১৭ জুন, ২০২২

শহীদ মুরসি : মিশরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট


আজ ১৭ জুন। শহীদ প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসির ৩য় শাহদাতবার্ষিকী। মুহাম্মদ মুরসি ছিলেন মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। সামরিক বাহিনী তাকে উৎখাতের আগে মাত্র এক বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা । 'আরব বসন্ত' নামে খ্যাত সরকার বিরোধী বিক্ষোভের পর ২০১২ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল তার মাধ্যমে মুহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ইতিহাসে এই প্রথম মিশর নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পায়।

২০১৩ সালের ৩রা জুলাই তাকে মিসরের সেনাবাহিনী উৎখাত করে। এটা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ ও আমেরিকার যৌথ এজেন্ডা। প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার চার মাস পরে, মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনের আরো ১৪জন ঊর্ধ্বতন নেতার সঙ্গে মোহাম্মদ মোরসির বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একজন সাংবাদিক ও দুইজন সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীকে হত্যায় প্ররোচনা দেবার অভিযোগ আনা হয় মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

শুনানির প্রথম দিনে মুহাম্মদ মুরসি কাঠগড়া থেকে চিৎকার করে বলেছিলেন, তিনি সেনা অভ্যুত্থানের শিকার এবং তার বিচার করার বৈধতা এ আদালতের নেই। সেনাপ্রধান আব্দুল ফাত্তাহ সিসি পরে হত্যার অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়, কিন্তু বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার ও দমনের অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। পরবর্তীতে মুরসির বিরুদ্ধে আরো অনেক অভিযোগ আনা হয়, এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। যদিও পরে সে রায় বাতিল করা হয়েছিল। ২০১৯ সালের ১৭ই জুন বিনাচিকিৎসায় মৃত্যুর সময় গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তার বিচার চলছিল।

শহীদ মুহাম্মদ মুরসি ১৯৫১ সালে মিশরের শারকিয়া প্রদেশের আল-আদওয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭০ এর দশকে তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন, এরপর পিএইচডি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। মিশরে ফিরে এসে তিনি জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড আন্দোলনে যোগ দেন তিনি এবং ক্রমে নেতৃত্বে আসেন। ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ পর্যন্ত এই দলের হয়ে মিশরের সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন।

সংসদ সদস্য হিসেবে ভালো বক্তা বলে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন অনেকবার, বিশেষ করে ২০০২ সালে এক রেল দুর্ঘটনার পর কর্মকর্তাদের নিন্দা করে তার দেয়া বক্তব্য খুবই আলোচিত হয়েছিল। ২০১২ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের ডেপুটি জেনারেল গাইড, মিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী খাইরাত আল-সাতেরকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়। এরপর মুসলিম ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকে মুরসিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। 

প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে জিতে ২০১২ সালের জুনে মিশরের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন মুহাম্মদ মুরসি। প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে জেতার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরাচারী সরকাররা প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে উৎখাত করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। কারণ তারা তাদের শাসনক্ষমতা নিয়ে চিন্তিত ছিল। তাদের প্ররোচনায় মুরসির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ তৈরি হয়। 

২০১২ সালের নভেম্বর থেকে জনরোষের প্রকাশ ঘটতে থাকে। এর সাথে জুড়ে যায় হোসনি মুবারকের সমর্থকরা ও ইসলামী রাজনীতির বিরোধী শক্তিরা। মুহাম্মদ মুরসি কুরআনের আলোকে সংবিধানের ঘোষণা দেওয়ায় সেক্যুলাররা তীব্র আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনকে পুঁজি করে জেনারেল আল সিসি ক্যু করে ক্ষমতা দখল করে। আন্তর্জাতিকভাবে সৌদি ও আমেরিকা মদদ দেয় জেনারেল সিসিকে।  

সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং নতুন স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট আব্দুল ফাত্তাহ আল সিসি মুরসিকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেন। তাকে গ্রেপ্তার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহ তার কোন খোঁজ ছিল না। এরপর মুহাম্মদ মুরসি মুক্তি এবং তাকে অবিলম্বে ক্ষমতায় পুনরায় অধিষ্ঠিত করার দাবিতে কায়রোর রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার সমর্থক। এর রিরুদ্ধে স্বৈরাচার সিসি হাজার হাজার মানুষকে খুন করে। মিশরে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রায় সব শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী।

স্বৈরাচার খুনী ও সন্ত্রাসী আল সিসি মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে তাদের ওপর চালানো হয় ব্যাপক নিপীড়ন, এবং ফল হিসেবে হাজার হাজার ব্রাদারহুড কর্মী গ্রেফতার বা নিহত হন। অনেকে কাতার এবং তুরস্কে পালিয়ে যান। এরপর মুহাম্মদ মুরসিকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে যাওয়া হয়। মাঝেমধ্যে মামলার হাজিরা দিতে তাকে আদালতে আনা হলেই কেবল তাকে দেখা যেত। এরপর কারাগারে নির্যাতনে তিনি অসুস্থ হলে বিনা চিকিৎসায় তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।  

২০১৯ সালের ১৭ জুন তিনি কারাগারে শাহাদাতবরণ করেন। 

৭ জুন, ২০২২

জামায়াত কী ধরণের কাজ করে?

জামায়াতের কার্যক্রম নিয়ে অনেকের জানার বিষয় থাকে। অনেকে মনে করেন জামায়াত মানেই হলো কিছু রাজনৈতিক মিটিং মিছিল। কিন্তু আসলে তা নয়। জামায়াত কী কাজ করে তা জানার জন্য প্রথমেই আমাদের জানতে হবে জামায়াতের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কী?

লক্ষ্য উদ্দেশ্য জানা থাকলে তাদের কার্যক্রমের আইডিয়া সহজেই পাওয়া যায়। জামায়াতে ইসলাম তাদের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে বলেছে, বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানব জাতির কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল সা. প্রদর্শিত দ্বীন কায়েমের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন সাফল্য অর্জন করাই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। জামায়াত মনে করে ইসলামী জীবন বিধান কায়েম করাই ইকামাতে দ্বীনের বেসিক অর্থ। তাই তারা এই কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করতে চায়। দ্বীন কায়েম বলতে শুধু নামাজ রোজা যাকাত দেওয়া ইত্যাদি ইবাদত বুঝায় না। বরং পুরো জীবন পদ্ধতি পরিচালনাকেই বুঝায়। মুমিন ব্যক্তি শুধু মসজিদে অথবা ব্যক্তিগতভাবে ইসলামী অনুশাসন মানবে না। বরং সর্বস্তরে ও সবস্থানে আল্লাহর দেওয়া বিধান প্রতিষ্ঠাই দ্বীন কায়েম। এজন্য জামায়াত চারটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ১. দাওয়াতের মাধ্যমে চিন্তার পরিশুদ্ধি ও পুনর্গঠনের কাজ : জামায়াত কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক শিক্ষাকে বলিষ্ঠ যুক্তির সাহায্যে তুলে ধরে জনগণের চিন্তার বিকাশ সাধন করছে। তাদের মধ্যে ইসলামকে অনুসরণ ও কায়েম করার উৎসাহ ও মনোভাব জাগ্রত করছে। ২. সংগঠন ও প্রশিক্ষণের কাজ : ইসলাম কায়েমের সংগ্রামে আগ্রহী ব্যক্তিদেরকে সুসংগঠিত করে উপযুক্ত জ্ঞানগত ও আচরণগত প্রশিক্ষণ দিয়ে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার যোগ্য করে গড়ে তুলছে। ৩. সমাজ সংস্কার ও সেবার কাজ : ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজের সংশোধন, নৈতিক পুনর্গঠন ও সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে জামায়াত সমাজের উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধন করছে। ৪. সরকার সংশোধনের কাজ : জামায়াত শাসন ব্যবস্থার সকল স্তরে অযোগ্য ও অসৎ নেতৃত্বের বদলে আল্লাহভীরু, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব কায়েমের জন্য আল্লাহর রাসূল ও সাহাবাদের প্রদর্শিত পন্থায় চেষ্টা চালাচ্ছে। এই চারটি কর্মসূচি জামায়াত কোনোটাই নিজ থেকে আবিষ্কার করেনি। বরং এগুলো গ্রহণ করেছে রাসূল সা.-এর সীরাত থেকে। রাসূল সা. প্রথমে মক্কার মানুষদের দাওয়াত দিয়েছেন। তারপর যারা তাঁর কথা মেনে নিয়েছেন তাদেরকে তার নেতৃত্বের অধীনে সঙ্ঘবদ্ধ করেছেন। এরপর দারুল আরকামে তাদের জ্ঞানগত ও আচরণগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। সবশেষ শক্তি কিছুটা অর্জন হওয়ার পর সমাজ থেকে অসৎ নেতৃত্ব দূর করার চেষ্টা করেছেন। অবশেষে মক্কায় প্রাথমিকভাবে সফল না হয়ে মদিনায় জনগণের সাপোর্ট নিয়ে সৎ নেতৃত্বের কাঙ্খিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে জামায়াতের তিনটি স্থায়ী কর্মনীতি রয়েছে। কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে অবশ্যই এই নীতি অনুসরণ করা হবে। ১। যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আল্লাহর বিধান ও রাসূলের নির্দেশিত বিধান অনুসারে করবে। ২। উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য জামায়াত এমন কোনো পন্থা অবলম্বন করবে না, যা সততার পরিপন্থী ও ফিতনা তৈরি করবে। ৩। জামায়াত তার কাঙ্খিত বিপ্লব করার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করবে। ইসলামী সমাজের উপযোগী বলিষ্ঠ ঈমান ও চরিত্র সৃষ্টির জন্য ইসলামী আন্দোলনই একমাত্র উপায়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমেই উপযুক্ত লোক তৈরি হয়। তাই জামায়াত এ পন্থায় লোক তৈরি করছে। ত্যাগী ও নিঃস্বার্থ কর্মী এভাবেই তৈরি হয়ে থাকে। হুজুগ, সন্ত্রাস ও বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে খারেজিদের মতো করে জাতিগঠনমূলক ও সমাজ পরিবর্তনের কাজ হতে পারে না। তাই জামায়াত নিয়মতান্ত্রিক ও জনগণের রায় নিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়। ইসলামী আদর্শ জোর করে জনগণের উপর চাপাবার বিষয় নয়। জনসমর্থন নিয়েই ইসলামের সত্যিকার বিজয় সম্ভব। জামায়াত মানুষকে দাওয়াত দিয়ে, সংগঠিত করে, প্রশিক্ষণ দিয়ে ও তাদের মন জয় করে সমাজে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছে। আশা করি আপনারা জামায়াতের এসব কর্মসূচি ও কর্মনীতির সাথে একমত হবেন। এটাই ইসলাম কায়েমের নববী পদ্ধতি। জামায়াত নববী পদ্ধতির বাইরে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করে না। যারা এখনো জামায়াতে ইসলামীর সাথে যুক্ত হননি তাদের যুক্ত হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আসুন আমরা হাতে হাত রেখে দ্বীন কায়েমের দায়িত্ব পালন করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন, আমাদের সঠিক পথ অনুসরণের তাওফিক দান করুন।
#গণসংযোগ_পক্ষ

জামায়াত মুসলিমদের কেন দাওয়াত দেয়?

এদেশে তো প্রায় সবাই মুসলিম। তো মুসলিমদেরকে আবার কীসের দাওয়াত দেয় জামায়াত? জামায়াতে ইসলামের প্রতি এটি একটি কমন প্রশ্ন। এই ব্যাপারে আমাদের কথা হলো আমরা বেসিক্যালি তিনটি বিষয়ে দাওয়াত দেই। আমাদের দাওয়াতকে সহজ ও সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাইলে নিম্নলিখিত তিনটি পয়েন্টে বলা যায়। ১. আমরা সাধারণত সকল মানুষকে এবং বিশেষভাবে মুসলমানদেরকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করার আহবান জানাই। ২. ইসলাম গ্রহণ করার কিংবা ইসলাম মেনে নেওয়ার কথা যারাই দাবী করেন, তাদের সকলের প্রতি আমাদের আহবান এই যে, আপনারা আপনাদের বাস্তব জীবন হতে মুনাফিকী ও কর্ম-বৈষম্য দূর করুন এবং মুসলমান হওয়ার দাবী করলে খাঁটি মুসলমান হতে ও ইসলামের পূর্ণ আদর্শবান হতে প্রস্তুত হোন। ৩. মানব-জীবনের যে ব্যবস্হা আজ বাতিলপন্থী ও ফাসিক কাফিরদের নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন করতে হবে এবং নেতৃত্ব আদর্শ ও বাস্তব উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর নেক বান্দাহদের হাতে সোপর্দ করতে হবে। খেয়াল করুন প্রিয় ভাই, আমরা মুসলিম অথচ আমাদের দেশ ইসলামী বিধান অনুসারে পরিচালিত হয় না। আমরা মুসলিম দাবি করি অথচ আমাদের চরিত্র দেখে সেটা বুঝা যায় না। এটাই আমাদের আন্দোলনের বেসিক কারণ। আমরা প্রথমত একজন মানুষকে আল্লাহর পূর্ণ অনুগত হতে আহবান জানাই। এই আনুগত্যের মানে হলো নামজের মধ্যে আমরা যেভাবে আল্লাহকে পূর্ণভাবে মানি সেভাবে সবসময় আল্লাহর অনুগত থাকা। আল্লাহর বিধানকে পুরোপুরি অনুসরণ করা। সকল নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা। সকল ফরজ কাজ অবশ্যই করা। এতটুকু মেনে নেয়ার পর আমাদের দ্বিতীয় আহবান হলো মুনাফিকি তথা কর্মীয় বৈসাদৃশ্য দূর করুন। আপনি যা মানেন তার বিপরীত কিছু দেখলে আপনার শরীরে গা-জ্বালা করাটাই স্বাভাবিক। যদি গা-জ্বালা না করে তাহলে বুঝা যায় আপনার আপনার মেনে নেওয়াটা সঠিকভাবে হয় নি। পর্দা করা ফরজ, বেপর্দা পরিবেশ দেখলে আপনার ঘৃণা হওয়া উচিত, তেমনি সুদ, ঘুষ, মজুতদারি, জুলুম ইত্যাদিতে আপনার ঘৃণা হওয়া উচিত। যদি ঘৃণা না হয়ে ঐসব কাজে আপনি জড়িত থাকেন তবে এটাই কর্মীয় বৈসাদৃশ্য। আবার আল্লাহ তায়ালা বিধান দিয়েছেন এবং দায়িত্ব দিয়েছেন সেই বিধান অনুসারে সমাজ/ রাষ্ট / পরিবার পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু আপনি এমন একটি সমাজে বাস করেন এখানে ৯০% মুসলিম হলেও সেই সমাজে ইসলাম অনুসারে পরিচালিত হয় না। আপনি আল্লাহকে মানেন, নামাজ-রোজা করেন অথচ সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা না দেখেও যদি আপনার অন্তর না পুড়ে তবে এটা মুনাফিকি। আমরা এই মুনাফিকি আচরণ থেকে সরে আসার জন্য আহবান জানাই। আমরা আপনাকে সেভাবে বলতে চাই, আল্লাহ তায়ালা যেভাবে বলেছেন, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। এই সমাজের মুসলিমদের প্রতি আমাদের সর্বশেষ আহবান হলো দ্বীন প্রতিষ্ঠার আহবান। এই সমাজের নেতৃত্ব আমরা এমন লোকদের হাতে তুলে দিতে চাই যারা এই সমাজকে আল্লাহর বিধান অনুসারে পরিচালিত করবে। এজন্য তাকওয়াবান লোকদের আমরা নির্বাচিত করবো আমাদের নেতা হিসেবে। মুসলিমদের নেতা হবে মুসলিমদের পছন্দ অনুসারে। কেউ জোর করে মুসলিমদের নেতা হলে তার পরিণতি ভালো নয়। আমরা এই সমাজের মুসলিমদের তাদের নেতা বাছাইয়ের সুযোগ করে দিতে চাই। জোর করে মুসলিমদের নেতা হওয়া জালিমদের ব্যাপারে মুহাম্মদ সা. বলেন, আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কোন কওমের লোকদের অনুমোদন ছাড়াই তাদের নেতা হয় তার উপর আল্লাহ, সকল ফেরেশতা ও মানবকুলের অভিশাপ। তার কোন ফরয বা নাফ্‌ল ‘ইবাদাত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। [আবু দাউদ ২০৩৪] ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তিন ব্যক্তির সালাত তাদের মাথার এক বিঘত উপরেও উঠে না : যে ব্যক্তি জনগণের অপছন্দ হওয়া সত্ত্বেও তাদের নেতৃত্ব দেয়, যে নারী তাঁর স্বামীর অসন্তুষ্টিসহ রাত যাপন করে এবং পরস্পর সম্পর্ক ছিন্নকারী দু’ ভাই। [ইবনে মাজাহ ৯৭১] আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “তিন ব্যক্তির নামায তাদের কান অতিক্রম করে না; প্রথম হল, পলাতক ক্রীতদাস; যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। দ্বিতীয় হল, এমন মহিলা যার স্বামী তার উপর রাগান্বিত অবস্থায় রাত্রিযাপন করে এবং তৃতীয় হল, সেই জাতির নেতা যাকে ঐ লোকেরা অপছন্দ করে।” (তিরমিযী ৩৬০, সহীহ তারগীব ৪৮৭ নং) এই হচ্ছে আমাদের দাওয়াতের কারণ। আশা করি আপনারা এসব বিষয়ের সাথে একমত হবেন। যারা এখনো জামায়াতে ইসলামীর সাথে যুক্ত হননি তাদের যুক্ত হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। #গণসংযোগ_পক্ষ


জামায়াতের আকিদা কতটুকু খারাপ?

 


আকিদার ক্ষেত্রে জামায়াত নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন আছে নাকি বাজারে। আমরাও কারো কারো থেকে শুনেছি জামায়াতের আকিদা খারাপ। তবে জামায়াত একটা দারুণ কাজ করেছে। তারা তাদের আকিদা পরিপূর্ণভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে। জামায়াতে ইসলাম তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতির মধ্যে লিখেছে তাদের বেসিক আকিদা হলো ১.আল্লাহ্‌ তা’আলাই মানব জাতির একমাত্র রব, বিধানদাতা ও হুকুমকর্তা। ২. কুরআন ও সুন্নাহ্‌ই মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ৩. মহানবী সা.-ই মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য আদর্শ নেতা। ৪. ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনই মুমিন জীবনের লক্ষ্য। ৫. আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি ও আখিরাতের মুক্তিই মুমিন জীবনের কাম্য। জামায়াত তার গঠনতন্ত্র বা সংবিধানে ডিটেইল আকিদা উল্লেখ করেছে। সেখানে তারা বলেছে তাদের আকিদার মূলকথা হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'। কালেমা তাইয়্যেবার বেসিক কথা হলো সকল বিধান দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। তিনিই সকল সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। আর যেহেতু আল্লাহর মনোনীত রাসূল হলেন মুহাম্মদ সা.। সুতরাং তাঁর কথা ও কর্মকে অনুসরণ করতে হবে। জামায়াত বলেছে কালিমা তাইয়্যেবাকে মেনে নেওয়া মানে নিচের বিষয়গুলোও মেনে নেওয়া। ১। আল্লাহ ব্যতীত কাউকে সাহায্যকারী, রক্ষাকর্তা ও পালনকর্তা মনে না করা। ২। আল্লাহ ছাড়া কাউকে কল্যাণের কারণ ও আল্লাহ ছাড়া কাউকে বিপদদাতা মনে না করা। ৩। আল্লাহ ছাড়া কারো নিকট দোয়া, প্রার্থনা ও আশ্রয় খোঁজা যাবে না। ৪। আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা নত করা যাবে না। ৫। আল্লাহ ছাড়া কারো কাউকে সার্বভৌমত্বের মালিক মনে করা যাবে না। জামায়াত বলেছে এর পাশাপাশি নিন্মোক্ত বিষয়গুলোও মেনে নিতে হবে। ১। নিজেকে স্বাধীন ইচ্ছার মানুষ মনে করা যাবে না। সর্বদা আল্লাহর দাস হিসেবে নিজেকে ভাবতে হবে। ২। নিজেকে কোনো কিছুর স্বাধীন মালিক মনে করা যাবে না। যেমন নিজের জীবন, অঙ্গ, দৈহিক শক্তির একান্ত মালিক নিজেকে মনে করা যাবে না। এগুলো আল্লাহর মালিকানাধীন ও তাঁর থেকে আমানত প্রাপ্ত। ৩। সব কিছুর জন্য আল্লাহর নিকট দায়বদ্ধ থাকার চিন্তা করতে হবে। ৪। আল্লাহর পছন্দ-অপছন্দকেই নিজের পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনা করতে হবে। ৫। আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই সকল কর্ম-তৎপরতার লক্ষ্য স্থির করতে হবে। ৬। আল্লাহর দেওয়া বিধানের বিপরীত সবকিছু প্রত্যাখ্যান করতে হবে। জামায়াত বলেছে এই বিষয়গুলোর পাশাপাশি কিছু কর্তব্যও রয়েছে। ১- মুহাম্মদ সা. থেকে প্রামাণ্যসূত্রে প্রাপ্ত সকল বিধান দ্বিধাহীনভাবে গ্রহণ করতে হবে। ২- আল্লাহ ও মুহাম্মদ সা. থেকে প্রাপ্ত আদেশ ও নিষেধকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিতে হবে। ৩- আল্লাহ ও মুহাম্মদ সা. ছাড়া অন্য কারো নিরঙ্কুশ আনুগত্য করা যাবে না। বরং অন্য যে কাউকেই শরিয়ত দিয়ে বিচার করতে হবে। ৪- আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার চাইতে অন্য কাউকে বেশি ভালোবাসা যাবে না। ৫- মুহাম্মদ সা. ছাড়া অন্য কারো আনুগত্যের ব্যাপারে এমন মর্যাদা পোষণ না করা যে, তার আনুগত্য করার সাথে ঈমান ও কুফর ফয়সালা জড়িত। এই হলো জামায়াতে ইসলামের আকিদা। আমি যা বুঝেছি তাদের গঠনতন্ত্র পড়ে তা সংক্ষেপে উল্লেখ করেছি। আমি মনে করি জামায়াতের এই আকিদা আলাদা কোনো আকিদা নয়, বরং সকল মুসলিমেরই এই আকিদা বিশ্বাস পোষণ করা উচিত। যারা এখনো জামায়াতে ইসলামে যোগ দেননি, আমরা তাদের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আসুন আমরা হাতে হাত রেখে দ্বীন কায়েমের দায়িত্ব পালন করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন, আমাদের সঠিক পথ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। যারা জামায়াতের আকিদা পড়তে চান তাদের জন্য কমেন্টে লিংক দেওয়া রয়েছে। #গণসংযোগ_পক্ষ

জামায়াত কি ফিরকা তৈরি করে?

জামায়াতের বয়স তখন মাত্র ৫ বছর। ১৯৪৬ সাল। লাহোরে একটি সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছিলেন মাওলানা মওদূদী রহ.। বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি কিছু অভিযোগের জবাব দেন। এর মধ্যে একটি ছিল, জামায়াতে ইসলাম নতুন ফিরকা তৈরি করছে। এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হচ্ছে। এর উত্তরে মাওলানা বলেন, //বলা হয় যে, আমাদের জামায়াত মুসলমানদের মধ্যে একটি নতুন ফিরকার গোড়া পত্তন করেছে। এ ধরনের কথা যারা প্রচার করে থাকেন, সম্ভবত ফিরকা সৃষ্টির মূল কারণগুলোই তাদের জানা নেই, মুসলমানদের মধ্যে যেসব কারনে ফিরকা বা উপদলের সৃষ্টি হয়, সেগুলোকে মোটামুটি চার, ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমতঃ দ্বীনের সাথে সম্পর্কহীন কোন বস্তুকে আসল দ্বীনের মধ্যে শামিল করে নিয়ে তাকেই কুফর ও ঈমান অথবা হিদায়াত ও গোমরাহীর মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করা। দ্বিতীয়তঃ দ্বীনের কোন বিশেষ মাসয়ালাকে কুরআন ও সুন্নাহর চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তাকেই উপদল সৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা। তৃতীয়তঃ ইজতিহাদী বিষয়াদিতে বাড়াবাড়ি করা এবং ভিন্ন মত পোষনকারীদের ওপর ফাসিক ও কুফরীর অপবাদ চাপিয়ে দেয়া কিংবা অন্তত তাদের সাথে স্বতন্ত্র আচার পদ্ধতি অবলম্বন করা। চতুর্থতঃ নবী করীম (স.) এর পর কোন বিশেষ ব্যক্তি সম্পর্কে অতিরিক্ত ধারণা পোষণ করা এবং তার সম্পর্কে এমন কোন মর্যাদা দাবী করা যা মানা বা না মানার উপর লোকদের ঈমান কিংবা কুফর নির্ভরশীল হতে পারে অথবা কোন বিশেষ দলে যোগদান করলেই সত্যপন্থী হওয়া যাবে এবং তার বাইরে অবস্থানকারী মুসলমানরা হবে বাতিলপন্থী এমন কোন দাবী উত্থাপন করা। এখন আমি জিজ্ঞেস করতে চাই যে, উপরোক্ত চারটি ভুলের কোনটি আমরা করেছি? কোনো ভদ্রলোক যদি দলিল-প্রমাণসহ স্পষ্টভাবে বলে দিতে পারেন যে, আমরা অমুক ভুলটি করেছি তবে তৎক্ষণাৎ আমরা তওবা করবো এবং নিজেদের সংশোধন করে নিতে আমরা মোটেই দ্বিধাবোধ করবো না। কেননা-আমরা আল্লাহর দ্বীন কায়েম করার উদ্দেশ্যেই সংঘবদ্ধ হয়েছি, দলাদলি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়। কিন্তু আমাদের কার্যকলাপ দ্বারা যদি ভুল প্রমাণিত না হয়, তবে আমাদের সম্পর্কে ফিরকা সৃষ্টির আশংকা কীভাবে করা যেতে পারে? আমরা শুধু আসল ইসলাম এবং কোন কাটছাঁট না করে পূর্ণ ইসলামকে নিয়েই দাড়িয়েছি, আর মুসলমানদের কাছে আমাদের আবেদন শুধু এই যে, আসুন আমরা সবাই মিলে একে কার্যত প্রতিষ্ঠিত করে দুনিয়ার সামনে এর সত্যতার সাক্ষ্য দান করি। বস্তুত দ্বীনের কোন একটি বা কয়েকটি বিষয়কে নয় বরং পরিপূর্ণ দীন ইসলামকে আমরা সংগঠন ও সম্মিলনের বুনিয়াদ হিসেবে স্থির করে নিয়েছি।// নতুন একটা কথা পাওয়া যায়, এটা মূলত মাদখালীদের প্রচারণায় তৈরি হয়েছে। তারা ইসলামী আন্দোলন থেকে মানুষকে দূরে রাখার ব্যাপারে সদা তৎপর। আল্লাহ তাদের হিদায়াত দান করুন। নতুন কথাটি হলো, আমরা মুসলিমরা এক জামায়াত। কেউ মুসলিম হলে তাকে আলাদা করে দল করার দরকার নেই। কথাটা ঠিক। তবে এর সাথে বাস্তবতার মিল নেই। কারণ আমরা মুসলিমরা কেউ সংঘবদ্ধ নই। আমাদের কোনো কেন্দ্রীয় নেতা নেই। অতএব নেতা বিহীন এই দলকে জামায়াত হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এজন্যই মুহাম্মদ সা. বলেছেন, মেষের পাল থেকে আলাদা একটি মেষকে যেমন নেকড়ে বাঘ সহজেই ধরে খায়, তেমনি জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন একজন মুসলিম সহজেই শয়তানের খপ্পরে পড়ে যায়। যদি মুসলিম মানেই জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত হতো তাহলে মুহাম্মদ সা.-এর এই কথার দরকার ছিল না। উমার রা. বলেন, لا إسلام الا بجماعة ولا جماعة الا بإمارة ولا إمارة إلا بطاعة জামায়াত ছাড়া ইসলাম হয়না এবং নেতৃত্ব ছাড়া ইসলাম হয় না এবং আনুগত্য ছাড়া নেতৃত্ব হয় না। অতএব নেতৃত্বহীন একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে জামায়াতবদ্ধ রয়েছে বলে যে ধারণা দেওয়া হচ্ছে এটা ভুল। অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি এসব কথা বললেও এগুলো অসার কথা। আমরা আসলে ব্যক্তি বিবেচনায় কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। যদি নেই তাহলে তা ঘুরে ফিরে ফিরকায় পরিণত হবে। ইসলামকে তার বিধান অনুসারেই মানতে হবে। জামায়াতে ইসলাম এমন একটি দল বা জামায়াত যারা মাজহাবগত পার্থক্য, আমলগত মতপার্থক্য ও ইজতেহাদী পার্থক্যকে একেবারেই ইগ্নোর করে। এসব ক্ষেত্রে জামায়াতের কোনো বক্তব্য নেই। জামায়াত কর্মীরা তাদের পছন্দমত মতামতকে অনুসরণ করতে পারে। জামায়াতে ইসলাম মূলত মুসলিমদের সংঘবদ্ধ করে তাদের দায়িত্ব পালনে তাকিদ করে। যারা অভিযোগ দাতা তারা এসব অভিযোগ আগেও করেছে এখনো করছে। এর দ্বারা মুসলিমদের বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা আশা করি তারা ধীরে ধীরে হক উপলব্ধি করতে পারবেন এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে শামিল হবেন। ইনশাআল্লাহ। যারা এখনো জামায়াতে ইসলামে যোগ দেননি, আমরা তাদের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আসুন আমরা হাতে হাত রেখে দ্বীন কায়েমের দায়িত্ব পালন করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন, আমাদের সঠিক পথ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। #গণসংযোগ_পক্ষ


আমরা কেন জামায়াত করি?

 


আল্লাহ্‌ তা’আলা তাঁর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কে মূলত যে কাজটি করার জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন তা কুরআনের তিনটি সূরায় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, “তিনিই সে মহান সত্তা (আল্লাহ) যিনি তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও আনুগত্যের একমাত্র সত্য বিধান (দ্বীনে হক) সহ পাঠিয়েছেন, যেন (রাসূল) তাকে (ঐ বিধানকে) আর সব বিধানের উপর বিজয়ী করেন।” (সূরা আত্‌ তাওবা : ৩৩, সূরা আল ফাত্‌হ : ২৮, সূরা আস সাফ : ৯)

রাসূল (সা.) আল্লাহ্‌র দ্বীনকে কায়েম করেই এ দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, আইন, শাসন, বিচার, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই তিনি আল্লাহ্‌র বিধানকে চালু করে প্রমাণ করেছে যে, ইসলামই দুনিয়ার জীবনে শান্তির একমাত্র উপায়। তাই দ্বীন ইসলাম কায়েমের দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সাহাবায়ে কিরামও রাসূল (সা.)-এর সাথে এ দায়িত্বই পালন করেছেন। মুসলিম হিসেবে আমাদের সবারই এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কর্তব্য। এ দায়িত্ব অবহেলা করে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি হাসিল করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মুসলিদেরকে তাদের এই দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন করে যাচ্ছে। আমাদের সাথে আপনিও এই কাফেলায় সংযুক্ত হোন। মুসলিম হিসেবে দায়িত্ব পালনে আমরা সবাই মিলে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাই। আজ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত গণসংযোগ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। যারা এখনো জামায়াতে যুক্ত হননি আপনাদের জামায়াতে যোগ দেওয়ার আহবান জানাচ্ছি। এটা আমাদেরকে দায়িত্ব পালনে ও জান্নাতে যেতে সহায়তা করবে, ইনশাআল্লাহ।

ইসলাম কায়েমের এ মহান দায়িত্ব একা একা পালন করা যায় না, এটা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যারাই নবীর প্রতি ঈমান এনেছেন তাদেরকেই সংঘবদ্ধ করে নবীগণ ইসলামী আন্দোলন করেছেন। যে সমাজে ইসলাম কায়েম নেই সেখানে ব্যক্তি জীবনেও পুরোপুরি মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করা কঠিন। আর আল্লাহ্‌র দ্বীনকে সমাজ জীবনে কায়েম করার কাজ তো জামায়াতবদ্ধভাবে ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই আমরা যারা দ্বীন কায়েমের দায়িত্ব পালন করতে চাই তারা জামায়াতবদ্ধ জীবন যাপন করি। আর দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কিন্তু নফল দায়িত্ব নয়। এটা অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব। এজন্য আমরা জামায়াতবদ্ধ থাকার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সাথে জড়িত হয়ে জামায়াতবদ্ধ থাকি ও দ্বীন কায়েমের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি। 

নবী করীম সা. বলেছেন, মেষের পাল থেকে আলাদা একটি মেষকে যেমন নেকড়ে বাঘ সহজেই ধরে খায়, তেমনি জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন একজন মুসলিম সহজেই শয়তানের খপ্পরে পড়ে যায়। তাই জামায়াতবদ্ধ জীবনই ঈমানের অনিবার্য দাবী। উমার রা. বলেন, জামায়াত (সঙ্ঘবদ্ধতা) ছাড়া ইসলাম হয় না। অতএব জামায়াতের ইসলামের সাথে আমরা জড়িত হয়েছি সংঘবদ্ধ থেকে ইকামাতে দ্বীনের দায়িত্ব পালনের জন্য।   

আর জামায়াতে ইসলামী প্রচলিত অর্থে শুধুমাত্র ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক দল নয়। ইসলামে ধর্মীয় জীবনের গুরুত্ব আছে বলেই জামায়াত ধর্মীয় দলের দায়িত্ব পালন করে। রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া ইসলামী আইন চালু হতে পারে না বলেই জামায়াত রাজনৈতিক ময়দানে কাজ করে। সমাজ সেবা ও সামাজিক সংশোধনের জোর তাকিদ ইসলাম দিয়েছে বলেই জামায়াত সমাজসেবা ও সমাজ সংস্কারে মনোযোগ দেয়। এ অর্থেই জামায়াতে ইসলামী একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আন্দোলন। 

একজন মুসলিমকে অবশ্যই জীবনের সবক্ষেত্রে ইসলামের আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ২০৮ ও ২০৯ নং আয়াতে বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের অনুসারী হয়ো না, কেননা সে তোমাদের সুস্পষ্ট দুশমন। তোমাদের কাছে যে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হিদায়াত এসে গেছে তা লাভ করার পরও যদি তোমাদের পদস্খলন ঘটে তাহলে ভালোভাবে জেনে রাখো আল্লাহ‌ মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।

ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে না মানাটা গোমরাহী ও পদস্থলন। যারা ইসলামকে পছন্দ অনুযায়ী মানে বা আংশিকভাবে মানে আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতি স্পষ্ট হুমকি দিয়েছেন। আমরা ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে মানার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংযুক্ত হয়েছি। 
মুহাম্মদ সা. বলেছেন, সে ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, অপর ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে। আমরা আমাদের নিজেদের কল্যানের জন্য জামায়াতে ইসলামকে পছন্দ করেছি। তাই আপনাদের জন্যও এই সংগঠনকে সাজেস্ট করছি। 

যারা এখনো জামায়াতে যোগ দেননি তাদেরকে জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংযুক্ত হওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।    
 
#গণসংযোগ_পক্ষ

৩০ মে, ২০২২

জিয়া হত্যাকাণ্ড ছিল ধারাবাহিকতার অংশ


পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসারদের একাংশ ১৯৬৫ সাল থেকে ভারতীয় চক্রান্তের সাথে জড়িত হয় গোপন সংগঠন নিউক্লিয়াসের মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালিদের একটা অংশ জিয়ার আহ্বানে ক্যু করে। সেদিন জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা না দিলে ক্যু হওয়ার মতো কিছু ঘটতো না। তাদের সাথে বাঙালি সৈনিকরা ক্যু করে। সেই যে সেনাবাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়েছে তা জিয়া খুনের মাধ্যমে শেষ হয়েছে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হয় সেনাবাহিনীর একটি ক্যু এর মাধ্যমে। এরা ছিল সেই আগের ক্যু করা জাসদ প্রভাবিত বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার। সেসময় সেনাপ্রধান ছিল কে এম শফিউল্লাহ। ক্যু এর পর জিয়া সেনাপ্রধান হন। কিন্তু একচ্ছত্র ক্ষমতা তিনি পাননি। ক্যু কারীরাই ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল। ওই সময় জাসদের প্রধান নেতারা হয় জেলে, নয়তো গা-ঢাকা কিংবা দেশের বাইরে। তাহেরের হাতে জাসদের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই চলে যায়। তিনি অনেক বিষয়েই জাসদের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন।

৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর আওয়ামীলীগের প্রতি অনুগত অফিসাররা ক্যু করে। এই ক্যু হয় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে। খালেদ মোশাররফের সাথে ঝামেলার মধ্যেই আওয়ামীলীগের চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করে বাম সেনা অফিসাররা। সেনানিবাসগুলো অস্থির হয়ে পড়ে। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকায় বসলো জাসদের বিপ্লবী পার্টির ইমার্জেন্সি স্ট্যান্ডিং কমিটির সভা। হঠাৎ করেই সেখানে তাহের এসে উপস্থিত হন এবং ঢাকা সেনানিবাসে নিজ গৃহে অন্তরীণ জিয়ার হাতের লেখা একটা চিরকুট পড়ে শোনান। চিরকুটটা ইংরেজিতে। বাংলা তরজমা করলে তার অর্থ হবে—আমি বন্দী, নেতৃত্ব দিতে পারছি না। আমার লোকেরা তৈরি। তুমি যদি নেতৃত্ব দাও, আমার লোকেরা তোমার সঙ্গে যোগ দেবে।

তাহের প্রস্তাব দেন, জিয়াকে সামনে রেখে অভ্যুত্থান ঘটাতে হবে। ঘটনার আকস্মিকতায় সভায় উপস্থিত জাসদ নেতারা বেশ বেকায়দায় ছিলেন। তাঁরা একপর্যায়ে তাহেরের প্রস্তাবে সম্মতি দেন। অবশ্য তাহের জাসদ নেতাদের সম্মতির অপেক্ষায় থাকেননি। ওই দিন দুপুরেই তিনি সৈনিক সংস্থার সংগঠকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন, মধ্যরাতে অভ্যুত্থান শুরু হবে।

অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য হলো
১. খালেদ মোশাররফের আওয়ামী চক্রকে উৎখাত করা;
২. বন্দিদশা থেকে জিয়াকে মুক্ত করা;
৩. একটা বিপ্লবী মিলিটারি কমান্ড কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা;
৪. রাজবন্দীদের মুক্তি দেওয়া;
৫. রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করা;
৬. বাকশাল বাদে অন্য সব দলকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন; এবং
৭. সৈনিক সংস্থার ১২ দফা দাবি বাস্তবায়ন করা।

রাত ১২টায় শুরু হয় অভ্যুত্থান। প্রথম প্রহরেই জিয়া মুক্ত হন। ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই জিয়া-তাহেরের সমীকরণ ভেঙে যায়। ভোরে বেতারের বুলেটিনে সবাই জানতে পারেন, সিপাহি বিপ্লব হয়েছে এবং জিয়া মুক্ত হয়েছেন। ঢাকার রাস্তায় সেনাবাহিনীর ট্যাংক-লরি ইতস্তত ঘোরাফেরা করতে থাকে। আমজনতা পথের পাশে দাঁড়িয়ে উল্লাস করে, হাততালি দেয় এবং অনেকে জীবনে প্রথমবারের মতো ট্যাংকে বা সেনাবাহিনীর ট্রাকে চড়ে ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ান।

জনতা ও সৈনিকদের এমন সমর্থন পাওয়ার মূল কারণ ছিল মুজিবের ভয়ংকর দুঃশাসন। মানুষ সেই দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলো, সেটা যেভাবেই হোক। খালেদ মোশাররফ মুজিবের পক্ষ হয়ে পাল্টা ক্যু করার কারণে মানুষ খালেদকে ঘৃণা করতে শুরু করে। রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনও অন্যতম কারণ ছিলো।

জাসদের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি যে ছিল না, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যায়। কয়েক শ সৈনিক ও জাসদ কর্মী একটি ট্যাংক নিয়ে ৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন জাসদ নেতা এম এ আউয়াল, মো. শাহজাহান ও মির্জা সুলতান রাজা। কারাগারে তখন শত শত জাসদ কর্মী। তাঁরা তিনজন সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আপনারা অপেক্ষা করুন। আমরা বাইরে গিয়ে পরিস্থিতিটা দেখি।’ তাঁরা আর ফিরে আসেননি। ওই কর্মীরা অনেক দিন কারাবন্দী ছিলেন। কেউ দুই বছর, কেউ তিন বছর, কেউবা তার চেয়েও বেশি।

৭ নভেম্বর বহু খুনোখুনির মধ্যে তাহের-জিয়া পক্ষ টিকে যায়। খালেদ মোশাররফকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। জিয়া-তাহেরের এই ‘বিপ্লব’ ছিল ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে। ৭ নভেম্বর সকালে বন্দী অবস্থায় খালেদ নিহত হলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর দুজন সহযোগী কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লে. কর্নেল এ টি এম হায়দারও নিহত হন। এই তিনজনই ছিলেন একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের স্মরণে ওই দিনটি অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস হিসেবে পালন করেন। অথচ তাদের যারা খুন করে তারাও ছিল মুক্তিযোদ্ধা।

ক্ষমতার ত্রিভুজ লড়াইয়ে জিয়া-তাহেরের সম্মিলিত শক্তির কাছে খালেদ হেরে গিয়েছিলেন। পরে জিয়া-তাহেরের মধ্যকার দ্বন্দ্বে তাহের ছিটকে পড়েন। ২১ জুলাই ১৯৭৬ দেশদ্রোহী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা তাহেরকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ক্ষমতার মূল লড়াইয়ে আবেগ বা মান-অভিমানের কোনো জায়গা নেই। হেরে গেলে মূল্য দিতে হয়, এটাই চরম সত্য।

সৈনিক সংস্থার সংগঠকেরা অনেকেই গ্রেপ্তার হন, কেউ কেউ আত্মগোপন করেন। এদের সামনের কাতারের নেতা করপোরাল আলতাফের অনুপস্থিতিতে তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার একটা গ্রামে টাঙ্গাইলের গণবাহিনী কমান্ডার খন্দকার আবদুল বাতেনসহ একদল কৃষকের সঙ্গে সভা করার সময় পুলিশের অতর্কিত আক্রমণে তিনি নিহত হন। খন্দকার বাতেন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আলতাফের লাশ পাওয়া যায়নি। বাতেন পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিলেন।

এতে ১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। ধারণা করা হয় ৭ই নভেম্বরে কর্নেল তাহেরের জনপ্রিয়তা দেখে জিয়াউর রহমান শংকিত ছিলেন। আবার জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে তাহের চেয়েছে মূলত জাসদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে। সেনা অফিসার হত্যার অভিযোগে তাই তাহেরকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি পেতে হয়।

মুজিবের মত জিয়াও সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিশ্বাস করতেন না। মুক্তিযোদ্ধাদের কোণঠাসা করে তাই তিনি অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের (যারা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে ছিলেন) পদোন্নতি দেন। এর মূল কারণ তারা অনুগত থাকতো। মুক্তিযোদ্ধারা কেউই চেইন অব কমান্ড মানতে প্রস্তুত ছিলেন না। এই কারণে জিয়া অমুক্তিযোদ্ধা সেনাদের ওপর নির্ভরশীল হন।
১৯৭৮ সালে অমুক্তিযোদ্ধা এরশাদকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছিলেন এবং তাকে উপ-সেনাপ্রধান করেন।

মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের মধ্যে মোটাদাগে দুপক্ষ ছিল। এক পক্ষ ছিল জাসদ প্রভাবিত বাম অন্যপক্ষ ভারতের একনিষ্ঠ দালাল আওয়ামী লীগের অনুসারী। জিয়া দুপক্ষেরই শত্রুতে পরিণত হন। ধারণা করা হয় জিয়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে সফল হওয়ায় এরশাদেরও ইচ্ছে ছিল এভাবে ক্ষমতাবান হওয়ার। তাই এরশাদ কট্টর জিয়াবিরোধীদের নানান সময়ে পোস্টিং দিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একত্রিত করেন। পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে তিনিই জিয়া হত্যার প্লট তৈরি করেন।

জিয়ার আমলে ক্যু হয়েছে ২২ বার। এর মধ্যে ২১ বার তিনি তা ঠেকাতে পেরেছেন। ২২ তম ক্যু তে প্রাণ হারান। এভাবে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেরাই নিজেদের রক্ত পান করেছে প্রায় দশ বছর। ধারণা করা হয় এসব ক্যু'তে মৃত্যুবরণ করেন প্রায় দুই সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্য।

জিয়া তার রাজনৈতিক দল, বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যে সংঘটিত একটি কোন্দলের সমঝোতা করতে চট্টগ্রামে যান। ৩০শে মে ভোরে জিয়া চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলেন। ভোর ৪টায় সেনাবাহিনীর অফিসারদের তিনটি দল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ আক্রমণ করে। এ আক্রমণে ১৬ জন অফিসার জড়িত ছিলেন। তাদের এগারটি সাবমেশিন গান, তিনটি রকেট লাঞ্চার এবং তিনটি গ্রেনেড ফায়ারিং রাইফেল ছিল।

আক্রমণকারী দলের মূল হোতা লে. কর্নেল মতিউর রহমান, লে. কর্নেল মাহবুব, মেজর খালেদ, এবং লে. কর্নেল ফজলে হোসেন সার্কিট হাউজে রকেট নিক্ষেপ করে ভবনের দেয়ালে দুটি গর্ত সৃষ্টি করার মাধ্যমে আক্রমণ শুরু করেন। এরপর অফিসাররা কক্ষগুলোতে জিয়াউর রহমানকে খুঁজতে থাকেন। মেজর মোজাফফর এবং ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সর্বপ্রথম জিয়াকে খুঁজে পান। মোসলেহ উদ্দিন জিয়াকে জানান যে, তাকে তাদের সাথে সেনানিবাসে যেতে হবে। এরপর কর্নেল মতিউর রহমান আরেকটি দল নিয়ে উপস্থিত হন এবং জিয়াকে অনেক কাছ থেকে একটি এসএমজি দিয়ে গুলি করে।

আক্রমণকারীদের মধ্যে, লে. কর্নেল মতিউর রহমান এবং কর্নেল মাহবুবকে পলায়নরত অবস্থায় হত্যা করা হয়। মেজর খালেদ এবং মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেফতার হন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা লাভ করেন। ২০১০ সাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন।

১৯৮১ সালের ৩০শে মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চীফ অব আর্মি স্টাফ লে.জে.হু.মু. এরশাদ মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে সংগঠিত ক্যু দমন করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন। প্রথমেই কুমিল্লা সেনানিবাস মুভ করে চট্টগ্রাম দখলে নেওয়ার জন্য।

সরকার বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়ে সময়সীমা প্রদান করে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অপারেশনে অংশগ্রহণকারী অফিসাররা এবং অধিকাংশ সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। নেতৃত্ব প্রদানকারী অফিসাররা সহ জিওসি মঞ্জুর পার্বত্য চট্টগ্রামে পালানোর চেষ্টা করেন। পথিমধ্যে সরকার প্রেরিত বাহিনী কর্তৃক তারা গ্রেফতার হন। কর্নেল মতিউর রহমান এবং লে. কর্নেল মাহবুব (২১ ইস্ট বেঙ্গলের প্রধান, মঞ্জুরের ভাগ্নে) মেজর মান্নান (অমুক্তিযোদ্ধা) কর্তৃক নিহত হন।

জেনারেল মঞ্জুর তার স্ত্রী ও সন্তানদের খাওয়ানো অবস্থায় ফটিকছড়ির একটি চা বাগানের জীর্ণ কুটিরে পুলিশ ইন্সপেক্টর গোলাম কুদ্দুসের হাতে ধরা পড়েন। পুলিশ ইন্সপেক্টর গোলাম কুদ্দুস তাকে গ্রেফতার করে হাটহাজারী থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তিনি একজন আইনজীবীর জন্য আবেদন করলে তা নাকচ করে দেওয়া হয়। তিনি বারবার পুলিশের হেফাজতে থেকে চট্টগ্রামে জেলে প্রেরিত হওয়ার জন্য আবেদন করতে থাকেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পুলিশের হেফাজত থেকে নিষ্কৃতি পেলেই সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করবে। কিন্তু যখন তাকে পুলিশ ভ্যানে উঠানো হয়, তখন সেনাবাহিনী একটি দল থানায় উপস্থিত হয়। কিছুক্ষণ বিতর্কের পর ক্যাপ্টেন্ এমদাদ জেনারেল মঞ্জুরের হাত-পা বেঁধে প্রায় টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে চট্টগ্রাম অভিমুখে রওয়ানা হয়। পরবর্তীতে কী ঘটেছিল তা সরকার কখনো প্রকাশ করেনি। তবে সরকারের রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষিত হয়- চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যের হাতে জেনারেল মঞ্জুর নিহত হয়েছেন।

১২ জন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে জিয়া হত্যাকাণ্ডে ভূমিকার জন্য সামরিক আদালতে মাত্র ১৮ দিনের দ্রুত বিচারকার্যে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৩তম মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে চট্টগ্রামে ৩০শে মের ঘটনাপ্রবাহে বুলেটের আঘাতে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকায় দুই বছর পরে ফাঁসি দেওয়া হয়।

সামরিক ট্রাইবুনালে জিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ১৮ জন অফিসারকে অভিযুক্ত করা হয়। এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। এদের মধ্যে ১৩ জন মৃত্যদণ্ড এবং বাকি ৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড লাভ করেন। এ অফিসারদের ১৯৮১ সালের ১-৩ জুনের মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অমুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল আবদুর রহমানের নেতৃত্বে ১০ জুলাই ১৯৮১ থেকে ২৮ জুলাই ১৯৮১ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলে সামরিক আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

রায় অনুযায়ী ১২ জন অফিসারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। বিচারকারী অফিসার মেজর জেনারেল আবদুর রহমানকে পরবর্তীতে ১৯৮৩/৮৪ সালে ফ্রান্সে রাষ্ট্রদূত হিসেবে প্রেরণ করা হয় এবং সেখানেই তিনি রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। জেনারেল রহমানের পরিবারের দাবি, তার মৃত্যুর সাথে এরশাদ জড়িত।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত
ব্রিগেডিয়ার মহসিন উদ্দিন আহমেদ
কর্নেল এম আব্দুর রশীদ
লেঃ কর্নেল এওয়াইএম মাহফুজুর রহমান
লেঃ কর্নেল এম দেলোয়ার হোসেন
লেঃ কর্নেল শাহ মোঃ ফজলে হোসেন
মেজর এজেড গিয়াসউদ্দীন আহমেদ
মেজর রওশন ইয়াজদানী ভূঁইয়া
মেজর কাজী মোমিনুল হক
মেজর এম মজিবুর রহমান
ক্যাপ্টেন মোঃ আব্দুস সাত্তার
ক্যাপ্টেন জামিল হক
লেঃ রফিকুল হাসান খান

কারাদণ্ডপ্রাপ্ত
লেঃ মোসলেহ উদ্দীন। (যাবজ্জীবন কারাদন্ড)

বহিষ্কৃত অফিসারগণ
ব্রিগেডিয়ার আবু সৈয়দ মতিউল হান্নান শাহ
ব্রিগেডিয়ার একেএম আজিজুল ইসলাম
ব্রিগেডিয়ার গিয়াস উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী (বীর বিক্রম)
ব্রিগেডিয়ার আবু জাফর আমিনুল হক (বীর বিক্রম)
কর্নেল মোঃ বজলুল গনি পাটোয়ারী (বীর প্রতিক)
লেঃ কর্নেল এএস এনামুল হক
লেঃ কর্নেল মোঃ জয়নাল আবেদিন
লেঃ কর্নেল মোঃ আব্দুল হান্নান (বীর প্রতিক)
মেজর মঞ্জুর আহমেদ (বীর প্রতিক)
মেজর ওয়াকার হাসান (বীর প্রতিক)
মেজর মোঃ আব্দুল জলিল
মেজর রফিকুল ইসলাম
মেজর মোঃ আব্দুস সালাম
মেজর একেএম রেজাউল ইসলাম (বীর প্রতিক)
মেজর মোঃ আসাদুজ্জামান
ক্যাপ্টেন জহিরুল হক খান (বীর প্রতিক)
ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক
ক্যাপ্টেন এএসএম আব্দুল হাই
ক্যাপ্টেন ইলিয়াস
লেঃ আবুল হাসেম

জিয়া ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে ক্যু করে যে অস্থিরতার জন্ম দিয়েছেন, জিয়া হত্যা ও এই বিচারের মধ্যে মধ্য দিয়ে সেই অস্থিরতার পরিসমাপ্তি ঘটে। কারণ এরপর আর মুক্তিযোদ্ধাদের (বাম ও লীগ) পক্ষ হয়ে নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউ অবশিষ্ট ছিল না।