের অভাব নেই। ইচ্ছেমত রঙ ছড়িয়ে দিতে কি যে সুখ! 

নিজামীর পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন পরিষ্কারভাবে মহামান্য আপিলেট ডিভিশনে উপস্থাপন করেছেন যে, নিজামী তার রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে ১৯৭১ সালে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে বক্তব্য রাখতে পারেন, তবে সরকার পক্ষ তার বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সমুহের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা প্রমানে সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হয়েছে।

খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘আমরা মনে করি, ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বদর বাহিনীতে তিনি (নিজামী) ছিলেন না। সাক্ষীরা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে বক্তব্য দিয়েছেন, আদালতে সাক্ষী দেওয়ার সময় বক্তব্যের সঙ্গে কোনো মিল নেই। প্রসিকিউশন সেফ হোমে দিনের পর দিন সাক্ষীদের মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তৈরি করেছেন। হত্যা, খুন, অপহরণের সঙ্গে নিজামী জড়িত ছিলেন না। প্রসিকিউশন অপরাধ প্রমাণ করতে পারেনি।’

‘শেষ সময়ে বলব আদালত যদি মনে করে উনি (নিজামী) দোষী, তাহলে তাঁর বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কথা বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করতে পারে।’ যোগ করেন খন্দকার মাহবুব।

ওই বক্তব্যের পর দুপুর পৌনে ১টার দিকে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত মামলার কার্যক্রম আজকের মতো শেষ করেন। আগামী ৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন আদালত। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনে নিজামীর করা আপিল আবেদনের ওপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী এস এম শাহজাহান। নিজামীকে নির্দোষ প্রমাণ করতে তিনি চারটি যুক্তি তুলে ধরেন।

প্রথম যুক্তি : যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে জেলা প্রশাসকরা একটি রাজাকারের তালিকা জমা দিয়েছিলেন। ওই তালিকায় মতিউর রহমান নিজামীর নাম ছিল না।

দ্বিতীয় যুক্তি : যুদ্ধের পর বুদ্ধিজীবী হত্যায় ৪২টি মামলা হয়েছিল। কিন্তু একটিতেও নিজামীর নাম ছিল না।

তৃতীয় যুক্তি : মতিউর রহমান নিজামী ইসলামী ছাত্র সংঘের নিখিল পাকিস্তানের দায়িত্বে ছিলেন ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অথচ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড হয় ডিসেম্বর মাসে। তাই ওই সময় তিনি কোনো দায়িত্বে ছিলেন না।

চতুর্থ যুক্তি : রাষ্ট্রপক্ষের মৌখিক অনেক সাক্ষ্যর মধ্যে অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে। আলবদর নেতা হিসেবে নিজামীর বিরুদ্ধে কোনো নথি রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি। 

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুব সবসময় উল্টো বুঝেন, আইনী ব্যখ্যা নিজের মত দিতে গিয়ে তার অর্ধেক বয়সী আইনজীবী শিশির মনিরের কাছে আগেও বারংবার ধরা খেয়েছেন। এরপরও তার সুমতি হয়নি। সে খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে মিডিয়ায় ঘোষনা করলো আসামী পক্ষের যুক্তি দেখে আমি যেটা বুঝেছি সেটা হলো নিজামীর আইনজীবী দোষ স্বীকার করে বয়স বিবেচনায় শাস্তি কমানোর আবেদন করেছেন। 

জান্ডিস আক্রান্ত মিডিয়া সমাজ খুশিতে অন্ধ হয়ে যায়, একে একে রিপোর্ট করতে থাকে। 

১- অপরাধ স্বীকার করে শুধু মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি চান নিজামী’
২- যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার নিজামীর। 
৩- 'যুদ্ধাপরাধের দায় স্বীকার করলেন নিজামী
৪- এবার নিজামীর জন্য অনুকম্পা ভিক্ষা 
৫- ৪৪ বছর পর এই প্রথমঃ দোষ স্বীকার নিজামীর
৬- শাস্তির ভয়ে আগেই দোষ স্বীকার নিজামীর 

বাহ! এই না হলে বঙ্গদেশের মিডিয়া ! 

এবার বিচারপতি এস কে সিনহার কথায় আসি। তিনি যুক্তি প্রমাণ নিয়ে কথা বলবেন। প্রতিটা অভিযোগ যখন সন্দেহাতীতভাবে খন্ডন করা হলো তখন তিনি বলে উঠলেন আপনারা মুজাহিদের রায় পড়েননি? ‘তাঁরা (নিজামীরা) যদি পাকিস্তানিদের সমর্থন না করত, তাহলে সিন্ধু, পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান থেকে এসে তারা এ দেশে নয় মাস থাকতে পারত না। তারা তিন মাস থাকত। 

তো এবার বলুক সিনহা সেনাবাহিনীর কোন কর্মকর্তা, সৈনিককে নিজামী আশ্রয় দিয়েছিলো? প্রমাণ করুক সে। তা সে করবে না, ঐ রুপকথার গল্প বলে যাবে। রুপকথা আর উপন্যাস হচ্ছে এদের কাছে শক্তিশালী প্রমাণ।

আরো পড়ুন
মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পর্যালোচনা
বাংলাদেশঃ যেখানে অবিচার হয় বিচারালয় থেকেই 

২৬ নভেম্বর, ২০১৫

অসহিষ্ণু বাংলাদেশঃ সুন্দরের মাঝে অসুন্দরের চর্চা


ভার্সিটিতে থাকাকালে আমরা একসাথেই খাবার খেতাম। ছাত্রপ্রতিনিধি থাকার কারণে ১টা থেকে ২টা ব্রেকের সময়টা অনেকটা দৌড়ের উপরে থাকতে হতো, অমুকের এটা তমুকের সেটা ইত্যাদি দেখতে গিয়ে লাঞ্চের সময় একেবারেই পেতামনা। দু’টো বাজার দশমিনিট আগে হুড়মুড় করে সহপাঠী বন্ধুদের আড্ডায় গিয়ে দেখতে পেতাম তারা আমার জন্য কিছু খাবার রেখে দিয়েছে। এক পাতেই খাবার খেতাম হিন্দু-মুসলিম সব। কেউ কাউকে আলাদা চোখে দেখার সময়ই পেতামনা। অথচ একেকজন একেক ধর্মের একেক রাজনৈতিক মতাদর্শের। নিজেদের মধ্যে যে এসব নিয়ে মাঝে মধ্যে ঝগড়া হতো না তা নয়। মাঝে মধ্যে খুব তর্ক হত। কিন্তু কিছু সময় পর আবার সবাই একসাথে আড্ডা দিয়েছি। 

আরো ছোটবেলায় তপনদের সাথে ফুটবল খেলতাম, জগদীশের সাথে মার্বেল খেলতাম, অর্পনাদির বাগান ছিল, আমারও বাগান ছিল। কোন সমস্যায় পড়লে, গাছে কোন পোকা দেখা গেলে অথবা কোন কোন পরামর্শের জন্য অর্পনাদির কাছে ছুটে যেতাম। তিনিও আমাকে বহুদিন বলে যেতেন, ওরে আমার বাগানে আজ একটু পানি দিস আমার ফিরতে দেরী হবে। অপুদার ছিল কবুতর। আমারও অল্পস্বল্প ছিল। অপুদা ছিলেন আমার গুরু। এমন না যে আমাদের পরিবার ধর্ম-কর্ম করতোনা। বরং একটু বেশীই করতো। অথচ আমাদের পরিবারের কাউকে দেখিনি হিন্দু বলে কাউকে হিংসা করতে এবং আমার গুরুজনরা কখনোই অন্য ধর্মের মানুষদের সাথে মিশতে মানা করেন নি। শুধু তাই নয় বাবার বন্ধু আমার শিক্ষক শেখর স্যার কোনদিন নামাজ পড়তে না দেখলে কান ধরে মসজিদে পাঠাতেন।

এই গল্পগুলো শুধু আমার না, বাংলায় আবহমান কাল ধরেই তা চলে আসছে। এদেশ সম্প্রীতির, সৌহার্দের। এখানে সবাই মিলেমিশে থাকা অসাধারণ একটা ব্যাপার। ভারত মহাদেশে বার বার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হলেও আমাদের অংশে ছোঁয়া ব্যাপকভাবে কখনোই ঘটেনি। শুধু ধর্মীয় সম্প্রীতি নয় রাজনৈতিক সম্প্রীতিও ছিল সুন্দর। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকেরা নিজেদের মধ্যে আড্ডা দেয়া, ব্যবসা করা, আত্মীয়তা খুব সাধারণ ব্যাপার ছিল। 

কিন্তু আজকে? আজকে বিষয়টা এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে আওয়ামীলীগের একজন বিএনপির একজনের সাথে আত্মীয়তা বা ব্যবসা করা দূরে থাক একসাথে বসে এক কাপ চা খেলে তা নিউজ হয়ে যায়। আরে, এটাও কি সম্ভব! একাসাথে বসে চা! মনে হয় যেন বিরাট অপরাধ করে ফেলেছেন তারা। নিজ নিজ দলের লোকেরা তাদের সন্দেহ করে। দালাল, গুপ্তচর ইত্যাদি উপাধি পায়। এখন কেউ কাউকে সহ্য করতে চায় না। পারে না। 

এর কারণ হিসেবে আমি প্রথমে বলবো অনলাইন জগত। অনলাইনে আমি প্রথম দেখেছি এক ধর্মের লোকজন অন্য ধর্মের সম্মানের বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্রী ও অশ্লীল কথা বলতে, এক রাজনৈতিক দলের লোক অন্য দলগুলোর সম্মানিত মানুষদের নিয়ে ব্যাঙ্গ করতে। প্রথমে শুধুমাত্র ব্লগগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তিতে ফেসবুক ও ইউটিউবের প্রসারের সাথে সাথে তা ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র মানুষের মধ্যে।

দ্বিতীয় বিষয় শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে একটি ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের উত্থান হয় এই দেশে, যার নাম গণজাগরণ মঞ্চ। “বিচার চাই না, ফাঁসী চাই” দাবীতে ঘৃণা আর হিংসার মাত্রা ছড়িয়েছে নতুন করে। এদের বিরুদ্ধেও গঠিত হয় হিফাযত। ঘৃণা তার সকল মাত্রা ছড়িয়ে যায়। কিছুদিন আগের কথা। এক সিনিয়র ভাইয়ের বিয়ে, সব ঠিকঠাক ছিল। এর মধ্যে আবিষ্কৃত হয় তিনি একদা শাহবাগে গিয়েছেন আর সেলফি তুলে তা ফেসবুকে আপলোড করেছেন। ব্যাস নাস্তিক উপাধি পেয়ে বিয়েটা ভেঙে গেলো। মেয়ের আত্মীয়-স্বজনকে যতই বুঝানো হলো, না, সে নাস্তিক না, নিয়মিত নামাজ পড়ে। কিন্তু কিছুই ধোপে টিকেনি। শাহবাগ মানেই নাস্তিক! অপরদিকে তারাও ছড়িয়েছে দাঁড়ি, টুপি, ইসলাম মানেই জঙ্গী, সন্ত্রাসী, বোমাবাজ।

আওয়ামীলীগ এই ঘৃণা ছড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছে। অথচ তা করতে গিয়ে পুরো দেশে অসহিষ্ণুতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল দেখা যাচ্ছে এখন পুরো সমাজে। আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলো হত্যা-সন্ত্রাসকে এতটাই সহজ ও স্বাভাবিক করে দিয়েছে এখন তাদের কোন সংঘর্ষে কেউ না মরলে তা নিউজ হয়না। গর্ভের বাচ্চা গুলিবিদ্ধ হওয়ার মত ঘটনাও বাংলাদেশে ঘটে। কোন ছাড়াই বাচ্চা শিশুকে গুলি করে আইন প্রণেতা। এই আইন প্রণেতাদের কাছ থেকে আসলে কেমন আইন বের হবে তা সহজেই অনুমেয়। 

আইন-শৃংখলা বাহিনীকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে সরকার এখন পুলিশ র‍্যাব মানুষকে গ্রেফতার করে বিএনপি করার অপরাধে বা জামায়াত শিবির করার অপরাধে। কিছুদিন আগে DMP এর ফেসবুক পেইজে দেখলাম জামায়াতের পাঁচজনকে তারা আটক করেছে। জব্দ করেছে জামায়াতের লিফলেট, বই, চাঁদা আদায়ের রশিদ। অবস্থা বুঝেন! আগে এদের এরেস্ট করার জন্য বোমা ককটেল নাটক করলেও এখন আর তার প্রয়োজন হয়না। একটা লোক বিরোধী দল করাই অপরাধ। 

আর পক্ষান্তরে আওয়ামীলীগের লোক কোন অপরাধ করলেও শুধু আওয়ামীলীগ করার জন্য তার অপরাধ মাফ। যদি একটা ঘটনা মারাত্মক মিডিয়া কাভারেজ পায় তখন কিছু লোক গ্রেফতার হয়। অসহিষ্ণুতা যে কত ভালোভাবে ছড়িয়েছে তা বুঝার জন্য খুব একটা কষ্ট করতে হবেনা। সারাদিনের খবরগুলোর উপরগুলোর উপর চোখ বুলালেই হবে। সরকার একটা জেনারেশন তৈরী করছে যারা অপেক্ষা করছে কোনভাবে সরকারের পতনের। এই কথাটা অবশ্য আওয়ামীলীগও জানে। এই পরিমান অপরাধ তারা করেছে ক্ষমতায় না থাকলে কারো পিঠের চামড়া থাকবে না। 

আমি বলছিনা এই ধরণের ঘটনা আগে কখনোই ঘটেনি। আগেও ঘটেছে তবে এত ব্যপকতা কখনোই পায়নি। আর এর সুযোগ নিচ্ছে বিদেশী গোয়েন্দারা। বিশেষ করে “র”। একের পর এক জঙ্গীগোষ্ঠী তৈরী করছে। এটাও নতুন নয়। আগেও তারা এই দেশে জেএমবি তৈরী করেছে। কিন্তু তৎকালীন মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ও সরকারের আন্তরিকতায় ভেস্তে যায় ঐ সময়ের পরিকল্পনা। বাংলাদেশ হয় একমাত্র রাষ্ট্র যারা তাদের জঙ্গীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলো। কিন্তু এই বিষয়টার কাউন্টার এট্যাক করতেও দেরী হয়নি। ৫৭ জন আর্মি অফিসারকে প্রাণ দিতে হয়েছে। এটা আপনারা সবাই জানেন। 

এখন ভারতের “র” পাশাপাশি নতুন করে যোগ দিয়েছে সিআইএ। তারাও চায় বাংলাদেশকে জঙ্গী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে। আইএস নিয়ে আসার সব পরিকল্পনাই করছে সিআইএ। নতুন নতুন সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ছড়াচ্ছে সবাই। বাংলাদেশ হয়তো বরণ করতে যাচ্ছে আফগানিস্তান, ইরাক বা সিরয়ার মত ভাগ্য। 

আসুন আমরা একটু সহিষ্ণু হই। দেশকে গড়ি। বিদেশীদের ব্যাপারে সাবধান হই। অবশ্য এই ব্যাপারে যাদের সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রাখার কথা সে সরকারই অসহিষ্ণুতা কে উস্কে দিচ্ছে। আমাদের এই সুন্দর দেশে অসুন্দরের চর্চা আমরা বন্ধ করবো। আল্লাহ আমাদের দেশকে রক্ষা করুন। 

২০ নভেম্বর, ২০১৫

বাংলাদেশঃ যেখানে অবিচার হয় বিচারালয় থেকেই


এতদিন শুনেছি আইন সবার জন্য সমান, আইন অন্ধ এখন দেখি বিচারকেরাই অন্ধ। কারণ এখানে যুক্তি খাটেনা, তথ্য প্রমাণের কোন বালাই নাই, প্রসিকিউটররা নানান গল্পকারের গল্প উপন্যাস নিয়ে বিচারালয়ে হাজির করেন। আর বিচারক মহোদয় সবকিছু গম্ভীরভাবে শুনে বলেন, ওকে ডিসমিসড, ডিসমিসড। তোমাদের রিভিউ খারিজ। তোমাদের ঝুলিয়ে দেয়া হবে। 

এক নজরে কাদের মোল্লার গ্রেফতার থেকে ফাঁসি 

গ্রেফতার : ১৩ জুলাই ২০১০ সুপ্রিম কোর্ট এলাকা থেকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার।
তদন্ত শুরু : ২১ জুলাই ২০১০
তদন্ত শেষ : ৩১ অক্টোবর ২০১১
আদালতে অভিযোগ উত্থাপন : ১৮ ডিসেম্বর ২০১১
শ্যোন অ্যারেস্ট : ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জ থানায় মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম মোস্তফা নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগে কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়। ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করা হয়। দুই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
অভিযোগের সংখ্যা : ৬টি

৬ নং অভিযোগ : মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা। আর এই চার্জেই ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয় আব্দুল কাদের মোল্লাহকে
অভিযোগ আমলে নেয় : ২৮ ডিসেম্বর ২০১১
চার্জ গঠন করে : ২৮ মে ২০১২
অভিযোগের ওপর সূচনা বক্তব্য শুরু হয় : ১৬ জুন ২০১২
রাষ্ট্রপক্ষের প্রথম সাক্ষ্য : ৩ জুলাই ২০১২
রাষ্ট্রপক্ষের মোট সাক্ষী : ১২ জন
সাক্ষ্য শেষ হয় : ৪ নভেম্বর ২০১২
কাদের মোল্লার পক্ষের সাক্ষীর আবেদন : ৫ নভেম্বর ২০১২
কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষী : ৬ জন
কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য শুরু : ১৫ নভেম্বর ২০১২
কাদের মোল্লার পক্ষে সাক্ষ্য শেষ হয় : ৬ ডিসেম্বর ২০১২
রাষ্ট্রপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক : ১৭ ডিসেম্বর
মামলা পুনর্বিচারের জন্য আবেদন : ৩ জানুয়ারি ২০১৩
পুনর্বিচারের আবেদন খারিজ : ৭ জানুয়ারি ২০১৩
আসামিপক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক : ৭ জানুয়ারি ২০১৩
রায় দেয়ার ঘোষণা : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩
ট্রাইব্যুনালের যাবজ্জীবন কারাদ-ের রায় : ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
শাহবাগেিদর দাবি অনুযায়ী সরকারকে আপিলের সুযোগ দিতে আইন সংশোধন : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
সরকারে আপিল : ৩ মার্চ ২০১৩
কাদের মোল্লার আপিল : ৪ মার্চ ২০১৩
আপিলের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩
আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ : ৯ ডিসেম্বর ২০১৩
ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যু পরোয়ানা জারি : ১০ ডিসেম্বর ২০১৩
মৃত্যুদন্ড কার্যকর স্থগিত : ১০ ডিসেম্বর রাত ১০টা।
রিভিউ আবেদনের শুনানি খারিজ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৩
মৃত্যুদন্ড কার্যকর : ১২ ডিসেম্বর ২০১৩ রাত ১০টা ১ মিনিট।

৬ নং চার্জের পোস্টমর্টেমঃ 
এই চার্জটি প্রমাণ করা হয় একজন মাত্র সাক্ষী দিয়ে। তিনি হলেন ঘটনায় বেঁচে যাওয়া হযরত আলি লস্করের বড় মেয়ে মোমেনা বেগম। কথা ছিল মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন ক্যামেরা ট্রায়ালে। 

তিনি তিন জায়গায় তিন রকম সাক্ষ্য দিয়েছেন হজরত আলী লস্করের মেয়ে মোমেনা বেগম, ২৬শে মার্চ সন্ধ্যা ছয়টায় তার বাবা-মাসহ পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করা হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের প্রতিনিধি, ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নিযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তা মোহনা বেগম এবং ট্রাইব্যুনালে ক্যামেরা ট্রায়ালে সেই ঘটনার বর্ননা দেন।তার সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে আপিল বিভাগে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতামতের ভিত্তিতে কাদের মোল্লার দন্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

সবাই ভালো করে নিচের দলিলটি দেখুন দেখুন, এটি মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য । যেটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত প্রতিবেদনে দেখা যায় মোমেনা বেগম ঘটনার দুই দিন আগে তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যান। ফলে তিনি প্রানে বেঁচে যান এ ঘটনা থেকে। মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মোমেনা বেগম তাদের পরিবারের হত্যার জন্য বিহারীদের দায়ী করেছেন।সেখানে কাদের মোল্লার কোন নাম গন্ধই নেই। 




















যে মোমেনা বেগম এতদিন কাদের মোল্লাকে চিনতেন না তিনি এখন কোর্টে এসে সাক্ষ্য দিলেন তিনি নাকি দেখেছেন কাদের মোল্লার নেতৃত্বে তার বাবাকে ও পরিবারের সদস্যদের হত্যা করতে। পর্যবেক্ষনে বুঝা যায় যিনি ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষী তিনি আসল মোমেনাই না। তিনি নকল তাই ধরা পড়ার ভয়ে চেহারাসহ পুরো শরীর কালো কাপড়ে ঢেকে এসেছেন। এবার বিচারকরা এসব কাহিনী শুনে ও দেখে আচরণ করেছেন অন্ধ ও বধিরের মত। এই ধরণের ঠুনকো ও মিথ্যা সাক্ষী দিয়েই খুন করা হলো আব্দুল কাদের মোল্লাহকে। 


মুহাম্মদ কামারুজ্জামান প্রসঙ্গঃ 
সাত অভিযোগের ভিত্তিতে কামরুজ্জামানের বিচার হয়। তার মধ্যে চুড়ান্তভাবে রায়: 
১ নং অভিযোগ - খালাস 
২ নং অভিযোগ - ১০ বছরের কারাদন্ড 
৩ নং অভিযোগ - সংখ্যাগরিষ্টের মতামতের ভিত্তিতে মৃত্যুদন্ড। 
৪ নং অভিযোগ - যাবজ্জীবন 
৫ নং অভিযোগ - খালাস 
৬ নং অভিযোগ - খালাস 
৭ নং অভিযোগ - যাবজ্জীবন
অর্থাৎ ৩ নং অভিযোগের রায়ই আজ কার্যকর করা হল যাতে মাননীয় বিচারকেরা একমত হতে পারেননি। এবার আসুন দেখে নিই অভিযোগটি কি ছিল। অভিযোগটি হচ্ছে, কামরুজ্জামানের পরিকল্পনায় এবং নেতৃত্বে সোহাগপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১২০ জনকে খুন করে এবং অনেক মহিলাকে ধর্ষন করে। 

১- কামারুজ্জামানের জন্ম ১৯৫২ সালে, ১৯৭১ সালে তার বয়স ১৯ বছর। ১৯ বছরের একজন কিশোর কিভাবে এতবড় অভিযানের পরিকল্পনা করেন? কিভাবে সেনাবাহিনীর জাঁদরেল অফিসারদের সামনে নেতৃত্ব দেন? আর এমনটাও নয় যে ঐ এলাকার মানুষ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছিলো। হঠাত করে ৪০ বছর পর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে এই ধরণের সাজানো অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়া হত্যাকান্ডেরই নামান্তর। 
২- এই চার্জে তিনজন মহিলা ক্যামেরা ট্রায়ালে সাক্ষ্য প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালে তারা বলেন তাদেরকে ধর্ষন করা হয় এবং সেখানে কামারুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। অথচ তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দিতে তারা কামারুজ্জামানের উপস্থিতির ব্যাপারে কিছুই বলেন নি। কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সময়ও বলা হয়নি তিনি ঘটনার সময় ঐ গ্রামে উপস্থিত ছিলেন। 

এই মামলায় দশজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেয়ার পর নতুন করে তাদের দিয়ে সাক্ষ্য দেয়ানো হয়। অথচ মূল সাক্ষী তালিকার ৪৬ জনের মধ্যে তাদের নাম ছিলনা।

এর মধ্যে ১১ নং সাক্ষী হাসেন বানু বলেন, দেশ স্বাধীন হলে আমরা মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি এই আসামী বড় নেতা ছিলেন এবং স্বাধীনতার পর তিনি শেরপুরে ধরা পড়েছিলেন। তিনি আদৌ কামারুজ্জামানকে চিনেন না। 

১২ নং সাক্ষী হাফিজা বেওয়া বলেছেন দেশ স্বাধীন হলে তিনি টিভিতে প্রথম কামারুজ্জামানকে দেখেছেন। হাফিজা বেওয়াও বলেছেন কামারুজ্জামানের নাম মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনেছেন। কোন মুরুব্বি ? এই জিজ্ঞাসায় তিনি কোন মুরুব্বির নাম বলতে পারেননি। এই মুরুব্বী কি সরকারের কর্তাব্যাক্তিরা? 

করফুলি বেওয়া আমি যুদ্ধের আগে থেকে কামারুজ্জামানকে চিনিনা। দেশ স্বাধীনের ৩-৪ মাস পরে কামারুজ্জামান সাহেবকে চিনেছি। কিভাবে চিনেছেন এই প্রশ্নের উত্তরও বেশ মজার, তিনি বলেন, আমার বাড়ির আশে পাশে দিয়ে অনেক মানুষ নিয়ে কামারুজ্জামান হেঁটে যায়, তখন চিনেছি। অথচ স্বাধীনতার পর সোহাগপুরে গিয়ে হাঁটাহাঁটির কোন কারনই নেই। কামারুজ্জামানের বাড়ি ভিন্ন থানায়। সোহাগপুর থেকে প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার দূরে। 

জেরায় তারা কেউই কামারুজ্জামানকে চিনেন না। সবাই মুরুব্বিদের থেকে শুনেছিলেন। তাহলে তাদের ধর্ষন ও স্বামী হত্যার দায় কামারুজ্জামানের উপর পড়বে কেন?

তারা তিনজন যে কত মিথ্যা কথা বলেছে তা তাদের তিনজনের জেরার বর্ণনা পড়লে তা বুঝতে পারবেন। একজন বলেছে আরেকজনের সাথে এসেছে। অন্যজন বলেছে তিনি একাই এসেছেন। আবার তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো কত টাকা দিয়ে এসেছেন? তিনি আর তা বলতে পারেননি। সমানে মিথ্যা কথা বলা সাক্ষীদের সাক্ষ্য আদালতে কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ধরা দিয়েছে। 

৩- সাক্ষীদের কেউই বলতে পারেননি কামারুজ্জামান কখন কোথায় কাকে এই গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন 

৪- সাংবাদিক মামুনুর রশীদ “সোহাগপুরের বিধবা কন্যারা” নামে একটি গবেষনামূলক লিখেন। তিনি সেই সময়ের গণহত্যা নিয়ে ১৫ জন মহিলার সাক্ষাৎকার নিয়ে বইটি লিখেন। বইটি প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। সেখানে হাসেন বানু, করফুলি বেওয়া তাদের বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তারা কেউই কামারুজ্জামানের নাম উচ্চারণ করেননি। সেই বইতে ভিকটিমদের সাক্ষাৎকার অনুসারে ১৪৮ জন রাজাকারের নাম প্রস্তুত করা হয়। সেখানেও নাম নেই কামারুজ্জামানের। কি আজিব বিষয়! যে মহিলারা ২০১০ সালে কামারুজ্জামানকে চিনতোনা তার বিরুদ্ধে তাদের কোন অভিযোগ ছিলনা অথচ এখন কামারুজ্জামান ছাড়া আর কারো বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ নেই।

৫- কামারুজ্জামানের পক্ষে সাফাই সাক্ষী দেয়ার জন্য ৬০০ জন সাক্ষী থাকলেও আদালত অনুমতি দেয় মাত্র পাঁচজনকে। 

আদালত এগুলো কিছুই বুঝার চেষ্টা করেন নি কারণ তাদের তো রায় দিতে হবে। বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের সুত্র ধরে যদি বলতে হয় তাহলে বলতে “সরকার গেছে পাগল হইয়া তারা একটা রায় চায়”। বিচারপতিগণ অতি নিষ্ঠার সাথে সরকারের চাওয়া সেই রায়েরই বাস্তবায়ন করেছেন। যেখানে বিচার পদদলিত হয়েছে অবিচারের কাছে। 


এবার আসা যাক আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ সাহেবের প্রসঙ্গেঃ

বাংলাদেশের সাবেক মন্ত্রী, যিনি অত্যন্ত সততার সাথে তাঁর মন্ত্রীত্ব পরিচালনা করেছেন। জনাব মুজাহিদকে আলবদরের কমান্ডার হিসাবে সাজা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত প্রশ্নমালার কোন সদুত্তর রাষ্ট্রপক্ষ দিতে পারেননি-

ক. কে কখন কোথায় কিভাবে জনাব মুজাহিদকে আলবদরের কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ প্রদান করেন?
খ. তিনিই কি আলবদরের প্রথম এবং শেষ কমান্ডার? তার আগে এবং পরে কে বা কারা এই দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন?
গ. রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্যমতে ১৯৭১ সালের মে মাসে জামালপুরে মেজর রিয়াজের প্রচেষ্টায় আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। ঐ সময় জনাব মুজাহিদ ঢাকা জেলার ছাত্র সংঘের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তাহলে ঢাকায় বসে কিভাবে তিনি জামালপুরে গঠিত আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হলেন?
ঘ. জনাব মুনতাসির মামুন সম্পাদিত “দি ভ্যাঙ্কুইশড জেনারেলস” বইয়ে রাও ফরমান আলী এবং জেনারেল এ, এ, কে, নিয়াজি স্বীকার করেছেন যে, আলবদর বাহিনী সরাসরি আর্মির কমান্ডে এবং কন্ট্রোলে পরিচালিত হতো। প্রশ্ন হলো জনাব মুজাহিদ একজন ছাত্রনেতা হয়ে কিভাবে এই বাহিনীর কমান্ডার হলেন? 
ঙ. জেরায় তদন্তকারী কর্মকর্তা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে, তার তদন্তকালে রাজাকার, আলবদর, আল-শামস বা শান্তি কমিটির সংশ্লিষ্ট কোন তালিকায় আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের নাম ছিল মর্মে তিনি কোন প্রমান পাননি। তিনি আরও স্বীকার করেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত জনাব আলী আহসান মো: মুজাহিদের বিরুদ্ধে ফরিদপুর জেলাধীন কোন থানায় বা বাংলাদেশের অন্য কোন থানায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের সংঘঠিত কোন অপরাধের জন্য কোন মামলা হয়েছে কিনা তা আমি আমার তদন্তে পাইনি। তাহলে আদালত কিসের ভিত্তিতে তাকে আলবদরের কমান্ডার সাব্যস্ত করলেন?

চ. স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তীকালে (১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত) তদানিন্তন জাতীয় গণমাধ্যমে আলবদরের কর্মকান্ড নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ ছাপা হয়েছে এমনকি ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদেরকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছে। অথচ ঐসব সংবাদ ও বিজ্ঞপ্তিতে জনাব মুজাহিদের নাম কেউ উল্লেখ করেনি। সত্যিই যদি তিনি আলবদরের সারা দেশের কমান্ডার হতেন তাহলে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে তার নাম কেউ উল্লেখ করেনি কেন?

ছ. বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড নিয়ে ১৯৭২ সালে দালাল আইনে ৪২ টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর একটিতেও জনাব মুজাহিদকে আসামী করা হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ এই মামলাগুলোর নথি আদালতে উপস্থাপন করেনি। অথচ ৪২ বছর পর কিভাবে এই হত্যাকান্ডের সকল দায়-দায়িত্ব তার উপর চাপানো হয়েছে?

জ. ২৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের তদন্তের জন্য জনাব জহির রায়হানকে আহবায়ক করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল। প্রথিতযশা সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আমির-উল-ইসলাম এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এই কমিটির সদস্য ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই কমিটি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত তদন্ত রিপোর্ট ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়নি এবং তদন্তকালে তাঁদের কারো সাথে আলোচনাও করেনি। কেন রাষ্ট্রপক্ষ এই তদন্ত রিপোর্ট জাতির সামনে প্রকাশ করেনি?

এইসব প্রশ্নের উত্তর কেউ দিবেনা। কারন এদেশে এখন সবচেয়ে বেশী অবিচার হয় বিচারালয় হতেই। এখানে সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী বিচারপতি নাসিমকে রায় দেয়ার জন্য বলে। সেখানে বিচার আশা করা পাপ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যশনালের ভাষায় “বিচারের গর্ভপাত হচ্ছে”। যে দেশে পাপীরা বিচারকের আসনে বসে আছে সে দেশে সৎ মানুষেরা শাস্তি পাবে এটাই স্বাভাবিক। একটি সুন্দর বাংলাদেশের আশা করছি মহান রাব্বুল আলামীন হয়তো সেই ব্যবস্থা করে দিবেন যেখানে বর্তমান বিচারালয় হতে অসৎ মানুষদের সরিয়ে ও শাস্তি দিয়ে বিচারালয় কলঙ্কমুক্ত হবে।