কারবালা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কারবালা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

৬ আগ, ২০২২

কারবালা পর্ব-০৫ : মদিনায় লুট, খুন ও ধর্ষণের মর্মান্তিক ঘটনা!

 

মক্কা ও মদিনাবাসী শুরু থেকেই ইয়াজিদের প্রতি অনুগত ছিল না। বিভিন্ন চাপে পড়ে তারা আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু যখন হুসাইন রা.-কে ইয়াজিদের বাহিনী খুন করে তখন মদিনাবাসী ক্ষিপ্ত হয় এবং ইয়াজিদের প্রতি বাইয়াত প্রত্যাহার করে। তারা আব্দুল্লাহ ইবন হানযালাকে নেতা নির্বাচন করল। তারা সকলে মসজিদে নববীর মিম্বরের কাছে জমায়েত হল।

তখন তাদের মধ্যে হতে একজন বলতে লাগলেন, আমি এ পাগড়ীকে প্রত্যাহার করলাম এ বলে সে মাথা থেকে পাগড়ীটি ফেলে দিল। অন্য একজন বলল, আমি ইয়াযীদকে প্রত্যাহার করলাম যেমন আমি আমার এ জুতা প্রত্যাহার করলাম,। এ বলে সে তার জুতা ছুঁড়ে মারলো। এভাবে একজনের পর একজন বলতে লাগল ও এরূপ করতে লাগল। ফলে সেখানে অনেক পাগড়ী ও জুতার স্তুপ হয়ে গেল। তারপর তারা তাদের মধ্যে থেকে ইয়াজিদের গভর্নরকে বহিষ্কার করার ব্যাপারে একমত হল। তিনি হলেন উসমান ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু সুফিয়ান, ইয়াযীদের চাচাতো ভাই। বনূ উমাইয়ার সদস্যদেরকে মদীনা থেকে বিতাড়িত করার ব্যাপারেও তারা একমত হলো।

অবস্থা বেগতিক দেখে বনু উমাইয়ার লোকেরা মারওয়ান ইবন হাকাম-এর ঘরে একত্রিত হলো। আর মদীনাবাসীরা তাদেরকে চতুর্দিক দিয়ে ঘিরে রাখল। কিন্তু কিশোর আলী ইবনুল হুসাইন ওরফে জয়নুল আবেদীন এবং নবী পরিবারের নারী সদস্যরা এই আয়োজনের সাথে ছিলেন না। তারা নিজ ঘরে নিশ্চুপ ছিলেন।

মদিনার লোকদের আনুগত্য অস্বীকারের খবর ও বনু উমাইয়ার সদস্যদের অবরুদ্ধ হওয়ার খবর ইয়াজিদের কাছে পৌঁছলো। তিনি মুসলিম ইবনে উকবাকে সেনাপতি বানিয়ে বললেন, “মদিনার সম্প্রদায়কে তুমি তিনবার আহবান করবে, যদি তারা বশ্যতা স্বীকার করে তাহলে তুমি তাদের থেকে আনুগত্য গ্রহণ করবে এবং তাদের থেকে বিরত থাকবে, অন্যথায় তুমি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। যদি তুমি তাদের উপর বিজয় লাভ করো তবে মদিনায় তিনদিন হালাল ঘোষণা করবে (যা ইচ্ছা তা করবে, হারাম কাজও হালাল বলে গণ্য হবে)। তারপর বিরত হবে। আলী ইবন হুসাইনের প্রতি নযর রাখবে, তার থেকে বিরত থাকবে এবং তার কল্যাণ কামনা করবে, তাকে মজলিসে ডেকে নিবে। মদীনার কাজ সমাপ্ত করে মক্কা অবরোধ করবে।

ইতপূর্বে ইয়াজিদ উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে আদেশ দিয়েছিলেন, সে যেন আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর রা.-কে মক্কায় অবরোধ করার জন্য সেখানে গমন করে। কিন্তু উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ তার আদেশ অমান্য করে এবং বলে আল্লাহর শপথ! আমি ইয়াজিদের ন্যয় এরূপ ফাসিক লোকের জন্য দুইটি মারাত্মক কাজ একত্রে করতে পারবো না। একটি হল রাসূল সা. এর নাতিকে হত্যা করা এবং দ্বিতীয়টি হল মহাসম্মনিত বাইতুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। তার মা মারজানা তাকে ইমাম হুসাইন রা.-এর শাহাদাতের সময় বলেছিলেন, দুর্ভাগ্য তোর! অভিশপ্ত তুই! তুই কী করেছিস! তুই কীসের দায়িত্ব নিয়েছিস? হুসাইন রা.-এর শাহদাতের পর তার আত্মীয়রা তাকে তিরস্কার করলে সে কিছুটা হীনমন্যতায় পড়ে যায়।

মুসলিম ইবনে উকবা তার সেনাবাহিনী নিয়ে মদীনার দিকে রওয়ানা হলো, সেনাবাহিনী যখন মদীনার নিকটবর্তী হলো, মদীনাবাসীরা বনু উমাইয়ার সদস্যদের অবরোধে কঠোরতা অবলম্বন করতে লাগল এবং বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! আমরা তোমাদের সকলকে এখনই হত্যা করবো। যদি তোমরা আমাদেরকে এমন একটি চুক্তিনামা লিখে দাও যে, তোমরা সিরিয়ার সৈন্যদেরকে আমাদেরকে চিনিয়ে দেবে না, আমাদের সাথে যুদ্ধে তাদের সহায়তা করবে না এবং আমাদের প্রতি তাদেরকে উসকানিও দিবে না। তখন বনূ উমাইয়ার লোকেরা তাদেরকে এ ব্যাপারে একটি অঙ্গীকারনামা প্রদান করলো।

যখন ইয়াজিদ বাহিনী মদিনায় পৌঁছল তখন বন্ উমাইয়ার লোকেরা তাদের সাথে সাক্ষাত করলো। সেনাপতি তাদের খবরাখবর সম্বন্ধে জিজ্ঞাস করলো, তখন তাদের কেউ তাকে কোন সংবাদ দিল না। আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান সেনাপতির কাছে আসলো এবং বললো, যদি আপনি তাদের উপর জয়ী হতে চান তাহলে আপনি মদিনার পূর্বদিকে হাররায় সেনাবাহিনী নিয়ে অবস্থান নিন। যখন শত্রুরা আপনার দিকে আসবে তখন সূর্যের তাপ থাকবে তাদের চোখে মুখে। এমন সময় আপনি তাদেরকে আপনার বাধ্যতা স্বীকার করতে আহবান জানাবেন। যদি তারা আপনার আহবানে সাড়া দেয় তাহলে ভাল কথা, অন্যথায় তাদেরকে হত্যা শুরু করবেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন। কেননা তারা দেশের ইমাম তথা খলীফার বিরুদ্ধাচরণ করছে এবং তার অবাধ্য হয়েছে।

এ পরামর্শ দেওয়ার জন্য মুসলিম ইবন উকবা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তিনি যেদিকে ইঙ্গিত করলেন তা তিনি পরোপুরি পালন করলেন। তিনি পূর্ব মদীনার হাররায় অবতরণ করেন এবং মদীনাবাসীদেরকে তিনদিনের অবকাশ দিলেন। মদিনাবাসী তাদেরকে অন্যায়ের পথ ছেড়ে ন্যায়ের পথে আসার আহবান জানালেন। তারা অবৈধ শাসকের আনুগত্যের বিপরীতে শাহদাতকে আপন করে নেয়ার শপথ নিলেন। প্রতিদিন তারা বশ্যতা স্বীকার না করে যুদ্ধ ও মুকাবিলার কথা পুনরাবৃত্তি করলেন।

যখন তিনদিন শেষ হয়ে গেল তখন সেনাপতি তাদরকে চতুর্থ দিন অর্থাৎ ৬৩ হিজরীর জুলহাজ্জ মাসের ২৮ তারিখ বুধবার দিন বললো, হে মদীনাবাসীগণ! তিনদিন অতিবাহিত হলো, আমীরুল মু'মিনীন আমাকে বলেছিলেন যে, তোমরা তার আত্মীয়স্বজন। তাই তিনি তোমাদের রক্তপাতকে খারাপ মনে করেন। তিনি আমাকে হুকুম দিয়েছেন আমি যেন তোমাদেরকে তিন দিনের সময় দেই। তিনদিন শেষ হয়ে গেল। এখন তোমরা কি করবে? তোমরা কি আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে, না সন্ধি করবে? তারা বললেন, যুদ্ধ করবো।

মুসলিম আবার বললো, যুদ্ধ করো না বরং সন্ধি করো তাহলে আমরা ঐ বিদ্রোহী ব্যক্তিকে (আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর রা.) দমন করার জন্য সর্বশক্তি ও প্রচেষ্টা প্রয়োগ করতে পারব। তারা বললেন, “হে আল্লাহর দুশমন! তোমার যদি এটাই ইচ্ছে হয়ে থাকে তাহলে আমরা কখনোই তোমার সহযোগী হবো না। আমরা কি তোমাদেরকে ছেড়ে দিব যে, তোমরা বাইতুল্লাহ গিয়ে যথেচ্ছা আচরণ করবে? তারপর তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিল।

মদিনাবাসী বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিখা খনন করে নিলেন। তারা নিজেদের সৈন্যদেরকে চার ভাগে ভাগ করে নেয় এবং প্রতিটি ভাগের জন্য একজন আমীর নিয়োগ করে। সবচাইতে সুবিন্যস্থ ভাগের আমীর হলেন আবদুল্লাহ ইবন হানযালা। তারপর তারা প্রচণ্ড যুদ্ধ করলেন। যুদ্ধে মদীনাবাসীরা পরাজয়বরণ করলেন। দু'পক্ষ থেকেই বহু সর্দার ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ নিহত হলেন। এই ঘটনাকে ইতিহাসে 'আল হাররা'র যুদ্ধ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।

তারপর এক জঘন্য ঘটনার অবতারণা হলো মদিনায়। মুসলিম ইবন উকবা তার নেতা ইয়াজিদের নির্দেশমতে মদিনায় তিন দিন যাবত লুটতরাজ করার নির্দেশ দিলো। সে এ তিন দিনে মদীনার বহু সাহাবি, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোকদের পাইকারিভাবে হত্যা করতে শুরু করলো। মদিনায় জঘন্যতম লুট, ধর্ষণ, নির্যাতন ও উৎপীড়নের অজস্র ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে হতে সাতশত জন গণ্যমান্য ব্যক্তি, তাদের দাস-দাসী এবং অপরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে দশ হাজার নিহত হয়েছিল। বহু সম্মানিত মুসলিম নারী ধর্ষিত হয়েছেন ইয়াজিদের বাহিনীর দ্বারা।

জালিম ইয়াজিদ তিনদিনের জন্য মদিনাকে লুটপাটের লক্ষ্যে মুসলিম ইবন উকবাকে নির্দেশনা দিয়ে জঘন্য অপরাধ করেছে। যার দরুন সাহাবায়ে কিরামের একটি বিরাট দল ও তাদের সন্তানগণ নিহত হন। বহু সম্মানিত নারী ধর্ষিত হয়েছেন। সা'দ ইবন আবু ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, “যদি কেউ মদীনাবাসীদের সাথে ষড়যন্ত্র করে তাহলে লবন যেভাবে পানিতে গলে নিঃশেষ হয়ে যায় সেও এভাবে গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।” ইমাম মুসলিমও আবু আবদুল্লাহ সা'দ ইব্ন আবু ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যদি কোন ব্যক্তি মদীনাবাসীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে তাহলে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে জাহান্নামে এমনভাবে গলাবেন যেমন সীসা আগুনে গলে যায় কিংবা লবণ যেভাবে পানিতে গলে যায়।”

কিছু অর্বাচীন ও জ্ঞানপাপীকে দেখা যায় নানানভাবে ইয়াজিদকে শাসক এমনকি আমিরুল মুমেনিন হিসেবে আখ্যায়িত করতে। যে পাইকারীভাবে খুন ও ধর্ষণ করার নির্দেশ দেয় সে মুসলিমদের নেতা হওয়া তো দূরের কথা তাকে মুসলিম হিসেবে বিবেচনা করাও তো কঠিন। তার আক্রমনের পর মদিনার সমস্ত সাহাবী হয় খুন হয় নাহয় জঙ্গলে পালিয়ে যায়। সাহাবাদের সাথে যার এই আচরণ সে জালিম ও ফাসিক, এটাই তার পরিচয়। আল্লাহ তায়ালা তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করুন। আমিন।

বি. দ্র. ঘটনার বর্ণনা আল্লামা ইবনে কাসীরের বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া'-এর ৮ম খন্ড (৪০০-৪১৫) থেকে নেওয়া হয়েছে।

১৬ আগ, ২০২১

কারবালা পর্ব-০৪ : হুসাইন রা.-এর শাহদাত ও সন্ত্রাসীদের দুর্ব্যবহার

 


হুসাইন রা. তার পরিবারসহ শ'খানেক সঙ্গী সাথীদের নিয়ে কারবালায় পৌঁছলেন। সেখানে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের অগ্রবর্তী বাহিনীর সাথে তাঁর দেখা হয়। এই বাহিনীর নেতা ছিলেন হুর বিন ইয়াজিদ। তিনি হুসাইন রা.-কে বললেন, আমীর উবাইদুল্লাহ আপনাকে তার কাছে যেতে বলেছেন অথবা আমিরুল মু'মেনিন ইয়াজিদের বাইয়াত গ্রহণ করতে বলেছেন।

হুসাইন রা. তাকে বুঝালেন কেন তিনি এই পথ গ্রহণ করেছেন। কেন ইয়াজিদের শাসন ও ক্ষমতা গ্রহণ বৈধ নয়। একইসাথে তিনি হুরকে কুফা থেকে পাঠানো চিঠিগুলো দেখিয়েছেন। এসময় যোহরের নামাজের ওয়াক্ত হলো। হুসাইন রা. হুরকে বললেন, তুমি কি তোমার সঙ্গীদের নিয়ে আলাদা নামাজ পড়বে? হুর বললো, অবশ্যই নয়। আপনি ইমামতি করুন। আপনার পেছনে আমরা নামাজ পড়বো। নামাজ শেষে হুসাইন রা. সবার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। এরপর তিনি যাত্রা শুরু করতে চাইলে হুর আবারো বাধা দিল। সে বললো, আমি আমার কর্তব্য পালন করবো। আপনাকে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে নিয়ে যাওয়া আমার কাজ। আমি আপনার পিছু ছাড়বো না। হুসাইন রা. তার সঙ্গীদের অগ্রসর হতে নির্দেশ দিলেন। তখন হুর পথ আগলে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনি নবিজীর নাতি না হলে এতক্ষণে আপনাকে ধুলিস্যাত করে ফেলতাম। হুসাইন রা. বললেন, আমি চাইনা তোমার মা পুত্রহারা হোক। হুর বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি এই কথার প্রতিশোধ নিতাম। কিন্তু আমি আপনাকে সম্মান করি। আপনি যদি আমার সাথে ইবনে যিয়াদের কাছে না যেতে চান তবে কুফা ভিন্ন অন্য পথ ধরুন। আমি এই বিষয়ে ইবনে যিয়াদের কাছে পত্র লিখবো। এদিকে ইয়াজিদ বুঝতে পেরেছে অগ্রবর্তী বাহিনী যদি হুসাইন রা.-এর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং ঐ অঞ্চলের গোত্রগুলো হুসাইন রা.-এর সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। এখন হুসাইন রা. পরিবার নিয়ে সেনাবাহিনী ছাড়া রয়েছে। তাই সে হুরকে চিঠি লিখেছে তার মূলবাহিনী না আসা পর্যন্ত যাতে হুসাইন রা.-কে আক্রমণ বা তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়। শুধু গতিরোধ করাই তার কাজ হবে। এদিকে ইয়াজিদের নির্দেশে বসরা ও কুফার গভর্নর উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ উমর বিন সা'দের নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন হুসাইন রা.-কে বশ করার জন্য। ইবনে যিয়াদ উমরকে নির্দেশ দেন যাতে হুসাইন রা.-কে পানির উৎসের কাছে যেতে বাধা দেওয়া হয়। এতে হুসাইন রা. সহজে আত্মসমর্পন করবে এবং উসমান রা.-কে পানি না দেওয়ার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। উমর বিন সা'দ ও তার সৈন্যরা এসে হুসাইন রা.-কে ঘিরে ফেললো এবং তাদেরকে পানি সংগ্রহে বাধা দিল। হুসাইন রা. উমর বিন সা'দকে আলোচনার জন্য আহ্বান করলেন। সেখানে তিনি প্রস্তাব করলেন তিনি কুফা যাওয়া থেকে বিরত থাকবেন যদি তাকে দামেশকে ইয়াজিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। বাকী আলোচনা তিনি ইয়াজিদের সাথে করবেন। উমর বিন সা'দ রাজি হলো না। পরে তিনি অন্যদিকে অর্থাৎ তুর্কি অঞ্চলের দিকে যেতে চাইলে উমর চিঠি দিল ইবনে যিয়াদের কাছে। ইবনে যিয়াদ রাজি হয়নি। ইবনে যিয়াদ দুটো কথা বললেন, হয় হুসাইন রা.-কে ইবনে যিয়াদের কাছে আত্মসমর্পন করতে হবে নতুবা যুদ্ধ করতে হবে। এভাবে কয়েকদিন চলে গেল আলোচনা করতে। এদিকে পানির অভাবে হুসাইন রা.-এর তাঁবুতে হাহাকার পড়ে গেল। ৬১ হিজরির মহররম মাসের ৯ তারিখ আসরের নামাজের পর উমর বিন সা'দ হুসাইন রা.-এর দিকে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হলো। এসময় তাঁবুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ছিলেন হুসাইন রা.। তাঁর তন্দ্রা এসে গেল। ইয়াজিদ বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার খবর দেওয়ার জন্য হুসাইন রা.-এর বোন তাঁকে জাগিয়ে দিলে তিনি বললেন, স্বপ্নে আমি রাসূল সা.-কে দেখছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, তুমি তো আমাদের কাছে চলে আসছো! এই কথা শুনে বোন চিৎকার করে বলে উঠলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য! হুসাইন রা. বললেন, তোমার কোনো দুর্ভাগ্য নেই। তুমি শান্ত হও। এরপর আব্বাস বিন আলী এসে বললো, ভাইজান! আমাদের শত্রুরা তো এসে পড়েছে। হুসাইন রা. উঠে তাদের কাছে কয়েকজন সঙ্গীকে পাঠিয়ে তাদের মনোভাব বুঝতে বললেন। তারা গেলেন ও জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কী চাও? উমর বিন সা'দ বললো, আমরা আমাদের আমীরের নির্দেশে এসেছি। হয় তোমরা আত্মসমর্পন করবে নতুবা আমাদের সাথে লড়াই করবে। হুসাইন রা.-এর প্রতিনিধিরা ফিরে এসে তাঁকে জানালে তিনি সিদ্ধান্ত দিলেন, আজ তোমরা ফিরে যাও। রাতে চিন্তা করে কালকে তোমাদের সিদ্ধান্ত জানাবো। উমর বিন সা'দ বললো, ঠিক আছে, তবে কাল অবশ্যই আমরা লড়াই করবো। রাত নেমে এলে হুসাইন রা. তাঁর সঙ্গীদের ডাকলেন। বক্তব্য রাখলেন। রাষ্ট্রের ব্যাপারে ইসলামের শিক্ষা জানালেন। ইস্তেগফার করলেন। তারপর সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বললেন, তারা আমাকে চায়। আমি তাদের কাছে আত্মসমর্পন করবো না এবং আমি কখনো অবৈধ শাসকের অনুগত হবো না। আর তোমাদের ব্যাপারে আমার কথা হলো তোমরা যে যার মতো চলে যাও। আমি তোমাদের অনুমতি দিলাম। এখানে থাকা মানে নিশ্চিত মৃত্য। তোমরা অন্ধকার থাকতেই ফিরে যাও পরিবারসহ। তখন সবাই প্রতিবাদ করে বললেন, আপনি ভিন্ন আমাদের অস্তিত্ব নেই। আমরা কেউ আপনাকে ছেড়ে যাব না। আপনার সিদ্ধান্তই আমাদের সিদ্ধান্ত। আপনি আমাদের নেতা। তারপরও হুসাইন রা. তার আত্মীয়দের ডেকে ডেকে বুঝালেন তারা যেন চলে যায়। তবে কেউ যায়নি। সবাই দৃঢ়ভাবে হুসাইন রা. পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা সারারাত ইবাদতে কাটালেন। ১০ মহররম সকালে হুসাইন রা. উমর বিন সা'দের দলের উদ্দেশ্যে কিছু বক্তব্য রাখলেন। তাদেরকে সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে আসার অনুরোধ করলেন। এসময় হুর বিন ইয়াজিদ উমরকে বললেন, তোমরা কি হুসাইন রা.-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে? উমর বললো, অবশ্যই যতক্ষণ না তাদের সবার দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন না হয়! তখন সে বললো, আল্লাহর শপথ। আমি জাহান্নাম ও জান্নাতের মাঝামাঝি আছি। আর আমি অবশ্যই জাহান্নাম থেকে জান্নাতকে প্রাধ্যান্য দেব। এরপর হুর বিন ইয়াজিদ তার কিছু সৈন্যকে নিয়ে হুসাইন রা.-এর দলে যোগ দিল। যাওয়ার সময় উমরের বেশ সমালোচনা করলেন হুসাইন রা.-এর পানি আটকানোর জন্য। এরপর রেওয়াজ অনুযায়ী দুইদলের মধ্যে দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হলো। এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে হুসাইন রা.-এর সঙ্গীরা জিতে গেল। এরপর শুরু হলো অসম যুদ্ধ। একে একে হুসাইন রা.-এর সৈন্যরা বহু শত্রু সৈন্যকে শেষ করে শাহদাতবরণ করতে লাগলেন। সব সামর্থবান পুরুষ শাহদাতবরণ করলেন। বাকী রইলেন কেবল হুসাইন রা.। বহু শত্রু সৈন্য তার হাতে নিহত হলেন। একপর্যায়ে শত্রুরা সবাই তাঁর তলোয়ারের এরিয়া থেকে দূরে চলে গেল। দূর থেকে তারা রাসূল সা.-এর কলিজার প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। তিনি আহত অবস্থায় পড়ে যান। অতঃপর শাম্মার ইবনে জুল জাওশানের নেতৃত্বে একটি দল হুসাইন রা.-এর মাথা কেটে আনলো। মারাত্মক হত্যাযজ্ঞ ও লুটপাট চালালো ইয়াজিদের বাহিনী। সমস্ত বালকদের হত্যা করা হলো একমাত্র জাইনুল আবেদিন ছাড়া। তিনি অসুস্থ ছিলেন। এই অসুস্থতার কারণে সন্ত্রাসীরা তাঁকে খুন করেনি। তিনি হুসাইন রা.-এর সন্তান। বাকী নবী পরিবারের সব সদস্যকে এইদিন খুন করা হয়েছে। নবী পরিবারের ২৩ জন পুরুষকে এইদিন হত্যা করা হয়। উমর বিন সা'দ নবী পরিবারের এই সদস্যদের কাটা মাথা উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে নিয়ে আসে। সে তার সামনে প্লেটে করে এক মাথাগুলো উপস্থাপন করায় এবং লাঠি নিয়ে হুসাইন রা. মাথায় আঘাত করেছেন ও সৌন্দর্য নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে। উপস্থিত এক বৃদ্ধ সাহাবি যায়দ বিন আরকাম রা. এর প্রতিবাদ করলে ইবনে যিয়াদ তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। আটক নারী ও শিশুদের এক দড়িতে বেঁধে বেশ অপদস্ত করে নিয়ে আসা হয় কুফায়। সেখানে জাইনুল আবেদিনকে দেখতে পেয়ে ইবনে যিয়াদ ক্ষেপে গেল। কেন তাকে হত্যা করা হলো না এই নিয়ে হইচই শুরু করলো। জাইনুল আবেদিন বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে কিনা তা চেক করার জন্য তাকে উলঙ্গ করে ফেলা হয়। যখন নিশ্চিত হলো তিনি বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছেন তখন তাকে খুন করার আদেশ দেয়। এসময় হুসাইন রা.-এর বোন জয়নাবের হৃদয়বিদারক আহাজারিতে ইবনে যিয়াদ অবশেষে খুন করা থেকে বিরত থাকে। ইবনে যিয়াদ এই মাথাগুলো নিয়ে কুফার মসজিদে গিয়ে আল্লাহ বিজয় দিয়েছেন ও শত্রুদের ধ্বংস করেছেন উল্লেখ করে উল্লাস করে। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে আফিফ এর প্রতিবাদ করেন এবং তুমি নবীর সন্তানদের হত্যা করেছ আর ভাষণ দিচ্ছো আলেমদের মতো! এই অপরাধে আব্দুল্লাহকে শূলবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। এরপর কুফার বাজারে হুসাইন রা. -এর মাথার প্রদর্শনীর আয়োজন করে। আব্দুল্লাহর পরিণতি দেখে কেউ এর প্রতিবাদ করেনি। অতঃপর উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ সবগুলো মাথা দামেশকে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেয়। ইয়াজিদও কুফার গভর্নরের মতো হুসাইন রা.-এর কাটা মাথার সাথে লাঠি দিয়ে আঘাত করে ও বেয়াদবি করে। তবে সে আটক মহিলাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে নি। তাদের মদিনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হুসাইন রা. ইয়াজিদের আনুগত্যের পরিবর্তে আল্লাহর আনুগত্যকেই বেছে নিলেন। কারণ তিনি নিজেই দোয়া করতেন, "হে আল্লাহ! যতদিন পর্যন্ত আমি তোমার আনুগত্য করি অনুসরণ করি, ততদিন আমার হায়াত বাড়িয়ে দিও। আর যদি তা শয়তানের চারণভূমিতে পরিণত হয় তাহলে আমাকে তোমার কাছে তুলে নিও।" হুসাইন রা. তার সঙ্গী সাথীসহ সবাইকে নিয়ে নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করলেন। তবু ইয়াজিদের শাসনক্ষমতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেননি। ইয়াজিদ প্রায় ৫ সহস্রাধিক সেনাবাহিনী নিয়ে ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে হুসাইন রা.-এর ক্ষুদ্র ঈমানদার ১শ জন সাহাবীকে শহীদ করে তার ক্ষমতা সাময়িকভাবে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চিরদিনের জন্য তিনি ইসলাম ও মুসলমানদের তথা সত্যপ্রেমীদের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। আর হুসাইন রা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করে জীবন দিয়ে শাহাদাত বরণ করে ইহকাল ও পরকালে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। আজো যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনগণের সমর্থন না নিয়ে ক্ষমতা দখল করে অন্যায় নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের জন্য এ ঘটনা অবশ্যই শিক্ষণীয়। যদি তাদের কপালে হিদায়াত থাকে তবেই তারা শিক্ষা নিতে পারবে। নতুবা তারাও বরণ করবে ইয়াজিদের পরিণতি।
এই কারবালার ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা হলো এর স্মরণের মাধ্যমে অন্যায় ও অবৈধ শাসকের কাছে মাথা নত না করা। আজকেও আমাদের দেশে আমাদের ওপর চেপে বসেছে অবৈধ শাসক। এই শাসকের বিরোধীতা করে জনগণের রায়ের সরকার প্রতিষ্ঠা করাই কারবালার শিক্ষা। এই শিক্ষা নিতে না পারলে কারবালা স্মরণ করা বৃথা। হুসাইন রা. তার বক্তব্যে কখনো ইয়াজিদের অযোগ্যতা নিয়ে কথা তুলেননি। বরং তিনি শুরার রায়ে শাসক নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি।

১৪ আগ, ২০২১

কারবালা পর্ব-০৩ : মুসলিম বিন আকিলের মর্মান্তিক শাহদাত



তখন হেজাজ নামে প্রদেশের অধীনে মক্কা ও মদিনা শহর ছিল। মদিনা ছিল কেন্দ্র। ওলিদ বিন উতবা ছিলেন হেজাজের গভর্নর। ইয়াজিদের আনুগত্য এড়ানোর জন্য আবু বকর রা.-এর নাতি আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। সেখানে তার সাথে হুসাইন রা. তাঁর পরিবারসহ যুক্ত হন।

বাইয়াত করাতে না পারায় ও মদিনার নিয়ন্ত্রণ সঠিকভাবে রাখতে না পারায় ইয়াজিদ ওলিদ বিন উতবাকে বরখাস্ত করেন এবং সে স্থানে নতুন নিয়োগ দেন আমর বিন সাঈদকে। আমর ছিল কঠোর প্রকৃতির মানুষ। আমর বিন সাঈদ মদিনায় দায়িত্ব গ্রহণ করে মদিনাবাসীকে শাসালেন তারা যাতে আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা.-কে সাহায্য না করেন। এছাড়াও তিনি মক্কা আক্রমণ করে ইবনে যুবায়ের রা. ও হুসাইন রা.-কে শায়েস্তা করার প্রতিজ্ঞা করেন। এটি ছিল জিলকদ মাস, যখন আরবের মানুষ হজ্বের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই মাসে যুদ্ধ নিষিদ্ধ। তাই আমর বিন সাঈদ হজ্ব শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইলো। এদিকে ইবনে যুবায়ের রা. মক্কায় ইয়াজিদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছেন। ফলে সেখানের কেউ ইয়াজিদের পক্ষে বাইয়াত নেয়নি। হেজাজের নায়েবে গভর্নরের অফিস ছিল মক্কায়। নায়েবে গভর্নরের নাম হারিস বিন খালিদ। ইবনে যুবায়ের রা. তাকে ইমামতিতে বাধা দিয়ে হুসাইন রা.-কে ইমামতি করার জন্য আহ্বান জানান। আমর বিন সাঈদ অপেক্ষা করতে রাজি থাকলেও ইয়াজিদ মোটেই রাজি ছিল না। তিনি আমর বিন সাঈদকে নির্দেশ দিলেন ইবনে যুবায়ের রা.-কে যেন গ্রেপ্তার করে তার দরবারে হাজির করা হয়। সাথে এটাও বলেছেন, সে এখন বাইয়াত নিলে গ্রহণ করা হবে না। তার গর্দানে বেড়ি পরিয়ে যাতে দামেশকে ইয়াজিদের কাছে হাজির করা হয়। হেজাজের গভর্নর উনাইস বিন আমরকে প্রধান করে ৭০০ জন সৈন্যের একটি বাহিনী তৈরি করে, যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় অবিলম্বে আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা.-কে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসা। উনাইস বিন আমরের বাহিনী মক্কার কাছাকাছি এলে ইবনে যুবায়ের রা. তাদের বাধা দেন। মক্কার সন্নিকটে উভয় বাহিনীর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ইয়াজিদ বাহিনী পরাজিত হয় ও পালিয়ে যায়। রমজান মাস থেকেই ইরাক (কুফা) থেকে নানান প্রতিনিধি দল ও অনেক চিঠি হুসাইন রা.-এর আসতে থাকে। ইরাকবাসী যখন জানতে পারলো হুসাইন রা. বাইয়াত হন নি তখন তাদের উতসাহ বেড়ে যায়। তারাও তাদের সংকল্পে অটুট থাকে। তারাও বাইয়াত নেয় নি ইয়াজিদের। গোটা কুফাবাসী ইয়াজিদের আনুগত্য থেকে বিরত রইলো এবং তারা হুসাইন রা.-এর হাতে খিলাফতের বাইয়াত নিতে প্রস্তুত। চিঠির পর চিঠি আসতে লাগল। এভাবে পাঁচ শতাধিক চিঠি হুসাইন রা. এর কাছে এসে জমা হল। প্রকৃত অবস্থা যাচাই করার জন্য হুসাইন রা. তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলকে পাঠালেন। মুসলিম কুফায় গিয়ে দেখলেন, আসলেই লোকেরা হুসাইনকে খলিফা হিসেবে চাচ্ছে। লোকেরা মুসলিমের হাতেই হুসাইনের পক্ষে বাইয়াত নেওয়া শুরু করলো। কুফার একজন আমীর হানী বিন উরওয়ার ঘরে বাইয়াত সম্পন্ন হল। তারা জান মাল দিয়ে খিলাফতের মর্যাদা রক্ষা করার শপথ গ্রহণ করলো। মুসলিম বিন আকিলের কাছে হুসাইন রা.-এর পক্ষে জিহাদ করার জন্য বাইয়াত গ্রহণকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই লাগলো। এই সংখ্যা যখন আঠারো হাজার অতিক্রম করলো তখন মুসলিম বিন আকিল চিঠি লিখলেন হুসাইন রা.-কে। জানালেন ইরাকবাসী প্রস্তুত। তারা খিলাফতের জন্য বাইয়াত নিয়েছে। পত্র পাওয়ামাত্র যেন হুসাইন রা. ইরাকের পথে রওনা হন। এদিকে কুফার গভর্নর ছিলেন নুমান বিন বশির রা.। তিনি হিজরতের পরে জন্মগ্রহণকারী ১ম আনসার সাহাবি। উসমান রা. হত্যার বিচার চেয়ে তিনি মুয়াবিয়া রা. পক্ষাবলম্বন করেন। মুয়াবিয়া রা. তাকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন। ইয়াজিদ ক্ষমতায় এলে নুমান বিন বশির রা. কুফার জনগণকে ইয়াজিদের আনুগত্য করাতে সক্ষম হন নাই। মুসলিম বিন আকিল কুফায় এসে হুসাইন রা.-এর পক্ষে গোপনে বাইয়াত নিচ্ছিলেন, এই খবর নুমান বিন বশির রা.-এর কাছে পৌঁছলে তিনি তা এড়িয়ে যান ও গুরুত্বারোপ করেননি। তিনি তার খুতবায় মতভিন্নতা পরিহার ও ঐক্যবদ্ধ থাকার নসিহত করেছিলেন। তিনি কারো বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেন নি। এই খবর ইয়াজিদের কাছে পৌঁছলে ইয়াজিদ অত্যন্ত রাগান্বিত হন এবং নুমান বিন বশির রা.-কে গভর্নর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। একইসাথে কুফাবাসীকে শায়েস্তা করার জন্য নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক বসরার গভর্নর উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদকে কুফার গভর্নরের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন। অর্থাৎ ইবনে জিয়াদ এখন দুই প্রদেশের গভর্নর। ইয়াজিদের শাসনামলে নুমান বিন বশির রা. নিষ্ক্রিয় থাকেন। তার মৃত্যুর পর তিনি মক্কাভিত্তিক খিলাফতের খলিফা আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা.-এর অনুগত হন। এই অপরাধে উমাইয়া সৈন্যরা তাঁকে খুন করে। ইয়াজিদ কুফার পরিস্থিতি তার অনুকূলে আনার জন্য দ্রুত কুফায় যাওয়ার জন্য উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদকে যাওয়ার নির্দেশ দেন। উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ কুফায় গিয়ে পৌঁছলেন। ১৭ জন সৈন্যসহ উবাইদুল্লাহ কুফার গেইটে যখন পৌঁছলো তখন তার মুখ ঢাকা ছিল। কুফার জনগণ ভেবেছে হুসাইন রা. এসে গেছেন। মুহূর্তেই জনগণ তাকে ঘিরে জমায়েত হয়ে গেল ও উল্লাস করতে লাগলো। উবায়দুল্লাহ তার পরিচয় দিয়ে সবাইকে সরে যেতে বললো। কুফাবাসীর মন খারাপ হলো। এদিকে নুমান বিন বশির রা. গুজব শুনে গভর্নর হাউসের দরজা বন্ধ করে দিল। উবাদুল্লাহ প্রবেশ করতে চাইলে তিনি হুসাইন মনে করে বলেন, এই আমানত আমি আপনার হাতে দিতে পারি না। উবাইদুল্লাহ ধমক দিয়ে দরজা খুলতে বললে তিনি বুঝতে পারেন এটা হুসাইন রা. নয়। তিনি দরজা খুললেন, বরখাস্ত হওয়ার খবর পেলেন। উবাইদুল্লাহকে চাবি দিয়ে তিনি বের হয়ে চলে গেলেন। ইয়াজিদ উবাইদুল্লাহকে নির্দেশ দিলেন যেন মুসলিম বিন আকিল ও তার স্থানীয় আশ্রয়দাতাদের হত্যা করা অথবা নির্বাসন দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণ করে উবাইদুল্লাহ মসজিদে সবাইকে সমবেত হতে বললেন। এরপর জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকা ও শাসকের অনুগত হওয়ার জন্য আহ্বান জানালেন। মুসলিম বিন আকিলসহ অন্যান্য রাষ্ট্রবিরোধীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বললেন। যাদের আশ্রয়ে তারা থাকবে তাদের মৃত্যদণ্ড দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিলেন। গোয়েন্দারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো মুসলিম বিন আকিলের সন্ধানে। উবাইদুল্লাহর গোয়েন্দারা নিশ্চিত হলো হানী বিন উরওয়ার ঘরে হুসাইন রা.-এর পক্ষে বাইয়াত নেওয়া হচ্ছে। একজন গোয়েন্দা হুসাইন রা.-এর পক্ষে বাইয়াত নেওয়ার ভান করে মুসলিম বিন আকিলের সাথে দেখা করে বিষয়টি নিশ্চিত হয়। হানি বিন উরওয়া ছিলেন কুফার একজন আমীর। তিনি ছিলেন প্রভাবশালী। তার অনেক অনুসারী ছিল। উবাইদুল্লাহ শাসক হয়ে আসার পর প্রায় সব আমীর তার সসাথে দেখা করলেও হানি দেখা করেননি। এতে উবাইদুল্লাহ তার সৈন্যদের হানিকে নিয়ে আসতে বললো। হানি জানালো সে অসুস্থ। সুস্থ হলে সে দেখা করতে আসবে। কিন্তু উবাইদুল্লাহ তাকে সে সুযোগ দেয়নি। আসতে বাধ্য করে। উবাইদুল্লাহ হানিকে মুসলিম বিন আকিলের বাইয়াত ও অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে হানি উত্তর দিতে অস্বীকার করেন ও মুসলিম বিন আকিলের সন্ধান জানে না বলে জানান। এই সময় বাইয়াত নেওয়া ঐ গোয়েন্দা যখন সামনে এসে দাঁড়ায় তখন হানি হতবুদ্ধি হয়ে যায়। উবাইদুল্লাহ হানি ভয়ংকর আঘাত করে। এতে তার মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে যায়। হানির লোকেরা জমায়েত ও শোরগোল করতে থাকে। উবাইদুল্লাহ তার প্রতিনিধির মাধ্যমে জানায় হানি জীবিত আছে। তাকে কেবল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটকে রাখা হয়েছে। কেউ যেন হইচই করে নিজের বিপদ না ডাকে। হানির লোকেরা পিছিয়ে গেল। এদিকে মুসলিম বিন আকিল এই খবর শুনতে পেয়ে কুফার রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। তিনি তার হাতে বাইয়াত নেওয়াদের একটি সাংকেতিক বাক্য শিখিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যখন সময় আসবে তখন তিনি 'ইয়া মনসুর, আমুতু' বলে সংকেত দিবেন। তখন সবাই একযোগে অস্ত্রহাতে বেরিয়ে পড়বে। রাস্তায় বেরিয়ে মুসলিম সাংকেতিক বাক্য উচ্চারণ করলেন। মুহূর্তের মধ্যে কুফাবাসীরা সবাই সাংকেতিক বাক্য বলতে লাগলো। অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৪০০০ যোদ্ধা ইয়াজিদের গভর্নর উবাইদুল্লাহর বিরুদ্ধে ও হানিকে উদ্ধার করতে সমবেত হয়ে গেল। অতঃপর মুসলিম বিন আকিল চার হাজার সমর্থক নিয়ে অগ্রসর হয়ে দুপুরের সময় উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের প্রাসাদ ঘেরাও করলেন। হানিকে ফিরিয়ে দিতে বললেন। এটা এমন সময়ে হলো যখন কুফার আমীররা উবাইদুল্লাহর সাথে ছিল। উবাইদুল্লাহ তাদের ওপর প্রেসার ক্রিয়েট করলো ও তাদের জিম্মি করলো যাতে তারা তাদের আত্মীয় ও অনুসারীদের ফিরে যেতে বলে। আমীররা একের পর এক প্রাসাদের জানালা দিয়ে তাদের অনুসারী ও আত্মীয় ফিরে গিয়ে তাদের জান বাঁচাতে অনুরোধ করতে থাকলো। এতে অনেকে ফিরে গেল। এরপর একসময় উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ প্রাসাদে দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দিলেন। তাতে তিনি ইয়াজিদের সেনাবাহিনীর ভয় দেখালেন। তিনি এমন ভীতি প্রদর্শন করলেন যে, লোকেরা ইয়াজিদের ধরপাকড় এবং শাস্তির ভয়ে কুফার লোকেরা আস্তে আস্তে পলায়ন করতে শুরু করল। যারা যাচ্ছিল না তাদের স্ত্রী-স্বজনরা এসে তাদের ভালোবাসা ও ভয় দেখিয়ে নিয়ে গেল। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর মুসলিম বিন আকীল দেখলেন,আল্লাহর একজন বান্দাও তার সাথে অবশিষ্ট নেই। এবার তাকে গ্রেপ্তার করা হল। উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ তাকে হত্যার আদেশ দিলেন। শহীদ হওয়ার পূর্বে মুসলিম বিন আকিল ব্যাপক নির্যাতনের মুখোমুখি হলেন। এক পর্যায়ে মুসলিম তার মৃত্যু নিশ্চিত বুঝতে পেরে ইবনে যিয়াদের কাছে ওসিয়ত করার জন্য চাইলেন। উবাইদুল্লাহ অনুমতি দিলে তিনি কুফায় থাকা উমর বিন সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে ডাকলেন। তাকে বললেন, কুফায় এক ব্যাক্তির কাছে আমার ৭০০ দিরহাম ঋণ আছে। তুমি পরিশোধ করে দিও। ইবনে যিয়াদ থেকে আমার লাশ চেয়ে নিয়ে দাফন করবে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হুসাইন রা.-কে এখানকার পরিস্থিতি জানিয়ে দিবে। আমি তাঁকে কুফায় আসতে লিখে পাঠিয়েছে। উমর বিন সা'দ এসব কথা ইবনে যিয়াদকে জানালে সে অনুমতি দিল ওসিয়ত পুরো করতে। এরপর ইবনে যিয়াদ প্রাসাদের সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে গেল মুসলিমকে। সেখানে শিরচ্ছেদ করে তাকে প্রাসাদ থেকে ফেলে দেওয়া হলো। শাহদাতের পূর্বে মুসলিম বিন আকিল তাকবির, তাহলিল, তাসবীহ ও ইস্তেগফার পড়ছিলেন। মুসলিমকে হত্যা করার পর উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ হানি বিন উরওয়াকেও হত্যা করে। শুধু তাই নয়, ইয়াজিদের পাঠানো সন্ত্রাসী ইবনে যিয়াদ খুঁজে খুঁজে কুফার বহু আলেম ও সৈনিক যারা হুসাইন রা.-এর পক্ষে জনমত গঠন করেছিলেন তাদের হত্যা করেছে। ইবনে যিয়াদ মুসলিম বিন আকিলের মাথা দামেশকে পাঠিয়ে খুশি করেছে ইয়াজিদকে। ইয়াজিদ তা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছে। মুসলিম বিন আকিলের শাহদাতের দিন ছিল যিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ অর্থাৎ আরাফার দিবসে। এর আগেই মুসলিমের চিঠি পেয়েছিলেন হুসাইন রা.। সেই চিঠির ওপর ভিত্তি করে যিলহাজ্জ মাসের ৮ তারিখ অর্থাৎ মুসলিমের শাহদাতের আগের দিন হুসাইন রা. মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। ৬০ হিজরির শেষ মাসে হুসাইন রা. তার পরিবারকে সাথে নিয়ে রওনা হয়েছিলেন। তার প্রায় একমাস পরে ৬১ হিজরির প্রথম মাস মহররমের ২ তারিখ ইরাকের কারবালা প্রান্তরে তাঁবু স্থাপন করেন। কারবালা ছিল কুফা থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তরে। হুসাইন রা. তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কুফার কাছাকাছি কারবালায় পৌঁছেন। এখানেই ১০ মহররম তাঁর সাথে ইয়াজিদের সন্ত্রাসী বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হয়।

১৩ আগ, ২০২১

কারবালা পর্ব-০২ : ইয়াজিদের পথ ও হুসাইন রা.-এর পথ



একদিন মুয়াবিয়া রা. ইন্তেকাল করলেন। সেসময় ইয়াযিদ ছিল হিমসের হাওয়ারিন দূর্গে। সেখান থেকে মৃত্যুর সংবাদ শুনে দ্রুত রাজধানী দামেশকে চলে আসেন। ইয়াযিদ আসার আগেই মুয়াবিয়া রা.-এর দাফন সম্পন্ন হয়ে যায়।

যেহেতু মুয়াবিয়া রা. আগেই ইয়াজিদের পক্ষে বাইয়াত নিয়ে নিয়েছেন তাই পরবর্তী শাসক নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি দামেশকে। ইয়াজিদ রাষ্ট্রের সভাসদ এবং দামেশকবাসীর উদ্দেশ্যে শোক বক্তব্যে বলেন,
"মুয়াবিয়া নিঃসন্দেহে আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে একজন বান্দা ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তার উপর অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন। তারপর নিজের কাছে নিয়ে গিছেন। তিনি পূর্ববর্তীদের থেকে মর্যাদার দিক থেকে কম হলেও পরবর্তীদের থেকে উত্তম ছিলেন। আমি আল্লাহর কাছে তাঁর পক্ষে সাফাই গাইছি না। কেননা, আল্লাহ তাআলাই তার ব্যাপারে ভালো জানেন। যদি তার ক্ষমা হয়, তাহলে এটা আল্লাহর রহমাত। আর যদি পাকড়াও হন, তাহলে তা নিজের পদস্খলনের কারণে। তারপর জিম্মাদারী আমাকে দেয়া হয়েছে। কোন কিছুর অন্বেষণে আমি ব্যথিত নই এবং কোন কিছুর বর্জনে আমি কৈফিয়ত দানকারী নই। কিন্তু যা আল্লাহ তাআলা মঞ্জুর করেন, তা’ই হয়"। 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়ার সময়ই ইয়াজিদ নিশ্চিত করেছেন তিনি তার কাজের জন্য কারো কাছে জবাবদিহী করবেন না। এরপর তিনি সারা মুসলিম জাহানে মুয়াবিয়া রা. এর মৃত্যুর খবর ও ইয়াজিদের কাছে বাইয়াত নেওয়ার জন্য দূত পাঠান। তিনটি স্থান থেকে বাধা আসার সম্ভাবনা ছিল। সেগুলো হলো কুফা, বসরা ও মদিনা। এই তিন স্থানে গভর্নর ছিলেন যথাক্রমে নু’মান বিন বশীর রা., উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ এবং ওলীদ বিন উতবা। 

বসরায় উবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদের কঠোর শাসনে কেউ ইয়াজিদের কাছে বাইয়াত নেওয়ার ব্যাপারে বিরত থাকতে পারে নি। তবে কুফা ও মদিনায় বেশিরভাগ মুসলিম ও প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গ ইয়াজিদের বাইয়াত গ্রহণ করে নি। 

মদিনার চারজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হুসাইন রা., ইবনে যুবায়ের রা., ইবনে ওমর রা. এবং ইবনে আবু বকর রা. আগে থেকেই অর্থাৎ মুয়াবিয়া রা.-এর সময় থেকেই ইয়াজিদের খলিফার উত্তরাধিকার হওয়ার ব্যাপারে বাধা দিয়েছেন। মুয়াবিয়া রা. তাদেরকে অস্ত্রের মুখে বাইয়াত নিতে বাধ্য করেছেন। 

ইয়াযিদ সিংহাসনে আরোহনের পর মুয়াবিয়া রা. এর আযাদকৃত গোলাম রুযাইককে মদিনার গভর্নর ওলীদ বিন উতবার নিকট প্রেরণ করে। এই মর্মে নির্দেশ দেন যে, ওলীদ যেন হুসাইন রা. ও আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা.-কে দ্রুত তার নিজের কাছে ডেকে আনে এবং তাদের থেকে বাইয়াত নেয়।

পত্রবাহক যখন মদীনায় পৌঁছে, তখন রাত হয়ে গিয়েছিল। সে গভর্নর ওলীদ বিন উতবার সাথে সাক্ষাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদটি পৌঁছায়। ওলীদ বিন উতবা সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই প্রথমে আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. এবং তারপর হুসাইন রা.-কে গভর্নর হাউসে ডেকে আনেন। এরপর বাইয়াত হবার জন্য অনুরোধ করেন।

আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. জবাবে বলেন, “বাইয়াত হবার এটা কোন সময় নয়। তাছাড়া আমার মত ব্যক্তি একাকি লুকিয়ে বাইয়াত হবো না। আপনি কালকে মিম্বরে বসে আমার বাইয়াত গ্রহণ করুন”। এরই মাঝে হুসাইন রা. উপস্থিত হলেন। ওলীদ বিন উতবা ইবনে যুবায়েরের কথাকে যুক্তিযুক্ত মনে করলেন। তাই হুসাইন রা.-কেও বাইয়াত হবার জন্য কোনো চাপ সৃষ্টি করলেন না। উভয়কে বাইয়াত ছাড়াই যাবার অনুমতি দিয়ে দিলেন।

তারা উভয়ে বুঝে গেলেন যে, বাইয়াত না হলে তাদের উপর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোরতা করা হবে। তা’ই রাতের শেষ প্রহরে আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. বিকল্প একটি রাস্তা দিয়ে মদিনা থেকে বের হয়ে মক্কা রওনা হয়ে গেলেন। ওলীদ যখন সকালে তার অনুপস্থিতির কথা জানতে পারলো, তখন তার খোঁজে ৩০ বা ৮০ জন ঘোরসওয়ার প্রেরণ করল। কিন্তু তারা আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা.-কে খুঁজে পেল না। একইভাবে হুসাইন রা.ও তার পরিবারসহ মদিনা থেকে উধাও হয়ে যান। 

এদিকে আব্দুল্লাহ বিন উমার রা. ও ইবনে আব্বাস রা. উপয়ান্তর না দেখে বাইয়াত নেন। মুয়াবিয়া রা.-এর সামনে তারা দৃঢ়তা দেখাতে সক্ষম হলেও ইয়াজিদ বাহিনীর সামনে দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি। এতে বুঝা যায় ইয়াজিদ ও তার বাহিনীর ফাসেকি আচরণ তাদের দুর্বল করে দিয়েছে। একই কথা হুসাইন রা. ও ইবনে যুবাইর রা.-এর জন্যও সত্য। তারাও ইয়াজিদ বাহিনীর মুখোমুখি হতে চাননি।     

তাঁরা মদীনা থেকে মক্কাকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করার কারণ এই ছিল যে, মক্কা পবিত্র শহর। রাষ্ট্রপক্ষীয় দায়িত্বশীলরা ক্ষমতা প্রয়োগ করে উক্ত পবিত্র ভূমির পবিত্রতা বিনষ্ট করার সাহস করবে না। দামেশক থেকে মদীনা কাছে। কিন্তু মক্কা বেশ দূরে। তাছাড়া মদীনার তুলনায় মক্কা ছিল পাহাড়ে ঘেরা শহর। যাতে সহজেই রাষ্ট্রীয় সেনাদের থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা সহজতর ছিল। এসকল কারণে হযরত হুসাইন রা. এবং আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. মদিনা ছেড়ে মক্কায় নিজেদের অধিক নিরাপদ মনে করলেন।

ইয়াজিদের শাসনামলে সাহাবাদের বড় অংশ যারা মদিনায় ছিলেন তারা দুই কারণে বাইয়াত হতে রাজি ছিলেন না। প্রথমত সে মুসলিমদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যোগ্য মানুষ ছিল না। নেতা হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে ইসলামের গাইডলাইন আছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, মানুষের ইমামতি করবে সে-ই, যে কুরআন ভাল জানে। যদি কুরআন জানায় সকলে সমান হয়, তবে যে সুন্নাহ বেশি জানে। যদি সুন্নাহেও সকলে সমান হয়, তবে যে হিজরত করেছে সে। যদি হিজরতেও সকলে সমান হয়, তবে যে বয়সে বেশি। কেউ যেন অপর ব্যক্তির অধিকার ও সেইস্থলে ইমামতি না করে এবং তার বাড়িতে তার সম্মানের স্থলে অনুমতি ব্যতীত না বসে। 

আল্লাহর রাসূল সা. যখন এটি বলেছেন তখন ইসলামের জন্য বড় ত্যাগ ছিল হিজরত। তাই হিজরতকে যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়েছে। পরবর্তী যুগে যারা ইসলামের জন্য বেশি ত্যাগ করবে এটি তাদের ৩য় যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে। যাই হোক ইয়াজিদের নেতা হওয়ার এই সকল গুণের কোনোটাই ছিল না। উলটো তিনি নামাজ ছেড়ে দিতেন, রেশমি কাপড় পরতেন, মদ্যপায়ী ছিলেন, প্রেমাসক্ত কবিতায় লিখতেন ও মজে থাকতেন। এরকম লোক কীভাবে মুসলিমদের নেতা হয়! 

দ্বিতীয়ত নির্বাচন পদ্ধতি। আদর্শ নিয়ম হচ্ছে শুরা কর্তৃক নির্ধারণ করবে কে হবে নেতা। যার কাছে উল্লিখিত গুণাবলী থাকবে এবং যাকে মুসলিমরা ভোট দিবে বা সমর্থন দিবে তিনিই হবেন নেতা। জোর করে নেতা হওয়া অথবা পিতার উত্তরাধিকার হিসেবে মুসলিমদের নেতা হওয়া ইসলামে বৈধতা নেই। 

রাসূল সা. বলেন, ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ কবুল হবে না।  যে কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয়েছে অথচ তারা তাকে পছন্দ করে না, যে নামাজ পড়তে আসে দিবারে। আর দিবার হল- নামাজের উত্তম সময়ের পরের সময়কে এবং যে কোন স্বাধীন নারীকে দাসীতে পরিণত করে। (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।

আবু উমামা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের কানের সীমা অতিক্রম করে না (অর্থাৎ কবুল হয় না) পলাতক দাস যতক্ষণ না সে ফিরে আসে, যে নারী রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট এবং গোত্র বা জাতির ইমাম কিন্তু মানুষ তাকে পছন্দ করে না। (তিরমিযী, তবে হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী গরীব বলেছেন)

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের মাথার উপর এক বিঘতও ওঠে না অর্থাৎ কখনই কবুল হয় না। ক. যে ব্যক্তি কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয় কিন্তু তারা তাকে পছন্দ করে না, খ. সেই নারী যে রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী সঙ্গত কারণে তার ওপর নাখোশ এবং গ. সেই দুই ভাই যারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন। (ইবনে মাজাহ) 

এই তিনটি হাদিসে দেখা যায় জনগণের রায় না নিয়ে ক্ষমতায় থাকা অবৈধ। তাদের ইবাদত কবুল হয় না। ইয়াজিদকে লোকজন না চাওয়ার পরও সে জোর করে জাতির নেতা হয়ে বসেছে। এটা ইসলামে অবৈধ। এই অবৈধ শাসকের নেতৃত্ব মেনে নেন নি প্রখ্যাত সাহাবারা। তবে প্রথমে মুয়াবিয়া রা. ও পরে ইয়াজিদ চাপে তারা বাধ্য হয়ে বাইয়াত নেন। ব্যতিক্রম শুধু দুইজন প্রখ্যাত সাহাবী একজন রাসূল সা.-এর নাতি ও অন্যজন আবু বকর রা.-এর নাতি।      

ইসলামে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। অনেক অর্বাচীন ইয়াজিদের বিরোধীতাকে শাসকের বিরোধীতা হিসেবে বিবেচনা করতে চায়। ইয়াজিদ তো জালিম। সে তো বৈধ শাসকই নয়। যে বৈধ শাসক নয়, জীবন দিয়ে তার বিরোধীতা করার শিক্ষাই হলো কারবালার শিক্ষা। হুসাইন রা. সেই শিক্ষাই আমাদের দিয়ে গেছেন। রাসূল সা. তাঁকে জান্নাতি ও শহীদ হিসেবে আগেই ঘোষণা দিয়ে গেছেন। অতএব হুসাইন রা.-এর পথ ভুল পথ নয়। এটিই সর্বোচ্চ সঠিক পথ। যারা শক্তির অভাবে ইয়াজিদের অনুগত হয়েছেন তাদের পথ ওজরের পথ। এটা আদর্শ পথ নয়। আর ইয়াজিদের পথ তো সঠিক হতে পারে না, এটা অবৈধ পথ, জাহান্নামের পথ। 

হুসাইন রা. ও ইবনে যুবায়ের রা.-এর বাইয়াত না নিয়ে মদিনা থেকে চলে যাওয়ার খবরে ইয়াজিদ অত্যন্ত ক্ষেপে যান। তিনি ওলিদকে তাদের অনুসারীদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন। মদিনার গভর্নর ওলিদ এই দুজনের আত্মীয়দের গণগ্রেপ্তার শুরু করেন। মদিনাবাসী প্রথমে গভর্নরের কাছে যায় তাদের মুক্ত করতে। বিফল হয়ে তারা আব্দুল্লাহ বিন উমর রা.-এর কাছে আবেদন করলেন যে, যেন প্রশাসন এভাবে কঠোরতা করা থেকে বিরত থাকে ও বন্দিদের ছেড়ে দেয়।

ইয়াজিদের বাইয়াত নেওয়া ইবনে উমর রা. পেরেশান হয়ে ওলীদ বিন উতবার সাথে সাক্ষাৎ করেন। বললেন, ‘স্বীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত রাখতে হকের উপর অটল থাকো, জুলুম করো না। যাদের গ্রেফতার করেছো তারা নির্দোষ। তাদের ছেড়ে দাও’। ওলিদ জানালেন, তার কিছুই করার নেই। আমীরুল মু’মিনীন ইয়াজিদের আদেশ এমনটাই। তাই লঙ্ঘণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

মদীনাবাসী যখন দেখলো আব্দুল্লাহ বিন উমর রা.-এর মতো ব্যক্তিত্ব এর সুপারিশ পর্যন্ত ফিরিয়ে দেয়া হলো। তখন তারা বুঝলো এই জালিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই সমাধান। মদিনাবাসী  জেলখানায় হামলা করে বসে ও আটক ব্যাক্তিদের ছাড়িয়ে আনে। আটক ব্যাক্তিরা মুক্ত হওয়ার পর মক্কায় চলে যায়। ইয়াজিদ এতে ক্ষুব্দ হয়ে ওলিদ বিন উতবাকে বরখাস্ত করেন এবং আমর বিন সাঈদকে নতুন গভর্নর হিসেবে মদিনায় পাঠান।  

আমর বিন সাঈদ দায়িত্ব নিয়ে মদিনাবাসীদের কঠোরভাবে শাসিয়ে দেন তারা যদি একই কাজ আবারো করে তবে এর চরম মূল্য দিতে হবে। এছাড়া তিনি মক্কায় হামলা করে বিদ্রোহীদের শাস্তি দেওয়ারও সংকল্প করেন। 

এদিকে বাইয়াত না নেওয়া হুসাইন রা. ও আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. দফায় দফায় পরামর্শ করতে থাকেন কী করা যায়! অবশেষে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, একটি স্থানকে কেন্দ্র বানিয়ে নিজেদের পক্ষে জনমত আদায় করতে হবে এবং বৈধ খিলাফত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু কেন্দ্র কোন স্থানকে বানানো হবে? এ বিষয় নিয়ে উভয়ের মাঝে মতভেদ দেখা দেয়। 

আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা. এর মত ছিল এই যে, মক্কাকে কেন্দ্র বানানো হোক। কারণ, মক্কাই সবচেয়ে নিরাপদ। মক্কা পুরো মুসিলম মিল্লাতের আদি কেন্দ্রভূমি। মক্কায় যেমন সাহায্যকারী নিজেদের গোত্র কোরাইশরা রয়েছে, তেমনি মুত্তাকী পরহেযগারদের এক বড় জামাতও বিদ্যমান। তাই তিনি চাইলেন যে, হযরত হুসাইন রা. যেন মক্কাকেই কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেন।

কিন্তু হযরত হুসাইন রা. এর কাছে ইরাক থেকে একের পর এক পত্র এবং প্রতিনিধি দল আসছিল। যারা এখনো ইয়াজিদের হুমকি উপেক্ষা করে বাইয়াত নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। হযরত হুসাইন রা. তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কুফা তথা ইরাক যাবার দিকেই মনস্থির করছিলেন। ইরাকে যাবার পেছনে হুসাইন রা. এর প্রথম কারণ এই ছিল যে, আন্দোলনে সাধারণ মানুষের জানমাল হেফাজত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হেযাজের তুলনায় ইরাকে তার অনুসারীদের সংখ্যা বেশি থাকায় শক্তিও বেশি থাকবে। ফলে কম ক্ষতির সম্মুখিন হয়ে সফলতার মুখ দেখা সহজ হবে বলেই তিনি মনে করলেন।

এছাড়াও হযরত হুসাইন রা. নিজের জানের চেয়ে পবিত্র নগরীর পবিত্রতা রক্ষা করাকে বেশি জরুরি মনে করলেন। ঠিক একই কারণে হযরত আলী রা. মক্কা মদীনা ছেড়ে কুফাকে রাজধানী বানিয়েছিলেন। হযরত হুসাইন রা. জানতেন যে, এখন হজ্জ চলছে বলে তার উপর হামলা করা বন্ধ আছে। কিন্তু হজ্জ শেষ হলেই তার ওপর আক্রমন করা হবে। তাই তিনি পবিত্র নগরীকে রক্তপাত থেকে রক্ষা করতে মক্কা ছেড়ে দেওয়াকেই প্রাধান্য দিলেন। তবে তিনি আরেকটি কেন্দ্র রাখার জন্য আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রা.-কে মক্কায় থেকে যেতে ও জনমত গঠন করতে বলেন। 

এদিকে হুসাইন রা. কুফায় যাওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করেননি। তিনি তার চাচতো ভাই মুসলিম বিন আকিলকে কুফায় পাঠালেন পরিস্থিতি যাচাই করে চিঠি দেওয়ার জন্য। এবং সব ঠিকঠাক থাকলে নতুন খিলাফত গঠনের জিহাদের বাইয়াত নেওয়ার জন্য। 

১২ আগ, ২০২১

কারবালা পর্ব-০১ : কারবালা ঘটনার পটভূমি

 


আলী রা. যখন শাহদাত বরণ করেন তখন পরবর্তী খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন তাঁরই ছেলে হাসান বিন আলী রা.। তিনি খিলাফতের দায়িত্ব নিলে তৎকালীন আরবের লেবান্ট অঞ্চলের (সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তিন) শাসক মুয়াবিয়া রা. পূর্বের মতোই বিদ্রোহ করেন। তখন খিলাফতের রাজধানী ছিল ইরাকে। মুয়াবিয়া রা. ইরাক অভিমুখে সেনা পরিচালনা করলে হাসান রা.ও তার সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেন। 

তবে হাসান রা. যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন বলে মনে হয় না। মুয়াবিয়া রা.-এর পক্ষ থেকে আপোষ প্রস্তাব এলে তিনি যুদ্ধ এড়ানোর জন্য তাতে রাজি হয়ে যান। যদিও তার ছোট ভাই হুসাইন রা. ও সেনারা এটা সহজে মানতে পারেন নি। যাই হোক, যেহেতু খলিফা হাসান রা. মুয়াবিয়া রা.-এর পক্ষে নিজের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন তাই না মেনে আর উপায় ছিল না। এরপর মুয়াবিয়া রা. কুফা অর্থাৎ রাজধানীতে প্রবেশ করলেন ও জনগণের সামনে ভাষণ দিলেন। 

এসময় আমর ইবনুল আস রা. মুয়াবিয়া রা.-কে ইশারা করলেন যাতে হাসান রা.-কে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হয়। মুয়াবিয়া রা. হাসান রা.-এর নাম ঘোষণা করলেন। আমর ইবনুল আস রা. ও মুয়াবিয়া রা.-এর আশা ছিল হাসান রা. জনগণকে মুয়াবিয়া রা.-এর আনুগত্যের দিকে আহ্বান জানাবেন। হাসান রা. জনগণকে বললেন, আমরা রক্তপাত বন্ধ করেছি। যুদ্ধ থেকে নিজেদের বাঁচিয়েছি। দুনিয়া খুব অল্প সময়ের। আল্লাহ তায়ালা এসময়ে মানুষকে নানানভাবে পরীক্ষা করেন। কাউকে ক্ষমতা দিয়ে কাউকে ক্ষমতা না দিয়ে। এরপর তিনি সূরা আম্বিয়ার ১১১ নং আয়াত তিলওয়াত করেন। 

এতটুকু বক্তব্যেই ক্ষেপে যান মুয়াবিয়া রা.। তিনি ধমক দিয়ে হাসান রা.-কে বসিয়ে দেন। এরপর হাসান রা.-এর অনুসারীরা আরো নিশ্চিত হলো মুয়াবিয়া রা. চুক্তি রক্ষা করবেন না। হলোও তাই। হাসান রা. খুব সহজে সন্ধি প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলে সন্ধির চুক্তিগুলোও লিপিবদ্ধ হয়নি। চুক্তি প্রতিপালন তো দূরের কথা। এই ব্যাপার নিয়ে হাসান রা. তার অনুসারীদের দ্বারা ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছেন। যদিও হাসান রা.-এর সিদ্ধান্তে উম্মাহ রক্তপাত থেকে রক্ষা পেয়েছে তারপরও তার অনুগতরাই তাকে মুমিনের মুখে কালিমা লেপনকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 

হাসান রা. তখন নবিজীর একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করে আত্মপক্ষ সমর্থন করলেন। একবার রাসূল সা. স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন তাঁর জন্য স্থাপিত মিম্বরে উঠে গেছে উমাইয়া বংশের লোকেরা। তিনি খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। এটা সেসময়ের ঘটনা যখন মুহাম্মদ সা. রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি। তিনি তখনো মক্কায়। মুহাম্মদ সা. বুঝতে পারলেন তাঁর স্থাপিত ইসলামী রাষ্ট্র একটি বংশের কুক্ষিগত হয়ে পড়বে। তিনি দুঃখ পেলেন। একইসাথে এও জানতে পারলেন এই বংশ ১০০০ মাস রাজত্ব করবে। 

স্বপ্ন দেখার পর বিষণ্ণ মুহাম্মদ সা.-কে পুরস্কার দিয়ে সান্ত্বনা দিলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা। তিনি সূরা কদর নাজিল করে জানালেন, আর মহিমান্বিত রাত প্রসঙ্গে আপনি কি জানেন? মহিমান্বিত রাত হাজার মাস হতেও উত্তম”। 

হাসান রা. মুআবিয়া রা.-এর নিকট বাই’আত গ্রহণের পর তাঁর সামনে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলেন, আপনি (মুআবিয়ার নিকট বায়’আত গ্রহণ করে) মু’মিনদের চেহারা কলঙ্কিত করেছেন। এতে তিনি বললেন, তুমি আমাকে অভিযুক্ত করো না। আল্লাহ তা’আলা তোমার প্রতি রহমত করুন। 

যেহেতু রাসূলুল্লাহ সা.-কে স্বপ্নে উমাইয়্যা বংশীয়দেরকে তাঁর মিম্বারের ওপর দেখানো হয়েছে। বিষয়টি তাঁর নিকট খারাপ লাগে। তখন অবতীর্ণ হয়, “আমি অবশ্যই তোমাকে কাওসার (ঝরণা) দান করেছি” (সূরাঃ আল-কাওসার-১) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! আমি জান্নাতে তোমাকে কাওসার নামক ঝরণা দান করেছি। আরো অবতীর্ণ হয়, “নিশ্চয় আমি এ কুরআন মহিমান্বিত রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর মহিমান্বিত রাত প্রসঙ্গে আপনি কি জানেন? মহিমান্বিত রাত হাজার মাস হতেও উত্তম” (সূরাঃ আল-ক্বাদর-১-৩)। 

হাসান রা. বুঝাতে চেয়েছেন, উমাইয়ারা ক্ষমতা দখল করবে এটা নির্ধারিত, তাই সন্ধি করে আমি রক্তপাত বন্ধ করতে চেয়েছি। 

যাই হোক হাসান রা. ও মুয়াবিয়া রা.-এর মধ্যে চুক্তি লিখিত না হওয়ায় এর সঠিক শব্দগুলো পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে যা জানা যায় তা হলো, 
১. মুয়াবিয়া রা.-কে হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, অপবাদ ও প্রচারণা বন্ধ করতে হবে।
২. মুয়াবিয়া রা.-কে বাদশাহী আচার-আচরণ পরিহার করতে হবে।
৩. জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারগুলোকে অর্থ সাহায্য দিতে হবে।
৪. মুয়াবিয়া রা. কোনো ব্যক্তিকেই (খেলাফতের জন্য) নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করতে পারবেন না। পরবর্তী খলিফা নির্ধারিত হবে শুরা কর্তৃক নির্বাচিত।
৫. মুয়াবিয়া রা.-এর মৃত্যুকালে হাসান রা. জীবিত থাকলে খেলাফতের উত্তরসূরি হবেন হাসান রা.।

আমরা ইতিহাস থেকে দেখতে পাই মুয়াবিয়া রা. কর্তৃক এই চুক্তিগুলোর মধ্যে ৩ নং ছাড়া কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। ইমাম হাসান তিনবার বিষপ্রয়োগের শিকার হলেন। প্রথম দুইবার সুস্থ হলেও তৃতীয়বারে তিনি শহীদ হন। প্রায়ই জুমুআর খুতবায় আলী রা.-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা ও অভিশম্পাত করা হতো। এর বিরুদ্ধে কথা বলায় হুজর বিন আদি রা.-কে খুন করেন। একই ঘটনায় আলী রা.-এর ভাই আকিল রা.-কেও হত্যা করার চেষ্টা করেন। তিনি এক গুহায় মৃত্যবরণ করলে মুয়াবিয়া রা.-এর সৈন্যরা তাঁর মাথা কেটে মুয়াবিয়া রা.-এর কাছে পাঠিয়ে দেয়। মুয়াবিয়া রা. আকিল রা.-এর মাথা সিরিয়ার রাস্তায় রাস্তায় প্রদর্শনী করেন। এরপর বন্দি থাকা আকিল রা.-এর স্ত্রীর কাছে তা প্রেরণ করেন। 

শর্ত ছিল বাদশাহী আচরণ পরিহার করার। মুয়াবিয়া রা. নিজেকে ইসলামের প্রথম বাদশাহ হিসেবে দাবি করতেন। এর আগেও উমার রা.-এর খিলাফতকালে এই আচরণের জন্য তাকে বেত্রাঘাত করতে উদ্যত হয়েছিলেন। মুয়াবিয়া রা. তার জীবদ্দশায় তারই পুত্র ইয়াজিদকে খেলাফতের উত্তরসূরী হিসেবে ঘোষণা করেন এবং নেতাদের কাছ থেকে ইয়াজিদের পক্ষে বাইয়াত আদায় করেন। ৫ম শর্ত কার্যকর করার সুযোগ ছিল না কারণ তার আগেই হাসান রা. শাহদাতবরণ করেন। হাসান রা.-এর শাহদাতের ব্যাপারে উমাইয়াদের অনেকে দায়ি করলেও সুনির্দিষ্ট প্রমান হাজির করতে পারে নি।         

ইয়াজিদ এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি খলিফা হওয়ার যোগ্য ছিলেন না। শুরা দ্বারা খলিফা নির্বাচনের ব্যাপার হলে তার নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ হতো না। তিনি ইসলামের বেসিক জ্ঞান, ইনসাফ ও আদল তো দূরের কথা তিনি নামাজ ছেড়ে দিতেন। মদ পান করতেন ও প্রেমাসক্ত কবিতা লিখতেন। হাসান বসরি রহ. চার কারণে মুয়াবিয়া রা. এর শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করতেন। ১. খলিফা আলী রা.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তথা হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ২. হুজর বিন আদি রা.-কে খুন ৩. জিয়াদ বিন আবিহকে নিজের পিতার ঔরশভুক্ত করে নেওয়া (যা হারাম করা হয়েছে সূরা আহজাবের ৫ নং আয়াতে)। ৪. নিজের মদ্যপায়ী সন্তানের অনুকূলে খলিফা হিসেবে বাইয়াত নেওয়া।

এখানে একটা বিষয় দ্রষ্টব্য যে, যে কারনে মুয়াবিয়া রা. ইসলামের ৪র্থ খলিফা আলী রা.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল সে কারণটা তার পুরো শাসনামলে উপেক্ষিত ছিল। তিনি বিশ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। এরমধ্যে তিনি একবারও ইসলামের তৃতীয় খলিফা উসমান বিন আফফান রা.-এর হত্যার বিচারে উদ্যোগী হননি। 

কারবালার ঘটনার জন্য সবচেয়ে গুরুতর দায়ী ব্যাপার হলো ইয়াজিদকে ক্ষমতার উত্তরাধিকার করে যাওয়া। এই ব্যাপারে মুগিরা বিন শু'বা রা.-এর ভূমিকা রয়েছে। মুআবিয়া রা. তাকে কুফার গভর্নরের পদ থেকে বরখাস্ত করার কথা চিন্তা করছিলেন। তিনি এ বিষয়ে অবহিত হলেন। তৎক্ষণাৎ কুফা থেকে দামেশকে পৌঁছে ইয়াজিদের সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, ‘শীর্ষ স্থানীয় সাহাবী এবং কুরাইশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমি বুঝতে পারছি না আমীরুল মুমিনীন তোমার পক্ষে বায়আত গ্রহণের কেন বিলম্ব করছেন!’ ইয়াজীদ তাঁর পিতার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। 

মুয়াবিয়া রা. মুগিরা রা.-কে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ইয়াজিদকে কী বলেছো? মুগিরা রা. জবাব দেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! হযরত ওসমান রা.-এর হত্যার পর যত মতবিরোধ এবং খুন-খারাবী হয়েছে, তা আপনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। কাজেই এখন আপনার জীবদ্দশায়ই ইয়াজীদকে স্থলাভিষিক্ত করে বাইয়াত গ্রহণ করাই আপনার জন্য উত্তম। ফলে আল্লাহ না করুন যদি আপনার কখনো কিছু হয়ে যায়, তাহলে অন্তত মতবিরোধ দেখা দেবে না।’ 

মুয়াবিয়া রা. জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কাজ করার দায়িত্ব কে নেবে? জবাবে তিনি বললেন, আমি কুফারবাসীদের সামলাবো; আর জিয়াদ বসরাবাসীদেরকে। এরপর বিরোধিতা করার আর কেউ থাকবে না।’ এ কথা বলে মুগিরা রা. কুফা গমন করেন এবং দশজন লোককে ৩০ হাজার দিরহাম দিয়ে একটি প্রতিনিধি দলের আকারে মুয়াবিয়া রা.-এর নিকট গমন করে ইয়াজীদের স্থলাভিষিক্তের জন্য তাঁকে বলতে সম্মত করেন। মুগিরা রা.-এর পুত্র মুসা ইবনে মুগিরার নেতৃত্বে এ প্রতিনিধি দল দামেস্কে গমন করে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে। পরে মুয়াবিয়া রা. মুসাকে একান্তে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার পিতা এদের নিকট থেকে কত মূল্যে এদের ধর্ম ক্রয় করেছেন? তিনি বললেন ৩০ হাজার দিরহামের বিনিময়ে। মুয়াবিয়া রা. বলেন, তাহলে তো এদের ধর্ম এদের দৃষ্টিতে নিতান্ত নগণ্য। 

অতঃপর মুআবিয়া রা. বসরার গভর্নর যিয়াদকে লিখেন, এ ব্যাপারে তোমার মতামত কী? তিনি ওবায়েদ ইবনে কাআবকে ডেকে বলেন, আমিরুল মুমিনীন এ ব্যাপারে আমাকে লিখেছেন। আমার মতে ইয়াজীদের মধ্যে অনেকগুলো দুর্বলতা রয়েছে। তিনি দুর্বলতাগুলো উল্লেখ করেন। অতঃপর বলেন, তুমি আমীরুল মুমিনীনের কাছে গিয়ে বলো যে, এ ব্যাপারে যেন তাড়াহুড়ো না করা হয়। 

ওবায়েদ বলেন, আপনি মুআবিয়া রা.-এর ইচ্ছের বিরোধীতা করবেন না। আমি গিয়ে ইয়াজিদকে বলবো যে, আমীরুল মুমিনীন এ ব্যাপারে আমীর যিয়াদের পরামর্শ চেয়েছেন। তিনি মনে করেন, জনগণ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করবে। কারণ, তোমার কোনো কোনো আচার-আচরণ জনগণ পছন্দ করে না। তাই আমীর যিয়াদের পরামর্শ এই যে, তমি এ সব বিষয় সংশোধন করে নাও, যাতে কাজটি ঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে। যিয়াদ এ মত পছন্দ করেন। ওবায়েদ দামেস্ক গমন করে এক দিকে ইয়াজীদকে তাঁর ব্যক্তিগত আচার-আচরণ সংশোধনের পরামর্শ দেন আর অপর দিকে হযরত মুআবিয়া রা.-কে বলেন, আপনি এ ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না। 

বসরার গভর্নর জিয়াদের মৃত্যুর পর মুআবিয়া রা. ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রভাবশালী লোকদের সমর্থন লাভের চেষ্টা শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা.-এর নিকট এক লক্ষ দিরহাম পাঠিয়ে ইয়াজিদের বাইয়াতের জন্য তাঁকে সম্মত করাবার চেষ্টা করেন। আব্দুল্লাহ রা. বলেনঃ ‘ওহো, এ উদ্দেশ্যে আমার জন্য এ টাকা পাঠানো হয়েছে। তা হলে তো আমার দ্বীন আমার জন্য খুবই সস্তা।’ এ বলে তিনি টাকা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। 

এরপর হযরত মুআবিয়া রা. মদিনার গভর্নর মারওয়ান ইবনুল হাকামকে লিখেন, ‘আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি। আমার জীবদ্দশায়ই কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে যেতে চাই। মারওয়ান বিষয়টি মদিনাবাসীদের সামনে উত্থাপন করে মসজিদে নববীতে ভাষণ দান করেন। তিনি বলেন, ‘আমীরুল মুমিনীন তোমাদের জন্য যোগ্য ব্যক্তি সন্ধান করার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেননি। তিনি নিজে পুত্র ইয়াজিদকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছেন। এটা একটা চমৎকার সিদ্ধান্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি নিজ পুত্রকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন, এটা কোন নতুন কথা নয়। আবুবকর (রাঃ) এবং ওমর (রাঃ)-ও স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করেছিলেন।’ 

এতে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা. উঠে দাঁড়িয়ে বলেনঃ ‘মারওয়ান! তুমি মিথ্যা বলেছো। আর মিথ্যা বলেছে মুআবিয়াও। তোমরা কখনো উম্মাতে মুহাম্মদীয়ার কল্যাণের কথা চিন্তা করোনি। তোমরা একে ‘কায়সারতন্ত্রে’ রূপান্তিরত করতে চাও। একজন কায়সর মারা গেলে তার পুত্র তার স্থান দখল করে। এটা আবুবকর ও ওমরের নীতি নয়। তাঁরা আপন সন্তানকে স্থলাভিষিক্ত করেননি।’ মারওয়ান বলেনঃ ‘ধরো একে’। এ ব্যক্তি সম্পর্কেই তো কুরআনে বলা হয়েছে, وَالَّذِى قَالَ لِوٰلِدَيْهِ أُفٍّ لَّكُمَآ (যে ব্যক্তি তার মাতা-পিতাকে বলেছে, অভিশাপ তোমাদের জন্য।) 

আব্দুর রহমান রা. মসজিদে নববি থেকে উঠে গিয়ে বোন আয়িশা রা.-এর ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। হযরত আয়েশা রা.ও বলেন, ‘মিথ্যা বলেছে মারওয়ান। আমাদের খান্দানের কারো প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়নি। বরং যার প্রসঙ্গে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, আমি ইচ্ছা করলে তার নাম বলতে পারি। অবশ্য মারওয়ান যখন পিতার ঔরসে, তখন রাসুলুল্লাহ সা. তার পিতার ওপর অভিশাপ দিয়েছেন।’ 

মজলিসে উপস্থিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনে আবুবকর রা.-এর মতো হুসাইন ইবনে আলী রা., আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. ইয়াজিদের খলিফার উত্তরাধিকার মেনে নিতে অস্বীকার করেন। 

এ সময়ে মুআবিয়া রা. বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিদের তলব করে বিষয়টি তাদের সামনে উত্থাপন করেন। জবাবে সকলেই তোষামোদমূলক বক্তব্য পেশ করে। কিন্তু আহনাফ ইবনে কায়েস রা. নীরব থাকেন। মুয়াবিয়া রা. জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আবু বাহর, তোমার কী মত?’ তিনি বলেনঃ ‘সত্য বললে আপনার ভয়, আর মিথ্যা বললে আল্লার ভয়। আমীরুল মুমিনীন, আপনি ইয়াজীদের দিন-রাত্রির চলাফেরা ওঠা-বসা, তার ভিতর-বাহির সবকিছু সম্পর্কে ভালভাবেই জানেন। আল্লাহ এবং এ উম্মতের জন্য সত্যিই তাকে পসন্দ করে থাকলে এ ব্যাপারে আর কারো পরামর্শ নেবেন না। আর যদি তাকে এর বিপরীত মনে করে থাকেন, তাহলে আখেরাতের পথে পাড়ি দেবার আগে দুনিয়া তার হাতে দিয়ে যাবেন না। আর বাকী রইলো আমাদের ব্যাপার; যা কিছু নির্দেশ দেওয়া হয়, তা শোনা এবং মেনে নেয়াইতো আমাদের কাজ।’ 

ইরাক, শাম এবং অন্যান্য এলাকা থেকে বায়আত গ্রহণ করে হযরত মুআবিয়া রা. মদিনায় যান। মুসলিম জাহানের যে সকল প্রভাবশালী ব্যক্তির পক্ষ থেকে বিরোধিতার আশংকা ছিল, তাঁরা সকলেই ছিলেন সেখানে। মদিনায় হযরত হুসাইন রা., হযরত ইবনে যুবায়ের রা., হযরত ইবনে ওমর রা. এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা. তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন। 
মুআবিয়া রা. তাদের সাথে এমন কঠোর আচরণ করেন যে, তাঁরা শহর ত্যাগ করে মক্কা চলে যান। এভাবে মদিনার ব্যাপারটি সহজ হয়ে যায়। এরপর তিনি মক্কা গমন করে তাদেরকে শহরের বাইরে ডেকে এনে তাঁদের সঙ্গে মিলিত হন। এবারের আচরণ ছিল আগের থেকে ভিন্ন। তাঁদেরকে সাথে নিয়ে শহরে প্রবেশ করেন। অতঃপর তাঁদেরকে একান্তে ডেকে ইয়াজীদের বাইআতে তাদেরকে রাজি করাবার চেষ্টা করেন। 

হযরত আবুদল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. জবাবে বলেন, ‘আপনি তিনটি কাজের যে কোনো একটি করুন। হয় নবী করীম সা.-এর মতো কাউকে স্থলাভিষিক্ত-ই করবেন না, জনগণ নিজেরাই কাউকে খলীফা বানাবে, যেমন বানিয়েছিল হযরত আবুবকর রা.-কে। অথবা আবুবকর রা. যে পন্থা অবলম্বন করেছিলেন সে পন্থা অবলম্বন করুন। তিনি স্থলাভিষিক্তের জন্য উমার রা.-এর মতো গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে মনোনীত করেছিলেন, যাঁর সাথে তাঁর দূরতম কোন আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল না। অথবা হযরত ওমর রা.-এর পন্থা অবলম্বন করুন। তিনি ৬ ব্যক্তির পরামর্শ সভার প্রস্তাব দেন। এ পরামর্শ সভায় তাঁর সন্তানদের কেউ ছিলেন না।’ 

হযরত মুআবিয়া রা. অবশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনারা কি বলেন?’ তাঁরা বলেন, ‘ইবনে যুবায়ের যা বলেছেন, আমাদের বক্তব্যও তাই।’ এরপর হযরত মুআবিয়া রা. বলেন, এতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে এসেছি। এবার আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, ‘আমার কথার জবাবে তোমাদের কেউ যদি একটি কথাও বলে, তাবে তার মুখ থেকে পরবর্তী শব্দটি প্রকাশ করার অবকাশ দেওয়া হবে না। সবার আগে তার মাথায় তরবারী পড়বে।’ 

অতঃপর মুয়াবিয়া রা. তার রক্ষীবাহিনীর প্রধান কর্মকর্তাকে ডেকে নির্দেশ দেন, ‘এদের প্রত্যেকের জন্য একজন লোক নিয়োগ করে তাকে বলে দাও যে, এদের কেউ আমার মতের বিপক্ষে মুখ খুললে তার মস্তক যেন নামিয়ে দেওয়া হয়।’ তারপর তিনি তাদেরকে নিয়ে কা'বার সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, ‘এরা মুসলমানদের স্থলাভিষিক্তে সন্তুষ্ট এবং এরা বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) করেছেন। সুতরাং তোমরাও বাইয়াত করো।’ এক্ষেত্রে লোকদের পক্ষে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ ছিল না। কাজেই মক্কাবাসীরাও সবাই ইয়াজিদের অনুকূলে বাইয়াত করে। 

মুআবিয়া রা. যথার্থই বিপুল গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর সাহাবী হওয়ার মর্যাদাও অতীব সম্মানিত। অবশ্য তিনি মক্কা বিজয়ের পর তার পিতা আবু সুফিয়ান ও মা হিন্দার সাথে মুসলিম হন। মক্কা বিজয়ের পরের সাহাবি হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার যোগ্যতার বলে দ্রুতই ইসলামী রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আসীন হন। তিনি মুসিলিম জাহানকে পুনরায় এক পতাকাতলে সমবেত করেন এবং বিশ্বে ইসলামের বিজয়ের গতি পূর্বের চাইতেও দ্রুত করতে সক্ষম হন। তাঁর এসব খেদমতও অনস্বীকার্য।