২৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

একনজরে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহান আলোকময় জীবন



রাসূল (সাঃ)এর জীবনী সংক্ষেপ
মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত। তার জন্ম যেমনিভাবে ছিল বিশ্ববাসীর জন্যে এক রহমত স্বরূপ তেমনিভাবে তার জন্মের সাথে সাথেই কিছু বিস্ময়কর ঘটনা ঘটি ছিল। যার মাধ্যমে বিশ্ববাসী বুঝতে পেরছিল যে এ কোন সাধারণ মানুষ নয়। তিনি অবশ্যই হবেন একজন মহামানব। তাঁর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে বায়তুল্লাহ আক্রমণকারী ইয়ামানের শক্তিশালী বাদশাহ আব্রাহা তার সৈন্যসহ সমূলে ধ্বংস হয়েছিল। মক্কায় তখন মহা দুর্ভিক্ষ চলছিলো, তিনি তাঁর মায়ের গর্ভে আসার সাথেই দুর্ভিক্ষ অবসান হয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া যমযম কূপের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর মা জননী আমেনা বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ তার পেটে অবস্থান নেয়ার সাথেই সারা বিশ্বে আলোক রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছিল, যার সাহায্যে তিনি সুদূর সিরিয়ার রাজ প্রাসাদসমূহ পরিস্কার দেখতে ছিলেন। এমনিভাবে আরো অসংখ্য ঘটনা পৃথিবীতে ঘটতেছিল।

তিনি যখন জন্মগ্রহণ করলেন, মক্কায় তখন ভূ-কম্পনের দ্বারা মূর্তিগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। জ্বিনদের আসমান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অপরদিকে পারস্য সম্রাটের রাজমহলে ভূ-কম্পনের আঘাতে রাজমহলের ১৪ টি স্তম্ভ ধ্বসে পড়েছিলো। এক দিকে শান্তির আগমন অপর দিকে বাতিলের মাথায় আঘাত। তাইতো আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন, 'আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার উপর, ফলে সত্য মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।' ( সূরা: আম্বিয়া-১৮)। নিচে সে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত তুলে ধরছি। 

১. রাসূল (সাঃ)এর বংশ পরিচয়
 
তিনি মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম। হাশেমের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে নবীজীর বংশ হাশেমী বংশ হিসেবে পরিচিত। আর হাশেম ছিলেন কুরাইশ গোত্রের যা আদনান পর্যন্ত পৌঁছেছে। 

২. জন্ম ও শৈশব
 
মুহাম্মদ (সাঃ) ৫৭০ সালে , হস্তী বাহিনী ধ্বংসের বছর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের ৬ মাস পূর্বেই তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব সফররত অবস্থায় মদিনায় ইন্তেকাল করেন । সে সময়ের ঐতিহ্য অনযায়ী সম্ভান্ত আরব পরিবারের সন্তানদেরকে অন্য গোত্রে লালন-পালন করতে দেওয়া হত। সে হিসেবে নবী করীম (সাঃ) বনী সা‘দ গোত্রে লালিত- পালিত হন এবং চার অথবা পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন। আর সেখানেই তাঁর বুক বির্দীণের ঘটনা ঘটে। 
নবী করীম (সাঃ)এর মাতা ও দুধ মাতা গণ : 

  •  স্বীয় মাতা আমেনা বিনতে ওয়াহাব 
  •  হালিমা -তু- সা‘দিয়াহ 
  •  আবূ লাহাবের বাঁদী সুয়াইহাব 

৩. মায়ের মৃত্যু 
নবী করীম (সাঃ)এর মাতা আমেনা মদিনা মুনাওয়ারায় নিজ স্বামী আব্দুল্লাহ এর কবর যিয়ারতের পর ফেরার পথে মক্কা ও মদিনার মাঝে অবসি'ত আবহাওয়া নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। তখন নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। 

৪. দাদা ও চাচার তত্ত্বাবধানে 
মাতা- পিতার মৃত্যুর পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের দায়িত্ব ভর গ্রহণ করেন। তিনি তাকে খুবস্নেহ করতেন। এমনকি নিজের ছেলেদের উপরও তাঁকে প্রাধান্য দিতেন। নিজের আসনে বসাতেন। দাদার মৃত্যুরপূর্ব পর্যন্ততিনি তাঁর তত্ত্বাবধানেই ছিলেন।
দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন। তখন তার বয়স ছিল আট বছর। তিনি স্বীয় চাচাকে বকরী লালন-পালন ও শাম দেশের ব্যবসায়ে সহযোগিতা করতেন। 

৫. খাদীজা (রা) এর সাথে বিবাহ এবং সন্তানাদি
 
পঁচিশ বছর বয়সে খাদীজা (রা) কে বিবাহ করেন। একমাত্র ইবরাহীম ব্যতীত তাঁর সব কয়টি সন্তান খাদীজার (রা) এর গর্ভ থেকেই হয়েছে। কাসেম তাঁর প্রথম সন্তান। এর নামেই তাঁর উপনাম আবুল কাসেম। অতঃপর যয়নব, রূকাইয়া, উম্মে কুলসুম,ফাতেমা ও আব্দুল্লাহর জন্ম হয়।
তাঁর ছেলেরা সকলেই বাল্য বয়সে মারা যান। মেয়েদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে হিযরত করার সুযোগ পান। ফাতেমা (রাঃ) ব্যতীত তাদের সকলেই নবীজীর জীবদ্দশায় মারা যান। তিনি নবীজীর ইন্তেকালের ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করেন। 

৬. নবুওয়্যাত পূর্ব গুণাবলি 
তিনি ছিলেন চিন্তায় সঠিক, সিদ্ধান্তে নির্ভুল, ব্যক্তিত্বে অনন্য, চরিত্রে শ্রেষ্ঠতর, প্রতিবেশী হিসেবে অতি মর্যাদাবান,সহনশীলতায় সুমহান, সত্যবাদিতায় মহত্ত্বর, সচ্চরিত্র, বদান্যতা, পুণ্যকর্মা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও বিশ্বস্ততায় অনুপম আদর্শ। এসব গুণে মুগ্ধ হয়ে তার গোত্র তাঁকে আল-আমীন উপাধিতে ভূষিত করে। 

৭. ওহী নাযিলের সূচনা 
তিনি মক্কায় অবস্থিত হেরা গুহায় ইবাদত করতেন। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন। 
জিবরাইল আ. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে অবতরণ করেন।
أول ما نزل عليه قوله تعالى : اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ ﴿১﴾ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ ﴿২﴾ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ ﴿৩﴾ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ ﴿৪﴾ عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ ﴿৫﴾ (سورة العلق )
সর্ব প্রথম সূরা ‘আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিল হয় : যার অর্থ- পাঠ করূন, আপনার পালন কর্তার নামে,যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করূন, আপনার পালনকৃত মহা দয়ালু।যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা আলাক:১-৫) 

৮. দাওয়াতের আদেশ 
أمر الله تعالى خاتم رسله وأنبيائه صلى الله عليه وسلم أن يدعو الناس إلى الإســلام، قال تعالي : يَاأَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ ﴿১﴾ قُمْ فَأَنْذِرْ ﴿২﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ ﴿৩﴾ . (سورة المدثر) 
আল্লাহ তাআলা সর্বশেষ নবী (সাঃ)কে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচারের আদেশ করেন। এ মর্মে তিনি ইরশাদ করেন, হে চাদরাবৃত ব্যক্তি! ওঠ এবং সতর্ক কর। (সুরা-মুদ্দাসির:১-২) 

৯. গোপনে দাওয়াত 
নবী করীম (সাঃ) স্বীয় প্রতিপালকের আদেশ যথাযথ পালন করেন এবং গোপনে গোপনে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। যাতে করে কুরাইশদের বিরোধিতা প্রকট না হয়। তিনি সর্বপ্রথম আপন পরিবার- পরিজন ও বন্ধুদের ইসলামের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম খাদীজা (রা) তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম আবু বকর সিদ্দীক (রা) ছোটদের মধ্যে আলী ইবনে আবু তালিব (রা) এবং ক্রীতদাসদের মধ্যে যায়েদ ইবনে হারেসা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি খাদিজা (রা) এর ক্রীতদাস ছিলেন। রাসূল (সাঃ) তিন বছর পর্যন্ততার নিকটস্থ লোকদের মাঝে ইসলাম প্রচারে গোপনীয়তা অবলম্বন করেন। তিনি দারূল আরকাম তথা কুরাইশ নেতা আরকাম ইবনে আবু আরকামের বাড়িটি মুসলমানদের সম্মেলনস্থল হিসেবে নির্বাচিত করেন। 

১০. প্রকাশ্যে দাওয়াত 
ثم أمر الله تعالى : النبي صلى اللع عليه وسلم بإعلان الدعوة على الناس قال تعالى : فاصدع بما تؤمر وأعرض عن المشركين. (سورة الحجر)
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা প্রকাশ্যে দ্বীন প্রচারের আদেশ করলেন- ইরশাদ হচ্ছে, অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়েদিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।” (সূরা হিজর : ৯৪)
وأنذر عشيرتك الأقربين. (الشعراء:২১৪) 
“আপনি নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করূন।” (সূরা শু‘আরা : ২১৪)
امتثل النبي صلى الله عليه وسلم لأمر الله، ودعا عشيرته والمقربين له إلى اجتماع عند جبل الصفا. ثم أخبرهم بأنه قد جمعهم ليبلغهم رسالة ربه، بترك عبادة الأصنام وأن يعبدوا الله وحده. فقام من بين الحاضرين عمه أبو لهب غاضبا وقال له : تبالك ؟ لهذا جمعتنا؟ فأنزل الله سبحانه فيه وفي زوجته أم جميل: تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ ﴿১﴾ مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ ﴿২﴾ سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ ﴿৩﴾ وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ ﴿৪﴾ فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِنْ مَسَدٍ ﴿৫﴾ (سورة المسد)
আল্লাহ তাআলার আদেশ পেয়ে নবী মুহাম্মদ (সাঃ)তাঁর নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদেরকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একত্রিত করেন। অতঃপর তাদেরকে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ‘ইবাদত করতে আহ্বান করেন। সমবেত লোকদের মধ্য থেকে তাঁর চাচা আবূ লাহাব বলে উঠল: তোমার ধ্বংস হোক, এ জন্যেই কি আমাদেরকে একত্রিত করেছে? এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামীল সম্পর্কে সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেন, “আবূ রাহাবের দু’হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খেজুরের পাকানো রশি নিয়ে।” (সূরা লাহাব : ১-৫) 

১১. ঠাট্টা-বিদ্রূপ 
মুশরিকরা নবী আকরাম (সাঃ) কে বিভিন্ন উপায়ে উপহাস করত। কখনো কখনো তাকে পাগল ও যাদুকর বলত। আবার কখনো বলত কবি ও গণক। অগান্তুক লোকদেরকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে অথবা কথা শুনতে বাধা দিত। তাঁর চলাচলের রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রাখত এবং সালাতরত অবস্থায় তাঁর উপর ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করত।

১২. নির্যাতন নিপীড়ন 
মুশরিকরা তাদের মুসলিম গোলামদের উপর কঠিন নির্যাতন চালাতো। তাদেরকে হাত-পা বেঁধে ভর দুপুরে উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে দিত এবং ভারী পাথর দ্বারা তাদের বুক চাপা দিত এবং ছড়ি দ্বারা প্রহার করত ও আগুনের সেঁকা দিত। নির্যাতনের এমন কোন পদ্ধতি নেই যা তারা মুসলমানদের উপর প্রয়োগ করেনি। 

১৩. ধৈর্য ও অবিচল 
মুসলমানগণ মুশরিকদের সকল নির্যাতন ও নিপীড়ন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করতেন। কেননা নবী করীম (সাঃ) তাদেরকে সাওয়াব ও জান্নাত লাভের আশায় বিপদে ধৈর্য ধারণ ও অনড় থাকার পরামর্শ দেন। মুশরিকদের নির্যাতন ভোগ করেছেন এমন কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সাহাবী হলেন : বিলাল ইবনে রাবাহ ও আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) প্রমুখ । তাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হয়েছেন ইয়াসির ও সুমাইয়া (রা)। ইসলামের ইতিহাসে এরাই সর্বপ্রথম শহীদ। 

১৪. হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) হিজরত 
রাসূল (সাঃ) কাফেরদের অনবরত নির্যাতনের কারণে সাহাবাগণের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে হাবশাতে হিজরত করার নির্দেশ দেন। হাবশার বাদশা নাজ্জাশী ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু ছিলেন বলে হাবশাকেই হিজরতের জন্যে মনোনীত করা হল। নাজ্জাশী ঈসা (আ) এর অনুসারী ছিলেন। নবুয়্যাতের পঞ্চম বছর প্রথম মুহাজিরদের এ দলে ছিলেন দশ জন পুরূষ ও চার জন মহিলা। তারা কুরাইশদের অজান্তে চুপিসারে হাবশার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।
 
কিছুদিন পর আরো একটি মুহাজির দল তাদের সাথে মিলিত হলেন। পুরূষ, মহিলা, শিশু সহ তাদের মোট সংখ্যাছিল প্রায় একশো জন। বাদশা নাজ্জাশী তাদের সম্মান এবং সুন্দর ব্যবহার করেন পাশাপাশি সেখানে নিরাপদে বসবাস করার অনুমতি দেন। 

১৫. তায়েফ গমন
রাসূল (সাঃ) এর আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিবের মৃত্যুকে কুরাইশরা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল। তার উপর নির্যাতনের মাত্রা পূর্বের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দেয়। এ কঠিন পরিস্থিতিতে সহযোগিতাও আশ্রয় পাওয়ার আশায় তিনি তায়েফ গমন করলেন। কিন্তু সেখানে উপহাস ও দুর্ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। তারা রাসূল (সাঃ) কে পাথর নিক্ষেপ করে মারাত্মক আহত করে। বাধ্য হয়ে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। 

১৬. বিভিন্ন গোত্রের নিকট রাসূলের উপস্থিতি
রাসূল (সাঃ) হজ্বের মৌসুমে মক্কায় আগত বিভিন্ন গোত্রের নিকট দাওয়াত নিয়ে উপস্থিত হন। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং শত্রুদের থেকে আত্মরক্ষা ও দাওয়াতের নিরাপত্তা বিধানে সহযোগিতা কামনা করেন।
তবে কোন গোত্রই এতে সাড়া দিল না। কারণ, কুরাইশরা তাদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং তাদেরকে তার নিকট হতে দূরে রাখার কৌশল অবলম্বন করে। ইতিমধ্যে মদীনার নেতৃস্থানীয় ছয়জন লোক রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং কুরাইশদের ভয়ে গোপনে তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তারা নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেমানুষের সাথে ইসলাম সম্পর্কে এবং রাসূল (সাঃ)এর চরিত্র ও দাওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। এবং মদীনাবাসীদের মাঝে ইসলাম প্রচারের কাজ করেন। ফলে অনেকেই ইসলামগ্রহণ করেন। 

১৭. আকাবার প্রথম বাইয়াত
নবুয়্যাতের দ্বাদশ বছর হজ্জের মৌসুমে বার জন লোক মদীনা হতে বের হয়ে মিনাতে আকাবার প্রথম বাইআতের সময় রাসূল (সাঃ) এর সাথে দেখা করে এবং বাইয়াতে অংশ গ্রহণ করেন। এ বাইয়াতকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল আকাবাতুল উলা’ প্রথম বাইয়াত বলা হয়। মদীনায় ফিরে যাবার সময়রাসূল তাদের সাথে মুস‘আব ইবনে উমায়ের (রা)কে কুরআন তিলাওয়াত এবং দ্বীন শিখানোর জন্য পাঠান। 

১৮. আকাবর দ্বিতীয় বাইয়াত
 
আকাবর প্রথম বাইয়াতের পরবর্তী বছর নবুয়্যাতের তেরোতম বছর হজের মৌসুমে সত্তুর জন পুরূষ, দুই জনমহিলা মক্কার উদ্দেশ্যে হজ পালনের লক্ষ্যে মদীনা হতে রওয়ানা হন এবং কুরাইশদের অগোচরে গোপনে মিনাতে রাসূল (সাঃ) এর সাথে সাক্ষাৎ করেন যাতে করে কুরাইশরা না দেখে। আর তারা সকলে রাসূলের চাচা আব্বাস, আবূ বকর এবং আলী ইবনে আবু তালিবের (রা) উপস্থিতিতে রাসূল (সা)এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন। এ বাইয়াতকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল-আকবাতুস সানীয়াহ’ বলা হয়। এতে তারা জান-মালের বিনিময়ে রাসূল (সা) কে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেন। তারা তাঁকে এ মর্মে আশ্বস-করলেন যে, তিনি যদি তাঁদের দেশে তাঁদের নিরাপত্তায় হিজরত করেন তাহলে তারা স্বাগত জানাবেন। রাসূলে (সা) এর নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে তাদের দেশে হিজরত করাকে স্বাগত জানানো হবে। 

১৯. হিযরত ও মক্কা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত
কুরাইশরা রাসূল (সাঃ)কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু' তারা ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহ তাআলাকে তাকে হেফাযত করেন। রাসূল (সাঃ)স্বীয় ঘর থেকে বের হন এবং আল্লাহ তাআলা কাফেরদের চক্ষু অন্ধ করেদেন যাতে তারা রাসূল (সাঃ) কে দেখতে না পারে। তিনি চলতে চলতে মক্কার বাইরে বন্ধু আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর সাথে মিলিত হন। অতঃপর তারা উভয়ে এক সাথেই পথ চলা আরম্ভ করেন। ‘সওর’ নামক পাহাড়ে পৌঁছে একটি গুহায় তিন দিন পর্যন্ত আত্মগোপন করেন। আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর (রা) তাদের নিকট কুরাইশদের সংবাদ পৌঁছাতেন এবং তার বোন আসমা (রা) খাদ্য ও পানীয় পৌঁছাতেন। তারপর নবী করীম (সাঃ) ও তার সঙ্গী গুহা হতে বের হন এবং ইয়াসরিব (মদীনা) অভিমুখে যাত্রা শুরূ করেন।
২০.ইয়াসরিবে (মদীনা) নতুন অধ্যায়ের সূচনা 
রাসূল (সাঃ) মদীনায় পৌঁছে তাকওয়ার ভিত্তিতে ইসলামের সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে মদীনা শরীফে এ মসজিদটি “মসজিদে কু’বা” নামে পরিচিত। মদীনাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সর্বপ্রথম যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হচ্ছে মসজিদে নববী নির্মাণ এবং মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন। 

২১. ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ
 আবূ সুফিয়ানের কাফেলা
কুরাইশদের একটি ব্যবসায়ী দল সিরিয়া থেকে বিশাল যুদ্ধসামগ্রী কিনে মক্কা প্রত্যাবর্তন করছে মর্মে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)এ ব্যাপারে অবগত হলে তাকে বাধা দিতে চাইলেন। কারণ ইতিপূর্বে মক্কা বাসীরা মুহাজিরদের সম্পদ দখল করে নিয়েছিল। ঐ দলনেতা আবু সুফিয়ান রাসূল (সাঃ) এর সংকল্পের কথা জানতে পেরে এক লোককে কুরাইশদের নিকট পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদদানের জন্য পাঠালেন। সংবাদ পেয়ে কুরাইশরা বাণিজ্যিক কাফেলা রক্ষার্থে দ্রুত বের হয়ে আসল। এদিকে আবূ সুফিয়ান আগেই কাফেলা সহ পলায়ন করতে সক্ষম হয় এবং বেঁচে যায়। 

কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যেতে চাইল কিন্তু কুরাইশ নেতারা বিশেষত আবু জাহেল মুসলমানদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দেয় এবং প্রায় এক হাজার যোদ্ধার একটি সেনাদল মদীনাভিমুখে পাঠায়।
 
 যুদ্ধের অনুমতি
لما ازداد طغيان المشركين على المسلمين، أمر الله رسوله صلى الله عليه وسلم بقتالهم بقوله تعالى: وَقَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ ﴿১৯০﴾ (البقرة : ১৯০)
মুসলমানদের বিরূদ্ধে মুশরিকদের নির্যাতন যখন অসহনীয় পর্যায়ে বেড়ে গেল আল্লাহ তাআলা তখন আপন রাসূলকে তাদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন : যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় তোমরাআল্লাহর পথে তাদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ কর। অবশ্য কারো প্রতি বাড়বাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমা লঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা বাকারাহ : ১৯০)

নবী আকরাম (সাঃ) পরামর্শ করে মুহাজির ও আনসারগণের নিয়ে গঠিত প্রায় তিনশত তের জনের একটি সেনাদল নিয়ে মুশরিকদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে বের হলেন।
হিজরী দ্বিতীয় সনের ১৭ রামাযান বদর নামক স্থানে উভয় দল মুখোমুখি হয় এবং সেখানেই বদর যুদ্ধ সংঘটিতহয়। এ যুদ্ধে মুসলমানরা মহা বিজয় লাভ করেন। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ অনেক গনিমতের সম্পদ লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের মাঝে সেগুলো বণ্টন করে দেন। এ যুদ্ধে মোট সত্তর জন মুশরিক নিহত হয় এবং সত্তর জন বন্দী হয় আর মুসলমানদের শহীদের সংখ্যা মাত্র চৌদ্দজন। 

২২. উহুদ যুদ্ধ 
 কুরাইশদের প্রতিশোধ প্রস্তুতি
বদর যুদ্ধে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় এবং নিজেদের বড় বড় নেতা হারিয়ে দুঃখ ভারাক্রান- হৃদয়ে মক্কায়প্রত্যাবর্তন করার পর তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য মুসলমানদের পক্ষ হতে হুমকির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করে। ফলে তারা পূর্ণ এক বছর যাবৎ সৈন্য ও সম্পদ সঞ্চয় এবং প্রতিবেশী গোত্রীয় মিত্রদেরকে সহায়তা প্রদানের আহ্বানসহ জোর প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজারের অধিক একটি বিশাল সেনাদল গঠন করে।
 উহুদ অভিমুখে যাত্রা 
নবী আকরাম (সাঃ)এর নিকট কুরাইশদের আগমন বার্তা পৌঁছোলে তিনি মুহাজির ও আনসার নিয়ে গঠিত এক হাজার যোদ্ধার একটি সেনাদল নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করার জন্য বের হনএবং উহুদ পাহাড়ের ঢালুতে অবস্থান গ্রহণ করেন। পাহাড় পিছনে রেখে তিনি সৈন্যদের সুসংগঠিত ও বিন্যস্থ করেন। যে কোন পরিসি'তিতে স্থান ত্যাগ না করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন।
 প্রাথমিক বিজয় ও তিরন্দাজদের দায়িত্বে অবহেলা 
ঐ যুদ্ধের শুরুর দিকে মুসলমানদের জয় হল এবং মুশরিকরা পিছু হটল। কিন্তু মুসলিম তীরান্দাজগণ গনিমতের মাল সংগ্রহণ করতে গিয়ে নিজেদের স্থান ত্যাগ করে বসলেন।
 শরিকদের জড়ো হওয়া ও সুযোগ গ্রহণ 
কাফেররা এ সুযোগে তীর নিক্ষেপের স্থানগুলো দখল করে নিল এবং মুসলমানদের পিছন দিক থেকে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। যার কারণে মুসলমানদের কাতার ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এতে অনেক মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। তাদের মধ্যে শহীদগণের সরদার হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা) ছিলেন। এ যুদ্ধে রাসূল (সাঃ)এর মুখমন্ডল এবং দন্তমুবারক মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরী সনের তৃতীয় বছর শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখ রোজ শনিবার। 

২৩. খন্দকের যুদ্ধ
 ইয়াহুদীদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও কুরাইশদের ষড়যন্ত্র 
কুরাইশরা মদীনার মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করে দিতে চাইল। যুদ্ধের প্রকৃত কারণ: মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, তাদের বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হিংসাত্মক আচরণের কারণে যে সব ইয়াহুদীদের রাসূল (সাঃ) মদীনা হতে তাড়িয়ে দেন তারা মক্কায় কুরাইশদের দলভুক্ত হয়। কুরাইশদেরকে মুসলমানদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ করার প্রেরণা জোগায় এবং তাদেরকে জনবল, টাকা-পয়সা ও অস্ত্র-শস্ত্র দিয়েসহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
 ধন সম্পদ একত্রিকরণ এবং বিভিন্ন গোত্রকে উৎসাহ প্রদান
ইয়াহুদীদের পরামর্শ অনুসারে মক্কাবাসী ধন-সম্পদ জোগাড় করতে আরম্ভ করল। কুরাইশরা ও ইয়াহুদীরান তাদের স্বীয় গোত্র ও মিত্রদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানাল। পঞ্চম হিজরীতে আবূ সুফিয়ানের নেতৃত্বে দশহাজারেরও বেশি যোদ্ধা মদীনাভিমুখে রওয়ানা হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করা ওতাদের নিশ্চিহ্ন করা।
 সাহাবীদের সাথে মত বিনিময় ও সালমান (রা)-এর পরিখা খননের পরামর্শ প্রদান 
রাসূল (সাঃ) কুরাইশদের প্রস'তি ও প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর করণীয় নির্ধারণে সহাবাগণের সাথে পরামর্শ করেন। তারা সিদ্ধান্ত করেন মুসলমানগণ মদীনায় অবস্থান করে প্রতিরোধ করবে। মদীনার উত্তর পার্শ্বের সীমান্ত অরক্ষিত থাকায় সালমান ফারসী (রা) মদীনায় দুশমনদের প্রবেশে বাধাগ্রস্থ করার লক্ষ্যে উত্তর পার্শ্বে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। রাসূল (সাঃ) সালমান ফারসী(রা) এর পরামর্শ গ্রহণ করেন।
মুসলমানগণ পরিখা খনন আরম্ভ করেন এবং রাসূল (সাঃ) নিজেই মুসলমানগণের সাথে কাজে অংশগ্রহণ করেন। পনেরো দিনের মধ্যে পরিখা খনন সম্পন্ন হয়। রাসূল (সাঃ) মহিলা ও শিশুদের দুর্গে আশ্রয় গ্রহণের নির্দেশ দেন। এক হাজারেরও বেশি মুসলিম যোদ্ধা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করেন এবং মদীনা প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত হন।
 
 কাফের সেনাদের অবস্থান
মুশরিক সৈন্যরা পরিখার অদূরে মদীনার বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। কেননা তাদের অশ্বগুলো পরিখা অতিক্রম করতে পারেনি। অতঃপর তাদের অশ্বারোহীরা নিহত হলে অন্যরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। এসময় পিছন দিক থেকে মুসলমানদেরকে আক্রমণের লক্ষ্যে বনু কুরাইযার ইয়াহুদীরা তাদের নিরাপত্তাবিধানকারী দুর্গগুলোর ফটক উন্মুক্ত করতে সম্মত হল। নুয়াইম বিন মাসউদ (রা) যার ইসলাম গ্রহণের খবর কুরাইশ ও ইয়াহুদীরা জানত না তাকে রাসূল (সাঃ) তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির অনুমতি দেন। তিনি উক্ত কাজে সফল হন।

 আল্লাহর সৈনিক
এক মাস পর্যন্ত মদীনা অবরুদ্ধ ছিল। প্রচন্ড শীতের গভীর অন্ধকার রাত্রিতে প্রবল বাতাস ও তুফান প্রবাহিত হল। এতে মুশরিকদের তাবু ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সহ যাবতীয় সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়। আর আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন।
আবু সুফিয়ান তার উটে আরোহন করল এবং দৌড়ে পলায়ন করল। অন্যান্য সৈন্যরাও তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করল। এভাবে মুশরিকদের ব্যর্থতা ও রণক্ষেত্র থেকে পলায়নের মাধ্যমে আহযাব যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটল। 
وصدق الله حيث يقول: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا ﴿৯﴾ (الأحزاب)
আল্লাহ তাআলা সত্যিই বলেছেন: “হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়া’মতের কথা স্মরণ কর,যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরূদ্ধে ঝঞ্ঝা বায়ু এবং এমনসৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা কর আল্লাহ তা দেখেন।” (সূরা আহযাব : ৯) 

২৪. হুদাইবিয়ার সন্ধি 
যষ্ঠ হিজরীতে রাসূল (সাঃ) উমরা করার লক্ষ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। এ সফরে তাঁর যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছা ছিল না। চৌদ্দ শত আনসারী ও মুহাজির সাহাবী তাঁর সফরের সাথী হন। যখন তারা হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন সকলে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় অবতরণ করেন। কুরাইশরা এসংবাদ জানতে পেরে শপথ করল যে, তারা নবী করীম (সাঃ)ও তার সাথীদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। 

রাসূল (সাঃ )উসমান (রা) কে কুরাইশদের নিকট এ খবর দিয়ে প্রেরণ করেন যে, তারা যুদ্ধের জন্য মক্কার দিকে রওয়ানা হননি। বরং তারা শুধুমাত্র উমরার উদ্দেশ্যেই মক্কায় প্রবেশ করতে চান। তারপর তারা আলোচনায় বসার জন্য সম্মত হয়।
 
আলোচনা আরম্ভ হলে তা সন্ধির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। এ সন্ধিকেই হুদাইবিয়ার সন্ধি বলা হয়। সিদ্ধান্ত হয় রাসূল (সাঃ) তার উমরা পালনকে এক বছর পিছিয়ে দেবেন এবং দশ বছর যাবত যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। আর যে কোন গোত্র তাদের ইচ্ছানুসারে যে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। এ চুক্তির ফলে খোযাআ’ গোত্র মুসলমানদের সাথে মিলিত হল এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে মিলিত হল। সন্ধি চুক্তিসম্পন্ন হওয়ার পর রাসূল (সাঃ)পশু জবেহ করেন এবং মাথা মুড়িয়ে ফেলেন। মুসলমানগণ তাঁর অনুকরণ করেন। অতঃপর তিনি মুসলমানদেরকে নিয়ে মদীনায় ফেরত আসেন। 

২৫. মক্কা বিজয় 
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী আকরাম (সাঃ) বিভিন্ন গোত্রে তাঁর দাওয়াতী কর্মসূচী অধিক পরিমাণে বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হন। ফলে এক বছরের মাথায় মুসলমানদের সংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পেল। এরই মাঝে কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ বনু বকর মুসলমানদের মিত্র কবীলায়ে খুযা‘আর উপর আক্রমণ করল। এর অর্থ দাঁড়াল করাইশ এবং তার মিত্ররা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করল। 
নবী আকরাম (সাঃ) এ সংবাদ পেয়ে অত্যধিক ক্রুদ্ধ হন এবং মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে দশহাজার যোদ্ধার একটি বিশাল সেনাদল গঠন করেন।
তখন ছিল হিজরী অষ্টম বর্ষের রমাযান মাস। এদিকে কুরাইশরা নবী আকরাম (সাঃ) এর মক্কাভিমুখে অভিযানের সংবাদ পেয়ে তাদের নেতা ও মুখপাত্র আবু সুফিয়ানকে ক্ষমা প্রার্থনা, সন্ধি চুক্তি বলবৎ এবং চুক্তির মেয়াদ আরো বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে নবী আকরাম (সাঃ) এর নিকট প্রেরণ করেন। নবী করীম (সাঃ) তাদের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দিলেন। কেননা তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ ভিন্ন বাঁচার আর কোন উপায় না দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর সেনাদল (মক্কাভিমুখে) রওয়ানা হয়ে মক্কার কাছাকাছি আসলে মক্কাবাসী বিশাল দল দেখে আত্মসমর্পণ করে। আর নবী আকর (সাঃ)মুসলমানগণকে সঙ্গে নিয়ে বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। 
(وَقُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوقًا ﴿৮১﴾ سورة الإسراء : ৮১) 

নবী করীম (সাঃ) বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করেন এবং নিজ হাতের ছড়ি দ্বারা কা‘বার আশেপাশে রাখা সকল প্রতিমা ভেঙে চুরমার করে দেন। আর স্বীয় রবের শেখানো আয়াত পাঠ করতে থাকেন,যার অর্থ :
“বল: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” (সূরা ইসরা : ৮১) 
অতঃপর নবী আকরাম (সাঃ) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ঘোষণা করেন মক্কাপবিত্র ও নিরাপদ। আল্লাহ তাআলা শুধুমাত্র তাঁর নবীর খাতিরেই কিঞ্চিৎ সময়ের জন্যে (যুদ্ধ) হালাল করেছেন।তাঁরপর আর কারো জন্যে কখনো হালাল করা হবে না।

قوله تعالى :
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ ﴿১﴾ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا ﴿২﴾ فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا ﴿৩﴾ (سورة النصر )

এরপর সমবেত মক্কাবাসীর প্রতি লক্ষ্য করে বললেন: আমি তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করব বলে তোমাদের ধারণা? তারা বলল: সহানুভূতিশীল, উদাহরণ ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ। আপনি মহৎ মহানুভবের ভ্রাতুষ্পুত্র। নবী করীম (সাঃ) তাদের সকলকে ক্ষমা করে দিয়ে বললেন : তোমরা সকলেই মুক্ত। এরপর মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হতে লাগল। আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করলেন: “যখন আল্লাহর সাহায্যও বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে আল্লাহর দ্বীনে দলে দলে প্রবেশ করতে দেখবেন।” (সূরা নাসর : ১-৩) 

২৬. বিদায় হজ্জ
দশম হিজরী সনে নবী (সাঃ) মুসলমানদেরকে তাঁর সাথে হজব্রত পালন ও হজের আহকাম শিক্ষা গ্রহণ করতে মক্কা যাবার আহ্বান জানা। 
قول الله تعالى : الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا (سورة المائدة : ৩) 
তাঁর আহ্বানে এক লক্ষের মত লোক সাড়া দিল। তাঁরা যুলকা’দাহ্ মাসে পঁচিশ তারিখ তাঁর সাথে মক্কা পানে বের হন। বাইতুল্লাহতে পৌঁছে প্রথমে তওয়াফ করেন। অতঃপর যিলহজ্জ মাসের আট তারিখ মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানাহন। এরপর নয় তারিখ জাবালে আরাফাহ অভিমুখে যাত্রা করেন। রাসূল (সাঃ) সেথায় অবস্থান করেন এবং মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক অমর ভাষণ দান করে তাদেরকে ইসলামী বিধি-বিধান ও হজের আহকাম শিক্ষা দেন এবং আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী তিলাওয়াত করে শুনান- আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নিয়াআমত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

২৭. রাসুল (সা) এর জীবনে যুদ্ধ
রাসূল (সঃ) স্বীয় জীবনে সর্বোমোট তেইশটি জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। এ সকল জিহাদকে 'গাযওয়া' বলা হয়। তন্মধ্যে মোট নয়টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। যথা- (১) বদরের যুদ্ধ (২)উহুদের যুদ্ধ, (৩)আহযাবের যুদ্ধ (৪) বনী কুরাইযা যুদ্ধ (৫) মুত্তালিক যুদ্ধ (৬) খাইবার যুদ্ধ (৭) ফাতহে মক্কা যুদ্ধ (৮) হুনাইনের যুদ্ধ এবং (৯) তায়িফের যুদ্ধ। আর রাসূল (সাঃ) নিজে সশরীরে অংশগ্রহণ না করে অপর কাউকে সিপাহসালার নিযুক্ত করে সাহাবায়ে কেরামকে যে জিহাদ অভিযানে প্রেরণ করেছেন,তাকে 'সারিয়্যা' বলে। এ ধরনের জিহাদের সংখ্যা ৪৩টি।


২৮. আল্লাহর সান্নিধ্যে 
বিদায় হজ্জ পরবর্তী বছর নবী আকরাম স. জ্বরাক্রান্ত হয়ে অসুস্থ' হয়ে পড়েন এবং প্রিয় সহধর্মিণী আশেয়া (রা) এর ঘরে শয্যা গ্রহণ করেন। রাসূল (সঃ) ৬৩ বছর বয়সে ১১ হিজরীর ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার দুপুরের পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিয়ে ইহকাল ত্যাগ করে পরপারে গমন করেন । অতঃপর খলীফা নির্বাচনের কাজ সমাধা করে ১৪ই রবিউল আউয়াল রাতে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর গৃহে (রওযা মুবারকে ) রাসুল্ (সাঃ) কে সমাহিত করা হয়।

قوله تعالى: وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ ﴿১৪৪﴾ (سورة آل عمران : ১৪৪)

রাসূল (সাঃ) এর ইন্তেকালে মুসলমানগণ একবারেই নিরাশ ও হতাশ হয়ে যান। এ পরিস্থিতিতে আবুবকর (রা) ভাষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন : যাঁরা মুহাম্মাদের উপাসনা করত তারা জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ(সাঃ) আজ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করে, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা চিরঞ্জীব, কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না। এরপর নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন : “আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ কিছুই নন। তার পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরন করবে? বস্তুত: কেউ যদি পশ্চাদপসরন করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবেনা। আর যারা কৃতজ্ঞ আল্লাহ তাদের সাওয়াব দান করবেন।” 
(সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)

#সংগৃহীত 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন