১ ডিসেম্বর, ২০২২

খিলাফত পর্ব-৩৬ : উসমান রা.-এর প্রাচ্য অভিযান


আরব অঞ্চল পৃথিবীর প্রায় মাঝামাঝ স্থানে থাকায় ইসলামী রাষ্ট্র মূলত দুইদিকে বিস্তার লাভ করে। প্রথমত ইরাক ইরান হয়ে ভারতের দিকে। দ্বিতীয়ত সিরিয়া হয়ে ইউরোপের দিকে। পূর্ব দিকে অর্থাৎ ইরাক-ইরানে অগ্নিপুজারী পারসিকদের সাম্রাজ্য ছিল। আর সিরিয়া ও ইউরোপে খ্রিস্টান রোমানদের সাম্রাজ্য ছিল। উমার রা.-এর বিজয় অভিযানের ক্ষেত্রে সিরিয়া থেকে বাহিনী দুইভাগ একভাগ ইউরোপের দিকে অন্যভাগ জেরুজালেম ও মিশরের দিকে এগিয়ে যায়। ৩য় খলিফা উসমান রা.-এর খিলাফতকালে ইসলামী রাষ্ট্র প্রাচ্যের আজারবাইজান থেকে বিজয় অভিযান শুরু করে কাবুল অর্থাৎ আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।

এই বিস্তৃতির লাভের অনেক আগ থেকেই অর্থাৎ উমার রা.-এর শাসনামল থেকেই মুসলিম দাঈ ও ব্যবসায়ীরা এসব অঞ্চলে মুসলিমদের দাওয়াত দিতে শুরু করেছেন। উসমান রা.-এর সময়ে দাঈরা সিন্দু নদীর তীরের হিন্দুস্থানে ব্যাপক দাওয়াতী কাজ করেছেন। প্রাচ্য ও ইউরোপ অভিযানে যুদ্ধকৌশল নির্ণয় ও সেনাপতি নির্বাচনে উসমান (রা.)-এর দূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে। অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা সংরক্ষণ করেন, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করে রাষ্ট্রের সীমানা সম্প্রসারণ করেন। স্বভাবে উমার রা. থেকে কোমল হওয়ায় কোন কোন ইতিহাসবিদ উসমান রা.-কে দুর্বল শাসক হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছেন। একজন দুর্বল শাসকের পক্ষে এত বিশাল রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যের সীমানা সংরক্ষণ ও রাজ্য সম্প্রসারণ সম্ভব হত না।

প্রাচ্যের বিজয়সমূহ
কুফা বাহিনীর আজারবাইজান বিজয় :
উসমান রা. খালীফা হওয়ার পর আল-ওয়ালীদ ইবনু উকবাকে কূফার শাসনকর্তা নিয়োগ করা হলে তিনি কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে তার অধীনস্ত আজারবাইজানের শাসনকর্তা উতবা ইবনু ফারকাদকে পদচ্যুত করেন। এই সুযোগে আজারীরা বিদ্রোহ করে এবং উমার রা.-এর আমলে তারা যে সন্ধিচুক্তি করেছিল তা ভঙ্গ করে। উসমান রা. কুফার শাসনকর্তাকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ দেন। ২৫ হিজরিতে আল-ওয়ালীদ সেনাপতি সালমান ইবনু রাবী'আহকে একদল সৈনিকসহ অগ্রবাহিনী হিসেবে প্রেরণ করেন। কিছু সময় পরে তিনিও একটি বড় সেনাদলসহ রওয়ানা হন। মুসলিমদের যুদ্ধযাত্রা দেখে আজারবাইজানের বিদ্রোহীরা আগের সন্ধির শর্তে আনুগত্য স্বীকার করল। আল-ওয়ালীদ তাদের আনুগত্য গ্রহণ করলেন এবং চারদিকে ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করলেন। আবদুল্লাহ ইবনু শুবাইল আল-আহমাসী চার হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে মুকান, বাবর ও তাইলাসান জয় করেন। তারপর সালমান আল-বাহিলী বারো হাজার সৈনিক নিয়ে আর্মেনিয়া জয় করেন। এই যুদ্ধে প্রচুর গানীমতের সম্পদ অর্জিত হয়। বিজয় শেষে আল-ওয়ালীদ আশ'আস ইবনু কায়সকে আজারবাইজানের দায়িত্ব দিয়ে কুফায় ফিরে আসেন।

রোমানদের হামলা প্রতিরোধে কুফাবাসীদের অংশগ্রহণ :
এদিকে সিরিয়ার শাসক মুয়াবিয়া রা. রোমানদের পক্ষ বড় আক্রমণের আশংকায় ছিলেন। তাই খলিফা উসমান রা. কুফার শাসক আল ওয়ালিদকে লিখলেন, //মু'আবিয়া ইবনু আবি সুফিয়ান আমার কাছে এই মর্মে পত্র দিয়েছে যে, রোমানরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেছে। আমার মনে হয় কুফাবাসীদের উচিত সিরিয় সেনাবাহিনীকে সাহায্য করা। তোমার কাছে আমার পত্র পৌছলে তুমি এমন একজন সেনাপতি বাছাই করবে যার সাহসিকতা ও ধার্মিকতার ব্যাপারে তুমি সন্তুষ্ট এবং তাঁর সাথে আট, নয় বা দশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী সিরিয়দের সাহায্যে প্রেরণ করবে। যেখানে আমার দূত তোমার সাথে সাক্ষাৎ করবে সেখান থেকেই তুমি সৈন্য প্রেরণ করবে।//

মাত্রই আজারবাইজান অভিযান শেষ করে এই চিঠি পেয়েছেন আল-ওয়ালীদ। তিনি সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বললেন,
//হে সমাবেশ! পুর্ব দিকে আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা নিয়েছেন আর তোমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। তিনি তোমাদের হৃত সাম্রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছেন, নতুন নতুন অঞ্চল তোমাদের করায়ত্ত করে দিয়েছেন, তোমরা সুস্থ অবস্থায় যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও সাওয়াবের অধিকারী হয়ে প্রত্যাবর্তন করেছ। সুতরাং সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমার কাছে আমীরুল মু'মিনীন এই পত্র দিয়েছেন যে আমি যেন তোমাদের মধ্য থেকে বাছাই করে আট থেকে দশ হাজার সৈন্যের একটি দল গঠন করি; যাতে তোমরা তোমাদের সিরিয় ভাইদেরকে সাহায্য করতে পার। কারণ তারা রোমানদের আক্রমণের মুখে পড়েছে। আর এতে রয়েছে মহান প্রতিদান ও সুস্পষ্ট মর্যাদা। কাজেই তোমরা সালমান ইবনু রাবী'আহ আল-বাহিলী-এর নেতৃত্বে এই আহবানে সাড়া দেয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর।//

সৈনিকরা তাদের সেনাপতির আহবানে সাড়া দিল। তিনদিন অতিক্রান্ত হওয়ার আগে আট হাজার কুফাবাসী সালমান ইবনু রাবী'আহ আল-বাহিলীর নেতৃত্বে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করল। ওদিকে সিরিয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন হাবীব ইবনু মাসলামা ইবনু খালিদ আল-ফিহরী। যৌথবাহিনী শত্রু এলাকায় তীব্র হামলা করে রোমানদেরকে পর্যুদস্ত করে ফেলল। যুদ্ধ শেষে কুফা ও সিরিয়ার বাহিনী বিপুল গানীমতসহ ফিরে এলো।

সা'ঈদ ইবনুল 'আস-এর তিবরিস্তান অভিযান :
হিজরী ত্রিশ সনে কুফার গভর্ণর সা'ঈদ ইবনুল আস কুফা হতে খুরাসান (আফগানিস্তান) বিজয়ের উদ্দেশে রওয়ানা করলেন। তাঁর সাথে অনেক সাহাবী ছিলেন: হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রা., আল-হাসান রা., আল-হুসাইন রা., আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা., আবদুল্লাহ ইবনু উমার রা., আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আস রা., আবদুল্লাহ ইবনুয্ যুবাইর রা.-সহ অনেকে। তিনি ইরানের তিবরিস্তান বিজয় করেন। সেখানের মুশরিকবাহিনী বাধা তৈরী করলেও সেটা ভয়াবহ যুদ্ধে রূপ নেয়নি। তিনি একের পর এক শহর ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসেন। এরপর জুরজান শহরে পৌঁছলে শহরবাসী তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলিম বাহিনীর সাথে ব্যাপক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এত মারাত্মকভাবে যুদ্ধ করতে হয় যে, মুসলিমরা সালাতুল খাওফ (যুদ্ধকালীন নামাজ) পড়তে হয়। অবশেষে মুসলিমরা জুরজানবাসীর দূর্গ দখল করতে সক্ষম হয়। তিবরিস্তান জয় করে সৈন্যদল কুফায় ফেরত আসে।

পারস্য সম্রাট ইয়াযদগির্দ-এর পলায়ন ও হত্যাকাণ্ড:
আবদুল্লাহ ইবনু আমির ছিলেন বসরার শাসক। তিনি ফার্স অভিমুখে রওয়ানা করে সেটি অধিকার করেন। মুসলিম বাহিনীর অগ্রগামিতার খবর পেয়ে ছন্নছাড়া পারস্যের সম্রাট ইয়াজদিগার্দ পালিয়ে গেলেন। এটি ৩০ হিজরী সনের ঘটনা। কিসরাকে ধাওয়া দেওয়ার জন্য মাজাশি ইবনু মাস'উদ আস-সুলামীকে প্রেরণ করলেন ইবনু আমির। তিনি কিসরাকে তাড়িয়ে কারমানে নিয়ে গেলেন। ইয়াযদিগার্দ খুরাসানে পালিয়ে গেলেন আর মাজাশি সেনাবাহিনী নিয়ে সায়ারজানে অবস্থান নিলেন। গ্রামবাসী নিজেদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ভয়ে সম্রাটকে আশ্রয় দিল না, শুধু তাই নয়, তারা সম্রাটের বিরুদ্ধে তুর্কীদের সাহায্য চাইল। তুর্কী সৈন্যরা ইয়াযদগির্দের ক্ষুদ্র বাহিনীকে হত্যা করলে সম্রাট পালিয়ে গিয়ে মারগাব নদীর তীরে এক ব্যক্তির ঘরে আশ্রয় নিলেন। সেখানে তাকে হত্যা করা হয়। এভাবে পরিসমাপ্তি হয় দীর্ঘ পার্সিয়ান শাসক কিসরার ইতিহাস। কিসরা আর ফিরে আসেনি পৃথিবীতে।

আবদুল্লাহ ইবনু আমিরের খুরাসান বিজয় :
উসমান রা.-এর নির্দেশে ৩১ হিজরিতে আব্দুল্লাহ ইবনু আমির খোরাসান অভিযানে বের হন। কিন্তু নিশাপুরের পথে কুহিস্তান অতিক্রম করার সময় তিনি কঠিন প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। সেনাপতি আল- আহনাফ ইবনু কায়স তাদের দর্প চূর্ণ করে নিশাপুরের রাস্তার নিরাপত্তা বিধান করেন। তারপর ক্ষুদ্র সেনাদল প্রেরণ করে তিনি রাসতাক যাম, বাখার ও জুওয়াইন দখল করেন। এখান থেকে ইবনু 'আমির, আল-আসওয়াদ ইবনু কুলসূম আল-আদাবীকে বাইহাকেরও উদ্দেশে প্রেরণ করেন। নগরপ্রাচীরের এক ছিদ্রপথ দিয়ে তিনি দলবলসহ শহরে প্রবেশ করেই স্থানীয়দের প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। যুদ্ধে আল-আসওয়াদ নিহত হলে তার ছোট ভাই আদহাম ইবনু কুলসূম মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং বিজয় সম্পন্ন করেন। নিশাপুর বিজয়ের পূর্বে ইবনু আমিরের সেনাপতিত্বে বুত, আশবান্দ, রুখ, যাওয়াহ, খুওয়াফ, আসফারাইন ও আরগিয়ান বিজিত হয়।

আবদুল্লাহ ইবনু আমির নিশাপুরের উপকণ্ঠে এসে শহর অবরোধ করলেন। শহরটি চারভাগে বিভক্ত ছিল; প্রতি ভাগে একজন করে শাসক ছিল। এক চতুর্থাংশের শাসক, ইবনু 'আমিরের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়ে মুসলিমদেরকে শহরে প্রবেশ করতে দিলেন। আচানক শত্রু বাহিনী দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নিশাপুরের প্রধান শাসক সন্ধির প্রস্তাব দিলেন। নিশাপুর হতে বার্ষিক দশ লক্ষ দিরহাম কর প্রদান করা হবে-এই শর্তে চুক্তি সম্পাদিত হল। কায়স ইবনুল হায়সাম নিশাপুরের শাসক নিযুক্ত হলেন। মুসলিম সেনাবাহিনী নিশাপুরের আশে পাশে আরো বেশ কয়েকটি শহর সন্ধির মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের অধিকারে নিয়ে আসেন।

মার্ভারুজ বিজয় :
আবদুল্লাহ ইবনু আমির তাঁর সেনাপতি আল-আহনাফ ইবনু কায়সকে মার্ভারুয অভিমুখে প্রেরণ করেন। আল-আহনাফ শহর অবরোধ করে রাখেন। শহরবাসী দুর্গ থেকে বের হয়ে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু পরাজিত হয়ে পুনরায় দুর্গে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। মার্ভবাসীর অনুরোধে সেই দিনের জন্য যুদ্ধ স্থগিত রেখে আল-আহনাফ শিবিরে ফিরে যান। পরদিন প্রত্যুষে মার্ভের গভর্ণর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মাহাক মারফত আরব বাহিনীর অধিনায়ক আল-আহনাফের নিকট সন্ধির প্রস্তাব সম্বলিত একটি চিঠি প্রেরণ করেন। পত্রে নিম্নোক্ত শর্তাবলীর উল্লেখ ছিল:
ক) মার্ভ থেকে বার্ষিক ষাট হাজার দিরহাম কর প্রদান করা হবে;
খ) পারস্য সম্রাট কিসরা কর্তৃক দখলকৃত ভূমিতে গভর্ণরের অধিকার মেনে নিতে হবে;
গ) গভর্ণর ও তাঁর পরিবারের কাছ থেকে কর আদায় করা যাবে না এবং
ঘ) মার্ভের নেতৃত্ব তাঁর পরিবারের হাতেই বহাল রাখতে হবে।
আল-আহনাফ চিঠির বিষয়বস্তুর ব্যাপারে নেতৃস্থানীয় সৈনিকদের সাথে পরামর্শ করে ইতিবাচক জবাব দিলেন। তবে একটি অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত করলেন যে মার্ভবাসীকে মুসলিমদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। তদুপরি তিনি তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানালেন; তারা যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তারা মর্যাদায় আসীন হবে এবং মুসলিমদের ভাই বলে পরিগণিত হবে। মুহাররাম মাসের প্রথম দিবসে সম্পাদিত এই চুক্তিনামা লেখেন বানু সা'লাবা - এর আযাদকৃত দাস কায়সান।

তুখারিস্তান, জুযজান, তালকান ও ফারিয়ার বিজয়:
এরপর আল- আহনাফ চার হাজার সৈনিক নিয়ে তুখারিস্তান অভিমুখে রওয়ানা করেন। মুসলিম বাহিনীর অগ্রগামিতার খবর পেয়ে তুখারিস্তান, জুযজান, তালকান ও ফারিয়াব-এর প্রায় ত্রিশ হাজার সৈন্য তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। বিপুল সংখ্যক শত্রু সৈন্য দেখে মুসলিমদের মাঝে যুদ্ধের ব্যাপারে মতভেদ দেখা দেয়। কিন্তু সেনাপতি আল- আহনাফ ছিলেন অবিচল। তিনি অত্যন্ত কার্যকর একটি কৌশলের আশ্রয় নেন; মারগাব নদী ও পাহাড়ের মাঝখানের সরু পথ ধরে তিনি এগিয়ে যান। ফলে একসঙ্গে বিপুল সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করা থেকে তিনি নিস্তার লাভ করেন। এই সময় মার্ভবাসী সাহায্যে এগিয়ে এলেও আল-আহনাফ এই বলে তাদের সাহায্য গ্রহণে বিরত থাকেন যে তিনি মুশরিকদের সাহায্য নেবেন না। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। পলায়নপর শত্রুবাহিনীকে পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য আল-আকরা ইবনু হারিসকে পাঠানো হয়; তিনি বীরবিক্রমে হামলা চালিয়ে শত্রু বাহিনীকে তছনছ করে দেন।

বালখ বিজয়:
আল-আহনাফ মার্ভ থেকে বাল্‌খ অভিমুখে রওয়ানা করলেন। বালখবাসী যুদ্ধ করতে অনিচ্ছুক ছিল। তারা বার্ষিক চার লক্ষ দিরহামের বিনিময়ে সন্ধির প্রস্তাব দিলে আল-আহনাফ তা মেনে নিলেন চাচাতো ভাই উসাইদ ইবনুল মুতাশাম্মিসকে বালখের শাসক হিসেবে নিয়োগ করে আল-আহনাফ খাওয়ারিজের-এর পথ ধরলেন। কিন্তু শীতের মৌসুম এসে পড়ায় তিনি কোন অভিযান পরিচালনা না করে বাল্‌খে ফিরে এলেন। তখন বাল্‌খে নববর্ষের উৎসব চলছিল। বাখবাসীরা শাসনকর্তা উসাইদকে স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্র ও অজস্র মুদ্রা উপহার দিল। আল-আহনাফ বাল্‌খে এলে উসাইদ স্থানীয়দের উপহারের বিষয়টি তাকে জানালেন। তিনি সকল উপহার সামগ্রী ইবনু 'আমিরের কাছে নিয়ে যান। ইবনু 'আমির বললেন, 'আবু বাহর! ওগুলো তুমি নিয়ে নাও।' আল-আহনাফ জবাব দিলেন, 'ওগুলোতে আমার কোন প্রয়োজন নেই। আবদুল্লাহ্ ইবনু 'আমির যুদ্ধজয়ের পর বাসরায় ফিরে গেলেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি কায়স ইবনুল হায়সামকে খুরাসানের শাসনকর্তা নিয়োগ করলেন।

তুর্কি সেনানায়ক কারেনের আক্রমণ :
মুসলিমদের অগ্রযাত্রার খবর পেয়ে ৭০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে তুর্কী যুদ্ধবাজ কারেন এগিয়ে এল। তুর্কীদের মুকাবিলায় 'আবদুল্লাহ ইবনু খাযিম আস-সুলামী চার হাজার যোদ্ধা নিয়ে এগিয়ে গেলেন। এঁদের মধ্য হতে ছয়শ' সৈনিককে অগ্রবর্তী দল হিসেবে পাঠালেন। শত্রুসৈন্যের কাছে পৌঁছলে ইবনু খাযিম সৈন্যদেরকে বললেন, 'সবাই যেন বর্শাগ্রে কাপড়ের টুকরা বেঁধে তাতে তেল বা চর্বি মেখে আগুন জ্বালিয়ে নেয়। তারপর আগুনের বর্ষা দিয়ে কারেন বাহিনীর ওপর হামলা চালানো হয়। ৭০ হাজার যোদ্ধার কারেন বাহিনী চারদিকে আগুন দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাতে থাকে। তুর্কী দলপতি কারেনসহ বহু সৈন্য নিহত হয়।

কাবুল জয় :
আবদুল্লাহ ইবনু আমির কাবুল অভিযানের সেনানায়ক হিসেবে আবদুর রহমান ইবনু সামুরাকে নিয়োগ দেন। তিনি ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা বর্ধনে চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। প্রথমে তিনি যারানজ-এর বিদ্রোহ দমন করেন। তারপর ভারত সীমান্তে যারানজ ও কাশ-এর মধ্যবর্তী এলাকা জয় করেন। অতঃপর রুখরাজ জয় করে দাউন-এর বাসিন্দাদেরকে অবরোধ করেন। সামান্য প্রতিরোধের পর স্থানীয়রা সন্ধি করে। ঐ পাহাড়ে স্বর্ণমূর্তি ছিল, যার দু'চোখ ছিল ইয়াকুত পাথরের। আবদুর রহমান মূর্তিটির হাত কেটে চোখ বের করে নিলেন। কিন্তু স্বর্ণ ও জহরত না নিয়ে শহরের শাসকের কাছে সেগুলো ফেরত দিয়ে বললেন, এগুলোতে আমার কাজ নেই, আমি শুধু তোমাকে দেখাতে চেয়েছিলাম যে, মূর্তিটি ক্ষতি বা উপকার করতে পারে না। তারপর তিনি বুত, কাবুল ও যাবুলিস্তান (গজনী) জয় করেন। তারপর বিজয়াভিযান দীর্ঘ না করে তিনি যারানজ-এ ফিরে আসেন। উসমান রা.-এর খিলাফাতের শেষদিকে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তিনি উমাইর ইবনু আহমার আল-ইয়াশকুরীকে প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করে যারানজ ত্যাগ করেন।

আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা জয় করার পর বসরার শাসক আব্দুল্লাহ ইবনু আমল উমরাহ আশ-শুকুর পালন করেন। ৩১ ও ৩২ হিজরিতে বসরার গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনু আমীর ও তাঁর অধীনস্থ সেনাপতিগণ মধ্য এশিয়ার বিশাল ভূখন্ড জয় করেন। এরকম বিজয়ের কৃতিত্ব খুব কম গভর্ণরের ভাগ্যে জুটেছে। বিজয়াভিযানের সমাপ্তিতে লোকজন ইবনু 'আমিরকে বলল: 'আল্লাহ আপনাকে বিপুল বিজয় দান করেছেন: আপনি ফার্স, কারমান, সিজিস্তান ও সমগ্র খুরাসান জয় করেছেন! ইবনু আমির বললেন, ‘আল্লাহর শুকরিয়াস্বরূপ আমি এখান থেকে ইহরাম বেঁধে উমরাহ পালন করব। তারপর ইবনু আমির নিশাপুর থেকে ইহরাম বেঁধে মাক্কায় গিয়ে উমরাহ পালন করেন।

৩২ হিজরীতে বালানজার-এর যুদ্ধে বিপর্যয় :
কুফার গভর্ণর সা'ঈদ ইবনুল আসের অধীনে সেনাপতি আবদুর রহমান ইবনু রাবী'আহ আল-বাবে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বালাজারে অভিযান পরিচালনার সংকল্প করলেন। বিষয়টি জানতে পেরে উসমান রা. সা'ঈদ ইবনুল আসকে লিখেন, 'তুমি সালমান ইবনু রাবী'আহকে তাঁর ভাই আবদুর রহমান ইবনু রাবী'আহ-এর সহায়তার জন্য আল-বাবে প্রেরণ কর। আবদুর রহমান ইবনু রাবী'আহ আল-বাবে ছিলেন, তাঁকে সাবধান করে খালীফা লিখলেন, 'বদহজমে প্রজাদের অনেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে; অতএব তুমি অভিযান সংক্ষেপ কর, মুসলিমদেরকে দুর্যোগে ঠেলে দিও না। কারণ আমার ভয় হয় তারা বিপদে পড়বে। খালীফার এই সতর্কবাণী আবদুর রহমানকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারল না। তিনি বালানজার থেকে ফিরে আসলেন না। উসমান রা.-এর খিলাফাতের নবম বছরে আবদুর রহমান ইবনু রাবী'আহ বালানজারে পৌঁছে শহর অবরুদ্ধ করে মিনজানিক দাগিয়ে পাথর ছুঁড়তে লাগলেন। অবরুদ্ধ শহরবাসীর কেউ মিনজানিকের তোড়ে কাছে ঘেঁষতে পারছিল না। তারপর একদিন বালাজারবাসীর সহায়তায় তুর্কীরা এগিয়ে এল, যৌথ বাহিনী প্রচণ্ড আক্রমণের ফলে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হলো। আবদুর রহমান ইবনু রাবী'আহ নিহত হলেন। তাঁকে বালানজারের উপকন্ঠে দাফন করা হয়। পরাজিত মুসলিম বাহিনী ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। সালমান ইবনু রাবী'আহ একদলকে আশ্রয় দিয়ে আল-বাবের পথে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিলেন। আরেকদল খাযার-এর পথ ধরে জীলান ও জুরজানের পথে বেরিয়ে গেলেন। এঁদের সাথে সালমান ফারসী রা. ও আবূ হুরাইরা রা. ছিলেন।

হিন্দুস্থান অভিযানের পরিকল্পনা :
খলিফা উসমান রা. বাসরার গভর্ণর 'আবদুল্লাহ ইবনু আমিরকে হিন্দুস্থান তথা ভারত সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধানের নির্দেশ দেন। তিনি হুকাইম ইবনু জাবালা আল-‘আবদীকে সিন্ধুতে প্রেরণ করেন। হুকাইম ভারত সম্পর্কে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে খালীফাকে অবহিত করে বলেন, 'ভারতে পানি কম, ফলমূল নিম্নমানের, ওই অঞ্চলের চোরগুলো অনেক সাহসী, আমাদের সৈনিক সংখ্যা কম হলে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে আর বেশি হলে ক্ষুধায় মারা যাবে। খালীফা বললেন, 'তুমি কি অভিজ্ঞতা থেকে বলছো না বুদ্ধি থেকে বলছো? তিনি জবাব দিলেন, 'না, বরং অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।' এরপর খালীফা আর ভারতে কোন বাহিনী প্রেরণ করেননি।



পাহাড়ের খ্রিস্টান সন্ত্রাসীদের শেল্টার দিচ্ছে ভারত

২য় বার এরেস্ট হওয়ার পর থানায় আমাকে ভালোভাবেই টাইট দেওয়া হয়। দুইদিন পর কোর্টে উঠায়। কোর্টে আসার পর উপলব্ধি করতে পারলাম আমি ভীষণভাবে অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েছি। তারপরও সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের বুঝ দেওয়ার জন্য নিজেকে ফিট রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম।

ততদিনে জেলখানা আমার পরিচিত। টার্গেট ছিল কোনরকম কারাগারে গিয়ে হালদা ১৭ বা ১৮ তে গিয়ে একটা লম্বা ঘুম দিব। হালদা ১৭, হালদা ১৮, পদ্মা ৫, কর্ণফুলি ১৬ এই ওয়ার্ডগুলোতে জামায়াত-শিবিরের ভাইরা থাকতো। তারা ছাড়া সেসময় ঐ ওয়ার্ডগুলোতে আর কেউ ছিল না। তাই কারাগার আমাদের কাছে একটা মেসে পরিণত হয়েছিল। ভাই-ব্রাদার আছে সেখানে। তারা একটু সেবা যত্ন করলেই সুস্থ হয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। এই পরিকল্পনা করে নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি। কোর্টে এক ভাইকে বলে দুটো নাপা খেয়ে নিয়েছি।

আসরের পরে কোর্ট থেকে কারাগারে গিয়েছি। কারাগারে গিয়ে শরীরের দ্রুত অবনতি হতে লাগলো। কারাগারে ঢুকার সময় যদি রক্ষীরা বুঝতে পারে আমি অসুস্থ তারা বাধ্যগতভাবে আমাকে কারা হসপিটালে পাঠাবে। সেটা আরেক আজাব। সেখানে সকল বেড দখল করে রেখেছে পয়সাওয়ালা বন্দিরা। হসপিটালে গেলে আমার স্থান হবে বেডের নিচে অথবা চলাচলের রাস্তায় অথবা টয়লেটের সামনে। তাই এখানেও নিজেকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করছি, যাতে হসপিটালে যেতে না হয়।

সন্ধ্যার গুনতির আগে আমার প্রসেসিং শেষ হলে আমি ওয়ার্ডে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু সেটা হয়নি। গণনা শেষ হয়ে গেল। আমার প্রসেসিং শেষ হতে হতে মাগরিবের সময় হয়ে গেল। ঠাঁই হলো আমদানি ওয়ার্ডে। পুরো শরীরে ধুলোবালি, ময়লা। গত দু'দিন মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে মার খেয়েছি। ওয়ার্ডে যেতে না পারায় গোসলও দেওয়া হলো না। অযু করে গামছা বিছিয়ে মাগরিবের নামাজে দাঁড়ালাম। ১ম রাকায়াত শেষে যেই দাঁড়াতে গিয়েছি আর পারি নি। ঢলে পড়ে গেলাম। আর কত নিজেকে ধরে রাখা যায়!

অল্প সময়েই জ্ঞান ফিরলো। দেখলাম দুজন লোক আমাকে কিছু একটা খাওয়াতে ট্রাই করছে। ওটা ছিল মাল্টার জুস। খেলাম। এরপর পানি খেলাম। ঐ দুইজন ভাই ভেবেছে আমি ক্ষিদের জন্য ঢলে পড়েছি। আমি তাদের আশ্বস্ত করলাম, প্রচুর খাওয়া হয়েছে আমার। দুপুরে বিরিয়ানী ও নানান ফলমূল খেয়েছি। বিকেলে আধালিটার আইস্ক্রিমের বড় অংশ খেয়েছি। পানি খেয়ে আবার নামাজ শুরু করলাম। এবার বসে পড়েছি।

নামাজের পর ঐ দুই ভাইয়ের সাথে আলাপ করলাম। তারা আমাকে জানালেন, আমাকে নাকি দেখেই তারা বুঝেছে যে আমি শিবির। জ্ঞান হারানোর পর তারা আমার শরীর ম্যাসেজ করে দিয়েছে। পানি খাইয়েছে। আমার ব্যাগ থেকে মাল্টা বের জুস বানিয়ে খাইয়েছে। আমিও বুঝলাম তারা জেএমবি সদস্য। তারা এই কারাগারে দীর্ঘদিন আছে। আজ তাদের কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া গেছে। এর বিচার কাল সকালে হবে। তাই তাদের আমদানিতে এনে রাখা হয়েছে।

যাই হোক রাতে আমার জ্বর এসেছে। জেএমবি সদস্যরা আমার সেবা করেছে। তাদের কাছে থাকা খেজুর খাইয়েছে। পরদিন সকালে কারাগারের কিছু ফর্মালিটিজ শেষ করে ১০ টার দিকে হালদা ১৮-তে চলে গেলাম। সেই থেকে ঐ দুই ভাইয়ের সাথে আমার যোগাযোগ ছিল। তারা ওয়ার্ড থেকে বের হতে পারতেন না। তাই আমার পরিচিত রক্ষীদের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রাখতাম। খাবার পাঠাতাম। কোনোদিন ফেবারে থাকা রক্ষীকে সাথে নিয়ে তাদের সাথে দেখা করতে যেতাম। জাতীয় দিবসগুলোতে দেখা করার সুযোগ পেতাম। দেখা করতাম। এভাবে তাদের সাথে ভালো সখ্যতা তৈরি হলো।

তাদের থেকে আমি যেটা জানলাম, তাদের সংগঠিত হওয়া, অস্ত্রের প্রশিক্ষণ পাওয়া ও অস্ত্র পাওয়া সবটাই হয়েছে ভারতের বিভিন্ন স্থানে। ভারত আসা যাওয়া নিয়ে আমি প্রশ্ন করলে তাদের থেকে যেটা জানতে পারি তা হলো, ঐ দেশের মুজাহিদরা অর্থাৎ ভারতের মুজাহিদরা বিএসএফকে ম্যানেজ করতে পেরেছে। বিএসএফ তাদের জন্য কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল বিডিআর। বিডিআরকে ফাঁকি দিতে পারলেই যাতায়াত ও অস্ত্র আনতে আর কোনো সমস্যা ছিল না।

আমি তাদেরকে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত শুনে তাদের মনে প্রশ্ন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি কীভাবে একটি চরম মুসলিম বিদ্বেষী রাষ্ট্র ইসলামী যোদ্ধাদের সহায়তা করতে পারে! এটা একটা ট্র্যাপ। আপনারা সাধারণ ঈমানদার মানুষ। আপনাদের ত্যাগ ও নিয়ত নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনাদের যারা পরিচালনা করছে তাদের আমরা সন্দেহ করি। অনেক তর্ক বিতর্ক হতো! অনেক কথা হতো! সর্বোপরি ভালোবাসাও ছিল।

পুরাতন এই কথাগুলো টেনে আনলাম গতকাল একটা নিউজ দেখে। ভারতের মিজোরাম সরকার অফিসিয়ালি বাংলাদেশের পাহাড়ের খ্রিস্টান বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গীদের আশ্রয় দিচ্ছে। গত ২২ নভেম্বর তাদের মন্ত্রীপরিষদে এই সিদ্ধান্ত পাশ হয়েছে। মিজোরাম একটি খ্রিস্টান রাজ্য। এর ৮৮% মানুষ খ্রিস্টান। কুকি চীন ন্যশনাল ফ্রন্ট নামের বাংলাদেশী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টানদের স্বাধীন দেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে ভারত তাদের সহায়তা করছে। বিএসএফ পলাতক কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) সদস্যদের উদ্ধার ও আশ্রয় দেওয়ার জন্য রেসকিউ টিম তৈরি করেছে।

জেএমবি ইস্যুতে আমার দেওয়া তথ্যকে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব উল্লেখ করে উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মিকে (কেএনএ) সহায়তা দেওয়াকে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। কারণ ভারতের গণমাধ্যমগুলো সহায়তার নিউজ ছাপিয়েছে ২৪ নভেম্বর।

কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি আবার বাংলাদেশের রানিং জঙ্গী গোষ্ঠী হিন্দাল শ্বারকিয়ার সাথে জড়িত। কী ভয়ানক কথা! আল কাদেয়া পন্থী হিন্দাল শ্বারিকিয়ার কিছু সদস্য ট্রেনিং পারপাসে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সেই লেজ টানতে টানতে দেখা যায় আল কায়েদা আর কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি একসাথে ট্রেনিং নেয়। একদল খ্রিস্টান রাজ্য বানাতে চায় অন্যদল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ তারা একসাথে খায়!

উদ্বেগজনক বিষয় হলো উগ্র পাহাড়ী খৃস্টান সন্ত্রাসী আর আল কায়েদাপন্থী খারেজি সন্ত্রাসীদের মধ্যেকার সমন্বয়। সাধারণ দৃষ্টিতে তাদেরকে পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন মনে হলেও তারা আসলে বন্ধুভাবাপন্ন। তাদের গডফাদার কারা? কারা তাদেরকে একত্র করে দেয়? কারা তাদেরকে পুতুল বানিয়ে জেএমবিদের মতো সন্ত্রাসী বানাচ্ছে?

বিশ্বব্যাপী খৃস্টান মিশনারিরা পূর্ব তিমুরের মতো বাংলাদেশকে দ্বিখন্ডিত করার পরিকল্পনা করছে। তারা একইসাথে জঙ্গী দমনের নামে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ ও খৃস্টানদের অধিকারের নামে তাদের হয়ে অবৈধ হস্তক্ষেপ করতে চায়। খারেজি সন্ত্রাসী ও খৃস্টান পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের উস্কে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

যদিও শুরু থেকেই জোর সন্দেহ ছিল এই বিদ্রোহী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সহায়তা করতে ভারত। কিন্তু এর অফিসিয়াল কোনো তথ্য ছিল না। গত মঙ্গলবার অর্থাৎ ২২ নভেম্বর পার্শ্ববর্তী ভারতীয় প্রদেশ মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গার সভাপতিত্বে মিজোরাম মন্ত্রিসভার একটি বৈঠকে চিন-কুকি-মিজো সম্প্রদায়ের অন্তর্গত উদ্বাস্তুদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে এবং "অস্থায়ী আশ্রয়, খাদ্য ও অন্যান্য ত্রাণ সুবিধা অনুযায়ী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবরটি ২৪ নভেম্বর 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'সহ ভারতের সকল মূলধারার সংবাদ মাধ্যমে এসেছে।

যদিও এখানে উদ্বাস্তুদের কথা বলা হয়েছে, তবে প্রকৃত সত্য হচ্ছে শুধুমাত্র কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির জঙ্গী সদস্যরাই ভারতের আশ্রয়ে গেছে। কোনো সাধারণ নাগরিক তাদের বাড়িঘর ছেড়ে যায়নি। তারা দেশেই আছে। কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির দাবিও তাই। তারা বলেছে তারা সাধারণ কুকি চীন উপজাতি বাসিন্দাদের বিপদে ফেলতে চায় না বিধায় তারা যুদ্ধ না করে পিছু হটেছে।

মিজোরাম সরকার ইতোমধ্যে সকল পলাতক জঙ্গীকে তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিএসএফ রেসকিউ টিম তৈরি করে কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির সদস্যদের মিজোরামে থাকার সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে বিএসএফ ও ভারতীয় আর্মির প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সহায়তায় দ্রুতই তারা বাংলাদেশে অস্থিরতা ও গোলযোগ তৈরি করবে।

বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গী তৈরি ও আশ্রয় দেওয়া ভারতের জন্য নতুন নয়। ১৯৬৩ সাল থেকেই জঘন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

আমার এই পোস্ট সতর্ক থাকার জন্য। আমাদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে যাতে কেউ ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে না পারে!

২৭ নভেম্বর, ২০২২

আবির যেন মব জাস্টিসের শিকার না হয়!


চট্টগ্রামে নিখোঁজ আয়াতকে খুনের জন্য পুলিশ দায়ী করেছে আবির নামে এক গার্মেন্টস কর্মীকে। এন্টিকাটার আর বটি দিয়ে নাকি সে শিশু আয়াতকে জঘন্যভাবে খুন করেছে। আসলেই এন্টিকাটার কিংবা বটি দিয়ে ডেডবডি টুকরো করা যায় কিনা এটা প্রশ্নসাপেক্ষ। আর এই জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি দরকার সেই মানসিক প্রস্তুতি থাকে একজন পেশাদার অপরাধীর। কোনো প্রকার প্রতিশোধ, দ্বন্দ্ব, প্রচণ্ড ঘৃণা না থাকলে এভাবে একজন সাধারণ মানুষ অসাধারণ খুনী হয়ে ওঠা দুষ্কর।

এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ও জনমনে স্বভাবতই আবিরের বিরুদ্ধে জনরোষ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে তাকে ক্রসফায়ার করে খুন করার আবেদন জানাচ্ছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি জানিনা আবির খুনী কিনা। তবে আমি চাই তার বিচার হোক। সে সুষ্ঠু ও নির্ভরযোগ্য আইনজীবী পাক। আয়াতের প্রকৃত খুনীর প্রচণ্ড শাস্তি হোক। তবে আমি চাই না আয়াতের খুনের জন্য কোনো সাধারণ মানুষ ফেঁসে যাক।

যারা আবিরের ক্রসফায়ার চাইছেন তাদের জন্য আমি একটা ঘটনা শেয়ার করতে চাই।

//রেখা আক্তার। স্বামীর অভাবের সংসারে সুখের রেখা টানতে সেলাই মেশিনে বাসায় বসে কাজ করেন। হোসিয়ারি গার্মেন্টসে স্বামী কাজ করে যা রোজগার করেন তা দিয়ে সংসার চালানো অনেক কষ্টের। দুই মেয়ে লেখাপড়া করে। কোন ছেলে নেই তাদের। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পাশ করেছে। ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রি।

ছেলে সন্তান না থাকলেও মেয়েকে কোন কাজে দেননি তারা। মাঝে মাঝে অভাবের সংসারে বড় মেয়ে পড়ালেখা ছেড়ে মায়ের সাথে কাজ করতে চায়। কিন্তু রেখা আক্তার সুস্থ থাকতে সেটা করতে দিতে রাজি হননা। রাতে যখন নিস্তব্ধ শহর, তখনও রেখা সেলাই মেশিনে সুতার রেখা টেনে চলেন কাপড়ে। তবে আজকের গল্পটা অন্যরকম রোমহর্ষক।

আদরের দুই মেয়ে জেরিন ও জিসা। ছোট্ট সংসারে অভাব থাকলেও সুখ ছিল। খুব বেশি চাওয়া নেই তাদের। করোনার কারণে গার্মেন্টস বন্ধ হলেও রেখা ঠিকই সংসার সামলেছেন দিন-রাত কাজ করে। ছোট্ট ঘরে চারটি প্রাণ নিয়ে কখনও কারো নিকট হাত পাতেননি। করোনার কারণে যে গার্মেন্টস বন্ধ ছিল তা এখন খোলা হয়েছে। স্বামী জাহাঙ্গীর কাজ করে উপার্জন করছে। এখন তাদের অভাব নেই।

তবে ঘটনার শুরু ৪ জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যার পর থেকে। ছোট মেয়ে জিসা(১৪) কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গিয়েছে, কার সাথে গিয়েছে কিছুই জানেনা তারা। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি এমন কারো ঘর নেই যেখানে খোঁজা হয়নি তাঁকে। কিন্তু তারা জানেনা কেউ হারিয়ে গেলে নিকটস্থ থানায় সংবাদ দিতে হয়। কেউ একজন বলেছিল থানায় জিডি করতে। খুব বেশি কর্ণপাত করেনি সে কথায়।

অবশেষে ১৭ জুলাই ২০২০ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে মেয়ের নিখোঁজ জিডি করেন দেওভোগ এলাকার রেখা আক্তার। তদন্তকারী অফিসার এসআই শামীম আল মামুন। ঘটনার ১৩ দিন পর জিডি হলেও থেমে থাকেননি তিনি। বারবার রেখা আক্তারের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও গোপন অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন। জিসা কোন মোবাইল ফোন ব্যবহার করত না। শুধুমাত্র রেখা আক্তারের একটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করত পরিবারের সকল সদস্যরা। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে কোন ফল পাওয়া যাবে কিনা সেটাও ছিল অনিশ্চিত। তবুও এগিয়ে যান তদন্তকারী অফিসার।

তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সন্দেহ করা হয় অটো রিক্সা চালক রকিবকে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে আনা হয় থানায়। পাওয়া যায় ঘটনার কিছু সূত্র। সে অনুযায়ী ৬ আগস্ট অপহরণ মামলা রুজু হয় থানায়। অতঃপর আটক করা হয় আব্দুল্লাহকে। এদের কাউকে চিনেনা রেখা আক্তারের পরিবার। তাদের সাথে কোন পূর্ব শত্রুতাও নেই। তবে তারা কেন অপহরণ করবে জিসাকে? প্রশ্ন থেকেই যায়।

এগুতে হবে তদন্তকারী দলকে। রকিব ও আব্দুল্লাহকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে দুই দিনের পুলিশ রিমাণ্ডে আনা হয়। এবার নতুন তথ্য পাওয়া যায় আব্দুল্লাহর নিকট থেকে। ঘটনার সময় নারায়ণগঞ্জ ইস্পাহানী ঘাট থেকে জিসাকে নিয়ে আব্দুল্লাহ একটি ছোট বৈঠা চালিত নৌকা ভাড়া করেছিল। তখন রাত অনুমান নয়টা। রাত বারোটার দিকে ফিরে এসেছিল আব্দুল্লাহ। তবে ফিরে আসেনি জিসা। আর তার পুরো ঘটনা জানতে হলে যেতে হবে সেই মাঝির নিকট। তবে সে মাঝির নাম জানেনা আব্দুল্লাহ। পুলিশ সুপার নারায়ণগঞ্জ নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার টিম ও সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসার একসাথে কাজ শুরু করেন পুরো রহস্য উদ্ঘাটনে।

ইস্পাহানী ঘাটে থাকা বৈঠা দ্বারা চালিত ১২টি নৌকার মাঝিকে একযোগে জিজ্ঞসাবাদের জন্য আটক করা হয়। হাজির করা হয় আব্দুল্লাহর সামনে। এক এক করে মাঝিকে দেখানো হয় তাঁকে। এবার খুঁজে পাওয়া যায় সেই মাঝিকে, নাম খলিলুর রহমান ওরফে খলিল। এরপর আটক করা হয় তাঁকেও। গ্রেপ্তারকৃত তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ঘটনার আদ্যোপান্ত।

জিসা খুব সহজ সরল এবং চরম বিশ্বাস প্রবণ একটি মেয়ে। সবাইকে খুব সহজেই বিশ্বাস করত। আব্দুল্লাহর কোন নির্দিষ্ট পেশা নেই। অনেকটা ভবঘুরে স্বভাবের। জিসাদের বাড়ির পাশে একটি চায়ের দোকানে কাজ করেছে কিছুদিন। সেখান থেকেই পরিচয় হওয়ার পর জিসা তাঁকে দিয়েছিল তার মায়ের মোবাইল নম্বর। আব্দুল্লাহর নিজের কোন মোবাইল নেই। এরপর সুযোগ পেলে অন্য কোন মোবাইল থেকে তাদের কথা হতো মাঝে মাঝে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহ অটো রিক্সা চালক রকিবের মোবাইল ফোন থেকে ফোন দিয়ে কথা বলে জিসার সাথে।

ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে রকিবের অটোতে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে রাত নয়টায় ইস্পাহানী ঘাটে যায় তারা। রকিব তাদেরকে নামিয়ে দিয়ে চলে আসে। রাতের নদীতে ভ্রমনের আনন্দ নিতে খলিলের নৌকা ৩০০ টাকায় ভাড়া করে আব্দুল্লাহ। নদীর মাঝে ঘুরতে ঘুরতে একসময় আব্দুল্লাহ ঝাঁপিয়ে পড়ে জিসার উপর। নিজেকে রক্ষা করতে প্রাণপণে চেষ্টা করে জিসা। কিন্তু জিসার শক্তির সাথে পেরে ওঠেনা আব্দুল্লাহ। সাহায্য করে মাঝি খলিল। জিসা’র দু পা ধরে রাখে সে। আর আব্দুল্লাহ জোর পূর্বক ধর্ষণ করে রক্তাক্ত করে জিসাকে।

তার গগণবিদারী হাহাকার রাতের আঁধারের নদীতে কেউ শোনেনি। মুখ বন্ধ করে ধরে রাখে আব্দুল্লাহ। তারপর রক্তাক্ত দেহে আবার ধর্ষণ করে মাঝি খলিল। জিসা তখন ক্লান্ত ও অবসন্ন। ধর্ষণের আঘাতে চরম ক্ষতিগ্রস্থ তার শরীর। যন্ত্রণায় কাতর জিসা শুধু বলে বাড়িতে গিয়ে সব বলে দিবে। এমন কথায় ভয় পেয়ে যায় আব্দুল্লাহ ও খলিল। এবার নতুন মিশনে নামে তারা দু’জন। জিসার গলা টিপে ধরে আব্দুল্লাহ আর পা চেপে রাখে খলিল। একসময় নিস্তেজ হয়ে যায় জিসার দেহ। প্রাণ চলে যায় দূর আকাশে। পড়ে থাকে দেহ রাতের আঁধারে নদীর বুকে খলিল মাঝির নৌকায়। স্রোতাস্বিনী শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় জিসা’র মরদেহ।

০৯ আগস্ট বিজ্ঞ আদালতে নির্মম এ খুনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে গ্রেপ্তারকৃত আসামি আব্দুল্লাহ (২২), রকিব (১৯) ও খলিলুর রহমান (৩৬)। আদালতের নির্দেশে আসামিরা এখন জেলখানায় বন্দি। মা রেখার জীবনে আর ফিরে আসবেনা জিসা। এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি জিসার লাশ। শেষ দেখাও হবে কিনা জিসার মুখটা তাও অনিশ্চিত। তবে জড়িত আসামিদের সনাক্ত ও বিচারের মুখোমুখি করতে পেরেছে পুলিশ।

জিসার পরিবার কখনো ভাবতে পারেনি তাদের জিসা এমন নির্মম ধর্ষণ ও খুনের শিকার হয়েছে। তারা পুলিশের কাছেও আসতে চায়নি। তবে যখন পুলিশের নিকট এসেছে, পুলিশ তাদের সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দিয়ে অকল্পনীয় ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। পুলিশ এতটুকু না করলেও হয়তো রেখা আক্তারের কোন অভিযোগ থাকত না। কারণ তারা এসবের কিছুই জানেনা বা ভাবতেও পারেনি। শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকেই এমন ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হযেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ।
সম্মানিত নাগরিকদের পাশে সর্বদাই বাংলাদেশ পুলিশ।//

এই অসাধারণ সুন্দর গল্পটি ১০ আগস্ট ২০২০ পাবলিশ হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফায়েড পেইজে সন্ধ্যায়। মজার ব্যাপার হলো গল্পের জিসা গত রবিবার(২৩/৮/২০) তার মাকে ফোন দিয়ে বলে বাসা ভাড়ার জন্য চার হাজার টাকা দিতে! মূলত জিসা মারা যায়নি। সে তার প্রেমিক ইকবালের সাথে পালিয়ে গেছে। দেড় মাসের মতো সংসার করেছে। এখন টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা ফোন করে টাকা চাইছে।

এদিকে বীর পুঙ্গব পুলিশ বাহিনী রিমান্ডে নিয়ে তিন জনের কাছ থেকে খুনের স্বীকারোক্তি আদায় করে ফেলেছে। এই হলো আমাদের পুলিশের বীরোচিত গল্পগাঁথা। পুলিশের রিমান্ডের চোটে ভয় দেখিয়ে পুলিশ তার কেইস সমাধান করে। বাংলাদেশের পুলিশের মতো ভয়ংকর সন্ত্রাসী আর কেউ হতে পারে না।

রিমান্ডে পুলিশ নিজেই গল্প সাজিয়ে দেয়। সন্দেহভাজনদের সেই গল্প বলতে বাধ্য করে। নতুবা খুন করে ফেলার হুমকি দেয়। আর প্রচন্ড নির্যাতন তো আছেই। আমি নিজেই সাক্ষী চট্টগ্রামে পাঁচলাইশ ও চাঁন্দগাঁও থানায়। আল্লাহ সাহায্য করেছেন, ধৈর্য দিয়েছেন। তাই আমাকে কোনো ভুয়া স্বীকারোক্তি দিতে হয়নি।

পুলিশের নির্মমতা শুধুমাত্র তারাই বুঝবেন যারা পুলিশের খপ্পরে পড়েছেন। তাই এখনই আবিরের বিরুদ্ধে মব জাস্টিস তৈরি করবেন না। অপেক্ষা করুন। প্রকৃত খুনী যাতে শাস্তি পায় সে জন্য দোয়া করুন।

আয়াতের জন্য খুবই কষ্ট হচ্ছে। আমারো এই বয়সী একটি সন্তান আছে। ডাইনি হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী সমাজে নিজের ও সন্তানদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আরো সাবধানী হই। তাদেরকে একা না ছাড়ি। চোখে চোখে রাখি।

আল্লাহ কবে যে আমাদের এই জালিম জনপদ থেকে মুক্তি দেবে!


১৭ নভেম্বর, ২০২২

খিলাফত পর্ব-৩৫ : কুরআন সংকলনের ইতিহাস

একদিন বিশিষ্ট সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. বিচলিত হয়ে উসমান রা.-এর কাছে এলেন। তিনি বললেন, ইহুদী ও খৃস্টানদের মতো নিজেদের কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ করার পূর্বেই আপনি এই উম্মাহকে সামলান। হুযাইফা রা. সিরিয় ও ইরাকী যোদ্ধাদের সাথে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নানা অঞ্চলের মানুষের কুরআন পাঠের ভিন্নতা দেখে তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করলেন, কেউ ইবনু মাস'উদ রা.-এর অনুসরণে কুরআন তিলাওয়াত করে। আবার অন্যরা আবূ মূসা আল-আশ'আরীর অনুসরণে কুরআন তিলাওয়াত করে। শুধু তাই নয়, এক দল অন্য দলকে হেয়জ্ঞান করে।


এই অবস্থা দেখে তিনি বললেন, 'কূফাবাসী বলে, ইবনু মাসউদের কিরাআত ভালো, বসরাবাসী বলে আবূ মূসার কিরাআত ভালো। আল্লাহর শপথ! আমি আমীরুল মু'মিনীনের কাছে গিয়ে অনুরোধ করবো তিনি যেন সবাইকে একই পঠনপদ্ধতির ওপর একত্রিত করেন। অভিযান শেষে মাদীনায় এসে হুযাইফা রা. উসমান রা.-কে বললেন, 'আমীরুল মু'মিনীন! ইয়াহুদী ও নাসারাদের মত নিজেদের কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ করার পূর্বেই আপনি এই উম্মাহকে সামলান।

পঠনপদ্ধতির ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন ক্বারির ছাত্রদের মাঝে বিতর্কের বিষয়টি উসমান রা. মদিনায়ও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। একবার তিনি মসজিদে খুতবা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, 'তোমরা আমার সামনেই মতভেদ করো! না জানি দূরে যারা আছে তারা কী করে?

কুরআন সংকলনের বিষয়ে সাহাবীদের সাথে উসমান রা.-এর পরামর্শ করা শুরু করলেন। হুযাইফা রা.-এর আশংকা ও পরামর্শ উসমান রা. অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিলেন। করণীয় নির্ধারণে তিনি মুহাজির ও আনসারী সাহাবীগণকে একত্রিত করলেন। উম্মাহর শ্রেষ্ঠ আলিম, ফকীহ ও বিজ্ঞ ব্যক্তি এদের মধ্যেই ছিলেন। যাদের শীর্ষে ছিলেন আলী ইবনু আবি তালিব রা.। তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা পর্যালোচনা শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হতে দেওয়া যায় না, মুমিনদের অন্তরে কোনো প্রকার সন্দেহ-সংশয় যেন প্রবেশ না করতে পারে।

তাই তাঁরা আবু বকর রা.-এর আমলে প্রস্তুতকৃত কুরআনের সংরক্ষিত কপি হতে আরো কয়েক কপি প্রস্তুত করে কুরআনের বিশুদ্ধ কপি ইসলামী খিলাফাতের নানা স্থানে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সংরক্ষিত কপি উম্মুল মুমিনিন হাফসা রা.-এর নিকট সংরক্ষিত ছিল। সিদ্ধান্ত অনুসারে খলীফা উসমান রা. হাফসা রা.-এর কাছে দূত পাঠিয়ে বললেন, 'আমাকে সংরক্ষিত কুরআনের সংরক্ষিত কপি পাঠিয়ে দিন। আমি কয়েকটি অনুলিপি তৈরী করে মূল কপি আপনার কাছে ফেরত পাঠাবো। হাফসা রা. তাঁর কাছে রক্ষিত আল কুরআন উসমান রা.-এর কাছে পাঠিয়ে দেন।

এরপর উসমান রা. চার সদস্যের একটি কমিটি তৈরি করেন। যার সদস্যরা ছিলেন, যায়িদ ইবনু সাবিত রা., আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর রা., সাঈদ ইবনুল আস রা. ও আবদুর রহমান ইবনুল হারিস রা.। তাদেরকে উসমান রা. আবু বকর রা.-এর আমলে প্রস্তুত কুরআনের সংরক্ষিত কপির অনুলিপি প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। এদের মধ্যে যায়িদ ইবনু সাবিত রা. ছিলেন মদিনার সাহাবী আর বাকীরা ছিলেন মক্কার। উসমান রা. কমিটির সদস্যদের জানালেন কোনো শব্দের আরবীত্বের ব্যাপারে যায়িদ ইবনু সাবিত রা.-এর সাথে বাকীদের মতভেদ হয় তবে তোমরা তা মক্কার ভাষায় লিপিবদ্ধ করবে। কারণ এই কিতাব কুরাইশদের ভাষায় নাযিল হয়েছে।

২৫ হিজরীতে কমিটির সদস্যরা কাজ শুরু করেন। চার সদস্যের কমিটির সবাই হাফিযুল কুরআন হলেও তারা হাফসা রা.-এর কাছ থেকে আনীত সাহীফাগুলোর ওপর ভিত্তি করে কুরআনের কয়েকটি অনুলিপি প্রস্তুত করলেন। উসমান রা. কয়েকটি শব্দের আরবীত্বের ব্যাপারে মতভেদের আশঙ্কা করেছিলেন। তবে একটি মাত্র শব্দ নিয়ে যায়িদ রা. ও কুরাইশী সংকলকদের মাঝে মতভেদ হয়েছিলো বলে জানা যায়। শব্দটি হল তাবূত। মদীনার আনসারদের উপভাষায় এটির পাঠ ছিল তাবুহ। এ বিষয়ে উসমান রা.-এর কাছে নির্দেশনা চাওয়া হলে তিনি তাবূত লিখতে বলেন।

উসমান রা.-এর আমলে সংকলিত আল কুরআনে আয়াত বা সূরার ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনরূপ পরিবর্তন আনা হয়নি। আবূ বাকর রা.-এর সংকলনে যে ধারাবাহিকতা ছিল সেটিই হুবহু বহাল ছিল উসমান রা.-এর সংকলনে। তাছাড়া কোন শব্দে কোনরূপ পরিবর্তন আনা হয়নি, সেটি সম্ভবও ছিল না। কুরআন সংকলনকালে আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর রা., উসমান রা.-কে বলেছিলেন, সুরা আল বাকারার ২৪০ নং আয়াতটি তো অন্য আয়াত দ্বারা (একই সূরার ২৩৪ নং আয়াত দ্বারা) মানসুখ হয়ে গেছে, তবে কেন আপনি সেটি বহাল রাখছেন?

জবাবে উসমান রা. বললেন, ভাতিজা, আমি (আল কুরআনের) কোন কিছু স্থান হতে পরিবর্তন করতে পারি না। খলীফার এই জবাব হতে বুঝা যায়, কোন আয়াত বাদ দেয়া তো দূরের কথা, কোন আয়াতের স্থান পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়নি। মৃত্যুর পূর্বে রা.-এর সামনে জিবরাঈল আ. পুরো কুরআন উপস্থাপন করেছিলেন। আবু বাকর রা.-এর সংকলনটি সেই উপস্থাপনার অনুরূপ, আবার উসমান রা.-এর সংকলনটি ছিল আবু বাকর রা.-এর সংকলনের অনুরূপ। এখানে কোনরূপ পরিবর্তন পরিবর্ধনের কোন ক্ষমতা কারো ছিল না।

বইয়ের মতো করে এই প্রথম কুরআন সংকলন হলো ৪ জনের কমিটির অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে। গ্রন্থাকারে কুরআনের অনুলিপি তৈরির কাজ সম্পন্ন হলে উসমান রা. মূল কপির পৃষ্ঠাগুলো হাফসা রা.-এর কাছে ফেরত পাঠালেন এবং অনুলিপিকৃত কুরআনের এক একটি কপি দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে প্রেরণ করলেন। এই কপিগুলোতে হারাকাত বা স্বরচিহ্ন এবং নুক্তা ছিল না। ফলে কুরআনের শব্দগুলো বিভিন্নভাবে তিলাওয়াত করার সুযোগ ছিল। এ কারণে উসমান রা. কুরআনের অনুলিপি প্রেরণের পাশাপাশি ক্বারীও প্রেরণ করেন। যাতে তারা জনগণকে একই পদ্ধতির ক্বিরাতের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন।

আবদুল্লাহ ইবনু সাইব রা.-কে মক্কায়, আল-মুগীরা ইবনু শিহাবকে সিরিয়ায়, আবু আবদুল্লাহ আস-সুলামীকে কুফায়, আমির ইবনু কায়সকে বসরায় প্রেরণ করা হয়। যায়িদ ইবনু সাবিত রা.-কে মদীনার অধিবাসীদেরকে কিরাআত প্রশিক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়। উসমান রা. নিজের কাছে এক কপি রাখেন। শাহদাতের সময় তিনি সেই কপি পড়ছিলেন। সন্ত্রাসী মুনাফিক ঘাতকদের আঘাতে উসমান রা.-এর রক্তে ভিজে যায় কুরআনের সেই কপি।

কুরআনের সরকারি কপি নির্ধারণের পর বাকী খন্ড খন্ড যে কপিগুলো মদিনায় ছিল সেগুলোকে একত্র করা হলো। রাসূল সা.-এর কাছে যখন কুরআন নাজিল হতো তখন অনেক সাহাবী আয়াতগুলো লিখে রাখতেন ও এর ব্যাখ্যা-টিকা সংযোজন করে রাখতেন। সকল সাহাবী থেকে এসব কপি সংগ্রহ করা হয় যাতে কুরআন নিয়ে পরবর্তীতে সন্দেহ সংশয় না তৈরি হয়। কেউ হয়তো কুরআনের আয়াতের পাশে ব্যাখ্যামূলক কিছু শব্দ লিখে রেখেছেন। তাদের অবর্তমানে তাদের সন্তানরা ঐ শব্দকে কুরআনের শব্দ হিসেবে দাবি করে বসতে পারে। এই আশংকায় কুরআনের সব খন্ডাংশ ও নোট একত্র করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

কারো কুরআনের কপির প্রয়োজন হলে সে স্টান্ডার্ড/ আদর্শ কপি হতে অনুলিপি করার সুযোগ ছিল। উসমান রা. সকল গভর্নরকে নির্দেশ দিলেন মাদীনা হতে প্রেরিত মুসহাফ ব্যতীত কুরআনের অন্যান্য কপিগুলো যেন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে আল্লাহর কালাম পাঠে মতভেদ করা হতে মুসলিম উম্মাহ্ পরিত্রাণ লাভ করে। সাহাবায়ে কিরামের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কুরআন সংকলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তারা উসমান রা.-এর এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিলেন। তারপরও কিছু কিছু স্থান থেকে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা হয়।
সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ্যে আলী রা. বলেন, ওহে জনগণ, উসমান রা.-এর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না, তাঁর সম্পর্কে ভাল বৈ অন্য কিছু বলো না। আল্লাহর শপথ! কুরআন সংকলনের ব্যাপারে তিনি তো আমাদের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! আমি যদি দায়িত্বে থাকতাম তবে অনুরূপ সিদ্ধান্তই নিতাম।

কুরআন সংকলন নিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বিরোধীতা করেছেন বলে কিছু কিছু বর্ণনায় পাওয়া যায়। যদিও এসব নির্ভরযোগ্য বর্ণনা নয়। তবে সেসব বর্ণনায় এটাও উল্লেখ রয়েছে, পরে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সাহাবাদের ইজমার সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। কুরআন সংরক্ষণের ব্যাপারে উসমান রা. ও তৎকালীন সাহাবাদের প্রচেষ্টা ছিল সত্যিই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে কুরআন সংরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি একই স্টাইলে কুরআন পড়ার ব্যবস্থা হয়েছে। কুরআন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার পথ বন্ধ হয়েছে।

তৎকালে আরবি ভাষাভাষীরাও একই নিয়মে বা একই শব্দে আরবি বলতেন না। তাদের নিজেদের মধ্যেও উচ্চারণে পার্থক্য ছিল। উসমান রা.-এর প্রচেষ্টায় সারা পৃথিবীতে একই পদ্ধতিতে কুরআন পড়ার প্রচলন হয়। মূলত মক্কার লোকদের উচ্চারণেই কুরআন পড়া হয়। এর মাধ্যমে আরবি ভাষাতেও শৃঙ্খলা আসে। আরবের লোকেরা কুরআনের মাধ্যমে একটি স্টান্ডার্ড ভাষা পায়। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে কুরআনের ভাষার মান ভাষা হিসেবে নির্ধারণ আরবি ভাষার ব্যকরণ প্রস্তুত
হয়।

মহান রাব্বুল আলামীন ৩য় খলিফা উসমান রা. থেকে এই খেদমত নিয়ে তাঁকে সম্মানিত করেছেন। এই কারণে উসমান রা.-কে জামিউল কুরআন বলা হয়।

১৬ নভেম্বর, ২০২২

ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান

মাওলানা মওদূদীর লেখালেখির একটা বড় অংশ ছিল ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ঘিরে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাদা আলাদা লেখাগুলোকে একত্রিত করে একই মলাটে প্রকাশ করার দাবি ওঠে পাঠক মহল থেকে। জামায়াত নেতা ড. খুরশিদ আহমদ মাওলানার লেখাগুলোকে একত্র করে ইসলামী রিয়াসাত নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এই বইটি বাংলায় 'ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান' নামে অনুবাদ হয়েছে।


ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সকল দিক ও বিভাগ সম্পর্কে ইসলামী স্কলারগণ বিংশ শতাব্দীতে ব্যাপক আলোচনা করছেন। একদিকে তাঁরা কুরআন সুন্নাহ থেকে ইসলামের মূলনীতি পেশ করছেন, খুলাফায়ে রাশেদীনের রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করছেন। অপরদিকে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা পর্যালোচনার মাধ্যমে আধুনিককালে ইসলামী মূলনীতি ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার উপযোগীতা, বাস্তবতা ও অকাট্যতার প্রমাণ পেশ করেছেন।

এই উভয় ক্ষেত্রেই সাইয়েদ মওদূদী অন্যদের চেয়ে অগ্রজ। একদিকে তিনি আধুনিক বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। অপরদিকে কুরআন সুন্নাহর অগাধ পান্ডিত্য, ইসলামের ইতিহাসের নির্যাস, শানিত যুক্তি আর অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিভা দিয়ে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বাস্তবতা ও বাস্তব রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।

প্রফেসর ডক্টর খুরশীদ আহমেদ প্রথমে সাইয়েদ মওদূদীর এ সংক্রান্ত লেখাগুলোর ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করেন Islamic Law and Constitution’ নামে। ইংরেজি গ্রন্থটি সারাবিশ্বে অভূতপূর্ব সাড়া জাগায়। তখন প্রবলভাবে দাবি উঠতে থাকে ইংরেজি সংস্কারণের পাশাপাশি সাইয়েদ মওদূদী ইসলামী রাষ্ট্র সংক্রান্ত সমস্ত লেখা একত্রে সংকলিত করে মূল উর্দু ভাষায় একটি গ্রন্থ প্রকাশ করা হোক। সেই দাবি ও চাহিদার প্রেক্ষিতেই প্রফেসর খুরশীদ আহমদ ইসলামী রাষ্ট্র সংক্রান্ত তাঁর সমস্ত লেখা একত্রে করে ইসলামী রিয়াসাত গ্রন্থ তৈরি করেন ১৯৬০ সালে। ইংরেজি Islamic Law and Constitution গ্রন্থটি ৪১২ পৃষ্ঠা আর উর্দু ইসলামী রিয়াসাত গ্রন্থটি ৭২০ পৃষ্ঠা। দুটি গ্রন্থই বিশ্বব্যাপী দারূণভাবে সমাদৃত হয়েছে।

সঙ্গত কারণেই এই অসাধারণ সংকলনটি বাংলায় অনুবাদ হওয়ার দাবি ওঠে। অনুবাদ কর্ম আগে শেষ হলেও বইটি ১ম প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। বইটি অনুবাদ করেন ৪ জন। আবদুস শহীদ নাসিম, আকরাম ফারুক, আব্দুল মান্নান তালিব ও মুহাম্মদ মুসা। বইটির টোটাল আলোচনাকে ১৬ টি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এই ১৬ অধ্যায়কে আবার ৪ খন্ডে ভাগ করা হয়েছে।

১ম পাঁচ অধ্যায় নিয়ে ১ম খন্ড। ১ম খন্ডের নাম 'ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন'। এই খন্ডে ইসলামের রাজনৈতিক থিওরি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

১ম অধ্যায়ে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ধর্ম সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? ইসলাম কী আচার সর্বস্ব কোনো ধর্ম? নাকি এটি জীবন সংশ্লিষ্ট বিধানের নাম? ইসলামী রাষ্ট্রের কেন প্রয়োজন? রাষ্ট্র ইসলামী না হলে ইসলামকে পূর্ণভাবে মানা যায় না। ইসলামের সকল বিধান মানার জন্য অবশ্যই রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োজন। এই অধ্যায়ে আরো আলোচিত হয় ধর্ম নিরপেক্ষ মতবাদ নিয়ে। ইসলাম ও রাজনীতিকে আলাদা করার চিন্তা বাতিল মতবাদ এই নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।

২য় অধ্যায়ে ইসলামের রাজনৈতিক মতাদর্শ কেমন তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইসলামী রাজনীতির উৎস কী? তা দিয়েই এই অধ্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে। নবীদের মিশন ও দায়িত্ব কী ছিল? ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও ধরণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এখানে। খিলাফত কী এবং এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

৩য় অধ্যায়ে কুরআনের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই অধ্যায়ে রাজনীতির মৌলিক থিওরি, জীবন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভংগি, দীন এবং আল্লাহর আইন, রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব, সার্বভৌমত্ব ও খিলাফতের ধারণা এবং আনুগত্যের মূলনীতি এসব বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।

৪র্থ অধ্যায়ে খিলাফতের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের কী দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন তা সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে।

৫ম অধ্যায়ে মাওলানা মওদূদী ইসলামী জাতীয়তার ধারণা ও ইসলামী জাতীয়তার প্রকৃত তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। জাতীয়তার বিভিন্ন উপাদান ও জাহেলি সমাজে জাতিগত বিদ্বেষের কদর্য রূপ তুলে ধরা হয়েছে। এর বিপরীতে ইসলামের প্রশস্ত ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

৬ষ্ঠ থেকে ১১শ অধ্যায় নিয়ে ২য় খন্ড গঠিত হয়েছে। ২য় খন্ডের নাম ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতি ও কর্মপন্থা।

৬ষ্ঠ অধ্যায়ে ইসলামী সংবিধানে আইনের উৎস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আইনের উৎস হিসেবে কুরআন মাজীদ, রাসূলূল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ, খিলাফতে রাশেদার কার্যক্রম এবং উম্মাতের মুজতাহিদগণের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করেছে মাওলানা।

৭ম অধ্যায়ে মাওলানা একটি ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিওসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইসলামী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কার? রাষ্ট্রের কর্মসীমা কতটুকু ব্যপৃত? রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের কর্মসীমা বা অধিক্ষেত্র এবং এগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক কী হতে পারে? রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী? সরকার কিভাবে গঠিত হবে? শাসকের গুণাবলী ও যোগ্যতা কী হওয়া উচিত? নাগরিকত্ব কী? নাগরিকদের অধিকার ও নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রের অধিকার এসব বিষয় নিয়ে দারুণ আলোচনা হয়েছে এই অধ্যায়ে।

৮ম অধ্যায়ে ইসলামী সংবিধানের ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে যা আলোচনা হয়েছে তা হলো- আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, রিসালাতের মর্যাদা, খিলাফতের ধারণা, পরামর্শের নীতিমালা, নির্বাচনের নীতিমালা, নারীদের দায়িত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য, শাসক ও তার আনুগত্যের নীতিমালা, মৌলিক অধিকার ও সামাজিক সুবিচার ও জনকল্যাণ।

৯ম অধ্যায়ে ইসলামী রাষ্ট্রের উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। নববী যুগের ১০ বছর ও পরবর্তী খুলাফায়ে রাশেদার আমলের বর্ণনা, শাসনপদ্ধতি ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন মাওলানা মওদূদী।

১০ম অধ্যায়ে ইসলামের আইন শাস্ত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্র এবং তাতে ইজতিহাদের গুরুত্ব, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, মহানবী সা.-এর অনুসরণ, ইজতিহাদ ও ইজতিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলী নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও আইন প্রণয়নে শূরা ও ইজমার ভূমিকা এবং ইসলামী ব্যবস্থায় বিতর্কিত বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঠিক পন্থা নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন মাওলানা মওদূদী।

১১শ অধ্যায়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন দিক ও বিভাগ নিয়ে আলোচনা করেছেন মাওলানা মওদূদী রহ.। এছাড়াও খিলাফাত ও স্বৈরতন্ত্র, জাতীয় রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও অমুসলিমদের অধিকার নিয়ে এই অধ্যায়ে আলোচনা হয়েছে।

দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ অধ্যায় পর্যন্ত ৩য় খন্ড। এই খন্ডের নাম ইসলামী শাসনের মূলনীতি।

১২শ অধ্যায়ে মাওলানা মৌলিক মানবাধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। এই অধ্যায়ে মাওলানা মানবাধিকার কী? কবে থেকে এবং কেন এর উতপত্তি তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সবশেষে ইসলাম মানুষকে যেসব অধিকার দান করেছে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

১৩শ অধ্যায়ে মাওলানা অমুসলিমদের অধিকার নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। এই অধ্যায়ে মাওলানা একটি ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের অধিকার কী হতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। এর পাশাপাশি যেসব বিষয়ে তাদের হক বা অধিকার নেই তাও বিবৃত করেছেন।

১৪শ অধ্যায়ে ইসলাম ও সামাজিক সুবিচার নিয়ে আলোচনা করেছে মাওলানা মওদূদী। মাওলানা এখানে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। ইসলামের সুবিচার ও সাম্যতার পাশাপাশি অন্যান্য মতবাদের শোষণনীতি ও তাদের অসারতা প্রমাণ করেছেন।

১৫শ অধ্যায়ে কুরআনের আলোকে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান নীতিমালাগুলো কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখানে মাওলানা রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃতি, পরামর্শ বা শূরা, আদল ও ইহসান, নেতৃত্ব নির্বাচনের মূলনীতি, প্রতিরক্ষা এবং যুদ্ধ ও সন্ধির মূলনীতি, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং শিক্ষানীতির সাধরণ মূলনীতি, নাগরিকত্ব ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ষোড়শ অধ্যায় নিয়ে ৪র্থ খন্ড গঠিত হয়েছে। এই খন্ডের নাম ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি

১৬শ অধ্যায়ে মূলত একটি ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে গঠিত হবে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মাওলানা মওদূদী ৮ টি পয়েন্টে এই অধ্যায় লিখেছেন।
১. ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি
২. ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট
৩. ইসলামী বিপ্লবের পথ
৪. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মপন্থা
৫.শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের পন্থা
৬. আধুনিক রাষ্ট্রে ইসলামী আন্দোলনের কর্মপন্থা
৭. ইসলামী রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার সঠিক কর্মধারা
৮. রাজনৈতিক বিপ্লব আগে না সমাজ বিপ্লব?

'ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান' এই বইটি সকল মুসলিম বিশেষভাবে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অতীব জরুরি পাঠ্যবই। এই বই অধ্যয়নের মাধ্যমে একজন পাঠক সহজেই ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধানের রূপ ও প্রকৃতি কীরূপ হওয়া উচিত তা জানতে পারবে। ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য কর্মপন্থা কী হবে? এবং ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য নিজেকে কী দায়িত্ব পালন করতে হবে তার সঠিক নির্দেশনা পাবে।

মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের ইকামাতে দ্বীন তথা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান
লেখক : সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী
অনুবাদক : আবদুস শহীদ নাসিম, আকরাম ফারুক, আব্দুল মান্নান তালিব ও মুহাম্মদ মুসা।
প্রকাশনী : শতাব্দি প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ৪৯৬
মুদ্রিত মূল্য : ২৫০
জনরা : থিয়োলজি ও রাজনীতি

১৩ নভেম্বর, ২০২২

খিলাফত পর্ব-৩৪ : উসমান রা.-এর আর্থিক নীতি যেমন ছিল


রাসূল সা.-এর সময়ে ও আবু বকর রা.-এর সময়ে বাইতুলমাল / কোষাগার প্রতিষ্ঠা হলেও এটি স্বাতন্ত্র ও পূর্ণতা পায়নি। তাঁরা আয় করতেন ও সাথে সাথেই খরচ করতেন। উমার রা. অর্থনৈতিক বিভাগ গঠন করেন এবং এর তত্ত্বাবধানের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করেন। উমার রা.-এর সময়ে রাষ্ট্রের আয় ব্যপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এগুলোর হিসেব রাখা ও খরচ করার নিমিত্তে তিনি পারসিকদের অনুকরণে নথিপত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। যার নাম দেওয়া হয় দিওয়ানী। উসমান রা.-এর আর্থিক নীতি উমার রা.-এর সময়ের আর্থিক নীতিরই অনুরূপ।  

উসমান রা.-এর আর্থিক নীতি 

১.  পূর্বসূরিদের অনুসরণ 
উসমান রা. নিজের ঘোষণা অনুযায়ী অন্যান্য বিভাগের মতো বাইতুলমাল বিভাগেও পূর্বসূরী অর্থাৎ উমার রা.-এর নীতি অনুসরণ করেন। আল্লাহর রাসূল সা.-এর অর্থনৈতিক মূলনীতি অনুসরণ করেন।

২. কর আদায়কারীদের বাড়াবাড়ি থেকে জনগণকে রক্ষা
উসমান রা.-এর আর্থিক নীতির একটি অন্যতম বিষয় ছিল জনগণকে যাকাত, উশর অন্যান্য কর আদায়কারীদের বাড়াবাড়ি ও জুলুম থেকে রক্ষা করা। ন্যায়ানুগ ভিত্তিতে রাষ্ট্রের পাওনা আদায় করার ব্যবস্থা তিনি করেছেন। জনগণের সুযোগ সুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখে পাওনা আদায় করতে তিনি সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। যাকাত আদায়ের সময় যাতে নাগরিকদের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সম্পদ্গুলো বেছে বেছে নেওয়া না হয় তার আদেশ দিয়েছেন।   

৩. জনগণের পাওনা যথাযথভাবে আদায় করা 
রাষ্ট্র থেকে জনগণের পাওনা যথাযথভাবে আদায় করার ব্যবস্থা নিয়েছেন উসমান রা.। জনগণ তার পাওনা আদায়ে যাতে ভোগান্তির শিকার না হয় তার ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া রাস্তাঘাট, বাজার, সরাইখানা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল যা থেকে জনগণ উপকৃত হতো। উসমান রা. জনগণের অধিকার জনগণের নিকট পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। 

৪. জিম্মিদের অধিকার নিশ্চিত
ইসলামী রাষ্ট্রের চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া, তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা ও তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় জোর তাকিদ দিয়েছেন উসমান রা.। উমার রা. মৃত্যুশয্যায় পরবর্তী খলিফার উদ্দেশ্যে এই অসিয়ত করে গিয়েছেন যে, জিম্মীদের সাথে যেন ভালো ব্যবহার করা হয়। তাদের ওপর যেন করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া না হয়। রাসূল সা.-ও বলে গিয়েছেন, যে চুক্তিবদ্ধ নাগরিকদের ওপর জলুম করে, তার ওপর সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেয়, তার সম্মানহানী করে, কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে জিম্মীদের পক্ষ হয়ে অবস্থান নিবেন। 

৫. বাইতুলমালে বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ দেওয়া 
বাইতুলমাল আদায় ও পরিচালনার জন্য উসমান রা. বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে আপোষহীন ছিলেন। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেই তিনি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতেন ও ব্যবস্থা নিয়েছেন। 

৬. দ্রব্যমূল্য ও বাজার নিয়ন্ত্রণ 
উসমান রা. ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি তাদের যথেচ্ছাচার রোধ করেছেন। তিনি বাজার নিয়ন্ত্রণে অত্যান্ত কঠোর ছিলেন। বাজারের খোঁজ খবর তিনি বাজার থেকেও নিতেন এমনকি মসজিদে খুতবা দিতে দাঁড়িয়েও জনগণ থেকে খবর নিতেন বাজারের দরদাম ঠিক আছে কিনা।  

বাইতুলমালে আয়ের খাত 

১. যাকাত : উমার রা.-এর মতো উসমান রা.-এর সময়ে যাকাত ছিল বড় রাষ্ট্রীয় আয়ের মাধ্যম।  উসমান রা. যাকাত আদায়, যাকাতের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ এবং যাকাতের সম্পদ ব্যায়ের জন্য আলাদা যাকাত ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করে দেন। যাকাত ব্যয়ের নির্দিষ্ট খাতে যাকাত ব্যয় করা হতো। 

২. জিজিয়া : ইসলামী রাষ্ট্রে যারা অমুসলিম ছিল তারা নিরাপত্তা কর বা জিজিয়া দিতেন। এটাও রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আয়ের খাত হিসেবে দেখা দেয়। এই কর প্রত্যেক অমুসলিম স্বাধীন সামর্থবান পুরুষের ওপর ধার্য ছিল। কোনো অক্ষম পুরুষ, মহিলা, শিশু ও দাসের ওপর ধার্য ছিল না। এই করের বিনিময়ে অমুসলিম পুরুষেরা তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করবে ও নিরাপত্তা পাবে। তারা প্রতিরক্ষায় কোনো যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষা ব্যয়ে কোনো ভূমিকা রাখবে না। মুসলিম সামর্থবান পুরুষেরা এই কর দিবে না। কিন্তু তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ও প্রতিরক্ষায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে। উসমান রা. তার সময়ে ধনীদের জন্য বার্ষিক ৪৮ দিরহাম, মধ্যবিত্তদের জন্য ২৪ দিরহাম ও নিন্মবিত্তদের জন্য ১২ দিরহাম জিজিয়া নির্ধারণ করে দেন।   

৩. খারাজ : ইসলামী রাষ্ট্র যে জমি কোন অমুসলিমকে বন্দোবস্ত দিয়েছে, এমন জমিকে খারাজি জমি বলে। আর এই জমি হতে যে রাজস্ব আদায় করা হয় তাকে খারাজ বলে। খারাজ সাধারণত বছরে একবার আদায় করা হয়। এটা রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে। ভূমির উর্বরা শক্তি , ধরন, সেচ ইত্যাদির উপর এর পরিমাণ নির্ভর করে। ইসলামের ২য় খলিফা উমার রা. ইরাক, সিরিয়া ও মিশরের বিশাল বিস্তৃত উর্বর ভূমির উপর খারাজ নির্ধারণের জন্য ভূমি রাজস্ব বিশেষজ্ঞ দলের অন্যতম সদস্য উসমান বিন হানিফকে জমির জরিপকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে খারাজ নির্ধারণের নির্দেশ জারী করেছিলেন। উসমান রা.-এর সময়ও এই আয় অব্যাহত থাকে।  

৪. বিদেশী পণ্যের উশর : উশর মানে এক দশমাংশ বা ১০%। ইসলামী রাষ্ট্র যখন অনেক বড় হয়ে যায় তখন এখানে ব্যবসা করার জন্য বহু ব্যবসায়ি আসতে থাকে। ফলে রাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তৎকালীন বিশ্বের নিয়ম অনুসারে বিদেশী ব্যবসায়ীদের ওপর ১০% কর আরোপ করা হয়। 

৫. উশর : কৃষিজাত পণ্যের ওপর নির্ধারিত যাকাতকে উশর বলে। এটা মুসলিমদের ওপর নির্ধারিত ছিল। সেচবিহীন জমিতে উৎপাদিত ফসলের যাকাত ছিল ১০%। আর সেচ দেওয়া জমিতে উৎপাদিত ফসলের যাকাত ছিল ৫%। এছাড়া গবাদি পশুর ওপরও নির্দিষ্ট হারে যাকাত দিতে হতো। 

৬. গনিমতের এক পঞ্চমাংশ : রাসূল সা.-এর সময় গনিমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের পাঁচভাগের এক ভাগ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো। এর আবার পাঁচ ভাগ করা হতো। ১ম ভাগ রাসূল সা.-এর, ২য় ভাগ রাসূল সা.-এর আত্মীয়দের, ৩য় ভাগ ইয়াতিমদের, ৪র্থ ভাগ মিসকিনদের এবং ৫ম ভাগ মুসাফিরদের। আবু বকর রা. এবং উমার রা.-এর সময়ে গণিমতের সম্পদ একইভাবে ভাগ হতো। ১ম ভাগ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকতো, বাকি ভাগগুলো আহলে বাইত, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিররা পেয়ে যেত। রাসূল সা.-এর অংশ দিয়ে জিহাদের জন্য যুদ্ধ সরঞ্জাম কেনা হতো। 

৭. ফাই : যুদ্ধ ছাড়াই শত্রুপক্ষ থেকে যেসব সম্পদ অর্জিত হতো সেগুলোকে ফাই বলা হয়। ফাইয়ের পুরোটাই বাইতুলমালে জমা হতো। 

৮. খনিজ সম্পদ : খনির মালিক রাষ্ট্র। এর আয় বাইতুলমালে জমা হতো। 

৯. গুপ্তধন : গুপ্তধনের এক পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রীয় কোষগারে জমা করার নির্দেশ দেন উমার রা.। 
   
বাইতুলমালের ব্যয়ের খাত : 

১. যাকাতের অর্থ ব্যয় : উসমান রা. যাকাতের অর্থ থেকে রাষ্ট্রের অনেক খরচ মিটিয়ে ফেলতেন। ফকির, মিসকিন, ঋণগ্রস্থদের সাহায্য করতেন। মুসাফিরদের সেবা ও আপ্যায়নে খরচ করতেন। মুসলিম দাসদের মুক্তির জন্যও এই অর্থ ব্যবহার করতেন। জিহাদের ব্যয় মিটাতেও তিনি যাকাতের অর্থ ব্যবহার করতেন। 

২. গভর্নর ও সরকারি চাকুরেদের বেতন : মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা.-এর সময়ে এমন বেতনধারী সরকারি লোক ছিল না। উমার রা. তাঁর শাসনামলে সরকারি কাজে নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছেন। রাষ্ট্রও তখন অনেক বড় হয়েছিল। তাই রাষ্ট্রীয় কাজে বহু মানুষের দরকার হয়ে পড়ে। তিনি সবার জন্য মর্যাদা অনুসারে বেতনের ব্যবস্থা করেন, যাতে করে তারা সরকারি কাজে মননিবেশ করতে পারে। উমার রা. রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বেতনের ব্যবস্থা করেছেন। উসমান রা.-এর আমলে এই ধারা অব্যাহত থাকে।

৩. সেনাবাহিনীর বেতন : মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা.-এর সময়ে নিয়মিত সেনাবাহিনী ছিল না। যুদ্ধের প্রয়োজন হলে সাহাবারা সবাই যোদ্ধা হয়ে যেতেন আবার ফিরে এসে নিজ নিজ পেশায় চলে যেতেন। উমার রা.-এর সময়ে নিয়মিত রাজ্যজয় ও বিশাল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি নিয়মিত সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। যাদের কাজ ছিল শুধুমাত্র যুদ্ধ করা ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করা। তাদের অন্য পেশায় লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ ছিল। উসমান রা.-এর সময়ও রাষ্ট্রীয় খরচের একটা অংশ ছিল সেনাবাহিনীর বেতন। 

৪. নাগরিকদের ভাতা : উমার রা.-এর সময় থেকে যখন রাষ্ট্রীয় আয় অনেক বেশি হয়ে যায় তখন তিনি সকল নাগরিকদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেন। এক্ষেত্রে যারা মুহাজির ও বাদরি সাহাবী তাদের পরিমাণ সবার চেয়ে বেশি ছিল। এরপর হুদায়বিয়ার আগ পর্যন্ত যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের স্থান ছিল। তারপর যারা মক্কা বিজয়ের আগে ইসলামগ্রহণ করেছে তাদের স্থান ছিল। এরপর ছিল মক্কা বিজয়ের পরে যারা ঈমান এনেছে তাদের স্থান। এই ভাতা থেকে কেউ বঞ্চিত ছিল না। একজন নবজাতক শিশু জন্ম নেওয়ার সাথে সাথেই তার ভাতা পেয়ে যেত। উসমান রা.-এর সময়ও এই ভাতা অব্যাহত থাকে। 

৫. গনীমতের সম্পদ ব্যয় : গনীমতের সম্পদ পাঁচ ভাগের এক ভাগ বাইতুলমালে জমা হতো। আর বাকী চার ভাগ মুজাহিদদের মধ্যে বন্টিত হতো। পদাতিক সৈন্যরা পেত এক ভাগ আর অশ্বারোহীরা পেত তিন ভাগ। অশ্বারোহীরা বাড়তি ঘোড়া ক্রয় ও লালনপালনের জন্য। এই কারণে দেখা যেত সেসময়ে সরকারি চাকুরেদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ছিল সেনাবাহিনী।

৬. খলিফার ভাতা : বাইতুলমাল থেকে খলিফার ভাতা নির্ধারণের বিষয়টা আবু বকর রা.-এর সময় থেকে চালু হলেও উসমান রা. বাইতুল মাল থেকে ভাতা নিতেন না। উসমান রা. সেসময়ের শীর্ষ ধনীদের একজন ছিলেন। 

৭. মুয়াজজিনদের জন্য ভাতা : উসমান রা. মসজিদের মুয়াজজিনদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেন। উমার রা.-এর সময়ে এর প্রচলন ছিল না। মুয়াজজিনগণ মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখাশোনা করতেন।  

৮. মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণ : উমার রা.-এর সময় থেকেই মক্কা সারা পৃথিবীর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। এখানে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকে। উসমান রা. হারামের আশেপাশের জমি ক্রয় করে হারামের এরিয়া বাড়ান। ২৬ হিজরিতে তিনি মসজিদুল হারামের এরিয়া সম্প্রসারণ করেন। 

৯. মসজিদে নববী সংস্কার : মদিনা ছিল পৃথিবীর রাজধানী। মুসলিম জাহানের খলিফা এখানে থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। পৃথিবীর সেরা গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়েছিল মদিনা। এখানে বসবাসকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মসজিদে নববীতে স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। ২৯ হিজরিতে উসমান রা. মসজিদে নববী ভেঙ্গে নতুন করে ও বড় করে প্রস্তুত করেন।  

১০. জিদ্দায় নৌ-বন্দর নির্মাণ : মক্কাবাসীদের নৌ-যোগাযোগ সুবিধার জন্য জিদ্দায় সর্বপ্রথম উসমান রা. নৌ-বন্দর নির্মাণ করেন। এটাই রাষ্ট্রের প্রধান নৌবন্দরে পরিণত হয়। ২৬ হিজরিতে এই বন্দর প্রতিষ্ঠা হয়। 

১১. নৌ-বাহিনী সৃষ্টি : উসমান রা.-এর আমলে সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া রা. রোমানদের বিরুদ্ধে নৌযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য অনুমতি চেয়েছিলেন। প্রথমে উসমান রা. অনুমতি না দিলেও পরে নানান দিক বিবেচনায় নৌ-যুদ্ধের অনুমতি দেন। এজন্য মুয়াবিরা রা.-এর নেতৃত্বে প্রথম নৌ-বহর তৈরি করেন। এই নৌবাহিনী তৈরিতে বাইতুলমালের অর্থ ব্যয় হয়। 

১২. হাজ্জ ব্যবস্থাপনা : উসমান রা.-এর আমলে বিশাল সংখ্যক হাজিদের জন্য হজ্ব ব্যবস্থাপনায় বাইতুলমালের অর্থ ব্যবহার করা হতো। 

১৩. মসজিদে খাবারের ব্যবস্থা : মসজিদে ইতিকাফকারী ও ইবাদতকারীদের কষ্ট লাঘব করার জন্য বাইতুল মাল থেকে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। গরিব ও অসহায়রাও এই খাবারের সুযোগ নিতে পারতো। 


১২ নভেম্বর, ২০২২

খিলাফত পর্ব-৩৩ : উসমান রা.-এর শাসনামলে গভর্নরদের দায়িত্ব ও কর্তব্য


উসমান রা. দায়িত্ব গ্রহণের আগে যারা গভর্নর ছিলেন তাদের প্রত্যেককেই তিনি দায়িত্বে বহাল রাখেন। কিছু বছর যাওয়ার পর প্রয়োজনের আলোকে পরিবর্তন হয়। উসমান রা. প্রাদেশিক শাসনকর্তাদেরকে সীমাহীন ক্ষমতা চর্চার সুযোগ দেননি। বরং সময়ে সময়ে পত্র প্রেরণ ও ফরমান জারির মাধ্যমে তাদেরকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এক্ষেত্রে মাদীনায় অবস্থানরত সাহাবীগণের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে তিনি কাজ করতেন। আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণে কাজ করতে তিনি বারংবার তাকিদ দিতেন। 

গভর্ণরদের উদ্দেশে প্রেরিত তাঁর প্রথম পত্রটিতে তিনি বলেন, //নিশ্চয়ই আল্লাহ শাসকদেরকে তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কর আদায়কারী বলে শাসকদেরকে আল্লাহ অগ্রাধিকার দেননি। এই উম্মাহর অগ্রবর্তীদেরকে আল্লাহ দায়িত্বশীল হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, কর আদায়কারী হিসেবে সৃষ্টি করেননি। আমার আশঙ্কা তোমরা শাসকরা তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার বদলে যেন কর আদায়কারী না হয়ে পড়ো। তোমরা যদি কর আদায়কারী হয়ে পড়, তবে লজ্জাশীলতা, আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার অবসান হবে। সাবধান! তোমরা মুসলিমদের ব্যাপারে মনোযোগী হবে, তাদেরকে তাদের প্রাপ্য প্রদান করবে এবং রাষ্ট্রের প্রাপ্য তাদের কাছ থেকে আদায় করবে। অতঃপর তোমরা জিম্মীদের ব্যাপারে মনোযোগী হবে, তাদের প্রাপ্য তাদেরকে প্রদান করবে আর রাষ্ট্রের পাওনা তাদের কাছ থেকে আদায় করবে। অতঃপর আমি শক্রদের ব্যাপারে বলছি যাদের ওপর তোমরা আঘাত হেনে থাকো, তাদের ভূমি তোমরা উন্মোচন করবে বিশ্বস্ততার সাথে।//

প্রাদেশিক শাসকদের কার্যকলাপ তদারক করার জন্য উসমান রা. যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন সেগুলো হলো: 
ক. হাজ্জ সম্মিলন:
হাজ্জ আদায়ের পর গভর্ণরদের সাথে বৈঠকের রেওয়াজ দ্বিতীয় খালীফা উমার রা. চালু করেছিলেন। উসমান রা. এই প্রথা বহাল রেখেছিলেন। তিনি প্রাদেশিক শাসনকর্তাদেরকে প্রতি বছর হাজ্জ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। হাজ্জ সমাপনান্তে তিনি গভর্ণরদের সাথে বার্ষিক সম্মেলনে মিলিত হতেন। সর্বসাধারণের এই অনুমতি ছিল যে, তারা গভর্ণরের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে তা খালীফার কাছে পেশ করতে পারবে। "উসমান রা. অভিযোগগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতিকার করতেন। 

খ. নাগরিকের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ:
রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল মাদীনা। ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্ত হতে নাগরিকগণ নানা প্রয়োজনে, ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কিংবা জ্ঞান চর্চার জন্য রাজধানীতে আসতেন। খালীফা আগত নাগরিকদের কাছ থেকে প্রদেশগুলোর তথ্য সংগ্রহ করতেন। তাছাড়া সাধারণ নাগরিকদেরও খলীফার সাথে দেখা করার অবাধ সুযোগ ছিল। তারা প্রদেশের অবস্থা সম্পর্কে খলীফাকে অবহিত করতেন। কোন শাসনকর্তার ব্যাপারে অভিযোগ থাকলে তা নিঃসঙ্কোচে ব্যক্ত করতেন। অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই করে খলীফা পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন।

গ. নাগরিকদের পত্র:
বিভিন্ন প্রদেশ হতে নাগরিকরা এককভাবে বা সমষ্টিগতভাবে খালীফার কাছে পত্র লিখতেন। উসমান রা.-এর আমলে কুফা, মিসর ও সিরিয়াবাসীর কাছ থেকে মাদীনায় পত্র প্রেরণের কথা ইতিহাসে জানা যায়। উসমান রা. পত্রগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। 

ঘ, সফর:
উসমান রা. মাঝে মাঝে সরকারি সফরে বিভিন্ন প্রদেশে যেতেন এবং স্বচক্ষে জনগণের অবস্থা দেখতেন। প্রদেশের সামগ্রিক অবস্থা দেখতেন, গভর্নরদের কার্যকলাপ দেখতেন। প্রদেশের কোনো উন্নয়ন কাজের প্রয়োজন হলে তার ব্যবস্থা নিতেন। 

ঙ. বিভিন্ন প্রদেশে তথ্যানুসন্ধানে গোয়েন্দা দল প্রেরণ:
উসমান রা. মাঝে মাঝে নানা প্রদেশে তথ্যানুসন্ধান করার দল প্রেরণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তিনি ‘আম্মার ইবনু ইয়াসির রা.-কে মিসরে, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা রা.-কে কুফায়, উসামা ইবনু যায়িদ রা.-কে বাসরায় এবং আবদুল্লাহ ইবনু “উমার রা.-কে সিরিয়ায় প্রেরণ করেছিলেন। তাছাড়া আরো অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তিনি অন্যান্য প্রদেশে পাঠিয়েছেন। এই প্রতিনিধিরা প্রদেশগুলোর অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে খলীফার কাছে প্রতিবেদন পেশ করতেন। খলীফা পরিস্থিতির আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। 

চ. গভর্ণরদেরকে রাজধানীতে তলব:
প্রতি বছর হাজ্জ মৌসুমে খলীফার সভাপতিত্বে গভর্ণরদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হত। তাছাড়া সারা বছরই খলীফা ও গভর্ণরদের মাঝে পত্র বিনিময় হত। মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতি উদ্ভব হত যে খলীফা জরুরি ভিত্তিতে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদেরকে রাজধানীতে তলব করতেন। তাদের সাথে পরামর্শ করতেন। 

ছ. প্রতিনিধি প্রেরণে গভর্ণরদের নির্দেশ
খুলাফা রাশিদূন প্রাদেশিক শাসনকর্তাদেরকে নির্দেশ দিতেন তারা যেন রাজধানীতে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন। এদের কাছ থেকে খালীফাগণ বিভিন্ন প্রদেশের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে তথ্য লাভ করতেন। তাঁদের আবেদন-অভিযোগ খলিফা শুনেছেন এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।

উসমান রা. গভর্নরদের ব্যাপারে সজাগ ছিলেন ও সচেতন ছিলেন। যখনই কোন গভর্ণরের শৈথিল্য বা ত্রুটি তার নজরে আসত তিনি কালবিলম্ব না করে তাকে সাবধান করতেন। ক্ষেত্রবিশেষে কঠোর পদক্ষেপও গ্রহণ করতেন। এক্ষেত্রে ঐ গভর্ণর সম্পর্কে তার সুধারণা বা আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারত না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আল-ওয়ালীদ ইবনু উকবার কথা। কুফার এই শাসক ‘উসমান রা.-এর আত্মীয় ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষীরা এই সাক্ষ্য দিল যে তিনি মদ পান করেছেন। তখন উসমান রা. আত্মীয়তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আল-ওয়ালীদের ওপর মদ্যপানের হদ কায়েম করলেন। পরবর্তীতে তাকে কুফার গভর্ণরের পদ হতে অপসারণ করেন।

গভর্নরদের দায়িত্ব ও কর্তব্য:
সকল গভর্নরের কতৃত্ব সমান ছিল না। আগে গভর্নরদের পূর্ণ কর্তৃত্ব দেওয়া হতো। উমার রা. আমল থেকে প্রয়োজন অনুসারে দ্বৈত শাসনের পদ্ধতি চালু হয়। পূর্ণ কর্তৃত্বের অধিকারী গভর্নরকে মৌলিকভাবে চারটি দায়িত্ব পালন করতে হত, 
১) প্রাদেশিক রাজধানীর কেন্দ্রীয় মসজিদে সালাতে ইমামতি; 
২) প্রাদেশিক সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে সীমান্ত সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ; 
৩) প্রদেশের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কোষাগারের আয়-ব্যয় তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ; 
৪) কাজী বা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন।
আংশিক কর্তৃত্বের অধিকারী গভর্নরগণ ঠিক ততটুকু ক্ষমতাপ্রাপ্ত হতেন যতটুকু ক্ষমতাসহ তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হত। 

আল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতে শাসকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বলা হয়েছে :
আমি তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে, এবং সৎকার্যের নির্দেশ দেবে ও অসৎকার্য হতে নিষেধ করবে। আর সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে। [আল কুরআন ২২:৪১] কুরআনে মুসলিম শাসকদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশনা সম্বলিত আরো আয়াত রয়েছে। এসব আয়াত ও আস-সুন্নাহর নির্দেশনার আলোকে গভর্ণরগণ নিম্নলিখিত দায়িত্ব পালন করতেন। 

ইকামাতে দ্বীন বা দ্বীন প্রতিষ্ঠা ছিল মুসলিম শাসকদের সর্বপ্রধান কর্তব্য। আল্লাহ আ'আলা বলেন, তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে, আর যা আমি ওহী করেছি তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে, এই বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে মতভেদ করো না। [আল কুরআন ৪২:১৩।]

আল কুরআনের নির্দেশানুসারে দ্বীন কায়েম করতে গিয়ে গভর্ণরগণ নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতেন। 

১. দ্বীনের প্রচার ও প্রসার:
দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভিক কাজ হলো দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে দাওয়াতী কার্যক্রম জোরদার করা। এটি ছিল অন্যতম বুনিয়াদি কাজ, যা খলীফা ও তার গভর্নরগণ ব্যবস্থা করতেন। দ্বীনী দাওয়াত সম্প্রসারণের একটি প্রভাবক উপায় ছিল রাজ্যবিজয়। কোন অঞ্চলে প্রথমেই হামলা করা হত না বরং ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদেরকে দ্বীন কবুলের জন্য উদাত্ত আহবান জানানো হত। সেই আহবানে সাড়া দিলে সবার মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সৃষ্টি হত। দ্বীনের দাওয়াত কবুল না করলেও জিজিয়া দিতে রাজি হলে সামরিক অভিযান চালানো হত না। দ্বীনের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলে আল্লাহর বান্দাদেরকে মানুষের দাসত্বের নিগড় থেকে মুক্ত করার জন্য অভিযান পরিচালিত হত। বিজিত অঞ্চলে নবদীক্ষিত মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার জন্য মু'আল্লিম (প্রশিক্ষক) ও মুবাল্লিগ (প্রচারক) নিয়োজিত থাকতেন। এরা জনগণকে ইসলামের বিশুদ্ধ আকীদা, ইবাদাত ও মু'আমালাত পদ্ধতি শিক্ষা দিতেন। 

২. সালাত কায়েম করা:
নবদীক্ষিত মুসলিমকে সর্বাগ্রে সালাত আদায় পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া হতো। সালাত আদায়ের জন্য প্রতি শহরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাসজিদ নির্মিত হয়েছিল। মদিনার মসজিদে নববীতে খালীফা নিজে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ইমামতি করতেন। তিনি জুমু'আ ও ঈদের সালাতে খুতবা দিতেন ও ইমামতি করতেন। প্রাদেশিক শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদে গভর্ণরের ইমামতিতে সালাত আদায় করা হত। এভাবে সালাত আদায়ের মাধ্যমে একটি পবিত্র সমাজ গড়ে ওঠেছিল। সালাত ত্যাগকারীদেরকে সদুপদেশ দিয়ে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করা হতো। এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো। 

৩. দ্বীনের মূলনীতি সংরক্ষণ:
যেসব মূলনীতির ওপর এই দ্বীনের সৌধ প্রতিষ্ঠিত খুলাফা রাশিদূন ও তাদের গভর্ণরগণ সর্বদা সেগুলো সংরক্ষণ ও সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থাকতেন। সহীহ আকীদা বিশ্বাসের প্রচার ও শির্ক-বিদ'আত প্রতিরোধে তারা সদা তৎপর থাকতেন। 

৪. মাসজিদ নির্মাণ:
হিজরাতের পথে কুবায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ সা. ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। ইয়াসরিবে পৌঁছেও তিনি সর্বপ্রথম যে কাজ করেন তা হল মাসজিদ নির্মাণ। রাসূলুল্লাহ সা.-এর অনুসরণে খলীফা ও গভর্ণরগণ অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। বিজিত অঞ্চলে শাসকগণ মসজিদ নির্মাণ করতেন। শহরগুলোর সকল মসজিদ হয়তো গভর্ণর নির্মাণ করতেন না। কিন্তু প্রধান মসজিদ গভর্ণর নির্মাণ করতেন। রাষ্ট্রীয় খরচ ব্যতীত কেবল জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম এবং দানেও অনেক মাসজিদ নির্মিত হয়েছে। 

৫. যাকাত আদায়:
যাকাত আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক ইবাদাত। রাসূলুল্লাহ সা. রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় করতেন। খুলাফা রাশিদূনের আমলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় করা হত। প্রদেশগুলোতে গভর্ণরগণ রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা করতেন এবং আল কুরআনের নির্দেশ অনুসারে তা বিলি-বণ্টন করতেন।

৬. হাজ্জ কার্যক্রম সহজীকরণ:
খুলাফা রাশিদূনের আমলে হাজ্জ যাত্রীদের সহায়তা করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অন্ত ভুক্ত ছিল। গভর্ণরগণ হাজীদের চলাচলের রাস্তার নিরাপত্তা বিধান করতেন। হাজ্জযাত্রীরা দল বেঁধে মাক্কায় গমন করতেন। প্রাদেশিক শাসকগণ হাজ্জ কাফিলার আমীর নিয়োগ করতেন। হাজ্জে রওয়ানার পূর্বে গভর্ণরের অনুমতি নেওয়ার প্রথা ছিল। হাজ্জের সফর সহজ ও আরামপ্রদ করার জন্য গভর্ণররা আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। উসমান রা.-এর আমলে বসরার গভর্ণর ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমির। তিনি বসরা থেকে মক্কা যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে হাজ্জযাত্রীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছিলেন। ফাকীহগণ পরবর্তীতে মত প্রকাশ করেছেন যে, হাজ্জ ব্যবস্থাপনা সহজীকরণ শাসকদের অন্যতম দায়িত্ব। 

৭. শারঈ হদ প্রয়োগ করা: 
মানব সমাজের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য আল কুরআনে কিছু গুরুতর অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। এই শাস্তি প্রয়োগের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। খুলাফা রাশিদূন আল কুরআনে নির্দেশিত হদ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতেন। প্রাদেশিক গভর্ণররা নিজ নিজ প্রদেশে অনুরূপ দায়িত্ব পালন করতেন। এক্ষেত্রে শারঈ বিধান সমুন্নত রাখার চেতনা ব্যতীত অন্য কোন বিবেচনা প্রাধান্য পেত না। 

৮. জনগণের জান-মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা বিধান:
জনগণের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রুর হিফাযাত করতেন গভর্ণরগণ। এই লক্ষ্যে দ্বিমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হত: আল কুরআন ও আস-সুন্নাহ’র নির্দেশনার আলোকে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হত এবং খ) প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতো। স্বর্ণযুগের মুসলিমগণ পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কে এত বেশি সচেতন ছিলেন তারা অপরের অধিকারে হস্তক্ষেপ করতেন না। অপর ভাইয়ের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রু হিফাযাতকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন। মানুষের অধিকার হরণকারী বা নিরাপত্তা বিঘ্নকারী কোন অপরাধ সংঘটিত হলে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হত, যা মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। দৈহিক ও আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ইজ্জত-আব্রুর নিরাপত্তা বিধান করা হত। 

৯. আল-জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ:
গভর্ণরগণ প্রদেশের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, পাশাপাশি তারা মাসজিদে সালাতের ইমামতি করতেন। শুধু তাই নয়, প্রদেশের প্রধান সেনাপতি হিসেবেও তারাই দায়িত্ব পালন করতেন। জিহাদের ময়দানে তাদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী। পরিচালিত হত। বিজয়াভিযানগুলো প্রাদেশিক গভর্ণরদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। জিহাদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গভর্ণরগণ নিম্নলিখিত দায়িত্বসমূহ পালন করতেন। 

ক. স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রেরণ:
ইসলামী রাষ্ট্রের কিছু কিছু প্রদেশ অমুসলিম রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন ছিল না; যেমন- মাক্কা, ইয়ামান, বাহরাইন, ওমান ইত্যাদি। এসব অঞ্চল হতে সরাসরি অভিযান পরিচালনার সুযোগ ছিল না। গভর্ণরগণ তাঁদের প্রদেশের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে প্রেরণ করতেন। যাতে স্বেচ্ছাসেবকরা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারে। জিহাদে অংশগ্রহনেচ্ছু মুজাহিদদের বস্তুগত সহায়তা দেওয়া হত প্রদেশের পক্ষ থেকে। 

খ. শক্রদের হামলা হতে সীমান্তের সুরক্ষা:
সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলো প্রায়শ শত্রুর আক্রমণের শিকার হত, গভর্ণরগণ সীমান্ত বর্ধিতকরণের পাশাপাশি সীমান্ত সুরক্ষার পদক্ষেপও গ্রহণ করতেন। সিরিয়ার শাসক মু'আবিয়া রোমানদের হামলা হতে সীমান্ত রক্ষার জন্য ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। বসরার শাসকও সীমান্ত সুরক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

গ. বসতিস্থাপনের জন্য জায়গীর প্রদান:
জনশূন্য এলাকাগুলো আবাদের জন্য আগ্রহীদেরকে জায়গীর প্রদানের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন উসমান রা.। গভর্ণরগণ তাঁর নির্দেশে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। 

ঘ. শত্রুদের খবরাখবর অনুসন্ধান:
গোয়েন্দা বিভাগ নামে স্বতন্ত্র কোন বিভাগ ছিল না সেকালে। তবে গভর্ণরের অধীনে কিছু গোয়েন্দা কাজ করতেন। এদের অনেকে শক্রদের গতিবিধি ও যুদ্ধপ্রস্তুতির ওপর নজরদারি করতেন। নাগরিকদের খোঁজ-খবর রাখতেন। 

ঙ. ঘোড়া ও অশ্বারোহী বাহিনী পরিচালনা:
রাসূলুল্লাহ সা.-এর সময়েই অশ্বপালন ও অশ্বারোহন চর্চার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। উমার রা. সকল প্রদেশে অশ্বশালা প্রতিষ্ঠা করেন। উসমান রা.-ও পূর্ববর্তী খলীফার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। প্রতি প্রদেশেই অশ্বশালা ছিল। এসব খামারে পালিত ঘোড়া যুদ্ধের ময়দানে বিরাট ভূমিকা পালন করতো। এসব ঘোড়ার আস্তাবলে সৈনিকরা প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পেত।  

চ. তরুণদের প্রশিক্ষণ প্রদান;
এটি ছিল জিহাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যেন জিহাদের চেতনা জাগরুক থাকে সেই লক্ষ্যে তরুণদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এই কর্মসূচির দু'টো অংশ ছিল: মানসিক প্রস্তুতি ও দৈহিক প্রস্তুতি। জিহাদের গুরুত্ব ও মুজাহিদের মর্যাদার বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদেরকে জিহাদের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হত। পাশাপাশি শরীর চর্চা, ব্যায়াম, তীর চালনা প্রশিক্ষণ, ঘোড়সওয়ার প্রশিক্ষণ ইত্যাদির মাধ্যমে তাদেরকে দৈহিকভাবে জিহাদের জন্য প্রস্তুত করা হতো। 

ছ. সেনাবাহিনীর জন্য পৃথক দফতর স্থাপন:
ইসলামের প্রাথমিক যুগে সেনাবাহিনী পরিচালনার জন্য পৃথক দফতর ছিল না। তাৎক্ষণিকভাবে আগ্রহী যোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত করে সেনাবাহিনী গঠন করা হত। দ্বিতীয় খালীফা উমার রা. সর্বপ্রথম প্রতিরক্ষা বিভাগ স্থাপন করেন, কেন্দ্রে খালীফা ও প্রদেশে গভর্ণররা এর তত্ত্বাবধান করতেন। উসমান রা.-এর আমলেও এই ব্যবস্থা চালু ছিল। এই দফতরের কার্যপরিধির আওতায় ছিল সৈনিক সংগ্রহ, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। 

১০. চুক্তি বাস্তবায়ন:
মুসলিম শাসকরা বিভিন্ন শাসকদের সাথে চুক্তি করতেন। শুধু তাই নয়, ইসলামী বিজয়াভিযানের পদ্ধতিই ছিল এই যে, মুসলিম বাহিনী প্রথমে সামরিক অভিযান না চালিয়ে শত্রু পক্ষকে সন্ধি করার আহবান জানাতে। বিপক্ষ দল এই আহবানে সাড়া দিলে কোন অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন হত না। খলীফার পক্ষ থেকে প্রাদেশিক গভর্ণরগণ চুক্তি স্বাক্ষর করতেন। তারাই চুক্তি বাস্তবায়ন ও পালনের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ছিলেন। 

১১. জনগণের জীবিকার বন্দোবস্ত করা:
একটি সমন্বিত ও মধ্যপন্থি আর্থিক ব্যর্থস্থাপনা প্রচলিত ছিল সে সময়। সম্পদের ওপর ব্যক্তির মালিকানা স্বীকৃত ছিল। জনগণ নিজস্ব মালিকানায় কৃষিকাজ, শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতেন। তবে বাইতুল মাল হতেও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে ভাতা দেওয়া হত। উমার রা.-এর আমলে এই ব্যবস্থাপনা চালু হয়। পরবর্তীতে উন্নয়ন ও সংস্কার সাধনের মাধ্যমে এটি চালু রাখা। হয়। কেন্দ্রে খালীফা ও প্রদেশে গভর্ণর জনগণের মাঝে রেশন বিতরণের কার্যক্রম তদারক করতেন। গভর্ণরগণ বাজার অনুসন্ধান করতেন এবং দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। শুধু তাই নয় বিজিত অঞ্চলে বাড়িঘর বন্টনও প্রাদেশিক শাসনকর্তারা তত্ত্বাবধান করতেন। 

১২. প্রশাসক ও কর্মচারী নিয়োগ:
‘উসমান রা.-এর আমলে রাজ্য বিজয়ের কারণে প্রদেশগুলোর সীমানা বেড়ে গিয়েছিলো। বিশেষত মিসর, সিরিয়া ও বসরা প্রদেশের আওতায় অনেক বিশাল এলাকা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। প্রাদেশিক রাজধানী শহরের বাইরেও অনেক শহর ও অঞ্চল রাজ্যগুলোর অধীনে শাসিত হত। খালীফা প্রাদেশিক গভর্ণর ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী নিয়োগ দিতেন। প্রদেশের অন্তর্গত বিভিন্ন শহর ও এলাকার প্রশাসক নিয়োগ দিতেন গভর্ণরগণ। তাছাড়া ছোটখাট বিভিন্ন পদে কর্মচারী নিয়োগের দায়িত্বও ছিলো প্রাদেশিক শাসনকর্তার। 

১৩. জিম্মীদের হিফাযাত: 
ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত জিম্মীদের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্রুর হিফাজত করা মুসলিম শাসকদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল। 

১৪. পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ:
উম্মাহর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছিল রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ । খুলাফা রাশিদূনও শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কিরামের পরামর্শে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। খালীফার অনুসরণে প্রাদেশিক গভর্ণরগণ স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে জরুরী বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।

১৫. অবকাঠামোগত উন্নয়ন:
রাস্তাঘাট, পুল নির্মাণ ও সংস্কারসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে গভর্ণরগণ দৃষ্টি দিতেন। সেচের জন্য খাল খনন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, কৃষি উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, যাতায়াতের ব্যবস্থা উন্নতকরণ, মুসাফিরদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত, বাজার তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে গভর্নররা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।