২৫ জানু, ২০২২

খিলাফত পর্ব-১৬ : উমার রা. যেভাবে গভর্নরদের বিচার করতেন



ইসলামের মূলনীতি রক্ষায় উমার রা. প্রচেষ্টা ছিল অন্যরকম অনুপ্রেরণাদায়ক। তাঁর নিয়োগকৃত বিভিন্ন গভর্নর, সেনানায়ক ও প্রতিনিধিগণ জনগণের সাথে কীরূপ আচরণ করছে তা তিনি জনগণ থেকে শুনতে চাইতেন। তারা কি বাদশাহ হয়ে গেছে নাকি জনগণের খাদেম হয়ে আছে তা তিনি নিজে পরখ করতেন। তিনি এই কাজকে আমানত মনে করতেন। 

তাঁর নিয়োগকৃত গভর্নররা যদি কারো প্রতি জুলুম করে তিনি এটাকে নিজের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন ও এর বিরুদ্ধে শক্ত, যথাযথ পদক্ষেপ নিতেন। তাকে প্রায়ই তাঁর সংবাদবাহকদের বিভিন্ন গভর্নরের কাছে রাষ্ট্রীয় কাজে পাঠাতে হতো। তিনি এই সংবাদবাহকদের কাজে লাগাতে চাইলেন জনগণের খবর জানতে। তিনি তাঁর সংবাদবাহকদের এই কাজে নিযুক্ত করেন। 

তাঁর সংবাদবাহকরা যখন কোনো প্রদেশে যেতেন তখন মসজিদে দাঁড়িয়ে জানাতেন, আমি আমিরুল মুমিনিনের কাছ থেকে এসেছি। কয়েকদিন পর ফিরে যাবো। তোমরা যারা তাঁর কাছে কোনো খবর পাঠাতে চাও অথবা যেসব কথা তোমরা এই গভর্নরকে বলতে পারছো না সেসব কথা লিখে দাও। আমি তোমাদের চিঠি উমারের কাছে পোঁছে দেব। 

জনগণের কথা শোনার জন্য উমার রা. এই দারুণ পলিসি গ্রহণ করেন। এই মাধ্যমে অনেক অভিযোগ জমা পড়ে। উমার রা. তদন্ত সাপেক্ষে সেইসব অভিযোগের জন্য গভর্নরদের ডেকে শাস্তি দিয়েছেন। 

কয়েক বছরের মধ্যে এই চিঠি চালাচালি শুধু শাসক-জনগণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি। জনগণ যে কোনো প্রদেশের জনগণের কাছে চিঠি লিখতে শুরু করলো। উমার রা.-এর সংবাদ বাহকেরা চিঠিগুলো মদিনায় নিয়ে আসতেন। সেখান থেকে আবার চিঠি তার গন্তব্য প্রদেশে চলে যেত। এভাবে ডাক ব্যবস্থাপনা চালু হয়ে গেল বিনামূল্যে। উমার রা. যখন দেখলেন এই ডাক ব্যবস্থাপনা থেকে জনগণ উপকৃত হচ্ছে তখন তিনি এই ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন। জনগণ এবার শুধু চিঠি পাঠানোতে সীমাবদ্ধ থাকে নি। তারা পণ্যও পাঠাতে শুরু করলো। আরবে চালু হয়ে গেল বিশ্বস্ত ডাক ব্যবস্থাপনা।

যাই হোক এই মাধ্যমে কিছু অভিযোগ জমা পড়ে প্রভাবশালী গভর্নরদের বিরুদ্ধে। তার কিছু নমুনা আমরা উল্লেখ করবো। 
মুগিরা বিন শুবা রা. :
মুগিরা বিন শুবা রা. ছিলেন বসরার গভর্নর। একদিন উমার রা.-এর নিকট চিঠি আসলো আবু বাকরা রা. থেকে। তিনি জানিয়েছেন তিনি উম্মু জামিল নামে এক মহিলার সাথে তিনি মুগিরা রা.-কে ব্যভিচার করতে দেখেছেন। অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ পেয়েই উমার রা. চিঠি পাঠালেন মুগিরা রা.-এর নিকট। যেহেতু অভিযোগ মারাত্মক তাই তিনি মুগিরা রা.-কে  দায়িত্বে রাখা আর সমীচীন মনে করেন নি। চিঠিতে মুগিরা রা.-কে আবু মুসা আশায়ারি রা.-কে দায়িত্ব বুঝিয়ে দ্রুত মদিনায় আসতে বলেন উমার রা.। আবু বাকরা রা.-কেও আলাদা চিঠিতে সাক্ষীসহ উপস্থিত হতে বলেন। 

আবু বাকরা রা.-এর বাড়ি ও মুগিরা রা.-এর বাড়ি খুবই কাছাকাছি। একজনের জানালা দিয়ে আরেকজনের জানালা দেখা যেত। আর উম্মু জামিল হলো একজন বিধবা মহিলা। সে বনু হেলাল গোত্রের মেয়ে। তার স্বামী ছিল ছাকিফ গোত্রের। তিনি মৃত্যুবরণ করেন। উম্মু জামিল বসরার বিভিন্ন প্রভাবশালী মানুষের দরবারে কারণে অকারণে যেতেন। এবং বসরার গভর্নর মুগিরা রা.-এর দরবারেও তাকে প্রায়ই দেখা যেত। কখনো সাহায্যপ্রার্থী হয়ে কখনো এমনিতেই আসতেন। 

একদিন আবু বাকরা রা. মুগিরা রা.-কে আপত্তিকর অবস্থায় দেখলেন। তাঁর মনে হলো এটি উম্মু জামিল। তিনি আরো তিনজনকে ডেকে সাক্ষী করলেন এবং বললেন, তোমাদের শাসককে দেখো! সে উম্মু জামিলের সাথে ব্যভিচার করছে। 

মদিনার উমার রা.-এর আদালতে আবু বাকরা রা. তাঁর সাক্ষ্য উপস্থাপন করলেন। উমার রা. জিজ্ঞাসা করলেন, উম্মু জামিলের মুখ তিনি দেখেছেন কিনা? উত্তরে আবু বাকরা রা. বলেন, তিনি পেছনদিক থেকে দেখে উম্মু জামিলের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন। মুখ দেখেননি। অন্য তিনজন সাক্ষীর মধ্যে নাফি ও শিবল আবু বাকরার মতো করে সাক্ষ্য দিয়েছেন। অন্য সাক্ষী যিয়াদ ইবনে উমাইয়া বললেন, তিনি মহিলাটিকে চিনেননি। 

উমার রা. সবাইকে আলাদাভাবে জেরা করেছেন। মুগিরা রা. নিজের ব্যাপারে বলেছেন তিনি তার স্ত্রীর সাথে ছিলেন। অবশেষে প্রমাণিত হলো মহিলাটি মুগিরা রা.-এর স্ত্রী ছিল এবং উম্মু জামিল ছিল না। সাক্ষীদের বেত্রাঘাত করা হলো নিশ্চিত না হয়ে অভিযোগ দায়েরের জন্য। আর মুগিরা বিন শুবা রা.ও বরখাস্ত হলেন গোপনীয়তা রক্ষা করতে না পারায় ও উম্মু জামিলকে দরবারে প্রশ্রয় দেওয়ায়। পরে অবশ্য কুফার গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হয় মুগিরা রা.-কে। 

সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. :
কুফার জনগণের একটা অংশ ইসলামের ন্যায়নীতির সুযোগ নিয়ে বার বার বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করেছিল। এদের প্রথম শিকার হলেন সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা.। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে তিনি নামাজ ঠিকভাবে আদায় করেন না ও শিকারে ব্যস্ত থাকেন। ফলে রাষ্ট্রীয় কাজ ব্যাহত হয়। উমার রা. এই অভিযোগের তদন্ত করেন এবং সা'দ রা. নির্দোষ প্রমাণিত হয়। কিন্তু উমার রা.-এর কাছে এই অভিযোগে অনেক চিঠি এসেছিল বিধায় উমার রা. আর সেখানে তাঁকে দায়িত্বে রাখার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। সা'দ রা.-কে খলিফার পরামর্শক পদ দিয়ে মদিনায় নিয়ে এলেন। সা'দ রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন কুফায় কাকে গভর্নর করবেন? সা'দ রা. আব্দুল্লাহ ইবনে উতবানকে মনোনীত করেন। তাকে নিয়েও অসন্তুষ্ট ছিল কুফার আরেক অংশ। এরপর সেখানে মনোনয়ন দেওয়া হলো আম্মার ইবনে ইয়াসিরের মতো তাকওয়াবান সাহাবীকে। 

তার বিরুদ্ধে চিঠি পাঠাতে লাগলো কুফাবাসী। আম্মার রা.কেও প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলেন উমার রা. অবশেষে তিনি কুফা নিয়ে মজলিসে শুরা আহবান করলেন। উমার রা. জিজ্ঞাসা করলেন, একজন কোমলচিত্ত ধার্মিক ব্যক্তি ও একজন দৃঢ়চিত্তের কিছুটা কম ধার্মিক ব্যক্তি সম্পর্কে আপনাদের মন্তব্য কী? 

মুগিরা বিন শুবা রা. উত্তরে বলেন, হে আমিরুল মু'মিনিন, কোমলচিত্ত ও বিনয়ী ব্যক্তির কাজ কেবল তার নিজের কল্যাণ বয়ে আনে। কিন্তু তার দুর্বলতা আপনার ও মুসলিম জাতির ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার দৃঢ় চরিত্রের ব্যক্তির কম ধার্মিকতার কারণে কেবল সে নিজে কম লাভবান হয়, কিন্তু তার দৃঢ়তা আপনার ও মুসলিম জাতির কল্যাণ বয়ে আনে। 

উমার রা. বললেন, আপনি সঠিক কথা বলেছেন। অবশেষে সবার পরামর্শে মুগিরা বিন শু'বা রা.-কেই কুফার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। দায়িত্ব নিয়ে যাওয়ার সময় উমার রা. মুগিরা রা.-কে বলেন, এমন একজন ব্যক্তি হওয়ার চেষ্টা করবেন যাতে সৎকর্মশীলরা বিশ্বাস করে, অসৎ লোকেরা ভয় পায়।    

আমর ইবনুল আস রা. :  
আমর ইবনুল আস রা. উমার রা.-এর প্রিয়পাত্র ছিলেন। কিন্তু নানান কারণে আমর রা. শাস্তির মুখোমুখি হন। উমার রা. তাঁকে শাস্তি দিতে একটুও সংকোচ করেন নি। অন্যদিকে আমর ইবনুল আস রা.ও বিনা প্রতিবাদে উমার রা.-এর শাসন মেনে নেন। আমর রা. ছিলেন মিসরের গভর্নর। একবার আমর রা. তাঁর জন্য সুদৃশ্য উঁচু মিম্বর তৈরি করেন, যেখান থেকে তিনি ভাষণ দিতেন। উমার রা. চিঠি লিখে জানান ''আপনার জন্য কি এটাই যথেষ্ট নয় যে, আপনি নিজ পায়ে ভর করে মুসলিমদের সাথে দাঁড়াবেন। আমি খবর পেয়েছি মুসলিমদের মাথার উপরে দাঁড়ানোর জন্য আপনি একটি মিম্বর তৈরি করেছেন। আমি এটা ভেঙ্গে ফেলার জন্য জোর তাকিদ করছি। 

একবার আমর রা.-এর ছেলে অন্যায়ভাবে এক মিসরিয়কে চাবুক মেরেছিল। মিসরিয় লোকটি আমর রা.-এর কাছে বিচার পাবে না ভেবে উমার রা.-কে চিঠি লিখলেন। উমার রা. চিঠিতে আমর রা.-কে তার ছেলেসহ উপস্থিত হতে বললেন। এরপর বিচার শেষে লোকটির হাতে চাবুক দিয়ে উমার রা. বললেন, তুমি আমরের ছেলের কাছ থেকে প্রতিশোধ নাও। লোকটি আমর রা.-এর ছেলেকে প্রহার করার পর উমার রা. বললেন, তুমি চাইলে আমরকেও চাবুক মারো। লোকটি বললো, না, তিনি কোনো অন্যায় করেন নি। আমর রা. আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, আমি এই ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। তাহলে এই বিচার আপনাকে করতে হতো না। 

আরেকবার আমর রা. তাঁর নিজ বাহিনীর এক সৈন্যের প্রতি রাগান্বিত হয়ে মুনাফিক বলেছেন। এতে ভীষণ কষ্ট পায় সৈন্যটি। তিনি উমার রা.-কে চিঠি লিখলেন। উত্তরে উমার রা. আমর রা.-কে লিখলেন, এই ব্যক্তির অভিযোগ যদি সত্য হয় তবে সে আপনাকে প্রকাশ্যে চাবুক মারবে। মিশরের লোকজন সৈন্যটিকে অর্থ দিয়ে আমর রা.-কে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে চাইলেন। কিন্তু সৈনিকটি রাজি হয় নি। তিনি চাবুক হাতে নিয়ে আমর রা. এর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, আমাকে বাধা দেয়ার জন্য এখানে কেউ আছে কি? আমর রা. বললেন, না! তোমাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা পালন করো। সে বললো, আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম। 

আবু মুসা আশআরি রা. : 
আবু মুসা আশাআরি রা. ছিলেন বসরার শাসক। তিনি জনপ্রিয় শাসক ছিলেন। যদিও তিনি কঠোর শাসক তারপরও বসরার জনগণ তাকে পছন্দ করেছিল। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দু'জন লোক অভিযোগ করেছিল। একজন ওনার অধিনস্ত সৈন্য। অন্যজন একজন মদ্যপায়ী। 

অধিনস্ত সৈন্যের অভিযোগ ছিল, তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ বাবদ গণিমাত লাভ করেছেন। কিন্তু হিসাব না হওয়ায় আবু মুসা রা. তখনো তাকে বুঝিয়ে দেননি। এই নিয়ে সে কর্কশ ভাষায় ও উচ্চ স্বরে কথা বলেছিল। রাগান্বিত হয়ে আবু মুসা রা. তাকে বেত্রাঘাত করেন ও তার চুল কেটে দেন। সৈন্যটি কাটা চুল নিয়ে উমার রা.-এর কাছে এলেন এবং অভিযোগ দায়ের করলেন। সব শুনে উমার রা. আবু মুসার কাছে চিঠি লিখে জানালেন, লোকটিকে যদি আপনি প্রকাশ্যে এই আঘাত করেন তবে তাকে প্রকাশ্যে প্রতিশোধ নিতে দেবেন। আর যদি গোপনে হয়ে থাকে তবে সে গোপনে প্রতিশোধ নিবে। আপনি এই রায় বাস্তবায়ন করবেন। 

লোকটি প্রতিশোধ নিতে গেলে সকল সাহাবা ও সৈন্যরা লোকটিকে বললো, তুমি আবু মুসাকে ক্ষমা করে দাও। সে কোনো কিছুর বিনিময়ে প্রতিশোধ নেওয়া ত্থেকে বিরত থাকতে চাইলো না। অবশেষে আবু মুসা রা. নত মস্তকে তার হাতে চাবুক তুলে দিয়ে বললেন, তুমি প্রতিশোধ নাও। লোকটি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি বিচার পেয়ে গেছি। আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম। 

এক মদ্যপায়ীকে আবু মুসা রা. কঠোর শাস্তি দিলেন। এরপর তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করলেন। লোকজনকে তার সাথে কথা বলতে বারণ করে দিলেন। সে মদিনায় চলে এলো। উমার রা. এর সামনে কাঁদতে লাগলো। তিনি অভিযোগ করে বললেন, আবু মদপান করেছি, এজন্য আবু মুসা আমাকে চাবুক মেরেছে। আমার মাথা মুড়ে দিয়েছে। আমাকে এভাবে বাজারে হাঁটিয়েছে। শুধু তাই নয় আমার সাথে সবার মেলামেশা বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে আমার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আমার একবার মনে হয়, তলোয়ার দিয়ে নিজের মাথা কেটে ফেলি, আবার মনে হয় মুশরিকদের দেশে চলে যাই। 

উমার রা. এই লোকের দুঃখে দুঃখী হলেন। তিনি চিঠি লিখে আবু মুসা রা.-কে জানালেন, আপনি অতিরিক্ত শাস্তি কখনো দেবেন না। আল্লাহর শপথ! আপনি যদি আর কখনো এমন করেন তবে আপনার চেহারায় আমি কালি মেখে দেব। চিঠি পাওয়ার পর সবাইকে তার সাথে মিশতে বলবেন। তাকে পোষাক, একটি ঘোড়া ও দুইশ দিরহাম উপহার দিবেন। তার জীবন স্বাভাবিক করে দেবেন। 

অপরাধীর ওপর শাস্তি প্রয়োগে কোনো গভর্নর যাতে মাত্রা ছাড়িয়ে না যান তা নিশ্চিত করতে আমিরুল মুমিনিন উমার রা.-এর আন্তরিকতা পরিলক্ষিত হয়েছে এই ঘটনায়। 

সাঈদ ইবনে আমির রা. : 
সিরিয়ার এমেসায় (হোমস, সিরিয়া) উমার রা. নিয়োগ করেন সাঈদ ইবনে আমির রা.-কে। উহুদ যুদ্ধের পর মক্কার মুশরিকদের কাছে বন্দী হলেন খুবাইব রা.। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে খুবাইব রা.-কে হত্যা করা হয়। সাঈদ ইবনে আমির রা. তখনো মুসলিম হন নি। অনেকের মতো তিনি এই হত্যাকাণ্ড পরিলক্ষিত করেন। সেদিন খুবাইব রা.-এর নামাজ, তাঁর কথা, মুহাম্মদ সা.-এর প্রতি তাঁর সম্মান ও ভালোবাসা, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ইসলামের প্রতি আনুগত্য ইত্যাদি দেখে তাঁর মানসিক পরিবর্তন আসে। শাহদাতের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে খুবাইব রা. উপস্থিত লোকদের অভিশাপ দিতে থাকেন। অভিশাপ থেকে বাঁচানোর জন্য আবু সুফিয়ান হাতের কাছে থাকা তাঁর ছেলে মুয়াবিয়াকে শুইয়ে দেন। জাহেলি রীতি অনুসারে শুয়ে পড়লে অভিশাপ কার্যকর হয় না। সাঈদ ইবনে আমির সেসময় খুনের দৃশ্য দেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। 

এই ঘটনা তাঁর জীবনে প্রভাব তৈরি করে। তিনি মক্কা থেকে পালিয়ে যান ও মদিনায় এসে ইসলামগ্রহণ করেন। তিনি খুব তাকওয়াবান মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সম্পদ ও উন্নত জীবনের প্রতি তাঁর কোনো ঝোঁক ছিল না। তিনি গভর্নর হিসেবে পাওয়া ভাতা দান করে দিতেন। উমার রা. তাঁকে হোমসের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। 

একবার উমার রা. হোমসে গেলেন এবং খুব বড় আশা নিয়ে হোমসের জনগণের সামনে দাঁড়ালেন। হোমসবাসীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে এমেসাবাসী! আপনাদের প্রশাসক কেমন মানুষ? উমার রা. ভাবলেন তারা ভালো উত্তর করবে। তাই এমন প্রশ্ন করলেন জনসম্মুখে। কিন্তু উমার রা.-কে অবাক করে দিয়ে হোমসবাসী বললো, তার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ আছে। 

উমার রা. লজ্জা পেয়ে গেলেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন, ইয়া আল্লাহ! সাঈদের প্রতি আমার সুধারণা তুমি পরিবর্তন করে দিও না। মাথা নিচু করে উমারের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাঈদ। উমার রা. বললেন, তোমাদের অভিযোগ বলো। 

জনগণ থেকে চারটি অভিযোগ পাওয়া গেল। ১ম অভিযোগ, তিনি দরবারে আসতে দেরি করেন। ২য় অভিযোগ রাতের বেলা তিনি কারো ডাকে সাড়া দেন না। ৩য় অভিযোগ মাসে একদিন তিনি কারো সাথে সাক্ষাত দেন না। ৪র্থ অভিযোগ তিনি মাঝে মাঝে দরবার চলাকালে অজ্ঞান হয়ে যান।

সাঈদ রা. অভিযোগগুলো মেনে নিলেন এবং উত্তর করতে চান নাই। উমারের নির্দেশে তিনি উত্তর করতে বাধ্য হলেন। ১ম অভিযোগের জন্য বললেন, আমার কোন ভৃত্য নেই। আমি আমার পরিবারের জন্য সারাদিনের খাবার তৈরি করি, তারপর অযু করে লোকজনের সামনে আসি। এতে আমার কিছুটা দেরি হয়ে যায়। ২য় অভিযোগের উত্তর হলো, আমি দিনের বেলা দায়িত্বের জন্য বরাদ্দ রেখেছি। রাতের বেলা আল্লাহর দরবারের জন্য নির্দিষ্ট করেছি। ৩য় অভিযোগের কারণ হলো, আমার একটা মাত্র কোর্তা। এটা আমি মাসে একবার ধুয়ে দিই। সেটি শুকানোর জন্য আমাকে একদিন দরবারে কামাই করতে হয়। ৪র্থ অভিযোগের কারণ হলো, যখন খুবাইব আনসারি রা.-কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, তখন আমাদের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। আমি মুশরিক ছিলাম। আমি তাকে সাহায্য করি নাই। মাঝে মাঝে এই দৃশ্য আমার চোখে ভাসে। খুবাইব রা. বদদোয়া ও আল্লাহর শাস্তির ভয়ে আমি বিচলিত হয়ে জ্ঞানহারা হয়ে পড়ি। 

সাঈদ রা.-এর উত্তরে উমার রা. অত্যন্ত খুশি হলেন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহর। যিনি আমার ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেন নি। এরপর তিনি ১০০০ দিরহাম দিলেন সাঈদ রা.-কে। প্রয়োজন পূরণ করতে বললেন, কিন্তু সাঈদ রা. সব দান করে দেন। 

ইয়াদ ইবনে গানাম রা.: 
তিনি ছিলেন সিরিয়ার একটি অংশের প্রশাসক। তিনি একটি পরিষদবর্গ তৈরি করেন। তাদের নিয়ে আয়েশি জীবন যাপন করেন। পরে তিনি একটি হাম্মামখানা ক্রয় করেন। এই খবরে উমার রা. তাঁকে জরুরি তলব করেন মদিনায়। ইয়াদ রা. মদিনায় আসলে উমার রা. তাঁকে তিনদিন সাক্ষাতের অনুমতি দেননি। এরপর সাক্ষাত করে তাকে বাইতুল মালের সরকারি ভেড়া লালন পালনের দায়িত্ব দেন। এভাবে তিন মাস একজন গভর্নর মেষপালকে পরিণত হন। তিন মাস পার হলে উমার রা. তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, আর ভুল হবে? উত্তরে তিনি 'না' বলেন। উমার রা. তাঁকে বললেন, যান, সিরিয়ায় গিয়ে নিজ দায়িত্ব পালন করুন। এই প্রশিক্ষণ পেয়ে ইয়াদ রা. একজন প্রখ্যাত ও দক্ষ গভর্নরে পরিণত হন।  

এভাবে উমার রা. জনগণের কথা শুনতেন ও গভর্নরদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। গভর্নরসহ অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তিনি মূলত পুরো ইসলামী রাষ্ট্রে ন্যয়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।    

২৩ জানু, ২০২২

খিলাফত পর্ব-১৫ : উমার রা. ও খালিদ রা.-এর মধ্যেকার সম্পর্ক


উমার রা. খালিদ রা.-কে তার সাহস, বীরত্ব ও স্পষ্টবাদীতার জন্য জাহেলি যুগ থেকেই পছন্দ করতেন। সম্পর্কে তারা মামাতো ফুফাতো ভাই হন। খালিদ রা. সাইফুল্লাহ উপাধি পেয়ে মুসলিমদের সেনানায়ক হন রাসূল সা.-এর সময়ে। একই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে আবু বকর রা.-এর সময়ও। এই সময় তিনি নতুন দায়িত্ব পান গভর্নর হিসেবে। প্রথমে তিনি ইরাকের ও পরে সিরিয়ার গভর্নর হন। আবু বকর রা.-এর সময়ে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যাপক বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়। এই বিদ্রোহ দমনে রিদ্দার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মূলত এই সময় থেকে খালিদ রা. ও উমার রা.-এর মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। 

রিদ্দার যুদ্ধে মালিক ইবনে নুওয়ারাহর হত্যাকাণ্ড থেকে খালিদ রা. ও উমর রা.-এর সম্পর্ক ছিল শীতল। খলিফা আবু বকর রা. নজদের আশপাশের বিদ্রোহী গোত্রগুলোকে দমনে চার হাজার সৈন্যসহ খালিদ রা.-কে পাঠান। নজদের নেতা মালিক ইবনে নুওয়ারাহ মদিনাতে যাকাত পাঠাতে অস্বীকার করেন। তবে তিনি মদিনার সাথে যুদ্ধের জন্য বা বিদ্রোহের জন্য প্রচেষ্টা চালাননি। মালিক তার পরিবারকে নিয়ে মরুভূমির ওপারে স্থানান্তরিত হন। খালিদ রা.-এর সৈন্যরা তার অশ্বারোহীদের থামতে বাধ্য করে। 

মালিককে খালিদ রা. যাকাতের ব্যাপারে প্রশ্ন করেন। তিনি নিজের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে তোমাদের প্রভু ও তোমাদের রাসূল উল্লেখ করেন। এতে খালিদ রা. ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। বলেন, আমাদের প্রভু ও রাসূল কি তোমার প্রভু ও রাসূল নয়? এরপর তিনি মালিককে বিদ্রোহী মুরতাদ হিসেবে সাব্যস্ত করেন ও হত্যা করেন। তিনি মালিকের পরিবারকে বন্দী করেন। অভিযান শেষে তিনি মালিকের বিধবা স্ত্রী লায়লা বিনতে আল-মিনহালকে বিয়ে করেন।  

এই ঘটনা অনেকের মতো হযরত উমর রা.ও খালিদ রা.-এর সীমালংঘন হিসেবেই দেখেছেন। উমর রা. অবিলম্বে খালিদকে বরখাস্ত করার জন্য ও বিচারের মুখোমুখি করার জন্য আবু বকর রা.-এর কাছে দাবি জানান। তিনি বলেন, হত্যা ও ব্যভিচার- এ দুটি অপরাধে খালিদের বিচার করা উচিত। কিন্তু খলিফা আবু বকর রা. এই ঘটনাকে খালিদ রা.-এর ভুল হিসেবে আখ্যায়িত করেন ও মালিকের পরিবারকে রক্তমূল্য পরিশোধ করেন। আবু কাতাদা আল-আনসারী মদিনা থেকে খালিদ রা.-এর সঙ্গী হয়েছিলেন। মালিকের হত্যাকাণ্ডে কাতাদা এত ব্যথিত হন যে, তিনি অবিলম্বে মদিনায় ফিরে এসে খলিফাকে বলেন, তিনি একজন মুসলিম হত্যাকারীর অধীনে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নন। 

এই ঘটনার কিছুদিন পরেই খলিফা আবু বকর রা. খালিদ রা.-কে ইরাকে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠান। সেখানে তিনি বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে জয়ী হতে থাকেন। আবু বকর রা. তাঁকে ইরাকের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন। তার কিছুদিন পর সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনী রোমানদের সাথে ভয়াবহ যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। আবু বকর রা. সেই যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে খালিদ রা.-কে নির্দেশ দেন। একইসাথে তিনি খালিদ রা.-কে সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব দেন। 

ইরাকের গভর্নর থাকাকালে আবারো মতবিরোধ তৈরি হয় উমার রা.-এর সাথে। উমার রা.-এর মতামত ছিল গভর্নররা যুদ্ধের কৌশল ও চুক্তির ব্যাপারে খলিফার নিকট দায়বদ্ধ থাকবে। তারা স্বাধীনভাবে যুদ্ধ পরিচালনা ও শত্রুপক্ষের সাথে চুক্তি করবে না। অবশ্যই খলিফা থেকে অনুমতি নিয়ে করবে। খালিদ রা. এই ব্যাপারে একমত ছিলেন না। তিনি ভাবতেন যুদ্ধের সিদ্ধান্ত, যুদ্ধকৌশল ও চুক্তির ব্যাপারে ময়দানে থাকা সেনানয়কই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। খালিদ রা. রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যয় করার ক্ষেত্রে স্থানীয় ধনী ও প্রভাবশালী লোকদের প্রাধান্য দিতেন। তিনি ভাবতেন এর মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালীরা তার অনুগত থাকবে। প্রদেশ পরিচালনা সহজ হবে। অন্যদিকে উমার রা. মতামত দিয়েছেন যখন ইসলাম অপেক্ষাকৃত দুর্বল  ছিল তখন মুহাম্মদ সা. কিছু কিছু প্রভাবশালীকে উপহার দিয়ে ইসলামের প্রতি নমনীয় করে তুলেছেন। কিন্তু এটার আর এখন প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ পাবার অধিকার রয়েছে মুহাজির ও অভাবীদের। 

এই বিষয় নিয়ে মদিনায় মজলিসে শুরায় দীর্ঘ আলাপ আলোচনা ও পর্যালোচনা হয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় যে, গভর্নররা যুদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে খলিফার অনুমতি নেবেন। এই মর্মে সকল গভর্নরকে চিঠি পাঠানো হয়। খালিদ রা. চিঠির উত্তরে এভাবে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হবে বলে জানান। এদিকে খালিদ রা.-এর বিজয়ে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, মুসলিমদের বিজয় আসে খালিদ রা.-এর মাধ্যমে। উমার রা. ভাবেন এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে ঈমানের ঘাটতি তৈরি হবে। তাই উমার রা. খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর খালিদ রা.-কে গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।     

খলিফা উমর রা. আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রা.-কে চিঠি লিখে জানান, আমি আল্লাহকে ভয় করার জন্য আপনার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি চিরঞ্জীব এবং তিনি ছাড়া সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে সৎ পথের নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং আমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে এসেছেন। আমি আপনাকে খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করছি। সুতরাং কর্তব্য হিসেবে আপনি এ নিযুক্তি গ্রহণ করুন। লুণ্ঠনের স্বার্থে মুসলমানদের ধ্বংসের পথে ঠেলে দেবেন না। পর্যবেক্ষণ না করে এবং খোঁজ খবর না নিয়ে কোনো তাঁবুতে মুসলমানদের অবস্থান করতে দেবেন না। ইউনিটগুলোকে যথাযথ সংগঠিত করা ছাড়া কোনো অভিযানে পাঠাবেন না। মুসলমানরা নির্মূল হয়ে যেতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকুন। আল্লাহ আমাকে দিয়ে আপনাকে এবং আপনাকে দিয়ে আমাকে পরীক্ষা করছেন। পৃথিবীর প্রলোভন সম্পর্কে সাবধান হোন। প্রলোভন আপনার আগে অন্যদের ধ্বংস করেছে।

খালিদ রা. এই খবর জানতে পেরে বিনা বাক্য ব্যয়ে সিনিয়র সাহাবী আবু উবাইদাহ রা.-এর কাছে নেতৃত্ব হস্তান্তর করেন। খালিদ রা. আবু উবাইদা রা.-এর অধীনে একজন সেনা কমান্ডার হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। উমার রা.-এর প্রশাসন ছিল তার পূর্বসূরি আবু বকর রা.-এর কার্যকলাপ থেকে ভিন্ন। আবু বকর রা. সামরিক কমান্ডারদের বিভিন্ন অভিযানে পাঠাতেন এবং অপারেশন পরিচালনার ভার তাদের ওপর অর্পণ করতেন। অন্যদিকে হযরত উমর রা. প্রতিটি যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের নির্দেশ দিতেন। তিনি তার সেনাপতিদের ওপর নজরদারি করার জন্য একটি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক গঠন করেন। তার খিলাফতকালে তিনি মুসলিম বাহিনীর বামবাহু কিংবা ডানবাহুর নেত্বত্ব কে দেবেন তাও নির্ধারণ করতেন। আবু বকর রা. যাদের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন, উমর রা. তাদের নিয়োগ পুনরায় অনুমোদন করেন। 

৬৩৮ সালে মারাশ বিজয় শেষে ফিরে এসে খালিদ রা. উদারহস্তে সৈন্যদের দান করেন। এ সময় কিছু লোক খালিদের প্রশস্তিসূচক কবিতা পাঠ করে তার কাছ থেকে পুরস্কার লাভ করেন। তাদের একজন ছিলেন কবি আল-আশা’স ইবনে কায়েস আল-কিন্দি। কবি আশা’স কিনাচ্ছারিনে (সিরিয়ার হোমস থেকে অল্প দূরে, বর্তমান নাম চেলসিস) আসেন এবং খালিদের প্রশংসাসূচক একটি কবিতা পাঠ করে তাকে শোনান। খলিফা উমার রা. জানতে পারেন যে, খালিদের প্রশস্তিসূচক কবিতা পাঠ করায় কবি আশা’সকে ১০ হাজার দিরহামের বিশাল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। একথা জানতে পেরে উমর মনঃক্ষুণ্ণ হন। এ পরিমাণ অর্থ ছিল রাজকোষ থেকে খলিফার প্রাপ্ত অর্থের চেয়েও বেশি। দ্বন্দ্বযুদ্ধ এবং অন্যান্য যুদ্ধে অর্জিত মাল থেকে প্রাপ্ত আয় খালিদের বেতনের অংশ ছিল না। একজন কমান্ডারের বার্ষিক আয় ছিল ৭ থেকে ৯ হাজার দিরহামের মধ্যে। 

উমার রা. অবিলম্বে আবু ওবাইদা রা.-এর কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে লিখেন, খালিদকে তলব করুন, তার পাগড়ি দিয়ে তার হাত বাঁধুন এবং তার টুপি খুলে নিন। তাকে জিজ্ঞেস করুন তিনি আশা’সকে কোন তহবিল থেকে অর্থ দিয়েছেন। তিনি কি তার নিজের পকেট থেকে নাকি অভিযানে অর্জিত গণিমতের মাল থেকে অর্থ দিয়েছেন? খালিদ যদি স্বীকার করেন যে, তিনি গণিমতের মাল থেকে এ অর্থ দিয়েছেন তাহলে অর্থ আত্মসাতের দায়ে তিনি অভিযুক্ত হবেন। আর যদি তিনি দাবি করেন যে, তিনি তার পকেট থেকে এ অর্থ দিয়েছেন তাহলে তিনি অপব্যয়ের জন্য দোষী সাব্যস্ত হবেন। দুটি ঘটনার প্রতিটির জন্য তাকে বরখাস্ত করুন। 

উমার রা. এই নির্দেশ কার্যকরের জন্য আবু উবাইদা রা. সহযোগী হিসেবে একজন প্রভাবশালী সাহাবীকে দিয়ে কার্যকর করতে চাইলেন। এজন্য তিনি বিলাল রা.-কে এ কাজের জন্য বেছে নেন। তিনি বিলাল রা.-এর কাছে চিঠি হস্তান্তর করেন। কিভাবে খালিদকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে তা তিনি তাকে বুঝিয়ে দেন এবং তাকে সর্বোচ্চ গতিতে এমেসা (হোমস) যাবার নির্দেশ দেন। বিলাল রা. এমেসা এসে পৌঁছান এবং আবু উবাইদা রা.-এর কাছে উমরের চিঠি হস্তান্তর করেন। আবু উবাইদাহ রা. খালিদ রা.-কে ডেকে পাঠান। খালিদ রা. এমেসা আসলে তাঁর বিচার শুরু হয়। 

খালিদ রা.-কে আদালতের মুখোমুখি করা হলো। বিলাল রা. ওঠে দাঁড়ান এবং খালিদ রা.-কে জিজ্ঞাসা করেন, হে খালিদ! আপনি কি আশা’সকে ১০ হাজার দিরহাম পুরস্কার দিয়েছেন? উত্তরে খালিদ রা. বললেন, হ্যাঁ। এ অর্থ আপনি কোথা থেকে দিয়েছেন? আপনার নিজের পকেট থেকে নাকি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে? তিনি জানালেন, নিজ পকেট থেকে দিয়েছেন। অবশেষে অপব্যয়ের দায়ে তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো এবং অবিলম্বে খলিফা উমার রা.-এর সঙ্গে দেখা করার জন্য বলা হলো।

খালিদ রা. কিনাচ্ছারিনে ফিরে যান এবং তার অতি প্রিয় ভ্রাম্যমাণ অশ্বারোহী বাহিনীকে সমবেত করেন এবং তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। এ বাহিনীর যোদ্ধারা বিনা প্রশ্নে তার নির্দেশ মেনে নিতো। তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাদের জানান যে, তাকে কমান্ড থেকে অপসারণ করা হয়েছে এবং এখন তিনি খলিফার নির্দেশে মদিনা যাচ্ছেন। এবং তিনি নতুন সেনানয়কের নির্দেশ মানতে নসিহত করেন। 

মদিনায় দুজন লৌহমানব তদানীন্তন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক উমার রা. এবং সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ রা. একে অন্যের মুখোমুখি হন। উমর রা. প্রথম কথা বলেন। তিনি খালিদ রা.-এর সাফল্য ও কৃতিত্ব স্বীকার করে তাৎক্ষণিক একটি কবিতা রচনা করেন এবং আবৃত্তি করেন। উত্তরে খালিদ রা. বলেন, 

- আমি মুসলমানদের কাছে আপনার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। হে উমর! আল্লাহর কসম! আপনি আমার প্রতি অন্যায় করেছেন।
- আপনি এত সম্পদ কোথায় পেলেন? 
- গণিমতের মালে আমার হিস্যা থেকে। ৬০ হাজার দিরহামের অতিরিক্ত হলে আপনার।

উমর রা. জমাকৃত গণিমত ও খালিদ রা. সম্পদ হিসাব করলেন। হিসাবে খালিদ রা. থেকে ২০ হাজার দিরহাম পাওনা হলো রাষ্ট্র। খালিদ রা. সেগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে দিলেন। 

হিসাব শেষ করে উমর রা. খালিদকে বললেন, হে খালিদ! আল্লাহর কসম! আপনি আমার চোখে অত্যন্ত সম্মানিত। আপনি আমার প্রিয়পাত্র। আজকের পরে আমার কাছে আপনার অভিযোগ করার কোনো কারণ থাকবে না। উমার রা. খালিদ রা.-এর জন্য নিয়মিত সম্মানজনক ভাতার ব্যবস্থা করেন।

কয়েকদিন পর খালিদ কিনাচ্ছারিনের উদ্দেশে মদিনা ত্যাগ করেন। তিনি আর কখনো আরবে ফিরে আসেননি। খালিদ রা. মদিনা ত্যাগ করা মাত্র খলিফা উমর রা.-এর কাছে লোকজন এসে ভিড় জমায় এবং খালিদ রা.-এর সম্পদ তার কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করে। জবাবে উমর রা. বলেন: আমি আল্লাহ ও মুসলমানদের সম্পদ লেনদেন করতে পারি না।

খালিদ রা.-এর সম্মান রক্ষার্থে উমার রা. সকল গভর্নর ও প্রতিনিধির কাছে চিঠি পাঠান উমার রা.। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, আমি আমার ক্রোধ অথবা তার অসাধুতার জন্য খালিদ রা.-কে বরখাস্ত করিনি। লোকজন তাকে গৌরবান্বিত করায় এবং বিভ্রান্ত হওয়ায় তাকে বরখাস্ত করেছি। আমি আশঙ্কা করছিলাম যে, লোকজন তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে। আমি তাদেরকে একথা জানিয়ে দিতে চেয়েছি যে, আল্লাহই সব করেন। এ ভূখন্ডে কোনো ভুল ধারণা পোষণ করার সুযোগ নেই। 

এরপর খালিদ রা. এমেসায় (হোমস) বাড়ি করে বসবাস শুরু করেন। যদিও তাদের মধ্যে সম্পর্ক শীতল ছিল কিন্তু তাঁরা পরস্পরকে শ্রদ্ধা করতেন। মৃত্যুর আগে খালিদ রা. তার সকল সম্পদ উমর রা.-এর হাতে অর্পণ করে যান এবং উমর রা.-কে নিজ অসিয়তের বাস্তবায়নকারী মনোনীত করে যান। 

খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. যখন মৃত্যুশয্যায় ছিলেন তখন তাকে দেখতে আবু দারদা রা. গিয়েছিলেন। খালিদ রা. আবু দারদা রা.-কে বলেন, হে আবু দারদা! উমারের মৃত্যুর পর আপনি অপছন্দনীয় অনেক কিছু ঘটতে দেখবেন। 

তিনি আরো বলেন, আমি তার ওপর মন খারাপ করেছি। এখন অসুস্থ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছি। আমি বুঝতে পেরেছি উমার তার সব কাজেই আল্লাহকে খুশি করার চেষ্টা করেন। যখন তিনি আমার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করছিলেন আমি খুবই রাগান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু আমার পূর্বে ইসলামগ্রহণকারী বাদরি সাহাবীদের ব্যাপারেও তিনি এমন কঠোর আচরণ করেছেন। যেহেতু তিনি আমার নিকটাত্মীয় তাই ভেবেছিলাম ওনার কাছ থেকে কোমল ব্যবহার পাবো। আমি দেখলাম তিনি কখনো স্বজনপ্রীতিকে প্রশ্রয় দেননি। হকের খাতিরে কারো নিন্দার পরোয়া করেন নি। এটাই তার প্রতি আমার মনোভাব বদলে দিয়েছে। তিনি আমার প্রতি বিদ্বেষবশতঃ সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি আমার প্রতি রাগান্বিত হয়েছেন, এর কারণ ছিল আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা। আমার দান তিনি পছন্দ করেননি। 

খালিদ রা.-এর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পড়েন উমার রা.। তিনি তাঁর জন্য কবিতা আবৃত্তি করেন ও চোখের পানি ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, আবু সুলাইমান (খালিদ রা.) শির্ক ও মুশরিকদের অপদস্ত করতে ভালোবাসতেন। তিনি আরো বলেন, আজ ইসলামের দেয়ালে একটি ছিদ্র তৈরি হলো।    


২২ জানু, ২০২২

খিলাফত পর্ব-১৪ : উমার রা. এর শাসনামলে গভর্নরদের কর্তব্য


উমার রা. রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার্থে পুরো মুসলিম জাহানকে অনেকগুলো প্রদেশে ভাগ করেন। আর সেখানে দায়িত্বশীল বা গভর্নর নিযুক্ত করেন। তাদের নিযুক্ত করার সময় তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে দিতেন। এতটুকুতে ক্ষান্ত ছিলেন না, তিনি নিয়মিত তত্ত্বাবধান করতেন যাতে গভর্নররা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। 

দাওয়াতের কাজ করা : 
উমার রা. দাওয়াতের কাজকে গুরুত্ব দিতেন। যেভাবে মুহাম্মদ সা. গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু বকর রা. এর সময়ে মাত্র দুবছরে তিনি বিদ্রোহ দমন ও বহিঃশত্রু থেকে নিজেদের রক্ষায় ব্যস্ত ছিলেন বলে তিনি এদিকে ভালো নজর দিতে সক্ষম হননি। উমার রা. দায়িদের প্রশিক্ষণ ও উপদেশ দিয়ে বিজিত অঞ্চলে পাঠাতেন। সিরিয়ার মানুষ বেশিরভাগ ছিল খ্রিস্টান। তারা যুদ্ধে পরাজিত হলেও ধর্ম ত্যাগ করে নি। উমার রা. সিরিয়ায় বহু দায়িকে সেখানে পাঠান ও সেখানের গভর্নরকে এই ব্যপারে নির্দেশনা দেন যাতে তিনি প্রতিটি সিরিয়ানের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান। উমার রা. গভর্নরদের বলতেন, আমি আপনাদের নিযুক্ত করেছি এই জন্য নয় যে, আপনারা জনগণের মুন্ডুপাত করবেন ও প্রহার করবেন। বরং নিয়মিত সালাত প্রতিষ্ঠা করা ও তাদেরকে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমরা তোমাদের নিযুক্ত করেছি। 

উমার রা. জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রায়ই বলতেন আল্লাহর শপথ আমরা গভর্নরদের তোমাদের প্রহার করা ও তোমাদের সম্পদ নেওয়ার জন্য পাঠাই না। বরং তাদের পাঠাই তোমাদের বিশুদ্ধভাবে দ্বীন ও সুন্নাহ শেখানোর জন্য। 

নামাজ কায়েম : 
নামাজ কায়েম শাসকদের অন্যতম প্রধান কাজ। আল্লাহ তায়ালা সূরা হজ্বের ৪১ নং আয়াতে এই ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। উমার রা. এই ব্যাপারে গভর্নরদের জোর দিতেন। তিনি প্রায়ই গভর্নরদের লিখতেন, আমার দৃষ্টিতে তোমাদের সকল কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নামাজ। নিয়মিত যে নামাজ আদায় করে সে তার ঈমান রক্ষা করে। আর যে তাতে অবহেলা করে তার ঈমানের অন্যান্য অঙ্গ আরো বেশি অবহেলিত হতে বাধ্য। উমার রা. গভর্নরদের ওপর নজরদারি করতেন তারা নামাজ কায়েমের ব্যাপারে তৎপর কিনা। 

মসজিদ প্রতিষ্ঠা :
উমার রা. ইসলামী রাষ্ট্রের গভর্নরদের মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য তাকিদ করতেন এবং মসজিদকে কেন্দ্র করেই সকল প্রশাসনিক কাজ আঞ্জাম দিতে বলতেন। এতে বিধর্মীরাও মসজিদের সংস্পর্শে আসতো তারা মুসলিমদের কালচার ও শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হতো। উমার রা.-এর দশ বছরে শুধু আরবেই চার সহস্রাধিক মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।

জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ : 
উমার রা.-এর সময়ে গভর্নরদের বড় কাজ ছিল জিহাদ করা ও ইসলামের সাম্রাজ্য বাড়ানো। আবু বকর রা.-এর সময়ে পৃথিবী বিখ্যাত দুই সাম্রাজ্য রোমান ও পারসিকদের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া জিহাদ চূড়ান্ত সফলতা পেয়েছে উমার রা.-এর আমলে। প্রায় অর্ধ পৃথিবীকে ইসলামের অনুগত করেছে উমার রা.-এর গভর্নররা। উমার রা. তাঁর প্রতিনিধি, সেনানায়ক ও গভর্নরদের জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ থেকে বিশ্রাম দেননি বলেই চলে। ফলশ্রুতিতে মাত্র কয়েকবছরে পৃথিবীর বেশিরভাগ সভ্যতা ইসলামের অনুগত হয়েছে। 

পরামর্শভিত্তিক প্রদেশ পরিচালনা : 
উমার রা. সময়ে গভর্নরদের প্রতি নির্দেশ ছিল তারা যাতে প্রদেশ পরিচালনাকালে প্রাদেশিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রদেশের বিশেষ ব্যক্তি ও নেতাদের সাথে পরামর্শ করে নেন। গভর্নররা এই নির্দেশ বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলেন। মাসিক ভিত্তিতে শহরের বিশেষ ব্যক্তিদের সাথে গভর্নররা মতবিনিময় করতেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অমুসলিম নেতাদেরও পরামর্শ সভায় রাখা হতো, যাতে তাদের বক্তব্যগুলো গভর্নররা জানতে পারেন। 

দণ্ডবিধি ও ন্যয়বিচার প্রতিষ্ঠা : 
গভর্নর ও প্রতিনিধিদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল দণ্ডবিধি ও ন্যয়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। দণ্ডবিধি কার্যকরের ক্ষেত্রে যাতে বৈষম্য না করা হয়, প্রভাবশালীদের জন্য যাতে বিচার পরিবর্তিত না হয় তা দেখভালের দায়িত্ব ছিল গভর্নরদের। সাধারণ মানুষ যাতে ন্যয়বিচার পায়, অন্যায়ের প্রতিবিধান যাতে হয় তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের নির্দেশ ছিল উমার রা.-এর পক্ষ থেকে। প্রথম দিকে মৃত্যুদণ্ডের জন্য গভর্নররা স্বাধীন ছিল। তারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতেন। পরবর্তীতে কয়েকটি সমস্যা তৈরি হওয়ায় শুধু মৃত্যুদণ্ডের কার্যকরের জন্য আমীরুল মু'মিনিনের অনুমতি নিতে হতো। 

অসহায়দের জন্য ভাতার ব্যবস্থা : 
উমার রা. তাঁর শাসনামলে জনগণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। বিশেষত যারা দুর্বল, অসহায় ও বিপদ্গ্রস্থ তাদের খোঁজখবর তিনি নিজেও রাখতেন এবং গভর্নরদের নির্দেশ দিতেন যাতে তারা এই অসহায়দের খবর রাখে। তিনি ইরাকে গিয়ে এক ভাষণে বলেন, আমি যদি আর কিছুদিন হায়াত পাই তবে ইরাকের বিধবাদের এমন ব্যবস্থা করে যাবো যাতে তাদের কারো প্রয়োজন না পড়ে। তিনি তাদের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করেন। এছাড়া অসুস্থ, ঋণগ্রস্থরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে যাতে সাহায্য পায় তার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। উমার রা. সময়ে রাষ্ট্রের আয় ব্যপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। আবার রাষ্ট্রের খরচও সেসময় অনেক বেশি ছিল না। তাই উমার রা. সেসময় ব্যাপক সম্পদ জমা রেখে রাষ্ট্রীয় কোষগারের আকার বড় করেননি। তিনি এই টাকা সকল জনগণের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন গভর্নরদের মাধ্যমে। 

কর্মকর্তা নিয়োগ : 
গভর্নরদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যাতে তাঁরা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য উমার রা. প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগে কার্পন্য নিজেও করতেন না এবং গভর্নরদেরও করতে দিতেন না। গভর্নররা নিজ নিজ কর্মী নিয়োগে স্বাধীন ছিলেন। 

জিম্মী নাগরিকদের তত্ত্বাবধান : 
উমার রা. গভর্নরদের আরেকটি বিষয়ে তাকিদ করতেন। আর তা হলো জিম্মীদের খোঁজখবর। জিম্মী মানে হলো রাষ্ট্রে অবস্থানকারী অনুগত অমুসলিম নাগরিক। গভর্নররা তাদের কাছ থেকে নামমাত্র জিজিয়া কর আদায় করতেন নিরাপত্তার বিনিময়ে। তাই উমার রা. কড়া নির্দেশ দিতেন যাতে তাদের ধর্ম পালন ও বসবাসে কোনোরূপ বাধা তৈরি না হয় এবং তারা যাতে কোনোরূপ অসুবিধায় না পড়েন। যাদের সাথে যেরূপ চুক্তি ছিল তাদের সাথে সেরূপ চুক্তি যথাযথভাবে মানার দায়িত্ব ছিল গভর্নরদের। 

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড : 
এখন যেরকম সরকারকে ব্যপকভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে হয়, তখনকার সমাজব্যবস্থা সেরকম ছিল না বিধায় শাসকরা উন্নয়ন কর্মকান্ডে খুব একটা যুক্ত হতো না। কিন্তু উমার রা. সময়ে তিনি এই বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। এই কাজে তিনি প্রাদেশিক গভর্নরদের কাজে লাগান। তাঁর উন্নয়নের মধ্যে মূল গুরুত্বপায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ও খাবার পানি বন্টন।  প্রত্যেক প্রদেশের সাথে রাজধানী তথা মদিনার যোগাযোগের রাস্তা তিনি মসৃন ও সহজ করার দায়িত্ব গভর্নদের ছিল। এই রাস্তায় মুসাফিরদের নিরাপত্তার জন্য তারা পুলিশের পেট্রোল টহলের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করা খুব সহজ হয়ে গিয়েছিল। পন্যের দাম কমেছিল। খাবার পানি যাতে প্রত্যেক নাগরিক পায় সেই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গভর্নরদের ছিল। 
গভর্নরদের আরেকটি দায়িত্ব ছিল কৃষিকাজে কৃষকদের সহায়তা করা। এক্ষেত্রে ভালো বীজের ব্যবস্থা করা ও পানি সেচের ব্যবস্থা করা ছিল গভর্নরদের দায়িত্বের অংশ। প্রয়োজনীয় খাল খনন, ফসল বিক্রীর ব্যবস্থা করা ও ভূমিহীনদের জন্য ভূমি বরাদ্দ দেওয়া গভর্নরদের দায়িত্ব ছিল। দুর্গম স্থানে যাতায়াতের জন্য রাস্তা নির্মান অন্যতম কাজ ছিল। 

জনগণের সাথে সম্পর্ক : 
উমার রা. গভর্নরদেরকে জনগণের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার ব্যাপারে নির্দেশ দিতেন। জনগণ যাতে সবসময় প্রয়োজনে গভর্নরদের পায় সে সুযোগ রাখতে বলতেন। যেসব গভর্নর সবসময় জনগণের মুখোমুখি হতেন তাদের চিঠি দিয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিতেন। তিনি জনগণকে সাথে নিয়ে সামাজিক কাজ করার ব্যাপারে গভর্নরদের নির্দেশ দিতেন। ফলে গভর্নর ও জনগণের মধ্যে দুরত্ব তৈরি হতো না। 

হজ্ব ব্যবস্থাপনা : 
উমার রা.-এর শাসনামলে গভর্নরদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল হজ্ব ব্যবস্থাপনা। প্রত্যেক গভর্নর তার প্রদেশ থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় হজ্বযাত্রীদের একত্র করে নিরাপত্তা দিয়ে মক্কায় পাঠাতেন ও নিরাপদে নিয়ে আসতেন। আর মক্কার গভর্নরের দায়িত্ব ছিল হাজিদের থাকার ব্যবস্থা ও নির্বিঘ্নে হজ্ব পালনের সম্ভাব্য সকল ব্যবস্থার আয়োজন করা।

৮ জানু, ২০২২

ফেলানী হত্যার ১১ বছর


মেয়েটার বাড়ি কুড়িগ্রামে। সে তার বাবার সাথে ভারতে থাকে। সেখানে নয়াদিল্লিতে একটি বাড়িতে কাজ করে মেয়েটি। তার বাবা দিনমজুরের কাজ করে নয়াদিল্লিতেই। সীমান্তের মানুষ অনায়াসেই এপার অপার যাতায়াত করে, আত্মীয়তা করে। সামাজিকতা রক্ষা করে। মেয়েটি ও তার বাবা যখন ভারতে যায় তখন সীমান্তে কাঁটাতার ছিল না। তারা প্রায় ১০ বছর ধরে নয়াদিল্লীতে থাকে। বছরে কয়েকবার তারা সীমান্ত পার হয়।

২০১১ সালে মেয়েটির বিয়ে ঠিক হয়। পাত্রের বাড়ি কুড়িগ্রামেই, মেয়েটির খালাতো ভাই। বিয়ের প্রস্তুতি নিতে মেয়েটির বাবা ও মেয়েটি বাংলাদেশে ফিরে আসতে গিয়ে দেখে সীমান্তে কাঁটাতার দেওয়া। কাঁটাতারের পাশে মই লাগিয়ে পারাপারের ব্যবস্থাও আছে। মেয়েটির বাবা পার হয়ে যান আগে। এরপর মেয়েটি পার হতে গেলে তার কাপড় আটকে যায় কাঁটাতারের সাথে। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে মেয়েটি।


তার চিৎকার শুনে সচকিত হয় ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। বিএসএফ সদস্য অমীয় ঘোষ কোনো কিছু জিজ্ঞাসা না করেই পাখি শিকারের মতো করে নির্দয়ভাবে ভয়ার্ত মেয়েটিকে টার্গেট করে গুলি করে। আর্তচিতকার করে ওঠে মেয়েটি। এটা তার শেষ চিৎকার। গুলিবিদ্ধ মেয়েটির হাত ফসকে যায়। সে ঢলে পড়ে। কিন্তু তার কাপড় আটকে থাকে কাঁটাতারে। ঝুলতে থাকে মেয়েটি।

তার বাবা চেয়েছেন ঝুলে থাকা মেয়েটিকে নামিয়ে আনতে। চিকিতসার ব্যবস্থা করতে। না! বিএসএফ তা হতে দেয়নি। মেয়েটি ঝুলে ছিল প্রায় পাঁচ ঘন্টা। কোনো ফাঁসীর আসামীকেও মনে হয় এতক্ষণ ঝুলতে হয় না। ১৫ বছরের সেই মেয়েটির নাম ফেলানী। গতকাল ৭ জানুয়ারি ছিল ফেলানী হত্যার ১১ বছর।

আমার জানামতে ফেলানীর মৃত্যুর এই মর্মান্তিক খবর ছাপে শুধুমাত্র আমার দেশ পত্রিকা। কয়েকদিন এই নিয়ে রিপোর্ট করার পর অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও আসা শুরু করেছিলো। এদিকে বাংলা ব্লগগুলো ছিল তখন তুমুল জনপ্রিয়। বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী হেলাল এম রহমান ভাই ছিলেন আমার দেশ পাঠকমেলার দায়িত্বশীল। আমার যতদূর মনে আছে তাঁর একটি বিপ্লবাত্মক লেখা সেসময় ৭ টি ব্লগে স্টিকি পোস্ট/ নির্বাচিত পোস্ট ছিল। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে প্রথম ফেলানী হত্যার প্রতিবাদে ভারতের বিরুদ্ধে মানববন্ধন হয় চট্টগ্রামে। এরপর ঢাকায় এবং সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

টুইটার স্টর্মের মাধ্যমে সারাবিশ্বের ভারতীয় হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলতে থাকে। বাংলাদেশের মেইন্সট্রিম মিডিয়াও এই আলোচনা শুরু হয়। এতেও বোধোদয় হয় না ভারত সরকারের। কিন্তু এই নিয়ে বাংলাদেশের অনলাইন এক্টিভিস্টরা ও পৃথিবীর নানান মানবাধিকার সংস্থা সোচ্চার থাকে। এদিকে বিএসএফ ধারাবাহিকভাবে সীমান্তে হত্যা জারি রাখে।

২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আটরশিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমান নামক ব্যক্তিকে বিএসএফ হাত-পা বেঁধে বিবস্ত্র করে রাইফেলের বাঁট ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটায়। এর ভিডিও কিছুদিন পর ভাইরাল হয়। এতে আবারো অনলাইন এক্টিভিস্টরা ক্ষিপ্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ও ভারত সরকার থাকে একদম নির্বিকার।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্স নামে একটি হ্যাকার গ্রুপ ভারতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করে। তারা একটি ভিডিও বার্তা দেয় যান্ত্রিক কন্ঠে।

// হ্যালো বাংলাদেশের নাগরিকরা, আমরা বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারস। এখন সময় আমাদের চোখ খুলবার। বিএসএফ এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে, তাদের গুলিতে আহত হয়েছে আরও ৯৮৭ বাংলাদেশি। অপহৃত হয়েছে হাজারো মানুষ। এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তারা অবিচার করছে। সংকটময় এ মুহূর্তে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে আমাদের কিছু দায়িত্ববোধ রয়েছে, আমরা চাই ভারত সরকার নিরপরাধ বাংলাদেশিদের হত্যা করা বন্ধ করুক। নতুবা আমরা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে সাইবার-যুদ্ধ শুরু করব। এটি চলতেই থাকবে।//

ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্স শুধু ভারতীয় সাইট ডাউন করেনি। একইসাথে বাংলাদেশ সরকারের নীরবতায় ক্ষুব্দ হয়ে বাংলাদেশেরও অনেক সরকারি সাইট ডাউন করে দিয়েছিল। ভারতের শেয়ার মার্কেট তিনদিন বন্ধ থাকে এই সাইবার আক্রমণে। ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার্সের আহ্বানে চীন ও পাকিস্তানের কিছু হ্যাকার গ্রুপ সমানতালে ভারতের বিভিন্ন সাইট ডাউন করে দেয়। এই ঘটনায় সারাবিশ্বের গণমাধ্যমের নজর কাড়তে সক্ষম হয় ফেলানী হত্যা ইস্যু।

সারাবিশ্বের চাপে ২০১৩ সালের ১৩ অগাস্ট কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যার বিচারকাজ শুরু হয়। সেখানে ফেলানীর বাবা ও মামা হানিফ সাক্ষ্য দেন। ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাদ দেয় ভারতের কোচবিহারের সোনারী ছাউনিতে স্থাপিত বিএসএফের বিশেষ আদালত।

পুনঃবিচারের দাবিতে ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারের নিকট আবেদন করেন। পরে বিজিবি-বিএসএফের দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকে ফেলানী হত্যার পুনঃবিচারের সিদ্ধান্ত হয়।

২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনঃবিচার শুরু করে বিএসএফ। ওই বছরের ১৭ নভেম্বর ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বিএসএফের বিশেষ আদালতে অমিয় ঘোষকে অভিযুক্ত করে পুনরায় সাক্ষ্য প্রদান করেন এবং অমিয় ঘোষের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। ২০১৫ সালের ২ জুলাই এ আদালতে অমিয় ঘোষ আবারও বেকসুর খালাস পান।

২০১৫ সালের ১৩ জুলাই ভারতীয় ‘মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) ফেলানী খাতুন হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করে। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর শুনানীর পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টে বারবার তারিখ পিছাতে থাকে। ফলে থমকে যায় ফেলানী খাতুন হত্যার বিচার ও ক্ষতিপূরণের দাবি।

আজ ১১ বছর হলো। বিচার হলো না। বরং সীমান্তে মানুষ হত্যা হচ্ছেই। পৃথিবীর আর কোনো সীমান্তে এত হত্যা হয় না যত হত্যা হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। অথচ ভারতের সাথে আমাদের কোনো যুদ্ধ। উপরন্তু দুই দেশের ক্ষমতাবানরা দাবি করে আমরা নাকি বন্ধু রাষ্ট্র! আজিব!


৫ জানু, ২০২২

ছাত্রলীগ সভাপতিদের অর্ধেকই আওয়ামী লীগ করেন না


১৯৪৭ সালে শেখ মুজিব নাইমুদ্দিনকে আহবায়ক করে ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ (ছাত্রলীগ) গঠন করেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগ ৩০ জন সভাপতি পেয়েছে। 

অত্যন্ত অবাক করা ব্যাপার এই ৩০ জনের অর্ধেকও আওয়ামীলীগে যুক্ত থাকতে পারে নি। তারা ভিন্ন দলে চলে গেছে বা আওয়ামী লীগের সাথে অভিমান করে রাজনীতি থেকে দূরে চলে গেছেন। 

৩০ জনের মধ্যে আওয়ামীলীগ করেছেন ১৪ জন, ভিন্ন দল করেছেন ১০ জন, নিষ্ক্রিয় থেকেছেন ৪ জন, বহিষ্কৃত হয়েছেন ২ জন। 

যারা ভিন্ন দল করেছেন তাদের মধ্যে বিএনপি করেছেন ৫ জন, কৃষক প্রজা পার্টি করেছেন ২ জন, জাসদ করেছেন ১ জন, জাতীয় পার্টি করেছেন ১ জন ও গণফোরাম করেছেন ১ জন। 

সর্বপ্রথম আহ্বায়ক ও সর্বশেষ কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েছেন বহিষ্কৃত। 

সালভিত্তিক কেন্দ্রীয় সভাপতিদের তালিকা দেখুন 

১৯৪৭ - নাঈমুদ্দিন - বহিষ্কৃত 
১৯৪৭ - দবিরুল ইসলাম - কৃষক প্রজা পার্টি 
১৯৫০ - খালেক নেওয়াজ খান - কৃষক প্রজা পার্টি
১৯৫২ - কামরুজ্জামান - আওয়ামীলীগ 
১৯৫৩ - আব্দুল মোমিন তালুকদার - আওয়ামীলীগ 
১৯৫৭ - রফিক উল্লাহ চৌধুরী - আওয়ামীলীগ (আমলা) 
১৯৬০ - শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন - বিএনপি 
১৯৬৩ - কে এম ওবায়েদুর রহমান - বিএনপি 
১৯৬৫ - সাইয়েদ মাযহারুল হক বাকি - নিষ্ক্রিয়
১৯৬৭ - ফেরদৌস আহমেদ কোরেশি - বিএনপি, পিডিপি 
১৯৬৮ - আব্দুর রঊফ - নিষ্ক্রিয় 
১৯৬৯ - তোফায়েল আহমদ - আওয়ামী লীগ 
১৯৭০ - নূরে আলম সিদ্দিকী - নিষ্ক্রিয় 
১৯৭২ - শেখ শহিদুল ইসলাম - জাতীয় পার্টি 
১৯৭৩ - মনিরুল হক চৌধুরী - বিএনপি 
১৯৭৬ - এম এ আউয়াল - জাসদ 
১৯৭৭ - ওবায়েদুল কাদের - আওয়ামী লীগ 
১৯৮১ - মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন - আওয়ামী লীগ 
১৯৮৩ - আব্দুল মান্নান - আওয়ামী লীগ
১৯৮৬ - সুলতান মনসুর - গণফোরাম 
১৯৮৮- হাবিবুর রহমান - বিএনপি 
১৯৯০ - শাহে আলম - আওয়ামী লীগ 
১৯৯২ - মাইনুদ্দিন হোসাইন চৌধুরী -  নিষ্ক্রিয় 
১৯৯৪ - এনামুল হক শামীম - আওয়ামীলীগ 
১৯৯৯ - বাহাদুর ব্যাপারি - আওয়ামী লীগ 
২০০২ - লিয়াকত শিকদার - আওয়ামী লীগ 
২০০৬ - মাহমুদ হোসেন রিপন - আওয়ামী লীগ  
২০১১ - বদিউজ্জামান সোহাগ - আওয়ামীলীগ 
২০১৫ - সাইফুর রহমান সোহাগ - আওয়ামীলীগ 
২০১৮ - রেজোয়ানুল হক শোভন - বহিষ্কৃত


৪ জানু, ২০২২

খিলাফত পর্ব-১৩ : উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ব্যাপারে উমার রা.-এর নীতি


অন্য ব্যাপারগুলোর মতো উমার রা. এই কাজেও মুহাম্মদ সা.-এর নীতি অনুসরণ করেছেন। সবচেয়ে যোগ্য, দক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কাজের উপযোগী লোককেই দায়িত্ব দিতেন। প্রশাসকসহ সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগের কাজকে তিনি আমানত হিসেবে নিয়েছেন। যোগ্য লোককে প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করতে না পারাকে তিনি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও খিয়ানত হিসেবে ভাবতেন। 

পরামর্শের ভিত্তিতে নিয়োগ :
উমার রা. যত কর্ককর্তা নতুন করে নিয়োগ করেছেন প্রত্যেকের ব্যাপারে শুরার সদস্যদের সাথে পরামর্শ করে নিয়েছেন। কুফার শাসক নিয়ে বিপদে পড়েছিলেন উমার রা.। সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. ও পরে তাকে সরিয়ে আম্মার ইবনে ইয়সারকে নিযুক্ত করেন। দুজনেই ছিলেন প্রসিদ্ধ, জ্ঞানী, খোদাভীরু ও বিনয়ী। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ করেছিল কুফাবাসী। তাই তাদেরকে সরাতে বাধ্য হন উমার রা.। 

এই নিয়ে পরামর্শ করছিলেন উমার রা.। পরামর্শ সভায় তিনি বলেন, একজন কোমলচিত্ত ধার্মিক ব্যক্তি ও একজন দৃঢ়চিত্তের কিছুটা কম ধার্মিক ব্যক্তি সম্পর্কে আপনাদের মন্তব্য কী? মুগিরা বিন শুবা রা. উত্তরে বলেন, হে আমিরুল মু'মিনিন, কোমলচিত্ত ও বিনয়ী ব্যক্তির কাজ কেবল তার নিজের কল্যাণ বয়ে আনে। কিন্তু তার দুর্বলতা আপনার ও মুসলিম জাতির ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার দৃঢ় চরিত্রের ব্যক্তির কম ধার্মিকতার কারণে কেবল সে নিজে কম লাভবান হয়, কিন্তু তার দৃঢ়তা আপনার ও মুসলিম জাতির কল্যাণ বয়ে আনে। 

উমার রা. বললেন, আপনি সঠিক কথা বলেছেন। অবশেষে সবার পরামর্শে মুগিরা বিন শু'বা রা.-কেই কুফার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। দায়িত্ব নিয়ে যাওয়ার সময় উমার রা. মুগিরা রা.-কে বলেন, এমন একজন ব্যক্তি হওয়ার চেষ্টা করবেন যাতে সৎকর্মশীলরা বিশ্বাস করে, অসৎ লোকেরা ভয় পায়।    

নিয়োগপূর্ব যাচাই :
উমার রা. যাদের নিয়োগ করতেন তাদের সামগ্রিক জীবন যাচাই করতেন। তিনি যাদের ভালোভাবে চিনতেন তাদের কথা ভিন্ন। বাকীদের ক্ষেত্রে তিনি সম্ভাব্য প্রশাসককে মদিনার নিজের সাথে রাখতেন। যাতে ঐ ব্যক্তিকে ভালোমতো যাচাই করা যায়। আহনাফ ইবনে কাইসকে প্রায় একবছর তিনি এভাবে যাচাই করেন। 

নিজ সম্প্রদায় থেকে প্রশাসক : 
উমার রা. চাইতেন যে সমাজের প্রশাসক নিয়োগ করা হচ্ছে সেই সমাজ বা সম্প্রদায় থেকেই নিয়োগ করতে। যাতে প্রশাসক ও জনগণের মধ্যে দুরত্ব কম হয়। রাসূল সা. একইভাবে প্রসাশক নিয়োগ করতেন। যদি সেখানে যথাযথ লোক না পাওয়া যেত তখনই ভিন্ন কাউকে চিন্তা করা হতো। 

জ্ঞান, যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততা : 
উমার রা. জ্ঞান, যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততাকে খুবই গুরুত্ব দিতেন প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে। যাদের মধ্যে তিনি এগুলোর সমন্বয় দেখতেন তাদের তিনি নিয়োগ দিতেন। এজন্য তিনি দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অসৎকর্মশীলের যোগ্যতা ও সৎকর্মশীলের অযোগ্যতা থেকে আশ্রয় চাই। একবার উত্তর ফিলিস্তিনের কমান্ডার শুরাহবিলের ইবনে হাসানাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। 

শুরাহবিল রা. তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি আমার কোনো কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়েছেন। উত্তরে উমার রা. বললেন, না। আমি আপনার ব্যপারে ভালো ধারণা পোষণ করি। কিন্তু আমি আরো যোগ্যতাসম্পন কাউকে সেখানে নিয়োগ করতে চাই। 

অধীনস্তদের প্রতি কোমল : 
উমার রা. চাইতেন প্রশাসকরা তাদের অধীনস্তদের ব্যপারে দয়ালু ও কোমল হৃদয়ের হতে হবে। তিনি সব প্রশাসক ও সেনা কমান্ডারদের উপদেশ দিতেন যাতে বিপদসংকুল পথে অভিযান না চালায়। সেনাদের যাতে বিশ্রাম দেয়। সেনাদের যাতে গুরুতর বিপদের মুখোমুখি না করে। একবার এক লোক উমার রা.-এর সাক্ষাতে এসে দেখতে পান তিনি এক শিশুকে কোলে নিয়ে আদর করছেন। এটা দেখে ঐ ব্যক্তি বললো, আপনি এমনটা করেন! আমি কখনোই আমার কোনো সন্তানকে চুমু খাইনি। 

একথা শুনে উমার রা. বললেন, আল্লাহর শপথ! তাহলে তুমি মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে কম দয়ালু। সাক্ষাতের আগে উমার রা. এই ব্যক্তিকে সেনা কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করতে চেয়েছেন। কিন্তু তার কথা শুনে বললেন, তোমাকে আমি কখনোই কোনো কাজে নিযুক্ত করবো না। 

ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর পারস্যের নগরীগুলো একের পর এক দখলে নিচ্ছিল মুসলিম বাহিনী। এমন সময়ে একজন কমান্ডার একটি নদীর মুখোমখি হন। পার হওয়ার জন্য কোনো সেতু ছিল না। শীতের দিন। সেনা কমান্ডার এক সৈন্যকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে সে মধ্যে পানিতে নেমে পানি পরিমাপ করে এবং কম গভীরতার স্থান ফাইন্ড আউট করে। সৈন্যটি পানিতে নামতে ভয় পাচ্ছিল এবং কমান্ডারকে বলছিল, আমি ভয় পানি খুবই ঠান্ডা। আমি পানিতে নামলে মারা যাবো। 

কমান্ডার তার আবেদন গ্রাহ্য করেনি। তাকে পানিতে নামতে বাধ্য করেছিল। সত্যিই সৈন্যটি ঠান্ডায় মারা যায়। এই ঘটনা উমার রা.-এর পৌঁছলে তিনি সাথে সাথেই তাকে বরখাস্ত করেন। সৈন্যদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে নইলে তিনি এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেন বলেও জানিয়েছেন। উমার রা. প্রশাসকদের বলতেন, জেনে রাখো একজন নেতার ক্ষামশীলতা ও দয়াশীলতার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কিছু নেই। আর একজন নেতার মূর্খতা ও বোকামির চেয়ে আল্লাহর নিকট ঘৃণ্য আর কিছু নেই। 

স্বজনপ্রীতি না করা : 
উমার রা. স্বজনপ্রীতি করা তো দূরে থাক, নিজ আত্মীয়দের কেউ যোগ্য হলেও তাকে দায়িত্ব দেননি। কুফার প্রশাসকের ব্যাপারে তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা.-এর নাম অনেকেই প্রস্তাব করেছিলো। উমার রা. দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এছাড়া তাঁর চাচতো ভাই সাঈদ ইবনে জাইদ রা.-কে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে অনেকে পরামর্শ দিলেও তিনি তা আমলে নেন নি। 

পদপ্রার্থী ব্যক্তিকে দায়িত্ব না দেওয়া : 
আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি দায়িত্ব চেয়ে নেয় সে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য। উমার রা. তাঁর শাসনামলে এই নীতি ফলো করেছিলেন। কেউ তাঁর কাছে কোনো দায়িত্ব চাইলে তিনি তাকে দায়িত্ব দিতেন না। প্রশাসক বা সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের ক্ষেত্রে এই নীতি আরো স্ট্রিকলি ফলো করতেন। 

প্রশাসক, প্রতিনিধি ও সেনা কমান্ডারদের জন্য ব্যবসা নিষিদ্ধ : 
যারা সরকারি উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেতন নির্ধারণ করেছিলেন উমার রা.। আর একইসাথে তাদের ব্যবসা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন যাতে তারা সর্বক্ষণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ব্যাপারে সজাগ থাকতে পারে। তাছাড়া ব্যবসায় বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত হলে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ও দায়িত্ববোধ কমে যেতে পারে। 

সম্পদের হিসাব রাখা : 
প্রশাসকসহ উচ্চপদস্থ সকল কর্মকর্তার সমুদয় সম্পত্তির হিসাব লিখে রাখার ব্যবস্থা করেছেন উমার রা.। কারো কাছে সম্পদের আধিক্য দেখা দিলে তিনি সম্পদের তদন্ত করতেন। অতিরিক্ত সম্পদের হিসাব চাইতেন। সঠিক হিসাব দিতে না পারলে দুর্নীতির অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন। তাদের জন্য ব্যবসা করাও দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচিত হতো। 

রাষ্ট্রীয় কাজে অমুসলিমদের সহায়তা না নেওয়া : 
উমার রা. কঠোরভাবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ও সেনাবাহিনীতে অমুসলিম নিয়োগ নিষিদ্ধ করেছিলেন। রাসূল সা.-ও এই ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। উহুদের যুদ্ধে অনেকে ইহুদিদের সাহায্য নিতে চাইলে রাসূল সা. নিষেধ করেন। আবু মুসা আশয়ারি রা. তাঁর কাতিব (অফিস সহকারী) হিসেবে এক খ্রিস্টানকে নিয়োগ করেছিলেন। এর জন্য উমার রা. তাঁকে তিরস্কার করেন এবং ঐ কাতিবকে অবিলম্বে বিদায় দিতে বলেন।  

৩০ ডিসেম্বর, ২০২১

মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা ও ঢাকার ভাগ্য


আজ ৩০ ডিসেম্বর। উপমহাদেশের মুসলিমদের রাজনীতির জন্য আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯০৬ সালের এই দিনে ঢাকায় উপমহাদেশের মুসলিমরা ফুলস্কেলে রাজনীতি শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় এদেশের মুসলিমরা খ্রিস্টান ও মুশরিকদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে।
 
আজ মুসলিম লীগের ১১৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে মুশরিকদের চরম মুসলিম বিদ্বেষের প্রেক্ষিতে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর বাসভবন 'আহসান মঞ্জিলে' সারা ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দ (প্রায় তিন হাজার) একত্রিত হন। তিন দিনের সম্মেলনের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন সুলতান মাহমুদ শাহ (আগা খান ৩)।
 
বঙ্গভঙ্গের ফলে কলকাতাকেন্দ্রিক বর্ণহ্দিু সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমানদের যে দ্বন্দ্ব, তার পটভূমিতে গঠিত হয় মুসলিম লীগ, বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে বর্ণহিন্দুদের সাথে যে মানসিক বিচ্ছেদ তা কোন আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদারের ভাষায়, “যদিও তারা একই দেশের মানুষ ছিল, তবুও এক ভাষা ছাড়া অন্য সব ব্যাপারে তারা বিভিন্ন ছিল। ধর্মে, শিক্ষায়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে আটশ’ বছর ধরে তারা বাস করেছে যেন দু’টি ভিন্ন পৃথিবীতে”। 

মুসলিম শাসনের শুরু থেকে কয়েক শতাব্দী বাংলাদেশের মুসলমান ও হিন্দুগণ, অভিন্ন ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক আবহাওয়ায় নিজেদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনাচরণ পদ্ধতি নিয়ে ধর্মীয় জীবনের স্বাতন্ত্র্য-চেতনা সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের লক্ষ্য অর্জনে আপাতদৃষ্টিতে বড় রকমের কোন দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করেনি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনকালে হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মীয় পার্থক্য তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে বিস্তার লাভ করে। ব্রিটিশ শাসনকে হিন্দুরা নিছক শাসক-বদলের ঘটনারূপে গ্রহণ করে। ইংরেজদের আস্থা ও অনুগ্রহ লাভের জন্য তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। রাতারাতি তাদের একটি শ্রেণী বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়। অন্যদিকে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র। তারা এই শাসনের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে ‘রানীর বিদ্রোহী প্রজা’ রূপে অভিহিত হয়। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মুসলমানরা দরিদ্র হয়ে পড়ে। হিন্দুরা ইংরেজদের সমর্থনে পুষ্ট হয়ে তাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পরিচালনা করে। মুসলমানদের সংগ্রামে হিন্দুদের কোন সহানুভূতি ছিল না।

বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষপটে হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দুদের মাঝে সাম্প্রয়াদিক স্বাতন্ত্র্যবোধ তীব্র হয়। মুসলমানদের শক্ররূপে চিহ্নিত করে তাদের ওপর তারা নানামুখী হামলা পরিচালনা করে। গত শতাব্দির শুরুতে প্রশাসনিক কারণে বঙ্গভঙ্গ হওয়ার ফলে বাংলাদেশের মুসলমানদের অবস্থার উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তার বিরুদ্ধে হিন্দুদের মারমুখী সংগ্রাম হিন্দু-মুসলিত জাতি-স্বাতন্ত্র্যের দিকটিকে আরো প্রকটভাবে উপস্থিত করে।

মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন নিয়ে নবাব সলিমুল্লাহ একটি পরিকল্পনা নিয়ে সিমলায় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার মধ্যে আলোচনা করেন। তাঁরা ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য শিক্ষা সম্মেলনে কনফেডারেসী বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপর বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু জমিদার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রবল আন্দোলনের পটভূমিতে ঢাকায় ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন শেষে সর্বভারতীয় মুসলিম প্রতিনিধিদের এক বিশেষ সভায় নওয়াব সলীমুল্লাহর প্রস্তাবক্রমে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’ গঠিত হয়। ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর রবিবার ঢাকার শাহবাগে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বহু প্রতিনিধির এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করা হয় এবং বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের নিন্দা করে প্রস্তাব গৃহীত হয়। এভাবেই ভারতীয় মুসলমানগণ একটি নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করেন। এ রাজনৈতির ভিত্তি হলো জাতিস্বাতন্ত্রভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদ।

সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের উদ্দেশ্যাবলি ছিল মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা, ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানদের আনুগত্য রেখে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করা, ভারতীয় অন্যান্য সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তোলা। একটি মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য নওয়াব সলিমুল্লাহর পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য হিন্দুদের শক্তিশালী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এটাই ছিল মূল এবং প্রধান কারণ। 

ভারতীয় জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রসমূহ একটি দুর্বল সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগকে আখ্যায়িত করে। এসব সংবাদপত্র দ্রুত মুসলিম লীগের বিলুপ্তি ঘটবে বলে প্রচার চালায়। এটা সত্য যে প্রথম দিকে একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে লীগের গতিশীলতার অভাব ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় থেকে আসা এবং বৈপ্লবিক চিন্তাধারার তরুণ প্রজন্মের মুসলমানগণ মুসলিম লীগের রাজনীতিতে এগিয়ে আসেন। তারা ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের বিরোধিতা তো করেনই, অধিকন্তু ভারতে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত সরকার প্রতিষ্ঠারও দাবি করতে থাকেন।

১৯১০-এর দশকে মুসলিম লীগ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আদলে একটি নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ গ্রহণ করে। লক্ষ্ণৌ চুক্তি (১৯১৬) এবং খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের উন্নতি ঘটলে মুসলিম লীগ জড় ও স্থবির অবস্থায় পড়ে। ১৯২০-এর পর থেকে কয়েক বছর খেলাফত সংগঠনই মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থরক্ষার সকল কাজ পরিচালনা করে।

১৯৩৫ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নেতৃত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত সংগঠনটি রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি সফলতা পায়নি। অনেক মুসলমান নেতার অনুরোধের প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ লন্ডন হতে ভারতে ফিরে আসেন এবং মুসলিম লীগের সভাপতির পদ গ্রহণ করেন। ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে জিন্নাহ মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখাসমূহ পুনর্গঠিত করে নতুন কাঠামো প্রদান করেন। নতুন কমিটিসমূহকে জনসংযোগ এবং আসন্ন নির্বাচনী রাজনীতির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।


মুসলিম লীগের ১ম সাফল্য ছিল আলাদা মুসলিম আসনের দাবি আদায় করা। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগ বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু মোটের ওপর ভালো সাফল্য পায়নি। মোট নয়টি প্রদেশে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ৪৮২টি আসনের মধ্যে লীগ ১০৪টি আসন লাভ করে। মোট প্রাপ্ত আসনের এক তৃতীয়াংশেরও অধিক (৩৬টি) শুধু বাংলাতেই অর্জিত হয়েছিল। মুসলিম লীগ আইন সভায় কংগ্রেসের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ধারণা করা হয় যে, বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয় ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমান পেশাদার ও মুসলমান ভূমি মালিক সম্প্রদায়ের যৌথ সমর্থনের ফল। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো তা হলো আলেম শ্রেণি বিশেষত দেওবন্দি ধারার আলেমরা মুসলিম লীগের কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকাতেই আগ্রহী ছিল।

১৯৩৭ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ.কে. ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং এর ফলে তার মন্ত্রিসভা কার্যত মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভায় পরিণত হয়। শেরে বাংলা ফজলুল হকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে বাংলাকে মুসলিম লীগের দুর্গে পরিণত করা হয়। বাংলার মুসলমানদের নেতা হিসেবে ফজলুল হক মুসলিম লীগের মঞ্চ থেকে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন আবাসভুমি দাবি করে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। 

গর্ভনর জন হার্বাট-এর পরামর্শে ফজলুল হক পদত্যাগ করলে খাজা নাজিমউদ্দীন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬-এর মধ্যে মুসলিম লীগ একটি যথার্থ জাতীয় সংগঠনে পরিণত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম এর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলার মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে দল ১১০টি আসন অর্জন করে। ফলে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, মুসলিম লীগই বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের একক সংগঠন। 

তখন পর্যন্ত কংগ্রেস প্রভাবাধীন একমাত্র উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ছাড়া ভারতের অন্যান্য মুসলমানপ্রধান প্রদেশসমূহে লীগের সাফল্য সমভাবে উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের সাফল্যের নায়ক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ভারতীয় মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। ব্রিটিশ কর্তৃক ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ক সকল আলোচনা ও চুক্তিতে মুসলমান সম্প্রদায় সম্পর্কিত সকল বিষয়ে জিন্নাহর মতামত গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। লাহোর প্রস্তাবের ছয় বছর পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইন সভায় মুসলমান সদস্যদের দিল্লি কনভেনশনে ‘একটি মুসলমান’ রাষ্ট্রের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা অর্জিত হলে মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলমানদের প্রায় সকলের সংগঠনে পরিণত হয়।  

দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, যে ঢাকা থেকে মুসলিমদের রাজনীতির সূচনা সেই ঢাকা রাজনৈতিকভাবে মুশরিকদের কাছে হেরে গেছে। তবে আমরা আত্মবিশ্বাসী! হেরে যাওয়া শহর থেকেই গাজওয়ায়ে হিন্দের স্বপ্ন দেখি। কল্পনাবিলাস ভাবতে পারেন আপনারা কেউ কেউ। তবে জেনে রাখুন আমার নেতারা এজন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আমিও জীবন দিতে প্রস্তুত! এবং প্রস্তুত আমার মতো অনেকে। ইনশাআল্লাহ!