মসজিদ ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মসজিদ ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৯ ডিসে, ২০২০

ঘুরে এলাম কাঁচের মসজিদ



শিরোনাম দেখে অবাক হতে পারেন। কাঁচ দিয়ে কী মসজিদ তৈরি হয়! আমিও অবাক হয়েছি। এই প্রথম কোনো মসজিদ দেখলাম যার চারপাশের দেয়ালই তৈরি হয়েছে কাঁচ দিয়ে। প্রায় ২২ ফুট লম্বা কাঁচের খণ্ড দিয়ে তৈরি করা হয়েছে কেরানীগঞ্জের দোলেশ্বর জামে মসজিদ। এরকম নান্দনিক মসজিদ খুব কমই দেখেছি। 

মসজিদটি এমন ছিল না। ১৫২ বছরের পুরনো মসজিদ এটি। ১৮৬৮ সালে মসজিদটি স্থাপন করেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের দোলেশ্বর গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। সেসময় পাঁচজন দানশীল ব্যক্তি মসজিদের জন্য জমি দান করেন। দারোগা আমিনউদ্দীন আহম্মদের নেতৃত্বে এই মসজিদের কার্যক্রম শুরু হয়। তাই এটি পরিচিত ছিলো “দারোগা মসজিদ” নামে। তার ছেলে মইজ উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন মসজিদের প্রথম মোতোয়ালি। 

পাঁচজন দানশীল ব্যক্তির একজন হলেন খিদির বক্স। মইজউদ্দিনের পর খিদির বক্সের পরিবার এই মসজিদটির দেখাশোনা করেন। কয়েকজন মানুষের হাত বদল হয়ে পাকিস্তান আমলে এই মসজিদটির দায়িত্ব আসে অধ্যাপক হামিদুর রহমানের কাছে। অধ্যাপক হামিদুর রহমান মসজিদটির সংস্কার করেন। মিনার ও গম্বুজ তৈরি করেন। এটি দুই গম্বুজ বিশিষ্ট সুন্দর মসজিদ। 


হামিদুর রহমান সাহেব আওয়ামী লীগ করতেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে কেরানীগঞ্জের আসন থেকে নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানের প্রতি অনুগত থাকেন। মোস্তফা মহসিন মন্টুর নেতৃত্বে এখানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু হয়। মন্টু ও ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা বেশিরভাগ বাম মুক্তিযোদ্ধা কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা এদিক-সেদিক বোমা ফাটানো জনজীবন বিপর্যস্ত করে তোলে। এপ্রিলে সেনাবাহিনী কেরানীগঞ্জে অভিযান পরিচালনা করে। তারাও সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের হত্যা করে। এই ব্যাপক গন্ডগোলের সময় অধ্যাপক হামিদুর রহমান কেরানীগঞ্জের মানুষের পাশে দাঁড়ান ও দুই বাহিনী থেকেই গণমানুষকে রক্ষার চেষ্টা করেন। 


অধ্যাপক হামিদুর রহমানের মৃত্যুর পর এই মসজিদ পরিচালনার দায়িত্ব আসে তার ছেলে নসরুল হামিদ বিপুর কাছে। নসরুল হামিদ বর্তমানে আওয়ামী এমপি ও জ্বলানী প্রতিমন্ত্রী। তিনি দায়িত্বে আসার পর মসজিদটি সংস্কারের প্রসঙ্গ আসে। মসজিদটির ছাদ বেয়ে পানি পড়ে ও মসজিদে মুসল্লিদের স্থান সংকুলান হয় না। নসরুল হামিদ আগের স্থাপনা রেখেই নতুন মসজিদ করার পরিকল্পনা করেন। কারণ তিনি ঐতিহ্য হারাতে চান নি। নতুন মসজিদ তৈরির জন্য তিনি দায়িত্ব দেন বাংলাদেশের নামকরা স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীকে। 


কাশেফ মাহবুব চৌধুরী বাংলাদেশের সেরা আর্কিটেক্টদের একজন। ২০১৬ সালে তিনি ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারের জন্য আর্কিটেক্টদের সর্বোচ্চ পুরস্কার 'Aga Khan Award for Architecture' লাভ করেন। চট্টগ্রামে থাকাকালে তার আরেকটি স্থাপনা চাঁদগাঁও আবাসিক মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি ছিলাম। 


যাই হোক কাশেফ মাহবুব দোলেশ্বর মসজিদকে পুরো একটি কমপ্লেক্সে পরিণত করে। আগের মসজিদের পূর্ব দিকে থাকা পুকুর ভরাট করে চার বিঘা জমির ওপর নতুন মসজিদ তৈরি করা হয়। নতুন মসজিদের চারদিক থেকে খোলা যায়। তাই বাতাস চলাচলের কারণে গরমকালে এটি বেশ আরামদায়ক হয়। মসজিদের তিনদিকে বিশাল চত্ত্বর ও বসার স্থান আছে। যাতে বাচ্চার দৌড়াদৌড়ি করে ও মুরুব্বিরা বসে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ফলে মসজিদটি এখন একটি সামাজিক মেলবন্ধনের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


মসজিদটি ৩০ টি বৃক্ষাকৃতির কংক্রিটের পিলারের ওপর কংক্রিটের ছাদ। ছাদে একটি ডিম্বাকৃতির গম্বুজ রয়েছে। এটি আমার কাছে সুন্দর লাগেনি। আমার মনে হয় গোলাকার ও বড় গম্বুজ হলেই বেশ মানাতো। তিনি হয়তো ভিন্নতা তৈরি করতে এই পলিসি নিয়েছেন। ছাদটি এমনভাবে তৈরি তাতে মনে হচ্ছে ছাদকে ছয়ভাগে ভাগ করা হয়েছে। দুইটি কংক্রিটের বড় খন্ডের মাঝে গ্লাস দেওয়া হয়েছে যাতে ওপর থেকে আলো মসজিদে প্রবেশ করতে পারে। মসজিদে প্রচুর আলো ও বাতাস প্রবেশ করতে পারে। 


মসজিদটির পুরো কমপ্লেক্স জুড়ে সর্বত্র লালের ছড়াছড়ি। লাল টাইলসে মুসল্লিদের সিজদাহ বেশ পবিত্র আবহ তৈরি করে। প্রায় ১৬০০ মানুষ একসাথে সেখানে নামাজ পড়তে পারে। লাল রং যারা অপছন্দ করেন তাদের জন্য এটি বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে। তবে আমার কাছে বেশ মনোহর মনে হয়েছে। এর কারণ হিসেবে কাশেফ মাহবুব বলেছেন আগের মসজিদটি লাল রং-এর থাকায় তিনি ঐতিহ্য হিসেবে লালকে বেইস করেছেন। পুরাতন মসজিদ এখন ব্যবহার হচ্ছে না। তবে পরিকল্পনা রয়েছে এটিকে লাইব্রেরিতে পরিণত করা হবে। 


মসজিদ তিনদিকে অর্থাৎ পূর্ব দিক বাদে বাকী সব দিকে কৃত্রিম লেক ও ফোয়ারা তৈরি করা আছে। তাই উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দরজা খোলা গেলেও মুসল্লি প্রবেশ করতে পারে কেবল পূর্ব দিক থেকে। এই মসজিদে একটি দারুণ বিষয় ছিল এর সাউন্ড সিস্টেম। সাধারণত মসজিদের সাউন্ড সিস্টেম ভালো হয় না। ইমামের সুন্দর তিলওয়াত সাউন্ড সিস্টেমের বদৌলতে মন ছুঁয়ে গেছে। মসজিদের পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে পারিবারিক কবরস্থান। সেটাও সুন্দর করে গোছানো হয়েছে। পশ্চিম-উত্তর দিকে রয়েছে সুন্দর ওয়াশরুম। মন ভালো করে দেওয়ার মতো একটি স্থাপনা দোলেশ্বর জামে মসজিদ। সময় থাকলে একটি বিকাল ঘুরে আসুন। শান্তি পাবেন। 


রাত নামলে মসজিদ নতুন রূপ ধারণ করে। সেটা আরো মায়াবী। মসজিদের ভেতরে ও বাইরের চত্ত্বরের লাইটিং একটি স্বপ্নময় জগত তৈরি করে। এমন সুন্দরে আপনার ঘন্টা পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতে একটুও বিরক্তি আসবে না। 


মসজিদ থেকে বের হয়ে ঘাটের কাছে পাবেন প্রচুর স্ট্রিট ফুডের দোকান। আমার মতো ভোজন রসিক হলে খাবারের মতো হালাল বিনোদন থেকে বঞ্চিত হবেন না আশা করি। 


যেভাবে যাবেন... 
সাধারণত কোনো স্থানে যাওয়ার জন্য এখন লোকেশন বলার দরকার হয় না। এখন গুগল ম্যাপ সবার হাতে হাতে। তবে এই মসজিদের জন্য সাজেশন লাগবে। নইলে গুগল ম্যাপ আপনাকে পুরো কেরানীগঞ্জ ঘুরিয়ে মারবে। ঢাকার যে কোন স্থান থেকে পোস্তগোলা ব্রিজের গোড়ায় অর্থাৎ জুরাইন রেল গেইটে চলে আসবেন। যারা এই স্থানটি চিনছেন না তাদের জন্য বলছি, যাত্রাবাড়ি থেকে জুরাইন রেল গেইট মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ যাত্রাবাড়ি এসে রিকশায় ২০/৩০ টাকা দিয়ে জুরাইন রেল গেইটে আসতে পারেন। 


জুরাইন রেল গেইট থেকে রিকশা করে দোলেশ্বর ঘাটে চলে আসবেন। ৩০/৪০ টাকা নিবে। দোলেশ্বর ঘাটে ২ টাকা ঘাট চার্জ দিবেন। তারপর ট্রলারে করে বুড়িগঙ্গার ওপারে অর্থাৎ কেরানীগঞ্জের দোলেশ্বরে যাবেন। ট্রলার ভাড়াও জনপ্রতি দুই টাকা। ট্রলার ছাড়া ডিঙ্গি নৌকা আছে যেখানে ৭/৮ জন বসা যায়। ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে পার হতে চাইলে বিশ টাকা দিতে হবে। দোলেশ্বরে নেমে মাত্র ১৫০ মিটার হাঁটলেই মসজিদ।


আর কেউ যদি ব্যক্তিগত পরিবহনে আসেন তবে দোলেশ্বর ঘাটে আপনার যানবাহন রেখে তারপর নদী পার হতে পারেন।

১৯ অক্টো, ২০২০

মানুষের আবাদ নেই অথচ নান্দনিক মসজিদের আবাদ

 

সময়ের সাথে সাথে ব্যস্ততা বেড়ে যাচ্ছে। সাংগঠনিক, পারিবারিক ও পেশাগত ব্যস্ততা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। তাই শখের কাজগুলো কমে যাচ্ছে। আগে প্রায়ই চেষ্টা করতাম নতুন নতুন মসজিদ ভ্রমণ করতে। অনেকদিন সেই ভ্রমণ করা সম্ভব হয়নি। তবে রিসেন্টলি একটি দারুণ মসজিদে গেলাম। প্রাণ জুড়িয়ে গেল।


অফিসের এক কলিগ বললেন, একটা সুন্দর মসজিদের সন্ধান পেয়েছি। চলুন। হুটহাট বেরিয়ে পড়লাম। ঢাকা থেকে বেশি দূরে নয়। এটা কেরানিগঞ্জে। বুড়িগঙ্গার ওপারে। পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল রাস্তার পাশে। বর্তমান সরকার পদ্মা সেতুর জন্য একটি কানেক্টিং রোড তৈরি করেছে মাওয়া পর্যন্ত, যা ঢাকা মাওয়া এক্সপ্রেস হাইওয়ে নামে পরিচিত। আর এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রাস্তা। প্রতি কিলোমিটারে ১১৫ কোটি টাকা খরচ করেছে সরকার। রাস্তাটা দারুণ, কোনো সন্দেহ নাই। তবে ব্যয়বহুল হবার পেছনে যতটা দায়ী এর অবকাঠামো তার চাইতে বেশি দায়ী দুর্নীতি।


যাই হোক আজকে এটা আমাদের আলোচিত বিষয় নয়। মসজিদটির অবস্থান হলো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের উল্টো পাশে। সেখানে কেরানিগঞ্জ সাউথ টাউন নামে একটি আবাসিক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন এক ব্যবসায়ি। ভবিষ্যতে ঢাকা এদিকে সম্প্রসারিত হবে এই আশায় এমন বড় আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। কারাগার ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এর চাহিদা বাড়বেই।


মসজিদটির একটি আলাদা বিশেষত্ব আছে। সাধারণত মসজিদ নির্মিত হয় মুসল্লিদের প্রয়োজনের আলোকে। অর্থাৎ আগে মানুষের আবাদ হয়, পরে মসজিদের আবাদ। কিন্তু এখানে হয়েছে উল্টো। কেরানিগঞ্জ সাউথ টাউনে মানুষের আবাদ এখনো হয়নি, তবে মসজিদের আবাদ হয়ে গেছে। আবাসন প্রকল্পটির মালিক মোস্তফা কামাল মঈনুদ্দিন বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আগেই পরিকল্পনা অনুসারে সুন্দর একটি মসজিদ স্থাপন করেছেন। ফলে অসাধারণ মসজিদটির উসিলায় তার আবাসন প্রকল্পটি পরিচিত হয়ে উঠছে।


কেরানিগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর সাউথ টাউন জামে মসজিদ। এর মাধ্যমে নয়াভিরাম সুদৃশ্য এক মসজিদ যোগ হলো আমাদের দেশে। সাউথ টাউনের এই মসজিদটি তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর। আধ বিঘা জমির ওপর মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। চারপাশে খোলামেলা জায়গার মাঝে মসজিদটি তার সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো জনবসতি গড়ে ওঠেনি। তাই মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজির সংখ্যা নাই বললেই চলে। তবে মসজিদের নান্দনিকতার খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই এটি দেখতে আসেন এবং নামাজ পড়েন।


একতলা মসজিদটির স্থাপত্যকলা নকল করা হয়েছে ঢাকা ভার্সিটির কার্জন হল থেকে। মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় সাড়ে ৬০০ লোক জামাতে নামাজ পড়তে পারেন। মসজিদটি তৈরিতে প্রায় ৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এতে প্রধান ফটক আছে তিনটি। দুই পাশে আছে আরও দুটি দরজা। চারপাশে প্রচুর জানালা তৈরি করে আলো ঢোকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুই স্তরের জানালার ফাঁক গলে আসা প্রকৃতির আলোয় ভেতরে চমৎকার এক পরিবেশ তৈরি হয়। জুড়িয়ে যায় চোখ। স্থপতির নন্দনভাবনার শৈলী ফুটে আছে গম্বুজের ভেতরের অংশেও। দিনের আলো ঢোকার ব্যবস্থা আছে সেখানেও।


এর পাশেই মসজিদের ইমাম ও খাদেমদের থাকার জন্যে আলাদা একটি ভবন করা হয়েছে। এই এলাকায় এলে প্রকল্পের ভেতরে মিলবে কাশবন। বিকেলে দেখা যাবে সূর্যাস্ত। ঢাকার অদূরেই এতো সুন্দর মনোরম পরিবেশ রয়েছে তা সেখানে না গেলে বোঝা যাবে না। সন্ধ্যার দিকে মসজিদের চারপাশের লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়, তখন আরেক নান্দনিক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মনে তখন মসজিদটি তার রূপ আরো মেলে ধরে।


কীভাবে যাবেন?

১. যদি আপনার নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা থাকে, তবে গুগল ম্যাপে যাবেন। মসজিদের নাম লিখে সার্চ করবেন। ম্যাপের পথ ধরে চলে যাবেন।

অথবা,

২. যারা কেন্দ্রীয় কারাগার চিনেন তারা সেখানে যাবেন। রাস্তা পার হয়ে দশ-পনের মিনিট হাঁটার পথ। কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দিবে। অটোরিকশা ব্যবহার করেও যেতে পারেন।

অথবা,

৩. ঢাকার যে কোনো স্থান থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে পোস্তগোলা ব্রিজ আসবেন। পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে সিএনজি নিয়ে সাউথ টাউন মসিজিদে চলে যেতে পারবেন। সর্বোচ্চ ভাড়া নিবে ১৫০ টাকা। এটা ঢাকা সিটির বাইরে ঢাকা জেলায়। তাই সিটির সিএনজিগুলো পোস্তগোলা ব্রিজ পার হতে পারে না।

৩১ ডিসে, ২০১৯

গাজী খান জাহানের ক্যান্টনমেন্টে একদিন



বন্ধুবর মঈন সাহেবের বিয়ে। খুলনায় যেতেই হবে। তার একদিন পর আবার আরেক কলিগের বিয়ে সাতক্ষীরায়। সেখানেও যেতে হবে। এদিকে পকেট প্রায় ফাঁকা। কী যে করি! সুন্দরবনে যাবো অনেক দিন ধরেই ভাবছি। তবে নানান প্রতিবন্ধকতায় সুন্দরবনে যাওয়া হয়নি। যাই হোক পকেটের অংকের সাথে জরুরী প্রয়োজনের হিসেব কোনদিনেই মিলে না।

অবশেষে প্ল্যান করলাম খুলনা-সাতক্ষীরা থেকে ঘুরে আসে। সাথে বাগেরহাট ও সুন্দরবনও একনজর দেখে আসি।

একজন দুজন করে সাতজন জুটে গেলো। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ফোরকাস্ট করলো আগামী কয়েকদিন শীত বেড়ে যাবে, কুয়াশা হবে প্রচুর, শৈত্যপ্রবাহ সাথে বৃষ্টিও থাকবে।

রাতে রওনা হলাম। পরদিন দুপুরে বিয়ে। যেহেতু আবহাওয়া সুবিধের না, ভেবেছি আমাদের পৌঁছাতে সকাল গড়িয়ে যাবে। বাসে উঠে গল্প-গুজব শেষ করে যেই চোখটা একটু লেগে আসলো তখনই মাওয়া ঘাটে আমাদের বাস থকে নামিয়ে ফেরিতে উঠানো হলো। ফেরিতে বসা পরের কথা দাঁড়ানোরও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। অবশেষে পদ্মা নদীর ঐ পাড়ে পৌঁছলাম।

ভোগান্তি ছাড়াই ঐ পাড়ে দাঁড়ানো কানেক্টিং বাস পেয়ে গেলাম। বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লাম। এই সময় এক সহযাত্রীর হাঁক ডাকে ঘুম টুটে গেলো। সে আমাদের সবাইকে চিৎকার করে জানালো গাড়ি খুলনা শহর পার হয়ে চলে যাচ্ছে। তখনো সুবহে সাদিকও হয়নি। শিরোমনি বাজারে নামলাম। সেখান থেকে আবার সোনাডাঙায় ফেরত এলাম। ঘুমে থাকার কারণে কিছু টাকা খরচ হলো। কিন্তু খরচেই চাইতেই যেটা বেশি গায়ে লেগেছে তা হলো ঠান্ডা। সোনাডাঙা বাস স্টেশনে ফেরত আসতে গিয়ে জমে গেছি।

নামাজ ও নাস্তা শেষ করে রওনা হলাম বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদের উদ্দেশ্যে। প্রথমে গেলাম গাজী খান জাহান আলীর মাজারে।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যেসকল ওলী-আউলিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে স্মরণীয় একটি নাম হযরত খান জাহান আলী (র)। একাধারে তিনি ছিলেন একজন যোদ্ধা, সাধক, ধর্ম প্রচারক ও সুশাসক। জীবনের একটা বিশাল সময় তিনি ব্যয় করেন ইসলামের সেবায়। দক্ষিণবঙ্গে খান জাহান আলী খলিফাতাবাদ নামে ইসলামী শাসন চালু করেন। খান জাহান আলীর প্রকৃত জন্ম তারিখ জানা যায় না। তিনি প্রায় ৪০ বছর দক্ষিণবঙ্গে ইসলাম প্রচার ও শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

হজরত খান জাহান আলী (রহ.) ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আকবর খাঁ এবং মাতার নাম আম্বিয়া বিবি। খান জাহান আলীর প্রাথমিক শিক্ষা তার পিতার কাছে শুরু হলেও তিনি তার মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন দিল্লির বিখ্যাত অলি ও কামেল পীর শাহ নেয়ামত উল্লাহর কাছে। তিনি কোরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞানার্জন করেন।

খান জাহান আলী ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে তুঘলক সেনাবাহিনীতে সেনাপতির পদে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি জৈনপুর প্রদেশের গভর্ণর পদে যোগ দেন। পরবর্তী জীবনে নানা ধাপ পেরিয়ে জৈনপুর থেকে প্রচুর অর্থসম্পদ এবং প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাংলাদেশে আগমন করেন। তার এই বাহিনীতে কয়েকজন সূফি ও প্রকৌশলী ছিল। তিনি তদানীন্তন বাংলার রাজধানীর দিকে না যেয়ে সুন্দরবন অঞ্চলের দিকে আসেন এবং এখানে ইসলামী শাসন কায়েম করেন।

তিনি এই বৃহৎ অঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেন। নোনা পানির এই অঞ্চলে মিঠা পানির ব্যবস্থা করেন অসংখ্য বিশাল বিশাল দীঘি খনন করে, যার অনেকই খাঞ্জালির দীঘি নামে পরিচিত। অনেক রাস্তা-ঘাট, বাজার, সরাইখানা (হোটেল) নির্মাণ করেন। তার নির্মিত রাস্তা খাঞ্জালির জাঙ্গাল নামে অভিহিত। তিনি এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা ও খানকাহ স্থাপন করেন।
খান জাহান আলী (রহ.) এই অঞ্চলে পাথরের তৈরি মসজিদ নির্মাণ করেন। দূর-দূরান্ত থেকে পাথর নিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে অনেক কিংবদন্তি এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে এখনও শোনা যায়।

খান জাহান আলীর আগমনকালে দক্ষিণবঙ্গের বেশিরভাগ জায়গা ছিল বনাঞ্চল। বন-জঙ্গল সাফ করে তিনি ও তার অনুসারীরা দক্ষিণবঙ্গকে বসবাসের উপযোগী করে তোলেন। পুরো দক্ষিণাঞ্চল একরকম তার রাজ্য ছিল। কোনো বাধা ছাড়াই এই এলাকা তিনি শাসন করতে থাকেন। জনগণও তার নেতৃত্ব মেনে নেয়। তবে আঞ্চলিক শাসক হলেও প্রকট শাসকসুলভ জীবনযাপন কখনোই করেননি খান জাহান আলী। স্বাধীন বাদশাহদের মতো তিনি চলতেন না। এমনকি নিজের নামে কোনো মুদ্রার প্রচলনও তিনি করেননি। এছাড়া গৌড়ের সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের সময় তার সনদ নিয়ে দক্ষিণবঙ্গ শাসন করেছেন তিনি। খান জাহান আলীর মৃত্যুর পরে তার প্রতিষ্ঠিত খলিফাতাবাদেই গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক টাকশাল। পরবর্তী ৪০/৫০ বছর এই টাকশাল থেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মুদ্রা তৈরি হতো। বিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদ ছিল তার দরবারগৃহ। ষাট গম্বুজ মসজিদ হতে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিল খান জাহান আলীর বসতবাড়ি। এখন সেটির কোনো অস্তিত্বই নেই, সেটি আসলেই দুর্বল স্থাপনা ছিলো অথচ তার পাবলিক স্থাপনাগুলোর ভিত ছিলো শক্তিশালী। যেগুলো এখনো বর্তমান।

খান জাহান আলী তার দীর্ঘ শাসনামলে এই অঞ্চলের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। প্রায় ২০/২৫টি গ্রাম নিয়ে তার রাজধানী খলিফাতাবাদ গড়ে উঠেছিল। এখানে তিনি থানা, কাচারি, বিভিন্ন সরকারী দফতর, বিচারালয়, সেনানিবাস ইত্যাদি নির্মাণ করেন। প্রশাসনিক সুবিধার্থে দক্ষিণবঙ্গকে তিনি ভাগ করেন কয়েকটি ভাগে, ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন সুশাসন। তার এই ছোটখাট রাজ্যে তিনি কায়েম করেন ইসলামী হুকুমত। খলিফাতাবাদ বা বাগেরহাট এলাকায় ইসলাম প্রচারের সময় স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দুদের বাধার সম্মুখীন হন খান জাহান আলী। তাদের বিরোধিতার কারণে ঐ এলাকার রণবিজয়পুর, ফতেহপুর, পিলঙ্গজ প্রভৃতি স্থানে হিন্দুদের সাথে যুদ্ধ হয় মুসলিমদের। খান জাহান আলী তাদের পর্যুদস্ত করে নিজের শাসনক্ষমতা কায়েম করতে সমর্থ হন।

প্রায় ৪০ বছর স্বাচ্ছন্দ্যে দক্ষিণবঙ্গে রাজত্ব করেন খান জাহান আলী। এই পুরো এলাকায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন এই মহান সাধক। তাঁর সুশাসন ও বিনয়ী স্বভাবে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে এই এলাকার মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। জীবনের শেষ দিনগুলো দরগায় বসে আল্লাহর ধ্যানে কাটিয়ে দিতেন তিনি। অনেক মূল্যবান বাণী তিনি দিয়ে যান নিজের প্রজ্ঞা ও সাধনালব্ধ জ্ঞান থেকে। এই মহান শাসক ও ধর্ম প্রচারক ৮৬৩ হিজরীর ২৬ জিলহজ্জ, ইংরেজি ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

খান জাহান আলীর মাজার সংশ্লিষ্ট বিশাল দিঘী যা ঠাকুরদিঘী নামে পরিচিত সেখানে খান জাহান একজোড়া কুমির ছেড়েছিলেন। কথিত আছে এই কুমির জোড়া তার বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেই কুমিরের বংশধররা সাতশ বছর ধরে কালাপাহাড় এবং ধলাপাহাড় নামে ছিল। তাদের সর্বশেষ বংশধর ২০১৫ সালে মারা গিয়েছে। এই কুমিরগুলোর ব্যতিক্রম হলো এরা কখনোই হিংস্রতা দেখায়নি। একেবারেই শান্ত ছিলো। মানুষ তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতো। এখনো সেই দিঘীতে কুমির আছে। তাদের পরে এনে ছাড়া হয়েছে এখানে। এরা শুরুতে কিছুটা হিংস্র থাকলেও এখন শান্ত আচরণ করে। তবে তারা আগের কুমিরদের মতো মানুষবান্ধব নয়।

গাজী খান জাহান আলী রহ. -এর মাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরেই আছে তাঁর অফিস ও ক্যান্টনমেন্ট। এখান থেকেই তিনি খলিফতাবাদের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। আমরা মাজার পরিদর্শন করে ওনার অফিস পরিদর্শনের জন্য বের হলাম। যা ষাট গম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত। দশটাকা করে ভাড়া দিয়ে ষাট গম্বুজে যাওয়ার জন্য ব্যাটারি চালিত টমটম আছে। যদিও ষাট গম্বুজ মসজিদ বলা হয় তবে এর গম্বুজ সংখ্যা ৮১ টি। মসজিদের ছাদে ৭৭ টি গম্বুজ। চারটি মিনারের উপর চারটি। সবমিলিয়ে ৮১ টি।

আভিধানিকভাবে ‘ষাটগম্বুজ’ অর্থ হলো ষাটটি গম্বুজ সম্বলিত। তবে সাধারণভাবে মসজিদটিতে একাশিটি গম্বুজ পরিলক্ষিত হয়। নামকরণের ব্যাপারে দুটি ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত সাতটি চৌচালা ভল্ট মসজিদটিকে ‘সাতগম্বুজ’ মসজিদ হিসেবে পরিচিত করে, কিন্তু সময় পরিক্রমায় এই ‘সাতগম্বুজ’ই ‘ষাটগম্বুজ’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুসারে, মসজিদের বিশাল গম্বুজ-ছাদের ভারবহনকারী মসজিদ অভ্যন্তরের ষাটটি স্তম্ভ সম্ভবত একে ‘ষাট খামবাজ’ (খামবাজ অর্থ স্তম্ভ) হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে। এটি অসম্ভব নয় যে, এই ‘খামবাজ’ শব্দটিই পরবর্তীকালে বিকৃতরূপে ‘গম্বুজ’-এ পরিণত হয়ে মসজিদটিকে ষাটগম্বুজ হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। শেষোক্ত ব্যাখ্যাটি সম্ভবত বেশি গ্রহণযোগ্য। নামকরণের এই ব্যাখ্যা বাংলাপিডিয়ার।

খানজাহান (রহ.)-এর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ষাট গম্বুজ মসজিদ। পিরোজপুর-রূপসা মহাসড়কের পাশে খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরীফ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে সুন্দরঘোনা গ্রামে মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে পাকা সড়ক, পশ্চিম পাশে ঐতিহাসিক ঘোড়াদীঘি। এই দিঘীটির আয়তন প্রায় ৪০ একর। কথিত আছে এই দিঘী খনন করার পর বহুদিন এখানে পানি উঠে নি। এরপর খান জাহান আলী ঘোড়ার পিঠে আরোহন করে দিঘীতে নামেন এবং পানিপূর্ণ হওয়ার জন্য দোয়া করেন। এরপর পানি উঠতে থাকে। একারণে এই দিঘীর নাম ঘোড়াদিঘী।

ষাট গম্বুজের স্থাপত্য কৌশল আর লাল পোড়া মাটির উপর সুনিপুণ লতাপাতার অলঙ্করণে নানারূপে কারুকার্যখচিত মসজিদের ভেতর-বাইরে অভাবনীয় সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটেছে। বাংলাদেশে এতবড় ঐতিহাসিক মসজিদ আর নেই। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৬০ ফুট এবং প্রস্থ ১০৮ ফুট। আর এর উচ্চতা ২২ ফুট। এর দেয়াল প্রায় ৯ ফুট পুরু। পূর্ব-পশ্চিমে ৭টা করে ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে মাঝের এক সারিতে ৭ গম্বুজের উপরিভাগ চৌকোণা, বাকি ৭০টির উপরিভাগ গোলাকার। মসজিদের ভেতরে পূর্ব-পশ্চিমে ১০টি সারিতে ৬টা করে মোট ৬০টি স্তম্ভ রয়েছে। স্থানীয় লবণাক্ত জলবায়ুর প্রভাবে যাতে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে কারণে মসজিদের স্তম্ভের নিচে ৪ ফুট পর্যন্ত চারপাশে পাথরের আন্তরণ দেয়া হয়েছে। এসব পাথর বাইরে থেকে আমদানি করা হয়েছিল। মসজিদের ভেতর এমন জ্যামিতিক পদ্ধতিতে স্তম্ভগুলো বিন্যাস করা হয়েছে যে ইমাম সাহেবের দৃষ্টি মসজিদের যে কোনো প্রান্ত পর্যন্ত কোনো বাধা ছাড়াই পৌঁছতে পারে।

মসজিদে দরজা আছে মোট ২৫টি। এর একটি দরজা রয়েছে পশ্চিম দিকে, যা সম্ভবত জানাজার নামাজ পড়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। ছাদ থেকে প্রায় ১৩ ফুট উঁচু মসজিদের চার কোণে চারটি মিনার আছে। সামনের মিনার দুইটির ভেতর দিয়ে ওপরে যাওয়ার জন্য ঘোরানো সিঁড়িপথ রয়েছে। এ দুইটি মিনারের ভেতরে খিলানের সাহায্যে নির্মিত একটি করে ছোট কক্ষ রয়েছে। এ কক্ষ দুইটির নাম ‘আন্ধার মানিক’ ও ‘শলক মালিক’। মিনার দুইটি আজান দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো বলে মনে হয় এবং একইসাথে এসব মিনারে চড়ে খানজাহানের সৈন্যরা পাহারা দিতেন, বহিঃশত্রুর চলাচলের ওপর নজর রাখতেন।

খানজাহান (রহ.) জৌনপুরের দক্ষ নির্মাণ শিল্পী এনে এই সুবিশাল সুরম্য মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে কত সময় এবং কত লোক এর নির্মাণ কাজ করেছেন তা জানা যায়নি। এ মসজিদে প্রায় আড়াই হাজার লোক এক সঙ্গে নামায পড়তে পারে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে অযত্নে অবহেলায় মসজিদটি জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। ১৯০৪ সালে ইংরেজ শাসনামলে পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এটি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। এরপর মসজিদটিকে কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদের চারপাশে সীমানা প্রাচীর রয়েছে। পূর্ব দিকে ছিল প্রবেশ তোরণ। তোরণের দু'পাশের দু'টি কক্ষ ছিল কিন্তু এখন তার কোন অস্তিত্ব নেই।

এটি শুধু মসজিদ ছিল না, খানজাহান (রহ.) এর দরবার ও সেনা ছাউনি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এখান থেকেই তৎকালীন দক্ষিণাঞ্চলীয় স্বাধীন-সার্বভৌম ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র হাবেলী পরগণা বা খলিফাতাবাদ রাষ্ট্র পরিচালনা করা হতো। বর্তমান ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গণের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো জাদুঘর। ১৯৯৩ সালে এখানে জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। জাদুঘরে ২৮টি গ্যালারি রয়েছে। এখানে খানজাহান (রহ.)- এর আমলের শতাধিক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।

আমাদের দুপুরে মঈন সাহেবের বিয়ের দাওয়াত ছিলো। তাই এখানে বেশি সময় অতিবাহিত করার সুযোগ পাইনি। একটার মধ্যেই খুলনায় ফেরার তাগিদ থেকে অনুপম এই নিদর্শন থেকে বিদায় নিই। ষাট গম্বুজের ঠিক উল্টোপাশেই রয়েছে সিঙ্গাইর মসজিদ। ধারণা করা হয় এটি মুঘল আমলে তৈরি করা হয়। ষাট গম্বুজের এতো কাছে আরেকটি ছোট মসজিদের কেন প্রয়োজন হয়েছিলো এই উত্তর আমি কারো কাছ থেকে পাইনি।

ষাটগম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মধ্যযুগীয় এই মসজিদটি অবস্থিত। এটি একগম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ। বর্গাকার এক গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদ সম্পূর্ণরূপে ইটের তৈরি। বাইরের পরিমাপ ১২.১৯ মি। এর দেওয়ালগুলি প্রায় ২.১৩ মি পুরু। মসজিদ ইমারতটির পূর্বদিকে তিনটি খিলানপথ আছে, আর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে আছে একটি করে। পূর্বদিকের মাঝের প্রবেশপথটি পার্শ্বদেশে অবস্থিত প্রবেশপথের চেয়ে বড়। কিবলা দেওয়ালের ভেতরে আছে খাজকৃত খিলান মিহরাব যার বাইরের দিকে রয়েছে একটি আয়তাকার।

সিঙ্গাইর মসজিদ দেখে এসে বাসে করে আবার খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ইতোমধ্যে আকাশের অবস্থা পাল্টে গেলো। রোদযুক্ত আকাশ কুয়াশাছন্ন হয়ে পড়লো। যতই খুলনার দিকে আগাচ্ছি ততই শীত জেঁকে বসা শুরু করেছে। সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ডের পাশেই আমরা হোটেল খুঁজতে থাকলাম। খুলনায় হোটেল ভাড়া চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের তুলনায় অনেক সস্তা। আমরা একটি বড় কক্ষ যেখানে তিনটি ডাবল বেড সেট করা আছে এমন একটি কক্ষ মাত্র ১৫০০ টাকায় ভাড়া করলাম। অর্থাৎ সাত জন থাকলাম ১৫০০ টাকায়। হোটেলের সার্ভিসও খারাপ ছিলো না।

হোটেলে ফ্রেশ হয়ে ও ব্যাগ রেখে দুটোর সময় গেলাম কমিউনিটি সেন্টারে। সেখানে আরো অনেক পরিচিত মানুষের সাথে দেখা হলো। বরের সাথে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে পেট পুরে খেলাম। খাওয়া শেষে বের হলাম চা খাবো বলে। খুলনায় একটা বিষয় আমাকে অবাক করেছে। এখানে হোটেলগুলোতে চা পাওয়া যায় না। একটি হোটেলে চা চেয়েছি। ম্যানেজার বললেন এটা তো হোটেল, চা দোকান না। চা পাওয়া যায় টং দোকানগুলোতে।

টং দোকানে চা খাওয়ার পর আমার সহযাত্রীরা শহর ঘুরেছেন। আর আমি আইলসা মানুষ। হোটেলে এসে ঘুম দিয়েছি। এই শীতের মধ্যে শহরে ঘোরাঘুরি আমার পছন্দ হয়নি।

৩১ জুল, ২০১৯

আগা খান পুরস্কার পাওয়া একমাত্র মসজিদের গল্প



ভিডিওটা দেখে আমি অবাকই হয়েছি। সেটা যতটা না মসজিদের স্থাপত্যনকশা দেখে তার চাইতে বেশি এর স্থপতিকে দেখে। বলছি ঢাকার দক্ষিণখানের একটি মসজিদের কথা। নাম বাইতুর রউফ। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম। অবাক হওয়ার কারণ দু'টি। প্রথমত বাংলাদেশে মসজিদ পরিচালনায় মহিলাদের দেখা যায় না। মহিলা আর্কিটেক্ট তো আরো দূরের কথা। দ্বিতীয়ত মেরিনা তাবাসসুমের চাল-চলন পুরোটাই ওয়েস্টার্ন। ইসলামিক তো দূরের ব্যাপার, সাধারণ বাঙালি মহিলার মতোও না। অথচ তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত হলো অসাধারণ এক মসজিদ।

হপ্তাখানেক আগে একদিন সকালে একটি নোটিফিকেশনের সূত্র ধরে বাইতুর রউফ মসজিদের ভিডিওটি আমার সামনে আসে। গত বছর মসজিদ ভ্রমণের একটি পরিকল্পনা মাথায় আসে। চেষ্টা করতাম শুক্রবার অফিস বন্ধের সুযোগটা কাজে লাগাতে। কিন্তু এই বছর শুক্রবারগুলোতেই যেনো বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। সঙ্গী সাথীরা তাড়া দেয়, কিন্তু সময় সুযোগ হয়ে উঠে না। শুধু আমিই যে ব্যস্ত তা নয় যাদের সাথে যাবো তারাওতো কম ব্যস্ত নয়।

মসজিদের প্রোমো ভিডিও দেখার পর চিন্তা করলাম শুক্রবারের জন্য বসে থাকা উচিত হবে না। বরং সেদিনই বিকেলে রওনা হয়ে যাবো। চিন্তা অনুসারে সঙ্গী সাথীদের মেসেজ পাঠানো শুরু করি। মাত্র একজনকে পাওয়া গেলো। লাঞ্চের পর অফিসকে নিজ দায়িত্বে ছুটি দিয়ে রওনা হয়ে গেলাম বাইতুর রউফ মসজিদের উদ্দেশ্যে। অবশ্য এর আগে সারাদিনের কাজ গুছিয়ে নিয়েছিলাম।



মসজিদ বলতেই আমরা বুঝি আর্চ, গম্বুজ, মিনার ইত্যাদি। এগুলো ছাড়া অসাধারণ মসজিদ হতে পারে আমার ধারণা ছিলো না। সুলতানি আমলের স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা আর সঙ্গে মেরিনার নিজস্ব স্বকীয়তা এ দুয়ে মিলে তৈরি মসজিদটি। ৭৫৪ বর্গমিটারের ‘বাইতুর রউফ’ মসজিদটির বিশেষত্ব হলো পরিচিত আর্চ, ডোম বা মিনার নেই। কেননা ইট এখানে প্রধান কাঠামো ধারক নয়, কাঠামোটি চতুর্দিকে আটটি কলামের ওপর বসানো।

সূর্যের আলো ছাড়াও পর্যাপ্ত দিবালোক নিশ্চিত করতে ৪টি আলোক স্থল (light courts) আছে। ৮টি পেরিফেরাল কলামের উপর ভর করে মসজিদটি দাঁড়িয়ে। ছাদ থেকে এলোপাতাড়ি ও বৃত্তাকার দিনের আলো প্রবেশ পথ মেঝেতে অসাধারণ ও নান্দনিক প্যাটার্ন তৈরি করে।

মসজিদের প্ল্যানটিতে একটি স্কোয়ারের ভেতর একটি সার্কেল, তার ভেতর আরেকটি ৫০ ফুট X ৫০ ফুটের স্কোয়ার। আবার এ কক্ষটির চতুর্দিকে উপর থেকে আনা হয়েছে সূর্যের আলো। অনেকটা দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের অবস্থান পরিবর্তের সঙ্গে আলোর তীব্রতা আর বিচ্ছুরণ যেন খেলা করে ইটের বৃত্তাকার প্রকোষ্ঠে।



মসজিদের বাইরের দেয়ালে ব্যবহার করেছেন ইটের জালি, যেন বাতাস ভেতরে ঢুকতে পারে। প্রার্থনা কক্ষটির ফ্লোরে ব্যবহার করেছেন পাথরের গুঁড়ার মোজাইক, কাচের বিভাজন রেখার সমন্বয়ে। স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এ মসজিদে যেমন ঝকঝকে রোদের দেখা মেলে, তেমনি ঝম ঝম বৃষ্টি এখানে দারুণ বর্ষার আবহ তৈরি হয়। বিশেষ বাতাস চলাচল ব্যবস্থা এখানকার তাপমাত্রা রাখে নিয়ন্ত্রিত। প্রাকৃতিক আলোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকায় দিনে বৈদ্যুতিক আলোর প্রয়োজন হয় না। বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার জন্য রয়েছে সুন্দর ড্রেনেজ সিস্টেম।

শুধু কি দিনের আলো! নক্ষত্র সমৃদ্ধ চাঁদের আলো থেকেও বঞ্চিত হননা এখানকার মুসল্লিরা। এই মসজিদ শুধুই স্থাপনা নয়। প্রকৃতিক পরিবেশ ও আধুনিক স্থাপত্যকলা মিলে এক অসাধারণ আবহ। এমন পরিবেশে মহান প্রভুর ইবাদত সত্যিই মনকে প্রশান্ত করে। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ইট আর কংক্রিটের ভবনে প্রাণের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।



বাইতুর রউফ মসজিদের গল্পটা কীভাবে শুরু হয়েছে এই নিয়ে কথা আমরা সরাসরি স্থপতি মেরিনা থেকেই শুনি। ২০১৮ সালে ৫ নভেম্বর প্রথম আলোতে তিনি বলেন,

"বাইতুর রউফ মসজিদের গল্পের শুরু ২০০৫ সালে। আমার নানি তখন খুবই অসুস্থ। একদিন আমাকে চায়ের দাওয়াত দিলেন। দুই মেয়েকে পরপর হারিয়ে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। ২০০২ সালে মা মারা যান, পরের বছর এক খালা। আর নানা মারা গেছেন ১৯৭১ সালে। সাত মেয়ে, তিন ছেলেকে প্রায় একা হাতেই মানুষ করেছেন নানি।

তুরাগ নদের ধারে নানার কিছু জমি ছিল। নানি বললেন, এলাকায় ভালো কোনো মসজিদ নেই। তিনি জমি দিতে চান। আমি যেন মসজিদের নকশা করি।
সবাই মিলে জমি নির্বাচন করা হলো। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা মিলাদ পড়িয়ে ১০ কাঠা জমির ওপর মসজিদের কাজ শুরু করি। সে বছরই নানি মারা গেলেন; ডিসেম্বরে।

জরিপ, নকশা তৈরি, অর্থ জোগাড়ের কাজ চলতে থাকল। সুলতানি আমলের নকশা বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তার ওপর ভিত্তি করে নকশা হলো। ২০০৮ সালে শুরু হলো মসজিদ নির্মাণের মূল কাজ। সবাই জানত আমার নানি মসজিদের জমি দিয়েছেন। তাই কখনো কোনো অসুবিধার মুখোমুখি হইনি। ইমাম সাহেব, স্থানীয় লোকজন—সবাই খুব সাহায্য করেছেন।"

‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার-২০১৬’ লাভ করে মসজিদটি। ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার’ যে কোন স্থপতির জন্য স্বপ্ন। পুরষ্কারের মূল্যমান এ অ্যাওয়ার্ডের গুরুত্ব সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা দেয় (আগা খান অ্যাওয়ার্ডের মূল্যমান $১০০০,০০০ এবং নোবেল প্রাইজের মূল্যমান $১৫০০,০০০)।



আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (একেডিএন) প্রতি তিন বছর পরপর ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার’ পুরষ্কার দেওয়া হয়। পুরস্কারটিতে স্থাপত্যে শ্রেষ্ঠত্ব, পরিকল্পনা এবং ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি স্থাপত্যের মাধ্যমে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়।

২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত তিনটি স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবন, গ্রামীণ ব্যাংক হাউজিং প্রকল্প ও রুদ্রপুর মেটিস্কুল ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার’ লাভ করে, যেখানে তিনজনই ছিলেন বিদেশী স্থপতি। বাংলাদেশের প্রথম দুজন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ও কাশেফ মাহবুব চৌধুরী স্থাপত্যে অনন্য সম্মান ‘আগা খান স্থাপত্য’ লাভ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৪৮টি প্রকল্পের মধ্য থেকে ১৯টি প্রকল্পকে চূড়ান্ত মনোনয়নের জন্য বাছাই করা হয়, যেখানে স্থাপত্যের স্বকীয়তায় স্থান করে নেয় স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের ঢাকার ‘বায়তুর রউফ মসজিদ’ এবং স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর গাইবান্ধার ‘ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার’।

আমরা যখন আসর নামাজ শেষ করলাম তখন মসজিদের একপাশে দেখলাম জিলাপির প্যাকেট। বুঝলাম মিলাদ হবে এবং শেষে তবারক হিসেবে জিলাপি দেয়া হবে। সঙ্গীকে বললাম আজকে কিন্তু তবারক খেয়েই যাবো। অতএব বিদআত বলে যাতে সে মিলাদ থেকে বেশি দূরে না থাকে। সে আমাকে ইশারা দিয়ে বুঝালো তার খুব একটা সমস্যা নেই। নামাজ শেষে বসে রইলাম। ইমাম সাহেব যার উদ্দেশ্যে দোয়া করা হবে তার সম্পর্কে বললেন। এরপর সূরা ফাতিহা ও সূরা ইখলাস তিনবার পড়ে মুনাজাত করলেন। বুঝলাম ইমাম সাহেব মিলাদ-কিয়ামের লোক নন।

স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম

যাই হোক আমি তবারক খুবই উচ্ছসিত হলাম। আসলেই ভালো ছিলো জিলাপিটি। মসজিদের বারান্দায় বসে ঠাণ্ডা বাতাসে জিলাপি খাচ্ছিলাম। এমন সময়ে একটি ছোট বাবু তার মায়ের হাত ধরে কোথাও যাচ্ছিল। আমি ভেংচি কাটলাম, সেও প্রতিউত্তর করলো। এভাবে চলছিলো। আমার সহযাত্রী আমাকে কড়াভাবে সতর্ক করলো। বললো, এটা অচেনা যায়গা। মানুষ ছেলেধরা বলে পিটুনি দিলে কিছু করার থাকবে না। সাথে সাথে অসুস্থ বাংলাদেশের কথা ভেবে চুপসে গেলাম।

কীভাবে যাবেন? 
এখনতো লোকেশন চিনা কোনো ব্যাপার না। বাইতুর রউফ বলে গুগোল ম্যাপে সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন। তারপরও সহজে লোকেশন বলে দিচ্ছি। উত্তরা আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে যাবেন। সেখানে গিয়ে কোনো রিকশাকে বললেই নিয়ে যাবে ফয়দাবাদ লাল মসজিদ। স্থানীয়রা একে লাল মসজিদ বলে জানে। আব্দুল্লাহপুর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে মসজিদটি।

মসজিদ থেকে বের হয়ে চাপের বাপ নামে একটি কাবাব হাউজে উদরপূর্তি করে বাসার দিকে রওনা হলাম।

২২ সেপ, ২০১৮

যে মসজিদ উদ্বোধন করেন বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ

পুরাতন দিনের চকবাজার ও পেছনে চকবাজার শাহী মসজিদ। মাঝখানে বিবি মরিয়ম কামান, যা মির জুমলা ব্যবহার করেছেন।

দিনটা কিন্তু ভালোই ছিলো। ঝকঝকে রোদ না থাকলেও বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল না। তাই বের হলাম মসজিদ দেখতে। যেহেতু একা যাবো তাই চিন্তা করেছি পাঠাও বাইক সার্ভিসে করেই যাবো। 

সেদিন একটা পত্রিকায় নিউজ পড়লাম এই পাঠাও এপ্সের পেছনে আছে তিন কারিগর। ওরা তিন বছর আগে সার্ভিস শুরু করেছিলো খাবারের হোম ডেলিভারি। উবার আসার পর তারা বাইক সার্ভিস ও কার সার্ভিসও চালু করে। মাত্র তিন বছরে ওরা এখন প্রচুর টাকার মালিক। ওদের লাভ ১০০ মিলিয়ন ডলার। 

যাই হোক তারা সেই একশ মিলিয়ন থেকে আমাকে কিছু দেয়ার জন্য মনস্থির করেছে। তারা আমাকে অফার করেছে আগামী ছয়টা রাইডে ১০০ টাকা করে ছাড় দিবে। আমার মতো গরীব মানুষ খুশিতে আটখান। দোয়া করে দিলাম আল্লাহ ওদের আরো পয়সাওয়ালা বানিয়ে দিক।

যাই হোক। রাস্তার মোড়ে এসে যে বাইক ডাকবো তখনই শুরু হলো ধুন্ধুমার বৃষ্টি। কোন বাইক আর রাজি না চকবাজার যেতে। টার্গেট চকবাজার শাহী মসজিদ। অবশেষে বৃষ্টি একটু থামলো। আমি আবারো পাঠাও এপ্সের মাধ্যমে বাইকারদের রিকোয়েস্ট পাঠালাম। 

একজন পাওয়া গেলো। তার বাইকের পেছনে উঠে বসলাম। বাইক চলা শুরু করলো। বাইকারের বাড়ি বরিশাল। গল্প করতে করতে চলে এলাম চকবাজার শাহী মসজিদের সামনে। 

বর্তমান চকবাজার শাহী মসজিদ

মসজিদের সামনে এসে বাইকার মাহফুজ ভাই রাইড ক্লোজ করে দেখলেন আসলো মাত্র ৮ টাকা। মূলত ১০৮ টাকা আসলো, ১০০ টাকা ছাড়। তাই আমাকে দিতে হবে মাত্র ৮ টাকা। মন খারাপ করে ফেললেন মাহফুজ ভাই। 

বিরক্তি নিয়ে বললেন, আগে জানলে এই বৃষ্টির মধ্যে আসতাম না। আমার নিজের কাছেও একটু গিল্টি ফিল হতে লাগলো। যদিও ওনার টাকা মার যাবে না। উনি পাঠাও থেকে পেয়ে যাবেন। কিন্তু সম্ভবত ওনার নগদ টাকার দরকার ছিল। 

কী আর করা! ২০ টাকার একটা চকচকে নোট মাহফুজ ভাইকে দিয়ে বললাম এটা রাখুন। মাহফুজ ভাই মন খারাপ করে ২০ টাকা নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন। আর আমি চকবাজার শাহী মসজিদের ১ নং গেইট দিয়ে উঠতে শুরু করলাম। এই মসজিদটা আগে ভ্রমণ করা কর্তালাব শাহের মসজিদ থেকে বেশি দূরে না।  

ঢাকার পুরনো দিনের বাজারগুলোর মধ্যে চকবাজার অন্যতম ব্যস্ত একটি জনপদ। আগে চকবাজারকে চৌক বন্দর বলে ডাকা হতো। এই বাজারের পত্তন মোগল আমলে। মোগল আমলে সম্রাট বা সুবেদার যেখানে তাদের শিবির স্থাপন করতেন সেখানে শিবিরের প্রয়োজনেই একটি বাজার গড়ে উঠত। 

১৬০২ সালে ভাওয়াল থেকে রাজা মানসিংহ মোগল সম্রাটের হয়ে বিদ্রোহ দমনে এসেছিলেন পূর্ববঙ্গে এবং বর্তমানের কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপন করেছিলেন মোগল দুর্গ। সেই দুর্গের পাশেই দিনে দিনে গড়ে ওঠে আজকের চকবাজার। সেই আমলে চকবাজার ছিল ঢাকার অভিজাত এবং ধনী ব্যক্তিদের প্রধান বাজার। 

চকবাজারে ইফতারের বাজার

বাংলার সুবেদার হিসেবে শায়েস্তা খান যখন বাংলায় আসেন তখন তিনি চকবাজারে একটি মসজিদ স্থাপন করেন। তিনি ১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই মসজিদটি সম্ভবত বাংলাদেশে উঁচু প্লাটফর্মের উপরে নির্মিত প্রথম মসজিদ। এছাড়া খান মুহাম্মদ মৃধা ও কর্তালাব শাহের মসজিদও উঁচু প্লাটফর্মের উপর নির্মিত মসজিদ। যেগুলো নিয়ে আগেও লিখেছি। 

এই মসজিদকে ঘিরেই একসময় চকবাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। তাই এখনও মসজিদটি চকবাজারের কেন্দ্রস্থলে বলে ধরা হয়। তবে শায়েস্তা খানের সেই যুগে চক মসজিদ ঢাকার কেন্দ্রীয় মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। 

রমজান বা ঈদের চাঁদ দেখা দিলে এই মসজিদের সামনে থেকে তোপধ্বনি দেওয়া হতো। রমজান বা ঈদের চাঁদ দেখা দিলে এই মসজিদের সামনে থেকে তোপধ্বনি দেওয়া হতো বিবি মরিয়ম কামানের মাধ্যমে। বিবি মরিয়ম কামান একটি বৃহত্তম ও শক্তিশালী কামান মুঘলদের। এটি এখন উসমানী উদ্যানে সংরক্ষিত।

রমজান মাসে তারাবির নামাজের সময় মসজিদের ভেতরটায় ঝাড়বাতির আলোয় আলোকিত করা হতো। ইফতারির সময় বিভিন্ন বাড়ি ও দোকানপাট থেকে ইফতারি আসত মসজিদে। সবাই এখানে ইফতারি করতে আসতো। ইফতারি করতে এখানে মানুষ জড়ো হতো বিধায় ধীরে ধীরে এখানে ইফতারি মার্কেট গড়ে উঠে। আজ তাই ইফতারির আলোচনা আসলেই চকাবাজারের নাম উঠে আসে। বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় ইফতারি মার্কেট চকবাজার। 

আরেকটি সামাজিক রীতি ছিলো চক মসজিদকে ঘিরে জুম্মার নামাজের দিন চারপাশের বাড়ি থেকে মিষ্টান্ন পাঠানো হতো। নামাজ শেষে বিতরণ করা হতো এই মিষ্টান্ন।

মসজিদটির একটি বাড়তি গুরুত্ব হলো, সুবেদার শায়েস্তা খাঁ এই মসজিদ নির্মাণের মধ্য দিয়েই চকবাজারের উদ্বোধন করেছিলেন। ঢাকার নায়েবে নাজিমরা চকবাজার জামে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তেন।

একসময় চক মসজিদের সামনে একটি খোলা আঙিনা ছিল। এখন আঙিনাকে ঘিরে মসজিদের আয়তন বাড়ানো হয়েছে। মসজিদের আয়তন এখন আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মূল মসজিদের উত্তর দেয়াল অপসারণ করা হয়েছে ও পূর্ব দিকের সম্প্রসারিত অংশে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। 

মসজিদের তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মূল আচ্ছাদন ভেঙে তার ওপর নির্মাণ করা হয়েছে আরেকটি তল এবং এর ছাদে তিনটি নতুন গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মাঝের গম্বুজটি করা হয়েছে অনেক বড়। দেয়ালগুলোর পুরুত্ব হ্রাস করা হয়েছে, মিহরাব ও প্রবেশপথগুলোকে করা হয়েছে প্রশস্ত আর উত্তর ও দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথ দুটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

আজ যে ঝকঝকে আধুনিক মসজদি আমরা দেখছি, তাতে এটা যে প্রায় চারশ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে তা বোঝার উপায় নেই। পূর্বের ঐতিহাসিক অস্তিত্বের চিহ্ন রাখার ব্যাপারে খুব সম্ভবত কর্তৃপক্ষের আগ্রহের খুব অভাব ছিলো। 

যাই হোক মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে যখন বের হলাম তখন দেখি চারদিকে স্ট্রিট ফুডের মেলা বসে গেলো। কোনটা রেখে কোনটা খাই এই অবস্থা! অবশেষে খাওয়া দাওয়া শেষে আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে পুরাতন কারাগারের সামনে এলাম। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। একসময় বাংলাদেশ যার কথায় পরিচালিত হতো তিনি আজ একা বন্দি এই কারাগারে! অথচ অতি ঠুনকো মামলা। যে মামলার কোন ভিত্তি নেই। 

১৪ আগ, ২০১৮

বাংলা বিহার উড়িষ্যার ১ম নবাবের তৈরি মসজিদের গল্প

করতলব খানের মসজিদ

একের পর এক রিকশাওয়ালা ফিরিয়ে দিচ্ছে আমাদের। কেউ চিনে না সেই মসজিদ। ঘটনা কি? ভাবলাম ভুল নাম বলছি কি না। আবারো গুগুল মামাকে জিজ্ঞাসা করলাম। না ঠিকই তো আছে। মসজিদের নাম করতলব খানের মসজিদ। পুরান ঢাকার বেগমবাজারে। 

এক রিকশাওয়ালা মামা বললেন পুরানা মসজিদ মানে কি চকবাজার শাহী মসজিদের কথা বলছেন? 
-আরে না চকবাজার না। বেগমবাজারে। আমি আসলে তখনো জানতাম না বেগমবাজার আর চকবাজার যে কাছাকাছি।  

যাই হোক এক প্রায় বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা মামা আমাদের নিয়ে যেতে রাজি হয়েছেন। আমাদের তিনজনেরই সাইজ খারাপ না। জিজ্ঞাসা করলাম মামা পারবেন তো? তিনি বললেন এই রিকশায় দশ মণ অনায়াসে পার করি। আপনারা তিনজন কিছু না। এবার আমরা আমাদের তিনজনের ওজন যোগ করে দেখলাম মোটে সাত। দশ মণ হতে ঢের বাকী। 

যাই হোক, আমরা চলতে শুরু করলাম। রিকশাওয়ালা মামা যতটা সহজ মনে করেছিলেন আসলে ততটা ছিল না। বেশ কয়েকটি উঁচু নিচু স্থানে আমরা নেমে ওনার বোঝা হালকা করেছি। 

পুরনো দিনের ছবি


বেগমবাজার জেল রোডে এসে গেলাম। পুরাতন কেন্দ্রীয় জেলখানার সামনে। এখানে এখন একজন মাত্র বন্দি। বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। খালেদার জন্য আফসোস করছি, এমন সময়ে গলির ফাঁক দিয়ে ধরা পড়লো সেই মসজিদ। গুগলে যেরকম ছবি দেখেছি সেরকম। ব্যস ব্যাপারটা  সহজ হয়ে গেলো। 

আসলেই সহজ হলো। এই মসজিদটির নাম করতলব খান মসজিদ হলেও স্থানীয়রা একে বেগমবাজার মসজিদ নামেই চিনে। করতলব খান করতে করতে জীবনপাত করলেও মনে হয় মসজিদ বের করতে পারতাম না। আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়ে মসজিদে ঢুকে পড়লাম। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগের আকার নেই। সংস্কার হয়েছে। মসজিদ বড়ও হয়েছে। 

এ পর্যন্ত যত মসজিদ দেখেছি এর মধ্যে এটাকে বেশ ভালোই লেগেছে কারণ এর সংস্কারের মধ্যে পুরোনোর আভিজাত্য রয়েছে। 

করতলব খাঁ কে ছিলেন? 
করতলব খাঁ এই নামটা আমি প্রথম পেয়েছি মসজিদ খোঁজ করতে গিয়েই। গুগোলে সার্চ করলাম ঢাকার পুরোনো মসজিদ লিখে। অনেক মসজিদের পাশে এই মসজিদের নাম পেলাম। করতলব খান মসজিদ। যদিও করতলব খান নামটা আমার কাছে অপরিচিত ছিল আসলে তিনি কিন্তু অপরিচিত নন। 



তিনি বাংলা বিহার উড়িষ্যার প্রথন স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলি খান। এই সিলসিলার শেষ নবাব হলেন সিরাজ উদ দৌলা।  

মুর্শিদকুলি খান ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব। আসলে তিনি নবাব ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুঘলদের দেওয়ান প্রশাসক। আওরঙ্গজেব তাকে বাংলায় নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেবের ছেলেরা ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে বাংলায় তাদের আর প্রভাব থাকে না। কেন্দ্রীয় শাসন নষ্ট হয়ে যায়। সেই সুবাধে মুর্শিদকুলি খান হয়ে উঠেন স্বাধীন নবাব। 

মুর্শিদকুলি খানকে হাজি শফি ইসফাহানি নামে ইরানের একজন উচ্চপদস্থ মুঘল কর্মকর্তা ক্রীতদাস হিসেবে ক্রয় করেন। ইসফাহানিই তাকে শিক্ষিত করে তুলেন। ভারতে ফেরার পর তিনি মুঘল সাম্রাজ্যে যোগদান করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তিনি তার যোগ্যতা ও ইসলামপ্রিয়তার জন্য আওরঙ্গজেবের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেন।  

১৭০০-১৭০৪ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন মুর্শিদকুলি খাঁ। দিল্লির তুলনায় ঢাকা সেসময় ছিল অজগাঁ। তিনি এখানে নিজেকে ইসলামের প্রসারে নিয়োজিত করেন। দাওয়াতী কাজ করতে থাকেন মুসলিমদের মধ্যে। ঢাকায় তিনি মুসলিমদের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি তার নামে প্রথমে মুর্শিদকুলি খাঁ নাম হয়। পরে সম্রাট আওরঙ্গজেব তরুণ মুর্শিদকুলী খাঁকে ১৭১৭ সালে সম্মানসূচক করতলব খাঁ উপাধি দিয়ে দেওয়ান হিসেবে বাংলায় পাঠান। 

এরপর এই মসজিদের নাম হয়ে যায় করতলব খান মসজিদ। স্থানীয়রা মসজিদটিকে বেগমবাজার মসজিদ নামে চেনে। সময়ের পরিক্রমায় ১৭৩৯-৪০ সালে ঢাকার নায়েবে নাজিম সরফরাজ খাঁর কন্যা লাভলি বেগমের নাম থেকে মাছপ্রধান এই এলাকার বড় বাজারের নাম হয় বেগমবাজার। 

এই বাজারটি মূলত স্থাপন করা হয়েছিল পাঁচ গম্বুজ মসজিদটির ব্যয় নির্বাহ করার জন্য। সময়ের কালস্রোতে, লোকজনের সহজ পরিচিতির জন্য এক সময় বেগম বাজারের নাম জুড়ে দিয়ে মসজিদটির নাম হয়ে যায় বেগম বাজার মসজিদ। যা এখনও চলছে। ধারণা করা হয়, এক সময় বুড়িগঙ্গা নদীর অববাহিকা এই মসজিদের কোল ঘেষে প্রবাহিত হত । পরে নদীর গতি পথ পরিবর্তিত হয়ে প্রায় দেড় কি.মি. দূরে চলে যায়। 

সে সময়কার অন্যান্য মসজিদের মতো করতলব খান মসজিদটিও উঁচু ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হয়। পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের উত্তরদিকে একটি কক্ষের মতো বর্ধিত দোচালা রয়েছে। সংযোজিত দোচালা অংশসহ মসজিদটি একটি উঁচু ভল্টেড প্লাটফর্মের পশ্চিমের অর্ধেক অংশ দখল করে আছে। প্লাটফর্মের পূর্বে রয়েছে একটি বাব বা বাউলি (ধাপকৃত কুয়া)। উত্তর-দক্ষিণে ৩৯.৬২ মি এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৩.৪১ মি প্লাটফর্মের উত্তর প্রান্ত খিলানাকৃতির। প্লাটফর্মের খিলানাকৃতির অংশটির মাঝ বরাবর কেটে একটি সমাধির জন্য জায়গা করা হয়েছে। 

নামাজ পড়ে বের হয়েই আহা! বিরিয়ানীর গন্ধে মৌ মৌ করছিলো চারদিক। এই এলাকায় আসলে আপনি পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সব খাবারও পেয়েও যাবেন। ভুরিভোজ করার উৎকৃষ্ট সময় তো এখনই...। 

২৬ জুল, ২০১৮

চেনা মসজিদের অজানা গল্প


বায়তুল মুকাররম মসজিদ। কে না চিনে? বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ। আমি নোয়াখালীর মফস্বলে বেড়ে উঠা মানুষ। বায়তুল মুকাররমে নামাজ পড়া ছিল স্বপ্নের মতো। একবার একটি রাজনৈতিক প্রোগ্রামে অনেকের সাথে এলাম পল্টনে। স্কুলছাত্র ছিলাম বলে নিয়ে আসতে চাইছিলো না কেউ। কিন্তু জোর করে চলে এলাম। 

পল্টন ময়দানে এসে জানতে পারলাম পাশেই বায়তুল মুকাররম। অনেক ভাইকে বললাম ভাই আমাকে একটু নিয়ে চলেন। মসজিদটা একটু দেখবো। কিন্তু কেউ রাজি হলো না দলছুট হয়ে যাওয়ার ভয়ে। প্রচণ্ড গরম। আইসক্রিম আর তরমুজ বিক্রি হচ্ছে স্থানে স্থানে। 

আইসক্রিম খেতে এসে দেখি আমার স্কুলের এক স্যার। সালাম দিলাম। তিনি বললেন ছোট মানুষ তুমি। কেন এলে? আমি কিছু না বলে চুপ করে ছিলাম। তিনি আমাকে আইসক্রিম কিনে দিলেন। বললেন আর কিছু লাগবে কিনা? 

আমি বললাম, স্যার বায়তুল মুকাররমে যোহর নামাজ পড়তে চাই। তিনি বললেন বেশ! আমিও তো চিন্তা করে রাখছি যোহর বায়তুল মুকাররমে পড়বো। এরপর স্যারের পিছে লেগে থাকলাম। যাতে এত মানুষের মধ্যে স্যারকে হারিয়ে না ফেলি। 

সেই আমার প্রথম বায়তুল মুকাররম দেখা ও নামাজ পড়া। অন্যরকম অনুভূতি কাজ করেছিল। আহা আমি বাংলাদেশের সেরা মসজিদে নামাজ পড়ছি। যে মসজিদকে এতদিন পত্রিকায় ও টিভিতে দেখেছি সেটাতে এখন আমি নিজেই। আহা...। চোখ বন্ধ করে এখনো টের পাই ছেলেবেলার সেই অনুভূতি। 

এরকম দুইটা অনুভূতির জন্য অপেক্ষা করছি। এক. সৌদিতে গিয়ে কা'বায় ও নববীতে দাঁড়িয়ে আবেগে আপ্লুত হবো আর চোখের পানি ফেলবো। দুই. জেরুজালেমে গিয়ে অনেক নবীর স্মৃতি বিজড়িত বায়তুল আকসায় সিজদা দিয়ে পড়ে রইবো। জানিনা কবে আল্লাহ তায়ালা আমার ইচ্ছেগুলো কবুল করবেন! 

যাই হোক ফিরে আসি বায়তুল মুকাররমে। এটি পল্টনে অবস্থিত। মসজিদটির আয়তন ৬০ হাজার বর্গফুট। এর ধারণ ক্ষমতা ৪০,০০০। মানে একসাথে ৪০ হাজার মানুষ এখানে নামাজ পড়তে পারে। এই সুবিশাল মসজিদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং ধারণক্ষমতা বিবেচনায় এটি পৃথিবীতে দশম বৃহত্তম মসজিদ। 

পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর যে ক'জন ব্যক্তি/পরিবার নিজ উদ্যোগে পাকিস্তান গঠনে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে বাওয়ানী, আদমজী, ইস্পাহানী অন্যতম। বাওয়ানী পরিবারের লতিফ বাওয়ানী বাংলাদেশে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৫ টি শিল্পকারখানা স্থাপন করে। বাংলাদেশের পাটকে সোনালী আঁশে পরিণত করে মূলত বাওয়ানী, আদমজী ও ইস্পাহানী পরিবার। 

লতিফ বাওয়ানী পূর্ব-পাকিস্তানে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ স্থাপনের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সে জন্য ঢাকার আলেম সমাজ ও গণ্যমান্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন ১৯৫৯ সালে। সেখানে ঠিক হয় এই মসজিদের নাম হবে বায়তুল মুকাররম। কমিটির নাম হয় বায়তুল মুকাররম মসজিদ সোসাইটি। কিন্তু তখনো ঠিক হয়নি মসজিদটি কোথায় স্থাপিত হবে? 

বেশিরভাগ লোক বলেছিলো পুরান ঢাকায় করার জন্য। কিছু লোক বললো নতুন ঢাকায় করা ভালো হবে কারণ সেটা হবে পরিকল্পিত ঢাকা। যেহেতু এটা গ্র্যান্ড মসজিদ হবে তাই পুরান ঢাকায় সম্ভব নয় কারণ সেখানে এত জায়গা নেই। তাহলে? পরে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় এটি পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলেই স্থাপিত হবে। আর সেটা হবে পল্টনে। 

ঢাকায় যখন এমন আলোচনা চলছিলো তখন পাকিস্তানের শাসক ছিলেন সেনাশাসক স্বৈরাচারী আইয়ুব খান। স্বৈরাচারীদের একটা ব্যাপার থাকে এমনসব আকর্ষণীয় কিছু করা যাতে তারা মানুষদের কাছে ভালো ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান পায়। যেমন বাংলাদেশে এরশাদ নিজেকে ইসলামিক প্রমাণ করার জন্য অনেক কিছু করেছে। আবার এখন হাসিনা নিজেকে তাহাজ্জুদ্গুজার হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

আসলে এরা সবাই আইযুবের শিষ্য। যাই হোক আইয়ুব খানও এমন একটি মসজিদের কথা ভাবছেন যা পাকিস্তানের ঐতিহ্যকে শাণিত করবে। এটা হবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় মসজিদ। এমন সময় লতিফ বাওয়ানীর প্রস্তাব আইয়ুব খানের কাছে পৌঁছলে তা আইয়ুবের জন্য সহজ হয়ে গেলো। একইসাথে আইয়ুব খান ঢাকাকে সেকেন্ড রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলো। তাই পাকিস্তানের পার্লামেন্টের জন্য শেরে বাংলা নগরে কাজ শুরু করলো। 

জাতীয় সংসদ ভবন ও বায়তুল মুকাররম মসজিদ দুটি মেগা প্রজেক্ট আইয়ুব একইসাথে শুরু করে। লতিফ বাওয়ানী মসজিদের খরচের বড় অংশ বহন করে। সরকার প্রায় সাড়ে আট একর জমি বরাদ্দ দেয় মসজিদের জন্য। মসজিদটি এখন যে স্থানে সেখানে একটি বিশাল পুকুর ছিল, নাম পল্টন পুকুর। সেই পল্টন পুকুর ভরাট করেই মসজিদ স্থাপিত হয়। 

বিশিষ্ট স্থপতি আবদুল হুসেন মুহাম্মদ থারিয়ানিকে মসজিদ কমপ্লেক্সটির নকশার জন্য নিযুক্ত করেন লতিফ বাওয়ানী। থারিয়ানীর বাড়ি ছিল মুম্বাইতে। পরে অবশ্য পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। পুরো কমপ্লেক্স নকশার মধ্যে দোকান, অফিস, লাইব্রেরি ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের প্রধান কক্ষটি তিন দিকে বারান্দা দিয়ে ঘেরা। মিহরাবটি অর্ধ-বৃত্তাকারের পরিবর্তে আয়তাকার।

বাইরে থেকে দেখলে বায়তুল মোকাররম মসজিদকে ‘কাবার’ মডেলের মতো মনে হবে। বায়তুল মোকাররম মসজিদটি প্রধানত ৮তলা। নীচতলায় বিপণী বিতান ও গুদামঘর। বাকীগুলো নামাজের জন্য। আল্লাহর ৯৯টি নামের কথা স্মরণ করে মসজিদটির উচ্চতা ৯৯ ফুট করা হয়েছে। 

১৯৬৩ সালে বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রথম পর্বের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি শুক্রবার বায়তুল মোকাররম মসজিদে প্রথম জুমআর নামাজ আদায় করা হয়। আর এর পরদিন ২৬ জানুয়ারি শনিবার তারাবীহ নামাজ শুরু হয়।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন মুজিব সরকার সমাজতন্ত্রীদের পরামর্শে লতিফ বাওয়ানীর সমস্ত শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয়। বাওয়ানী পরিবার প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় পাকিস্তানে ফিরে যায়। অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তানেও তাদের ব্যবসা ছিলো। পাকিস্তান গঠনের পর এই বাওয়ানী, আদমজী ও ইস্ফাহানীরা পূর্ব পাকিস্তানকে সমৃদ্ধ করার কাজ করেছিলো। এখনকার ব্যবসায়ী মতো শুধু ব্যবসা করেনি তারা। এই বাওয়ানীরা শত শত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, পাঠাগার স্থাপন করেছে। বাংলা শিল্প সাহিত্যের বিকাশে বহু সম্মাননা ও পুরষ্কারের আয়োজন করেছে।

এদেশের কাঁচামাল থেকে যাতে এদেশের মানুষ উপকৃত হয় সেই ব্যবস্থা করেছে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এই লতিফ বাওয়ানী। যিনি আমাদের বায়তুল মুকাররমের মতো মসজিদ উপহার দিয়েছেন আমরা তাকে গলাধাক্কা দিয়েছি শুধুমাত্র অবাঙালি হওয়ার অপরাধে। এমন নয় যে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এমনও নয় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী। তিনি ভারতের গুজরাট থেকে আসা মুহাজির মুসলিম।   

যাই হোক, এবার আসি খতিবদের প্রসঙ্গে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রথম খতিব ছিলেন মাওলানা আবদুর রহামন বেখুদ (রহ:)। তিনি ১৯৬৩ সালে এই মসজিদের খতিব হন। এরপরে খতিব হন মাওলানা ক্বারী উসমান মাদানী (রহ:)। তিনি এ মসজিদের খতিব ছিলেন (১৯৬৩-১৯৬৪) মাত্র এক বছর। পরবর্তী খতিব ছিলেন মুফতী সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান। তিনি ১৯৬৪-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর এ মসজিদের খতিব হন মুফতী মাওলানা মুইজ (রহ:)। 

তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৪-১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। এরপরে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দায়িত্ব পালন করেন খতিব মাওলানা উবায়দুল হক (রহ:)। তিনি ছিলেন দেশ বরেণ্য আলেম। তিনি খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৪-২০০৯ সাল পর্যন্ত। 

তারপর ২৪ বছর যিনি এখানে ইমামের দায়িত্ব পালন করেছিলেন সেই মুফতি মাও: নুরুদ্দীন সাহেব এক বছর ভারপ্রাপ্ত খতিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিবের দায়িত্বে রয়েছেন প্রফেসর মাওলানা মো: সালাহ্উদ্দিন। তিনি ৫ জানুয়ারি ২০০৯ সালে এ মসজিদের খতিব নিযুক্ত হন।

১৭ জুল, ২০১৮

ঢাকার সবচেয়ে পুরনো মসজিদের ছোঁয়া


এই যে মসজিদের শহর ঢাকা, বলতে পারবেন কোন মসজিদটি ঢাকা শহরের প্রথম মসজিদ?

একটু ভড়কে যাওয়ার মতই প্রশ্ন। আসলে এই ইতিহাস কোথাও লিখিত নেই। প্রথমে ঢাকার কোথায় মসজিদ স্থাপিত হয়েছে এটা আসলেই জানা যায় না। তবে বর্তমানে ঢাকার মসজিদ্গুলোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে পুরনো তা বলা যায়। এক অর্থে এটাই এখন ঢাকার ১ম মসজিদ।

রাতেই ঠিক করে ফেললাম বিনত বিবির মসজিদে যাবো। গুগল ম্যাপ দেখে বুঝে নিলাম কত সময় লাগতে পারে।

জুমার নামাজের বেশ আগেই আমরা তিনজন রওনা হলাম পুরান ঢাকার নারিন্দায়। যেখানে আছে ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ বিনতে বিবির মসজিদ।

সায়েদাবাদ পর্যন্ত বাসে করে গেলাম। এরপর রিকশা নিয়ে রওনা হলাম। রিকশাওয়ালা মামাকে বললাম, চিনেন কিনা? তিনি বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান দিলেন, অবশ্যই চিনেন।

বেশ, তাহলে তো আর চিন্তা নেই! তবে নিত্যদিনের সঙ্গী গুগল ম্যাপ তো সাথে আছেই। মাথার উপর ভীষণ রোদ। চোখটা ভালো করে খুলে তাকাতে পর্যন্ত পারছি না। এমন সময় একজন বলতে লাগলো সেলফি তুলবে। রিকশায় নাকি তিনজনের সেলফি ভালো উঠে।

ভীষণ রোদে সেলফি তুলতে গিয়ে পড়লাম বেকায়দায়। ভালো করে হাসি মুখে ছবি তোলা যাচ্ছে না। রোদের তীব্রতায় কপাল কুঁচকে আছে। এমতাবস্তায় হাসতে গিয়ে আমার চেহারার যে দশা তা নিতান্তই দুর্দশা।

যাই হোক রিকশাওয়ালা একটা মসজিদের সামনে আমাদের নামিয়ে দিলো। গুগোল ম্যাপে তখনো দুই মিনিটের রাস্তা বাকী। জিজ্ঞাসা করলাম এটাইতো সেই মসজিদ? সে বললো, হু এটা তো সেটাই।

বেশ ভালো মসজিদে ঢুকে পড়লাম। কিছুটা পুরাতন ছাপ আছেই। ভিতরে তিনটা কবরও আছে। অবাক হতে শুরু করলাম। অনলাইনে যা পড়ে এসেছি এবং যেসব ছবি দেখেছি তার সাথে তো মিল পাচ্ছি না।

ইতিমধ্যে আমাদের এক সঙ্গী কাতচিৎ হয়ে ছবি তোলা শুরু করেছে। গুগোল ম্যাপ অনুসারেও এটা সেই স্থান নয়। বেকায়দায় পড়ে গেলাম। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম এটা কি বিনত বিবির মসজিদ? তিনি বললেন না, এটা পীরসাব বাড়ির মসজিদ, একটু সামনে হেঁটে গেলেই সেই মসজিদ।

রিকশাওয়ালার উপর প্রচন্ড বিরক্তি প্রকাশ করে হাঁটা শুরু করলাম। যে সঙ্গীটা এতক্ষণ বহু কসরত করে বহু ছবি তুলেছিলো সে রাগে গজরাতে গজরাতে শালীন কিছু গালি দিচ্ছে আর ছবি ডিলেট করছে।

আমরা অল্প কিছুক্ষণ হেঁটেই পেয়ে গেলাম বিনত বিবির মসজিদ। ভাবা যায়, প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছর আগের মানুষের স্মৃতি। তাদের স্পর্শ পেতে যাচ্ছি। ভাবছি আর শিউরে উঠছি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি ব্যবসায়ী আরাকান আলীর। আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

ঢাকায় প্রাপ্ত শিলালিপিসমূহের মধ্যে বিনত বিবির মসজিদের শিলালিপিটিই ছিল প্রথম মুসলিম শিলালিপি। শিলালিপিটি মূল মসজিদের প্রধান প্রবেশ পথে লাগানো ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটা উত্তর দিক থেকে দ্বিতীয় প্রবেশ পথের মাথায় রয়েছে। ঢাকায় এটিই একমাত্র মসজিদ, যার নাম রাখা হয়েছে একজন নারীর নামে।

মসজিদের দেয়ালে স্থাপিত একটি কালো পাথরে ফারসি ভাষায় লিখিত বর্ণনায় রয়েছে, সে-সময় পারস্য উপসাগরের আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজন জলপথে এ অঞ্চলে বাণিজ্যে আসতেন। পুরান ঢাকার এই নারিন্দা-ধোলাইখাল এলাকা দিয়ে তখন বয়ে যেত বুড়িগঙ্গার একটি শাখা, যা বুড়িগঙ্গা হয়ে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে মিশেছিল। আরাকান আলী নামক এক সওদাগর সে সময় এ এলাকায় বাণিজ্যের জন্য আসেন এবং এখানে বসবাস শুরু করেন। তিনিই নামাজ পড়ার সুবিধার্থে এখানে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এখানে বসবাসকালীন আরাকান আলীর মেয়ে বিনত বিবির আকস্মিক মৃত্যু হয়।

মসজিদের পাশেই সমাধিস্থ করা হয় এবং মেয়ের মৃত্যুর শোকে ছয় মাস পর আরাকান আলীর মৃত্যু ঘটলে তাকেও এখানেই কবর দেয়া হয়। পরবর্তীতে বিনত বিবির নামে মসজিদটির নামকরণ করা হয়। বর্তমানে চারপাশে ঘিঞ্জি দোকান-পাট আর অনেক দোকানের মাঝেই একটি দোকানের মতো জায়গা নিয়ে পড়ে আছে আরকান আলি ও তার মেয়ের খুব সাধারণভাবে পাশাপাশি দুটি কবর। কবরের উপরটা চাদরে মোড়ানো।

সুলতানি আমলে সাধারণভাবে আরবি শিলালিপি পাওয়া গেলেও এখানে আরবির সঙ্গে ফার্সি লিপিরও ব্যবহার লক্ষণীয়। মসজিদটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর আককোণবিশিষ্ট পার্শ্ব স্তম্ভ, বর্গাকার কক্ষের ওপর অর্ধ বৃত্তাকার গম্বুজ, উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বদিকে খিলানের ব্যবহার, সাদামাটা অলঙ্করণ, প্লাস্টারে ঢাকা, বাঁকানো কার্নিশ প্রভৃতি।

ছয়-সাত কাঠা জায়গায় গড়ে ওঠা মূল মসজিদটি বর্গাকৃতির এবং এক গম্বুজবিশিষ্ট। এর ভেতরভাগের পরিমাপ প্রতিদিকে ৩.৬৬ মিটার। মসজিদটির ছাদ গোলাকার গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত এবং গম্বুজটি সরাসরি ছাদে স্থাপিত। মসজিদের দেওয়ালগুলি ১.৮৩ মিটার পুরু। এর পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে একটি করে মোট তিনটি প্রবেশপথ আছে। পশ্চিম দেওয়ালের পেছনের দিকে একমাত্র মিহরাবটি এখন অব্যবহৃত।

মসজিদের দুটো গম্বুজের একটির গায়ে আদি ভবন প্রতিষ্ঠার সাল ৮৬১ হিজরি (১৪৫৭ খ্রি:) লেখা আছে। আরেকটি গম্বুজের লেখা অনুযায়ী ভবনটি প্রথম সংস্কারের মুখ দেখে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে (১৯৩০ খ্রি:)।

২০০৬ সালে মসজিদের পুরান ভবনটি ভেঙে নতুন করে আবার নির্মাণের জন্য কাজে হাত দেয় পরিচালনা কমিটি। সে সময় মসজিদের প্রায় সব অংশই ভেঙে ফেলা হয়। তবে এলাকাবাসীর প্রতিরোধে মসজিদের বারান্দাটুকু বেঁচে যায়। ফলে রয়ে যায়, ঢাকার প্রথম মসজিদের এক টুকরো স্মৃতি।

ঢাকায় মুসলিমদের অবস্থার উন্নতি মূলত মুঘল সেনাপতি ইসলাম খানের ঢাকা আগমনের পর থেকে। তখন থেকেই মূলত ঢাকা ইসলামের শহরে পরিণত হয়। বিনত বিবির মসজিদ ইসলাম খানের ঢাকা আগমনেরও প্রায় ১৫০ বছর আগে তৈরি হয়েছে। তখন বাংলার স্বাধীন সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের আমল চলছিলো।

তখন ঢাকায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও সারা পৃথিবীজুড়ে মুসলিমদের রাজত্ব ছিল। দিল্লিতে রাজত্ব করছিলেন লোদী রাজবংশের বাহলুল খান লোদী। আর পৃথিবী চালাচ্ছিলেন মুসলিমদের ইতিহাসে খ্যতিমান বীর সুলতান ফাতিহ মুহাম্মদ যিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে কনস্টান্টিনোপল জয় করেন।

ইতিহাসের ছোঁয়া নিয়ে বের হয়েছি মসজিদ থেকে। কিন্তু তখনো রোদের তেজ কমেনি। একটু হেঁটে মোড়ে আসতেই দেখি লাচ্ছি বিক্রি হচ্ছে। পুরান ঢাকার নামকরা লাচ্ছি। গলায় ঢেলে দিলাম সেই ঠাণ্ডা লাচ্ছি। আহ শান্তি। ইতিহাস ও লাচ্ছি একসাথেই খেলাম।

২৭ জুন, ২০১৮

যেভাবে একটি স্কুল মসজিদে পরিণত হলো



নোয়াখালী ছেড়ে বাসটি যাবে ঢাকা। আমি পথিমধ্যে চড়ে বসলাম। নিজের আসন বুঝে নিয়ে মাত্র আরাম করে চোখ বন্ধ করলাম। তখনি বাসটি কিছু যাত্রী তোলার জন্য দাঁড়াল। কিন্তু যাত্রী তোলা বাদ দিয়ে চলছে গ্যাঞ্জাম। কৌতুহলী হয়ে দরোজার দিকে তাকালাম। দুজন নারী উঠলেন, আবার নামলেন। গ্যাঞ্জাম তখনো চলছে।

তারপর আরেকজন উঠলেন। আরে, এ যে আমারই সহকর্মী বন্ধু। বুঝলাম গ্যাঞ্জাম তার সাথেই হয়েছে। সে বাসে উঠে তখনো সমানে মুখ চালিয়ে যাচ্ছে। ভুল ছিল সুপারভাইজারের। এতক্ষণে সে ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইতে লাগলো।

আমার আসন ছিল বাসের একেবারে সামনের দিকেই। আমি মুখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। যাতে করে সে আমাকে দেখতে না পায়। একটু মজা করার চিন্তা করলাম। আড় চোখে দেখলাম সে তার সিটে গিয়ে বসেছে। হাতে মোবাইল ফোন।

আমি তাকে মেসেজ করলাম, 'বাসে উঠে এভাবে রাগ করতে হয় না'। সে সচকিত হয়ে মাথা ঘুরাতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ড পরই বুঝতে পারলো এই বাসে আমিও আছি। আমি কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে জানালার দিকেই তাকিয়ে আছি।

সে তার সিটে বসে আমাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়নি। অবশেষে হেঁটে আমার সিটের সামনে আসলো। দুজনেই হেসে উঠলাম। মুহুর্তেই একটি বিরক্ত মুখ হাসিমুখে পরিণত হলো।

প্রতিটা ঈদের পর পরই বেজে উঠে বিচ্ছেদের সুর। ঈদ আমাদের জন্য বিরাট রহমত। বিশেষ করে আমরা যারা পরিবারের সাথে থাকি না। ঈদ উপলক্ষে আমাদের সুযোগ হয় প্রিয় মানুষগুলোর সাথে সময় কাটাবার।

আর এবার আমার জন্য বিচ্ছেদ যে অন্যান্য বারের চাইতে অনেক বেশি সে কথা সহজেই অনুমেয়।

বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় আসার পথে সহকর্মীকে পেয়ে বিচ্ছেদ অনেকটাই বন্ধনে পরিণত হয়েছে। সহকর্মীর অনুরোধে নিজের বাসায় না গিয়ে রাতে তার বাসায় দাওয়াত নিলাম।

পরদিন সে আমাকে বললো মসজিদ দেখবে আমার সাথে। আমি যেভাবে পুরাতন মসজিদ দেখি। বললাম ঠিক আছে, তাই হবে।

কোন মসজিদে যাবো? কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করে পেয়ে গেলাম একটি নাম 'খান মুহাম্মদ মৃধা' মসজিদ। অনলাইনে ছবি দেখে দারুণ লোভ হয়েছে দেখার। সেজেগুজে বের হয়ে পড়লাম।

ফাঁকা রাস্তা। ঢাকা তখনো অবগুণ্ঠন খুলে নি। ঝিরি ঝিরি বাতাস। এমন সময়ে রিকশা ভ্রমণ খুবই আনন্দদায়ক ও স্বাস্থ্যকর। গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।

দেখেই মনে হয়েছে এটা একটা দুর্গ। তিন গম্বুজঅলা এই মসজিদটির অন্যতম বিশেষত্ব হলো এটি প্রায় সতের ফুট উঁচু প্লাটফর্মের উপর নির্মিত। মসজিদটি যে যুগে নির্মিত সে যুগে দোতলা মসজিদ নির্মিত হওয়ার নজির নেই। কিন্তু মসজিদটি দোতলায় নির্মিত।

নিচের তলায় অনেকগুলো কক্ষ। সেই কক্ষগুলোকে ভিত্তি করে উপরে অনেকটা মঞ্চের মত করে স্থাপনাটি তৈরী করা হয়েছে। মঞ্চের উপর মুঘল রীতিতে নির্মিত ৪৮ ফুট বাই ২৪ ফুট ক্ষেত্রবিশিষ্ট মসজিদ। দোতলায় মানে মঞ্চে যেমন প্রশস্ত আঙিনা রয়েছে তেমনি নিচে আরো বড় আঙিনা রয়েছে।

আমরা প্রথমে ভেবে নিয়েছি পুরো স্থাপনা একটি দূর্গ। নিচের কক্ষগুলোতে সৈন্যরা থাকতো। কিন্তু আবার খটকা লাগলো লালবাগ কেল্লা এত কাছে থাকতে এখানে আবার কেন ছোট দূর্গ স্থাপনের প্রয়োজন হলো!

বাসায় ফিরে এই মসিজদ নিয়ে পড়তে লাগলাম। পরে জানতে পেরেছি এটা ছিল একটি স্কুল/ মাদ্রাসা। আগের দিনে যেখানে জ্ঞান চর্চা হতো।

মসজিদটির উত্তর-পূর্বদিকে নির্মিত কক্ষগুলো শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মঞ্চের উপর তিন গম্বুজ মসজিদ ও স্কুল ভবন ছাড়া অবশিষ্ট উন্মুক্ত অংশও শিক্ষার্থীদের পাঠদান কাজে ব্যবহৃত হতো।

মঞ্চের নিম্নস্থ কক্ষগুলো মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের বাসস্থান হিসেবে নির্মিত হয়েছে। এটি খুব নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। ধারণা করা হয় খান মুহাম্মদ মৃধা এই স্কুলের প্রধান পন্ডিত ছিলেন।

বর্তমানে এটি মসজিদ হিসেবে পরিচিত হলেও মসজিদ ছিল এখানে গৌণ। মূল ব্যাপার ছিল স্কুল। এই স্কুলটি যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার সুবেদার ছিলেন সম্রাট ফররুখ শীয়ার। অবশ্য তিনি তখনো মুঘল সম্রাট হননি। তখন সম্রাট ছিলেন আওরঙ্গজেব বা আলমগীর। ফররুখ শীয়ার ছিলেন আওরঙ্গজেবের প্রপৌত্র।

ফররুখ শীয়ার যখন বাংলার সুবেদার তখন ঢাকার প্রধান কাজী ছিলেন কাজী ইবাদুল্লাহ। কাজী ইবাদুল্লাহ ঢাকার সন্তানদের সুশিক্ষিত করার জন্য স্কুলের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তিনি সুবেদারের কাছে আবেদন করলে ফররুখ শীয়ার তা মঞ্জুর করে ও অর্থ বরাদ্দ করেন।

কাজী ইবাদুল্লাহ সেই অর্থ পন্ডিত খান মুহাম্মদ মৃধাকে দিয়ে একটি স্কুল নির্মানের নির্দেশ দেন। পন্ডিত সাহেব তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। মসজিদটি ছিল স্কুলের মসজিদ।

ইংরেজরা ঢাকা দখল করার পর মুসলিমদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যায় স্কুলটি বন্ধ করে দেয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত স্কুলটি বন্ধই রয়েছে। এখন পুরো স্কুল মসজিদে পরিণত হয়েছে। দোতলার শেণিকক্ষগুলো এখন মসজিদের খাদেমদের থাকার জায়গা। আর নিচতলার কক্ষগুলো ব্যবহৃত হয় লালবাগ কেল্লার কর্মচারীদের হোস্টেল হিসেবে।

খান মুহাম্মদ মৃধা মসজিদ আপনার ভালো লাগবে। বিশেষ করে দোতলায় উঠার জন্য সিঁড়ির ২৩ টি ধাপ আপনাকে নিয়ে যাবে সেই মুঘল আমলে। স্মরণ করিয়ে দেবে ইসলামী ঐতিহ্যের সেই দিনগুলোর কথা।

কৃতজ্ঞতা ও মাগফেরাত কামনা করছি তাদের জন্য যারা আমাদের প্রিয় শহরকে ইসলামের শহর হিসেবে তৈরী করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জান্নাত নসীব করুন। আমীন।

৩০ মে, ২০১৮

তারা মসজিদের আঙিনা থেকে



ঢাকা মসজিদের শহর। একথা কে না জানে? কিন্তু ঢাকা লিখে গুগোলে ইমেজ সার্চ করলে কিন্তু সেকথার প্রমাণ পাওয়া যায় না। কোনো বিদেশি যদি ঢাকা নিয়ে জানতে চায় ইমেজের মাধ্যমে তবে বুঝতেই পারবে না ঢাকা মুসলিমদের শহর। মসজিদের শহর তো পরের কথা।

আমার কাছের একজন শখের ফটোগ্রাফার এই নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। তিনি বললেন, ভাই সুযোগ করে আমরা একেকদিন একেক মসজিদে জুমার নামাজ পড়বো। এতে মসজিদগুলোর সাথে পরিচিত হবো। সাথে কিছু ছবিও তুলে নিতে পারবো। এরপর তার নাকি সেই ছবিগুলো নিয়ে বিস্তর পরিকল্পনা আছে।

সে যাকগে, আমার এত পরিকল্পনা নাই। আমি যাই তার সাথে। ঘুরতে আমার ভালোই লাগে। তবে সমস্যা হলো বেকার মানুষ তো, তেরো কোম্পানির কাজ করতে হয়। তাই অবসর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তারপরও চেষ্টা করি।

কয়েক দিন আগে প্ল্যান করেছি তারা মসজিদে যাব। ঢাকার তারা মসজিদ। অনেক পুরনো। উইকি-টুইকি সার্চ করে করে কিছু ইনফো জেনে নিলাম। গুগোল ম্যাপ থেকে জেনে নিলাম ঠিকানা। ব্যাস সব প্রস্তুতি শেষ। এবার মানিব্যাগে ঢুঁ মেরে দেখে নিলাম কী অবস্থা। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। সিকি আধুলি সব মিলে একশ বিশ টাকা। এটা দিয়ে তো হবে না। কারণ সুন্দর করে মাঞ্জা মেরে বের হবো ভাবছি।

এখন যদি লোকাল বাসে যাই তবে ফিটফাট পোশাকের বারোটা বেজে যাবে। তাহলে? যাই হোক যেতে হবে। কারণ আমার কাছে টাকা পয়সার চাইতে সময় আরো দুর্লভ। তাই দেরী না করে বেরিয়ে পড়লাম। মনে মনে ভাবছি আরেকজনের পকেটের কুরবানী করে আজ পার হয়ে যাবো।

শুনেছি বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। পরবর্তিতে কিছু বিজ্ঞ গবেষক জানালেন না, তা নয়, শেষ স্বাধীন নবাব হলেন মীর কাসিম। তিনি স্বাধীনভাবে চলতে গিয়ে ইংরেজদের সাথে বক্সারের যুদ্ধে উপনীত হন। অবশেষে মারা পড়েন। কিন্তু আমি জানি এসব কিছুই সঠিক নয়। বাংলার স্বাধীন নবাবরা আজো আছেন। বীর বিক্রমে রাজপথ দাপিয়ে বেড়ান। তারা হলেন সিএনজি ড্রাইভার। আপনি যেখানেই যাবেন তারা তাদের ইচ্ছেমত ভাড়া দাবী করে নবাবী হালে উদাস হয়ে চেয়ে থাকবেন। আপনার ইচ্ছে হলে যাবেন না হলে হাঁটবেন।

নিজের পকেটের যা অবস্থা তা দিয়ে নবাবের গাড়িতে উঠাতো দূরস্থান, নবাবের পায়ের ধূলোও কিনতে পারবো না। ইঙ্গিতে বুঝালাম সঙ্গীদের আমার অবস্থা সঙিন।

আমরা মোটে তিনজন। সবাই হাঁটছি। হঠাৎ বৃষ্টির দেখা পেলাম। সবাই তো খুব অবাক। যদিও কিছুদিন ধরে বৃষ্টিকে কামনা করছিলাম। কিন্তু তাই বলে এখন পবিত্র হয়ে মসজিদে যাচ্ছি। এখন তো তার আসা উচিত হয়নি। মুখটা পাংশু করে পালানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু জানেনইতো আমার ভারী শরীর। এই নিয়ে পালানো সহজসাধ্য নয়।

বৃষ্টির অত্যাচারে বিশ মিনিট ধরে আটকে আছি। সঙ্গীদের একজনকে দেখলাম মোবাইল গুতাচ্ছে। বললো উবার কল করতেছি। আজকে গাড়িতে করে যাবো। আমি দরিদ্র মানুষ। গাড়ি টাড়ি দেখলে কী করতে গিয়ে কী করে ফেলি এই ভয়ে এসব উবার টুবারে কাছে ঘেঁষি না।

বললাম ভাই আমারে বেচলেও গাড়ি ভাড়া হবে না। বাদ দেন। সে আমার মতন ভীরু কিসিমের না। সাহসী মানুষ। বললো, আরে দেখেন না কারবার! দেখতে দেখতে বৃষ্টির মধ্যে একটি গাড়ি এসে হাজির। ঝটপট উঠে পড়লাম। আমাদের মত অনেকেই বৃষ্টির ভয়ে আড়াল হয়ে ছিল। গটাগট করে তিনজন গাড়িতে উঠতে দেখে মুখটা করুণ হয়ে গেলো অনেকের।

বেশ ভাব নিয়ে গাড়িতে উঠলাম। মানুষ দরিদ্র হলে কী হবে! ভাবের কমতি নেই। গাড়িতে উঠার পর বৃষ্টির তীব্রতা আরো বেড়ে গেলো। ভাব-সাব বাদ দিয়ে নাকটা গুঁজে দিলাম গাড়ির কাঁচে। আহা কী শান্তি বৃষ্টি যেন এসে পড়ছে আমার মুখে।

অপর সঙ্গীদ্বয় ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি ছবি-টবি ভালো তুলতে পারিনা। তাই ওসবে নাই আমি। আমি বৃষ্টি উপভোগ করছি গাড়িতে বসে। গাড়ি এগিয়ে চললো গুলিস্তান-বংশাল হয়ে তারা মসজিদ পানে।

বেশ উপভোগ করে এলাম। কিন্তু এখন গাড়ি ভাড়া দেয়ার সময় হয়েছে। আমি ভাবতেছি না জানি কত টাকা বিল এসেছে। দেখলাম আমার সঙ্গী মাত্র ৬০ টাকা দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলো। আমি হা করে রইলাম!

সে বললো উবার ৭০% ডিসকাউন্ট দিয়েছে। তাইতো অভাবের দিনে গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াই। মনে মনে খুশি হলাম। যাক এবার তাহলে বিদেশী বেনিয়া উবার ঠিকই দেশীয় স্বাধীন নবাবদের নবাবী ছুটিয়ে দিবে। বুঝলাম এমনই কোন কারণে হয়তো মুর্শিদাবাদের জনগণ সিরাজের পতন উপভোগ করেছিলো।

মসজিদে ঢুকেই প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। কী সুন্দর উঠান। সবুজ ঘাসের কার্পেট বিছানো। সেখানে বড় করে একটি কংক্রিটের তারা অবস্থান করছে। লোকজন চাইলে সেখানে বসে বিশ্রামও করতে পারে। মসজিদের বাইরের চাইতেও ভিতরের কারুকাজ আমাকে বিমোহিত করেছে। খুব বড় মসজিদ নয়। তবে যত আগের মসজিদ তত আগে এই মসজিদই যে সবচেয়ে বিশাল স্থাপনা ছিল সেটা সহজেই অনুমেয়।

সাদা মার্বেলের গম্বুজের ওপর নীলরঙা তারায় খচিত এ মসজিদ নির্মিত হয় আঠারো শতকের প্রথম দিকে। মসজিদের গায়ে এর নির্মাণ-তারিখ খোদাই করা ছিল না। বিভিন্ন সুত্র থেকে ইতিহাসবিদেরা অনুমান করেন, আঠারো শতকে ঢাকার 'মহল্লা আলে আবু সাঈয়ীদ'-এ (পরে যার নাম আরমানিটোলা হয়) আসেন জমিদার মির্জা গোলাম পীর। যার আসল নাম মির্যা আহমদ জান। ঢাকার ধণাঢ্য ব্যক্তি মীর আবু সাঈয়ীদের নাতি ছিলেন তিনি। মির্জা গোলাম পীর এ মসজিদ নির্মাণ করেন। ‌মির্জা সাহেবের মসজিদ হিসেবে এটি তখন বেশ পরিচিতি পায়। ১৮৬০ সালে মারা যান মির্জা গোলাম পীর। পরে ১৯২৬ সালে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী জান বেপারী মসজিদটির সংস্কার করেন। সে সময় জাপানের রঙিন চিনি-টিকরি পদার্থ ব্যবহৃত হয় মসজিদটির মোজাইক কারুকাজে।

পুরাতন তারা মসজিদ বর্তমান তারা মসজিদের ন্যায় নকশালংকারে সমৃদ্ধ ছিল না। মসজিদের পিছনের ভগ্ন ও নগ্ন দেয়াল সেই সাক্ষ্য বহন করছে। এ মসজিদের দরজাগুলির মধ্যে দক্ষিণ দিকের তিনটি দরজাই প্রাচীন। ১৯২৬ সালে আলীজান ব্যাপারী বহু অর্থ ব্যয় করে মসজিদটির পূর্বপার্শ্বে বারান্দা সংযুক্ত করে মসজিদের আকৃতি বৃদ্ধি করেন। এতে কেবল প্রস্থের দিক বর্ধিত হয়। চারটি স্তম্ভ ও পাঁচটি খিলানে মসজিদের সম্মুখভাগ গঠিত হয় এবং প্রস্থে ৩.৯৯ মিটার সম্প্রসারিত করায় তারা মসজিদের প্রস্থ দাঁড়ায় একেবারে দ্বিগুণ অর্থাৎ ৭.৯৮ মিটার। এ সময়ের সম্প্রসারণে মসজিদের মূল ভূমিনকশায় কোনোরূপ পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে বিভিন্ন নকশার রঙিন চকচকে টালির সংযোজন করা হয়।

১৯৮৭ সালে তিন গম্বুজের তারা মসজিদকে পাঁচ গম্বুজের মসজিদে রূপান্তর করা হলে মসজিদটি দৈর্ঘ্যে বৃদ্ধি পায়। অবশ্য প্রস্থে কোনোরূপ পরিবর্তন করা হয় নি। বর্তমানে সম্প্রসারিত মসজিদের দৈর্ঘ্য ২১.৩৪ মিটার এবং প্রস্থ ৭.৯৮ মিটার। পাঁচ গম্বুজের মসজিদে পরিবর্তন করার প্রয়োজনে একটি মিহরাব ভেঙ্গে ফেলা হয় এবং দুটি নতুন গম্বুজ ও তিনটি নতুন মিহরাব যুক্ত করা হয়। মসজিদে প্রবেশের জন্য পাঁচটি খিলানবিশিষ্ট পথ সৃষ্ট করা হয়েছে। এ খিলানগুলি বহু খাঁজবিশিষ্ট এবং চারটি অষ্টভুজাকৃতির স্তম্ভ হতে উত্থিত। মসজিদের অভ্যন্তরে ও বাইরে সম্পূর্ণরূপে মোজাইক নকশা করা।

মসজিদের গায়ে চিনামাটির প্লেট, পেয়ালা ইত্যাদির ছোট ভগ্নাংশ ও কাঁচের টুকরা ব্যবহূত হয়েছে। এ পদ্ধতিকে ‘চিনি টিকরী’বা চিনি দানার কাজ বলা হয়। ফুলদানি, ফুলের ঝাড়, গোলাপ ফুল, এক বৃন্তে একটি ফুল, চাঁদ, তারা, নক্ষত্র ও আরবি ক্যালিগ্রাফিক লিপি মসজিদের দেয়ালকে অসাধারণ সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে। প্রায় বৃত্তাকার শ্বেত-শুভ্র গম্বুজগুলিতে বসানো হয়েছে নীল রঙের অসংখ্য তারা বা নক্ষত্র। সমগ্র নকশায় সর্বাধিক প্রাধান্য পেয়েছে তারার ‘মোটিফ’; তাই মসজিদটি তারা মসজিদ নামে খ্যাত।

জুমার নামাজ শেষ করে যখন বাড়ি ফিরছিলাম তখন বার বার ফিরে তাকিয়েছি। ছেড়ে যেতে একদম ইচ্ছে করছিলো না। তারা মসজিদ আমার মন কেড়েছে। আমি নিশ্চিত আপনাদেরও মন কাড়বে।

কীভাবে যাবেন? 
ভ্রমণ বর্ণনা লিখলে একথা অবশ্যই লিখতে হয় সেখানে কীভাবে যেতে হবে? তবে এসব ধারণা পুরাতন হয়ে গেছে। এখন এগুলোর প্রয়োজন পড়ে না। আপনি গুগোল ম্যাপে যাবেন। তারা মসজিদ লিখে সার্চ করবেন। আপনাকে দেখিয়ে দিবে আপনার বাসা থেকে আপনি কীভাবে কোন রাস্তা দিয়ে সেখানে যাবেন। সুতরাং এসব কথা বলে লিখার দৈর্ঘ্য আর বাড়াতে চাই না।

১৬ মে, ২০১৮

হুট করে পরিচিত হলাম উমেদ খাঁর সাথে



কিছুদিন আগে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরাতন একটি মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছি। সাথের সঙ্গীরা পুরাতন সেই মসজিদের ছবি তুলতে ব্যস্ত। আমি ওর মধ্যে নেই। আর তাছাড়া আমি ভাল ছবিও তুলতে পারি না। আমি ইতিহাসের ছাত্র। তাই খুঁজতে গেলাম কীভাবে এই মসজিদটি স্থাপিত হলো? এর ইতিহাসই বা কী?

মসজিদটি হলো সাত গম্বুজ মসজিদ। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছেই। আমি খুঁজতে লাগলাম কোন মুরব্বী শ্রেণির মানুষ পাই কিনা? পেয়েও গেলাম কয়েকজনকে। তাদের সাথে গল্প করতে লাগলাম এই ঐতিহাসিক মসজিদের ইতিহাস নিয়ে।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবরে কে না চিনে? তার মত ধার্মিক ও ক্ষমতাশালী সম্রাট মুঘলদের মধ্যে আর কেউ ছিল না। তার আমলেই মুঘলরা চট্টগ্রাম থেকে কাবুল পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। ফতোয়ায়ে আলমগীরী সুন্নী হানাফী মাযহাবের একটি অসাধারণ সংকলিত আইনের বই।

আওরঙ্গজেব প্রায় ৫০০ আলেম নিয়োগ করেছেন এই ফতোয়ার বইকে সমৃদ্ধ ও নির্ভুল করার জন্য। উনি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এই বই থেকেই সাহায্য নিতেন।

আলমগীর/ আওরঙ্গজেব ক্ষমতা গ্রহণ করার সময় চট্টগ্রাম বাংলার সাথে ছিল না। এটা শাসন করতো আরাকনীরা। আবার সেখানে ছিল পর্তুগীজদের উৎপাত। এই দুই দস্যু প্রজাতির মানুষের শাসনের ফলে সেখানের মানুষরা অবর্ণনীয় জুলুমের মধ্যে ছিল।

দিল্লিতে মুঘল শাসকদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সুযোগে বাংলায়ও মুঘল শাসন শক্তিশালী ছিল না। তখন বাংলায় স্বাধীন নবাবদের উত্থান হয়। চট্টগ্রামের মানুষরা বিশেষত মুসলিমরা নবাবদের কাছে তাদের উদ্ধারের আহবান জানান। তারা আরাকানদের সাথে লড়ে ব্যর্থ হন। এই ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল আরাকানীদের শক্তিশালী নৌবাহিনী। অন্যদিকে বাংলার শাসকরা নদীপথের যুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন না।

যাই হোক বাংলার এহেন দুর্দশায় আওরঙ্গজেব সুবেদার হিসেবে থাকা মীর জুমলাকে প্রত্যাহার করে নেন। এবং সেখানে নতুন দায়িত্ব দেন মীর্যা আবু তালিবকে।

মীর্যা আবু তালিব তার মূল নাম হলেও তিনি এই নামে পরিচিত নন। তিনি পরিচিত তার উপাধি দিয়ে। তার উপাধি ছিল শায়েস্তা খাঁ। এই উপাধি তাকে দিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান। তার এই উপাধি ছিল সরকারি কাজে তার নিষ্ঠা ও যুদ্ধের ময়দানে বীরত্বের জন্য। শায়েস্তা খাঁ ভালো শাসকের পাশাপাশি ছিলেন একজন ভালো মুসলিমও।

যাই হোক তিনি যখন ঢাকায় এসেছিলেন তখন ঢাকার মানুষ খুব খুশি হন। শায়েস্তা খাঁর নাম ডাক ইতিমধ্যে ঢাকায়ও প্রচার হয়েছিল। ঢাকার সবাই তার কাছে বিভিন্ন আবদার নিয়ে আসলো।

এমনি কিছু আবদার নিয়ে এলো মোহাম্মদপুরের মানুষরা। তখন তার নাম মোহাম্মদপুর ছিল না। বলতে গেলে এটা ছিল ঢাকার অনেক বাইরে। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে। সেখানে বিশুদ্ধ পানি, নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা ইত্যাদি দাবী নিয়ে এসেছিল তারা।

শায়েস্তা খাঁ এই বিষয়ে দায়িত্ব দিলেন তাঁর ছেলে উমেদ খাঁকে। উমেদ খাঁ এসে দেখলেন এখানে মুসলিম নেই বললেই চলে। মাত্র চারটি পরিবার। উমেদ খাঁ তাদের প্রয়োজনমত এবং রাজ্যের সাধ্যমত সমস্যাগুলোর সমাধান করলেন।

তারপর তিনি মুসলিমদের বললেন তিনি এখানে একটি মসজিদ করতে চান। মুসলিমরা বললো এখানে তো মুসলিম খুব বেশি নেই। আমরা মাত্র চার পরিবার।

তখন তিনি বললেন এখানে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ হবে। এই মসজিদ থেকেই এই এলাকার প্রশাসনিক কার্যক্রম হবে। বিচার সালিশ হবে। এখানে ধ্বনিত হবে পাঁচবার আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা। এখানকার মানুষ এই মসজিদের প্রভাবে মুসলিম হয়ে যাবে।

সেসময়ের মুসলিমরা বুঝতে পারেনি। কিন্তু উমেদ খাঁ ঠিকই বুঝতে পেরেছেন। মাত্র বিশজন মুসলিমের জন্য তিনি বানিয়েছেন ২০০ মুসল্লি ধারণ ক্ষমতার এই সাত গম্বুজ মসজিদ। মুসলিমরা তো অবাক। এতবড় মসজিদ দিয়ে তারা কী করবে? উমেদ খাঁ বললেন, তোমরা যদি ন্যায়নিষ্ঠ হও আর তোমাদের মধ্যে যদি সাহাবাদের চরিত্র থাকে তবে তোমরা দেখবে এই এলাকায় এত মুসল্লি হবে যে, তোমরা মসজিদে জায়গা দিতে পারবে না।

উমেদ খাঁ এই এলাকার নাম রাখলেন মোহাম্মদপুর। সত্যিই সেদিনের সেই অল্প কয়জন মুসলিমের প্রভাবে ও সুবেদার শায়েস্তা খাঁর ন্যায় বিচারে পাল্টে গেলো মোহাম্মদপুরের চিত্র।

আমি উমেদ খাঁর নাম সেদিনই মোহাম্মদপুরের মুরুব্বীদের কাছ থেকে শুনলাম। বাসায় এসে তাঁকে নিয়ে পড়তে বসলাম। অবাক হলাম। আসলেই তিনি ছিলেন দাওয়াতী চরিত্রের মানুষ।

শুধু মোহাম্মদপুর নয় পুরো বাংলায় বহু স্থানে তিনি তাঁর মিশনারি কার্যক্রমের স্বাক্ষর রেখেছেন। সেসময়ে মানুষ তাকে বলতো বুজুর্গ উমেদ খাঁ।

চট্টগ্রামের মুসলিমদের উদ্ধারে শায়েস্তা খাঁ তাঁর ছেলে উমেদ খাঁকেই পাঠিয়েছেন। তিনি শক্তিশালী আরাকানীদের পরাজিত করেন শুধু অস্ত্রের জোরে নয়। বুদ্ধি, কূটনীতি, উদারতা সবকিছু দিয়েই তিনি চট্টগ্রাম জয় করেন।

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ তাঁর তৈরী। এটাকে আগে পর্তুগিজরা ও আরাকানীরা যুদ্ধের দূর্গ হিসেবে ব্যবহার করতো। আওরঙ্গজেবের নির্দেশে কিল্লাতেই মসজিদ নির্মাণ করেন উমেদ খাঁ।

এই মসজিদ থেকেই চট্টগ্রামে ইসলামের প্রচার প্রশাসনিকভাবে শুরু হয়। এখানে উমেদ খাঁ মসজিদ, সরাইখানা, বিশ্রামাগার, লাইব্রেরি, গবেষণাগার ইত্যাদি তৈরী করেন। পাশাপাশি এই মসজিদ চট্টগ্রামের নিরাপত্তার জন্য দূর্গ হিসেবেও ব্যবহার হয়।

ইংরেজরা এই দূর্গ দখল করতে অনেক বেগ পেতে হয়। তাই তারা আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ দখল করেই নামাজ পড়া বন্ধ করে দেয়। এখানে তারা অস্ত্রের গোডাউন হিসেবে ব্যবহার করে। পরে ১৮৮৫ সালে সালে তা আবার মুসলিমরা উদ্ধার করে নামাজ পড়া শুরু করে।

উমেদ খাঁ সম্পর্কে আরেকটি কাহিনী আমি জানতে পেরেছি। উমেদ খাঁ চট্টগ্রাম অধিকার করার পর হিঁদু জমিদার শ্যাম রায় তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে। শ্যাম রায় তার সাথে পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

সেসময় উমেদ খাঁ শ্যাম রায়ের বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের পরিচয় পান। তিনি তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক সৃষ্টি করেন এবং ইসলামের দাওয়াত দেন। শ্যাম রায় প্রথমে অস্বীকার করে। হাল না ছেড়ে এবং ক্ষুব্দ না হয়ে ধীরে ধীরে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেন উমেদ খাঁ।

একপর্যায়ে উমেদ খাঁ জয়ী হন। শ্যাম রায়ের মন বিগলিত হয়। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। উমেদ খাঁ অত্যন্ত খুশি হন এতে। তিনি শ্যাম রায়ের কাছে তার বোন বিয়ে দেয়ার প্রস্তাব নিয়ে যান পিতা শায়েস্তা খাঁয়ের কাছে। শায়েস্তা খাঁ রাজি হন।

দেওয়ান মনোহরের (শ্যাম রায়) সাথে চট্টগ্রামের একটি বৃহত হিঁদু সমাজ ইসলামে ছায়াতলে এসে পড়েন। সেই থেকে চট্টগ্রাম ইসলামী ভাবধারার শহরে পরিণত হয়। আওরঙ্গজেবের পরামর্শে উমেদ খাঁ চট্টগ্রামের নাম রাখেন ইসলামাবাদ।

আফসোস হয়, সেসময়ের মুসলিম ও মুসলিম নেতারা ছিলেন মিশনারি চরিত্রের। তাঁরা কাফির-মুশরিকদের মুসলিম বানাতেন। আর এখনকার মুসলিমদের মধ্যে সেই বিখ্যাত হয় যে ফিরকাবাজ ও ফিতনাবাজ। আমাদের দেশে এখন সেই বড় মুসলিম নেতা যে কথায় কথায় মুসলিমদের কাফির-মুশরিক বানায়।

আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।