ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২৫ মার্চ, ২০২১

সন্দ্বীপের কোলে দু'দিন



সন্দ্বীপের ইতিহাস বেশ পুরনো। এটি একসময় শিল্প, শিক্ষা, ব্যবসায় অনন্য ছিল। শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জাহাজ, লবণ ও বস্ত্র। সন্দ্বীপের জাহাজ রপ্তানী হতো আরবে। এটা সেসময়ের কথা যখন ইউরোপিয়ানরা জাহাজ বানানো দূরে থাকুক, কেনারও সামর্থ রাখতো না।

সন্দ্বীপের লবণ ও কাপড় সারা পৃথিবীতে বিক্রি হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রিপোর্ট অনুসারে প্রতি বছর সন্দ্বীপে উৎপাদিত প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার মণ লবণ, তিনশ জাহাজে করে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো।

একটি সমৃদ্ধ দ্বীপ ছিল সন্দ্বীপ। মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি আব্দুল হাকিমের বাড়ি এখানেই। তিনি বলেছেন বিখ্যাত সেই কথা

//যেসব বঙ্গে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী
সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।//

মুঘল আমল পর্যন্ত এখানকার বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ভাঙ্গন, তুফান আর চট্টগ্রামের মগদের আক্রমণ। সীতাকুন্ড দিয়েই মগরা বেশিরভাগ আক্রমণ পরিচালনা করতো। সে কারণেই সম্ভবত সীতাকুণ্ডের দিকে সন্দ্বীপের যে ইউনিয়ন তার নাম মগধরা ইউনিয়ন। ১৬০০ সাল থেকে এটি বিদেশীদের নজরে পড়ে। তার আগে মুসলিম বণিকেরা এখানে ইসলাম কায়েম করে।

প্রথমে পর্তুগালের ব্যবসায়ীরা এখানের বাসিন্দাদের জিম্মী করে। এরপর মগরাজ। তাদের ঠেকিয়ে এখানে স্বাধীন রাজ্য কায়েম করেন দিলওয়াল খাঁ। তারপর শায়েস্তা খাঁর ছেলে উমেদ খাঁ এখানের মানুষদের সাথে নিয়ে শক্তিশালী নৌ-বাহিনী তৈরি করেন। তারপর তাদের সাথে নিয়ে চট্টগ্রাম দখল করে মগদের অত্যাচার থেকে সন্দ্বীপবাসীকে উদ্ধার করেন।

ব্যবসা, যোগাযোগ ও শিল্পে এগিয়ে থাকার কারণে বঙ্গের একসময়ের বড় বন্দর ছিল সন্দ্বীপ। শিক্ষা-দীক্ষাও সন্দ্বীপ ছিল নামী এলাকা। তাই এখানে বড় বড় কবি সাহিত্যিকেরা আসতেন। শুধু তাই নয় এখানের সৌন্দর্যও ছিল নজরকাড়া। ইবনে বতুতা, সিজার ফ্রেডরিকের মতো বিখ্যাত পর্যটকরাও সন্দ্বীপকে এড়িয়ে যেতে পারেননি। কবি নজরুল এখানে এসে লিখেছেন বিখ্যাত মধুবালা গীতিনাট্য। এছাড়া চক্রবাকের অনেকগুলো কবিতাও সন্দ্বীপে সাগরের পাড়ে বসে রচনা করেন।

সন্দ্বীপের অবনতি হতে শুরু করে ইংরেজ আমলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তাদের ব্যবসা ঠিক রাখতে বঙ্গের সকল শিল্প বন্ধ করে দেয়। তাদের লবণ চালানোর জন্য এখানের লবণ কারখানা বন্ধ করে দেয়। ইউরোপীয় নিম্নমানের কাপড় ভারতে চালানোর জন্য এখানের সকল চরকা বন্ধ করে দেয়। যারা গোপনে চরকা চালাতো তাদের বুড়ো আঙ্গুল কেটে দেয়। আমার জানামতে আজ পর্যন্ত সন্দ্বীপে বস্ত্রশিল্প গড়ে উঠেনি।

আমার তো মনে হয়, নবাবদের ভুলে যদি ব্রিটিশদের কাছে বাংলার পরাজয় না হতো তবে শিল্প বিপ্লব ইউরোপে হতো না, বাংলায় হতো। অবশ্য এটা আমার ধারণা। এখানের সকল শিল্পই বিশ্বে সর্বাধিক উন্নত ছিল যা ইংরেজরা দুইশ বছর বন্ধ রেখেছে। তাদের শোষণে একটি শিক্ষিত, ধনী ও উন্নত জাতি পর্যায়ক্রমে অশিক্ষিত ও গরীব জাতিতে পরিণত হয়েছে।

ইংরেজরা বঙ্গের এই সমৃদ্ধ এলাকা থেকে প্রচুর রাজস্ব আদায় করার চেষ্টা চালিয়েছে। শায়েস্তা খাঁ এখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আগের থেকেও খাজনা কমিয়ে দেয়। যার ফলে এখানের বাসিন্দারা মুঘলদের অনুগত থাকতে পছন্দ করেছিল। ইংরেজদের চাহিদা অনুসারে ব্যাপক খাজনা আদায় করা সম্ভব হয়নি বিধায় স্থানীয় মুসলিম জমিদাররা জামিদারি হারিয়েছে। সেসময়ে প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন আবু তোরাব।

মীরজাফরের জামাতা মীর কাসিম এখানে গোকুল ঘোষাল নামে কোলকাতার এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে জমিদার হিসেবে অনুমোদন করে। গোকুল ঘোষাল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে জমিদার হিসাবে রাজস্ব সংগ্রহের উদ্দেশ্য সন্দ্বীপ আগমন করেন ১৭৬৩-৬৪ সালে। তার সাথে আবু তোরাবের বিরোধ চরমে পৌঁছে ১৭৬৭ সালে।

জমিদার আবু তোরাব ইংরেজ ওয়াদদাদারের কাজে রাজস্ব জমা দেয়া থেকে পুরাপুরি বিরত থাকেন। তাছাড়া, গোকুল ঘোষালের প্রতিনিধিদের সন্দ্বীপ থেকে বিতাড়ণের জন্য আবু তোরাব তাঁর সেনাপতি মালকামকে নির্দেশ প্রদান করেন।

অতঃপর মীর জাফরের জামাতা নবাব মীর কাসেমের নির্দেশে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী থেকে নবাবের অনুগত একদল সৈন্য এসে তোরাব আলীর মুখোমুখি হয়। কিন্তু প্রতিরোধ ও চাপের মুখে কিছুদিনের মধ্যে গোকুলের লোকজন সন্দ্বীপ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। অবশেষে ক্যাপ্টেন নলিকিন্স এবং আরো কয়েকজন সেনাধ্যক্ষের নেতৃত্বে ইংরেজ সেনাবাহিনী নদী পার হয়ে সন্দ্বীপে পৌঁছায়।

১৭৬৭ সালের মধ্যভাগে সন্দ্বীপ শহরের সামান্য উত্তরে চার আনি হাটের অদূরবর্তী কিল্লাবাড়িতে আবু তোরাব বাহিনীর সাথে ক্যাপ্টেন নলিকিন্স-এর বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে আবু তোরাব পরাজিত ও নিহত হন। আবু তোরাব চৌধুরী জমিদার হলেও সুশাসনের কারণে কৃষক প্রজারা তাঁকে ভালবাসতেন। এ করণে উপরিউক্ত যুদ্ধে সন্দ্বীপের কৃষকগণ আবু তোরাব চৌধুরীর পক্ষাবলম্বন করেন। ইতিহাসে এটি সন্দ্বীপের প্রথম কৃষক বিদ্রোহ বলেও খ্যাত হয়।

এরপরে আরো দুইবার এখানের লোকেরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। শেষ অন্তত বিশ বছর এখান থেকে খাজনা নিতে পারেনি ইংরেজরা।

সন্দীপের যোগাযোগ ব্যবস্থা সব জায়গায় সমভাবে ভালো নয়। সীতাকুন্ড থেকে ২৫০ টাকা ভাড়া লাগে স্পিডবোটে। এখানে খুবই নৈরাজ্য চলে। সুযোগ পেলেই তারা দাম বাড়িয়ে দেয়। এখানে নিয়মিত চলাচল করার জন্য ওয়াটার বাস চালু করা দরকার তাহলে দুর্ভোগ কমবে আশা করি। এখানে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের সাথে কানেক্ট করা হয়েছে। এখন ধীরে ধীরে এখানে মানুষ বিদ্যুতের পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছে।

পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালের আগ পর্যন্ত সন্দ্বীপ নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। নোয়াখালী থেকে যাতায়াত সহজ ছিল না এবং সন্দ্বীপের পশ্চিম অংশ ভাংতে থাকায় এটি নোয়াখালী থেকে দূরে সরে গিয়েছে। প্রশাসনিক সুবিধা হাসিলের জন্যই চট্টগ্রামের সাথে যুক্ত হয়।

তবে এখানকার মানুষের কালচার ও ভাষা অনেকটাই নোয়াখালীর মতো। সকালবেলা নামাজ পড়েই এখানের চা-দোকানে চা খেতে খেতে এলাকাবাসীর সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম। এখানের গরুর দুধের চা আর গুলগুইল্লার স্বাদ বহুদিন মুখে লেগে থাকবে। সন্দ্বীপ ট্যুরে এসে এখানের স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি যা সত্যিই দারুণ ছিল।

বরাবরের মতো এখানের ইমাম সাহেবকে পেয়েছি নোয়াখালীর। এটা আমার এক দারুণ অভিজ্ঞতা। আমি বাংলাদেশের যত স্থানেই ঘুরতে গিয়েছি সেখানের মসজিদ বা মাদ্রাসায় নোয়াখালীর লোক আমি পেয়েছি। এখানেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। ভদ্রলোক আমাদের জন্যে মসজিদ সর্বক্ষণ খোলা রেখেছেন। মসজিদের টয়লেট, টিউবওয়েল, পুকুর ইত্যাদি ব্যবহার আমাদের জন্য সহজ হয়েছে।

সাগরের পাড়ে ক্যাম্প করার জন্য একটি আদর্শ স্থান সন্দ্বীপের হরিশপুর। তবে অবশ্যই আবহাওয়া অনুকূলে থাকা প্রয়োজন। শীতকালের আশে পাশে হলে ভালো হয়। কিছুদিন পর কালবৈশাখী শুরু হলে এখানে আর আসা যাবে না।

৩১ ডিসে, ২০১৯

গাজী খান জাহানের ক্যান্টনমেন্টে একদিন



বন্ধুবর মঈন সাহেবের বিয়ে। খুলনায় যেতেই হবে। তার একদিন পর আবার আরেক কলিগের বিয়ে সাতক্ষীরায়। সেখানেও যেতে হবে। এদিকে পকেট প্রায় ফাঁকা। কী যে করি! সুন্দরবনে যাবো অনেক দিন ধরেই ভাবছি। তবে নানান প্রতিবন্ধকতায় সুন্দরবনে যাওয়া হয়নি। যাই হোক পকেটের অংকের সাথে জরুরী প্রয়োজনের হিসেব কোনদিনেই মিলে না।

অবশেষে প্ল্যান করলাম খুলনা-সাতক্ষীরা থেকে ঘুরে আসে। সাথে বাগেরহাট ও সুন্দরবনও একনজর দেখে আসি।

একজন দুজন করে সাতজন জুটে গেলো। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ফোরকাস্ট করলো আগামী কয়েকদিন শীত বেড়ে যাবে, কুয়াশা হবে প্রচুর, শৈত্যপ্রবাহ সাথে বৃষ্টিও থাকবে।

রাতে রওনা হলাম। পরদিন দুপুরে বিয়ে। যেহেতু আবহাওয়া সুবিধের না, ভেবেছি আমাদের পৌঁছাতে সকাল গড়িয়ে যাবে। বাসে উঠে গল্প-গুজব শেষ করে যেই চোখটা একটু লেগে আসলো তখনই মাওয়া ঘাটে আমাদের বাস থকে নামিয়ে ফেরিতে উঠানো হলো। ফেরিতে বসা পরের কথা দাঁড়ানোরও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। অবশেষে পদ্মা নদীর ঐ পাড়ে পৌঁছলাম।

ভোগান্তি ছাড়াই ঐ পাড়ে দাঁড়ানো কানেক্টিং বাস পেয়ে গেলাম। বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লাম। এই সময় এক সহযাত্রীর হাঁক ডাকে ঘুম টুটে গেলো। সে আমাদের সবাইকে চিৎকার করে জানালো গাড়ি খুলনা শহর পার হয়ে চলে যাচ্ছে। তখনো সুবহে সাদিকও হয়নি। শিরোমনি বাজারে নামলাম। সেখান থেকে আবার সোনাডাঙায় ফেরত এলাম। ঘুমে থাকার কারণে কিছু টাকা খরচ হলো। কিন্তু খরচেই চাইতেই যেটা বেশি গায়ে লেগেছে তা হলো ঠান্ডা। সোনাডাঙা বাস স্টেশনে ফেরত আসতে গিয়ে জমে গেছি।

নামাজ ও নাস্তা শেষ করে রওনা হলাম বাগেরহাট ষাট গম্বুজ মসজিদের উদ্দেশ্যে। প্রথমে গেলাম গাজী খান জাহান আলীর মাজারে।

বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যেসকল ওলী-আউলিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে স্মরণীয় একটি নাম হযরত খান জাহান আলী (র)। একাধারে তিনি ছিলেন একজন যোদ্ধা, সাধক, ধর্ম প্রচারক ও সুশাসক। জীবনের একটা বিশাল সময় তিনি ব্যয় করেন ইসলামের সেবায়। দক্ষিণবঙ্গে খান জাহান আলী খলিফাতাবাদ নামে ইসলামী শাসন চালু করেন। খান জাহান আলীর প্রকৃত জন্ম তারিখ জানা যায় না। তিনি প্রায় ৪০ বছর দক্ষিণবঙ্গে ইসলাম প্রচার ও শাসনকার্য পরিচালনা করেন।

হজরত খান জাহান আলী (রহ.) ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আকবর খাঁ এবং মাতার নাম আম্বিয়া বিবি। খান জাহান আলীর প্রাথমিক শিক্ষা তার পিতার কাছে শুরু হলেও তিনি তার মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন দিল্লির বিখ্যাত অলি ও কামেল পীর শাহ নেয়ামত উল্লাহর কাছে। তিনি কোরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞানার্জন করেন।

খান জাহান আলী ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে তুঘলক সেনাবাহিনীতে সেনাপতির পদে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৯৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি জৈনপুর প্রদেশের গভর্ণর পদে যোগ দেন। পরবর্তী জীবনে নানা ধাপ পেরিয়ে জৈনপুর থেকে প্রচুর অর্থসম্পদ এবং প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাংলাদেশে আগমন করেন। তার এই বাহিনীতে কয়েকজন সূফি ও প্রকৌশলী ছিল। তিনি তদানীন্তন বাংলার রাজধানীর দিকে না যেয়ে সুন্দরবন অঞ্চলের দিকে আসেন এবং এখানে ইসলামী শাসন কায়েম করেন।

তিনি এই বৃহৎ অঞ্চলে কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেন। নোনা পানির এই অঞ্চলে মিঠা পানির ব্যবস্থা করেন অসংখ্য বিশাল বিশাল দীঘি খনন করে, যার অনেকই খাঞ্জালির দীঘি নামে পরিচিত। অনেক রাস্তা-ঘাট, বাজার, সরাইখানা (হোটেল) নির্মাণ করেন। তার নির্মিত রাস্তা খাঞ্জালির জাঙ্গাল নামে অভিহিত। তিনি এই অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে মাদরাসা ও খানকাহ স্থাপন করেন।
খান জাহান আলী (রহ.) এই অঞ্চলে পাথরের তৈরি মসজিদ নির্মাণ করেন। দূর-দূরান্ত থেকে পাথর নিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে অনেক কিংবদন্তি এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে এখনও শোনা যায়।

খান জাহান আলীর আগমনকালে দক্ষিণবঙ্গের বেশিরভাগ জায়গা ছিল বনাঞ্চল। বন-জঙ্গল সাফ করে তিনি ও তার অনুসারীরা দক্ষিণবঙ্গকে বসবাসের উপযোগী করে তোলেন। পুরো দক্ষিণাঞ্চল একরকম তার রাজ্য ছিল। কোনো বাধা ছাড়াই এই এলাকা তিনি শাসন করতে থাকেন। জনগণও তার নেতৃত্ব মেনে নেয়। তবে আঞ্চলিক শাসক হলেও প্রকট শাসকসুলভ জীবনযাপন কখনোই করেননি খান জাহান আলী। স্বাধীন বাদশাহদের মতো তিনি চলতেন না। এমনকি নিজের নামে কোনো মুদ্রার প্রচলনও তিনি করেননি। এছাড়া গৌড়ের সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের সময় তার সনদ নিয়ে দক্ষিণবঙ্গ শাসন করেছেন তিনি। খান জাহান আলীর মৃত্যুর পরে তার প্রতিষ্ঠিত খলিফাতাবাদেই গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক টাকশাল। পরবর্তী ৪০/৫০ বছর এই টাকশাল থেকেই বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মুদ্রা তৈরি হতো। বিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদ ছিল তার দরবারগৃহ। ষাট গম্বুজ মসজিদ হতে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিল খান জাহান আলীর বসতবাড়ি। এখন সেটির কোনো অস্তিত্বই নেই, সেটি আসলেই দুর্বল স্থাপনা ছিলো অথচ তার পাবলিক স্থাপনাগুলোর ভিত ছিলো শক্তিশালী। যেগুলো এখনো বর্তমান।

খান জাহান আলী তার দীর্ঘ শাসনামলে এই অঞ্চলের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। প্রায় ২০/২৫টি গ্রাম নিয়ে তার রাজধানী খলিফাতাবাদ গড়ে উঠেছিল। এখানে তিনি থানা, কাচারি, বিভিন্ন সরকারী দফতর, বিচারালয়, সেনানিবাস ইত্যাদি নির্মাণ করেন। প্রশাসনিক সুবিধার্থে দক্ষিণবঙ্গকে তিনি ভাগ করেন কয়েকটি ভাগে, ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন সুশাসন। তার এই ছোটখাট রাজ্যে তিনি কায়েম করেন ইসলামী হুকুমত। খলিফাতাবাদ বা বাগেরহাট এলাকায় ইসলাম প্রচারের সময় স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দুদের বাধার সম্মুখীন হন খান জাহান আলী। তাদের বিরোধিতার কারণে ঐ এলাকার রণবিজয়পুর, ফতেহপুর, পিলঙ্গজ প্রভৃতি স্থানে হিন্দুদের সাথে যুদ্ধ হয় মুসলিমদের। খান জাহান আলী তাদের পর্যুদস্ত করে নিজের শাসনক্ষমতা কায়েম করতে সমর্থ হন।

প্রায় ৪০ বছর স্বাচ্ছন্দ্যে দক্ষিণবঙ্গে রাজত্ব করেন খান জাহান আলী। এই পুরো এলাকায় ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন এই মহান সাধক। তাঁর সুশাসন ও বিনয়ী স্বভাবে আকৃষ্ট হয়ে দলে দলে এই এলাকার মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়। জীবনের শেষ দিনগুলো দরগায় বসে আল্লাহর ধ্যানে কাটিয়ে দিতেন তিনি। অনেক মূল্যবান বাণী তিনি দিয়ে যান নিজের প্রজ্ঞা ও সাধনালব্ধ জ্ঞান থেকে। এই মহান শাসক ও ধর্ম প্রচারক ৮৬৩ হিজরীর ২৬ জিলহজ্জ, ইংরেজি ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

খান জাহান আলীর মাজার সংশ্লিষ্ট বিশাল দিঘী যা ঠাকুরদিঘী নামে পরিচিত সেখানে খান জাহান একজোড়া কুমির ছেড়েছিলেন। কথিত আছে এই কুমির জোড়া তার বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেই কুমিরের বংশধররা সাতশ বছর ধরে কালাপাহাড় এবং ধলাপাহাড় নামে ছিল। তাদের সর্বশেষ বংশধর ২০১৫ সালে মারা গিয়েছে। এই কুমিরগুলোর ব্যতিক্রম হলো এরা কখনোই হিংস্রতা দেখায়নি। একেবারেই শান্ত ছিলো। মানুষ তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতো। এখনো সেই দিঘীতে কুমির আছে। তাদের পরে এনে ছাড়া হয়েছে এখানে। এরা শুরুতে কিছুটা হিংস্র থাকলেও এখন শান্ত আচরণ করে। তবে তারা আগের কুমিরদের মতো মানুষবান্ধব নয়।

গাজী খান জাহান আলী রহ. -এর মাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরেই আছে তাঁর অফিস ও ক্যান্টনমেন্ট। এখান থেকেই তিনি খলিফতাবাদের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। আমরা মাজার পরিদর্শন করে ওনার অফিস পরিদর্শনের জন্য বের হলাম। যা ষাট গম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত। দশটাকা করে ভাড়া দিয়ে ষাট গম্বুজে যাওয়ার জন্য ব্যাটারি চালিত টমটম আছে। যদিও ষাট গম্বুজ মসজিদ বলা হয় তবে এর গম্বুজ সংখ্যা ৮১ টি। মসজিদের ছাদে ৭৭ টি গম্বুজ। চারটি মিনারের উপর চারটি। সবমিলিয়ে ৮১ টি।

আভিধানিকভাবে ‘ষাটগম্বুজ’ অর্থ হলো ষাটটি গম্বুজ সম্বলিত। তবে সাধারণভাবে মসজিদটিতে একাশিটি গম্বুজ পরিলক্ষিত হয়। নামকরণের ব্যাপারে দুটি ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত সাতটি চৌচালা ভল্ট মসজিদটিকে ‘সাতগম্বুজ’ মসজিদ হিসেবে পরিচিত করে, কিন্তু সময় পরিক্রমায় এই ‘সাতগম্বুজ’ই ‘ষাটগম্বুজ’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুসারে, মসজিদের বিশাল গম্বুজ-ছাদের ভারবহনকারী মসজিদ অভ্যন্তরের ষাটটি স্তম্ভ সম্ভবত একে ‘ষাট খামবাজ’ (খামবাজ অর্থ স্তম্ভ) হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে। এটি অসম্ভব নয় যে, এই ‘খামবাজ’ শব্দটিই পরবর্তীকালে বিকৃতরূপে ‘গম্বুজ’-এ পরিণত হয়ে মসজিদটিকে ষাটগম্বুজ হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। শেষোক্ত ব্যাখ্যাটি সম্ভবত বেশি গ্রহণযোগ্য। নামকরণের এই ব্যাখ্যা বাংলাপিডিয়ার।

খানজাহান (রহ.)-এর শ্রেষ্ঠ কীর্তি ষাট গম্বুজ মসজিদ। পিরোজপুর-রূপসা মহাসড়কের পাশে খানজাহান আলী (রহ.) মাজার শরীফ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম দিকে সুন্দরঘোনা গ্রামে মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে পাকা সড়ক, পশ্চিম পাশে ঐতিহাসিক ঘোড়াদীঘি। এই দিঘীটির আয়তন প্রায় ৪০ একর। কথিত আছে এই দিঘী খনন করার পর বহুদিন এখানে পানি উঠে নি। এরপর খান জাহান আলী ঘোড়ার পিঠে আরোহন করে দিঘীতে নামেন এবং পানিপূর্ণ হওয়ার জন্য দোয়া করেন। এরপর পানি উঠতে থাকে। একারণে এই দিঘীর নাম ঘোড়াদিঘী।

ষাট গম্বুজের স্থাপত্য কৌশল আর লাল পোড়া মাটির উপর সুনিপুণ লতাপাতার অলঙ্করণে নানারূপে কারুকার্যখচিত মসজিদের ভেতর-বাইরে অভাবনীয় সৌন্দর্যের সমাবেশ ঘটেছে। বাংলাদেশে এতবড় ঐতিহাসিক মসজিদ আর নেই। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ১৬০ ফুট এবং প্রস্থ ১০৮ ফুট। আর এর উচ্চতা ২২ ফুট। এর দেয়াল প্রায় ৯ ফুট পুরু। পূর্ব-পশ্চিমে ৭টা করে ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে মাঝের এক সারিতে ৭ গম্বুজের উপরিভাগ চৌকোণা, বাকি ৭০টির উপরিভাগ গোলাকার। মসজিদের ভেতরে পূর্ব-পশ্চিমে ১০টি সারিতে ৬টা করে মোট ৬০টি স্তম্ভ রয়েছে। স্থানীয় লবণাক্ত জলবায়ুর প্রভাবে যাতে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে কারণে মসজিদের স্তম্ভের নিচে ৪ ফুট পর্যন্ত চারপাশে পাথরের আন্তরণ দেয়া হয়েছে। এসব পাথর বাইরে থেকে আমদানি করা হয়েছিল। মসজিদের ভেতর এমন জ্যামিতিক পদ্ধতিতে স্তম্ভগুলো বিন্যাস করা হয়েছে যে ইমাম সাহেবের দৃষ্টি মসজিদের যে কোনো প্রান্ত পর্যন্ত কোনো বাধা ছাড়াই পৌঁছতে পারে।

মসজিদে দরজা আছে মোট ২৫টি। এর একটি দরজা রয়েছে পশ্চিম দিকে, যা সম্ভবত জানাজার নামাজ পড়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। ছাদ থেকে প্রায় ১৩ ফুট উঁচু মসজিদের চার কোণে চারটি মিনার আছে। সামনের মিনার দুইটির ভেতর দিয়ে ওপরে যাওয়ার জন্য ঘোরানো সিঁড়িপথ রয়েছে। এ দুইটি মিনারের ভেতরে খিলানের সাহায্যে নির্মিত একটি করে ছোট কক্ষ রয়েছে। এ কক্ষ দুইটির নাম ‘আন্ধার মানিক’ ও ‘শলক মালিক’। মিনার দুইটি আজান দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো বলে মনে হয় এবং একইসাথে এসব মিনারে চড়ে খানজাহানের সৈন্যরা পাহারা দিতেন, বহিঃশত্রুর চলাচলের ওপর নজর রাখতেন।

খানজাহান (রহ.) জৌনপুরের দক্ষ নির্মাণ শিল্পী এনে এই সুবিশাল সুরম্য মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে কত সময় এবং কত লোক এর নির্মাণ কাজ করেছেন তা জানা যায়নি। এ মসজিদে প্রায় আড়াই হাজার লোক এক সঙ্গে নামায পড়তে পারে। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে অযত্নে অবহেলায় মসজিদটি জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। ১৯০৪ সালে ইংরেজ শাসনামলে পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এটি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। এরপর মসজিদটিকে কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদের চারপাশে সীমানা প্রাচীর রয়েছে। পূর্ব দিকে ছিল প্রবেশ তোরণ। তোরণের দু'পাশের দু'টি কক্ষ ছিল কিন্তু এখন তার কোন অস্তিত্ব নেই।

এটি শুধু মসজিদ ছিল না, খানজাহান (রহ.) এর দরবার ও সেনা ছাউনি হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এখান থেকেই তৎকালীন দক্ষিণাঞ্চলীয় স্বাধীন-সার্বভৌম ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র হাবেলী পরগণা বা খলিফাতাবাদ রাষ্ট্র পরিচালনা করা হতো। বর্তমান ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গণের এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো জাদুঘর। ১৯৯৩ সালে এখানে জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। জাদুঘরে ২৮টি গ্যালারি রয়েছে। এখানে খানজাহান (রহ.)- এর আমলের শতাধিক নিদর্শন সংরক্ষিত আছে।

আমাদের দুপুরে মঈন সাহেবের বিয়ের দাওয়াত ছিলো। তাই এখানে বেশি সময় অতিবাহিত করার সুযোগ পাইনি। একটার মধ্যেই খুলনায় ফেরার তাগিদ থেকে অনুপম এই নিদর্শন থেকে বিদায় নিই। ষাট গম্বুজের ঠিক উল্টোপাশেই রয়েছে সিঙ্গাইর মসজিদ। ধারণা করা হয় এটি মুঘল আমলে তৈরি করা হয়। ষাট গম্বুজের এতো কাছে আরেকটি ছোট মসজিদের কেন প্রয়োজন হয়েছিলো এই উত্তর আমি কারো কাছ থেকে পাইনি।

ষাটগম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মধ্যযুগীয় এই মসজিদটি অবস্থিত। এটি একগম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ। বর্গাকার এক গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদ সম্পূর্ণরূপে ইটের তৈরি। বাইরের পরিমাপ ১২.১৯ মি। এর দেওয়ালগুলি প্রায় ২.১৩ মি পুরু। মসজিদ ইমারতটির পূর্বদিকে তিনটি খিলানপথ আছে, আর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে আছে একটি করে। পূর্বদিকের মাঝের প্রবেশপথটি পার্শ্বদেশে অবস্থিত প্রবেশপথের চেয়ে বড়। কিবলা দেওয়ালের ভেতরে আছে খাজকৃত খিলান মিহরাব যার বাইরের দিকে রয়েছে একটি আয়তাকার।

সিঙ্গাইর মসজিদ দেখে এসে বাসে করে আবার খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ইতোমধ্যে আকাশের অবস্থা পাল্টে গেলো। রোদযুক্ত আকাশ কুয়াশাছন্ন হয়ে পড়লো। যতই খুলনার দিকে আগাচ্ছি ততই শীত জেঁকে বসা শুরু করেছে। সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ডের পাশেই আমরা হোটেল খুঁজতে থাকলাম। খুলনায় হোটেল ভাড়া চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের তুলনায় অনেক সস্তা। আমরা একটি বড় কক্ষ যেখানে তিনটি ডাবল বেড সেট করা আছে এমন একটি কক্ষ মাত্র ১৫০০ টাকায় ভাড়া করলাম। অর্থাৎ সাত জন থাকলাম ১৫০০ টাকায়। হোটেলের সার্ভিসও খারাপ ছিলো না।

হোটেলে ফ্রেশ হয়ে ও ব্যাগ রেখে দুটোর সময় গেলাম কমিউনিটি সেন্টারে। সেখানে আরো অনেক পরিচিত মানুষের সাথে দেখা হলো। বরের সাথে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে পেট পুরে খেলাম। খাওয়া শেষে বের হলাম চা খাবো বলে। খুলনায় একটা বিষয় আমাকে অবাক করেছে। এখানে হোটেলগুলোতে চা পাওয়া যায় না। একটি হোটেলে চা চেয়েছি। ম্যানেজার বললেন এটা তো হোটেল, চা দোকান না। চা পাওয়া যায় টং দোকানগুলোতে।

টং দোকানে চা খাওয়ার পর আমার সহযাত্রীরা শহর ঘুরেছেন। আর আমি আইলসা মানুষ। হোটেলে এসে ঘুম দিয়েছি। এই শীতের মধ্যে শহরে ঘোরাঘুরি আমার পছন্দ হয়নি।

১৪ আগ, ২০১৮

বাংলা বিহার উড়িষ্যার ১ম নবাবের তৈরি মসজিদের গল্প

করতলব খানের মসজিদ

একের পর এক রিকশাওয়ালা ফিরিয়ে দিচ্ছে আমাদের। কেউ চিনে না সেই মসজিদ। ঘটনা কি? ভাবলাম ভুল নাম বলছি কি না। আবারো গুগুল মামাকে জিজ্ঞাসা করলাম। না ঠিকই তো আছে। মসজিদের নাম করতলব খানের মসজিদ। পুরান ঢাকার বেগমবাজারে। 

এক রিকশাওয়ালা মামা বললেন পুরানা মসজিদ মানে কি চকবাজার শাহী মসজিদের কথা বলছেন? 
-আরে না চকবাজার না। বেগমবাজারে। আমি আসলে তখনো জানতাম না বেগমবাজার আর চকবাজার যে কাছাকাছি।  

যাই হোক এক প্রায় বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা মামা আমাদের নিয়ে যেতে রাজি হয়েছেন। আমাদের তিনজনেরই সাইজ খারাপ না। জিজ্ঞাসা করলাম মামা পারবেন তো? তিনি বললেন এই রিকশায় দশ মণ অনায়াসে পার করি। আপনারা তিনজন কিছু না। এবার আমরা আমাদের তিনজনের ওজন যোগ করে দেখলাম মোটে সাত। দশ মণ হতে ঢের বাকী। 

যাই হোক, আমরা চলতে শুরু করলাম। রিকশাওয়ালা মামা যতটা সহজ মনে করেছিলেন আসলে ততটা ছিল না। বেশ কয়েকটি উঁচু নিচু স্থানে আমরা নেমে ওনার বোঝা হালকা করেছি। 

পুরনো দিনের ছবি


বেগমবাজার জেল রোডে এসে গেলাম। পুরাতন কেন্দ্রীয় জেলখানার সামনে। এখানে এখন একজন মাত্র বন্দি। বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। খালেদার জন্য আফসোস করছি, এমন সময়ে গলির ফাঁক দিয়ে ধরা পড়লো সেই মসজিদ। গুগলে যেরকম ছবি দেখেছি সেরকম। ব্যস ব্যাপারটা  সহজ হয়ে গেলো। 

আসলেই সহজ হলো। এই মসজিদটির নাম করতলব খান মসজিদ হলেও স্থানীয়রা একে বেগমবাজার মসজিদ নামেই চিনে। করতলব খান করতে করতে জীবনপাত করলেও মনে হয় মসজিদ বের করতে পারতাম না। আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়ে মসজিদে ঢুকে পড়লাম। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগের আকার নেই। সংস্কার হয়েছে। মসজিদ বড়ও হয়েছে। 

এ পর্যন্ত যত মসজিদ দেখেছি এর মধ্যে এটাকে বেশ ভালোই লেগেছে কারণ এর সংস্কারের মধ্যে পুরোনোর আভিজাত্য রয়েছে। 

করতলব খাঁ কে ছিলেন? 
করতলব খাঁ এই নামটা আমি প্রথম পেয়েছি মসজিদ খোঁজ করতে গিয়েই। গুগোলে সার্চ করলাম ঢাকার পুরোনো মসজিদ লিখে। অনেক মসজিদের পাশে এই মসজিদের নাম পেলাম। করতলব খান মসজিদ। যদিও করতলব খান নামটা আমার কাছে অপরিচিত ছিল আসলে তিনি কিন্তু অপরিচিত নন। 



তিনি বাংলা বিহার উড়িষ্যার প্রথন স্বাধীন নবাব মুর্শিদকুলি খান। এই সিলসিলার শেষ নবাব হলেন সিরাজ উদ দৌলা।  

মুর্শিদকুলি খান ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব। আসলে তিনি নবাব ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুঘলদের দেওয়ান প্রশাসক। আওরঙ্গজেব তাকে বাংলায় নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আওরঙ্গজেবের ছেলেরা ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে বাংলায় তাদের আর প্রভাব থাকে না। কেন্দ্রীয় শাসন নষ্ট হয়ে যায়। সেই সুবাধে মুর্শিদকুলি খান হয়ে উঠেন স্বাধীন নবাব। 

মুর্শিদকুলি খানকে হাজি শফি ইসফাহানি নামে ইরানের একজন উচ্চপদস্থ মুঘল কর্মকর্তা ক্রীতদাস হিসেবে ক্রয় করেন। ইসফাহানিই তাকে শিক্ষিত করে তুলেন। ভারতে ফেরার পর তিনি মুঘল সাম্রাজ্যে যোগদান করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তিনি তার যোগ্যতা ও ইসলামপ্রিয়তার জন্য আওরঙ্গজেবের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেন।  

১৭০০-১৭০৪ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন মুর্শিদকুলি খাঁ। দিল্লির তুলনায় ঢাকা সেসময় ছিল অজগাঁ। তিনি এখানে নিজেকে ইসলামের প্রসারে নিয়োজিত করেন। দাওয়াতী কাজ করতে থাকেন মুসলিমদের মধ্যে। ঢাকায় তিনি মুসলিমদের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি তার নামে প্রথমে মুর্শিদকুলি খাঁ নাম হয়। পরে সম্রাট আওরঙ্গজেব তরুণ মুর্শিদকুলী খাঁকে ১৭১৭ সালে সম্মানসূচক করতলব খাঁ উপাধি দিয়ে দেওয়ান হিসেবে বাংলায় পাঠান। 

এরপর এই মসজিদের নাম হয়ে যায় করতলব খান মসজিদ। স্থানীয়রা মসজিদটিকে বেগমবাজার মসজিদ নামে চেনে। সময়ের পরিক্রমায় ১৭৩৯-৪০ সালে ঢাকার নায়েবে নাজিম সরফরাজ খাঁর কন্যা লাভলি বেগমের নাম থেকে মাছপ্রধান এই এলাকার বড় বাজারের নাম হয় বেগমবাজার। 

এই বাজারটি মূলত স্থাপন করা হয়েছিল পাঁচ গম্বুজ মসজিদটির ব্যয় নির্বাহ করার জন্য। সময়ের কালস্রোতে, লোকজনের সহজ পরিচিতির জন্য এক সময় বেগম বাজারের নাম জুড়ে দিয়ে মসজিদটির নাম হয়ে যায় বেগম বাজার মসজিদ। যা এখনও চলছে। ধারণা করা হয়, এক সময় বুড়িগঙ্গা নদীর অববাহিকা এই মসজিদের কোল ঘেষে প্রবাহিত হত । পরে নদীর গতি পথ পরিবর্তিত হয়ে প্রায় দেড় কি.মি. দূরে চলে যায়। 

সে সময়কার অন্যান্য মসজিদের মতো করতলব খান মসজিদটিও উঁচু ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হয়। পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের উত্তরদিকে একটি কক্ষের মতো বর্ধিত দোচালা রয়েছে। সংযোজিত দোচালা অংশসহ মসজিদটি একটি উঁচু ভল্টেড প্লাটফর্মের পশ্চিমের অর্ধেক অংশ দখল করে আছে। প্লাটফর্মের পূর্বে রয়েছে একটি বাব বা বাউলি (ধাপকৃত কুয়া)। উত্তর-দক্ষিণে ৩৯.৬২ মি এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৩.৪১ মি প্লাটফর্মের উত্তর প্রান্ত খিলানাকৃতির। প্লাটফর্মের খিলানাকৃতির অংশটির মাঝ বরাবর কেটে একটি সমাধির জন্য জায়গা করা হয়েছে। 

নামাজ পড়ে বের হয়েই আহা! বিরিয়ানীর গন্ধে মৌ মৌ করছিলো চারদিক। এই এলাকায় আসলে আপনি পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সব খাবারও পেয়েও যাবেন। ভুরিভোজ করার উৎকৃষ্ট সময় তো এখনই...। 

২৬ জুল, ২০১৮

চেনা মসজিদের অজানা গল্প


বায়তুল মুকাররম মসজিদ। কে না চিনে? বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ। আমি নোয়াখালীর মফস্বলে বেড়ে উঠা মানুষ। বায়তুল মুকাররমে নামাজ পড়া ছিল স্বপ্নের মতো। একবার একটি রাজনৈতিক প্রোগ্রামে অনেকের সাথে এলাম পল্টনে। স্কুলছাত্র ছিলাম বলে নিয়ে আসতে চাইছিলো না কেউ। কিন্তু জোর করে চলে এলাম। 

পল্টন ময়দানে এসে জানতে পারলাম পাশেই বায়তুল মুকাররম। অনেক ভাইকে বললাম ভাই আমাকে একটু নিয়ে চলেন। মসজিদটা একটু দেখবো। কিন্তু কেউ রাজি হলো না দলছুট হয়ে যাওয়ার ভয়ে। প্রচণ্ড গরম। আইসক্রিম আর তরমুজ বিক্রি হচ্ছে স্থানে স্থানে। 

আইসক্রিম খেতে এসে দেখি আমার স্কুলের এক স্যার। সালাম দিলাম। তিনি বললেন ছোট মানুষ তুমি। কেন এলে? আমি কিছু না বলে চুপ করে ছিলাম। তিনি আমাকে আইসক্রিম কিনে দিলেন। বললেন আর কিছু লাগবে কিনা? 

আমি বললাম, স্যার বায়তুল মুকাররমে যোহর নামাজ পড়তে চাই। তিনি বললেন বেশ! আমিও তো চিন্তা করে রাখছি যোহর বায়তুল মুকাররমে পড়বো। এরপর স্যারের পিছে লেগে থাকলাম। যাতে এত মানুষের মধ্যে স্যারকে হারিয়ে না ফেলি। 

সেই আমার প্রথম বায়তুল মুকাররম দেখা ও নামাজ পড়া। অন্যরকম অনুভূতি কাজ করেছিল। আহা আমি বাংলাদেশের সেরা মসজিদে নামাজ পড়ছি। যে মসজিদকে এতদিন পত্রিকায় ও টিভিতে দেখেছি সেটাতে এখন আমি নিজেই। আহা...। চোখ বন্ধ করে এখনো টের পাই ছেলেবেলার সেই অনুভূতি। 

এরকম দুইটা অনুভূতির জন্য অপেক্ষা করছি। এক. সৌদিতে গিয়ে কা'বায় ও নববীতে দাঁড়িয়ে আবেগে আপ্লুত হবো আর চোখের পানি ফেলবো। দুই. জেরুজালেমে গিয়ে অনেক নবীর স্মৃতি বিজড়িত বায়তুল আকসায় সিজদা দিয়ে পড়ে রইবো। জানিনা কবে আল্লাহ তায়ালা আমার ইচ্ছেগুলো কবুল করবেন! 

যাই হোক ফিরে আসি বায়তুল মুকাররমে। এটি পল্টনে অবস্থিত। মসজিদটির আয়তন ৬০ হাজার বর্গফুট। এর ধারণ ক্ষমতা ৪০,০০০। মানে একসাথে ৪০ হাজার মানুষ এখানে নামাজ পড়তে পারে। এই সুবিশাল মসজিদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং ধারণক্ষমতা বিবেচনায় এটি পৃথিবীতে দশম বৃহত্তম মসজিদ। 

পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর যে ক'জন ব্যক্তি/পরিবার নিজ উদ্যোগে পাকিস্তান গঠনে এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে বাওয়ানী, আদমজী, ইস্পাহানী অন্যতম। বাওয়ানী পরিবারের লতিফ বাওয়ানী বাংলাদেশে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৫ টি শিল্পকারখানা স্থাপন করে। বাংলাদেশের পাটকে সোনালী আঁশে পরিণত করে মূলত বাওয়ানী, আদমজী ও ইস্পাহানী পরিবার। 

লতিফ বাওয়ানী পূর্ব-পাকিস্তানে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ স্থাপনের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সে জন্য ঢাকার আলেম সমাজ ও গণ্যমান্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছিলেন ১৯৫৯ সালে। সেখানে ঠিক হয় এই মসজিদের নাম হবে বায়তুল মুকাররম। কমিটির নাম হয় বায়তুল মুকাররম মসজিদ সোসাইটি। কিন্তু তখনো ঠিক হয়নি মসজিদটি কোথায় স্থাপিত হবে? 

বেশিরভাগ লোক বলেছিলো পুরান ঢাকায় করার জন্য। কিছু লোক বললো নতুন ঢাকায় করা ভালো হবে কারণ সেটা হবে পরিকল্পিত ঢাকা। যেহেতু এটা গ্র্যান্ড মসজিদ হবে তাই পুরান ঢাকায় সম্ভব নয় কারণ সেখানে এত জায়গা নেই। তাহলে? পরে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় এটি পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলেই স্থাপিত হবে। আর সেটা হবে পল্টনে। 

ঢাকায় যখন এমন আলোচনা চলছিলো তখন পাকিস্তানের শাসক ছিলেন সেনাশাসক স্বৈরাচারী আইয়ুব খান। স্বৈরাচারীদের একটা ব্যাপার থাকে এমনসব আকর্ষণীয় কিছু করা যাতে তারা মানুষদের কাছে ভালো ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান পায়। যেমন বাংলাদেশে এরশাদ নিজেকে ইসলামিক প্রমাণ করার জন্য অনেক কিছু করেছে। আবার এখন হাসিনা নিজেকে তাহাজ্জুদ্গুজার হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

আসলে এরা সবাই আইযুবের শিষ্য। যাই হোক আইয়ুব খানও এমন একটি মসজিদের কথা ভাবছেন যা পাকিস্তানের ঐতিহ্যকে শাণিত করবে। এটা হবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় মসজিদ। এমন সময় লতিফ বাওয়ানীর প্রস্তাব আইয়ুব খানের কাছে পৌঁছলে তা আইয়ুবের জন্য সহজ হয়ে গেলো। একইসাথে আইয়ুব খান ঢাকাকে সেকেন্ড রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলো। তাই পাকিস্তানের পার্লামেন্টের জন্য শেরে বাংলা নগরে কাজ শুরু করলো। 

জাতীয় সংসদ ভবন ও বায়তুল মুকাররম মসজিদ দুটি মেগা প্রজেক্ট আইয়ুব একইসাথে শুরু করে। লতিফ বাওয়ানী মসজিদের খরচের বড় অংশ বহন করে। সরকার প্রায় সাড়ে আট একর জমি বরাদ্দ দেয় মসজিদের জন্য। মসজিদটি এখন যে স্থানে সেখানে একটি বিশাল পুকুর ছিল, নাম পল্টন পুকুর। সেই পল্টন পুকুর ভরাট করেই মসজিদ স্থাপিত হয়। 

বিশিষ্ট স্থপতি আবদুল হুসেন মুহাম্মদ থারিয়ানিকে মসজিদ কমপ্লেক্সটির নকশার জন্য নিযুক্ত করেন লতিফ বাওয়ানী। থারিয়ানীর বাড়ি ছিল মুম্বাইতে। পরে অবশ্য পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। পুরো কমপ্লেক্স নকশার মধ্যে দোকান, অফিস, লাইব্রেরি ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের প্রধান কক্ষটি তিন দিকে বারান্দা দিয়ে ঘেরা। মিহরাবটি অর্ধ-বৃত্তাকারের পরিবর্তে আয়তাকার।

বাইরে থেকে দেখলে বায়তুল মোকাররম মসজিদকে ‘কাবার’ মডেলের মতো মনে হবে। বায়তুল মোকাররম মসজিদটি প্রধানত ৮তলা। নীচতলায় বিপণী বিতান ও গুদামঘর। বাকীগুলো নামাজের জন্য। আল্লাহর ৯৯টি নামের কথা স্মরণ করে মসজিদটির উচ্চতা ৯৯ ফুট করা হয়েছে। 

১৯৬৩ সালে বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রথম পর্বের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি শুক্রবার বায়তুল মোকাররম মসজিদে প্রথম জুমআর নামাজ আদায় করা হয়। আর এর পরদিন ২৬ জানুয়ারি শনিবার তারাবীহ নামাজ শুরু হয়।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন মুজিব সরকার সমাজতন্ত্রীদের পরামর্শে লতিফ বাওয়ানীর সমস্ত শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয়। বাওয়ানী পরিবার প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় পাকিস্তানে ফিরে যায়। অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তানেও তাদের ব্যবসা ছিলো। পাকিস্তান গঠনের পর এই বাওয়ানী, আদমজী ও ইস্ফাহানীরা পূর্ব পাকিস্তানকে সমৃদ্ধ করার কাজ করেছিলো। এখনকার ব্যবসায়ী মতো শুধু ব্যবসা করেনি তারা। এই বাওয়ানীরা শত শত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, পাঠাগার স্থাপন করেছে। বাংলা শিল্প সাহিত্যের বিকাশে বহু সম্মাননা ও পুরষ্কারের আয়োজন করেছে।

এদেশের কাঁচামাল থেকে যাতে এদেশের মানুষ উপকৃত হয় সেই ব্যবস্থা করেছে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে এই লতিফ বাওয়ানী। যিনি আমাদের বায়তুল মুকাররমের মতো মসজিদ উপহার দিয়েছেন আমরা তাকে গলাধাক্কা দিয়েছি শুধুমাত্র অবাঙালি হওয়ার অপরাধে। এমন নয় যে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। এমনও নয় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানী। তিনি ভারতের গুজরাট থেকে আসা মুহাজির মুসলিম।   

যাই হোক, এবার আসি খতিবদের প্রসঙ্গে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রথম খতিব ছিলেন মাওলানা আবদুর রহামন বেখুদ (রহ:)। তিনি ১৯৬৩ সালে এই মসজিদের খতিব হন। এরপরে খতিব হন মাওলানা ক্বারী উসমান মাদানী (রহ:)। তিনি এ মসজিদের খতিব ছিলেন (১৯৬৩-১৯৬৪) মাত্র এক বছর। পরবর্তী খতিব ছিলেন মুফতী সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান। তিনি ১৯৬৪-১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর এ মসজিদের খতিব হন মুফতী মাওলানা মুইজ (রহ:)। 

তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৪-১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। এরপরে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দায়িত্ব পালন করেন খতিব মাওলানা উবায়দুল হক (রহ:)। তিনি ছিলেন দেশ বরেণ্য আলেম। তিনি খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৪-২০০৯ সাল পর্যন্ত। 

তারপর ২৪ বছর যিনি এখানে ইমামের দায়িত্ব পালন করেছিলেন সেই মুফতি মাও: নুরুদ্দীন সাহেব এক বছর ভারপ্রাপ্ত খতিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিবের দায়িত্বে রয়েছেন প্রফেসর মাওলানা মো: সালাহ্উদ্দিন। তিনি ৫ জানুয়ারি ২০০৯ সালে এ মসজিদের খতিব নিযুক্ত হন।