২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২

ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকটে ইডেনের মেয়েরা!

গত কয়েকদিন ধরে ইডেন মহিলা কলেজে ছাত্রলীগের নেত্রীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় দেশ তোলপাড়। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ভয়ংকর সব অভিযোগ। ইডেন মহিলা কলেজের মেয়েদের মধ্যে যাদের ঢাকায় থাকার ব্যবস্থা নেই এবং যারা বাসা ভাড়া করে থাকার সামর্থ রাখে না তারাই বাধ্য হয়ে কলেজের হোস্টেলে থাকতে হয়। হোস্টেলে থাকতে বাধ্য হওয়া মেয়েদের ছাত্রলীগের কাছে জিম্মি হয়ে থাকতে হয়। ছাত্রলীগের কথামত না চললে তারা হোস্টেলে থাকতে পারে না।


ছাত্রলীগের নেত্রীরা প্রথমত নতুন ছাত্রীদের থেকে চাঁদা কালেকশন করে। বিভিন্ন মিছিল সমাবেশে তাদের যেতে বাধ্য করে। দ্বিতীয়ত তাদের মধ্যে যাদের চেহারা ভালো তাদেরকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামীলীদের নেতাদের বাসায় এবং আবাসিক হোটেলে যেতে বাধ্য করে। তৃতীয়ত নতুন ছাত্রীদের মধ্যে যারা রাজনৈতিক সচেতন তাদেরকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ও দেহব্যবসার লভ্যাংশ দিয়ে লাঠিয়াল বানায়। এই লাঠিয়ালরাই কয়েকবছর পর নেত্রী হয়ে যায় ও উপরোক্ত কাজগুলো করে।

ইডেনের এই ভয়াবহ অবস্থার খবর প্রথম সংবাদ মাধ্যমে আসে ২০১০ সালের মার্চ মাসে। সেসময় ধারণা করা হয়েছে এই টোটাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো ওবায়দুল কাদের। সেসময় এই নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হয় কিন্তু এর কোনো সমাধান হয় না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইডেনের ছাত্রীরা। ১৩ মার্চ ২০১০ সালে আমার দেশ পত্রিকায় এই ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনে জানা যায়,

//রাজধানীর সরকারি ইডেন কলেজে এবার দেহব্যবসার ঘটনা নিয়ে ছাত্রলীগের দুগ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এ নিয়ে গতকাল দু'পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাংচুর ও সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় গ্রুপের কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দু'পক্ষের নেতাকর্মীরা হকিস্টিক, রড, স্ট্যাম্প নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। দু'পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে অনু, তানিয়া, রূপা, রুমানা, কণা, লুচি, স্বর্ণা, লাবনীসহ কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছে। এছাড়া জেবুন্নেসা হলের ২০৮, খোদেজা বেগম হলের ২০৫ ও পুরাতন হলের ২ (ক) নম্বর কক্ষটিতে ভাংচুর করে মালামাল লুট করা হয়েছে।

ছাত্রলীগের জুনিয়র কর্মী ছাড়াও সাধারণ ছাত্রীদের দিয়ে দেহব্যবসা ও ভর্তি বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের সূত্রপাত। দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্রীদের জোরপূর্বক ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের বাসায় নেয়া ছাড়াও রাজধানীর কাকরাইল, গুলিস্তান, এলিফেন্ট রোড, মালিবাগ, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, নাখালপাড়া, মীরপুরের আবাসিক হোটেলগুলোতে সংগঠনের জুনিয়র কর্মী ছাড়াও প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীদের বাধ্য করে নিয়ে যাওয়া হতো।

এছাড়া চলতি শিক্ষাবর্ষে ৩ শতাধিক ভর্তিচ্ছু এবং শতাধিক ছাত্রীর সাবজেক্ট পরিবর্তনের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকা ব্যবসা করেছে ছাত্রলীগ। এ সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। একটি পক্ষ বলছে, কলেজের সভাপতি জেসমিন শামীমা নিঝুম ও সাধারণ সম্পাদক ফারজানা ইয়াসমিন তানিয়াসহ কয়েকজন প্রথম সারির নেত্রী ছাত্রীদের দিয়ে দেহব্যবসা ও ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। আবার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পক্ষ বলছে, যারা ছাত্রীদের দিয়ে দেহব্যবসা করায় তার প্রতিবাদ করায়ই আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।

নিঝুম গ্রুপের তানিয়া বলেন, আমি রাজিয়া হলের ২১০ নম্বর কক্ষে থাকি। বেশ কিছুদিন ধরে ছাত্রলীগের বড় আপা চম্পা ও কানিজ আমাকে অবৈধ কাজে অফার করে। এতে আমি রাজি না হলে গতকাল আমাকে রুমেই মারধর করে চম্পা ও কানিজ। জানা গেছে, কলেজের জেবুন্নেসা হলের ২০৮ নম্বর কক্ষের এক ছাত্রীকে ও খোদেজা বেগম হলের ২০৫ নম্বর কক্ষের এক ছাত্রীকে ছাত্রলীগ ও এক মন্ত্রীর বাসায় যাওয়ার প্রস্তাব দেয় সভাপতি নিঝুম ও সাধারণ সম্পাদক তানিয়া গ্রুপ। প্রস্তাবে রাজি না হয়ে ওই দুই ছাত্রী বিষয়টি অন্যদের কাছে প্রকাশ করে দেন। সমাজকর্ম বিভাগের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী মাহফুজা খানম স্বর্ণা বলেন, সভাপতি নিঝুম ও সাধারণ সম্পাদক তানিয়া আমাকে সব ধরনের অফার করেছে।

বিভিন্ন নেতার বাসায় যাওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছে। আমি তাদের কথা না শোনায় আমার রুম ভাঙচুর করে তালা দিয়ে সবকিছু নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতেও আমাকে এক মন্ত্রীর বাসায় যেতে বলেছিল নিঝুম। তার কথা না শোনায় আমাকে তার কর্মীরা মারধর করেছে।

অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী লাবনী আক্তার বলেন, আমার চৌদ্ধগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। আমি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কথামতো না চলায় আমাকে শিবির বানিয়ে হল থেকে বের করে দিয়েছে। আমাকে সব ধরনের অফার করা হয়েছিল। তিনি বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক টাকার বিনিময়ে নবম শ্রেণীর মেয়েদেরও হলে রেখে তাদের দিয়ে দেহব্যবসা করাচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে শিবির বলে হল থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই দু'পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল।

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দু'গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। জানা গেছে, ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে সভাপতি নিঝুম ও তানিয়া ইডেনে কয়েকশ ছাত্রীকে অবৈধভাবে ভর্তি করায়। প্রত্যেকের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা নেয়া হয়। এছাড়া কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহফুজা চৌধুরীর সঙ্গে সমঝোতা করে কয়েকশ ছাত্রীর সাবজেক্ট পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা ব্যবসা করে। এদের প্রত্যেকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা নেয়া হয়।

ভাগ-বাটোয়ারার ক্ষেত্রে জুনিয়রদের একটি করে ছাত্রী ভর্তি করার সুযোগ দেয়া হয়। প্রত্যাশিত ভাগ না পেয়ে এর প্রতিবাদ করায় তিন মাস আগে সাংগঠনিক সম্পাদক শর্মী ও হ্যাপিকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে সভাপতি জেসমিন শামীমা নিঝুম বলেছেন, ওই দুই নেত্রী ছাত্রীদের দিয়ে দেহব্যবসার মতো কাজ করিয়েছে। এজন্য তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি সব ধরনের অনিয়মের বিপক্ষে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। আমাকে সরাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সিদ্দিকী নাজমুল আলম ষড়যন্ত্র করছেন। সভাপতি নিঝুম গ্রুপের ছাত্রলীগ কর্মীরা বলেন, কিছুদিন আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সিদ্দিকী নাজমুল আলম ও ইডেনের সহ-সভাপতি চম্পা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তারা বিয়ে করে মিরপুরে বাসা নিয়ে থাকছেন। ওই বাসায় আরও পাঁচ থেকে ছয়জন ছাত্রীকে রেখে তারা দেহব্যবসা করাচ্ছে।

এর সঙ্গে বহিষ্কৃত নেত্রী হ্যাপী, শর্মী, চম্পা, কানিজ জড়িত। আমরা ওই ঘটনার প্রতিবাদ করায় আমাকে সরাতে ষড়যন্ত্র করছে। শর্মী ও হ্যাপি, সহ-সভাপতি চম্পা খাতুন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের হ্যাপী, ইতিহাস বিভাগের কানিজ, অর্থনীতি বিভাগের লিজা, বি.কমের মিশু, সমাজকর্ম বিভাগের স্বর্ণা, ইতিহাস বিভাগের মিনাসহ আরও ক'জন আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। সহ-সভাপতি চম্পা খাতুন বলেন, ইডেনের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে অনেকদিন আগেই। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে থাকতে সম্প্রতি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছে নিঝুম ও তানিয়া।

এছাড়া তারা ছাত্রীদের দিয়ে দেহব্যবসা, ভর্তি বাণিজ্যসহ সব ধরনের অপকর্ম করছে। হলের ছাত্রীদের জিম্মি করে রেখেছে। তাদের কবল থেকে বের হয়ে ছাত্রীরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। এছাড়া এই চক্রটি ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত।//

২৫ জানুয়ারি ২০১৫ সালে জাগো নিউজে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়,
//২০১২ সালের ৬ ডিসেম্বর জেসমিন আক্তার নিপাকে সভাপতি ও ইশরাত জাহান অর্চিকে সাধারণ সম্পাদক করে শাখা ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এছাড়া ৯ জনকে সহ-সভাপতি, পাঁচজনকে যুগ্ম সম্পাদক, চারজনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। নতুন কমিটি ঘোষণার পর থেকেই বিনা কারণে ছাত্রীদেরকে মারধর, ব্যক্তিগত কাজে ছাত্রীদেরকে কাজে লাগানো, বাহির থেকে ছেলে নিয়ে এসে হলে ফুর্তি করা, হলে মাদকের আড্ডা, প্রশ্ন ফাঁস ও ভর্তি বাণিজ্য, অজ্ঞাত স্থানে যাওয়া-আসাসহ নানা অভিযোগ ওঠে নেত্রীদের বিরুদ্ধে।

কলেজ প্রশাসন জানায়, কলেজের ৬টি হলেই সিট দেয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্রলীগ। অনেক ক্ষেত্রে বহিরাগতদের অবৈধভাবে হলে রেখে ভাড়া আদায় করেন তারা। এছাড়া কলেজের আশপাশে থাকা দোকানগুলো থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে শাখা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁসেরও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর একটি আবেদনপত্র দেয় রাজিয়া বেগম ছাত্রীনিবাসের ছাত্রীরা। আবেদনপত্রে বলা হয়, আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাকিব হাসান সুইম, ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইশরাত জাহান অর্চির ২০১ নম্বর রুমে অবস্থান করেন। এ অবস্থায় তারা বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

হলের একাধিক ছাত্রী জানিয়েছেন, রাজিয়া বেগম হলের ২১০ এবং ২১২ নম্বর কক্ষে অর্চি তার সহচরদের নিয়ে থাকে। এর মধ্যে ২১২ নম্বর কক্ষটি খুবই গোপনীয়। এ কক্ষটিই তাদের মাদক গ্রহণের নিরাপদস্থান হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন সময়ে অনেক রাত করে হলে ফেরেন কলেজের নেত্রীরা। গেটের দারওয়ান বাধা দিলে তাকে চাকরিচ্যুত করারও হুমকি দেন তারা।

ইডেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় গত বছরের ২৩ জুন কলেজে ছাত্রলীগের কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় কমিটি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়- স্থগিতাদেশের পর ছাত্রলীগের পদ-পদবি ও নাম ব্যবহার করে কেউ কোনো কর্মকাণ্ড করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ঘোষণার পরেও ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন। সর্বশেষ গত ৩ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও তারা যোগ দিয়েছেন। এ ঘটনার পর গত ১১ জানুয়ারি রাজিয়া বেগম হল থেকে ১৪, জেবুন্নেছা হল থেকে ২৫ এবং হাসনা বেগম হল থেকে ১৫ জনসহ মোট ৫৪ জন ছাত্রীকে বেআইনিভাবে হল থেকে বের করে দেন সাধারণ সম্পাদক অর্চি।

শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি নিপার তিন বছর আগে ছাত্রত্ব শেষ হলেও এখনও সে অবৈধভাবে হলে অবস্থান করে সিট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানা গেছে। এদিকে সাধারণ সম্পাদক মাস্টার্সে উঠলেও গত তিন সেশনে পরীক্ষা দেয়নি বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। এ ব্যাপারে কথা বলতে জেসমিন আক্তার নিপাকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া ইশরাত জাহান অর্চির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে ফোন করতে বলেন। ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম জানান, তিনি অসুস্থ ছিলেন তাই এ বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারছেন না।//

এভাবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রত্যক্ষ মদদে ইডেন মহিলা কলেজে ছাত্রলীগ মেয়েদের জিম্মী করে ভয়ানক বিপদে ফেলে দিচ্ছে। কারো সম্মান নষ্ট, কারো ক্যারিয়ার নষ্ট, কাউকে মাদকাসক্ত, সন্ত্রাসী ও দেহব্যবসায়ী বানাচ্ছে। ইডেনে ছাত্রীনিবাসে থেকে পড়াশোনার বিষয়টা এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সারা বাংলাদেশ থেকে বাছাই করা মেধাবী ছাত্রীরা এখানে এসে সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে, জীবন বিপন্ন করছে এর চেয়ে দুর্ভাগ্য একটি দেশের জন্য আর কী হতে পারে!

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

খিলাফত পর্ব-২৬ : উমার রা.-এর শাসনামলে সিরিয়া অভিযান

 

আবু বকর রা.-এর আমলে দুইটি ফ্রন্টে যুদ্ধ চলছিল মুসলিম বাহিনীর। এক সিরিয়া ফ্রন্টে দুই ইরাক ফ্রন্টে। আমরা আগের পর্বগুলোতে ইরাক ফ্রন্টের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এখন আমরা সিরিয়া ফ্রন্টে যুদ্ধের ধারাবাহিক অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করবো। ইনশাআল্লাহ। 

আবু বকর রা. যখন মৃত্যুশয্যায় তখন সিরিয়ায় ইয়ারমুকের ভয়াবহ যুদ্ধ চলছিল। এই অবস্থায় রাজধানী মদিনা থেকে চিঠি আসে খবর ও নির্দেশনাসহ। খবর ছিল, আবু বকর রা. ইন্তেকাল করেছেন। আর নতুন খলিফা নির্বাচিত হয়েছেন উমার রা.। নির্দেশনা ছিল আবু উবাইদা রা.-এর প্রতি। তিনি এখন থেকে সিরিয়ায় অবস্থিত মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব পালন করবেন। 

ইয়ারমুকের যুদ্ধ চলাকালে এই খবর ও নির্দেশনা আবু উবাইদাহ রা.-এর কাছে পৌঁছলেও তিনি বিভিন্ন দিক বিবেচনায় তিনি এসব খবর ও নির্দেশনা গোপন রাখেন। আল্লাহর ইচ্ছায় ও সহায়তায় ইয়ারমুকের যুদ্ধে বিজয় আসলে তিনি সবাইকে এসব বিষয়ে অবহিত করেন। 

খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. যখন জানতে পারলেন তাকে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তখন তিনি আবু উবাইদাহর নিকট এসে বললেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। খলিফা আপনাকে পত্র মারফত নিয়োগ দিয়েছেন, কিন্তু আমাকে তা আপনি জানাননি। জবাবে আবু উবাইদাহ রা. বললেন, আমি আপনাকে জানাইনি কারণ আমি চেয়েছিলাম অন্য কেউ এটা জানাক। মুসলিম বাহিনীর ব্যাপারে যুদ্ধ চলাকালে কোনো পরিবর্তন হোক তা চাইনি। বরং আপনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অপেক্ষা করছি। 

খালিদ রা. বিনাবাক্যে কমান্ড থেকে সরে আসলেন এবং আবু উবাইদাহ রা.-এর আনুগত্য মেনে নিলেন। আবু উবাইদাহ রা. প্রতিটা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে খালিদ রা.-এর পরামর্শ নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর আবু উবাইদাহ রা.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী দামেশকের দিকে যাত্রা শুরু করে। আবু উবাইদাহর টার্গেট ছিল দামেশক অবরোধ করা। কিন্তু পথিমধ্যে খবর আসলো, রোমান সৈন্যরা হোমস থেকে বিশাল সৈন্য সাহায্য পেতে যাচ্ছে। একইসাথে ফিলিস্তিনেও রোমানরা বড় সৈন্য সমাবেশ করেছে। 

কোন বাহিনীকে আগে সামলাবেন তা তিনি নিয়ে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন  সেনাপতি। উমার রা.-এর কাছে পত্র লিখে সিদ্ধান্ত চাইলেন আবু উবাইদাহ রা.। উমার রা. জানালেন, আপনি দামেশকের উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত রাখেন। হিমস থেকে রোমানরা সাহায্য পাওয়ার আগেই দামেশক বিজয়ের চেষ্টা করুন। একদল অশ্বারোহীকে পাঠিয়ে দিন ফিহলের উদ্দেশ্যে। যাতে তারা হিমসের বাহিনীকে আটকাতে পারে। আমাদের আশা অশ্বারোহীরা ফিহলে হিমসের বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে। আর যদি আগেই দামেশক বিজয় হয় তবে দামেশকে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে আপনি ও খালিদ উভয়ে হিমসের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। আমর ও শুরাহবিলকে জর্ডান ও ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করুন।  

সাহাবী আম্মারা ইবনে মুখশী রা. নেতৃত্বে একদল সেনাবাহিনীকে আবু উবাইদাহ রা.ফিহলের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তারা ফিহলে ৮০০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীকে দেখতে পান। মুসলিমরা ছিল উজানে আর রোমানরা ছিল ভাটির দিকে। মুসলিমরা খাল কেটে রোমানদের দিকে পানি প্রবাহিত করে দিল। রোমানদের মাঠ, তাঁবু, চুলা সব ভেসে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেল। মুসলিমরা আল্লাহর ইচ্ছায় ও সাহায্যে অল্প ক্লেশে যুদ্ধে বিজয় লাভ করলো। রোমানরা পিছিয়ে গেল হিমসের দিকে।   

মুসলিম বাহিনী দামেশক অবরোধ করলেন। রোমানরা শহরে প্রবেশের সমস্ত পথ বন্ধ করে রাখলো। কিছু স্থানে উঁচু দেওয়াল, কিছু স্থানে পরিখার মাধ্যমে তারা আত্মরক্ষা করলো। খালিদ রা. তাদের এই বাধা ভাঙ্গার জন্য নানান কৌশল করলেন। ছোট ছোট দলে বিভক্ত করলেন। ঝটিকা আক্রমণ করে পুরো দামেশকের প্রতিরক্ষা নিয়ে অবগত হলেন। দুর্বল প্রতিরক্ষার স্থানে আক্রমণ করতে করতে তিনি দামেশকের প্রতিরক্ষা ভেদ করে খন্ড যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থেকে যখন প্রতিরক্ষা ভেঙ্গে গেল তখন তারা আর যুদ্ধ না করে সন্ধির প্রস্তাব দিল। মুসলিমরা জিজিয়ার বিনিময়ে যুদ্ধ বন্ধ করে দামেশক অধিকার করলো। 

দামেশক বিজয় হয় ১৩ হিজরিতে। বিজয়ের পর আবু উবাইদাহ রা. খালিদ রা.-কে বিকা জয় করার জন্য পাঠান। তিনি সফলভাবে তা জয় করেন। আরেকটি বাহিনীকে পাঠান আইন মিসনুনে। লেবাননের রোমান বাহিনী তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয় লাভ করলেও একটা বড় অংশ শাহদাতবরণ করেন। এই কারণে আইন মিসনুনকে আইন আশ শুহাদা বলা হয়। 

আবু উবাইদা ইয়াজিদ ইবনু আবু সুফিয়ানকে দামেশকের দায়িত্ব প্রদান করেন। দিহাইয়া ইবনে খলিফাকে তামদূর জয় করার জন্য প্রেরণ করেন। শুরাহবিল রা.-কে জর্দান জয় করার জন্য প্রেরণ করেন। এরপর আবু উবাইদা রা. ও খালিদ রা. ফিহল অবরোধ করেন। দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার পর তারা বাধ্য হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং পরাজয়বরণ করে। মুসলিমরা দখলকৃত অঞ্চলে ইসলামী শাসন, তাবলীগ, মসজিদ স্থাপন ও প্রশিক্ষণের কাজ করতে থাকেন। 

১৫ হিজরিতে রোমানরা হিমসে একত্রিত হতে থাকে। আবু উবাইদাহ রা. মুসলিম বাহিনী নিয়ে হিমস অবরোধ করেন। তখন তীব্র শীল চলছিল। হিমসের অধিবাসীরা ভেবেছে তীব্র শীতে খোলামাঠে থাকতে না পেরে মুসলিমরা ফিরে যাবে। কিন্তু মুসলিমরা আল্লাহর রহমতে তীব্র শীতের মধ্যেও অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে তারা সন্ধি করতে সম্মত হয়। মুসলিমরা বিনাযুদ্ধে হিমস দখল করে নেয়। 

এরপর আবু উবাইদাহ রা. খালিদ রা.-কে কিন্নাসরিনে পাঠান। সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে আল্লাহর রহমতে মুসলিমরা বিজয় লাভ করে। এই ভয়াবহ যুদ্ধে খালিদ রা.-এর সাহস, নৈপুণ্য ও আত্মত্যাগের কথা উমার রা.-এর কাছে পৌঁছে। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ আবু বকরের প্রতি দয়া করুন। তিনি মানুষ চিনতেন আমার চাইতে বেশি। আমি খালিদকে এই কারণে বরখাস্ত করিনি এজন্য যে, সে কোনো অপরাধ করেছে। বরং এজন্য যে, লোকেরা তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছিল। 

১৫ হিজরিতে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে সিরিয়া ছেড়ে রোমে চলে গেল। এরপর উমার রা. মুয়াবিয়া রা.-কে কায়সারিয়ায় সেনাপতি হিসেবে প্রেরণ করেন। মুয়াবিয়া রা. সেখানে গিয়ে শহর অবরোধ করেন। তাদের সাথে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয়ী হয়। একইসাথে উমার রা.-এর নির্দেশে আমর ইবনুল আস রা. জেরুলাজালেমের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথমধ্যে রামাল্লার আজনাদায়নে রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধ হয়। আমর ইবনুল আস বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকলেন এবং সাহায্য চেয়ে উমার রা. এবং আবু উবাইদাহ রা.-এর নিকট পত্র লিখলেন। হিমস থেকে আবু উবাইদাহ রা. আমর ইবনুল আস রা.-কে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেলেন। ইতোমধ্যে আমর ইবনুল আস যুদ্ধে জয় লাভ করলেন এবং আরো দ্রুত সামনে এগিয়ে গিয়ে জেরুজালেম অবরোধ করলেন।  

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আদম সৃষ্টির হাকিকত

 

শহীদ গোলাম আযম তখন তাবলীগ জামায়াতের আন্দোলনের সাথে জড়িত। ইসলামের অনেক বিষয় নিয়ে তাঁর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হতো। কিন্তু তিনি এর যুৎসই জবাব পেতেন না। এর জবাবের জন্য তিনি হন্যে হয়ে বই পুস্তক পড়তেন। তেমনি একটি বিষয় ছিল আদম আ.-এর ইতিহাস। ওয়াজ মাহফিলে ও ধর্মীয় মুরুব্বিদের কাছ থেকে পাওয়া ভুল ব্যাখ্যা তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল।

১৯৫৫ সালে এমন পরিস্থিতিতে তার হাতে পড়ে মাওলানা মওদূদী রহ.-এর লেখা তাফহীমুল কুরআনের সূরা বাকারার তাফসীর। তিনি মাওলানার ব্যাখ্যা পড়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। এরপর তিনি মাওলানা মওদূদীর প্রতি আগ্রহী হন। তাঁর কিতাবাদি ও পত্রিকা পড়তে থাকেন। অল্প সময়ের তিনি ইকামাতে দ্বীনের কাজে যুক্ত হয়ে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন।

এরপর তো বহু ঘটনা পার হলো। ১৯৮৯ সালে তাঁর প্রস্তাবিত 'কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা' মেনে নিয়ে সমস্ত বিরোধীদল আন্দোলন শুরু করলো এরশাদের বিরুদ্ধে। এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হলো। ১৯৯১ সালে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে সরকারের গঠনের জন্য আরো কিছু সিট তাদের প্রয়োজন ছিল। জামায়াত একটি সুন্দর জনগণের সরকার গঠনের পরামর্শ দিয়ে বিএনপিকে বিনাশর্তে সমর্থন জানালো।

কিন্তু বিএনপি সে মর্যাদা রাখতে সক্ষম হয়নি। ১৯৯২ সালে প্রথম আঘাতটা আসে জামায়াতের আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে। তাঁর নাগরিকত্ব নেই এই মর্মে 'ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি' একটি আন্দোলন শুরু করে অধুনা শাহবাগের আদলে। জামায়াত সরকারের অংশ হওয়ার পরও বহুস্থানে ঘাদানিক জামায়াত-শিবিরের ওপর হামলা করে। অফিস ভাংচুর করে। অন্তত তিরিশজনকে হত্যা করে। বিএনপি সরকার এর বিহিত করা তো দূরের কথা উল্টো ঘাদানিকের প্ররোচনায় অধ্যাপক গোলাম আযমকে গ্রেপ্তার করে ও আদালতের মুখোমুখি করে।

যাই হোক, আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি। কারাগারে যাওয়ার পর শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম আবার তাঁর পুরনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৯২ সালে তিনি কারাগারে একটি বই লিখেন 'আদম সৃষ্টির হাকিকত' নামে। এই বইতে তিনি আদম আ.-এর সৃষ্টি এবং কারণ নিয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেন। বইটির ভূমিকাতে তিনি বলেন, সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুর প্রচলিত ভুল ব্যাখ্যার কারণেই মুসলিমদের মধ্যে ইসলাম একটি আচার সর্বস্ব ধর্ম হিসেবে পরিচিত হয়েছে। এর সঠিক ব্যাখ্যা ছাড়া কুরআনের বিপ্লবী দাওয়াত ও রাসূল সা.-এর সংরামী জীবনের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব।

সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুতে মূলত আদম আ.-এর সৃষ্টি ও পৃথিবীতে তাঁর কাজ অর্থাৎ মানবজাতির কাজ উল্লেখ করা হয়েছে।

কুরআনে মোট আটটি সূরায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আদম আ.-এর সৃষ্টির ইতিহাস ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন। 'আদম সৃষ্টির হাকিকত' বইয়ের লেখক শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম বইয়ের শুরুতেই আটটি অংশের সরল অনুবাদ করেছেন। এরপর তিনি টোটাল ঘটনা ও উদ্দেশ্যের একটি সামারি টেনেছেন।

এরপর তিনি সূরা বাকারা কেন পরে নাজিল হয়েও আগে স্থান পেয়েছে তার একটি ব্যাখ্যা দেন। লেখকের মতে সূরার বাকার ৪র্থ রুকুর গুরুত্বের কারনেই এমনটা হতে পারে।

এরপর তিনি সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুর ভুল ব্যাখ্যা যা সমাজে চালু রয়েছে সেগুলো নিয়ে বর্ণনা ও আলোচনা করেন। এসব ব্যাখ্যা যে ইসলামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক তা আলোচনা করেন।

লেখক গোলাম আযম এরপর সূরা বাকারার ৪র্থ রুকুর সঠিক ব্যাখ্যা কী হতে পারে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি এখানে ১১ টি পয়েন্টে কথা বলেন।
১. খলিফা ও খিলাফত
২. খিলাফতের দায়িত্ব কী?
৩. ফেরিশতাদের সহযোগিতা
৪. ফেরেশতাদের আশংকা
৫. তাসবিহ ও তাকদিস
৬. আদম আ.-কে জ্ঞান দান
৭. আদম আ.-কে সিজদা করার বিষয়
৮. ইবলিসের নাফরমানি থেকে শিক্ষা
৯. আদম আ.-কে কেন বেহেশতে পাঠানো হলো?
১০. আদম আ.-এর তওবা
১১. জান্নাত থেকে আদম আ.-এর বিদায়

এরপর শহীদ গোলাম আযম এই ইতিহাস বর্ণনার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। একই কাহিনী থেকে ৫ টি শিক্ষা উল্লেখ করেন ও সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

১. দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধির দায়িত্ব পালনই আমাদের বড় কর্তব্য
২. এই কর্তব্যকে উপেক্ষা করে অন্য লক্ষ্যের কাজ মূলত ইবলিসের কুমন্ত্রণা।
৩. ইবলিস ও তার প্রতিনিধিরা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।
৪. লজ্জাশীলতা ও পর্দা মানুষের স্বাভাবিক আচরণ। ইবলিস এটা নষ্ট করে দিতে চায়।
৫. মানুষের জন্য ভুল করা স্বাভাবিক, কিন্তু ভুলের পর তওবা করা আবশ্যক।

এরপর লেখক মানুষের মর্যাদার কারণ নিয়ে আলোচনা করেন। খিলাফতের দায়িত্বের কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরার মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।

লেখক উল্লেখ করেন, মানুষের দায়িত্ব হলো আল্লাহর খিলাফত অর্থাৎ আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা। আর এই দায়িত্বে ব্যর্থ হওয়া মানেই ইবলিসের খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব করা। সমগ্র মানুষ মূলত দুইটি দলে বিভক্ত। এক. আল্লাহর খলিফা, দুই. ইবলিসের খলিফা।

বইটির শেষে তিনি বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আনেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন বাংলাদেশে কি আল্লাহর খিলাফত কায়েম আছে? বাংলাদেশ বহু মুসলিমের দেশ হলেও এদেশে আল্লাহর আইন প্রচলিত নয়। যারা এই বাংলাদেশের আইন পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে না, চিন্তা ও ফিকির করছে না তাদেরকে দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য আহবান করেন।

অনেক আলেম ওলামা ও ইসলামী ব্যক্তিত্বকে দেখা যায় তারা ব্যক্তিগতভাবে খুবই ইসলামপ্রিয় ও তাকওয়াবান। কিন্তু সমাজে ও রাষ্ট্রে আল্লাহর আইন বাস্তবায়নে অর্থাৎ খিলাফতের দায়িত্ব পালনে তাদের সচেষ্ট দেখা যায় না। বরং তাদেরকে বর্তমান প্রচলিত অনৈসলামিক ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকতে দেখা যায়। তাদের কথা উল্লেখ করে লেখক বলেন আল্লাহর প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন না করা মানেই শয়তানের প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করা। এই কথা লেখক আমাদের সকলকে মনে করিয়ে দেন। এই নিয়ে সতর্ক করেন। আমাদের প্রতি আহবান করেন, আমরা যেন আমাদেরকে দুনিয়ায় পাঠানোর উদ্দেশ্য অর্থ্যাৎ আল্লাহর খিলাফতের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হই।

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

#বুক_রিভিউ
বই : আদম সৃষ্টির হাকিকত
লেখক : অধ্যাপক গোলাম আযম
প্রকাশনী : আধুনিক প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ৬৬
মুদ্রিত মূল্য : ২৫
জনরা : ইডিওলজি



৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২

জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের ভিত্তি

 


মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্র আদায় করে দিয়েছে ইংরেজদের কাছ থেকে। এই রাষ্ট্র মুসলিমদের নিরাপত্তায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। মুসলিমরা স্বতন্ত্র জাতির পরিচয় পায়। ১৯২৩ সালে তুর্কি খিলাফত বিলুপ্ত হলে মুসলিম পরিচয়ে আর কোনো রাষ্ট্র অবশিষ্ট থাকে নি। এর কয়েকবছর পর ৬/৭টি ভিন্ন ভাষাভাষি মানুষ শুধুমাত্র মুসলিম পরিচয়ে একত্রিত হয় ও উম্মাহ চেতনায় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করে। 

কিন্তু মুসলিম লীগের এই বিশাল অর্জন ম্লান হতে থাকে কারণ তারা একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সক্ষম হয় নি। একটি সংবিধান বা শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে পারেনি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে, আন্দোলনের সময় তারা জাতিকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রের কথা বলেছে। কিন্তু রাষ্ট্র গঠন হলে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার চেষ্টা করেছে। এছাড়াও নাস্তিক্যবাদের চিন্তার হামলা, কমিউনিজম চিন্তার হামলা পাকিস্তানের মুসলিমদের অশান্ত করে তুলেছিল। মুসলিম নেতারা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল। 

এই ব্যর্থতার কথা অনুমান করে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী ১৯৪০ সাল থেকে সতর্ক করে আসছিলেন। যাই হোক তারপরও তিনি পাকিস্তানে চিন্তার ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য ও পাকিস্তানকে ব্যর্থতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য একটি বক্তব্য দেন ষাটের দশকে। সেখানে জাতীয় ঐক্যের দিকে আহবান জানিয়েছেন সবাইকে। যেভাবে সবাই একত্র হয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনের সময়। 

এই বক্তব্যটি বই আকারে প্রকাশ হয়। পাকিস্তানে বরাবরের মতো এই বইটি বেশ সমাদৃত হয়। বাংলাদেশে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর তার স্বৈরাচারী আচরণ শুরু হয়। জনগণের নেতারা সঠিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ১৯৮৪ সালে আব্বাস আলী খান মাওলানা মওদূদীর এই বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন। বাংলায় এর নামকরণ হয় জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের ভিত্তি। ছোট বই, কিন্তু নির্দেশনা পরিষ্কার। 

বইটির ভূমিকায় মাওলানা মানুষের প্রকৃতি তুলে ধরে বলেন, সব মানুষ সব বিষয়ে একমত হবে না। হওয়া জরুরীও নয়। তবে মৌলিক কিছু বিষয়ে তাকে একমত হতে হবে জাতির প্রয়োজনে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, শান্তির প্রয়োজনে, স্বাধীনতার প্রয়োজনে, ধ্বংস থেকে বাঁচার প্রয়োজনে। মাওলানা এরপর স্বাধীনতাত্তর পাকিস্তানের অবস্থা বর্ণনা করেন। এরপর তিনি ঐক্যের জন্য গঠনমূলক উপাদান খুঁজে বের করার আহবান জানান। 

মাওলানা মওদূদী জাতীয় ঐক্যের জন্য পাঁচটি মূলনীতি নির্ধারণ করেন ও সেগুলো ব্যাখ্যা করেন। সেগুলো হলো, 
১. সর্বাবস্থায় সততা ও সুবিচারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। 
২. পারস্পরিক সহনশীলতা এবং অন্যের মত প্রকাশের অধিকার মেনে নেওয়া। 
৩. বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা পরিহার করতে হবে। 
৪. বলপ্রয়োগ ও প্রতারণার পরিবর্তে যুক্তি প্রদর্শন। 
৫. ছোটখাটো ব্যাপারে বিদ্বেষ ও গোঁড়ামি পরিহার করা।   

এরপর মাওলানা পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি/ মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করেন। মূলনীতিগুলো হলো, 
১. সর্বক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর প্রাধান্য দেওয়া। 
২. গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। মুসলিমদের মতামত দেবার ও শাসক বাছাইয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। 
৩. গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রাণশক্তি ও এর ৫ মূলনীতি 

প্রথমত, রাষ্ট্রের তিনিটি বিভাগ শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভাকে পৃথক করে দেওয়া। তাদের ক্ষমতার সীমারেখা সুষ্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা। 

দ্বিতীয়ত, নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান এবং তা সংরক্ষণের জন্য বিচার বিভাগকে ক্ষমতা প্রদান। 

তৃতীয়ত, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনের ফলাফল যাতে মুসলিমদের জনমতের ভিত্তিতেই হয়। 

চতুর্থত, আইনের শাসন। শাসক ও শাসিতের জন্য একই আইন হবে। সকলে আইন মানতে বাধ্য থাকবে। আদালত আইন সবার ওপর সমানভাবে প্রয়োগ করবে। 

পঞ্চমত, সরকারি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। তারা শাসনপদ্ধতি অনুযায়ী কাজ করবে। জনগণ যাদের শাসক মনোনীত করবে তাদের আনুগত্য করবে। 

৪. নির্বাচন হতে হবে অবাধ ও সুষ্ঠু। 

মাওলানা সবশেষে বলেন। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্য ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে সরকারের ওপর। যারা সরকার পরিচালনা করবে তারা যদি গণতন্ত্রের মূলনীতি ও শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি মেনে চলে ও সংরক্ষণ করে তবে রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। 


#বুক_রিভিউ
বই : জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের ভিত্তি
লেখক : সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী
অনুবাদক : আব্বাস আলী খান  
প্রকাশনী : মওদূদী রিসার্চ একাডেমি, ঢাকা 
পৃষ্ঠা : ২৬
মুদ্রিত মূল্য : ৯
জনরা : রাজনীতি 

৩১ আগস্ট, ২০২২

ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা


সাইয়েদ কুতুব রহ.। জীবনের একটা বড় অংশজুড়ে তিনি ছিলেন কারাগারে। ১৯৬৪ সালে তার একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটির নাম ছিল معالم فى الطريق  (মা'আলিম ফিত তারিক্ব)। এই কথাটার অর্থ হতে পারে পথনির্দেশক। সাইয়েদ কুতুব এখানে মূলত আমাদের করণীয় কী হবে তা উল্লেখ করেছেন। তাঁর এই বইটি ছিল মুসলিমদের করণীয় বিষয়ক গাইড বুক। 

সেই সময় মিশরের জালিম, তাগুত ও স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান ছিল জামাল আব্দুন নাসের। সে তার সরকারের জন্য এই বইটিকে হুমকি হিসেবে দেখেছে। উনিশ শ’পয়ষট্টি সালে কর্নেল নাসের মস্কো সফরে থাকাকালে এক বিবৃতিতে ঘোষণা করে যে, ইখওয়ানুল মুসলিমুন সাইয়েদ কুতুবের নেতৃত্বে তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। আর এই ঘোষণার সাথে সাথেই সারা মিসরে ইখওয়ান নেতা ও কর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। আবারো গ্রেপ্তার হন সাইয়েদ কুতুব। 

মা'আলিম ফিত তারিক্ব বইটি লিখে নাসেরকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অপরাধে(!) ১৯৬৬ সালের ২৯ আগস্ট আমাদের নেতা সাইয়েদ কুতুব শহীদ রহ.-কে ফাঁসী দিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর বইটি সারা পৃথিবীতে হটকেক হয়ে যায়। হয়তো আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছেই ছিল এমন। আল্লাহ তায়ালা এই শহীদকে দিয়ে শুধু মিসর নয়, সারা পৃথিবীতে দাওয়াতী কাজ করাবেন। 

এই বইটি দিয়ে এখনো দাওয়াতী কাজ করছেন, পথ নির্দেশ করছেন আমাদের নেতা, আমাদের সাইয়েদ। আল্লাহ তায়ালা যথার্থই বলেছেন, শহীদেরা মরে না, তাদের মৃত বলো না। আমি তাদের রিজিক দেই। 

মা'আলিম ফিত তারিক্ব বইটি পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে 'মাইলস্টোন' নামে। বাংলায় অনুবাদ হয়েছে 'ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা' নামে। বইটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক। 

বইটি মোট ১২ টি অধ্যায়ে লেখা। বইয়ের ভূমিকাতে লেখক সারা পৃথিবীর মতবাদগুলো নিয়ে আলোচনা করে দেখিয়েছেন মানবরচিত মতবাদের ফলে মানবতা দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর বিপরীতে ইসলামী আদর্শ তথা আল্লাহ প্রদত্ত বিধানই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে। এছাড়াও তিনি ভূমিকাতে বিশ্ব নেতৃত্বের জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাবলী, আধুনিক যুগের জাহেলিয়াত, ইসলাম ও জাহেলিয়াতের পার্থক্য ও ইসলামী সমাজের পুনরুজ্জীবন এসব পয়েন্টে কথা বলেছেন। 

১ম অধ্যায়ে হাফেজ সাইয়েদ কুতুব কুরআনের কর্মীদের দল নিয়ে আলোচনা করেন। সাহাবীদের মতো কেন আমাদের ডেডিকেশন নেই অথবা আমরা কেন মান হারিয়েছি তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

২য় অধ্যায় লেখক শুরু করেছেন মাক্কী যুগে মুহাম্মদ সা. ও সাহাবারা কীভাবে দাওয়াতী কাজ করেছেন, কুরবানীর নজরানা দিয়েছে সেই প্রসঙ্গ দিয়ে। সাহাবাদের জীবন বিধান সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ/ তারবিয়াত ও সংগঠনিক কর্মকান্ড আলোচনা করেছেন। একই অধ্যায়ে তিনি বিপ্লব বলতে কী বুঝায় ও বিপ্লব কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২য় অধ্যায়ে তিনি আরো আলোচনা করেছেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার সঠিক উপায় ও এই বিষয়ে আল্লাহ প্রদত্ত কর্মসূচি নিয়ে।   

৩য় অধ্যায় মুফাসসির সাইয়েদ কুতুব শুরু করেছেন ইসলামী সমাজের বৈশিষ্ট্য ও সমাজ গঠনের উপায় নিয়ে আলোচনা দিয়ে। তিনি এই অধ্যায়ে ইসলামী সমজের আদর্শিক ভিত্তি ও জাহেলী পরিবেশে ইসলামী পুনর্জাগরণের পন্থা কী হতে পারে নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার এই আলোচনার বেসিক হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলল্লাহ' তথা কালিমাতুত তাওহীদের অর্থ বুঝে আল্লাহর কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়া এবং মুহাম্মদ সা.-কে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করা। 

৪র্থ অধ্যায়ে মাওলানা সাইয়েদ কুতুব শহীদ আলোচনা করেছেন জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নিয়ে। তিনি প্রথমে জিহাদের স্তর, জিহাদের বিপ্লবী ঘোষণা ও আল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে কথা বলেছেন। এরপর শুধু আত্মরক্ষার নাম জিহাদ নয়, এটাও ক্লিয়ার করেছেন। মাক্কী জীবনে জিহাদ নিষিদ্ধ থাকার কারণ ও প্রেক্ষাপট উল্লেখ করেছেন। সর্বশেষ মাওলানা কুতুব ইসলাম, দেশরক্ষা ও হিহাদের দাবি নিয়ে আলোচনা করেছেন। একইসাথে জিহাদ সম্পর্কিত কিছু ভুল ধারণার অপনোদন করেছেন। 

৫ম অধ্যায় ছিল ইসলামী জীবন বিধান নিয়ে। এখানেও কালেমাতুত তাওহীদ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। ইসলামী সমাজের বৈশিষ্ট্য, ইসলামী সমাজ গঠনের উপায়, জাহেলিয়াত ও তার প্রতিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার অসারতা ও মুসলিম হিসেবে এই ব্যবস্থাকে মেনে নেওয়াকে কুফরি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

৬ষ্ঠ অধ্যায়ে ইসলামী আদর্শই যে বিশ্বজনীন জীবনাদর্শ তা নিয়ে আলোচনা করেন। মানুষের জৈবিক অংশ যে অন্যান্য সৃষ্টির মতো আল্লাহর বিধান পূর্ণরূপে মান্য করে তা নিয়েও বিশদ আলোচনা করেন। ইসলামের বিধান ত্যাগ অথবা ইসলাম থেকে বিচ্যুতির ফলে মানবতার যে অস্থিরতা তা এই অধ্যায়ের শেষে আলোচনা করেন। 

৭ম অধ্যায়ের আলোচনার বিষয় ছিল সভ্যতা। কাকে আমরা সভ্যতা বলতে পারি আর কোনটা অসভ্যতা এই নিয়েই এই অধ্যায়ের শুরু।  ইসলাম ও জাহিলী সমাজের মৌলিক পার্থক্য ও সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড কী হতে পারে তা নিয়েও আলোচনা করেন।  এই অধ্যায়ের শেষে শহীদ কুতুব ইসলামী সমাজের ক্রমবিকাশ ও ইসলামী সভ্যতা যে সকল ধর্মের মানুষের জন্যই কল্যাণকর তা নিয়ে ব্যখ্যা করেন। 

৮ম অধ্যায়ে আমাদের সাইয়েদের আলোচনার বিষয় ছিল সংস্কৃতি/ কৃষ্টি। এই অধ্যায়ে লেখক ইসলাম, কৃষ্টি ও এই ব্যাপারে ইসলামের সীমারেখা নিয়ে দারুণ আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা করেছেন।

৯ম অধ্যায় ছিল লেখকের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের একটি। এখানে তিনি আলোচনা করেছে মুসলিমদের জাতীয়তা কী হবে? কীসের ওপর ভিত্তি করে করে আমাদের জাতীয়তা নির্ধারণ হবে? ঈমানই হবে আমাদের জাতীয়তার পরিচয় ও ঐক্যের ভিত্তি। এরপর তিনি মধ্যপন্থী উম্মাহ'র ব্যবচ্ছেদ করেছেন। দারুল ইসলাম ও দারুল হারব নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

লেখক বলেন, দ্বীনের প্রতি আহবানকারীদের অন্তরে ইসলাম ও জাহেলিয়াত এবং দারুল ইসলাম ও দারুল হরবের প্রকৃতি ও পরিচয় সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সংশয় থাকা উচিত নয়। কারণ সন্দেহের পথ ধরেই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। যে দেশে ইসলামের প্রধাণ্য নেই, যেখানে ইসলামী শরীয়াত বাস্তবায়িত হয়নি এবং যে ভূখণ্ডের আইন-কানুন ইসলাম নয়। ঈমানের বহির্ভূত যা কিছু আছে তাই কুফর এবং ইসলামের বাইরে যা আছে তা শুধুই জাহেলিয়াত এবং সত্যের বিপরীত সবকিছুই মিথ্যা ছাড়া কিছুই নয়।

১০ম অধ্যায় শহীদ কুতুব যারা ইসলামী রাষ্ট্রের দাওয়াত দিবে তাদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন। কীভাবে দাওয়াত দিতে হবে, কীভাবে আপোষহীন থাকতে হবে, আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য, কীসে আমাদের সাফল্য তা উল্লেখ করেছেন।  

তিনি নসিহত করে বলেন, দ্বীনের প্রতি আহবানকারীদের কোন প্রকারেই জাহেলিয়াতের সাথে খাপ খাইয়ে চলার নীতি গ্রহণ সম্ভব নয়। জাহেলিয়াতের কোন একটি মতবাদ, কোন রীতিনীতি অথবা তার সামাজিক কাঠামোর কোন একটি মতবাদ, কোন রীতিনীতি অথবা তার সামাজিক কাঠামোর কোন একটির সাথেও আপোষ করা আমাদের জন্যে অসম্ভব। এ জন্যে জাহেলিয়াতের ধারক-বাহকগণ যদি আমাদের উপর অত্যাচারের স্টিমরোলারও চালিয়ে দেয় তবু আমরা বিন্দুমাত্র নতি স্বীকার করতে রাজি নই।

১১শ অধ্যায়ে আলোচনার বিষয় ছিল ঈমান ও আকিদা। ঈমান আনার পর একজন মানুষের আচরণ ও চরিত কী রকম হওয়া উচিত তা নিয়েও আলোচনা করেন। মূলত এই অধ্যায়ে একজন মুমিনের চালচলন ও আচার আচরণ কীরূপ হবে তা বর্ণনা করা হয়েছে। 

১২শ অধ্যায়ের নাম রক্তে রঞ্জিত পথ। লেখক বলেন ইসলামী সমাজ কায়েম তথা ঈমানের পথে চলা সহজ কাজ নয়। এর জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। তিনি শুরুতে সূরা বুরুজে বর্ণিত ঘটনার উদাহরণ দিয়েছেন। 

আমাদের নেতা সাইয়েদ কুতুব বলেন, কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের চলার পথে যেসব বাধা বিপত্তি আসতে পারে তা উল্লেখ করেছেন এবং সম্ভাব্য সকল প্রকার বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টকে বরণ করে নেয়ার জন্যে উৎসাহ দিয়েছেন।

একজন মুসলিমের জন্য এই বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য এটা পাঠ্য। এই বইটি আপনাকে পথ দেখাবে। কুরআন ও রাসূল সা.-এর সীরাত বুঝতে আপনাকে সহায়তা করতে। আপনাকে আপনার করণীয় সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা দিবে। 

বইটি আমাদের সকলের পড়া উচিত। যারা পড়েন নাই তারা তো অবশ্যই পড়বেন, যারা পড়েছেন তারাও পুনরায় পড়বেন। আপনার ঈমান তাজা হবে ইনশাআল্লাহ। 

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা
লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ
অনুবাদক : মুহাম্মদ আব্দুল খালেক 
প্রকাশনী : আধুনিক প্রকাশনী 
পৃষ্ঠা : ২১৬
মুদ্রিত মূল্য : ১৬৪
জনরা : রাজনীতি 

২৬ আগস্ট, ২০২২

বাংলায় জামায়াতের প্রচার যেভাবে হয়!



১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট ৭৫ জন নিয়ে জামায়াত যখন প্রতিষ্ঠা হয় তখন একজনমাত্র বাঙালি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর নাম মাওলানা আতাউল্লাহ বুখারী। তিনি তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার পটুয়াখালী শহরের বাসিন্দা ছিলেন। মাওলানা ৭৫ জনের মধ্যে ১৬ জনকে নিয়ে মজলিসে শুরা গঠন করেছিলেন সেই মজলিশে শুরাতেও ছিলেন মাওলানা আতাউল্লাহ বুখারী। সেই হিসেবে ১ম বাঙালি রুকন ও ১ম বাঙালি শুরা সদস্য ছিলেন তিনি। তবে তিনি দুই বছরের মধ্যে জামায়াত ত্যাগ করেন।

১৯৪৬ সালে জামায়াতের সম্মেলনে যোগ দেন মাওলানা আব্দুর রহীম। তিনি কলকাতা থেকে সেখানে গিয়েছেন। তখন তার বয়স ২৮ বছর। তিনি মাওলানার সাথে দেখা করেন ও রুকন শপথ নেন। সেই হিসেবে ২য় বাঙালি রুকন হলেন মাওলানা আব্দুর রহীম। তিনি সেখান থেকে ফিরে এসে নিজ গ্রামে অর্থাৎ পিরোজপুর জেলার কাউখালী থানার শিয়ালকাঠি গ্রামে দাওয়াতী কাজ করেন। সেখানে তিনি ১০-১২ জন যুবককে ইকামাতে দ্বীনের কাজের জন্য রাজি করান। এদেরকে নিয়ে গঠিত হয় বাংলার ১ম ইউনিট। ইউনিট সভাপতি ছিলেন মাওলানা লেহাজ উদ্দিন।

মাওলানা আব্দুর রহীম নাজিরপুরে একটি মাদ্রাসার হেড মাওলানা পদে চাকুরি শুরু করেন। এই মাদ্রাসাতেও আরেকটি ইউনিট তিনি গঠন করেন। এখানে স্থানীয় অতুল চন্দ্র ও ভবানীসেন নামে দুই বাম কমরেডের সাথে প্রায়ই মাওলানা আব্দুর রহীমের বিতর্ক হতো। সেই সূত্রে তিনি ইসলাম, কমিউনিজম ও অর্থনীতি নিয়ে 'ইসলামে অর্থনীতি' নামে একটি বই লিখে ফেলেন।

১৯৪৮ সালেও ঢাকায় কাজ শুরু করা যায়নি। ততক্ষণে পাকিস্তান গঠিত হয়েছে। ইংরেজমুক্ত হয়েছে উপমহাদেশ। ঢাকায় কাজ নিয়ে কেন্দ্র বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, কিন্তু সেভাবে সফল হওয়া যায়নি। ১৯৪৮ সালে খুরশিদ আহমদ বাট নামে একজন সরকারি কর্মকর্তা করাচি থেকে ঢাকায় ট্রান্সফার হয়েছিলেন। তিনি রুকন ছিলেন। তিনি খুব করে চেয়েছিলেন যাতে ঢাকায় কাজ শুরু করা যায়। এজন্য তিনি কেন্দ্রকে জানিয়েছেন। কেন্দ্র তাকে মাওলানা আব্দুর রহীমের ঠিকানা দেন।

খুরশিদ আহমদ বাট ঢাকায় এসে চাকুরিতে জয়েন করেন। তিনি মাওলানা আব্দুর রহীমকে চিঠি লিখেন। চিঠিতে তিনি তাঁকে ঢাকায় আসতে অনুরোধ করেন। জবাবে মাওলানা আব্দুর রহীম জানান, ঢাকায় শুধু থাকার একটি জায়গা দিতে পারলে তিনি নির্দ্বিধায় চলে আসবেন। খুরশিদ আহমদ বাট একটি প্রশস্ত রুম ভাড়া করেন আব্দুর রহীম সাহেবের জন্য। এপ্রিলেই আব্দুর রহীম সাহেব ঢাকায় চলে আসেন। তাঁরা দুইজন ঢাকার কাজ নিয়ে পরিকল্পনা করতে থাকেন।

১৯৪৮ সালের মাঝামাঝিতে মাওলানা মওদূদী রহ. ঢাকায় কাজ করার জন্য বাগ্মী ও বিখ্যাত দায়ি রফি আহমদ ইন্দোরিকে ঢাকায় প্রেরণ করেন। ইতোমধ্যে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে আলিয়া মাদ্রাসা কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। সেখানের একজন শিক্ষক ছিলেন মাওলানা কারি জলিল আশরাফ নদভী। রফি আহমদ ইন্দোরীর নেতৃত্বে ঢাকায় এখন রুকন চারজন।
১. রফি আহমদ ইন্দোরি
২. কারি জলিল আশরাফ নদভী
৩. খুরশিদ আহমদ বাট
৪. মাওলানা আব্দুর রহীম

এর মধ্যে শুধু আব্দুর রহীম ছাড়া বাকিরা ছিল অবাঙালী। তবে আব্দুর রহীম ছাড়া বাকিরা ছিল সাংগঠনিক কাছে বেশ পারদর্শী। তাই তারা ঢাকায় কাজ শুরু করেন ঢাকায় থাকা মুহাজিরদের মধ্যে। লালবাগ, নবাবপুর, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে মুহাজিরদের মধ্যে জামায়াতের কাজ দ্রুত সম্প্রসারণ হতে থাকে।

এরমধ্যে মাওলানা আব্দুর রহীম দাওয়াতী কাজে ভীষণ পারদর্শী হয়ে উঠলেন। তাকে সামনে রেখেই রফি আহমদ ইন্দোরি ঢাকাকে জামায়াতের শহরে পরিণত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। ১৯৪৯ সালে পিতার অসুস্থতার কারণে আব্দুর রহীম সাহেবকে নিজ গ্রামে ফিরে যেতে হয়। তাকে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয় এবং জীবিকার জন্য কাজ করতে বাধ্য হন। মাওলানা মওদূদী তাঁকে অনুরোধ করে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং উর্দু ভাষায় রচিত সাহিত্যগুলো বাংলায় অনুবাদ করার কাজ দেন। এভাবে তার জীবিকার ব্যবস্থা হয়। তিনি পূর্ণ মনোযোগের সাথে ঢাকার সাংগঠনিক বিস্তৃতির জন্য কাজ করতে থাকেন।

অবশেষে কাজের বিস্তৃতি মোটামুটি হলে মাওলানা মনজুর আহমেদ জামেয়ীর নেতৃত্বে ঢাকা শহরের ইমারত গঠিত হয়। তিনি হন ঢাকার প্রথম আমীর। ঢাকায় জামায়াতের কাজ প্রতিষ্ঠায় যাদের অসামান্য ভূমিকা রয়েছে তাদের মধ্যে পূর্বে বর্ণিত চার জন, মনজুর আহমেদ জামেয়ী ছাড়াও আরো রয়েছেন,

১. সাইয়্যেদ হাফিজুর রহমান, হেড মাস্টার, রহমতুল্লাহ মডেল হাই স্কুল
২. খাজা মাহবুব এলাহী, প্রথম সভাপতি, জমিয়তে তলাবা, পূর্ব পাকিস্তান
৩. মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আলী, সভাপতি, জমিয়তে তলাবা, পূর্ব পাকিস্তান
৪. মাওলানা আব্দুস সুবহান, সাবেক এমপি, পাবনা।
৫. ব্যারিস্টার কোরবান আলী।

এছাড়া আরো একজনের কথা আলাদাভাবে বলতে তিনি হলেন শেখ আমিনুদ্দিন ভাই। ঢাকায় জামায়াতের কাজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না এই খবর পৌঁছে গেছে বিহারের ছোট নাগপুরের রুকন শেখ আমিনুদ্দিনের কাছে। ১৯৪৭ সালে বিহার থেকে হিজরত করে পশ্চিম পাকিস্তানে গেছেন। কিন্তু তার মন পড়ে আছে বাংলায়। কারণ ঢাকায় জামায়াতের কাজ করার লোক তৈরি হচ্ছে না। 

শেখ আমিনুদ্দিন দাওয়াতী কাজ করার জন্য ঢাকায় চলে এলেন। তিনি দাওয়াতী কাজ করতে পছন্দ করেন। ঢাকার অলি গলিতে হাঁটেন আর পুরান ঢাকার মানুষের সাথে উর্দুতে কথা বলেন, পরিচিত হন। এভাবে নবাবপুরে তিনি বেশ পরিচিতি লাভ করেন। 

তিনি খেয়াল করেছেন, ঢাকার মানুষ পান খেয়ে গল্প করতে পছন্দ করেন। তিনি পান দোকান দিয়ে বসলেন মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য। একটি দুটি নয় ঢাকায় নবাবপুর, মোহাম্মদ পুর, বংশাল ও মিরপুরে পানের দোকান দিয়ে মানুষকে পান খাওয়াতেন। ঢাকার মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করে তিনি ইকামাতে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। 

ঢাকায় যখন মোটামুটি সংগঠন কায়েম হয়ে গেল, অনেকজন দায়ি তৈরি হয়ে গেল তখন একদিন তিনি আমীরের অনুমতি নিয়ে চলে গেলেন বগুড়ায়। শুরু করলেন সেখানে দাওয়াত দেওয়া। বগুড়ায়ও তিনি পান দোকান দিয়ে সংগঠনের দাওয়াত দিতে থাকলেন! 

বাংলায় জামায়াতে ইসলামীর পথচলার একেবারে শুরুতে যারা দাওয়াতী কাজে জীবন উতসর্গ করেছেন তাদের মধ্যে একজন বিহারের শেখ আমিনুদ্দিন ভাই। দ্বীন কায়েমকে তিনি সত্যিকারভাবেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন।

কত মহামানুষের অপরিসীম ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলামী আন্দোলন! এই তালিকা শেষ হবার নয়। শেখ আমিনুদ্দিন ভাইয়ের গল্প যেদিন প্রথম শুনছিলাম, তীব্র অপরাধবোধ কাজ করছিল। 

এই অঞ্চলের বাঙালিদের ইসলামী আন্দোলন বুঝাতে আমিনুদ্দিন ভাইয়ের যত পেরেশানী, এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা তার এক ছটাক যদি আমাদের থাকতো! হায়! 

আমরা যদি সত্যিই এই অঞ্চলের মানুষকে ভালোবেসে তাদেরকে জান্নাতের দাওয়াত দেওয়ার পেরেশানী নিয়ে কাজ করতাম তাহলে তো আমাদের চোখে ঘুম ধরার কথা ছিল না। কাজের নেশায় পাগল হয়ে যেতাম। হায়!

আজ ২৬ আগস্ট জামায়াতের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সকল কাজপাগল মুজাহিদদের প্রতি সম্মান জানাচ্ছি। যাদের রক্তঘামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সংগঠন, যাদের কাজের বদৌলতে আমরা ইকামাতে দ্বীনের দাওয়াত পেয়েছি, তাঁদের জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে সম্মান ভিক্ষা চাইছি।


১৮ আগস্ট, ২০২২

ইসলামী ব্যাংকিং



জনাব আব্দুর রকিব। পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৩ সালে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। এরপরের বছর স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে যোগ দেন। ১৯৬৭ সালে তিনি স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের বাংলাদেশ শাখার প্রধান হন। ১৯৭১ এর পর বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির প্রধান হন।

সত্তরের দশকের শেষ দিকে সারা পৃথিবীতে ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে যখন ব্যাপক আলোচনা ও এর আলোকে ব্যাংক চালু হওয়া শুরু হলো তখন তিনি ইসলামী ব্যাংকিং-এর সাথে জড়িত হন। তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট হন। যারা ইসলামী ব্যাংক নিয়ে কাজ করেছে, পলিসি তৈরি করেছে এমন বহু মানুষের মধ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ একজন।

জনাব শেখ মুহাম্মদ। পড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞানে। ১৯৮৪ সালে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকুরি ছেড়ে নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংকে যোগ দেন। ইসলামী ব্যাংকে এসেছেন শুধুমাত্র ইসলামকে ভালোবেসে। এদেশে একটি সুদমুক্ত ব্যাংক চালু করে জাতিকে বিকল্প দেওয়ার জন্য। ইসলামী ব্যাংকের যেমন ভবিষ্যত সম্পর্কে কারো কোনো আইডিয়া ছিল না তেমনি এখানে তার সম্মানীও কমে গেছে। তিনি ইসলামী ব্যাংকের একজন গবেষক ছিলেন। সারা পৃথিবীর অন্যান্য ইসলামী ব্যাংক থেকে আইডিয়া ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ও বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যাংকিং পদ্ধতি নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন।

এই দুইজন ব্যক্তি ২০০৪ সালে একটি বই লিখেন 'ইসলামী ব্যাংকিং' নামে। এখানে তারা ইসলামী ব্যাংকের থিওরি, প্রয়োগ ও পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। বইটিতে মোট ১৪ টি অধ্যায় রয়েছে। তারা ইসলামী ব্যাংকিং-এর সকল আলোচনা এই বইতে সন্নিবেশ করেছেন।

১ম অধ্যায়ে তারা ব্যাংক ও অর্থ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ব্যাংকের সংজ্ঞা, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা, কমিউনিজম, ইসলামী অর্থব্যবস্থা এবং তাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।

২য় অধ্যায়ে সুদ ও সুদের প্রকার নিয়ে আলোচনা করেছেন।

৩য় অধ্যায়ে ইসলামী ব্যাংকের উতপত্তি, বাংলাদেশে এর পটভূমি নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর ইসলামী ব্যাংক ও সুদি ব্যাংকের মধ্যেকার পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর তারা ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কার্যাবলী নিয়ে আলোচনা করেন।

৪র্থ অধ্যায়ে লেখকদ্বয় মূলত ইসলামী ব্যাংকের টাকা সংগ্রহ/ আমানত/ জমা গ্রহণ নিয়ে আলোচনা করেন। এক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকের দুইটা পদ্ধতি আছে। আল ওয়াদিয়াহ ও মুদারাবা। এই দুইটি পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এই অধ্যায়ে। কীভাবে এর মুনাফা বন্টন হয় তা নিয়েও আলোচনা হয়।

৫ম অধ্যায়ে চেক সংক্রান্ত আলোচনা করেন তারা। চেকের প্রকারভেদ, হস্তান্তর, অনুমোদন, অনুমোদনের শর্তাবলী ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়।

৬ষ্ঠ অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিনিয়োগের পদ্ধতিগুলোকে তারা তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন।

ক. ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি
১. বাই মুরাবাহা
২. বাই মুয়াজ্জাল
৩. বাই সালাম
৪. ইসতিসনা

খ. অংশিদারিত্ব পদ্ধতি
১. মুদারাবা
২. মুশারাকা

গ. মালিকানায় অংশীদারিত্ব

এই অধ্যায়ে লেখকদ্বয় প্রতিটি পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং এক পদ্ধতির সাথে অপর পদ্ধতির পার্থক্য সূচিত করেন। যাতে সাধারণ পাঠক বুঝতে সক্ষম হয়। এখানে তারা আরেকটি দারুণ কাজ করেছেন তা হলো প্রতিটি পদ্ধতির ক্ষেত্রে তারা সম্ভাব্য অনিয়ম ও ত্রুটির কথাও উল্লেখ করেছেন। এজন্য একটা কথা বলা হয়ে থাকে 'ইসলামী ব্যাংকের জন্য পূর্বশর্ত ইসলামী ব্যক্তিত্ব'। কাজী ওমর ফারুক ২০০৬ সালে এই নামেই একটি বই লিখেছেন।

ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা সম্পর্কিত একটি প্রশ্নের সমাধান এখানে তারা দিয়েছেন। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফার হার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সুদের হারের সাথে মিলে যায়। তাহলে ইসলামী ব্যাংকের এই আয় কি সুদ? এই প্রশ্নের সমাধান দেওয়া আছে এই অধ্যায়ে। এরপর সুদ ও মুনাফার মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করেছেন লেখকদ্বয়।

এরপর তারা কীভাবে একজন ব্যবসায়ীর সাথে বিনিয়োগে যাবে সেই পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। কীভাবে রিস্ক ম্যানেজম্যান্ট করেন তা নিয়ে আলোচনা করেন। শুধু তাই নয়, ইসলামী ব্যাংক যেখানে বিনিয়োগ করে সেই ব্যাবসার তদারকি ও মুনাফা আদায়ের পদ্ধতিও তারা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন। এরপরও যদি ক্ষতি হয় তবে সেই ক্ষতিপূরণের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়।

৭ম অধ্যায়ে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়। ব্যবসায়ে লিখিত চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ গ্রাহকদের সাথে চুক্তি কীভাবে করতে হবে ও মানতে হবে সে পদ্ধতি উল্লেখ করেন।

৮ম অধ্যায়ে বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা করেন তারা। এই অধ্যায়ে ঋণপত্র, শরিয়ার আলোকে ঋণপত্র, মুদ্রা বিনিময়, আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য নিয়ে এবং এসবের শরিয়াহ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়।

৯ম অধ্যায়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের কিছু বিশেষ বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই অধ্যায় থেকে ১৪শ অধ্যায় পর্যন্ত মূলত ইসলামী ব্যাংকের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।

১০ম অধ্যায়ে ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

১১শ অধ্যায়ে বিনিয়োগের শ্রেণীবিন্যাস ও প্রভিশনিং নিয়ে আলোচনা হয়।

১২শ অধ্যায়ে ইসলামী ব্যাংকের মূলধন নিয়ে আলোচনা হয়।

১৩শ অধ্যায়ে ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে আলোচনা হয়।

১৪শ ও সর্বশেষ অধ্যায়ে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং-এর সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সম্ভাবনার ক্ষেত্রে বলা হয়, জনগণের আস্থা অর্জন করে বিশাল আমানত সংগ্রহ করেছে ইসলামী ব্যাংকগুলো। সেই সাথে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ভালো ভূমিকা রেখেছে। সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ ও সবচেয়ে বেশি লাভও অর্জন করেছে তারা। এখনো সেই অবস্থা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রে লেখকদ্বয় যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন তা হলো,
১. ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার আইন নেই।
২. সুদমুক্ত সিকিউরিটিজ/বন্ড-এর অভাব
৩. খেলাপি বিনিয়োগ। অন্যান্য ব্যাংকগুলো দন্ডসুদ আরোপ করে। এখানে যা সম্ভব নয়।
৪. ব্যাংক কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত ট্রেইনিং-এর অভাব
৫. শরীয়তের বিষয়ে দক্ষতার অভাব।

বইটি ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে আপনার ধারণাকে পরিপূর্ণ করবে এবং বাজারি কথাবার্তা থেকে আপনাকে মুক্ত করবে। একইসাথে আপনি এখান থেকে সুদ ও ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে বিস্তর ধারণা লাভ করতে পারবেন। যদি ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে ধারণা নিতে চান তবে এই বইটি আপনার জন্য পাঠ্য।

বইটির পিডিএফ লিংক দেওয়া হয়েছে।

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী ব্যাংকিং
লেখক : আব্দুর রকীব ও শেখ মোহাম্মদ
প্রকাশনী : আল আমিন প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ২৭২
মুদ্রিত মূল্য : ২০০
জনরা : অর্থনীতি