রব্বানা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রব্বানা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৩ জুন, ২০২৪

সফলতার জন্য যে দোয়া আপনাকে পড়তেই হবে!


বদর যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় ছিল আকস্মিক ঘটনা। এই ঘটনার পর মক্কার কাফির, মদিনার ইহুদি ও মুনাফিক এবং মরুভূমির বেদুইনরা উদীয়মান শক্তি মুসলিমদের উড়িয়ে দেওয়ার উঠে পড়ে লেগেছে। মুসলিমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল। কারণ পরাজিতের ছোবল মারাত্মক হয়।

মাওলানা মওদূদী রহ. সেই পরিস্থিতিকে এভাবে চিত্রিত করেন, বদর যুদ্ধে ঈমানদারগণ বিজয় লাভ করলেও এ যুদ্ধটি যেন ছিল ভীমরুলের চাকে ঢিল মারার মতো ব্যাপার। এ প্রথম সশস্ত্র সংঘর্ষটি আরবের এমন সব শক্তিগুলোকে অকস্মাত নাড়া দিয়েছিল যারা এ নতুন আন্দোলনের সাথে শত্রুতা পোষণ করতো। সবদিকে ফুটে উঠছিল ঝড়ের আলামত। মুসলমানদের ওপর একটি নিরন্তর ভীতি ও অস্থিরতার অবস্থা বিরাজ করছিল। মনে হচ্ছিল, চারপাশের সারা দুনিয়ার আক্রমণের শিকার মদীনার এ ক্ষুদ্র জনবসতিটিকে দুনিয়ার বুক থেকে মুছে ফেলে দেয়া হবে। মদীনার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর এ পরিস্থিতির অত্যন্ত বিরূপ প্রভাব পড়েছিল। মদিনা ছিল তো একটি ছোট্ট মফস্বল শহর। জনবসতি কয়েক হাজার ঘরের বেশী ছিল না। সেখানে হঠাৎ বিপুল সংখ্যক মুহাজিরের আগমন। ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য তো এমনিতেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর আবার এই যুদ্ধাবস্থার কারণে বাড়তি বিপদ দেখা দিল।

মুসলিমরা ভাবতে থাকলো, মক্কার কুরাইশ, মদিনার ইহুদি ও মরুভূমির বেদুইনদের যেমন লোকবল তেমনি ছিল ধন-সম্পদ। এর মোকাবেলায় মুসলিমরা ছিল দুর্বল। জনবল ও সম্পদ উভয় দিকেই দুর্বল ছিল। এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখে আল্লাহ তায়ালা সূরা ইমরানের ১০-১৪ নং আয়াতে বলেন,

(১০) যারা কুফরী নীতি অবলম্বন করেছে, তাদের না ধন–সম্পদ, না সন্তান–সন্ততি আল্লাহ‌র মোকাবিলায় কোন কাজে লাগবে। তারা দোজখের ইন্ধনে পরিণত হবেই।
(১১) তাদের পরিণাম ঠিক তেমনি হবে যেমন ফেরাউনের সাথী ও তার আগের নাফরমানদের হয়ে গেছে। তারা আল্লাহ‌র আয়াতের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে, ফলে আল্লাহ‌ তাদের গোনাহের জন্য তাদেরকে পাকড়াও করেছেন। আর যথার্থই আল্লাহ‌ কঠোর শাস্তিদানকারী।
(১২) কাজেই হে মুহাম্মাদ! যারা তোমরা দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো, তাদের বলে দাও, সেই সময় নিকটবর্তী যখন তোমরা পরাজিত হবে এবং তোমাদের জাহান্নামের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, আর জাহান্নাম বড়ই খারাপ আবাস।
(১৩) তোমাদের জন্য সেই দু'টি দলের মধ্যে একটি শিক্ষার নিদর্শন ছিল যারা (বদরে) পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। একটি দল আল্লাহ‌র পথে যুদ্ধ করছিল এবং অন্য দলটি ছিল কাফের। চোখের দেখায় লোকেরা দেখছিল, কাফেররা মু'মিনদের দ্বিগুণ। কিন্তু ফলাফল (প্রমাণ করলো যে) আল্লাহ‌ তাঁর বিজয় ও সাহায্য দিয়ে যাকে ইচ্ছা সহায়তা দান করেছেন। অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লোকদের জন্য এর মধ্যে বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।
(১৪) মানুষের জন্য নারী, সন্তান, সোনা-রূপার স্তূপ, সেরা ঘোড়া, গবাদী পশু ও কৃষি ক্ষেতের প্রতি আসক্তিকে বড়ই সুসজ্জিত ও সুশোভিত করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামগ্রী মাত্র। প্রকৃতপক্ষে উত্তম আবাস তো রয়েছে আল্লাহ‌র কাছে।

এখানে আল্লাহ তায়ালা আমাদের স্পষ্ট করেছেন কাফেরদের অনেক সম্পত্তি ও জাঁকজমক দেখে আমরা যেন বিভ্রান্ত না হই, বরং আমরা যেন আল্লাহর ওপর আস্থা রাখি। আল্লাহ তায়ালা বদর যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেছেন, বিজয় একমাত্র আল্লাহর সাহায্যেই আসে। আর আমরা যেগুলোকে সফলতা মনে করি এগুলো দুনিয়ার সুশোভিত বস্তু। এগুলো অর্জন করা যেতে পারে কিন্তু এগুলো যেন মূল লক্ষ্য না হয়ে যায়। মূল লক্ষ্য হবে আখিরাতের সাফল্য। দুনিয়া তো মুসাফিরের মতো অবস্থান করার জায়গা।

আমরা এমন এক সময়ে জন্ম নিয়েছি পৃথিবীতে যখন মুসলিমরা সারাবিশ্ব জুড়ে মার খেয়ে যাচ্ছে। আমাদের হতাশ হওয়ার অনেক উপাদান আছে। কিন্তু আমাদের হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে। আল্লাহর দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

দুনিয়ার এই জাঁকজমকের বিপরীতে আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য যা উত্তম সে সম্পর্কে বলেছেন, পরবর্তী তিন আয়াতে। আল্লাহ তায়ালা সূরা ইমরানের ১৫-১৭ আয়াতে বলেন,

(১৫) বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো, ওগুলোর চাইতে ভালো জিনিস কি? যারা তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে বাগান, তার নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহিত হয়। সেখানে তারা চিরন্তন জীবন লাভ করবে। পবিত্র স্ত্রীরা হবে তাদের সঙ্গিনী এবং তারা লাভ করবে আল্লাহ‌র সন্তুষ্টি। আল্লাহ‌ তার বান্দাদের কর্মনীতির ওপর গভীর ও প্রখর দৃষ্টি রাখেন।
(১৬) এ লোকেরাই বলেঃ 'হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, আমাদের গোনাহখাতা মাফ করে দাও এবং জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদের বাঁচাও।
(১৭) তারা ধৈর্যশীল, সত্যনিষ্ঠ, অনুগত, দানশীল এবং রাতের শেষভাগে আল্লাহ‌র কাছে গোনাহ মাফের জন্য দোয়া করে থাকে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আসল সফলতা সম্পর্কে জ্ঞান দান করেছেন এবং এর জন্য করণীয় উল্লেখ করে দিয়েছেন। আমাদের ধৈর্য ধরে ইসলামী আন্দোলনে যুক্ত থাকতে হবে, হক কথা বলতে হবে। পরিস্থিতির চাপে পড়ে মুশরিকদের শেখানো কথা বলা যাবে না। আমাদের উলিল আমরের প্রতি (ইসলামী আন্দোলনের নেতা) অনুগত হতে হবে, দ্বীন কায়েমের পথে টাকা খরচ করতে হবে। যখনই আন্দোলনের জন্য সম্পদ চাওয়া হবে বিনা দ্বিধায় দান করতে হবে। এই দানকে আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে কর্জে হাসানা বলেছেন। এই ঋণ আল্লাহকে দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহ এই দানকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে ফেরত দিবেন। সর্বশেষ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন রাতের শেষভাগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সাহায্য চাইতে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের দোয়াও শিখিয়ে দিয়েছেন। সূরা ইমরানের ১৬ নং আয়াতে আল্লাহ দোয়াটি উল্লেখ করেন।

رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা ইন্নানা আ-মান্না-ফাগফিরলানা-যুনূবানা-ওয়াকিনা আযা-বান্না-র।

হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমরা ঈমান আনলাম। অতএব, আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।

আসুন আমরা হতাশ না হয়ে ইকামাতে দ্বীনের কাজ করি। আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং দায়িত্বশীলের আনুগত্য করি। আর আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া দোয়া বার বার পড়তে থাকি, বিশেষ করে শেষ রাতে।

#রব্বানা

১৫ মে, ২০২৪

অন্তরের বক্রতা থেকে রক্ষা পাওয়ার দোয়া



বাংলাদেশে আলেম নামধারী কিছু লোক অনলাইনে বিতর্কের হাট বসিয়ে দিচ্ছেন। এই প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা জরুরি মনে করছি। 

একবার রাসূল সা. দেখলেন সাহাবাদের একটি গ্রুপ কুরআনের বিভিন্ন আয়াত নিয়ে পরস্পরে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছেন। কুরআনের এক আয়াতকে অন্য আয়াতের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে বিতর্ক করছিলেন তাঁরা। এটা দেখে রাসূল সা. বললেন, তোমাদের পূর্বের লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তারা আল্লাহ্‌র কিতাবের একাংশকে অপর অংশের বিপরীতে ব্যবহার করত। আল্লাহ্‌র কুরআন তো এ জন্যই নাযিল হয়েছিল যে, এর একাংশ অপর অংশের সত্যয়ণ করবে। সুতরাং তোমরা এর একাংশকে অপর অংশের কারণে মিথ্যারোপ করো না। এর যে অংশের অর্থ তোমরা জানবে সেটা বলবে, আর যে অংশের অর্থ জানবে না সেটা আলেম বা যারা জানে তাদের কাছে সোপর্দ করো।  [মুসনাদে আহমাদ ২/১৮৫, নং ৬৭৪১; মুসান্নাফে ইবন আবী শাইবাহ ১১/২১৬২১৭, হাদীস নং ২৩৭০]

আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য কুরআন নাজিল করেছেন। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করাই যেন হয় আমাদের উদ্দেশ্য। কুরআনে দুই ধরণের আয়াত রয়েছে। একটা প্রকার হলো মুহকামাত। আরেক প্রকার হলো মুতাশাবিয়াত। 

মুহকাম পাকাপোক্ত জিনিসকে বলা হয়। এর বহুবচন 'মুহকামাত'। 'মুহকামাত আয়াত' বলতে এমন সব আয়াত বুঝায় যেগুলোর ভাষা একেবারেই সুস্পষ্ট, যেগুলোর অর্থ নির্ধারণ করার ব্যাপারে কোনো প্রকার সংশয়-সন্দেহে অবকাশ থাকে না, যে শব্দগুলো দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য উপস্থাপন করে এবং যেগুলোর অর্থ বিকৃত করার সুযোগ লাভ করা বড়ই কঠিন। যে উদ্দেশ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে এ আয়াতগুলো সেই উদ্দেশ্য পূর্ণ করে। এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে দুনিয়াবাসীকে ইসলামের দিকে আহবান জানানো হয়েছে। এগুলোতেই শিক্ষা ও উপদেশের কথা বর্ণিত হয়েছে। ভ্রষ্টতার গলদ তুলে ধরে সত্য-সঠিক পথের চেহারা সুস্পষ্ট করা হয়েছে। দ্বীনের মূলনীতি এবং আকীদা-বিশ্বাস, ইবাদাত, চরিত্রনীতি, দায়িত্ব-কর্তব্য ও আদেশ-নিষেধের বিধান এ আয়াতগুলোতেই বর্ণিত হয়েছে। কাজেই কোন সত্যানুসন্ধানী ব্যক্তি কোন্ পথে চলবে এবং কোন্ পথে চলবে না একথা জানার জন্য যখন কুরআনের শরণাপন্ন হয় তখন 'মুহকাম' আয়াতগুলোই তার পথপ্রদর্শন করে। স্বাভাবিকভাবে এগুলোর প্রতি তার দৃষ্টি নিবন্ধ হয় এবং এগুলো থেকে উপকৃত হবার জন্য সে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।

আর 'মুতাশাবিহাত' অর্থ যেসব আয়াতের অর্থ গ্রহণে সন্দেহ-সংশয়ের ও বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে দেওয়ার অবকাশ রয়েছে। বিশ্ব-জাহানের অন্তর্নিহিত সত্য ও তাৎপর্য, তার সূচনা ও পরিণতি, সেখানে মানুষের অবস্থান, মর্যাদা ও ভূমিকা এবং এ ধরনের আরো বিভিন্ন মৌলিক বিষয় সম্পর্কিত সর্বনিম্ন অপরিহার্য তথ্যাবলী মানুষকে সরবরাহ না করা পর্যন্ত মানুষের জীবন পথে চলার জন্য কোন পথনির্দেশ দেয়া যেতে পারে না, এটি একটি সর্বজনবিদিত সত্য। আবার একথাও সত্য, মানবিক ইন্দ্রিয়ানুভুতির বাইরের বস্তু-বিষয়গুলো, যেগুলো মানবিক জ্ঞানের আওতায় কখনো আসেনি এবং আসতেও পারে না, যেগুলোকে সে কখনো দেখেনি, স্পর্শ করেনি এবং যেগুলোর স্বাদও গ্রহণ করেনি, সেগুলো বুঝাবার জন্য মানুষের ভাষার ভাণ্ডারে কোন শব্দও রচিত হয়নি এবং প্রত্যেক শ্রোতার মনে তাদের নির্ভুল ছবি অংকিত করার মতো কোন পরিচিত বর্ণনা পদ্ধতিও পাওয়া যায় না। 

কাজেই এ ধরনের বিষয় বুঝাবার জন্য এমন সব শব্দ ও বর্ণনা পদ্ধতি অবলম্বন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, যেগুলো প্রকৃত সত্যের সাথে নিকটতর সাদৃশ্যের অধিকারী অনুভবযোগ্য জিনিসগুলো বুঝাবার জন্য মানুষের ভাষায় পাওয়া যায়। এ জন্য অতি প্রাকৃতিক তথা মানবিক জ্ঞানের ঊর্ধ্বের ও ইন্দ্রিয়াতীত বিষয়গুলো বুঝাবার জন্য কুরআন মজীদে এ ধরনের শব্দ ও ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। যেসব আয়াতে এ ধরনের ভাষা ও শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোকেই 'মুতাশাবিহাত' বলা হয়।

দ্বিতীয় প্রকার আয়াতের অর্থ  আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে এগুলো সম্পর্কে বিশুদ্ধ পন্থা হল, এসব আয়াতকে প্রথম প্রকার আয়াতের আলোকে দেখা। 

 উদাহরণতঃ ঈসা আ. সম্পর্কে কুরআনের সুস্পষ্ট উক্তি এরূপ

(اِنْ هُوَ اِلَّا عَبْدٌ اَنْعَمْنَا عَلَيْهِ)

অর্থাৎ "সে আমার নেয়ামত প্রাপ্ত বান্দা ছাড়া অন্য কেউ নয়।  [সূরা আয-যুখরুফ  ৫৯] 

অন্যত্র বলা হয়েছে,

(اِنَّ مَثَلَ عِيْسٰى عِنْدَ اللّٰهِ كَمَثَلِ اٰدَمَ ۭخَلَقَهٗ مِنْ تُرَابٍ)

অর্থাৎ “আল্লাহ্‌র কাছে ঈসার উদাহরণ হচ্ছে আদমের অনুরূপ আল্লাহ্ তাকে সৃষ্টি করেছেন মৃত্তিকা থেকে।" [সূরা আলে-ইমরানঃ ৫৯]

এসব আয়াত এবং এ ধরনের অন্যান্য আয়াত থেকে পরিস্কার বুঝা যায় যে, ঈসা আ. আল্লাহ্ তা'আলার মনোনীত এবং তাঁর সৃষ্ট। অতএব তিনি উপাস্য, তিনি আল্লাহ্‌র পুত্র-নাসারাদের এসব দাবী সম্পূর্ণ বানোয়াট। তারা যদি (كَلِمَةُ اللّٰهِ) 'আল্লাহ্‌র কালেমা' বা (رُوْحٌ مِنْهُ); ‘তাঁর পক্ষ থেকে রূহ’ শব্দদ্বয় দ্বারা দলীল নেয়ার চেষ্টা করে তখন তাদের বলতে হবে যে, পূর্বে বর্ণিত আয়াতসমূহের আলোকেই এশব্দদ্বয়কে বুঝতে হবে। সে আলোকে উপরোক্ত (كَلِمَةُ اللّٰهِ I رُوْحٌ مِنْهُ) শব্দদ্বয় সম্পর্কে এটাই বলতে হয় যে, ঈসা আ. আল্লাহ্‌র নির্দেশে সৃষ্ট হয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে পাঠানো একটি রূহ। 

এরকম আরো বহু আয়াত রয়েছে যা দ্বারা আমরা নানান অর্থ করতে পারি। তবে সে অর্থই সঠিক যে অর্থ মুহকামাত আয়াত দ্বারা সাব্যস্থ। 

এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন, তিনি সূরা ইমরানের ৭ও ৮ নং আয়াতে বলেন,

তিনিই তোমাদের প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছেন। এ কিতাবে দুই ধরনের আয়াত আছে। এক হচ্ছে, মুহকামাত, যেগুলো কিতাবের আসল বুনিয়াদ এবং দ্বিতীয় হচ্ছে, মুতাশাবিহাত। যাদের মনে বক্রতা আছে তারা ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সবসময় মুতাশাবিহাতের পিছনে লেগে থাকে এবং তার অর্থ করার চেষ্টা করে থাকে। অথচ সেগুলোর আসল অর্থ আল্লাহ‌ ছাড়া আর কেউ জানে না। বিপরীত পক্ষে পরিপক্ক জ্ঞানের অধিকারীরা বলে, 'আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি, এসব আমাদের রবের পক্ষ থেকেই এসেছে'। আর প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানবান লোকেরাই কোন বিষয় থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। তারা আল্লাহ‌র কাছে দোয়া করতে থাকে, 'হে আমাদের রব! যখন তুমি আমাদের সোজা পথে চালিয়েছো তখন আর আমাদের অন্তরকে বক্রতায় আচ্ছন্ন করে দিয়ো না, তোমার দান ভাণ্ডার থেকে আমাদের জন্য রহমত দান করো কেননা তুমিই আসল দাতা।

ইদানিং দেখা যাচ্ছে, আমাদের সমাজে আলেম নামধারী কিছু লোক এসব মুতাশাবিয়াত আয়াত ও শব্দ নিয়ে বিতর্কের হাট বসিয়ে দিচ্ছেন। একজন আরেকজনকে বিদয়াতি, মুশরিক, ভ্রান্ত ইত্যাদি উপাধি প্রয়োগ করছেন। বস্তুত উভয় পক্ষই কুরআনের নির্দেশনা পরিপন্থী আচরণ করছেন। যারা এসব মুতাশাবিয়াতের চর্চা করে কুরআনে আল্লাহ  
তাদের অন্তর বক্র বলে উল্লেখ করেছেন। এটা করা যাবে না। 

এর জন্য পানাহ চাইতে হবে। আল্লাহ তায়ালা এসব বক্রতা থেকে রক্ষা পাওয়ার দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। আমরা নিজেরা তো অবশ্যই মুতাশাবিহাতের চর্চা করবো না। যারা এসব চর্চা করে বিতর্কের হাট বসিয়ে দিচ্ছে এবং কুরআনের এক আয়াতকে দিয়ে অন্য আয়াতকে খন্ডন করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে। এই বিতর্কে কোনোভাবেই অংশ নেওয়া যাবে না। 

আর পাশাপাশি এসব বক্রতা ও ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর শিখিয়ে দেওয়া দোয়া বারংবার পড়তে হবে। 

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
রব্বানা-লা-তুঝিগ কুলূবানা-বা'দা ইয হাদাইতানা -ওয়াহাবলানা-মিল্লা দুনকা রাহমাতান ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহা-ব।

হে আমাদের রব, আপনি হিদায়াত দেয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয় আপনি মহাদাতা।
(সূরা আল-ইমরানঃ ৩:৮)

#রব্বানা



২৫ এপ্রি, ২০২৪

যে দোয়া আল্লাহ তায়ালা শিখিয়ে দিয়েছেন!


একবার রাসূলুল্লাহ সা. একজন বেদুঈনের নিকট হতে একটি ঘোড়া ক্রয় করেন। রাসূল সা.-এর হাতে ঐ সময় পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। তিনি বিক্রেতা লোকটিকে তার সাথে ঘোড়ার মূল্য নেওয়ার জন্য বাড়িতে আসতে বলেন।  বেদুঈন মূল্য নেয়ার উদ্দেশ্যে রাসূল সা.-এর পিছনে পিছনে তার বাড়ীর দিকে আসতে থাকে। 

মহাম্মদ সা. খুব দ্রুত চলছিলেন এবং বেদুঈনটি ধীরে ধীরে চলছিল। ঘোড়াটি যে বিক্রি হয়ে গেছে এ সংবাদ জনগণ জানতো না বলে তারা ঐ ঘোড়ার দাম করতে থাকে। বিক্রেতার অসৎ উদ্দেশ্য ছিল। সে কাউকে বলছে না ঘোড়াটি বিক্রি হয়ে গেছে। 

বিক্রেতা লোকটি ঘোড়াটি দাম দর করতে থাকে। এক পর্যায়ে  এবং রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট ঘোড়াটি যে দামে বিক্রি করেছিল তার চেয়ে বেশী দাম নির্ধারণ হয়ে যায়। বেদুঈন নিয়্যত পরিবর্তন করে রাসূলুল্লাহ সা.-কে ডাক দিয়ে বলে, আপনি হয় ঘোড়াটি এখনই ক্রয় করুন, না হয় আমি অন্যের হাতে বিক্রি করে দেই।' 

একথা শুনে নবী সা. থেমে যান এবং বলেন- 'তুমি তো ঘোড়াটি আমার হাতে বিক্রি করেই ফেলেছো; সুতরাং এখন আবার কি বলছো? বেদুঈনটি তখন বলে, 'আল্লাহর শপথ! আমি বিক্রি করিনি। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, তোমার ও আমার মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় হয়ে গেছে। ঐ ব্যাক্তি তখন বলে, আমি আপনার নিকট বিক্রি করেছি তার পক্ষে সাক্ষী আনয়ন করুন। মুসলমানগণ তাকে বারবার বলে, ওরে হতভাগা! তিনি তো আল্লাহর রাসূল, তার মুখ দিয়ে শুধু সত্য কথাই বের হয়। 

কিন্তু তার এই একই কথা-সাক্ষ্য আনয়ন করুন। এমন সময় হযরত খুযাইমা রা. এসে পড়েন এবং বেদুঈনের কথা শুনে বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে ঘোড়াটি বিক্রি করেছ। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে বলেন, তুমি কি করে সাক্ষ্য দিচ্ছ? তিনি বলেন, আপনার সত্যবাদিতার উপর ভিত্তি করে। 

এই ঘটনার মতো আরো ঘটনা, লেনদেনে ও ঋণ চুক্তিতে ফাসাদের খবর পাওয়া যায় মদিনাতে। তাই আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারায় ১৮২ নং আয়াতে চুক্তি, ঋণ ইত্যাদি বিষয়ে নীতিমালা নাজিল করেছেন। আয়াতটি অবতীর্ণ হলে রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, হযরত আদম আ. স্বয়ং অস্বীকারকারী। সুতরাং তার সন্তানেরা অস্বীকার করবেই। তাই আল্লাহ তায়ালা এই গাইডলাইন নাজিল করেছেন। 

আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করার পর তাঁর পৃষ্ঠদেশে হাত বুলিয়ে দেন। ফলে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর যতগুলো সন্তান জন্মগ্রহণ করবে সবাই বেরিয়ে আসে। হযরত আদম আ. তাঁর সন্তানদেরকে স্বচক্ষে দেখতে পান। একজনকে অত্যন্ত হৃষ্ট পুষ্ট ও ঔজ্জ্বল্যময় দেখে জিজ্ঞেস করেন,
- হে আল্লাহ! এর নাম কি? 
- এটা তোমার সন্তান দাউদ। 
- তার বয়স কত হবে? 
- ষাট বছর। 
- তার বয়স কিছুদিন বাড়িয়ে দিন! 
- না, তা হবে না। তবে তুমি যদি তোমার বয়সের মধ্য হতে তাকে কিছু দিতে চাও তবে দিতে পার। 
- ইয়া আল্লাহ! আমার বয়সের মধ্য হতে চল্লিশ বছর তাকে দেওয়া হোক। 

সুতরাং তা দেয়া হয়। হযরত আদম আ. এর প্রকৃত বয়স ছিল এক হাজার বছর। বয়সের এই আদান-প্রদান লিখে নেয়া হয় এবং ফেরেশতাদেরকে ওর উপর সাক্ষী রাখা হয়। 

হযরত আদমের আ.-এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি বলেন, হে আল্লাহ! আমার বয়সের এখনও তো চল্লিশ বছর অবশিষ্ট রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তখন বলেন, 'তুমি তোমার সন্তান দাউদকে চল্লিশ বছর দান করেছ। 

হযরত আদম আ. তা অস্বীকার করেন। তখন তাঁকে ঐ লিখা দেখানো হয় এবং ফেরেশতাগণ সাক্ষ্য প্রদান করেন। এই ঘটনাকে ইঙ্গিত করে মুহাম্মদ সা. বলেন, অস্বীকার করা, ভুলে যাওয়া আদম সন্তানদের বৈশিষ্ট্য। 

চুক্তির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 
১. হে ঈমানদারগণ! যখন কোন নির্ধারিত সময়ের জন্য তোমরা পরস্পরে মধ্যে ঋণের লেনদেন করো তখন লিখে রাখো। 

২. উভয় পক্ষের মধ্যে ইনসাফ সহকারে এক ব্যক্তি দলীল লিখে দেবে। আল্লাহ‌ যাকে লেখাপড়ার যোগ্যতা দিয়েছেন তার লিখতে অস্বীকার করা উচিত নয়। সে লিখবে এবং লেখার বিষয়বস্তু বলে দেবে সেই ব্যক্তি যার ওপর ঋণ চাপছে (অর্থাৎ ঋণগ্রহীতা)। তার রব আল্লাহ‌কে তার ভয় করা উচিত। যে বিষয় স্থিরীকৃত হয়েছে তার থেকে যেন কোন কিছুর কম বেশি না করা হয়। 

৩. কিন্তু ঋণগ্রহীতা যদি বুদ্ধিহীন বা দুর্বল হয় অথবা লেখার বিষয়বস্তু বলে দিতে না পারে, তাহলে তার অভিভাবক ইনসাফ সহকারে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেবে। 

৪. তারপর নিজেদের পুরুষদের মধ্য থেকে দুই ব্যক্তিকে তার স্বাক্ষী রাখো। আর যদি দু'জন পুরুষ না পাওয়া যায় তাহলে একজন পুরুষ ও দু'জন মহিলা সাক্ষী হবে, যাতে একজন ভুলে গেলে অন্যজন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। এসব সাক্ষী এমন লোকদের মধ্য থেকে হতে হবে যাদের সাক্ষ্য তোমাদের কাছে গ্রহণীয়। 

৫. সাক্ষীদেরকে সাক্ষ্য দেবার জন্য বললে তারা যেন অস্বীকার না করে। 

৬. ব্যাপার ছোট হোক বা বড়, সময়সীমা নির্ধারণ সহকারে দলীল লেখাবার ব্যাপারে তোমরা গড়িমসি করো না। 

৭. আল্লাহ‌র কাছে তোমাদের জন্য এই পদ্ধতি অধিকতর ন্যায়সঙ্গত, এর সাহায্যে সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা বেশী সহজ হয় এবং তোমাদের সন্দেহ-সংশয়ে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা কমে যায়। 

৮. তবে যেসব ব্যবসায়িক লেনদেন তোমরা পরস্পরের মধ্যে হাতে হাতে করে থাকো, সেগুলো না লিখলে কোন ক্ষতি নেই।

৯. কিন্তু ব্যবসায়িক বিষয়গুলো স্থিরীকৃত করার সময় সাক্ষী রাখো। লেখক ও সাক্ষীকে কষ্ট দিয়ো না। এমনটি করলে গোনাহের কাজ করবে। 

১০. আল্লাহ‌র গযব থেকে আত্মরক্ষা করো। তিনি তোমাদের সঠিক কর্মপদ্ধতি শিক্ষা দান করেন এবং তিনি সবকিছু জানেন। 

মহান রাব্বুল আলামীন এই গাইডলাইন দিয়েছে সূরা বাকারের ২৮২ নং আয়াতে। 

এর পর ২৮৩ নং আয়াতে সফরকালীন বিশেষ অবস্থার গাইডলাইন দিয়েছেন। 

১. যদি তোমরা সফরে থাকো এবং এ অবস্থায় দলীল লেখার জন্য কোন লেখক না পাও, তাহলে বন্ধক রেখে কাজ সম্পন্ন করো। 

২. যদি তোমাদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি অন্যের ওপর ভরসা করে তার সাথে কোন কাজ কারবার করে, তাহলে যার ওপর ভরসা করা হয়েছে সে যেন তার আমানত যথাযথরূপে আদায় করে এবং নিজের রব আল্লাহকে ভয় করে। আর সাক্ষ্য কোনোক্রমেই গোপন করো না।

৩. যে ব্যক্তি সাক্ষ্য গোপন করে তার হৃদয় গোনাহর সংস্পর্শে কলুষিত। আর আল্লাহ‌ তোমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে বেখবর নন।

এরপর ২৮৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা হুমকি দিলেন যারা চুক্তি পরিপালন করবে না তাদের ব্যাপারে। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, 
১. আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর। 
২. তোমরা নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করো বা লুকিয়ে রাখো, আল্লাহ‌ অবশ্যি তোমাদের কাছ থেকে তার হিসাব নেবেন।
৩. তারপর তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেবেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন, এটা তাঁর এখতিয়ারাধীন। 
৪. তিনি সব জিনিসের ওপর শক্তি খাটাবার অধিকারী।

এই আয়াত নাজিলের পর সাহাবায়ে কেরাম অস্থির হয়ে গেলেন এবং রাসূল সা.-এর কাছে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এতদিন আমরা মনে করতাম যে, আমাদের ইচ্ছাকৃত কাজেরই হিসাব হবে। মনে যেসব অনিচ্ছাকৃত কল্পনা আসে, সেগুলোর হিসাব হবে না। কিন্তু এ আয়াত দ্বারা জানা গেল যে, প্রতিটি কল্পনারও হিসাব হবে। এতে তো শাস্তির কবল থেকে মুক্তি পাওয়া সাংঘাতিক কঠিন মনে হয়। 

মহানবী রাসূল সা. নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলা সমীচীন মনে করলেন না বরং ওহীর অপেক্ষায় রইলেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামকে আপাততঃ আদেশ দিলেন যে, আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে যে নির্দেশ আসে, তা সহজ হোক কিংবা কঠিন - মুমিনের কাজ হলো তা মেনে নেয়া। 

সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সা.-এর নির্দেশমত কাজ করলেন; যদিও তাদের মনে এ সংশয় ছিল যে, অনিচ্ছাকৃত কল্পনা ও কু-চিন্তা থেকে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা'আলা প্রথমে মুসলিমদের আনুগত্যের প্রশংসা করেন এবং বিশেষ ভঙ্গিতে ঐ সন্দেহের নিরসন করে ২৮৬ নং আয়াতে বলেন, আল্লাহ তা'আলা কাউকে তার সাধ্যের বহির্ভূত কোন কাজের নির্দেশ দেন না। 

কাজেই অনিচ্ছাকৃতভাবে যেসব কল্পনা ও কু-চিন্তা অন্তরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে, এরপর সেগুলো কার্যে পরিণত করা না হয়, সেসব আল্লাহ্‌ তা'আলার কাছে মাফযোগ্য। যেসব কাজ ইচ্ছে করে করা হয়, শুধু সেগুলোরই হিসাব হবে। কুরআনে বর্ণিত এ ব্যাখ্যার ফলে সাহাবায়ে কেরামের মানসিক উদ্বেগ দূর হয়ে যায়।

এরপর আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদেরকে ২৮৬ নং আয়াতেই কয়েকটি বিশেষ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। যাতে ভুল-ভ্রান্তিবশতঃ কোন কাজ হয়ে যাওয়ার পর ক্ষমা প্রার্থনার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়া হয়েছে এবং পূর্ববর্তী উম্মতদের মত শাস্তিও যেন এ উম্মতের উপর না আসে, তার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে বলা হয়েছে।

১. رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا
রব্বানা-লা-তু আ-খিযনা ইন নাছীনা-আও আখত'না

হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই, অথবা ভুল করি তাহলে আপনি আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।

২. رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا

রব্বানা ওয়ালা-তাহমিল আলাইনা ইসরান কামা-হামালতাহূ আলাল্লাযীনা মিন কাবলিনা

হে আমাদের রব, আমাদের উপর বোঝা চাপিয়ে দেবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

৩. رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا ۚ أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

রব্বানা ওয়ালা তুহাম্মিলনা-মা-লা-তা-কাতা লানা-বিহী ওয়া'ফু'আন্না ওয়াগফিরলানা ওয়ারহামনা আনতা মাওলা-না-ফানসুরনা আলাল কাওমিল কা-ফিরীন।

হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে এমন কিছু বহন করাবেন না, যার সামর্থ্য আমাদের নেই। আমাদের প্রতি কোমল হন, আমাদের অপরাধ ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি করুণা করুন। আপনি আমাদের অভিভাবক। কাফেরদের মোকাবিলায় আপনি আমাদের সাহায্য করুন।

#রব্বানা


১৪ জানু, ২০২৪

শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দোয়া


ফিলিস্তিনে মূসা আ.-এর মৃত্যুর পরে কিছুদিন পর্যন্ত বনী ইসরাঈল সত্যের উপরেই ছিল। অতঃপর তারা শিরক ও বিদআতের মধ্যে নিমজ্জিত হযলো। আল্লাহ তায়াল ক্রমাগত তাদের মাঝে নবী পাঠান। কিন্তু যখন তাদের অন্যায় কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের শত্রুদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করে দেন। তাদের শত্রুরা অর্থাৎ আমালিকরা তাদের বহু লোককে হত্যা করলো, বহু বন্দী করলো এবং তাদের বহু শহর দখল করে নিলো। 

সামুয়েল নবী তখন ছিলেন বনী ইসলাঈলের শাসক। কিন্তু তিনি বার্ধক্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাই ইসরাঈলী সরদাররা অন্য কোন ব্যক্তিকে নিজেদের নেতা বানিয়ে তার অধীনে যুদ্ধ করার প্রয়োজন অনুভব করছিল। কিন্তু তখন বনী ইসরাঈলদের মধ্যে অজ্ঞতা এত বেশী বিস্তার লাভ করেছিল এবং তারা অমুসলিম জাতিদের নিয়ম, আচার-আচরণে এত বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়েছিল যে, খিলাফত ও রাজতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্যবোধ তাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই তারা একজন খলীফা নির্বাচনের নয় বরং বাদশাহ নিযুক্তির আবেদন করেছিল। 

এই ঘটনা বাইবেলে এভাবে বর্ণিত আছে, //সামুয়েল সারা জীবন ইসরাঈলীদের মধ্যে সুবিচার করতে থাকেন। আমালিকদের হামলার পর সব ইসরাঈলী নেতা একত্র হয়ে রামা'তে সামুয়েলের কাছে আসে। তারা তাঁকে বলতে থাকে, দেখো, তুমি বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে পড়েছো এবং তোমার ছেলে তোমার পথে চলছে না। এখন তুমি কাউকে আমাদের বাদশাহ নিযুক্ত করে দাও, যে অন্য জাতিদের মতো আমাদের প্রতি সুবিচার করবে। 

একথা সামুয়েলের খারাপ লাগে। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ তায়ালা সামুয়েলকে বলেন, এই লোকেরা তোমাকে যা কিছু বলছে, তুমি তা মেনে নাও কেননা তারা তোমার নয়, আমারই অবমাননা করেছে। আমার বাদশাহীকে তারা মানতে চায় না। 

সামুয়েল তাদেরকে (যারা তাঁর কাছে বাদশাহ নিযুক্তির দাবী নিয়ে আসেছিল) বললেন, 
যদি বাদশাহ নিযুক্ত হয়, তবে সে তোমাদের ওপর রাজত্ব করবে। তার নীতি এই হবে যে, সে তোমাদের পুত্রদের নিয়ে যাবে। তার রথ ও বাহিনীতে চাকর নিযুক্ত করবে এবং তারা তার রথের আগে আগে দৌঁড়াতে থাকবে। সে তাদেরকে সহস্রজনের ওপর সরদার ও পঞ্চাশ জনের ওপর জমাদার নিযুক্ত করবে এবং কাউকে কাউকে হালের সাথে জুতে দেবে, কাউকে দিয়ে ফসল কাটাবে এবং নিজের জন্য যুদ্ধাস্ত্র ও রথের সরঞ্জাম তৈরী করাবে। আর তোমাদের কন্যাদেরকে পাচিকা বানাবে। 

তোমাদের ভালো ভালো শস্যক্ষেত্র, আংগুর ক্ষেত ও জিতবৃক্ষের বাগান নিয়ে নিজের সেবকদের দান করবে এবং তোমাদের শস্যক্ষেত ও আংগুর ক্ষেতের এক দশমাংশ নিয়ে নিজের সেনাদল ও সেবকদের দান করে দেবে। তোমাদের চাকর-বাকর, ক্রীতদাসী, সুশ্রী যুবকবৃন্দ ও গাধাগুলোকে নিজের কাজে লাগাবে এবং তোমাদের ছাগল-ভেড়াগুলোর এক দশমাংশ নেবে। সুতরাং তোমরা তার দাসে পরিণত হবে। 

সেদিন তোমাদের এই বাদশাহ, যাকে তোমরা নিজেদের জন্য নির্বাচিত করবে তার কারণে তোমরা ফরিয়াদ করবে কিন্তু সেদিন আল্লাহ তোমাদের কোনো জবাব দেবেন না। তবুও লোকেরা সামুয়েলের কথা শোনেনি। তারা বলতে থাকে, না আমরা বাদশাহ চাই, যে আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে। তাহলে আমরাও অন্য জাতিদের মতো হবো। আমাদের বাদশাহ আমাদের মধ্যে সুবিচার করবে, আমাদের আগে আগে চলবে এবং আমাদের জন্য যুদ্ধ করবে।// 

সামুয়েল আ. তাদেরকে আরেকটি বিষয়ে সাবধান করেছিলেন যে, যদি বাদশাহ তাদের জিহাদ করতে বলে তবে কি তারা জিহাদ থেকে পালিয়ে যাবে? মূলত বনী ইসরাইলের বেশিরভাগ লোক যুদ্ধ না করেই আমালিকদের (আমুন মুর্তির পূজারী) হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। ওরা ভেবেছিল একজন বাদশাহ তাদের ওপর নিযুক্ত করলে সে তার সৈন্যবাহিনী দিয়ে তাদের উদ্ধার করবে। 

নবী সামুয়েলের প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেছিল, আমাদের সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং আমাদের সন্তানাদিকে বন্দী করা হয়েছে। আমরা কি এতই কাপুরুষ যে তবুও আমরা মৃত্যুর ভয়ে জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবো? তখন জিহাদ ফরয করে দেওয়া হলো এবং তাদেরকে  বাদশাহর সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে গমন করতে বলা হলো। 

আল্লাহর নবীকে রেখে তারা অন্য কাউকে নেতা হিসেবে চাওয়ায় আল্লাহ তায়ালা তাদের পরীক্ষাকে আরো কঠিন করে দেন। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে নবী সামুয়েল আ. একজন সাধারণ সৈনিক অথচ ঈমানদারকে (তালুত)তাদের সামনে বাদশাহরূপে পেশ করলেন। তিনি সম্ভ্রান্ত বংশের ছিলেন না বরং একজন সৈনিক ছিলেন। ইয়াহূদার সন্তানেরা ছিল সম্ভ্রান্ত লোক এবং তালুত এদের মধ্যে ছিলেন না। তাই ইহুদীরা প্রতিবাদ করে বললো যে, তার অপেক্ষা তারাই রাজত্বের দাবীদার বেশী। দ্বিতীয় কথা এই যে, তিনি দরিদ্র ব্যক্তি। তাঁর কোন ধন-মাল নেই। 

নবীর আদেশের সামনে তাদের এই প্রতিবাদ ছিল প্রথম বিরোধিতা। নবী আঃ উত্তর দিলেন, এই নির্বাচন আমার পক্ষ হতে হয়নি যে, আমি পুনর্বিবেচনা করবো। বরং এটা তো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ। সুতরাং এই নির্দেশ পালন করা অবশ্য কর্তব্য। তাছাড়া এটাতো প্রকাশমান যে, তিনি তোমাদের মধ্যে একজন বড় আলেম, তার দেহ সুঠাম ও সবল, তিনি একজন বীর পুরুষ এবং যুদ্ধ বিদ্যায় তাঁর পারদর্শিতা রয়েছে।

সামুয়েল আ. আরো বলেন, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলাই হচ্ছেন মহাবিজ্ঞ এবং সাম্রাজ্যের প্রকৃত অধিকর্তা তিনিই। সুতরাং তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই রাজত্ব প্রদান করে থাকেন। তিনি হচ্ছেন সর্বজ্ঞাতা ও মহাবিজ্ঞানময়। কার এই ক্ষমতা রয়েছে যে, তার কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করে! তিনি যাকে চান নিজের নিয়ামত দ্বারা নির্দিষ্ট করে থাকেন, তিনি মহাজ্ঞানী। সুতরাং কে কোন জিনিসের যোগ্য এবং কোন জিনিসের অযোগ্য এটা তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন।

নবী আ. তাদেরকে বলেন- 'তালূতের রাজত্বের প্রথম বরকতের নিদর্শন এই যে, সেই সিন্ধুকটি তোমরা ফিরিয়ে পাবে, যার মধ্যে রয়েছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য মানসিক প্রশান্তির সামগ্রী। যার ভিতরে রয়েছে পদমর্যাদা, সম্মান, মহিমা, স্নেহ, ও করুণা। তার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর নিদর্শনাবলী যা তোমরা ভালভাবেই জান। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই হারানো সিন্ধুক নব নিযুক্ত বাদশাহ তালুতের কাছে চলে এলো। এতে বনী ইসরাঈলের লোকেরা তালুতের আনুগত্য মেনে নিলো। 

 যখন লোকেরা তালূতকে বাদশাহ বলে মেনে নিলো তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে যুদ্ধে বের হলেন। তালূত তাদেরকে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন। হযরত ইবনে আব্বাসের রাঃ উক্তি অনুসারে এই নদীটি উরদুন ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত ছিল। ঐ নদীটির নাম ছিল 'নাহরুশ শারীআহ। তালুত তাদেরকে সতর্ক করে দেন যে, কেউ যেন ঐ নদীর পানি পান না করে। যারা পান করবে তারা যেন আমার সাথে না যায়। এক আধ চুমুক যদি কেউ পান করে নেয় তবে কোন দোষ নেই। কিন্তু তথায় পৌঁছে গিয়ে তারা অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে। কাজেই তারা পেট পুরে পানি পান করে নেয়। কিন্তু অল্প কয়েকজন অত্যন্ত পাকা ঈমানদার লোক ছিলেন। তাঁরা এক চুমুক ব্যতীত পান করলেন না।

হযরত ইবনে আব্বাসের রা. উক্তি অনুযায়ী ঐ এক চুমুকেই ঈমানদারদের পিপাসা মিটে যায় এবং তারা জিহাদেও অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু যারা পূর্ণভাবে পান করেছিল তাদের পিপাসাও নিবৃত্ত হয়নি এবং তারা জিহাদের উপযুক্ত বলেও গণ্য হয়নি। যারা নদীর পরীক্ষায় পাশ করেছে তালুত তাদের নিয়ে নদী পার হলেন এবং মূর্তি পূজারীদের নেতা জালুতের মুখোমুখি হলেন। 

জালুতের বীরত্বের কথা ও তার বিশাল সেনাবাহিনীর কথা জেনে বনী ইসরাঈলের লোকেরা আবারো ভীত হয়ে পড়লো। তারা যুদ্ধ করতে চাইলো না। তারা কাপুরুষতার সাথে যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে বসলো। শত্রু সৈন্যদের সংখ্যা বেশী শুনে তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। সুতরাং তারা স্পষ্টভাবে বলে ফেললো, আজ জালুত ও তার সেনাদলের মোকাবিলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই।'  

তাদের মধ্যে যারা আলেম ছিলেন তারা তাদেরকে বহুরকম করে বুঝিয়ে বললেন, বিজয় লাভ সৈন্যদের আধিক্যের উপর নির্ভর করে না। ধৈর্যশীলদের উপর আল্লাহ তা'আলার সাহায্য এসে থাকে। বহুবার এরূপ ঘটেছে যে, মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোকে বিরাট দলকে পরাজিত করেছে। সুতরাং তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকারের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ কর। এই ধৈর্যের বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের সহায় হবেন। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও তাদের মৃত অন্তরে উত্তেজনার সৃষ্টি হলো না এবং তাদের ভীরুতা দূর হলো না।

মূলত আল্লাহ তায়ালা মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রার্থক্য স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছিলেন। বস্তুত দেখা গেল যারা বাদশাহ চেয়েছিল তারা কেউ আর জিহাদে নেই। এমন আশংকা নবী সামুয়েল আ. আগেই করেছিলেন। যাই হোক অতঃপর সেনাপ্রধান তালুত অল্প কিছু ঈমানদারকে সাথে নিয়ে জালুতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে তালুত ও ঈমানদারগণ একটি দোয়া করলেন। এই দু'আ আল্লাহ তায়ালা খুব পছন্দ করলেন। মূলত এই দু'আর প্রেক্ষাপট লেখার জন্যই এই ইতিহাস বর্ণনা করলাম। 

তালুত ও তার অনুসারী হাত তুলে কায়মনোবাক্যে বললেন, رَبَّنَآ اَفۡرِغۡ عَلَيۡنَا صَبۡرًا وَّثَبِّتۡ اَقۡدَامَنَا وَانصُرۡنَا عَلَى الۡقَوۡمِ الۡکٰفِرِيۡنَ﴿٢٥٠﴾
রব্বানা আফরিঘ আলাইনা সাব-রান ওয়া থাব্বিত আকদামানা ওয়ানসুরনা আলাল-কাউমিল-কাফিরিন
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাদের ধৈর্য শক্তি বাড়িয়ে দাও, এবং আমাদেরকে অবিচল রাখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিজয় দান করো।" [সূরা আল-বাক্বারাহ:২৫০]

দোয়া করা শেষে তালুত বনী ইসরাঈলের মধ্যে একজন সাহসী সামনে আসতে বললেন যিনি আক্রমণের অগ্রভাগে থাকবেন। দাউদ আ. এ সময় ছিলেন একজন কম বয়সী যুবক। তিনি তালুতের আহবানে সামনে এলেন। মুশরিকদের বাদশাহ জালুত দ্বন্দ্বযুদ্ধে একজন আহবান করলো। দাউদ আ. নির্ভয়ে জালুতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন এবং জালুতকে হত্যা করলেন। এই ঘটনায় মুশরিক বাহিনীর মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তারা মনোবল হারিয়ে ফেলে। মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে তাদের বিশাল বাহিনী পরাজিত হয়।  

এ ঘটনায় দাউদ আ. হয়ে উঠলেন ইসরাঈলীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তালুত নিজের মেয়ের সাথে তাঁর বিয়ে দিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নবুয়্যত দান করলেন। অবশেষে তিনিই হলেন ইসরাঈলীদের শাসক।

এই ঘটনায় আমরা যে শিক্ষা পাই, 
১. মুশরিকদের সাময়িক জয়ে আমরা যেন ধৈর্যহারা না হয়ে পড়ি। 
২. আল্লাহ তায়ালা ও নবী সা.-এর সিদ্ধান্তের বাইরে বাদশাহ হওয়া ও বাদশাহীর অনুসরণ যেন না কামনা করি।
৩. যুদ্ধ জয়ের জন্য মুসলিমদের বেশি লোকের প্রয়োজন নেই। দরকার অবিচল ঈমান।
৪. দলে মুনাফিক থাকলে যুদ্ধে জয়ী হওয়া কঠিন। তাই মুনাফিক ছাঁটাই জরুরি। 
৫. বিজয় আল্লাহর সাহায্যে হবে, তাই জয়ী হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতে হবে।

#রব্বানা

দুনিয়া ও আখিরাত প্রাপ্তির দু'আ

ইবরাহীম আ. যখন হজ্ব চালু করলেন তখন সেই সময়ের একটি পদ্ধতিতে হজ্ব পালন করা হতো। যত দিন গেল তত বিকৃতি প্রবেশ করতে থাকলো। একটা সময়ে ইসলাম বিরুদ্ধ পদ্ধতি চালু হয়ে গেল হজ্বের রীতিনীতিতে। তাই আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সা.-কে জানানোর মাধ্যমে আমাদের হজ্ব পালনের নিয়মকানুন শিখিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ১৯৬ নং আয়াতে বলেন, //আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যখন হজ্জ ও উমরাহ করার নিয়ত করো তখন তা পূর্ণ করো। আর যদি কোথাও আটকা পড়ো তাহলে যে কুরবানী তোমাদের আয়ত্বাধীন হয় তাই আল্লাহর উদ্দেশ্যে পেশ করো। আর কুরবানী তার নিজের জায়গায় পৌঁছে না যাওয়া পর্যন্ত তোমরা নিজেদের মাথা মুণ্ডন করো না। তবে যে ব্যক্তি রোগগ্রস্ত হয় অথবা যার মাথায় কোন কষ্ট থাকে এবং সেজন্য মাথা মুণ্ডন করে তাহলে তার ফিদিয়া হিসেবে রোযা রাখা বা সাদকা দেয়া অথবা কুরবানী করা উচিত। তারপর যদি তোমাদের নিরাপত্তা অর্জিত হয় (এবং তোমরা হজ্জের আগে মক্কায় পৌঁছে যাও) তাহলে তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি হজ্জ্বের সময় আসা পর্যন্ত উমরাহ্‌র সুযোগ লাভ করে সে যেন সামর্থ অনুযায়ী কুরবানী করে। আর যদি কুরবানীর যোগাড় না হয়, তাহলে হজ্জ্বের যামানায় তিনটি রোযা এবং সাতটি রোযা ঘরে ফিরে গিয়ে, এভাবে পুরো দশটি রোযা যেন রাখে। এই সুবিধে তাদের জন্য যাদের বাড়ী-ঘর মসজিদে হারামের কাছাকাছি নয়। আল্লাহর এ সমস্ত বিধানের বিরোধিতা করা থেকে দূরে থাকো এবং ভালোভাবে জেনে নাও আল্লাহ‌ কঠিন শাস্তি প্রদানকারী।//

এই আয়াত থেকে জানা গেলো,
১. হজ্ব বা উমরার নিয়ত করলে আমরা যেন তা পূর্ণ করি।

২. যদি এমন কোন কারণ দেখা দেয় যার ফলে সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বাধ্য হয়ে পথেই থেমে যেতে হয়, মক্কায় না যাওয়া যায় তবে উট, গরু, ছাগলের মধ্য থেকে যে পশুটি পাওয়া সম্ভব হয় সেটি আল্লাহর জন্য কুরবানী করতে হবে।

৩. কুরবানী না হওয়া পর্যন্ত মাথার চুল চেঁছে ফেলতে পারবে না।

৪. যদি কেউ রোগের কারণে বা অন্য প্রয়োজনে আগেই মাথা মুন্ডন করবে তারা ফিদিয়া দিবে। তিন দিন রোযা রাখা বা ছয় জন মিসকিনকে আহার করানো অথবা কমপক্ষে একটি ছাগল যবেহ করবে। এটা রাসূল সা.-এর নির্দেশ।

৫. জাহেলী যুদ্ধে আরবের লোকেরা ধারণা করতো, একই সফরে হজ্জ ও উমরাহ দু'টো সম্পন্ন করা মহাপাপ। তাদের মনগড়া শরীয়াতী বিধান অনুযায়ী হজ্জের জন্য একটি সফর এবং উমরাহর জন্য আর একটি সফল করা অপরিহার্য ছিল। মহান আল্লাহ‌ তাদের আরোপিত এই বাধ্য-বাধকতা দূর করে দেন এবং বাইরে থেকে আগমনকারীদেরকে এক সফরে হজ্জ ও উমরাহ করার সুবিধা দান করেন। তবে যারা মক্কার আশেপাশের মীকাতের (যে স্থান থেক হজ্জযাত্রীকে ইহরাম বাঁধতে হয়) সীমার মধ্যে অবস্থান করে তাদেরকে এই সুযোগ দেয়া হয়নি। কারণ তাদের পক্ষে হজ্জ ও উমরাহর জন্য পৃথক পৃথক সফর করা মোটেই কঠিন কাজ নয়।

৬. হজ্জের সময় আসা পর্যন্ত উমরাহর সুযোগ লাভ করার অর্থ হচ্ছে, উমরাহ সম্পন্ন করে ইহরাম খুলে ফেলতে হবে এবং ইহরাম থাকা অবস্থায় যেসব বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হচ্ছিল সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। তারপর হজ্জের সময় এলে আবার নতুন করে ইহরাম বেঁধে নেবে।

আল্লাহ তায়ালা ১৯৭ নং আয়াতে বলেন, //হজ্জের মাসগুলো সবার জানা। যে ব্যক্তি এই নির্দিষ্ট মাসগুলোতে হজ্জ করার নিয়ত করে, তার জেনে রাখা উচিত, হজ্জের সময়ে সে যেন যৌন সম্ভোগ, দুষ্কর্ম ও ঝগড়া –বিবাদে লিপ্ত না হয়। আর যা কিছু সৎকাজ তোমরা করবে আল্লাহ‌ তা জানেন। হজ্জ সফরের জন্য পাথেয় সঙ্গে নিয়ে যাও আর সবচেয়ে ভালো পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। কাজেই হে বুদ্ধিমানেরা! আমার নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকো।//

এই আয়াত থেকে জানা গেলো
১. ইহরাম বাঁধা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্কই নিষিদ্ধ।

২. যদিও সাধারণ অবস্থায়ই যে কোন গোনাহের কাজ করা অবৈধ কিন্তু ইহরাম বাঁধা অবস্থায় অন্যায় কাজ সংঘটিত হলে তার গোনাহের মাত্রা অনেক বেশী কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. ঝগড়া বিবাদ লিপ্ত হওয়া তো বিপজ্জনক। চাকরকে ধমক দেয়াও জায়েয নয়।

৪. জাহেলী যুগে হজ্জের জন্য পাথেয় সঙ্গে করে নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়াকে দুনিয়াদারীর কাজ বা গর্হিত কাজ মনে করা হতো। একজন ধর্মীয় ব্যক্তি সম্পর্কে আশা করা হতো সে দুনিয়ার কোন সম্বল না নিয়ে আল্লাহর ঘরের দিকে রওয়ানা হবে। এ আয়াতে তাদের এ ভুল চিন্তার প্রতিবাদ করা হয়েছে। তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে, পাথেয় না নিয়ে সফর করার মধ্যে মাহাত্ম্য নেই। আসল মাহাত্ম্য হচ্ছে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হওয়া, তাঁর বিধি-নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করা থেকে বিরত থাকা এবং জীবনকে পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও কলুষ মুক্ত করা। যে ব্যক্তি সৎ চারিত্রিক গুণাবলী নিজের মধ্যে সৃষ্টি করে সে অনুযায়ী নিজের চরিত্রকে নিয়ন্ত্রিত করেনি এবং আল্লাহর ভয়ে ভীত না হয়ে অসৎকাজ করতে থাকে, সে যদি পাথেয় সঙ্গে না নিয়ে নিছক বাহ্যিক ফকীরী ও দরবেশী প্রদর্শনী করে বেড়ায়, তাহলে তাতে তার কোন লাভ নেই। আল্লাহ‌ ও বান্দা উভয়ের দৃষ্টিতে সে লাঞ্ছিত হবে। যে ধর্মীয় কাজটি সম্পন্ন করার জন্য সে সফর করছে তাকেও লাঞ্ছিত করবে। কিন্তু তার মনে যদি আল্লাহর প্রতি ভয় জাগরুক থাকে এবং তার চরিত্র নিষ্কলুষ হয় তাহলে আল্লাহর ওখানে সে মর্যাদার অধিকারী হবে এবং মানুষও তাকে মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখবে। তার খাবারের থলিতে খাবার ভরা থাকলেও তার এ মর্যাদার কোন কম-বেশী হবে না।

এরপর আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ১৯৮ ও ১৯৯ নং আয়াতে বলেন,
//আর হজ্জের সাথে সাথে তোমরা যদি তোমাদের রবের অনুগ্রহের সন্ধান করতে থাকো তাহলে তাতে কোন দোষ নেই। তারপর আরাফাত থেকে অগ্রসর হয়ে 'মাশআরুল হারাম' (মুয্‌দালিফা) এর কাছে থেমে আল্লাহ‌কে স্মরণ করো এবং এমনভাবে স্মরণ করো যেভাবে স্মরণ করার জন্য তিনি তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। নয়তো ইতিপূর্বে তোমরা তো ছিলে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত। তারপর যেখান থেকে আর সবাই ফিরে আসে তোমরাও সেখান থেকে ফিরে এসো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়//

এই দুইটি আয়াত থেকে আমরা যা জানতে পারি,

১. আরবে আগে হজ্জ সফরকালে অর্থ উপার্জনের জন্য কোনো কাজ করাকে খারাপ মনে করা হতো। কারণ তাদের মতে, অর্থ উপার্জন করা একটি দুনিয়াদারীর কাজ। কাজেই হজ্জের মতো একটি ধর্মীয় কাজের মধ্যে এ দুনিয়াদারীর কাজটি করা তাদের চোখে নিন্দনীয়ই ছিল। কুরআন এ ধারণার প্রতিবাদ করছে এবং তাদের জানিয়ে দিচ্ছে, একজন আল্লাহ‌ বিশ্বাসী ব্যক্তি যখন আল্লাহর আইনের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করে নিজেদের অর্থ উপার্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালায় তখন আসলে সে আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করে। কাজেই এক্ষেত্রে সে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সফর করতে গিয়ে তার মাঝখানে তাঁর অনুগ্রহের সন্ধানও করে ফেরে, তাহলে তার কোন গোনাহ হবে না।

২. ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-এর সময় আরবে হজ্জের সাধারণ প্রচলিত পদ্ধতি ছিল এই যে, ৯ই যিলহজ্জ তারা মিনা থেকে আরাফাত যেতো এবং ১০ তারিখের সকালে সেখান থেকে ফিরে এসে মুযদালিফায় অবস্থান করতো। কিন্তু পরবর্তী কালে যখন ধীরে ধীরে ভারতীয় ব্রাহ্মণদের মতো আরবে কুরাইশদের ধর্মীয় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো তখন তারা বললো, আমরা হারাম শরীফের অধিবাসী, সাধারণ আরবদের সাথে আমরা আরাফাত পর্যন্ত যাবো, এটা আমাদের জন্য মর্যাদাহানিকর।

কাজেই তারা নিজেদের জন্য পৃথক মর্যাদাজনক ব্যবস্থার প্রচলন করলো। তারা মুযদালিফা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসতো এবং সাধারণ লোকদের আরাফাত পর্যন্ত যাবার জন্য ছেড়ে দিতো। পরে বনী খুযাআ ও বনী কিনানা গোত্রদ্বয় এবং কুরাইশদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য গোত্রও এই পৃথক অভিজাতমূলক ব্যবস্থার অধিকারী হলো। অবশেষে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে, কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ গোত্রগুলোর মর্যাদাও সাধারণ আরবদের তুলনায় অনেক উঁচু হলে গেলো। তারাও আরাফাতে যাওয়া বন্ধ করে দিল।

এ গর্ব ও অহংকারের বিষয়টিকে এই আয়াতে রহিত করে দেওয়া হয়েছে। এ আয়াতে বিশেষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে কুরাইশ, তাদের আত্মীয় ও চুক্তিবদ্ধ গোত্রগুলোকে এবং সাধারণভাবে সম্বোধন করা হয়েছে এমন সব লোকদেরকে যারা আগামীতে কখনো নিজেদের জন্য এ ধরনের পৃথক ব্যবস্থা প্রচলনের আকাঙ্ক্ষা মনে মনে পোষণ করে। তাদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, সবাই যতদূর পর্যন্ত যায় তোমরাও তাদের সাথে ততদূর যাও, তাদের সাথে অবস্থান করো, তাদের সাথে ফিরে এসো এবং এ পর্যন্ত জাহেলী অহংকার ও আত্মম্ভিরতার কারণে, তোমরা সুন্নাতে ইবরাহিমীর যে বিরুদ্ধাচরণ করে এসেছো সেজন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।

সবশেষে আল্লাহ তায়ালা ২০০ থেকে ২০২ নং আয়াতে বলেন,
অতঃপর যখন তোমরা নিজেদের হজ্জের অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করবে তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে যেমন ইতিপূর্বে তোমাদের বাপ-দাদাদেরকে স্মরণ করতে বরং তার চেয়ে অনেক বেশী করে স্মরণ করবে (আল্লাহকে)। তাদের মধ্যে কেউ এমন আছে যে বলে, হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় সবকিছু দিয়ে দাও। এই ধরনের লোকের জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। আবার কেউ বলে, হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দাও এবং আখেরাতেও কল্যাণ দাও এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও। এই ধরনের লোকেরা নিজেদের উপার্জন অনুযায়ী (উভয় স্থানে) অংশ পাবে। মূলত হিসেব সম্পন্ন করতে আল্লাহর একটুও বিলন্ব হয় না।

এই আয়াতগুলো থেকে আমরা জানতে পারি,

১. আরবের লোকেরা হজ্জ শেষ করার পর পরই মিনায় সভা করতো। সেখানে প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা তাদের বাপ-দাদাদের কৃতিত্ব আলোচনা করতো। গর্ব ও অহংকারের সাথে এবং এভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করতো। তাদের এ কার্যকলাপের ভিত্তিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, এসব জাহেলী কথাবার্তা বন্ধ করো, ইতিপূর্বে আজেবাজে কথা বলে যে সময় নষ্ট করতে এখন আল্লাহর স্মরণে ও তাঁর যিকিরে তা অতিবাহিত করো।

২. আবার যারা আল্লাহকে স্মরণ করতো তাদের মধ্যে দুইটি দল ছিল একদল আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতো,
رَبَّنَآ اٰتِنَا فِىۡ الدُّنۡيَا
অর্থাৎ হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় সবকিছু দিয়ে দাও।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হজ্বে এসে যারা আল্লাহর কাছে শুধু দুনিয়ার জন্য চাইবে তাদের জন্য আখিরাতে কোনো কিছু থাকবে না।

৩. আরেক দল লোক হজ্বে এসে আল্লাহর কাছে দোয়া করতো,
رَبَّنَآ اٰتِنَا فِىۡ الدُّنۡيَا حَسَنَةً وَّفِىۡ الۡاٰخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থাৎ হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দাও এবং আখেরাতেও কল্যাণ দাও এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও।
আল্লাহ তায়ালা এই দোয়াকে পছন্দ করেছেন। তাই তিনি আমরা যাতে এই দোয়া করি সেজন্য কুরআনে উদ্ধৃত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, এই দোয়াকারীরা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় অংশেই তারা নিজ নিজ আমল অনুযায়ী প্রতিদান পাবেন। আল্লাহর রাসূল সা. এই প্রতিদনই করতেন।

শুধু হজ্ব নয়, রাসূল সা. ও সাহাবা রা.-গণ সবসময় এই দোয়া করতেন। আসুন আমরাও আল্লাহর কাছে এই অতি পরিচিত দোয়া সবসময় করতে থাকি।

#রব্বানা

জাতি ও সন্তানের জন্য ইবরাহিম আ.-এর হৃদয়গ্রাহী দু'আ

বড় কঠিন ছিল সেই পরিক্ষা। স্ত্রী ও নবজাতক সন্তানকে রেখে যেতে হয়েছে দুই হাজার কিলোমিটার দূরে। জনমানবহীন মরুভূমিতে। বলছি ইবরাহীম আ.-এর কথা। জগতের সব কঠিন পরিক্ষা দিতে হয়েছে তাঁকে। তিনি নমরুদের আগুন থেকে আল্লাহর ইশারায় রক্ষা পেলেও নমরুদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন নি।


নমরুদ তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। এরপর ফিলিস্তিন, মিশর, আরব ইত্যাদি দেশ ঘুরে সিরিয়ায় থিতু হলেন। তাঁর জীবন জুড়েই পরীক্ষা। আমরা সবাই কমবেশি এই সম্পর্কে জানি। তিনি তাঁর ২য় স্ত্রী ও সন্তান ইসমাঈল আ.-কে মক্কায় রেখে গেলেন।

ধীরে ধীরে সেখানে বসতি তৈরি হলো। ইসমাঈল আ. নবুয়্যত প্রাপ্ত হলেন। আরবে ঘুরে ঘুরে জনমানুষের কাছে তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছেন। এমনই এক দিনে ইবরাহীম আ. তাঁর বড় সন্তান ইসমাঈল আ.-এর সাথে দেখা করতে সিরিয়া থেকে মক্কায় এলেন।

এখানে এসে তিনি দেখেন হযরত ইসমাঈল আ. বাড়িতে নেই।
পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করেন- সে কোথায় গেছে?
- তিনি পানাহারের খোঁজে বেরিয়েছেন। অর্থাৎ শিকারে গেছেন।
- তোমাদের অবস্থা কি?
- অবস্থা খারাপ, বড়ই দারিদ্র্য ও সংকীর্ণতার মধ্যে দিন যাপন করছি।
- তোমার স্বামী বাড়ী আসলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে।

ইসমাঈল আ. ফিরে এসে যেন তিনি কোনো মেহমানের আগমনের ইঙ্গিত পেয়েছেন। তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন,
- এখানে কোন লোকের আগমন ঘটেছিল কি?
স্ত্রী বলে, হ্যাঁ, এরূপ এরূপ আকৃতির একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এসেছিলেন। তিনি আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি যে, তিনি শিকারের অনসুন্ধানে বেরিয়েছেন।
- আমাকে কিছু বলতে বলেছেন কি?
- হ্যাঁ, বলেছেন যখন তোমার স্বামী আসবে তখন তাকে বলবে যে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে।
হযরত ইসমাঈল আ. তখন বলেন, হে আমার সহধর্মিনী! জেনে রেখো যে, উনি আমার আব্বা ইবরাহীম আ.।

ইসমাঈল আ. বুঝে নিলেন, ইবরাহীম আ. তাঁকে এই স্ত্রী পরিত্যাগ করার জন্য বলেছেন। তিনি স্ত্রীকে সসম্মানে বিদায় দিলেন ও কষ্ট থেকে মুক্তি দিলেন। অতঃপর ঐ গোত্র থেকেই আরেকজন নারীকে বিবাহ করলেন।

কিছুদিন পর ইবরাহীম আ. পুনরায় মক্কায় আসেন। ঘটনাক্রমে এবারও হযরত ইসমাঈল আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি তাদের জন্যে আহার্যের অনুসন্ধানে বেরিয়েছেন।
পুত্রবধূ বলে, আপনি বসুন। বিশ্রাম করুন ও সামান্য কিছু আহার করুন।
তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের দিন যাপন কীভাবে হচ্ছে এবং তোমাদের অবস্থা কীরূপ?
- আলহামদুলিল্লাহ! আমরা ভালোই আছি এবং আল্লাহর অনুগ্রহে সুখে-স্বচ্ছন্দে আমাদের দিন যাপন হচ্ছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
- তোমাদের কী খাও?
- গোশত।
- তোমরা কী পান করো?
- পানি।
- হে আল্লাহ! আপনি তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন।

(এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাসূল সা. বলেন, যদি ইসমাঈল আ.-এর বাসায় শস্য থাকতো এবং তারা এটা বলতো। তবে ইবরাহীম আ. তাদের জন্যে শস্যেরও বরকত চাইতেন। এখন এই প্রার্থনার বরকতে মক্কাবাসী শুধুমাত্র গোশত ও পানির উপরেই দিনযাপন করতে পারে, অন্য লোক পারে না।)

অতঃপর ইবরাহীম আ. বলেন, আচ্ছা, আমি যাচ্ছি, তোমার স্বামীকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে সে যেন তার চৌকাঠ ঠিক রাখে।

এরপর ইসমাঈল আ. এসে সমস্ত সংবাদ অবগত হন। তিনি বলেন, উনি আমার সম্মানিত আব্বা ছিলেন। আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, আমি যেন তোমাকে পৃথক না করি।

আবার কিছু দিন পর ইবরাহীম আ. সিরিয়া থেকে মক্কায় এলেন। ইসমাঈল আ. তখন যমযম কূপের পাশে একটি পাহাড়ের উপর তীর সোজা করছিলেন। এমতাবস্থায় তাঁদের দেখা হয়। তাঁরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেন।

ইবরাহীম আ. বলেন, হে ইসমাঈল! আমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি নির্দেশ হয়েছে।
- যে নির্দেশ হয়েছে তা পালন করুন আব্বা।
- তোমাকেও আমার সাথে থাকতে হবে।
- আমি প্রস্তুত আছি আব্বা!
- এই স্থানে আল্লাহ তা'আলার একটি ঘর নির্মাণ করতে হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার, কা'বা প্রথমেই ইবরাহীম আ. দ্বারা প্রস্তুত হয়নি। বায়তুল্লাহ প্রথমে ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেন। অতঃপর হযরত আদম আ. পুনর্নিমাণ করেন। তারপর নূহ আ.-এর সময় মহাপ্লাবণে বায়তুল্লাহর প্রাচীর বিনষ্ট হলেও ভিত্তি আগের মতই থেকে যায়।

পরবর্তীতে আল্লাহর হুকুমে একই ভিত্তিভূমিতে ইবরাহীম তা পুনঃনির্মাণ করেন। এই নির্মাণকালে ইবরাহীম আ. মক্কায় এসে বসবাস করেন ও বাপ-বেটা মিলেই কা'বা গৃহ নির্মাণ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তখন থেকে অদ্যাবধি কা'বা গৃহে অবিরত ধারায় হজ্জ ও তাওয়াফ চালু আছে।

আল্লাহ বলেন,
আর যখন আমরা ইবরাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, নামাজে দন্ডায়মানদের জন্য ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য। (সূরা হজ্জ -২৬)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
আর তুমি মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা জারি করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত হতে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং (কুরবানীর) নির্দিষ্ট দিনগুলিতে (১০, ১১, ১২ই যিলহাজ্জ) তাঁর দেওয়া চতুষ্পদ পশু সমূহ যবেহ করার সময় তাদের উপরে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং আহার করাও অভাবী ও দুস্থদেরকে। (সূরা হজ্জ ২৭-২৮)।

উপরোক্ত আয়াতগুলিতে কয়েকটি বিষয় জানা যায়। যেমন- (১) বায়তুল্লাহ ও তার সন্নিকটে কোনরূপ শিরক করা চলবে না (২) এটি স্রেফ তাওয়াফকারী ও আল্লাহর ইবাদতকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হবে (৩) এখানে কেবল মুমিন সম্প্রদায়কে হজ্জের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

কা'বা তৈরি হয়ে গেলে ইবরাহীম আ. মাক্বামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে এবং কোন কোন বর্ণনা মতে আবু কুবায়েস পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে দুই কানে আঙ্গুল দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে উচ্চ কণ্ঠে চারদিকে ফিরে বারবার হজ্জের উক্ত ঘোষণা জারি করেন।

ইবরাহীম আ. উক্ত ঘোষণা আল্লাহ পাক সাথে সাথে বিশ্বের সকল প্রান্তে মানুষের কানে কানে পৌঁছে দেন। ইবনু আব্বাস রা. বলেন, ইবরাহীমী আহবানের জওয়াবই হচ্ছে হাজীদের লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক।

সেদিন থেকেই কা'বাকে কেন্দ্র করে হজ্জ ও কুরবানীর বিধান মানব ইতিহাসে যুক্ত হয়ে গেল। এক কালের চাষাবাদহীন বিজন পাহাড়ী উপত্যকা ইবরাহীম আ.-এর দোয়া বরকতে হয়ে উঠলো বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সম্মিলনস্থল হিসাবে।

যেমন আল্লাহ বলেন,
যখন আমরা কা'বা গৃহকে লোকদের জন্য সম্মিলনস্থল ও নিরাপদস্থলে পরিণত করলাম (আর বললাম,) তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোর স্থানটিকে সালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ করো। অতঃপর আমরা ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো। (বাক্বারাহ ১২৫)।

কা'বা ঘর প্রস্তুত ও হজ্জ্বের ঘোষণা দেওয়ার পর পিতা-পুত্র দুইজনে আল্লাহর কাছে হাত তুললেন এবং কতকগুলো দোয়া করতে থাকলেন।

১. হে আমার রব! এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আর এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ‌ ও আখেরাতকে মানবে তাদেরকে সব রকমের ফলের আহার্য দান করো। -বাক্বারাহ ১২৬

২. হে আমাদের রব! আমাদের এই খিদমত কবুল করে নাও। তুমি সবকিছু শ্রবণকারী ও সবকিছু জ্ঞাত। -বাক্বারাহ ১২৭

৩. হে আমাদের রব! আমাদের দু'জনকে তোমার মুসলিম (নির্দেশের অনুগত) বানিয়ে দাও। আমাদের বংশ থেকে এমন একটি জাতির সৃষ্টি করো যে হবে তোমার মুসলিম। তোমার ইবাদাতের পদ্ধতি আমাদের বলে দাও এবং আমাদের ভুলত্রুটি মাফ করে দাও। তুমি বড়ই ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী। -বাক্বারাহ ১২৮

৪. হে আমাদের রব! তুমি এদের মধ্য থেকেই এদের নিকটে একজন রাসূল প্রেরণ কর, যিনি তাদের নিকটে এসে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী ও দূরদৃষ্টিময়। -বাক্বারাহ ১২৯

৫. হে আমার রব! এ শহরকে নিরাপত্তার শহরে পরিণত করো এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচাও। -ইবরাহিম ৩৫

৬. হে আমার রব! এ মূর্তিগুলো অনেককে ভ্রষ্টতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যে আমার পথে চলবে সে আমার অন্তর্গত আর যে আমার বিপরীত পথ অবলম্বন করবে, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই তুমি ক্ষমাশীল ও মেহেরবান। -ইবরাহিম ৩৬

৭. হে আমাদের রব! আমি একটি তৃণ পানিহীন উপত্যকায় নিজের বংশধরদের একটি অংশকে তোমার পবিত্র গৃহের কাছে এনে বসবাস করিয়েছি। পরওয়ারদিগার! এটা আমি এ জন্য করেছি যে, এরা এখানে নামায কায়েম করবে। কাজেই তুমি লোকদের মনকে এদের প্রতি আকৃষ্ট করো এবং ফলাদি দিয়ে এদের আহারের ব্যবস্থা করো, হয়তো এরা শোকরগুজার হবে। -ইবরাহিম ৩৭

৮. হে আমার রব! আমাকে নামায কায়েমকারী বানাও এবং আমার বংশধরদের থেকেও। হে আমাদের রব আমার দোয়া কবুল করো। -ইবরাহিম ৪০।

ইবরাহীম ও ইসমাঈলের উপরোক্ত দোআগুলো আল্লাহ কবুল করেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে তাদের বংশে চিরকাল একদল মুত্তাকী পরহেযগার মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। তাঁদের পরের সকল নবী তাঁদের বংশধর ছিলেন। কা'বার খাদেম হিসাবেও চিরকাল তাদের বংশের একদল দ্বীনদার লোক সর্বদা নিয়োজিত ছিল। কা'বার খেদমতের কারণেই তাদের সম্মান ও মর্যাদা সারা আরবে এমনকি আরবের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল।

নিজের জন্য, নিজ শহরের জন্য, জনপদের জন্য, নিজের বংশধরদের জন্য এমন সুন্দর দোয়া ইবরাহীম আ. করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা এই দুয়াগুলোকে পছন্দ করেছেন। তাই কুরআনে দু'আগুলোকে উদ্ধৃত করে দিয়েছেন।

আমরা নিজের জন্য, নিজের দেশের জন্য ও নিজের সন্তানদের এই দুয়াগুলো করতে পারি।

ভালো হয় রব্বানা ও রব্বি দিয়ে শুরু হওয়া দোয়াগুলো মুখস্ত করতে পারলে।

#রব্বানা