ইসলামিক প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইসলামিক প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

৬ সেপ, ২০২৫

২৫ টি পয়েন্টে মুহাম্মদ সা.-এর জীবনী

 


১. রাসূল সা.-এর জন্ম ও শৈশব
তাঁর নাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম। হাশেমের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে নবীজীর বংশ হাশেমি বংশ হিসেবে পরিচিত। মুহাম্মদ সা. এর জন্ম ৫৭০ সালে, হস্তী বাহিনী ধ্বংসের বছর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের ৬ মাস পূর্বেই তার পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব সফররত অবস্থায় মদিনায় ইন্তেকাল করেন । সে সময়ের ঐতিহ্য অনযায়ী সম্ভান্ত আরব পরিবারের সন্তানদেরকে অন্য গোত্রে লালন-পালন করতে দেওয়া হত। সে হিসেবে নবী করীম সা. বনী সা‘দ গোত্রে লালিত- পালিত হন এবং চার অথবা পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেন।

২. জন্মের সময় কিছু অলৌকিক ঘটনা 
তাঁর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে বায়তুল্লাহ আক্রমণকারী ইয়ামানের শক্তিশালী বাদশাহ আবরাহা তার সৈন্যসহ সমূলে ধ্বংস হয়েছিল। মক্কায় তখন মহা দুর্ভিক্ষ চলছিলো, তিনি তাঁর মায়ের গর্ভে আসার সাথেই দুর্ভিক্ষ অবসান হয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া যমযম কূপের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর মা জননী আমেনা বর্ণনা করেন, মুহাম্মদ তার পেটে অবস্থান নেয়ার সাথেই সারা বিশ্বে আলোক রশ্মি ছড়িয়ে পড়েছিল, যার সাহায্যে তিনি সুদূর সিরিয়ার রাজ প্রাসাদসমূহ পরিস্কার দেখতে ছিলেন। এমনিভাবে আরো অসংখ্য ঘটনা পৃথিবীতে ঘটতেছিল। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করলেন, মক্কায় তখন ভূ-কম্পনের দ্বারা মূর্তিগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। জ্বিনদের আসমান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। অপরদিকে পারস্য সম্রাটের রাজমহলে ভূ-কম্পনের আঘাতে রাজমহলের ১৪ টি স্তম্ভ ধ্বসে পড়েছিলো।

৩. বক্ষ বিদীর্ণ হওয়া 
রাসূল সা.-এর যখন চার কি পাঁচ বছর তখন তাঁর কাছে জিবরাঈল আ. এলেন, তখন তিনি শিশুদের সাথে খেলছিলেন। তিনি তাঁকে ধরে শোয়ালেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর হৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ থেকে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন এ অংশটি শয়তানের। এরপর হৎপিন্ডটিকে একটি স্বর্ণের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্হানে পূনঃস্থাপন করলেন। তখন তাঁর খেলার সাথী শিশুরা দৌড়ে তাঁর দুধমায়ের কাছে গেল এবং বলল, "মুহাম্মাদকে হত্যা করা হয়েছে"। কথাটি শুনে সবাই সেদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল তিনি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন! আনাস রা. বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বক্ষে সে সেলাই-এর চিহ্ন দেখেছি"। এটি ছিলো তাঁর প্রথম বক্ষ বিদীর্ণ হওয়ার ঘটনা।

গবেষকদের মতে, মোট চার বার রাসূল সা. এর বক্ষ বিদারণ হয়।
ক। হালিমার গৃহে অবস্থান কালে চার বছর বয়সে।
খ। ১০ বছর বয়সে।
গ। হেরা পর্বতের গুহায় ১ম ওহী নাজিলের সময়
ঘ। মিরাজের রাতে।

৪. মায়ের মৃত্যু ও দাদা-চাচার তত্ত্বাবধান 
নবী করীম সা.-এর মা আমেনা মদিনা মুনাওয়ারায় নিজ স্বামী আব্দুল্লাহ এর কবর যিয়ারতের পর ফেরার পথে মক্কা ও মদিনার মাঝে অবসি'ত আবহাওয়া নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। তখন নবী মুহাম্মদ সা. এর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। মাতা-পিতার মৃত্যুর পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন পালনের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। দাদার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তাঁর তত্ত্বাবধানেই ছিলেন। দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তাঁর দায়িত্ব নেন। তখন তার বয়স ছিল আট বছর। তিনি চাচাকে বকরি লালন-পালন ও শাম দেশের ব্যবসায়ে সহযোগিতা করতেন।

৫. বিয়ে এবং সন্তানাদি 
পঁচিশ বছর বয়সে খাদীজা রা.-কে বিবাহ করেন। একমাত্র ইবরাহীম ব্যতীত তাঁর সব কয়টি সন্তান খাদীজার রা. এর গর্ভ থেকেই হয়েছে। কাসেম তাঁর প্রথম সন্তান। এর নামেই তাঁর উপনাম আবুল কাসেম। অতঃপর যয়নব, রূকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতেমা ও আব্দুল্লাহর জন্ম হয়। তাঁর ছেলেরা সকলেই বাল্য বয়সে মারা যান। মেয়েদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে হিযরত করার সুযোগ পান। ফাতেমা রা. ব্যতীত তাদের সকলেই নবীজীর জীবদ্দশায় মারা যান। তিনি নবীজীর ইন্তেকালের ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করেন। খাদিজা রা. কে ছাড়াও নবীজি আরো দশজনকে বিবাহ করেন। তাঁরা হলেন, সওদা বিনতে যাম‘আহ, আয়েশা বিনতে আবুবকর, হাফসাহ বিনতে উমার, জয়নব বিনতে খুযায়মা, উম্মে সালামাহ, জয়নব বিনতে জাহশ, জুওয়াইরিয়া বিনতুল হারেছ, উম্মে হাবীবাহ রামলাহ বিনতে আবু সুফিয়ান, সাফিয়া বিনতে হুয়াই বিন আখত্বাব, মায়মুনা বিনতুল হারেছ।

৬. ওহী নাযিলের সূচনা 
তিনি মক্কায় অবস্থিত হেরা গুহায় ইবাদত করতেন। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন। জিবরাইল আ. আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে অবতরণ করেন। সর্ব প্রথম সূরা ‘আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাযিল হয় : যার অর্থ- পাঠ করূন, আপনার পালন কর্তার নামে,যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করূন, আপনার পালনকৃত মহা দয়ালু।যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। (সূরা আলাক:১-৫) ওহী নাজিলের আগেও তিনি ছিলেন চিন্তায় সঠিক, সিদ্ধান্তে নির্ভুল, ব্যক্তিত্বে অনন্য, চরিত্রে শ্রেষ্ঠতর, প্রতিবেশী হিসেবে অতি মর্যাদাবান,সহনশীলতায় সুমহান, সত্যবাদিতায় মহত্ত্বর, সচ্চরিত্র, বদান্যতা, পুণ্যকর্মা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও বিশ্বস্ততায় অনুপম আদর্শ। এসব গুণে মুগ্ধ হয়ে তার গোত্র তাঁকে আল-আমিন উপাধিতে ভূষিত করে।

৭. গোপন দাওয়াত 
আল্লাহ তাআলা রাসূল সা.-কে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচারের আদেশ করেন। এ মর্মে তিনি ইরশাদ করেন, হে চাদরাবৃত ব্যক্তি! ওঠ এবং সতর্ক কর। (সুরা-মুদ্দাসির:১-২)। নবী করীম (সাঃ) স্বীয় প্রতিপালকের আদেশ যথাযথ পালন করেন এবং গোপনে গোপনে মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। যাতে করে কুরাইশদের বিরোধিতা প্রকট না হয়। তিনি সর্বপ্রথম আপন পরিবার- পরিজন ও বন্ধুদের ইসলামের দাওয়াত দেন। সর্বপ্রথম খাদীজা রা. তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম আবু বকর সিদ্দীক রা., ছোটদের মধ্যে আলী ইবনে আবু তালিব রা. এবং ক্রীতদাসদের মধ্যে যায়েদ ইবনে হারেসা রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি খাদিজা রা.-এর ক্রীতদাস ছিলেন। রাসূল সা. তিন বছর পর্যন্ত নিকটস্থ লোকদের মাঝে ইসলাম প্রচারে গোপনীয়তা অবলম্বন করেন। তিনি দারূল আরকাম তথা কুরাইশ নেতা আরকাম ইবনে আবু আরকামের বাড়িটি মুসলমানদের সম্মেলনস্থল হিসেবে নির্বাচিত করেন।

৮. প্রকাশ্যে দাওয়াত 
অতঃপর আল্লাহ তায়ালা প্রকাশ্যে দ্বীন প্রচারের আদেশ করলেন- ইরশাদ হচ্ছে, অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়েদিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।” (সূরা হিজর : ৯৪), “আপনি নিকটাত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন।” (সূরা শু‘আরা : ২১৪)। আল্লাহ তাআলার আদেশ পেয়ে নবী মুহাম্মদ সা. তাঁর নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদেরকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একত্রিত করেন। অতঃপর তাদেরকে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ‘ইবাদত করতে আহ্বান করেন। সমবেত লোকদের মধ্য থেকে তাঁর চাচা আবু লাহাব বলে উঠলো, তোমার ধ্বংস হোক, এ জন্যেই কি আমাদেরকে একত্রিত করেছে? এরপর আবু লাহাব ও তার পরিবার রাসূল সা.-এর উপর নির্যাতনের পূর্ন মাত্রা প্রয়োগ করে। এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামীল সম্পর্কে সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেন, “আবু লাহাবের দু’হাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সহসাই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খেজুরের পাকানো রশি নিয়ে।” (সূরা লাহাব : ১-৫)

৯. ঠাট্টা-বিদ্রূপ, অত্যাচার ও নির্যাতন 
মক্কার মুশরিকরা রাসূল সা.-কে বিভিন্ন উপায়ে উপহাস করত। কখনো কখনো তাকে পাগল ও যাদুকর বলত। আবার কখনো বলত কবি ও গণক। আগন্তুক লোকদেরকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে অথবা কথা শুনতে বাধা দিত। তাঁর চলাচলের রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রাখত এবং সালাতরত অবস্থায় তাঁর উপর ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করত। মুশরিকরা তাদের মুসলিম গোলামদের উপর কঠিন নির্যাতন চালাতো। তাদেরকে হাত-পা বেঁধে ভর দুপুরে উত্তপ্ত বালুতে শুইয়ে দিত এবং ভারী পাথর দ্বারা তাদের বুক চাপা দিত এবং ছড়ি দ্বারা প্রহার করত ও আগুনের সেঁকা দিত। নির্যাতনের এমন কোন পদ্ধতি নেই যা তারা মুসলমানদের উপর প্রয়োগ করেনি। মুসলমানগণ মুশরিকদের সকল নির্যাতন ও নিপীড়ন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করতেন। কেননা নবী করীম সা. তাদেরকে সাওয়াব ও জান্নাত লাভের আশায় বিপদে ধৈর্য ধারণ ও অনড় থাকার পরামর্শ দেন। মুশরিকদের নির্যাতন ভোগ করেছেন এমন কয়েকজন উল্লেখযোগ্য সাহাবী হলেন, বিলাল ইবনে রাবাহ ও আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. প্রমূখ । তাদের নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হয়েছেন ইয়াসির ও সুমাইয়া রা.। ইসলামের ইতিহাসে এরাই সর্বপ্রথম শহীদ। আবু জাহেল তাদের খুন করে।

১০. হাবশায় (আবিসিনিয়ায়) হিজরত 
রাসূল সা. কাফেরদের অনবরত নির্যাতনের কারণে সাহাবাগণের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে হাবশাতে হিজরত করার নির্দেশ দেন। হাবশার বাদশা নাজ্জাশী ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু ছিলেন বলে হাবশাকেই হিজরতের জন্যে মনোনীত করা হল। নাজ্জাশী ঈসা আ.-এর অনুসারী ছিলেন। নবুয়্যাতের পঞ্চম বছর প্রথম মুহাজিরদের এ দলে ছিলেন দশ জন পুরূষ ও চার জন মহিলা। তারা কুরাইশদের অজান্তে চুপিসারে হাবশার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কিছুদিন পর আরো একটি মুহাজির দল তাদের সাথে মিলিত হলেন। পুরুষ, মহিলা, শিশু সহ তাদের মোট সংখ্যাছিল প্রায় একশোজন। বাদশা নাজ্জাশী তাদের সম্মান এবং সুন্দর ব্যবহার করেন পাশাপাশি সেখানে নিরাপদে বসবাস করার অনুমতি দেন।

১১. শিয়াবে আবু তালিবে আটক
মুশরিকরা ভাবলো, বনু হাশিমের সহযোগিতাই মুহাম্মাদ সা. এর শক্তির উৎস। তাই বনু হাশিমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সকলে মিলে বনু হাশিমকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। বয়কট চুক্তি অনুযায়ী সবাই বনু হাশিমের সাথে মেলামেশা বন্ধ করে দেয়। তাদের কিছু কেনা ও তাদের নিকট কিছু বেচা বন্ধ হয়ে যায়। খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। বলা হলো, হত্যার জন্য মুহাম্মাদকে তাদের হাতে তুলে না দেয়া পর্যন্ত এই বয়কট চলতে থাকবে।

আবু তালিব বানু হাশিমের লোকদেরকে নিয়ে শিয়াবে আবু তালিব নামক গিরি খাদে আশ্রয় নেন। আবু লাহাব ছাড়া বানু হাশিমের মুসলিম-অমুসলিম সকল সদস্যই মুহাম্মাদ সা. এর সঙ্গী হন। আটক অবস্থায় তাঁদেরকে থাকতে হয় তিন বছর। এই তিন বছরে তাঁদেরেক দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে। খাদ্যাভাবে অনেক সময় গাছের পাতা ও ছাল খেতে হয়েছে। শুকনো চামড়া চিবিয়ে চিবিয়ে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণের চেষ্টা করতে হয়েছে। পানির অভাবে অবর্ণনীয় কষ্ট পেতে হয়েছে।

তিন বছর পর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই বন্দীদশা থেকে তাঁদের মুক্তির পথ করে দেন। বনু হাশিম খান্দানের এই নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট দেখে একদল যুবকের মন বিগলিত হয়। তারা এই অমানুষিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠে। তাদের মধ্যে ছিলো মুতইম ইবনু আদি, আদি ইবনু কাইস, যামআহ ইবনুল আসওয়াদ, আবুল বুখতারী, জুহাইর এবং হিশাম ইবনু আমর। তারা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে আবু জাহালের নিষেধ অমান্য করে বানু হাশিমকে মুক্ত করে আনে। এটা ছিলো নবুয়াতের নবম সনের ঘটনা।

১২. তায়েফ গমন
রাসূল সা.-এর আশ্রয়দাতা চাচা আবু তালিবের মৃত্যুকে কুরাইশরা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল। তার উপর নির্যাতনের মাত্রা পূর্বের চেয়ে অনেক বাড়িয়ে দেয়। এ কঠিন পরিস্থিতিতে সহযোগিতা ও আশ্রয় পাওয়ার আশায় তিনি তায়েফ গমন করলেন। কিন্তু সেখানে উপহাস ও দুর্ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। তারা রাসূল সা.-কে পাথর নিক্ষেপ করে মারাত্মকভাবে আহত করে। বাধ্য হয়ে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন।

১৩. বিভিন্ন গোত্রের নিকট রাসূল সা.-এর দাওয়াত
রাসূল সা. হজ্বের মৌসুমে মক্কায় আগত বিভিন্ন গোত্রের নিকট দাওয়াত নিয়ে উপস্থিত হন। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং শত্রুদের থেকে আত্মরক্ষা ও দাওয়াতের নিরাপত্তা বিধানে সহযোগিতা কামনা করেন। তবে কোন গোত্রই এতে সাড়া দিল না। কারণ, কুরাইশরা তাদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং তাদেরকে তার নিকট হতে দূরে রাখার কৌশল অবলম্বন করে। ইতিমধ্যে মদিনার নেতৃস্থানীয় ছয়জন লোক রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং কুরাইশদের ভয়ে গোপনে তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তারা নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করে মানুষের সাথে ইসলাম সম্পর্কে এবং রাসূল সা.-এর চরিত্র ও দাওয়াতের সত্যতা সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং মদীনাবাসীদের মাঝে ইসলাম প্রচারের কাজ করেন। ফলে মদিনার অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

১৪. মিরাজের ঘটনা
নবুয়্যাতের একাদশ বছরে মুহাম্মদ সা. প্রথমে কাবা শরিফ থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসায় গমন করেন এবং সেখানে তিনি নবীদের জামায়াতে ইমামতি করেন। অতঃপর তিনি বোরাক নামক বিশেষ বাহনে আসীন হয়ে ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন। ঊর্ধ্বাকাশে সিদরাতুল মুনতাহায় তিনি আল্লাহ'র সাক্ষাৎ লাভ করেন। এই সফরে ফেরেশতা জিবরাইল তার সফরসঙ্গী ছিলেন। কুরআনের সুরা বনি ইসরাঈল এর প্রথম আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, "পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

১৫. আকাবার শপথ
নবুয়্যাতের দ্বাদশ বছর হজ্জের মৌসুমে বারো জন লোক মদীনা হতে বের হয়ে মিনাতে আকাবার প্রথম বাইআতের সময় রাসূল সা. এর সাথে দেখা করে এবং বাইয়াতে অংশ গ্রহণ করেন। এ বাইয়াতকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল আকাবাতুল উলা’ প্রথম বাইয়াত বলা হয়। মদীনায় ফিরে যাবার সময় রাসূল সা. তাদের সাথে মুস‘আব ইবনে উমায়ের রা.-কে কুরআন তিলাওয়াত এবং দ্বীন শিখানোর জন্য পাঠান।

আকাবার প্রথম বাইয়াতের পরবর্তী বছর নবুয়্যাতের ত্রয়োদশ বছর হজের মৌসুমে সত্তর জন পুরুষ, দুই জন মহিলা মক্কার উদ্দেশ্যে হজ্জ পালনের লক্ষ্যে মদীনা হতে রওয়ানা হন এবং কুরাইশদের অগোচরে গোপনে মিনাতে রাসূল সা.-এর সাথে সাক্ষাত করেন। আর তারা সকলে রাসূলের চাচা আব্বাস, আবু বকর এবং আলী ইবনে আবু তালিবের উপস্থিতিতে রাসূল সা.-এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেন। এ বাইয়াতকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আল-আকবাতুস সানীয়াহ’ বলা হয়। এতে তারা জান-মালের বিনিময়ে রাসূল সা.-কে রক্ষা করার অঙ্গীকার করেন। তারা তাঁকে এ মর্মে আশ্বস্ত করলেন যে, তিনি যদি তাদের দেশে তাদের নিরাপত্তায় হিজরত করেন তাহলে তারা স্বাগত জানাবেন।

১৬. হিজরত
কুরাইশরা রাসূল সা.-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহ তাআলাকে তাঁকে হেফাযত করেন। রাসূল সা. নিজের ঘর থেকে বের হন এবং আল্লাহ তাআলা কাফেরদের চোখ অন্ধ করে দেন যাতে তারা রাসূল সা.-কে দেখতে না পারে। তিনি চলতে চলতে মক্কার বাইরে বন্ধু আবু বকর সিদ্দীক রা. এর সাথে মিলিত হন। অতঃপর তারা উভয়ে এক সাথেই পথ চলা আরম্ভ করেন। ‘সওর’ নামক পাহাড়ে পৌঁছে একটি গুহায় তিন দিন পর্যন্ত আত্মগোপন করেন। আব্দুল্লাহ বিন আবু বকর রা. তাদের নিকট কুরাইশদের সংবাদ পৌঁছাতেন এবং তার বোন আসমা রা. খাদ্য ও পানীয় পৌঁছাতেন। তারপর নবী করীম সা. ও তার সঙ্গী গুহা হতে বের হন এবং ইয়াসরিব (মদিনা) অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন।

১৭. মদীনায় নতুন রাষ্ট্রের সূচনা 
রাসূল সা. মদীনায় পৌঁছে তাকওয়ার ভিত্তিতে ইসলামের সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে মদীনা শরীফে এ মসজিদটি “মসজিদে কু’বা” নামে পরিচিত। মদীনাতে রাসূলুল্লাহ সা. সর্বপ্রথম যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হচ্ছে মসজিদে নববী নির্মাণ এবং মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন। এরপর তিনি মদিনার অপরাপর ইহুদী গোষ্ঠীদের সাথে মদিনা সনদের মাধ্যমে সার্বভৌম মদিনা রাষ্ট্র গঠন করেন। এটাই প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র। এখানে রাসূল সা. আল্লাহর আইন ও ইসলামের রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছেন।

১৮. বদর যুদ্ধ
কুরাইশদের একটি ব্যবসায়ী দল সিরিয়া থেকে বিশাল যুদ্ধসামগ্রী কিনে মক্কা প্রত্যাবর্তন করছে মর্মে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সা. এ ব্যাপারে অবগত হলে সেই কাফেলাকে বাধা দিতে চাইলেন। কারণ ইতিপূর্বে মক্কাবাসীরা মুহাজিরদের সম্পদ দখল করে নিয়েছিল। ঐ দলনেতা আবু সুফিয়ান রাসূল সা. এর সংকল্পের কথা জানতে পেরে এক লোককে কুরাইশদের নিকট পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদদানের জন্য পাঠালেন। সংবাদ পেয়ে কুরাইশরা বাণিজ্যিক কাফেলা রক্ষার্থে দ্রুত বের হয়ে আসলো। এদিকে আবু সুফিয়ান আগেই কাফেলাসহ পলায়ন করতে সক্ষম হয় এবং বেঁচে যায়। কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যেতে চাইলো কিন্তু কুরাইশ নেতারা বিশেষত আবু জাহেল মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দেয় এবং প্রায় এক হাজার যোদ্ধার একটি সেনাদল মদিনাভিমুখে পাঠায়। নবী সা. পরামর্শ করে মুহাজির ও আনসারগণের নিয়ে গঠিত প্রায় ৩১৩ জনের একটি সেনাদল নিয়ে মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার লক্ষ্যে বের হলেন। হিজরী দ্বিতীয় সনের ১৭ রামাদান বদর নামক স্থানে উভয় দল মুখোমুখি হয় এবং সেখানেই বদর যুদ্ধ সংঘটিতহয়। এ যুদ্ধে মুসলমানরা মহা বিজয় লাভ করেন। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ অনেক গনিমতের সম্পদ লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ সা. তাদের মাঝে সেগুলো বণ্টন করে দেন। এ যুদ্ধে মোট সত্তর জন মুশরিক নিহত হয় এবং সত্তর জন বন্দী হয় আর মুসলমানদের শহীদের সংখ্যা মাত্র চৌদ্দজন।

১৯. উহুদ যুদ্ধ 
বদর যুদ্ধে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় এবং নিজেদের বড় বড় নেতা হারিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করার পর তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য মুসলমানদের পক্ষ হতে হুমকির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করে। ফলে তারা পূর্ণ এক বছর যাবৎ সৈন্য ও সম্পদ সঞ্চয় এবং প্রতিবেশী গোত্রীয় মিত্রদেরকে সহায়তা প্রদানের আহ্বানসহ জোর প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজারের অধিক একটি বিশাল সেনাদল গঠন করে।

রাসূল সা.-এর নিকট কুরাইশদের আগমন বার্তা পৌঁছোলে তিনি মুহাজির ও আনসার নিয়ে গঠিত এক হাজার যোদ্ধার একটি সেনাদল নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করার জন্য বের হন এবং উহুদ পাহাড়ের ঢালুতে অবস্থান গ্রহণ করেন। পাহাড় পিছনে রেখে তিনি সৈন্যদের সুসংগঠিত ও বিন্যস্থ করেন। যে কোনো পরিস্থিতিতে স্থান ত্যাগ না করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন। যুদ্ধের শুরুর দিকে মুসলমানদের জয় হলো এবং মুশরিকরা পিছু হটলো। কিন্তু মুসলিম তীরান্দাজগণ গনিমতের মাল সংগ্রহণ করতে গিয়ে নিজেদের স্থান ত্যাগ করে বসলেন। মুশরিকরা এ সুযোগে তীর নিক্ষেপের স্থানগুলো দখল করে নিলো এবং মুসলমানদের পিছন দিক থেকে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। যার কারণে মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এতে অনেক মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। তাদের মধ্যে শহীদগণের সরদার হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিব রা. ছিলেন। এ যুদ্ধে রাসূল সা.-এর মুখমন্ডল এবং দাঁত মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরী সনের তৃতীয় বছর শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখ রোজ শনিবার।

২০. খন্দকের যুদ্ধ
মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হিংসাত্মক আচরণের কারণে যে সব ইয়াহুদীদের রাসূল সা. মদীনা হতে তাড়িয়ে দেন তারা মক্কায় কুরাইশদের দলভুক্ত হয়। কুরাইশদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রেরণা জোগায় এবং তাদেরকে জনবল, টাকা-পয়সা ও অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। মদিনার ইয়াহুদীদের পরামর্শ অনুসারে মক্কাবাসী ধন-সম্পদ জোগাড় করতে আরম্ভ করল। কুরাইশরা ও ইয়াহুদীরা তাদের স্বীয় গোত্র ও মিত্রদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানাল। পঞ্চম হিজরিতে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে দশহাজারেরও বেশি যোদ্ধা মদিনাভিমুখে রওয়ানা হয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করা।

রাসূল সা. কুরাইশদের প্রস্তুতি ও প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর করণীয় নির্ধারণে সহাবাগণের সাথে পরামর্শ করেন। তারা সিদ্ধান্ত করেন মুসলমানগণ মদিনায় অবস্থান করে প্রতিরোধ করবে। মদিনার উত্তর পার্শ্বের সীমান্ত অরক্ষিত থাকায় সালমান ফারসী রা. মদিনায় দুশমনদের প্রবেশে বাধাগ্রস্থ করার লক্ষ্যে উত্তর পার্শ্বে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। রাসূল সা. সালমান ফারসী রা. এর পরামর্শ গ্রহণ করেন। মুসলমানগণ পরিখা খনন আরম্ভ করেন এবং রাসূল সা. নিজেই মুসলমানগণের সাথে কাজে অংশগ্রহণ করেন। পনেরো দিনের মধ্যে পরিখা খনন সম্পন্ন হয়। রাসূল সা. মহিলা ও শিশুদের দুর্গে আশ্রয় গ্রহণের নির্দেশ দেন। মুশরিক সৈন্যরা পরিখার অদূরে মদিনার বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। কেননা তাদের অশ্বগুলো পরিখা অতিক্রম করতে পারেনি। তারা একমাস ধরে মদিনা অবরোধ করে রাখে। অতঃপর তাদের অশ্বারোহীরা নিহত হলে এবং আল্লাহর পাঠানো ঝড়ো বাতাসে তাদের তাঁবু ও সরঞ্জাম লণ্ডভণ্ড হলে তারা পলায়ন করে।

২১. হুদাইবিয়ার সন্ধি 
যষ্ঠ হিজরিতে রাসূল সা. উমরা করার লক্ষ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। এ সফরে তাঁর যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছা ছিল না। চৌদ্দশত আনসার ও মুহাজির সাহাবি তাঁর সফরের সাথী হন। যখন তারা হুদাইবিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন সকলে ইহরাম বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। কুরাইশরা এ সংবাদ জানতে পেরে শপথ করল যে, তারা নবী করীম সা. ও তার সাথীদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। রাসূল সা. উসমান রা.-কে কুরাইশদের নিকট এ খবর দিয়ে প্রেরণ করেন যে, তারা যুদ্ধের জন্য মক্কার দিকে রওয়ানা হননি। বরং তারা শুধুমাত্র উমরার উদ্দেশ্যেই মক্কায় প্রবেশ করতে চান। তারপর তারা আলোচনায় বসার জন্য সম্মত হয়। আলোচনা আরম্ভ হলে তা সন্ধির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। এ সন্ধিকেই হুদাইবিয়ার সন্ধি বলা হয়। সিদ্ধান্ত হয় রাসূল সা. তার উমরা পালনকে এক বছর পিছিয়ে দেবেন এবং দশ বছর যাবত যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। আর যে কোন গোত্র তাদের ইচ্ছানুসারে যে কোন দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। এ চুক্তির ফলে খোযাআ’ গোত্র মুসলমানদের সাথে মিলিত হল এবং বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সাথে মিলিত হল। সন্ধি চুক্তিসম্পন্ন হওয়ার পর রাসূল সা. পশু জবেহ করেন এবং মাথা মুড়িয়ে ফেলেন। মুসলমানগণ তাঁর অনুকরণ করেন। অতঃপর তিনি মুসলমানদেরকে নিয়ে মদিনায় ফেরত আসেন। আল্লাহ তায়ালা এই সন্ধিকে বড় বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

২২. মক্কা বিজয় 
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী সা. বিভিন্ন গোত্রে তাঁর দাওয়াতী কর্মসূচী অধিক পরিমাণে বিস্তৃতি ঘটাতে সক্ষম হন। ফলে এক বছরের মাথায় মুসলমানদের সংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পেল। এরই মাঝে কুরাইশদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ বনু বকর মুসলমানদের মিত্র কবিলায়ে খুযা‘আর উপর আক্রমণ করল। এর অর্থ দাঁড়াল করাইশ এবং তার মিত্ররা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করল। রাসূল সা. এ সংবাদ পেয়ে অত্যধিক ক্ষুব্দ হন এবং মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে দশহাজার যোদ্ধার একটি বিশাল সেনাদল গঠন করেন।

তখন ছিল হিজরী অষ্টম বর্ষের রমাযান মাস। এদিকে কুরাইশরা রাসূল সা. এর মক্কাভিমুখে অভিযানের সংবাদ পেয়ে তাদের নেতা আবু সুফিয়ানকে ক্ষমা প্রার্থনা, সন্ধি চুক্তি বলবৎ এবং চুক্তির মেয়াদ আরো বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে নবী সা.-এর নিকট আসে। রাসূল সা. তাদের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দিলেন। কেননা তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ ভিন্ন বাঁচার আর কোন উপায় না দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর সেনাদল (মক্কাভিমুখে) রওয়ানা হয়ে মক্কার কাছাকাছি আসলে মক্কাবাসী বিশাল দল দেখে আত্মসমর্পণ করে।

এরপর সমবেত মক্কাবাসীর প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, আমি তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করব বলে তোমাদের ধারণা? তারা বললো, সহানুভূতিশীল, উদার ও ভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ। আপনি মহৎ মহানুভবের ভ্রাতুষ্পুত্র। নবী করীম সা. তাদের সকলকে ক্ষমা করে দিয়ে বললেন, তোমরা সকলেই মুক্ত। এরপর মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হতে লাগলো।

২৩. বিদায় হজ্জ
দশম হিজরী সনে রাসূল সা. মুসলমানদেরকে তাঁর সাথে হজ্জ পালন ও হজ্জের আহকাম শিক্ষা গ্রহণ করতে মক্কা যাবার আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে প্রায় এক লক্ষের মত লোক সাড়া দিল। তাঁরা যিলকদ মাসের পঁচিশ তারিখ তাঁর সাথে মক্কা পানে বের হন। বাইতুল্লাহতে পৌঁছে প্রথমে তওয়াফ করেন। অতঃপর যিলহজ্জ মাসের আট তারিখ মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এরপর নয় তারিখ জাবালে আরাফাহ অভিমুখে যাত্রা করেন। রাসূল সা. সেখানে অবস্থান করেন এবং মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তার ঐতিহাসিক অমর ভাষণ দান করে তাদেরকে ইসলামী বিধি-বিধান ও হজের আহকাম শিক্ষা দেন এবং আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী তিলাওয়াত করে শুনান- আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে একমাত্র দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”

২৪. রাসূল সা.-এর জীবনে যুদ্ধ
রাসূল সা. সর্বমোট তেইশটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে মোট নয়টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। বাকীগুলো শুধু অভিযান হয়েছে। যথা- (১) বদরের যুদ্ধ (২)উহুদের যুদ্ধ, (৩)আহযাবের যুদ্ধ (৪) বনী কুরাইযা যুদ্ধ (৫) মুত্তালিক যুদ্ধ (৬) খাইবার যুদ্ধ (৭) ফাতহে মক্কা যুদ্ধ (৮) হুনাইনের যুদ্ধ এবং (৯) তায়িফের যুদ্ধ। আর রাসূল সা. নিজে সশরীরে অংশগ্রহণ না করে অপর কাউকে সিপাহসালার নিযুক্ত করে সাহাবায়ে কেরামকে যে জিহাদ অভিযানে প্রেরণ করেছেন,তাকে 'সারিয়্যা' বলে। এ ধরনের যুদ্ধের সংখ্যা ৪৩টি। এসবগুলো যুদ্ধই সংঘটিত হয়েছে হিজরতের পরে দশ বছরে।

২৫. আল্লাহর সান্নিধ্যে 
বিদায় হজ্জ পরবর্তী বছর রাসূল সা. জ্বরাক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং প্রিয় সহধর্মিণী আয়েশা রা. এর ঘরে শয্যাগ্রহণ করেন। রাসূল সা. ৬৩ বছর বয়সে ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার দুপুরের পর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিয়ে ইহকাল ত্যাগ করে পরপারে গমন করেন। অতঃপর খলীফা নির্বাচনের কাজ সমাধা করে ১৪ রবিউল আউয়াল রাতে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা.-এর গৃহে রাসূল সা.-কে সমাহিত করা হয়।

রাসূল সা.-এর ইন্তেকালে মুসলমানগণ একবারেই নিরাশ ও হতাশ হয়ে যান। এ পরিস্থিতিতে আবুবকর রা. ভাষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলেন, যারা মুহাম্মাদের উপাসনা করতো তারা জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ সা. আজ মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা চিরঞ্জীব, কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। এরপর নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন : “আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ কিছুই নন। তার পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরন করবে? বস্তুত: কেউ যদি পশ্চাদপসরন করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবেনা। আর যারা কৃতজ্ঞ আল্লাহ তাদের সাওয়াব দান করবেন।” 
(সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)

১৭ জুন, ২০২৫

জাতীয়তাবাদ, মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও ইসলাম


জাতীয়তাবাদ কী?

জাতীয়তাবাদ হলো একটি মতাদর্শ বা আন্দোলন, যা কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিক পরিচিতির প্রতি আনুগত্য ও গর্ব প্রকাশ করে। এটি জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা, এবং স্ব-শাসনের ওপর জোর দেয়। জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পায়, যেমন:

সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ: জাতির ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রচার।

রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ: স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন বা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা।

অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ: জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতা।

মুসলিম জাতীয়তাবাদ কী?

মুসলিম জাতীয়তাবাদ হলো এমন একটি ধারণা, যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচিতি (ইসলাম) এবং সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে একটি জাতীয় পরিচয় গঠন করা হয়। এটি প্রায়শই ধর্মীয় ঐক্যের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে শক্তিশালী করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদাহরণ হলো দ্বি-জাতি তত্ত্ব, যা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রচার করেছিল। এই তত্ত্বে বলা হয়েছিল যে হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি, যাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনধারা ভিন্ন। এর ফলে পাকিস্তানের সৃষ্টি (১৯৪৭) হয়, যা মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রকাশ ছিল।

ইসলাম কি মুসলিম জাতীয়তাবাদ সমর্থন করে?

না। ইসলাম কোনো জাতীয়তাবাদ সমর্থন করে না। ইসলাম শুধু ইসলামকেই সাপোর্ট করে। এক ইহুদী ও সাহাবীর ঘটনা। রাসূল সা. এর বিচার মানেনি সাহাবী। উমার রা.-এর কাছে গেলে উমার রা. সাহাবীকে হত্যা করেন।

ইসলাম কেন জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে?

১. মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্যঃ

জাতীয়তাবাদ উম্মাহর ঐক্যকে খণ্ডিত করতে পারে এবং জাতিগত বা ভৌগোলিক বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে ইসলাম সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের কথা বলে। কুরআনের সূরা হুজুরাত (৪৯:১৩) বলে: হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে পুরুষ ও নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হলো সবচেয়ে ধার্মিক। এই আয়াত জাতীয় বা গোত্রভিত্তিক বিভেদের পরিবর্তে ঐক্যের ওপর জোর দেয়।

জাতীয়তাবাদ জাতিগত বা জাতীয় পরিচয়কে ধর্মীয় ঐক্যের উপরে স্থান দিয়ে উম্মাহর ঐক্যকে দুর্বল করতে পারে। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব যেমন জামালুদ্দিন আফগানি জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেছেন, কারণ এটি মুসলিম বিশ্বকে বিভক্ত করে। তবে, কিছু প্রেক্ষাপটে, যেমন পাকিস্তানের সৃষ্টি, মুসলিম জাতীয়তাবাদ ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।

২. জাতীয়তাবাদ একটি জাহেলিয়্যাত

ইসলামী শিক্ষা জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে, বিশেষ করে যখন এটি গোত্রবাদ বা শ্রেষ্ঠত্ববাদের রূপ নেয়। কুরআন ও হাদিসে বলা হয়েছে, সকল মানুষ সমান, এবং শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র ধার্মিকতার ভিত্তিতে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিস (৪৫৬১) বলে, গোত্রের পতাকার অধীনে যুদ্ধ করা জাহিলিয়াতে মৃত্যুর সমান। সুনান আবি দাউদের হাদিস (৫১০২) বলে, যে ব্যক্তি গোত্রবাদের ডাক দেয়, গোত্রবাদের জন্য লড়াই করে বা গোত্রবাদের জন্য মরে, সে আমাদের মধ্যে নয়। নবী মুহাম্মদ (সা.) জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বলেছেন, এটি ছেড়ে দাও, এটি পচা। মুসনাদ আহমদের হাদিস (৩৭৮৪) বলে, গুরাবা (অপরিচিত) হলো তারা যারা গোত্রীয় আনুগত্য থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে। এই শিক্ষাগুলো জাতীয়তাবাদকে প্রাক-ইসলামী অজ্ঞতা (জাহিলিয়া) হিসেবে দেখে, যা ইসলাম নিষিদ্ধ করে।

৩. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বনাম জাতীয় সার্বভৌমত্ব

ইসলাম: সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ্র জন্য সংরক্ষিত। আইন ও মূল্যবোধের উৎস হলো আল্লাহ্র বিধান (শরীয়া)। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে: "আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান দেয়ার অধিকার নেই" (সূরা ইউসুফ, ১২:৪০)।

জাতীয়তাবাদ: সার্বভৌমত্ব "জাতির" হাতে ন্যস্ত করে এবং মানবরচিত সংবিধান/আইনকে সর্বোচ্চ মনে করে।

৪. ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি: ঈমান বনাম জাতীয়তা

ইসলাম: মুসলিমদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও শত্রুতার ভিত্তি হলো ঈমান (বিশ্বাস)। কুরআন নির্দেশ দেয়:

"মুমিনগণ যেন অপর মুমিনকে ছেড়ে কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে" (সূরা আল-ইমরান, ৩:২৮)।

জাতীয়তাবাদ: সম্প্রীতি বা শত্রুতার ভিত্তি হলো জাতীয় স্বার্থ, যা অনেক সময় ইসলামী মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

৫. ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: উম্মাহর ধারণা

প্রাথমিক ইসলামে, নবী মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় একটি বহুজাতিক, বহুধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ("মদিনা সনদ")। সেখানে পরিচয়ের ভিত্তি ছিল বিশ্বাস, জাতীয়তা নয়।ইসলামী খিলাফত মডেল (যেমন উসমানীয় সাম্রাজ্য) জাতীয়তাবাদকে দমন করেছিল, কেননা তা উম্মাহর ঐক্যকে বিপন্ন করত।

৬. জাতীয়তাবাদের বিপদ: বিভাজন ও সংঘাত

ইসলামী স্কলারগণ (যেমন সাইয়েদ কুতুব, মাওলানা মওদুদী) যুক্তি দেন যে জাতীয়তাবাদ: মুসলিম বিশ্বকে দুর্বল করে (যেমন: উসমানীয় খিলাফতের পতনের পর জাতি-রাষ্ট্রগুলোর সংঘাত)। গোত্রপ্রীতি (আসাবিয়্যাহ) তৈরি করে, যা নবী (সা.) নিষিদ্ধ করেছিলেন: "যে ব্যক্তি আসাবিয়্যাহের ডাক দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়" (সুনান আবু দাউদ)।
ইসলামী দৃষ্টিকোণে সমালোচনা:

১. বিভ্রান্তিকর আনুগত্য: জাতীয়তাবাদ আল্লাহ্র পরিবর্তে জাতির প্রতি আনুগত্য চায়।

২. উম্মাহর বিভক্তি: মুসলিম বিশ্বকে ৫০টিরও বেশি জাতি-রাষ্ট্রে বিভক্ত করেছে।

৩. সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার: ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো জাতীয়তাবাদ ব্যবহার করে মুসলিম ভূখণ্ড বিভক্ত করেছে।

৭. ব্যতিক্রম: "দেশপ্রেম" বনাম "জাতীয়তাবাদ"

ইসলাম দেশপ্রেম (ওয়াতানিয়্যাহ) বা স্বদেশের কল্যাণ কামনাকে সমর্থন করে, তবে তা শর্তসাপেক্ষ:

তা যেন ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী না হয়। তা যেন উম্মাহর ঐক্যকে ক্ষুণ্ন না করে। উদাহরণ: ফিলিস্তিন, কাশ্মীরের মুসলিমদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে "ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ" হিসেবে দেখা হয়, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে নয়।

জাতীয়তাবাদ / জাতিবাদ / গোত্রবাদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ সা.-এর বক্তব্য

এক.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি নেতার আনুগত্য হতে বের হয়ে যায় এবং মুসলিমদের দল ত্যাগ করে, আর এই অবস্থায় মারা যায়, তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু। যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়ে ভাল-মন্দ নির্বিচারে হত্যা করে এবং মুসলিমকেও ছাড়ে না; আর যার সাথে যে অঙ্গীকারাবদ্ধ, তার অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার সাথে আমার কোন সম্বন্ধ থাকবে না। আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্টতা এবং অজ্ঞতার পতাকাতলে যুদ্ধ করে, আর লোকদেরকে জাতিয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে এবং তার ক্রোধ জাতিয়তাবাদের জন্যই হয়, পরে সে নিহত হয়; তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যু হবে।

সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ৪১১৪

দুই.

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি লোকেদেরকে গোত্রবাদের দিকে আহবান করে অথবা গোত্রবাদে উন্মত্ত হয়ে ভ্রষ্টতার পতাকাতলে যুদ্ধ করে নিহত হলে সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করলো।

সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৯৪৮

ফাসীলাহ্ বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমীপে জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! কোন ব্যক্তির নিজের গোত্রকে ভালোবাসা কি আসাবিয়্যাতের অন্তর্ভুক্ত? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ না; বরং আসাবিয়্যাত হলো কোন ব্যক্তির নিজের গোত্রকে যুলমে সাহায্য করা। (আহমাদ ও ইবনু মাজাহ)

ইসলাম একে জাহেলিয়াত বলে ঘোষণা করেছে। ইসলামে আরব অনারব, সাদা কালো, দেশি বিদেশি সকল মুসলিমকেই সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি মুসলিম হয় তাহলে সে ভারতীয়, পাকিস্থানি অথবা অন্য যে কোন দেশের নাগরিক হোক না কেন, সে আমাদের দ্বীনি ভাই। মুসলিমদের মধ্যে মর্যাদা ও সম্মানের পার্থক্য হবে তাকওয়ার ভিত্তিতে, জাতীয়তা কিংবা দেশীয় নাগরিকত্বের ভিত্তিতে নয়। কেউ যদি ইসলামের বিরোধীতা করে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অস্বীকার করে তাহলে সে স্বদেশী হলেও সে আর আমি এক জাতি নই।

তিন.

জাতীয়তাবাদ, গোত্র প্রীতি, বংশীয় আভিজাত্য ও অহংকারবোধকে আরবী পরিভাষায় আসাবিয়্যাহ বলা হয়। এই আসাবিয়্যাহ এর কুফল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাহর কারণে মৃত্যুবরণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাহর দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয় যে আসাবিয়্যাহর কারণে যুদ্ধ করে। [আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১২১]

চার.

জাবের বিন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেনঃ হে লোক সকল শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবের উপর অনারবের এবং অনারবের উপর আরবের, কৃষ্ণকায়ের উপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের উপর কৃষ্ণকায়ের কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল তাকওয়ার কারণেই। [ইমাম আহমাদ, আল মুসনাদ, হাদিস নং ২৩৪৮৯]

কেন জাতীয়তাবাদ ক্ষতিকর?  

এক.

ইসলামের একটি মূলনীতি হলো আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ। জাতীয়তাবাদের ফলে এই মূলনীতি সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়। 'আল ওয়ালা ওয়াল বারাহ এর মর্মার্থ হলো আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্যই ঘৃণা। একজন মুসলিমের প্রতি আরেকজন মুসলিমের ভালোবাসা থাকতে হবে আল্লাহর জন্যই। ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী কাফির মুনাফিকদের প্রতি অন্তরে ঘৃণা থাকতে হবে আল্লাহর জন্যই। কোন পার্থিব স্বার্থের জন্য নয়। কিন্তু জাতীয়তাবাদ মুসলিমদের এই সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল তৈরি করে দেয়। ভিনদেশের মুসলিমকে তখন আর আপন ভাবা যায় না। অন্যদিকে নিজ দেশের আল্লাহদ্রোহীর প্রতিও সহানুভূতি চলে আসে।

দুই.

জাতীয়তাবাদ মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ ধ্বংস করে দেয়। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে একজন মুসলিমের কষ্টে সমস্ত পৃথিবীর মুসলিমের অন্তরে কষ্ট অনুভূত হবে, এটিই ইসলামের শিক্ষা। অথচ জাতীয়তাবাদ আমাদের সেই অনুভূতি নষ্ট করে দিয়েছে। নিজ দেশের কিংবা নিজ জাতির মানুষ সুখে থাকলেই আমরা খুশি। আর এরূপ স্বার্থপরতাই হচ্ছে জাতীয়তাবাদের মূল শিক্ষা। বিংশ শতকের শুরুতে জাতীরাষ্ট্র ধারণা থেকেই আমাদের উম্মাহ চেতনা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমরা আরব-তুর্কি, আরব-আফ্রিকান, তুর্কি-হিন্দুস্তানী এসব ভাবে ভাগ যুদ্ধ শুরু করেছি। সেই উম্মাহ ভেঙ্গে এখন বাঙালি, সিন্ধি, বেলুচ, পাঞ্জাবি ইত্যাদি জাতিতে ভাগ হয়ে গিয়েছি। 

তিন.

জাতীয়তাবাদ নিজের জাতিকে অন্যান্য জাতি থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায়। ইসলামে নিজ জাতিকে নিয়ে অহংকার কিংবা বংশ মর্যাদার গৌরব চরম নিন্দনীয়। ইসলাম এরূপ কর্মকে জাহেলি যুগের কর্ম বলে উল্লেখ করেছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড হলো তাকওয়া। এক্ষেত্রে গায়ের রঙ, বংশ, জাতি, ভাষা, ভূখণ্ড ইত্যাদি মূল্যহীন। আল্লাহর রাসূল বিদায় হজ্বের ভাষণেও এই ধরণের জাতিভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।  

চার.

জাতীয়তাবাদ ন্যায় অন্যায় বোধকে নষ্ট করে দেয়। জাতীয়তাবাদের দাবিই হলো নিজের স্বজাতিকে সাহায্য করা হবে যদিও সে অন্যায় করে এবং অন্য জাতিকে সাহায্য করা হবে না যদিও তারা নিরপরাধ হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো অন্যায়কারীকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করা হবে, যদিও সে নিজ সম্প্রদায় কিংবা নিজ দেশের নাগরিক হয়।

বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে এক মুহাজির ও এক আনসার সাহাবীর মধ্যে বিতর্ক শুরু হলে উভয়ই তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়কে ডেকে মারামারি করার জন্য উদ্ধত হলো। মুহাম্মদ সা. এই ধরণের কাজের কঠোর নিন্দা করেছেন এবং এই কাজকে জাহেলি দুর্গন্ধময় কাজ বলেছেন।

২২ জুন, ২০২৩

"অতএব পুঁজি বিকিয়ে দেবেন না"


আমরা যারা ইসলামী আন্দোলন করি, আমরা নঈম সিদ্দিকীর 'চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান' প্রবন্ধটি পড়েই বড় হয়েছি। এখানে লেখক জোর দিয়েছেন কীভাবে আমরা আমাদের চরিত্র ঠিক রাখবো। আর চরিত্র ঠিক রাখা মানে হলো ইসলামী আন্দোলনে টিকে থাকা বা ইসলামকে গালিব করার জন্য কাজ করা। 

চরিত্র নষ্ট বলতে লেখক বুঝিয়েছেন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ইসলামী আন্দোলন থেকে বিচ্যুত হওয়া। উনি যেসময় লেখাটি লিখেছিলেন তখন ওনার দৃষ্টিতে দুটি কারণ ধরা পড়ে চরিত্র নষ্ট হওয়া তথা হকের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার। 

উনি বলতে চেয়েছেন যখন কোনো মানুষ ইসলামের দিকে ধাবিত হওয়ার চেষ্টা করে তখন শয়তান ঐ মানুষের প্রতি তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। তাকে দুইভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। 

প্রথমত তাকে দুনিয়ার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লোভ দেখায়। যেটাকে নঈম সিদ্দিকী বলেছেন পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী ও স্বার্থপূজারী সভ্যতার হামলা। 

দ্বিতীয়ত তাকে সাম্যবাদী সমাজের নামে ইসলামবিমুখ করার চেষ্টা করে। যেটাকে লেখক বলেছেন সমাজতন্ত্রের নাস্তিক্যবাদী চিন্তার হামলা। 

বইটি লেখার প্রায় ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। বর্তমান সমাজে শয়তানের এই দুটি আক্রমণের মধ্যে ১ম টি প্রবলভাবে অব্যাহত আছে এবং এটি আজীবন থাকবে বলে মনে করি। কারণ এর মাধ্যমে বেশিরভাগ ঘায়েল হয়েছে ও হচ্ছে। মানুষ বরাবরই সম্পদ, খ্যাতি, ক্ষমতার কাঙ্গাল। এটি মানুষের কমন ফিতরাত। নফসের চাহিদাও তাই। ফলে বেশিরভাগ মানুষ দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য শয়তানের ধোঁকায় পড়ে। 
 
সমাজতন্ত্র সেসময় ট্রেন্ডি আদর্শ ছিল। মুসলিম যুবকরা কম্যুনিস্টদের কবলে পড়ে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। তারা কিন্তু আদর্শের জন্য ডেডিকেটেড ছিল। যেহেতু তারা আদর্শের জন্য উন্মূখ ছিল তাই ওদের চেয়ে ভালো আদর্শ উপস্থাপন করতে পারলেই সমস্যা কেটে যাবে। জামায়াতে ইসলাম উপমহাদেশে সেই ভূমিকা পালন করেছে। ইসলামকে সঠিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরেছে। ফলে বহু কমিউনিস্ট নেতা তওবা করে সঠিক মুসলমান হয়েছে। 

কমিউনিস্টদের আদর্শ বিশ্বব্যাপী মার খাওয়ায় সমাজতন্ত্রের নাস্তিক্যবাদী চিন্তার হামলা ষাটের দশকের চেয়ে অনেক অনেক কমে গিয়েছে। কিন্তু এই স্থান দখল করে নিয়েছে সেক্যুলারিজম। তারা ইসলাম ও রাষ্ট্রকে আলাদা করে দিয়েছে। ফলে একশ্রেণির মুসলিম তৈরি হচ্ছে যারা পার্সোনালি ইসলামকে ভালোবাসে। নামাজ রোজা করে কিন্তু রাষ্ট্র থেকে অনৈসলামিক কার্যকলাপ পরিহার করতে সচেষ্ট তো থাকেই না। উল্টো রাষ্ট্রকে ইসলামী কানুন থেকে আলাদা রাখতে চায়। 

আজকে আমার আলোচনা আমাদের চারিত্রিক পুঁজিকে কেন্দ্র করে। নঈম সিদ্দিকীর লেখা থেকে বুঝতে পারি, সেসময় এক টাইপের মুসলিম পাওয়া যেত, যারা চরিত্র নষ্ট হওয়ার ভয়ে রাজনীতি করতেন না, দাওয়াতী কাজ করতেন না। নিজের যৎসামান্য ঈমানের পুঁজি নিয়ে নিজের মধ্যেই আবদ্ধ থাকতেন। 

তাদের ব্যাপারে নঈম সিদ্দিকী বলেন, চরিত্রের যে ‘মূলধন’কে ক্ষতির আশঙ্কায় হামেশা সিন্দুকের মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় এবং যা হামেশা অনুৎপাদক (Unproductive) অবস্থায় বিরাজিত থাকে, সমাজ জীবনের জন্যে তার থাকা বা না থাকা সমান। 

মুসলমান নারী-পুরুষ এবং মুসলিম দলের নিকট চরিত্র ও ঈমানের কিছু ‘মূলধন’ থাকলে তাকে বাজারে আবর্তন (Circulation) করার জন্য ছেড়ে দেওয়া উচিত। তারপর মূলধন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যোগ্যতা থাকলে সে মূলধন লাভসহ ফিরে আসবে, আর অযোগ্য হলে লাভ তো দূরের কথা আসল পুঁজিও মারা পড়বে। কিন্তু বাজারে আবর্তিত হতে থাকার মধ্যেই পুঁজির স্বার্থকতা। অন্যথায় যত অধিক পরিমাণ পুঁজিই জমা করা হোক না কেন তা পুরোপুরি ব্যর্থ হতে বাধ্য।

বাজারে আবর্তন করেই পুঁজি বিকিয়ে দেওয়া যাতে না হয় সেজন্য তিনি বলেছেন, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ যখন তাদের চরিত্র ও ঈমানের ন্যূনতম পুঁজি এ পথে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, তখন একে কেবল ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাবার জন্যই নয়, বরং দেশ ও জাতির এবং আমাদের নিজেদেরকেও এ থেকে অধিকতর মুনাফা অর্জনের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

যাই হোক, তত্ত্বগত আলোচনা বাদ দিয়ে প্র্যাকটিক্যাল কিছু কথা বলি। 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ধর্মীয় পুঁজি কী?
জামায়াতের ধর্মীয় পুঁজি হলো, এদেশে আল্লাহর আইন কায়েম করা, দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা, ইসলামকে গালিব করা, তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের জনপ্রিয় স্লোগান হলো,
আল্লাহর আইন চাই
সৎ লোকের শাসন চাই 

জনগণ আমাদেরকে এই কারণে পছন্দ করবে যে, আমরা ইসলামকে বিজয়ী করার জন্যই কাজ করছি। আমরা যদি ইসলামের চাইতে অন্যান্য বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেই তবে আমরা পুঁজি হারাবো। সেটা যতই ভালো কাজ হোক না কেন! যেমন আপনি মানুষকে যদি বলেন, জামায়াতে যোগ দিন, জামায়াত দেশ শাসন করলে প্রচুর উন্নয়ন করে দেশকে উন্নত রাষ্ট্র করে দিবে। আপনাদের পয়সাওয়ালা বানিয়ে দেবে। 

উন্নয়ন করা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আপনি চান বা না চান এটা হবেই। মানুষ এই কারণে জামায়াতকে গ্রহণ করবে না। যদি উন্নয়নই শেষ কথা হয়, তবে আওয়ামী লীগ বা বিএনপিই করা উচিত। জামায়াতের দরকার নেই। 

উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি থাইল্যান্ডের কথা। থাইল্যান্ড পর্যটন শিল্পকে তাদের প্রধান রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস বানিয়েছে। মদ, ক্যাসিনো, পতিতাবৃত্তিসহ নানাবিধ সুবিধা দিয়ে তারা পর্যটকদের কাছে টানে। এর মাধ্যমে তারা সম্পদশালীও হয়েছে। 

জামায়াতের কাছে যদি বস্তুগত উন্নয়নই শেষ কথা হয় তবে নঈম সিদ্দিকীর ভাষ্যমতে আমরা চরিত্রহীন হয়ে পড়বো। অতএব জামায়াতের প্রথম ও প্রধান পুঁজি ইসলাম প্রতিষ্ঠা। আমরা যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠার কম বলে উন্নয়নের কথা বেশি বলি তবে বুঝতে বাজারে আমাদের পুঁজি মাঠে মারা যাবে। বেশি লাভ করতে যেয়ে আমরা যাতে পুঁজি হারিয়ে না বসি। 

আপনি যদি জনগণকে উন্নয়ন শেখান তবে সে এর জন্য জামায়াতের কাছে আসবে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জামায়াতের রাজনৈতিক পুঁজি হলো ভারত তথা মুশরিকদের বিরোধীতা। 

এই অঞ্চলে ইসলামপন্থী/ তাওহীদপন্থী রাজনীতির এটাই হলো বেসিক কথা। বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস হলো একত্ববাদ ও বহুঈশ্বরবাদের দ্বন্দ্ব। সেই দ্রাবিড় ও আর্যদের দ্বন্দ্ব। 

বাংলাদেশের মানুষ আমাদের সমর্থন দেবে এইজন্য যে, আমরা মুশরিকদের সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদীতা থেকে মুসলিমদের রক্ষা করবো। যদি আমরা ভারত ও ভারতীয় এজেন্ডাকে ঔন করি, তাদের এজেন্ডাকে নিজেদের এজেন্ডা মনে করি তবে জামায়াতের এই দেশে দরকার নেই। 

কারণ ভারত ও ভারতের এজেন্ডার পক্ষে থাকার জন্য আওয়ামী লীগ আছে। ভারতীয় এজেন্ডার জন্য আওয়ামী লীগ হচ্ছে উত্তম চয়েস। জামায়াত যদি ভারত বিরোধীতা ছেড়ে দেয় তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত অপ্রাসঙ্গিক। দরকার নেই।   

অতএব, জামায়াতের নেতা কর্মীদের প্রতি আমার আহ্বান। পুঁজি বিকিয়ে দেবেন না। আপনি কী পুঁজি নিয়ে নামছেন তা আপনার জানা থাকা দরকার। আপনি যদি মনে করেন, আপনার পুঁজি দিয়ে কাজ হবে না। আওয়ামীলীগের পুঁজি ধার করতে হবে তবে আমার বিনীত অনুরোধ, ভালো হয় আপনি আওয়ামী লীগ করেন। জামায়াত করার দরকার নেই। 

আন নাহদা পার্টির কথাই ধরুন। জনপ্রিয় হয়ে ক্ষমতায় আসলো। পশ্চিমা সুশীল সমাজ তাদের বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচনা করলো। বিরোধীরা তাদের সেকেলে বললো। অমনি তারা নিজের পুঁজির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেললো। ধার করলো সেক্যুলারদের পুঁজি। এখন ক্ষমতাও হারালো, জনসমর্থনও হারালো।

জামায়াত এতো এতো নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আদালত থেকে রায় নিয়ে নিকৃষ্ট সব অভিযোগে ফাঁসি দিয়েছে জামায়াত নেতাদের। অনেকে ভেবেছে এর ফলে জামায়াতের সমর্থকরা লজ্জায় জামায়াত ছেড়ে দেব। কিন্তু দেখুন, জামায়াত মোটেই তার সমর্থন হারায়নি। বরং সিম্প্যাথি নিয়ে জনসমর্থন গেইন করেছে। এর বড় কারণ তারা পুঁজি ধরে রেখেছে। 

এখন যদি বহিঃবিশ্বের সুবিধা হাসিল করার জন্য নিজের পুঁজি বিকিয়ে দেয় তবে জামায়াত সব হারাবে। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই, আল্লাহ তায়ালা জামায়াতকে বহুবার মর্যাদার সাথে বাঁচিয়ে দিয়েছে বলে সবসময় বাঁচাবে। জামায়াত যদি নিজেদের চরিত্র নষ্ট করে, নিজেদের পুঁজি বিকিয়ে দেয়, তবে বাংলাদেশে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই অন্য আরেকটি তাজদিদি দল প্রতিষ্ঠা করবেন। 

এটা আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা। তিনি সূরা তাওবার ৩৯ নং আয়াতে এই ওয়াদা করেছেন। অতএব পুঁজি বিকিয়ে দেবেন না। চরিত্র নষ্ট করবেন না।


৩০ জুল, ২০২২

হিজরি সন গণনার ইতিহাস



আমাদের নেতা উমার রা.-এর শাসনামল। ইসলামী হুকুমাত তখন অনেক বড়। এর মধ্যে একটি সংকটে পড়লো রাষ্ট্র। আরবে তৎকালীন সমাজ মাসের হিসেব ও তারিখের হিসেব করতো কিন্তু নির্দিষ্টভাবে সনের হিসাব করতো না। রাষ্ট্র বিশাল হওয়ায় অনেক ডকুমেন্টস মেইনটেইন করতে হচ্ছে। যেমন, রাষ্ট্রীয় আদেশ, সার্কুলার, ঘোষণাপত্র, চুক্তিপত্র, কূটনৈতিক চিঠি ইত্যাদি। এগুলোতে মাসের নাম থাকলেও সন লিখা থাকতো না। 

১৬ হিজরির শাবান মাসের ঘটনা। তখন অবশ্য ১৬ হিজরি বলে কিছু ছিল না। একটি অফিসিয়াল সার্কুলার হাজির হলো উমার বিন খাত্তাব রা.-এর সামনে। সেখানে মাসের নাম লেখা ছিল কিন্তু সনের নাম ছিল না। উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলো এটি কোন সনের সার্কুলার! উমার রা. বললেন এটি এখনই সমস্যা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে তো এটি বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়াবে। এর সমাধান কী? এর কোন সদুত্তর পাওয়া যায় নি সেসময়। 

তৎকালীন আরবে সুনির্দিষ্ট কোন সন প্রথা প্রচলিত ছিল না। বিশেষ ঘটনার নামে বছরগুলোর নামকরণ করা হতো। যেমন- বিদায়ের বছর, অনুমতির বছর, ভূমিকম্পের বছর, হস্তীর বছর ইত্যাদি। মহানবী সা. যখন পৃথিবীতে এসেছেন আরববাসী তখন ‘হস্তীর বছর’ থেকে কাল গণনা করছিল। এরপর ফিজার যুদ্ধ দিয়েও সাল গণনা হতো। যেমন তারা বলতো হস্তীর বছরের তিন বছর পরে আমার মেয়ের জন্ম। ফিজার যুদ্ধের আগের বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে ইত্যাদি। 

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমার ফারুক রা. যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন বহু দূর-দূরান্ত পর্যন্ত নতুন নতুন রাষ্ট্র ও ভূখন্ড ইসলামী খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাষ্ট্রের জরুরি দলিল, কাগজপত্র ইত্যাদিতে কোন সন উল্লেখ না থাকায় অসুবিধার সৃষ্টি হতো। আবার বসরার (ইরাক) গভর্নর মুসা আল আশয়ারি রা. রাষ্ট্রনায়ক উমার ফারুক রা.-কে লিখে পাঠালেন, আপনি পাঠানো চিঠিতে সন না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। তিনি এক্ষেত্রে গ্রিসকে অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।  

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমীরুল মুমেনিন একটি বিশেষজ্ঞ মিটিং আহ্বান করলেন এই সমস্যা সমাধানে। এখানে বিজ্ঞ সাহাবা ও পন্ডিত ব্যক্তিদের আহ্বান জানান হয়েছে।  সোলার ক্যালেন্ডার নাকি লুনার ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হবে? কোন ঘটনাকে সাক্ষী রেখে বছর গণনা শুরু হবে? কোন মাসকে প্রথম মাস হিসেবে ধরা হবে? ইত্যাদি সব জটিল সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে সেই মিটিং-এ।        

হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জমাদিউল আউয়ালে আসলো সেই ঐতিহাসিক দিন। যেহেতু আরবের মানুষ ও সাহাবীরা চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করতো এবং আমাদের ইবাদতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তারিখ চাঁদের সাথে সম্পর্কিত তাই সৌর ক্যালেন্ডার বাদ পড়ে যায় শুরুতেই। মহানবী সা.-এর জন্ম, নব্যুয়ত, হিজরত ও মৃত্য—এ চারটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার যেকোন একটি হতে হিজরি সন গণনা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হলো।

কিন্তু সমস্যা হলো জন্ম ও নবুয়তের তারিখ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আর মৃত্যু শোকের সিম্বল। এছাড়া জন্ম, মৃত্যুকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা রাসূল সা. বলেননি। অতএব হিজরতের মাধ্যমেই সন গণনা শুরু করার পক্ষে সাহাবার একমত হলেন। হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন বিজ্ঞ সাহাবী সাইয়্যেদেনা আলী রা.। কারণ ঐদিন থেকে আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সা. শাসনক্ষমতা গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং মুসলিমরা রাষ্ট্রীয় শক্তি অর্জন করে। সেজন্যই দিনটি মুসলিমদের কাছে চিরস্মরণীয়। আর পবিত্র মাস মহররমকে ১ম মাস হিসেবে নির্ধারণ করতে একমত হন সাহাবারা।     

সিদ্ধান্ত হলো যে বছর মুহাম্মদ সা. হিজরত করে মদিনায় এসেছেন সে বছরের মহররমের ১ তারিখ থেকে হিজরি বর্ষ গণনা করা হবে। হিসেব করে দেখা গেল ১ হিজরির ১ মহররম অর্থাৎ প্রথম দিনটি ছিল জুমাবার, জুলিয়ান দিনপঞ্জি অনুসারে ১৬ জুলাই ৬২২ খ্রিস্টাব্দ। আর এই সিদ্ধান্তটি নেয়া হয় ঘটনার ১৬ বছর পর ৯ জুন ৬৩৭ সালে। সেদিনই বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখলো সেদিন ছিল ১০ জমাদিউল আউয়াল, ১৬ হিজরি। উমার ফারুক রা. শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করার তিন বছরের মাথায় এমন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে কার্যকরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। 

আজ ১ মহররম ১৪৪৪। আজ থেকে ১৪৪৪ বছর আগে মুহাম্মদ সা. তাঁর দায়িত্বের অংশ হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। আলী রা.-এর শাহদাতের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রকে হারিয়ে ফেলেছি। এরপর বহু মর্দে মুজাহিদ এই ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করতে চেয়েছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ শাহদাতের নজরানা পেশ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হুসাইন ইবনে আলী রা., আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা., উমার ইবনে আব্দুল আজিজ রা.। 

আমাদের আন্দোলন সেই ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করার আন্দোলন! আসুন আমরা শপথ নিই আমরা আমাদের সম্পদ ও জীবন বাজী রেখে ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করার চেষ্টা করে যাবো ইনশাআল্লাহ। 

সবাইকে হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা। নতুন বছরে মহান রাব্বুল আলামীন আরো বেশি তার অনুগত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

২৩ এপ্রি, ২০২২

লাইলাতুল কদরের শানে নুজুল



একবার রাসূল সা. স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন তাঁর জন্য স্থাপিত মিম্বরে উঠে গেছে উমাইয়া বংশের লোকেরা। তিনি খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। এটা সেসময়ের ঘটনা যখন মুহাম্মদ সা. রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি। তিনি তখনো মক্কায়।  

মুহাম্মদ সা. বুঝতে পারলেন তাঁর স্থাপিত ইসলামী রাষ্ট্র একটি বংশের কুক্ষিগত হয়ে পড়বে। তিনি দুঃখ পেলেন। একইসাথে এও জানতে পারলেন এই বংশ ১০০০ মাস রাজত্ব করবে। 

স্বপ্ন দেখার পর বিষণ্ণ মুহাম্মদ সা.-কে পুরস্কার দিয়ে সান্ত্বনা দিলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা। তিনি সূরা কদর নাজিল করে জানালেন, আর মহিমান্বিত রাত প্রসঙ্গে আপনি কি জানেন? মহিমান্বিত রাত হাজার মাস হতেও উত্তম”। 

ইমাম তিরমিজি রহ. সূরা কদরের শানে নুজুল হিসেবে এই একটি ঘটনাকেই উল্লেখ করেছেন। 

ইউসুফ ইবনু সা’দ রহ. থেকে বর্ণিত, হাসান রা. মুআবিয়া রা.-এর নিকট বাই’আত গ্রহণের পর তাঁর সামনে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলেন, আপনি (মুআবিয়ার নিকট বায়’আত গ্রহণ করে) মু’মিনদের চেহারা কলঙ্কিত করেছেন। এতে তিনি বললেন, তুমি আমাকে অভিযুক্ত করো না। আল্লাহ তা’আলা তোমার প্রতি রহমত করুন। 

হাসান রা. বলেন, যেহেতু রাসূলুল্লাহ সা.-কে স্বপ্নে উমাইয়্যা বংশীয়দেরকে তাঁর মিম্বারের ওপর দেখানো হয়েছে। বিষয়টি তাঁর নিকট খারাপ লাগে। তখন অবতীর্ণ হয়, “আমি অবশ্যই তোমাকে কাওসার (ঝরণা) দান করেছি” (সূরাঃ আল-কাওসার-১) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! আমি জান্নাতে তোমাকে কাওসার নামক ঝরণা দান করেছি। আরো অবতীর্ণ হয়, “নিশ্চয় আমি এ কুরআন মহিমান্বিত রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর মহিমান্বিত রাত প্রসঙ্গে আপনি কি জানেন? মহিমান্বিত রাত হাজার মাস হতেও উত্তম” (সূরাঃ আল-ক্বাদর-১-৩)। হে মুহাম্মাদ! আপনার পরে বনী উমাইয়্যা হাজার মাস শাসন করবে।    

- জামে আত তিরমিজি/ তাফসীরুল কুরআন / হাদিস নং ৩৩৫০

১৩২ হিজরিতে উমাইয়াদের পতন হয়। হাসান রা. ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া থেকে গণনা শুরু করলে বনু উমাইয়া ৯২ বছর ক্ষমতায় ছিল। বনু উমাইয়াদের ক্ষমতার সময়কাল ৯২ বছর  হলেও মক্কাতে তারা ৮৩ বছর শাসন করে। কারণ মক্কায় আবু বকর রা.-এর নাতি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. ৯ বছর খলিফা ছিলেন। 

উমাইয়া শাসনের ১ম শাসক মুয়াবিয়া রা.-এর মৃত্যুর আগেই তার ছেলে ইয়াজিদকে শাসন ক্ষমতার উত্তরাধিকার করে যান। এটা হাসান রা.-এর সাথে করা চুক্তির বিপরীত। তাছাড়া এটি শুরার মাধ্যমে হয়নি বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মতামত দেন। 

উমাইয়া শাসনের ২য় শাসক ইয়াজিদ ক্ষমতা গ্রহণ করলে রাসূল সা.-এর নাতি ও জান্নাতের সর্দার ইমাম হুসাইন রা. ও আবু বকর রা. এর নাতি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. যথাক্রমে মদিনা ও মক্কা থেকে বিদ্রোহ করেন। 

ইমাম হুসাইন রা. কুফায় ইয়াজিদের সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত ও শাহদাতবরণ করলেও আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. বিদ্রোহ চালিয়ে যান। তিনি ৯ বছর মক্কার খলিফা হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর উমাইয়া শাসনের এক সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে ইবনে যুবাইর রা.-এর পরাজয় ঘটে ও তিনি শাহদাতবরণ করেন।  

হিসেব করলে দেখা যায় মক্কায় উমাইয়া শাসন ৮৩ বছর ছিল। যা হাজার মাসের সমান। কাসিম ইবনে ফজল রহ. বলেছেন, আমি হিসেব করে দেখেছি পুরো হাজার মাস হয়েছে। কম বেশি হয়নি। 

মুসলিম রাষ্ট্রের ক্ষত হিসেবে আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য মেহেরবানী করে লাইলাতুল কদর দান করেছেন। আসুন আমরা এই ক্ষত পূরণের চেষ্টা করি। আমাদের রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। 

আল্লাহর রাসূল সা.-এর মিম্বার কোনো বংশ, কোনো গোত্র, কোনো সেক্যুলার গোষ্ঠির কাছে যেন না যায়। আল্লাহর রাসূল সা.-এর মিম্বার তাঁর একান্ত অনুসারী ও তাঁর আদর্শ ধারণকারীদের হাতে তুলে দেওয়া আমাদের কর্তব্য।

আসুন, আমরা ইকামাতে দ্বীনের জন্য ব্যস্ত হই। আমাদের ব্যস্ততার বড় অংশ যাতে দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই হয়। আমাদের এই প্রচেষ্টা ও ব্যস্ততা আল্লাহ চাইলে হাজার মাসের প্রচেষ্টার বরকত দিয়ে দিবেন। ইনশাআল্লাহ।

১০ ডিসে, ২০২১

কাতিবে ওহি কারা ছিলেন?


আমাদের প্রিয় নবী সা.-এর কোনো শিক্ষক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তিনি ছিলেন অক্ষরজ্ঞানহীন। এটা আল্লাহ তায়ালার একটি কুদরত। এরকম একজন মানুষ যখন হুট করে জ্ঞানের চর্চা ও নসিহত দিচ্ছিলেন তখন আরবের লোকজন একথা মানতে বাধ্য হয়েছে যে, মুহাম্মদ সা. কাছে ফেরেশতা আসে এবং এগুলো তাঁকে শেখানো হয়।

যাই হোক, মুহাম্মদ সা. অক্ষরজ্ঞানহীন হওয়ায় নবুয়্যতের শুরু থেকেই কাতিবে ওহির প্রয়োজন হয়। আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে ওহি নাজিল হয় ২৩ বছর। এই ২৩ বছরে প্রায় ২২ জন কাতিবে ওহির সাহায্য নেন মুহাম্মদ সা.। এর মধ্যে কেউ ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত। আর কেউ নিজ থেকে কাজটা করেছেন। আর কেউ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে কাতিবে ওহির দায়িত্ব পালন করেছেন। আর একজন সুপারিশের ভিত্তিতে এই দায়িত্ব পেয়েছেন। 

আল্লাহর রাসূল সা.-এর মাক্কী জীবনে সর্বপ্রথম কাতিবে ওহির দায়িত্ব পালন করেছেন আবু বকর রা.। তার সাথে ছিলেন আলী রা. ও উসমান রা.। তারা চামড়ার টুকরো ও খেজুরের ডালে ওহি লিখে সংরক্ষণ করতেন। এরপর দারুল আরকামে ইসলামের গোপন শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপিত হলে আরকাম ইবনে আবুল আরকাম রা. ওহি লিখে রাখতেন যাতে নতুন মুসলিমদের শিক্ষা দেওয়া যায়। উমার রা. ইসলাম গ্রহণের পর তিনি কুরআন সংরক্ষণ করা শুরু করেন। একইসাথে তিনি কুরআন মুখস্ত করতে থাকেন। যতদূর জানা যায় তিনি প্রথম কুরআনে হাফেজ। 

মাক্কী জীবনের ১৩ বছরে আরো কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন, খালিদ ইবনে সাঈদ রা., যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা., আমির ইবনে ফুহাইরা রা. এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সা'দ রা.।    

যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. আবিসিনিয়ায় হিজরত করার সময় ওহি লিখে নিয়ে যান যাতে সেখানে দাওয়াতের কাজ করা যায়। আব্দুল্লাহ ইবনে সা'দ রা. ছিলেন উসমান রা.-এর দুধভাই। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যান। ইসলামের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখেন। মক্কা বিজয়ের সময় রাসূল সা. যাদের হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি। পরে উসমান রা.-এর সুপারিশে তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পান ও পুনরায় ইসলামে দাখিল হন।  

আল্লাহর রাসূল সা. যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন যায়িদ বিন সাবিত রা. ছিলেন ১১-১২ বছরের কিশোর। তিনি লেখাপড়া জানতেন। মুহাম্মদ সা. তাঁকে কাতিব বা লেখক হিসেবে নিয়োগ দেন। তাঁর দায়িত্ব ছিল মুহাম্মদ সা. ও ইসলামী রাষ্ট্রের সব ডকুমেন্ট লেখা ও সংরক্ষণ। সেই হিসেবে তিনি কাতিবে ওহিও ছিলেন। তিনি কুরআনের সব অংশ সংগ্রহ করেন ও লিখে রাখেন। এটা তাঁর অফিসিয়াল দায়িত্ব ছিল। 

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তাঁর অনুপস্থিতে বহু সাহাবি কাতিব ও কাতিবে ওহি ছিলেন। যারা কাতিব ছিলেন তারা বিভিন্ন চুক্তিপত্র ও নির্দেশনামা লিখেছেন যেমন খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. এবং হানজালা রা. (শহীদ হানজালা নয়)। এছাড়াও মাদানী জীবনে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন উবাই ইবনে কা'ব রা., আবান ইবনে সাঈদ রা. আব্দুল্লাহ বিন যায়দ রা., সাবিত ইবনে কায়স রা., আব্দুল্লাহ ইবনুল আরকাম রা., আলা ইবনুল হাদরামি রা., মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা রা., আলা ইবনুল উকবা রা., মুগিরা বিন শু'বা রা. এবং মু'আবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রা.।

এর মধ্যে মুগিরা বিন শু'বা রা. ছিলেন মুহাম্মদ সা. দেহরক্ষীর মতো। তিনি সবসময় রাসূল সা.-এর নিরাপত্তায় নিজেকে উতসর্গ করেছিলেন। তাই তিনি নানান সময়ে ওহি নাজিলের সাক্ষী ছিলেন এবং বিভিন্ন পত্রাদি ও চুক্তি লিখেছেন। আল্লাহর রাসূল সা.-এর বিশাল কাতিব বাহিনীর সর্বশেষ সংযোজন ছিল মু'আবিয়া রা.। 

তিনি ও তাঁর বাবা মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কা বিজয় ও আরো কিছু অভিযান শেষ করে রাসূল সা. মদিনায় পৌঁছলে তাঁর কাছে আবু সুফিয়ান তিনটি আবেদন করেন, 
১. আমাকে সেনাধিনায়ক করে দিন আমি ইসলামের বিরুদ্ধে যেভাবে যুদ্ধ করেছি এখন ইসলামের পক্ষে সেভাবে যুদ্ধ করবো। 
২. আমার ছেলে মু'আবিয়াকে আপনার কাতিবদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নিন। 
৩. আমার একটি মেয়েকে আপনি স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করুন। 

আল্লাহর রাসূল সা. আবেদনগুলো কবুল করেন ৩য় টি ছাড়া। কারণ ইতোমধ্যে আবু সুফিয়ানের একটি মেয়ে (উম্মে হাবিবা রা.) রাসূল সা.-স্ত্রী ছিলেন।

ইয়ামামার যুদ্ধে যখন বহু হাফিজ সাহাবি শাহদাতবরণ করে তখন আবু বকর রা.  কুরআন সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেক্ষেত্রে তিনি উমার রা. ও যায়িদ বিন সাবিত রা.-কে দায়িত্ব দেন যেন কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ কপি তৈরি করা হয়। তারা কুরআনের একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ সংকলন করে উম্মুল মু'মিনিন হাফসা রা.-এর কাছে সংরক্ষণ করেন।


২২ অক্টো, ২০২১

খাদিজা রা. ও মুহাম্মদ সা.-এর বিয়ে


খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি লোকজনকে নির্দিষ্ট বেতনে ও লভ্যাংশের ভিত্তিতে ব্যবসায়ে নিয়োগ করতেন। ব্যবসায়ী গোত্র হিসেবে কুরাইশদের নাম-ডাক ছিল। মুহাম্মদ সা.-এর সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও চারিত্রিক মহত্ত্বের কথা জানতে পেরে তিনি তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে তাঁর পণ্যসামগ্যী নিয়ে সিরিয়া যাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বললেন যে, এজন্য তিনি অন্যদেরকে যা গিয়ে থাকেন তার চেয়ে উত্তম সম্মানী তাঁকে দেবেন। মাইসারাহ নামক এক গোলামকেও তাঁর সাহায্যের জন্য সঙ্গে দিতে চাইলেন। মুহাম্মদ সা. এই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং খাদীজার পণ্য সামগ্রী ও দাস মাইসারাহকে সাথে নিয়ে সিরিয়ায় রওয়ানা হলেন।

সিরিয়ায় পৌঁছে তিনি জনৈক খ্রিস্টান ধর্মযাজকের গীর্জার নিকটবর্তী এক গাছের নীচে বিশ্রাম করলেন। মুহাম্মদ সা.-এর নিকট নবুয়ত আসার আগে খ্রিস্টানরাই ছিল মুসলিম। ধর্মযাজক মাইসারাহকে জিজ্ঞেস করলেন, “গাছটির নিচে যিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনি কে?” মাইসারাহ বললেন, “তিনি হারামের অধিবাসী একজন কুরাইশ বংশীয় ব্যক্তি।” ধর্মযাজক কললেন, “তিনি শেষ নবী ছাড়া আর কেউ নন!”

মুহাম্মদ সা. তাঁর আনীত পণ্য বিক্রি করে দিলেন এবং নতুন কিছু জিনিস ক্রয় করলেন। অতঃপর তিনি মক্কা অভিমুখে রওনা হলেন। পথে যেখানেই দুপুর হয় এবং প্রচণ্ড রৌদ্র ওঠে, মাইসারাহ দেখতে পায় যে, একটি ছায়া তাদেরকে রৌদ্র থেকে রক্ষা করেছে। মক্কায় পৌঁছে মুহাম্মদ সা. খাদিজাকে তাঁর পণ্যদ্রব্য ও অর্থ বুঝিয়ে দিলেন। প্রায় দ্বিগুণ লাভ হলো খাদিজার। খাদিজা এত লাভ দেখে অবাক হলেন। মাইসারাহ খাদিজাকে যাজকের বক্তব্য ও মুহাম্মদ সা.-কে ছায়াদানের বিষয় অবহিত করলেন।

খাদীজা ছিলেন দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন বুদ্ধিমতি ও সম্ভ্রান্ত মহিলা। মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে এসব শুনে মনে মনে তাঁকে পছন্দ করে ফেললেন। এর আগে বড় বড় সর্দার এবং নেতৃস্থানীয় লোক বিবি খাদিজাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রস্তাবই তিনি গ্রহণ করেননি। মনের গোপন ইচ্ছার কথা খাদিজা রা. তাঁর বান্ধবী নাফিসার কাছে ব্যক্ত করলেন। নাফিসা গিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে কথা বললেন। মুহাম্মদ সা. তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করলেন।

তাঁর চাচারা এই প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করলেন। চাচা হামজা রা. খাদিজার পিতা খুয়াইলিদ ইবনে আসাদের সাথে আলোচনা করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। এরপর ২০ টি উট মোহরানা ধার্য হয়ে বিয়ে হলো। এ বিয়েতে বনি হাশেম এবং মুজার গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সিরিয়া থেকে বাণিজ্যিক সফর শেষ করে ফিরে আসার দুই মাস পর এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

মুহাম্মদ সা.-এর সাথে খাদিজা রা.-এর বিয়ের সময় বয়স কত ছিল তা নিয়ে দু'টি মত রয়েছে। একটি মতামত হচ্ছে মশহুর মানে প্রসিদ্ধ, আর সেটা হলো ৪০ বছর। অন্যটি অপ্রসিদ্ধ তবে অধিকতর সঠিক, আর সেটা হলো ২৭/২৮। ইসলামের ১ম গবেষণাভিত্তিক ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাকের মতে মুহাম্মদ সা.-এর সাথে বিয়ের সময় তাঁর বয়স ২৭/২৮ ছিল।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য সেটা হলো যারা সীরাত রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে দুটি দল রয়েছে। একদল মুহাম্মদ সা.-এর ব্যাপারে আবেগাক্রান্ত হয়ে সীরাত রচনা করেছেন। অন্য দল যুক্তি ও দলিলের নিরিখে ইতিহাস রচনা করেছেন। ১ম দল খাদিজা রা.-এর বিয়ে নিয়ে মুহাম্মদ সা.-এর মহানুভবতা ফুটিয়ে তুলতে চান। তারা এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যেন মুহাম্মদ সা. বয়স্ক খাদিজা রা.-কে বিয়ে করে তাঁর প্রতি করুণা করেছেন।

কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়, বরং উল্টো। দুইবারের বিধবা খাদিজা রা.-কে বিয়ে করার জন্য মক্কার বহু সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী মানুষ আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু খাদিজা রা. সবাইকেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। বরং মক্কার মানুষ অবাক হয়েছে মুহাম্মদ সা.-এর মতো দরিদ্র যুবককে তিনি বিয়ে করেছেন বলে। ২য় দল নানানভাবে গবেষণা করে তাঁর বয়স ২৭/২৮ বলেছেন। আলেমগণ এই মতামতকে অধিকতর সহীহ বলে জানিয়েছেন।

নবুয়তের তিন বছর পর খাদিজা রা.-এর সবশেষ সন্তান আব্দুল্লাহর জন্ম হয়েছিল। যদি খাদিজা রা.-এর বিয়ের বয়স ৪০ হয় তবে আব্দুল্লাহর জন্মের সময় তাঁর বয়স হয় ৫৮ বছর। আর যদি ২৭/২৮ বছর হয় বিয়ের বয়স তাহলে আব্দুল্লাহর জন্মের সময় খাদিজা রা.-এর বয়স হয় ৪৫/৪৬। ৫৮ বছর বয়সে সন্তান জন্মদান, এটা খুবই রেয়ায় বা অলৌকিক ঘটনা। যদি তাই হতো তবে এটা নিয়ে আলাদা আলোচনা তৈরি হতো।

যাই হোক, খাদিজা রা.-এর বিয়ের বয়স ৪০ ছিল এটি ভুল বলা যাবে না, কারণ সঠিক কথা আমরা কোনো হাদিসে পাই না। তবে ২৭/২৮ হওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত। বাকী আল্লাহ ভালো জানেন।

খাদিজার গর্ভে মুহাম্মদ সা.-এর একজন সন্তান ছাড়া বাকি সবার জন্ম হয়। কাসিম, তাহির তাইয়েব, যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও আব্দুল্লাহ। কাসিমের নামানুসারে মুহাম্মদ সা. আবুল কাসিম নামেও খ্যাত হন। কাসিম ও তাহির জাহেলিাতের যুগেই মারা যান। আব্দুল্লাহ নবুয়তের ৩য় বছরে জন্ম নেন ও ৫ম বছরে ইন্তেকাল করেন। কিন্তু মেয়েরা সবাই ইসলামের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে পিতার সাথে হিজরত করেন। খাদিজা রা. নবুয়তের দশম বছরে ইন্তেকাল করেন।

২০ অক্টো, ২০২১

রাসূল সা.-এর মৃত্যুর পর যা ঘটেছিল মদিনায়




আজ ১২ রবিউল আউয়াল। ১১ হিজরির এই দিনে আমাদের নেতা মুহাম্মদ সা. দুনিয়া থেকে ইন্তেকাল করেন। অনেকের মতে আজকের এই দিনে রাসূল সা. জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য মতামত হচ্ছে মুহাম্মদ সা. ৯ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেছেন। মুহাম্মদ সা. বহুবার বলেছেন তিনি সোমবারে জন্মগ্রহণ করেছেন। সেই হিসেবেও ৯ রবিউল আউয়াল সঠিক হয়। আমুল ফিল বা হস্তির বছরে ১২ রবিউল আউয়াল ছিল বৃহস্পতিবার।

মুহাম্মদ সা. আয়িশা রা.-এর কোলে মাথা রাখা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালে সাহাবারা হতাশ হয়ে কান্না করতে থাকে। তখন উমার ইবনুল খাত্তাব রা. দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, “কতকগুলো মুনাফিক বলে বেড়াচ্ছে যে, রাসুল সা. মারা গেছেন। আল্লাহর কসম, তিনি মারা যাননি। তিনি কেবল মূসা আ.-এর মত সাময়িকভাবে আল্লাহর কাছে গিয়েছেন। মূসা আ. চল্লিশ দিনের জন্য আল্লাহর কাছে গিয়েছিলেন। তখন প্রচার করা হয়েছিল যে, তিনি মারা গেছেন। অথচ তার পরে তিনি ফিরে এসেছিলেন। আল্লাহর কসম, মূসার আ. মত রাসূলুল্লাহ সা. আবার ফিরে আসবেন। তিনি রাগান্বিত হয়ে বলেন, যারা বলছে যে, তিনি মারা গেছেন তাদের হাত পা কেটে দেওয়া হবে।

আবু বকর রা. মুহাম্মদ সা.-এর ইন্তিকালের খবর পেয়ে ছুটে এলেন। উমার রা. তখন ঐ কথা বলে চলেছেন। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে তিনি আয়িশার রা.-এর ঘরে রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে চলে গেলেন। তখন তাঁকে একটি কাপড় দিয়ে ঘরের এক কোণে ঢেকে রাখা হয়েছিল। এগিয়ে গিয়ে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখের কাপড় সরিয়ে চুমু খেলেন। অতঃপর বললেন, “আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারিত করে রেখেছিলেন তা আপনি আস্বাদন করেছেন। এরপর আপনার কাছে আর কখনো মৃত্যু আসবে না।” অতঃপর মুখ ঢেকে দিলেন।

আবু বকর রা. এই ঘটনার জন্য আগেই প্রস্তুত ছিলেন। বিদায় হজ্বে যখন দ্বীন পরিপূর্ণ হয়েছে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে তখন থেকেই তিনি জানতেন যে কোনো সময়ই মুহাম্মদ সা. চলে যাবেন। তিনি বাহিরে বেরিয়ে দেখেন উমার রা. সেই একই কথা বলে চলেছেন। তিনি বললেন, “উমার। তুমি ক্ষান্ত হও। চুপ করো।” উমার রা. কিছুতেই থামতে রাজি হচ্ছিলেন না। এ অবস্থা দেখে আবু বকর রা. জনতাকে লক্ষ্য করে কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর কথা শুনে জনতা উমারকে রা.-কে রেখে তাঁর দিকে এগিয়ে এল।

তিনি আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন, “হে জনমন্ডলী, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের পূজা করতো সে জেনে রাখুক যে, মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদাত করতো সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব ও অবিনশ্বর।” তারপর তিনি সূরা ইমরানের ১৪৪ নং আয়াত উল্লেখ করেন,
//মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বৈ আর কিছুই নন। তার পূর্বে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা ইসলাম থেকে ফিরে যাবে? যে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। কৃতজ্ঞ লোকদের আল্লাহ যথোচিত পুরস্কার দেবেন।//

আবু বকর রা.-এর এই বক্তব্যের পর সাহাবারা বুঝতে পারলেন রাসূল সা. আর নেই। উমার রা. একদম শান্ত হয়ে বসে পড়লেন, যেন তিনি সব হারিয়ে ফেললেন। তবে অবশ্য অল্পসময় পর সবাই শোক চেপে রেখে স্বাভাবিক হলেন।

আনসারদের একজন নেতা হলেন সা'দ বিন উবাদা রা.। তিনি খাজরাজদের অন্তর্গত বনু সাঈদা গোত্রের প্রধান। তিনি আকাবার ২য় শপথের সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যেসব মানুষের কারণে মদিনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। মুহাম্মদ সা. আনসারদের নেতা হিসেবে তাকে বিবেচনা করতেন। কোনো ব্যাপারে আনসারদের মনোভাব জানতে মুহাম্মদ সা. সবসময় সা'দ বিন উবাদা রা.-কে জিজ্ঞাসা করতেন। তাঁর নেতৃত্বের যোগ্যতা থাকায় শুধু খাজরাজরা নয়, আওস গোত্রের লোকেরাও তাঁকে নেতা মানতেন।

মুহাম্মদ সা.-এর মৃত্যুর পর বনু সাঈদা গোত্রে খাজরাজদের একদল লোক সমবেত হলো। তারা সা'দ বিন উবাদার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে তাকে আমীর ঘোষণা করলো। আলী রা.-এর ঘরে ছিল তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা.। তারা এখন এসব ঝামেলায় জড়াতে চাননি। একদল লোক তাদের আনুগত্য করলো। তারা সম্ভবত আলী রা.-কে পরিবারের সদস্য হিসেবে নেতা মানতে চেয়েছিল। আওস গোত্রের শাখা আব্দুল আশহাল গোত্রের নেতা উসাইদ বিন হুদাইর রা.-এর নেতৃত্বে কিছু সাহাবী আলাদা হয়ে তাকে আমীর ঘোষণা করলো। অল্প সময়ের মধ্যে সাহাবারা তিনভাগ হয়ে গেল। সা'দ বিন উবাদা রা.-এর নেতৃত্বে বেশি মানুষ জমায়েত হলো। তিনজন নেতা দেখা দিলেও মদিনার বেশিরভাগ সাহাবী এই তিনদলের কারো সাথেই যুক্ত হননি। মুহাজিররা সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য আবু বকর রা.-এর কাছে হাজির হলো।

এই প্রসঙ্গে উমার রা. বলেন, //রাসূলুল্লাহ সা. ইন্তিকালের পর আমরা খবর পেলাম আনসারগণ আমাদের বিরোধিতা করছেন। তাঁরা বনু সাঈদা গোত্রের চত্বরে তাঁদের গণ্যমান্য মুরব্বীদের নিয়ে সমবেত হলেন। আলী রা., তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা., যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. ও তাঁদের সহচরগণ আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাইলেন। আর আবু বকর রা.-এর কাছে জমায়েত হলেন মুহাজিরগণ। আমি আবু বকরকে বললাম, “আপনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের আনসার ভাইদের কাছে চলুন।”

তাদের কাছে যাওয়ার পথে তাদের দু’জন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সাথে আমাদের দেখা হলো। তারা আনসারদের মনোভাব জানালেন। অতঃপর আমরা বনু সাঈদা গোত্রে গেলাম। আমরা সেখানে বসলে তাঁদের এক বক্তা আল্লাহর একত্ব ও রাসূলের রিকালাতের সাক্ষ্য দিয়ে এবং আল্লাহ যথোচিত প্রশংসা করে ভাষণ দিতে শুরু করলেন। বললেন, “আমরা আল্লাহর আনসার এবং ইসলামের বীর সেনানী। আর হে মুহাজিরগণ! আপনার আমাদেরই একটি দল। আপনাদের একটি শান্তশিষ্ট মরুচারী দল আমাদের সাথে এসে ইতোমধ্যেই যোগদান করেছে।”

উমার বলেন, আমরা দেখতে পেলাম, তারা আমাদেরকে আমাদের মূল আদর্শ থেকেই বিচ্যুত করতে চাইছে এবং তার ওপর জোরপূর্বক নিজেদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যত হয়েছে। আমি এর জবাবে চমৎকার একটা বক্তৃতা তৈরি করলাম এবং তা আমার নিজের কাছে অত্যন্ত যুৎসই মনে হয়েছিল। আমি আবু বকরকে শোনাতে চাইলাম। আবু বকরের মধ্যে এক ধরনের তেজস্বিতা ছিল যার জন্য তাঁকে আমি খুবই ভয় পেতাম এবং যথাসম্ভব তাঁর মনরক্ষা করে চলার চেষ্টা করতাম।

আবু বকর বললেন, “উমার। তুমি কিছু বলো না।” তিনি তাঁদের কথার এত সুন্দরভাবে জবাব দিলেন যে, আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমি যে বক্তব্য তৈরি করে এটি ছিল তার চাইতেও অনেক সুন্দর। তিনি বললেন, “তোমরা নিজেদের মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী ও অবদান সম্পর্কে যা বলেছো তা যথার্থ বলেছো। আবার এ কথাও অনস্বীকার্য যে, এই কুরাইশ গোত্রের অবদান না থাকলে আরবরা ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানতে পারতো না। তারা আরবদের মধ্যে মধ্যম ধরনের বংশীয় মর্যাদার অধিকারী এবং তাদের আবাসিক এলাকাও সমগ্র আরব জাতির মধ্যস্থলে অবস্থিত। আমি তোমাদের সবার জন্য এই দুইজনের যেকোনো একজনকে পছন্দ করি। তোমরা এদের মধ্যে যাকে পছন্দ করো তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হও ও বাইয়াত করো।” এই বলে তিনি আমার ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহর হাত ধরলেন। তাঁর এই শেষের কথাটি ছাড়া আর কোনো কথা আমার কাছে খারাপ লাগেনি। আল্লাহর কসম, আমার মনে হচ্ছিল, আবু বকর থাকতে অন্য মুসলমান নেতা হতে পারে না।

আবু বকরের এই ভাষণের পর আনসারদের একজন বললেন, “আমরা আরবদের মধ্যে বুদ্ধিমত্তায় যেমন নির্ভরযোগ্য, মান মর্যাদায়ও তেমনি শ্রেষ্ঠ। সুতরাং আমাদের পক্ষ থেকে একজন এবং তোমাদের (কুরাইশদের) তরফ থেকে আরো একজন আমীর হোক।” এরপর প্রচুর বাকবিতন্ডা হলো এবং বেশ চড়া গলায় কথা কথাবার্তা হতে লাগলো। আমার আশংকা হলো যে, শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের দুই গোষ্ঠী মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে একটা বিভেদ বা কলহের সৃষ্টি হয়ে না যায়। আমি (সকল বিতর্কের অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্যে) তৎক্ষণাৎ বললাম, “হে আবু বকর! আপনার হাতখানা বাড়িয়ে দিন।” তিনি বাড়িয়ে দিলেন। আমি তার হাত ধরে বাইয়াত করলাম। এরপর মুহাজিররা বাইয়াত করলেন। তারপর আনসাররাও বাইয়াত করলেন। এরপর আমরা সা’দ ইবনে উবাদাকে বকাঝকা করতে আরম্ভ করলাম। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের একজন বললেন, “তোমরা সা’দ ইবনে উবাদাকে কোণঠাসা করে দিলে।” আমি বললাম, “আল্লাহই সা’দ ইবনে উবাদাকে কোণঠাসা করে দিলেন।”//

নেতা নির্বাচন নিয়ে ঘটে যাওয়া এসব কাণ্ডের কারনে সোমবার গত হয়ে যায়। মঙ্গলবারের রাত চলে আসে। আরবি ক্যালেন্ডার অনুসারে দিন শুরু হয় সূর্য অস্ত যাওয়ার পর সন্ধ্যা থেকে। মঙ্গলবার সকালে আবু বকর রা. নামাজ শেষে মিম্বরে বসলেন। রাসূল সা. অসুস্থ থাকতেই মসজিদে নববিতে আবু বকর রা. ইমামতি করতেন। আমীর হিসেবে বাইয়াত নেওয়ার পরও তার ব্যতিক্রম কিছু হয়নি। আবু বকর রা. কিছু বলার আগে উমার রা. তার অনুমতি কিছু বলার জন্য দাঁড়ালেন।

আল্লাহর প্রশংসা করে তিনি বলেন, “হে জনতা! গতকাল আমি তোমাদেরকে যে কথা বলেছিলাম [অর্থাৎ মুহাম্মদ সা. মারা যাননি, তিনি মুসা আ. মত সাময়িকভাবে অন্তর্ধান হয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি] তা আমি কুরআন থেকে পাইনি এবং রাসূলুল্লাহু সা.ও আমাকে তা বলেননি। আমার ধারণা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের সমষ্টিগত জীবনের সকল দিক পুরোপুরিভাবে গুছিয়ে দিয়ে সবার শেষে ইনতিকাল করবেন। কিন্তু আসলে তা ঠিক নয়।

আল্লাহর যে কিতাব দ্বারা তাঁর রাসূল সা.কে নিজের মনোনীত লক্ষ্যে পরিচালিত করেছেন সে কিতাব আল্লাহ তোমাদের মধ্যে বহাল রেখেছেন। এই কিতাবকে যদি তোমরা আঁকড়ে ধর তাহলে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যেদিকে পরিচালিত করেছেন সেদিকে তোমাদের চালিত করবেন। আজ আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যিনি শ্রেষ্ঠতম তাঁর কাছেই তোমাদের নেতৃত্ব সমর্পণ করেছেন। তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ সা.-এর অন্যতম সঙ্গী, সওর পর্বত গুহায় তাঁর একনিষ্ঠ সহচর। অতএব তোমরা তাঁর কাছে বাইয়াত করে তাঁকে খলিফা বা আমীর হিসাবে গ্রহণ করো।” উমার রা.-এর এই কথার পর সাহাবার একযোগে সবাই বাইয়াত করলো। যারা গতকাল করেছিল তারা আজ আবার বাইয়াত করলো।

অতঃপর আবু বকর রা. বক্তব্য রাখলেন। প্রথমে আল্লাহর যথোচিত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, “হে জনতা! আমাকে তোমাদের দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে। আসলে আমি তোমাদের চেয়ে উত্তম নই। আমি যদি ভাল কাজ করি তাহলে আমাকে সাহায্য করবে। আর যদি অন্যায় করি তাহলে আমাকে শুধরে দেবে। সত্যবাদিতাই বিশ্বস্ততা। আর মিথ্যাবাদিতা হলো বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের কাছে যে দুর্বল বিবেচিত হয়ে থাকে সে আমার শক্তিশালী যতক্ষণ আমি আল্লাহর ইচ্ছায় তার প্রাপ্য হক না দিতে পারবো। আর তোমাদের মধ্যে যে শক্তিশালী বিবেচিত হয়ে থাকে তার কাছ থেকে যতক্ষণ প্রাপ্য হক আদায় না করবো ততক্ষণ সে আমার কাছে দুর্বল।

মনে রেখ কোনো জাতি আল্লাহর পথে জিহাদ ত্যাগ করলে আল্লাহ তাকে লাঞ্চনা গঞ্জনা ও বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেন। আর অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও নোংরামি যে সমাজে ব্যাপক আকার ধারণ করে সে সমাজকে আল্লাহ বিপদ মুসিবত ও দুর্যোগ দিয়ে ভরে দেন। যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করবো ততক্ষণ তোমরা আমার কথামতো চলবে। কিন্তু যখন আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবো তখন তোমাদের আনুগত্য আমার প্রাপ্য হবে না। তোমরা নামাযের প্রতি যত্নবান থেকো আল্লাহ তোমাদের ওপর রহমত নাযিল করুন।”

আবু বকর রা. বাইয়াত সুসম্পন্ন হওয়ার পর মঙ্গলবার দিন জনগণ রাসূলুল্লাহ সা.-এর দাফনের আয়োজন করলো। আলী রা., আব্বাস রা., ফযল ইবনে আব্বাস রা., কুসাম ইবনে আব্বাস রা., উসামা ইবনে যায়িদ রা. ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুক্ত গোলাম শাকরান রা. তাঁকে গোসল দেয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত হলেন। আওস রা. আলী রা.-কে বললেন, “হে আলী! আল্লাহর দোহাই। রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাফন-দাফন আমাদের অংশ নিতে দেয়ার ব্যবস্থা করুন।”

আলী রা. বললেন, “এসো।” তিনি এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোসলে অংশগ্রহণ করলেন। গোসলের আয়োজন করতে গিয়ে গোসলের দায়িত্বে নিয়োজিত লোকেরা মতবিরোধের শিকার হলেন। প্রশ্ন ছিল এই যে, অন্যান্য মৃতের মত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাপড় খুলে ফেলে গোসল দেওয়া হবে, না কাপড় গায়ে রেখেই গোসল দেওয়া হবে। এই মতভেদ চলাকালে সহসা আল্লাহ তাদের ওপর ঘুম চাপিয়ে দিলেন। ঘুমের কারণে সকলেরই মুখ রাসূলুল্লাহ সা.-এর বুকের ওপর এসে পড়লো। সেই অবস্থায় ঘরের একপাশ থেকে এক অচেনা ব্যক্তি তাদেরকে বললো, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাপড় গায়ে রেখেই গোসল দাও।” এই কথা শুনে সবাই হতচকিত হয়ে জেগে ওঠলেন এবং সকলেই এই কথা শুনেছেন বলে জানালেন। অতঃপর জামা গায়ে রেখেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গোসল দেওয়া হলো এবং কাপড়ের ওপর দিয়েই গা কচলানো হলো।

রাসূলুল্লাহ সা.-এর গোসল সম্পন্ন হলে তিনটি কাপড় দিয়ে কাফন পরানো হলো। মঙ্গলবার রাসূলুল্লাহ সা.-কে কাফন ও গোসল দিয়ে তাঁর বাড়ীতে তাঁর খাটে শুইয়ে রাখা হলো। এরপর দাফন নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে আবার মতান্তর ঘটলো। কেউ বললেন, মসজিদে নববীতে দাফন করবো।” কেউ বললেন, “অন্যান্য সাহাবীদের কবরের পার্শ্বে দাফন করবো।” আবু বকর রা. মীমাংসা করে দিলেন এই বলে যে, রাসূলুল্লাহ সা.-কে আমি বলতে শুনেছি যে, প্রত্যেক নবীকে তার ইনতিকালের জায়গাতে দাফন করা হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সা. যে বিছানার শুয়ে ইনতিকাল করেছিলেন তা তুলে ফেলে তার নীচেই কবর খনন করা হলো।

এরপর শুরু হলো জানাজার নামাজ। রাসূল সা.-এর জানাজার নামাজ অন্য মুসলিমদের মতো জামায়াতবদ্ধভাবে হয়নি। রাসূল সা.-কে তাঁর ছোট্ট ঘর থেকে বের করা হয়নি। তিনি সেখানেই ছিলেন। এরপর একে একে সাহাবারা সেই ঘরে প্রবেশ করলেন ও জানাজার নামাজ পড়লেন। এভাবে প্রথমে সকল পুরুষরা পড়লেন, তারপর মহিলারা অবশেষে শিশু-কিশোররা জানাজার নামাজ পড়লেন। এভাবে কেন হয়েছে তা অনেক চেষ্টা করেও সঠিকভাবে জানতে পারিনি।

এভাবে জানাজার নামাজ পড়তে গিয়ে অনেক সময় লেগেছে। মঙ্গলবারের সূর্য অস্ত গিয়েছে। বুধবারের রাত চলে এসেছে। এরপরও জানাজা চলছিল। মধ্যরাতে জানাজা শেষ হলে মুহাম্মদ সা.-কে কবরস্থ করা হলো। মহানবীকে কবরে শোয়ানোর জন্য রাসূল সা. তিনজন চাচাতো ভাই আলী রা., ফজল রা., কুসাম রা. ও আজাদকৃত দাস শাকরান রা.। আল্লাহর রাসূল সা.-এর ইন্তিকালের পর প্রায় ৪০-৪৫ ঘন্টা পর তাঁর দাফন সম্পন্ন হলো।

দাফন সম্পন্ন হলে আলী রা. আব্বাস রা.-সহ নিকটাত্মীয়রা জানতে পারলো আবু বকর রা. খলিফা হিসেবে বাইয়াত নিয়েছেন। অভিষেক ভাষণও দিয়ে ফেলেছেন। এতে তাঁরা ভীষণভাবে আহত হন। তাঁদের কাছে পুরো প্রেক্ষাপটও জানা ছিল না। তাঁরা মুহাম্মদ সা.-এর লাশের পাশেই ছিলেন এবং লাশ সামলানোকেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে নিয়েছেন। মুহাম্মদ সা. এর রাজনৈতিক উত্তরসূরী নির্ধারিত হয়ে গেল অথচ তার পরিবার কোনো পরামর্শও দিতে পারলো না এটা তাঁদের ব্যথিত করলো।

আলী রা.সহ অন্যদের এই মনঃকষ্ট দূর হতে প্রায় ছয়মাসের মতো সময় লেগেছে। আবু বকর রা. সেসময় নানান সমস্যায় পড়েছিলেন। চারদিকে মানুষ মুরতাদ হয়ে যাচ্ছিল, মিথ্যা নবী দাবীদার বের হয়েছিল, মুসলিমরা জাকাত দিতে অস্বীকার করছিল। এসব পরিস্থিতিতে আলী রা. অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আবু বকর রা.-কে সাহায্য করেছেন এবং মুসলিম রাষ্ট্রের ঐক্য ফিরিয়ে আনতে শক্ত ভূমিকা রেখেছিলেন।

আলী রা.-এর উগ্র অনুসারী শিয়াদের কেউ কেউ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবু বকর রা.-এর খিলাফতকে অস্বীকার করেন। এটা সঠিক নয়। তারা বলতে চান আলী রা. বাধ্য হয়ে আবু বকর রা.-এর আনুগত্য করেছেন। বাস্তবতা হচ্ছে আলী রা. কখনো এই জন্যে বাইয়াত নিতে দেরি করেননি যে, তিনি আবু বকর রা.-কে অযোগ্য মনে করেন বা তাকে অপছন্দ করেন। বরং তারা ঘটনার পরম্পরায় ব্যথিত হয়ে বাইয়াত নিতে দেরি করেছেন।

বস্তুত আলী রা. আবু বকর রা.-কে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন ও ভালোবাসতেন। আবু বকর রা.-এর সাথে মিলিয়ে তিনি তার নাতির নাম রেখেছেন আবু বকর। আলী রা. আবু বকর রা.-কে অপছন্দ করতেন বা তার নেতৃত্ব আন্তরিকভাবে মেনে নেননি এই দাবি ভুয়া ও অগ্রহণযোগ্য।