আন্তর্জাতিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আন্তর্জাতিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৭ জুন, ২০২৫

শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ার : আমাদের মহানায়ক


হামাসের নাম তো আমরা সবাই জানি। হামাসের ওপর ভিত্তি করেই এখন টিকে আছে ফিলিস্তিনের মজলুম মানুষদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। আর হামাস বহুদিন ধরে সারভাইভ করে যাচ্ছে 'আল মাজদ' বাহিনীর সহায়তায়। হামাস হলো সামগ্রিক সংগঠন। এর যোদ্ধা শাখা হলো আল কাসসাম ব্রিগেড। আল কাসসাম ব্রিগেডের নাম সবাই জানলেও 'আল মাজদ' অনেকটাই আড়ালের সংগঠন।  

হামাসের আল-মাজদ বাহিনী হলো ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা শাখা, যা মূলত গোয়েন্দা ও পাল্টা-গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত। এই শাখাটি হামাসের সামরিক এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বলা যায় এটা হামাসের গোয়েন্দা বাহিনী।

আল-মাজদ বাহিনী ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে গঠিত হয় বলে জানা যায়, যখন হামাস নিজেকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি শক্তিশালী শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছিল। হামাস প্রতিষ্ঠাতা শায়খ ইয়াসিনের নির্দেশে ইয়াহিয়া সিনওয়ার হাত ধরে এই বাহিনী যাত্রা শুরু করে। আল-মাজদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো হামাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ইসরায়েলি গুপ্তচর এবং ফিলিস্তিনি সহযোগীদের (যারা ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করে বলে সন্দেহ করা হয়) শনাক্ত ও নির্মূল করা। এছাড়া, এই বাহিনী হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ট্র্যাক করার কাজে নিয়োজিত। 

আল-মাজদ সন্দেহভাজন ইসরায়েলি এজেন্টদের তদন্ত করে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এই বাহিনী গাজা উপত্যকায় হামাসের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং সংগঠনের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। হামাসের শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গাজায় সংগঠনের অভিযানের গোপনীয়তা রক্ষা করা এই শাখার অন্যতম দায়িত্ব। তারা ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে পাল্টা-গোয়েন্দা অভিযান চালায়।

আল-মাজদ সন্দেহভাজন সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রয়োগ করে, প্রয়োজনে তারা মৃত্যুদণ্ডও দিয়ে থাকে। আল-মাজদ হামাসের সামরিক শাখা ইজ আদ-দীন আল-কাসসাম ব্রিগেড থেকে আলাদা, যদিও উভয় শাখা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে। আল-মাজদের কার্যক্রম বেশি গোপনীয় এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার উপর কেন্দ্রীভূত। ইয়াহিয়া সিনওয়ার এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে আল-মাজদ হামাসের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে। 

আমাদের আজকের আলোচনা আল মাজদের শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে নিয়ে। ১৯৮৭ সালে শায়খ আহমাদ ইয়াসিন হামাস প্রতিষ্ঠার অল্প সময় পর দলটির অন্যতম নেতা হিসেবে যোগ দেন সিনওয়ার। তিনি শুরু থেকেই আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দেন। তাঁর ভাষ্য ছিল আমাদের সব অগ্রগতি নিমিষেই ব্যর্থ হবে যদি আমাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম শক্তিশালী না করি। আমাদেরকে আমাদের নিজের মধ্যেই গোয়েন্দা কার্যক্রম চালাতে হবে। শায়খ আহমাদ ইয়াসিন ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ওপর আস্থা রেখেই আল মাজদ বাহিনী গড়ে তুলেছেন।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই একটি শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করেন। এটা হামাসকে যেমন শক্তিশালী করে তেমনি দুর্বল করেছে ইসরাঈলকে। ইসরাঈল ক্রমাগতভাবে ফিলিস্তিনীদের খবরাখবর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আল মাজদ অল্প সময়ের মধ্যে মুসলিমদের মধ্যে থাকা ইসরাঈলী গুপ্তচরদের হামাস ও ফিলিস্তিন থেকে বহিষ্কার করতে শুরু করেছিল। এই আল মাজদের ওপর ভরসা করে শক্তিশালী হয়ে ওঠে হামাস। এদিকে মোসাদ ও শিন বেতের মূল শত্রু হয়ে ওঠে আল মাজদের কমান্ডিং অফিসার ইয়াহিয়া সিনওয়ার।

জন্ম ও শৈশবঃ

ইয়াহিয়া সিনওয়ারে পুরো নাম ইয়াহিয়া ইবরাহিম হাসান সিনওয়ার। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের একজন গোয়েন্দা, রাজনীতিবিদ, যোদ্ধা, লেখক এবং সর্বশেষ হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান। তিনি গাজা উপত্যকায় হামাসের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের উপর হামাসের হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার ১৯৬২ সালের ২৯ অক্টোবর গাজার খান ইউনিস শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় মাজদাল আসকালান (বর্তমানে ইসরায়েলের অংশ) থেকে বিতাড়িত হয়ে গাজায় উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। তার বাবা-মায়ের বিষয়ে বিশদ তথ্য জানা যায় না, তবে জানা যায় তার তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড়। তার এক ভাই, মোহাম্মদ সিনওয়ার, হামাসের শীর্ষ নেতা এবং আরেক ভাই, যাকারিয়া সিনওয়ার, ফিলিস্তিনের একজন খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ ও একাডেমিশিয়ান।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার খান ইউনিস শরণার্থী শিবিরে কঠিন পরিবেশে বড় হন। ১৯৪৮ সালে তার পরিবারের বাস্তুচ্যুতির কারণে তাদের জীবন ছিল দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। এই পরিবেশ তাকে ফিলিস্তিনি সংগ্রামের প্রতি গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং তার রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের ভিত্তি তৈরি করে। সিনওয়ার খান ইউনিস সেকেন্ডারি স্কুল ফর বয়েজে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি স্টাডিজে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষাগত জীবন তাকে ফিলিস্তিনি আন্দোলনের প্রতি আরও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে এবং তিনি ছাত্রজীবন থেকেই হামাসের সঙ্গে জড়িত হন। যেহেতু তিনি ও তার পরিবার ইসারাইলি আগ্রাসনে উদ্বাস্তু হয়েছেন তাই ফিলিস্তিনের ভূমি উদ্ধারে ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। 

ইয়াহিয়া সিনওয়ার ১৯৮৭ সালে হামাসের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে তিনি দুজন ইসরায়েলি সেনা এবং ১২ জন ফিলিস্তিনি (যাদের ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ ছিল) হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে গ্রেপ্তার হন। এই ঘটনায় তাকে চারটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি ২০১১ সালে গিলাদ শালিত বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে মুক্তি পান, যেখানে ১০২৭ ফিলিস্তিনি বন্দীর বিনিময়ে একজন ইসরায়েলি সেনাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর তিনি দ্রুত হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং ২০১৭ সালে গাজায় হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের আগস্টে ইসমাইল হানিয়ার মৃত্যুর পর তিনি হামাসের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

সাংগঠনিক ও কারাজীবন:

হামাস গঠিত হওয়ার আগে থেকেই ইয়াহিয়া সিনওয়ার ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। তিনি কিশোর বয়স থেকে ইখওয়ানুল মুসলেমিনের সাথে যুক্ত ছিলেন। খান ইউনিসে মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি বিশাল আস্তানা ছিল। শরণার্থী শিবিরের দরিদ্র যুবকদের মসজিদে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে বিশাল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এই সংগঠনটি। পরে স্থানটি হামাসের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হয়ে দাঁড়ায়। এর অন্যতম মধ্যমণি ছিলেন ইয়াহিয়া সিনওয়ার।

১৯৮২ সালে ২০ বছর বয়সে তিনি প্রথম ইসরাঈলি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তাকে চার মাসের প্রশাসনিক আটকাবস্থায় রাখা হয়। মুক্তির পর মাত্র এক সপ্তাহ পরে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিনা বিচারে ছয় মাস কারাগারে রাখা হয়। ১৯৮৫ সালে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন এবং আট মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এই সময়েই তিনি হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিনের আস্থা অর্জন করেন। তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক কোবি মাইকেল বলেন, তারা দুজন খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সংগঠনের আধ্যাত্মিক নেতার সাথে এই সম্পর্ক পরে সিনওয়ারকে আন্দোলনের মধ্যে একটি "বিশেষ মর্যাদা" দেয়। হামাস ও আল মাজদের নেতা হিসেবে তিনি ১৯৮৮ সালে পুনরায় গ্রেপ্তার হন। এবার আর সাধারণ বিক্ষোভকারী হিসেবে নয়, গোয়েন্দা হিসেবে গ্রেপ্তার হন। 

দুই ইসরায়েলি সৈন্যকে অপহরণ ও হত্যার পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করার সন্দেহে ১২ ফিলিস্তিনিকে (ইসরাঈলিদের গোয়েন্দা) হত্যার নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে তার বিচার করা হয়। এ মামলায় তাকে চার দফা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাবাসের সময় সিনওয়ার ইসরাঈলি কারাগারে হামাস বন্দীদের সুপ্রিম লিডারশিপ কমিটির নেতৃত্ব দেন। কারাগারকে ইয়াহিয়া সিনওয়ার বানিয়ে ফেলেন হামাস যোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট ও টেনিং-এর মোক্ষম স্থান। মাঝে কারাগারে বিভিন্ন দাবী দাওয়ায় অনশন ও কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করেন তিনি। সিনওয়ার দুইবার কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু উভয় প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। 

ইয়াহিয়া সিনওয়ার তার কারাজীবনের সময় বেশ কিছু সাহিত্য রচনা করেছেন। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হলো উপন্যাস আশ-শাওক ওয়াল কারানফুল (কাঁটা ও ফুল), যা ২০০৪ সালে বিরশেবা কারাগারে লেখা। এই উপন্যাসে তিনি ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, উপন্যাসটি তার নিজের গল্প নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের সম্মিলিত কাহিনী। বইটি ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়া তিনি দুটি গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেছেন।

সিনওয়ার তার কারাজীবনকে পড়া-লেখাসহ হিব্রু শেখার কাজেও ব্যবহার করেন। ইসরাঈলী গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের দুই প্রধানের লেখা তিনটি বই তিনি হিব্রু থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। এ সময় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অন্যান্য কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নেন তিনি।

২০১১ সালে একটি চুক্তির অংশ হিসেবে সিনওয়ারকে মুক্তি দেওয়া হয়, যেখানে একজন ইসরায়েলি জিম্মি, আইডিএফ সৈন্য গিলাদ শালিতের বিনিময়ে ১,০২৭ জন ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি আরব বন্দীকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। শালিতকে পাঁচ বছর ধরে অপহরণ করে রাখা হয়েছিল এবং অপহরণকারীদের মধ্যে সিনওয়ারের ভাইও ছিলেন, যিনি হামাসের একজন সিনিয়র সামরিক কমান্ডার।

ফিলিস্তিনের নেতা সিনওয়ারঃ

ইয়াহিয়া সিনওয়ার গাজায় ফিরে আসার পর গাজার মুসলিমরা তাকে নিয়ে উৎসব করতে থাকে। এর মূল কারণ ছিল হামাসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তার বিশেষ মর্যাদা এবং ইসরায়েলি কারাগারে তার জীবনের অনেকগুলো বছর উৎসর্গ করা।

২০১২ সালে হামাসের রাজনৈতিক শাখায় যোগ দেন সিনওয়ার। এ সময় কাসসাম ব্রিগেডের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রাখেন তিনি। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের সাত সপ্তাহের আগ্রাসনের সময় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা পালন করেন সিনওয়ার। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাকে 'আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী' হিসেবে অপবাদ দেয়। ২০১৭ সালে ইসমাঈল হানিয়া হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হলে সিনওয়ারকে গাজায় হামাস প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার ২০১২ সাল থেকেই আল মাজদকে আরো ফাংশনাল করেন। তিনি গাজার অভ্যন্তরে টানেল নেটওয়ার্ক একটি অন্য মাত্রায় নিয়ে যান। এই টানেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে হামাস যোদ্ধারা ইসরাঈলে ও মিশরে যাতায়াত করতে পারতো। ইয়াহিয়া সিনওয়ারের আরেকটি বড় সাফল্য ছিলো তিনি ইরানের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করেন। ইরানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আল কাসসাম ব্রিগেডকে শক্তিশালী করেন। টানেলে অস্ত্র কারখানা গড়ে তুলেন। মিশর থেকে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সহায়তায় খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তার দ্বার উন্মূক্ত করেন। গাজার মেধাবী ছাত্রদের তিনি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। কয়েক বছরের মধ্যে গাজার চেহারাই তিনি পালটে দেন।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার কখনোই আপোষকামী মনোভাবের মানসিকতা লালন করতেন না। তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তিনি কোনোভাবেই ভয় পেতেন না। কবি কাজী নজরুল যেমন বিদ্রোহী কবিতায় বলেছেন "আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি" এই কথাটির সাথে আমি কেবল ইয়াহিয়া সিনওয়ারকেই সম্পর্কিত করতে পারি। তিনি তার কিশোর বয়স থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যুদ্ধ করে গেছেন।   

শাহদাতঃ

১৬ অক্টোবর ২০২৪। আনুমানিক ১০টায় ইসরাঈলি সন্ত্রাসী আইডিএফ সৈন্যরা একজন ব্যক্তিকে একটি ভবনের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখে। বিকাল ৩টায়, একটি আইডিএফ ড্রোন তিনজন ব্যক্তিকে ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে, দু'জন কম্বলে ঢাকা এবং তৃতীয় জনের জন্য পথ পরিষ্কার করছিল। সৈন্যরা গুলি চালায় এবং দলটি আলাদা হয়ে যায়, দু'জন একটি ভবনে প্রবেশ করে এবং তৃতীয়জন (সিনওয়ার) আরেকটি ভবনে প্রবেশ করেন এবং দ্বিতীয় তলায় উঠে যান।

গোলাগুলির এক পর্যায়ে একজন আইডিএফ সৈন্য গুরুতর আহত হয়। একটি ট্যাঙ্ক সিনওয়ারের অবস্থানে একটি শেল নিক্ষেপ করে এবং অন্য সৈন্যরা ভবনের পাশে অবস্থান নেয়। সিনওয়ার তাদের লক্ষ্য করে দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে; একটি বিস্ফোরিত হয়। সন্ত্রাসী ইহুদী সৈন্যরা পিছু হটে এবং একটি ড্রোন পাঠিয়ে দেয় যা একটি আহত ব্যক্তিকে সনাক্ত করে যার মুখ ঢাকা তিনি একটি লাঠি দিয়ে ড্রোনটিকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। মুখোশধারী ব্যক্তিটি সিনওয়ার কিনা তা সে সময় জানা যায়নি।

ঘটনার পরের দিন সৈন্যরা একটি মৃতদেহ দেখতে পায় যা সিনওয়ারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, সামরিক ভেস্ট পরিহিত, একটি গ্রেনেড এবং একটি বন্দুক, ৪০,০০০ শেকেল (ইসরাঈলি মুদ্রা), একটি লাইটার, একটি ইসরাঈলি পাসপোর্ট। সেখান থেকে আরো দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয় নগদ টাকা, অস্ত্র ও ভুয়া পরিচয়পত্রসহ। ডিএনএ পরীক্ষা, দাঁতের রেকর্ড এবং আঙুলের ছাপের মাধ্যমে ইসরাঈলিরা নিশ্চিত হয় তিনি ছিলেন আমাদের বীর যোদ্ধা, আমাদের নেতা শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ার। 

ইয়াহইয়া সিনওয়ার আমাদের জীবদ্দশায় ঐতিহাসিক হক ও বাতিলের লড়াইয়ের সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা। অমর মহানায়ক। মুমিনদের মধ্যে কিছু লোক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছে। তাদের কেউ কেউ (শাহাদাত বরণ করে) তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছে। আবার কেউ কেউ (শাহাদাত বরণের) প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা (তাদের সংকল্পে) কোনো পরিবর্তন করেনি। (সূরা আহযাব, আয়াত-২৩)

ধারাবাহিকভাবে হামাস নেতাদের শাহাদাতের ঘটনায় কবি আল মাহমুদ এর লেখা আমাদের মিছিল কবিতার কথা বাববার মনে করিয়ে দেয়,

‘‘আমরা তো শাহাদাতের জন্যই
মায়ের উদর থেকে পৃথিবীতে পা রেখেছি।
কেউ পাথরে, কেউ তাঁবুর ছায়ায়
কেউ মরুভূমির উষ্মবালু কিংবা সবুজ কোনো ঘাসের দেশে
আমরা আজন্ম মিছিলেই আছি, এর আদি বা অন্ত নেই।’’

৩০ এপ্রি, ২০২৫

হিন্দুত্ববাদ, এর পরিণতি ও আমাদের করণীয়


ভৌগোলিক বিবেচনায় ‘হিন্দুত্ব’ বা ‘হিন্দু’ শব্দের মূল সিন্ধু অববাহিকার অধিবাসীদের পরিচয়ের সাথে জড়িত। কালক্রমে এই আঞ্চলিক পরিচয়কে নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে একীভূত করা হয়েছে, যা অনুসারীদের এই অঞ্চলের মূল ধারক হিসেবে উপস্থাপন করতে সহায়ক হয়। পাশাপাশি এর প্রাচীনত্ব বোঝাতে ‘সনাতন ধর্ম’ পরিভাষাটিও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পক্ষান্তরে, ইসলামী আকিদা অনুযায়ী মানবজাতির সূচনা থেকেই তাওহিদ বা ইসলাম ছিল আদি ও চিরন্তন দ্বীন, যার ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল আদি পিতা আদম (আ.)-এর মধ্য দিয়ে।

হিন্দুত্ববাদের ইতিহাস

বাংলায় পৌত্তলিক বিশ্বাসের সূচনা আর্যদের আগমনের হাত ধরে। বর্ণাশ্রম ও ব্রাহ্মণ্যবাদী শোষণের ফলে যখন দলিত ও নিম্নবর্ণের সাধারণ মানুষ সনাতনী কাঠামো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে, তখনই পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে হিন্দুত্ববাদের ধারণার বিকাশ ঘটে। এই কাঠামোর মাধ্যমে জাত-পাতের বিভাজনকে আড়াল করে একটি সম্মিলিত জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের ভিত্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়।

আধুনিক হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক সূচনা ঘটে ১৯২৩ সালে, বিনায়ক দামোদর সাভারকরের চিন্তার মধ্য দিয়ে। সাভারকর হিন্দুত্বকে কেবল ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। এই বলয়ে তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখদের অন্তর্ভুক্ত করলেও ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মকে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করেন।

হিন্দুত্ববাদ মূলত একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ, যার মূল লক্ষ্য ভারতকে একটি একচ্ছত্র ব্রাহ্মণ্যবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা। ১৯২৫ সালে গঠিত আরএসএস (RSS) এবং পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) মাধ্যমে এই মতাদর্শ সাংগঠনিক রূপ পায়। ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং ২০১৪ সালে বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই মতাদর্শ আগ্রাসী রূপ লাভ করে।

সাবেক তুর্কি প্রধানমন্ত্রী ড. নাজিমুদ্দিন এরবাকান যেভাবে জায়নবাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ককে একটি কুমিরের সাথে তুলনা করেছিলেন, হিন্দুত্ববাদের সামগ্রিক কাঠামোটিও ঠিক তেমনই। এরবাকানের রূপক অনুযায়ী জায়নবাদের ক্ষেত্রে ওপরের চোয়াল আমেরিকা, নিচের চোয়াল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দাঁত ও জিহ্বা ইসরায়েল এবং শরীর হলো প্রভাবিত মিডিয়া ও আপসকামী শাসকগোষ্ঠী।

একইভাবে বর্তমান হিন্দুত্ববাদী ব্যবস্থারও ওপরের চোয়াল বিজেপি এবং নিচের চোয়াল আপাতদৃষ্টিতে বিরোধী ধারার দলগুলো। এর ধারালো দাঁত ও সক্রিয় চালিকাশক্তি হলো আরএসএস। আর এই পুরো ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এবং ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন, সুবিধাভোগী রাজনৈতিক বলয়, নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ও প্রচারমাধ্যম।

হিন্দুত্ববাদের প্রভাব, আফটারম্যাথ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় হিন্দুত্ববাদের উত্থান সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক চরিত্রকে রূপান্তর করে একটি ধর্মীয় আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র গঠনের প্রয়াস শুধু ভারতের অভ্যন্তরেই নয়, বরং পুরো উপমহাদেশে নানামুখী সংকট তৈরি করছে। এর সম্ভাব্য পরিণতি ও প্রভাবসমূহ নিম্নরূপ:

১. কাঠামোগত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ

আরএসএস এবং বিজেপির মতাদর্শিক কৌশলের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় মেরুকরণ। নির্বাচনী সুবিধা অর্জনে মুসলিমবিদ্বেষী বয়ানকে মূলধারায় নিয়ে আসা হয়েছে। এনআরসি (NRC) ও সিএএ (CAA)-এর মতো নাগরিকত্ব আইনের সংস্কার, বুলডোজার জাস্টিস এবং তথাকথিত ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘গো-রক্ষা’র নামে বিচারবহির্ভূত গণপিটুনি (Mob Lynching) সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংবিধানিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে

২. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও বৈচিত্র্য বিলোপ

ভারতের হাজার বছরের বহুত্ববাদী, বহুভাষিক ও বহুধর্মীয় ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে একটি একক বৈদিক ও পৌত্তলিক জাতীয়তাবাদী বয়ান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ইতিহাস বিকৃতি, পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন এবং মুসলিম ঐতিহ্যের শহর ও স্থাপনার নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর (বিশেষত বাংলাদেশ ও নেপাল) সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্বের ওপরও বিস্তারের চেষ্টা দৃশ্যমান।

৩. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনের অবক্ষয়

হিন্দুত্ববাদী কর্তৃত্ববাদের প্রসারে স্বাধীন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বাড়ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করে তৈরি করা হয়েছে অনুগত ‘গোদি মিডিয়া’।

৪. উগ্র পুঁজিবাদ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাথে নির্দিষ্ট কিছু করপোরেট গোষ্ঠীর আঁতাত অর্থনীতিতে চরম বৈষম্য তৈরি করেছে। রাষ্ট্রের মেগা প্রকল্প ও সম্পদ কিছু ঘনিষ্ঠ পুঁজিপতির হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর ট্রানজিট, বন্দর ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একপাক্ষিক অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার নীতি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।

৫. প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আধিপত্য বিস্তার ও স্বৈরতন্ত্রের মদদ

হিন্দুত্ববাদী ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় ‘বিগ ব্রাদার’ সুলভ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। নিজস্ব ভূরাজনৈতিক প্রভাব বলয় টিকিয়ে রাখতে তারা প্রতিবেশীদের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে অনুগত ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখতে মদদ জুগিয়েছে। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে ভারতের এই আগ্রাসী নীতি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সার্বভৌমত্বের সংকটকে ঘনীভূত করেছে।

৬. সংখ্যালঘুদের পদ্ধতিগত প্রান্তিকীকরণ

ভারতের প্রায় ২০ কোটির অধিক মুসলিম (১৪.২%), আড়াই কোটি খ্রিস্টান (২.৩%) এবং শিখ (১.৭%) জনগোষ্ঠী কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার। আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত মার্কিন কমিশনের (USCIRF) প্রতিবেদনে ভারতকে বারবার ‘Country of Particular Concern’ (বিশেষ উদ্বেগের দেশ) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা সংখ্যালঘুদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের প্রমাণ দেয়।

৭. অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদ ও আঞ্চলিক অস্থিরতা

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে জাতিগত সংঘাত (যেমন মণিপুর সংকট) এবং মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের কিছু অঞ্চলের রাজনৈতিক অসন্তোষ ভারতের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে দুর্বল করছে। এছাড়া কাশ্মীর ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং পাকিস্তান ও চীনের সাথে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা যেকোনো সময় বৃহত্তর পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

৮. চরমপন্থী রাষ্ট্রের রূপান্তর

উগ্রবাদী নেতাদের ক্ষমতার কেন্দ্রে আরোহণ ভারতকে একটি কট্টর হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতের দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ ও জোটনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করছে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আদর্শিক দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।

৯. ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণীর প্রাসঙ্গিকতা

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে উপমহাদেশে মুসলিমদের টিকে থাকার লড়াই এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হাদিসে বর্ণিত ‘গাজওয়ায়ে হিন্দ’-এর ভবিষ্যৎবাণী রাজনৈতিক সচেতনদের মাঝে প্রতিনিয়ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের মুখে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রেরণাদায়ী ধারণা হিসেবে এই আলোচনা সমাজে ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে।

১০. ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার আঞ্চলিক হুমকি ও মানচিত্র রাজনীতি

হিন্দুত্ববাদের অন্যতম মূল রাজনৈতিক এজেন্ডা হলো ঐতিহাসিক ‘অখণ্ড ভারত’ (Akhand Bharat)-এর ভৌগোলিক রূপরেখা প্রতিষ্ঠা করা। ভারতের নতুন সংসদ ভবনে প্রদর্শিত বিতর্কিত মানচিত্রে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও আফগানিস্তানের ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও স্বাধীনতার ওপর সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক ও সার্বভৌম হুমকি তৈরি করে।

১১. পানি কূটনীতি ও নদী আগ্রাসন (Hydro-Hegemony)

উপমহাদেশের ৫৪টিরও বেশি অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীর ওপর একপাক্ষিক বাঁধ ও গজলডোবা বা ফারাক্কার মতো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ব্যবহার করে ভাটির দেশগুলোকে (বিশেষত বাংলাদেশ) পরিকল্পিতভাবে পানিবন্দী বা খরাজনিত বিপর্যয়ের মুখে ফেলা হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী নীতির অধীনে নদী নিয়ন্ত্রণকে একটি ভূরাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা মারাত্মক রূপ নিচ্ছে।

১২. গ্লোবাল হিন্দুত্ব ও আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া রপ্তানি

হিন্দুত্ববাদী নেটওয়ার্ক কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং যুক্তরাজ্য (যেমন লেস্টার দাঙ্গা), যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী হিন্দু জনগোষ্ঠীর মাঝে তহবিল সংগ্রহ ও চরমপন্থী বয়ান ছড়িয়ে দিচ্ছে। একই সাথে পশ্চিমা উগ্র ডানপন্থী দলগুলোর সাথে আঁতাত করে বিশ্বজুড়ে সুপরিকল্পিত ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

১৩. তথাকথিত ‘আইটি সেল’ ও ডিজিটাল ডিসইনফরমেশন যুদ্ধ

সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার ফেক অ্যাকাউন্ট ও বটের মাধ্যমে পরিকল্পিত অপতথ্য (Disinformation) ছড়ানো হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে সাইবার আক্রমণ, মুসলিম ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত এবং ইতিহাস বিকৃত করে কৃত্রিম ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যমে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ (Fifth Generation Warfare) পরিচালনা করা হচ্ছে।

১৪. মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার কৌশলগত অনৈক্যের সুযোগ গ্রহণ

উপমহাদেশের প্রায় ৬০ কোটিরও বেশি মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে (পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের মুসলিম মিলিয়ে)। কিন্তু কৌশলগত ও রাজনৈতিক ঐক্যের অভাবে হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলো এক-একটি দেশকে পৃথকভাবে চাপে রাখার সুযোগ পায়। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে পুঁজি করে ভারত আন্তর্জাতিক মুসলিম ফোরামে (যেমন OIC) কাশ্মীর ও ভারতীয় মুসলিমদের নিপীড়নের বিষয়টি আড়াল করে আসছে।

আমাদের করণীয়

হিন্দুত্ববাদ ঠেকিয়ে আমাদের দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা, সামাজিক সম্মতি, এবং ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার প্রয়োজন। এটি কেবল আইন প্রণয়নের বিষয় নয়, বরং সমাজের সকল স্তরে ইসলামী নীতির প্রয়োগ ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।

১. শিক্ষা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ

সমাজের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কুরআন, সুন্নাহ ও বিশুদ্ধ আকিদার সঠিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা কেন্দ্র ও থিংক-ট্যাংক গড়ে তুলতে হবে, যা হিন্দুত্ববাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিভ্রান্তিকর মতাদর্শকে যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করবে। শিক্ষাব্যবস্থার সকল স্তরে ইসলামের নৈতিক দর্শন ও সঠিক ইতিহাস পাঠ অন্তর্ভুক্ত করে আগামী প্রজন্মকে আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক গোলামি থেকে মুক্ত একটি সচেতন প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক।

২. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংহতি

পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে বিবাহ, বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারসহ সর্বক্ষেত্রে শরীয়াহর বিধানের যথার্থ চর্চা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ করা যায়। একই সাথে সমাজে লজ্জা ও শালীনতার আবহ তৈরি করে অপসংস্কৃতি, শিরক ও বিদআতের অবসান ঘটিয়ে একটি পরিশুদ্ধ তাওহিদভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি করা জরুরি, যা যেকোনো বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

৩. অর্থনৈতিক সংস্কার ও স্বনির্ভরতা

সুদমুক্ত বিকল্প ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু, প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ও ওক্বাফ ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজের সম্পদ বণ্টনের ভারসাম্য ফিরিয়ে এনে বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোগকে প্রণোদনা প্রদান এবং সৎ বাণিজ্যিক নৈতিকতা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিবেশী ও আধিপত্যবাদী শক্তির পণ্যের ওপর পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য 

৪. শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর

আল্লাহভীরু, প্রজ্ঞাবান ও দক্ষ নেতৃত্বের অধীনে পারস্পরিক পরামর্শ বা শূরার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের শাসনতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দল-মত ও ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য নিরপেক্ষ বিচার এবং নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অমুসলিম সংখ্যালঘুদের ন্যায্য ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার প্রদানের মাধ্যমে একটি সুষম, শোষণহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে হবে।

৫. মিডিয়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও তরুণ নেতৃত্ব

আধিপত্যবাদী শক্তির সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা ও সাইবার যুদ্ধ মোকাবিলায় নিজস্ব শক্তিশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, বস্তুনিষ্ঠ গণমাধ্যম এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে আদর্শহীনতা ও বিভ্রান্তি থেকে বের করে দেশপ্রেম, চারিত্রিক মাধুর্য ও ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে সময়ের আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর চালিকাশক্তি হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

৬. জাতীয় সার্বভৌমত্ব, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি

একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে মুসলিম উম্মাহ ও অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সাথে বহুমুখী কৌশলগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে হবে। একই সাথে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

৭. ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি ও আত্মিক জাগরণ

ব্যক্তি ও সমষ্টিগত জীবনে তাকওয়া, ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি অগাধ ভরসা বৃদ্ধির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ইবাদতের পাশাপাশি ব্যবহারিক জীবনেও ইসলামের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে হবে। প্রজ্ঞা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত বিস্তার করা এবং সামগ্রিক স্বার্থে ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল একটি আত্মমর্যাদাশীল ও শক্তিশালী আদর্শ সমাজ তৈরি করা সম্ভব।

৮. মূলনীতি ও কৌশলগত সতর্কতা

মনে রাখা জরুরি যে ইসলাম কখনোই জোরজবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ সমর্থন করে না; বরং চারিত্রিক মাধুর্য, প্রজ্ঞা ও ইনসাফের মাধ্যমেই মানুষের হৃদয়ে এর গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে। সেই সাথে শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন ইতিবাচক দেশীয় রীতিনীতিকে ধারণ করে এবং আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তি ও প্রযুক্তির সাথে ইসলামী দর্শনের সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে অত্যন্ত দূরদর্শী ও ধৈর্যশীল প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হতে হবে।

হিন্দুত্ববাদকে মোকাবিলা করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ভূখণ্ডে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, বরং জনগণের হৃদয়ে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা জরুরি। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যেখানে ধৈর্য, জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং আল্লাহর উপর ভরসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৬ এপ্রি, ২০২৫

ভারতের ওয়াকফ সংশোধনী বিল ও বিজেপি'র ষড়যন্ত্র


ভারতের পার্লামেন্টে সম্প্রতি পাস হওয়া ওয়াকফ সংশোধনী বিল ২০২৫ নিয়ে তৈরি হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। এমনকি খোদ ভারতের বিরোধী দলের নেতারাও এই বিলের বিরোধিতা করেছেন। বলা হচ্ছে, এ আইনের মাধ্যমে মুসলিমদের দানকৃত মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান ও আশ্রয়কেন্দ্রের মতো ধর্মীয় সম্পদগুলোয় সরকারি হস্তক্ষেপ ও দখলের পথ তৈরি করা হয়েছে।

গত ৩ এপ্রিল ভারতের লোকসভায় বিলটি পাস হওয়ার পর থেকেই ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন, লোকসভায় পাসকৃত বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিল মুসলিম স্বার্থবিরোধী এবং মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, মালিকানা ও অধিকার হরণে বিজেপি সরকারের ধারাবাহিক সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টারই আরেকটি বহিঃপ্রকাশ।

ওয়াকফ সম্পত্তি কী?
মুসলিমদের কল্যাণে মুসলিমদের বরাদ্দ করা সম্পত্তিকেই ওয়াকফ সম্পত্তি বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কৃষিজমি, দালানকোঠা, দরগাহ/মাজার ও কবরস্থান, ইদগাহ, খানকাহ, মাদ্রাসা, মসজিদ, প্লট, পুকুর, স্কুল, দোকানপাটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম ওয়াকফের প্রচলন ১২শ শতকে শুরু হয়, যখন মুসলিম শাসক মুহাম্মদ ঘোরি হিন্দুস্থানে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং দুটি গ্রাম ওয়াকফ হিসেবে একটি লিখিত অনুদানের মাধ্যমে দান করেন। দিল্লি সালতানাতের শাসনামলে ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। যেখানে ইলতুতমিশ, মুহাম্মদ বিন তুঘলক ও আলাউদ্দিন খলজি ওয়াকফ সম্পত্তি প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করেন। মুঘল সাম্রাজ্যের সময় ওয়াকফ ব্যবস্থার আরও প্রসার ঘটে।
আকবর ও শাহজাহান গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি ওয়াকফ করেন, যার মধ্যে তাজমহলও রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রসার ও ধর্মান্তরের ফলে এই ব্যবস্থার বিস্তার গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াকফের জন্য অর্থায়ন মূলত ওয়াকফকৃত গ্রামের রাজস্ব থেকে আসত, যা প্রায়ই হিন্দুপ্রধান গ্রাম ছিল এবং এই অর্থ মসজিদ ও মাদ্রাসার জন্য ব্যবহার করা হতো।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে ওয়াকফ ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত ও আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হয়, যা বর্তমান ভারতীয় আইনের অধীন এখনো প্রযোজ্য। ১৯১৩ সালে ওয়াকফ বোর্ড গঠন করা হয়, এবং ১৯২৩ সালে "মুসলমান ওয়াকফ আইন" প্রণয়ন করা হয়, যা রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডগুলোর কার্যক্রম ও সুষ্ঠু প্রশাসনের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করত। ওয়াকফ হল মুসলিম আইনে স্বীকৃত একটি স্থায়ী দান, যেখানে অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে দান করা হয়। এই অনুদানকে "মুশরুত-উল-খিদমত" বলা হয়, এবং যিনি এই দান করেন তাকে "ওয়াকিফ" বলা হয়।

ওয়াকফ (সংশোধনী) আইন, ২০২৫
ওয়াকফ সংশোধনী বিল ২০২৫ ভারতীয় লোক সভায় ২০২৪ সালে ৮ই আগস্ট পেশ করা হয়। এই বিলে ১৯২৩ সালের মুসলমান ওয়াকফ আইন বাতিল এবং ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইন সংশোধন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ওয়াকফ বোর্ড কতটুকু জমি আছে?
হিন্দুস্থানে ওয়াকফ বোর্ডের অধীনে ৮.৭ লক্ষ সম্পত্তি আছে। ৯.৪ লক্ষ একর জমি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে ওয়াকফ। যার আনুমানিক মূল্য ১.৫ লক্ষ কোটি টাকা। ওয়াকফ বোর্ড ভারতীয় রেল এবং সশস্ত্র বাহিনীর পরে তৃতীয় বৃহত্তম জমির মালিক। মূলত এটাই বিজেপির মাথাব্যাথার কারণ। মুসলিমদের কল্যাণে ব্যবহার হওয়া এই বিপুল সম্পত্তি হস্তগত ও রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করার জন্য ওয়াকফ সংশোধনী বিল আনা হয়েছে।

বিজেপি সরকার কেন ওয়াকফ আইন সংশোধন করছে?
১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইন সংশোধনের বিলে বলা হয়েছিল, ওয়াকফ বোর্ডগুলিকে বাধ্যতামূলক ভাবে তাদের সম্পত্তি জেলা কালেক্টরদের কাছে নথিভুক্ত করতে হবে, যাতে তাদের প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়। বর্তমানে, ওয়াকফ বোর্ডের বেশিরভাগ সদস্য নির্বাচিত হন, তবে নতুন বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পরে সমস্ত সদস্যকে সরকার মনোনীত করবে। আশঙ্কা রয়েছে যে এই বিধানটি ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের বোর্ডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবে। নতুন বিলে বলা হয়েছে, একজন অমুসলিমও সিইও হতে পারবেন এবং কমপক্ষে দুজন সদস্য অমুসলিম হতে হবে।

বর্তমান ওয়াকফ বিলের ৪০ নম্বর ধারার আইন অনুযায়ী, ওয়াকফ বোর্ডের দখল করা সম্পত্তি বা জমিতে কোনো রকম সরকারি পর্যালোচনা বা রিভিউ করা যায় না। পর্যালোচনা ছাড়াই ওয়াকফ বোর্ড সম্পদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কোনো সম্পত্তি নিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং ওয়াকফ বোর্ডের আইনি বিবাদ চললেও তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না সরকার। সংশোধিত বিলে সরকার মূলত ওয়াকফ অধিকার খর্ব করতে চাইছে। বিতর্কিত কোনো সম্পত্তির মালিকানা আদতে কার, তাও খতিয়ে দেখার আইনি এক্তিয়ার সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে।

এর মাধ্যমে একাধিক ক্ষেত্রে ওয়াকফ বোর্ডের একচ্ছত্র অধিকার খর্ব করা হতে পারে। নতুন সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের সেই একচ্ছত্র অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো সম্পত্তি ওয়াকফ কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে জেলাশাসক বা সমপদমর্যাদার কোনো অফিসারের হাতে। এ ছাড়াও রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির নথিভুক্তিকরণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব। পুরোনো আইন অনুযায়ী কোনো সম্পত্তিকে ওয়াকফ সম্পত্তি ঘোষণা করলে চিরদিনের জন্য সেটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবেই থেকে যেত। নতুন বিল পাস হলে এবার সেটাকেও চ্যালেঞ্জ করা যাবে। ফলে যে সম্পত্তি ওয়াকফ বোর্ডের বলে ঘোষণা করে, তাতে ইসলামিক ধর্মস্থান বা অন্য কোনো ইসলামিক প্রার্থনাস্থল তৈরি হলেও সেটাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে দাবি করা যেতে পারে।

সমালোচকরা বলছেন, নতুন সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন, অমুসলিমদের (মূলত হিন্দুদের) সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, কোন সম্পত্তি ওয়াকফ বলে বিবেচিত হবে কোনটা হবে না সরকারকে তা নির্ধারণের কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ ওয়াকফকৃত সম্পদ পরিচালনা ও ভোগের একমাত্র হকদার মুসলমানরা। এই বিলের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ওয়াকফ আইনকে দুর্বল করে দেওয়া এবং ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও দখল করার আইনি পথ তৈরি করা।


১ অক্টো, ২০২৩

মালদ্বীপে কেন 'ইন্ডিয়া আউট' আন্দোলন জনপ্রিয় হলো?

 



মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে দিয়ে যে জাহাজ চলাচলের রুট বা শিপিং লাইনগুলো আছে, তার মাঝামাঝি খুব স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানে আছে মালদ্বীপ। ভারত সাগরের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় স্বভাবতই এই রাষ্ট্রের দিকে আঞ্চলিক পরাশক্তিদের নজর থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তাই। এখানে প্রভাব বলয় তৈরি করার জন্য মরিয়া চীন ও ভারত। মালদ্বীপে তাই দুই টাইপের জনগণ তৈরি হয়েছে। একপক্ষ ভারতের পক্ষে, অন্যপক্ষ চীনের।

কিন্তু ভারতের আগ্রাসী পররাষ্ট্র নীতি ভারতকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে মালদ্বীপে। ২০১৮ সালে বেশ অপ্রত্যাশিতভাবে ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসার পর মালডিভিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এমডিপি) নেতা ইব্রাহিম মুহাম্মদ সোলিহ্ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমশ শক্তিশালী করেছেন। ভারতের সঙ্গে তার দেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও খুব শক্তিশালী করেছেন।

মালদ্বীপ আসলে দীর্ঘকাল ধরেই ভারতের প্রভাব বলয়ে ছিল। সাবেক স্বৈরশাসক মামুন আব্দুল গাইয়ুমকে ভারত টিকিয়ে রেখেছিল বহুদিন থেকে। প্রেসিডেন্ট সোলিহ'র বিরুদ্ধে একটা বড় সমালোচনা হল তার প্রশাসন দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার দিকেই ঝুঁকেছে – যে নীতিকে বলা হয় ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ পলিসি। মালদ্বীপে ভারতের উপস্থিতি থাকার ফলে দিল্লিও ভারত মহাসাগরের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশে তাদের নজরদারি বা মনিটরিং জারি রাখতে পেরেছে। সম্প্রতি তারা তাদের নজরদারির সীমা ছাড়িয়েছে।

২০১৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আবদুল্লাহ ইয়ামিন, যার আমলে মালদ্বীপ ক্রমশ চীনের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। সে সময় মালদ্বীপ চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে’ যোগ দেয়, যে পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল চীনের সঙ্গে সারা বিশ্বের রেল, সড়ক ও নৌ-যোগাযোগ গড়ে তোলা। ইয়ামিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠায় ভারত ও পশ্চিমা দেশগুলো তখন মালদ্বীপকে ঋণ সহায়তা দিতে অস্বীকার করেছিল। তিনি তখন চীনের শরণাপন্ন হন এবং বেইজিং কোনও শর্ত ছাড়াই মালদ্বীপে অর্থ ঢালতে থাকে।

২০২১ সালে মালদ্বীপে 'ইন্ডিয়া আউট' আন্দোলন শুরু করে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও মালের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মইজ্জু। তিনি আব্দুল্লাহ ইয়ামিনের দলের ডেপুটি নেতা। 'ইন্ডিয়া আউট' আন্দোলনের মূল কারণ ইন্ডিয়ার মালদ্বীপে গোয়ান্দা কার্যক্রম। ২০১০ ও ২০১৩ সালে ভারত মালদ্বীপকে দুটি হেলিকপ্টার উপহার দিয়েছিল। এরপর ২০২০ সালে তাদের একটি ছোট এয়ারক্র্যাফট-ও দেওয়া হয়। বলা হয়েছিল, মালদ্বীপে উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান চালাতে এবং আপদকালীন মেডিকেল ইভ্যাকুয়েশনে এগুলো ব্যবহার করা হবে। কিন্তু ২০২১ সালে মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায় যে ভারতের দেওয়া বিমান চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ৭৫জন ভারতীয় সেনা সদস্য সে দেশে অবস্থান করছেন।

ক্ষমতাসীন ভারতপন্থীদের যোগসাজশে ভারত মালদ্বীপে গোপনে সেনা ক্যাম্প গড়ে তুলেছে, এই খবর স্বাধীনচেতা মালদ্বীপের মানুষকে আহত করে। মালদ্বীপের পক্ষ থেকে প্রথমে অস্বীকার করা হলেও পরে তারা ভারতীয় সেনাদের উপস্থিতি স্বীকার করে নেয়। জানানো হয়, “সামরিকভাবে সক্রিয় কোনও বিদেশি সেনা সদস্য মালদ্বীপে মোতায়েন নেই।” “ভারতের যে সেনা সদস্যরা এই মুহূর্তে মালদ্বীপে রয়েছেন তারা সকলেই মালদ্বীপের ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের অপারেশনাল কমান্ডের অধীন”।

এই ঘটনায় মোহাম্মদ মইজ্জু 'ইন্ডিয়া আউট' আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনে মালদ্বীপবাসীর ব্যাপক সমর্থন পান মোহাম্মদ মইজ্জু। এবারের প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে এর প্রভাব পড়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে চীন ও ভারত সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত কোনো প্রার্থী ৫০ ভাগের বেশি ভোট পাননি। ফলে ভোট গড়িয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ এই নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে ভোট দিয়েছিলেন। এর মধ্যে বিরোধী দল পিপলস ন্যাশনাল কংগ্রেসের (পিএনএস) প্রার্থী মইজ্জু ভোট পেয়েছেন ৪৬ ভাগ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মালদ্বীপ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এমডিপি) ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ পেয়েছেন ৩৯ ভাগ ভোট। নির্বাচনে আরও ছয়জন প্রার্থী ছিলেন। তাঁরা সবাই মিলে বাকি ১৫ ভাগ ভোট পেয়েছেন। প্রথম দফার এই ফল থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে মূলত পিএনএসের মোহাম্মদ মুইজজু ও এমডিপির সলিহের মধ্যে।

দ্বিতীয় দফায় মোহাম্মদ মুইজ্জু পেয়েছেন ৫৪ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ভোট। আগামী ১৭ নভেম্বর দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবেন তিনি। এর আগ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন মোহাম্মদ সলিহ।

আদালতের দণ্ডের কারণে আবদুল্লাহ ইয়ামিন যেমন প্রার্থী হতে পারেননি, তেমনি এমডিপি থেকে নাশিদকে প্রার্থী হতে দেননি বর্তমান প্রেসিডেন্ট সলিহ। এর ফল হয়েছে দুটি। নাশিদ এমডিপি ছেড়ে দিয়েছেন। আর বিরোধী পক্ষ ইয়ামিনের বিকল্প হিসেবে মুইজ্জুকে প্রার্থী করে। মুইজ্জু প্রার্থী হয়েছেন দুটি বিরোধী দলের জোট প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স থেকে। এই জোটে আছে দুটি বিরোধী দল—পিপিএম এবং পিএনসি। এর মধ্যে প্রথমটি দেশের মূল বিরোধী দল।

নির্বাচনকালে সাম্প্রতিক সংবাদগুলোতে ভারতীয় অনেক প্রচারমাধ্যম মুইজ্জুকে চীনের ‘প্রক্সি প্রার্থী’ বলেও উল্লেখ করেছে। এ রকম অভিমত যে সলিহের পক্ষে যায়নি, সেটা ভোটের ফল থেকেই স্পষ্ট। পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে তিনি ৫৪ ভাগের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। অথচ এবার ৯ ভাগ কমে গেল। এ থেকে সাধারণভাবে মনে করা হচ্ছে, তার সরকারের ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ নীতি মালদ্বীপের মুসলমানেরা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি।

ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র নীতি সবচেয়ে বাজে দিক হলো তারা কোনো রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন না করে ঐ দেশের কোনো গোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করে। যেমন বাংলাদেশে তারা আওয়ামী লীগকে সকল বৈধ-অবৈধ সুবিধা দেয় কিন্তু বাংলাদেশ উন্নতি হবে এমন সহায়তা তারা করে না। মালদ্বীপেও তারা একই কাজ করেছে। সম্পর্ক উন্নয়ন করেছে, সুবিধা দিয়েছে সোলিহ ও তার দলকে বিনিময়ে হুমকিতে ফেলে দিয়েছে মালদ্বীপের সার্বভৌমত্বকে।

২০ সেপ, ২০২৩

খালিস্তান আন্দোলন ও ভারত - কানাডার বিবাদ


শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাদের মাতৃভূমি 'খালিস্তান' বলে দাবি করেন। যার অর্থ 'বিশুদ্ধ দেশ'। তারা চান, এই রাষ্ট্র পাঞ্জাবে গড়ে তোলা হোক। ১৯৪৭ সাল থেকে তারা পাঞ্জাবে স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেই সূত্র ধরে ভারতীয় সরকারের সাথে বিচ্ছিন্নতাবাদী শিখদের দ্বন্দ্ব চলে আসছে।

সম্প্রতি খালিস্তানি তৎপরতাকে কেন্দ্র করে ভারত-কানাডা সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হয়েছে। ২০২৩ সালের জুন মাসে শীর্ষ শিখ নেতা ও কানাডীয় নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জর কানাডায় শিখ মন্দিরের সামনে খুন। অজ্ঞাত আততায়ী মাস্ক পরে তাকে গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেশ নড়েচড়ে বসে কানাডা। কানাডায় বহু আগ বহু খালিস্তানি নেতা রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন ও অনেকেই কানাডার নাগরিক হয়ে গিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডে ভারত জড়িত, এমন অভিযোগ এনে সে দেশের এক কূটনীতিককে কানাডা সোমবার বহিষ্কার করেছে। কানাডার কাছে প্রমাণ রয়েছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র'-এর অপারেশনেই শিখ নেতা হরদীপ সিং খুন হয়েছেন। কানাডার পার্লামেন্টে ট্রুডো অভিযোগ করেন, হরদীপ সিংকে খুনের পেছনে ভারতের হাত থাকার নির্দিষ্ট প্রমাণ তার সরকারের কাছে রয়েছে। তাদের কাছে সেই প্রমাণ যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যও।

ট্রুডো বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরে কানাডার মাটিতে এক নাগরিককে এভাবে হত্যা করা, বিদেশিদের এমন প্রত্যক্ষ যোগসাজশ কানাডার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। ওই অভিযোগের পরই কানাডায় অবস্থানরত এক ভারতীয় কূটনীতিককে বহিষ্কারের কথা জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেলানিয়া জোলি। কানাডা ভারতের দিকে ওই গুরুতর অভিযোগ তোলার পর যুক্তরাজ্য আর অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে তারা কানাডার নাগরিকের হত্যা তদন্তের দিকে নজর রাখছে।

হরদীপ সিং হত্যার ঘটনায় ভারত সরকারের জড়িত থাকার গুরুতর এই অভিযোগকে মোদি সরকার 'মনগড়া' এবং 'উদ্দেশ্য প্রণোদিত' বলে নাকচ করে দিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী টুইট করে লিখেছেন, এই ধরণের ভিত্তিহীন অভিযোগ খালিস্তানি সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থীদের ওপর থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। যারা ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি একটা হুমকি, তাদের কানাডায় আশ্রয় দেওয়া চলছে।

এর পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিল্লিতে কানাডার রাষ্ট্রদূত ক্যামেরুন ম্যাকে-কে ডেকে পাঠায়। কানাডার এক সিনিয়র কূটনীতিককে পাঁচ দিনের মধ্যে ভারত ছাড়তে বলা হয়। ভারত ও কানাডার মধ্যে বৈরিতার সম্পর্ক নেই, তবুও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের এতটাই অবনতি হয়েছে যে একে অপরের একজন করে শীর্ষ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে। তবে খালিস্তানীদের ইস্যু নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই ভারত আর কানাডার মধ্যে বাক্য বিনিময় হচ্ছিল। ভারত বলে আসছে যে খালিস্তানপন্থীদের কাজকর্ম কানাডার প্রশ্রয়ে যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়াতেও ছড়িয়ে গেছে।

খালিস্তান আন্দোলনের পত্তন হয় যেভাবে:
ভারতবর্ষ ভাগের পর শিখদের স্মৃতিবিজড়িত পাঞ্জাব প্রদেশ দুই ভাগ হয়ে যায়। এক অংশ ছিল ভারতে, আরেক অংশ পাকিস্তানে। পাকিস্তানে যে অংশটি ছিল, সেখান থেকে অসংখ্য শিখ ভারতের পাঞ্জাব অংশে চলে আসে, অপরদিকে পাকিস্তানে অবস্থানরত শিখরা সেদেশের পাঞ্জাব প্রদেশে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। এছাড়াও ঐতিহাসিক পাঞ্জাব রাজ্যের লাহোর ও শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানকের জন্মস্থানও পাকিস্তানের সীমারেখায় রেখে দেয়া হয়।

এই ভাগকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। শিখরা এই ভাগের ফলে নিজেদের প্রতারিত ভাবতে শুরু করে। ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পর পরই শুরু হয় 'পাঞ্জাবি সুবাহ্ আন্দোলন'। এই আন্দোলনের দাবি ছিল পাঞ্জাবি ভাষার উপর ভিত্তি করে একটি আলাদা প্রদেশ তৈরি করতে হবে। প্রথমদিকে এই দাবিকে গুরুত্ব দেয়া না হলেও অব্যাহত প্রতিবাদের পর ১৯৬৬ সালে ভারতের 'স্টেটস রিকগনাইজেশন কমিশন' এই দাবি গ্রহণ করে। তবে এই দাবি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিমাচল ও হরিয়ানা নামে দুটো হিন্দিভাষী প্রদেশ তৈরি করা হয়েছিল।

'পাঞ্জাবি সুবাহ্ আন্দোলন' সফল হওয়ার পর প্রদেশটির রাজনৈতিক আকালি দলের জনপ্রিয়তা হু হু করে বাড়তে থাকে। এরপর তারা আরও বেশি জনসমর্থন গড়ে তোলার করার জন্য পরিকল্পনা হাতে নেয়। ১৯৭৩ সালে খালসা মতাদর্শের জন্মস্থান আনন্দপুর সাহিবে দলের নেতারা একত্রিত হন এবং 'আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাবনা'র ঘোষণা দেন। এই প্রস্তাবে কিছু দিক ছিল খালিস্তান প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ। যেমন- অন্যান্য প্রদেশের বেশ কিছু অংশ নিয়ে গঠিত একটি প্রদেশ গঠন এবং সেই প্রদেশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলে তারা। এছাড়া তারা নতুন প্রদেশের স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থার জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের দাবি জানায় সেই প্রস্তাবে।

এরপরই প্রেক্ষাপটে আবির্ভাব ঘটে জারনেইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে নামের এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের। তিনি আকালি দলের স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন শিখদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে । অল্প সময়ের মধ্যেই তার বিশাল সমর্থন গড়ে ওঠে। পাঞ্জাবের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মাঝে তার বিপুল জনপ্রিয়তা তৈরি হয়।

১৯৮২ সালের গ্রীষ্মে আকালি দলের নেতৃত্বের সমর্থনে জারনেইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে একটি চরমপন্থী আন্দোলন গড়ে তোলেন পাঞ্জাবে। তিনি নিজে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে আশ্রয় নেন এবং সেখান থেকেই পুলিশের সাথে তার অনুসারীদের সংঘাত ও দাবি আদায়ের মিছিলের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। আনন্দপুর সাহিব প্রস্তাবনায় যেসব প্রস্তাবের উল্লেখ করা হয়েছিল, সেগুলো মেনে নেয়ার দাবি জানানো হয় তার পক্ষ থেকে। সেই সাথে পাঞ্জাবের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। তার অনুসারীরা অন্যান্য ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। জারনেইল শিং ভিন্দ্রানওয়ালে হিন্দু ধর্মের বিপক্ষে অনেক স্পর্শকাতর মন্তব্য প্রচার করেন। ভারতের তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকার এই আন্দোলনকে 'দেশদ্রোহী' হিসেবে ঘোষণা দেয়।

১৯৮৪ সালে পাঞ্জাবের পরিস্থিতি আরও বাজে দিকে মোড় নেয়। জারনেইল সিং আন্দোলনরত শিখদের অস্ত্র হাতে নেয়ার আহ্বান জানান। হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্র রূপ ধারণ করে। ভারতীয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেনাবাহিনীকে শিখ উগ্রপন্থীদের হাত থেকে স্বর্ণমন্দির মুক্ত করা এবং জারনেইল সিংকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেন।

সেনাবাহিনী 'অপারেশন ব্লু স্টার' হাত নেয়। শিখদের প্রতিরোধ এত বেশি ছিল যে, একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ট্যাংক ও বিমান থেকে গোলাবর্ষণের সহায়তা নেয়। এই সামরিক অভিযানে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসেবে বলা হয়েছিল, ৮৩ জন সেনাসদস্য নিহত এবং ২৪৯ জন সেনাসদস্য আহত হয় এই অভিযানে। শিখ উগ্রপন্থী এবং বেসামরিক মানুষের সংখ্যা দেখানো হয় ৪৯৩। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসেবে দু'পক্ষ মিলিয়ে হতাহতের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে শিখদের নেতা জারনেইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে নিহত হন। সে বছরেরই ৩১ অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দুজন শিখ দেহরক্ষীর হাতে নিহত হলে শিখদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংঘটিত হয়, যাতে প্রায় আট হাজার শিখ নিহত হন। এর পরের বছর কানাডাপ্রবাসী শিখরা এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। এই বোমা বিস্ফোরণে বিমানে অবস্থানরত ৩২৯ জনের সবাই মৃত্যুবরণ করে। এই বিস্ফোরণের পেছনে যারা দায়ী ছিল, তারা তাদের নেতা জারনেইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে এই বিমান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করে। ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাবে খালিস্তান আন্দোলনকেন্দ্রিক সহিংসতা চলমান ছিল।

খালিস্তান আন্দোলন শিখদের আলাদা রাষ্ট্রের দাবি হলেও ক্রমাগত সহিংসতা ও অন্যান্য ধর্মের প্রতি তাদের ঘৃণাসুলভ মনোভাব এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিশাল জনমত গড়ে তুলতে সমর্থ হয়। খোদ পাঞ্জাবেই এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে আলোচনা শুরু হয়েছিল। ১৯৯৫ সালের পর থেকে খালিস্তান আন্দোলনের মূল নেতারা ভারত থেকে পালিয়ে যান। ইউরোপ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় তারা রাজনৈতিক আশ্রয় ও নাগরিকত্ব নিতে থাকেন। বর্তমানে খালিস্তান আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব কানাডা থেকেই আন্দোলন পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

১৪ মে, ২০২৩

সুদানে গৃহযুদ্ধ ও সৌদি সরকারের তেলেসমাতি

ছবি : আরএসএফ প্রধান হেমেদতি (বামে), সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল বুরহান (ডানে)

সুদানের এই সংকট একদিনের নয়। বহু আগ থেকে ব্রিটিশরা এই সংকটের গোড়াপত্তনকারী। আর এখন আমেরিকা এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করে যাচ্ছে।


সুদান আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। মিশরের দক্ষিণে এর অবস্থান। ১৮২০ সালে উসমানীয় শাসনের অধীনে আসে পুরো সুদান। উসমানীয়দের মিশরিয় গভর্নর ছিলেন মুহাম্মদ আলী পাশা। তার নেতৃত্বে সুদান উসমানীয় সাম্রাজ্যে যুক্ত হওয়ার পর উসমানীয় সুলতান মাহমুদ সানি আলী পাশার ছেলে তরুণ সেনানায়ক ইসমাঈল পাশাকে সুদানের গভর্নর করেন।

ইসমাঈল পাশার ছেলে তৌফিক ব্রিটিশদের সাথে ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়ে পড়ে। সুদানের পাশাপাশি মিশরেও ব্রিটিশদের প্রভাব বাড়তে থাকে। ১৮৭০ সালে মিশরে ব্রিটিশদের পরোক্ষ শাসন শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৭৯ সালে সুদানের শাসক ইসমাঈল পাশাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসে তারই ছেলে তৌফিক। তৌফিকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সেনাবাহিনী ও জনগণের একাংশ। তৌফিক ব্রিটিশদের সাহায্য কামনা করে। এভাবে ব্রিটিশ সৈন্যরা উসমানীয় শাসনে বিনাবাধায় ঢুকে পড়ে।

এ সুযোগে ব্রিটিশরা সুদান তো দখলে নিয়েই আসে তদুপরি ১৮৮২ সালে মিশরও দখল করে নেয়। এরপর সুদানে শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। এতে নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ আহমদ ইবনে আব্দুল্লাহ। ১৮৮৫ সালে সুদানে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল গর্ডনের পতন হয়। সুদান থেকে প্রত্যাহার করা হয় মিশরীয় ও ব্রিটিশ সৈন্য।

জিহাদি চেতনায় জনগণকে সংগঠিত করে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিপ্লব সাধন করেন। ক্ষমতায় আরোহণের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তিনি মারা যান। এরপর ক্ষমতায় আসেন তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ। তিনি নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন। আশেপাশে উসমানীয় অঞ্চল না থাকায় তারা কারো সাহায্য পায়নি। তবে সুদানে তারা যথেষ্ট শক্তি অর্জন করেন। সুদানের দক্ষিণ অঞ্চলের প্রতিবেশি ছিল খ্রিস্টান রাষ্ট্র ইথিওপিয়া। ইথিওপিয়া থেকে দীর্ঘদিন ধরে খ্রিস্টানরা সুদানে এসে দক্ষিণ সুদানের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে এসেছিল ব্রিটিশদের সহায়তায়।

আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে ইথিওপিয়া থেকে আক্রমণের হুমকি শুরু হয়েছিল। ফলে আব্দুল্লাহ ১৮৮৭ সালে প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য নিয়ে ইথিওপিয়ায় অভিযান চালায় এবং সীমান্তবর্তী বহু অঞ্চল দখলে নিয়ে আসেন। এর দুই বছর পর ১৮৮৯ সালে তিনি মিসরেও অভিযান চালায়। তবে মিসর অভিযানে তিনি ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হন। ১৮৯৩ সালে বেলজিয়াম ও ইতালিয়ানদের সহায়তায় ইথিওপিয়া তার দেশ থেকে থেকে সুদানিদের হটাতে সক্ষম হয়।

১৯৯০ সাল থেকে ব্রিটিশরা নানানভাবে সুদানে বার বার আক্রমণ চালিয়ে আসছিলো। অবশেষে বহু চেষ্টার পর ব্রিটিশরা ১৮৯৯ সালে আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে থাকা সুদানিদের পরাজিত করে। এরপর সুদান ব্রিটিশদের কলোনি হিসেবে পরিচিত হয়। ১৯২৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা সুদানকে দু’টি ভাগে ভাগ করে শাসন করত। দেশটির উত্তরাঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মধ্য থেকে গভর্নর করতো এবং দক্ষিণাঞ্চলে খ্রিষ্টানদের মধ্য থেকে গভর্নর করতো। ধীরে ধীরে ইথিওপিয়া থেকে খ্রিস্টানরা এসে দক্ষিণ সুদানের ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন করতে শুরু করলো। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সংখ্যালঘুতে পরিণত হলো। সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সংখ্যাগুরুতে পরিণত হতে থাকে।

ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই মিশরীয়রা দাবি করতে থাকে, মিশর ও সুদান এক রাষ্ট্র হবে। কিন্তু সুদানের নেতারা কোনোভাবেই মিশরের অধীনে যেতে রাজি ছিল না। এদিকে এই সমস্যা সমাধান হতে দেরি হওয়ায় মিশরের স্বাধীনতা বিলম্বিত হতে থাকে। ফলে মিশরের রাজনীতিবিদরা সুদানের দাবি ছেড়ে দিতে রাজি হয় এবং স্বাধীনতাকে তরাণ্বিত করে। ১৯৫৪ সালে মিশরীয়রা ব্রিটিশদের সাথে একটি চুক্তি করে। ওই চুক্তি অনুসারে ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি সুদান স্বাধীনতা লাভ করে। ইসমাইল আল আজহারি সুদানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক সুদানের প্রথম সরকারের নেতৃত্ব দেন।

তবে স্বাধীনতার এক বছর আগে ১৯৫৫ সালে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। খ্রিষ্টান অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলের আশঙ্কা, স্বাধীন সুদানে নেতৃত্ব দেবে উত্তরের মুসলমান জনগোষ্ঠী। কারণ উত্তরাঞ্চলের মুসলমানদের সাথে মিশরসহ আরব বিশ্বের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুদানের দক্ষিণাঞ্চলকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার ব্যবস্থা করে ব্রিটিশরা। কিন্তু মুসলিমরা এটা মেনে নেয়নি। এই সমস্যা নিয়ে প্রথম গৃহযুদ্ধ শুরু হয় সুদানে।

এরপর নানান পক্ষ তৈরি হয় সুদানে এবং মারাত্মক গোলযোগ শুরু হয়। ১৯৫৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলে। ১৯৮৯ সালের ৩০ জুন ওমর আল বশির একদল সামরিক কর্মকর্তার সমর্থন নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটান। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এই অভ্যুত্থানে ওমর আল বশির সাধারণ জনগণের একনিষ্ঠ সাপোর্ট পেয়েছেন। এর নেপথ্য নায়ক হাসান আল তুরাবি। তিনি সুদানের ইসলামপন্থী নেতা ছিলেন। হাসান তুরাবি ওমর আল বশিরকে সমর্থন দেন।

ওমর আল বশির সুদানে ইসলামি আইন চালু করেন। হাসান তুরাবিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী বানান। তার এই ঘোষণায় বেশিরভাগ মুসলিম যোদ্ধা তার আনুগত্য স্বীকার করে। তিনি সুদানে সুদ নিষিদ্ধ করেন। যে তিনটি রাষ্ট্রে সুদ নিষিদ্ধ এর মধ্যে সুদান একটি। বাকি দুইটি হলো ইরান ও পাকিস্তান।

পাঁচ বছরের মধ্যেই ওমর আল বশির পুরো সুদানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে সুদানের প্রেসিডেন্ট হন ওমর আল বশির। একমাত্র প্রার্থী ছিলেন তিনি নিজেই। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সুদানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। ওমর আল বশির ইসলামী আইন প্রচলন করলেও তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণ কিংবা শুরার তোয়াক্কা করতেন না। বলা যায় তিনি স্বৈরাচার ছিলেন। এদিকে তিনি হাসান তুরাবি তার এইসব কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলে হাসান তুরাবিকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে এরেস্ট করেন। হাসান তুরাবির অনুসারীদের ওপরও নির্যাতন চালানো হয়।

মূলত ওমর আল বশির মনে প্রাণে ইসলামিস্ট ছিলেন না। ক্ষমতা দখল করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য যখন হাসিল হলো তখন ইসলামপন্থীদের তিনি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। হাসান তুরাবির অনুসারীরা দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। বশিরের স্বৈরাচারী আচরণে তিনি জনগণের সমর্থন হারান। দেশের জনগণের সাপোর্ট না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিনি পশ্চিমাদের কাছে জিম্মি হয়ে যান।

আমেরিকার ইন্ধনে ও অস্ত্র সহায়তায় ২০০৩ সালে দারফুরের মুসলিমরা ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এর বেসিক কারণ ওমর আল বশির আমেরিকার কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেয়নি। যারাই আমেরিকা ইংল্যান্ডের সহযোগী হয় নাই তাদের দেশে জঙ্গীবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে আমেরিকা নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক চক্র। যেমন বাংলাদেশে জেএমবিকে নামিয়ে দিয়েছে।

এছাড়াও দারফুর সংকটের মূলে রয়েছে জাতিগত বিভেদ। ফুর, জাঘাওয়া ও মাসালিত এই তিন উপজাতি মিলে দারফুর লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করেন। সুদান সরকার দারফুরে থাকা আরেক যাযাবর উপজাতি জানজাউইদের সহায়তায় বিদ্রোহ খুব কঠোরভাবে দমন করেন। এই বিষয় নিয়ে ওমর আল বশির আন্তর্জাতিকভাবে বিপদে পড়ে যায়। দারফুর সমস্যা নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র চাদ সুদানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
সুদানের দারফুর এলাকায় বিদ্রোহ দমন করার জন্য বশিরের সরকার যতগুলো সশস্ত্র উপজাতি গোষ্ঠীকে মাঠে নামিয়েছিল, তার একটার নেতৃত্বে ছিলেন মুসা হিলাল নামের এক যুদ্ধবাজ নেতা। মুসা হিলাল দারফুরে তাঁর গ্রুপের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন মোহাম্মাদ হামদান হেমেদতি দাগালোকে। অল্প সময়ের মধ্যেই হেমেদতি নির্দয় ও নিষ্ঠুরতার জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠেন এবং তাঁরই নিয়োগদাতা হিলালের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে পড়েন।

দারফুরের বিপদকে পুঁজি আমেরিকা পুরাতন সমস্যা দক্ষিণ সুদানকে স্বাধীন করার প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০০৫ সালের ৯ জানুয়ারিতে ওমর আল বশির দক্ষিণ সুদানের নেতাদের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয়। "কমপ্রিহেনসিভ পিস এগ্রিমেন্ট" চুক্তি অনুসারে চুক্তির পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চল স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে এবং স্বাধীনতার জন্য ছয় বছর পর গণভোট হবে। কিন্তু চুক্তির পর দক্ষিণের এক নেতা বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলে দেশটিতে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

২০০৫ সালের ২৪ মার্চ দেশটিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এ বাহিনী মোতায়েনের বিরোধিতা করেন প্রেসিডেন্ট বশির। কিন্তু তার কিছু করার ছিল না। দেশের জনগণের সাপোর্ট না থাকলে বিদেশী সন্ত্রাসীদের খপ্পরে পড়ে যাওয়া খুবই সহজ। জনগণের সাপোর্ট ছিল বিধায় বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ হালে পানি পায়নি। জোট সরকার মাত্র দেড় বছরে জঙ্গীবাদের মূলোৎপাটন করতে সক্ষম হয়েছে।

২০০৯ সালে দারফুরে গণহত্যার অভিযোগ এনে ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি ২০১০ ও ২০১৫ সালের দুইটি নির্বাচনে বিজয়ী হন। যদিও তার সব নির্বাচন বাংলাদেশের হাসিনা মার্কা নির্বাচন। তার সর্বশেষ নির্বাচন বিরোধীরা বর্জন করে। ২০১১ সালে জানুয়ারিতে স্বাধীনতা ইস্যুতে দক্ষিণ সুদানে গণভোট হয় জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে। ৯৮% ভোট পড়ে স্বাধীন হওয়ার পক্ষে। ২০১১ সালের ৯ জুলাই দক্ষিণ সুদান একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন হয়।

২০১১ সালের পর থেকে সুদানের আর্থিক অবস্থা দিন দিন খুব খারাপ হতে থাকে। দক্ষিণ সুদান আলাদা হয়ে যাওয়ায় ওমর আল বশিরের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিতে থাকে রাজনীতিবিদ ও জনগণ। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট বশির একটি ডিক্রি জারি করে সব কটি সরকারপন্থী মিলিশিয়া গ্রুপকে এক করে আরএসএফ গঠন করেন এবং তার প্রধান হিসেবে হেমেদতিকে নিয়োগ দেন। এটা করতে অনুপ্রাণিত হন মূলত সৌদি আরবের চাপে। যখন আরব বসন্ত শুরু হয় তখন সব রাষ্ট্রেই ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় চলে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

হাসান তুরাবির দলও বশিরের বিরুদ্ধে গণভ্যত্থান করে ক্ষমতায় চলে আসতে পারে। এই ভয় দেখিয়ে মিলিশিয়া বাহিনীকে সরকারি বাহিনীতে রূপান্তর করা হয়। তবে শেষ রক্ষা হয় নি বশিরের। এই মিলিশিয়া বাহিনীই তাকে গ্রেপ্তার করে। আরএসএফ ইসলামপন্থীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালায়।

২০১৫ সালে সুদানের সবচেয়ে বড় বাহিনী হিসেবে আরএসএফ সৌদি আরবের হয়ে ইয়েমেনে যুদ্ধ করতে যায়। বলা বাহুল্য আরএসএফ সরাসরি অর্থায়ন পেতে থাকে সৌদি থেকে। ফলে বশিরকে আনুগত্য করার খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না আরএসএফের। ওই যুদ্ধে আরএসএফ ও সৌদির মধ্যে যে কর্মকর্তা মধ্যস্থতা করছিলেন, তিনিই হলেন আজকের সুদানি সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল বুরহান। তিনি এর আগে দারফুরে দীর্ঘ সময় হেমেদতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। হেমেদতি এবং বুরহান দুজনেই সৌদি এবং আমিরাতের নেতাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং ইয়েমেনে লড়াইরত নিজের মিলিশিয়া বাহিনীর কারণে হেমেদতির ভাগ্য খুলে যায়।

২০১৭ সালে সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক উপাদান হিসেবে আরএসএফকে স্বীকৃতি দিয়ে সুদানে একটি আইন পাস করা হয়। সে আইনে বলা হয়, আরএসএফ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত একটি বাহিনী হিসেবে কাজ করবে। বাহিনীটি সরাসরি প্রেসিডেন্টের আদেশাধীন থাকবে। এর কিছুদিন পরই সেনাবাহিনীর কাছে দুর্নীতি ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট বশির অবিশ্বস্ত হয়ে ওঠায় তিনি খার্তুমে আরএসএফকে একটি সেনাঘাঁটি গড়তে অনুমতি দেন। বশির আরএফএফের ওপর ভর করে বাঁচতে চান। ওই সময় থেকে হেমেদতি আরও ক্ষমতা ও সম্পদ কুক্ষিগত করতে থাকেন এবং অচিরেই সুদানের সবচেয়ে ধনী লোক হয়ে দাঁড়ান।

২০১৮ সালে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। এরকম বিক্ষোভ গত তিরিশ বছরে দেখেনি সুদান। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি এক বছর মেয়াদি জরুরি অবস্থা জারি করেন ওমর আল বশির। তার মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনেন এবং দেশের সব স্টেট সরকারের গভর্নরদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বসিয়ে দেন।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সুদানে তিন দশক ধরে দায়িত্ব পালন করা ওমর আল-বশিরকে ২০১৯ সালের এপ্রিলে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়৷জনগণের বিক্ষোভের পাশাপাশি এতে নেতৃত্ব দেন সেনাপ্রধান বুরহান ও আরএসএফ প্রধান হেমেদতি। এর তিন মাস পর দেশ পরিচালনায় সামরিক ও রাজনৈতিক দলের নিয়োগ দেয়া ব্যক্তিদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছিল৷প্রেসিডেন্ট হয়েছে জেনারেল বুরহান। ২০২৩ সাল শেষ হওয়ার আগে নির্বাচন আয়োজনের কথা ছিল তাদের৷ অন্তবর্তী সরকারে থাকা সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের মধ্যেকার দন্দ্ব গত দুই বছর ধরেই চলে আসছে।

ওমর আল বশিরের ক্ষমতাকালের শেষ কয়েক বছরে সুদানে যে বিভক্তি বাড়ছিল, ২০১৯ সালে তাঁর পতনের পর তা অধিকতর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। আজকের এই অবস্থা সেই বিশৃঙ্খলারই পরিণতি। প্রেসিডেন্ট বশিরের পতন সংকট কাটানোর বদলে আরও ঘনীভূত করেছে। বশিরের পতনের পর ২০১৯ সালে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সার্বভৌম পর্ষদ শাসনক্ষমতা নেয়। হেমেদতিকে এই পর্ষদের উপপ্রধান অর্থাৎ কার্যত ভাইস প্রেসিডেন্ট করা হয়। এটি হেমেদতির উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

বিক্ষোভকারী জনগণের চাপ ছিল নির্বাচন দেওয়ার। সৌদি আরব ও আরব আমিরাত হস্তক্ষেপ করে এই নির্বাচন বন্ধ করে। তারা চায় না কোনোভাবেই যাতে হাসান তুরাবির দল 'পপুলার কংগ্রেস পার্টি' ক্ষমতায় না আসতে পারে। এদিকে হেমেদতি আরএসএফকে সেনাবাহিনীর সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনি খার্তুম ও ১৭টি প্রদেশে শিবির গড়ে সেখানে প্রায় এক লাখ সেনার অবস্থান ঘটান। তাঁর পরবর্তী পরিকল্পনা ছিল মেরোই বিমানবন্দর দখল করে সেখানে বিমানঘাঁটি গড়ে তুলেন।

কয়েক বছর ধরে হেমেদতি সেনাবাহিনীর আদলে অস্ত্রাগার গড়ে চলেছেন। তাঁর অধীন পাইলটদের বিদেশে গিয়ে জঙ্গি বিমান চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তিনি তাঁর বাহিনীতে ফাইটার জেট যুক্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর একটা এয়ারফিল্ড দরকার ছিল। তাঁর সর্বশেষ লক্ষ্য ছিল সুদানের সশস্ত্র বাহিনী করায়ত্ত করা।

বর্তমান গৃহযুদ্ধ দুইটি কারণে।
১. নির্বাচনকে ঘিরে। অন্তবর্তী সরকারে থাকা কর্মকর্তারা চাপ দেয় নির্বাচন আয়োজন করার। প্রেসিডেন্ট জে. বুরহান সেটা মেনে নেয়। কিন্তু সৌদি-আমিরাত মদদপুষ্ট আরএসএফ প্রধান হেমেদতি এর বিরোধীতা করে।
২. আরএসএফ সৈন্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে। হেমেদতির দাবি হলো সে সহ তার বাহিনী সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হবে। বুরহান প্রেসিডেন্ট থাকবে কিন্তু সেনাপ্রধান হবে হেমেদতি। এটা মানতে ঘোর বিরোধী সুদানিজ সেনাবাহিনী।

এর প্রেক্ষিতেই সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। দুই পক্ষই পরষ্পরকেই নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। স্পষ্টতই তিনদিনের যুদ্ধে সেনাবাহিনী এগিয়ে আছে। হেমেদতি ব্যাকফুটে গেছে। এই অবস্থায় আবারো দৃশ্যপটে হাজির সৌদি আরব।

সৌদি এবং ইউএই ভয় পাচ্ছে এই লড়াইয়ে যদি হেমেদতি হারে তাহলে জেনারেল বুরহান হয়তো নির্বাচন দিয়ে দেবেন এবং সেই নির্বচনে ইসলামপন্থীরা জিতবে। প্রধানত সে কারণে সৌদিরা মধ্যস্থতা করতে উঠেপড়ে লেগেছে যাতে হেমেদতির আরএসএফ যেন টিকে থাকতে পারে।

তাছাড়া, ২০১৯ সালে বশিরের উৎখাতের পর প্রাকৃতিক সম্পদ এবং কৃষিতে সমৃদ্ধ সুদানে পা রাখার সুযোগ হয় সৌদি আরবের। গত বছর তারা সুদানের কৃষি এবং খনিজ সম্পদ উন্নয়নে ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে তারা।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইয়েমেনের সোকোটরা বন্দর থেকে হর্ন অব আফ্রিকার সোমালি-ল্যান্ড পর্যন্ত সাগরপথে বাণিজ্যিক নৌ পরিবহনের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইছে তারা। ডিসেম্বরে আবুধাবি বন্দর কর্তৃপক্ষ পোর্ট অব সুদানের ২০০ মাইল উত্তরে একটি নতুন বন্দর নির্মাণে ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের একটি চুক্তি করেছে।

রিয়াদে এই মীমাংসা বৈঠক আয়োজনের জন্য হেমেদতি সৌদি আরব এবং আমেরিকাকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। এখন মীমাংসা বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়, তার ওপর নির্ভর করবে সুদান স্থিতিশীল হবে কিনা?

১৭ জুন, ২০২২

শহীদ মুরসি : মিশরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট


আজ ১৭ জুন। শহীদ প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসির ৩য় শাহদাতবার্ষিকী। মুহাম্মদ মুরসি ছিলেন মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। সামরিক বাহিনী তাকে উৎখাতের আগে মাত্র এক বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা । 'আরব বসন্ত' নামে খ্যাত সরকার বিরোধী বিক্ষোভের পর ২০১২ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল তার মাধ্যমে মুহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ইতিহাসে এই প্রথম মিশর নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পায়।

২০১৩ সালের ৩রা জুলাই তাকে মিসরের সেনাবাহিনী উৎখাত করে। এটা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ ও আমেরিকার যৌথ এজেন্ডা। প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার চার মাস পরে, মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনের আরো ১৪জন ঊর্ধ্বতন নেতার সঙ্গে মোহাম্মদ মোরসির বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একজন সাংবাদিক ও দুইজন সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীকে হত্যায় প্ররোচনা দেবার অভিযোগ আনা হয় মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

শুনানির প্রথম দিনে মুহাম্মদ মুরসি কাঠগড়া থেকে চিৎকার করে বলেছিলেন, তিনি সেনা অভ্যুত্থানের শিকার এবং তার বিচার করার বৈধতা এ আদালতের নেই। সেনাপ্রধান আব্দুল ফাত্তাহ সিসি পরে হত্যার অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়, কিন্তু বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার ও দমনের অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। পরবর্তীতে মুরসির বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ আনা হয়, এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। যদিও পরে সে রায় বাতিল করা হয়েছিল। ২০১৯ সালের ১৭ই জুন বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুর সময় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তার বিচার চলছিল।

শহীদ মুহাম্মদ মুরসি ১৯৫১ সালে মিশরের শারকিয়া প্রদেশের আল-আদওয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭০ এর দশকে তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন, এরপর পিএইচডি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। মিশরে ফিরে এসে তিনি জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনে যোগ দেন তিনি এবং ক্রমে নেতৃত্বে আসেন। ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ পর্যন্ত এই দলের হয়ে মিশরের সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন।

সংসদ সদস্য হিসেবে ভালো বক্তা বলে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন অনেকবার, বিশেষ করে ২০০২ সালে এক রেল দুর্ঘটনার পর কর্মকর্তাদের নিন্দা করে তার দেয়া বক্তব্য খুবই আলোচিত হয়েছিল। ২০১২ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের ডেপুটি জেনারেল গাইড, মিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী খাইরাত আল-সাতেরকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়। এরপর মুসলিম ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকে মুরসিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। 

প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে জিতে ২০১২ সালের জুনে মিশরের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন মুহাম্মদ মুরসি। প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে জেতার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী সরকাররা প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে উৎখাত করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। কারণ তারা তাদের শাসনক্ষমতা নিয়ে চিন্তিত ছিল। তাদের প্ররোচনায় মুরসির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ তৈরি হয়। 

২০১২ সালের নভেম্বর থেকে জনরোষের প্রকাশ ঘটতে থাকে। এর সাথে জুড়ে যায় হোসনি মুবারকের সমর্থকরা ও ইসলামী রাজনীতির বিরোধী শক্তিরা। মুহাম্মদ মুরসি কুরআনের আলোকে সংবিধানের ঘোষণা দেওয়ায় সেক্যুলাররা তীব্র আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনকে পুঁজি করে জেনারেল আল সিসি ক্যু করে ক্ষমতা দখল করে। আন্তর্জাতিকভাবে সৌদি ও আমেরিকা মদদ দেয় জেনারেল সিসিকে।  

সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং নতুন স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসি মুরসিকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেন। তাকে গ্রেপ্তার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ তার কোন খোঁজ ছিল না। এরপর মুহাম্মদ মুরসি মুক্তি এবং তাকে অবিলম্বে ক্ষমতায় পুনরায় অধিষ্ঠিত করার দাবিতে কায়রোর রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার সমর্থক। এর রিরুদ্ধে স্বৈরাচার সিসি হাজার হাজার মানুষকে খুন করে। মিশরে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রায় সব শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী।

স্বৈরাচার খুনী ও সন্ত্রাসী আল সিসি মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে তাদের ওপর চালানো হয় ব্যাপক নিপীড়ন, এবং ফল হিসেবে হাজার হাজার ব্রাদারহুড কর্মী গ্রেফতার বা নিহত হন। অনেকে কাতার এবং তুরস্কে পালিয়ে যান। এরপর মুহাম্মদ মুরসিকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে যাওয়া হয়। মাঝেমধ্যে মামলার হাজিরা দিতে তাকে আদালতে আনা হলেই কেবল তাকে দেখা যেত। এরপর কারাগারে নির্যাতনে তিনি অসুস্থ হলে বিনা চিকিৎসায় তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।  

২০১৯ সালের ১৭ জুন তিনি কারাগারে শাহাদাতবরণ করেন। 

৩০ ডিসে, ২০২১

মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও ঢাকার ভাগ্য


আজ ৩০ ডিসেম্বর। উপমহাদেশের মুসলিমদের রাজনীতির জন্য আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯০৬ সালের এই দিনে ঢাকায় উপমহাদেশের মুসলিমরা ফুলস্কেলে রাজনীতি শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় এদেশের মুসলিমরা খ্রিস্টান ও মুশরিকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
 
আজ মুসলিম লীগের ১১৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে মুশরিকদের চরম মুসলিম বিদ্বেষের প্রেক্ষিতে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর বাসভবন 'আহসান মঞ্জিলে' সারা ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দ (প্রায় তিন হাজার) একত্রিত হন। তিন দিনের সম্মেলনের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন সুলতান মাহমুদ শাহ (আগা খান ৩)।
 
বঙ্গভঙ্গের ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক বর্ণহ্দিু সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানদের যে দ্বন্দ্ব, তার পটভূমিতে গঠিত হয় মুসলিম লীগ, বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বর্ণহিন্দুদের সাথে যে মানসিক বিচ্ছেদ তা কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদারের ভাষায়, “যদিও তারা একই দেশের মানুষ ছিল, তবুও এক ভাষা ছাড়া অন্য সব ব্যাপারে তারা বিভিন্ন ছিল। ধর্মে, শিক্ষায়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে আটশ’ বছর ধরে তারা বাস করেছে যেন দু’টি ভিন্ন পৃথিবীতে”। 

মুসলিম শাসনের শুরু থেকে কয়েক শতাব্দী বাংলাদেশের মুসলমান ও হিন্দুগণ, অভিন্ন ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক আবহাওয়ায় নিজেদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনাচরণ পদ্ধতি নিয়ে ধর্মীয় জীবনের স্বাতন্ত্র্য-চেতনা সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের লক্ষ্য অর্জনে আপাতদৃষ্টিতে বড় রকমের কোন দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করেনি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মীয় পার্থক্য তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে বিস্তার লাভ করে। ব্রিটিশ শাসনকে হিন্দুরা নিছক শাসক-বদলের ঘটনারূপে গ্রহণ করে। ইংরেজদের আস্থা ও অনুগ্রহ লাভের জন্য তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। রাতারাতি তাদের একটি শ্রেণী বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়। অন্যদিকে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র। তারা এই শাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে ‘রানীর বিদ্রোহী প্রজা’ রূপে অভিহিত হয়। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মুসলমানরা দরিদ্র হয়ে পড়ে। হিন্দুরা ইংরেজদের সমর্থনে পুষ্ট হয়ে তাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পরিচালনা করে। মুসলমানদের সংগ্রামে হিন্দুদের কোন সহানুভূতি ছিল না।

বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষপটে হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দুদের মাঝে সাম্প্রয়াদিক স্বাতন্ত্র্যবোধ তীব্র হয়। মুসলমানদের শক্ররূপে চিহ্নিত করে তাদের ওপর তারা নানামুখী হামলা পরিচালনা করে। গত শতাব্দির শুরুতে প্রশাসনিক কারণে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার ফলে বাংলাদেশের মুসলমানদের অবস্থার উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার বিরুদ্ধে হিন্দুদের মারমুখী সংগ্রাম হিন্দু-মুসলিত জাতি-স্বাতন্ত্র্যের দিকটিকে আরো প্রকটভাবে উপস্থিত করে।

মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন নিয়ে নবাব সলিমুল্লাহ একটি পরিকল্পনা নিয়ে সিমলায় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মধ্যে আলোচনা করেন। তাঁরা ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য শিক্ষা সম্মেলনে কনফেডারেসী বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু জমিদার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রবল আন্দোলনের পটভূমিতে ঢাকায় ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন শেষে সর্বভারতীয় মুসলিম প্রতিনিধিদের এক বিশেষ সভায় নওয়াব সলীমুল্লাহর প্রস্তাবক্রমে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়। ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর রবিবার ঢাকার শাহবাগে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বহু প্রতিনিধির এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করা হয় এবং বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের নিন্দা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। এভাবেই ভারতীয় মুসলমানগণ একটি নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করেন। এ রাজনৈতির ভিত্তি হলো জাতিস্বাতন্ত্রভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদ।

সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের উদ্দেশ্যাবলি ছিল মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা, ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানদের আনুগত্য রেখে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করা, ভারতীয় অন্যান্য সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তোলা। একটি মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহর পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য হিন্দুদের শক্তিশালী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এটাই ছিল মূল এবং প্রধান কারণ। 

ভারতীয় জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রসমূহ একটি দুর্বল সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগকে আখ্যায়িত করে। এসব সংবাদপত্র দ্রুত মুসলিম লীগের বিলুপ্তি ঘটবে বলে প্রচার চালায়। এটা সত্য যে প্রথম দিকে একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে লীগের গতিশীলতার অভাব ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় থেকে আসা এবং বৈপ্লবিক চিন্তাধারার তরুণ প্রজন্মের মুসলমানগণ মুসলিম লীগের রাজনীতিতে এগিয়ে আসেন। তারা ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের বিরোধিতা তো করেনই, অধিকন্তু ভারতে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত সরকার প্রতিষ্ঠারও দাবি করতে থাকেন।

১৯১০-এর দশকে মুসলিম লীগ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আদলে একটি নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ গ্রহণ করে। লক্ষ্ণৌ চুক্তি (১৯১৬) এবং খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের উন্নতি ঘটলে মুসলিম লীগ জড় ও স্থবির অবস্থায় পড়ে। ১৯২০-এর পর থেকে কয়েক বছর খেলাফত সংগঠনই মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষার সকল কাজ পরিচালনা করে।

১৯৩৫ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নেতৃত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সংগঠনটি রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি সফলতা পায়নি। অনেক মুসলমান নেতার অনুরোধের প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ লন্ডন হতে ভারতে ফিরে আসেন এবং মুসলিম লীগের সভাপতির পদ গ্রহণ করেন। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে জিন্নাহ মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখাসমূহ পুনর্গঠিত করে নতুন কাঠামো প্রদান করেন। নতুন কমিটিসমূহকে জনসংযোগ এবং আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।


মুসলিম লীগের ১ম সাফল্য ছিল আলাদা মুসলিম আসনের দাবি আদায় করা। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু মোটের ওপর ভালো সাফল্য পায়নি। মোট নয়টি প্রদেশে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ৪৮২টি আসনের মধ্যে লীগ ১০৪টি আসন লাভ করে। মোট প্রাপ্ত আসনের এক তৃতীয়াংশেরও অধিক (৩৬টি) শুধু বাংলাতেই অর্জিত হয়েছিল। মুসলিম লীগ আইন সভায় কংগ্রেসের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ধারণা করা হয় যে, বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয় ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমান পেশাদার ও মুসলমান ভূমি মালিক সম্প্রদায়ের যৌথ সমর্থনের ফল। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো তা হলো আলেম শ্রেণি বিশেষত দেওবন্দি ধারার আলেমরা মুসলিম লীগের কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকাতেই আগ্রহী ছিল।

১৯৩৭ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ.কে. ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং এর ফলে তার মন্ত্রিসভা কার্যত মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভায় পরিণত হয়। শেরে বাংলা ফজলুল হকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে বাংলাকে মুসলিম লীগের দুর্গে পরিণত করা হয়। বাংলার মুসলমানদের নেতা হিসেবে ফজলুল হক মুসলিম লীগের মঞ্চ থেকে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন আবাসভুমি দাবি করে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। 

গর্ভনর জন হার্বাট-এর পরামর্শে ফজলুল হক পদত্যাগ করলে খাজা নাজিমউদ্দীন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬-এর মধ্যে মুসলিম লীগ একটি যথার্থ জাতীয় সংগঠনে পরিণত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম এর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলার মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে দল ১১০টি আসন অর্জন করে। ফলে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, মুসলিম লীগই বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের একক সংগঠন। 

তখন পর্যন্ত কংগ্রেস প্রভাবাধীন একমাত্র উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ছাড়া ভারতের অন্যান্য মুসলমানপ্রধান প্রদেশসমূহে লীগের সাফল্য সমভাবে উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের সাফল্যের নায়ক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ভারতীয় মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। ব্রিটিশ কর্তৃক ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ক সকল আলোচনা ও চুক্তিতে মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কিত সকল বিষয়ে জিন্নাহর মতামত গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। লাহোর প্রস্তাবের ছয় বছর পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইন সভায় মুসলমান সদস্যদের দিল্লি কনভেনশনে ‘একটি মুসলমান’ রাষ্ট্রের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা অর্জিত হলে মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলমানদের প্রায় সকলের সংগঠনে পরিণত হয়।  

দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, যে ঢাকা থেকে মুসলিমদের রাজনীতির সূচনা সেই ঢাকা রাজনৈতিকভাবে মুশরিকদের কাছে হেরে গেছে। তবে আমরা আত্মবিশ্বাসী! হেরে যাওয়া শহর থেকেই গাজওয়ায়ে হিন্দের স্বপ্ন দেখি। কল্পনাবিলাস ভাবতে পারেন আপনারা কেউ কেউ। তবে জেনে রাখুন আমার নেতারা এজন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আমিও জীবন দিতে প্রস্তুত! এবং প্রস্তুত আমার মতো অনেকে। ইনশাআল্লাহ!


১২ নভে, ২০২১

হিরো থেকে যেভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়লেন ইয়াসির আরাফাত


এই আলোচনা শুরু করার জন্য একটু অতীত থেকে শুরু করা দরকার। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে। ১৮৮০ সালের দিকে ফিলিস্তিন ছিল তুর্কি সালতানাতের অধীনে। তখন ইউরোপিয়ানরা বিশেষত ব্রিটেন মুসলিমদের জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ঘটায়। আরব-অনারব ইস্যু তুলে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে। অভিজাত আরবরা নিজেদের সবসময় মুসলিমদের নেতা মনে করতো। এটাকে ব্যবহার করে তারা আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটায়। মুসলিমদের নেতা হিসেবে তারা তুর্কিকে অস্বীকার করতে থাকে।    


অন্যদিকে তখন ইহুদীরা বেশি ছিল রাশিয়া, জার্মানী ও পোল্যান্ডে। আর পুরো ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে তাদের অবস্থান ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সব রাষ্ট্রেই কমবেশি তারা নির্যাতিত হতো। তখন পৃথিবীতে সুপার পাওয়ার ছিল ব্রিটেন ও উসমানীয় সালতানাত। নির্যাতিত ইহুদীরা এই দুই রাষ্ট্রে পালিয়ে আসতে থাকে। ব্রিটেন শরনার্থীদের আশ্রয় দিতে না চাইলে সবাই একযোগে তুর্কি অঞ্চলে আসতে থাকে। তুর্কি সালতানাত তখন বিশাল। ইহুদী শরনার্থীরা বিচ্ছিন্নভাবে তুর্কি সালতানাতে প্রবেশ করে এবং যার যেখানে সুবিধা সেখানে বসবাস শুরু করে।


ইহুদীদের এই দুরবস্থা নিয়ে তাদের মধ্যে থাকা পণ্ডিতেরা কাজ শুরু করে। অনেকেই কাজ করেন, তবে এর মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন থিয়োডোর হার্জেল। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত তার পুস্তিকা 'ডের জুডেনস্টাটে' তিনি বিংশ শতাব্দীতে একটি ভবিষ্যৎ স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন দেখেন এবং এর জন্য তিনি স্থান নির্ধারণ করেন জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনকে।


তার এই পুস্তক ইহুদীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তবে কিছু ইহুদী এর বিরোধীতা করে। তাদের ধর্মীয় বিবেচনায় তাদের রাষ্ট্রগঠন তাদের ধ্বংসের কারণ হবে। এই গ্রুপ ছোট হলেও তারা এখনো বিদ্যমান। আবার কিছু ইহুদী রাষ্ট্রগঠনের বিরোধী ছিল এই মর্মে যে, তুর্কি খলিফা এই রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াতে রাগান্বিত হয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালাবে এবং তুর্কি থেকে উচ্ছেদ করবে এই ভয়ে। সেসময় ফিলিস্তিন অঞ্চল তুর্কি সালতানাতের মধ্যে অবস্থিত ছিল।


সব বাধা উপেক্ষা করে হার্জেল তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একনিষ্ঠ ছিল। ১৮৯৭ সে সর্বপ্রথম ইহুদী সমাবেশ করে এবং তার ধারণা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। তার এই রাষ্ট্রের পরিকল্পনা জায়নবাদ নামে পরিচিত হয়। হিব্রু ভাষায় জায়ন মানে জেরুজালেম। শুরুতে শুধু ইহুদীরাই শুধু জায়নবাদী থাকলেও এখন যারা ইহুদী রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান করে তারা সবাই জায়নবাদী হিসেবে পরিচিত। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে চাইলে যারা মনে করে (সে যে ধর্মেরই হোক না কেন) জেরুজালেম ইহুদীদের অধিকারে থাকবে তারাই জায়নবাদী।


এই জায়নবাদীদের একটি কুমিরের সাথে তুলনা করে সাবেক তুর্কি প্রধানমন্ত্রী ড. নাজিমুদ্দিন এরবাকান বলেন, //জায়নবাদ হল একটি কুমিরের মত।এর উপরের চোয়াল হল আমেরিকা আর নিচের চোয়াল হল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর জিহ্বা আর দাঁত হল ইসরাঈল। এবং এর শরীর সহ অন্যান্য অঙ্গসমূহ হল মুসলিমদেশ সমূহ সহ অন্যান্য রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী, মিডিয়া ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং এর সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংগঠন।//


থিওডোর হার্জেল ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জন্য কলোনী বা আবাসভূমি গঠনের প্রস্তাব নিয়ে তুর্কি সুলতান আব্দুল হামিদ সানির সাথে দেখা করে। বিনিময়ে উসমানীয় সালতানাতের একটি বড় ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। আব্দুল হামিদ তাতে রাজি হননি এবং তাদের দেশ দখলের পরিকল্পনা বুঝতে পেরে জেরুজালেম ও তার আশে পাশে জমি বিক্রয় নিষিদ্ধ করে দেন।


১৯০৪ সালে হার্জেলের মৃত্যুর পর জায়নবাদকে নেতৃত্ব দেন ইহুদী ধনকুবের ও ব্যাংক ব্যবস্থার প্রবর্তক ব্যারন রথচাইল্ড। এদিকে উসমানীয় সালতানাত ভাঙতে মরিয়া ছিল ব্রিটেন। মুসলিমদের ঐক্য নষ্ট করে তারা। সালতানাতের বিরুদ্ধে আরব জাতীয়তাবাদকে জাগ্রত করে। তাদেরকে বুঝানো হয় অনারব তুর্কি ছোট জাত। তাদের অধিকার নেই আরব মুসলিমদের নেতৃত্ব দেওয়ার। আরবদের কাছেই নবী এসেছে তাই আরবরাই মহান। নেতৃত্বের হকদার তারা। ব্রিটেন আরব নেতা শরীফ হুসেইনকে মুসলিম বিশ্বের নেতা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।


অন্যদিকে উসমানীয় ভূমি দখলের পর ভাগ বাটোয়ারা করে ফ্রান্স ও রাশিয়ার সাথে রিভাল চুক্তির মাধ্যমে। আর ইহুদীদের সাথে চুক্তি করে জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে তাদেরকে একটি রাষ্ট্র তৈরিতে সাহায্য করবে। এই বিষয়ে ব্রিটেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী বেলফোর জায়নবাদী নেতা রথচাইল্ডকে একটি পত্র দেন, যা বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত।


মোটকথা ব্রিটেন আরব নিয়ে একইসাথে তিন পক্ষের সাথে তিনটি চুক্তি করে


(ক) বৃটেন আরব নেতাদের আশ্বাস দিল, তারা কুরাইশ বংশের শরীফ হুসেইনের মাধ্যমে আরব রাজ্যের কর্তৃত্ব পাবে।

(খ) ফ্রান্স এবং বৃটেন চুক্তি করলো, ঠিক ঐ এলাকাগুলোই বৃটেন এবং ফ্রান্স ভাগ করে নিবে। সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান পাবে ফ্রান্স অন্যদিকে হেজাজ, ফিলিস্তিন, জেরুজালেমসহ বাকী আরব ব্রিটেন পাবে।

(গ) জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ইহুদীদের একটি রাষ্ট্রগঠনের সুযোগ দেওয়া হবে।


১ম বিশ্বযুদ্ধে ফিলিস্তিনের আরব জাতীয়তাবাদী মুসলিমরা ব্রিটেনকে সাপোর্ট করে। তাদের সহায়তায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স সহজে মধ্যপ্রাচ্য দখল করে। উসমানীয় সৈন্যরা পরাজিত হয়ে চলে যায়। অন্যদিকে ইহুদীরা চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটেনকে প্রযুক্তিগত, আর্থিক ও গোয়েন্দা সুবিধা দেয়। প্রসঙ্গত বলে রাখি উসমানীয় সরকারে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইহুদী গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিল। এর ফলে রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্রিটেনের কাছে চলে যেত। ১ম বিশ্বযুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে উসমানীয় সেনাদের পরাজয়ে জাতীয়তাবাদী মুসলিমরা ও ইহুদীরা ভালো ভূমিকা রেখেছে। তাই এই ফ্রন্টে সহজেই ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সেনারা জয়লাভ করে।


১৯১৭ সালে থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ভূমি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইহুদীদের কাছে ব্রিটেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে ফিলিস্তিনের জমিতে তাদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ করে দিবে। সেজন্য ইহুদীরা কাজ করতে থাকে। সারাবিশ্ব থেকে চাঁদা তুলে ইহুদীরা ফিলিস্তিনের গরিব মুসলিমদের থেকে জমি ক্রয় করা শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে জোর করেও দখল নিতে থাকে। সারা পৃথিবীকে উদ্বাস্তু ইহুদীদের ফিলিস্তিনে আনা হয় ও তাদের পুনর্বাসন করা হয়।


সিরিয়া থেকে আসা উসমানীয় সেনা কমান্ডার ইজেদ্দিন আল কাসসাম ব্রিটেন ও ইহুদীদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন ও পরে সশস্ত্র আন্দোলন করেন। তিনি মুসলিমদের জমি বিক্রয়ের ব্যাপারেও সতর্ক করেন। 


১৯৩৩ সালের পর থেকে জার্মানির শাসক হিটলার ইহুদিদের প্রতি কঠোর হতে শুরু করেন। ইতোমধ্যে জাহাজে করে সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার ইহুদি অভিবাসী ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে আসতে থাকে। তখন ফিলিস্তিনী আরবরা বুঝতে পারে যে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।


ইহুদীবাদীদের তিনটি সন্ত্রাসী সংগঠন ছিল হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং। যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে। আল কাসসাম তাদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৩৫ সালে এক খন্ডযুদ্ধে আল কাসসামকে খুন করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী।


আল কাসসামের শাহদাতের মধ্য দিয়ে আরব জাতীয়তাবাদী মুসলিমদের টনক নড়ে। ১৯৩৬-১৯৩৯ সালে ফিলিস্তিনী আরবরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিদ্রোহ করে। কিন্তু আরবদের সে বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করেছে ব্রিটিশ সৈন্যরা।


বরাবরের মতো ব্রিটেন আরব এবং ইহুদী- দু'পক্ষকেই হাতে রাখতে চেয়েছে। ১৯৩৯ সালের মাঝামাঝি ব্রিটেনের সরকার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে যেখানে বলা হয়েছিল পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য পঁচাত্তর হাজার ইহুদি অভিবাসী আসবে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে। অর্থাৎ সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছিল। ব্রিটেনের এ ধরনের পরিকল্পনাকে ভালোভাবে নেয়নি ইহুদীরা। তারা একই সাথে ব্রিটেন এবং আরবদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিকল্পনা করে।


১৯৪০ সালে ৩২ হাজার ইহুদি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত ছিল। সেই ইহুদি সৈন্যরা বিদ্রোহ করে ব্রিটেন এবং আরবদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। এদিকে ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেন ইহুদীদের সব দাবি মেনে নিয়ে আপাতত বিদ্রোহ থামায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের বাহিনীর দ্বারা বহু ইহুদি হত্যাকাণ্ডের পর নতুন আরেক বাস্তবতা তৈরি হয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর যেসব ইহুদি বেঁচে ছিলেন তাদের জন্য জন্য কী করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।


তখন ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে ইহুদীদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা আরো জোরালো হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন পৃথিবীতে তার একক কতৃত্ব হারায়। নতুন পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার উত্থান হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইসরায়েল রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। ট্রুম্যান চেয়েছিলেন হিটলারের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক লক্ষ ইহুদিকে অতি দ্রুত ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে জায়গা দেয়া হোক। কিন্তু ব্রিটেন বুঝতে পারছিল যে এতো বিপুল সংখ্যক ইহুদিদের ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে নিয়ে গেলে সেখানে গৃহযুদ্ধ হবে।


ব্রিটেনের গড়িমসি দেখে ইহুদিদের সশস্ত্র দলগুলো ব্রিটিশ সৈন্যদের উপর ফিলিস্তিনের বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালানো শুরু করে। তখন ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে জাহাজে বোঝাই হয়ে আসা হাজার-হাজার ইহুদিদের বাধা দেয় ব্রিটিশ বাহিনী। কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। ইহুদি সশস্ত্র দলগুলো ব্রিটিশ বাহিনীর উপর তাদের আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি পরিস্থিতির তৈরি করা যাতে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ব্রিটেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। তখন সমাধানের জন্য ব্রিটেনের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এরপর বাধ্য হয়ে ব্রিটেন বিষয়টিকে জাতিসংঘে নিয়ে যায়।


১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে দু'টি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। একটি ইহুদিদের জন্য এবং অন্যটি আরবদের জন্য। ইহুদিরা মোট ভূখণ্ডের ১০ শতাংশের মালিক হলেও তাদের দেয়া হয় মোট জমির অর্ধেক। স্বভাবতই আরবরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তারা জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়। কিন্তু ফিলিস্তিনীদের ভূখণ্ডে তখন ইহুদিরা বিজয় উল্লাস শুরু করে। অবশেষে ইহুদিরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেল। কিন্তু আরবরা অনুধাবন করেছিল যে কূটনীতি দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদীরা রাষ্ট্র গঠন করতে পারলেও মুসলিমরা তা পারেনি। ইহুদিরা সংগঠিত হয়ে গেল। অন্যদিকে মুসলিমদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা ছিল না। শরীফ হুসেইন জর্ডানের নেতৃত্ব পেয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। 


ইসরাঈল রাষ্ট্র গঠনের পর আরব এবং ইহুদিদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ইহুদিদের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল তাদের বিচক্ষণ নেতৃত্ব। এর বিপরীতে আরবদের কোন নেতৃত্ব ছিলনা। ইহুদীরা বুঝতে পেরেছিল যে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পর আরবরা তাদের ছেড়ে কথা বলবে না। সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য আগে থেকেই তৈরি ছিল ইহুদীরা। জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরব-ইহুদী সংঘর্ষ বেধে যায়। যেহেতু আরবদের মধ্যে কোন সমন্বয় ছিল না সেজন্য ইহুদিরা একের পর এক কৌশলগত জায়গা দখল করে নেয়। ইহুদিদের ক্রমাগত এবং জোরালো হামলার মুখে ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে ফিলিস্তিনীরা। তারা বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে থাকে।


তখন ফিলিস্তিনের একজন নেতা আল-হুসেইনি সিরিয়া গিয়েছিলেন অস্ত্র সহায়তার জন্য। কিন্তু তিনি সাহায্য পাননি। এদিকে সিরিয়া, হেজাজ, মিশর, জর্ডান, লেবানন, ইরাক ইত্যাদি আরব অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী মুসলিমরা আলাদা আলাদা রাষ্ট্রগঠন করে ব্রিটেনের অনুগত হয়েছে। জেরুজালেমে চলা দাঙ্গার মধ্যে ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যায় ব্রিটেন। একই দিন তৎকালীন ইহুদি নেতারা ঘোষণা করেন যে সেদিন রাতেই ইহুদি রাষ্ট্রের জন্ম হবে।


ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের এক ঘন্টার মধ্যেই আরবরা আক্রমণ শুরু করে। একসাথে পাঁচটি আরব দেশ ইসরায়েলকে আক্রমণ করে। মিশর, ইরাক, লেবানন, জর্ডান এবং সিরিয়া। তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো। অন্যদিকে ইসরায়েলের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫ হাজার। তীব্র লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ইসরায়েলি বাহিনী পিছু হটতে থাকে। তাদের অস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যায়। সম্ভাব্য পরাজয় আঁচ করতে পেরে ইহুদিরা নিজেদের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য সময় নেয়। আর কিছুদূর অগ্রসর হলেই মিশরীয় বাহিনী তেল আবিবের দিকে অগ্রসর হতে পারতো। তখন আমেরিকা জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে।


যুদ্ধবিরতির সময় দু'পক্ষই শক্তি সঞ্চয় করে। কিন্তু ইসরায়েল বেশি সুবিধা পেয়েছিল। তখন চেকোস্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্রের চালান আসে ইসরায়েলের হাতে। যুদ্ধবিরতি শেষ হলে নতুন করে আরবদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরাঈলী বাহিনী। একর পর এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয় ইহুদীরা। তেল আবিব এবং জেরুজালেমের উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। রাষ্ট্র গঠনের সময় জাতিসংঘ ইসরাঈলকে ফিলিস্তিনের ৫০% জমি দিলেও ইহুদীরা ক্রমাগত তাদের জমি বাড়াতে থাকে। যুদ্ধ হলে ভূমি বাড়ানোর প্রক্রিয়া কিছুদিন বন্ধ থাকে। আর পরিস্থিতি শান্ত হলে ভূমি অধিগ্রহণ বাড়াতে থাকে।


ইসরাঈল রাষ্ট্রগঠন করতে সক্ষম হলেও ফিলিস্তিনে কোনো রাষ্ট্র গঠিত হয়নি। ফিলিস্তিনে কোনো নেতা ছিল না যার মাধ্যমে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র গঠন করবে। ১৯৫৯ সালে ৩০ বছর বয়সী ইয়াসির আরাফাত জাতির মুক্তিকামী নেতা হিসেবে আবির্ভাব হন। এই তরুণের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনের মুসলিমরা একত্রিত হয়। 


ইয়াসির আরাফাত ছিল তার রাজনৈতিক নাম। তার মূল নাম মুহাম্মদ আবদেল রহমান আব্দেল রউফ আরাফাত আল-কুদওয়া আল-হুসেইনী। ডাক নাম আবু আম্মার। তার জন্ম ও বাড়ি হলো মিশরের কায়রোতে। জেরুজালেম ছিল তার নানার বাড়ি। কায়রোতে পড়াশোনা করার সময় তিনি আরব জাতীয়তাবাদী ধারণা লাভ করেন ও জায়নবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করেন। পড়াশোনা শেষে জেরুজালেমে আসেন ও ফিলিস্তিনীদের একত্র করে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (PLO) নামে একটি সংগঠন কায়েম করেন।  


তার এই সংগঠন কায়েমের আগে তিনি ছাত্রদের নিয়েও কয়েকটি সংগঠন কায়েম করেছিলেন। PLO অল্প সময়ের মধ্যেই আরবদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তার নেতৃত্বে মুসলিমরা ঘুরে দাঁড়ায়। মূলত PLO থাকার কারণে ফিলিস্তিন থেকে মুসলিমরা হারিয়ে যায় নি। তারা সংগ্রাম করার একটি অবলম্বন পেয়েছিলো। ইয়াসির আরাফাত হয়ে ওঠেন ফিলিস্তিনীদের প্রাণপ্রিয় নেতা।  


১৯৬৭ সালে যুদ্ধে লজ্জাজনকভাবে হারের পর ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদী দল ফাতাহর নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে PLO গেরিলা সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়। তারা ইসরাঈলীদের সীমানা বাড়ানোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জায়নবাদীরা নতুন ইহুদি বসতি স্থাপন করতে গেলে PLO তাদের সাথে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হতো। ১৯৮০ সাল থেকে ইসরাঈলের বিরুদ্ধে পিএলও এর নেতৃত্বে ইন্তিফাদা শুরু করে। প্রতিষ্ঠা সময় থেকে পিএলও জর্ডানের সাহায্য পেয়ে আসছিল। পশ্চিমা বিশ্বের চাপে জর্ডান পিএলওকে বের করে দেয়। এরপর ইয়াসির আরাফাত লেবানন থেকে সংগ্রাম পরিচালনা করেন। সেখান থেকেও তারা বহিষ্কৃত হন। 


১৯৮০ সালের পর থেকে আরবের রাষ্ট্রসমূহ ইসরাঈলকে মেনে নেয় ও জায়নবাদীদের হাতিয়ারে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে পিএলও-এর সংগ্রাম ব্যর্থ হতে থাকে। এর কারণ PLO-এর বহু নেতা ইসরাঈলী অর্থ, নারী ও সুযোগ সুবিধার কাছে বিক্রি হয়ে যায়। ইহুদী চক্রান্ত ও প্রলোভনে ইয়াসির আরাফাত ও তার দল বার বার পর্যদস্তু হলে ১৯৮৭ সালে হামাস গঠিত হয়। এরা মিশরের ইসলাম্পন্থী মুসলিম ব্রাদারহুড দ্বারা সংগঠিত হয়। হামাস দ্রুতই জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইসলামপন্থী হামাসের উত্থান দেখে ইসরাঈল ফাতাহকে সমর্থন দেয়। তাদেরকে সরকার গঠন করার সুযোগ দেয়। প্রায় ৪১ বছর পর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হয়। ১৯৯৩ সালে অস্ত্র সমর্পন করে PLO। বিনিময়ে তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র পুনর্গঠনে ইসরাঈল আমেরিকা সহ সকল জায়নবাদীদের থেকে সুবিধা পায়। এভাবে একটি পঙ্গু রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের জন্ম হয়, যার কোনো সার্বভৌমত্ব ছিল না। এটি অসলো চুক্তি নামে পরিচিত। 


এই ভাঁওতা চুক্তির জন্য পশ্চিমা বিশ্ব ইয়াসির আরাফাতকে শান্তিতে নোবেল প্রাইজ দেয়। কিন্তু এর ফলে ইয়াসিরের জনপ্রিয়তা বাড়েনি বরং কমেছে। কারণ রাষ্ট্র গঠনের পর ফিলিস্তিনে বিনা বাধায় ইহুদি বসতি স্থাপন করতে থাকে ইসরাঈল। আগে তো প্রতিরোধ করা যেত। অস্ত্র সমর্পনের মাধ্যমে ইয়াসির আরাফাত ফিলিস্তিনের মুসলিমদের একেবারে নিরাপত্তাহীন করে ফেলেছেন। দ্রুতই মুসলিমরা উচ্ছেদ হতে থাকে তাদের বাড়ি থেকে। ইয়াসির জায়নবাদীদের পাপেটে পরিণত হন। 


অন্যদিকে হামাস তার সশস্ত্র প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। ফলে হামাস জনপ্রিয় হতে থাকে। ২০০০ সালে টিকতে না পেতে ফাতাহ (পিএলও-এর পরিবর্তিত নাম) ২য় ইন্তিফাদা শুরু করে। এটি ব্যাপক আকার ধারণ করে। ফাতাহ আবার অস্ত্র হাতে নেয়। ইয়াসির আরাফাতকে কোণঠাসা করে ফেলে পশিমা বিশ্ব। ইসরাঈল তাকে গৃহবন্দী করে। ২০০৪ সালে বিষ প্রয়োগে খুন করা হয় ইয়াসির আরাফাতকে। ধারণা করা হয় তার খ্রিস্টান স্ত্রী তাকে বিষ প্রয়োগ করেছে জায়নবাদীদের প্ররোচনায়। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনীদের ঐক্যের প্রতীক। তাকে খুন করতে পারলেই ফিলিস্তিনীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। 


২০০৬ সালের নির্বাচনে ফিলিস্তিনে নিরঙ্কুশ বিজয় পায় হামাস। কিন্তু সরকার গঠন করার পর মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে ফাতাহ হামাসের সাথে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। ফাতাহকে অস্ত্র ও অর্থের যোগান দেয় ইসরাঈল। অবশেষে ২০০৭ সালে হামাস মুসলিমদের রক্তক্ষয় এড়াতে গাজার একক নিয়ন্ত্রণ নেয় ও পশ্চিম তীর ফাতাহকে ছেড়ে দেয়। পশ্চিম তীরে সরাসরি না হলেও গোপনে হামাস সক্রিয় রয়েছে। আন্দোলন ও বিক্ষোভে পশ্চিম তীরের মানুষ হামাসের আনুগত্য করে। এভাবে কার্যত ফিলিস্তিন দুইভাগ হয়ে পড়ে। একইসাথে ফাতাহ, ইয়াসির আরাফাত ও মাহমুদ আব্বাসরা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। 


আমরা ফিলিস্তিনী যাদেরকে ইট পাথর নিক্ষেপ করতে দেখি তারা মূলত পশ্চিম তীরের জনগণ। তাদের কাছে অস্ত্র নেই। সেই অঞ্চলে প্রায়ই মুসলিমরা উচ্ছেদের শিকার হয়। অন্যদিকে গাজার লোকেরা অবরুদ্ধ হলেও গাজার অভ্যন্তরে ইসরাঈলীদের কোনো প্রবেশাধিকার নেই। তারা সেখানে ভূমি দখল বা বসতি স্থাপন করতে পারে না। হামাস ধীরে ধীরে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করছে। ২০১৪ সাল ও ২০২১ সালে তারা সরাসরি যুদ্ধ করে ইসরাঈলকে ভালো জবাব দিতে সক্ষম হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ইসরাঈলের সীমানা বাড়ানোর প্রচেষ্টা রুখে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে হামাস যদি পার্শ্ববর্তী আরব রাষ্ট্রগুলোর সহায়তা পায় তবে ইসরাঈলকে দমন করা সহজ হবে।