ঘটনাবহুল কুরআন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ঘটনাবহুল কুরআন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৪ জানু, ২০২৪

শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দোয়া


ফিলিস্তিনে মূসা আ.-এর মৃত্যুর পরে কিছুদিন পর্যন্ত বনী ইসরাঈল সত্যের উপরেই ছিল। অতঃপর তারা শিরক ও বিদআতের মধ্যে নিমজ্জিত হযলো। আল্লাহ তায়াল ক্রমাগত তাদের মাঝে নবী পাঠান। কিন্তু যখন তাদের অন্যায় কার্যকলাপ সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের শত্রুদেরকে তাদের উপর জয়যুক্ত করে দেন। তাদের শত্রুরা অর্থাৎ আমালিকরা তাদের বহু লোককে হত্যা করলো, বহু বন্দী করলো এবং তাদের বহু শহর দখল করে নিলো। 

সামুয়েল নবী তখন ছিলেন বনী ইসলাঈলের শাসক। কিন্তু তিনি বার্ধক্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাই ইসরাঈলী সরদাররা অন্য কোন ব্যক্তিকে নিজেদের নেতা বানিয়ে তার অধীনে যুদ্ধ করার প্রয়োজন অনুভব করছিল। কিন্তু তখন বনী ইসরাঈলদের মধ্যে অজ্ঞতা এত বেশী বিস্তার লাভ করেছিল এবং তারা অমুসলিম জাতিদের নিয়ম, আচার-আচরণে এত বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়েছিল যে, খিলাফত ও রাজতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্যবোধ তাদের মন-মস্তিষ্ক থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই তারা একজন খলীফা নির্বাচনের নয় বরং বাদশাহ নিযুক্তির আবেদন করেছিল। 

এই ঘটনা বাইবেলে এভাবে বর্ণিত আছে, //সামুয়েল সারা জীবন ইসরাঈলীদের মধ্যে সুবিচার করতে থাকেন। আমালিকদের হামলার পর সব ইসরাঈলী নেতা একত্র হয়ে রামা'তে সামুয়েলের কাছে আসে। তারা তাঁকে বলতে থাকে, দেখো, তুমি বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে পড়েছো এবং তোমার ছেলে তোমার পথে চলছে না। এখন তুমি কাউকে আমাদের বাদশাহ নিযুক্ত করে দাও, যে অন্য জাতিদের মতো আমাদের প্রতি সুবিচার করবে। 

একথা সামুয়েলের খারাপ লাগে। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ তায়ালা সামুয়েলকে বলেন, এই লোকেরা তোমাকে যা কিছু বলছে, তুমি তা মেনে নাও কেননা তারা তোমার নয়, আমারই অবমাননা করেছে। আমার বাদশাহীকে তারা মানতে চায় না। 

সামুয়েল তাদেরকে (যারা তাঁর কাছে বাদশাহ নিযুক্তির দাবী নিয়ে আসেছিল) বললেন, 
যদি বাদশাহ নিযুক্ত হয়, তবে সে তোমাদের ওপর রাজত্ব করবে। তার নীতি এই হবে যে, সে তোমাদের পুত্রদের নিয়ে যাবে। তার রথ ও বাহিনীতে চাকর নিযুক্ত করবে এবং তারা তার রথের আগে আগে দৌঁড়াতে থাকবে। সে তাদেরকে সহস্রজনের ওপর সরদার ও পঞ্চাশ জনের ওপর জমাদার নিযুক্ত করবে এবং কাউকে কাউকে হালের সাথে জুতে দেবে, কাউকে দিয়ে ফসল কাটাবে এবং নিজের জন্য যুদ্ধাস্ত্র ও রথের সরঞ্জাম তৈরী করাবে। আর তোমাদের কন্যাদেরকে পাচিকা বানাবে। 

তোমাদের ভালো ভালো শস্যক্ষেত্র, আংগুর ক্ষেত ও জিতবৃক্ষের বাগান নিয়ে নিজের সেবকদের দান করবে এবং তোমাদের শস্যক্ষেত ও আংগুর ক্ষেতের এক দশমাংশ নিয়ে নিজের সেনাদল ও সেবকদের দান করে দেবে। তোমাদের চাকর-বাকর, ক্রীতদাসী, সুশ্রী যুবকবৃন্দ ও গাধাগুলোকে নিজের কাজে লাগাবে এবং তোমাদের ছাগল-ভেড়াগুলোর এক দশমাংশ নেবে। সুতরাং তোমরা তার দাসে পরিণত হবে। 

সেদিন তোমাদের এই বাদশাহ, যাকে তোমরা নিজেদের জন্য নির্বাচিত করবে তার কারণে তোমরা ফরিয়াদ করবে কিন্তু সেদিন আল্লাহ তোমাদের কোনো জবাব দেবেন না। তবুও লোকেরা সামুয়েলের কথা শোনেনি। তারা বলতে থাকে, না আমরা বাদশাহ চাই, যে আমাদের ওপর কর্তৃত্ব করবে। তাহলে আমরাও অন্য জাতিদের মতো হবো। আমাদের বাদশাহ আমাদের মধ্যে সুবিচার করবে, আমাদের আগে আগে চলবে এবং আমাদের জন্য যুদ্ধ করবে।// 

সামুয়েল আ. তাদেরকে আরেকটি বিষয়ে সাবধান করেছিলেন যে, যদি বাদশাহ তাদের জিহাদ করতে বলে তবে কি তারা জিহাদ থেকে পালিয়ে যাবে? মূলত বনী ইসরাইলের বেশিরভাগ লোক যুদ্ধ না করেই আমালিকদের (আমুন মুর্তির পূজারী) হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। ওরা ভেবেছিল একজন বাদশাহ তাদের ওপর নিযুক্ত করলে সে তার সৈন্যবাহিনী দিয়ে তাদের উদ্ধার করবে। 

নবী সামুয়েলের প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেছিল, আমাদের সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং আমাদের সন্তানাদিকে বন্দী করা হয়েছে। আমরা কি এতই কাপুরুষ যে তবুও আমরা মৃত্যুর ভয়ে জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নেবো? তখন জিহাদ ফরয করে দেওয়া হলো এবং তাদেরকে  বাদশাহর সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে গমন করতে বলা হলো। 

আল্লাহর নবীকে রেখে তারা অন্য কাউকে নেতা হিসেবে চাওয়ায় আল্লাহ তায়ালা তাদের পরীক্ষাকে আরো কঠিন করে দেন। আল্লাহ তা'আলার নির্দেশক্রমে নবী সামুয়েল আ. একজন সাধারণ সৈনিক অথচ ঈমানদারকে (তালুত)তাদের সামনে বাদশাহরূপে পেশ করলেন। তিনি সম্ভ্রান্ত বংশের ছিলেন না বরং একজন সৈনিক ছিলেন। ইয়াহূদার সন্তানেরা ছিল সম্ভ্রান্ত লোক এবং তালুত এদের মধ্যে ছিলেন না। তাই ইহুদীরা প্রতিবাদ করে বললো যে, তার অপেক্ষা তারাই রাজত্বের দাবীদার বেশী। দ্বিতীয় কথা এই যে, তিনি দরিদ্র ব্যক্তি। তাঁর কোন ধন-মাল নেই। 

নবীর আদেশের সামনে তাদের এই প্রতিবাদ ছিল প্রথম বিরোধিতা। নবী আঃ উত্তর দিলেন, এই নির্বাচন আমার পক্ষ হতে হয়নি যে, আমি পুনর্বিবেচনা করবো। বরং এটা তো স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ। সুতরাং এই নির্দেশ পালন করা অবশ্য কর্তব্য। তাছাড়া এটাতো প্রকাশমান যে, তিনি তোমাদের মধ্যে একজন বড় আলেম, তার দেহ সুঠাম ও সবল, তিনি একজন বীর পুরুষ এবং যুদ্ধ বিদ্যায় তাঁর পারদর্শিতা রয়েছে।

সামুয়েল আ. আরো বলেন, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলাই হচ্ছেন মহাবিজ্ঞ এবং সাম্রাজ্যের প্রকৃত অধিকর্তা তিনিই। সুতরাং তিনি যাকে ইচ্ছে করেন তাকেই রাজত্ব প্রদান করে থাকেন। তিনি হচ্ছেন সর্বজ্ঞাতা ও মহাবিজ্ঞানময়। কার এই ক্ষমতা রয়েছে যে, তার কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করে! তিনি যাকে চান নিজের নিয়ামত দ্বারা নির্দিষ্ট করে থাকেন, তিনি মহাজ্ঞানী। সুতরাং কে কোন জিনিসের যোগ্য এবং কোন জিনিসের অযোগ্য এটা তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন।

নবী আ. তাদেরকে বলেন- 'তালূতের রাজত্বের প্রথম বরকতের নিদর্শন এই যে, সেই সিন্ধুকটি তোমরা ফিরিয়ে পাবে, যার মধ্যে রয়েছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য মানসিক প্রশান্তির সামগ্রী। যার ভিতরে রয়েছে পদমর্যাদা, সম্মান, মহিমা, স্নেহ, ও করুণা। তার মধ্যে রয়েছে আল্লাহর নিদর্শনাবলী যা তোমরা ভালভাবেই জান। অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই হারানো সিন্ধুক নব নিযুক্ত বাদশাহ তালুতের কাছে চলে এলো। এতে বনী ইসরাঈলের লোকেরা তালুতের আনুগত্য মেনে নিলো। 

 যখন লোকেরা তালূতকে বাদশাহ বলে মেনে নিলো তখন তিনি তাদেরকে নিয়ে যুদ্ধে বের হলেন। তালূত তাদেরকে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন। হযরত ইবনে আব্বাসের রাঃ উক্তি অনুসারে এই নদীটি উরদুন ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত ছিল। ঐ নদীটির নাম ছিল 'নাহরুশ শারীআহ। তালুত তাদেরকে সতর্ক করে দেন যে, কেউ যেন ঐ নদীর পানি পান না করে। যারা পান করবে তারা যেন আমার সাথে না যায়। এক আধ চুমুক যদি কেউ পান করে নেয় তবে কোন দোষ নেই। কিন্তু তথায় পৌঁছে গিয়ে তারা অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে। কাজেই তারা পেট পুরে পানি পান করে নেয়। কিন্তু অল্প কয়েকজন অত্যন্ত পাকা ঈমানদার লোক ছিলেন। তাঁরা এক চুমুক ব্যতীত পান করলেন না।

হযরত ইবনে আব্বাসের রা. উক্তি অনুযায়ী ঐ এক চুমুকেই ঈমানদারদের পিপাসা মিটে যায় এবং তারা জিহাদেও অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু যারা পূর্ণভাবে পান করেছিল তাদের পিপাসাও নিবৃত্ত হয়নি এবং তারা জিহাদের উপযুক্ত বলেও গণ্য হয়নি। যারা নদীর পরীক্ষায় পাশ করেছে তালুত তাদের নিয়ে নদী পার হলেন এবং মূর্তি পূজারীদের নেতা জালুতের মুখোমুখি হলেন। 

জালুতের বীরত্বের কথা ও তার বিশাল সেনাবাহিনীর কথা জেনে বনী ইসরাঈলের লোকেরা আবারো ভীত হয়ে পড়লো। তারা যুদ্ধ করতে চাইলো না। তারা কাপুরুষতার সাথে যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে বসলো। শত্রু সৈন্যদের সংখ্যা বেশী শুনে তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। সুতরাং তারা স্পষ্টভাবে বলে ফেললো, আজ জালুত ও তার সেনাদলের মোকাবিলা করার ক্ষমতা আমাদের নেই।'  

তাদের মধ্যে যারা আলেম ছিলেন তারা তাদেরকে বহুরকম করে বুঝিয়ে বললেন, বিজয় লাভ সৈন্যদের আধিক্যের উপর নির্ভর করে না। ধৈর্যশীলদের উপর আল্লাহ তা'আলার সাহায্য এসে থাকে। বহুবার এরূপ ঘটেছে যে, মুষ্টিমেয় কয়েকটি লোকে বিরাট দলকে পরাজিত করেছে। সুতরাং তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহ তা'আলার অঙ্গীকারের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ কর। এই ধৈর্যের বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের সহায় হবেন। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও তাদের মৃত অন্তরে উত্তেজনার সৃষ্টি হলো না এবং তাদের ভীরুতা দূর হলো না।

মূলত আল্লাহ তায়ালা মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রার্থক্য স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছিলেন। বস্তুত দেখা গেল যারা বাদশাহ চেয়েছিল তারা কেউ আর জিহাদে নেই। এমন আশংকা নবী সামুয়েল আ. আগেই করেছিলেন। যাই হোক অতঃপর সেনাপ্রধান তালুত অল্প কিছু ঈমানদারকে সাথে নিয়ে জালুতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। যুদ্ধের প্রাক্কালে তালুত ও ঈমানদারগণ একটি দোয়া করলেন। এই দু'আ আল্লাহ তায়ালা খুব পছন্দ করলেন। মূলত এই দু'আর প্রেক্ষাপট লেখার জন্যই এই ইতিহাস বর্ণনা করলাম। 

তালুত ও তার অনুসারী হাত তুলে কায়মনোবাক্যে বললেন, رَبَّنَآ اَفۡرِغۡ عَلَيۡنَا صَبۡرًا وَّثَبِّتۡ اَقۡدَامَنَا وَانصُرۡنَا عَلَى الۡقَوۡمِ الۡکٰفِرِيۡنَ﴿٢٥٠﴾
রব্বানা আফরিঘ আলাইনা সাব-রান ওয়া থাব্বিত আকদামানা ওয়ানসুরনা আলাল-কাউমিল-কাফিরিন
অর্থ: "হে আল্লাহ! আমাদের ধৈর্য শক্তি বাড়িয়ে দাও, এবং আমাদেরকে অবিচল রাখো এবং কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিজয় দান করো।" [সূরা আল-বাক্বারাহ:২৫০]

দোয়া করা শেষে তালুত বনী ইসরাঈলের মধ্যে একজন সাহসী সামনে আসতে বললেন যিনি আক্রমণের অগ্রভাগে থাকবেন। দাউদ আ. এ সময় ছিলেন একজন কম বয়সী যুবক। তিনি তালুতের আহবানে সামনে এলেন। মুশরিকদের বাদশাহ জালুত দ্বন্দ্বযুদ্ধে একজন আহবান করলো। দাউদ আ. নির্ভয়ে জালুতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন এবং জালুতকে হত্যা করলেন। এই ঘটনায় মুশরিক বাহিনীর মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তারা মনোবল হারিয়ে ফেলে। মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে তাদের বিশাল বাহিনী পরাজিত হয়।  

এ ঘটনায় দাউদ আ. হয়ে উঠলেন ইসরাঈলীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তালুত নিজের মেয়ের সাথে তাঁর বিয়ে দিলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নবুয়্যত দান করলেন। অবশেষে তিনিই হলেন ইসরাঈলীদের শাসক।

এই ঘটনায় আমরা যে শিক্ষা পাই, 
১. মুশরিকদের সাময়িক জয়ে আমরা যেন ধৈর্যহারা না হয়ে পড়ি। 
২. আল্লাহ তায়ালা ও নবী সা.-এর সিদ্ধান্তের বাইরে বাদশাহ হওয়া ও বাদশাহীর অনুসরণ যেন না কামনা করি।
৩. যুদ্ধ জয়ের জন্য মুসলিমদের বেশি লোকের প্রয়োজন নেই। দরকার অবিচল ঈমান।
৪. দলে মুনাফিক থাকলে যুদ্ধে জয়ী হওয়া কঠিন। তাই মুনাফিক ছাঁটাই জরুরি। 
৫. বিজয় আল্লাহর সাহায্যে হবে, তাই জয়ী হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতে হবে।

#রব্বানা

দুনিয়া ও আখিরাত প্রাপ্তির দু'আ

ইবরাহীম আ. যখন হজ্ব চালু করলেন তখন সেই সময়ের একটি পদ্ধতিতে হজ্ব পালন করা হতো। যত দিন গেল তত বিকৃতি প্রবেশ করতে থাকলো। একটা সময়ে ইসলাম বিরুদ্ধ পদ্ধতি চালু হয়ে গেল হজ্বের রীতিনীতিতে। তাই আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সা.-কে জানানোর মাধ্যমে আমাদের হজ্ব পালনের নিয়মকানুন শিখিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ১৯৬ নং আয়াতে বলেন, //আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যখন হজ্জ ও উমরাহ করার নিয়ত করো তখন তা পূর্ণ করো। আর যদি কোথাও আটকা পড়ো তাহলে যে কুরবানী তোমাদের আয়ত্বাধীন হয় তাই আল্লাহর উদ্দেশ্যে পেশ করো। আর কুরবানী তার নিজের জায়গায় পৌঁছে না যাওয়া পর্যন্ত তোমরা নিজেদের মাথা মুণ্ডন করো না। তবে যে ব্যক্তি রোগগ্রস্ত হয় অথবা যার মাথায় কোন কষ্ট থাকে এবং সেজন্য মাথা মুণ্ডন করে তাহলে তার ফিদিয়া হিসেবে রোযা রাখা বা সাদকা দেয়া অথবা কুরবানী করা উচিত। তারপর যদি তোমাদের নিরাপত্তা অর্জিত হয় (এবং তোমরা হজ্জের আগে মক্কায় পৌঁছে যাও) তাহলে তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি হজ্জ্বের সময় আসা পর্যন্ত উমরাহ্‌র সুযোগ লাভ করে সে যেন সামর্থ অনুযায়ী কুরবানী করে। আর যদি কুরবানীর যোগাড় না হয়, তাহলে হজ্জ্বের যামানায় তিনটি রোযা এবং সাতটি রোযা ঘরে ফিরে গিয়ে, এভাবে পুরো দশটি রোযা যেন রাখে। এই সুবিধে তাদের জন্য যাদের বাড়ী-ঘর মসজিদে হারামের কাছাকাছি নয়। আল্লাহর এ সমস্ত বিধানের বিরোধিতা করা থেকে দূরে থাকো এবং ভালোভাবে জেনে নাও আল্লাহ‌ কঠিন শাস্তি প্রদানকারী।//

এই আয়াত থেকে জানা গেলো,
১. হজ্ব বা উমরার নিয়ত করলে আমরা যেন তা পূর্ণ করি।

২. যদি এমন কোন কারণ দেখা দেয় যার ফলে সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বাধ্য হয়ে পথেই থেমে যেতে হয়, মক্কায় না যাওয়া যায় তবে উট, গরু, ছাগলের মধ্য থেকে যে পশুটি পাওয়া সম্ভব হয় সেটি আল্লাহর জন্য কুরবানী করতে হবে।

৩. কুরবানী না হওয়া পর্যন্ত মাথার চুল চেঁছে ফেলতে পারবে না।

৪. যদি কেউ রোগের কারণে বা অন্য প্রয়োজনে আগেই মাথা মুন্ডন করবে তারা ফিদিয়া দিবে। তিন দিন রোযা রাখা বা ছয় জন মিসকিনকে আহার করানো অথবা কমপক্ষে একটি ছাগল যবেহ করবে। এটা রাসূল সা.-এর নির্দেশ।

৫. জাহেলী যুদ্ধে আরবের লোকেরা ধারণা করতো, একই সফরে হজ্জ ও উমরাহ দু'টো সম্পন্ন করা মহাপাপ। তাদের মনগড়া শরীয়াতী বিধান অনুযায়ী হজ্জের জন্য একটি সফর এবং উমরাহর জন্য আর একটি সফল করা অপরিহার্য ছিল। মহান আল্লাহ‌ তাদের আরোপিত এই বাধ্য-বাধকতা দূর করে দেন এবং বাইরে থেকে আগমনকারীদেরকে এক সফরে হজ্জ ও উমরাহ করার সুবিধা দান করেন। তবে যারা মক্কার আশেপাশের মীকাতের (যে স্থান থেক হজ্জযাত্রীকে ইহরাম বাঁধতে হয়) সীমার মধ্যে অবস্থান করে তাদেরকে এই সুযোগ দেয়া হয়নি। কারণ তাদের পক্ষে হজ্জ ও উমরাহর জন্য পৃথক পৃথক সফর করা মোটেই কঠিন কাজ নয়।

৬. হজ্জের সময় আসা পর্যন্ত উমরাহর সুযোগ লাভ করার অর্থ হচ্ছে, উমরাহ সম্পন্ন করে ইহরাম খুলে ফেলতে হবে এবং ইহরাম থাকা অবস্থায় যেসব বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হচ্ছিল সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। তারপর হজ্জের সময় এলে আবার নতুন করে ইহরাম বেঁধে নেবে।

আল্লাহ তায়ালা ১৯৭ নং আয়াতে বলেন, //হজ্জের মাসগুলো সবার জানা। যে ব্যক্তি এই নির্দিষ্ট মাসগুলোতে হজ্জ করার নিয়ত করে, তার জেনে রাখা উচিত, হজ্জের সময়ে সে যেন যৌন সম্ভোগ, দুষ্কর্ম ও ঝগড়া –বিবাদে লিপ্ত না হয়। আর যা কিছু সৎকাজ তোমরা করবে আল্লাহ‌ তা জানেন। হজ্জ সফরের জন্য পাথেয় সঙ্গে নিয়ে যাও আর সবচেয়ে ভালো পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। কাজেই হে বুদ্ধিমানেরা! আমার নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকো।//

এই আয়াত থেকে জানা গেলো
১. ইহরাম বাঁধা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌন সম্পর্কই নিষিদ্ধ।

২. যদিও সাধারণ অবস্থায়ই যে কোন গোনাহের কাজ করা অবৈধ কিন্তু ইহরাম বাঁধা অবস্থায় অন্যায় কাজ সংঘটিত হলে তার গোনাহের মাত্রা অনেক বেশী কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. ঝগড়া বিবাদ লিপ্ত হওয়া তো বিপজ্জনক। চাকরকে ধমক দেয়াও জায়েয নয়।

৪. জাহেলী যুগে হজ্জের জন্য পাথেয় সঙ্গে করে নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়াকে দুনিয়াদারীর কাজ বা গর্হিত কাজ মনে করা হতো। একজন ধর্মীয় ব্যক্তি সম্পর্কে আশা করা হতো সে দুনিয়ার কোন সম্বল না নিয়ে আল্লাহর ঘরের দিকে রওয়ানা হবে। এ আয়াতে তাদের এ ভুল চিন্তার প্রতিবাদ করা হয়েছে। তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে, পাথেয় না নিয়ে সফর করার মধ্যে মাহাত্ম্য নেই। আসল মাহাত্ম্য হচ্ছে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হওয়া, তাঁর বিধি-নিষেধের বিরুদ্ধাচরণ করা থেকে বিরত থাকা এবং জীবনকে পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও কলুষ মুক্ত করা। যে ব্যক্তি সৎ চারিত্রিক গুণাবলী নিজের মধ্যে সৃষ্টি করে সে অনুযায়ী নিজের চরিত্রকে নিয়ন্ত্রিত করেনি এবং আল্লাহর ভয়ে ভীত না হয়ে অসৎকাজ করতে থাকে, সে যদি পাথেয় সঙ্গে না নিয়ে নিছক বাহ্যিক ফকীরী ও দরবেশী প্রদর্শনী করে বেড়ায়, তাহলে তাতে তার কোন লাভ নেই। আল্লাহ‌ ও বান্দা উভয়ের দৃষ্টিতে সে লাঞ্ছিত হবে। যে ধর্মীয় কাজটি সম্পন্ন করার জন্য সে সফর করছে তাকেও লাঞ্ছিত করবে। কিন্তু তার মনে যদি আল্লাহর প্রতি ভয় জাগরুক থাকে এবং তার চরিত্র নিষ্কলুষ হয় তাহলে আল্লাহর ওখানে সে মর্যাদার অধিকারী হবে এবং মানুষও তাকে মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখবে। তার খাবারের থলিতে খাবার ভরা থাকলেও তার এ মর্যাদার কোন কম-বেশী হবে না।

এরপর আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ১৯৮ ও ১৯৯ নং আয়াতে বলেন,
//আর হজ্জের সাথে সাথে তোমরা যদি তোমাদের রবের অনুগ্রহের সন্ধান করতে থাকো তাহলে তাতে কোন দোষ নেই। তারপর আরাফাত থেকে অগ্রসর হয়ে 'মাশআরুল হারাম' (মুয্‌দালিফা) এর কাছে থেমে আল্লাহ‌কে স্মরণ করো এবং এমনভাবে স্মরণ করো যেভাবে স্মরণ করার জন্য তিনি তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। নয়তো ইতিপূর্বে তোমরা তো ছিলে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত। তারপর যেখান থেকে আর সবাই ফিরে আসে তোমরাও সেখান থেকে ফিরে এসো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিঃসন্দেহে তিনি ক্ষমাশীল ও করুণাময়//

এই দুইটি আয়াত থেকে আমরা যা জানতে পারি,

১. আরবে আগে হজ্জ সফরকালে অর্থ উপার্জনের জন্য কোনো কাজ করাকে খারাপ মনে করা হতো। কারণ তাদের মতে, অর্থ উপার্জন করা একটি দুনিয়াদারীর কাজ। কাজেই হজ্জের মতো একটি ধর্মীয় কাজের মধ্যে এ দুনিয়াদারীর কাজটি করা তাদের চোখে নিন্দনীয়ই ছিল। কুরআন এ ধারণার প্রতিবাদ করছে এবং তাদের জানিয়ে দিচ্ছে, একজন আল্লাহ‌ বিশ্বাসী ব্যক্তি যখন আল্লাহর আইনের প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন করে নিজেদের অর্থ উপার্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালায় তখন আসলে সে আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করে। কাজেই এক্ষেত্রে সে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সফর করতে গিয়ে তার মাঝখানে তাঁর অনুগ্রহের সন্ধানও করে ফেরে, তাহলে তার কোন গোনাহ হবে না।

২. ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-এর সময় আরবে হজ্জের সাধারণ প্রচলিত পদ্ধতি ছিল এই যে, ৯ই যিলহজ্জ তারা মিনা থেকে আরাফাত যেতো এবং ১০ তারিখের সকালে সেখান থেকে ফিরে এসে মুযদালিফায় অবস্থান করতো। কিন্তু পরবর্তী কালে যখন ধীরে ধীরে ভারতীয় ব্রাহ্মণদের মতো আরবে কুরাইশদের ধর্মীয় প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো তখন তারা বললো, আমরা হারাম শরীফের অধিবাসী, সাধারণ আরবদের সাথে আমরা আরাফাত পর্যন্ত যাবো, এটা আমাদের জন্য মর্যাদাহানিকর।

কাজেই তারা নিজেদের জন্য পৃথক মর্যাদাজনক ব্যবস্থার প্রচলন করলো। তারা মুযদালিফা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসতো এবং সাধারণ লোকদের আরাফাত পর্যন্ত যাবার জন্য ছেড়ে দিতো। পরে বনী খুযাআ ও বনী কিনানা গোত্রদ্বয় এবং কুরাইশদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য গোত্রও এই পৃথক অভিজাতমূলক ব্যবস্থার অধিকারী হলো। অবশেষে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে, কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ গোত্রগুলোর মর্যাদাও সাধারণ আরবদের তুলনায় অনেক উঁচু হলে গেলো। তারাও আরাফাতে যাওয়া বন্ধ করে দিল।

এ গর্ব ও অহংকারের বিষয়টিকে এই আয়াতে রহিত করে দেওয়া হয়েছে। এ আয়াতে বিশেষভাবে সম্বোধন করা হয়েছে কুরাইশ, তাদের আত্মীয় ও চুক্তিবদ্ধ গোত্রগুলোকে এবং সাধারণভাবে সম্বোধন করা হয়েছে এমন সব লোকদেরকে যারা আগামীতে কখনো নিজেদের জন্য এ ধরনের পৃথক ব্যবস্থা প্রচলনের আকাঙ্ক্ষা মনে মনে পোষণ করে। তাদের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, সবাই যতদূর পর্যন্ত যায় তোমরাও তাদের সাথে ততদূর যাও, তাদের সাথে অবস্থান করো, তাদের সাথে ফিরে এসো এবং এ পর্যন্ত জাহেলী অহংকার ও আত্মম্ভিরতার কারণে, তোমরা সুন্নাতে ইবরাহিমীর যে বিরুদ্ধাচরণ করে এসেছো সেজন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।

সবশেষে আল্লাহ তায়ালা ২০০ থেকে ২০২ নং আয়াতে বলেন,
অতঃপর যখন তোমরা নিজেদের হজ্জের অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করবে তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে যেমন ইতিপূর্বে তোমাদের বাপ-দাদাদেরকে স্মরণ করতে বরং তার চেয়ে অনেক বেশী করে স্মরণ করবে (আল্লাহকে)। তাদের মধ্যে কেউ এমন আছে যে বলে, হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় সবকিছু দিয়ে দাও। এই ধরনের লোকের জন্য আখেরাতে কোন অংশ নেই। আবার কেউ বলে, হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দাও এবং আখেরাতেও কল্যাণ দাও এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও। এই ধরনের লোকেরা নিজেদের উপার্জন অনুযায়ী (উভয় স্থানে) অংশ পাবে। মূলত হিসেব সম্পন্ন করতে আল্লাহর একটুও বিলন্ব হয় না।

এই আয়াতগুলো থেকে আমরা জানতে পারি,

১. আরবের লোকেরা হজ্জ শেষ করার পর পরই মিনায় সভা করতো। সেখানে প্রত্যেক গোত্রের লোকেরা তাদের বাপ-দাদাদের কৃতিত্ব আলোচনা করতো। গর্ব ও অহংকারের সাথে এবং এভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করতো। তাদের এ কার্যকলাপের ভিত্তিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, এসব জাহেলী কথাবার্তা বন্ধ করো, ইতিপূর্বে আজেবাজে কথা বলে যে সময় নষ্ট করতে এখন আল্লাহর স্মরণে ও তাঁর যিকিরে তা অতিবাহিত করো।

২. আবার যারা আল্লাহকে স্মরণ করতো তাদের মধ্যে দুইটি দল ছিল একদল আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতো,
رَبَّنَآ اٰتِنَا فِىۡ الدُّنۡيَا
অর্থাৎ হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় সবকিছু দিয়ে দাও।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হজ্বে এসে যারা আল্লাহর কাছে শুধু দুনিয়ার জন্য চাইবে তাদের জন্য আখিরাতে কোনো কিছু থাকবে না।

৩. আরেক দল লোক হজ্বে এসে আল্লাহর কাছে দোয়া করতো,
رَبَّنَآ اٰتِنَا فِىۡ الدُّنۡيَا حَسَنَةً وَّفِىۡ الۡاٰخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থাৎ হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দাও এবং আখেরাতেও কল্যাণ দাও এবং আগুনের আযাব থেকে আমাদের বাঁচাও।
আল্লাহ তায়ালা এই দোয়াকে পছন্দ করেছেন। তাই তিনি আমরা যাতে এই দোয়া করি সেজন্য কুরআনে উদ্ধৃত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, এই দোয়াকারীরা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় অংশেই তারা নিজ নিজ আমল অনুযায়ী প্রতিদান পাবেন। আল্লাহর রাসূল সা. এই প্রতিদনই করতেন।

শুধু হজ্ব নয়, রাসূল সা. ও সাহাবা রা.-গণ সবসময় এই দোয়া করতেন। আসুন আমরাও আল্লাহর কাছে এই অতি পরিচিত দোয়া সবসময় করতে থাকি।

#রব্বানা

জাতি ও সন্তানের জন্য ইবরাহিম আ.-এর হৃদয়গ্রাহী দু'আ

বড় কঠিন ছিল সেই পরিক্ষা। স্ত্রী ও নবজাতক সন্তানকে রেখে যেতে হয়েছে দুই হাজার কিলোমিটার দূরে। জনমানবহীন মরুভূমিতে। বলছি ইবরাহীম আ.-এর কথা। জগতের সব কঠিন পরিক্ষা দিতে হয়েছে তাঁকে। তিনি নমরুদের আগুন থেকে আল্লাহর ইশারায় রক্ষা পেলেও নমরুদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন নি।


নমরুদ তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল। এরপর ফিলিস্তিন, মিশর, আরব ইত্যাদি দেশ ঘুরে সিরিয়ায় থিতু হলেন। তাঁর জীবন জুড়েই পরীক্ষা। আমরা সবাই কমবেশি এই সম্পর্কে জানি। তিনি তাঁর ২য় স্ত্রী ও সন্তান ইসমাঈল আ.-কে মক্কায় রেখে গেলেন।

ধীরে ধীরে সেখানে বসতি তৈরি হলো। ইসমাঈল আ. নবুয়্যত প্রাপ্ত হলেন। আরবে ঘুরে ঘুরে জনমানুষের কাছে তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছেন। এমনই এক দিনে ইবরাহীম আ. তাঁর বড় সন্তান ইসমাঈল আ.-এর সাথে দেখা করতে সিরিয়া থেকে মক্কায় এলেন।

এখানে এসে তিনি দেখেন হযরত ইসমাঈল আ. বাড়িতে নেই।
পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করেন- সে কোথায় গেছে?
- তিনি পানাহারের খোঁজে বেরিয়েছেন। অর্থাৎ শিকারে গেছেন।
- তোমাদের অবস্থা কি?
- অবস্থা খারাপ, বড়ই দারিদ্র্য ও সংকীর্ণতার মধ্যে দিন যাপন করছি।
- তোমার স্বামী বাড়ী আসলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে।

ইসমাঈল আ. ফিরে এসে যেন তিনি কোনো মেহমানের আগমনের ইঙ্গিত পেয়েছেন। তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন,
- এখানে কোন লোকের আগমন ঘটেছিল কি?
স্ত্রী বলে, হ্যাঁ, এরূপ এরূপ আকৃতির একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এসেছিলেন। তিনি আপনার সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি যে, তিনি শিকারের অনসুন্ধানে বেরিয়েছেন।
- আমাকে কিছু বলতে বলেছেন কি?
- হ্যাঁ, বলেছেন যখন তোমার স্বামী আসবে তখন তাকে বলবে যে, সে যেন তার দরজার চৌকাঠ পরিবর্তন করে।
হযরত ইসমাঈল আ. তখন বলেন, হে আমার সহধর্মিনী! জেনে রেখো যে, উনি আমার আব্বা ইবরাহীম আ.।

ইসমাঈল আ. বুঝে নিলেন, ইবরাহীম আ. তাঁকে এই স্ত্রী পরিত্যাগ করার জন্য বলেছেন। তিনি স্ত্রীকে সসম্মানে বিদায় দিলেন ও কষ্ট থেকে মুক্তি দিলেন। অতঃপর ঐ গোত্র থেকেই আরেকজন নারীকে বিবাহ করলেন।

কিছুদিন পর ইবরাহীম আ. পুনরায় মক্কায় আসেন। ঘটনাক্রমে এবারও হযরত ইসমাঈল আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। পুত্রবধূকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে, তিনি তাদের জন্যে আহার্যের অনুসন্ধানে বেরিয়েছেন।
পুত্রবধূ বলে, আপনি বসুন। বিশ্রাম করুন ও সামান্য কিছু আহার করুন।
তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের দিন যাপন কীভাবে হচ্ছে এবং তোমাদের অবস্থা কীরূপ?
- আলহামদুলিল্লাহ! আমরা ভালোই আছি এবং আল্লাহর অনুগ্রহে সুখে-স্বচ্ছন্দে আমাদের দিন যাপন হচ্ছে। এজন্য আমরা মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
- তোমাদের কী খাও?
- গোশত।
- তোমরা কী পান করো?
- পানি।
- হে আল্লাহ! আপনি তাদের গোশত ও পানিতে বরকত দিন।

(এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রাসূল সা. বলেন, যদি ইসমাঈল আ.-এর বাসায় শস্য থাকতো এবং তারা এটা বলতো। তবে ইবরাহীম আ. তাদের জন্যে শস্যেরও বরকত চাইতেন। এখন এই প্রার্থনার বরকতে মক্কাবাসী শুধুমাত্র গোশত ও পানির উপরেই দিনযাপন করতে পারে, অন্য লোক পারে না।)

অতঃপর ইবরাহীম আ. বলেন, আচ্ছা, আমি যাচ্ছি, তোমার স্বামীকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে সে যেন তার চৌকাঠ ঠিক রাখে।

এরপর ইসমাঈল আ. এসে সমস্ত সংবাদ অবগত হন। তিনি বলেন, উনি আমার সম্মানিত আব্বা ছিলেন। আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, আমি যেন তোমাকে পৃথক না করি।

আবার কিছু দিন পর ইবরাহীম আ. সিরিয়া থেকে মক্কায় এলেন। ইসমাঈল আ. তখন যমযম কূপের পাশে একটি পাহাড়ের উপর তীর সোজা করছিলেন। এমতাবস্থায় তাঁদের দেখা হয়। তাঁরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেন।

ইবরাহীম আ. বলেন, হে ইসমাঈল! আমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার একটি নির্দেশ হয়েছে।
- যে নির্দেশ হয়েছে তা পালন করুন আব্বা।
- তোমাকেও আমার সাথে থাকতে হবে।
- আমি প্রস্তুত আছি আব্বা!
- এই স্থানে আল্লাহ তা'আলার একটি ঘর নির্মাণ করতে হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার, কা'বা প্রথমেই ইবরাহীম আ. দ্বারা প্রস্তুত হয়নি। বায়তুল্লাহ প্রথমে ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেন। অতঃপর হযরত আদম আ. পুনর্নিমাণ করেন। তারপর নূহ আ.-এর সময় মহাপ্লাবণে বায়তুল্লাহর প্রাচীর বিনষ্ট হলেও ভিত্তি আগের মতই থেকে যায়।

পরবর্তীতে আল্লাহর হুকুমে একই ভিত্তিভূমিতে ইবরাহীম তা পুনঃনির্মাণ করেন। এই নির্মাণকালে ইবরাহীম আ. মক্কায় এসে বসবাস করেন ও বাপ-বেটা মিলেই কা'বা গৃহ নির্মাণ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তখন থেকে অদ্যাবধি কা'বা গৃহে অবিরত ধারায় হজ্জ ও তাওয়াফ চালু আছে।

আল্লাহ বলেন,
আর যখন আমরা ইবরাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, নামাজে দন্ডায়মানদের জন্য ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য। (সূরা হজ্জ -২৬)।

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
আর তুমি মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা জারি করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত হতে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং (কুরবানীর) নির্দিষ্ট দিনগুলিতে (১০, ১১, ১২ই যিলহাজ্জ) তাঁর দেওয়া চতুষ্পদ পশু সমূহ যবেহ করার সময় তাদের উপরে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং আহার করাও অভাবী ও দুস্থদেরকে। (সূরা হজ্জ ২৭-২৮)।

উপরোক্ত আয়াতগুলিতে কয়েকটি বিষয় জানা যায়। যেমন- (১) বায়তুল্লাহ ও তার সন্নিকটে কোনরূপ শিরক করা চলবে না (২) এটি স্রেফ তাওয়াফকারী ও আল্লাহর ইবাদতকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হবে (৩) এখানে কেবল মুমিন সম্প্রদায়কে হজ্জের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

কা'বা তৈরি হয়ে গেলে ইবরাহীম আ. মাক্বামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে এবং কোন কোন বর্ণনা মতে আবু কুবায়েস পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে দুই কানে আঙ্গুল দিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে উচ্চ কণ্ঠে চারদিকে ফিরে বারবার হজ্জের উক্ত ঘোষণা জারি করেন।

ইবরাহীম আ. উক্ত ঘোষণা আল্লাহ পাক সাথে সাথে বিশ্বের সকল প্রান্তে মানুষের কানে কানে পৌঁছে দেন। ইবনু আব্বাস রা. বলেন, ইবরাহীমী আহবানের জওয়াবই হচ্ছে হাজীদের লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক।

সেদিন থেকেই কা'বাকে কেন্দ্র করে হজ্জ ও কুরবানীর বিধান মানব ইতিহাসে যুক্ত হয়ে গেল। এক কালের চাষাবাদহীন বিজন পাহাড়ী উপত্যকা ইবরাহীম আ.-এর দোয়া বরকতে হয়ে উঠলো বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সম্মিলনস্থল হিসাবে।

যেমন আল্লাহ বলেন,
যখন আমরা কা'বা গৃহকে লোকদের জন্য সম্মিলনস্থল ও নিরাপদস্থলে পরিণত করলাম (আর বললাম,) তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোর স্থানটিকে সালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ করো। অতঃপর আমরা ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো। (বাক্বারাহ ১২৫)।

কা'বা ঘর প্রস্তুত ও হজ্জ্বের ঘোষণা দেওয়ার পর পিতা-পুত্র দুইজনে আল্লাহর কাছে হাত তুললেন এবং কতকগুলো দোয়া করতে থাকলেন।

১. হে আমার রব! এই শহরকে শান্তি ও নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও। আর এর অধিবাসীদের মধ্য থেকে যারা আল্লাহ‌ ও আখেরাতকে মানবে তাদেরকে সব রকমের ফলের আহার্য দান করো। -বাক্বারাহ ১২৬

২. হে আমাদের রব! আমাদের এই খিদমত কবুল করে নাও। তুমি সবকিছু শ্রবণকারী ও সবকিছু জ্ঞাত। -বাক্বারাহ ১২৭

৩. হে আমাদের রব! আমাদের দু'জনকে তোমার মুসলিম (নির্দেশের অনুগত) বানিয়ে দাও। আমাদের বংশ থেকে এমন একটি জাতির সৃষ্টি করো যে হবে তোমার মুসলিম। তোমার ইবাদাতের পদ্ধতি আমাদের বলে দাও এবং আমাদের ভুলত্রুটি মাফ করে দাও। তুমি বড়ই ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী। -বাক্বারাহ ১২৮

৪. হে আমাদের রব! তুমি এদের মধ্য থেকেই এদের নিকটে একজন রাসূল প্রেরণ কর, যিনি তাদের নিকটে এসে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী ও দূরদৃষ্টিময়। -বাক্বারাহ ১২৯

৫. হে আমার রব! এ শহরকে নিরাপত্তার শহরে পরিণত করো এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচাও। -ইবরাহিম ৩৫

৬. হে আমার রব! এ মূর্তিগুলো অনেককে ভ্রষ্টতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যে আমার পথে চলবে সে আমার অন্তর্গত আর যে আমার বিপরীত পথ অবলম্বন করবে, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই তুমি ক্ষমাশীল ও মেহেরবান। -ইবরাহিম ৩৬

৭. হে আমাদের রব! আমি একটি তৃণ পানিহীন উপত্যকায় নিজের বংশধরদের একটি অংশকে তোমার পবিত্র গৃহের কাছে এনে বসবাস করিয়েছি। পরওয়ারদিগার! এটা আমি এ জন্য করেছি যে, এরা এখানে নামায কায়েম করবে। কাজেই তুমি লোকদের মনকে এদের প্রতি আকৃষ্ট করো এবং ফলাদি দিয়ে এদের আহারের ব্যবস্থা করো, হয়তো এরা শোকরগুজার হবে। -ইবরাহিম ৩৭

৮. হে আমার রব! আমাকে নামায কায়েমকারী বানাও এবং আমার বংশধরদের থেকেও। হে আমাদের রব আমার দোয়া কবুল করো। -ইবরাহিম ৪০।

ইবরাহীম ও ইসমাঈলের উপরোক্ত দোআগুলো আল্লাহ কবুল করেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে তাদের বংশে চিরকাল একদল মুত্তাকী পরহেযগার মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। তাঁদের পরের সকল নবী তাঁদের বংশধর ছিলেন। কা'বার খাদেম হিসাবেও চিরকাল তাদের বংশের একদল দ্বীনদার লোক সর্বদা নিয়োজিত ছিল। কা'বার খেদমতের কারণেই তাদের সম্মান ও মর্যাদা সারা আরবে এমনকি আরবের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল।

নিজের জন্য, নিজ শহরের জন্য, জনপদের জন্য, নিজের বংশধরদের জন্য এমন সুন্দর দোয়া ইবরাহীম আ. করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা এই দুয়াগুলোকে পছন্দ করেছেন। তাই কুরআনে দু'আগুলোকে উদ্ধৃত করে দিয়েছেন।

আমরা নিজের জন্য, নিজের দেশের জন্য ও নিজের সন্তানদের এই দুয়াগুলো করতে পারি।

ভালো হয় রব্বানা ও রব্বি দিয়ে শুরু হওয়া দোয়াগুলো মুখস্ত করতে পারলে।

#রব্বানা

২৬ এপ্রি, ২০২২

আল্লাহ তায়ালা যেভাবে ইহুদীদের দর্প চূর্ণ করলেন!


মদিনার ইহুদীরা বেশ অহংকারী ছিল। এই অহংকার ছিল জ্ঞান, ঐতিহ্য, ব্যবসা ও আল্লাহর প্রিয় গোষ্ঠী হিসেবে। যেহেতু তাদের ওহির জ্ঞান ছিল তাই তারা নিজেরা ছাড়া বাকীদের মূর্খ বলে মনে করতো, শুধু তাই তাদের উম্মী বা অশিক্ষিত হিসেবে সম্বোধন করতো। তাদের কিতাবে শেষ নবীর ভবিষ্যৎবাণী ছিল। এই নিয়েও তারা গর্ব করতো। যেহেতু বনী ইসরাঈল থেকেই নবী বেশি এসেছে তাই তারা ভাবতো তাদের বংশ থেকেই নবী আসবে।

নবী আসা নিয়ে মদিনার ইহুদীরা অন্যান্য মুশরিক গোত্রকে এই বলে হুমকি দিত যে, শেষ নবী আসার সময় হয়েছে। শেষ নবী আসলে আমরা তোমাদের ওপর বিজয়ী হবো এবং সারা আরব শাসন করবো। কিন্তু নবী সা.-এর আবির্ভাব হয়েছে মক্কাতে। ইহুদীদের কথিত 'উম্মী'-দের বংশ থেকে। এটা তারা মেনে নিতে পারে নাই। তাই তারা মুহাম্মদ সা.-এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক শত্রুতা করতে শুরু করলো।

নবী সা. মদিনায় আসলে তাদের শত্রুতা আরো বেড়ে যায়। তারা মুসলিমদের ফকির, উম্মী ইত্যাদি বলে অপমান করতো। অযথা ঝগড়া তৈরি করতো। মদিনায় তখন তিনটি ইহুদি গোত্র ছিল। বনু কাইনুকা, বনু নাদির ও বনু কুরাইজা। বনু কাইনুকার বাজারে এক মুসলিম মহিলাকে বিবস্ত্র করার ইস্যুতে মুসলিমদের সাথে বনু কাইনুকার যুদ্ধ বেধে যায়। মুহাম্মদ সা. তাদের অবরোধ করেন। একপর্যায়ে তারা নতি স্বীকার করে এবং মুহাম্মদ সা. তাদেরকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করেন।

এরপর বনু নাদির গোত্র মুহাম্মদ সা.-কে হত্যার পরিকল্পনা করে। জিব্রাঈল আ.-এর মাধ্যমে আল্লাহ তা জানিয়ে দিলে মুসলিমরা তাদের অবরোধ করে। তারা দীর্ঘদিন অবরোধে থেকে অবশেষে পরাজয় স্বীকার করে। মুহাম্মদ সা. তাদেরকেও মদিনা থেকে বহিষ্কার করেন। এই নাদির গোত্রের নেতা আরবের সকল গোত্রকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে এবং সবাইকে একতাবদ্ধ করে। যার ফলে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যখন প্রায় ১০,০০০ মুশরিক সৈন্য মদিনা অবরোধ করে তখন মদিনার অবশিষ্ট ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজা মদিনার ভেতর থেকেই মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। মুহাম্মদ সা. কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে তাদের ঐক্য বিনষ্ট করে দেয়। অবশেষে আল্লাহর সাহায্যে বিজয় আসে। তারপর বনু কুরাইজার সৈন্যদের হত্যা করা হয়।

মদিনা থেকে বিতাড়িত ইহুদীদের একটা বড় অংশ খায়বারে ইহুদী পল্লীতে অবস্থান নেয়। সেখানে ইহুদীদের শক্তিশালী আটটি দুর্গ ছিল। মদিনা থেকে খায়বার ছিল প্রায় ১৭০ কি.মি. দূরে। রাসূল সা. সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের পরাস্ত করেন। তারা মুসলিম অধীনে প্রজা হিসেবে থাকতে চাইলে মুহাম্মদ সা. তাদের অনুমতি করেন।

এরপর আল্লাহ তায়ালা সূরা জুম'আর ১ম ৮ আয়াত নাজিল করেন। ইহুদীদের অহংকার চূর্ণ করে ২ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
তিনিই মহান সত্তা যিনি উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রসূল করে পাঠিয়েছেন যে তাদেরকে তাঁর আয়াত শুনায়, তাদের জীবনকে সজ্জিত ও সুন্দর করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। অথচ ইতিপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল।

আল্লাহ তায়ালা এখানে বুঝাতে চেয়েছেন, তোমরা এ রাসূলকে মানতে অস্বীকার করছো এই কারণে যে, তিনি এমন এক কওমের মধ্যে প্রেরিত হয়েছেন যাদেরকে অবজ্ঞা ভরে তোমরা ‘উম্মী’ বলে ডাকো। তোমাদের ভ্রান্ত ধারণা এই যে, রসূলকে অবশ্যই তোমাদের নিজেদের কওমের মধ্যে থেকে হতে হবে। তোমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে ছিলে যে, তোমাদের কওমের বাইরে যে ব্যক্তিই রিসালাতের দাবি করবে সে অবশ্যই মিথ্যাবাদী।

কিন্তু আল্লাহ তা’আলা সেই উম্মীদের মধ্যেই একজন রাসূল সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের চোখের সামনেই যিনি তাঁর কিতাব শুনাচ্ছেন, মানুষকে পরিশুদ্ধ করেছেন এবং সেই মানুষকে হিদায়াত দান করেছেন তোমরা নিজেরাও যাদের গোমরাহীর অবস্থা জান। এটা আল্লাহর করুণা ও মেহেরবানী, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। তাঁর করুণা ও মেহেরবানীর ওপর তোমাদের কোন ইজারাদারী নেই যে, তোমরা যাকে তা দেয়াতে চাও তাকেই তিনি দিবেন আর তোমরা যাকে বঞ্চিত করতে চাও, তাকে তিনি বঞ্চিত করবেন।

এরপর আল্লাহ তায়ালা ৫ নং আয়াতে বলেন,
যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা বহন করেনি। তাদের উপমা সেইসব গাধা যারা বই-পুস্তক বহন করে। এর চেয়েও নিকৃষ্ট উপমা সেই সব লোকের যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলেছে। আল্লাহ এ রকম জালেমদের হিদায়াত দান করেন না।

এখানে আল্লাহ তায়ালা বুঝাতে চেয়েছেন, তোমাদের তাওরাতের বাহক বানানো হয়েছিল। কিন্তু তোমরা এর গুরুদায়িত্ব উপলদ্ধিও করোনি, পালনও করোনি। তোমাদের অবস্থা সেই গাধার মত যার পিঠে বই পুস্তকের বোঝা চাপানো আছে কিন্তু সে কি বহন করে নিয়ে যাচ্ছে তা জানে না। তোমাদের অবস্থা গাধার চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা, তোমরা আল্লাহর কিতাবের বাহক হওয়ার গুরুদায়িত্ব শুধু এড়িয়েই চলছো না, জেনে বুঝে আল্লাহর আয়াতসমূহকে মিথ্যা বলছো। এসব সত্ত্বেও তোমাদের ধারণা এই যে, তোমরা আল্লাহর অতি প্রিয় এবং রিসালাতের নিয়ামত চিরদিনের জন্য তোমাদের নামে লিখে দেয়া হয়েছে।

তারপর ৬-৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,
হে ইহুদী হয়ে যাওয়া লোকগণ! তোমরা যদি ভেবে থাকো যে, অন্য সব মানুষ বাদ দিয়ে কেবল তোমরাই আল্লাহর প্রিয়পাত্র, আর তোমাদের এ ধারণার ক্ষেত্রে তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো, তাহলে মৃত্যু চেয়ে নাও। কিন্তু যেসব অপকর্ম তারা করেছে, তার কারণে তারা কখনো মৃত্যু কামনা করবে না। আল্লাহ‌ এসব জালেমকে খুব ভালভাবেই জানেন। তাদের বলো, যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালাচ্ছো তা তোমাদের কাছে আসবেই তারপর তোমাদেরকে সেই সত্তার সামনে পেশ করা হবে যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই জানেন। তখন তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন যা তোমরা করছিলে।

আল্লাহ তায়ালা তাদের দাবি এখানে পরিষ্কারভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের বলেছেন, সত্যিই যদি তোমরা আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে এবং এ বিশ্বাসও তোমাদের থাকতো যে, তাঁর কাছে তোমাদের জন্য অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার স্থান সংরক্ষিত আছে তাহলে মৃত্যুর এমন ভীতি তোমাদের মধ্যে থাকতো না যে, অপমান ও লাঞ্ছনার জীবন গ্রহণীয় কিন্তু কোন অবস্থায়ই মৃত্যু গ্রহণীয় নয়। আর মৃত্যুর এই ভয়ের কারণেই তো বিগত কয়েক বছরে তোমরা পরাজয়ের পর পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছো। তোমাদের এই অবস্থা-ই প্রমাণ করে যে, তোমাদের অপকর্মসমূহ সম্পর্কে তোমরা নিজেরাই অবহিত।

এই আয়াতগুলো(১-৮) ৭ম হিজরিতে খাইবারের যুদ্ধের সময় নাজিল হয়েছিল। সূরা জুম'আর আয়াত সংখ্যা ১১। এর অনেক আগে বাকি ১ম হিজরিতে বাকী ৩ আয়াত নাজিল হয়েছিল। মুহাম্মদ সা. মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর একদিন মসজিদে নববীতে জুম'আর খুতবা দিচ্ছিলেন। সে সময় মাদীনার একটি ব্যবসায়ী কাফেলা এসে হাজির হয়। ব্যবসায়ীরা কী পণ্য নিয়ে এসেছে তা দেখার কৌতুহল সামলাতে পারেন নি মুসলিমরা। মাত্র বারোজন সাহাবা ছাড়া বাকীরা খুতবা চলাকালীন মসজিদ থেকে থেকে বের হয়ে গেলেন।

এই প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তায়ালা সূরা জুম'আর ৯-১১ নং আয়াত বলেন,
হে মুমিনগণ, যখন জুমু‘আর দিনে সালাতের জন্য আহবান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও। আর বেচা-কেনা বর্জন কর। এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে। অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। আর তারা যখন ব্যবসায় অথবা ক্রীড়া কৌতুক দেখে তখন তারা তার দিকে ছুটে যায়, আর তোমাকে দাঁড়ান অবস্থায় রেখে যায়। বল, আল্লাহর কাছে যা আছে তা ক্রীড়া- কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উত্তম। আর আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিকদাতা।

এই আয়াতগুলো থেকে সহজেই আমরা অনুভব করতে পারি আল্লাহ তায়ালা কী বুঝিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো আগের অংশের সাথে এই অংশ কেন একই সূরায় সন্নিবেশ করা হলো? এই প্রসঙ্গে মাওলানা মওদূদী রহ. তাফহীমুল কুরআনে বলেন,

আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের ‘সাবত’ বা শনিবারের পরিবর্তে মুসলমানদের ‘জুমআ’ দান করেছেন। তাই আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সাবধান করে দিতে চান যে, ইহুদীরা, সাবতের সাথে যে আচরণ করেছে তারা যেন জুমআর সাথে সেই আচরণ না করে। রাসূলুল্লাহ সা. বক্তব্য দেওয়া অবস্থায় মসজিদ ছেড়ে চলে যাওয়া ঈমানের সাথে যায় না। তাই নির্দেশ দেওয়া হয় যে, জুমআর আযান হওয়ার পর সব রকম কেনাবেচা এবং অন্য সব রকম ব্যস্ততা নিষেধ। ঈমানদারদের কাজ হলো, এ সময় সব কাজ বন্ধ রেখে আল্লাহর জিকিরের দিকে ধাবিত হবে।

এই সূরা থেকে আমাদের শিক্ষা হলো, আমরা যেন ইহুদীদের মতো আচরণ না করি। ইহুদীদের মতো নিজেদের বিশেষ গোষ্ঠী মনে না করি। আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর ভরসা রাখি। আমরা যেন আল্লাহর আয়াতের নির্দেশনা মান্য করি। আল্লাহর আয়াতকে পাল্টে না দেই। ইহুদীদের মতো আমার যেন আল্লাহর আয়াতকে বিক্রি করে পেট ভর্তি না করি যার কথা আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ৪১ নং আয়াতে বলেছেন।


২৩ এপ্রি, ২০২২

লাইলাতুল কদরের শানে নুজুল



একবার রাসূল সা. স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন তাঁর জন্য স্থাপিত মিম্বরে উঠে গেছে উমাইয়া বংশের লোকেরা। তিনি খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। এটা সেসময়ের ঘটনা যখন মুহাম্মদ সা. রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি। তিনি তখনো মক্কায়।  

মুহাম্মদ সা. বুঝতে পারলেন তাঁর স্থাপিত ইসলামী রাষ্ট্র একটি বংশের কুক্ষিগত হয়ে পড়বে। তিনি দুঃখ পেলেন। একইসাথে এও জানতে পারলেন এই বংশ ১০০০ মাস রাজত্ব করবে। 

স্বপ্ন দেখার পর বিষণ্ণ মুহাম্মদ সা.-কে পুরস্কার দিয়ে সান্ত্বনা দিলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা। তিনি সূরা কদর নাজিল করে জানালেন, আর মহিমান্বিত রাত প্রসঙ্গে আপনি কি জানেন? মহিমান্বিত রাত হাজার মাস হতেও উত্তম”। 

ইমাম তিরমিজি রহ. সূরা কদরের শানে নুজুল হিসেবে এই একটি ঘটনাকেই উল্লেখ করেছেন। 

ইউসুফ ইবনু সা’দ রহ. থেকে বর্ণিত, হাসান রা. মুআবিয়া রা.-এর নিকট বাই’আত গ্রহণের পর তাঁর সামনে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলেন, আপনি (মুআবিয়ার নিকট বায়’আত গ্রহণ করে) মু’মিনদের চেহারা কলঙ্কিত করেছেন। এতে তিনি বললেন, তুমি আমাকে অভিযুক্ত করো না। আল্লাহ তা’আলা তোমার প্রতি রহমত করুন। 

হাসান রা. বলেন, যেহেতু রাসূলুল্লাহ সা.-কে স্বপ্নে উমাইয়্যা বংশীয়দেরকে তাঁর মিম্বারের ওপর দেখানো হয়েছে। বিষয়টি তাঁর নিকট খারাপ লাগে। তখন অবতীর্ণ হয়, “আমি অবশ্যই তোমাকে কাওসার (ঝরণা) দান করেছি” (সূরাঃ আল-কাওসার-১) অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ! আমি জান্নাতে তোমাকে কাওসার নামক ঝরণা দান করেছি। আরো অবতীর্ণ হয়, “নিশ্চয় আমি এ কুরআন মহিমান্বিত রাতে অবতীর্ণ করেছি। আর মহিমান্বিত রাত প্রসঙ্গে আপনি কি জানেন? মহিমান্বিত রাত হাজার মাস হতেও উত্তম” (সূরাঃ আল-ক্বাদর-১-৩)। হে মুহাম্মাদ! আপনার পরে বনী উমাইয়্যা হাজার মাস শাসন করবে।    

- জামে আত তিরমিজি/ তাফসীরুল কুরআন / হাদিস নং ৩৩৫০

১৩২ হিজরিতে উমাইয়াদের পতন হয়। হাসান রা. ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া থেকে গণনা শুরু করলে বনু উমাইয়া ৯২ বছর ক্ষমতায় ছিল। বনু উমাইয়াদের ক্ষমতার সময়কাল ৯২ বছর  হলেও মক্কাতে তারা ৮৩ বছর শাসন করে। কারণ মক্কায় আবু বকর রা.-এর নাতি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. ৯ বছর খলিফা ছিলেন। 

উমাইয়া শাসনের ১ম শাসক মুয়াবিয়া রা.-এর মৃত্যুর আগেই তার ছেলে ইয়াজিদকে শাসন ক্ষমতার উত্তরাধিকার করে যান। এটা হাসান রা.-এর সাথে করা চুক্তির বিপরীত। তাছাড়া এটি শুরার মাধ্যমে হয়নি বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মতামত দেন। 

উমাইয়া শাসনের ২য় শাসক ইয়াজিদ ক্ষমতা গ্রহণ করলে রাসূল সা.-এর নাতি ও জান্নাতের সর্দার ইমাম হুসাইন রা. ও আবু বকর রা. এর নাতি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. যথাক্রমে মদিনা ও মক্কা থেকে বিদ্রোহ করেন। 

ইমাম হুসাইন রা. কুফায় ইয়াজিদের সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত ও শাহদাতবরণ করলেও আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. বিদ্রোহ চালিয়ে যান। তিনি ৯ বছর মক্কার খলিফা হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর উমাইয়া শাসনের এক সেনাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে ইবনে যুবাইর রা.-এর পরাজয় ঘটে ও তিনি শাহদাতবরণ করেন।  

হিসেব করলে দেখা যায় মক্কায় উমাইয়া শাসন ৮৩ বছর ছিল। যা হাজার মাসের সমান। কাসিম ইবনে ফজল রহ. বলেছেন, আমি হিসেব করে দেখেছি পুরো হাজার মাস হয়েছে। কম বেশি হয়নি। 

মুসলিম রাষ্ট্রের ক্ষত হিসেবে আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য মেহেরবানী করে লাইলাতুল কদর দান করেছেন। আসুন আমরা এই ক্ষত পূরণের চেষ্টা করি। আমাদের রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। 

আল্লাহর রাসূল সা.-এর মিম্বার কোনো বংশ, কোনো গোত্র, কোনো সেক্যুলার গোষ্ঠির কাছে যেন না যায়। আল্লাহর রাসূল সা.-এর মিম্বার তাঁর একান্ত অনুসারী ও তাঁর আদর্শ ধারণকারীদের হাতে তুলে দেওয়া আমাদের কর্তব্য।

আসুন, আমরা ইকামাতে দ্বীনের জন্য ব্যস্ত হই। আমাদের ব্যস্ততার বড় অংশ যাতে দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করেই হয়। আমাদের এই প্রচেষ্টা ও ব্যস্ততা আল্লাহ চাইলে হাজার মাসের প্রচেষ্টার বরকত দিয়ে দিবেন। ইনশাআল্লাহ।

২৩ জুল, ২০২১

ইহুদি আলিম ও মুসলিম আলিম


মদিনায় রাষ্ট্রগঠন করার পর হযরত মুহাম্মদ সা. ইহুদী গোত্রগুলোর সঙ্গে নানারূপ চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন এবং তাদের জান-মালের কোনো ক্ষতি না করার ও তাদেরকে সর্বপ্রকার ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। তারপরও ইসলামী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান উন্নতিতে ইহুদি আলিমগণ বিশেষভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলো।

প্রথমত তারা নিশ্চিত জানতো মুহাম্মদ সা. যা বলছেন তা সত্য। এর সত্যতা তারা তাদের আসমানী কিতাব তাওরাতেই পেয়েছে। সেখানে মুহাম্মদ সা.-এর সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করা হয়েছিল। যেহেতু তারা আশা ও ধারণা করেছিলো শেষ নবী তাদের বংশ থেকেই আসবে, কিন্তু সেটা না হওয়াতে তারা মুহাম্মদ সা. মেনে নিতে পারেনি।

দ্বিতীয়ত নবী আসার ধারাবাহিকতার জন্য তাদের বংশ অর্থাৎ বনী ইসরাইল অত্যন্ত সুপরিচিত, এজন্য তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবতো। এই বংশে বেশিরভাগ নবী এসেছেন। এজন্য তাদের বংশীয় অহমিকা ছিল ব্যাপক। মুহাম্মদ সা. নবী হিসেবে আসার আবির্ভাব হওয়ার পর তাদের বংশের মর্যাদা কমে গেল। তাই তারা মুহাম্মদ সা.-কে সত্য নবী জেনেও বিরোধীতা করতে থাকে।

তৃতীয়ত ধর্মীয় দিক থেকে এ পর্যন্ত ইহুদীদের এক প্রকার অহমিকা ছিলো। আল্লাহর বিশেষ বান্দা ও দ্বীনদারির দিক দিয়ে সবাই তাদেরকে শ্রদ্ধার পাত্র বলে গণ্য করতো। তারা নিজেদেরকে সাধারণ জনগণ ও আল্লাহর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতো। আল্লাহর কাছে ইহুদি আলেমদের সুপারিশ পাওয়ার আশায় জনগণ তাদের কথা শুনতে ও মানতে বাধ্য হতো। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের প্রসারের ফলে তাদের এই ভ্রান্ত ধার্মিকতা ও পেশাদারীর মুখোশ খসে পড়লো। সত্যিকার ধার্মিকতা কাকে বলে এবং যথার্থ তাকওয়ার তাৎপর্য কী, মুহাম্মদ সা.-এর বক্তব্য শুনে লোকেরা তা জানতে পরলো। ফলে ইহুদি আলিমদের পুরোহিত তন্ত্র ও ধর্ম ব্যবসায়ে মন্দাভাব দেখা দিলো।

ইহুদি আলেমদের এই সকল সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় তারা জোরালোভাবে মুহাম্মদ সা.-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করতে থাকে। তাঁকে মিথ্যা নবী দাবীদার হিসেবে সাব্যস্ত করে। বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ করে তারা সমাজে ফিতনা তৈরি করছিল। ইহুদিদের মিথ্যা প্রচারণায় মদিনার মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদারেররাও প্রভাবিত হয়।

তাদের মিথ্যা প্রচারণার জবাবে আল্লাহ তায়ালা সূরা মায়েদা, সূরা নিসা, সূরা বাকারাহ ও সূরা আলে ইমরানে ইহুদিদের সমালোচনা করেছেন ও তাদের বক্তব্যের অসারতা তুলে ধরেছেন। আর তাদের আলিমদের জন্য তিনটি বিশেষ আয়াত নাজিল করেছেন সূরা বাকারাহ'র ১৭৪-১৭৬ নং আয়াতে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, //নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর কিতাবে যে সমস্ত বিধান অবতীর্ণ করেছেন সেগুলো যারা গোপন করে এবং কিতাবের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, তারা তাদের নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই খায় না। আর কেয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তাদের সাথে কথা বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

তারাই হিদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা এবং মাগফিরাতের পরিবর্তে আজাব ক্রয় করেছে। আগুনের উপর তারা কতই না ধৈর্যশীল। তা এই কারণে যে, আল্লাহ যথার্থরূপে কিতাব নাযিল করেছেন। আর নিশ্চয়ই যারা কিতাবে মতবিরোধ উদ্ভাবন করেছে, তারা নিজেদের বিরোধের ক্ষেত্রে সত্য থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছে।//

অর্থাৎ তাওরাতের মধ্যে মুহাম্মদ সা.-এর গুণাবলী, বৈশিষ্ট্য ও ভবিষ্যতবাণী সম্পর্কিত যেসব আয়াত রয়েছে সেগুলো যেসব ইহুদি আলিম তাদের শ্রেষ্ঠত্ব চলে যাওয়ার ভয়ে গোপন করে তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে। এবং ঐ আলিম নামধারীরা সাধারণ আরবদের নিকট হতে হাদিয়া ও উপঢৌকন গ্রহণ করতো আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার জন্য, দোয়া করার জন্য তাদের এই বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তারা দুনিয়ায় অর্থ লাভ ও প্রভাবের জন্য আল্লাহর আয়াত ব্যবহার করতো এবং তাদের ইচ্ছেমত আয়াত তারা জনগণের সামনে উপস্থাপন করতো। অর্থাৎ যেসব আয়াত উল্লেখ করলে বা প্রচার হলে তাদের সমস্যা হবে সেসব আয়াত তারা গোপন রাখতো। সাধারণ জনগণকে তাওরাত পড়তে দিত না।

এখানেও এও বলা হয়েছে আল্লাহর কথা ব্যবহার করে ও আল্লাহর ভয় দেখিয়ে তারা যে অর্থ উপার্জন করছে তা প্রকৃতপক্ষে আগুনের অঙ্গার দ্বারা তারা তাদের পেট পূর্ণ করছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলা তাদের সাথে কথা পর্যন্ত বলবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না বরং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির মধ্যে পতিত হবে। কেননা, তাদের কৃতকর্মের কারণে আল্লাহ তায়ালার ক্রোধ ও অভিশাপ তাদের উপরে বর্ষিত হয়েছে এবং আজ তাদের উপর হতে আল্লাহর করুণা দৃষ্টি অপসারিত হয়েছে।

এই আয়াতের প্রসঙ্গে উস্তাদ আবুল আ'লা মওদূদী রহ. বলেন, "এখানে যেসব ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ মিথ্যা দাবি করে এবং জনগণের মধ্যে নিজেদের সম্পর্কে মিথ্যা ও বানোয়াট প্রচারণা চালায় এখানে আসলে তাদের সমস্ত দাবি ও প্রচারণার প্রতিবাদ করা হয়েছে। তারা সম্ভাব্য সকল উপায়ে নিজেদের পূত-পবিত্র সত্তার অধিকারী হবার এবং যে ব্যক্তি তাদের পেছনে চলবে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তার সুপারিশ করে তার গোনাহ খাতা মাফ করিয়ে নেয়ার ধারণা জনগনের মনে বদ্ধমূল করার চেষ্টা করে এবং জনগণও তাদের একথায় বিশ্বাস করে।

জবাবে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেছেন, আমি তাদের সাথে কথাই বলবো না এবং তাদের পবিত্রতার ঘোষণাও দেবো না"।

মওদূদী রহ. আরো বলেন, "সাধারণ লোকদের মধ্যে যত প্রকার বিভ্রান্তিকর কুসংস্কার প্রচলিত আছে এবং বাতিল রীতিনীতি ও অর্থহীন বিধি-নিষেধের যেসব নতুন নতুন শরিয়ত তৈরি হয়েছে ও বিদয়াত চালু হয়েছে এগুলোর জন্য দায়ি হচ্ছে সেই আলিম সমাজ, যাদের কাছে আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান ছিল কিন্তু তারা সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছায়নি। তারপর অজ্ঞতার কারণে লোকদের মধ্যে যখন ভুল পদ্ধতির প্রচলন হতে থাকে তখনো ঐ জালেম গোষ্ঠী মুখ বন্ধ করে বসে থেকেছে তাদের অর্থনৈতিক লাভের জন্য। তারা আল্লাহর কিতাবের বিধানের ওপর আবরণ পড়ে থাকাটাই নিজেদের জন্য লাভজনক বলে তাদের অনেকেই মনে করেছে। এদেরকেই এই আয়াতগুলোতে হুমকি দেওয়া হয়েছে"।

এবার আসুন, ঐ সময়ের ইহুদি আলিমদের যে বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল সেগুলো এখন মুসলিম আলিমদের মধ্যে দেখা যায় কিনা? ইহুদি আলিম আর মুসলিম আলিম নামধারীদের মধ্যে মিল রয়েছে কিনা?

এর উত্তর হবে বেশিরভাগ আলিম নামধারীরার এইসব দোষে দুষ্ট। তারা তাদের প্রয়োজনমতো কুরআন-হাদিস ও ইসলামকে ব্যবহার করে। জালিম শাসকের জুলুমকে বৈধতা দেয়। কুরআনের দাওয়াত দেওয়াকে ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করে। মোটা অংকের টাকা দাবি করে কুরআনের তাফসির করে। অথচ এই কাজটা ফরজ। ফরজ ইবাদতের জন্য তারা টাকা দাবি করে জনগণের কাছে।

আমাদের কিছু মুসলিম আলিমদের মধ্যে ইহুদিদের মতো মিথ্যা অহমিকা দেখা যায়। এক আলিম ওপর আলিমের সাথে বাহাস করে। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। এক ঘরানার আলিম অন্য ঘরানার আলিমদের মুর্খ হিসেবে অভিহিত করে। আবার যারা নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে নি তাদের ইসলাম নিয়ে কথা বলার অধিকার ও দাওয়াত দেওয়ার অধিকার দিতে রাজি হয় না মিথ্যা অহমিকার জন্য।

সবচেয়ে খারাপ কথা হলো তারা প্রতি কথায় উঠতে বসতে মতবিরোধ করে। মতবিরোধের জেরে এক পক্ষ অপর পক্ষকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়। এভাবে মুসলিমদের ঐক্যের সাথে থাকার, জামায়াতবদ্ধ থাকার ফরজ নির্দেশকে তারা উপেক্ষা করেন। এদের জন্য আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তারা মতবিরোধের উদ্ভব ঘটিয়ে সত্য থেকে বহুদূরে চলে গেছে।

এদেশের বেশিরভাগ আলিম নামধারীরা কোনো মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করার বিনিময়ে টাকা নেয় ও দাবি করে। কেউ কেউ তো কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সুপারিশ করার ধৃষ্টতাও দেখায়! কী ভয়ংকর! সেদিনের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে যেখানে মুহাম্মদ সা. বিচলিত, সেখানে কীভাবে তারা সুপারিশ করার ধৃষ্টতা দেখায় ইহুদিদের মতো!

আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ৪১ নং আয়াতে সরাসরি নিষেধ করে দিয়েছেন, আর আমি যে কিতাব পাঠিয়েছি তার ওপর ঈমান আন। সামান্য দামে আমার আয়াত বিক্রি করো না এবং আমাকে ভয় করো।

আল্লাহ তায়ালার এই নিষেধ সত্ত্বেও এদেশের আলিম নামের লোকেরা মোটা অংকের বিনিময়ে মাহফিল করে। এডভান্স নেয়। ফুল পেমেন্ট না করলে মাহফিলে যায় না। আবার নিজেদেরকে দ্বীনের দাঈও মনে করে। কেউ কেউ এর প্রতিবাদ করলে বলে, ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ারদের, উকিল এদের উদাহরণ টানে। বলে, তাদের থেকে টাকা দিয়ে পরামর্শ নিলে আলিমদের থেকে নিতে কী সমস্যা?

সমস্যা যে কী তা তো আল্লাহই বলে দিয়েছেন। উপরোক্ত লোকেরা কেউই আখিরাতের অংশ পাওয়ার জন্য এই কাজ করেন না। যেসব আলিম দ্বীনের দাওয়াত ও নসিহতকে অন্যান্য পেশার সাথে মিলিয়ে নিচ্ছেন তারা নিজেকে দাঈ বলা থেকে বিরত হন। নিজেকে মোটিবেশনাল বক্তা হিসেবে পরিচিত করুন। কেউ কেউ তো নিজেদেরকে কনসার্টের আর্টিস্টদের সাথেও তুলনা করেন। ভালো কথা! আপনারা নিজেদেরকে কনসার্ট/ যাত্রার বিনোদন কর্মী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করুন। এই পরিচয়ে পরিচিত হলে আমাদের কোনো কথা নাই।

নিজেদের আলিম দাবি করবেন, মুফাসসির, মুফতি, মুহাদ্দিস, ইসলামিক স্কলার এসবে পরিচিত হবেন আর আয়াত বেচে সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন তা হতে দেয়া ঠিক হবে না।

ওয়াজের মৌসুম আসছে। এখন শুরু হবে আলেম নামধারী বহু লোকের ইহুদী আচরণ। তাদের ব্যপারে সাবধান থাকুন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এদের থেকে হিফাজত করুন। ইহুদি কালচার থেকে আমাদের আলিমদের হিফাজত করুন। আল্লাহর আয়াত বেচা জাহান্নামের আগুন খাওয়া লোকদের থেকে ইলম অর্জন করতে যাবেন না।

আল্লাহ আমাদের হিফাযত করুন।

৩০ মার্চ, ২০২১

অপপ্রচার থেকে প্রসার



নতুন করে একটি সমস্যা দেখা দিল মক্কাবাসীদের সামনে। মুহাম্মদ সা. প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এসে পড়লো হজ্জের সময়। এটা তো জানা কথা যে, আরবের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিধিদল এ সময় মক্কায় আসবে। এ কারণে তারা খুব বিচলিত হয়ে পড়লো। মুহাম্মদ যদি এখন সবার কাছে তার কথাগুলো পেশ করে তবে তো সবাই নতুন ধর্মে দীক্ষিত হয়ে যাবে।

তখন তারা পরিকল্পনা করলো হাজিরা মক্কায় প্রবেশ করলে তাদেরকে মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে এমন কিছু বলবে যাতে তারা মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে সতর্ক থাকে। মুহাম্মদ সা.-এর তাবলীগ তাদের ওপর প্রভাব তৈরি না করে। তারা অনেক চিন্তা করলো কিন্তু সমাধানে আসতে পারলো না। অতএব তারা সেসময়ের একজন পণ্ডিত ব্যক্তি ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার কাছে গেল।

ওয়ালিদ বললো, প্রথমে তোমরা সবাই এই বিষয়ে একমত হবে। নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য করবে না। একজনের কথা অন্যজন মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবে, এমন যেন না হয়। এজন্য আগে ঠিক করা হবে আমরা হাজিদের কী বলবো। তারপর আমরা সবাই তা প্রচার করবো। একেকজন একেকভাবে প্রচার করলে হাজিরা আমাদের কথা বিশ্বাস করবে না। অতএব আমরা কী বলবো তা নির্ধারণ করবো।

তখন সবাই বললো, আপনি ঠিক করে দিন, আমরা কী বলবো?
ওয়ালিদ বলবো, প্রথমে তোমরা বলো, আমি শুনি। পরে সেখান থেকে একটা সিদ্ধান্তে আসা যাবে।

এরপর কয়েকজন বললো, আমরা বলব যে, তিনি একজন জ্যোতিষী।

ওয়ালিদ বললো, না তিনি জ্যোতিষী নন, আমি জ্যোতিষীদের দেখেছি, তার মধ্যে জ্যোতিষীদের মতো বৈশিষ্ট্য নেই, জ্যোতিষীরা যেভাবে অন্তঃসারশূন্য কথা বলে থাকে তিনি সেভাবে বলেন না।

এরপর আরেকজন বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন পাগল।

ওয়ালিদ বললো, না তিনি পাগলও নন। আমি পাগলও দেখেছি, পাগলের প্রকৃতিও দেখেছি। তিনি পাগলের মতো আচরণও করেন না পাগলের মতো উল্টাপাল্টা কথাও বলেন না।

লোকেরা বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন কবি।

ওয়ালিদ বললো, তিনি কবিও নন। কবিত্বের বিভিন্ন রকম আমার জানা আছে। তার কথা কবিতা নয়।

কেউ কেউ বললো, তাহলে আমরা বলব যে, তিনি একজন যাদুকর।

ওয়ালিদ বললো, না তিনি যাদুকরও নন। আমি যাদুকর এবং তাদের যাদু দেখেছি। তিনি ঝাড়ফুঁক করেননা এবং যাদু-টোনাও করেননা।

এরপর সকলে মিলে বললো, তাহলে আমরা কী বলবো হাজিদেরকে?

ওয়ালিদ বললো, আল্লাহর শপথ তার কথা বড় মিষ্টি। তার কথার তাৎপর্য অনেক গভীরতাপূর্ন। তোমরা উপরোক্ত যে কথাই বলবে শ্রোতাদেরকে, তারা যখন মুহাম্মদের কথা শুনবে তখন সবাই তোমাদের মিথ্যা মনে করবে।

তবে তার সম্পর্কে শুধু একথাই বলতে পারো যে, মুহাম্মদ একজন যাদুকর। সে যেসব কথা তা শুনতে খুবই ভালো শোনায়, সবাই মুগ্ধ হয়। তবে তার কথা শোনার পর পিতা পুত্রের মধ্যে, ভাই ভাইয়ের মধ্যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ফাসাদ তৈরি হয়। একে অপরের শত্রু হয়ে যায়। মুহাম্মদ যা বলে এগুলো মোটেই আল্লাহর পাঠানো কথা নয়। এগুলো মানুষের বানানো কথা।

ওয়ালিদ ইবনে মুগিরার কথা সবার পছন্দ হলো। সবাই সিদ্ধান্ত নিল হাজিরা মুহাম্মদের দেখা পাওয়ার আগেই তাদেরকে মুহাম্মদের ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হবে।

কোনো কোনো বর্ণনায় একথাও উল্লেখ রয়েছে যে, ওয়ালিদ যখন লোকদের সব কথা প্রত্যাখ্যান করলো তখন তারা বললো, তাহলে আপনি সুচিন্তিত মতামত পেশ করুন। এ কথা শুনে ওয়ালিদ বললো, আমাকে একটুখানি চিন্তা করার সময় দাও। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর ওয়ালিদ উপরোক্ত মন্তব্য করেছিল।

যাই হোক, মুশরিকদের এই সিদ্ধান্তে মুহাম্মদ সা. ভেবে পাচ্ছিলেন না কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন! মুসলিমরা অত্যন্ত কষ্ট পেল কুরাইশদের এই আচরণে। এই ঘটনা আল্লাহ তায়ালা সূরা মুদ্দাসসিরে উল্লেখ করেছেন ১৮ থেকে ২৬ নং আয়াতে। আল্লাহ তায়ালা ওয়ালিদ সম্পর্কে বলেন,

//সে চিন্তা ভাবনা করল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। অতঃপর সে ধ্বংস হোক! কীভাবে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল? তারপর সে ধ্বংস হোক! কীভাবে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল? তারপর সে তাকাল। তারপর সে ভ্রূকুঞ্চিত করল এবং মুখ বিকৃত করল। তারপর সে পিছনে ফিরল এবং অহংকার করল। অতঃপর সে বলল, ‘এ তো লোক পরম্পরায়প্রাপ্ত যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়’। ‘এটা তো মানুষের কথামাত্র’। অচিরেই আমি তাকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাব।//

মক্কার মুশরিকরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলো। মুশরিকরা দলবদ্ধ হয়ে হ্জ্জ যাত্রীদের আসার বিভিন্ন পথে অবস্থান নেয় এবং নবী মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে হাজিদের সতর্ক করে।

এ কাজে সবার প্রথম ছিল আবু লাহাব। হজ্জের সময়ে সে হজ্জ-যাত্রীদের ডেরায়, ওকায, মাজনা এবং যুল মায়াযের বাজারে প্রচারণা চালায়। এছাড়া সে মুহাম্মদ সা.-এর পেছনে লেগে থাকে। নবী সা. আল্লাহর দ্বীনের তাবলীগ করেন আর আবু লাহাব পেছনে থেকে বলে, তোমরা ওর কথা শুনবে না, সে হচ্ছে মিথ্যাবাদী, বিদয়াতী এবং বেদ্বীন।

মুশরিকরা তাদের ষড়যন্ত্র করে। ইসলামের ক্ষতি করাই হয় তাদের পরিকল্পনার বেসিক উদ্দেশ্য। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা থাকে অন্যরকম। হজ্বের আগে মুহাম্মদ সা.-এর চিন্তা করছিলেন কীভাবে এতো মানুষের কাছে তিনি পৌঁছবেন! কেউ তার কথার গুরুত্ব দিবে কিনা এই নিয়েও তিনি সন্দিহান ছিলেন। এতো মানুষের কাছে একা পৌঁছানো প্রায় দুঃসাধ্য ছিল।

অথচ মুশরিকরা তাঁর এই কাজকে সহজ করে দিয়েছিল। তাদের ছুটোছুটি, তোড়জোড় ও সতর্ক করার ফলে হাজিরা মুহাম্মদ সা.-কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন। অনেকেই মুহাম্মদ সা.-কে দেখতে এলেন। কেউ কেউ কথা বললেন ও শুনলেন। মোটকথা হজ্জ যাত্রীরা সবাই জানতে পারলো যে, মক্কায় মুহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি নবুয়্যতের দাবি করেছে। তার কথা খুবই হৃদয়গ্রাহী ও আকর্ষণীয়।

প্রকাশ্য দাওয়াতের ১ম বছরেই সারা আরবে ও আরবের বাইরেও কিছু কিছু এলাকায় খবর পৌঁছে গেল শেষ নবী মুহাম্মদ সা.-এর আগমন হয়েছে।

২ মার্চ, ২০২১

মিরাজ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দিক নির্দেশনা



নবুয়্যুতের দশম বছরে অর্থাৎ আমাদের প্রিয় নবীর বয়স যখন পঞ্চাশ বছর তখন এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। একদিন রাত্রে যখন কা’বায় রাসূলুল্লাহ সা. শুয়ে ছিলেন, তখন তাঁর নিকট তিনজন ফেরেশতা আসেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম জন জিজ্ঞেস করেন, “ইনি এই সবের মধ্যে কে?” মধ্যজন উত্তরে বলেনঃ “ইনি এসবের মধ্যে উত্তম।” তখন সর্বশেষজন বলেনঃ “তা হলে তাঁকে নিয়ে চলো।” ঐ রাত্রে এটুকুই ঘটলো। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁদেরকে দেখতে পেলেন না, কিন্তু শুনতে পেয়েছেন।

দ্বিতীয় রাত্রে আবার ঐ তিনজন ফেরেশতা আসলেন। ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ সা. ঐ সময়েও শুয়ে ছিলেন। ঐ রাত্রে তাঁরা কোনো আলাপ আলোচনা করেন নাই। তাঁরা নবীকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে যমযম কূপের নিকট শায়িত করেন এবং জিবরাঈল আ. তাঁর গলা থেকে বুক পর্যন্ত বিদীর্ণ করে দেন এবং বক্ষ ও পেটের সমস্ত জিনিস বের করে নিয়ে জমজমের পানি দ্বারা ধুয়ে নেন।

যখন খুব পরিষ্কার হয়ে যায় তখন তাঁর কাছে একটা সোনার থালা আনা হয় যাতে বড় একটি সোনার পেয়ালা ছিল। ওটা ছিল হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ। ওটা দ্বারা তাঁর বক্ষ ও গলার শিরাগুলিকে পূর্ণ করে দেন। তারপর বক্ষকে শেলাই করে দেওয়া হয়। এরপর মুহাম্মদ সা. পূর্ণ জাগ্রত ও চেতনা ফিরে পান। এরপরের বর্ণনা আমরা তাঁর নিজের মুখেই শুনি যা বায়হাকিতে বর্ণিত হয়েছে।

"আমি উঠে বসলাম কিন্তু কাউকেও দেখতে পেলাম না। তবে জানোয়ারের মত একটা কি দেখলাম এবং গভীরভাবে দেখতেই থাকলাম। অতঃপর মসজিদ হতে বেরিয়ে দেখতে পেলাম যে, একটা বিস্ময়কর জন্তু দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাদের জন্তগুলির মধ্যে খচ্চরের সঙ্গে ওর কিছুটা সাদৃশ্য ছিল। ওর কান দুটি ছিল উপরের দিকে উত্থিত ও দোদুল্যমান। ওর নাম হচ্ছে বুরাক। আমার পূর্ববর্তী নবীরাও এরই ওপর সওয়ার হয়ে এসেছেন। আমি ওরই উপর সওয়ার হয়ে চলতেই রয়েছি এমন সময় আমার ডান দিক থেকে একজন ডাক দিয়ে বললো, “হে মুহাম্মদ সা.! আমার দিকে তাকাও, আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো।” কিন্তু আমি না জবাব দিলাম, না দাঁড়ালাম। এরপর কিছু দূর গিয়েছি এমন সময় বাম দিক থেকেও ডাকের শব্দ আসলো। কিন্তু এখানেও আমি থামলাম না এবং জবাবও দিলাম না। আবার কিছু দূর অগ্রসর হয়ে দেখি যে, একটি স্ত্রীলোক দুনিয়ার সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেও আমাকে বললো, “আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাই। কিন্তু আমি তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করলাম না এবং থামলামও না।”

এরপর আমি বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছালাম, জিব্রাঈল আমাকে দুটি পাত্র দিলেন, একটি ছিল দুধের পাত্র অন্যটি মদের। আমি দুধ পছন্দ করেছিলেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার চেহারায় চিন্তারভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে কেন?”

আমি তখন পথের ঘটনা তিনটির কথা বর্ণনা করলাম। তিনি তখন বলতে শুরু করলেনঃ “প্রথম লোকটি ছিল ইয়াহূদী। যদি আপনি তার কথার উত্তর দিতেন এবং সেখানে দাঁড়াতেন তবে আপনার উম্মত ইয়াহুদী হয়ে যেতো। দ্বিতীয় আহ্বানকারী ছিল খৃষ্টান। যদি আপনি সেখানে থেমে তার সাথে কথা বলতেন তবে আপনার উম্মত খৃস্টান হয়ে যেতো। আর ঐ স্ত্রী লোকটি ছিল দুনিয়া। যদি আপনি সেখানে থেমে তার সাথে কথা বলতেন তবে আপনার উম্মত আখেরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে হতো।”

অতঃপর আমি এবং হযরত জিবরাঈল বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলাম এবং দু’জনই দু'রাকাত করে নামায আদায় করলাম। (বাইতুল মুকাদ্দাস হজরত ইব্রাহিম আ.-এর যুগ হতে নবীদের কেন্দ্রস্থল ছিল। আর একারনেই সব নবী সা.-এর সাথে মহানবীকে একত্রিত করা হয়। এবং মহানবী সা. সকল নবীকে সাথে নিয়ে নামাজে ইমামতি করেন।)

তারপর আমাদের সামনে মি'রাজ (আরোহণের সিঁড়ি) হাজির করা হলো। দুনিয়া এইরূপ সুন্দর জিনিস আর কখনো দেখে নাই। তোমরা কি দেখ না যে, মরণান্মুখ ব্যক্তির চক্ষু মরণের সময় আকাশের দিকে উঠে থাকে? এটা দেখে বিস্মিত হয়েই সে ঐরূপ করে থাকে। আমরা দু’জন ওপরে উঠে গেলাম। আমি ইসমাঈল নামক ফেরেস্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি দুনিয়ার আকাশের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। তার অধীনে সত্তর হাজার ফেরেশতা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রত্যেক ফেরেশতার সঙ্গীয় ফেরেশতাদের সংখ্যা হলো এক লাখ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমার প্রতিপালকের সৈন্যদেরকে শুধুমাত্র তিনিই জানেন।”

হযরত জিবরাঈল আ. আকাশের দরজা খুলতে বললে জিজ্ঞেস করা হলো, “কে?” তিনি উত্তর দিলেন, “জিবরাঈল (আঃ)।” প্রশ্ন করা হলো, “আর কে আছেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “হযরত মুহাম্মদ সা.।” পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো আপনাকে কি তাঁর নিকট পাঠান হয়েছিল?” তিনি জবাব দিলেনঃ “হ্যাঁ”

অতঃপর ১ম আসমানে প্রবেশ করলাম। সেখানে আমি হযরত আদমকে আ.-কে দেখলাম। জিবরাঈল আদম আ.-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। বলেন, “ইনি আপনার পিতা হযরত আদম আ.। তাঁকে সালাম দিন।” হযরত আদম আ. সালামের জবাব দেন এবং মারহাবা বলে অভ্যর্থনা জানান ও বলেন, “আপনি আমার খুবই উত্তম ছেলে। কিছু দূর গিয়ে দেখি যে, একটি ঝুড়ি রাখা আছে এবং তাতে অত্যন্ত উত্তম ভাজা গোশত রয়েছে আর এক দিকে রয়েছে আর একটি ঝুড়ি। তাতে আছে পঁচা দুর্গন্ধময় ভাজা গোশত।

এমন কতকগুলি লোককে দেখলাম যারা উত্তম গোশতের কাছেও যাচ্ছে না এবং ঐ পচা দুর্গন্ধময় ভাজা গোশত খেয়ে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “হে জিবরাঈল! এই লোকগুলি কারা?” উত্তরে তিনি বলেন, “এরা হলো আপনার উম্মতের ঐ সব লোক যারা হালাল কে ছেড়ে হারামের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে।”

আরো কিছু দূর অগ্রসর হয়ে দেখি যে, কতকগুলি লোকের ঠোঁট উটের মত। ফেরেস্তারা তাদের মুখ ফেড়ে ফেড়ে ঐ গোশত তাদের মখের মধ্যে ভরে দিচ্ছেন। যা তাদের অন্য পথ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তারা ভীষণ চীৎকার করছে এবং মহান আল্লাহর সামনে মিনতি করতে রয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ “এরা কারা?” জবাবে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বললেনঃ “এরা আপনার উম্মতের ঐসব লোক যারা ইয়াতীমদের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতো। যারা ইয়াতীমদের মাল অন্যায়ভাবে খায় তারা নিজেদের পেটের মধ্যে আগুন ভরে দিচ্ছে এবং অবশ্য অবশ্যই তারা জাহান্নামের জ্বলন্ত অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করবে।”

আরো কিছু দূর গিয়ে দেখি যে, কতকগুলি স্ত্রী লোক নিজেদের বুকের ভরে লটকানো রয়েছে এবং হায়! হায়! করতে আছে। আমার প্রশ্নের উত্তরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) বলেনঃ “এরা হচ্ছে আপনার উম্মতের ব্যভিচারিণী স্ত্রীলোক।”

আর একটু অগ্রসর হয়ে দেখি যে, কতকগুলি লোকের পেট বড় বড় ঘরের মত। যখন উঠতে চাচ্ছে তখন পড়ে যাচ্ছে এবং বার বার বলতে আছেঃ “হে আল্লাহ! কিয়ামত যেন সংঘটিত না হয়।” আর তারা হা-হুতাশ করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জবাবে হযরত জিবরাঈল আ. বললেন, এরা হচ্ছে আপনার উম্মতের ঐ সব লোক যারা সুদ খেতো। সুদখোররা ঐ লোকদের মতই দাঁড়াবে যাদেরকে শয়তান পাগল করে রেখেছে।

আরো কিছু দূর গিয়ে দেখি যে, কতকগুলি লোকের পার্শ্বদেশের গোশত কেটে কেটে ফেরেশতাগণ তাদেরকে খাওয়াচ্ছেন। আর তাদেরকে তারা বলতে আছেন, “যেমন তোমরা তোমাদের জীবদ্দশায় তোমাদের ভাইদের গোশত খেতে তেমনই এখনো খেতে থাকো।” আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিবরাঈল! এরা কারা? উত্তরে তিনি বললেনঃ “এরা হচ্ছে আপনার উম্মতের ঐ সব লোক যারা অপরের দোষ অন্বেষণ করে বেড়াতো।”

এরপর আমরা দ্বিতীয় আকাশে আরোহণ করলাম। সেখানে আমি একজন অত্যন্ত সুদর্শন লোককে দেখলাম। তিনি সুদর্শন লোকদের মধ্যে ঐ মর্যাদাই রাখেন যেমন মর্যাদা রয়েছে চন্দ্রের তারকারাজির উপর। জিজ্ঞেস করলামঃ ইনি কে? জবাবে হযরত জিবরাঈল আ. বললেন, “ইনি হলেন আপনার ভাই ইউসুফ আ.” তাঁর সাথে তাঁর কওমের কিছু লোক রয়েছে। আমি তাদেরকে সালাম করলাম এবং তারা আমার সালামের জবাব দিলেন।

তারপর আমরা তৃতীয় আকাশে আরোহণ করলাম। আকাশের দরজা খুলে দেয়া হলো। সেখানে আমি হযরত ইয়াহইয়া আ. ও হযরত যাকারিয়াকে আ. দেখলাম। তাদের সাথে তাঁদের কওমের কিছু লোক ছিল। আমি তাদেরকে সালাম করলাম এবং তারা আমার সালামের উত্তর দিলেন।

এরপর আমরা চতুর্থ আকাশে উঠলাম। সেখানে হযরত ইদ্রীসকে আ. দেখলাম। আল্লাহ তাআলা তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। আমি তাকে সালাম করলাম। তিনি আমার সালামের জবাব দিলেন।

অতঃপর আমরা পঞ্চম আকাশে আরোহণ করলাম। সেখানে ছিলেন হযরত হারুন আ.। তাঁর শ্মশ্রুর অর্ধেকটা সাদা ছিল এবং অর্ধেকটা কালো ছিল। তাঁর শ্মশ্রু ছিল অত্যন্ত লম্বা, তা প্রায় নাভী পর্যন্ত লটকে গিয়েছিল। আমার প্রশ্নের উত্তরে হযরত জিবরাঈল আ. বললেন, “ইনি হচ্ছেন তাঁর কওমের মধ্যে হৃদয়বান ব্যক্তি হযরত হারুন ইবনু ইমরান আ.। তাঁর সাথে তাঁর কওমের একদল লোক ছিল। তারাও আমার সালামের উত্তর দেন।

তারপর আমরা আরোহণ করলাম ষষ্ঠ আকাশে। সেখানে আমার সাক্ষাৎ হলো হযরত মুসা ইবনু ইমরানের আ. সঙ্গে। আমি হযরত জিবরাঈলকে আ. জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, ইনি হচ্ছেন হযরত মুসা ইবনু ইমরান আ.। তার পার্শ্বেও তার কওমের কিছু লোক ছিল। তিনিও আমার সালামের জবাব দিলেন।

তারপর আমরা সপ্তম আকাশে উঠলাম। সেখানে আমি আমার পিতা হযরত ইবরাহীম খলীল আ.-কে দেখলাম। তিনি স্বীয় পৃষ্ঠ বায়তুল মা'মুরে লাগিয়ে দিয়ে বসে রয়েছেন। জিজ্ঞেস করে আমি তাঁর নামও জানতে পারলাম। আমি সালাম করলাম এবং তিনি জবাব দিলেন। আমি আমার উম্মতকে দু'ভাগে বিভক্ত দেখলাম। অর্ধেকের কাপড় ছিল বকের মত সাদা এবং বাকী অর্ধেকের কাপড় ছিল অত্যন্ত কালো। আমি বায়তুল মামুরে গেলাম।

সাদা পোশাকযুক্ত লোকগুলি সবাই আমার সাথে গেল এবং কালো পোশাকধারী লোকদেরকে আমার সাথে যেতে দেওয়া হলো না। আমরা সবাই সেখানে নামায পড়লাম। তারপর সবাই সেখান হতে বেরিয়ে আসলাম। এই বায়তুল মামুরেই প্রত্যহ সত্তর হাজার ফেরেশতা নামায পড়ে থাকেন। কিন্তু যারা একদিন নামায পড়েছেন তাঁদের পালা কিয়ামত পর্যন্ত আসবে না। অতঃপর আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় উঠিয়ে নেয়া হলো। যার প্রত্যেকটি পাতা এতো বড় যে, আমার সমস্ত উম্মতকে ঢেকে ফেলবে।” তাতে একটি নহর প্রবাহিত ছিল যার নাম সালসাবীল। এর থেকে দু'টি প্রস্রবণ বের হয়েছে। একটি হলো নহরে কাওসার এবং আর একটি নহরে রহমত। আমি তাতে গোসল করলাম। আমার পূর্বাপর সমস্ত পাপ মোচন হয়ে গেল।

এরপর আমাকে জান্নাতের দিকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমি একটি হুর দেখলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কার? উত্তরে সে বললো, “আমি হলাম হযরত যায়েদ ইবনু হারেসার। সেখানে আমি নষ্ট না হওয়া পানি, স্বাদ পরিবর্তন না হওয়া দুধ, নেশাহীন সুস্বাদু শরবত এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মধুর নহর দেখলাম। সেখানে ডালিম ফল বড় বড় বালতির সমান ছিল। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাঁর সৎবান্দাদের জন্যে ঐ সব নিয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন যা কোন চক্ষু দর্শন করে নাই, কোন কর্ণ শ্রবণ করে নাই এবং কোন অন্তরে কল্পনাও জাগে নাই।

অতঃপর আমার সামনে জাহান্নাম পেশ করা হলো, যেখানে ছিল আল্লাহ তাআলার ক্রোধ, তার শাস্তি এবং তাঁর অসন্তুষ্টি। যদি তাতে পাথর ও লোহ নিক্ষেপ করা হয় তবে ওগুলিকেও খেয়ে ফেলবে। এরপর আমার সামনে থেকে ওটা বন্ধ করে দেওয়া হলো।

আবার আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছিয়ে দেয়া হলো এবং ওটা আমাকে ঢেকে ফেললো (সিদরাতুল মুনতাহা হলো একটি রহস্যময় বরই গাছ। যা সপ্তাকাশে অবস্থিত)। সেখানে আমার ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হলো। আর আমাকে বলা হলো, “তোমার জন্যে প্রত্যেক ভাল কাজের বিনিময়ে দশটি পূণ্য রইলো। তুমি যখন কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করবে, অথচ তা পালন করবে না, তথাপি একটি পূণ্য লিখা হবে। আর যদি করেও ফেল তবে দশটি পূর্ণ লিপিবদ্ধ হবে। পক্ষান্তরে যদি কোন খারাপ কাজের ইচ্ছা কর, কিন্তু তা না কর তবে একটিও পাপ লিখা হবে না। আর যদি করে বস তবে মাত্র একটি পাপ লিখা হবে।”

আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রাসূল সা.-এর কাছে নির্দেশ করা হয়, যাতে তাঁর উম্মতের উপর প্রত্যহ দিনরাত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়। যখন তিনি সেখান হতে নেমে আসেন তখন হযরত মূসা আ. তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে আপনি কি হুকুম প্রাপ্ত হলেন?” উত্তরে তিনি বললেনঃ “দিন রাত্রে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায।” হযরত মূসা আ. এ হুকুম শুনে বললেন, “এটা আপনার উম্মতের ক্ষমতার বাইরে। আপনি ফিরে যান এবং কমানোর জন্যে প্রার্থনা করুন।” তাঁর একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সা. জিবরাঈলের আ.-এর দিকে পরামর্শ চাওয়ার দৃষ্টিতে তাকান এবং তিনি ইঙ্গিতে সম্মতি দান করেন।

তিনি পুনরায় আল্লাহ তাআলার নিকট গমন করেন এবং স্বস্থানে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেন, “হে আল্লাহ! হালকা করে দিন। এটা পালন করা আমার উম্মতের সাধ্য হবে না।” আল্লাহ তাআলা তখন দশ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ফিরে আসলেন। হযরত মূসা আ. আবার তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করেনঃ “কি হলো?” জবাবে তিনি বললেনঃ “দশ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দিলেন।” একথা শুনে হযরত মূসা আ. তাঁকে বললেন, “যান, আরো কমিয়ে আনুন।” এভাবে কমিয়ে পাঁচে নামানো হলো।

শেষে যখন পাঁচ ওয়াক্ত বাকী থাকলো তখন ফেরেশতার মাধ্যমে ঘোষণা করা হলো, “আমার ফরজ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আমি আমার বান্দার উপর হাল্কা করলাম। তাকে প্রত্যেক সৎ কাজের বিনিময়ে দশটি পূণ্য দান করা হবে।” এর পরেও হযরত মুসা আ. আমাকে আল্লাহ তাআলার নিকট ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমি বললাম, এখন আমাকে আবারও যেতে লজ্জা লাগছে। এরপর আমি আবার কাবায় ফিরে এলাম।"

পরদিন সকালে হযরত মুহাম্মদ সা. মক্কার জনগণের সামনে এই সব বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণনা করেন যে, তিনি গত রাত্রে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছেছেন, তাঁকে আকাশ সমূহে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং তিনি এটা, ওটা দেখেছেন। তখন আবু জেহেল ইবনু হিশাম বলতে শুরু করে, “আরে দেখো, বিস্ময়কর কথা শুনো! আমরা উটকে মেরে পিটে দীর্ঘ এক মাসে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে থাকি। আবার ফিরে আসতেও এক মাস লেগে যায়, আর এ বলছে যে, সে দু'মাসের পথ এক রাত্রেই অতিক্রম করেছে!”

রাসূলুল্লাহ সা. তখন তাকে বললেন, “শোন, যাওয়ার সময় আমি তোমাদের যাত্রীদলকে (মক্কার ব্যবসায়ীদল) অমুক জায়গায় দেখেছিলাম। অমুক রয়েছে অমুক রঙ এর উটের উপর এবং তার কাছে রয়েছে এইসব আসবাবপত্র।” আবু জেহেল তখন বললো, খবর তো তুমি দিলে, দেখা যাক, কি হয়?”

তখন তাদের মধ্যে একজন বললো, “আমি বায়তুল মুকাদ্দাসের অবস্থা তোমাদের চাইতে বেশী জানি। মুকাদ্দাসের ইমারত, ওর আকৃতি, পাহাড় হতে ওটা কাছাকাছি হওয়া ইত্যাদি সবই আমার জানা আছে। সুতরাং আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই, মুহাম্মদ আমাকে বাইতুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে বলুন। ওটা কেমন দেখতে?

আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহর সা.-এর সামনে বায়তুল মুকাদ্দাসকে হাজির করে দিলেন। তিনি এর গঠনাকৃতি এই প্রকারের, ওর আকার এইরূপ এবং ওটা পাহাড় থেকে এই পরিমাণ নিকটে রয়েছে ইত্যাদি সব বলে দিতে লাগলেন। ঐ লোকটি একথা শুনে বললো, “নিশ্চয়ই আপনি সত্য কথাই বলছেন।” অতঃপর সে কাফিরদের সমাবেশের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বললো, “মুহাম্মদ নিজের কথায় সত্যবাদী।”

এই ঘটনা যখনই কেউ শুনেছে তখন সে বিস্ময়বোধ করেছে ও প্রথমেই বিশ্বাস করতে চায়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম হলেন আবু বকর রা.। তিনি শোনামাত্রই বিশ্বাস করলেন নবী সা.-এর কথা। এজন্য তিনি সিদ্দিক উপাধি লাভ করেন।

আর এই ঘটনা মিরাজের ঘটনা নামে পরিচিত। মিরাজ মানে হলো আরোহন করা। ইসলামী পরিভাষায় নবীজি সা.-এর উর্ধাকাশে আরোহন করাকে মিরাজ বলে। অনেকে এটাকে আত্মিক ও স্বপ্নে ভ্রমণ বলে থাকেন ও বিশ্বাস করেন। তবে আল্লাহর রাসূল সা. এমনটা বলেননি। যখন মক্কার মুশরিকরা এই বর্ণনা নিয়ে হাসাহাসি ও ইয়ার্কি করা শুরু করলো তখনো রাসূল সা. বলেছেন, আল্লাহ চাইলে বহু দূরত্বের পথ মুহূর্তেই পাড়ি দেওয়া যায়। যদি বিষয়টা শারীরিক ভ্রমণ না হয়ে আত্মিক হতো তবে অবশ্যই মুশরিকদের জবাবে রাসূল সা. তা বলতেন। কারণ তারা দূরত্বে বিষয়টাকেই হাইলাইট করে ইয়ার্কি করেছিল। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতে বিশ্বাস হলো মহানবী সা. শারিরীকভাবেই মসজিদুল আকসা ও আকাশে ভ্রমণ করেছিলেন।

মিরাজের ঘটনা নিয়ে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা বানী ইসরাঈলের ১ম আয়াত নাজিল করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, //পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি। যাতে আমি তাঁকে আমার কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।//

মিরাজের রাতে নবী করিম সা. ও তাঁর উম্মতের জন্য কয়েকটি জিনিস প্রদান করা হয়—

প্রথমত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ; যা প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত ছিল।

দ্বিতীয়ত, তাঁর উম্মতের যেসব ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না, আল্লাহ তাঁর পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন।

তৃতীয়ত, সূরা আল-বাকারার শেষাংশ।

চতুর্থত, সূরা বনি ইসরাইলের ১৪ দফা নির্দেশনা। মহানবী (সা.) মেরাজ থেকে ফিরে আসার পর সুরা বনি ইসরাইলের মাধ্যমে ১৪টি দফা মানুষের সামনে পেশ করেন। বর্তমান সময়ে ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ সংস্কারে এই ১৪ দফা বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

১. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর সঙ্গে কারও শরিক না করা, ২. পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, ৩. আত্মীয়স্বজন, এতিম ও মুসাফিরের হক মেনে চলা, ৪. অপচয় না করা, ৫. অভাবগ্রস্ত ও প্রার্থীকে বঞ্চিত না করা, ৬. হাত গুটিয়ে না রেখে সব সময় কিছু দান করা, ৭. অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা না করা, ৮. দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা, ৯. ব্যভিচারের নিকটবর্তী না হওয়া, ১০. এতিমের সম্পদের ধারেকাছে না যাওয়া, ১১. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, তা অনুসন্ধান করা, ১২. মেপে দেওয়ার সময় সঠিক ওজন পরিমাপ করা, ১৩. প্রতিশ্রুতি পালন করা, ১৪. পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা না করা।