গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২ মে, ২০২৫

বেহেশতি কবর

১.
হালকা বাতাস বইছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভেজা মাটি থেকে ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছিল। পরিবেশটা বেশ মোহনীয়। কাগজি লেবু গাছ থেকে ভেসে আসছে হালকা সুবাস। কিন্তু লেবু গাছের পাশে বসে থাকা তামান্নার জন্য এটা মোটেই ভালো দিন নয়। সে বসে আছে সদ্য খোঁড়া একটি কবরের পাশে। যার জন্য কবরটি খোঁড়া হয়েছে তিনি তামান্নার বাবা। না, তার বাবা এখনো মৃত্যুবরণ করেন নি। তবে করবেন। তাই আগেই এতো আয়োজন।

কবরের এক পাশে তামান্না তার মেজ বোন রোকেয়ার হাত ধরে বসে আছে। অন্যপাশে আছে তার মা ও বড় বোন ফাতিমা। তারা অপেক্ষা করছে একটি লাশের। কিন্তু যার লাশ তিনি এখনো জীবিত।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। বার বার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে সে। ঠিক ৬ টা বাজলেই মৃত্যুবরণ করবে তার বাবা। কান্না করতে করতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। তামান্নার খুব অভিমান হচ্ছে, রাগ হচ্ছে বাবার প্রতি। তার মনে হচ্ছে তার বাবা তাদের কথা ভাবেন নি। ভাবেন নি ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের কথা। তিনি কেবল ভেবেছেন তার আদর্শের কথা। তিনি কেবল ভেবেছেন তার রাজনীতির কথা।

কী দরকার ছিল দেশে ফেরার! যদি বিদেশে থাকতেন তবে তো আজ এই দিনের দুঃসহ অপেক্ষায় থাকতে হতো না। একথা সেকথা ভাবতে ভাবতে তামান্না চিন্তা করলো, বাবার সাথে আমার বিশেষ স্মৃতি কী? বাবা কি আমাকে বিশেষভাবে ভাবতেন? পাঁচ ভাইবোনের মাঝে আমি সবার ছোট, আমার জন্য কি বাবার বিশেষ স্নেহ ছিল?

তামান্না তেমন কিছু খুঁজে পায় না। সে খুব হতাশ হয়। হঠাৎ তার পঞ্চম শ্রেণির একটা কথা মনে পড়ে। খুব দুষ্টামি করার কারণে প্রায়ই তামান্নার বিরুদ্ধে বাবার কাছে অভিযোগ করতো তার মা। ৫ম শ্রেণির ফার্স্ট টার্ম শেষে তার রেজাল্ট হলো। রেজাল্টে তামান্না দুইটি বিষয়ে খুবই খারাপ করে। মোটের ওপর রেজাল্ট ভালো না। মা অনেক বকাঝকা করে। রাতে বাবা বাসায় ফিরলে মা এই বিষয়ে অভিযোগ করে এবং তামান্নার বাবাকেও বকাঝকা করে। তামান্নার বাবা’র প্রশ্রয়েই নাকি তামান্নার এই অধঃপতন।

তামান্নার মায়ের বকাঝকা শুনে বাবা খুবই রাগান্বিত হয়ে যান। তিনি হঠাৎ করে তামান্নাকে কষে একটি চড় লাগিয়ে দেন। শুধু তামান্না নয়, ঘরের সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বেশি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েন মীর আফজাল নিজেই।

তামান্না কী কান্না করবে, তামান্নার আগেই কেঁদে ফেলেন বাবা মীর আফজাল। রাগের মাথায় ছোট মেয়েকে চড় বসিয়ে দিয়েছে এই অনুশোচনায় তিনি পাগল হয়ে যান। তামান্নাকে কোলে তুলে আদর করতে থাকেন। পাগলের মতো মেয়ের গালে চুমু দিতে থাকেন। তামান্নার ফর্সা গালে চড়ের দাগ বসে যায়। সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারেননি আফজাল সাহেব।

তামান্নার আজ হঠাৎ করে এক যুগ আগের ঘটনাটি মনে পড়লো। গালে হাত দিয়ে সে যেন অনুভব করতে লাগলো সেই চড়ের দাগ। মেঝ বোনের কানের কাছে জিজ্ঞেস করলো,
- আপু, তোকে কি কোনোদিন আব্বু মেরেছে?
- না তো, কোনোদিন মারে নাই।
আস্তে করে বোনের পাশ থেকে উঠে গিয়ে বড় বোনের পাশে গিয়ে বসলো
- বড় আপু, তোকে কি আব্বু কোনোদিন মেরেছে?
- (বড় বোন অবাক হয়ে) না, কোনোদিন মারে নি।

এবার তামান্না মায়ের পাশে গিয়ে বসে।
- মা, বাবা কি কখনো তার সন্তানদের মেরেছে?
- না, কোনোদিন তোদের বাবা তোদের মারে নি।
- আমাকে একদিন মেরেছে
- কবে? আমার তো মনে পড়ে না।
- ঐ যে একদিন, রেজাল্ট খারাপ করেছি। তুমি বকাঝকা করেছো। আব্বু রাতে এসে আমাকে একটি চড় মারলো। পরে আমিও কেঁদেছি, সেও কেঁদেছে।
- (মায়ের মনে পড়ে) হ্যাঁ, ঐ একদিনই।
- জানো মা, আমি ছাড়া কোনো সন্তানের কাছেই বাবার স্মৃতি নেই। আমার গালে এখনো আমি বাবার হাতের স্পর্শ পাচ্ছি।
- তুই তোর বাবার প্রতি অভিমান করিস না।
- না মা… এটা আমার সৌভাগ্য। বাবার এই স্পর্শ আমার বাকী জীবনের সম্বল
(এই বলে গাল স্পর্শ করে কাঁদতে থাকে তামান্না)

২.
কাতারের এয়ারপোর্টে মীর আফজাল।
কাতারে এসেছেন আল জাজিরা পরিদর্শনে। তাদের নিউজরুম সেটআপ, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি দেখতে এসেছেন। দেশে এরকম একটি আধুনিক নিউজ চ্যানেল চালু করার প্রক্রিয়ায় আছেন তিনি। এখান থেকে যাবেন আমেরিকায় ছোট ভাইয়ের কাছে। তাছাড়া আমেরিকায় একটি কনফারেন্সেও অংশ নেবেন।

বিমানে উঠতে যাবেন এমন সময় তার সহকারী বাংলাদেশ থেকে ফোন দিয়ে বললেন, স্যার আপনার নামে একটি রিপোর্ট হয়েছে পত্রিকায়। আফজাল সাহেব গুরুত্ব দেন নি। তিনি বললেন, ঠিক আছে, পরে কথা বলবো। আমি এখন বিমানে উঠবো। এই বলে তিনি কল কেটে দেন।

ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসন চলছে। ইসলামপন্থী নেতা আফজাল সাহেব শুরু থেকে ফ্যাসিস্ট হাসিনার চোখের বালি। তাই সরকারি স্পন্সরে প্রায়ই তার বিরুদ্ধে পত্রিকাগুলো রিপোর্ট করে। এটা নতুন কিছু নয়।

আমেরিকায় তাকে স্বাগত জানালেন আফজাল সাহেবের ছোট ভাই। বললেন, ভাই বাংলাদেশে তোমার বিরুদ্ধে তো আজ বেশ তোলপাড় হয়ে গেল। একগাল হেসে আফজাল সাহেব বললেন, এ আর নতুন কী?

ছোট ভাই বললেন, না, এটা নতুন। বাংলাদেশে পত্রিকাগুলো রিপোর্ট করেছে তুমি নাকি দেশ থেকে পালিয়ে কাতার চলে গেছো? এটা নিয়ে দেশে খুব তোলপাড় হচ্ছে। সাংবাদিকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনকে ধরেছে তোমার বিষয়ে। সাহারা খাতুন বলেছে, তোমাকে যেভাবেই হোক দেশে ফেরত নেবে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহায়তা নেবে।

তাই নাকি? ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দিয়ে আফজাল সাহেব বললেন, সাহারার এতো কষ্ট করতে হবে না। আমি নিজেই দেশে যাবো।

ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফেরত নিবে এই কথা মীর আফজাল সাহেবকে বেশ অপমানিত করেছে। দাগী আসামীদের মতো ইন্টারপোলের কথা বলায় তার জেদ চেপে গেছে। আফজাল সাহেব আমেরিকার কাজকর্ম শেষে গেলেন মিশরে। সেখানে কিছু ব্যবসায়িক মিটিং শেষে বাংলাদেশে ফিরে এলেন। বিমানবন্দরে তিনি অজস্র সাংবাদিকের মুখোমুখি হলেন।

- স্যার আপনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হচ্ছে জেনেও কেন ফিরে এলেন?
- আমি তো কোনো অপরাধ করি নাই। মামলা নিয়ে চিন্তিত নই। মামলা হলে আদালতে লড়বো।
- আপনি পালিয়ে গেলেন কেন?
- আপনার কি দেখে মনে হয়েছে, আমি পালিয়ে গেছি? আর যদি পালাতাম তাহলে ফিরলাম কেন?
- আপনি কি যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত?
- আমার স্পষ্ট কথা, আমি কোনো যুদ্ধাপরাধ তো দূরের কথা। আমি কোনো অন্যায়ের সাথেই জড়িত নই।
- আপনার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে খুন ও ধর্ষনের অভিযোগ আছে। এই ব্যাপারে কী বলবেন?
- অভিযোগ কে করেছে? আপনি? আমি তো এমন কোনো অভিযোগ বা মামলার কথা এখনো জানি না। আপনার ফ্যসিস্ট হাসিনার ভাষায় আমাকে অহেতুক প্রশ্ন করছেন। আজ এই পর্যন্তই…

সাংবাদিকদের পাশ কাটিয়ে মীর আফজাল সাহেব গাড়িতে চেপে বসলেন। কপালে চিন্তার ভাঁজ। গাড়ি চলছে সাঁই সাঁই।

বাসায় ফেরার পর সবাই খুবই তটস্থ। কী হবে সামনে এই নিয়ে সবাই খুব চিন্তিত। আত্মীয়রা সবাই টিভিতে খবর দেখেছে। দেখেছে সাংবাদিকদের সাথে আফজাল সাহেবের সাক্ষাৎকার। বিচলিত হয়ে সবাই ফোন করছে। মীর আফজাল সাহেব স্বভাবসুলভ শান্তভাবে সবাইকে বললেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।

সপ্তাহখানেক পর আফজাল সাহেবের সব ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ করে দিলো সরকার। আফজাল সাহেব বুঝতে পারলেন তিনি সহসাই গ্রেপ্তার হতে চলেছেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসলেন। পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে যেতে অনুরোধ করলেন। তিনি শান্তভাবে বললেন আমি পালিয়ে গেলে আমারই অপমান। সবাই ভাববে আমি সত্যিকারের অপরাধী। আমি সমাজের সামনে তোমাদের, আত্মীয়দের ও আমার রাজনৈতিক দলের লোকদের ছোট হতে দিবো না। আমি মামলা লড়বো।

৩.
আজকে বেশ কর্মব্যস্ত দিন গিয়েছে মীর আশরাফের। মীর আশরাফ তরুণ ব্যারিস্টার। আফজাল সাহেবের ছেলে। আজকে দুপুরের ডিবি পু্লিশের একটি দল আফজাল সাহেবকে তুলে নিয়ে গেছে।

আফজাল সাহেবকে বেশ কয়েকটি মিথ্যা মামলা দিয়েছে হাসিনা সরকার। সবগুলো মামলাই বহু আগের, যখন তিনি ছাত্র ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন।

আশরাফ তার বাবার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের কপি নিয়েছে। বাবার সাথে কথা বলেছে। কীভাবে অভিযোগগুলো মিথ্যা প্রমাণ করবে তা নিয়ে তার টিম মেম্বারদের সাথে কথা বলেছে। তারা বেশ কনফিডেন্ট। মামলাগুলো একেবারেই ঠুনকো। সবগুলো অভিযোগই উড়িয়ে দেওয়া যাবে।

পরিবারের সদস্যরা প্রতি শনিবার দেখা করতে যায় কারাগারে। সেখানে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলেন মীর আফজাল। দেখতে দেখতে তিন বছর পার হয়ে গেলো। ট্রাইব্যুনালের রায়ের দিন এলো।

মীর আফজালের পরিবার ধরে নিয়ে নিয়েছে তিনি খালাস পাবেন সব মামলা থেকে। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের গৃহপালিত বিচারকরা মীর আফজালকে ফাঁসীর আদেশ দিলো। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো পরিবারের সদস্যরা। মীর আফজাল স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বললেন, ধৈর্য ধরো, আমার শাহদাতের মধ্য দিয়ে এদেশে ইসলামের বিপ্লব সূচিত হবে ইনশাআল্লাহ।

এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মুষড়ে পড়ে ছোট ছেলে আশরাফ। কারণ লড়াইটা তার ছিলো। সে তার বন্ধুদের সাথে কথা বলে। অনেকের কাছ থেকে সে পরামর্শ পায়, এই মামলাটিকে আন্তর্জাতিক কম্যুনিটির কাছে নিয়ে গেলে ন্যয়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ব্যরিস্টার আশারাফ সেই চেষ্টা করে।

আপীল বিভাগে শুনানীর আগে সরকার ভাবলো, যদি আশরাফ বাইরে থাকে তবে মীর আফজালকে হয়তো ফাঁসী দেওয়া যাবে না। মীর আশরাফ বাবাকে বাঁচাতে হেন চেষ্টা নেই, যা সে করছে না।

এদিকে মীর আফজালের পরিবার নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। আত্মীয় ও বন্ধুরা একে একে তাদের ছেড়ে যেতে শুরু করে। তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রায় সবই হাতছাড়া হয়ে যায়। মীর আফজালের বড় ছেলে থাকে কানাডায়। তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। দেখতে দেখতে ঘনিয়ে এলো আপিলের রায়ের দিন।

একদিন মীর আশরাফের বাসা ঘিরে ফেলে শত শত পুলিশ। টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে যায় তাকে। কোথাও পাওয়া যায় না তাকে। এভাবে এক সপ্তাহ চলে গেলো। মীর আফজালের স্ত্রী চূড়ান্ত অসহায় হয়ে পড়েন। একদিকে ছেলে নিখোঁজ অন্যদিকে স্বামী মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায়।

৪.
রাত দশটা! হঠাত সাইরেনের শব্দ শুনতে পায় তামান্না। আব্বু আসতেছে আব্বু আসতেছে বলে চিৎকার করে ওঠে সে। চার বছর পরে তিন মেয়ে তাদের বাবাকে আজ কারাগারের বাইরে দেখতে পাবে। আজ তাদের বাবার মুক্তি মিলেছে।

একে একে দশটি পুলিশের গাড়ি এসেছে। তামান্নাদের গ্রামের বাড়ি পুরোটাই ঘিরে ফেলেছে তারা। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানো হলো মীর আফজাল সাহেবের ভারী শরীর। কেমন যেন নির্ভার, সৌম্য, শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন এক মুখচ্ছবি। চারদিকে যেন মিষ্টি ঘ্রাণ।

তামান্না তার মৃত বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। কী সুন্দর ঘুমাচ্ছে মানুষটা। একটা হাত টেনে নিয়ে গালে লাগিয়ে তামান্না বলে ওঠে, আহ যদি চড় দিয়ে শাসন করার জন্যও তুমি থেকে যেতে!! তিন মেয়ে ভাগাভাগি করে বাবার হাত ধরে বসে থাকে।

এদিকে পুলিশ তাড়া দিতে থাকে দ্রুত দাফন করার জন্য। ততক্ষণেও মীর আফজালের ছেলে ব্যারিস্টার আশরাফকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ছেলে ও স্বামীর শোকে নির্বাক মীর আফজালের স্ত্রী।

হঠাৎ তামান্না খেয়াল করে তার বাবার বাম হাত মুঠি করা। হাতের মধ্যে যেন কিছু একটা। মুঠি খুলে দেখতে পায় একটি চিরকুট। খুব ছোট ছোট করে লেখা।

//আমার তিন আম্মু!!
নিজেকে বড় স্বার্থপর মনে হচ্ছে আজ।
তোমাদের একটি জাহান্নামে রেখে আমি রওনা হলাম জান্নাতের দিকে। তোমাদের আল্লাহর জিম্মায় রেখে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ আগামীকাল দেখা হবে।//

দাফন হয়ে গেলো। চাঁদটা বেশ আলো ছড়াচ্ছে। লেবু গাছ থেকে ছড়িয়ে পড়া সুবাস আরো তীব্রতর হলো। সবাই ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক অসহায় মা ও তার তিন মেয়ে। কেন যেন তাদের এখন আর দুঃখ হচ্ছে না। সবাই যেন কোথা থেকে প্রশান্তি পাচ্ছেন।

তামান্না বলে উঠলো, দেখো মা! বাবা সবসময় ছিল আমাদের প্রোটেক্টর। সে আগে আগে পরকালে গিয়ে আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে রাখবে। দেখবে আমাদের পরকাল নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। আমরা যখনই মৃত্যুবরণ করবো, দেখবো বাবা একগাল হেসে বলবে, আয় মা, বুকে আয়।

শেষ রাত! চারটা মানুষ! একটু দূরে একটা কবর! লেবুর সতেজ মোহনীয় ঘ্রাণ। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। চাঁদের আলো। যেন বেহেশত নেমে এসেছে মীর আফজালের কবর ঘিরে।

গল্প:
২ মে ২০২৫

১৮ জানু, ২০১৮

মেরুদন্ড


চিৎকার করে সাহায্য চাইতে লাগলো আসিফ। স্যার আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। স্যার দেখুন স্যার, স্যার... ... ... স্যা...র...। ডিপার্টমেন্ট চেয়ারম্যান ড. বদরুদ্দোজার কিছুই করার নেই। চিৎকার শুনে অন্যান্য স্যারদের সাথে তিনিও বেরিয়েছেন। কিন্তু অপহরণকারীদের দেখে তিনি চুপসে গেলেন। তার কিছুই করার নেই। এমনকি পুলিশ ডাকারও। একবার পুলিশ ডেকে ভয়ংকর হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। আর পুলিশ ডাকলে সমস্যা আরো বাড়বে বৈ কমবে না। পুলিশ অপহরনকারীদের কিছুই বলবে না উল্টো আসিফকেই এরেস্ট করবে। রিমান্ডে নিবে, এমনকি মেরেও ফেলতে পারে! 

নিজের রুমে প্রবেশ করলেন ড. বদরুদ্দোজা। মাঝে মাঝে তার খুব মনে হয় এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে। কিন্তু উপায় নাই, কারণ এসব অপহরণকারীদের তিনি এবং তার মতো শিক্ষকরাই তৈরী করেছেন। তাদের দ্বারা একের পর এক অবৈধ কাজ করিয়ে তাদের সাহস বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি সরকারপন্থী শিক্ষক। ক্ষমতাবান। আর এই ক্ষমতার অবৈধ প্রয়োগ তিনি করেছেন এদের দ্বারাই। 

ড. বদরুদ্দোজার মানসপটে ভেসে উঠে ড. শাহিদুলের কথা। তার সিনিয়র স্যার। সরকারপন্থী ছাত্রদের দ্বারা অপমানিত করেছেন তিনি। তার করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় চাকরি হারিয়েছেন। কিছুদিন আগেই অবশ্য শাহিদুল সাহেবের সাথে দেখা হয়েছে। যেন কিছুই হয়নি তার! স্বভাবসুলভ একগাল হাসি দিয়ে বললেন, আরে! বদরুদ্দোজা সাহেব যে, কেমন আছেন? 

এখন একটা স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি হারিয়ে স্কুলের টিচার! কোথায় তিনি আপসেট বা হতাশ থাকার কথা! কিন্তু তার চোখে মুখে এক অভাবনীয় ঔজ্জ্বল্য। বদরুদ্দোজা সাহেবকে বললেন, আপনার ক্যাম্পাস কেমন আছে? ছাত্ররা সবাই ভালো আছে? পড়ালেখা করছে? সদা হাস্যোজ্জ্বল শাহিদুল সাহেবের কথার কী জবাব দেবেন তা চিন্তা করতে করতেই শাহিদুল সাহেব আবারো বলে উঠলেন, জানেন বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। ক্যাম্পাসের ঐসব হানাহানি দেখতে একদম ভালো লাগে না। আপনি আমাকে সরিয়ে দিয়ে ভালো করেছেন। এখন বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়ে থাকি। ঝামেলা ছাড়া। 

মুখের আলো নিভে গিয়েছে বদরুদ্দোজা সাহেবের। নিজেকে অপরাধী মনে হতে থাকলো। কোনরকম বিদায় নিয়ে আসলেন শাহিদুল সাহেবের কাছ থেকে। সরকারবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে শাহিদুল সাহেবের চাকরীচ্যুত করার পেছনে যে তার ভূমিকা আছে সেটা ভালোভাবেই মনে রেখেছেন শাহিদুল সাহেব। কাজটা তিনি করেছেন কৌশলে। তার এই তৎপরতা শাহীদুল সাহেবের কাছে পরিষ্কার। আজ আসিফের অপহরণের ঘটনায় শাহীদুল সাহেবের কথাগুলো মনে পড়ছে তার। 

শাহীদুল সাহেব ক্যাম্পাস ছেড়েছেন দুইবছর হলো, আসিফ এসেছিল সেদিন। শাহীদুল সাহেবের হাত ধরে কেঁদে ফেলেছিল। বললো স্যার ইয়াতিম হয়ে গেলাম! কয়েকজনকে সাথে নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল আসিফ। কিন্তু ধোপে টিকেনি। সরকার সমর্থিত ছাত্ররা তাদের পিটিয়ে সরিয়ে দিয়েছে। কোন কিছু করতে না পেরে সবশেষ আসিফ ছুটে এসেছিল বদরুদ্দোজা সাহেবের অফিসে। চিৎকার করে বলেছিল স্যার শাহীদুল স্যারকে ঠেকান! স্যারকে ক্যাম্পাসে রাখেন। স্যার যদি ক্যাম্পাসে না থাকেন তবে এই ক্যাম্পাস অভিশপ্ত হয়ে যাবে। অভিশপ্ত, অভিশপ্ত হয়ে যাবে!

আজ বদরুদ্দোজা সাহেবের খুব মনে হচ্ছে ক্যাম্পাসটা আসলেই অভিশপ্ত হয়ে গেছে। সরকারি দলের ছাত্রদের ইচ্ছাই আইন। তারা পরীক্ষা দিতে বললে পরীক্ষা হবে। তারা পরীক্ষা বন্ধ করতে বললে পরীক্ষা বন্ধ হবে। তাদের নকল করতে দিতে হবে। শিক্ষকরা যে কোন অনুষ্ঠানে কী কথা বলবে তা নির্ধারন করে দিবে তারাই। নিজের ব্যাক্তিত্ব বলে কিছু নেই শিক্ষকদের। ছাত্ররা যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে যাচ্ছে। মেরুদন্ড সোজা করতে গেলেই বিপদ। শিক্ষকদের মেরুদন্ড বলে কিছু নেই। যারাই মেরুদন্ড টান করেছে তারা সবাই বহিষ্কৃত হয়েছেন ক্যাম্পাস থেকে। মাঝে মাঝে বদরুদ্দোজা সাহেবেরও খুব ইচ্ছে হয় মেরুদন্ড সোজা করতে। কিন্তু পরিণতির কথা ভেবে আর কিছু করার সাহস পান না। 

আসিফ তার ইচ্ছেমত পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হতে পেরেছে। আনন্দের তার সীমা নেই। কে জানতো এই আনন্দই তার জীবনে সবচেয়ে বেশি নিরানন্দ হয়ে ধরা দিবে। হলে উঠার তৃতীয় দিনেই তাকেসহ ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রদের অশ্লীল র‍্যাগের সম্মুখীন হতে হয়েছে। সবাই নীরবে হজম করলেও হজম করেনি আসিফ। সে সিনিয়রদের তোয়াক্কা না করে সেদিন ঝগড়া করেছিল। 

বিপত্তি সেদিন থেকেই। সবাই বুঝেছিল এটা সহজ জাতের না। এ ঝামেলা করবেই। আসলেই তাই। আসিফ কোন অন্যায়কে সহজভাবে চলতে দেয়নি। এই অন্যায় কোন শিক্ষক করুক বা কোন ছাত্র করুক! আসিফ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তার এই কাজে সবচেয়ে বড় সহযোগী হিসেবে পেয়েছে শাহীদুল স্যারকে। যেদিন শাহীদুল স্যার চলে যান সেদিন আসিফ বুঝেছিল তার পায়ের নিচে মাটি সরে যাচ্ছে। এই ক্যম্পাসে তার অনেক বন্ধু থাকলেও তার সহযোগী হয়ে অন্যায় রুখবে এমন কেউ আর রইলো না। 

অল্প দিনের মধ্যেই সরকার দলীয় ছাত্ররা তাকে আক্রমণ করতে গেল। হলের সকল কর্মচারীই ভীষণ ভালবাসে আসিফকে। একজন তাকে মারা হবে এটা বুঝতে পেরে তাকে ফোন করে সতর্ক করে দেয়। অল্পের জন্য জানে রক্ষা পায় আসিফ। সেদিন তার বিছানা, বই-পত্র, ল্যাপটপ সব হারিয়েছে। মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে রুমে আগুন ধরিয়ে দেয়। 

বস্তুত আসিফ সেদিন থেকেই ক্যাম্পাস ছাড়া। তখন সে ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। সে বছর আর ক্যাম্পাসে আসতে পারে নি। পড়াশোনা এক বছর বন্ধ রেখেছে। এর মধ্যে সে স্যারদের সাথে যোগাযোগ করে শুধু পরীক্ষা দেয়। ক্লাস করা ছাড়াই পরের বছর সে পরীক্ষা দেয়। শিক্ষকরা তার দুরাবস্থা দেখে তাকে সাহায্য করে। কোনরকম সে অনার্স শেষ করে। এর মধ্যে ক্যাম্পাসের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে। সন্ত্রাসীরাই এখন ক্যাম্পাসের হর্তাকর্তা। ভালো ছাত্রদের সরকারদলীয়দের নির্দেশে সকল অন্যায় মেনে নিয়েই ক্যাম্পাসে পড়াশোনা করতে হয়। এভাবেই চলছে সব। 

অনার্স শেষ করে আরো একবছর গ্যাপ দেয় সে। ইতোমধ্যে কিছু সরকারদলীয় ছাত্র পাশ করে ক্যাম্পাস ছেড়েছে। এতে মনে সাহস পায় আসিফ। মাস্টার্সে ভর্তি হয় সে। লুকিয়ে ছাপিয়ে ক্লাস করে। আগের মত প্রতিবাদী রূপ নেই তার। এর মধ্যেই একদিন সে ধরা পড়ে যায় সরকারী গুন্ডাদের চোখে। দৌড়ে পালিয়ে বাঁচে। তাদের কথা একটাই, তুই সরকার বিরোধী, তোর পড়ালেখার কোন অধিকার নেই। তুই ক্যাম্পাসে আসতে পারবি না। 

আবার লুকিয়ে যায় আসিফ। তিন বছরে লুকিয়ে ছাপিয়ে কোনরকম শুধু পরীক্ষাগুলোতে এটেইন করে সে তার মাস্টার্স শেষ করে। থিসিস পেপার জমা দেয়া বাকী শুধু। যেদিন সে ক্যাম্পাসে যাবে সেদিন আগে থেকেই ভার্সিটির কর্মচারীদের থেকে ইনফরমেশন নিয়ে ক্যাম্পাসে যায়। যাতে বিপদ এড়ানো। এভাবে তার থিসিসও শেষ হল। ইতোমধ্যে তার ধারণা হল যেহেতু এতদিনে তার সাথে যাদের শত্রুতা ছিল তারা সবাই ক্যাম্পাস ছেড়েছে তাই আপাতত ক্যম্পাসে তার বিপদ নেই। কারণ নতুন গুন্ডারা অনেক জুনিয়র। তারা তাকে ওভাবে চিনে না। সে এখন থিসিসের কাজে তার সুপারভাইজারের সাথে দেখা করার জন্য নিয়মিত আসতে শুরু করে। 

অবশেষে তার থিসিস প্রেজেন্টেশনের ডেট এল। সকল প্রস্তুতি শেষ। সেদিন একটু আগেই সে ক্যাম্পাসে এসেছে। সুপারভাইজারের রুমের সামনে পায়চারি করছে এমন সময় কয়েকটি ছেলে এসে জিজ্ঞাসা করলো। আরে! আপনি আসিফ ভাই না? আসিফ হ্যাঁ সূচক উপরে নিচে মাথা নাড়ে। আপনার বাড়ি খুলনা না? আসিফ এবারও মাথা নাড়ে। একজন হঠাৎ করেই ঘুষি মেরে বসে ‘শালা তুই শিবির’ বলে। তুলে নিয়ে যায় তারা আসিফকে। আসিফের ডাকে সারা ক্যাম্পাসের মানুষ বের হয়ে আসে। নীরবে তাকিয়ে থাকে। কিছুই করার নাই তাদের। মেরুদন্ড তারা বহু আগেই হারিয়েছে। 

আসিফের যখন জ্ঞান ফিরেছে তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করে হাসপাতালে। ধীরে ধীরে মনে করার চেষ্টা করে কী হয়েছিল। পূর্ণ চোখ মেলে তাকাতেই দেখে সবাই অপরিচিত। তাকে ঘিরে আছে পুলিশ। পা’টা নাড়াতেই গিয়ে বুঝতে পারে তা তার আওতার বাইরে। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে সে। দূরে সে দেখতে পায় তার এক সহকর্মী। চোখে চোখে কথা হয়। প্রশান্তি অনুভব করে আসিফ। নীরবে আবার সে চোখ বুঁজে। 

মনে আসতে থাকে তার সব কথা। ঐ ছেলেটার নাম সুদীপ্ত। বাড়ি তারই এলাকা খুলনায়। সে যখন প্রথম ইউনিভার্সিটিতে আসে তখন খুলনার কোন বড় ভাইকে খুঁজছিল। সহজেই পেয়ে যায় ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ আসিফকে। আসিফ তাকে হলে উঠার ব্যাপারে সহায়তা করে। নতুন শহরে আত্মবিশ্বাস পাওয়ার জন্য যতটা সাহস দেয়ার দরকার সবটাই তাকে দিয়েছে। এরপর বহুদিন তার সময় নিয়ে দেখা বা কথা হয়নি। মাঝে মধ্যে হাই হ্যালো হয়েছে। 

সেদিন সেই ছেলেটাই আক্রমণ করেছে তার উপর। সে এখন সরকার দলীয় পাণ্ডা। সে এবং তার সহকারীরা তাকে হলের একটা রুমে নিয়ে যায়। প্রথমে কোন কথাবার্তা ছাড়াই প্রায় আধাঘন্টা ধরে চললো মারপিট। অপরাধ একটাই সে বিরোধী দলীয় রাজনীতি করে। বিরোধী দলীয় রাজনীতি যারা করবে তাদের কোন অধিকার নেই ক্লাস করার বা পড়ালেখা করার। এরপর তার থেকে জানতে চাওয়া হয় তার অন্যান্য সঙ্গীদের। তারা সবাইকে খুঁজে বের করে মারবে। 

আসিফ আল্লাহকে ডাকা ছাড়া অন্য কোন কথা বলে না। এক পর্যায়ে তারা কিছুটা বিরতি দেয়। বিরতি দেয়ার কারণ তারা মারতে মারতে ক্লান্ত হয়েছে। একজনের হাত কিছুটা কেটে গিয়েছে লোহার খোঁচায়। তার হাত ব্যান্ডেজের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে আসিফ একনজর নিজের শরীরের তাকিয়ে দেখলো। লোহার আঘাতে হাত-পায়ের সমস্ত পেশী ফেটে রক্তাক্ত হয়েছে সারা দেহ। 

সুদীপ্ত আবারো এলো জিজ্ঞাসাবাদ করতে। তুই সম্বোধন করে বললো, বল তোর সঙ্গীরা কই থাকে? বল তাদের ঠিকানা। তোদের সবাইকে একসাথে পুঁতে ফেলবো। আসিফ ক্লান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললো, সুদীপ্ত তুমি আমাকে তুই করে কথা বলছো! তোমার কি মনে আছে যেদিন তুমি প্রথম ভার্সিটিতে এসেছিলে সেদিনের কথা? সেদিনের সেই সুদীপ্ত এত কৃতঘ্ন হবে চিন্তা করতে পারিনি। আমার সাথে তোমার কী সমস্যা? আমি কী ক্ষতি করেছি তোমার? 

সুদীপ্ত একটু পিছিয়ে এসে ভয়ানক গতিতে একটি আঘাত করে আসিফের মুখে। এরপর আর কিছু মনে নেই তার। হাসপাতালে তার দেহ নিয়ে ডাক্তাররা পরীক্ষা নীরিক্ষা চালাচ্ছে। জানা গেল দুই পায়ে চারটি স্থানে ভেঙে গিয়েছে। বাম হাত গেঙ্গে গিয়েছে। ডান হাতের পেশী ফেটে গিয়েছে। সেলাই দিতে হবে। মাথা থেতলে গিয়েছে, সেখানেও সেলাই লাগবে। আসিফের মনে হলো তার পুরো শরীর একটি বিষের টুকরো। 

সেদিন তাড়াতাড়িই ঘরে ফিরলেন ড. শাহীদুল। তার প্রতিষ্ঠানে সেদিন কাজ খুব একটা ছিল না। শরীরটাও ভালো লাগছে না। বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া সবে মাত্র গা’টা এলিয়ে দিয়েছেন অমনি একটি ফোন এল। অজানা কারণের বুকটা কেঁপে উঠলো তার। কেন জানি মনে হল কোন এক দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে আসছে এই কলটি। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে দেখলেন নাম্বারটা অপরিচিত। রিসিভ করতেই শুনলেন একজন লোক কেঁদে কেঁদে বলছে, 

- স্যার আমনে কই? আমনে কই স্যার। আসিফ বাইরে মারি হালাইছে। এতক্ষনে মনে অয় আর বাঁচি নাই।

- তুমি কে? 

- আমি রফিক স্যার, রফিক। বাবুর্চি। 

চিনতে পেরেছেন শাহিদুল সাহেব। পুরো ঘটনা জেনে নিলেন রফিকের কাছ থেকে। ভয় পেতে শুরু করলেন তিনি, এতক্ষনে চার ঘন্টা হয়ে গেছে। আল্লাহই জানেন বেঁচে আছে কিনা। 

সিদ্ধান্ত নিতে দেরী করেননি শাহীদুল সাহেব। যত যাই হোক সে পরে দেখা যাবে। আগে পুলিশ দিয়ে তাকে উদ্ধার করতে হবে। তিনি এবং তার আরো কিছু কলিগ দিয়ে থানায় ফোন করলেন। দ্রুত উদ্ধার করার জন্য বললেন। পুলিশের যেতে দেরী হওয়ায় শাহীদুল সাহেব নিজেই থানায় গেলেন। পুলিশকে বার বার রিকোয়েস্ট করলেন। সরকার দলীয় লোকদের শিকারকে ধরতে রাজি হয় না পুলিশ। অবশেষে ঘুষের অফার দিয়ে পুলিশ পাঠালেন শাহীদুল সাহেব। 

অবশেষে পুলিশ আসিফকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসলো। তাকে গ্রেপ্তার দেখালো। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে মামলা করলো পুলিশ। শাহীদুল সাহেব তারপরও খুশি। অন্তত বেঁচে তো ফিরতে পেরেছে। 

চিকিৎসা চলছে মোটামুটি ভালোভাবেই। যে ওয়ার্ডে চিকিৎসা চলছে সে ওয়ার্ডের ডিউটি ডক্টর তারই বন্ধু। আস্তে আস্তে সুস্থ হতে লাগলো সে। দুই পা এক হাত প্লাস্টার করা, অচল একটা মানুষ। এর মধ্যেও তাকে বেঁধে রাখা হয়েছে হাসপাতালের বেডের সাথে। কেমন অমানবিক! এই দৃশ্য দেখে ড. শাহীদুল মন্তব্য করলেন, এদেশ থেকে মানবতা বহু আগেই চলে গিয়েছে। আজ তার ফিরে আসার পথ রুদ্ধ হলো। এর প্রতিশোধ হবে। শোধ- প্রতিশোধ আগুনে পুড়ে খাক হবে বাংলাদেশ। 

অসুস্থ পঙ্গু এই মানুষটার বাঁধন খুলে দেয়ার জন্য চেষ্টা চালাতে লাগলেন। বার বার রিকোয়েস্ট করছেন পুলিশ সদস্যদের। উপস্থিত পুলিশরা তাদের অপারগতা স্বীকার করলো। এক পর্যায়ে উচ্চপদস্থ পুলিশ এলো। শাহীদুল সাহেব তাকে রিকোয়েস্ট করলো। সে রিকোয়েস্ট আমলে নেয়া তো দূরের কথা উল্টো একজন আসামীর জন্য তদবির করায় অপমান করতে লাগলেন। হুমকি দিলেন তাকেও গ্রেপ্তার করার। 

আসিফ কথা বলে উঠলো। বললো, স্যার আমার কোন সমস্যা হচ্ছে না। আমি তো এমনিতেই নড়তে পারি না। বাঁধলে কি না বাঁধলেও কি? হাল ছেড়ে দিয়ে ড. শাহীদুল দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন আসিফের দিকে। দুই চোখে ঝরছে অবিরল ধারা। 

একের পর এক জিজ্ঞাসাবাদ করে যাচ্ছে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন। উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে একবার ক্ষেপে গেল আসিফ। বললো আপনারা আমার পরিচয় নিচ্ছেন, ঠিকানা নিচ্ছেন। আমি কি করি জানতে চাইছেন। একবারও কি আমাকে প্রশ্ন করেছেন কারা তোমাকে মেরেছে? তাদের বাড়ি কই? তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন? মার খেলাম আমি। গ্রেপ্তার করলেন আমাকেই। অথচ যারা আমাকে মারলো তাদের ব্যাপারে আপনাদের কোন জিজ্ঞাসা নাই। এটা কেমন বিচার আপনাদের? 

পুলিশ কর্মকর্তা জবাব দিল, এটাই বিচার। এটা আমাদের দেশ। এখানে তোদের স্থান নেই। তোরা হয় মরে যাবি না হয় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবি অথবা জেলে থাকবি। 

সাত মাস পরের কথা। সবে কারাগার থেকে বের হলো আসিফ। মোটামুটি সুস্থ হয়েছে সে। শাহীদুল সাহেব তাকে সোজা নিয়ে আসলেন তার বাসায়। বললেন প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা আপাতত বাদ দাও। তুমি আমাদের স্কুলে বাচ্চাদের পড়াও। একদিন তারা দুজনে বের হলেন স্কুলের উদ্দেশ্যে। পথেই দেখলেন বদরুদ্দোজা সাহেবকে। কিছুক্ষণ পর পর পিঠে হাত দিচ্ছেন আর বলছেন মেরুদন্ড নাই। নাই, মেরুদন্ড নাই। 

অবাক দৃষ্টিতে আসিফ তাকালো শাহীদুল স্যারের দিকে। স্যার বললেন প্রচন্ড মানসিক চাপে অসুস্থ হয়ে গেছেন। 

- মানসিক চাপ? কেন? 

তুমি এরেস্ট হওয়ার পনের-বিশ দিন পরের কথা। সুদীপ্ত আর কিছু ছেলে মিলে তুলে নিয়ে যায় তার মেয়েকে। লাঞ্ছিত করা হয়। বোনকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিহত হয় তার একমাত্র ছেলে। 

১১ সেপ, ২০১৭

অন্ধকারের গল্প



রহিমা... রহিমা... 
ঘুম থেকে উঠেই এই ডাকটিই ডাকতে হয় ছেরাজ মিয়াকে। বাবা মা নামটা সিরাজ রাখলেও সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়ে এখন এটা ছেরাজে পরিণত হয়েছে। ছেরাজের চোখে আলো নেই। উঠেই স্ত্রীকে ডাকে সে। স্ত্রী রহিমা যেখানেই থাকে এই ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে আসে। ছেরাজের হাত ধরে বিছানা থেকে নামায়। টয়লেটে পৌঁছে দেয়, নাস্তা করায়। শীতের দিনে বাইরে হালকা রোদে একটি পিঁড়ি পেতে বসিয়ে দেয়। আর গরমের দিনে গাছের ছায়ায়। বৃষ্টির দিনে ক্ষয়ে যাওয়া বারান্দায়। সারাদিন ছেরাজ নীরবে বসে থাকে। কারো সাথে কথা বলে না। সত্য বলতে কি কেউ তার সাথে কথা বলতে আসে না। একটু দূরে স্টেশনে রহিমা চা বিক্রি করে। 

আমি এই স্টেশনের নিয়মিত যাত্রী। এই স্টেশনে নেমেই আমাকে কলেজে যেতে হয়। রহিমার দোকানের কোন নাম বা কোন সাইনবোর্ড না থাকলেও কলেজের সব ছাত্র রহিমা খালার দোকান বললে এক নামেই চেনে। ভালো চা বানায় রহিমা খালা। ট্রেন আসা পর্যন্ত আমি ঠায় বসে থাকি রহিমা খালার দোকানে। পুনঃ পুনঃ চা খাওয়া আমার অভ্যাস। চা এর সুবাধে খালার সাথে ভালো পরিচয় থাকলেও কোনদিন জানতে চাই নি খালার বৃত্তান্ত। রেললাইনের পাশে শত রহিমা খালার বসবাস। কে কার খবর রাখে? 

একদিন পড়ন্ত বিকেলে বসে চা খাচ্ছি অলসভাবে। হঠাৎ এক রহিমা বলে আর্ত চিৎকার! তাকিয়ে দেখি এক প্রায় বৃদ্ধ লোক হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। রহিমা খালা ছুটে গেল। হাত ধরে নিয়ে বস্তির একটি ঘরের ভেতর ঢুকে গেল । বুঝলাম, লোকটা অন্ধ। একটা হাহাকার সৃষ্টি হলো মনে। আমার কাছে মনে হয় অন্ধ লোকরাই পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায়। অন্ধ লোক দেখলেই শিউরে উঠি। অজান্তেই নিজের চোখে হাত চলে যায়। স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ হই, আমার চোখে তিনি আলো দিয়েছেন। খালা বেরিয়ে এলেন বস্তি থেকে। আবার দোকানের কাজ করতে থাকলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, খালা উনি কে? সলজ্জ মুখে খালা বললেন, সোয়ামী। 

কলেজের বেতন, পরীক্ষার ফি বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। দ্বিগুণের চাইতেও বেশি। আমাদের মত টিউশনি করে চলা ছাত্রদের জন্য এটা ছিল বড় ধরণের ধাক্কা। ছাত্ররা সবাই বললো আন্দোলন হবে। এভাবে চললে আমাদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হবে। কলেজের কোন হোস্টেল নেই। থাকতে হয় মেস করে। সেখানেও ভাড়া বাড়ায় বাড়িওয়ালা। দ্রব্যমূল্যেতো হু হু করে বাড়ছে। এর মধ্যে বেতন বাড়ানো আমাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে গেল। নির্দিষ্ট দিনে সবাই ক্লাস বর্জন করলো। ছাত্ররা সবাই মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হলো। সবার সাথে আমিও বের হলাম। 

পুলিশ অতর্কিতে আমাদের উপর আক্রমণ করলো। টিয়ার শেল নিক্ষেপ হচ্ছে। ভীষণ ধোঁয়া। চারদিকে অন্ধকার। চোখ জ্বলছে। হঠাৎ আমার কপালে ভীষণ আঘাত পেলাম। পড়ে গেলাম রাস্তায়। এরপর আর মনে নেই। 

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখি এক মাঝবয়সি লোক আমার মাথার পাশে বসা। আমার কপাল তিনি ভিজা রুমাল দিয়ে মুছে দিচ্ছেন। লোকটি কালো সানগ্লাস পরা। আরেকটু ভালো করে খেয়াল করতে যেই মাথা একটু তুলেছি বুঝতে পেরেছি মাথায় ভীষণ চোট। উহ শব্দ করে উঠলাম। লোকটি বললো, তুমি জেগেছ বাবা? জ্ঞান ফিরেছে বাবা? রহিমা... রহিমা... 

চট করে বুঝে ফেললাম, লোকটা রহিমা খালার অন্ধ স্বামী। রহিমা খালা তখন উচ্চস্বরে কারো সাথে ঝগড়া করছে বলে মনে হচ্ছে। কান পেতে বুঝার চেষ্টা করলাম। পুলিশ সন্দেহ করছে রহিমা খালার ঘরের মধ্যে কোন প্রতিবাদকারী ছাত্র লুকিয়ে আছে। তারা সেই লুকিয়ে থাকা প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তার করতে চায়। কিন্তু রহিমা খালা মিথ্যা বলে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। অবশেষে সফল হলেন রহিমা খালা। পুলিশদের সাথে ঝগড়া করে তাদের ফিরিয়ে দিলেন। ঢুকতে দিলেন না ঘরে। 

রহিমা খালা আমাকে লুকিয়ে ফেললেন চৌকির ওপাশে ছোট্ট একটু জায়গা করে। জানতে পারলাম গোলাগুলি দেখে রহিমা খালা ছুটে যান। দেখেন আমি পড়ে আছি রাস্তায়। তিনি আরো কয়েকজনের সহায়তায় আমাকে তার বাড়িতে টেনে নিয়ে আসলেন। এভাবে ছিলাম দুই দিন। এই দুই দিনে আমার একান্ত সঙ্গি ছিলেন ছেরাজ মিয়া। স্বল্পভাষী ছেরাজ মিয়ার সবচেয়ে বেশি যে শব্দটা উচ্চারণ করেন তা হল “রহিমা”। দুদিন পর আমি অনেকটা সুস্থ। ছেরাজ মিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি চোখ হারালেন কী করে? 

বলতে শুরু করলেন ছেরাজ মিয়া। সেদিন ছিল শুক্রবার। রহিমার বাবা দাওয়াত দিলেন আমাদের। দুপুরের খানা খেতে। আমি তখন ছোট্ট মুদি দোকান করি টাঙ্গাইলে। শ্বশুর বাড়ি পাশের গ্রামেই। সকালে রওনা হই শ্বশুর বাড়ি। আমি রহিমা আর আমাদের ছোট্ট মেয়ে শরিফা। বিকালে ফিরতে চাইলে শাশুড়ি জোর করে বললো একদিন থেকে যেতে। অগত্যা থেকে গেলাম। সন্ধ্যায় রহিমা বললো শরিফার জন্য দুধ কিনে আনতে। বাড়িতে দুধ নাই। 

বের হতে যাব এমন সময় দেখলাম একদল পুলিশ আসছে। তারা বহুদিন ধরেই আমার শ্বশুরের কাছে চাঁদা চেয়ে আসছে। সেই চাঁদা নিতেই রহিমাদের বাড়ি আসলো। শ্বশুর তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন, তাদের দাবীকৃত এত টাকা দেয়ার সামর্থ নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তারা আমার শ্বশুরকে এরেস্ট করতে চাইলো। আমি বাধা দিলাম। প্রতিবাদ করলাম তাদের এই ডাকাতির। 

তারা অবশেষে আমাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেল। এবার টাকার অংক আরো বেড়ে গেল। পাঁচ লাখ টাকা চাইলো। আমরা গরীব মানুষ পাঁচ লাখ টাকা দূরের কথা এক লাখ টাকা দেয়ারও সামর্থ ছিল না। রহিমা এর ওর কাছ থেকে ধার করে পঞ্চাশ হাজার টাকা পুলিশকে দিয়েছিল। কিন্তু আমি প্রতিবাদ করে যে অপরাধ করেছি তার কোন প্রায়শ্চিত্য এই টাকায় হবে না। 

সারারাত ধরে চললো নির্যাতন। মার খেতে খেতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আবার জ্ঞান ফিরে। আমার মার খাই। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলেই শুনি বাইরে রহিমা আর আমার মেয়ে শরিফা কান্না করছে। মাফ চাই পুলিশের পা ধরে। আর কোনদিন পুলিশের সাথে বেয়াদবি করবো না এসব কথা বার বার বলি। তবুও মাফ হয় না আমার অপরাধের। অবশেষে শেষরাতে থানার ওসি আসলো। আমি ভাবলাম পা ধরে মাফ চাইলে তিনি হয়তো আমাকে মাফ করে দিবেন। আমি আমার দোকান বিক্রি করে সব টাকাও দিতে চাইলাম। 

কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ওসি একটা স্ত্রু ড্রাইভার নিয়ে এলেন। নিজ হাতেই গেলে দিলেন আমার ডান চোখ। ভীষণ যন্ত্রনায় চিৎকার করলাম। গগনবিদারী সেই চিৎকারে থানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রহিমা আর মেয়ে শরিফা ছুটে এলো। একনজর তাদের দেখলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। তিনি আমাকে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে রহিমা আর শরিফার চেহারা দেখালেন। এই দু’টি চেহারাই আমার দুনিয়াতে সবচেয়ে প্রিয়। বাবা-মাকে কবে হারিয়েছি মনে নেই। বড় হয়েছি এতিমখানায়। আমার স্বজন বলতে এই রহিমা আর শরীফাই।

ডান চোখের ভয়ংকর যন্ত্রনা সামলাতে না সামলাতেই ওসির সেই ভয়ানক স্ক্রু ড্রাইভার এবার আক্রমণ করলো আমার বাম চোখ। দপ করে আমার আলো নিভে গেল। সেদিন থেকে অন্ধকার। ভীষণ অন্ধকার। আজ বাংলাদেশে শুধু আমি অন্ধ নই, স্বৈরাচারের দেশে গোটা দেশই যে আজ অন্ধ।

৩০ মার্চ, ২০১৭

সোনালী সূর্যোদয়


১। 
তাহমিদ। খুব ভালো একজন কণ্ঠশিল্পী। একটু পরেই তার স্টেজ পারফর্মেন্স। আজ কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। তার নেতৃত্বে কয়েকটি দলবদ্ধ গান গাওয়া হবে। এছাড়া তার একক পরিবেশনাও আছে। সব মিলিয়ে আজ সে খুব ব্যস্ত। ইতোমধ্যে সবাইকে নিয়ে কয়েকবার রিহার্সেল হয়ে গেছে। তারপরও তার একটু নার্ভাস লাগছে। নিজের জন্য আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই তার। কিন্তু সমবেত গানের অন্যরা কেউ নিয়মিত শিল্পী বা গায়ক না। বছরে দু’একটা অনুষ্ঠানে গান গায় সখের বশে এমন। তাহমিদের গান শেখা ও গাওয়ার নিয়মিত চর্চা কলেজে হয় না। সে কলেজের বাইরে একটা সংগীত দলে গান গায়। ঐ দলের সবাইকে নিয়ে গাইলে আজ এ টেনশন থাকতো না। তারা সবাই নিয়মিত গান করে। কিন্তু কলেজে যাদের নিয়ে গান গাইবে তারা নিয়মিত না হওয়ায় এটা সেটা ভুল করার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। তাই সে চিন্তায় ঘামতে শুরু করেছে। বার বার সবাইকে নির্দেশনা দিচ্ছে যাতে ভুল না হয়। যত বেশি সম্ভব রিহার্সেল করে ভুল টুল কমানো দরকার।

এমন সময় একটা ফোন আসলো। আজ বিকেলে স্বৈরাচারবিরোধী মিছিল হবে। তার বন্ধু আজমল জানিয়েছে। আরো জানিয়েছে আজকে গণ্ডগোল হওয়ার বেশ সম্ভাবনা আছে। তাহমিদের অবশ্য মিছিলে যাওয়া বারণ। ওদের সবার নেতা শফিক ভাই সবসময় বলেন আন্দোলনের প্রতিটি সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ। যারা যে বিষয়ে দক্ষ তারা সে বিষয়ে কাজ করবে। তাই সংগীত শিল্পীরা গান রচনা করবে, গান করবে, অন্দোলনের কর্মীদের উৎসাহ দেবে। তাদের মিছিলে যাওয়ার দরকার নেই। তাই সাধারণত তাহমিদ এবং তার মতো অন্য যারা গান অথবা অভিনয়ে দক্ষ তারা মিছিলে যাওয়ার তেমন একটা সুযোগ পায় না। কিন্তু সে যখনই মিছিলের খবর পায় তখনই তার মনের মধ্যে এক ধরণের অস্থিরতা শুরু হয়। তার মনে হয় মিছিলের স্লোগানই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা কবিতা, মিছিলের স্লোগানের মতো রক্তে আলোড়ন তোলা গান আর কি আছে! আর সে মিছিল যদি হয় প্রতিবাদী মিছিল, সে মিছিল যদি হয় দেশ রক্ষার মিছিল তবে তো কথাই নেই। 

ফোনে খবরটা পাওয়ার পর থেকে তাহমিদ মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আজ সে মিছিলে যাবেই। কলেজের অনুষ্ঠানে আর সে মনযোগী হতে পারে না। তার চিন্তা জুড়ে কেবলই বিকেলের মিছিল। অনুষ্ঠান নিয়ে আগের সে টেনশন আর থাকেনা। মোটামুটি ভালোভাবে অনুষ্ঠানের সব কিছু শেষ হয়ে যায়। তার গানের দলের পারফর্মেন্সও খারাপ হয়নি। তবে তার মাথায় ঘুরছে বিকেলে কথা। কোন রকমে অনুষ্ঠান শেষ করেই সে বাসায় ফিরে যায়। খাওয়া দাওয়া করে মিছিলের প্রস্তুতি নেয়। একটা পতাকা সবসময় সে সাথে রাখে। মিছিলে গেলেই সেটা মাথায় বেঁধে বের হয়। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মিছিল শুরু হওয়ার কিছুটা আগেই সে সভার জায়গাতে হাজির হয়ে যায়। 

নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার। রক্তে আলোড়ন তোলা সে চিরপরিচিত শ্লোগানে শুরু হয় মিছিল। তাকবীর দেয়ার সাথে সাথেই ভীমরুলের মত হাজার হাজার ছাত্র-যুবক-শ্রমিক মিছিলে শরিক হয়। জনা বিশেক পুলিশ অস্ত্র হাতে আগে থেকেই সেখানে প্রস্তুত ছিল। তারা ভাবতে পারেনি এত মানুষ হবে। যখন মিছিল শুরু হয় তখন তারা অস্ত্র বাগিয়ে তেড়ে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু যখনই চারদিক থেকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে থাকে তখন মানুষের ঢল দেখে তারা পিছিয়ে যায়। মিছিল থেকে দুই তিনজন নেতা এগিয়ে গিয়ে পুলিশদের বলে তারা শুধু শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করতে চায়। কোন ধরণের সহিংসতা কিংবা গোলমালের কোন চিন্তা তাদের নেই। মিছিল করা প্রতিবাদ করা নিশ্চয় আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। এসব শুনে পুলিশ দলের অফিসাররা চুপ করে থাকে। তারা কোন উত্তর দেয় না।

ফ্যাসিবাদের লাঠিয়াল পুলিশরা অবস্থা বেগতিক দেখে সাময়িক চুপ করে থাকলেও আসলে তারা ওয়ারলেসে আশেপাশের থানাগুলো থেকে জরুরী অতিরিক্ত পুলিশ এবং রিজার্ভ ফোর্স কল করে। মিছিল শুরু হওয়ার দশ পনেরো মিনিটের মধ্যেই চারপাশ থেকে পঙ্গপালের মতো বিপুল সংখ্যক পুলিশ এসে সবাইকে ঘিরে ফেলে। 

ছাত্রনেতারা মাইকে আহবান করেন পুলিশদেরকে শান্তিপূর্ণভাবে সরে দাঁড়াতে। কিন্তু উত্তরে পুলিশরা আচমকা টিয়ারশেল এবং গুলির বন্যা বইয়ে দেয়। হাজার হাজার মানুষ আটকে পড়ে রাস্তায়। পুলিশ নিরস্ত্র মানুষের প্রতিবাদে আগ্রাসী ভূমিকায় হামলে পড়ে। প্রথমে একটু হতচকিত এবং ছত্রভঙ্গ হলেও তাহমিদরা অল্পসময়ের মধ্যেই ইটপাটকেল দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। নেতারা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে করেই হোক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হবে। যেদিকে পুলিশের অবস্থান দূর্বল সেদিকে তাদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে বের হয়ে যেতে হবে। পুলিশের গুলিতে একের পর এক প্রতিবাদকারী গুলি খেয়ে আহত হচ্ছে। এরই মাঝে তাহমিদরা একটি পথে পুলিশকে পিছু হটতে বাধ্য করে।

এর মধ্যে হঠাৎ করেই বুকটা যেন একটু চিনচিন করে উঠে তাহমিদের। তার মনে হয় এক সাগর পিপাসা লেগেছে। সে পাশের একটি টং দোকানে পানি খাওয়ার জন্য যায়। টং দোকানদার বহু আগেই দোকান ছেড়ে পালিয়েছে। বোতল মুখে দিয়ে ঢক ঢক করে পানি ঢালতেই একটু শান্তি লাগলো। কিন্তু তৃষ্ণা কমছেই না। এসময় হঠাৎ নিজের দিকে তাকিয়ে দেখতেই চমকে উঠে তাহমিদ। রক্তে ভেসে গেছে বুক। শার্টের নিচে হাত চালান করে বুঝতে পারলো বুকে কয়েকটা গুলি লেগেছে। শর্টগানের গুলি। কখন যে গুলি লেগেছে টেরই পায়নি সে। বুক চেপে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করে সে। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ। আশেপাশে সাহায্যের আশায় তাকায়। সহকর্মীরা সবাই ইট-পাটকেল নিয়ে পুলিশের আক্রমণ প্রতিরোধে ব্যস্ত। কাউকে বিরক্ত না করে নিজেই নিজের সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করেছে। সব রাস্তা বন্ধ। কোথাও গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। তবে সবার আগে এখান থেকে বেরুতে হবে। কিন্তু বেরুনোর কোন উপায় দেখা যাচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতে পাশের একটা বস্তিতে ঢুকে পড়ে সে। একটু সাহায্যের আশায় সে একের পর এক দরজায় নক করতে থাকে। প্রতিটি দরজা তার অবস্থা দেখেই তার মুখের উপর বন্ধ হয়ে যায়।

২।
জামিল। তাহমিদ যে গানের দলে গান শিখে সে দলের পরিচালক। ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে অলসভাবে টিভি দেখছিল। হঠাত টিভির স্ক্রলে ব্রেকিং নিউজ লিখা উঠছে। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ছাত্রদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ। বহু হতাহত। জামিল তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়। তাহমিদ তার অচেনা নয়। তার দলের মধ্যে একমাত্র তাহমিদই সবসময় একটু বেশি বেয়াড়া ধরণের। সে সাধারণত এই ধরনের মিছিলে না গিয়ে থাকে না। ফোন তুলে নিয়ে জামিল ডায়াল করে তাহমিদের নাম্বারে। কল যায়। কিন্তু রিসিভ করার কেউ নাই। বার বার সে ফোন করতেই থাকে। তাহমিদের বন্ধু আজমলকেও চিনে জামিল। তাকেও ফোন দিল। একবার, দুইবার, তিনবার, চারবার...। চতুর্থবারে ফোন রিসিভ করে আজমল। প্রচুর শব্দ, চিৎকার। জামিল বুঝতে পারে সে ঘটনাস্থলেই আছে। 

আজমলের সাথে কথা বলে জামিল জানতে পারলো তাহমিদও ওখানে ছিলো। তবে তাকে এখন আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। ওরা একসাথে মিছিলে গিয়েছিল কিন্তু সংঘর্ষ শুরু হওয়ার একটু পর সে হারিয়ে গেছে। একে একে অনেককেই ফোন করে জামিল। না, কোথাও তাহমিদের হদিস নেই। এবার সে ফোন দেয় সাদমানকে। সাদমানও তাদের দলের ছেলে। সে অভিনয় শিল্পী। তাহমিদের সাথে তার বেশ ভাব। জামিল সাদমানকে বাসা থেকে বের হতে বলে। ওরা তাহমিদকে খুঁজে বের করবে। অজানা আশংকায় সবারই বুক কাঁপছে। 

জামিল আর সাদমান প্রথমে তাহমিদের বাসায় এল। সব খুলে বললো। তাহমিদের বাসায় জানেনা সে কোথায় গিয়েছে। কান্নার রোল পড়ে যায় তাহমিদের বাসায়। ওর মা ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ে। অনেক কষ্টে ওনাকে আটকানো হল। ওরা তাহমিদের বাসায় থাকতেই আজমল ফোন দেয়। ততক্ষণে সে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে পেরেছে। জামিল ভয়ে ভয়ে ফোন রিসিভ করে, না জানি কি খবর দেয় আজমল। কিন্তু কিছুই জানাতে পারেনা সে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে। অনেককে ফোন দিয়েছে। কোথাও তার খোঁজ জানা যায় নি। 

জামিল আর সাদমান তাহমিদদের বাসা থেকে বের হলো। হাসপাতালে গেল। অনেক খুঁজলো। না, কোথাও নেই। যারা এরেস্ট হয়েছে তাদের নাম সংগ্রহ করলো আজমল। সেখানেও নাম নেই তাহমিদের। তাহলে তাহমিদ কোথায়? চারদিকে অনেকেই বের হয়েছে তাহমিদকে খোঁজার জন্য। এরমধ্যে পুলিশের টহলতো আছেই। যারা পরিচিত আন্দোলনকারী তারা পুলিশের তৎপরতার কারণে রাস্তায় বের হতে পারছে না। যাদের সে সমস্যা নেই তারা বের হয়েছে তাহমিদকে খুঁজতে। প্রায় বিশজন লোক এখন তাহমিদকে খুঁজছে। 

এ সময় হঠাৎ কল আসলো জামিলের মোবাইল ফোনে। অপরিচিত নাম্বার।ফোন রিসিভ করতেই তাহমিদের কণ্ঠ। বড় দুর্বল সে কণ্ঠ। জানালো তার আহত হওয়ার কথা, একটা ঠিকানা দিল। কলটা কেটে গেল। জামিল চিৎকার করে উঠলো। তাহমিদ, তাহমিদের ফোন। বলেই আবার কল দিল সেই নাম্বারে। এবার শোনা গেল একটা পুরুষ কণ্ঠ। তার থেকেই জানা গেল তাহমিদ গুলিবিদ্ধ। যে সে জায়গায় নয়, একেবারে বুকে গুলি লেগেছে। ঠিকানা আরেকটু বিস্তারিত জানালো লোকটা। সব শুনে বিষাদগ্রস্থ হয়ে গেল জামিলের মুখ। একটা সিএনজিতে করে রওনা হলো তারা। কথা নাই দুজনের। কেবল বেদনায় নীল হয়ে যাওয়া কষ্টগুলো জল হয়ে গড়িয়ে পড়ছে চারটি চোখ জুড়ে। এক পর্যায়ে জামিল সাদমানের পিঠে হাত রেখে শক্ত হতে বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু শক্ত হতে কি বলবে! নিজেরইতো গলা কাঁপছে। 

৩।
আশ্রয়ের জন্য একের পর এক দুয়ারে করাঘাত করে যাচ্ছে তাহমিদ। না, আজ তার কোন আশ্রয় নেই। এমন রক্তাক্ত কাউকে বাড়িতে জায়গা দিয়ে কেউ স্বৈরাচারী পুলিশের শত্রু হতে চায় না। বস্তির গরীব মানুষ তারা, পুলিশের অত্যাচার সামলাতে পারবে না। ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে তাহমিদ। চোখে ঝাপসা দেখা শুরু করেছে। পা দুটো টলছে। আশ্রয় তাকে পেতে হবেই। অবশেষে একটা দরজা খুলে গেল। ছেলে হারানো এক মা। বহুক্ষন ধরেই তাহমিদের ছোটাছুটি দেখছেন। অবশেষে সহ্য করতে না পেরে দরজা খুললেন। তাহমিদকে শুইয়ে দিলেন বিছানায়। রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করলেন। একটু দুধ গরম করে খেতে দিলেন। তাহমিদ খেতে চাইলো না। কিন্তু তিনি জোর করে খাইয়ে দিলেন।

এর মধ্যে সমস্যা হয়ে দেখা দিল মমতাময়ী সে মহিলার স্বামী। তিনি আসন্ন বিপদের কথা ভেবে বার বার বলছেন ছেলেটিকে যাতে বের করে দেয়া হয়। কিন্তু মহিলা বার বার চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলছেন, এতটুকু ছেলের গুলি লেগেছে। পুলিশ গুলি করেছে, এখন সে কই যাবে? উত্তরে তিনি বললেন, যে ছেলের জন্য মায়া দেখাচ্ছ সে ছেলের জন্যই আমাদের সবাইকে জেলে যেতে হবে। সে এখানে থাকলে পুলিশ ওর সাথে আমাদেরও জেলে নিয়ে যাবে। আর সে গুলি খেয়েছে। যে কোন সময় মারা যেতে পারে। তখন একে খুন করার দায়ে পুলিশ আমাদের নিয়ে যাবে। ফাঁসীতে ঝুলাবে। এসব শুনে কিছুটা দমে গেলেন মহিলা। 

তাহমিদও ভাসাভাসা শুনতে পাচ্ছিলো তাদের কথাবার্তা। একটু পর সে নিজেই চলে যাবার জন্য উঠে বসতে চেষ্টা করে। উঠতে গিয়ে বুঝতে পারলো তার অবস্থা খুব খারাপ। শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে দ্রুত। কথা বলতে গিয়ে দেখে কথা বলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। শব্দ কমে নির্জীব হয়ে এসেছে কণ্ঠ। আস্তে আস্তে কথা বলতে হচ্ছে। তবু্ও সে এসময় উঠে দাঁড়ালো ধীরে ধীরে। ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এমন সময় সে মহিলা তার রক্তমাখা শার্ট বদলিয়ে তাকে আরেকটি শার্ট পরিয়ে দেন। তারপর একটা কাঁথা জড়িয়ে দেন তার গায়ে। 

টলতে টলতে বেরিয়ে এলো তাহমিদ। এখন তার অবস্থা ভীষণ খারাপ। আগে তো সে বিভিন্ন দরজায় নক করেছিলো, এখন নক করার মতো শক্তিও আর নেই তার। টলতে টলতে একসময় সে একটা ঘরের সামনে লুটিয়ে পড়ে। ওর লুটিয়ে পড়া দেখে সে ঘরের সবাই বের হয়ে এলো। ওকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে এল ঘরে। পানি খেতে দিল। ঘরের কর্তা তাহমিদকে জিজ্ঞাসা করলো ওর ফোন কই। তাহমিদ কাঁপা হাতে পকেটে হাত দিয়ে দেখে ফোন নেই। তখন তারা তাহমিদকে অভিভাবক কারো মোবাইল নাম্বার জিজ্ঞাসা করলো। তাহমিদ এক ঝলক চিন্তা করে জামিলের নাম্বারই দিল। জামিলকে তাহমিদ নিজের অভিভাবকই মনে করে। জামিলকে ফোন দিয়েই উপস্থিত সবাই তাহমিদের সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এদিকে তাহমিদ ক্রমেই তার কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলছে। সারা শরীর কাঁপছে তার। কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। চোখ খুলে রাখাও তার জন্য কষ্ট হয়ে পড়ছে। চোখ বন্ধ করে সে কেবলই আল্লাহকে ডাকছে। এতটাই কাঁপছে যে তার মনে হচ্ছে সে বিছানা থেকে পড়ে যাবে। এমন সময়ে কেউ একজন তার হাত শক্ত করে ধরলো। তার মনে হলো পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় কেউ যেন তার হাত ধরে তোলার চেষ্টা করছে। সেও শক্ত করে সেই হাতটি চেপে ধরলো। চোখ খুললো তাহমিদ। অন্য কারো হাত নয়। তার অভিভাবক জামিলেরই হাত। ডুকরে কেঁদে উঠলো তাহমিদ। 

৪।
দেরী করেনি জামিল। পাঁজাকোলে করে তাকে সিএনজিতে তুললো। সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রওনা হয়ে গেল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। একের পর এক পুলিশের চেক এড়িয়ে যাওয়া সহজসাধ্য ছিল না। এর মধ্যে একটা চেকপোস্টে গাড়ি থামাতে হলো। জিজ্ঞাসা করলো পুলিশ, কই যাও? হাসপাতালে। আমার ছোট ভাই। খুব জ্বর। আচ্ছা। ছেড়ে দিল পুলিশ। আবার চলতে শুরু করলো। হাসপাতাল আর মাত্র একশ গজ দূরে। আবারো চেকের সম্মুখীন। কি হয়েছে এর? দুদিন ধরে জ্বর, হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। পুলিশ ভালো করে দেখলো। তাহমিদের রক্ত কিছুটা কাঁথার উপরে উঠে এসেছে। রক্ত দেখেই পুলিশের সন্দেহ হয়। কাঁথা সরাতে বলে। জামিল বিপদ বুঝতে পেরে কৌশল করে একটু খুললো। দুজন পুলিশ কাঁথা টানটানি করে সরিয়ে ফেললো। রক্তাক্ত তাহমিদকে দেখে তারা বুকে হাত দেয়। বুঝতে দেরী হয় না পুলিশের। এরা প্রতিবাদকারী ছাত্র। 

সিএনজি ড্রাইভারকে থানার দিকে গাড়ি ঘুরাতে বলে। জামিল মিনতি করতে থাকে। বার বার বলে, অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে ওর। এখনই চিকিৎসা করাতে হবে। নইলে মারা যাবে। প্লিজ আমাদের এরেস্ট করেন। যা ইচ্ছা তাই করেন। শুধু এর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। একজন পুলিশ সিএনজিতে উঠলো। আর অন্যরা গাড়ি নিয়ে সিএনজির পেছনে আসতে শুরু করলো। জামিল-সাদমানের আর্তনাদ, কাকুতি-মিনতি কোন কিছুকেই পাত্তা দিল না তারা। চলছে গাড়ি থানার দিকে। 

থানায় জামিল আর সাদমানকে নামানো হল। পরে তাহমিদকেও নামানো হল। তারা সেকেন্ড অফিসারের রুমে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাত তিনজন এসে শুরু করলো লাঠি দিয়ে বেদম মার। মারের চোটে তিনজনই পড়ে গেল। জামিল চিৎকার করতে লাগলো ওকে মারবেন না, ও গুলিবিদ্ধ। কে শুনে কার কথা। জামিল প্রথমে তাহমিদকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। তাকে আড়াল করে তার মারগুলো নিজের পিঠে নিয়েছে। কিন্তু তা অল্প কতক্ষন। পুলিশের হিংস্রতায় সে নিজেই দিশেহারা। লুটিয়ে পড়েছে এক পাশে। একের পর এক লাঠি ভাংছে। আবার নতুন লাঠি এনে মারা হচ্ছে তিনজনকে। রক্তাক্ত হয়ে পড়েছে সবাই। এভাবে চললো আধঘন্টা। একে একে সব পুলিশ ক্লান্ত হয়ে পড়লো। তারা একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। সাদমান এই ফাঁকে একটু মাথা উঁচু করে তাহমিদের দিকে তাকালো। তাহমিদ চোখ উলটে পড়ে আছে। জামিল ভাই, তাহমিদ আর নেই বলে আর্তনাদ করে উঠলো। জামিলও উঠে এল। সাদমান চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। জামিল নিঃশ্বাস পরীক্ষা করে দেখলো এখনো প্রাণ আছে। এবার সে পুলিশদের পায়ে ধরে মিনতি করতে লাগলো ওকে যাতে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এক পর্যায়ে নিষ্ঠুর লোকগুলোর মন একটু গলে। তারা তাহমিদকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। সাদমান-জামিল পরষ্পরকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। তারা নিশ্চিত তারা হারাতে যাচ্ছে তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুকে। 
রাতে সাদমান-জামিলের উপর নেমে আসলো আগের চেয়েও ভয়াবহ নির্যাতন। ওরা কি তার বন্ধুর জন্য চিন্তা করবে, না নিজের কথা চিন্তা করবে কোন কিছুর কূল পায় না। একের পর এক লাঠির আঘাত এবং লাথি আছড়ে পড়ছে তাদের উপর। বাসায় কেউ জানে না। কোন খবর পাঠাতে পারেনি। এদিকে তাহমিদের খবরও পাঠাতে পারেনি তার বাসায়। সব মিলিয়ে তাদের পুরো পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়ায় এ হাজতখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। রাত তিনটার দিকে তাদেরকে মারা বন্ধ হলো। রক্তাক্ত নিথর দুটো দেহ পড়ে আছে মেঝেতে। একটু নড়ার সামর্থ্য নেই কারো। মাঝে মাঝে কেবল যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে তারা। আর আল্লাহকে ডাকছে বার বার। হঠাৎ আজানের ধ্বনি। ফজরের আজান। হৃদয় নাড়া দেয়া চিরপরিচিত সুর। সারাজীবন আজান শুনে আসছে, কিন্তু আজ যেন প্রতিটা ধ্বনি হৃদয়ে এক অচেনা শান্তির প্রলেপ আর আশ্বাস যোগালো। আজান শুনে মনে সাহস পেল দুজনই। ধীরে ধীরে এক সময় উঠে বসলো তারা। সে রক্তাক্ত অবস্থাতেই তায়াম্মুম করে নামাজ পড়লো। নামাজ শেষে বসে থেকে জামিল ছাদের কাছাকাছি থানার গরাদের একচিলতে জানালার ফাঁকা জায়গাটুকু দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো। সাদমান জিজ্ঞাসা করলো, ভাই কি দেখেন? জামিল আপনমনে উত্তর দিলো, সূর্যোদয় দেখি। সোনালী সূর্যোদয়। একদিন এদেশে সত্যিকারের সূর্যোদয় হবে। সেদিন এ জনপদে আর কোন অত্যাচারী স্বৈরাচারের কালো থাবা আমাদের স্বপ্নময় ভবিষ্যতকে আড়াল করে রাখতে পারবে না।

২৬ ফেব, ২০১৭

আকাশের মা


থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। খুবই ব্যস্ত সময় যাচ্ছে শাহিদের। অধিকাংশ ভার্সিটির ছেলেদের যা হয়, সারাবছর বইয়ের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। পরীক্ষা এলেই চোখের জল আর নাকের জল এক হয়ে যায়। শাহিদও তার ব্যতিক্রম নয়। তারই ক্লাসফ্রেন্ড রকিবের কাছে তার ছোটাছুটি এখন নিয়মিত। রকিব গ্রামের ছেলে, রাজনীতি করে না বলে হলে স্থান হয়নি। মেস ভার্সিটির আরো কিছু ছাত্রদের সাথে থাকে। অথচ ক্লাসের সেরা ছাত্রদের মধ্যে সে একজন। বৈধভাবে সিট বরাদ্দ হলে সেই সবার আগে পাবার কথা। কিন্তু হলতো এখন ক্ষমতাসীন দলের অফিস। সেখানে অরাজনৈতিক ছাত্র কিভাবে থাকবে! শাহিদ তার কাছে নিয়মিত আসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য।

এই নিয়ে চারদিন শাহিদ রকিবের মেসে এসেছে, এরমধ্যে তিনদিনই একই ঘটনা ঘটেছে। প্রথম দিন থেকেই সে ভাবছে বিষয়টা রকিবকে জিজ্ঞাসা করবে। বলি বলি করেও একথা সেকথায় আর বলা হয়নি। আজতো মহিলাটা তাকে প্রায়ই ধরেই ফেলেছিল। শাহিদও ভয় পেয়েছে ভীষণ। রাস্তার মোড়ে যেখানে বাস থামে সেখানেই গত চারদিন ধরে একটি মহিলাকে দাঁড়ানো দেখেছে শাহিদ। যখনই শাহিদ বাস থেকে নামে তখনই তিনি এগিয়ে আসেন। শাহিদের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন আকাশ কোথায়? তোমাদের সাথেই তো ছিল। তোমরা সবাই চলে এলে। আকাশ আসে না কেন? প্রথমদিন বিষয়টাকে পাত্তা না দিলেও প্রতিদিনের বিষয়টা শাহিদকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। 

মহিলাটির বয়স আনুমানিক ৪৫ হবে। একটু স্বাস্থ্যবান। রাস্তার মোড় থেকে গলির দিকে ঢুকার মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ বিদ্যমান। চোখ দুটোর দিকে একটু খেয়াল করলে বুঝা যাবে রাজ্যের ক্লান্ত তিনি। মনে হবে বহু বছর ঘুমাননি তিনি। আজ রকিবের বাসা থেকে বের হতে একটু দেরী হয়ে গেল। রাত সাড়ে দশটা। এখন গলির মুখটা প্রায় ফাঁকা। মানুষজনের চলাচল একেবারে কমে গেছে। সে হঠা দেখে সেই মহিলাকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছে দুজন। পাশেই বিলাসবহুল গাড়ি। তারা গাড়িতে উঠাতে চাচ্ছেন সেই মহিলাকে। কিন্তু ভদ্রমহিলা কোনভাবেই উঠতে চাইছেন না। তিনি এককথা বার বার বলছেন আকাশ বলেছে তো, সে ফিরবে। আরেকটু দাঁড়াই। বাচ্চা একটা ছেলে। অন্ধকার হয়ে গেছে। বাসায় ফিরতে ভয় পাবে তো। আরেকটু থাকি। অন্যদিকে যে দুজন লোক গাড়িতে উঠাতে চাইছেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করছেন, আকাশের সাথে তাদের কথা হয়েছে। সে আজ ফিরবে না। চলেন মা চলেন। এক পর্যায়ে মহিলা কাঁদতে শুরু করলেন। হঠাত সেই মহিলাটি দেখতে পেল শাহিদকে। দেখা মাত্রই তার দিকে প্রায় দৌড়ে আসলেন। লোক দু’জন প্রথমে বুঝতে পারেননি কি হচ্ছে। পরে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তারা মহিলাটিকে ধরে ফেললেন। আবার সেই জিজ্ঞাসা শাহিদকে। আমার আকাশ কই। লোক দুজন শাহিদকে স্যরি বলে এবার প্রায় জোর করে গাড়িতে তুললো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। শাহিদের খুব খারাপ লাগছে। তার খুব ইচ্ছে করছে মহিলাটার সাথে কথা বলতে। 

পরদিন রকিবের বাসায় আসতে গিয়ে খোঁজ করলো শাহিদ। না মহিলাটিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে খুঁজলো। না, কোথাও দেখা যাচ্ছে না। রকিবের বাসায় গিয়ে প্রথমে মহিলাটির কথা জিজ্ঞাসা করলো রকিবকে। রকিব তুই চিনিস? 

২.
গল্প বলার নেশায় থাকা শাহিদ এতক্ষন টের পায়নি রকিবের মানসিকতা। প্রশ্ন করে তার দিকে তাকাতেই দেখলো রকিব দু’চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছে। কাছে এগিয়ে এসে তার হাত ধরলো শাহিদ। 
কি হয়েছে রকিব? চিনিস তুই ওনাকে? কি হল? কথা বলছিস না যে? 
রকিব কান্না জড়িত কন্ঠে বললো, বড় নিষ্ঠুর হয়ে গেছি রে...।

আমি তখন নতুন ভর্তি হয়েছি বিজ্ঞান কলেজে। গ্রাম থেকে এসেছি। আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বাবাকে বলেছি আমি শহরেই পড়বো। গ্রামের কলেজে পড়লে ভালো কোন ক্যরিয়ার তৈরী হবে না। বাবাও চাইতেন আমার ক্যারিয়ার যাতে ভালো হয়। কিন্তু তিনি সামর্থের কথা চিন্তা করে আমাকে বলতেন মফস্বলের কলেজে পড়েও অনেকে মানুষ হয়েছে। বাবার সাথে অনেকটা জেদ করেই কলেজে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু বাবা যে আমাকে কিছু টাকা পাঠাবে আমার থাকা-খাওয়ার জন্য সেটাও নিয়মিত পাঠাতে পারতেন না। ভালো টিউশনিও পাচ্ছিলাম না। খুব কষ্টে যাচ্ছিল দিন। একদিন অর্থাভাবে খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। সেদিন প্রায় ঠিক করে ফেললাম পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাব। আল্লাহর উপর খুব রাগ হচ্ছিল। কত মানুষের কত টাকা। অল্প কিছু টাকার জন্য আমার পড়ালেখা হচ্ছে না। বাবা-মায়ের উপর রাগ করেও পারছি না। বয়সও তো কম ছিল। সব মিলিয়ে চাপ সহ্য করতে না পেরে চোখে পানি চলে আসছিল। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। 

এমন সময় কে যেন আমার পিঠে হাত রাখলো। আমি চমকে ফিরে তাকালাম। দেখলাম আমারই মত বয়স। হাসি হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, কি হয়েছে ভাই? কোন সমস্যা? প্রথম দেখাতেই আমার মনে হল এটা আমার আপনজন। কত দিনের পরিচয়। আমি আমার দুঃখের কথা বলতে গিয়েও আর বলতে চাই নি। বললাম, আপনি কে? আপনাকে তো চিনলাম না। সে বললো আমার বাসা এখানেই। চল বাসায় চল। আমি কেন যেন সেই নিমন্ত্রন ফেলতে পারিনি। কেমন যাদুকরি কথা, সুন্দর হাসিমুখ, অপরিচিত মানুষকে আপন করে নেয়ার তীব্র ব্যকুলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি চললাম তার বাসায় তার সাথে। বিশাল বাসা। আলিশান অবস্থা। বাসায় আমাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে তার মাকে বললো, মা আমার এক বন্ধু এসেছে। খাবার দাও একসাথে খাব। সে জানতে চায় নি আমি ক্ষুদার্ত কি না। সম্ভবত দেখেই বুঝেছে আমি ক্ষুদার্ত ছিলাম। 

খাওয়া-দাওয়ার পর জানতে চাইলো আমার পরিচয়। আমি বললাম। সেও তার পরিচয় দিল। সে আরেকটি কলেজে পড়ে। আমার মতই ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে। আমাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করতে আমি বৃত্তান্ত খুলে বললাম। আমাকে বসিয়ে রেখে বাসার ভেতরে গেল। কিছুক্ষণ পর এসেই তাড়াহুড়ো করে বললো, চল তোমার মেসে যাব। আমি বুঝতে পারিনি কি হতে যাচ্ছে। সে আর আমি আমার মেসে আসলাম। সে বললো তোমার জিনিস কোনগুলো? আমি আমার বেডিং তাকে দেখালাম। সে নিজহাতে সব গুছাতে লাগলো, আর বললো চল সব বেঁধে নাও এখন থেকে তুমি আমার সাথে থাকবে। আমি প্রতিবাদ করলাম, কিন্তু তার কড়া চোখ রাঙ্গানিতে কিছুই বলতে পারলাম না। এমন করে শাসন করলো যেন সে আমার বহুদিনের বন্ধু। অথচ তার সাথে পরিচয় মোটে কয়েক ঘন্টা। মেসে আমার থেকে পাওনা দুইহাজার টাকাও পরিশোধ করে আসলো। 

সেই থাকে তাদের বাসায় উঠে গেলাম। তখন বুঝতে পারলাম ও এমনই পরোপকারী। এলাকার সবাই তাকে এক নামে চিনে। সে ছাত্রদের ভালো উপদেশ দেয়। এলাকায় এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজের আয়োজন করে। আমার যাতে হাত খরচ চলে এজন্য সে একটা ভালো টিউশনির ব্যবস্থা করে দেয়। মোটকথা যেখানে আমার পড়াশোনা বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছিল সে সেখানে আমার সব সমস্যা দূর করার চেষ্টা করে। আকাশ কেন এত ভালো? এই প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছে খুব সোজা যারা আকাশের মাকে জানে। বিশাল হৃদয়ের মানুষ তিনি। আকাশের বাবার মৃত্যুর পর আর্থিক অবস্থায় কিছুটা সমস্যা হলেও সামলে নিয়েছেন তিনি। নিজেই পারিবারিক ব্যবসা দেখেন।

আকাশরা তিন ভাই। এর মধ্যে আকাশ ছিল সবার ছোট। আমার প্রায়ই মনে হত, আকাশ আমাকে বন্ধু বলে তার বাড়িতে তুলেছে। তার মধ্যে আমাকে নিয়ে কোন সমস্যা দেখিনি। কিন্তু তার ফ্যামিলির অন্যরা আমাকে কিভাবে দেখে? এইভেবে নিজের মধ্যে কুঁকড়ে যেতাম। আকাশদের বাসায় থাকা অপমান মনে হত। একদিন কলেজ থেকে ফিরে দেখি আমার বাবা-মা। আমি তো ভীষণ অবাক। পরে জানতে পারি আকাশ আমার মায়ের মোবাইল নাম্বার তার মাকে দিয়েছে। সেই থেকে তিনিও আমার মাকে তাঁর বন্ধু বানিয়ে নিয়েছেন। তিনি আমার বাবা-মাকে একদিন দাওয়াত করলেন অথচ আমাকে জানালেন না সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। আমার মধ্যে থাকা সেই হীনমন্যতা কেটে গেল। 

আকাশ ইসলামের কথা বলতো। আল্লাহর উপর ভরসা রাখার কথা বলতো। আমাকে প্রায়ই বলতো চল, নামাজ পড়ে আসি। একদিনের ঘটনা। আমি আর সে একই রুমেই ঘুমাতাম। সকালে উঠত বলে সে একটু আগেই ঘুমাত। একদিন গভীর রাতে আমি হঠাৎ জেগে যাই। শুনতে পাই কে যেন কাঁদছে। কান খাড়া করে থাকলাম। দেখলাম সে এলাকার কিছু ছেলের কথা বলছে যাদেরকে সবাই খারাপ ছেলে হিসেবেই জানে। সে তাদের নাম ধরে দোয়া করছে তারা যেন ভালো হয়ে যায়। আল্লাহর কাছে তাদের হিদায়াতের জন্য কাঁদছে সে। অবাক হলাম। আর সেই সাথে বুঝলাম, আকাশরা সাধারণ কোন মানুষ নয়। তারা জান্নাতি মানুষ। 

এইচ এস সি পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। একদিন পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এসে দেখি আকাশদের বাড়িতে থমথমে নীরবতা। দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করতেই বললো ছোট ভাইয়ারে একটা সাদা মাইক্রোবাসে করে আসা লোকেরা নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে। সবাই থানায় খোঁজাখুঁজি করছে। আশেপাশের কোন থানাই স্বীকার করেনি তারা নিয়েছে। ডিবি অফিসে যোগাযোগ করেও কোন হদীস পাওয়া যায়নি। সেদিনই খালাম্মা আমাকে বললেন বাবা তুমি এখানে থাকলে বিপদে পড়বে। তুমি তোমার কোন বন্ধুর সাথে আপাতত থাক। তোমার কিছু হলে তোমার মাকে আমি কি জবাব দেব? আমার পরীক্ষার কথা চিন্তা করে আমি প্রয়োজনীয় কিছু বই-পত্র আর জামাকাপড় নিয়ে বের হলাম। খালাম্মা আমার হাতে বিশ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন, যাতে আমার থাকা খাওয়ার অসুবিধা না হয়। আমি নিতে না চাইলে কড়া ধমক দেন।

তখন সারাদেশে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, আকাশও সেই আন্দোলনে যোগ দেয়। স্বৈরাচারী সরকারের নাগপাশ ছিন্ন করে এদেশকে মুক্ত করার কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় আকাশ। মিছিল-মিটিং, রাস্তায় দাঁড়িয়ে সরকারের অন্যায় আচরনের প্রতিবাদ সে ছোট বয়সেই করা শুরু করেছে। তার মত মেধাবী ছেলে সহজেই নজর কেড়েছে পুলিশের। তাই তাকে তুলে নিয়ে গেল। আকাশের মা দিনের পর দিন থানায় থানায় ঘুরেছেন। সংবাদ সম্মেলন করেছেন। কিছুতেই কিছু হয়নি। একদিন জানতে পারলেন ডিবি অফিসে আছে। দু’দিন দু’রাত বসে ছিলেন ডিবি অফিসের সামনে রাস্তায়। ছেলের দেখা পেলেন না। সারাজীবন কারো কাছে ছোট না হওয়া আকাশের মা গেলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতার বাসায়। ভিখারির মত বসে ভিক্ষা চাইলেন ছেলেকে। ঘৃণাভরে তাড়িয়ে দিলেন। 

এরপর সারাদেশের কোথাও লাশ পাওয়া গেলেই ছুটে যান আকাশের মা। এক পর্যায়ে আকাশের মা বুঝতে পারেন আকাশ আর নেই। এবার তিনি পুলিশের লোকদের পিছে পিছে ঘোরেন যাতে তার লাশটা কোথায় এটা জানায়। পুলিশের বড় অফিসারদের কাছে গিয়ে বলতে থাকেন ওর কবরটা দেখিয়ে দেন, যত টাকা লাগে দেব। শুধু ওর কবরটা দেখিয়ে দেন। নিয়মিত পুলিশের অফিসে যাওয়ায় পুলিশরা বিরক্ত হয়ে উঠে। একদিন তাকেও আটক করে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। মাসখানেক পর জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু তারপরও তিনি আকাশের খোঁজ বন্ধ করেন না। এভাবে এক বছর পার হয়ে যায়। একদিন এক পুলিশ অফিসার একটা পেপার ওয়েট ছুঁড়ে মারে আকাশের মায়ের কপালে। কপাট কেটে যায় তাঁর। আকাশ বলে চিৎকার করে পড়ে যান থানার সামনে। চিকিৎসা হয়। সুস্থও হন। কিন্তু আকাশের শোক আর মাথায় আঘাত দু’টো মিলে তিনি একটু অপ্রকৃতস্থ হয়ে পড়েন। 

আকাশের কোন বন্ধু-বান্ধব পেলেই জানতে চান আকাশ কবে ফিরবে? আকাশ কেন ফিরে না? আকাশের জন্য তিনি এখন দাঁড়িয়ে থাকেন রাস্তায়। আমিও বহুদিন তাকে ঘরে এনে দিয়েছি। আমাকে দেখলেই বেশী অস্থির হয়ে পড়তেন। তিনি মনে করতেন আমার সাথেই সে আছে। আমাকে দেখলেই জিজ্ঞাসা করতেন আমিও কিছু না কিছু বুঝিয়ে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যেতাম। একদিন আমার ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। তিনি আমার হাত জড়িয়ে ধরে রাখছেন। আমি যাতে আকাশকে এখনই নিয়ে আসি এসব বলছেন। সেদিন আমার বের হতে দেরী হয়েছিল। পরীক্ষা শুরু হওয়ার বাকী ছিল পনের মিনিট। আমি ওনার হাত হতে বাঁচার জন্য খুব কড়া করে ওনাকে একটা ধমক দেই। তিনি ভীষন শক খেলেন। আমার হাত ছেড়ে দিলেন। সেই থেকে আমাকে আর কোন দিন ডিস্টার্ব করেন নি। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি মানুষ না, কখনোই ছিলাম না। পশু না হলে কি সেদিন খালাম্মাকে ধমক দিতে পারতাম! 

৩. 
শাহিদ ও রকিব এখন আকাশের মায়ের পাশে। আজ তিনি অসুস্থ। ১০২ ডিগ্রী জ্বর। রকিবকে দেখেই উঠে বসলেন! এতদিনে বুঝি আসার সময় হল মায়ের কাছে! শাহিদের দিকে তাকিয়ে বললেন আমার আকাশটা ঠিক এর মত না? আকাশ আমাকে ফাঁকি দেয়ার জন্য ওকে পাঠিয়েছে। আচ্ছা বলো, আমি কি আকাশকে আদর করতাম না? কেন সে আসে না? কতদিন তাকে খাওয়াই না। বলতে বলতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন, আমার আকাশের বন্ধুরা এসেছে। তাদের খাওয়াতে হবে না! হই চই করে রান্না-বান্না শুরু করলেন। 

আচ্ছা রকিব, আকাশরা যে জন্য প্রাণ দিয়েছে, গুম হয়েছে, সেই স্বৈরাচারতো এখনো আছে। তাদের প্রাণ দেয়া তো বৃথা গেল। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে রকিব বললো আকাশরা ছিল আমার, তোমার, সবার। সবাইকে মুক্ত করতে গিয়ে তারা মুক্ত হয়ে গেল। মুক্তি পাইনি আমরা। আকাশরা সবার জন্য হলেও আমরা কেউ আকাশদের জন্য হতে পারিনি। আমাদের মুক্তি নেই...

১৬ ফেব, ২০১৭

মিথ্যেবাদী বাবা

১। 
রাত দেড়টা। এপাশ ওপাশ করছেন আজমল সাহেব। চোখের দুই পাতা এক করতে পারছেন না। ঘুম তো দূরের কথা মাঝে মধ্যে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। জেলখানায় এই বিষয়টা খুব সাধারণ হলেও আজমল সাহেবের জন্য মোটেই সাধারণ কোন ঘটনা নয়। খুব শক্ত মানসিকতার মানুষ তিনি। যখনই জেলখানায় কেউ ভেঙ্গে পড়ে তখন তিনি সান্ত্বনার হাত দিয়ে তাকে আগলে রাখেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তার বহু ছাত্র আটক হয়েছে, নির্যাতিত হয়েছে তারা যখনই তাদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে ওনার কাছে আসতেন তখন আজমল সাহেবের দরদ মাখা হাত বুলানো আর উদ্দিপনামূলক বক্তব্য তাদের দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। সেই আজমল সাহেব কান্না করছেন বিষয়টা সহজ কিছু নয়। 

অনেকক্ষণ ধরেই বিষয়টা লক্ষ্য করছে শাহেদ। সে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে আজমল সাহেবের কাছে আসলো। জেলখানায় রাতে জেগে থাকাটা অপরাধ। দশটায় সবাইকে ঘুমাতে হবে এটা বাধ্যতামূলক। ঘুম না এলেও শুয়ে থাকতে হয়। শাহেদ ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণ। রাত দশটায় ঘুমিয়ে পড়া এখনকার ছাত্রদের নিয়মের মধ্যে পড়ে না। তাদের কত কাজ(!)। ফেসবুকিং, ব্লগিং, আড্ডা, গুল্প-গুজব ইত্যাদি করতে করতে কমসে কম দু’টা তো বাজেই। তাই শাহেদদের মত তরুণরা জেলখানার এই নিয়ম মেনে নিতে পারে না। দশটায় শুয়ে পড়লেও কিছুক্ষণ পর উঠে তারা গল্প-গুজবে মাতে। এর মধ্যে কারারক্ষীর হাতে ধরা পড়েছে বার পাঁচেক। জরিমানা গুনতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও সে রাত জাগা থেকে সে বিরত থাকতে পারেনি। অভ্যাস বলে কথা। অভ্যাসের দাম কোটি টাকা। 

তার বন্ধু সমাজ ইদানিং জেগে থাকার শক্তি পায় না। জেলখানার পরিবেশের সাথে ধীরে ধীরে সবাই নিজেদেরকে তাল মিলিয়ে নিচ্ছে। সেদিনও পঞ্চাশজনের পুরো ওয়ার্ডে সে আর আজমল সাহেব জেগে আছে। আজমল সাহেব কাঁদছেন আর সে বই পড়ছে। এই ওয়ার্ডের সবাই আজমল সাহেবের ভক্ত। এমনকি বিড়ালটা পর্যন্ত। আজমল সাহেবের বিষয়টা প্রথমে শাহেদ টের না পেলেও টের পায় বিড়ালটি। সেই ইশারা করে শাহেদকে দেখায় আজমল সাহেব কাঁদছে। বিড়ালটা শাহেদের খুব প্রিয়। নাদুস নুদুস সাদা বিড়াল। জেলখানায় মানুষগুলো লিকলিকে থাকলেও বিড়ালগুলো থাকে হৃষ্টপুষ্ট। মানুষের জন্য দেয়া খাদ্য নামের অখাদ্যগুলো বিড়ালদের জন্য অমৃত। 

আলতো করে একটি হাত রাখে শাহেদ আজমল সাহেবের কপালে। চমকে উঠে তাকায় আজমল সাহেব। এবার তাকে দেখে চমকে উঠে শাহেদ। চোখ দু’টি ভয়ানক ফোলা, রক্তাভ। স্যার কি হয়েছে আপনার? কিছু না বলে সামলানোর চেষ্টা করেন তিনি। উঠে বসলেন। হঠাত শাহেদকে জড়িয়ে ধরেন। কান্নার চাপে কেঁপে কেঁপে উঠছেন তিনি। শাহেদ প্রাণপণে চেপে ধরে রাখছে। জেলখানায় দুটো জিনিস সংক্রামক একটি হল চুলকানি অন্যটি কান্না। প্রত্যেকের হৃদয়ে থাকা দুঃখ আরেকজনের কান্না দেখলেই উথলে উঠে। শাহেদ নিজেকে ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। চেপে রাখা কান্না যখন একবার তার বাঁধ ভেঙ্গে ফেলে তখন নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় দুঃসাধ্য। এর মধ্যেই শাহেদ আবিষ্কার করে আজমল সাহেব হাতে চেপে আছে একটি কাগজ। 

পরিস্থিতি কিছুটা সামলে নিয়ে শাহেদ আজমল সাহেবের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে নেয়। মেলে ধরে চোখের সামনে। ছোট কোন মানুষের হাতের লিখা। গোট গোট করে তাতে শিরোনাম দেয়া আমার প্রিয় মানুষ।
২। 
কলেজে তার চেয়ারে বসে ব্যাগ গোছাচ্ছেন আজমল সাহেব। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে এবার বাসায় যাওয়ার পালা। হঠাত তিনটি পুলিশের গাড়ি বেশ সাড়াশব্দ করে ঢুকে পড়ে কলেজে। ঘিরে ফেলে আজমল সাহেবের কক্ষ। প্রায় উড়ে এসে তিনজন পুলিশ সদস্য তাকে তার কক্ষেই শুইয়ে ফেলে। পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। মনে হচ্ছে যেন বিশাল কোন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে তারা ঘায়েল করেছে। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চললো গাড়ির কাছে। ধাক্কা মেরে গাড়িতে তুলছে এমন সময় পুলিশের তিনটি গাড়ি ঘিরে ফেলে ছাত্র আর শিক্ষকরা। কলেজের পাশের মসজিদের বৃদ্ধ মুয়াজ্জিন দৌড়ে মসজিদে গিয়ে মাইকে বলতে থাকে ‘এলাকাবাসী বাইর হই আইয়্যেন, বাইর হই আইয়্যেন, হারামজাদারা আঙ্গো আজমল স্যাররে লই যার। ব্যাকে বাইর হই আইয়্যেন। 

ব্যাস! আর যায় কোথায়। মুহুর্তেই মফস্বল শহরের হাজারখানেক মানুষ জড়ো হয়ে যায়। পুলিশ বিপদ বুঝেই আজমল সাহেবের বাঁধন খুলে দেয়। বিচক্ষন আজমল সাহেব বুঝতে পারেন আজ যদি তাকে পুলিশ না নিয়ে যেতে পারে তবে বিপদ শুধু তার একার হবে না, পুরো এলাকাবাসী বিপদে পড়বে। তাই তিনি নিজেই পুলিশের ভ্যনে উঠে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য দিলেন। সবাই শান্ত থাকতে বললেন। আর বললেন আমার ছাত্ররা যে সত্যকে বুকে ধারণ করে জেলে যাচ্ছে সে সত্যের শিক্ষক হয়ে আমি কেন তাদের পাশে থাকবো না। আমি যাচ্ছি পুলিশের সাথে, তাদের সাথে আমার আলাপ আছে। ততক্ষনে পুলিশ অফিসার জনতাকে শান্ত করার জন্য বলে উঠলো, আপনারা যার যার যায়গায় ফিরে যান। আমরা স্যারের সাথে কিছু জরুরী কথা বলে স্যারকে আবার বাসায় পৌঁছে দেব। 

থানায় এসে আজমল সাহেব তার অপরাধ বুঝতে পারলেন। তার ছাত্রদের কাবু করার জন্য তাকে ধরে নিয়ে আসা হল। রফিক আজমল সাহেবের প্রিয় ছাত্র। সে সংগ্রাম পরিষদের নেতা। দিন পনের আগে তাকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ রীতিমত অস্বীকার করে আসছে তারা রফিককে গ্রেফতার করে নি। তাকে দেখে চমকে উঠে আজমল সাহেব। পিটিয়ে কিছু রাখে নি। তবুও তার থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ চায় সে একটা ঘোষনা দিক যেখানে বলা থাকবে সংগ্রাম পরিষদ সব কার্যক্রম বন্ধ করছে সেই সাথে তারা আন্দোলন করে অন্যায় করেছে এমন একটি স্বীকারোক্তি থাকবে। আরো স্বীকারোক্তি তারা চায় এখন থেকে রফিক সরকারের সাথে কাজ করবে। এমন ঘোষণা দিলে তাকে মুক্ত করে দেয়া হবে। সেই সাথে তাকে দেয়া হবে গাড়ি বাড়ি ইত্যাদি। রফিকের এক কথা, কোন মিথ্যে কথা আমার থেকে বলিয়ে নিতে পারবে না। কখনো না... 

রফিকের আঙ্গুলগুলো যখন থেতলে দেয়া হচ্ছিল, রফিক তখন আল্লাহ ছাড়া আর কোন শব্দ করেনি। সব সহ্য করেছে। পরদিন তাকে থানা থেকে ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হলে একদিন তাকে কোন নির্যাতন করা হয়নি। এরপর আবার শুরু হয় কথা আদায়। স্বীকারোক্তি আদায়। নির্যাতনের নতুন সব কলাকৌশল। কোন কিছুই নমনীয় করতে পারেনি রফিককে। এভাবে চলছে পনের দিন। এরপর তারা বুঝতে পারে তার শিক্ষক আজমল সাহেব থেকেই সবসময় সে বুদ্ধিপরামর্শ নেয়। আজমল স্যারকে সে ভালবাসে। আজমল সাহেবকে তারা রফিকের সাথে দর কষাকষির বস্তু বানাতে চায়। কথাবার্তা ছাড়া হঠাত মারতে থাকে আজমল সাহেবকে রফিকের সামনে। বহু নির্যাতনের ধকলে প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়া রফিকের কোন বিষয়েই চাঞ্চল্য ছিল না। আজমল সাহেবের উপর নির্যাতনে সে চিৎকার করে উঠে। থাম! থাম!! তোরা সব থাম! তোদের যা ইচ্ছা লিখে দে আমি বলবো। সাবধান আমার স্যারের গায়ে হাত তুলবি না। 

আকস্মিক আক্রমনে হতচকিত আজমল সাহেব রফিকের চিৎকারে সম্বিত ফিরে পেলেন। মলিন অথচ আত্মবিশ্বাসী হাসি দিয়ে রফিককে শান্ত স্বরে বললেন “যে সত্যের দীক্ষা তুমি আমার কাছ থেকে পেয়েছ সেই শিক্ষার মর্মান্তিক মৃত্যু তুমি আমার সামনে ঘটাতে পারো না”। কপাল কেটে বেয়ে পড়া নোনা রক্ত শার্টের হাতা দিয়ে যেই মুছতে গেলেন তখনি হাত বাড়িয়ে দুই পা এগিয়ে গেল রফিক। আজমল স্যারের কপাল থেকে রক্ত নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে বললো শপথ করলাম স্যার, কোনদিন মিথ্যার সাথে আপোষ করবো না। কোনদিন না। আবার শুরু হল বেদম মার। দুইজনেই বেহুঁশ হয়ে পড়লো। 

জ্ঞান ফেরার পর থেকে আজমল সাহেব আর রফিককে দেখতে পাননি। বার বার জিজ্ঞাসা করেও কারো থেকে উত্তর পাননি। বাইরের লোকেরা এখনো জানে রফিক হারিয়ে গেছে। পুলিশের বরাবরের মত গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করে যাচ্ছে। তিনদিন পর আজমল সাহেবকে কোর্টে তোলা হল। জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানো হল। কোর্টে তার নিকট আত্মীয়-স্বজনরা প্রায় সবাই এসেছে। শুধু আসেনি তার ছয় বছরের মেয়ে লুবনা। ধুলামলিন এবং আঘাতে আঘাতে জর্জরিত আজমল সাহেবকে দেখে সবাই কান্না-কাটি শুরু করলো। আজমল সাহেব স্ত্রীকে বললেন তার গ্রেপ্তারের কথা যাতে লুবনাকে বলা না হয় কারণ এতে তার ভয়ংকর মানসিক চাপ হতে পারে। তাই তিনি কিছু একটা বলে চালিয়ে নিতে বললেন। আরো বললেন বলবে আমার বাহিরে কাজ পড়েছে। নতুন অফিস হয়েছে। অফিসে অনেক কাজ তাই বাসায় যাওয়া হয় না। কয়েকদিন পর আমার সাথে দেখা করতে নিয়ে আসবে। সবাইকে সান্তনা দিয়ে তিনি কারাগারে চলে গেলেন। 

কারাগারে যাওয়ার তৃতীয়দিনেই পেলেন দুঃসংবাদটি। সেই গথবাঁধা গল্প। রাতের বেলা মটরসাইকেল নিয়ে যাচ্ছে রফিক। পুলিশ তাকে চেক করার জন্য থামতে বলে। সে তো থামেই নি বরং গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করে পুলিশের দিকে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি করে। গুলিতে নিহত হয় রফিক। সব পত্রিকা পুলিশের সাজানো এমন গল্পই ছাপে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন আজমল সাহেব। সেই সাথে দুই ফোঁটা তপ্ত অশ্রুজল। স্বগতোক্তির মত বলতে থাকেন হাসবুন আল্লাহ ওয়া নে’মাল ওয়াক্বীল নে’মাল মাওলা নে’মান নাসির। 

৩। 
বাংলা ক্লাস চলছে। আয়েশা করিম ক্লাসে সবাইকে রচনা লিখতে বলেছেন। রচনার নাম “আমার প্রিয় মানুষ” সবাই লিখছে, সেই সাথে লিখছে লুবনাও। ছোট ছোট মানুষগুলো লিখছে তাদের প্রিয় মানুষের কথা। লুবনা লিখছে তার বাবাকে নিয়ে। ছোট ছোট হাতে গোট গোট অক্ষরে লিখছে। সবাই একের পর এক তাদের লিখা জমা দিচ্ছে। আয়েশা করিম দেখলেন লুবনা তার খাতার উপর মাথা নামিয়ে দিয়ে আছে। তিনি ডাক দিলেন, লুবনা কি করছো তুমি? তোমার কি লিখা শেষ হয়েছে? ডাক শুনে লুবনা মাথা তুলতেই আয়েশা ম্যাম বুঝতে পারলেন এতক্ষন কাঁদছিল লুবনা। মামণি কি হয়েছে তোমার? একথা বলে তিনি দৌড়ে আসলেন। তাকে জড়িয়ে ধরলেন আর তার লিখা পড়তে লাগলেন। 

আমার প্রিয় মানুষ আমার আব্বু। আব্বু আমাকে গল্প শোনায়। আব্বু আমাকে আইসক্রিম কিনে দেয়। আব্বু একটুও বকা দেয় না। আব্বু আমাকে খাইয়ে দেয়। রাতে আমি যখন শুয়ে পড়ি তখন আব্বু আমার কপালে চুমু দেয়। সে আমাকে স্কুলে নিয়ে আসে। আম্মু যখন আমাকে বকা দেয় তখন আব্বু আমাকে আদর করে। একবার আব্বুর সাথে আমি বৃষ্টিতে ভিজেছি। অনেকক্ষণ ভিজেছি। পরে আমার জ্বর হয়। আব্বু সারারাত আমার পাশে বসে কাঁদছিল। আম্মু সেদিন আব্বুকে অনেক বকেছে। আসলে আব্বুর দোষ ছিল না। আমিই আব্বুকে বার বার বলে বিরক্ত করে ভিজেছি। 

আব্বু সবসময় বলতেন কাউকে কষ্ট না দিতে। দুঃখীকে সাহায্য করতে। বড়দের সম্মান করতে। ছোটদের আদর করতে। আব্বু সবসময় মিথ্যা কথা বলতে নিষেধ করতো। আর এখন আব্বু সমানে মিথ্যা কথা বলে। আব্বু বলেছিল নতুন অফিস থেকে এক সপ্তাহ পরে বাসায় আসবে। আসেনি। সে আমাকে এখন স্কুলে নিয়ে আসে না। আমি আর আম্মু যখন নতুন অফিসে দেখা গিয়েছি তখন আব্বু বলেছিল আমার ফার্স্ট টার্মের আগেই সে বাসায় আসবে। এখন ফাইনাল টার্ম চলে আসছে এখনো সে আসেনি। আমাকে সে সবসময় বলে অল্প কিছুদিন পরে সে বাসায় আসবে। কিন্তু সে আসেনা। সে বলেছে রোজার আগে আসবে। আসেনি। গতমাসে বলেছে ঈদের আগে আসবে। আমার মনে হয়েছে সে আসবে না। সত্যিই সে আসেনি। ঈদের দিন শুধু আমাকে নতুন অফিসে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। আমিও কেঁদেছি। 

আব্বু মিথ্যা বলেছে। আসলে ওটা আব্বুর অফিস নয়। ওটা জেলখানা। আমাকে সামিহা বলেছে। ওখানে খারাপ মানুষ থাকে। আব্বু এখন মিথ্যাবাদী। আমি আর এখন আব্বুকে ভালবাসি না।

৩০ অক্টো, ২০১৬

জন্মদিনের কান্না


বার বার বলার পরও মেয়েটা মনযোগী হচ্ছেনা। উদাস দৃষ্টি নিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। খুব বিরক্ত হচ্ছেন শিক্ষিকা শিরিন শবনম। এই বয়সের মেয়েদের এই হচ্ছে সমস্যা। হুটহাট অভিমান, মন খারাপ করে থাকবে। তারা মনে করে তারাই জগতের সবচাইতে বেশী বুঝে। কেউ একটু পরামর্শ দিলে, আদেশ দিলে কোন কিছু করতে বারণ করলে এই শুরু হয় তাদের পাকামো। আজ প্রায় একযুগের মত মেয়েদের এসব কান্ডকারখানা তিনি দেখে আসছেন। বালিকা বিদ্যানিকেতনের ইংরেজী শিক্ষক তিনি। 

নাওফি মেয়েটাকে ভালোই জানতেন। পড়ালেখায় খুব মনোযোগী। এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজেও দারুণ। উপস্থিত বক্তব্য আর বিতর্কে মেয়েটার জুড়ি নেই। তার বহুদিনের আশা মেয়েটাকে ইংলিশ ডিবেটর বানাবেন। এমন চটপটে মেয়েও যদি আরো আট দশটা মেয়েদের মত আবেগী হয়ে পড়ে, অমনযোগী হয়ে পড়ে ব্যপারটা দুঃখজনকই বটে! তিনি দেখলেন মেয়েটি যে শুধুমাত্র বাইরে আকাশের দিকে বার বার তাকায় তা নয়, বার বার বইয়ের নিচে একটি খাতা দেখছে। শিরিন ম্যাডাম পড়ানোর পাশাপাশি চোখ রাখছেন নাওফির উপর। এবার আর দৃষ্টি আকর্ষন করছেন না। মনে মনে বললেন, থাক! মেয়েটা কিছুক্ষন নিজের মত থাক। 

অল্পকিছু পর ম্যাডাম মূল বিষয়টা ধরতে পারলেন, মেয়েটি একটি খাতায় লিখা কিছু একটা পড়ছে আর চোখ মুছছে। তার কান্না ঠেকানোর জন্য সে বার বার বাইরে তাকাচ্ছে। নিজেকে ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ম্যাডামের ভয়ানক রাগ হলো, বুঝতে পারলেন প্রেম ঘটিত ব্যাপার। এতটুকুন মেয়ে পড়ে ক্লাস সেভেনে। এখনই এসবে জড়িয়ে পড়েছে। এগুলোকে প্রশ্রয় দিতে নেই। কড়া ধমক দিয়ে ডাক দিলেন, নাওফি! 

ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠলো নাওফি! থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। ম্যাডাম নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে বললেন, নাওফি তোমার বইয়ের নিচে খাতাটা নিয়ে আসো। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নাওফি। ম্যাডাম আবারো বললেন, কথা কি তোমার কানে যায় না? নাওফি এবার আস্তে আস্তে বলে, ম্যাডাম স্যরি, আমি আর অমনযোগী হবোনা। ম্যাডাম গর্জে উঠলেন তোমাকে কি স্যরি বলতে বলেছি? যা বলেছি তাই করো। পুরো ক্লাসে থমথমে পরিস্থিতি। ম্যাডাম আরেকটি মেয়ে রাশিদাকে বললো, যাও ওর খাতাটি নিয়ে আসো। প্রাণপনে খাতাটি চেপে ধরে নাওফি। কিছুতেই সে খাতাটি হাতছাড়া হতে দিবেনা। এবার ম্যাডাম নিজেই হস্তক্ষেপ করলেন। জোর করে কেড়ে নিলেন খাতাটি নাওফি থেকে। 

সুন্দর মলাট করা একটা খাতা। খাতার উপরে লিখা “আমার প্রিয় মানুষ”। ম্যাডাম শিরিনের ঠোঁটের কোনায় হালকা হাসির রেখা। তিনি ভুল ধারণা করেননি। তারপর মলাট উল্টাতেই একজন ত্রিশোর্ধ মানুষের আঁকা ছবি। ম্যাডাম কড়া করে জিজ্ঞাসা করলেন কে এই লোক? ছবিটা এঁকেছেই বা কে? কোন জবাব দেয় না নাওফি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আর চোখ দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে অশ্রুমালা। ম্যাডাম একটু ভালো করে ছবি দেখতে গিয়েই দেখলেন কোণায় নাওফির স্বাক্ষর করা। মানে নাওফিই এঁকেছে এই ছবি। ভালোই আঁকতে পারে মেয়েটি। তার এই গুণের কথা জানতেন না ম্যাডাম। 

একটু খটকাও লাগছে ম্যাডামের। এমন বয়স্ক মানুষ কিভাবে প্রিয় মানুষ হয় বুঝতে পারছেন না। পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন। একটা বিয়ের ছবি, সেখানে এই মানুষটার বিয়ে হচ্ছে বুঝা যাচ্ছে। পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন, ঐ লোকটার রক্তাক্ত ছবি, একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাচ্ছেন ম্যাডাম। ঐ লোকটার অনেক রক্তাক্ত ছবি, লোকটাকে অনেকগুলো মানুষ পেটাচ্ছে এমন ছবিও অনেক। আরো পৃষ্ঠা উল্টালেন, এবার লোকটার কফিনের ছবি, দাফনের ছবি, জানাজার ছবি। ম্যাডাম অবাক হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন কে এই ব্যাক্তি? তোমার কি হয়? কিন্তু নাওফি নিরুত্তর। কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেঁদে যাচ্ছে। 

ম্যাডাম পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন, সেখানে একটি পুরাতন ডায়েরির একটা পাতা সাঁটা রয়েছে, সেই পাতায় লিখা রয়েছে কয়েকটি লাইন, 
“আজ আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন। আজ আমার জান্নাত, আমার বেহেশত, আমাদের ঘর আলো করেছে। বাচ্চার মা ও বাচ্চা দুজনই আল্লাহর মেহেরবানীতে সুস্থ আছে। বাবুটা আমার মত কালো হয়নি। কি সুন্দর তার চেহারা। আমি শুরুতেই বাবুর মাকে বলেছিলাম আমাদের মেয়েই হবে। আল্লাহর কাছে আমি মেয়েই চেয়েছি। আগে থেকেই ঠিক করেছি মেয়ে হলেই নাম রাখবো নাওফি। আমার বাবুটা শুরু থেকেই আমাকে চিনতে পেরেছে। আমি যখন হাত বাড়িয়েছি প্রায় উড়ে আমার কোলে এসেছে। সবার কোলে গেলে কাঁদে। আর আমার কোলে একদম ঠান্ডা। আজকে প্রথম দিনই বুঝেছি আমার মেয়ে আমাকে খুব ভালবাসে” 

এইবার ম্যাডাম তার ভুল বুঝতে পারলেন, এই ব্যক্তি নাওফির বাবা! তিনি খুব আপসেট হয়ে পড়লেন, উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন নাওফিকে। এতক্ষন যে কান্নাকে বহুকষ্টে হজম করে শুধু চোখ দিয়ে পানি ছেড়েছিলো সেই কান্না আর কোন বাধা মানেনি। হুড়মুড় করে বের হয়ে পড়লো। উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলো নাওফি। ম্যাডাম মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিছুটা শান্ত হলে ম্যাডাম জানতে চাইলেন কিভাবে কি হলো? কেন তার বাবাকে ওরা মেরে ফেললো? 

নিজেকে একটু স্থির করে নাওফি বলতে শুরু করলো, সেদিন ছিল আমার পঞ্চম জন্মদিন। বাবা জিজ্ঞাসা করেছিলেন তোমার কি লাগবে? আমি বলেছিলাম, আব্বু আমার জন্য একটা প্লেন লাগবে! আমি প্লেন চালিয়ে আকাশে উড়বো। বাবা সারাদিন বের হতে পারেননি, বাইরে খুব মারামারি হচ্ছিল। কিন্তু আমি ছিলাম নাছোড়বান্দা। প্লেন না নিয়ে আসা পর্যন্ত কিছু কান্না থামাচ্ছিলাম না। আমার কান্না আর জেদ দেখে এই মারামারির পরিবেশের মধ্যেও আব্বু বের হয়ে পড়লেন। আব্বু আসেনাতো আসেই না। আমি কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকাল বেলা দেখি সবাই কাঁদছে। আম্মু বার বার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। খালা-ফুফুরাও আমাকে কোলে নিয়ে কাঁদছে। কিছুসময় পরে দেখি আব্বু বারান্দায় পড়ে আছে... রক্ত আর রক্ত... 

আমি জড়িয়ে ধরে ডাকি, বাবা কথা বলেনা। আমি বলি বাবা আমার প্লেন লাগবেনা, তুমি কথা বলো... বাবা আর কোনদিন কথা বলেনা। ক্লাসের সবাই কাঁদছে। ম্যডাম জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে থাকলো নাওফিকে। কিছুটা শান্ত হলে নাওফি আবারো বলে, ম্যাম, আজ আটাশে অক্টোবর, নয় বছর আগে এইদিন আমি আমার বাবাকে হত্যা করেছি। আমি আমার বাবাকে হাসিনার লগি বৈঠার কবলে ফেলে দিয়েছি।
২৯/১০/২০১৫

২২ আগ, ২০১৬

একটি হিন্দুবাড়ির গল্প


রাজেশ ফার্মা। মেইন রোডের পাশে বড় ঔষধের দোকান। বেচাকেনা ভালো। সত্ত্বাধিকারী রাজেশ রায় যতটা পরিচিত দোকানের জন্য তার চাইতে বেশী পরিচিত শিক্ষক হিসেবে। জিলা স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। বিজ্ঞান পড়ান। দিনরাত খুব ব্যস্ততার মধ্যেই তাকে কাটাতে হয়। সকালে দুই ব্যাচ প্রাইভেট পড়ান। এরপর স্কুল। বিকেলে আবার ঔষধের দোকানে সময় দেন। বরাবরই তিনি হিসেবী মানুষ। ইদানিং আরো বেশী হিসেবী। ছেলে পরান দাঁড়িয়ে আছে দোকানের সামনে প্রায় আধাঘন্টা। তার সাইকেলের টায়ার ফেটে গেছে। সারাতে হবে। কিন্তু রাজেশ সাহেব এত সহজে টাকা ছাড়তে রাজি নন। তার দাবী পরানের অসাবধানতার কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। অতঃএব এর দায় তাকে নিতে হবে। সে আগামী দু’দিন টিফিনের জন্য যা টাকা পাবে তা দিয়ে টিফিন না খেয়ে সাইকেল সারাতে হবে। এটাই তার প্রাপ্য শাস্তি। 

ছেলে পরানও নাছোড়বান্দা। কিছুতেই সে তার বাবার কথা মানতে রাজি নয়। তার দাবী এই সাইকেলে করে গতকাল অতিরিক্ত ভারবহনের কারণেই এই দূর্ঘটনা ঘটেছে। অতিরিক্ত ভারবহন বলতে এক মণ ওজনের চাউলের বস্তা গতকাল নিতে হয়েছে। রাজেশ সাহেব সাধারণত যেদিন চাউল কিনতে হয় সেদিন পরানকে নিয়ে যান। তিনি বাজার করে চাউল ছাড়া অন্যান্য সদাই রিকশায় করে নিয়ে আসেন। আর চাউলের বস্তা তুলে দেন পরানের সাইকেলে। এতে বিশ টাকা সেইভ হয়। নানা তর্ক, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি শেষে টাকা দিতে বাধ্য হলেন রাজেশ সাহেব। ছেলে পরান টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেছে আর কোনদিন নাকি সে চাউলের বস্তা সাইকেলে তুলবে না। 

সখীপুরে হিন্দুবাড়ি একটাই। আর এই বাড়ির প্রধান রাজেশ সাহেব। এখানে সবাই তার আত্মীয় স্বজন। সবার চাইতে বেশী টাকা উপার্জন করা সত্ত্বেও রাজেশ সাহেবের ঘরই সবচেয়ে মলিন। তিনি খরচ করেন কম। তার ধারণা বাংলাদেশে টাকা খরচ করা ঠিক না। তিনি তার দেশ বলতে ভারতকেই বুঝেন। ভারতীয় জিনিস ছাড়া কোন জিনিস কেনেন না। তার চাকরী আছে আর আট মাস। এরপর তার ইচ্ছা তিনি ভারত চলে যাবেন পুরো গোষ্ঠীসহ। তাই তিনি টাকা জমাতে থাকেন বহু বছর জুড়ে। 

রাজেশ সাহেবের চাচাতো ভাইরা স্বর্ণের ব্যবসা করেন। তাদের সাথেও তিনি ভারত যাওয়ার বিষয়টা শেয়ার করেন। তারাও সানন্দে রাজি হয়। গোপনে শুরু হয় গুছানোর কাজ। তাদের দেশ ছাড়ার বিষয়টা কঠিনভাবে গোপন রাখে তারা। দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। রাজেশ সাহেবের চাকরী শেষ হয়ে যায়। পেনশনের টাকা একত্রেই সব তুলে নেন। একদিন তার দোকান বিক্রী করে দেন। প্রতিবেশীরা সবাই হায় হায় করে। রাজেশ সাহেব বলেন ছোট চাচাতো ভাইকে বিদেশ পাঠাবো তো... তাই কিছু টাকার জরুরী দরকার ছিল। এজন্যই দোকান বিক্রী। আসল কথা গোপন করে। 

এলাকার খন্দকার সাহেব ডাক্তারির পাশাপাশি মোটামুটি জমির কারবার করেন। একদিন খুব সকালে রাজেশ সাহেব এসে উপস্থিত খন্দকার সাহেবের বাড়িতে। বয়সের দিক দিয়ে খন্দকার সাহেব একটু ছোট হলেও দুজনেই ছোটবেলা থেকে বন্ধু। সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন খন্দকার সাহেব। রাজেশ সাহেব ইনিয়ে বিনিয়ে যা বললেন তার সার সংক্ষেপ হলো তার বউয়ের ক্যান্সার ধরা পড়েছে। বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসা নেই। ভারত নিয়ে যেতে হবে। টাকা দরকার। অনেক টাকা। খন্দকার সাহেব ব্যথিত হলেন খুব। নিজে থেকেই বেশ কিছু টাকা ঋণ দিতে চাইলেন। কিন্তু রাজেশ সাহেব বললেন তিনি বাড়ি বিক্রী করে দিতে চান। ঋণ নিয়ে ছোট থাকতে চান না। 

খন্দকার সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন তবে থাকবেন কই? তিনি জবাব দিলেন সব কিছু ঠিকঠাক হলে এবং চিকিৎসা শেষে ফিরতে পারলে তার শ্বশুর বাড়িতে কিছু জমি আছে। সেখানে থাকার বন্দোবস্ত হবে। আর ফিরে আসলে চাচাতো ভাইদের সাথে স্বর্ণের ব্যবসা করবে। এর মধ্যে পরাণ নিশ্চয়ই চাকরী-বাকরী কিছু জুটাতে পারবে। তাই আর সমস্যা হবে না। তাই ভগবানের উপর ভরসা রেখে বাড়ি বিক্রয় করতে চায়। তার ক্যাশ টাকা লাগবে। তাই বাজারে যা দাম তার চাইতে কিছু কম হলেও তিনি ছেড়ে দিবেন। খন্দকার সাহেবের রাজী না হওয়ার কারণ নেই। রাজেশ সাহেব অত্যান্ত খুশি হলেন, যাওয়ার সময় বলে গেলেন ক্যন্সারের বিষয়ে এবং বাড়ি বিক্রয়ের বিষয়ে যেন কাউকে কিছু জানানো না হয়। কারণ ডাক্তারের পরামর্শে রোগের বিষয়টা রোগীর কাছে গোপন রাখা হয়েছে। সাবধান করে গেলেন, আপনি বৌদিকেও বলবেন না। মেয়েরা পেটে কথা রাখতে পারেনা। 

আরো কিছুদিন পরের কথা। একদিন সকালে খন্দকার সাহেব বারান্দায় বসে চা খাচ্ছেন। হঠাৎ কাজের ছেলেটা এসে খবর দিল রায় বাড়ির সবাই হাওয়া হয়ে গেছে। খন্দকার সাহেব অবাক হলেন যাওয়ার কথাতো শুধু রাজেশের। কিন্তু পুরো বাড়ি হাওয়া হয়ে যাওয়ার কারণ তিনি বুঝতে পারেন নি। যাই হোক মনে মনে ঠিক করলেন আজ বিকেলেই তিনি রাজেশ সাহেবের বাড়ির দখল নিবেন। এই কথা চিন্তা করতেই হঠাৎ তার মনে হলো রাশেজের বউয়ের কথাতো সাজেদাকে বলা হয়নি। তিনি উঠে গিয়ে দ্রুত স্ত্রী সাজেদা বললেন রাজেশের স্ত্রীর ক্যন্সারের কথা এবং তার বাড়ি ক্রয় করার কথা। হায় হায় বলে আর্তনাদ করে উঠলেন সাজেদা। হিন্দুদের তুমি চেন নাই। এরা দশজনের কাছে জমি বিক্রী করে রাতের আঁধারে পালিয়ে যায়। তুমি ওর কথায় আমাকে পর্যন্ত বললে না। 

সাজেদার কথার কোন গুরুত্বই দিলেন না খন্দকার সাহেব। তিনি রাজেশকে চিনেন। সেই ছোটবেলা থেকে। রাজেশ একটু কৃপণ কিন্তু তাই বলে তাকে প্রতারক তাকে কোনদিন মনে হয়নি। তাছাড়া সে স্কুল শিক্ষক। সামান্য মূল্যবোধ তো তার থাকবেই। নিজের ব্যস্ততায় ঐ পুরো সপ্তাহ রাজেশের বাড়ির মুখো হতে পারেননি। একদিন শুক্রবার আমিনকে (জমি জরিপকারী) ডেকে পাঠালেন। আমিন আসলে রাজেশের বাড়ির কথা বললেন। আমিন চোখ কপালে তুলে বললো আপনিও কিনেছেন সেই জমি? খন্দকার সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আপনিও মানে? আমি ছাড়া অন্য কেউ কিনেছে নাকি? আমিন বললো, চলেন গিয়ে দেখেন সেখানে কি হচ্ছে? 

রায় বাড়িতে মনে হয় যেন মেলা বসছে। লোকে লোকারণ্য। প্রায় সবাই মারমুখী। জানা গেল রাজেশের জমি কিনেছে চারজন। তার চাচাতো ভাইদের জমি কিনেছে আট জন। আরো বারো জনের কাছ থেকে তারা ৫০ লক্ষ টাকা লোন করে পালিয়ে গেছে। খন্দকার সাহেব জমির দখল নিতে চাইলেন। অন্য তিনজন মালিক খন্দকার সাহেবকে চরম অপমান করলো। তাদের দাবী রাজেশ চলে যাওয়ার খবর পেয়ে তার সম্পদ ভোগ করতে ছুটে গিয়েছেন তিনি। যদি তিনি সত্যই কিনে থাকেন তাহলে এতদিন পরে আসলেন কেন? ভীষন অপমানিত হয়ে রায় বাড়ি থেকে ফিরে আসলেন খন্দকার সাহেব। হার মানতে রাজি হননি। 

মামলা ঠুকে দিলেন। একে একে সবাই কোর্টে আসলো। রাজেশের জমি নিয়ে মামলা চলতে লাগলো চার জনের মধ্যে। কেউ কাউরে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান লড়াই চলতে লাগলো। এভাবে বছর বছর পার হতে লাগলো। খন্দকার সাহেব ভালো করে নিয়মমত রাজেশ থেকে সব কাগজপত্র বুঝে নিলেও বাকীরা এই বিষয়ে অতটা নজর দেয়নি। তাই খন্দকার সাহেবের কাগজের জোর ছিল বেশী। খন্দকার সাহেব টাকাও খরচ করেছেন দেদারছে। উকিল নিয়োগ করেছেন তার উকিল বন্ধুকে। তিনিও বেশ পরিশ্রম করেছেন। সব মিলিয়ে রায় এলো খন্দকার সাহেবের পক্ষেই। তিনি দখলেও নিয়েছেন। দখলে নিয়েই নীতিবান মানুষ খন্দকার সাহেব অপর তিন ব্যক্তিকে ডাকলেন। কে কত দিয়ে কিনেছে, কার কত খরচ হয়েছে মামলায়, সব বিবেচনায় একটা ফয়সালা করলেন। সিদ্ধান্ত হলো এখানে বহুতল ভবন হবে সবার অংশগ্রহনে। খন্দকার সাহেবেই এই বদান্যতায় সবাই খুশি এবং তাদের মধ্যে আর কোন ঝামেলা রইলো না। তারাও আর এ বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতে গেল না। 

এদিকে রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হলো। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসলো। কয়েকবছর ঠিকঠাক চললেও ধীরে ধীরে স্বৈরাচারী হয়ে উঠে সরকার। খন্দকার সাহেব সরকার বিরোধী লোক হিসেবে একটু কোণঠাসা হয়ে আছেন। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার চাইতে ভালোই আছেন। তিনি নিজের বাসায় থাকতে পারেন। অন্যরা নিজের বাসায়ই থাকতে পারে না পুলিশের ভয়ে। রাজনীতি করা তো দূরের বিষয়। খন্দকার সাহেব ডাক্তার মানুষ। বহু মানুষের সেবা করেন এমনকি আওয়ামীলীগেরও। বিপদে সবাই তাকে কাছে পেতে চায়। এটাই খন্দকার সাহেবের ভালো থাকার কারণ। 

এদিকে রাজেশের অবস্থা ভালো না। কলকাতায় সে নিজের ঠাঁই করে নিতে পারেনি। চাচাতো ভাইরা মোটামুটি ব্যবসা ধরে ফেলেছে। তবে অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক নয়। রাজেশ কিছুই করতে পারেন নি। এদিকে বয়সও বেড়ে গেছে। আগের মত পরিশ্রম করতে পারেন না। কলকাতায় টুকটাক আয় যা হয় তার চাইতে খরচ বেশী। জমানো টাকা ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরে আসা ছাড়া গতি নেই। আবার যে কান্ড করে এসেছে বাংলাদেশে মুখ দেখানোর বা ঠাঁই পাওয়ার কোন অবস্থা নেই। তারপরও তার আশা বাংলাদেশের কোন না কোন অংশে তার ঠাঁই হবে। কারণ বাংলাদেশে কাজ পাওয়া ভারতের চাইতে অনেক সোজা। ছাত্র পড়িয়েও কোন রকম দিন কাটানো যাবে। 

রাজেশ সাহেবের আফসোসের এখন সীমা নাই। তিনি আসলে কিসের জন্য আফসোস করবেন ভেবে পান না। প্রতারণার জন্য কখনো কখনো আফসোস করেন, ভাবেন ঐ প্রতারণা না করলে আজ তিনি এলাকায় আবার সম্মানের সাথে গৃহিত হতেন। পড়ানোর জন্য ছাত্র পেতেন অনায়াসে, আবার ঔষধের দোকানটাও চালু করতে পারতেন। আবার আফসোস করেন বাংলাদেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তের জন্য। ঐ ভুল সিদ্ধান্তটা মাথায় না আসলে আজ তিনি কত আরামে থাকতে পারতেন। অবশ্য তিনি বুঝতে পারেন নি কলকাতার মানুষেরা এতটা খাইস্টা হবে। ওরা যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দুদের মানুষই মনে করে না এটা তিনি ভাবতেই পারেন নি। এই আফসোসের মধ্যেই একদিন তার মাথায় উঁকি দিল আরেক শয়তানি বুদ্ধি। 

একদিন রাজেশকে দেখা গেল সখিপুরে, না কোন হতাশাগ্রস্থ বৃদ্ধকে কেউ দেখেনি। সবাই দেখেছে বিজয়ীর বেশে আসছে রাজেশ। সাথে একগাদা পুলিশ আর জনা দশেক সাংবাদিক আর আওয়ামীলীগ নেতার চ্যালা-চামুন্ডারা। রাজেশ তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল তার সাবেক ঘরের কাছে যেখানে এখন বহুতল বাড়ি করছেন খন্দকার সাহেব। এসে কেঁদে কেঁদে বর্ণনা দিলেন কিভাবে খন্দকার সাহেব আট বছর আগে তাদের পুরো গোষ্ঠীকে নির্যাতন করে তাড়িয়ে দিয়েছে। দেশব্যাপী খবর ছড়িয়ে পড়লো মিডিয়ার কল্যাণে। রাজেশের দুঃখে দুঃখী হয়ে উঠলো পুরো দেশ। 

আওয়ামীলীগ নেতা দখলে নিল পুরো সম্পত্তি। রাজেশকে একটু জায়গা দিল। রাজেশ আবার এলাকায় বীরদর্পে চলাফেরা করতে লাগলো। সে এখন সখীপুরের দন্ডমুন্ডের কর্তা। একে একে সব হারাতে লাগলেন খন্দকার সাহেব। নিজের চেম্বার, ব্যবসাপাতি, এমনকি ভিটেমাটিও। তার স্থান হয় কারাগারে। সাজেদা তার ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে বহুদিনের গড়া নিজের সংসার ছেড়ে চলে যান অন্য শহরে তার বড় ছেলের কাছে। 

অনেকদিন পরের কথা। এতদিনে বহু জল বহু দিকে গড়িয়েছে। খন্দকার সাহেব বয়সের ভারে ন্যুজ। ছেলের বাসায়ই থাকেন। আগের মত চেম্বারে গিয়ে এবং হাসপাতালে গিয়ে রোগী দেখেন না। বাড়িতে কিছু রোগী আসে তাদের চিকিৎসাপত্র দেন। অবসর কাটে নাতীদের সাথে গল্প করে আর বই পড়ে। একদিন সকালে সস্ত্রিক হাঁটছেন পার্কে। হঠাৎ পার্কের বাইরে এক বৃদ্ধ ভিক্ষুককে দেখে চমকে উঠেন। সাজেদাকে দেখান। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পাশ কেটে চলে যান।

২৬ ফেব, ২০১৬

জান্নাতের যাত্রী


সালমান আজ না খেয়েই বেরিয়েছে। এটাতো আর বাড়ি নয় যে মাকে বলবে ‘মা, আজ আমার একটু আগে বের হতে হবে, খেতে দাও’। এটা মেস। এখানে কাকে বলবে? বুয়া প্রায়ই দেরী করে আসে, আড়মোড়া ভেঙ্গে তার রান্না করতে করতেই ক্লাসের সময় পার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে যায়। যেদিন একটু আগে বের হতে হয় সেদিনের সকালের খাওয়া বাদ। এতে অবশ্য সালমানের খুব একটা কিছু হয় না। মাঝে মাঝে গ্যাস জমে পেট ব্যাথা করে এই যা। এটা মোটামুটি তার অভ্যাসের মধ্যেই চলে আসছে।

আজকে ক্লাসের আগে তার মিছিল আছে। অপশক্তি স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে মিছিল। ইসলাম ও ইসলামী নেতৃত্ব রক্ষা করার আন্দোলনের মিছিল। তাই যথারীতি সে না খেয়েই বেরিয়েছে। বন্ধুদের সাথে নিয়ে সে মিছিলে যোগ দেয়। মিছিল শুরু হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই পুলিশ গুলি ছুঁড়ে। পুলিশ এখন খুব আক্রমানত্মক। লাঠিচার্জ কিংবা কাঁদানো গ্যাসের কোন বালাই নেই। সরাসরি গুলি। তাও কোন ফাঁকা গুলি নয়। বুক বরাবর। মিছিলের সামনে থাকা সালমান প্রথম শিকার পুলিশের। বুকে গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়ে সে। সে একা নয়, অনেকে। তার অন্যান্য সহকর্মীরা অনেককে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারলেও সালমান সহ সাত জনকে উদ্ধার করতে পারেনি।

কিছুক্ষন পর পুলিশ তাদের থানায় তুলে নিয়ে আসে। এসেই শুরু করে অত্যাচার। চিৎকার আর আর্তনাদে পুরো থানাটা যেন জাহান্নাম হয়ে উঠে। সাতটা গুলিবিদ্ধ মানুষের উপর ভাংতে থাকে এক একটা লাঠি। একজন পুলিশ মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে গেলে অপরজন শুরু করে। এভাবে পালাক্রমে চলছেই। রক্তের নহর বইতে থাকলো থানায়। একটা পুলিশতো দ্রুত হাঁটতে গিয়ে রক্তে পিছলিয়ে পড়ে গেলো। ঘন লাল রক্তে সেও রঞ্জিত হয়ে গেলো। হো হো করে হেসে উঠলো তার সহকর্মী অন্যান্য পুলিশেরা। রাগে লাল হয়ে গেলো সে। তার সব রাগ গিয়ে পড়লো উলট পালট কুন্ডলি পাকিয়ে থাকা সাতটি রক্তাক্ত দেহের উপর। কি যেন খুঁজতে লাগলো সে। কিছুক্ষন পর পাশের রুম থেকে নিয়ে এলো একটা লোহার পাইপ। এলোপাথাড়ি মারতে শুরু করলো সে। সালমানরা শুধু আল্লাহকে ডেকেই চলছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিকট শব্দ করে কবির নামে এক সহকর্মীর হাত ভেঙ্গে যায়। কবজি আর কনুইয়ের মাঝখান থেকে ঝুলতে থাকে তার রক্তাক্ত হাত। এ এক বিভীষিকাময় দৃশ্য।

বুকে, পেটে গুলি খাওয়া সালমানের শুধু নিঃশ্বাসটাই বাকী আছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে এখনই আল্লাহর কাছে চলে যাবে। মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি তার মনে ভর করে। কত কিছু যে কল্পনা করছে সে। সারা জীবনের কথা মনে করার চেষ্টা করে। কিছু কিছু অন্যায়ের কথা মনে হতেই সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। পুলিশের ক্রমাগত পিটুনি তাকে স্পর্শ করে না। সে আছে তার মত করে আনন্দে। মালিকের সাথে মিলিত হবার আনন্দ। বহু আকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে সে। এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না তার। এমন সময় সে বুঝতে পারলো তাকে গাড়িতে তুলছে পুলিশেরা।

কিছুক্ষনপর মৃতপ্রায় সাতটি মানুষকে পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে আসে। ডাক্তাররা দ্রুত চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করেন। সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ব্যান্ডেজ করে প্রথমে রক্ত বন্ধের ব্যবস্থা করলেন। তারপর একের পর এক পরীক্ষা করতে থাকলেন কার অবস্থা বেশী খারাপ। কাকে সবার আগে অপারেশন করতে হবে। পরিক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেলো সালমানের কন্ডিশন সবচেয়ে খারাপ। ডাক্তার তাকে বললেন, 
- তুমি দ্রুত তোমার আত্মীয়দের খবর দাও। তোমার আত্মীয় কেউ কি এসেছেন?
- আমার কোন আত্মীয় স্বজন এই শহরে থাকে না। আর থাকলেও আমি তাদের ডেকে কষ্ট দিবো না। আমি তো আমার কোন ক্ষতি করিনি। তাছাড়া আমার কোন এক্সিডেন্টও হয়নি। 
- তোমার অভিভাবকের সাইন ছাড়াতো আমরা তোমার অপারেশন করতে পারবো না। পরে কোন সমস্যা হলে আমাদের উপর দায় পড়বে। 
- (পুলিশদের দেখিয়ে) আপনাদের উপর দায় পড়বে কেন? তারা আমাকে গুলি করেছে। তারপর আমাকে আবার কোন কারণ ছাড়া এক ঘন্টা পিটিয়েছে। দায় হলে তাদের হবে। আর আমার এখানে কোন অভিভাবক নেই। আমার অভভাবক একমাত্র আল্লাহ্‌। 
- আল্লাহ্‌ তো আর সাইন দিবেন না। এখন আমরা কি করবো? 
- (পুলিশদের দেখিয়ে) ওদেরকে বলুন সাইন করতে।

পুলিশও সাইন করতে অস্বীকৃতি জানালো। এরপর সালমান বললো আমাকে দিন আমিই সাইন করি। কিন্তু ডাক্তাররা বললো প্রথম কথা তোমার সাইন করার শক্তি নেই। আর দ্বিতীয়ত তোমার সাইন কাজে আসবে না। এরপর ডাক্তার সার্জারির প্রধান ডাক্তার প্রবীর কুমারকে জানালো। তিনি সব শুনে বললেন, আচ্ছা তাকে নিয়ে এসো। অপারেশনতো করতে হবে। 

ডাঃ প্রবীর কুমার সালমানকে দেখেই চমকে উঠলেন। আরে এতো সেই ছেলে। তিনি তাকে চিনেন। মাস ছয়েক আগের কথা, একদিন রাত দুটোয় হঠাৎ তার বাসায় কলিংবেলের শব্দ। তিনি বের হয়ে দেখলেন একটা শীর্ণকায় ছেলে। দরোজা খুলে দিলেন। সে ঘরে ঢুকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লো। ডাঃ প্রবীর তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেন এবং বুঝতে পারলেন দীর্ঘক্ষন না খেয়ে থাকার কারণে ভীষন দূর্বল হয়ে পড়ছে। অল্পক্ষন পরই তার জ্ঞান ফিরলো। সে অপরাধী ও কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে ডাক্তার প্রবীরের দিকে তাকালো। ডাক্তার তাকে উঠালেন এবং বসালেন। তার কোন কথা শোনার আগেই তাকে খেতে দিতে বললেন তার স্ত্রীকে। সে খাওয়া দাওয়া শেষ করলে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন কী বৃত্তান্ত? তুমি কি কর? এত রাতেই বা কোথা থেকে? 
সব শুনে ডাঃ প্রবীর বললেন, আমি তোমাকে আগে থেকেই জানতাম। প্রসূনের মুখে তোমার এত গল্প শুনেছি যে তোমার সব বিষয় মোটামুটি জানি। সালমান অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে
- কোন প্রসূন?
- কেন তোমার ক্লাসমেট প্রসূন। সে আমার ছেলে। ঐ তো ঐদিকের রুমে ঘুমুচ্ছে।

সালমানের মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠছে। ডাক্তার প্রবীর সাহেব তাকে রাজনীতি করতে বারণ করছিলেন। কিন্তু এগুলো কিছুই তার কানে যাচ্ছিল না। সকাল দশটা থেকে পুলিশ তার পেছনে লাগছে। তার মেস ঘেরাও করেছে। কিন্তু কৌশলে বের হয়েছে। সারা শহর নিজেও ঘুরেছে পুলিশদেরও ঘুরিয়েছে। সে যে কোথাও গিয়ে বসবে তার ব্যবস্থা নেই। রাস্তার রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাহারা বসানো। খাবার দোকানগুলোতে গোয়েন্দারা বসে আছে। তাই সে অগত্যা টিকতে না পেরে এই ডাক্তারের বাসায় নক করেছে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি তারা হিন্দু। সে একটু আগে মজা করে মুরগী দিয়ে ভাত খেয়েছে। তার ক্লাসমেট প্রসূনের নাম বলাতে সে বুঝতে পারলো সে কতটা ভুল করেছে। ওনারা কষ্ট পেতে পারেন তাই সে আঙ্কেল বমি আসছে এই কথা বলেই সে ওয়াশরুমে চলে গেলো। গলায় হাত দিয়ে সব বমি করে দিলো। 

অন্য কেউ না বুঝলেও ডাক্তার বুঝলেন এটা সালমান ইচ্ছে করেই করেছে। অমুসলিমদের জবাই করা মুরগী মুসলিমদের খাওয়া বারণ এটাও জানা রয়েছে তার। তিনি কিছুই বললেন না কিন্তু শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিল ছোট্ট এই ছেলেটির প্রতি। কতটা একনিষ্ঠ তার আদর্শের প্রতি। তারপর সে ওয়াশ রুম থেকে বের হলে তাকে এক গ্লাস দুধ দিলেন। যে ছেলে সারাদিন না খাওয়ার পর যা খেয়েছে তাও বিসর্জন দিতে পারে শুধু আদর্শের জন্য সে সাধারণ কোন ছেলে নয়। তার ছেলে প্রসূনের মুখে তার শুধু প্রশংসাই শুনেন। সারাদিন পুলিশের সাথে দৌড়াদৌড়ি, তার সংগঠনের কাজ সব করেও সে ক্লাসের ফার্স্ট। প্রসূন ও সালমান দুজনই চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এবার HSC পরিক্ষার্থী।

এক মুহুর্তে সব মনে পড়ে গেলো ডাক্তারের। তিনি দ্রুত অপারেশনের ব্যবস্থা করলেন। পরিস্থিতি খুবই নাজুক। তারপরও বলা চলে অপারেশন সাকসেসফুল। তিনটি বুলেট এক্সরে রিপোর্টে ধরা পড়ছিলো। তিনটাই তিনি বের করতে পেরেছেন। অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়েই ছেলে প্রসূনকে ফোন করেছেন এবং বলেছেন সালমানের কথা। ততক্ষণে প্রসূন ও তার বন্ধুরা সবাই জেনেছে। সালমানের বাবা-মাও রওনা হয়েছেন গ্রাম থেকে। 

অপারেশনের আটচল্লিশ ঘণ্টা পার হওয়ার পরও সালমানের জ্ঞান ফিরছে না। সবাই খুব টেনশনে। সালমানের বাবা সিজদায় পড়ে আছেন আছেন। আর মা ছোটাছুটি করছেন অপারেশন থিয়েটারের সামনের বারান্দায়। কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছেন তারা। সালমানের আন্দোলনের সঙ্গীরাও আছে দূরে দূরে। পুলিশের কারণে তারা সামনে আসতে পারছে না। তবে সালমানের মায়ের সাথে যোগাযোগ রাখছে। সবার খাবার দাবার ঔষধ তারাই সরবরাহ করছে। বায়ান্ন ঘন্টা পর তার জ্ঞান ফিরেছে। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছিল। খুবই দূর্বল হয়ে পড়েছে। হঠাৎ তলপেটে সে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করছে। ডাক্তাররা আসলেন এবং এক্সরে করালেন। আরো দুটো বুলেটের অস্তিত্ব দেখা গেল সেখানে। আবার অপারেশন করতে হবে।

এক অপারেশনের ধাক্কাই সে নিতে পারেনি। এখন অন্য অপারেশন একেবারেই সম্ভব না। আবার ওদিকে বুলেটদুটো থাকার কারণে ভেতরে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছে। অপারেশন না করলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। ডাক্তাররা রিস্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন অপারেশনই করতে হবে। সালমানের বাবা-মা কে পুরো কন্ডিশন বুঝালেন ডাঃ প্রবীর। তারাও মত দিলো। সবাই বুঝতে পারলো হয়তো সালমানকে আর পাওয়া যাবে না।

একে একে সবাই অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করলো। সালমানের বাবা, মা, ডাক্তাররা, নার্স, সহকর্মীরা সবাই। সালমান তাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। জান্নাতি সে হাসি। ডাঃ প্রবীর একজন জুনিয়র ডাক্তারকে কাগজ কলম নিয়ে লিখতে বললেন। আর সালমানের দিকে তাকিয়ে কন্ঠকে খুব স্বাভাবিক রেখে বললেন, বাবা সালমান, তোমার শরীরে আরো দুটো বুলেট আছে সেগুলো বের করতে হবে। তোমার অবস্থা খুব নাজুক। আমরা জানিনা ভবিষ্যতে কি হবে। তবে তুমি আশঙ্কামুক্ত নও। এখানে সবাই আছেন। তুমি যদি কাউকে কিছু বলার থাকে তবে বলতে পারো। তোমার ক্ষতির জন্য কারা দায়ী তাদের কথা তুমি বলে যাও।

সালমান তার মাকে ইশারায় ডাকলো। মা কতদিন তুমি আমাকে আদর কর নাই, দোষ আমার আমি বাড়ি যেতে পারিনি। আমাকে একটু আদর করবে? মা জড়িয়ে ধরলো শুয়ে থাকা সালমানকে । মা-ছেলের সাথে কান্না করতে লাগলো সবাই। ডাক্তার তাদের ছাড়িয়ে নিলেন। এবার সে বাবাকে ডেকে বললো আমার কিছু ঋণ আছে, শোধ করে দিবে? বাবা বললো, কি ঋণ আমাকে বল। আমি অবশ্যই শোধ করে দিব। বাবা ঋণটা তোমার কাছেই। তুমি কষ্ট করে রোজগার করে আমার জন্য পাঠাতে। আমি তোমার কোন আশাই পূরণ করতে পারিনি। আমার ঋণটা মাফ করে দাও। 

তারপর তার এক সহকর্মীকে কাছে ডেকে বললো, আমার বিছানার নিচে ৫০০ টাকা আছে এগুলো সোহাগ ভাইকে দিবে। আর কিছু ভাউচার আর বিগত মাসগুলোর হিসাব আমার টেবিলের ড্রয়ারে আছে। দয়া করে সেগুলোও সোহাগ ভাইকে দিবে। আর আমাকে মাফ করে দিও ভাই। সবাইকে বলিও যেন আমাকে মাফ করে দেয়। এবার ডাক্তারকে ইশারা করে বলে লিখুন।

আমি সালমান বলছি আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। আল্লাহ্‌ তায়ালা যদি মনে করেন আমাকে তার সান্নিধ্যে নিয়ে যাবেন তাহলে এটা আমার জন্য পরম পাওয়া। যারা আমাকে গুলি করেছে আমাকে মেরেছে তারা না বুঝে এসব করেছে। তারা যদি আমাদের বুঝতো তাহলে তারা এই জঘন্য কাজ কখনোই করতো না। এই অপরাধ আমাদের, আমরা এদেশের মানুষকে ভালোভাবে বুঝাতে পারিনি। আমাদের সীমাবদ্ধতার জন্য আজ এই অবস্থা। আমার প্রতি যারা নির্যাতন করেছে আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন।

সবার চোখে অশ্রু। সবাই কাঁদছে। পুলিশগুলো সহ। হঠাৎ ডাঃ প্রবীর এক পুলিশের কলার চেপে ধরে বলতে লাগলেন, কেমনে পারলে? কেমনে পারলে এই ফেরেশতার মত ছেলেকে গুলি করতে? বলে কাঁদতে লাগলেন। পুলিশগুলোও চোখ মুছতে লাগলো।

একে একে সবাইকে ডাক্তার প্রবীর অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করে দিলেন। আরেকজন ডাক্তার সংজ্ঞাহীন করার ইঞ্জেকশন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সালমানের দিকে।
২৫/২/২০১৬