৭ আগস্ট, ২০২২

হাসিনাকে কেন তেলের দাম বাড়াতে হলো?

 


বাংলাদেশের জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধির বেসিক কারণ হলো রিজার্ভ সংকট। আর রিজার্ভ সংকটের কারণ হলো মেগাপ্রজেক্টের নামে মেগাদুর্নীতি। সরকারের আমলা ও ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ছোটখাটো কাজ থেকে শুরু করে বড় কাজ সব স্থানে হরিলুট চালিয়েছে।

যে সড়কের মেরামতে লাগার কথা এক কোটি টাকা সেখানে ব্যয় করেছে ১০ কোটি টাকা। একেকটা বালিশ কিনেছে ৫৫ হাজার টাকায়। ১০ হাজার কোটি টাকার পদ্মাসেতু ৪০ হাজার কোটি টাকায়। এভাবে এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে সরকারি অর্থের হরিলুট হয় নাই। সরকারের কোনো কেনাকাটা বাজারদরের দশগুণের চাইতে কম হয়নি। এসব কারণে জনগণের ওপর বার বার ট্যাক্স আরোপ করেও রিজার্ভ সংকট কাটানো যায়নি।

এছাড়া যেসব কারণে রিজার্ভ বাড়ার কথা সেসব খাতে সরকারের কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। প্রবাসী কল্যাণে সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। নতুন নতুন দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই। তৈরি পোষাক ও চামড়া শিল্পের বিকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ভারতকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। ইত্যাদি বহু কারণে রিজার্ভ সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, চীন, রাশিয়া ও ভারতের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ। সেগুলো পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। নেই কোনো পরিকল্পনা।

এমতাবস্তায় অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ও স্বৈরাচারী সরকার IMF-এর কাছে ঋণ চেয়েছে। IMF সাধারণত যে শর্তগুলো দেয় তার একটি হলো জ্বালানী খাতে ভর্তুকি না দেওয়া। IMF তাদের ঋণ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতা যাচাই করে। সে অনুযায়ী শর্তারোপ করে এবং ঋণ দেয়। বাংলাদেশ এখনো ঋণ দাতা গোষ্ঠীগুলোর সাথে বৈঠক করেনি। বৈঠকের আগেই হাসিনা সরকার তেলের মূল্য বড় আকারে বাড়িয়ে IMF ও দাতা গোষ্ঠীকে বুঝাতে চায়, শুধু জ্বালানীতে ভর্তুকি বন্ধ নয়, জ্বালানী তেল থেকে লাভ করেও আমরা ঋণ পরিশোধে সক্ষম।

মহাদুর্নীতি ও হরিলুটের ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ থেকে প্রায় সাড়ে চারশো কোটি ডলার ঋণ নেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু এ সংস্থা থেকে ঋণের প্রধানতম শর্তই হলো জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি তুলে নেয়া। এখন বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, সরকার যে ঋণ চেয়েছে সংস্থাটির কাছ থেকে তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগেই তেলের দাম বাড়িয়ে তাদের শর্ত পূরণ করে নিলো।

বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরের বাজেটে ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা যে ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে তার বড় অংশই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য। গত মাসে আইএমএফ'র একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছিলো এবং সে সময় সরকারকে এ ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছিলো।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যত সরকার এসেছে তারা সবাই জ্বালানীতে ভর্তুকি দিয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হাসিনা সরকার। ২০১৪ সালে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই মাত্র ছয় মাস তারা কিছুটা সাবসিডি বা ভর্তুকি দিয়েছে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে। ৭ বছরের লাভ তারা লুট করে ফেলেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি জানিয়েছে ছয়মাসে জ্বালানি তেল বিক্রয়ে ৮০১৪.৫১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।

বিশ্ব বাজারে তেলের দাম নজিরবিহীন কমে আসায় ২০১৪-১৫ অর্থ বছর থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত সাত বছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করেই সংস্থাটি মুনাফা করেছিলো প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এটা তাদের হিসাব। কিন্তু এখানে ব্যাপক গড়বড় রয়েছে। এত কম হওয়ার কথা নয়। জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেছেন ডিজেলের দাম ১১৪ টাকা নির্ধারণের পরও নাকি তাদের সাবসিডি দিতে হচ্ছে। এটা ডাহা মিথ্যা কথা।

সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানী নিয়ে বার বার মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে। গত জুলাই মাসে হাসিনাও মিথ্যা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। এমনকি IMF-এর ঋণ নিয়েও মিথ্যা তথ্য দিয়েছে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন তাদের নাকি ঋণের দরকার নেই। আবার এখন ঋণের জন্য জ্বালানী তেলের মূল্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া হলো।

গত সপ্তাহের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮৮ ডলার। বাংলাদেশের ডলার রেট ৯৫ টাকা। এই হিসেবে অপরিশোধিত তেলের ক্রয়মূল্য ৫২ টাকা লিটার প্রতি। এটাকে পরিশোধন করতে ২ টাকা যুক্ত হয় লিটার প্রতি। বাকী, এলসি, পরিবহন, ভ্যাট-ট্যাক্স ইত্যাদি মিলে সর্বোচ্চ ৮ টাকা যুক্ত হতে পারে লিটার প্রতি। ডিজেলের মূল্য সর্বোচ্চ হতে পারে ৬২-৬৫ টাকা। ভর্তুকি বন্ধ করলেও ৭০ টাকায় ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল পাওয়ার কথা। এটা বর্তমান রেট। কিন্তু গত ৭ বছরে ব্যারেল প্রতি দাম ছিল মাত্র ২২-২৭ ডলার এবং ডলার রেট ছিল ৮৫ টাকা প্রায়। তাহলে অনুমান করুন জ্বালানী তেলে কী পরিমাণ হরিলুট করেছে সরকার।

সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে দুইটা বিষয়কে টার্গেট করে। প্রথমত IMF থেকে ঋণ বাগিয়ে নেওয়া, দ্বিতীয়ত জ্বালানী তেল থেকে মুনাফা করে তাদের লুট জনিত ঘাটতি কিছুটা ব্যাকআপ দেওয়া। সরকারের লুটের দায় জনগণকে পরিশোধ করতে হচ্ছে।

৬ আগস্ট, ২০২২

মদিনায় লুট, খুন ও ধর্ষণের মর্মান্তিক ঘটনা!

 

মক্কা ও মদিনাবাসী শুরু থেকেই ইয়াজিদের প্রতি অনুগত ছিল না। বিভিন্ন চাপে পড়ে তারা আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু যখন হুসাইন রা.-কে ইয়াজিদের বাহিনী খুন করে তখন মদিনাবাসী ক্ষিপ্ত হয় এবং ইয়াজিদের প্রতি বাইয়াত প্রত্যাহার করে। তারা আব্দুল্লাহ ইবন হানযালাকে নেতা নির্বাচন করল। তারা সকলে মসজিদে নববীর মিম্বরের কাছে জমায়েত হল।

তখন তাদের মধ্যে হতে একজন বলতে লাগলেন, আমি এ পাগড়ীকে প্রত্যাহার করলাম এ বলে সে মাথা থেকে পাগড়ীটি ফেলে দিল। অন্য একজন বলল, আমি ইয়াযীদকে প্রত্যাহার করলাম যেমন আমি আমার এ জুতা প্রত্যাহার করলাম,। এ বলে সে তার জুতা ছুঁড়ে মারলো। এভাবে একজনের পর একজন বলতে লাগল ও এরূপ করতে লাগল। ফলে সেখানে অনেক পাগড়ী ও জুতার স্তুপ হয়ে গেল। তারপর তারা তাদের মধ্যে থেকে ইয়াজিদের গভর্নরকে বহিষ্কার করার ব্যাপারে একমত হল। তিনি হলেন উসমান ইবন মুহাম্মদ ইবন আবু সুফিয়ান, ইয়াযীদের চাচাতো ভাই। বনূ উমাইয়ার সদস্যদেরকে মদীনা থেকে বিতাড়িত করার ব্যাপারেও তারা একমত হলো।

অবস্থা বেগতিক দেখে বনু উমাইয়ার লোকেরা মারওয়ান ইবন হাকাম-এর ঘরে একত্রিত হলো। আর মদীনাবাসীরা তাদেরকে চতুর্দিক দিয়ে ঘিরে রাখল। কিন্তু কিশোর আলী ইবনুল হুসাইন ওরফে জয়নুল আবেদীন এবং নবী পরিবারের নারী সদস্যরা এই আয়োজনের সাথে ছিলেন না। তারা নিজ ঘরে নিশ্চুপ ছিলেন।

মদিনার লোকদের আনুগত্য অস্বীকারের খবর ও বনু উমাইয়ার সদস্যদের অবরুদ্ধ হওয়ার খবর ইয়াজিদের কাছে পৌঁছলো। তিনি মুসলিম ইবনে উকবাকে সেনাপতি বানিয়ে বললেন, “মদিনার সম্প্রদায়কে তুমি তিনবার আহবান করবে, যদি তারা বশ্যতা স্বীকার করে তাহলে তুমি তাদের থেকে আনুগত্য গ্রহণ করবে এবং তাদের থেকে বিরত থাকবে, অন্যথায় তুমি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। যদি তুমি তাদের উপর বিজয় লাভ করো তবে মদিনায় তিনদিন হালাল ঘোষণা করবে (যা ইচ্ছা তা করবে, হারাম কাজও হালাল বলে গণ্য হবে)। তারপর বিরত হবে। আলী ইবন হুসাইনের প্রতি নযর রাখবে, তার থেকে বিরত থাকবে এবং তার কল্যাণ কামনা করবে, তাকে মজলিসে ডেকে নিবে। মদীনার কাজ সমাপ্ত করে মক্কা অবরোধ করবে।

ইতপূর্বে ইয়াজিদ উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে আদেশ দিয়েছিলেন, সে যেন আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর রা.-কে মক্কায় অবরোধ করার জন্য সেখানে গমন করে। কিন্তু উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদ তার আদেশ অমান্য করে এবং বলে আল্লাহর শপথ! আমি ইয়াজিদের ন্যয় এরূপ ফাসিক লোকের জন্য দুইটি মারাত্মক কাজ একত্রে করতে পারবো না। একটি হল রাসূল সা. এর নাতিকে হত্যা করা এবং দ্বিতীয়টি হল মহাসম্মনিত বাইতুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। তার মা মারজানা তাকে ইমাম হুসাইন রা.-এর শাহাদাতের সময় বলেছিলেন, দুর্ভাগ্য তোর! অভিশপ্ত তুই! তুই কী করেছিস! তুই কীসের দায়িত্ব নিয়েছিস? হুসাইন রা.-এর শাহদাতের পর তার আত্মীয়রা তাকে তিরস্কার করলে সে কিছুটা হীনমন্যতায় পড়ে যায়।

মুসলিম ইবনে উকবা তার সেনাবাহিনী নিয়ে মদীনার দিকে রওয়ানা হলো, সেনাবাহিনী যখন মদীনার নিকটবর্তী হলো, মদীনাবাসীরা বনু উমাইয়ার সদস্যদের অবরোধে কঠোরতা অবলম্বন করতে লাগল এবং বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! আমরা তোমাদের সকলকে এখনই হত্যা করবো। যদি তোমরা আমাদেরকে এমন একটি চুক্তিনামা লিখে দাও যে, তোমরা সিরিয়ার সৈন্যদেরকে আমাদেরকে চিনিয়ে দেবে না, আমাদের সাথে যুদ্ধে তাদের সহায়তা করবে না এবং আমাদের প্রতি তাদেরকে উসকানিও দিবে না। তখন বনূ উমাইয়ার লোকেরা তাদেরকে এ ব্যাপারে একটি অঙ্গীকারনামা প্রদান করলো।

যখন ইয়াজিদ বাহিনী মদিনায় পৌঁছল তখন বন্ উমাইয়ার লোকেরা তাদের সাথে সাক্ষাত করলো। সেনাপতি তাদের খবরাখবর সম্বন্ধে জিজ্ঞাস করলো, তখন তাদের কেউ তাকে কোন সংবাদ দিল না। আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান সেনাপতির কাছে আসলো এবং বললো, যদি আপনি তাদের উপর জয়ী হতে চান তাহলে আপনি মদিনার পূর্বদিকে হাররায় সেনাবাহিনী নিয়ে অবস্থান নিন। যখন শত্রুরা আপনার দিকে আসবে তখন সূর্যের তাপ থাকবে তাদের চোখে মুখে। এমন সময় আপনি তাদেরকে আপনার বাধ্যতা স্বীকার করতে আহবান জানাবেন। যদি তারা আপনার আহবানে সাড়া দেয় তাহলে ভাল কথা, অন্যথায় তাদেরকে হত্যা শুরু করবেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবেন। কেননা তারা দেশের ইমাম তথা খলীফার বিরুদ্ধাচরণ করছে এবং তার অবাধ্য হয়েছে।

এ পরামর্শ দেওয়ার জন্য মুসলিম ইবন উকবা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তিনি যেদিকে ইঙ্গিত করলেন তা তিনি পরোপুরি পালন করলেন। তিনি পূর্ব মদীনার হাররায় অবতরণ করেন এবং মদীনাবাসীদেরকে তিনদিনের অবকাশ দিলেন। মদিনাবাসী তাদেরকে অন্যায়ের পথ ছেড়ে ন্যায়ের পথে আসার আহবান জানালেন। তারা অবৈধ শাসকের আনুগত্যের বিপরীতে শাহদাতকে আপন করে নেয়ার শপথ নিলেন। প্রতিদিন তারা বশ্যতা স্বীকার না করে যুদ্ধ ও মুকাবিলার কথা পুনরাবৃত্তি করলেন।

যখন তিনদিন শেষ হয়ে গেল তখন সেনাপতি তাদরকে চতুর্থ দিন অর্থাৎ ৬৩ হিজরীর জুলহাজ্জ মাসের ২৮ তারিখ বুধবার দিন বললো, হে মদীনাবাসীগণ! তিনদিন অতিবাহিত হলো, আমীরুল মু'মিনীন আমাকে বলেছিলেন যে, তোমরা তার আত্মীয়স্বজন। তাই তিনি তোমাদের রক্তপাতকে খারাপ মনে করেন। তিনি আমাকে হুকুম দিয়েছেন আমি যেন তোমাদেরকে তিন দিনের সময় দেই। তিনদিন শেষ হয়ে গেল। এখন তোমরা কি করবে? তোমরা কি আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে, না সন্ধি করবে? তারা বললেন, যুদ্ধ করবো।

মুসলিম আবার বললো, যুদ্ধ করো না বরং সন্ধি করো তাহলে আমরা ঐ বিদ্রোহী ব্যক্তিকে (আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর রা.) দমন করার জন্য সর্বশক্তি ও প্রচেষ্টা প্রয়োগ করতে পারব। তারা বললেন, “হে আল্লাহর দুশমন! তোমার যদি এটাই ইচ্ছে হয়ে থাকে তাহলে আমরা কখনোই তোমার সহযোগী হবো না। আমরা কি তোমাদেরকে ছেড়ে দিব যে, তোমরা বাইতুল্লাহ গিয়ে যথেচ্ছা আচরণ করবে? তারপর তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিল।

মদিনাবাসী বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পরিখা খনন করে নিলেন। তারা নিজেদের সৈন্যদেরকে চার ভাগে ভাগ করে নেয় এবং প্রতিটি ভাগের জন্য একজন আমীর নিয়োগ করে। সবচাইতে সুবিন্যস্থ ভাগের আমীর হলেন আবদুল্লাহ ইবন হানযালা। তারপর তারা প্রচণ্ড যুদ্ধ করলেন। যুদ্ধে মদীনাবাসীরা পরাজয়বরণ করলেন। দু'পক্ষ থেকেই বহু সর্দার ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ নিহত হলেন। এই ঘটনাকে ইতিহাসে 'আল হাররা'র যুদ্ধ' হিসেবে অভিহিত করা হয়।

তারপর এক জঘন্য ঘটনার অবতারণা হলো মদিনায়। মুসলিম ইবন উকবা তার নেতা ইয়াজিদের নির্দেশমতে মদিনায় তিন দিন যাবত লুটতরাজ করার নির্দেশ দিলো। সে এ তিন দিনে মদীনার বহু সাহাবি, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও ন্যায়নিষ্ঠ লোকদের পাইকারিভাবে হত্যা করতে শুরু করলো। মদিনায় জঘন্যতম লুট, ধর্ষণ, নির্যাতন ও উৎপীড়নের অজস্র ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে হতে সাতশত জন গণ্যমান্য ব্যক্তি, তাদের দাস-দাসী এবং অপরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে দশ হাজার নিহত হয়েছিল। বহু সম্মানিত মুসলিম নারী ধর্ষিত হয়েছেন ইয়াজিদের বাহিনীর দ্বারা।

জালিম ইয়াজিদ তিনদিনের জন্য মদিনাকে লুটপাটের লক্ষ্যে মুসলিম ইবন উকবাকে নির্দেশনা দিয়ে জঘন্য অপরাধ করেছে। যার দরুন সাহাবায়ে কিরামের একটি বিরাট দল ও তাদের সন্তানগণ নিহত হন। বহু সম্মানিত নারী ধর্ষিত হয়েছেন। সা'দ ইবন আবু ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, “যদি কেউ মদীনাবাসীদের সাথে ষড়যন্ত্র করে তাহলে লবন যেভাবে পানিতে গলে নিঃশেষ হয়ে যায় সেও এভাবে গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।” ইমাম মুসলিমও আবু আবদুল্লাহ সা'দ ইব্ন আবু ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যদি কোন ব্যক্তি মদীনাবাসীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে তাহলে আল্লাহ্ তা'আলা তাকে জাহান্নামে এমনভাবে গলাবেন যেমন সীসা আগুনে গলে যায় কিংবা লবণ যেভাবে পানিতে গলে যায়।”

কিছু অর্বাচীন ও জ্ঞানপাপীকে দেখা যায় নানানভাবে ইয়াজিদকে শাসক এমনকি আমিরুল মুমেনিন হিসেবে আখ্যায়িত করতে। যে পাইকারীভাবে খুন ও ধর্ষণ করার নির্দেশ দেয় সে মুসলিমদের নেতা হওয়া তো দূরের কথা তাকে মুসলিম হিসেবে বিবেচনা করাও তো কঠিন। তার আক্রমনের পর মদিনার সমস্ত সাহাবী হয় খুন হয় নাহয় জঙ্গলে পালিয়ে যায়। সাহাবাদের সাথে যার এই আচরণ সে জালিম ও ফাসিক, এটাই তার পরিচয়। আল্লাহ তায়ালা তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করুন। আমিন।

বি. দ্র. ঘটনার বর্ণনা আল্লামা ইবনে কাসীরের বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া'-এর ৮ম খন্ড (৪০০-৪১৫) থেকে নেওয়া হয়েছে।

হিন্দু জনসংখ্যা কমার আসল কারণ কী?

 

বাংলাদেশে আদমশুমারি হয়ে গেল। যদিও অনেক বিষয় নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। টোটাল সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিকলনা মন্ত্রীও স্বীকার করেছেন আদমশুমারি কিছুটা সমস্যা থাকতে পারে। এই বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে। আজকে আরেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে। আর সেটা হলো বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

এই নিয়ে প্রায় সব মিডিয়া অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছে। কেউ কেউ ইতিহাস টেনে নিয়ে অনেক বিশ্লেষণী রিপোর্ট করেছে। এসব বিষয় এতটা গুরুত্ব না পেলেও বুয়েটের শিক্ষক এনায়েত চৌধুরীর গত বুধবারের ভিডিও বরাবরের মতোই ভাইরাল হয়। তিনি হিন্দু কমে যাচ্ছে এই নিয়ে ভিডিও তৈরি করেছেন।

তিনি তার বিশ্লেষনে কয়েকটি বিষয়কে ফাইন্ড আউট করেছেন যার দ্বারা হিন্দু সংখ্যা কমে যাচ্ছে বাংলাদেশে।
১। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে মাইগ্রেশন (মুসলিমরা হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করছে)
২। এনিমি সম্পত্তি দখলের ফলে মাইগ্রেশন (আবুল বারাকাতের মতে হিন্দুদের জমি দখল করার কারণে এটা হয়)
৩। ফার্টিলিটি রেইট (এই সমস্যার কথা উল্লেখ করে ছেড়ে দিয়েছেন। এনায়েত এই কারণকে গুরুত্ব দেননি)

এনায়েত চৌধুরীর ভাষ্যমতে বাংলাদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাওয়ার বেসিক কারণ হলো ভারতে মাইগ্রেশন। কিন্তু আসলে কি তা হয়?

এদেশে হিন্দুদের অবস্থা, জীবন যাপন প্র্যাকটিসিং মুসলিমদের চাইতে অনেক ভালো। হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ৮% শতাংশ হলেও সরকারি চাকুরিতে হিন্দুদের পরিমাণ প্রায় ২২%। এখান থেকে সাধারণত হিন্দুরা যায় না। যারা মাইগ্রেশন করে তারা মূলত এখানে অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে এবং যাদের কালো টাকা আছে তারা ভারতে সেগুলো পাচার করে ও এক পর্যায়ে নিজেদের মাইগ্রেশন করে। এই সংখ্যাটা নিতান্তই কম। এটা ধর্তব্য নয়।

ধরে নিলাম এনায়েতের বিশ্লেষণ ঠিক। পাকিস্তানেও হিন্দু সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বৌদ্ধপ্রধান শ্রীলংকায়ও হিন্দুদের পার্সেন্টেজ কমে যাচ্ছে। এনায়েতের হিসাবকে সত্য হিসেবে ধরে নিলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে দলে দলে মানুষ ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। এদিকে ভারতের হিন্দুদের তো মাইগ্রেশনের ঝামেলা নেই।

এনায়েত ও বারাকাতের হিসেবে ভারতে হিন্দুদের পার্সেন্টেজ লাফিয়ে বাড়ার কথা। কিন্তু আসলে কী হচ্ছে সেখানে? ভারত থেকে দাঙ্গা কিংবা এনিমি সম্পত্তি দখলের কারণে মাইগ্রেশন নেই। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার হিন্দুরা সেখানে যাচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে নেপাল থেকেও কেউ কেউ ভারতে মাইগ্রেশন হচ্ছে।

এত হিন্দু চারদিক থেকে ভারতে এলেও ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আমি যে ছবিটি শেয়ার করেছি সেটা ভারতের ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার তুলনামূলক চিত্র। এটি দ্য হিন্দু পত্রিকা থেকে নিয়েছি। এখানে দেখা যাচ্ছে ভারতে ১৯৫১ সালে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮৪%। ২০১১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৯%এ। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে ৫% কমে যাওয়া অনেক বড় ব্যাপার!

এনায়েত ও বারাকাতেরা মাইগ্রেশনে যে চিত্র দেখিয়েছে তা যদি সঠিক হতো তবে কি ভারতে হিন্দুদের জনসংখ্যা কমে যেত? অন্যদিকে খেয়াল করুন ভারতে মুসলিমদের পার্সেন্টেজ বেড়ে গেছে। ১৯৫১ সালে তা মুসলিমরা ছিল ৯.৮%। ২০১১ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৪.২%। প্রায় সাড়ে ৪% বেড়ে গেছে।

ভারতে মুসলিমদের সুযোগ সুবিধা কয়েকটি স্থানে কিছুটা ভালো। বাকী পুরো ভারতে মুসলিমদের যুদ্ধ করে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। ভারত থেকে কিছু মুসলিম মাইগ্রেশন হয় মধ্যপ্রাচ্যে ও ইউরোপে। কিন্তু তারপরও সেখানে মুসলিমদের জনসংখ্যা বাড়ছে ও হিন্দুদের জনসংখ্যা কমছে।

একপাক্ষিক ও পূর্ব ধারণা মাথায় রেখে বিশ্লেষণ করার কারণে এনায়েত চৌধুরির বিশ্লেষণের মৌলিক ত্রুটি দেখা গেছে। যদি মাইগ্রেশনই মূল সমস্যা হতো তবে ভারতে হিন্দু সংখ্যা বেড়ে যেত।

হিন্দুরা জনসংখ্যার দিক দিয়ে ১ম দেশ ভারতে, এরপর নেপালে এবং ৩য় দেশ বাংলাদেশ। অবাক করা ব্যাপার হলো এই তিন দেশেই জনসংখ্যা কমছে। ভারত ও নেপালে মাইগ্রেশন সমস্যা নেই। তবুও কেন কমছে?

এর বেসিক কারণ হলো ফার্টিলিটি রেট। যে বিষয়টা এনায়েত উল্লেখ করেও গুরুত্ব না দিয়ে এড়িয়ে গেছে। অথচ এটাই হচ্ছে বেসিক কারণ।

হিন্দুদের ফার্টিলিটি রেট বা জন্মহার কমে যাওয়ার কারণ দুইটি
১। জন্মনিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় প্রভাব নেই
২। তাদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

ফার্টিলিটি রেট জলবায়ু ও অঞ্চলের ওপর বেশি নির্ভর করে। আমাদের অঞ্চলের চাইতে আফ্রিকায় ফার্টিলিটি রেট বেশি। একই এলাকার দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে এর পার্থক্য হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু দুই কারণে পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে।

আমাদের উপমহাদেশে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা প্ররোচনায় প্রচার করা হচ্ছে জনসংখ্যাই আমাদের সমস্যা। এজন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই প্রচারণার সাথে একমত হয় নি মুসলিমরা। কিন্তু হিন্দুদের তাতে সমস্যা ছিল না। মুসলিম সমাজের মসজিদে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে হামেশাই বক্তব্য দেওয়া হয়। উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মওদূদী এই নিয়ে বই লিখেছেন 'ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ'।

এই বইটি উপমহাদেশের মুসলিমদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে ও বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রজেক্টটা বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে অল্প কয়েকদিন হচ্ছে জনপ্রিয় হচ্ছে। কিন্তু হিন্দু সমাজে এটা গোড়া থেকেই জনপ্রিয় ছিল। তারা পশ্চিমা প্রচারণায় কান দিয়েছে। তাই তাদের জন্মহার কমে গিয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো তাদের খাদ্যাভ্যাস। এই উপমহাদেশের হিন্দুরা লাল গোশত খুবই কম খায়। গরু ছাগলের গোশত কম খাওয়ায় তাদের ফার্টিলিটি রেট কমে যাচ্ছে। গরু ছাগলের গোশতে (রেড মিট) প্রচুর জিংক থাকে। যা সন্তান জন্মদান ও গর্ভধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু ছেলে-মেয়েরা দীর্ঘসময় ধরে গোশত না খাওয়ায় ফার্টিলিটি রেট কমে যাচ্ছে।

তাই শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর সব স্থানে, সব দেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমছে। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকায় হিন্দু সংখ্যা কমছে। এই বিষয় নিয়ে ভারতের লোকেরাও গবেষণা করেছে। তারা এই ফার্টিলিটি রেটকেই ফাইন্ড আউট করেছে কারণ হিসেবে।


৩০ জুলাই, ২০২২

হিজরি সন গণনার ইতিহাস



আমাদের নেতা উমার রা.-এর শাসনামল। ইসলামী হুকুমাত তখন অনেক বড়। এর মধ্যে একটি সংকটে পড়লো রাষ্ট্র। আরবে তৎকালীন সমাজ মাসের হিসেব ও তারিখের হিসেব করতো কিন্তু নির্দিষ্টভাবে সনের হিসাব করতো না। রাষ্ট্র বিশাল হওয়ায় অনেক ডকুমেন্টস মেইনটেইন করতে হচ্ছে। যেমন, রাষ্ট্রীয় আদেশ, সার্কুলার, ঘোষণাপত্র, চুক্তিপত্র, কূটনৈতিক চিঠি ইত্যাদি। এগুলোতে মাসের নাম থাকলেও সন লিখা থাকতো না। 

১৬ হিজরির শাবান মাসের ঘটনা। তখন অবশ্য ১৬ হিজরি বলে কিছু ছিল না। একটি অফিসিয়াল সার্কুলার হাজির হলো উমার বিন খাত্তাব রা.-এর সামনে। সেখানে মাসের নাম লেখা ছিল কিন্তু সনের নাম ছিল না। উপস্থিত কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলো এটি কোন সনের সার্কুলার! উমার রা. বললেন এটি এখনই সমস্যা তৈরি করছে। ভবিষ্যতে তো এটি বড় সমস্যা হিসেবে দাঁড়াবে। এর সমাধান কী? এর কোন সদুত্তর পাওয়া যায় নি সেসময়। 

তৎকালীন আরবে সুনির্দিষ্ট কোন সন প্রথা প্রচলিত ছিল না। বিশেষ ঘটনার নামে বছরগুলোর নামকরণ করা হতো। যেমন- বিদায়ের বছর, অনুমতির বছর, ভূমিকম্পের বছর, হস্তীর বছর ইত্যাদি। মহানবী সা. যখন পৃথিবীতে এসেছেন আরববাসী তখন ‘হস্তীর বছর’ থেকে কাল গণনা করছিল। এরপর ফিজার যুদ্ধ দিয়েও সাল গণনা হতো। যেমন তারা বলতো হস্তীর বছরের তিন বছর পরে আমার মেয়ের জন্ম। ফিজার যুদ্ধের আগের বছর আমাদের বিয়ে হয়েছে ইত্যাদি। 

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমার ফারুক রা. যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন বহু দূর-দূরান্ত পর্যন্ত নতুন নতুন রাষ্ট্র ও ভূখন্ড ইসলামী খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাষ্ট্রের জরুরি দলিল, কাগজপত্র ইত্যাদিতে কোন সন উল্লেখ না থাকায় অসুবিধার সৃষ্টি হতো। আবার বসরার (ইরাক) গভর্নর মুসা আল আশয়ারি রা. রাষ্ট্রনায়ক উমার ফারুক রা.-কে লিখে পাঠালেন, আপনি পাঠানো চিঠিতে সন না থাকায় সমস্যা হচ্ছে। তিনি এক্ষেত্রে গ্রিসকে অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।  

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমীরুল মুমেনিন একটি বিশেষজ্ঞ মিটিং আহ্বান করলেন এই সমস্যা সমাধানে। এখানে বিজ্ঞ সাহাবা ও পন্ডিত ব্যক্তিদের আহ্বান জানান হয়েছে।  সোলার ক্যালেন্ডার নাকি লুনার ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হবে? কোন ঘটনাকে সাক্ষী রেখে বছর গণনা শুরু হবে? কোন মাসকে প্রথম মাস হিসেবে ধরা হবে? ইত্যাদি সব জটিল সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে সেই মিটিং-এ।        

হিজরতের ১৬ বছর পর ১০ জমাদিউল আউয়ালে আসলো সেই ঐতিহাসিক দিন। যেহেতু আরবের মানুষ ও সাহাবীরা চন্দ্রবর্ষ অনুসরণ করতো এবং আমাদের ইবাদতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তারিখ চাঁদের সাথে সম্পর্কিত তাই সৌর ক্যালেন্ডার বাদ পড়ে যায় শুরুতেই। মহানবী সা.-এর জন্ম, নব্যুয়ত, হিজরত ও মৃত্য—এ চারটি ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার যেকোন একটি হতে হিজরি সন গণনা করার প্রস্তাব উত্থাপিত হলো।

কিন্তু সমস্যা হলো জন্ম ও নবুয়তের তারিখ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আর মৃত্যু শোকের সিম্বল। এছাড়া জন্ম, মৃত্যুকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা রাসূল সা. বলেননি। অতএব হিজরতের মাধ্যমেই সন গণনা শুরু করার পক্ষে সাহাবার একমত হলেন। হিজরতের বছর থেকে সন গণনার পরামর্শ দেন বিজ্ঞ সাহাবী সাইয়্যেদেনা আলী রা.। কারণ ঐদিন থেকে আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সা. শাসনক্ষমতা গ্রহণ করতে শুরু করেন এবং মুসলিমরা রাষ্ট্রীয় শক্তি অর্জন করে। সেজন্যই দিনটি মুসলিমদের কাছে চিরস্মরণীয়। আর পবিত্র মাস মহররমকে ১ম মাস হিসেবে নির্ধারণ করতে একমত হন সাহাবারা।     

সিদ্ধান্ত হলো যে বছর মুহাম্মদ সা. হিজরত করে মদিনায় এসেছেন সে বছরের মহররমের ১ তারিখ থেকে হিজরি বর্ষ গণনা করা হবে। হিসেব করে দেখা গেল ১ হিজরির ১ মহররম অর্থাৎ প্রথম দিনটি ছিল জুমাবার, জুলিয়ান দিনপঞ্জি অনুসারে ১৬ জুলাই ৬২২ খ্রিস্টাব্দ। আর এই সিদ্ধান্তটি নেয়া হয় ঘটনার ১৬ বছর পর ৯ জুন ৬৩৭ সালে। সেদিনই বিশেষজ্ঞরা হিসেব করে দেখলো সেদিন ছিল ১০ জমাদিউল আউয়াল, ১৬ হিজরি। উমার ফারুক রা. শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করার তিন বছরের মাথায় এমন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে কার্যকরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। 

আজ ১ মহররম ১৪৪৪। আজ থেকে ১৪৪৪ বছর আগে মুহাম্মদ সা. তাঁর দায়িত্বের অংশ হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। আলী রা.-এর শাহদাতের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রকে হারিয়ে ফেলেছি। এরপর বহু মর্দে মুজাহিদ এই ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করতে চেয়েছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ শাহদাতের নজরানা পেশ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হুসাইন ইবনে আলী রা., আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা., উমার ইবনে আব্দুল আজিজ রা.। 

আমাদের আন্দোলন সেই ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করার আন্দোলন! আসুন আমরা শপথ নিই আমরা আমাদের সম্পদ ও জীবন বাজী রেখে ইসলামী রাষ্ট্রকে পুনঃস্থাপিত করার চেষ্টা করে যাবো ইনশাআল্লাহ। 

সবাইকে হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা। নতুন বছরে মহান রাব্বুল আলামীন আরো বেশি তার অনুগত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

২৬ জুলাই, ২০২২

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক

খুররম জাহ মুরাদ। ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘ, পাকিস্তানের ২য় নাজিম-ই-আলা বা কেন্দ্রীয় সভাপতি। খুররম জাহ মুরাদ এশিয়ার একজন বিখ্যাত প্রকৌশলী। একই সাথে তিনি ছিলেন দা’য়ী, সংগঠক, ছাত্রনেতা, হাদীস বিশারদ, ইসলামিক চিন্তাবিদ। তাঁর জন্ম হয়েছে ভারতের ভূপালে। ৪৭-এর দেশভাগের সময় তার পরিবার ভূপাল থেকে লাহোরে চলে আসে। 

পড়লেখা শেষে তিনি সরকারি চাকুরিতে যোগদান করেন। আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬৫ সালে মাতুয়াইল, মুসলিম নগর, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, কদমতলী, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা থানাসহ ৫৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বন্যামুক্ত এলাকা গড়তে প্রতিষ্ঠা করা হয় ডিএনডি বাঁধ। এই প্রকল্পের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন খুররম জাহ মুরাদ। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ ১৯৭৫ সালে করা কা'বা ঘরের এক্সটেনশন। তিনি জামায়াতের ঢাকা মহানগরীর আমীর ছিলেন।  

সব পরিচয়ের পাশাপাশি খুররম জাহ মুরাদ একজন ভালো লেখকও ছিলেন। তাঁর একটি আর্টিকেল ১৯৫৮ সালে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়েছিলো মাওলানা মওদূদী সম্পাদিত বিখ্যাত পত্রিকা 'তরজুমানুল কুরআনে'। নাম ছিল, তেহরিকে ইসলামী মেঁ কারকুনো কি বেহমি তা'লুকাত। প্রবন্ধটি খুবই জনপ্রিয় হয় তাই পরে এটি বই আকারে পাবলিশ হয়। এই দারুণ বইটি পৃথিবীর সব গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় অনুবাদ হয়। বাংলায় এর নাম হয়, 'ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক'। অনুবাদ করেন মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান। 

বইয়ের নাম শুনে বুঝা যাচ্ছে এই বইয়ের আলোচ্য বিষয় কী। বইটিতে ভ্রাতৃত্বকে জোর দেওয়া হয়েছে। একটি সফল ইসলামী আন্দোলনের জন্য এর বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নং আয়াতে বলেন, “আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে পরস্পরের ঘোরতর দুশমন, তখন তিনিই তোমাদের হৃদয়কে জুড়ে দিলেন এবং তোমরা তাঁর অনুগ্রহ ও মেহরবানীর ফলে ভাই-ভাই হয়ে গেলে। (নিঃসন্দেহে) তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের তীরে দাঁড়িয়ে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে সেখান থেকে নাজাত দিলেন"। ইসলামের একটি বেসিক শিক্ষাই হলো মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা। বংশ, গোত্র, বর্ণ, জাতি, সম্পদ ইত্যাদির ব্যবধান দূর করে পরস্পর ভাই হয়ে যাওয়া। 

খুররম জাহ মুরাদ ৪ টি অধ্যায়ে এই বইটি লিখেছেন। ১ম অধ্যায়ে তিনি পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তি, তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ২য় অধ্যায়ে একজন মুসলিমের ভালো চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা ও এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। ৩য় অধ্যায়ে যেসব বদ্গুণ সম্পর্কের অবনতি ঘটায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। শেষ অধ্যায়ে সম্পর্ক ভালো করার পন্থা ও ভালো গুণ নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

১. পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তিঃ তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
লেখক এখানে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ঈমানকে উল্লেখ করেছেন, কারণ সূরা হুজরাতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন “মু’মিনেরাতো পরস্পরের ভাই”। এরপর ভ্রাতৃত্বকে তিনি ঈমানের অনিবার্য দাবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর এই অধ্যায়ে তিনি আলোচনা করেছেন বিশ্বব্যাপী আমরা যে ইসলামী বিপ্লবের কাজ করছি তার জন্য ভ্রাতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই, এটি অপরিহার্য। এরপর খুররম জাহ মুরাদ ভ্রাতৃত্বের দাবি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই ভ্রাতৃত্ব আমাদের কাছে কী চায়! ভ্রাতৃত্বের ফলে আমরা আখিরাতে কী সুবিধা পাবো তা নিয়েও তিনি এই অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। 

২. চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা ও তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য 
লেখক বলেছেন, ইসলাম পারস্পারিক সম্পর্কের যে মান নির্ধারণ করেছে তাকে কায়েম ও বজায় রাখার জন্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) পারস্পারিক অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে একটি বিধি-বিধানও তৈরী করে দিয়েছেন। সেই বিধি-বিধানকে অনুসরণ করে এ সম্পর্ককে অনায়াসে দ্বীন-ইসলামের অভীষ্ট মানে উন্নীত করা যেতে পারে। এ বিধি-বিধানের ভিত্তি কতিপয় মৌলিক বিষয়ের ওপর স্থাপিত। লেখকের মতে এই মৌলিক বিষয়গুলো হলো আটটি, কল্যাণ কামনা, আত্মত্যাগ, ইনসাফ, ইহসান, রহমত, ক্ষমা, নির্ভরতা ও মর্যাদা। লেখক এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন ২য় অধ্যায়ে। 

৩. সম্পর্ককে বিকৃতি থেকে রক্ষা করার উপায়
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যেকার সম্পর্ককে বিকৃত করতে ও নষ্ট করার জন্য কিছু বদ্গুণ দায়ি। লেখক এখানে ১৫ টি বদগুণ চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো আমাদের সম্পর্ককে নষ্ট করে। ৩য় অধ্যায়ে লেখক এসব বদ্গুণের ব্যাপারে ও কুফল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। প্রত্যেকটি বদগুণের ব্যাপারে ইসলামের বিধান বর্ণনা করেছেন। 

৪. সম্পর্ক দৃঢ়তর করার পন্থা
পূর্বের অধ্যায়ে বর্ণিত সম্পর্কের বিকৃতি ও অনিষ্টসাধনকারী এ জিনিসগুলো থেকে বারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যেগুলো গ্রহণ ও অনুসরণ করার ফলে সম্পর্ক দৃঢ়তর ও স্থিতিশীল হয়, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় এবং যার ফলে দুটো হৃদয়ের মধ্যে এক হাতের দু’টি অংগুলির মতোই ঘনিষ্ঠতার সৃষ্টি হয়, আল্লাহ্ ও রাসূল (সঃ) সেগুলোও আমাদেরকে সুনির্দিষ্টরূপে বলে দিয়েছেন। এর ভেতর কতকগুলো জিনিসকে অত্যাবশ্যকীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অথবা বলা যায়, সেগুলোকে অধিকার (হক) হিসেবে পেশ করা হয়েছে। আবার কতকগুলো জিনিসের জন্যে করা হয়েছে নসিহত। এগুলো হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের পর্যায়ভূক্ত। লেখক এরকম ১৮ টি গুণের কথা কথা উল্লেখ করে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন।  

খুররম জাহ মুরাদের লেখার সাথে যারা পরিচিত তারা বিষয়টা জানেন। তিনি তাঁর লেখায় প্রচুর কুরান-হাদীসের রেফারেন্স ইউজ করেছ। প্রতিটি বিষয়ে তিনি ইসলামের নির্দেশনার আলোকে বর্ণনা করতে পছন্দ করেন। যারা এই বইটি এখনো পড়েননি, পড়ে নিন। সর্বস্তরের মানুষের সাথে আপনার মুয়ামেলাত সুন্দর করার একটি দারুণ গাইডলাইন পাবেন।  

চরিত্র গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মানুষ রাতারাতি অর্জন করতে পারে না। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে: চরিত্র গঠনের গোটা পরিকল্পনাটিকে বুঝে নিয়ে এক একটি জিনিসকে মনের মধ্যে খুব ভালো মতো বদ্ধমূল করে নেয়া, তারপর তাকে গ্রহণ ও অনুসরণ করার চেষ্টা করা এবং এভাবে প্রথমটির পর দ্বিতীয়টির পর তৃতীয়টিকে গ্রহণ করা। ধীরে ধীরে ভালো গুণগুলো প্র্যাকটিস করা ও বদগুণগুলো আমাদের আচরণ থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে। তবেই এই বই পড়া সার্থক হবে। ইনশাআল্লাহ।  

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক
লেখক : খুররম জাহ মুরাদ
অনুবাদক : মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান  
প্রকাশনী : আইসিএস
পৃষ্ঠা : ৯৬
মুদ্রিত মূল্য : ৪০
জনরা : আত্মউন্নয়ন ও মোটিভেশন

২৪ জুলাই, ২০২২

ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ


আজকে যে বইটি রিভিউ করবো এর একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। এই বইয়ের মাধ্যমে মাওলানা মওদূদী আর দেওবন্দীদের পথ দুইদিকে আলাদা হয়ে গিয়েছে। দেওবন্দীদের মিথ্যাচার ও তাকফিরের টার্গেট হয়েছেন মওদূদী ও তাঁর সমর্থকরা।

উপমহাদেশের সেরা ইসলামিক স্কলার যিনি ইসলামের স্বরূপ উপস্থাপন করে রাষ্ট্র ও জীবন পরিচালনার প্রায় সব দিক নিয়ে বই লিখেছেন সেই মাওলানা মওদূদীর উত্থান হয়েছে দেওবন্দীদের হাত ধরে। খুব কম বয়সে মাওলানা ইসলাম নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন। তাঁর এই প্রতিভা দেখে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মুখপত্র 'মুসলিম' পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেয় কর্তৃপক্ষ।


১৯২৩ সালে মাওলানার বয়স যখন মাত্র বিশ বছর, তখন তিনি 'মুসলিম' পত্রিকার সম্পাদক। ইংরেজ সরকার পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করলে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ 'আল জমিয়ত' নামে আরেকটি পত্রিকা স্টার্ট করে। মাওলানা এই পত্রিকারও সম্পাদক নিযুক্ত হন। এই পত্রিকার মাধ্যমে সারা উপমাহাদেশের মুসলিমরা মাওলানার লেখার সাথে পরিচিত হতে থাকে। ১৯২৭ সালে জমিয়ত পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে মাওলানা 'আল জিহাদ ফিল ইসলাম' নামের বইটি লিখতে থাকেন। এতে তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। ১৯৩০ সালে বইটি লেখা শেষ হয় ও বই আকারে পাবলিশ হয়।

এর মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হয়। পাকিস্তান আন্দোলন হুট করে হিন্দুস্থানে নাজিল হয়নি। ধারাবাহিকভাবে এর একটি প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। লর্ড কার্জন কর্তৃক শুধুমাত্র প্রশাসনিক কারণে ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভেঙে আরেকটি প্রদেশ তৈরি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুশরিকদের বঙ্গভঙ্গরদ আন্দোলন এবং ১৯১১ সালে তা রহিতকরণ থেকে শুরু। এরপর উপমহাদেশের যত্রতত্র এবং যখন তখন মুসলমাদের গায়ে পড়ে হিন্দুদের পক্ষ থেকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ সৃষ্টি এবং মুসলমানদের জানমালের প্রভূত ক্ষতিসাধন করে মুশরিকরা। মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে বার বার সমঝোতা করার চেষ্টা করা হলেও কংগ্রেস তথা হিন্দুত্ববাদীদের হটকারিতায় সেটা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর সাতটি প্রদেশে আড়াই বছর কংগ্রেসের হিংস্র শাসন মুসলিমদের আলাদা রাষ্ট্রের কথা তীব্রভাবে ভাবতে শিখায়।

হিন্দুস্থানে মুশরিকরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ও শক্তিশালী হওয়ার কারণে মুসলিম জাতিকে হয় তাদের দাসানুদাস বানিয়ে রাখতে অথবা নির্মূল করতে চায়। এ লক্ষ্য হাসিলে জন্যেই কংগ্রেসের দাবী ছিল এই যে এ উপমহাদেশের অধিবাসীদের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং ব্রিটিশ সরকারকে তার হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। হিন্দু সভ্যতা সংস্কৃতি ও হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ এবং হিন্দুরামরাজ্য স্থাপনই ছিল কংগ্রেসের একমাত্র লক্ষ্য। কংগ্রেস ও তার কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন আচরণে এ বিশ্বাস মুসলমানদের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয় এবং এ কারণেই মুসলমানগণ পাকিস্তান আন্দোলন করতে বাধ্য হন।

যাই হোক পাকিস্তান আন্দোলনের শুরুর দিকে মাওলানার সাথে জমিয়ত পত্রিকার মালিক জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতাদের সাথে দ্বিমত হয়। জমিয়ত নেতারা পাকিস্তান আন্দোলন ও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে থাকেন। মাওলানা তাদের এই মুশরিকপ্রধান কংগ্রেসপন্থী কার্যক্রম পছন্দ করেননি। মাওলানা ১৯২৮ সালে জমিয়ত পত্রিকা থেকে সরে দাঁড়ান।

১৯৩৮ সালে দেওবন্দের প্রধান নেতা হুসাইন আহমদ মাদানী ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বা ‘যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। ওনার এই বই প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলিমদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একদিকে তাদের মন সায় দিচ্ছে পাকিস্তানের প্রতি অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় আলেম বলছেন হিন্দুদের সাথে থাকার কথা। তার এই বইয়ের বিপরীতে কিছু দেওবন্দী নেতা বক্তব্য দিলেও তার যুক্তি খণ্ডন করে কেউ কিছু করতে পারে নি।

অবশেষে তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে আদ্যোপান্ত গবেষণানির্ভর বই 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' লিখেন মওলানা মওদূদী রহ.। সেই বইটি বাংলায় “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” নামে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সেই বইতে হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এই ধারণার সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।

দ্বি-জাতি তত্ত্ব হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোন তত্ত্ব নয়। এ তত্ত্ব মানুষের সৃষ্টি থেকে, বিশেষ করে ইসলামের আবির্ভাব থেকে সমাজে সুস্পষ্ট ছিল। রসুল সা. বলেছেন “আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহেদা”- সমস্ত কুফর জাতি এক জাতি এবং “আল মুসলেমু আখুল মুসলিম” এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। এ এক চরম সত্য।

আমাদের আজকের বই 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' বা 'ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ'। বইটি অনুবাদ করেছেন বাংলার বিখ্যাত পণ্ডিত মুমতাজুল মুহাদ্দিসিন মাওলানা আব্দুর রহীম রহ.। এই বইয়ের মাধ্যমে দেওবন্দের সাথে মাওলানার যে বিরোধ শুরু হয়েছে তা আজো চলমান। মাওলানাকে তাকফির করা শুরু হয়েছে এখান থেকেই। তখনো জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৪১ সালে জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হলে জামায়াতে ইসলামও তাকফিরের মুখোমুখি হয়।

বইটিতে মোটাদাগে ৬ টি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
১. ইসলাম ও জাতীয়তা
২. জাতীয়তার মৌলিক উপাদান
৩. ইসলামের মিলনবাণী
৪. একজাতিত্ব ও ইসলাম
৫. জাতীয়তাবাদ কি মুক্তি দিতে পারে?
৬. ইসলামী জাতীয়তার তাৎপর্য

প্রথমত মাওলানা জাতির সংজ্ঞা, জাতীয়তা গঠনের উপকরণ ইত্যাদি আলোচনা করেন। এই জাতীয়তা মানবিকতা ধ্বংস করে বিপর্যের উৎস হিসেবে কাজ করে মাওলানা তা আলোচনা করেছেন একসাথে এটাও দেখিয়েছেন এটা জাহেলি বিদ্বেষ তৈরি করে। আর ইসলাম এর কোনোটাই সাপোর্ট করে না। বরং জাতীয়তাবাদের জাহেলিয়াতকে নির্মূল করা ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

দ্বিতীয়ত মাওলানা জাতীয়তাবাদের মোলিক উপকরণ নিয়ে আলোচনা করেন। গোত্রবাদ, স্বদেশিকতা, ভাষাগত জাতীয়তা, বর্ণবৈষম্য, অর্থনৈতিক জাতীয়তা, রাজনৈতিক জাতীয়তা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেন। একইসাথে মাওলানা বিদায় হজ্বের ভাষণ ও রাসূল সা. অন্যান্য বক্তব্য থেকে জাতীয়তা বিষয়ে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরেন। এই গোত্রবাদের সাথে ইসলামের যে দ্বন্দ্ব তা তুলে ধরেন। আভিজাত্যের অহমিকা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ইসলামের বক্তব্য উপস্থানপন করেন।

মাওলানা বলেন, জাহেলী যুগের এ বর্বরতাকে নির্মূল করার পর ইসলাম বিজ্ঞানের ভিত্তিতে জাতীয়তার এক নতুন ধারণা উপস্থাপিত করেছে। ইসলামী জাতীয়তার মানুষে মানুষে পার্থক্য করা হয় বটে; কিন্তু তা জড়, বৈষয়িক ও বাহ্যিক কোনো কারণে নয়; তা করা হয় আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে। মানুষের সামনে এক স্বাভাবিক সত্যবিধান পেশ করা হয়েছে-তার নাম হচ্ছে ইসলাম। আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য, হৃদয় মনের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা, কর্মের অনাবিলতা-সততা ও ধর্মানুসরণের দিকে গোটা মানবজাতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে যে, যারা এ আমন্ত্রণ কবুল করবে তারা একজাতি হিসাবে গণ্য হবে। আর যারা তা অগ্রাহ্য করবে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতির অন্তর্ভূক্ত হবে। অর্থাৎ মানুষের একটি হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের জাতি এবং তার সমগ্র ব্যক্তি সমষ্টি মিলে একটি উম্মাত وَكَذَالِكَ جَعَلناكم اُمَّةً وَّسَطًا অন্যটি হচ্ছে কুফর ও ভ্রষ্টতার জাতি। তার অনুসারীরা নিজেদের পারস্পারিক মতদ্বৈততা ও বৈষম্য সত্ত্বেও একই দল একই জাতির মধ্যে গণ্য। وَاللهُ لاَ يَهْدىِ القَومَ الكافِرِيْنَ

তৃতীয়ত মাওলানা ইসলামে ঐক্যের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সুদূর প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যের সীমান্ত পর্যন্ত মুসলমানদের যে অখণ্ড সংহতি বিদ্যমান, এটাও আলাহরই অপার অনুগ্রহের সুস্পষ্ট নিদর্শন সন্দেহ নেই। বিশ্বব্যাপী ঐক্য ও সংহতি স্থাপন একমাত্র চূড়ান্ত কথা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই সম্ভব। এছাড়া আর যত মত ও পথ রয়েছে, তা সবই ভুল-সবই বিচ্ছেদ ও বিভেদ সৃষ্টিকারী, এটা নিঃসন্দেহ। বস্তুত এ পাঁচটি বিষয়ের প্রতি সংশয়ের লেশহীন বিশ্বাস স্থাপনের নামই হচ্ছে মিলনবাণী।

চতুর্থত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীর বইয়ের প্রসঙ্গ এনে সেই বইয়ের ভুল ও অবাস্তব কথাগুলো ধরিয়ে দেন। মাওলানা ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বই থেকে হুসাইন মাদানীর কথা, যুক্তি ও পয়েন্ট উল্লেখপূর্বক তাঁর লেখাকে খন্ডন করেছেন। তার এই যুক্তি খন্ডন শুধু উপমহাদেশের আলেম সমাজ নয়, দেওবন্দীদের ওপরও প্রভাব বিস্তার করেছে। দেওবন্দী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতি মুসলিমদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এই বইয়ের প্রভাবে জমিয়তে উলামায় হিন্দ থেকে বের হয়ে আসেন মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে একটি দল। তারা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে নতুন দল করেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবিও এই নতুন দলের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।

পঞ্চমত মাওলানা আলোচনা করেন, 'জাতীয়তাবাদ কী আসলে মুক্তি দিতে পারে?' এই প্রসঙ্গে। এই আলোচনার প্রেক্ষাপট মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধি। রেশমি রুমাল আন্দোলনের নেতা উবাইদুল্লাহ সিন্ধি দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবন যাপনের পর কলকাতায় একটা সভায় ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণে তিনি মুসলিমদের জাতীয়তাবাদী হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। ইউরোপীয় স্টাইল অনুসরণের জন্য আহ্বান জানান। মাওলান তার এই ধারণার বিরোধীতা করে বক্তব্য রাখেন। সেই আলোচনায় মাওলানা ইসলাম ও জাতীয়তাবাদের মধ্যে পার্থক্য, ইউরোপের প্রকৃত অবস্থা, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের স্বরূপ ও পরিণতি এবং উবাইদুল্লাহ সিন্ধি প্রস্তাবিত বিদেশী পোষাক গ্রহনের বিরোধীতা করেন।

ষষ্ঠত এবং সবশেষে মাওলানা ইসলামী জাতীয়তার তাৎপর্য উল্লেখ করেন। তিনি এখানে ইসলামী জাতীয়তার ভিত্তি 'ঈমান' তা উল্লেখ করেন। ঈমানের কারনে আমাদের চিন্তা ভাবনা ও আচরণের পার্থক্য সূচিত হয় ও আমরা আলাদা জাতিতে পরিণত হই।

মাওলান বলেন, কুরআন মজীদ ভূ-পৃষ্ঠের এ বিপুল জনতার মধ্যে কেবল দুটি পার্টিরই অস্তিত্ব স্বীকার করেছে : একটি হচ্ছে আল্লাহর দল (حـــزب الله) আর অপরটি হচ্ছে শয়তানের দল (حـــزب الشيطان) শয়তানের দলের পরস্পরের মধ্যে নীতি ও আদর্শের দিক দিয়ে যতোই পার্থক্য ও বিরোধ হোক না কেন, কুরআনের দৃষ্টিতে তা সবই এক। কারণ, তাদের চিন্তা, পদ্ধতি ও কর্মনীতি কোনো দিক দিয়েই ইসলামী নয়। আর খুঁটিনাটি ও ক্ষুদ্র ব্যাপারে মতবিরোধ সত্ত্বেও তারা সকলেই এক শয়তানের পদাংক অনুসরণ করতে সম্পূর্ণরূপে একমত।

বইটি দারুণ একটি বই, যা আপনার চিন্তাজগতকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করবে। বইটি পড়ুন, মুসলিমদের ঐতিহাসিক পটভূমি জানুন। যে বিষয়কে নিয়ে মওদূদী ও দেওবন্দের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়েছে সে সম্পর্কেও জানা যাবে এই বই থেকে।

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ
লেখক : সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী
অনুবাদক : মুহাম্মদ আবদুর রহীম
প্রকাশনী : আধুনিক প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ১৩৩
মুদ্রিত মূল্য : ৬৫
জনরা : থিয়োলজি

২১ জুলাই, ২০২২

ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?


১৯৪০ সালের কথা। আমাদের উপমহাদেশ তখন স্বাধীনতার জন্য উত্তাল। স্বাধীনতা দাবীদাররা আবার দুইভাগে বিভক্ত। মুসলিমরা আলাদাভাবে স্বাধীনতা চায়। তারা পাকিস্তান নামে আলাদা রাষ্ট্র করতে চায়। এই দাবীর পক্ষে রাজনৈতিক শক্তি নাম 'মুসলিম লীগ'।

অন্যদিকে হিন্দুরা এক ভারত চায়। ভারত ভাঙ্গুক এটা তারা চায় না। এই দাবীর পক্ষে রাজনৈতিক শক্তি হলো 'কংগ্রেস'। মুসলিমরা গত ৫০ বছরে কংগ্রেসের ভয়ংকর বর্ণবাদী আচরণে নিশ্চিত হয়েছে ভারত ইংরেজদের থেকে স্বাধীন হয়ে কংগ্রেসের হাতে পড়লে পরস্থিতি আরো ভয়ংকর হবে। মুসলিমরা পাইকারিভাবে নিধন হবে।

শুনতে ভিন্নরকম শোনালেও হিন্দুপ্রধান সংগঠন কংগ্রেসের মতামতের সাথে একাত্মতা পোষণ করলো দেওবন্দী আলেমদের মূল সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। আর তাদের নেতা হুসাইন আহমদ মাদানী ১৯৩৮ সালে ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বা ‘যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। ওনার এই বই প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলিমদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একদিকে তাদের মন সায় দিচ্ছে পাকিস্তানের প্রতি অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় আলেম বলছেন হিন্দুদের সাথে থাকার কথা। তার এই বইয়ের বিপরীতে কিছু দেওবন্দী নেতা বক্তব্য দিলেও তার যুক্তি খণ্ডন করে কেউ কিছু করতে পারে নি। অন্যদিকে আলিয়া মাদ্রাসার আলেমদেরকে তো দেওবন্দীরা পাত্তাই দিত না।

অবশেষে তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' নামে গবেষণানির্ভর বই লিখেন মওলানা মওদূদী রহ.। সেই বইটি বাংলায় “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” নামে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সেই বইতে হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এই ধারণার সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষত মুসলিম লীগ একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি পায়।

কিন্তু মাওলানা মুসলিম লীগে যোগদান করেননি। তিনি মুসলিম লীগের সাথে এই বিষয়ে একমত যে, মুসলিমদের আলাদা রাষ্ট্রের দরকার আছে। এটা খুবই জরুরি। কিন্তু মুসলিম লীগের নেতারা সেই রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, যে কর্মসূচি ঘোষণা করছে তা একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সঠিক পদক্ষেপ নয়। সবচেয়ে বড় কথা একটি ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য যে যোগ্যতাসম্পন্ন লোকের দরকার, মুসলিম লীগ সেই লোক তৈরি করছে না এবং লোক তৈরির কর্মসূচিও তাদের নেই। এই নিয়ে মুসলিম লীগের সমালোচনা করেছেন তিনি। মাওলানার এই অবস্থানকে কেউ কেউ পাকিস্তানবিরোধী অবস্থান বলে মিথ্যাচার করেন।

যাই হোক আমরা মূল প্রসঙ্গে আসি। ১৯৪০ সালে মাওলানা রাষ্ট্রের বিষয়ে তাঁর অবস্থান ক্লিয়ার করেন। এটা সেসময়ের কথা, জামায়াতে ইসলাম তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে মাওলানা একজন ইসলামিক স্কলার হিসেবে সারা হিন্দুস্থানজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন। ১২ই সেপ্টেম্বর আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রেচি হলে ইতিহাস ও সংস্কৃতি সংসদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সভায় মাওলানা মওদূদীকে অতিথি করা হয়। সে প্রোগ্রামে অতিথির বক্তব্যে মাওলানা মওদূদী ইসলামী রাষ্ট্র গঠন কীভাবে হবে তা নিয়ে আলোচনা করেন।

তাঁর এই বক্তব্য আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বই আকারে বের করে। বইটির নাম হলো 'ইসলামী হুকুমাত কিসতারাহ কায়েম হোতি হ্যায়'। এই বইটি উপমহাদেশে ব্যাপক তোলপাড় করে। বিচক্ষণ মুসলিমরা এই বইটিকে সাদরে গ্রহণ করে। এই বইটি বাংলায় অনুবাদ হয় প্রথমে 'ইসলামী বিপ্লবের পথ' এই নামে। পরে সংশোধন করে 'ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?' এই নামে প্রকাশিত হয়। বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন আব্দুস শহীদ নাসিম।

মাওলানা মওদূদীর এই বক্তব্যকে ৬টি ভাগে ভাগ করা যায়। বলা যায় তিনি ৬ টি বিষয়ে কথা বলেছেন।
১. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন।
২. আদর্শিক রাষ্ট্র।
৩. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র ।
৪. ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি।
৫. অবাস্তব ধারণা-কল্পনা।
৬. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মনীতি।

১. রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্বাভাবিক বিবর্তন:
রাষ্ট্রব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। একটা সমাজের মানুষের চিন্তা চেতনা, সংস্কৃতি, আচরণ এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক বিবর্তন হয়। অতএব হুট করে একটি জাহেলি সমাজকে ইসলামী সমাজে পরিণত করা যায় না। এর জন্য প্রথমে প্রয়োজন ঐ রাষ্ট্রের মানুষের পরিবর্তন। মাওলানা এখানে বুঝাতে চেয়েছেন শুধু একটি ভৌগলিক সীমারেখা নির্ধারণ করলেই ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যায় না। বরং এর জন্য জনগণকে প্রস্তুত করতে হবে।

২. আদর্শিক রাষ্ট্র:
ইসলামী রাষ্ট্র মানে মুসলিমদের রাষ্ট্র নয়। মুসলিমরা রাষ্ট্র কায়েম করলে সেটি ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যায় না। ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে সেটি যে রাষ্ট্রে ইসলামের বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়। এখানে জাতীয়তাবাদের লেশমাত্র থাকবে না। আদর্শিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গোটা মানবজাতিকে তার আদর্শ গ্রহন করে অজাতীয়তাবাদী বিশ্বজনীন রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানায়।

মাওলানা তাঁর কাঙ্খিত রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন,
১. রাষ্ট্রের আদর্শ হবে ইসলাম
২. সংকীর্ন জাতীয়তাবাদ হতে সম্পূর্ন মুক্ত
৩. অন্যান্য রাষ্ট্রনীতি হতে সম্পূর্ণ পৃথক।
৪. জনগনের অধিকার সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা।
৫. যোগ্যতার বলে যে কেউ শাসক হতে পারে।
৬. উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
৭. সার্বভৌমত্ব হবে আল্লাহর, প্রতিনিধিত্ব হবে জনগনের।

৩. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের প্রতিনিধিত্ব ভিত্তিক রাষ্ট্র:
মাওলানা বলেন, আমরা যে রাষ্ট্র কায়েম করতে চাই সেখানে সার্বভৌমত্ব হবে একমাত্র আল্লাহর। তাঁর বিধান, আইনই শেষ কথা। এই রাষ্ট্রের প্রকৃত স্বরূপ হচ্ছে, এখানে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করবে। এই খিলাফাত প্রতিষ্ঠার কাজে এমন সব লোকই অংশীদার হবে, যারা এই আইন ও বিধানের প্রতি ঈমান আনবে এবং তা অনুসরণ ও কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এই রাষ্ট্রের সকল কাজের জন্য সামষ্টিকভাবে আমাদের সকলকে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমাদের প্রত্যেককে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এ রাষ্ট্রের পরিচালকদের অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকবে। তারা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের মালিক নয়, আমানতদার হবে। শাসকগণ জনগনের কল্যান চিন্তায় বিনিদ্র রজনী কাটাবে। শাসক নির্বাচিত হবে জনগণের মতামত নিয়ে। বংশানুক্রমিক বা জবরদস্তি করে ক্ষমতা দখল করা যাবে না।

৪. ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি:
মাওলানা বলেন, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য প্রথমে এমন একটি আন্দোলন প্রয়োজন যে আন্দোলনের মধ্যে ইসলামের প্রাণশক্তির সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। এখানে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় এমনসব বিশেষজ্ঞ তৈরি করবে যারা নিজেদের মন মানসিকতা, ধ্যানধারনা ও চিন্তা দর্শনের দিক থেকে হবে পূর্ণ মুসলিম। যাদের ইসলামের মূলনীতির ভিত্তিতে বাস্তবধর্মী এক পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নকশা তৈরি করার থাকবে পূর্ণাঙ্গ যোগ্যতা।

৫. অবাস্তব ধারণা কল্পনা:
কিছু লোকের ধারণা মুসলমানরা সংগঠিত হলেই তাদের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মূলত জাতীয়তাবাদী চিন্তা থেকে এই ধারণার উদ্ভব। সত্যিকারভাবে জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। তারা ভাবে “মুসলমান” একটি বংশগত বা ঐতিহাসিক জাতির ধারণা। মুসলিমদের ঐক্যের মাধ্যমে সেই জাতিটিরই কেবল উন্নতি সাধন করা এবং একটি জাতীয় রাষ্ট্র অর্জিত হতে পারে। কিংবা কমপক্ষে দেশ শাসনে ভাল একটা অংশীদারিত্ব লাভ হতে পারে। কিন্তু ইসলামী বিপ্লব বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিক দিয়ে এটাকে প্রথম পদক্ষেপও বলা যেতে পারে না। ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন ইসলামকে আদর্শ হিসেবে ধারণ করা। ইসলামী বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনা করা। মাওলানা এখানে মূলত মুসলিম লীগের সমালোচনা করেছেন। মুসলিম লীগ ভেবেছে মুসলিমদের রাষ্ট্র হলেই সেটা ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যাবে। কিন্তু মাওলানা বলেন, এর দ্বারা মুসলিমদের উপকার হতে পারে, একটি ভালো শাসন পাওয়া যেতে পারে তবে কোনোভাবেই এটি ইসলামী রাষ্ট্র হবে না। এই রাষ্ট্র দিয়ে খিলাফতের দায়িত্ব পালন হবে না।

৬. ইসলামী আন্দোলনের সঠিক কর্মনীতি:
সবশেষে মাওলানা আমাদের কর্মনীতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এক আল্লাহর একচ্ছত্র ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে মানবজীবনের পরিপূর্ণ ইমারত রচনা করার প্রচেষ্টা ও আন্দোলনকে বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে বলা হয় ইসলাম। আর এর জন্য মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সা:) এর অনুসৃত পথেই ইসলামী আন্দোলনের কর্মনীতি পরিচালনা করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই যেখানে আল্লাহর বিধান কায়েম হবে তথা তাঁর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। আর মুহাম্মদ সা.-এর সীরাত থেকেই এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি আমরা গ্রহণ করবো।

এটি একটি দারুণ বই! ইসলামী রাষ্ট্র যারা প্রতিষ্ঠা করতে চান তাদের জন্য এটা টেক্সট বুক। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের এটা পড়া দরকার। যারা এখনো পড়েননি তারা অবশ্যই পড়বেন। আপনার চিন্তা পরিশুদ্ধ হবে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যারা চেষ্টা করছেন তাদের অন্তরে যদি চরমপন্থী ধারণা থাকে তবে তা দূর হবে ইনশাআল্লাহ।

#বুক_রিভিউ
বই : ইসলামী রাষ্ট্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
লেখক : সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী
অনুবাদক : আব্দুস শহীদ নাসিম
প্রকাশনী : শতাব্দী প্রকাশনী
পৃষ্ঠা : ৪৮
মুদ্রিত মূল্য : ২৪
জনরা : থিয়োলজি