সমসাময়িক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমসাময়িক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২২ মে, ২০২৫

বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ইসলামপন্থীদের ঐক্যে আমাদের করণীয়

জুলাই বিপ্লবের পর নতুন বাংলাদেশে দাবি উঠেছে ইসলামপন্থীদের এক হওয়ার। দীর্ঘদিন ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে আমরা এক হতে পারিনি। এছাড়া স্বাধীনতার পর থেকে এদেশে হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন ইসলামপন্থীদের মধ্যে বিভাজন জিইয়ে রেখেছে। এখন সময় এসেছে তা নিরসন করার। 

সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষায় ঐক্য জরুরি বিষয়। পবিত্র কোরআনে বারবার মুমিনদের ঐক্যের ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে। বিভাজন বিশৃঙ্খলা উসকে দেয়; অশান্তি সৃষ্টি করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখো এবং বিভেদ কোরো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো।

তোমরা একে অপরের শত্রু ছিলে, আল্লাহ তোমাদের অন্তরগুলো জুড়ে দিলেন, ফলে তাঁর দয়ায় তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেলে। …’ (সুরা আল ইমরান: ১০৩)

দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে বিবাদে জড়ানো মুমিনদের কাজ নয়। মুসলমানেরা যখন বিভেদ জিইয়ে রাখে, তখন ধীরে ধীরে তাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায় এবং শত্রুদের সামনে টিকে থাকা তাদের জন্য মুশকিল হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করো এবং পরস্পর কলহ কোরো না। অন্যথায় তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব বিলুপ্ত হবে। …’ (সুরা আনফাল: ৪৬)

বিভেদ তৈরি হয়ে গেলে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ ত্যাগ করে কোরআন-সুন্নাহর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াই মুমিনের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে আল্লাহ ও রাসুলের ওপরই বিষয়টি ন্যস্ত করো, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাকো। এটাই উৎকৃষ্ট পন্থা এবং এর পরিণামও সর্বাপেক্ষা শুভ।’ (সুরা নিসা: ৫৯)

বিবদমান দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা করে দেওয়া অন্য মুসলমানদের দায়িত্ব। ইনসাফ ও তাকওয়ার ভিত্তিতে তাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এ কথারই নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘সব মুমিন ভাই ভাই। কাজেই তোমাদের ভাইদের মধ্যে শান্তি-সমঝোতা করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা হুজরাত: ১০)

কখনো যদি মুসলমানদের বিভেদ চরমে পৌঁছায় এবং তা যুদ্ধ ও হানাহানিতে রূপ নেয়, তখন সবার জন্য সমঝোতার পথ অবলম্বন করা আবশ্যক। তবে সমঝোতার পরও কেউ সীমা লঙ্ঘন করলে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিনদের দুটি দল যদি নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। এরপর তাদের এক দল যদি অন্য দলের ওপর বাড়াবাড়ি করে, তবে বাড়াবাড়ি করা দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো—যতক্ষণ না তারা আল্লাহর ফায়সালার পথে ফিরে না আসে। …’ (সুরা হুজরাত: ৯)

ইসলামপন্থীদের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ার প্রক্রিয়ায় আলেম-ওলামাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা সমাজের নৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্ব প্রদানকারী। তাঁদেরই এগিয়ে আসতে হবে এই সংকট মোকাবিলায়। আলেম সমাজ ও আমাদের করণীয়। 

১. ঐক্যের গুরুত্ব অনুধাবন ও প্রচার: 
সর্বপ্রথম আলেম-ওলামাদের নিজেদের মধ্যে ইসলামপন্থীদের ঐক্যের অপরিহার্যতা গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঐক্যের গুরুত্ব ও ফযিলত সাধারণ মানুষ ও ইসলামপন্থী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের কাছে তুলে ধরতে হবে। মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর ইসলামি স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাতে হবে।

২. জনমত গঠন: 
ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি কল্যাণমূলক সমাজ বিনির্মাণের পক্ষে এবং অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করতে আলেম-ওলামারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। একটি শক্তিশালী জনমত ঐক্যবদ্ধ ইসলামপন্থী শক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

৩. সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন:
বিভক্ত দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য নিরপেক্ষ আলেমগণকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে হবে।

৪. সংলাপ ও সমঝোতার উদ্যোগ:
বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আন্তরিক সংলাপ ও আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টিতে আলেম-ওলামারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। তাঁরা নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দলগুলোর মধ্যকার মতপার্থক্য কমিয়ে এনে একটি সাধারণ কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারেন।

৫. সচেতনতা সৃষ্টি:
সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসলামী রাজনীতির গুরুত্ব এবং ইসলামপন্থীদের ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে খুতবা, মাহফিল ও মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

৬. নৈতিক চাপ প্রয়োগ:
যেসব রাজনৈতিক নেতারা ব্যক্তিগত স্বার্থে বিভাজন তৈরি করছেন, তাঁদের ওপর নৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে, যাতে তাঁরা উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে একত্র হতে বাধ্য হন।

৭. দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে অবস্থান: 
আলেম-ওলামাদের কোনো বিশেষ দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য না দেখিয়ে বৃহত্তর ইসলামি উম্মাহর কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করলে তা সকলের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে।

৮. যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত কর্মসূচি প্রণয়নে সহায়তা:
ইসলামপন্থী দলগুলো যেন নিছক আবেগসর্বস্ব বা অবাস্তব কোনো কর্মসূচি গ্রহণ না করে, সেদিকে আলেম-ওলামাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে যুগোপযোগী ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচি প্রণয়নে তাঁরা বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা প্রদান করতে পারেন।

৯. তরুণ আলেমদের সম্পৃক্ত করা: 
তরুণ, আধুনিক-মনস্ক আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদদের ঐক্য প্রচেষ্টায় যুক্ত করা দরকার, যাতে নতুন প্রজন্মের আস্থা অর্জন করা যায়।

১০. ইসলামী মূল্যবোধে অটল থাকা:
ক্ষমতা বা প্রভাবের লোভে কোনো আপস না করে ইসলামি আদর্শ ও নীতির প্রতি নিষ্ঠাবান থেকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

১১. নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতা:
যদি ইসলামপন্থীদের কোনো সমন্বিত জোট গঠিত হয়, তবে তার নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা, দূরদর্শিতা এবং ইসলামি জ্ঞানের গভীরতাকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়ে আলেম-ওলামাদের সোচ্চার হতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ বা গোষ্ঠীতন্ত্রের চেয়ে বৃহত্তর স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।

১২. শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থার অনুসরণ: 
রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সর্বদা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বনের জন্য ইসলামপন্থী দলগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা উগ্রপন্থা পরিহার করে আলাপ-আলোচনা ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে থাকার পরামর্শ দিতে হবে।

১৭ মে, ২০২৫

'ডাকাতের গ্রাম' থেকে সভ্যতার পথে ঢাবি'র অগ্রগতি কতদূর?


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেশের ইতিহাস ও socio-political প্রেক্ষাপটে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাঙ্গন কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রই নয়, বরং এটি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসনের কবলে পড়েছে। পাশাপাশি বাম আদর্শের শিক্ষকদের দৌরাত্মে ঢাবি অনৈতিকতার তীর্থস্থানেও পরিণত হয়েছে। ইংরেজ আমলে এখানে মুশরিকদের আগ্রাসন বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগের ছাত্রনেতা শহীদ নজির আহমদকে নির্মমভাবে খুন করে হিন্দু ছাত্ররা। নাজির আহমদকে স্মরণ করে কবি জসিম উদ্দিন লিখেন  

নজীরের বাপ ফিরিয়া যাইবে আবার আপন ঘরে
নজীরের সেই শূন্য বিছানা বাক্স সঙ্গে ক'রে।
অর্দ্ধেক পড়া বইগুলি তার লেখা ও অলেখা খাতা,
পাতায় পাতায় স্মৃতি তার কত আখরের মত পাতা।

পাকিস্তান আমলে মুশরিকদের দৌরাত্ম কিছুটা কমলেও শুরু হয় বাম-নাস্তিকদের দৌরাত্ম। একইসাথে শুরু হয় শেখ মুজিবের নেতৃত্ব গড়ে ওঠা ছাত্রলীগের সন্ত্রাস। তারা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্যায়ের আখড়া বানিয়ে দেয়। বিশেষত মাদকের সয়লাব ঘটায়। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট বামপন্থী সন্ত্রাসীরা ছাত্রসঙ্ঘের ছাত্রনেতা শহীদ আব্দুল মালেককে হত্যা করে। 

এরপর দেশ তথাকথিত স্বাধীন হলো। স্বাধীনতার পর ঢাবিতে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয় ছাত্রলীগ ও তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হুয়া জাসদ ছাত্রলীগ। ১৯৭২ থেকে এখন পর্যন্ত ৭৬ জন মানুষ খুন হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিচার হয়নি কোনো ঘটনারই। এর মধ্যে সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনা হলো ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ভোরে মহসিন হলে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে ছাত্রলীগ সেক্রেটারি শফিউল আলম প্রধান একে একে সাত ছাত্রলীগ কর্মীকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এতে শফিউল আলম প্রধানের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলে সে মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পায়। 

স্বাধীনতার পর আর ঢাবি স্থিতিশীল ছিল না। রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ ছিল নিয়মিত ঘটনা। এছাড়া খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজি, শিক্ষকদের হেনস্তা, এমনকি দেহব্যবসার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আশির দশকে ঢাবি জাহান্নামে পরিণত হয়। কবি আল মাহমুদ তাই তাঁর কবিতায় বলেন,

এই মহানগরীর ভদ্রবেশী বেশ্যা, লম্পট, হিরোইনসেবী ও ছিনতাইকারীর
প্রাত্যহিক পাপের দেনায় 'আমরা এমনিতেই অতিষ্ঠ, 
এর সাথে যোগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মহান পণ্ডিতেরা। 
শিক্ষার প্রতিটি প্রাঙ্গণ কিশোর হত্যার মহাপাপে এখন রক্তাক্ত, পঙ্কিল।
প্রকৃত পাপীদের বিনাশ ত্বরান্বিত করতে তুমি কি বাংলাদেশের
প্রতিটি বিদ্যাপীঠকেই বিরাণ করে ফেলবে? 

একমাত্র শহুরে পড়ুয়া মেয়েটির গলার চেন ও হাতের বালা 
জগন্নাথ হলের পাশের রাস্তা থেকে ছিনতাই হলো। বুকের ওপর ছুরি রেখে
খুলে দে হারামজাদী, চুপ্।

আমরা তো চুপ করেই আছি, তবু হে পরোয়ারদিগার
জানতে সাধ জাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?

প্রভু
ডাকাত, ছিনতাইকারী, পন্ডিত ও বেশ্যাদের হাত থেকে
তুমি কি ইলমকে রক্ষা করবে না? -রাব্বি যিদনী ইলমা- 
প্রভু, আমাদের জ্ঞানদান করো।
  
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের একক দৌরাত্মে গত এক যুগ ঢাবি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এখানে যোগ্য নাগরিক তৈরির বদলে পাকা সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। দৈনিক প্রথম আলো, যুগান্তর ও সাপ্তাহিক সোনার বাংলার রিপোর্ট ও কেস স্টাডিতে দেখা যায় গত ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ একাই খুন করেছে অন্তত ২৫৩ জনকে। এর মধ্যে একটা বড় অংশ নিজ দলের নেতাকর্মী। 

প্রতি বছরেই তারা খুন করেছে প্রায় ১৮ জনকে। প্রকাশ্যে বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ড, ঢাবির মেধাবী ছাত্র আবু বকর হত্যাকান্ডে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। তাছাড়া ২০১০ সালে বরিশাল পলিটেকনিকে দু’পক্ষের সংঘর্ষের সময় নজরুল ইসলামকে ধরে রেখে চুরি দিয়ে মুহুর্মুহু কোপানির দৃশ্য মানুষের মনে বীভৎসতার নতুন চিত্র তুলে ধরে। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিশু ও সাংবাদিকও। ছাত্রলীগ নেতা তপুর নির্দেশে এসপি ফজলুল করিমকে হত্যা করা হয়। সারাদেশে ছাত্রলীগের এই হত্যা ও খুনের রাজনীতি আবর্তিত হয় ঢাবি ছাত্রলীগের মাধ্যমে। 

বিষফোঁড়া সোহরাওয়ার্দি 
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ জনতার নিরাপদ বিনোদনকেন্দ্র হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি অপরাধীদের আনাগোনা ও মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। পার্কের নির্জন কোণে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্য বিক্রি ও সেবন হয়ে আসছে। রাতে উদ্যানের বিভিন্ন বিনোদনাঞ্চল যেমন মুক্তমঞ্চ, কালী মন্দির এলাকা, চারুকলার গেট সংলগ্ন স্থান ইত্যাদিতে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হয়। তবে শুধু মাদকই নয়, সন্ধ্যার পর উদ্যানটিতে ছিনতাই, ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজিসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। মাদকচক্রের কিছু সদস্য তরুণ-তরুণী ও হিজড়া নিয়ে গোষ্ঠী গঠন করে সাধারন দর্শনার্থীদের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। 

সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে খুন ও সহিংস ঘটনা। ১৩ মে ২০২৫ তারিখ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই উদ্যানের পাটিতে ৩০ বছর বয়সী বিল্লাল হোসেনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ১ জুন উদ্যানের ভিতরে মারধরের পর হাসপাতালে নেওয়ার পর আবুল হাসানের মৃত্যু হয়েছে; এ ঘটনায় তখন মাস্টার দা সূর্যসেন হলে ছাত্রলীগের এক নেতা জড়িত ছিলেন বলে খোঁজ পাওয়া যায়। মানবজমিনের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের লাশ উদ্যান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

মাদকের ‘আস্তানা’ 
সোহরাওয়ার্দি উদ্যান মাদকের আস্তানা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। মাঠের নির্জন কোণগুলোতে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা এমনকি ইনজেকশন-ভিত্তিক নেশাজাত দ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। যুগান্তর পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, উদ্যানের মাদক সিন্ডিকেটে অন্তত ১০ জনের নেতৃত্বে ৬০–৭০ জন সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের একটি চক্রের সদস্য জানান, এর আগে উদ্যানের মাদক ব্যবসা ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করত; ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন চাঁদাবাজরা নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছে। মুক্তমঞ্চ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন রাতে গাঞ্জা সেশন বসে; নগদ বাজারমূল্য অনুযায়ী ‘এক পুরিয়া’ গাঁজার দাম প্রায় ১০০ টাকা। এখানকার রিকশাচালকরা বলছেন, প্রতিদিন বিভিন্ন পেশার লোকজন (শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক) মাদক কেনার উদ্দেশ্যে উদ্যানে আসে। 

এখানে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের অবাধ বেচাকেনা চলে । উদ্যানের মুক্তমঞ্চ (শিল্পকলা একাডেমির নির্মিত উন্মুক্ত নাট্যমঞ্চ) বিশেষভাবে গাঁজার আসর হিসেবে পরিচিত, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদক সেবন করতে আসে । শুধু মুক্তমঞ্চ নয়, পুরো উদ্যান জুড়েই মাদক সেবনের দৃশ্য দেখা যায় ।   

মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে নারী মাদক বিক্রেতারাও উল্লেখযোগ্য, যাদের মধ্যে পারুল নামের একজন বিশেষভাবে পরিচিত। সে বিভিন্ন ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে ৫০ থেকে ১০০ টাকায় গাঁজা বিক্রি করে এবং প্রায়শই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যায় । মাদক ব্যবসার কারণে উদ্যানে বিভিন্ন সময়ে অঘটন ঘটেছে, এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটেছে । মাদক নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীদের সংঘর্ষের ঘটনা প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনা।

অসামাজিক কার্যকলাপ
মাদক ব্যবসার পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিনতাই, মারামারি এবং অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপও দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে । সন্ধ্যার পর থেকেই অপরাধীরা এখানে ভিড় করে এবং রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে তাদের আড্ডা আরও জমে ওঠে । উদ্যানের অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানগুলি অপরাধীদের জন্য নিরাপদ মনে করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যৌন অপরাধ ও অসামাজিক কার্যকলাপের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। মন্দিরের পাশ, গ্লাস টাওয়ার ও চারুকলার গেট এলাকায় সন্ধ্যার পর তরুণ-তরুণী ও হিজড়াচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে। এসব স্থানে চলে অসামাজিক কার্যকলাপ। উদ্যানের ভেতরে কয়েকটি স্পটে দেহ ব্যবসাও চলে। মূলত উদ্যানের ভেতর কয়েকটি স্পট রয়েছে- মুক্তমঞ্চ, ফুড কিওস্ক ক্যান্টিন, স্মৃতিস্তম্ভ, ছবিরহাট, রমনার পুকুর পাড়, শিখা চিরন্তনের পেছনে, হাইকোর্টের গেট, মাঠ। এই প্রতিটি স্পটেই দিনে রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। 

প্রশাসনের ব্যর্থতা ও অপরাধীদের সাথে আঁতাত
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অপরাধের ব্যাপক বিস্তারের পেছনে প্রশাসনের ব্যর্থতা ও অপরাধীদের সাথে আঁতাত একটি বড় কারণ। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও পুলিশ না দেখার ভান করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, উদ্যানের অপরাধচক্রে জড়িত রয়েছে কতিপয় শিক্ষার্থীও। ২০২৫ সালের আগস্টের পর নতুন চাঁদাবাজরা উদ্যান নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তাদের চাঁদা দিয়েই ব্যবসা চলছে। স্থানীয়দের মতে, আনসার সদস্যরাই এইসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তাদেরকে বখরা দিয়ে রমনার গেট দিয়ে ঠিকই সকলে মাঠের মধ্যে ঢোকে। 

ঢাবি ডাকাতের গ্রাম হওয়ার সাথে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের কানেকশন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সোহরাওয়ার্দি কেন্দ্রীক অপরাধীরা মূলত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে ঢাবি'র ছাত্রনেতাদের শেল্টারে। এতোদিন ছাত্রলীগ এই ব্যাপারগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো। ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর নতুন ছাত্রনেতারা এই বিষয়গুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে। তবে এটা এখনো সেটেলড নয়। তাই নিয়মিতই নারী, মাদক, ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে চাঁদা কালেকশন নিয়ে মারামারি হচ্ছে। সম্প্রতি গভীর রাতে ছাত্রদল নেতা সাম্য মাদকসেবীদের দ্বারা নিহত হলে নড়ে বসে প্রশাসন। 

যদিও ঢাবি প্রশাসন আগেই উদ্যানের অপরাধমূলক বিষয়গুলো থেকে ঢাবিকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বামপন্থী ছাত্র শিক্ষক ও ছাত্রদলের একাংশ এই প্রক্রিয়ায় বিশেষভাবে বহিরাগতদের গভীর রাতে আড্ডা বন্ধ করার ব্যাপারে ঢাবি প্রশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ডাকাতের গ্রাম থেকে সভ্য হয়ে ওঠার জন্য ঢাবি প্রশাসনকে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে। তবে জুলাই বিপ্লবের পর কিছু অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, আদু ভাইদের বিশ্ববিদ্যালয় হল ত্যাগ, রাজনৈতিক সিট বন্ধ, গেস্ট রুম কালচার বন্ধ, গণরুম বন্ধ ইত্যাদি উদ্যোগ ভালো ভূমিকা রাখছে। 

সাম্য হত্যাকাণ্ডের পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর উদ্যানকে 'আতঙ্কের স্থান' থেকে ধীরে ধীরে নিরাপদ ও 'স্বস্তিদায়ক স্থানে' রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ।

সরকার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে :
১. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ
২. মাদক কারবারি বন্ধ এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে যৌথ অভিযান চালানো
৩. উদ্যানে পর্যাপ্ত আলো ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সেগুলোর নিয়মিত মনিটরিং করা
৪. উদ্যানে একটি ডেডিকেটেড পুলিশ বক্স স্থাপন করা
৫. রাত ৮টার পর উদ্যানে জনসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা
৬. নিয়মিত মনিটরিং ও অভিযানের জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি কমিটি গঠন
৭. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রমনা পার্কের মতো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা চালু করা

যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু এর স্থায়ী সমাধানের জন্য আরও কঠোর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আমরা আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে ঢাবি হলগুলো যেভাবে সন্ত্রাসমুক্ত হয়েছে, পুরো ঢাবি এলাকা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ঢাবি কবি আল মাহমুদের 'ডাকাতের গ্রাম' তকমা থেকে মুক্তি পাবে। 

২২ মে, ২০২৪

গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড এমপি আনোয়ারুল আজিমের খণ্ড বিখন্ড লাশ উদ্ধার



২০১৬ সালে ঘটনার সূত্রপাত। ঝিনাইদহে হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক সমির উদ্দিন মণ্ডল ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারে কাজ করছিলেন। কে বা কারা ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি তার চেম্বারে রোগী সেজে তাকে হত্যা করে। ঘটনাটি ঘটে ঝিনাইদহ সদরের কালুহাটি গ্রামের বেলেখাল বাজারে।

ওইদিন রাতেই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) 'ধর্মান্তরিত হওয়ায়' সমিরকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে খবর দেয় জঙ্গি হুমকি পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট 'সাইট ইনটিলেজেন্স গ্রুপ'। সমির উদ্দিন ২০০১ সালে স্থানীয় 'ওয়ানওয়ে চার্চ বাংলাদেশ' এর মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন বলে দাবি করেন চার্চের ঝিনাইদহ এলাকার কো-অর্ডিনেটর হারুন অর রশিদ। হারুন আরো বলেন, "সমির খ্রিস্টধর্ম প্রচারে নিয়োজিত ছিলেন। জঙ্গিরা এ কারণেই তাকে হত্যা করেছে।"

বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে জোর গলায় আইএসের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। তারা তাদের এই কথাকে সত্য প্রমাণ করতে ভয়ংকর ষড়যন্ত্র শুরু করে। মুসলিম থেকে খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া সমিরের খুনের দায় তারা জামায়াত-শিবিরের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। খুনীদের ধরার ব্যাপারে তাদের প্রচেষ্টা দেখা যায় না বরং তারা কীভাবে এর দায় জামায়াত-শিবিরের ওপরে চাপিয়ে দেবে সেই প্রচেষ্টা বেশ লক্ষ্যণীয়।

বাংলাদেশ পুলিশ তাদের এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার জন্য একে একে খুন করে ১৪ জন মানুষকে। ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে কয়েকজনকে সমির হত্যার স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করে। যে কয়েকজন স্বীকারোক্তি দিয়েছে তারা বেঁচে আছেন। যারা শত নির্যাতনেও স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হয়নি তাদের খুন করে ফেলা হয়েছে। এই গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড হলো স্থানীয় এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তৎকালীন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক।

মাঠ পর্যায়ে এই গণহত্যা কার্যক্রম পরিচালনা করে ঝিনাইদহের তৎকালীন এএসপি আজবাহার আলী শেখ, সদর থানার ওসি হাসান হাফিজুর রহমান, হরিণাকুণ্ড থানার ওসি মাহাতাব উদ্দীন, মহেশপুর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম, কালিগঞ্জ থানার ওসি আনোয়ার হোসেন ও ঝিনাইদহ ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এম এ হাসেম খান।

গণহত্যার প্রথম শিকার জামায়াত কর্মী ও মাদ্রাসা শিক্ষক আবু হুরাইরা মালিথা। তাঁর বয়স ছিল ৫৫ বছর। ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার শৈলমারী বাজার সংলগ্ন কুঠিদুর্গাপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে আবু হুরাইরা মালিথাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকের লোকজন তুলে নিয়ে যায়।

ঝিনাইদহ পুলিশের ২য় শিকার হলেন ঝিনাইদহ আলীয়া মাদ্রাসার ফাজিলের ছাত্র ও শিবির নেতা হাফেজ জসিম উদ্দীন। ঝিনাইদহে আনোয়ারুল আজিম গং-দের ৩য় ও ৪র্থ শিকার হলেন আবু যর গিফারী ও শামীম হোসেন। ৫ম শিকার ছিল উচ্চ মাধ্যমিকের কিশোর ছাত্র ও শিবির কর্মী মহিউদ্দিন সোহান।

সোহানের মা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপি আনোয়ারুল আজিমের কাছে যান ছেলেকে বাঁচাতে। আনোয়ারুল আজিম তাকে তাড়িয়ে দেন। এরপর প্রায় ৩০০ গ্রামবাসী মিলে এমপির কাছে গিয়ে অনুরোধ করে পুলিশের কাছ থেকে সোহানকে ছাড়িয়ে আনতে। তারা এও বলে, আগামী দিন থেকে সোহান ও সোহানদের পরিবারসহ সবাই আওয়ামী লীগ করবে।

আনোয়ারুল আজিম তাদের বলে, তোদের আওয়ামীলীগ করা লাগবে না। আওয়ামী লীগ করার জন্য লোকের অভাব হবে না। এরপর ২০ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে কালীগঞ্জ থেকে প্রায় ৫০ কি.মি. দূরে চুয়াডাঙ্গায় সোহানের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। সকালে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ভুলাটিয়ার মাঠে ডান হাত ভাঙ্গা, বাম চোখ উপড়ানো মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় শহীদ মহিউদ্দীন সোহানের।

এভাবে আনোয়ারুল আজিম গং খুন করতে থাকে ছাত্রশিবির নেতা শহিদ আল মাহমুদ, আনিসুর রহমান ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা ইবনুল ইসলাম পারভেজকে।

এরপর একে একে খুন হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রশিবির নেতা সাইফুল ইসলাম মামুন, রমজান আলী, শরিফুল ইসলাম, হোসেন আলী আলিম মাদরাসার শিক্ষক ও মহিষগাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইদ্রিস আলী ওরফে পান্না হুজুর।

আনোয়ারুল আজিম ও আসাদুজ্জামান খান কামাল দ্বারা সংঘটিত পরিকল্পিত গণহত্যার ১৩ তম শিকার ছিলেন ঝিনাইদহ পৌরসভা জামায়াতের আমীর জহুরুল ইসলাম। ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ শহরের দিশারি প্রি-ক্যাডেট স্কুলের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। এই ঘটনার ৬ দিন পর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ শহরে বাড়ির পাশ থেকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় ডা. তারিক হাসান সজিবকে। ডা. সজিব ঝিনাইদহ গণহত্যার ১৪ তম শিকার।

দীর্ঘদিন পাওয়া যায়নি জহুরুল ইসলাম ও ডা. তারিক হাসান সজিবকে। এরপর ২৬ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে তারা নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ প্রচার করে। জনপ্রিয় জামায়াত নেতা জহুরুল ইসলামকে ৪৮ দিন গুম করে রেখে নির্মম নির্যাতনের পর ঠাণ্ডা মাথায় গুলী করে হত্যা করে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়েছে পুলিশ। একইসাথে মেধাবী ছাত্রনেতা ডা. তারিক হাসান সজিবকে ৪২ দিন গুম রেখে নির্যাতন করে খুন করে পুলিশ।

আজকে ২২ মে ২০২৪। আজ সকালে কলকাতার নিউটাউন এলাকার সঞ্জিভা গার্ডেন থেকে ঝিনাইদহ গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড আনোয়ারুল আজিমের খন্ডবিখন্ড মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আওয়ামী লীগের এমপি আনোয়ারুল আজিম চোরাচালান, মাদক কারবার ও হুণ্ডি সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা ছিল। ধারণা করা যাচ্ছে চোরাচালান সংশ্লিষ্টতার জন্যই মাফিয়া গ্যাং-দের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে আনয়ারুল আজিম। ফলশ্রুতিতে তাকে খুন হতে হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, আনোয়ারুল আজিম ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হয়েছে। ২০১৬ সালে গণহত্যা সংঘটিত করার পর চোরাচালান ও মাফিয়া গ্রুপদের সাথে সংশ্লিষ্টতা বেড়ে যায়। ২০২৩ সালে তার দেওয়া হলফ নামায় দেখা যায় ৫ বছরে তার সম্পত্তি বেড়েছে ২২২ গুণ। আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয় আনোয়ারুল আজিম।

২১ জুন, ২০২৩

অলি আহমদ থেকে রেজা কিবরিয়া : কে এই মাসুদ করিম


সম্প্রতি আমেরিকার ভিসা নীতি ঘোষণা হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতি দ্রুতই বাঁক নিচ্ছে। ভিসা নীতিকে কাজে লাগিয়ে জামায়াত একটি সফল সমাবেশ করে জানান দিলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। গত ডিসেম্বর থেকে বিএনপি একরকম প্রকাশ্যই জামায়াতকে বর্জন করে চলেছে। ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশে জামায়াত যোগ দিতে চাইলেও বিএনপি নিষেধ করে। শুধু প্রকাশ্য সমাবেশ নয়, ঘরোয়া মিটিংগুলোতেও জামায়াতের সাথে সব রকম সম্পর্ক অস্বীকার করে বিএনপি। 

জামায়াত এই বছরের শুরুর অন্তত দুই মাস বিএনপির সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালায়। কিন্তু বিএনপি পাত্তা দেয় না জামায়াতকে। জামায়াতকে ব্রাত্য করে রাখার একটি অপপ্রয়াস চালায় বিএনপি। এর নেপথ্যে কে বা কারা কাজ করছে তা বলা মুশকিল। তবে আমার জানা মতে ও বিভিন্ন সোর্স থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে বিএনপির মধ্যে থাকা বামপন্থীরা মূলত এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জামায়াতকে জোট থেকে বাদ দিয়ে তদস্থলে জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদকে কাছে টানার চেষ্টা করে। মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই প্রচেষ্টার একজন গুরুত্বপূর্ণ হোতা বলে মনে করা হচ্ছে।  

জামায়াতের ১০ জুনের সমাবেশ জামায়াতকে আবার রাজনীতির মূল ধারায় ফিরিয়ে আনে। জামায়াত আবারো প্রাসঙ্গিকতা পায়। আওয়ামীলীগ ও বিএনপি উভয়েই এই ফ্যাক্টর কাজে লাগাতে চাইছে। জামায়াত নিয়ে তাই মিডিয়া পাড়াতে হইচই পড়ে যায়। এই হইচই-এর মাঝে নতুন করে আলচনার জন্ম দেয় গণঅধিকার পরিষদ। সেখানে রেজা কিবরিয়া ও নূরুল হক নূরু পরস্পরকে বহিষ্কার করে।  

এর নেপথ্যে কী? 
এর নেপথ্যে বিএনপি। বিএনপি'র চাপে গণঅধিকার পরিষদ থেকে রেজা কিবরিয়াকে বের করে দেওয়া হয়। প্রথমত রেজা কিবরিয়া আওয়ামী লীগ থেকে আসা। দ্বিতীয়ত তিনি ডিজিএফআই-এর সোর্স মাসুদ করিমের সাথে সম্পৃক্ত। এই পর্যন্ত বিএনপি তাদের মধ্যেকার যারাই মাসুদ করিমের সাথে সম্পর্ক রেখেছে তাদের বহিষ্কার করেছে। সমমনা অর্থাৎ আওয়ামী বিরোধীদের মধ্যে যারা মাসুদ করিমের সাথে যুক্ত থেকেছে তাদের ব্যাপারে সতর্ক থেকেছে। 

এর শুরুটা হয়েছে অলি আহমদ থেকে। ২০১৮ সালের বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের পর থেকে সরকার পতনের লক্ষ্যে বিদেশের মাটিতে দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠানের খবর প্রকাশ পাচ্ছে। বিনা ভোটে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় তৎপর বিভিন্ন দলের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতা এসব বৈঠকে অংশগ্রহণ করছেন। পত্র-পত্রিকায় অংশগ্রহণকারীদের নাম প্রকাশ পেলেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।  

বিদেশে এসব বৈঠক আয়োজনের নেপথ্য কারিগর হলেন মাসুদ করিম নামের লন্ডন প্রবাসী এক বাংলাদেশী। তার সাথে পশ্চিমা একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সখ্য রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়। তার আরেক নাম এনায়েত করিম। তিনি একসময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পরে বিএনপি সরকারের আমলেই জেল খাটেন। একসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ছিলেন। মাসুদ করিমের সাথে নেপাল-থাইল্যান্ডে এলডিপির চেয়ারম্যান অলি আহমদের একাধিক বৈঠক হওয়ার খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। 

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৯ সালে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ গঠন করে হঠাৎ তৎপর হয়েছিলেন অলি আহমেদ। এর নেপথ্যেও ছিল মাসুদ করিম। তিনি অলি আহমদসহ বিএনপির একাধিক নেতাকে রাষ্ট্রক্ষমতায় পটপরিবর্তনের স্বপ্ন দেখান। মাসুদ করিম তাঁদের কাছে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী সংস্থার লোক বলে পরিচয় দেন।

মাসুদ করিমের নেপথ্য তৎপরতায় অলি আহমদ জাতীয় মুক্তি মঞ্চ গঠন করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। তখন মাসুদ করিমের সঙ্গে ব্যাংকক ও নেপালে একাধিক বৈঠকও করেন তিনি। ওই সব বৈঠকে বিএনপি ও হেফাজতে ইসলামের একাধিক নেতা অংশ নেন।

তার এই আন্দোলনের সময় জামায়াতকে তিনি তার সাথে নেন। জামায়াত যখন বুঝতে পারে এর ফান্ডিং বাইরে থেকে আসছে তখন জামায়াত সতর্ক হয় ও সরে আসে। 

একপর্যায়ে অলি আহমদ নিজ দল এলডিপির কেন্দ্রীয় এক নেতার সঙ্গে মাসুদ করিমের পরিচয় করিয়ে দেন। ওই নেতা তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী। অলি আহমদ তাঁকে বলেন, মাসুদ করিম প্রভাবশালী ব্যক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি শাখার সঙ্গে তাঁর সখ্য আছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য কিছু নির্দিষ্ট পোশাকের অর্ডার পেতে মাসুদ করিম তাঁকে সহায়তা করতে চান। কিন্তু এর জন্য আগে কারখানাকে তালিকাভুক্ত হতে হয়। জামানত হিসেবে জমা দিতে হয় এক লাখ মার্কিন ডলার। ওই ব্যবসায়ী এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান। একপর্যায়ে মাসুদ করিম নিজে ৫০ হাজার ডলার দেবেন এবং বাকি ৫০ হাজার ডলার ওই ব্যবসায়ী থেকে নিয়ে তালিকাভুক্ত করানোর প্রস্তাব দেন।

তিনি ২০১৯ সালের জুলাই মাসে অলি আহমদকে ৫০ হাজার ডলার সমপরিমাণ ৪৩ লাখ ১০ হাজার টাকা দেন। অলি আহমদ সেই টাকা মাসুদ করিমকে পাঠান। কিন্তু পোশাকের কোনো অর্ডার তিনি পাননি। পরে তিনি টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য অলি আহমদকে চাপ দেন। একপর্যায়ে তিন চেকে টাকা ফেরত দেন অলি আহমদ। এ নিয়ে তিক্ততায় ওই ব্যবসায়ী এলডিপি ছেড়ে দেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ওই ঘটনার পর অলি আহমদ চুপসে গেছেন।

গত সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি যখন রাজনীতিতে পর্যুদস্ত, তখন ২০১৯ সালের জুনে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ গঠন করে অলি আহমদ মধ্যবর্তী নির্বাচন ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি তোলেন। দুটি দাবিই বিএনপির নেতা-কর্মীদের কাছে জনপ্রিয়। কিন্তু বক্তৃতা-বিবৃতিতে অলি আহমদ বিএনপির নেতৃত্বের সমালোচনা শুরু করলে নেতারা সতর্ক হন। একপর্যায়ে দলের নেতা-কর্মীদের মুক্তির মঞ্চের কর্মসূচি এড়িয়ে চলতে বলা হয়। 

মাসুদ করিম যখন দেখলো বিএনপি ও অলি আহমেদের সাথে সম্পর্কের তিক্ততা তৈরি হয়েছে তখন অলি আহমেদকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় মাসুদ করিম। এটাই ছিল মাসুদের এসাইনমেন্ট।  

২০১৯ ও ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আচমকা দুটি বড় জমায়েত করা হয়। দুটি কর্মসূচিতে হঠাৎ রাস্তা অবরোধ করে কয়েক হাজার লোক বিক্ষোভ শুরু করে। ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টের সামনের বিক্ষোভে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানানো হয়। গত ১৩ ডিসেম্বরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভের সুর ছিল সরকারের পতন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দুটি বিক্ষোভের সংগঠকেরা কর্মীদের ধারণা দিয়েছিলেন, এই বিক্ষোভে বিভিন্ন দিক থেকে লাখো মানুষ যুক্ত হবে। সেখান থেকেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূচনা হবে।

এই দুই কর্মসূচির পেছনে বিএনপির একাধিক নেতার যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এতে আর্থিক সহায়তা দেন বিএনপির সাবেক ধনাঢ্য এক নেতা। যিনি ২০১৯ সালের শেষ দিকে বিএনপি থেকে ইস্তফা দেন। এই দুই কর্মসূচির সঙ্গেও মাসুদ করিম এবং দেশের বাইরের একটি মহলের যুক্ততা ছিল বলে জানা যায়। এর রেশ ধরেই দলের ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও শওকত মাহমুদকে নোটিশ দেওয়া হয়। এর সুত্র ধরে শওকত মাহমুদ এখন বহিষ্কৃত।  

শওকত মাহমুদ বলেন, তিনি মাসুদ করিমকে চেনেন। মাসুদ করিম একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তাঁর ভালো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আছে। ঢাকায় বড় ধরনের বিক্ষোভ আয়োজনের লক্ষ্যে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি বৈঠকে অংশ নেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমী। তিনি গত জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে ২০–দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন।

প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাৎকারে মনির হোসেন কাসেমী বলেন, ‘আমি হুজুরের (প্রয়াত নূর হোসাইন কাসেমী) নির্দেশনায় ব্যাংককে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর এটাকে আমার কাছে কার্যকরী কিছু মনে হয়নি।’ 

রাজপথে যখন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের পুলিশ একবারেই দাঁড়াতে দিচ্ছিল না ঠিক তখন কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে হাইকোর্টের সামনে কয়েক শ’ লোক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এতে আদালতসংলগ্ন এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। নজিরবিহীনভাবে দায়িত্বরত পুলিশ নীরব ছিল। 

একইভাবে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন মোড়-মুক্তাঙ্গন এলাকায় সহস্রাধিক লোকের আকস্মিক অবস্থান গ্রহণ এবং সমাবেশ থেকে সরকার পতনের ডাক দেয়া হয়। চলতি বছরের ২৭ মার্চ পেশাজীবী সমাজের ব্যানারে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে কয়েক হাজার লোক দিনব্যাপী অবস্থান গ্রহণ করলে আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। 
হাইকমান্ডের অনুমতির তোয়াক্কা না করেই বিএনপির কিছু নেতা এই কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন। অপর দিকে, হাই কমান্ড নিজস্ব দলীয় চ্যানেলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের এসব কর্মসূচি বর্জনের নির্দেশ দেয়। উল্লিখিত সব কর্মসূচিই ছিল মারমুখী। কিন্তু রহস্যের ব্যাপার হলো, পুলিশ একটি কর্মসূচিতেও বাধা দেয়নি, কাউকে গ্রেফতার কিংবা কারো বিরুদ্ধে মামলাও করেনি।

উল্লিখিত কঠোর কর্মসূচিগুলো সফলভাবে পালনের ফলে এক শ্রেণীর বিএনপি নেতা-কর্মীর মধ্যে সরকার পতন আন্দোলনের ব্যাপারে মূল নেতৃত্বের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার ব্যাপারে সংশয় ও দোদুল্যমানতা দেখা দেয়। তবে দলের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি পালনকারী বিএনপি নেতাদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে হাইকমান্ড। 

বিএনপি নেতৃত্বের দৃঢ়বিশ্বাস সরকার ও সরকারের সমর্থক গোষ্ঠী তাদের দূর থেকে মদদ দিচ্ছে। এই মহলটি দীর্ঘদিন যাবৎ জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে সংশয়, অবিশ্বাস ও বিভাজন সৃষ্টিতে তৎপর। এদের মূল লক্ষ্য সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন। তাই তারা কৌশলে সরকারের পক্ষ হয়ে সরকার হঠানোর নামে মূলত বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

মাসুদ করিমের উদ্দেশ্য হলো, বিরোধী দলগুলো বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত করে মূলত সরকারের হাতকেই শক্তিশালী করা। এজন্য অলি আহমদ, বিএনপির কয়েক ডজন নেতা, হেফাজতে ইসলাম ও সর্বশেষ রেজা কিবরিয়াকে হাত করে মাসুদ করিম। 

মাসুদ করিম নামের ঐ প্রবাসী আমেরিকান বাংলাদেশী ব্যাংককে ও কাঠমান্ডুতে বেশ কয়েকটি সম্মেলন আয়োজন করেছিল। তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার পরিচয় দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতাদের বিভ্রান্ত করলেও মাসুদ করিম ওরফে এনায়েত করিম আসলে বাংলাদেশের সরকারী গোয়েন্দা সংস্খা ডিজিএফআইর পেইড এজেন্ট। মেজর জেনারেল খালেদ মামুন শেখ হাসিনা সরকারের ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক থাকতে মাসুদ করিমকে রিক্রুট করা হয়। 

এরপর থেকে মাসুদ করিম সিএইএর পরিচয় দিয়ে বিএনপির ওপরে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের ওপরে প্রভাব বিস্তার করে তাদেরকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হন যে, সিআইএকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে দখলদার হাসিনা সরকারের পতন ঘটাকে সক্ষম হবেন। সরকার নামানোর কথা বলে মাসুদ প্রায়শই বাংলাদেশী কিছু পলিটিশিয়ানদের নিয়ে দেশে বিদেশে মিটিং করেন। অনেককে টাকা পয়সা ও বিমানের টিকেটও দেন। 

এই বিষয়টি বিএনপি'র হাইকমান্ড উপলব্ধি করতে পারেন এবং এর ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করেন। দলের যেসব নেতা মাসুদের সাথে সম্পর্ক রেখেছিল তাদের দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। রেজা কিবরিয়ার ব্যাপারেও একই কাজ করে বিএনপি। 

নূরুল হক নূরুদের বিনএপি বুঝাতে সক্ষম হয় যে, মাসুদ করিম একজন সরকারি গোয়েন্দা। বিরোধী দলকে মিসগাইড করাই তার কাজ। এই কারণে রেজা কিবরিয়াকে সতর্ক করতে বলে নূরুদের। নূররা রেজা কিবরিয়ার কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে রেজা কিবরিয়া বিষয়টি এড়িয়ে যান। এরই প্রেক্ষিতে বিএনপির পরামর্শে রেজা কিবরিয়াকে দল থেকে সরিয়ে দেয় গণঅধিকার পরিষদ।

৩ জানু, ২০২৩

সুদী লেনদেনে জড়িয়েছে ইসলামী ব্যাংক

 


পৃথিবীজুড়ে লেনদেনকে সহজ করার জন্য ব্যাংকব্যবস্থা চালু হওয়ার মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে মুসলিমরাও ব্যবসায়ের কাজে সুদী লেনদেনে জড়িত হতে বাধ্য হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পৃথিবীর বিখ্যাত ইসলামী স্কলাররা ইসলামী ব্যংকিং সিস্টেম চালু করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমে মিশরে 'মিটগামার ব্যাংক' নামে ইসলামী ব্যংক চালু হয়।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় এদেশের ইসলামপন্থী মানুষদের সহায়তায় ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ধারার ১ম ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড চালু হয়। ইসলামী ব্যাংকের বেসিক উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের জনগণকে সুদের জাল থেকে রক্ষা করা। সুদকে বাদ দিয়ে ব্যাংকিং-এর যাবতীয় সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা করা।

১৯৭১ সালে পটপরিবর্তনের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশকে সেক্যুলার/ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে চালু করায় বাংলাদেশ ইসলামকে বাদ দিয়েছে। সুদী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাই ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য আলাদা নীতি প্রবর্তন করেনি। বাংলাদেশের মানুষ ইসলামপ্রিয় হওয়ায় ও এর পরিচালনায় জামায়াত সংশ্লিষ্ট মানুষরা যুক্ত থাকায় ইসলামী ব্যাংক জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। ফলশ্রুতিতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সেরা ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। এর আমানত, রেমিটেন্স, বিনিয়োগ এবং লাভ সবচেয়ে বেশি।

২০০৮ সালে পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে স্বৈরাচার হাসিনা ক্ষমতায় এসে জামায়াতের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়েছে। শীর্ষ নেতাদের খুন করেছে। জামায়াত সংশ্লিষ্ট সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান এবং এমডিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ডিজিএফআই সদর দপ্তর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসে।

সেখানে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা তাদের পদত্যাগ পত্র এগিয়ে দিয়ে তাতে স্বাক্ষর করতে বলেন। বাধ্য হয়ে তারা পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর করে চলে আসেন। এরপর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি হোটেলে (হোটেল রেডিসন ব্লু ) সভা ডেকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পরিষদ গঠন করা হয়।

এভাবেই শুরু হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ও বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের দুর্ভাগ্যের সূচনা। ৭ বছর আগে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এস আলম গ্রুপ যখন ইসলামী ব্যাংক দখল করে তখন ইসলামী ব্যাংকে মানুষের আমানত সবচেয়ে বেশি ছিল। মালিকানা দখল করে এস আলম গ্রুপ নামে বেনামে ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে জামানত ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় ইসলামী ব্যাংক থেকে।

বিধি বহির্ভূতভাবে ঋণ বিতরণ করে ইসলামী ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে। এর মধ্যে জনগণ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এস আলম গ্রুপের আগ্রাসী ভূমিকার কথা জেনে তাদের আমানত তুলে নিচ্ছে। এতে সংকট আরো ঘণীভূত হয়েছে। এখন ইসলামী ব্যাংক তারল্য ঘাটতি কাটাতে বাধ্য হয়ে সুদের ভিত্তিতে আমানত নিচ্ছে। এর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক তার লক্ষ্যচ্যুত হয়েছে। তার লক্ষ্যই ছিল সুদ এড়ানো। এখন তারা তাদের লেনদেনে সুদকে জড়িত করেছে। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংক এখন সুদী ব্যাংকে পরিণত হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক এতদিন আমানত গ্রহণ করতো মুদারাবা সিস্টেমে। মুদারাবা হল ইসলামি শরীয়াহ সম্মত এক ধরনের অংশীদারি ব্যবসায় পদ্ধতি, যেখানে একপক্ষ মূলধন সরবরাহ করে এবং অপর পক্ষ মেধা ও শ্রম দিয়ে উক্ত মূলধন দ্বারা ব্যবসা পরিচালনা করে। যে পক্ষ মূলধন সরবরাহ করে তাকে সাহিব-আল-মাল বলে এবং ব্যবসায় পরিচালনাকারীকে বলা হয় মুদারিব বলে। এক্ষেত্রে, ব্যবসায়ে মুনাফা হলে পূর্ব চুক্তি অনুসারে বা আনুপাতিক হারে উভয়পক্ষের মাঝে মুনাফা বণ্টিত হয় এবং ব্যবসায় লোকসান হলে মূলধন সরবরাহকারী বা সাহিব-আল-মাল উক্ত লোকসান বহন করে। অন্যদিকে, ব্যবসায় পরিচালনাকারী বা মুদারিব তার মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক পায় না, যা তার লোকসান হিসেবে গণ্য হয়। তবে যদি মুদারিব কর্তৃক নিয়ম লঙ্ঘন, অবহেলা বা চুক্তিভঙ্গের কারণে লোকসান হয় তাহলে মুদারিবকেই লোকসানের দায় বহন করতে হয়।

তারল্য সংকট এড়াতে ইসলামী ব্যাংক গত মাসে অর্থাৎ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে 'নগদ'-এর কাছ থেকে ৮% সুদে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে। অন্যদিকে নগদও তা দিতে রাজি হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক জানিয়েছেন, গত ২৮ ডিসেম্বর ৫ হাজার ১০১ কোটি টাকা ঘাটতিতে পড়ে ইসলামী ব্যাংক। সেজন্য তারা ৮.৭৫% সুদে জরুরি ভিত্তিতে ৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ইসলামী ব্যাংক।

এই ঘটনা ইসলামী ব্যাংকের জন্য প্রথম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের কখনোই অন্যান্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার প্রয়োজন হয় নাই। কারণ এই ব্যাংকের আমানতদাতা ছিল বেশি। আর সুদের ভিত্তিতে ঋণ নেয়ার তো প্রশ্নই আসে না। সুদ রিলেটেড ইসলামী ব্যাংকের প্রবলেম ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে যে টাকা পরিশোধিত মূলধন হিসেবে জমা রাখতো সেখান থেকে সুদ পেত। এই সুদের টাকা তারা মূল ব্যবসার সাথে না জড়িয়ে বিভিন্ন দান-খয়রাত ও দাতব্য কাজে ব্যয় করতো। এখন ইসলামী ব্যাংক নতুনভাবে সুদের জালে জড়িয়ে পড়েছে। তারা সুদের ভিত্তিতে আমনত নিয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের নানা অনিয়ম আলোচনায় আসার পর ব্যাংকটিতে আমানত কমতে থাকে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোকে টাকা ধার দিতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। ইসলামী ব্যাংক এত দিন বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক বিনিয়োগ বন্ড ও সুকুক বন্ড জমা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করলেও এখন সেই সুযোগও শেষ হয়ে এসেছে। কারণ, টাকা ধার করতে ব্যাংকটির হাতে আর বন্ড ও সুকুক নেই। ফলে ব্যাংকটির তারল্য জোগানে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহের বিকল্প নেই।

এদিকে ইসলামী ব্যাংক ইসলামি ধারার অন্য ব্যাংকগুলোকে ৮ হাজার কোটি টাকা ধার দিয়ে রাখলেও সেই টাকা এখন ফেরত পাচ্ছে না। কারণ, যেসব ব্যাংককে টাকা ধার দিয়েছে সেগুলোও একই মালিকানার প্রতিষ্ঠান। এই ব্যাংকগুলো হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এসব ব্যাংকও তারল্যসংকটে পড়েছে। এসব ব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত সিআরআরের অর্থ রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

২০১৭ সালের পর থেকে ইসলামী ব্যাংকে আমানত রাখার ব্যাপারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং এটা অব্যাহত রয়েছে। ২০২২ সাথে আস্থার সংকট প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ইসলামী ব্যাংক ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধতার সংকটে পড়েছে। সুদের ভিত্তিতে ঋণ নেয়ার পর এই ব্যাংককে আর 'ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক পরিচালিত ব্যাংক' বলার সুযোগ নেই। এটি সাধারণ সুদী ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকার একটি প্রতিষ্ঠিত লাভজনক ইসলামী ব্যাংককে সুদী ব্যাংক বানিয়ে ছাড়লো।

২৭ নভে, ২০২২

আবির যেন মব জাস্টিসের শিকার না হয়!


চট্টগ্রামে নিখোঁজ আয়াতকে খুনের জন্য পুলিশ দায়ী করেছে আবির নামে এক গার্মেন্টস কর্মীকে। এন্টিকাটার আর বটি দিয়ে নাকি সে শিশু আয়াতকে জঘন্যভাবে খুন করেছে। আসলেই এন্টিকাটার কিংবা বটি দিয়ে ডেডবডি টুকরো করা যায় কিনা এটা প্রশ্নসাপেক্ষ। আর এই জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি দরকার সেই মানসিক প্রস্তুতি থাকে একজন পেশাদার অপরাধীর। কোনো প্রকার প্রতিশোধ, দ্বন্দ্ব, প্রচণ্ড ঘৃণা না থাকলে এভাবে একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ খুনী হয়ে ওঠা দুষ্কর।

এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ও জনমনে স্বভাবতই আবিরের বিরুদ্ধে জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে তাকে ক্রসফায়ার করে খুন করার আবেদন জানাচ্ছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি জানিনা আবির খুনী কিনা। তবে আমি চাই তার বিচার হোক। সে সুষ্ঠু ও নির্ভরযোগ্য আইনজীবী পাক। আয়াতের প্রকৃত খুনীর প্রচণ্ড শাস্তি হোক। তবে আমি চাই না আয়াতের খুনের জন্য কোনো সাধারণ মানুষ ফেঁসে যাক।

যারা আবিরের ক্রসফায়ার চাইছেন তাদের জন্য আমি একটা ঘটনা শেয়ার করতে চাই।

//রেখা আক্তার। স্বামীর অভাবের সংসারে সুখের রেখা টানতে সেলাই মেশিনে বাসায় বসে কাজ করেন। হোসিয়ারি গার্মেন্টসে স্বামী কাজ করে যা রোজগার করেন তা দিয়ে সংসার চালানো অনেক কষ্টের। দুই মেয়ে লেখাপড়া করে। কোন ছেলে নেই তাদের। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পাশ করেছে। ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রি।

ছেলে সন্তান না থাকলেও মেয়েকে কোন কাজে দেননি তারা। মাঝে মাঝে অভাবের সংসারে বড় মেয়ে পড়ালেখা ছেড়ে মায়ের সাথে কাজ করতে চায়। কিন্তু রেখা আক্তার সুস্থ থাকতে সেটা করতে দিতে রাজি হননা। রাতে যখন নিস্তব্ধ শহর, তখনও রেখা সেলাই মেশিনে সুতার রেখা টেনে চলেন কাপড়ে। তবে আজকের গল্পটা অন্যরকম রোমহর্ষক।

আদরের দুই মেয়ে জেরিন ও জিসা। ছোট্ট সংসারে অভাব থাকলেও সুখ ছিল। খুব বেশি চাওয়া নেই তাদের। করোনার কারণে গার্মেন্টস বন্ধ হলেও রেখা ঠিকই সংসার সামলেছেন দিন-রাত কাজ করে। ছোট্ট ঘরে চারটি প্রাণ নিয়ে কখনও কারো নিকট হাত পাতেননি। করোনার কারণে যে গার্মেন্টস বন্ধ ছিল তা এখন খোলা হয়েছে। স্বামী জাহাঙ্গীর কাজ করে উপার্জন করছে। এখন তাদের অভাব নেই।

তবে ঘটনার শুরু ৪ জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যার পর থেকে। ছোট মেয়ে জিসা(১৪) কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গিয়েছে, কার সাথে গিয়েছে কিছুই জানেনা তারা। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি এমন কারো ঘর নেই যেখানে খোঁজা হয়নি তাঁকে। কিন্তু তারা জানেনা কেউ হারিয়ে গেলে নিকটস্থ থানায় সংবাদ দিতে হয়। কেউ একজন বলেছিল থানায় জিডি করতে। খুব বেশি কর্ণপাত করেনি সে কথায়।

অবশেষে ১৭ জুলাই ২০২০ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে মেয়ের নিখোঁজ জিডি করেন দেওভোগ এলাকার রেখা আক্তার। তদন্তকারী অফিসার এসআই শামীম আল মামুন। ঘটনার ১৩ দিন পর জিডি হলেও থেমে থাকেননি তিনি। বারবার রেখা আক্তারের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও গোপন অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন। জিসা কোন মোবাইল ফোন ব্যবহার করত না। শুধুমাত্র রেখা আক্তারের একটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করত পরিবারের সকল সদস্যরা। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে কোন ফল পাওয়া যাবে কিনা সেটাও ছিল অনিশ্চিত। তবুও এগিয়ে যান তদন্তকারী অফিসার।

তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সন্দেহ করা হয় অটো রিক্সা চালক রকিবকে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে আনা হয় থানায়। পাওয়া যায় ঘটনার কিছু সূত্র। সে অনুযায়ী ৬ আগস্ট অপহরণ মামলা রুজু হয় থানায়। অতঃপর আটক করা হয় আব্দুল্লাহকে। এদের কাউকে চিনেনা রেখা আক্তারের পরিবার। তাদের সাথে কোন পূর্ব শত্রুতাও নেই। তবে তারা কেন অপহরণ করবে জিসাকে? প্রশ্ন থেকেই যায়।

এগুতে হবে তদন্তকারী দলকে। রকিব ও আব্দুল্লাহকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে দুই দিনের পুলিশ রিমাণ্ডে আনা হয়। এবার নতুন তথ্য পাওয়া যায় আব্দুল্লাহর নিকট থেকে। ঘটনার সময় নারায়ণগঞ্জ ইস্পাহানী ঘাট থেকে জিসাকে নিয়ে আব্দুল্লাহ একটি ছোট বৈঠা চালিত নৌকা ভাড়া করেছিল। তখন রাত অনুমান নয়টা। রাত বারোটার দিকে ফিরে এসেছিল আব্দুল্লাহ। তবে ফিরে আসেনি জিসা। আর তার পুরো ঘটনা জানতে হলে যেতে হবে সেই মাঝির নিকট। তবে সে মাঝির নাম জানেনা আব্দুল্লাহ। পুলিশ সুপার নারায়ণগঞ্জ নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার টিম ও সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসার একসাথে কাজ শুরু করেন পুরো রহস্য উদ্ঘাটনে।

ইস্পাহানী ঘাটে থাকা বৈঠা দ্বারা চালিত ১২টি নৌকার মাঝিকে একযোগে জিজ্ঞসাবাদের জন্য আটক করা হয়। হাজির করা হয় আব্দুল্লাহর সামনে। এক এক করে মাঝিকে দেখানো হয় তাঁকে। এবার খুঁজে পাওয়া যায় সেই মাঝিকে, নাম খলিলুর রহমান ওরফে খলিল। এরপর আটক করা হয় তাঁকেও। গ্রেপ্তারকৃত তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ঘটনার আদ্যোপান্ত।

জিসা খুব সহজ সরল এবং চরম বিশ্বাস প্রবণ একটি মেয়ে। সবাইকে খুব সহজেই বিশ্বাস করত। আব্দুল্লাহর কোন নির্দিষ্ট পেশা নেই। অনেকটা ভবঘুরে স্বভাবের। জিসাদের বাড়ির পাশে একটি চায়ের দোকানে কাজ করেছে কিছুদিন। সেখান থেকেই পরিচয় হওয়ার পর জিসা তাঁকে দিয়েছিল তার মায়ের মোবাইল নম্বর। আব্দুল্লাহর নিজের কোন মোবাইল নেই। এরপর সুযোগ পেলে অন্য কোন মোবাইল থেকে তাদের কথা হতো মাঝে মাঝে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহ অটো রিক্সা চালক রকিবের মোবাইল ফোন থেকে ফোন দিয়ে কথা বলে জিসার সাথে।

ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে রকিবের অটোতে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে রাত নয়টায় ইস্পাহানী ঘাটে যায় তারা। রকিব তাদেরকে নামিয়ে দিয়ে চলে আসে। রাতের নদীতে ভ্রমনের আনন্দ নিতে খলিলের নৌকা ৩০০ টাকায় ভাড়া করে আব্দুল্লাহ। নদীর মাঝে ঘুরতে ঘুরতে একসময় আব্দুল্লাহ ঝাঁপিয়ে পড়ে জিসার উপর। নিজেকে রক্ষা করতে প্রাণপণে চেষ্টা করে জিসা। কিন্তু জিসার শক্তির সাথে পেরে ওঠেনা আব্দুল্লাহ। সাহায্য করে মাঝি খলিল। জিসা’র দু পা ধরে রাখে সে। আর আব্দুল্লাহ জোর পূর্বক ধর্ষণ করে রক্তাক্ত করে জিসাকে।

তার গগণবিদারী হাহাকার রাতের আঁধারের নদীতে কেউ শোনেনি। মুখ বন্ধ করে ধরে রাখে আব্দুল্লাহ। তারপর রক্তাক্ত দেহে আবার ধর্ষণ করে মাঝি খলিল। জিসা তখন ক্লান্ত ও অবসন্ন। ধর্ষণের আঘাতে চরম ক্ষতিগ্রস্থ তার শরীর। যন্ত্রণায় কাতর জিসা শুধু বলে বাড়িতে গিয়ে সব বলে দিবে। এমন কথায় ভয় পেয়ে যায় আব্দুল্লাহ ও খলিল। এবার নতুন মিশনে নামে তারা দু’জন। জিসার গলা টিপে ধরে আব্দুল্লাহ আর পা চেপে রাখে খলিল। একসময় নিস্তেজ হয়ে যায় জিসার দেহ। প্রাণ চলে যায় দূর আকাশে। পড়ে থাকে দেহ রাতের আঁধারে নদীর বুকে খলিল মাঝির নৌকায়। স্রোতাস্বিনী শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় জিসা’র মরদেহ।

০৯ আগস্ট বিজ্ঞ আদালতে নির্মম এ খুনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে গ্রেপ্তারকৃত আসামি আব্দুল্লাহ (২২), রকিব (১৯) ও খলিলুর রহমান (৩৬)। আদালতের নির্দেশে আসামিরা এখন জেলখানায় বন্দি। মা রেখার জীবনে আর ফিরে আসবেনা জিসা। এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি জিসার লাশ। শেষ দেখাও হবে কিনা জিসার মুখটা তাও অনিশ্চিত। তবে জড়িত আসামিদের সনাক্ত ও বিচারের মুখোমুখি করতে পেরেছে পুলিশ।

জিসার পরিবার কখনো ভাবতে পারেনি তাদের জিসা এমন নির্মম ধর্ষণ ও খুনের শিকার হয়েছে। তারা পুলিশের কাছেও আসতে চায়নি। তবে যখন পুলিশের নিকট এসেছে, পুলিশ তাদের সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দিয়ে অকল্পনীয় ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। পুলিশ এতটুকু না করলেও হয়তো রেখা আক্তারের কোন অভিযোগ থাকত না। কারণ তারা এসবের কিছুই জানেনা বা ভাবতেও পারেনি। শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকেই এমন ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হযেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ।
সম্মানিত নাগরিকদের পাশে সর্বদাই বাংলাদেশ পুলিশ।//

এই অসাধারণ সুন্দর গল্পটি ১০ আগস্ট ২০২০ পাবলিশ হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফায়েড পেইজে সন্ধ্যায়। মজার ব্যাপার হলো গল্পের জিসা গত রবিবার(২৩/৮/২০) তার মাকে ফোন দিয়ে বলে বাসা ভাড়ার জন্য চার হাজার টাকা দিতে! মূলত জিসা মারা যায়নি। সে তার প্রেমিক ইকবালের সাথে পালিয়ে গেছে। দেড় মাসের মতো সংসার করেছে। এখন টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা ফোন করে টাকা চাইছে।

এদিকে বীর পুঙ্গব পুলিশ বাহিনী রিমান্ডে নিয়ে তিন জনের কাছ থেকে খুনের স্বীকারোক্তি আদায় করে ফেলেছে। এই হলো আমাদের পুলিশের বীরোচিত গল্পগাঁথা। পুলিশের রিমান্ডের চোটে ভয় দেখিয়ে পুলিশ তার কেইস সমাধান করে। বাংলাদেশের পুলিশের মতো ভয়ংকর সন্ত্রাসী আর কেউ হতে পারে না।

রিমান্ডে পুলিশ নিজেই গল্প সাজিয়ে দেয়। সন্দেহভাজনদের সেই গল্প বলতে বাধ্য করে। নতুবা খুন করে ফেলার হুমকি দেয়। আর প্রচন্ড নির্যাতন তো আছেই। আমি নিজেই সাক্ষী চট্টগ্রামে পাঁচলাইশ ও চাঁন্দগাঁও থানায়। আল্লাহ সাহায্য করেছেন, ধৈর্য দিয়েছেন। তাই আমাকে কোনো ভুয়া স্বীকারোক্তি দিতে হয়নি।

পুলিশের নির্মমতা শুধুমাত্র তারাই বুঝবেন যারা পুলিশের খপ্পরে পড়েছেন। তাই এখনই আবিরের বিরুদ্ধে মব জাস্টিস তৈরি করবেন না। অপেক্ষা করুন। প্রকৃত খুনী যাতে শাস্তি পায় সে জন্য দোয়া করুন।

আয়াতের জন্য খুবই কষ্ট হচ্ছে। আমারো এই বয়সী একটি সন্তান আছে। ডাইনি হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী সমাজে নিজের ও সন্তানদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আরো সাবধানী হই। তাদেরকে একা না ছাড়ি। চোখে চোখে রাখি।

আল্লাহ কবে যে আমাদের এই জালিম জনপদ থেকে মুক্তি দেবে!


৬ আগ, ২০২২

হিন্দু জনসংখ্যা কমার আসল কারণ কী?

 

বাংলাদেশে আদমশুমারি হয়ে গেল। যদিও অনেক বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। টোটাল সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকলনা মন্ত্রীও স্বীকার করেছেন আদমশুমারি কিছুটা সমস্যা থাকতে পারে। এই বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে। আজকে আরেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে। আর সেটা হলো বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

এই নিয়ে প্রায় সব মিডিয়া অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছে। কেউ কেউ ইতিহাস টেনে নিয়ে অনেক বিশ্লেষণী রিপোর্ট করেছে। এসব বিষয় এতটা গুরুত্ব না পেলেও বুয়েটের শিক্ষক এনায়েত চৌধুরীর গত বুধবারের ভিডিও বরাবরের মতোই ভাইরাল হয়। তিনি হিন্দু কমে যাচ্ছে এই নিয়ে ভিডিও তৈরি করেছেন।

তিনি তার বিশ্লেষনে কয়েকটি বিষয়কে ফাইন্ড আউট করেছেন যার দ্বারা হিন্দু সংখ্যা কমে যাচ্ছে বাংলাদেশে।
১। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে মাইগ্রেশন (মুসলিমরা হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করছে)
২। এনিমি সম্পত্তি দখলের ফলে মাইগ্রেশন (আবুল বারাকাতের মতে হিন্দুদের জমি দখল করার কারণে এটা হয়)
৩। ফার্টিলিটি রেইট (এই সমস্যার কথা উল্লেখ করে ছেড়ে দিয়েছেন। এনায়েত এই কারণকে গুরুত্ব দেননি)

এনায়েত চৌধুরীর ভাষ্যমতে বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাওয়ার বেসিক কারণ হলো ভারতে মাইগ্রেশন। কিন্তু আসলে কি তা হয়?

এদেশে হিন্দুদের অবস্থা, জীবন যাপন প্র্যাকটিসিং মুসলিমদের চাইতে অনেক ভালো। হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ৮% শতাংশ হলেও সরকারি চাকুরিতে হিন্দুদের পরিমাণ প্রায় ২২%। এখান থেকে সাধারণত হিন্দুরা যায় না। যারা মাইগ্রেশন করে তারা মূলত এখানে অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে এবং যাদের কালো টাকা আছে তারা ভারতে সেগুলো পাচার করে ও এক পর্যায়ে নিজেদের মাইগ্রেশন করে। এই সংখ্যাটা নিতান্তই কম। এটা ধর্তব্য নয়।

ধরে নিলাম এনায়েতের বিশ্লেষণ ঠিক। পাকিস্তানেও হিন্দু সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বৌদ্ধপ্রধান শ্রীলংকায়ও হিন্দুদের পার্সেন্টেজ কমে যাচ্ছে। এনায়েতের হিসাবকে সত্য হিসেবে ধরে নিলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে দলে দলে মানুষ ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। এদিকে ভারতের হিন্দুদের তো মাইগ্রেশনের ঝামেলা নেই।

এনায়েত ও বারাকাতের হিসেবে ভারতে হিন্দুদের পার্সেন্টেজ লাফিয়ে বাড়ার কথা। কিন্তু আসলে কী হচ্ছে সেখানে? ভারত থেকে দাঙ্গা কিংবা এনিমি সম্পত্তি দখলের কারণে মাইগ্রেশন নেই। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার হিন্দুরা সেখানে যাচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে নেপাল থেকেও কেউ কেউ ভারতে মাইগ্রেশন হচ্ছে।

এত হিন্দু চারদিক থেকে ভারতে এলেও ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমি যে ছবিটি শেয়ার করেছি সেটা ভারতের ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার তুলনামূলক চিত্র। এটি দ্য হিন্দু পত্রিকা থেকে নিয়েছি। এখানে দেখা যাচ্ছে ভারতে ১৯৫১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮৪%। ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯%এ। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে ৫% কমে যাওয়া অনেক বড় ব্যাপার!

এনায়েত ও বারাকাতেরা মাইগ্রেশনে যে চিত্র দেখিয়েছে তা যদি সঠিক হতো তবে কি ভারতে হিন্দুদের জনসংখ্যা কমে যেত? অন্যদিকে খেয়াল করুন ভারতে মুসলিমদের পার্সেন্টেজ বেড়ে গেছে। ১৯৫১ সালে তা মুসলিমরা ছিল ৯.৮%। ২০১১ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৪.২%। প্রায় সাড়ে ৪% বেড়ে গেছে।

ভারতে মুসলিমদের সুযোগ সুবিধা কয়েকটি স্থানে কিছুটা ভালো। বাকী পুরো ভারতে মুসলিমদের যুদ্ধ করে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। ভারত থেকে কিছু মুসলিম মাইগ্রেশন হয় মধ্যপ্রাচ্যে ও ইউরোপে। কিন্তু তারপরও সেখানে মুসলিমদের জনসংখ্যা বাড়ছে ও হিন্দুদের জনসংখ্যা কমছে।

একপাক্ষিক ও পূর্ব ধারণা মাথায় রেখে বিশ্লেষণ করার কারণে এনায়েত চৌধুরির বিশ্লেষণের মৌলিক ত্রুটি দেখা গেছে। যদি মাইগ্রেশনই মূল সমস্যা হতো তবে ভারতে হিন্দু সংখ্যা বেড়ে যেত।

হিন্দুরা জনসংখ্যার দিক দিয়ে ১ম দেশ ভারতে, এরপর নেপালে এবং ৩য় দেশ বাংলাদেশ। অবাক করা ব্যাপার হলো এই তিন দেশেই জনসংখ্যা কমছে। ভারত ও নেপালে মাইগ্রেশন সমস্যা নেই। তবুও কেন কমছে?

এর বেসিক কারণ হলো ফার্টিলিটি রেট। যে বিষয়টা এনায়েত উল্লেখ করেও গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে গেছে। অথচ এটাই হচ্ছে বেসিক কারণ।

হিন্দুদের ফার্টিলিটি রেট বা জন্মহার কমে যাওয়ার কারণ দুইটি
১। জন্মনিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় প্রভাব নেই
২। তাদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

ফার্টিলিটি রেট জলবায়ু ও অঞ্চলের ওপর বেশি নির্ভর করে। আমাদের অঞ্চলের চাইতে আফ্রিকায় ফার্টিলিটি রেট বেশি। একই এলাকার দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে এর পার্থক্য হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু দুই কারণে পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে।

আমাদের উপমহাদেশে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা প্ররোচনায় প্রচার করা হচ্ছে জনসংখ্যাই আমাদের সমস্যা। এজন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই প্রচারণার সাথে একমত হয় নি মুসলিমরা। কিন্তু হিন্দুদের তাতে সমস্যা ছিল না। মুসলিম সমাজের মসজিদে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে হামেশাই বক্তব্য দেওয়া হয়। উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মওদূদী এই নিয়ে বই লিখেছেন 'ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ'।

এই বইটি উপমহাদেশের মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে ও বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রজেক্টটা বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে অল্প কয়েকদিন হচ্ছে জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু হিন্দু সমাজে এটা গোড়া থেকেই জনপ্রিয় ছিল। তারা পশ্চিমা প্রচারণায় কান দিয়েছে। তাই তাদের জন্মহার কমে গিয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো তাদের খাদ্যাভ্যাস। এই উপমহাদেশের হিন্দুরা লাল গোশত খুবই কম খায়। গরু ছাগলের গোশত কম খাওয়ায় তাদের ফার্টিলিটি রেট কমে যাচ্ছে। গরু ছাগলের গোশতে (রেড মিট) প্রচুর জিংক থাকে। যা সন্তান জন্মদান ও গর্ভধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু ছেলে-মেয়েরা দীর্ঘসময় ধরে গোশত না খাওয়ায় ফার্টিলিটি রেট কমে যাচ্ছে।

তাই শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব স্থানে, সব দেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকায় হিন্দু সংখ্যা কমছে। এই বিষয় নিয়ে ভারতের লোকেরাও গবেষণা করেছে। তারা এই ফার্টিলিটি রেটকেই ফাইন্ড আউট করেছে কারণ হিসেবে।


৮ নভে, ২০২১

মাথাপিছু আয় ও অর্থনীতি নিয়ে কিছু সরল কথা


কী অবিশ্বাস্য ঘটনা! মন্ত্রীর কথাই সঠিক। সকালে মোবাইল চেক করে দেখলাম রাতের চাইতে ধনী হয়ে গেলাম! একজনের কাছে কিছু টাকা পেতাম। তিনি গত রাত দুইটায় তা পাঠিয়ে দিয়েছেন বিকাশে।

মাথাপিছু আয় নিয়ে আওয়ামীলীগের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান যেভাবে বলেছেন, আমাদের অজান্তেই আমরা ধনী হয়ে যাচ্ছি। এটা আসলে তার অর্থনীতি নিয়ে জ্ঞান কম থাকার কারণে এই কথা বলেছেন আমি তা বিশ্বাস করি না। উনি ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি সর্বশেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালকও ছিলেন।

এমন একজন ব্যক্তি যখন মাথাপিছু আয় নিয়ে হাস্যকর কথা বলে তখন বড় দুঃখ হয়। তিনি বলেছেন, আমাদের মাথাপিছু আয়ও বড়েছে। আড়াই হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পাচ্ছে, রাত পোহালেই আয় বাড়ছে বাংলাদেশের, আমরা টেরই পাচ্ছি না। আমরা অজান্তেই বড়লোক হয়ে যাচ্ছি।’ এ কেমন আয় যে, টের পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে সামান্য আয় করতে সবার চামড়া পুড়ে লাল হয়ে যাচ্ছে সেখানে কীভাবে টের পাওয়া ছাড়া হুদাই আয় হয়।

বিনা ভোটের সন্ত্রাসীরা মূলত জনগণকে ছাগল জ্ঞান করে। তাই এসব মন্তব্য করে তাদের অনুসারী সন্ত্রাসীদের চাঙ্গা রাখে। আর সন্ত্রাসীরাও জনগণকে শোষণ করে লুটপাট করে। সেই লুটপাটের টাকা মন্ত্রীর একাউন্টেও যায়। তিনিও সম্ভবত সকালে প্রতিদিন একাউন্ট চেক করে অবাক হয়ে যান। তৃণমূলের সন্ত্রাসীরা তার একাউন্টে হিসেব ছাড়া টাকা পাঠিয়ে দেয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) আমাদের জানিয়েছে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২৫০০ ডলার। তার মানে একজন মানুষের বার্ষিক আয় (২৫০০*৮৫) = ২১২৫০০ টাকা। এবং মাসিক আয় (২১২৫০০/১২) = ১৭৭০৮ টাকা। এক বছরের শিশু থেকে নিয়ে একদম বৃদ্ধ পর্যন্ত দেশের প্রতিটি মানুষের আয় গড়ে ১৭৭০৮ টাকা। এটা একটা রূপকথা। কারণ আমরা জানি আমাদের দেশের মানুষের আয়ের অবস্থা কী?

আমার নিজের কথাই ধরি। আমাদের পরিবারে যে ইনকাম হয় তা দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর চাইতেও বেশি। তারপরও আমাদের পরিবারের আয় মাথাপিছু আয় অতিক্রম করতে পারছে না। এখানে অনেকেই বলবেন আমরা তো অনেকেই ১৭০০০ হাজারের চাইতে বেশি ইনকাম করি। কিন্তু আপনার আয় আপনার একার নয়। আপনার ওপর নির্ভরশীল প্রতিটা ব্যাক্তির হিসেবে সেটা কম হয়ে যাবে। যেমন একটি পরিবারে ৫ জন মানুষ আছে। আয় করেন কেবল একজন। তার আয় যদি ৮৮৫৪০ টাকা হয় তবেই কেবল তিনি মাথাপিছু আয়ের সমান ইনকাম করতে পারেন।

যাই হোক এবার আমরা জানার চেষ্টা করি এই মাথাপিছু আয় কীভাবে নির্ধারিত হয়। একটি দেশের এক বছরে মোট জাতীয় আয়কে সেই দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়।

মাথাপিছু আয় = বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয় / মোট জনসংখ্যা

মোট জাতীয় আয় (GNP) : একটি দেশের নাগরিক (দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত) দ্বারা যত উৎপাদন ও সেবা পাওয়া যায় তার টাকার মূল্য হিসেব করে মোট জাতীয় আয় বা উৎপাদন নির্ধারণ করা হয়।

মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) : একটি দেশে অবস্থানরত (দেশি ও বিদেশী নাগরিক) সব মানুষ দ্বারা মোট যত উৎপাদন ও সেবা পাওয়া যায় তার টাকার মূল্য হিসেব করে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি পাওয়া যায়।

মোট জাতীয় উৎপাদন (GNP) = GDP - বাংলাদেশে থাকা বিদেশীদের আয় + বিদেশে থাকা বাংলাদেশীদের আয়।

অর্থাৎ জিডিপি থেকে বিদেশীদের আয় বিয়োগ করা হয় এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের আয় যোগ করে আমরা বাংলাদেশের মোট জাতীয় আয় বের করি।

আমার বিশ্বাস যদি সঠিকভাবে হিসেব করা হয় তবে আমাদের মাথাপিছু আয় আরো অনেক কম হওয়ার কথা। এখন এমন এক পরিসংখ্যান হাজির করা হলো যে, দেশের পরিকল্পনা মন্ত্রীই পর্যন্ত সেই হিসেব বিশ্বাস না করে বলেছেন দেশের আয় বেড়ে যাচ্ছে অথচ আমরা টের পাচ্ছি না।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি : গত বছরের তুলনায় এই বছর জিডিপি কত বেড়েছে তার শতকরা হিসেব কে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বলা হয়। যেমন গত বছর যদি আমাদের জিডিপি হয় ১০০০০ টাকা আর এই বছর যদি জিডিপি হয় ১১০০০ টাকা তাহলে আমাদের প্রবৃদ্ধি হবে, (১১০০০-১০০০০)*১০০/১০০০০ = ১০%

যত ঝামেলা এই প্রবৃদ্ধিকে নিয়ে। সরকার চায় এই প্রবৃদ্ধি বেশি দেখাতে তাহলে তার আমলে আয় বেড়েছে এটা বুঝা যাবে। প্রবৃদ্ধি যত বেশি তত গতিশীল অর্থনীতি নিশ্চিত হয়। বিবিএস বা পরিসংখ্যান ব্যুরো যেটা ঝামেলা করে সেটা হলো তারা হিসেব হিসেবটা রাজনৈতিকভাবে করে। আগেই সরকার প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করে তারপরে ব্যাক ক্যাককুলেশন করে হিসাব মিলায়। প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে সরকার প্রতিবছর আমাদের বেশি জিডিপি হিসেব করছে। আসলেই সেই উৎপাদন বা আয় হচ্ছে কিনা তার খবর কেউ রাখছে না।

২০ আগস্ট ২০২০ সালে প্রথম আলোতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক সচিব রীতি ইব্রাহীম বলেন, //আগে প্রবৃদ্ধি ঠিক করা হয়, পরে হিসাব মেলানো হয়। ফলে দেশের অর্থনীতির সাথে জিডিপির হিসেব মিলে না।//

বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২১২৫০০ টাকা যা পরিসংখ্যান ব্যুরো বলেছে এটা পুরোটাই ভাঁওতা ও প্রতারণা।

আরেকটি প্রতারণা হলো জনসংখ্যা নিয়ে। মাথাপিছু আয় বের করতে হলে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করতে হয়। এই জনসংখ্যাকে কমিয়ে রেখেছে পরিসংখ্যান ব্যুরো। বিভিন্ন গবেষণায় দেশের মানুষ বিশ কোটি ছাড়িয়ে গেলেও আমাদের দেশে অফিসিয়ালি জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লক্ষ। ২০১১ সালে এটি ছিল ১৪ কোটি ৯৭ লক্ষ। সরকারের হিসেবে গত দশ বছরে দেশের জনসংখ্যা বাড়ে নাই বললেই চলে। অথচ এই পরিসংখ্যান ব্যুরো দেখিয়েছে গত দশ সব ধরণের মৃত্যুর হার কমেছে। আমাদের গড় আয়ু ৬৩ থেকে ৭৩ হয়েছে।

সুতরাং সরকারি হিসেবের ভ্যালু একেবারে থার্ডক্লাশ লেভেলের। একদিকে বলছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। গড় আয়ু ১০ বছর বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আবার জনসংখ্যা বৃদ্ধির কোনো খবর নেই।

আমাদের মাথাপিছু আয়ে তাই মারাত্মক গলদ রয়েছে। একদিকে জিডিপি বাড়তি দেখানো হচ্ছে অন্যদিকে জনসংখ্যা কম দেখানো হচ্ছে। তাই আমাদের মাথাপিছু আয় একটি দানবীয় সংখ্যায় রূপ নিয়েছে আর তা হলো ২১২৫০০ টাকা।

৫ জুল, ২০২১

সূরা কাফিরুন ও ধর্মনিরপেক্ষতা



ঘটনাটা মক্কায়! উমার রা. ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর মুসলিমরা সাফা পর্বতের পাদদেশ থেকে মিছিল বের করলেন। এই প্রসঙ্গে উমার রা. বলেন, আমরা দুই কাতারে বিভক্ত হয়ে মিছিল শুরু করলাম। এক কাতারে ছিলেন হামজা, অন্য কাতারে আমি, আমাদের চলার পথে যাঁতার পেষা আটার মতো ধুলো উড়ছিলো। আমরা মসজিদে হারামে প্রবেশ করলাম। মুশরিকরা আমাদের মিছিল দেখে মনে এত বড় কষ্ট পেলো, যা ইতিপূর্বে পায়নি। সেই দিন কা'বা চত্বরে রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে 'ফারুক' উপাধি দিলেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, এর আগে আমরা কাবাঘরের কাছে নামায আদায়ে সক্ষম ছিলাম না। সুহাইব রুমি রা. বলেন, হযরত উমার ফারুক রা. মুসলমান হওয়ার পর ইসলাম পর্দার বাইরে এলো এবং ইসলামের দাওয়াত প্রকাশ্যে দেয়া শুরু হলো। আমরা কাবাঘরের সামনে গোল হয়ে বসতে লাগলাম এবং কাবাঘর তওয়াফ করতে লাগলাম, যারা আমাদের ওপর এতোদিন বাড়াবাড়ি করেছিলো, তাদের উপর আমরা এভাবেই প্রতিশোধ নিলাম এবং অত্যাচারের জবাব দিলাম।

যখন হযরত উমার রা. ঈমান আনলেন তখন কুরাইশ নেতারা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছিল। মুশরিক কুরাইশরা প্রথমেই এ দৃশ্য দেখে ভীত হয়ে পড়েছিল যে, ইসলামের দাওয়াতের নিয়ে তাদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তি উঠেছেন যিনি নিজের পারিবারিক আভিজাত্য, নিষ্কলংক চরিত্র, বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও বিচার বিবেচনার দিক দিয়ে সমস্ত জাতির মধ্যে অদ্বিতীয়। তারপর আবু বকরের মতো লোক তাঁর ডানহাত, যাকে মক্কা ও তার আশপাশের এলাকার প্রত্যেকটি শিশুও একজন অত্যন্ত ভদ্র, বিবেচক, সত্যবাদী ও পবিত্র পরিচ্ছন্ন মানুষ হিসেবে জানে। এখন যখন তারা দেখলো, উমর ইবনে খাত্তাবের মতো অসম সাহসী ও দৃঢ় সংকল্প ব্যক্তিও এ দু’জনের সাথে মিলিত হয়েছেন তখন নিশ্চিতভাবেই তারা অনুধাবন করতে সক্ষম হলো যে, বিপদ সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। তারা মুহাম্মদ সা.-এর দাওয়াত বন্ধ করার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকলো।

এদিকে চাচা আবু তালিব ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মুশরিক কুরাইশ সরদাররা মনে করলো, এবার বুঝি আবু তালিবের শেষ সময় এসে গেছে। তখন তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলো, হয় মুহাম্মদ সা.-এর সাথে তাদের বিবাদ মিটানো হবে নতুবা তাকে শেষ করে দেওয়া হবে। তারা মনে করলো এই বিষয়ে আবু তালিবের কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলা উচিত। তিনি আমাদের ও তাঁর ভাতিজার বিবাদ মিটিয়ে দিয়ে গেলে ভালো। নয়তো এমন ও হতে পারে, তার মৃত্যু হয়ে যাবে এবং আমরা পরে মুহাম্মাদ সা.-এর সাথে কোনো কঠোর ব্যবহার করবো। আর আরবের লোকেরা এ বলে আমাদের খোঁটা দেবে যে, যতদিন আবু তালিব জীবিত ছিলেন ততদিন এরা তাকে সমীহ করে চলেছে, এখন তার মৃত্যুর পর তার ভাতিজার গায়ে হাত তুলেছে।

তারা সবাই একমত হলো। আপোষ প্রস্তাব নিয়ে প্রায় ২৫ জন কুরাইশ নেতা আবু তালিবের কাছে গেল। এদের অন্যতম ছিলো আবু জাহেল, আবু সুফিয়ান, উমাইয়াহ ইবনে খালফ, আস ইবনে ওয়ায়েল, আসওযাদ ইবনুল মুত্তালিব, উকাবাহ ইবনে আবী মু’আইত, উতবাহ ও শাইবাহ। তারা যথারীতি প্রথমে আবু তালিবের কাছে মুহাম্মদ সা.-এর বিরুদ্ধে নিজেদের অভিযোগ পেশ করলো। তারপর বললো, আমরা আপনার কাছে একটি ইনসাফপূর্ণ আপোষের কথা পেশ করতে এসেছি। আর তা হলো আপনার ভাতিজা আমাদেরকে আমাদের ধর্মের ওপর ছেড়ে দিক আমরাও তাকে তার ধর্মের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি। সে যে মাবুদের ইবাদত করতে চায় করুক, তার বিরুদ্ধে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্ত সে আমাদের মাবুদদের নিন্দা করবে না এবং আমরা যাতে আমাদের মাবুদদেরকে ত্যাগ করি সে প্রচেষ্টা চালাবে না। এ শর্তের ভিত্তিতে আপনি তার সাথে আমাদের আপোষ করিয়ে দিন।

চাচা আবু তালিব নবী সা.-কে ডাকলেন। তাঁকে বললেন, ভাতিজা! এই যে তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমার কাছে এসেছে। তাদের ইচ্ছে, তুমি একটি ইনসাফপূর্ণ আপোষের ভিত্তিতে তাদের সাথে একমত হয়ে যাবে। এভাবে তোমার সাথে তাদের বিবাদ শেষ হয়ে যাবে। তারপর কুরাইশ সরদাররা তাঁকে যে কথাগুলো বলেছিল সেগুলো তিনি মুহাম্মদ সা.-কে বললেন। মুহাম্মদ সা. জবাবে বেশ কৌশলী হয়ে হিকমত সহকারে বললেন, “চাচাজান! আমি তো তাদের সামনে এমন একটি কথা পেশ করছি তা যদি তারা মেনে নেয় তাহলে সমগ্র আরব জাতি তাদের হুকুমের অনুগত হয়ে যাবে এবং অনারবরা তাদেরকে কর দিতে থাকবে।” একথা শুনে প্রথমে তো তারা হতভম্ব হয়ে গেল।

এবার আবু তালিব কুরাইশ নেতাদের বললেন, তোমরা আমার ভাতিজার কথা শুনলে তো আরব ও পৃথিবীর মালিক হয়ে যাবে। তাহলে বলো, মুহাম্মদের প্রস্তাব বেশি ভালো, না তোমরা ইনসাফের নামে যে কথাটি আমার সামনে পেশ করছো সেটি বেশি ভালো? রাসূল সা. আরো বললেন, তোমরা আমার কথাটি মেনে নেবে অথবা যে অবস্থার মধ্যে তোমরা এখন পড়ে রয়েছো তার মধ্যেই তোমাদের পড়ে থাকতে দেবো এবং নিজের জায়গায় বসে আমি নিজের আল্লাহর ইবাদত করতে থাকবো কোনটির মধ্যে তোমাদের কল্যাণ রয়েছে? আমি তো তোমাদের কল্যাণের জন্যই কাজ করছি।

তারা বুঝতে পারছিল না এমন একটি লাভজনক কথার প্রতিবাদ কীভাবে করবে? কাজেই তারা নিজেদের বক্তব্য থেকে সরে এসে বললো, তুমি একটি কথা বলছো কেন, আমরা তো এমন দশটি কথা মানতে রাজি কিন্তু সেই কথাটি কি তাতো একবার বলো। মুহাম্মদ সা. বললেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। একথা শুনেই তারা সবাই একসাথে উঠে দাঁড়ালো এবং সে কথাগুলো বলতে বলতে চলে গেলো যা আল্লাহ সূরা সোয়াদের শুরুতে উদ্ধৃত করেছেন।

সূরা সোয়াদের ৪ থেকে ৮ নং আয়াতে রয়েছে, মুশরিকরা আল্লাহর রাসূল সা. সম্পর্কে বলেছিলো, “এ হচ্ছে যাদুকর, বড়ই মিথ্যুক। সকল প্রভুর বদলে সেকি মাত্র একজনকেই প্রভু বানিয়ে নিয়েছে? এতো বড় বিস্ময়কর কথা! নেতারা একথা বলতে বলতে বের হয়ে গেলো, “চলো, অবিচল থাকো নিজেদের প্রভুদের উপাসনায়। একথা তো (রাসূল সা.-এর প্রস্তাব) বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই বলা হচ্ছে। আমরা অতীতের জাতিগুলোর মধ্য থেকে কারো কাছ থেকে তো এ ধরনের কথা শুনিনি। এটি একটি মনগড়া কথা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের মধ্য থেকে কেবল এ ব্যক্তির ওপরই কি আল্লাহর কুরআন নাযিল করা হল?

মুশরিকদের পরিকল্পনা কাজ না করায় তারা নতুন প্রস্তাব নিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর কাছে এলো। এই প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মুশরিকরা মুহাম্মদ সা.-কে বললো, আমরা আপনাকে এত বেশী পরিমাণ ধন- সম্পদ দেবো যার ফলে আপনি মক্কার সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে যাবেন। যে মেয়েটিকে আপনি পছন্দ করবেন তার সাথে আপনার বিয়ে দিয়ে দেবো। আমরা আপনার নেতা মেনে আপনার পিছনে চলতে প্রস্তুত। আপনি শুধু আমাদের একটি কথা মেনে নেবেন।

মুহাম্মদ সা. বললেন, কী সেই কথা?

তারা বললো, আমাদের উপাস্যদের নিন্দা করা থেকে বিরত থাকবেন। আপনি হয়তো এ প্রস্তাবটি পছন্দ করবেন না। আপনার পছন্দ না হলে আমরা আরো একটি প্রস্তাব পেশ করছি। এ প্রস্তাবে আপনার লাভ এবং আমাদেরও লাভ।

মুহাম্মদ সা. বললেন, বলো তোমাদের সেই প্রস্তাব।

তারা বললো, এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যদের ইবাদাত করবেন এবং আমরাও এক বছর আপনার উপাস্যের ইবাদাত করবো।

এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা সূরা কাফিরুন নাজিল করে জানিয়ে দিয়েছেন মুসলিম এবং মুশরিকের রাস্তা আলাদা। এরকম মিল সমন্বয়ের কোনো স্থান ইসলামে নেই।

//আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সা.-কে বলেন, বলে দাও, হে কাফেররা! তোমরা যার ইবাদাত করো আমি তার ইবাদাত করি না এবং আমি যার ইবাদাত করি তোমরা তার ইবাদাতকারী নও। তোমরা যার ইবাদত করছো, আমি তার ইবাদাতকারী হবো না। আর আমি যার ইবাদাত করি তোমরা তার ইবাদাতকারী হবে না। তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন আমার জন্য।//

আল্লাহ তায়ালা এই সূরার মাধ্যমে আমাদেরকে কাফেরদের থেকে আলাদা করে দিয়েছেন। মুসলিমদের দ্বীন আলাদা এবং কাফেরদের দ্বীন আলাদা। আমরা তোমাদের মাবুদদের পূজা-উপাসনা-বন্দেগী করি না এবং তোমরাও আমাদের মাবুদের পূজা-উপাসনা করো না। আমরা তোমাদের মাবুদদের বন্দেগী করতে পারি না এবং তোমরা আমাদের মাবুদের বন্দেগী করতে প্রস্তুত নও। তাই আমার ও তোমার পথ কখনো এক হতে পারে না। এটা কাফেরদের প্রতি উদারনীতি নয় বরং তারা কাফের থাকা অবস্থায় চিরকালের জন্য তাদের ব্যাপারে দায়মুক্তি, সম্পর্কহীনতা ও অসন্তোষের ঘোষণাবাণী।

আর আল্লাহ‌ ও তাঁর রসূলের প্রতি যারা ঈমান এনেছে তারা দ্বীনের ব্যাপারে কখনো তাদের সাথে সমঝোতা করবে না। এ ব্যাপারে তাদেরকে সর্বশেষ ও চূড়ান্তভাবে নিরাশ করে দেয়াই এই সূরার উদ্দেশ্য। অথচ স্বৈরাচারি হাসিনা গত ৩ জুলাই সংসদে দেওয়া বক্তব্যে এই সূরা উল্লেখ করে বলতে চায় আল্লাহ নাকি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বৈধতা দিয়েছেন। অথচ এই সূরার মাধ্যমে স্পষ্ট করা হয়েছে মুসলিমরা ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না। সে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর ইবাদত করতে বাধ্য। ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত বিধান দেয়নি, রাষ্ট্রীয় বিধানও দিয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষতার মূল কথা হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ধর্মীয় বিধানকে দূরে রাখা। যা স্পষ্টত কুফরি। রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামকে দূরে রাখার মানে আল্লাহর দেওয়া বিধানের লাঞ্ছনা ও অবমাননা। এটা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। 

৪ জুল, ২০২১

ঢাবির প্রতিষ্ঠাতাকে আমরা মনে রাখতে পারি নাই

 


সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছর বয়স হওয়া উপলক্ষে ডেইলি স্টার পত্রিকা একটি আঁকা ছবি প্রকাশ করে। সেই ছবিতে তারা ঢাবির প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই ছবি নিয়ে নানান বিতর্ক তৈরি হয়। সবচেয়ে জোরালো বিতর্ক হয় কেন সেখানে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি দেওয়া হয়েছে, যার বিরুদ্ধে ঢাবি প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করার জোরালো অভিযোগ রয়েছে। 

যাই হোক, আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়। আমি ঢাবির প্রতিষ্ঠাতার ছবি সেখানে খুঁজেছি। দুঃখজনক হলেও সত্য সেখানে বহু ছবি থাকলেও ঢাবির প্রতিষ্ঠাতার ছবি নেই। আমার মনে হয় এদেশের ১ম বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার নাম এদেশের বেশিরভাগ মানুষ জানেন না। শুধু তাই নয় আমার মনে হয় ঢাবির শিক্ষকদেরও যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তারা পারবেন না বা ভুল উত্তর দেবেন। এটা আমাদের বৈশিষ্ট্য। আমরা এটা অর্জন করেছি ৭১ এর তথাকথিত স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে। ৭১ এর পর থেকে আমাদের দেশে শুধু মিথ্যা ইতিহাস চর্চিত হয়েছে। 

আমরা এবার ইতিহাসের দিকে নজর দিই। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজ ইংল্যান্ডের একটি ব্যবসায়ী কোম্পানি 'ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির' কাছে পরাজিত হয়েছেন তার প্রধান সেনাপতি ও এখানকার মুশরিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। ঐ কোম্পানির ব্যবসায়িক ব্যবস্থা কোলকাতা বন্দরকে ঘিরে ছিল। তাই তারা কোলকাতাকে রাজধানী করে। এরপর তারা ধীরে ধীরে বাংলাকে ছাড়িয়ে পুরো ভারতকে যখন নিজেদের অধিকারে আনে তখনও রাজধানী ছিল কোলকাতা। ১৭৫৭ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত ১৫৪ বছর ভারতের রাজধানী ছিল কোলকাতা। 

ভারত পরিচালনা করতে গিয়ে ইংরেজরা সবচেয়ে বেশি শোষণ করেছে ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছে বাংলা বিশেষত পূর্ব বাংলা থেকে। এই প্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলায় তাদের শাসন আরো জোরদার করার লক্ষ্যে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা দেন। বাংলাকে ভেঙ্গে দুটি প্রদেশ করার সিদ্ধান্ত নেয় ইংরেজ সরকার। নতুন প্রদেশের নাম করা হয় 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম'। ত্রিপুরা, ঢাকা, রাজশাহী, চটগ্রাম, মালদা ও আসাম নিয়ে এই প্রদেশ গঠিত হয়। এর রাজধানী করা হয় ঢাকাকে এবং ২য় রাজধানী করা হয় চটগ্রামকে। 

মুসলিম রাজনীতিবিদেরা এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান। তারা ভেবেছেন এর মাধ্যমে ঢাকা পুনর্গঠন হবে। এখানকার মুসলিমরা চাকুরি ও ব্যবসায় উন্নতি করতে পারবে। মুসলিম অধ্যুষিত দুইটি এলাকা শহরে পরিণত হবে। মুসলিমদের জীবনমান উন্নত হবে। সেসময়ে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতা ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ, নবাব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ও তরুণ নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। তারা ঢাকাকে নতুন শহরে রূপ দিতে কাজ শুরু করেছিলেন ইংরেজদের সাথে। 

ইংরেজদের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারে নি কোলকাতার হিন্দু সমাজ। ১৭৫৭ সাল থেকেই ইংরেজরা কোলকাতায় একটি বুদ্ধিজীবী সুবিধাগোষ্ঠী সমাজ তৈরি করে যাদের সবাই ছিল হিন্দু। তারা শত বছর ধরে ইংরেজ শাসনের সুবিধাভোগী ও ইংরেজদের সকল কাজের বৈধতা দানকারী ছিল। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের ফলে যখন তারা ভেবেছে মুসলিমদের উন্নতি হবে তখনই তারা এর ঘোর বিরোধীতা করতে শুরু করে। ইংরেজদের দালালরাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ সহিংস আন্দোলন শুরু করে। 

ইংরেজরা হিন্দুদের এমন আচরণে থমকে যায়। তারপরেও তারা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অটল থাকে। মুসলিমরাও বুঝেছে ইংরেজদের চাইতে তাদের বড় শত্রু এদেশীয় মুশরিকরা। তাই ১৯০৬ সালে মুসলিম নেতারা নিজেদের জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান 'মুসলিম লীগ' গঠন করে। ইংরেজরা তাদের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত অটল থাকতে পারেনি। ৬ বছর পর ১৯১১ সালে তারা তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে। পুরো বাংলা, আসাম, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে আবার আগের মতো বঙ্গ প্রদেশ গঠিত হয়। রাজধানী থাকে আগের মতোই কোলকাতা। 

তবে ইংরেজরা এই ঘটনায় মারাত্মক শকড হয়। তাদের তৈরি দালাল শ্রেণি তাদের বিরুদ্ধে ব্যাকফায়ার করেছে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা ভেবেছে যদি কোলকাতা ভারতবর্ষের রাজধানী থাকে তবে এই দালালশ্রেণি তাদের পদে পদে বাধা তৈরি করবে। তাই তারা বঙ্গভঙ্গ রদ করার পাশাপাশি এও ঘোষণা দেয়, কোলকাতা এখন থেকে শুধু বঙ্গের প্রাদেশিক রাজধানী হয়েই থাকবে। ভারতবর্ষের নতুন রাজধানী হবে দিল্লী। 

কোলকাতার এতো বড় ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও তাদের অনুসারীরা সারা কোলকাতায় আবির উৎসব করেছে। তাদের উৎসবের একমাত্র হেতু ঢাকা আর রাজধানী থাকছে না। মুসলিমদের কোনো শহর হচ্ছে না বাংলায়। নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে এটি।

১৯১১ সালে ২৯ আগস্ট ঢাকার কার্জন হলে ল্যান্সলট হেয়ারের বিদায় এবং চার্লস স্টুয়ার্ট বেইলির যোগদান উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে পৃথক দুটি মানপত্রে নবাব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি লর্ড হার্ডিঞ্জের ঢাকায় অবস্থানকালে নওয়াব সলিমুল্লাহ ও নওয়াব আলীসহ ১৯ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে মুসলমানদের যে সমূহ ক্ষতি হয়েছে সে কথা তুলে ধরেন। সেখানে শেরে বাংলাও ছিলেন।  

তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। এ লক্ষ্যে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট নাথান কমিটি গঠিত হলে নওয়াব আলী চৌধুরী এর অন্যতম সদস্য হন। এর অধীনে ছয়টি সাব কমিটি গঠিত হলে তিনি ৬ টি বিভাগের সদস্য নিযুক্ত হন। 

সৃষ্টির শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়ে। কোলকাতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে হিন্দুরা। এর নেতৃত্ব দেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে তাঁর ঢাকা সফর শেষে কলকাতা প্রত্যাবর্তন করলে ১৯১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সাথে সাক্ষাৎ এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতামূলক একটি স্মারকলিপি পেশ করে।  

এছাড়া ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ইংরেজরা এই বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নিতে রাজি হয় না। এর মধ্যে ১৯১৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অনিশ্চয়তার দিকে চলে যায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো হার্ডিঞ্জ ক্ষুব্দ মুসলিম নেতাদের খুশি করতে তাদের দাবির প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক একটি ঘোষণা দেয়। এটি ইংরেজ সরকার থেকে আসেনি। ফলে ইংরেজরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থানে চলে যায়।   

এর ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ হতাশা প্রকাশ করে। ১৯১৬ সালে নবাব বাহাদুর নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাবি প্রতিষ্ঠার জন্য জোর তৎপরতা শুরু করেন। তিনি ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সভায় নওয়াব আলী চৌধুরী ইংরেজ সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাশ করার আহ্বান জানান। এই নিয়ে সেখানে তিনি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তার অব্যাহত প্রচেষ্টায় ১৯২০ সালের ১৮ মার্চ ভারতীয় আইনসভায় নওয়াব আলী চৌধুরীর উত্থাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল অ্যাক্টে পরিণত হয় এবং ২৩ মার্চ তা গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। এই আইনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। 

এরপরেও হিন্দুদের চাপে ইংরেজরা নানান টালবাহানা করতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সব বাধা প্রতিরোধ করেন। এদিকে কোলকাতার দালালরা আন্দোলন ও অসহযোগ অব্যাহত রেখেছেই। অবশেষে আশুতোষের সাথে ইংরেজদের সাথে এই মর্মে সমঝোতা হয় যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে তার ভূমিকা থাকবে এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি বিভাগ সৃষ্টি হবে। এভাবে ঢাবিতে সৃষ্টির শুরুতেই এখানে ব্রাহ্মন্যবাদীদের প্রভাব সৃষ্টি হয়।  

এবার ইংরেজ সরকারের নতুন অজুহাত, তাদের কাছে যথেষ্ট ফান্ড নেই। এরপরেও দমে যাননি নওয়াব আলী চৌধুরি। তিনি তার নিজ জমিদারীর একাংশ বন্ধক রেখে এককালীন ৩৫০০০ পাউন্ড প্রদান করেন। এই টাকা তিনি আর ফেরত পাননি। তিনি খরচ কমানোর জন্য সদ্য বিলুপ্ত হওয়া প্রদেশ 'পূর্ববঙ্গ ও আসামের' জন্য ব্যবহৃত সরকারি ভবনগুলোকে ঢাকা ভার্সিটির সম্পদ হিসেবে প্রস্তাব করেন। ইংরেজরা সেই ভবনগুলো ও ঢাকা কলেজ থেকে কার্জন হল নিয়ে নতুন কোনো ভবন তৈরি করা ছাড়াই ঢাবি প্রতিষ্ঠা করে। 

১৯২১ সালের ১ জুলাই তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ডিগ্রি ক্লাসে অধ্যয়নরত ছাত্রদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। শুধু ছাত্র নয়, শিক্ষক এবং লাইব্রেরির বই ও অন্যান্য উপকরণ এই দুই কলেজ থেকে নিয়ে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় চালু করে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, ইংরেজরা এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় মোটেই আন্তরিক ছিল না। নওয়াব আলী চৌধুরীর নেতৃত্বে মুসলিম নেতাদের চাপে তারা এটি করতে বাধ্য হয়।   

ঢাকা ভার্সিটি প্রতিষ্ঠায় নওয়াব আলী চৌধুরীকে সহায়তা করেন নবাব পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি ছিলেন নবাব খাজা সলিমুল্লাহর ভাগ্নে। নবাব সলিমুল্লাহর উত্তরসূরি নবাব তার ছেলে হাবিবুল্লাহ হলেও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও ঢাবি প্রতিষ্ঠায় সংযুক্ত থাকায় খাজা নাজিমুদ্দিনই হন সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক উত্তরসূরি। সলিমুল্লাহর পরে ঢাকার নেতৃত্ব তার কাছে আসে।   

১৯২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা যাতে ভার্সিটি থেকে বৃত্তি পেতে পারে এজন্যে নওয়াব আলী চৌধুরী নিজের থেকে ১৬০০০ পাউন্ড দিয়ে ফান্ড গঠন করে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। এই নওয়াব আলী চৌধুরীই হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। অথচ তার পরিচিতি নেই। যিনি এতো কষ্ট করলেন, এতো ত্যাগ স্বীকার করলেন তাকে চিনে না ঢাকা ভার্সিটি। ২০০৩ সালে জোট আমলে তার নামে ঢাবির সিনেট ভবনের নাম হয় "সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন"। এখন পর্যন্ত এটাই তাঁর একমাত্র স্বীকৃতি। 

আমি ডেইলি স্টারের বানানো ছবিতে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীকে খুঁজেছি। পাই নি।


২৭ মে, ২০২১

ঢাকায় মোসাদের কার্যক্রম



ঢাকা বিমানবন্দর। নভেম্বর ২০০৩। একটি বিমান ছেড়ে যাবে ব্যাংককের উদ্দেশ্যে। সব কিছু ঠিকঠাক। এর মধ্যে বিমানে ঘটাঘট উঠে পড়লেন সিকিউরিটি অফিসাররা। ইনকিলাব পত্রিকার এক সাংবাদিক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরিকে তল্লাশি করা শুরু করলেন। তারপর নিশ্চিত হয়ে তাকে নিয়ে নেমে গেলেন বিমান থেকে। ইনকিলাব পত্রিকা এদেশের হুজুরবান্ধব পত্রিকা। এই পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরি।

গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে ডিবি তাকে এরেস্ট করে। পরে তার কাছে তল্লাশি করে সে তথ্যের সত্যতা পায়। শোয়েব চৌধুরির কাছে তেলআভিভে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি সেমিনারের আমন্ত্রণপত্র পাওয়া যায়। শোয়েব ব্যাংকক হয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় ইসরাঈলের রাজধানী তেলআভিভে যাওয়ার কথা স্বীকার করে। তাকে নিয়ে বেশ কৌতুহলী হয়ে পড়ে সরকার। তাকে নিয়ে তদন্ত ও ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। তেল আভিভে যে সেমিনারটিতে সে জয়েন করার কথা তা ২০০৩ সালের ডিসেম্বরের ১-৩ তারিখ হয়েছিল।

'এডুকেশন টুয়ার্ডস কালচার অব পিস’ শীর্ষক ঐ কনফারেন্সে উপস্থাপনের জন্য একটি ভাষণের কপি ও সিডি শোয়েবের কাছে পাওয়া যায়। সেখানে সে বাংলাদেশের মসজিদ্গুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। অথচ ইনকিলাবের সাংবাদিক হিসেবে শোয়েব প্রায়ই ইসলাম ও ইসলামী জাতিয়তাবাদের পক্ষে লেখালেখি করতো।

সেসময় তার কাছে একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল পাওয়া যায়, যাতে ইসরাইলের কাছে তিনটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের জন্য ১২ কোটি টাকার চাহিদাপত্র ছিল। এই প্রকাশিতব্য পত্রিকাগুলোর নাম ছিল দৈনিক সোনালী দিন, দৈনিক রূপান্তর, দৈনিক পরিবর্তন। তার প্রজেক্ট প্রোফাইলে তার মন্তব্য পাওয়া যায়, যেখানে সে ইসরাইলী বন্ধুদের মুসলিম প্রধান দেশে মিডিয়া গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানিয়ে বলেন, "কোটি কোটি ডলার খরচ করে যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চেয়ে মিডিয়া সৃষ্টি করুন, এতে ইসরাইল বেশি লাভবান হবে।" শোয়েবের কাছে প্রাপ্ত নথিপত্র ও তার ইমেইল ঘেঁটে জানা যায়, বাংলাদেশ নাকি অচিরেই জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং আফগানিস্তানের মতো তালেবান রাষ্ট্র হবে। কিন্তু তখনো বাংলাদেশে জঙ্গী তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি।

পুলিশ তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে ২৪ জানুয়ারি ২০০৪ তারিখে। কিন্তু তৎকালীন সরকার তাকে আটক করে বেশ বেকায়দায় পড়ে যায়। সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়। শোয়েবকে মুক্ত করতে আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন ও ই ইউ থেকে বেশ চাপ প্রয়োগ করা হয়। মাত্র ১ বছর তাকে আটক রাখা গেছে। ২০০৫ সালের ২৯ এপ্রিল শোয়েবকে কারামুক্ত করতে বাধ্য হয় সরকার। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে বর্তমান মার্কিন সিনেটর ও তখনকার কংগ্রেসম্যান মার্ক স্টিভেন কির্ক ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের ওপর চাপ প্রয়োগ করায় সে জামিনে মুক্ত হয়েছে। সালাউদ্দিন শোয়েবের মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসে ২০০৭ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারি একটি প্রস্তাবও পাস হয়।

কারাগার থেকে বের হওয়ার পর ২০০৬ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাক্ষাৎকারে শোয়েব বলে, //আমি যখন প্রথম সাপ্তাহিক ব্লিতস (weekly blitz) প্রকাশ করি তখন সিদ্ধান্ত নেই ইহুদী খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে বিশেষত ইসরাইলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যে সংঘবদ্ধ প্রচারনা চলছে তার অবসান ঘটাতে। বাংলাদেশে শুক্রবারের খুতবায় মোল্লারা মূলত জিহাদের বাণী প্রচার করে এবং ইহুদী খ্রীস্টানদের হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে। আমি এর অবসান চেয়েছি।//

মোসাদ কানেক্টেড প্রমাণিত হওয়ার পরও থেমে থাকে নি শোয়েবের পথচলা। সে ইসরাঈলভিত্তিক সংগঠন ইফলাক (IFLAC, international forum for literature and culture for peace)এর সদস্য এবং ইসরাইল-ইসলাম বন্ধুত্বের একজন উপদেষ্টা। তার জেলমুক্তির জন্য জোর লবিং চালাতে এগিয়ে আসেন মার্কিন ইহুদী মানবাধিকার কর্মী ড. রিচার্ড বেনকিন। পরবর্তিতে বেনকিন দৈনিক আমাদের সময়ের আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা ও বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে যুক্ত থাকেন। বেনকিন ও সালাউদ্দীন শোয়েব চৌধুরী মিলে ইন্টার*ফেইথ কার্যক্রম চালানো শুরু করে।

এই ইন্টার*ফেইথের বেসিক হলো, সব ধর্মই সঠিক এবং ভালো কথা বলে। অতএব সব ধর্মকেই আমরা মেনে নিবো। অন্য ধর্মের মানুষদের আহ্বান করবো না। সবাই যার যার ধর্ম নিয়ে থাকবো। প্রয়োজনে একে অন্যের ধর্মীয় প্রার্থনা ও উৎসবে যোগদান করবো। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে কয়েকটি ইন্টারফেইথ ডায়ালগের আয়োজন হয়েছে এমনকি খ্রিস্টানদের পোপ বাংলাদেশে আসলে সর্বধর্মীয় প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিলো। তাদের এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে কওমি আলেমদের মধ্য থেকে ফরিদ উদ্দিন মাসুদ এবং জামায়াতঘেঁষা বুদ্ধিজীবী ও সাবেক প্রধান বিচারপতি আব্দুর রউফ।

বেনকিন ও শোয়েবের ইন্টারফেইথ সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন 

২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৮। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল। এসময় শোয়েব অনেক কাজ এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়। কারণ তখন রাষ্ট্রের পরিচালক ফখরুদ্দিন-মঈনরা বিদেশীদের ক্রীয়ানক ছিল। শোয়েব ইসরাঈল পাসপোর্ট নিয়ে টঙ্গি ইজতেমায় যোগদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিয়ে নেয়। একই বছর সে জোট আমলে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদকে প্রকাশ্য রাজনীতিতে নিয়ে আসে। ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে হুজি প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে।

২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রতিবেদনে থেকে পাওয়া যায়, আইডিপি গঠন প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী বলে, আইডিপির আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনীতির জন্ম হলো। আইডিপির সঙ্গে হরকাতুল জিহাদের নাম জড়িত। অনুষ্ঠানে আমার দেশ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরী বলেন, ‘আফগানফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের মূলধারার সদস্যরা আইডিপি গঠন করেছে। পরিচয়সূত্রে আমি এদের সঙ্গে অনেক কাজ একত্রে করেছি। আমরা এই অনুষ্ঠান আরো আগে করতাম, কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্টদের অনুমতি পেতে দেরি হয়েছে। ২০০৩ সালে যার নথিপত্রে তালেবান নিয়ে ভবিষ্যতবাণী পাওয়া গেছে সেই ব্যক্তিই জেএমবি’র পতনের প্রেক্ষাপটে আবার ২০০৮ সালে জঙ্গীদের সংগঠিত করেছে।

এই সঞ্জিব চৌধুরী একজন হিন্দু, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা। অথচ হরকাতুল জিহাদ ও আইডিপি গঠনের নায়ক সে! কী বিচিত্র ঘটনা!

আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০০০ সালের ১২ জানুয়ারি। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট কলকাতা থেকে ঢাকা আসার জন্য প্রস্তুত। এমন সময় ভারতীয় গোয়েন্দারা ১১ জন বিভিন্ন দেশের নাগরিককে আটক করে সন্দেহজনক বিমান ছিনতাইকারী হিসেবে। তারা সবাই গত দু'মাস ধরে ভারতে তাবলীগ জামায়াতের কাজ করছিল। এখন তারা বাংলাদেশে টঙ্গীর ইজতেমাতে জয়েন করতে যাচ্ছে বলে জানায়। ভারতীয়রা যাচাই বাছাই করে তাদের ছেড়ে দেয়।

এদিকে ঘটনা জানাজানি হলে বাংলাদেশ তাদের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা বিভিন্নভাবে বাংলাদেশে অবতরণের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু তাদের কারো কাছেই বাংলাদেশের ভিসা ছিল না। হয়তো ঢাকার কোনো চ্যানেলে তারা বাংলাদেশে ঢুকে যেত। অথবা তাবলীগের মুসল্লি বিবেচনায় তারা ঢাকায় প্রবেশ করতে পারতো। কিন্তু সন্দেহভাজন আটক হওয়াতে বাংলাদেশ তাদের ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করে। ভারতীয় গোয়েন্দারা তাদের পিছু ছাড়ে না। অধিকতর তল্লাশি চালিয়ে তাদের প্রত্যেকের কাছে ইসরাঈলি পাসপোর্ট পাওয়া যায়। এটা আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বেশ জোরালো আলোচনার জন্ম দেয়। পরে ইসরাইলি চাপের মুখে ভারত তাদের নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করে তেল-আভিভ ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়।

বর্তমান সময়ে যাকে নিয়ে বেশ শোরগোল হচ্ছে সে অনন্ত জলিলও তাবলীগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে জড়িত। এদেশের এখন পর্যন্ত যাদেরকে ইসরাইলি দূত হিসেবে আবিষ্কৃত হয়েছে তারা ডান ও জাতীয়তাবাদী ধারার সাথে জড়িত। ২০১৬ সালে বিএনপি নেতা আসলাম এক ইহুদি নেতার সাথে ভারতে বৈঠক করে পত্রিকার শিরোনাম হয়ে এখন জেলে আছে। শোয়েব চৌধুরীও বহুদিন জেলে ছিল। ২০১৪ সালে ১০ বছর আগের সেই মামলায় তার ৭ বছরের জেল হয়েছিল।

এই ডান বলয়ের বাইরে শুধু প্রকাশ্যে একজনকে দেখা যায় যে দায়িত্ব নিয়ে ইসরাঈলের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির কাজ করে যাচ্ছে সে হলো সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তার যুক্তির ভিত্তি হলো ১৯৭১ সালে ইসরাঈল আমাদের সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে। ইসরাঈলের টেকনোলজি ও ইন্টারন্যশনাল কানেকশন ভালো। অতএব আমাদের উচিত ইসরাঈলের সাথে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করা। বিভিন্ন লেখায় সে ইনিয়ে বিনিয়ে এগুলোই বলতে চায়।

আর গোপনে কে কীভাবে কাজ করছে তা জানিনা। যতটুকু প্রকাশ হয়েছে ততটুকুই কেবল জানতে পারি। তবে আমার দেখায় এখন পর্যন্ত মোসাদ-ইসরাঈল বাংলাদেশে কাজ করছে ডান ধারার লোকদের নিয়ে। তারা এদের মাধ্যমেই এদেশে প্রভাব রাখতে চায়। এদেশে জঙ্গী তৈরি তাদেরই এজেন্ডা। শোয়েব চৌধুরির আরেকটা এজেন্ডার কথা মিস হয়ে গেছে। সে এদেশের নাটক সিনেমায় পয়সা ইনভেস্ট করে।

তবে আমি মনে করি সম্প্রতি বাংলাদেশের পাসপোর্ট থেকে Except Israel বাদ দেওয়া আগের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নয়। এটি হলো ট্রাম্পের জেরুজালের শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ। সৌদি ও আমেরিকার চাপে এই কাজ হয়েছে ৮ - ১০ মাস আগে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়ে প্রকাশিত হয়েছে এখন।

সাম্প্রতিক হামাস-ইসরাঈল যুদ্ধে এই শান্তি প্রক্রিয়া নস্যাত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। যারা এবং যেসব রাষ্ট্র ইসরাঈলকে স্বীকৃতি দিয়েছে তারাও সেখান থেকে সরে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

১৯ মে, ২০২১

চলমান হামাস-ইসরাঈল যুদ্ধে বড় প্রাপ্তি তিনটি




আমার বিবেচনায় চলমান হামাস-ইসরাঈল যুদ্ধে বড় প্রাপ্তি তিনটি

১. ট্রাম্পের 'জেরুজালেম শান্তি প্রক্রিয়া' অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া।

ট্রাম্প তার শাসনামলের শুরু থেকেই জেরুজালেম শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করে। এই কাজ করার মানে হলো ইসরাঈলকে সুবিধা দেওয়া ও ফিলিস্তিন তথা হামাসকে নিরস্ত্র করা। এই শান্তি প্রক্রিয়ার ধারাগুলো জনগণের কাছে গোপন রেখে ট্রাম্প চেয়েছিলো আরব রাষ্ট্রপ্রধানদের একমত করতে।

সৌদি, মিশর, জর্ডান, আরব আমিরাত রাজি হয়ে গিয়েছিল। বাকী ছিল সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিনী দলগুলো। সিরিয়ায় ইরান ব্লকের আসাদ জিতে যাওয়ায় সিরিয়ার সমর্থন পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।

লেবাননের সা'দ হারিরিকে সৌদির এমবিএস আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাকে গৃহবন্দী করে তার থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়ার চেষ্টা ও লেবাননে শিয়া-সুন্নি যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ট্রাম্প ও এমবিএস। তবে লেবাননের সব পক্ষ (শিয়া, সুন্নি ও খৃস্টান) তাদের সেই চেষ্টাকে ব্যাহত করে দেয়।

ফিলিস্তিনের মাহমুদ আব্বাসকে রাজি করাতে চাপ দেয় ট্রাম্প ও এমবিএস। তাকেও সা'দের মতো আটকানোর চেষ্টা করে। তবে মাহমুদ আব্বাস দৃঢ়ভাবে তা মুকাবিলা করে। মাহমুদ আব্বাস রাজি না হওয়ায় হামাসের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যায় নি।

এই প্রক্রিয়া দ্রুত আগাচ্ছিল। এর সূত্র ধরে তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার ওপর চাপ আসে যাতে তারা ইসরাঈলকে স্বীকৃতি দেয়। চাপটা পাকিস্তানের ওপর বেশি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সৌদি-পাকিস্তানের সম্পর্কও বারবার বিনষ্ট হচ্ছিল। অর্থনৈতিক দিক থেকে পাকিস্তানের সৌদি নির্ভরতার সুযোগ নিতে চেয়েছিলো এমবিএস। সেটা সফল হতে যাচ্ছিল।

এই প্রক্রিয়া কন্টিনিউ হলে সব মুসলিম রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইসরাঈলকে বৈধতা দিত এবং সেইদিকেই আগাচ্ছিল। চলমান যুদ্ধে এই প্রক্রিয়া শুধু থেমে যাবে না বরং যারা আগে শান্তি প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলো তারা তা উইথড্রো করবে।

কমেন্টে ট্রাম্পের শান্তি প্রক্তিয়ার ধারাগুলো দেওয়া হবে।

২. আয়রন ডোমের জারিজুরি ফাঁস

২০০৬ সাল থেকে ইসরাঈল তাদের আকাশের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আয়রন ডোম নামে এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দাঁড় করায়। ২০১১ সালে তারা এর মাধ্যমে পুরো ইসরাঈলের আকাশ সীমার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইসরাঈলকে সুপার পাওয়ারে পরিণত করে। কোনো মিসাইল ইসরাঈলের অভ্যন্তরে আর আঘাত হানতে পারবে না।

এটি কাজ করতো এমনভাবে, কোনো মিসাইল যখন ইসরাঈলের আকাশের দিকে আসতো তখনই রাডার তা ডিটেক্ট করতো। সেই মিসাইলের গতি ও অবস্থান নির্ণয় করে আয়রন ডোম নিজেই একটা মিসাইল ছুঁড়ে ঐ মিসাইলকে আকাশে বিস্ফোরিত করে দিত।

এই প্রযুক্তির ফলে হামাসের স্বল্প পাল্লার রকেটগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে। হামাস এতে হতাশ না হয়ে তাদের রকেটের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে। কারণ হামাস উপলব্ধি করেছে এই আয়রন ডোম পরিচালনা বাবদ ইসরাঈলকে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হবে।

আগে হামাসের রকেটগুলো লক্ষ্যভেদ হতো না, সমুদ্রে পড়তো, নানানভাবে নষ্ট হতো। কিন্তু এখন হামাসের প্রতিটি রকেটের পেছনে ইসরাঈলের একটি মিসাইল ধ্বংস হয়। হামাসের রকেটের ব্যয় সর্বোচ্চ ৮০০ ডলার। অন্যদিকে ইসরাঈলের প্রতিটি মিসাইলের ব্যয় ৫০০০০ ডলার। এখন দেখা যাচ্ছে হামাসের রকেট যেগুলো আয়রন ডোম ভেদ করে আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে সেগুলো যত ক্ষতি করছে তার চাইতে বেশি ক্ষতি হচ্ছে যেগুলো আয়রন ডোম আটকে দিচ্ছে। হামাসের একটি রকেটেও বৃথা যাচ্ছে না।

হামাসের এই পরীক্ষা চালানো হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে আয়রন ডোম চালাতে সক্ষম হবে না ইসরাঈল। এই প্রসঙ্গে ইসরাঈলী নীতি নির্ধারকেরাও ইতোমধ্যে একই কথা বলেছে।

৩. সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া মুক্তি নেই, এই উপলব্ধি।

ফিলিস্তিনের মুসলিমরা নানান দলে বিভক্ত। এর মধ্যে অনেকেই ভাবতো রাজনৈতিকভাবেই ইসরাঈলের সাথে মীমাংসা হতে পারে। এটা যে হবে না, সেই উপলব্ধি এখন সবার হয়েছে। এবার যুদ্ধে ফিলিস্তিনের সব পক্ষই জয়েন করেছে। ইসরাঈল গাজা ও হামাস নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকার সুবিধা নিয়ে পশ্চিম তীরের গ্রুপগুলো ইসরাঈলের সীমানাবর্তী শহরগুলোতে মহড়া চালাচ্ছে। আর হামাসও তার দূরপাল্লার রকেটগুলো পরীক্ষা চালাচ্ছে।