বঙ্গকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বঙ্গকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

৫ জানু, ২০২১

বঙ্গকথা পর্ব-৭৬ : মেজর জিয়াউর রহমান ও গণহত্যা প্রসঙ্গ



১৯৭১ সালে মার্চের শুরু থেকেই ঢাকার চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে চট্টগ্রামে। এর কারণ চট্টগ্রামে ছোট বড় প্রচুর কারখানা। আর এসব কারখানায় কাজ করে হাজার হাজার ভারত থেকে আসা অবাঙালি। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা দেশে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য এসব বিহারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ৪ মার্চ থেকে শুরু হয় লীগ কর্তৃক অবাঙালি গণহত্যা এবং সেটা কন্টিনিউ করে।  

সেনাবাহিনীকে কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তারা ঘটনার সাথে যুক্ত ছিল না। জিয়া চট্টগ্রামের উপঅধিনায়ক হলেও তার সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা, নিউক্লিয়াসদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল না বলেই প্রতীয়মান হয় আমার কাছে। এজন্য তিনি ঢাকার খবর, বিদ্রোহের নির্দেশনার জন্য ক্যাপ্টেন অলি, ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান ও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের ওপর নির্ভর করেছিলেন। [১]

চট্টগ্রামের বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেয়ার আগে মেজর জিয়া ক্যাপ্টেন খলিকুজ্জামানের কাছে পরিস্থিতি ও নির্দেশনা কিছু জানলে তাকে জানাতে বলেছেন। [২]  
ঘটনার দিন অর্থাৎ ২৫ মার্চ সকাল থেকে আব্দুর রশিদ জানজুয়ার নির্দেশে মেজর মীর শওকত আলী এক কোম্পানি সেনা নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ‘সোয়াত' জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের কাজের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার আনসারিও সেখানে ছিলেন। সন্ধ্যার পর রশিদ জানজুয়া ও শওকত শহরে রেজিমেন্টের ইউনিট লাইনে ফিরে আসেন। এই পুরো ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের বর্ণনায়। সেদিনের বিদ্রোহীদের মধ্যে তিনিও একজন। 

//জানজুয়া আমাকে ডাকলেন। বললেন, 'খালেক, ইউ হ্যাভ টু গো টু দ্য পোর্ট টু টেক ওভার কমান্ড অব দ্য এরিয়া।' এমন সময় মেজর জিয়া সেখানে উপস্থিত হন। জিয়াকে দেখেই জানজুয়া বললেন, 'জিয়া, ইউ গো ফার্স্ট, খালেক উইল ফলো ইউ। জিয়া উঠলেন। সঙ্গে দুজন অবাঙালি অফিসার, সে. লে. হুমায়ুন আর সে. লে. আজম। আমি ওপাশে গেলাম। জিয়া বললেন, ‘খালেকুজ্জামান, কিছু শুনলে জানিয়ো।'

গাড়ি চলে গেল । জানজুয়া তার বাসা আলহামরা বিল্ডিংয়ে চলে গেলেন। মীর শওকত চলে গেলেন মেসে। ডিউটি অফিসার ক্যাপ্টেন অলি আহমদ চলে গেল ওপরে। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। তখন অলি ওপর থেকে বলল, স্যার, আপনার একটা ফোন আসছে। আমি গেলাম । বাই দ্যাট টাইম অলি হ্যাজ টড। উনি ছিলেন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অব স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক মি. কাদের (আবদুল কাদের)। 

অলির সঙ্গে কী কথা হয়েছে জানি না। বললেন, ‘ঢাকায় তো ইপিআরের ওখানে ফায়ারিং শুরু হয়ে গেছে। আর্মি হ্যাজ রেইডেড ক্যাম্পস। তোমরা কী করছ?’ আরও কিছু বললেন। আমাকে এক্সাইটেড করলেন। আমি অলিকে বললাম, তোমাকে কী বলেছে জানি না । ডিউটি করো ওখানে। কিপ আ ট্র্যাক অন দিস। আই অ্যাম গোয়িং টু গেট ব্যাক আওয়ার বস জিয়া।
পিক আপ এল । আমি কয়েকজন গার্ড নিলাম। জিয়াকে দেওয়ানহাট ওভারব্রিজের সামনে পেলাম। রাস্তায় ব্যারিকেড ছিল। ওখানে আল্লাহর রহমতে ওইটা (ব্যারিকেড) ছিল। জিয়া, লাইক আ ড্যান্ডি ম্যান, স্মার্ট, হাতে ফিল্টার উইলস, দ্যাট ফেমাস উইলস। সিগারেট খাচ্ছেন। বললেন, ইয়েস খালেক, হোয়াট হ্যাপেনড? আই সেইড, ফায়ারিং হজ স্টার্টেড।

 ইপিআর ক্যাম্প হ্যাজ বিন অ্যাটাকড... ব্লা ব্লা ব্লা। উনি তখন চিৎকার করে বললেন,
- হোয়াট শ্যাল উই ডু? 
- ইউ নো বেটার।
- ইন দ্যাট কেস, উই রিভোল্ট অ্যান্ড শো আওয়ার এলিজিয়েন্স টু দ্য গভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ।
ইউনিট লাইনে ফিরে আসার পর ল্যান্স নায়েক শফির হাত থেকে রাইফেলটা হাতে নিয়ে বললেন, হুমায়ুন, আজম (জুনিয়র অবাঙালি অফিসার) কাম এলংগ। শফি, তোমার স্যারদের কোয়ার্টার গার্ডের ভেতর নিয়ে যাও।' দে অয়ার স্টান্ট। কোয়ার্টার গার্ডের ভেতরে নিয়ে গেল। জিয়া বললেন, ‘খালেক, লেট মি গো অ্যান্ড গেট দিস বাস্টার্ড (জানজুয়া)।' 
জিপে করে আলহামরা বিল্ডিংয়ে গেলেন। জানজুয়া কেইম আউট। জিয়া জানজুয়াকে বললেন :
খালেক অ্যান্ড অলি উড লাইক টু টক টু ইউ। ইউ কাম টু দ্য ইউনিট লাইন। দে আর ওয়েটিং ফর ইউ টু টক।
চলো, চলতা হু।

জানজুয়াকে গাড়িতে বসালেন। জিয়া গাড়ি চালালেন । পেছনে যে সিপাই ছিল, সে বন্দুক ধরে রেখেছিল, সো দ্যাট হি ডাজ নট রান অ্যাওয়ে । (ইউনিট লাইনে) নামার সঙ্গে সঙ্গে জিয়া এক আজব কাণ্ড করলেন। ওখানে শফি ছিল । তার হাত থেকে রাইফেলটা নিলেন, পয়েন্টেড দ্য ব্যারেল অ্যাট হিম। বললেন, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।' জানজুয়া হতভম্ব হয়ে গেছে। 
(জিয়া) বললেন, ‘খালেক, টেক হিম। আমি জানজুয়াকে কোয়ার্টার গার্ডে নিয়ে গেলাম। বাই দ্যাট টাইম কোয়ার্টার গার্ডের মধ্যে সে, লে. আজম, সে. লে. হুমায়ুন, আহমেদ দ্বীন বলে একজন ক্যাপ্টেন, পাঞ্জাবি অফিসার। আজম, হুমায়ুন, আহমদ দ্বীন অয়ার টেকেন আপ। অ্যান্ড দে অয়ার এলিমিনেটেড ইন দ্য মেলু।

মেজর জিয়া সার্বিক পরিস্থিতি বলে সবার কাছ থেকে আনুগত্য চাইলেন, তোমরা কি আমার সঙ্গে আছ'? সবাই এক আওয়াজে বলেছিল, আমরা আছি।'
জিয়া শওকতকে বলেছিলেন, একটি গাড়ি নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে মাইক দিয়ে বলে দাও যে আমরা, এইট বেঙ্গল হ্যাজ রিভোল্টেড ফর দ্য কজ অব বাংলাদেশ।' বিফিটিং ল্যাঙ্গুয়েজে বলার জন্য। হি ডিড দ্যাট। জিয়া অফিসে বসে...হি ওয়াজ রিংগিং আপ-এমপি, ডেপুটি কমিশনার আর যাদের ফোন করে পায় নাই, অপারেটরকে বলেছেন, সবাইকে বলে দিন এইট বেঙ্গল রিভোল্ট করেছে বাংলাদেশের পক্ষে।'

তারপর আমরা ইউনিট লাইন থেকে বেরিয়ে গেলাম। তখন রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে গেছে। আমরা পটিয়া পর্যন্ত যাই। তখন কিছু কিছু অফিসার ডেপ্লয়েড হয়ে গেছেন। পটিয়া যেহেতু অলির জায়গা, তিনি সবকিছু চিনতেন। এতে আমাদের সুবিধা হয়েছে। বন্দোবস্তটা উনি ভালোভাবেই করে রেখেছিলেন। সেখান থেকে আমাদের বলে দেওয়া হলো, পজিশন, কে কোথায় যাবেন। আমাকে বলা হলো রেডিও স্টেশনটা প্রটেকশন দেওয়ার জন্য, রেডিও স্টেশন থেকে কর্ণফুলীর পূর্বপার পর্যন্ত। [৩]

আমার অনুমান কর্ণেল অলি নিউক্লিয়াস অথবা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংযুক্ত ছিলেন। কারণ জিয়াকে তিনিই বিদ্রোহ করতে উস্কে দিয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আব্দুল কাদেরের বরাত দিয়ে। এরপর আরেকটি কথা বলে জিয়াকে নিয়ে চলে গেলেন কক্সবাজার। অলির কাছে তথ্য ছিল, বিদ্রোহ শুরু হলে কক্সবাজারে অবস্থানরত ৭ম নৌবহরের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। 

মার্কিনীদের সহায়তা পাওয়ার জন্য অলি ও জিয়া একটি জিপ নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন। এখানেও অলি একজন আওয়ামী নেতা সরোয়ার আলমকে তাদের সাথে যুক্ত করে নেন যাতে জিয়া স্বাধীন সিদ্ধান্ত না নিতে পারেন। সরোয়ার আলম ছিলেন কক্সবাজারের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। 

এদিকে কর্নেল অলির সাথে যোগাযোগ রাখেন মাহমুদ নামের এক ভারতীয়। সম্ভবত মাহমুদ হোসেন তার ছদ্ম নাম। মাহমুদ পরিচয় দিতেন তিনি ভারতের বিজেপি নেতা মোরারজি দেশাই-এর ভাইজি জামাই। বাংলাদেশে তার আগমন লোকসংগীত কালেকশনে। এই পরিচয়ে তিনি চট্টগ্রামের বহু গণ্যমান্য মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু বাঙালিদের বিদ্রোহ শুরু হয়ে গেলে তার রাজনৈতিক পরিচয় বের হয়ে আসে। তিনি কর্নেল অলি থেকে কয়েকজন সৈন্য নিয়ে আগেই কক্সবাজার রওনা হন। 
মাহমুদ হোসেনই জিয়াকে মার্কিনীদের সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেবার কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। কক্সবাজার আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা মাহমুদ হোসেন ও তার সাথে সৈন্যদের পাক সেনা মনে করে পিটিয়ে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখে।[৪] 

মেজর জিয়া ও অলি আহমেদ কক্সবাজার গিয়ে যার বাসায় যাওয়ার কথা সেখানে গিয়ে কাউকে পান নি। মাহমুদের করুণ পরিণতি দেখে তারা অত্যন্ত দুঃখিত হন। এদিকে তারা খবর নিয়ে জানতে পারেন আশে পাশে বা কাছাকাছি কোথাও মার্কিন ৭ম নৌ-বহর নেই। ব্যর্থ মনোরথে তারা চট্টগ্রামের পটিয়ায় ফিরে এলেন। 

এর মধ্যে চট্টগ্রামের আওয়ামী নেতাদের সাথে মিটিং হয় তার। অতঃপর ৩০ মার্চ আবার কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে এসে আবারো স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। এবার শেখ মুজিবের নামে ঘোষণা করেন। এভাবে তিনি চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। [৫]

মেজর জিয়া বিদ্রোহ করার আগে চট্টগ্রামে ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম আগেই বিদ্রোহ করেন। ঢাকায় রাত ১০টা থেকে ইপিআরের বাঙালি অফিসার ও সৈনিকদের দায়িত্বমুক্ত ও নিরস্ত্র করে ব্যারাকে অবস্থান করার জন্য নির্দেশ আসে। ইপিআর কন্ট্রোল রুম থেকে মেজর দেলোয়ার ও কুতুবউদ্দিন ওয়্যারলেসে বার্তা পাঠাতে থাকে তোমরা যে যেখানে আছো একশনে যাও। 

'নিরস্ত্র করার সংবাদ' গুজব সৃষ্টিকারীদের মাধ্যমে হত্যা করার সংবাদে পরিণত হয়। সাড়ে দশটার পর মেজর দেলোয়ার আর কুতুবুদ্দিনের বার্তা পাওয়া যায়নি। অতএব তাদেরকেও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে হলো। চট্টগ্রামে ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম ঢাকার বার্তা পেয়ে বিদ্রোহ শুরু করেন। এরপর তিনি তার অধীনস্থ অফিসার ও সৈনিকদের কাছে বার্তা পাঠান 'ব্রিং সাম উড ফর মি'। এতে তার অধীনে থাকা সব বাঙালি সেনাসদস্য বিদ্রোহ করে। এরপর তিনি অবাঙালি প্লাটুন কমান্ডার হায়াতকে এরেস্ট করেন। [৬][৭] 

সমশের মুবিন চৌধুরি বলেন, রফিকুল ইসলামের বার্তা পেয়ে কাপ্তাইতে দায়িত্বরত ইপিআরের ক্যাপ্টেন হারুন ৬৫ জন সেনা নিয়ে বিদ্রোহ করলেন এবং মেজর জিয়ার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করলেন। জিয়া তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। ২৯ মার্চ সমশের ও হারুন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে চকবাজারে এক খণ্ডযুদ্ধে লিপ্ত হলেন। 
[৮][৯]

গণহত্যা প্রসঙ্গ 
চট্টগ্রামে দুই ধাপে গণহত্যা হয়। প্রথমত হয় মার্চে মূলত শহর এলাকায়। দ্বিতীয়ত হয় এপ্রিল ও মে মাসে শহরের বাইরে। শহর এলাকায় হয় মার্চ মাসে। হালিশহর, পাহাড়তলী, আগ্রাবাদ, বায়েজিদ, শেরশাহ কলোনী, ওয়্যারলেস রেলগেইট, কালুরঘাট ইত্যাদি স্থানে গণহত্যা হয়। ২৬ মার্চ থেকে সেনাবাহিনী শহর দখল নিতে থাকলে চটগ্রাম শহরে অবাঙালিদের নিরাপত্তা জোরদার হতে থাকে। কিন্তু ইতোমধ্যে সারা মার্চ জুড়ে হাজার হাজার বেসামরিক বিহারি খুন হতে থাকে। এই ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় কুতুবউদ্দিন আজিজের লেখা 'ব্লাড এন্ড টিয়ার্স' বইতে। এখানে অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে সারাদেশের বিহারী হত্যা একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। [১০] 

চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ধাপের অবাঙালি গণহত্যা শুরু হয় চট্টগ্রাম শহরের বাইরে। এই গণহত্যায় নেতৃত্ব দেন মেজর জিয়ার কাছে আনুগত্যের শপথ করা বিদ্রোহী বাঙালি সেনাসদস্যেরা। এর মেয়াদকাল প্রায় দুই মাস। যতক্ষণ না পুরো দেশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে না আসে। রাঙামাটির কাপ্তাইতে ইপিআর ক্যাপ্টেন হারুন তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে অবাঙালি ইপিআর সদস্য এবং তাদের পরিবারের ওপর গণহত্যা চালায়। ২৫ মার্চের পরের দুই সপ্তাহ ছিল ভয়াবহ। যেখানেই অবাঙালিদের দেখা মিলছিল, সেখানেই তাদের ঘিরে ধরে হত্যা করা হচ্ছিল। ইপিআর ও পুলিশের কিছু লোক এই হত্যাকান্ড চালাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল স্থানীয় কিছু লোক। [১১]

ফারুক আজিজ খান আর বলেন, রাঙামাটি থেকে দিনে ও রাতে বাস বোঝাই করে ইপিআরের সদস্যদের সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। অবাঙালি ইপিআরের সদস্যরা ও তাদের পরিবার তাদেরই বাঙালি সহকর্মীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হতে থাকে। অনেককে হাত-পা বেঁধে খাদের পানিতে ফেলে দেওয়া হয় বলেও শুনতে পাই। রাতে যখন তারা বাস-ট্রাকে চেপে চট্টগ্রামে রওনা হতো, তখন যে আওয়াজ হতো, তা ছিল রীতিমতো রোমহর্ষক। অবাঙালিদের হত্যা করার পর আমাদের নৈতিক শক্তিও ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাদের অনেককেই আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। [১২]

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা ও আশপাশের অবাঙালিরা প্রায় সবাই ইপিআরের লোকজন ও তাদের সহযোগীদের কব্জায় চলে আসে। এরপর থেকে নিয়মিতভাবেই অবাঙালিদের হত্যা করা হতো। সবচেয়ে ভয়ানক ঘটনা ঘটে ২৬-৩০শে এপ্রিল, ১৯৭১। কর্নফুলী পেপার ও রেয়ন মিলস, চন্দ্রঘোনা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকান্ড অনুষ্ঠিত হয়। মেয়েদের ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। উদ্ধার করার পর তারা অবর্ণনীয় ধর্ষণ ও বর্বরতার কাহিনী বর্ণনা করে। হতাহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। একইসাথে রাঙামাটি শহরেও মেজর জিয়ার কাছে আনুগত্যের শপথ নেওয়া বাঙালি সৈনিকেরা বেসামরিক অবাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালায়। সেখানে প্রায় ৫০০ অবাঙালি খুন হন। [১৩][১৪]

রাঙামাটির পাশাপাশি মেজর জিয়ার অধিনস্থ সৈনিকেরা এপ্রিল মাসেও শহরের কিছু কিছু স্থানে বেসামরিক নিরীহ মানুষ খুন করে। ১৯৭১ সালের মে মাসে কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিক পূর্ব পাকিস্তান সফর করেন। তারা ওয়াশিংটনের ইভিনিং স্টারে লিখেন  “বন্দর নগরী চট্টগ্রামে একটি জুট মিলের বিনোদন ক্লাবে কাপড়ের স্তুপের ভেতর রক্তমাখা একটি পুতুল গড়াগড়ি খাচ্ছিল। 

এ ক্লাবে বাঙালিরা ১৮০ জন মহিলা ও শিশুকে হত্যা করে। বাঙালিরা দেশপ্রেমের উত্তেজনায় মত্ত হয়ে কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানিকে হত্যা করে। বাঙালি বেসামরিক লোক ও মুক্তিফৌজ (জিয়ার সৈনিক) ভারতের বিহার রাজ্য থেকে আগত (ভারতীয় অভিবাসী) বিহারীদের গণহত্যায় লিপ্ত হয় এবং হাটবাজার ও বসতবাড়ি তছনছ করে, ছুরিকাঘাত, গুলিবর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগ করে। কখনো কখনো ধর্ষণ ও লুটপাটেও লিপ্ত হয় ৷"

১৯৭১ সালের ১২ মে আমেরিকান বার্তা সংস্থা এপি প্রেরিত একটি রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়াশিংটনের ইভিনিং স্টারে আরো বলা হয়। “গতকাল গুরুত্বপূর্ণ এ বন্দর নগরী সফরকারী সাংবাদিকরা জানিয়েছেন যে, তারা ব্যাপক গোলা ও গুলিবর্ষণে ক্ষয়ক্ষতির এবং বিদ্রোহীদের হাতে ব্যাপক বেসামরিক লোক নিহত হওয়ার প্রমাণ দেখতে পেয়েছেন। 

প্রভাবশালী ইস্পাহানি পরিবারের মালিকানাধীন জুট মিলগুলোতে সাংবাদিকরা মিলের ক্লাবে গত মাসে (এপ্রিলে) বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহীদের হাতে নিহত ১৫২ জন অবাঙালি মহিলা ও শিশুর গণকবর দেখতে পেয়েছেন। বুলেটে ক্ষত-বিক্ষত এ ক্লাবের মেঝেতে এখনো রক্তমাখা জামা-কাপড় ও খেলনা পড়ে রয়েছে। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২৫ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রামে পশ্চিম পাকিস্তানি ও ভারতীয় অভিবাসীদের (১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বসতি স্থাপনকারী মুসলমান) হত্যা করা হয়েছে। অধিবাসীরা একটি ভস্মীভূত ডিপার্টমেন্ট ভবন দেখিয়ে বলেছে, সেখানে বাঙালিরা পশ্চিম পাকিস্তানের সাড়ে তিন শ' পাঠানকে হত্যা করেছে।"

এন্থনি মাসকারেনহাস এপ্রিলে সময়গুলোতে চট্টগ্রামে ছিলেন। তিনি লন্ডনের সানডে টাইমসের পূর্ব পাকিস্তান প্রতিনিধি। ১৯৭১ সালের ২ মে সানডে টাইমসে এন্থনি মাসকারেনহাস প্রেরিত এক রিপোর্টে বলা হয়: "চট্টগ্রামে মিলিটারি একাডেমির কর্নেল কমান্ডিংকে হত্যা করা হয়। এসময় তার আট মাসের অন্তঃসত্তা স্ত্রীকে ধর্ষণ করে তলপেটে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। 

চট্টগ্রামের আরেকটি অংশে জীবন্ত অবস্থায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের একজন অফিসারের চামড়া ছিলে ফেলা হয়। তার দু'পুত্রের শিরচ্ছেদ করা হয়। তার স্ত্রীর তলপেটে বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে তার উন্মুক্ত শরীরের ওপর পুত্রদের মাথা রেখে যাওয়া হয়। বাংলাদেশের পতাকা উড়ানো বাঁশ দিয়ে জরায়ু বিদীর্ণ বহু যুবতী মেয়ের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম এবং খুলনা ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শহর। সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানিরা সমবেত হয়েছিল।" [১৫]

মেজর জিয়া ও তার নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া গণহত্যা ও গণধর্ষণের সবচেয়ে লোমহর্ষক বর্ণনা পাওয়া যায় মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলামের বর্ণনায়। তিনি তার স্মৃতিচারণে বলেন, তিনি এবং তার ছাত্রলীগের বন্ধুরা মেজর জিয়ার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রামগড় ক্যাম্পে ছিলেন। একদিন বাঙালি সেনা অফিসাররা জিয়ার নেতৃত্বে সীতাকুন্ডের হাফিজ জুটমিলে অভিযান চালায়। সেখানে নিরীহ সকল অবাঙালি পুরুষ শ্রমিকদের হত্যা করে। এরপর সেখানে থাকা নারী শ্রমিক ও পুরুষ শ্রমিকদের স্ত্রী কন্যাদের রামগড় ক্যাম্পে নিয়ে আসেন এবং দিনের পর দিন তাদের নির্যাতন করেন। এরপর যখন দেশের সেনাবাহিনী রামগড় ক্যাম্প দখলে নিতে আসে তখন জিয়া বুঝতে পারেন তিনি সেনাবাহিনীর সাথে পেরে ওঠবেন না তাই তিনি দলবল নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যান। ভারতে যাওয়ার আগে বাঙালি সেনা অফিসাররা রামগড় ক্যাম্পে থাকা সকল অবাঙালি নারীদের হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে যান। ভিডিও দেখুন [১৬]  

মেজর জিয়া কি গণহত্যায় জড়িত ছিলেন? 
যে তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন হয়েছে তাতে নিশ্চিত করা বলা যায় রামগড়, রাঙামাটি, কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা ও চট্টগ্রাম শহরে মেজর জিয়ার অনুগত বিদ্রোহী সেনারাই এই অবাঙালি গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এখন মেজর জিয়ার সমর্থকেরা যারা তাকে ভালোবাসেন তারা বলতে পারেন জিয়া কি তাদের গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছেন? এর কী প্রমাণ আছে। আমি তাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই জিয়া কী গণহত্যাকারী তার অধীনস্থ সেনাদের শাস্তি দিয়েছেন? যদি না দিয়ে থাকেন তবে এই গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ মেজর জিয়ারই প্রত্যক্ষ মদদেই হয়েছে। একজন সেনানায়ক হিসেবে জিয়া তার অধীনস্থদের সকল কৃতিত্ব বহন করতে বাধ্য। 

মেজর জিয়া কী খুনি চরিত্র লালন করতেন?  
একজন সেনানায়ক যুদ্ধে কঠোর হবেন। তিনি শত্রুদের খুন করবেন এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু সহকর্মীদের বিরুদ্ধে বিনা দোষে অস্ত্র উত্তোলন এবং নির্বিচার খুন জিয়ার চরিত্রে আছে। এবং তিনি তা দেখিয়েছেন। খালেকুজ্জামানের বর্ণনা থেকে যা বুঝতে পারি তাতে তার সিনিয়র অফিসার জানজুয়া তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বন্দর নিয়ন্ত্রণে পাঠিয়েছে তা একেবারে মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়। কারণ জানজুয়া প্রথমে খালেককে পাঠিয়েছেন। জিয়া এসে পড়ায় তিনি তাকে যেতে বলেছেন। তার মানে টার্গেট জিয়া ছিল না। 

ক্যাপ্টেন খালেকের বর্ণনা অনুসারে অলি ঢাকার ব্যাপারে তথ্য দিয়েছেন। জিয়াকে খুন করার কোনো ব্যাপার সেখানে ছিল না। আর যেহেতু এই সংবাদ খালেক নিজেই জিয়াকে দিয়েছেন তাই এখানে মিসিং ইনফো নেই। খালেক তাকে শুধু ঢাকার ইপিআরের কথাই বলেছেন। তার মানে জিয়ার সাথে জানজুয়ার কোনো খারাপ সম্পর্ক তৈরি হয় নি। একইসাথে জিয়ার অধীনে থাকা নবীন অবাঙালি অফিসাররা জিয়ার একনিষ্ঠ অনুগত ছিল। কিন্তু জিয়া তার অফিসার জানজুয়া, তার অবাঙালি সহকর্মী ও তার অনুগত অবাঙালি শিষ্যদের একত্র করে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করার নির্দেশ দেন। অতঃপর তাদের হত্যা করা হয়। এই ঘটনাই মেজর জিয়ার খুনী চরিত্রকে ফোকাস করে। 

মেজর জিয়ার রাজনৈতিক মতাদর্শ কী ছিল? 
মেজর জিয়ার রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল না একথা জোর করে বলা যায় না। তিনি ভাসানী দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। মাওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর মশিউর রহমান যাদু মিয়া বলেছেন, পাকিস্তান আমলে মেজর জিয়া মেজর কমল নামধারণ করে ভাসানীর সাথে গোপনে দেখা করতেন ও আলাপ আলোচনা করতেন। [১৭]

 এ থেকে বোঝা একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রবল আগ্রহ জিয়ার ছিল নইলে এতো বড় রিস্ক তার মতো ঠাণ্ডা মাথার মানুষ নিতেন না। এরপর জিয়ার ক্ষমতার সময়ে ভাসানী কর্তৃক জিয়াকে একনিষ্ঠ সমর্থন দানও তার রাজনৈতিক আদর্শকে ইঙ্গিত করে। ভাসানীর ইন্তেকালের পর মেজর জিয়া তার দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে ব্যবহার করেই বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি গঠন করেন। চীনপন্থী বাম ন্যাপের যাদুমিয়াকেই তিনি প্রথমে তার প্রধানমন্ত্রী করে নেন। বিএনপি'র বর্তমান অনেক নেতা প্রকাশ্যেই বলে থাকেন জিয়া ভাসানীর আদর্শ লালন করতেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও তেমনাটাই বলেছেন। [১৮]

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাহ বুলু বলেছেন ভাসানীর আদর্শেই বিএনপি গঠিত হয়েছে। [১৯]  অতএব এটা অনুমান করা যায় মেজর জিয়াউর রহমান মাওলানা ভাসানীর মতো পিকিংপন্থী বামাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তিনি ভাসানীর দলের প্রতীক নিজের দলের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

তথ্যসূত্র
১. আওয়ামীলীগ : যুদ্ধদিনের কথা/ মহিউদ্দিন আহমদ / পৃষ্ঠা ৮৩
২. আওয়ামীলীগ : যুদ্ধদিনের কথা/ মহিউদ্দিন আহমদ / পৃষ্ঠা ৭৯
৩. আওয়ামীলীগ : যুদ্ধদিনের কথা/ মহিউদ্দিন আহমদ / পৃষ্ঠা ৭৯-৮০
৪. মহিউদ্দিন আহমেদের কাছে কর্নেল অলির সাক্ষাৎকার 
৫. আওয়ামীলীগ : যুদ্ধদিনের কথা/ মহিউদ্দিন আহমদ / পৃষ্ঠা ৮২-৮৩
৬. ১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন / আমীন আহমেদ চৌধুরী/ পৃষ্ঠা ২১-২৮
৭. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে/ মেজর রফিকুল ইসলাম/ পৃষ্ঠা ১২০ 
৮. মহিউদ্দিন আহমেদের কাছে সমশের মুবিনের সাক্ষাৎকার
৯. আওয়ামীলীগ : যুদ্ধদিনের কথা/ মহিউদ্দিন আহমদ / পৃষ্ঠা ৮৩
১০. ব্লাড এন্ড টিয়ার্স/ কুতুবুদ্দিন আজিজ/ পৃষ্ঠা ৩৫-৭৮
১১. বসন্ত ১৯৭১/ ফারুক আজিজ খান/ পৃষ্ঠা ৪৭
১২. বসন্ত ১৯৭১/ ফারুক আজিজ খান/ পৃষ্ঠা ৫০
১৩. বসন্ত ১৯৭১/ ফারুক আজিজ খান/ পৃষ্ঠা ৫১
১৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র / বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর/ পৃষ্ঠা ১৪৩
১৫. ব্লাড এন্ড টিয়ার্স/ কুতুবুদ্দিন আজিজ/ পৃষ্ঠা ৫৬-৫৭ 
১৬. https://youtu.be/fOfaYa48_4I 
১৭. মাওলানা ভাসানী : রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম/ পৃষ্ঠা ২২
১৮. ভাসানী রাজনীতি নির্মাণ করতেন: ফখরুল/ প্রথম আলো/ ২০/১১/২০১৬
১৯. ভাসানীর আদর্শে গড়া দল বিএনপি: বরকতুল্লাহ বুলু/ বাংলা ট্রিবিউন/ ১৭/১১/২০২০

২৫ ডিসে, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৭৫ : কেমন ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ?



স্বাধীনতা পরপরই এদেশের ইসলামপন্থীদের ওপর ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসে। এটা অনুমিত ছিল। কারণ মুসলিম জাতীয়তাবাদের ইস্যুতে সৃষ্টি হওয়া পাকিস্তানকে ভাঙতে দিতে চায়নি সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম। যারা মুজিবকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তাদের বেশিরভাগই পাকিস্তান বিভক্তির বিপক্ষে ছিলেন। ১৮ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধ শুরু করে মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনী। বিশেষত কাদের সিদ্দিকীর অধীনে কাদেরিয়া বাহিনী ও জেনারেল ওবানের অধীনে মুজিব বাহিনী। ঢাকা ও তার আশপাশের মুসলিম লীগের নেতা কর্মী, নেজামে ইসলামের নেতা কর্মী, জামায়াতে ইসলামের নেতা-কর্মী, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী, ন্যাপের নেতা-কর্মী, মসজিদ্গুলোর ইমাম মুয়াজ্জিন, কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও সিনিয়র ছাত্রদের পল্টন ময়দানে জমায়েত করা হতো। তারপর তাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হতো। এটা কোনো গোপন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল খুবই প্রকাশ্য এবং দেশি-বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে চলে বেসামরিক নাগরিক হত্যা। এদের অপরাধ ছিল তারা পাকিস্তান ভেঙে যাক এটা চায়নি। 

একইসাথে ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের সব ক্যান্টনমেন্ট দখলে নিয়ে সেখানের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সম্পদ লুটপাট করে। এটাও ছিল যুদ্ধাপরাধ। বিরোধী মতের রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি ঘর দখল ও লুটপাটের আয়োজন করে মুক্তিবাহিনী। এ সবই ছিল যুদ্ধাপরাধ। যে মুহাজিররা ১৯৪৭ সালে ভারতের বিহার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলায় এসেছিল তাদের মধ্যে অনেকে মুক্তিবাহিনীর অত্যাচারে আবার ভারতে পাড়ি জমান। এ এক জিল্লতির জীবন ছিল। বিহারীরা ফিরে যেতে পারলেও এদেশের ইসলামপন্থীদের পালানোর জায়গা ছিল না বললেই চলে। সেসময়ের বেশ কয়েকজন ভিকটিমের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি তারা নির্যাতনের মুখে তাদের নিজ জেলা থেকে পালিয়ে দূরের জেলায় পালিয়ে থেকেছে। 

ইসলামের প্রতি আক্রোশ :
শুধু যে ইসলামপন্থীরা আক্রান্ত হয়েছে তা নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা ইসলাম বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তারা ইসলামের প্রতি আক্রোশ দেখিয়েছে। যে সকল প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নামে ইসলাম ও মুসলিম ছিল সেগুলো থেকে তারা ইসলাম ও মুসলিম শব্দ বাদ দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুসলিম বাদ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো থেকে 'রাব্বি জিদনি ইলমা' ও কুরআনের চিহ্ন বাদ দেওয়া হয়েছে। নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে ইসলাম বাদ দিয়েছে। পাবনার সেরা কলেজ ইসলামিয়া কলেজকে বুলবুল কলেজে পরিণত করা হয়েছে। এভাবে সারা বাংলাদেশে সব স্থান ইসলাম ও মুসলিমকে উৎখাত করা হয়েছে। কওমী মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের বোরকা নিষিদ্ধ করে শাড়ি পড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এই কারনে বহু ছাত্রী একাত্তর পরবর্তীতে বিদ্যালয়ে শিক্ষা নিতে যায় নি।    

সংবিধান প্রণয়ন করে বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, নেজামী ইসলামী ও জামায়াতে ইসলামী এই দুইদলই ছিল সেসময় ইসলামী রাজনীতির ধারক ও বাহক। এদের নিষিদ্ধ করা হয় নাই যে, তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলেন। বরং তাদের এইজন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে যে, তারা ইসলামী রাজনীতি করেন। সেসময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী ন্যাপ (মুজাফফর), মনি সিং এর কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় দল, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি এবং কৃষক শ্রমিক সমাজবাদী দল এই দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। সুতরাং এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের যারা কুশীলব তাদের মূল আক্রোশ ছিল ইসলামের সাথে। এই সাধারণ ব্যাপার সেসময়ের সকল ইসলামী রাজনীতিবিদ বুঝেছিলেন এবং তারা এজন্যই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলেন। সেসময়ের অনেক মুসলিম না বুঝে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলো এটা তাদের ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা ছিল। আল্লাহ তায়ালা তাদের ক্ষমা করুন। 

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিরাট পরিবর্তন এনেছে মুক্তিযোদ্ধারা। তারা রেডিও টেলিভিশনে বিসমিল্লাহ, সালাম দিয়ে শুরু করা বাদ দিয়ে সুপ্রভাত, শুভকামনা ইত্যাদি প্রতিস্থাপন করেছে। রেডিওতে কুরআন তিলওয়াত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী একাডেমি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই ইসলামী একাডেমীকেই তিনবছর পরে ইসলামী ফাউন্ডেশন নামে চালু করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আবার পুনরায় রেডিও টেলিভিশনে সালাম, বিসমিল্লাহ, আযান ও কুরআন তেলওয়াত শুরু হয়েছিল। 

এইসব কাজ শেখ মুজিব তার নিজস্ব পরিকল্পনাতে করেছেন এটা আমি বলতে চাই না। মুজিব পরিবেষ্টিত ছিলেন তাজউদ্দিনদের মতো এক ঝাঁক কমিউনিস্ট দ্বারা। তার ফলে মুজিবের শাসনামলের শুরুর দিকে সমস্ত ইসলামবিরোধী কাজের জোয়ার শুরু হয়েছিল। সংবিধান থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাদ পড়েছে। মূলনীতি থেকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস বাদ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে কমিউনিজম, সেক্যুলারিজমের মতো ইসলাম ও ধর্ম বিদ্বেষী মতবাদকে। ক্ষমতায় থেকে ইসলামপন্থা দমনে সব কাজ করেছেন শেখ মুজিব। যখন জাসদ গঠিত হয় এবং বামপন্থীদের সাথে সরকারের চরম বিরোধ শুরু হয় তখন মুজিব কোনঠাসা হয়ে থাকা ইসলামপন্থীদের কাছে টানতে থাকেন তার শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য। তবে অবশ্যই তিনি ইসলামী রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেননি। তিনি শুধুমাত্র অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি দিয়েছেন। তাবলীগের প্রসার করার চেষ্টা করেছেন। কওমীদের শুধুমাত্র মাদ্রাসার গণ্ডির মধ্যে থেকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।  

জাতীয়করণ :
কমিউনিজমের আদর্শ অনুসরণ করতে গিয়ে একের পর এক শিল্প কারখানা জাতীয়করণ করেন মুজিব। তবে কোনো বাঙালির কারখানা জাতীয়করণের আওতায় আসে নি। ১৯৪৭ এর পর বাঙালি রাজনীতিবিদেরা সবসময় মুসলিম বিশ্বের ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানাতেন এদেশে ব্যবসা করার জন্য, শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তাতে সাড়া দেয় অনেক অবাঙালি কোম্পানি। এরা বেশির ভাগ ভারত ও মিয়ানমারের। এর মধ্যে বড় ব্যাবসায়ি গোষ্ঠী ছিল আদমজি, বাওয়ানী ও ইস্পাহানী পরিবার। এর বাইরেও বহু ছোট ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা এদেশে এসেছিলেন। বাংলা ও বাঙালির উন্নয়নে এসব উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অনেক অবদান ছিল। কিন্তু শেখ মুজিব জাতীয়করণের নামে এসব অবাঙালি ব্যবসায়ীদের সমস্ত সম্পদ ও কারখানা দখল করে নেয়। যারা এতদিন এদেশের নেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এদেশের উন্নয়নে ও কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখেছিল শেখ মুজিব তাদের রিক্ত হস্তে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছেন। তবে দুঃখজনক হলো, এসব শিল্প কারখানা থেকে বাংলাদেশ কখনোই লাভবান হতে পারে নি। সরকার বছর বছর কেবল এগুলোতে ভর্তুকি দিয়েই আসছে। 

লুটপাট :
যুদ্ধপরবর্তী মানুষের পুনর্বাসন একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মুজিব সরকারের জন্য। সেজন্য মুজিব জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিশাল ত্রাণ সাহায্য পেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের লুটেরা গোষ্ঠীর লুটপাটে এই ত্রাণ থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। একটি বিশাল জনগোষ্ঠী দুর্ভিক্ষে পতিত হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের এতো উর্ধ্বগতি হয়েছিল যে, লবণের কেজি ৯০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। অথচ যুদ্ধের সময়ও ১ মণ চাউলের দাম ছিল ১৫-২০ টাকা। মুজিবের আমলে চাউলের কেজি ১০০-১৬০ টাকা, মশুর ডাল ১২০-১৫০ ও সয়াবিন ৫৯০ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে। এর বড় কারণ ছিল মুক্তিযোদ্ধারা আমদানিকৃত দ্রব্য আটকে দাম বাড়াতো, একইসাথে এদেশীয় কৃষকের ক্ষেতের ফসলও তারা লুটপাট করে নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। ১৯৭০ সালে 'সোনার বাংলা শ্মশান কেন?' বলে মিথ্যা প্রচারণাকারীরা টের পেল সোনার বাংলা কীভাবে মুজিবের হাতে শ্মশান হয়! 

রক্ষিবাহিনী :
মুজিব তার একান্ত অনুগত একটি বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। এটা অনেকটা জার্মানীর গেস্টাপো বাহিনীর মতো ছিল। সবচেয়ে বেশি যুদ্ধাপরাধ করা কাদেরিয়া ও মুজিব বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়। এর মাধ্যমে মুজিব তার সমস্ত পরিকল্পনা মুহুর্তেই বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। একইসাথে বিরোধী মত দমনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে রক্ষিবাহিনী। মূলত পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন আদর্শের লোক থাকায় সেসব বাহিনীর ওপর মুজিব ভরসা করতে পারেননি। শুরুর দিকে রক্ষীবাহিনী বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে অনেক অস্ত্রশস্ত্র, চোরাচালানের মালামাল উদ্ধার করে এবং মজুতদার ও কালোবাজারীদের কার্যকলাপ কিছুটা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু খুব দ্রুতই বাহিনীর ভাবমূর্তি নষ্ট হতে থাকে। এই বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহার করা হয় এবং এর পাশাপাশি রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, গুম, গোলাগুলি, লুটপাট এবং ধর্ষণের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। ঝটিকা বাহিনীর মতো রক্ষীবাহিনী প্রায়ই একেকটি গ্রামের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং অস্ত্র ও দুষ্কৃতিকারীদের খুঁজতো। 

তাদের নিয়ন্ত্রণ করার এবং তাদের কার্যকলাপের জবাবদিহিতার আইনগত কোন ব্যবস্থা ছিল না। অপরাধ স্বীকার করানোর জন্য গ্রেফতারকৃত লোকদের প্রতি নৃশংস অত্যাচারের অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে ওঠে। তাদের বিরুদ্ধে লুটপাট এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগও ছিল। তাদের কার্যকলাপের সমালোচনা যখন তুঙ্গে ওঠে এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে, তখন ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর সরকার জাতীয় রক্ষীবাহিনী (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-১৯৭৩ জারি করে রক্ষীবাহিনীর সকল কার্যকলাপ আইনসঙ্গত বলে ঘোষণা করে। রক্ষীবাহিনীর কোন সদস্য সরল বিশ্বাসে কোন কাজ করলে অথবা সৎ উদ্দেশ্যে উক্ত কাজ করে থাকলে অনুরূপ কাজের জন্য তার বিরুদ্ধে বিচারের জন্য কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়া যাবে না বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে এই বাহিনীকে বিরুদ্ধ মত ও জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন শেখ মুজিব। রক্ষিবাহিনীর সাথে সরাসরি বিরোধ তৈরি হয় সেনাবাহিনীর সাথে। এই দুই বাহিনীর মধ্যে প্রায়ই গোলাগুলি হতো।  

লালবাহিনী :
রক্ষীবাহিনী যেভাবে সরকারের ঘোষিত বাহিনী ছিল লালবাহিনী সেভাবে সরকারি বাহিনী ছিল না। আওয়ামী লীগের মধ্যে বামপন্থীরা বেশ সক্রিয়ভাবে ছিল। বামদের বড় অংশ ছিল শ্রমিকদের মধ্যে। যখন আওয়ামী লীগের মধ্যে থাকা বামপন্থীরা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নামে আলাদা হয়ে যায় তখন বাকীরা আওয়ামী শ্রমিক লীগ নামধারণ করে। যেহেতু জাসদের বড় অংশ ছিল শ্রমিক তাই শেখ মুজিব জাসদকে কন্ট্রোল করার জন্য শ্রমিক লীগকেই বেছে নিয়েছেন।   

আবদুল মান্নান, যিনি বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক লীগের প্রধান ছিলেন, তার নেতৃত্বেই লালবাহিনী গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি সশস্ত্রবাহিনী। এটিও সরকারের আজ্ঞাবহ তবে সরকার এর দায়দায়িত্ব নিত না। তাদের মূল কাজ ছিল বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক বিক্ষোভ দমন করা। শ্রমিকদের মধ্যে জাসদের কার্যক্রম বন্ধ করাও ছিল লালবাহিনীর কাজ। ১৯৭২ সালের মার্চ থেকে অবাঙালিদের কারখানাগুলিকে জাতীয়করণের নীতি ঘোষণার পরে লাল বাহিনী তাদের 'বিরোধী দল' হিসেবে চিহ্নিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্মূল করার জন্য শুদ্ধি অভিযান শুরু করে। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে লাল বাহিনীর শুদ্ধি অভিযানের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান তথাকথিত শোষণকারীদের শেষ করতে তাঁর 'লাল ঘোড়া' মোতায়েনের হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি বহু ভাষণে লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে দেওয়া হবে হুমকি দিতেন। লালবাহিনীর প্রধান আবদুল মান্নানকে এমনও বলতে শোনা গেছে যে, "নতুন ফ্রন্ট (জাসদের শ্রমিক ফ্রন্ট) যদি মুজিববাদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করে তবে আমি তাদের জিহ্বা কেটে দেব"।

লাল বাহিনীর গণহত্যা : 
লাল বাহিনীর প্রথম নৃশংসতা করেছিল মংলা বন্দরে। সেখানে হাজার হাজার শ্রমিক কুলি হিসাবে কাজ করত। ধারণা করা হয়েছিল যে বামপন্থী শ্রমিক মোর্চা ও বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক লীগের মধ্যে কুলিদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্ব থেকেই এই গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সরকারের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুসারে দাঙ্গার ফলে প্রায় ৩৬ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তবে প্রকৃত মৃত্যুর হার সরকার কর্তৃক বর্ণিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। দাঙ্গা চলাকালীন বাংলাদেশে থাকা বিশিষ্ট সাংবাদিক মাসকারেনহাসের মতে, সেদিন প্রায় ২০০০ মানুষ নিহত হয়েছিল এবং তারা সবাই বামপন্থী শ্রমিক ছিল। এই ঘটনা স্বাধীনতার কিছু দিন পর ১৯৭২ সালের মার্চে সংঘটিত হয়। 

আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা ছিল ৫ এপ্রিল। টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মীদের উপর লাল বাহিনীর লোকেরা হামলা করে। এই হামলার লক্ষ্য ছিল টঙ্গীর ন্যাপ (ভাসানী) সমর্থিত ফেডারেশন কর্মীদের প্রভাব শেষ করা। ঐ সময় বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে এটি বৃহত্তম ছিল। লাল বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলায় হাজার হাজার শ্রমিক নির্যাতিত ও সহিংসতার শিকার হয়। ন্যাপের দাবি অনুসারে সেখানে শতাধিক শ্রমিক খুন হন।

কালুরঘাট শিল্পাঞ্চলে এবং চট্টগ্রামের আরআর জুট অ্যান্ড টেক্সটাইল মিলের দাঙ্গার জন্য প্রত্যক্ষ দায়ী ছিল এই লালবাহিনী। এই দাঙ্গার পেছনের প্রধান কারণ ছিল 'স্থানীয় ও অ-স্থানীয় সমস্যা' এবং 'জেলাবাদ' যা লালবাহিনী সদস্যরা প্রবর্তন করেছিল এবং এটি শ্রমিকদের পার্থক্য করতে ব্যবহৃত হত। চট্টগ্রাম যেহেতু একটি বন্দর নগরী ছিল তাই অন্যান্য জেলা থেকে কাজের সন্ধানে অনেক শ্রমিককে চট্টগ্রাম আসতে হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের মে মাসে লাল বাহিনী সদস্যরা স্থানীয়-অ-স্থানীয় সমস্যাটি ব্যবহার করে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছিল। যেভাবে আগে তারা বামপন্থী ইস্যুতে শুদ্ধি অভিযান করেছিল। এই হামলায় চট্টগ্রামে কাজ করতে আসা শত শত শ্রমিককে খুন করে লালবাহিনী।আরো বেশ কয়েকটি দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল এবং খুনোখুনি ছিল নিয়মিত ঘটনা। এতে মিলগুলির উৎপাদন ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছিল। লালবাহিনীর দৌরাত্মে কারখানাগুলো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়েছিল। কারখানাগুলোর শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলো। লালবাহিনীর অশিক্ষিত শ্রমিকরাই তাদের ইচ্ছেমতো কারাখানা পরিচালনা করতে লাগলো। এরপর সরকার একে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেও সক্ষম হয়নি।  

ভারতের আজ্ঞাবহ : 
শেখ মুজিব সরকার ভারতের আজ্ঞাবহ সরকারে পরিণত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হতো না। পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিটা সিদ্ধান্তের জন্য ভারতের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে মুজিবকে। শেখ মুজিব তার ক্ষমতার শেষদিকে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা চালিয়েছেন। তদুপরি সে যখন দেখলো সে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে, দুর্ভিক্ষ ছাড়ছেই না। জনগণ বেকার হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের ইনকাম সোর্স বন্ধ হয়ে গেছে তখন শেখ মুজিব তার নীতি পরিবর্তনের চেষ্টা করলেন। তিনি তার বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়া, কিউবা, ভারত, ইংল্যান্ড থেকে সরে এসে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বন্ধুত্বের অনুরোধ নিয়ে ছোটাছুটি করলেন। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর শুভদৃষ্টি পেতে চাইলেন। ৭৪-এ আলজেরিয়াকে মিডিয়া বানিয়ে কমিউনিস্টদের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করার শর্তে বাংলাদেশ ওআইসির স্বীকৃতি লাভ করে। এর পরপরই তিনি পাকিস্তানে ওআইসি'র সম্মেলনে যোগ দেন। এই ঘটনায় ভারতের সাথে শেখ মুজিবের দূরত্ব তৈরি হয়।     

বাকশাল : 
শেখ মুজিব তার ক্ষমতার একেবারে শেষদিকে এসে মাও সে তুং-এর মতো করে একদলীয় শাসন চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশে শুধু একটি দল থাকবে তার নাম দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী অনুসারে বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং দেশের সমগ্র রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল নামক এই একক রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। বাকশাল ব্যবস্থায় দলের চেয়ারম্যানই সর্বক্ষমতার অধিকারী। চেয়ারম্যান ইচ্ছা করলে গঠনতন্ত্রের যে কোন ধারা পরিবর্তন, সংশোধন ও পরিবর্ধন করতে পারবেন এবং একমাত্র চেয়ারম্যানই গঠনতন্ত্রের ব্যাখ্যা দান করতে পারবেন। 

বাকশাল ব্যবস্থার অধীনে কোন নির্দলীয় শ্রেণী ও পেশাভিত্তিক সংগঠন এবং গণসংগঠন করার কোন অধিকার নেই। ট্রেড ইউনিয়ন মাত্রই তাকে বাকশালের অঙ্গদল শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এই ব্যবস্থায় জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় কৃষক লীগ, জাতীয় মহিলা লীগ, জাতীয় যুবলীগ এবং জাতীয় ছাত্রলীগ বাদে কোন শ্রমিক, কৃষক, মহিলা, যুব ও ছাত্র সংগঠন থাকতে পারবে না। আর উপরিউক্ত সংগঠনগুলি হচ্ছে বাকশালেরই অঙ্গ সংগঠন। বাকশাল আইনের অধীনে ১৯৭৫ সালের ৬ জুন দেশে চারটি দৈনিক ছাড়া আর সকল সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়। ঐ চারটি ছিল দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য বাংলাদেশ টাইমস, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার। 

২৩ ডিসে, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৭৪ : ১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও সত্যাসত্য প্রসঙ্গ



বাংলাদেশে ৫০ বছরে এই পর্যন্ত ৭১ এর হত্যাযজ্ঞ নিয়ে ভালো কোনো তালিকা বা রেকর্ড তৈরি করেনি এদেশের কোনো সরকার। বরং পারলে বাধা দিয়েছে। মুজিব সরকার কমিটি গঠন করে পরে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে যারাই ব্যক্তিগতভাবে এই কাজের সাথে জড়িত হয়েছেন তারা খুন হয়েছেন। এই ধারাবাহিক খুনের সর্বশেষ শিকার জাতীয় ভার্সিটির ভিসি আফতাব আহমাদ। তাই আজ পর্যন্ত সুষ্ঠু কোনো শুমারি হয়নি যে, কতজন মানুষ ১৯৭১-এ খুন হয়েছেন।

২০১০ সালে সংসদে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, 'স্বাধীনতা যুদ্ধে কতজন মারা গিয়েছে তা গণনার কোন পরিকল্পনা এ সরকারের নেই'। বিদেশের অনেক ব্যক্তি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য দিলেও দেশের সব সরকার ছিল বরাবরের মতই নির্বিকার। শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পথে ১৯৭২ সনের ১০ জানুয়ারী ভারতের পালাম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ৩ (তিন) মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছে; আজোবধি ৩ (তিন) মিলিয়ন তথা ৩০ (ত্রিশ) লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছে এ সংখ্যাই প্রচলিত আছে। শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে বের হয়ে দেশে না আসতেই কোনো তদন্ত ছাড়াই কেন এমন বললেন এই বিষয়ে বিবিসি সাংবাদিক সিরাজুর রহমান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশে ফেরত আসার সময় মুজিব জিজ্ঞাসা করলেন কেমন মানুষ মারা গেল যুদ্ধে? তখন সিরাজুর রহমান তাকে জানিয়েছেন আমরা আশংকা করছি প্রায় তিন লক্ষ মারা গেছে। এরপর সাংবাদিকদের তিনি থ্রি মিলিয়ন বলেছেন। সিরাজুর রহমান বলেছেন সেই সময়ের উত্তেজনা ও উদ্ভ্রান্ত মুহূর্তে শেখ মুজিব তিন লক্ষকে ভুলে থ্রি মিলিয়ন বলে ফেলেছেন।

বাংলাদেশে সেই সময় মুজিবকে তার অনুসারীরা প্রফেটিক মর্যাদা দিয়েছে। মুজিব বলেছে অতএব তাই ঠিক! এমন অবস্থা আজো চলমান। এ ব্যাপারে ১৫.০৬. ১৯৯৩ তারিখে সংসদে আলোচনায় কর্ণেল আকবর হোসেন বলেন যে, আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩ (তিন) মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছে উল্লেখ করে যা মূলতঃ প্রকৃত সংখ্যার ১০ (দশ) গুণ। তখন আওয়ামী লীগের আবদুস সামাদ আজাদ বলেন যে, জিয়াউর রহমানসহ কেউ এ সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন করেননি; আমাদের নেতা শেখ মুজিব যেহেতু সংখ্যাটি বলেছেন ধরে নিতে হবে এটিই সঠিক।

শর্মিলা বসু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কতজন মারা গিয়েছে সে হিসেব দিতে গিয়ে শাখারীবাজারের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে“ In Shakharipara an estimated 8,000 men, women and children were killed when the army, having blocked both ends of winding street, hunting them down house by house. The description is entirely false. Survivors of the attack on Shakharipara on March 26 testify that about 14 men and one child (carried by his father) were killed inside a single house that day."

বিচারপতি হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টে এই সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার, শর্মিলা বসু বলেন এ যুদ্ধে প্রায় ৩৬ হাজার নিহত হয়েছেন, কল্যাণ চৌধুরীর মতে ১২,৪৭,০০০ জন এবং British Medical Journal এ প্রকাশিত “Fifty Years of Violent War Deaths from Vietnam to Bosnia: Analysis of Data from World Health Survey Programme” বলা হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ২,৬৯,০০০ (দু' লক্ষ ঊনসত্তর হাজার) জন মানুষ মারা গিয়েছে। এভাবে নানান বর্ণনা পাওয়া যায়। বাঙালি লেখকরা প্রায় সবাই মুজিবের কথাকে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে নিহতের সংখ্যা তিরিশ লাখ উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের পরে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ টিভি ভাষণে বলেন, “দশ লক্ষাধিক মানুষের আত্মাহুতির মাঝ দিয়ে আমরা হানাদার পশুশক্তির হাত থেকে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত বাংলাদেশকে স্বাধীন করে ঢাকার বুকে সোনালী রক্তিমবলয় খচিত পতাকা উত্তোলন করেছি।

শেখ মুজিব ২৯ জানুয়ারী ১৯৭২ ডেপুটি ইন্সপেক্টর অব পুলিশ আব্দুর রহিমকে প্রধান করে মুক্তিযুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণের জন্য ১২ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৭২ তারিখের মধ্যে হতাহতের সংখ্যা, ক্ষয়-ক্ষতিসহ এর সাথে জড়িতদের অপরাধীদেরকে চিহ্নিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কমিটিকে পরে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। প্রসঙ্গত এই আব্দুর রহীমকে প্রধান করেই রাজাকারে বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে শেখ মুজিব সরকার প্রধান রাজাকার কমান্ডার আব্দুর রহীমকে সচিব পদে উন্নীত করেন।

বস্তুত ১৯৭১ সালের ১ থেকে ২৫ মার্চ আওয়ামী ও নিউক্লিয়াসের সন্ত্রাসীদের চালানো বর্বরতার একটি গোপন ঘাঁটি ছিল সেই বাড়িটি। যেখানে সন্ত্রাসীরা একত্রিত হতো এবং এখানে অস্ত্র ও বোমা বানানো হতো। সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় তারা সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে মারা যায়। এই সংখ্যা ১৫। কিন্তু ইতিহাস বিকৃতকারীরা সংখ্যা দেখিয়েছে ৮০০০। শাঁখারিবাজারে সব বাড়িতে গণহারে অভিযান চালানো হয় নি, শুধুমাত্র সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হন। যেভাবে ঢাবির সব হলে অভিযান চালানো হয়নি। শুধুমাত্র দুটি হলে অভিযান চালানো হয়েছে।

শর্মিলা বসু অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একজন গবেষক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে তিনি একজন নিরপেক্ষ গবেষক বলে বিবেচিত। তিনি পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বরতা ও গণহত্যা প্রমাণ করতে এসে প্রচলিত ইতিহাসের সাথে সত্যের ব্যাপক বিরোধ দেখতে পান। যা তিনি তার গবেষণায় উল্লেখ করেন।

কোন যুদ্ধেই শুধু একপক্ষের মানুষ মারা যায় না, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল পক্ষের মানুষই মারা যায়। যুদ্ধোত্তরকালে কোন পক্ষের কত জন নিহত বা আহত হয়েছে তার হিসেব বের করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র সে দায়িত্ব পালন করেনি বা করতে পারে নি। বাংলাদেশে কত মানুষ মারা গেছে তা নিয়েই কেবল আলোচনা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কতজন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়েছেন তার সংখ্যা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। কারণ এ সংখ্যা নিয়ে আলোচনা হলে যুদ্ধকালে ত্রিশ লাখ মানুষ মারা যাবার তথ্যটি সকলের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়বে। স্বাধীনতা যুদ্ধে মোট ৬৬২৯ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা হচ্ছে ১৫১১ জন। ৬৬২৯ জনের মধ্যে সেনাবাহিনীর সংখ্যা ১৫৪৪, নৌবাহিনীর সংখ্যা ২১, বিমানবাহিনীর সংখ্যা ৪৭, ইপিআরের সংখ্যা ৮১৭, পুলিশ ১২৬২ আর বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা ২৯৩৮ জন নিহত হয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যা আমাদেরকে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতে সহায়তা করবে তা হলো, ১৯৭২ সালে শেখ মুজিব সরকার শহীদ পরিবারকে প্রতিজন শহীদের বিপরীতে ২০০০ (দু’হাজার) টাকা করে অনুদান দেয়ার ঘোষণা করে। সারাদেশ থেকে প্রায় ৭২০০০ আবেদন জমা পড়ে। যাচাই বাছাই করে দেখা যায় এর মধ্যে প্রায় ২২ হাজার হলো স্বাধীনতাবিরোধী যারা মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত হন। পরবর্তীতে রাজাকারদের নাম বাদ দিয়ে করে মোটামুটি ৫০০০০ নিহত ব্যক্তির জন্য তাদের পরিবারকে ২০০০ (দু'হাজার) টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। এই তথ্যকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ইনষ্টিটিউট অব স্ট্রাট্রেজিক স্ট্যাডিজের ১৯৯৩ সালের অক্টোবর মাসের জার্নালে বলা হয়েছে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের মেয়াদ ছিল ৮ মাস ৩ দিন । এ যুদ্ধে নিহত হয় ৫০ হাজার মানুষ।

উপরে হত্যাকান্ড বা নিহতের যে হিসেব দেওয়া হয়েছে তা শুধু পাকিস্তান সামরিকবাহিনী, এর সহযোগী বাহিনী বা দালাল কর্তৃক বাঙালি হত্যার সংখ্যা। এভাবে বিষয়টি একপেশে প্রচারণার শিকার। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক অখন্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী বাঙালি, বিহারি ও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী নিহত হওয়ার বিষয়টি একেবারে চাপা পড়ে গিয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধে পাকিস্তান ও ভারতের সামরিকবাহিনীর সদস্য নিহত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যুদ্ধে পাকিস্তান সামরিকবাহিনীর প্রায় ৪৫০০ সদস্য নিহত ও প্রায় ৮০০০ জন আহত হয়েছেন। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ১৪২১ সদস্য নিহত ও ৪০৫৮ জন আহত হয়েছে।

বাংলাদেশে একাত্তরে যত নারী-ধর্ষণ হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী হয়েছে সত্যকে ধর্ষণ। গবেষক শর্মিলা বসু তেমনটাই মনে করেন। নারী ধর্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার পর তার মনে এ ধারণা দৃঢ়মূল হয় যে, বাংলাদেশে একাত্তরে নারী ধর্ষণ হয়তো হয়েছে ঠিকই, তবে বিপুল সংখ্যক অবাঙালি মহিলাও বাঙালিদের হাতে ধর্ষিতা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসের বইয়ে তার কোনো উল্লেখই নেই। ১৯৭১ সালের ধর্ষণ নিয়ে শর্মিলা বসু তার নিজের গবেষণায় যে উপসংহারটি টেনেছেন তা হলো, “একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় আমি দেখলাম, বাংলাদেশী অংশগ্রহণকারীগণ এবং যারা ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শী ছিল তারা যুদ্ধের বর্ণনা দিল। গুলি করে হত্যার বর্ণনাও দিল। কিন্তু তারা আমাকে এ কথাও বললো, “আর্মি মহিলাদের কোনো ক্ষতি করেনি। তবে যদি কেউ দুর্ভাগ্যক্রমে ক্রস ফায়ারে পড়ে যায় তবে অন্যকথা। একাত্তরে ধর্ষণের যে বিশাল সংখ্যা তুলে ধরা হয়েছিল সে প্রেক্ষিতে এটি আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছে। আমার কেস স্টাডিজে আমি একটি মাত্র ঘটনারও প্রমাণ পেলাম না।

হত্যার সংখ্যা নিয়ে যেমন অসততার আশ্রয় নেয়া হয়েছে, ধর্ষণের সংখ্যা নিয়েও তেমনই অসত্য বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন এই সংখ্যা জরিপ ছাড়াই ছিল দুই লক্ষ। ইতোমধ্যে এক যুগ পরে সেই সংখ্যা আর এক লক্ষ বেড়ে গিয়েছে। এখন বলা হয়, তিন লক্ষ মা-বোনকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এই যে প্রচারণা চলছে তারও কোন জরিপ করা হয়নি।

শর্মিলা বসু বলেন “60000 Pakistan Army to kill three million and rape three hundred thousand women, each and everyone of them had to kill 50 persons and rape 5 women.”

শর্মিলা বসু আরো লিখেছেন, //একাত্তরের যুদ্ধের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে দেখলাম ২ লাখ থেকে ৪ লাখ ধর্ষিতার যে সংখ্যা বাংলাদেশে বলা হয় তার হিসাব নিকাশের কোন ভিত্তি নেই। এটি অবশ্যই অপ্রত্যাশিত নয় যে ভূক্তভোগীদের সংখ্যার একটি অনুমান (estimate) করা হবে। তবে প্রতিটি অনুমানের মূলেও মাঠ পর্যায়ের কিছু সাক্ষী প্রমাণ থাকতে হয় যার ভিত্তিতে একটি পরিসংখ্যান বের করা যায় । কিন্তু বাংলাদেশে একাত্তরে তেমন কিছুই ছিল না। এ ব্যাপারে কোন সরকারি পরিসংখ্যানও নাই। পরিসংখ্যানের একটা বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি হতে পারতো মাঠপর্যায়ের তদন্ত, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ক্ষতিপূরণ থেকে। কিন্তু তেমন কিছু পাওয়া যায় নি।//
(পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিল ৬০,০০০; তারা যদি ত্রিশ লক্ষ মানুষ মেরে থাকে ও তিন লক্ষ মহিলাকে ধর্ষণ করে থাকে , তা হলে প্রতিজন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সদস্য গড়ে ৫০ জন মানুষ মেরেছে ও ৫ জন করে মহিলাকে ধর্ষণ করেছে ।)।

ফেরদৌসীর যুক্তি হলো, সে ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারি তাই তাকে খালিশপুরে থাকতে হয়েছিল। তার মতে যেদিন সে প্রথম ধর্ষণের শিকার হয় সেদিন সে তার ম্যানেজারের সাথে দুপুরের খানা খেতে গিয়েছিল, কাজ শেষে সে তার সাথে তার এপার্টমেন্টেও গিয়েছিল। এবং সেখানেই সে ধর্ষণের শিকার হয়। পরের দিন সে আবার কাজে গিয়েছিল। এখানে প্রশ্ন হলো, যে ধর্ষণ নিয়ে একাত্তরের পর সে এতবড় জবানবন্দী পেশ করলো এবং ইতিহাসের বইয়ে প্রকাণ্ড ও একমাত্র সাক্ষীতে পরিণত হলো, অথচ যেদিন সে ধর্ষিতা হলো, সেদিন তার নিজের আচরণটি কেমন ছিল? সে যখন ধর্ষিতা হওয়ার মুখে তখনও সে বাধা দেয়নি। প্রতিবাদও করেনি। ধাক্কাধাক্কি করে সে ধর্ষণ থেকে বাঁচবার বা পলায়নেরও চেষ্টা করেনি। যেখানে ধর্ষণকারি হলো স্বয়ং ম্যানেজার, সে স্থান কোন অবস্থাতেই তার জন্য নিরাপদ ছিল না। অথচ সে বিপদজনক স্থান থেকে সেদিন বা পরের দিন পলায়নও করেনি। পরবর্তী নয় মাসেও সে পলায়নের চেষ্টা করেনি। বরং পরের দিন আবার সে অফিসেই কাজে গেছে। অথচ কোন অবস্থাতেই এ বিশ্বাস করা যাবে না যে ফেরদৌসী বন্দী ছিল। নিরাপদ স্থানে সে চলে যেতে পারতো। কিন্তু সে যায়নি।//

বাংলাদেশের ইতিহাসে ধর্ষণের প্রমাণরূপে খাড়া করা হয়েছে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীকে। শাহরিয়ার কবির তার সম্পাদিত “একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি” বইতে তার জবানবন্দীকে দলিলরূপে পেশ করেছেন। শর্মিলা বসু তার ঘটনা কেস স্টাডি হিসেবে নিয়ে কাজ করছেন। এই বিষয়ে শর্মিলার মন্তব্য হলো, //ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনী একজন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত মহিলা এবং পেশায় ভাস্কর। তার কাজের স্থান ছিল খুলনার এক জুটমিলের অফিসে। ফেরদৌসীর অভিযোগ তাকে প্রথমে তার আগাখানী জেনারেল ম্যানেজার ধর্ষণ করে। তারপর সে ১৫ জন পাকিস্তানী সামরিক অফিসারের নাম নেয় যাদের অবস্থান ছিল যশোর ও খুলনায় । তাদের মধ্য থেকে একমাত্র দুইজন বাদে সবার বিরুদ্ধে হয় ধর্ষণ অথবা ধর্ষণের চেষ্টা বা অন্য প্রকার যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছে যা করা হয়েছে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে।

তার নিজের ভাষ্য মতে সে একজন তালাকপ্রাপ্তা তিন সন্তানের মা। তার সন্তানেরা খুলনায় ফেরদৌসীর নানীর কাছে থাকতো আর নিজের মা এবং ৭ জন ভাই-বোন নিয়ে সে খালিশপুরে থাকতো। যেখানে সে জুটমিলে কাজ করতো। আহসান উল্লাহ আহমেদ নামে ফেরদৌসীর একজন পুরুষ বন্ধু ছিল এবং সে ছিল পাশ্ববর্তী আরেকটি জুটমিলের লেবার অফিসার। মিলিটারি এ্যাকশনের পর আহসান উল্লাহ তার নিজের পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলে। ফেরদৌসীর মা এবং তার ভাই-বোনেরাও শহর চলে যায়। তখন ফেরদৌসী একা থেকে যায় তবে মাঝে মধ্যে তার কোন ভাই বা বোন বেড়াতে আসতো। তখন তার পুরুষ প্রেমিকটি পাশেই কাজ করতো।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা মারা গেছেন অথবা তাদের আত্নীয়-স্বজনরা মারা গিয়েছেন এমনটা শুনা যায়নি। শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার বলেন “আওয়ামী লীগের প্রথম সারির কোন নেতা যুদ্ধে আপনজন হারাননি।” অথচ এর বিপরীতে পাকিস্তানের অখন্ডতায় বিশ্বাসী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনায়েম খানকে মুক্তিযোদ্ধারা তার বাড়িতেই হত্যা করে। পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি ও কল্যাণ কাউন্সিলের আহবায়ক মৌলভী ফরিদ আহম্মেদকে গুম করা হয়। মুসলিম লীগ নেতা আজিজুল হক চৌধুরী, আব্দুল জব্বার আমীন ও সোলায়মান পাইকারকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা। সাবেক মন্ত্রী জহুরুল হক (লাল মিয়া), সিলেট পিডিপি সভাপতি জসিমউদ্দিন, প্রাক্তন এমএনএ আবদুল হামিদ, মুসলিম লীগ নেতা সিরাজুল হক, বগুড়ার খোরশেদ আলমসহ শত শত স্বাধীনতা বিরোধী নেতা কর্মীকে যুদ্ধ কালেই হত্যা করা হয়। অথচ তারা বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। তারা কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হন নি।

ধর্ষণের ইতিহাস কীভাবে বিকৃতি করা হয়েছে তার একটি নমুনা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আর জেয়াদ আল মালুমের কথোপকথন থেকেই অনুমান করা যায়। “জেয়াদ আল মালুম বলেন, আমাদের আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্যের জায়গাটা হলো, সাধারণ ফৌজদারী সাক্ষ্য-প্রমাণের জন্য যে সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয় থাকে, আমাদের ক্ষেত্রে আপনারা হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন, আমাদের আইনে শুধুমাত্র ব্যক্তি সাক্ষী তাই নয়, এমনও হতে পারে, রায়েরবাজার বধ্যভূমি, এটাতো নিজেই একটা সাক্ষী। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুরের একটা অঞ্চলে রেপের ঘটনা রয়েছে। ছাব্বিশাতে বহু রেপ ভিকটিম আছে।

এ সময় কাদের সিদ্দিকী প্রবল আপত্তি তুলে ধরে বলেন, এখানে আমার আপত্তি আছে। ইতিহাস বিকৃত করা অত্যন্ত অন্যায়। ছাব্বিশাতে একটি রেপও হয়নি। ছাব্বিশা মুক্তিযুদ্ধে আমার নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছিল। ছাব্বিশা গ্রামটি সমস্ত পুড়ে ছারখার করে দিয়েছিল। তাই আমি বলবো, বিভ্রান্ত করা ভালো কাজ না। এটা বিরক্তিকর। জিয়াদ আল মালুম বলেন, আমি বিভ্রান্ত করছি না। আমাদের কাছে সে ধরনের তথ্য-উপাত্ত আছে। কাদের সিদ্দিকী এ পর্যায়ে বলেন, তথ্য যদি ওই রকম বিভ্রান্তিকর হয় তাহলে তো হবেই। যুদ্ধ করলাম আমি। ছাব্বিশা গ্রামে এক দিনে ৩৬ জন রেপ, যে গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করা হলো, তখন কেউ রেপ করে?”

এখানে যদি জেয়াদ আল মালুম সত্য হয়ে থাকেন তবে ছাব্বিশাতে রেপের ঘটনা কাদেরিয়া বাহিনীর দ্বারাই সংঘটিত হয়েছে। যা এখন জেয়াদ আল মালুম সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। আর যদি কাদের সিদ্দিকী সত্য হয়ে থাকেন তবে সেখানে কোনো রেপের ঘটনা ঘটে নি। জেয়াদ আল মালুম মিথ্যা অভিযোগ করছেন। এখানে জেয়াদ আল মালুম দুই ক্ষেত্রেই মিথ্যেবাদী। কারণ ছাব্বিশাতে একদিন মাত্র অভিযান চালিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয় সেনাবাহিনী। তাই সেনাবাহিনী দ্বারা রেপের ঘটনা অবাস্তব।

এদেশে প্রকাশ্যে গণহত্যা শুরু হয় ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে। যেসব বাঙালি নেতা স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন নি তাদের বিরুদ্ধে নির্বিচার হত্যা চলতে থাকে। এই হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনী ও নিউক্লিয়াসের সদস্যদের দিয়ে গঠিত ভারতীয় জেনারেল ওবানের বিশেষ বাহিনী 'মুজিব বাহিনী'। বহু মসজিদ ও মাদ্রাসা বিশেষত কওমী মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায় সেদিন থেকে। এই হত্যাযজ্ঞ ও গণহত্যা এতই মর্মান্তিক ছিল যে, ঢাকার অনেক কওমী মাদ্রাসা চালু হতে প্রায় তিন বছর সময় লেগে গিয়েছে।
আর বধ্যভূমির কথা যা বলা হয়েছে তার দিকে যদি আমরা নজর করি তাহলে দেখতে সবগুলো বধ্যভূমি ছিল ভারত থেকে আসা বিহারের মজলুম মুহাজিরদের আবাসস্থলে বা তার কাছাকাছি। বলা যায় এপ্রিল ও মার্চে বিহারীদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্মম ও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞই বধ্যভূমির কারণ। যেগুলো এখন বাঙালি হত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আইসিটি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমরা এভাবেই তথ্য বিকৃতি করে গেছেন পুরোটা সময় জুড়ে।

এই ১৯৫ জনের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই হত্যার নির্দেশের জন্য অভিযুক্ত অর্থাৎ তারা যুদ্ধ করেননি বা সরাসরি অভিযানে যাননি। তাহলে কারা তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলো? অথবা কারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলো? ১০০ জনের কম মানুষ কীভাবে লাখ লাখ মানুষকে খুন করলো? এবার আসুন ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে কথা হোক। ১৯৫ জনের মধ্যে মাত্র ১৩ জনের বিরুদ্ধে মহিলাদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আসলো! তাহলে কী এই ১৩ জনই ৩ লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করলো! আবার খেয়াল করুন এই ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে মাত্র। প্রমাণিত নয়। যদি অভিযোগ সত্যও প্রমাণিত হয় তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনা অনধিক ২০। এখানে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে, কোনো স্থানে ধর্ষণ হয়েছে কিন্তু শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কারণ পাকিস্তান বাহিনীর সব সদস্যকেই বাঙালি সৈনিকরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল তারা চিনতো। একই ক্যান্টনমেন্টেই তারা থাকতো।

১৯৭০ সনের নির্বাচনের পরপরই বিহারিরা নির্যাতিত হতে শুরু করে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে বসবাসরত বিহারিরা দলবদ্ধভাবে থাকা শুরু করে। তারপরও তারা নিজেদেরকে বা পরিবারের সদস্যদেরকে রক্ষা করতে পারেননি। স্কুল-কলেজ ও কর্মস্থলে যাতায়াতকালে তাদের উপর আক্রমণ হতে শুরু হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, লালমনিরহাট, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ময়মনসিংহসহ অন্যান্য স্থানে ১ মার্চ ১৯৭১ তারিখ হতেই বিহারি ও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানীদের ওপর আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড ঘটায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ও নিউক্লিয়াস। ১৯৭১ সনের ঘটনার ওপর পাকিস্তান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্রে এসব ঘটনায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ উল্লেখ করা হয়।

এতক্ষণ যে বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে তা থেকে বুঝতেই পারছেন আমি বিভিন্ন সোর্স থেকে যুদ্ধের হতাহত উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। আর আমি যে অবস্থায় আছি তাতে আমার পক্ষে মাঠ পর্যায়ের গবেষণা অত্যন্ত বিপদজনক। আমি বিভিন্ন সোর্স থেকে সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আরেকটি বিষয় আমি আপনাদের সামনে উল্লেখ করতে চাই যা দ্বারা আপনারা অনুমান করতে পারবেন কী পরিমাণ হত্যাকাণ্ড হয়েছে!

সেসময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সব বাহিনী মিলে আত্মসমর্পন করেছে ৬০০০০ সেনা ও কর্মকর্তা। ৯৩০০০ হলে বলে যে সংখ্যা আমরা শুনতে পাই তা হলো সেনাবাহিনীর পরিবার পরিজন ও পশ্চিম পাকিস্তানী সাধারণ জনগণসহ। যাই হোক বাংলাদেশ সরকার যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনে তখন স্পেসেফিক নাম দেওয়ার প্রয়োজন হয়। প্রথমে পাক সেনাবাহিনীর ৫০০০ এরও বেশি সদস্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়। যুদ্ধাপরাধ মানে বেসামরিক মানুষ হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণ। এরপর যাচাই বাছাই করে বাংলাদেশ সরকার এই তালিকা আরো ছোট করে প্রায় ১২০০ জনের তালিকা প্রস্তুত করে। এরপর যখন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করার প্রয়োজন হয় তখন বাংলাদেশ সরকার মাত্র ১৯৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করতে সক্ষম হন। এই ১৯৫ জনকে বিচারের আওতায় আনার কথা ছিল। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় 'শিমলা চুক্তি'র মাধ্যমে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

স্বাধীনতার পর স্বাধীনতার বিপক্ষের মানুষদের বিচার করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে শেখ মুজিব সরকার। যেহেতু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বন্দী সদস্য ও তাদের পরিবার ভারতের জিম্মায় তাই তাদের বিচার ইচ্ছেমত করার সুযোগ ছিল না। তাদের বিচার হবে আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ মামলায়। আর যারা ছিলেন বাঙালি কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী তাদের বিচার করার জন্যে মুজিব সরকার দালাল আইনের ব্যবস্থা করেছিল।

তাহলে এবার বলা যেতে পারে পাকিস্তানীরা নয়, বাঙালিদের মেরেছে ও ধর্ষণ করেছে রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধী বাঙালিরা। সেই চিত্রটাও আমরা একটু দেখে নিতে পারি। এদেশীয় জনগণ যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল তাদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারী দালাল আইন প্রণয়নের পর ৬ ফেব্রুয়ারী, ১ জুন ও ২৯ আগস্ট তারিখে তিন দফা সংশোধনীর পর আইনটি চূড়ান্ত হয়।

এ আইনের অধীনে প্রায় একলাখ লোককে আটক করা হয়। এদের মধ্যে থেকে অভিযোগ আনা সম্ভব হয় ৩৭৪৭১ জনের বিরুদ্ধে। বাকীদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকায় ছেড়ে দেয়া হয়। অভিযুক্ত ৩৭৪৭১ জনের মধ্যে থেকে দালালী বা অপরাধের কোন প্রকার প্রমাণ না পাওয়ায় ৩৪৬২৩ জনের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করাই সম্ভব হয়নি। সারাদেশে ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ২২ মাসে বাকি ২৮৪৮ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়।

১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই তাদের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার পর দালাল আইনে আটক ৩৭ হাজারের অধিক ব্যক্তির ভেতর থেকে প্রায় ২৬ হাজার ছাড়া পায়। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় হয়, ‘যারা বর্ণিত আদেশের নিচের বর্ণিত ধারাসমূহে শাস্তিযোগ্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তারা কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নন।’

যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বিচার হয়। তাদের মধ্যে বিচারে মাত্র ৭৫২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। বাকী ২০৯৬ জন বেকসুর খালাস পায়। যে ৭৫২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হয় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও গুরুদন্ড দেয়ার মতো ছিল না। একজনের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয় নি। শুধুমাত্র চিকন আলী নামের একজনকে হত্যার অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। তাহলে সে আবার আগের প্রশ্ন এত হত্যা কে করলো? এত ধর্ষণ কে করলো?

প্রাসঙ্গিকভাবে বলে রাখি ২০১০ সাল থেকে যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলা হয়েছে, যারা অভিযুক্ত হয়েছে ও যাদের দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং হচ্ছে তাদের কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ তো দূরের কথা দালাল আইনেও মামলা করা হয়নি। অথচ তারা প্রকাশ্যে তাদের বাড়িতে, কর্মস্থলে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান করেছেন। এটা বানোয়াট এবং প্রতিহিংসামূলক বিচার তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের দৃষ্টিতে ১৯৭১ সালের অপরাধীদের মধ্যে অবাঙালি হলেন ১৯৫ জন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে কিন্তু বিচার হয়নি। আর বাঙালি অপরাধী হলেন ৭৫২ জন। এই ৭৫২ জনের ১ জন বাদে কেউই হত্যা, গণহত্যা ও ধর্ষণের অপরাধ করেননি বলে বাংলাদেশের আদালত ঘোষণা দিয়েছেন।

যদি সত্যিই অনেক ধর্ষণ হয়ে থাকে অথবা ১০০ টি ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে থাকে তবে এর দায় যুদ্ধের জয়ী পক্ষ মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর। আর যদি তা না হয়ে থাকে তবে পুরো বিষয়টাই বানোয়াট ও মিথ্যা।

২০ ডিসে, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৭৩ : ১৯৭১ এ যেভাবে ধরাশয়ী হয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী


ইন্দিরা গান্ধীর প্ল্যান ছিল আওয়ামী কর্মী, ভারতীয় গোয়েন্দা ও অন্যান্য বিদেশী গোয়েন্দাদের ব্যাপক তৎপরতা ও গেরিলা যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনী নাজেহাল হয়ে পড়বে। ম্যসাকার চালাবে পাকিস্তান। অবশেষে মানবতার দোহাই দিয়ে পাকিস্তানে ঢুকে পড়বে। রাশিয়া এক্ষেত্রে ভারতকে সাপোর্ট দিলেও সরাসরি যুক্ত হয়নি, কারণ তা চীন ও আমেরিকাকে আরো বেশি পাকিস্তানের পক্ষে সক্রিয় করবে। কিন্তু মে মাসে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী সকল স্থানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলো তখন ইন্দিরা আর কোনোভাবেই পাকিস্তানে অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছিল না। 


আন্তর্জাতিক সাহায্য পাওয়ার জন্য তিনি তৎপরতা চালাতে লাগলেন। কিন্তু সেরকম পজেটিভ কিছু পাননি। আমেরিকা তাকে হতাশ করলো। এরপরো দমে যেতে চান নি তিনি। এদিকে পাকিস্তান পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে দেখে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পূর্ব-পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। টিক্কা খানকে প্রত্যাহার করে ডা. আব্দুল মোতালেব মালেককে গভর্ণর করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন শূন্য আসনগুলোতে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে। বাঙালিরা আবার নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশে চলে গেছে। এসব ঘটনাপ্রবাহ ইন্দিরাকে ব্যাপকভাবে বিচলিত করে। 

তাই তিনি পাকিস্তান ভেঙে দেওয়ার সুযোগ যাতে হাতছাড়া না হয় সেজন্য কাজ করতে থাকেন। 


ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্তানে কর্মরত RAW এর এজেন্ট, মুক্তিযোদ্ধা ও সে দেশে আশ্রয়গ্রহণকারী শরণার্থীদের মাধ্যমে এ অঞ্চলের সার্বিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করে। সামগ্রিক পরিস্থিত্রি খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করার পর তারা এ যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা ভারতীয় সেনাপ্রধান মানেক'শ-কে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বলেন। মানেক'শ রাজি হননি। কারণ যুদ্ধে জড়ানোর মতো উপযুক্ত কারণ তখনো তৈরি হয়নি। এছাড়া আমেরিকা যদি ব্যবস্থা গ্রহণ করে তবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার মতো সক্ষমতা ভারতের নেই। 


এদিকে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি স্বীকৃতি আদায়ে তাজউদ্দিন আহমেদ মুসলিম ছাড়া আর যত জাতি আছে সবার কাছে ধরনা দিয়েছে। ভারত, রাশিয়া আর ইংল্যান্ড তো আছেই সাথে পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে পরিচিত আমেরিকা ও চীনের সাথেও যোগাযোগ চালিয়ে গেছে। চীন তাদের পুরোপুরি হতাশ করেছে আর আমেরিকা বরাবরের মতো আশা-নিরাশার দোলাচলে রেখেছে। শুধু তাই নয় তাজউদ্দিন মুসলিমদের সর্বোচ্চ দুশমন বলে পরিচিত ইহুদীদের কাছে সমর্থন আদায়ের জন্য গিয়েছেন। কারণ তিনি জানতেন ইহুদি-খ্রিস্টানরা ধর্ম বিবেচনায় হলেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যাবেন।  


তাজউদ্দিন ইসরাঈলের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব দেন আওয়ামী লীগের আব্দুস সামাদ আজাদকে। ইসরাঈল প্রবাসী সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করে ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেকোনো সহায়তার অঙ্গিকার প্রকাশ করে। প্রবাসী সরকারের অনেক কর্মকর্তাই এটিকে ভালো চোখে দেখে নি। হয়তো ইহুদী হওয়ায় মুসলিম সত্ত্বাটি জেগে উঠেছে। সমাজতন্ত্রী ছাড়া যারা শুধু আওয়ামী লীগ তারা কেউই ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছুক ছিল না। তাই প্রবাসী সরকারের সাথে ইসরাঈলের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়ে ওঠেনি। 


তারপরও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ইসরাইলের ভূমিকা ছিল বিস্ময়কর। ইসরাইল বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র যারা ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল। ১৯৭১ সালের ২ জুলাই ইসরাইলি পার্লামেন্ট বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণের অভিযোগ এনে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। এমনকি ইসরাইল রেডক্রস বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা, শরণার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঔষধ কাপড় ও খাবার ভারত সরকারের নিকট পাঠায়।


সরাসরি যোগাযোগ না রাখলেও তাজউদ্দিন ও ইসরাঈলের সাথে সম্পর্কের মধ্যস্থতা করেছেন ভারতের পূর্বাঞ্চলের ইহুদী কমান্ডার জ্যাকব। মূলত ভারত ১৯৭১ সালের যুদ্ধ করেছিলো জ্যাকবের নেতৃত্বে। ইন্দিরা গান্ধী শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ চালিয়ে বাংলাদেশকে আলাদা করার ব্যাপারে দৃঢ় ছিলো। কিন্তু সেনাপ্রধান মানেক'শ এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে যুদ্ধ জড়াতে চাইছিলো না। 


পাকিস্তানের সাথে মার্কিনীদের সমাজতন্ত্রী বিরোধী সিয়াটো চুক্তি রয়েছে। তাতে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো যে, কোনো সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র দ্বারা তারা পরষ্পরের কেউ আক্রান্ত হলে উভয়েই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। সেই হিসেবে পাকিস্তান তাদের সমস্যাকে সমাজতন্ত্র সমস্যা হিসেবে বেশি আখ্যায়িত করেছে। এদিকে ভারতও রাশিয়াকে এই যুদ্ধে আমন্ত্রণ জানাতে চায় না। কারণ রাশিয়ার অংশগ্রহণ যুদ্ধকে জটিল করবে এবং আমেরিকা রাশিয়াকে ঠেকাতে সব ধরণের চেষ্টা করবে। 


মানেকশ তাই সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে বাঙালিদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করানোর নীতি গ্রহণ করেছে। এদিকে ইহুদী জে এফ আর জ্যাকব ইন্দিরাকে আশ্বস্ত করেন আমেরিকাকে নিষ্ক্রিয় করার ও স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধে পাকিস্তানকে হারাবার সকল পরিকল্পনা তার আছে। জ্যাকব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ে ইসরাঈলকে ব্যবহার করেন। ইসরাঈলও সর্বাত্মক সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিল। সেসময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ছিলো গোল্ডা মেয়ার। গোল্ডা মেয়ার দফায় দফায় পাকিস্তান ইস্যুতে মিটিং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সাথে। তিনি আমেরিকাকে নিরপেক্ষ থাকতে রাজি করান। 


পাকিস্তান যাতে ভেঙে যায় এই ব্যাপারে ইসরাঈল আন্তরিক ছিল। গোল্ডা মেয়ার ভারতকে অস্ত্র সাহায্য পাঠায়। ইন্দিরা যাতে এই যুদ্ধে স্ট্রং থাকে সেজন্য অস্ত্র সাহায্য ও শরনার্থী সমস্যা মোকাবেলায় ভারতকে সাহায্য করে ইসরাঈল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো ভারতের সাথে তখন ইসরাঈলের কোনো কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো না। তাছাড়া ৭১ সালে ইসরাঈল অর্থনৈতিকভাবেও দুর্বল ছিলো। তবুও গোল্ডা মেয়ার এসব সাহায্য পাঠিয়ে ভারতকে মুসলিমবিরোধী যুদ্ধে চাঙা রাখে এবং এর মাধ্যমে ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু ইন্দিরা সাহায্য গ্রহণ করলেও রাশিয়ার বিরাগভাজন হওয়ার আশংকায় সেসময় কূটনৈতিক সম্পর্কের ইসরাঈলি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। 


১৯৭১ সালের অক্টোবরে শেষদিকে মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত সকল বাহিনী তথা মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী ইত্যাদির কমান্ড ভারতীয় বাহিনী গ্রহণ করে এবং জেনারেল ওসমানীর বিরোধিতা সত্ত্বেও যৌথবাহিনী গঠন করে জ্যাকব। ভারতীয় বাহিনী সকল ক্ষেত্রে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার সকল ব্যবস্থা সম্পন্ন করে। তাজউদ্দিন-ইন্দিরা চুক্তির দ্বিতীয় ২য় দফায় উল্লেখ ছিল যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সশস্ত্র বাহিনী মিলে একটি যৌথ কমান্ডের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত হবে। 


ভারতের সেনাপ্রধান উক্ত যৌথ কমান্ডের প্রধান হবেন এবং তার কমান্ড অনুসারে যুদ্ধে শামিল হওয়া বা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সে অনুসারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল বাহিনী (সামরিক বাহিনী, আধাসামরিক বাহিনী, মুক্তি ফৌজ, মুজিব বাহিনীসহ অন্যান্য আঞ্চলিক মুক্তিবাহিনী) কার্যতঃ ভারতীয় বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী যাকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়, তাকে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা লে. জেনারেল আরোরা অধীনে কমান্ড গ্রহণ করতে হয়।


এদিকে জে এফ আর জ্যাকব তার পরিকল্পনা অনুসারে ও ইসরাঈল থেকে পজেটিভ ইঙ্গিত পেয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে নেমে পড়ে। যুদ্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়। দিল্লি কিংবা মানেক'শর জন্য অপেক্ষা করে না। আত্মসমর্পনের খসড়া প্রস্তাব তার নিজেরই লেখা। সে কীভাবে অল্প সময়ে কৌশলে ব্লাফ দিয়ে আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীকে পরাজিত করেন তা কিংবদন্তি হয়ে আছে। এজন্য সে ব্লাফ মাস্টার খ্যাতি পায়। 


ভারতীয় স্থলবাহিনীর সম্মুখ অভিযান শুরু হয় চারটি অঞ্চল থেকে

১. পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে তিন ডিভিশনের সমন্বয়ে গঠিত ৪র্থ কোর সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী অভিমুখে। 

২. উত্তরাঞ্চল থেকে দু' ডিভিশনের সমন্বয়ে গঠিত ৩৩তম কোর রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া অভিমুখে

৩. পশ্চিমাঞ্চলে থেকে দু' ডিভিশনের সমন্বয়ে গঠিত ২য় কোর যশোর কুষ্টিয়া, খুলনা, ফরিদপুর অভিমুখে এবং 

৪. মেঘালয় রাজ্যের তুরা থেকে ডিভিশনের চাইতে ছোট একটি বাহিনী জামালপুর ও ময়মনসিংহ অভিমুখে। 

এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতের বিমান ও নৌশক্তি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচ্ছন্ন কিন্তু সদাতৎপর সহযোগিতা। 

এসব মিলে বাংলাদেশকে ডিসেম্বরের এক তারিখ থেকে ঘিরে ফেলে ভারত।


২ ডিসেম্বর ভারত সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে খুলনার কিছু অংশ দখল করে। এর প্রতিবাদে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ৩ ডিসেম্বর দুই দেশ পাল্টাপাল্টি বোমা হামলা করে ও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের কয়েকদিনের মধ্যেই পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ রণেভঙ্গ দেয়। পূর্ব-পাকিস্তান কমান্ডার নিয়াজী কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে হামলা করে ভারত জ্বালানী তেলের মজুদ ধ্বংস করে দেয়। ভারতীয় বিমান বাহিনী আকাশ থেকে লিফলেট ফেলে ঢাকাকে আত্মসমর্পনের জন্য নির্দেশ দিতে থাকে। এদিকে কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন নিয়াজীকে জ্যাকব ব্লাফ দেয় যে, সেনাবাহিনী একটা অংশ ও অবাঙ্গালিরা তার কাছে জিম্মি হয়ে আছে।  


১১ তারিখ গভর্নর হাউসে (বঙ্গভবনে) বোমা হামলা করে ভারত। সাহস হারিয়ে ডা. মালেক পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি ও তার সরকারের কিছু মন্ত্রী Hotel Intercontinental (বর্তমান রূপসী বাংলা)-এ আশ্রয় গ্রহণ করেন। এটি আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত নিরপেক্ষ স্থান ছিল। মূলত ১১ তারিখ থেকেই নিয়াজির বাঁধ ভেঙে যায়। সে হতাশ হয়ে পড়ে। তাছাড়া ৪ দিক থেকে ধীরে ধীরে ঢাকার দিকে এগোতে থাকে ভারতীয় বাহিনী। ১৩ ডিসেম্বর নিয়াজী জ্যাকবের কাছে আত্মসমর্পন করার সিদ্ধান্ত জানান। এরপর পাকিস্তান বাহিনী যারা সারাদেশে যুদ্ধ করছিলো তারা পুরোপুরি হাল ছেড়ে দেয় ও পিছু হটে ঢাকার দিকে আসতে থাকে।


১৬ তারিখ আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের ডেট নির্ধারিত আয়োজন হয়। ভারতীয় জেনারেলরা আত্মসমর্পনের ব্যাপারে ওসমানীকে অন্ধকারে রাখে। নিয়াজীও চেয়েছিলো মুক্তিবাহিনীর কাছে নয় বরং ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করতে। কারণ মুক্তিবাহিনীর কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ নয়। তারা বন্দীদের সাথে নৃশংস আচরণ করতে পারে যা ভারতীয় সেনাবাহিনী করবে না।     

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। মাত্র ১৩ দিনের যুদ্ধে পরাস্ত হয় পাকিস্তান। 


২২ ডিসেম্বর একটি ভারতীয় বিমানে করে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রীসভার অন্যান্য সদস্যগণ ঢাকা আসেন। কি কারণে প্রবাসী মন্ত্রীসভা ছ'দিন পর প্রত্যাবর্তন করে তা পরিস্কার নয়। এ সময়ে ভারতীয় বাহিনী সকল সেনানিবাস ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার (KPI) নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ফেলে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ভান্ডারের অধিকাংশ ভারতে স্থানান্তরের সুযোগ পায়। এ সময়ই ভারতীয় বাহিনীর লুটতরাজের বিরোধিতা করায় সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলকে গ্রেফতার করে ভারত।

১৫ ডিসে, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৭২ : স্বাধীনতা তথা দেশভাগের পক্ষে যারা ছিলেন




ভারত ও তাদের গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত সংলগ্ন মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রসহ বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠন হয়। এ সরকারই মুজিবনগর সরকার হিসাবে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। এ দিনই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের সমন্বয়ে গণপরিষদ গঠিত বলে গণ্য হয়। মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণার পর এটি যুদ্ধের দ্বিতীয় মাইলফলক যা বাংলাদেশের অনেক তারুণ্যকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার উৎসাহ যোগায়। ভারত সরকার দেশভাগের পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। 

ভারতের শরনার্থী গ্রহণ

২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট ও পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সারাদেশে আগ্রাসী সামরিক অভিযান অনেককে ভীত সন্ত্রস্ত করে। প্রথমে হিন্দু জনগোষ্ঠী ভারতে শরনার্থী হিসেবে গমন করে। ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ দলবেঁধে ভারতে প্রবেশ করতে থাকে। পরে অন্যান্য অংশের মানুষও শরনার্থী হয়। এভাবে ভারতের শরণার্থী শিবিরে ৭০ থেকে ৮০ লক্ষ মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করে । 

মুক্তিবাহিনী ও মুজিব বাহিনী গঠন এবং প্রশিক্ষণ

সেনাবাহিনীর সাঁড়াশী অভিযানে কিংকর্তব্যবিমুঢ় বিদ্রোহীরা মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণায় দিকনির্দেশনা পায়। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিদ্রোহী বাঙালি সামরিক বাহিনী, ই.পি.আর, ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যগণ সংঘবদ্ধ হতে থাকেন। ৪ এপ্রিল ৭১ তারিখে সামরিক কর্মকর্তাগণ মিলিত হন হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানে। পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগকারী সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার সদসদের নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিফৌজ। এর প্রধান করা হয় কর্ণেল (পরবর্তীতে জেনারেল) আতাউল গনি ওসমানীকে।

অন্যদিকে তাজউদ্দিন ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং প্রবাসী সরকার গঠন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ভারতীয় নিরাপত্তা এজেন্সীগুলোর মাধ্যমে পূর্ব রণাঙ্গনের প্রতিরোধ সংগ্রামের এ সব ঘটনা ও সিদ্ধান্তের সংবাদ তাজউদ্দিনের কাছে পৌঁছতে শুরু করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাজার হাজার আওয়ামী কর্মী ভারতে আশ্রয় নিলে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। দেশত্যাগীরা নিজের অস্তিত্বের তাগিদে ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুপ্রেরণায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণের দাবী জানাতে থাকে। এ সময় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও নিউক্লিয়াসের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। RAW এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় মুজিববাহিনী আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় মুক্তিযোদ্ধা। জুলাই মাসে মুক্তিফৌজ আর মুক্তিযোদ্ধা একীভূত করে গঠন করা হয় মুক্তিবাহিনী। মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্বে জেনারেল ওসমানী থাকলেও মুজিববাহিনীর নেতৃত্ব দেন ভারতীয় জেনারেল ওবান।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনী দেশ রক্ষার মন্ত্র নিয়ে দেশদ্রোহীদের শায়েস্তা করার শুরুর দিন থেকে মাত্র পাঁচ দিন পরেই পূর্ব বাংলার বিদ্রোহীদের সাহায্য করার জন্য ভারতীয় পার্লামেন্ট যে প্রস্তাব গ্রহণ করে তা অল্পদিনের মধ্যেই কার্যকর রূপ লাভ করেছিল। ফলে এপ্রিল মাসে ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ) বিক্ষিপ্তভাবে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে যে অল্প স্বল্প সাহায্য করে চলেছিল তার উন্নতি ঘটে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় চার সপ্তাহ মেয়াদী ট্রেনিং কার্যক্রম। এখানে শেখানো হতো সাধারণ হাল্কা-অস্ত্র ও বিস্ফোরকের ব্যবহার। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হয় দু'হাজার ছাত্র ও যুবকের প্রথম দলের ট্রেনিং।

তরুণদের ট্রেনিং দেওয়ার ব্যাপারে অবশ্য ভারতীয় প্রশাসন সতর্ক ছিল। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, নক্সালবাদী, নাগা, মিজো প্রভৃতি সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তৎপরতা-হেতু পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতীয় পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা সম্পর্কে ভারতীয় উদ্বিগ্ন ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত অস্ত্র এই সব সন্ত্রাসবাদী বা বিদ্রোহীদের হাতে যে পৌঁছবে না, এ নিশ্চয়তাবোধ গড়ে তুলতে বেশ কিছু সময় লাগে। তাই শুধু আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য সাধারণ যুবকদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দেওয়া হয়নি। 

আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে, সামগ্রিক সমস্যার চাপে ভারত সরকারের নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে যখন দক্ষিণপন্থীদের প্রভাব হ্রাস পায় এবং বাংলাদেশ মন্ত্রিসভার মধ্যে তাজউদ্দিনের অবস্থান অপেক্ষাকৃত সবল হয়, তখন বাংলাদেশের বামপন্থী তরুণদের বিরুদ্ধে এই বিধি-নিষেধ বহুলাংশে অপসারণ করা হয়। মনি সিং এর তৎপরতার ফলে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের নিয়ে আলাদাভাবে একটি প্রশিক্ষণ শিবির চালু করা হয় অক্টোবর মাসে। তারা যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পূর্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। 

প্রাথমিক পর্যায়ে (মার্চ-এপ্রিল) পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সকল দল, মত, ধর্মের মানুষ ভারতে পাড়ি জমায়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ট্রেনিং গ্রহণ করতে তারা আগ্রহ প্রকাশ করেন। এটি ছিল স্বাধীনতার স্বপক্ষে একপ্রকার ঐক্য। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মনোনয়ন ও ট্রেনিং-এর ক্ষেত্রে প্রদর্শিত বৈষম্য তরুণদের সেই একতাবোধকে বহুলাংশে বিনষ্ট করে। বিশেষ করে দাড়ি টুপিধারী শরণার্থীকে মারধর অথবা বন্দী করে রাখার ঘটনা ইসলামপন্থী মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনার মানুষদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটায়। 

ইসলামী ছাত্রসংঘের (পরবর্তীতে ইসলামী ছাত্রশিবির) কর্মী সন্দেহে ট্রেনিং থেকে বের করা সম্পর্কে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “এর মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে। প্রথমে আমরা বুঝতেই পারিনি কী হয়েছে! আমাদের ব্যাচের একজনকে ডেকে পাঠানো হয়। বলা হয়, ঐ ছেলেটিকে উইথড্র করা হয়েছে। একটা চাপা গুঞ্জন শুনি, সে নাকি ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে জড়িত ছিল।” মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। জেনারেল ওসমানী এক সাক্ষাতে বলেন, এ সংখ্যা ছিল প্রায় ষাট হাজার। 

স্বাধীনতার পক্ষে রাজনৈতিক শক্তি 

এ যুদ্ধের নেতৃত্বকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নাম প্রথমে আসে, এরপর মস্কোপন্থী কমুনিস্ট পার্টি, ন্যাপসহ কিছু ছোট ছোট রাজনৈতিক দল এবং মস্কোপন্থী অনেক বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি ভূমিকা রাখেন। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্রশক্তি। ব্রিটিশ পলিসি ছিল বরাবরই চতুর। ব্রিটেনের নীতিনির্ধারকদের একাংশ পাকিস্তানের পক্ষে আর অন্য অংশ বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন।

চীনপন্থী রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবীদের দুই একজন ব্যতিক্রম ছাড়া কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোন ভূমিকা রাখেননি। মাওলানা ভাসানী মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য ভারতে গিয়ে বন্দী জীবন কাটান। রাশেদ খান মেনন বলেন “তারপর মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস মাওলানাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানতাম তিনি আমাদের কাছেই আছেন। পত্রিকায় তাঁর বিবৃতি পড়েছি। আকাশবাণীতে সাক্ষাৎকার শুনেছি। প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা কমিটির সভার ছবিও দেখেছি পত্রিকায়। কিন্তু মওলানা যা আশংকা করেছিলেন, তিনি সুভাস বসুর মতো বন্দী ছিলেন ভারত সরকারের হাতে"। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় শেখ মুজিবের উর্দ্ধে কোন নেতার আবির্ভাব ভারতের কাছে বিব্রতকর ছিল। ভারত সরকার আশংকা করত ভারতের বাইরে গেলে ভাসানী হয়তো বামপন্থীদের নিয়ে স্বাধীনতা শক্তির পক্ষে অপর একটি সরকার গড়ে তুলতে পারেন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ লাভ করুক এটাও ভারত সরকারের কাম্য ছিল না। তাই ভাসানীকে ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে গৃহ-অন্তরীণ থাকতে হয়। 

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৬৭ জন ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে ২৮৮ জন সদস্যের অধিকাংশই ভারতে গমন করেন তবে এর সঠিক সংখ্যা পাওয়া যায় না। কতিপয় সদস্য মিয়ানমারে (বার্মায়) আশ্রয় গ্রহণ করেন। পাকিস্তান সরকার ৭৭ জন জাতীয় পরিষদের ও ১৪৫ জন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদেরকে সামরিক আদালতে হাজির হওয়ার জন্য ইশতেহার জারী করে। এই থেকে অনুমান করা যায় ১৬৭ জনের মধ্যে ৭৭ জন স্বাধীনতার পক্ষে ও ২৮৮ জনের মধ্যে ১৪৫ জন স্বাধীনতার পক্ষে থেকে ভারতে গমন করেছে বা পলাতক হয়েছে। বাকীরা পাকিস্তানের প্রতি অনুগত তথা দেশভাগের বিরুদ্ধে ছিল। 

মস্কোপন্থী ন্যাপ ও কম্যুনিস্ট পার্টি

দুটি ভিন্ন ভিন্ন নামের দল হলেও আদর্শিকভাবে তারা ছিল মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের ধারক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ন্যাপের অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ আর কম্যুনিস্ট পার্টির কমরেড মনি সিং যুগপৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্রদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ দু’জন নেতা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে বঙ্গবন্ধুকে ছদ্মবেশে আগরতলা প্রেরণ ও বিভিন্ন সময় গোপন বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতেন ন্যাপ ও কমিউনিস্ট নেতারা। 

তৎকালীন ন্যাপ নেতা ক্যাপ্টেন হালিমের নেতৃত্বে ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ ও বিক্রমপুর অঞ্চলে ৬ হাজার গেরিলা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পূর্ব-পাক ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ, পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম-সম্পাদক দেওয়ান মাহবুব আলী জাতিসংঘসহ পূর্ব ইউরোপ এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একটি সর্বোচ্চ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এক হয়ে মুজাফফর ও কমরেড মণি সিংহ, সোভিয়েত পার্টিকে বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে কনভিন্স করেন। মুজাফফর আহমদ কংগ্রেসের সোশ্যালিস্ট ফোরাম ও ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সর্বোচ্চ উপদেষ্টা পরিষদ, সচিব পরে মন্ত্রী ডিপি ধর, পিএন হাকসার প্রমুখ ক্ষমতাধর ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। 

ভাসানী ন্যাপ (পিকিংপন্থী)

মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। পরবর্তী সময়ে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করেন এবং লেনিন ও মাও এর চিন্তাধারার ভিন্নতায় ন্যাপ দ্বিখন্ডিত হয়ে ভাসানী ন্যাপ ও মস্কোপন্থী ন্যাপ নামে দুটি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ভাসানী পিকিংপন্থী হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের প্রতি ছিলেন দুর্বল এবং পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র করার স্বপ্ন তিনি ১৯৬৯ সন থেকেই দেখতেন বিধায় মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ভারতে পাড়ি জমান। ভারত প্রথম দিকে তাকে বন্দী ও পরে গৃহবন্দী করে রাখলেও মুক্তিযুদ্ধের উপদেষ্টা পরিষদে তাকে সভাপতি করে রাখা হয়। এ দলের মশিউর রহমান যাদু মিয়া, কাজী জাফরসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাই ভারতে গিয়ে ফিরে আসেন। 

বিদ্রোহী পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী

বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা দেশভাগের পক্ষে কাজ করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী বাঙালি সেনারা। বাংলাকে ১১ সেক্টরে ভাগ করে তারা যুদ্ধ পরিচালনা করে। সামরিক বাহিনীর সকল শাখা, ইপিআর ও পুলিশের বিদ্রোহীরা মুক্তিফৌজ নামে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। 

ছাত্র এবং ছাত্র সংগঠন

মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ছিল ছাত্রদের দ্বারা গঠিত নিউক্লিয়াস। পরে তারা ভারতের সহায়তায় গঠন করে মুজিব বাহিনী। সিরাজুল আলম খান, শেখ মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ, আসম আব্দুর রব প্রমুখ ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে এদেশের অনেক ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে এটেইন করে। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ ও বামপন্থীদের প্রভাব। সেই প্রভাবেই রাজনীতি সচেতন ছাত্রদের একটি অংশ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। 

কাদেরিয়া বাহিনী 

আবদুল কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ১-২৫ মার্চ তিনি টাংগাইলে আওয়ামী কর্মীদের সাথে নিয়ে গণহত্যা চালান। সেনাবাহিনীর অভিযানে তার বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। পরে তিনি ভারত না গিয়ে এলাকার যুবক, কৃষক ও ডাকাতদের সংগঠিত করতে থাকে টাংগাইলের সখীপুরে। এই বাহিনীই কাদেরিয়া বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পায়। অতর্কিত ও চোরাগোপ্তা হামলা করে তারা সেনাবাহিনীকে নাজেহাল করতে থাকে। সাফল্য আসায় তাদের বাহিনী বড় হতে থাকে। এই বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭০০০। সমগ্র টাঙ্গাইল জেলা এবং ঢাকা, ময়মনসিংহ ও পাবনার কিছু অংশ ছিল এর কর্মক্ষেত্র। এ বাহিনীর কোন যোদ্ধাই বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেনি। তবে এদের মধ্যে অনেকেই পূর্বে ডাকাতির সাথে যুক্ত ছিল বিধায় যৎসামান্য আগ্নায়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার তারা জানতো। ফলে নিজেরাই নিজেদের মধ্যে ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পাক সেনাবাহিনীকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। টাঙ্গাইলে তারা মুক্ত অঞ্চল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। 

হেমায়েত বাহিনী 

হেমায়েত উদ্দিন ছিলেন ২য় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন হাবিলদার। তিনি জয়দেবপুর ক্যাম্পে ছিলেন। তিনি এবং তার অনুসারী সৈনিকরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৫ জনকে হত্যা করে শতাধিক অস্ত্র, প্রচুর গোলাবারুদ, ৩টি গাড়ী এবং কয়েকজন জোয়ান নিয়ে পূর্ব দিকে চলে যান। হেমায়েত প্রথমে বাঘিয়ার বিলে তার ঘাঁটি স্থাপন করেন। ২৯ মে গৌরনদী থানার বাটরা বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে হেমায়েত বাহিনীর উদ্বোধন করেন। ১ জুন বরিশাল অঞ্চলে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। হেমায়েত বাহিনীর কর্মক্ষেত্র ছিল বরিশালের উজিরপুর ও গৌরনদী থানা, ফরিদপুরের কালকিনি, মাদারীপুর, রাজৈর, গোপালগঞ্জ ও কোটালীপাড়া। সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণভাবে গড়ে উঠেছিল এই হেমায়েত বাহিনী। তার দলে মুক্তিযোদ্ধা ছিল ৫,০৫৪ জন। তাদের মধ্যে নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর লোক ছিল ৪০ জন। এদের সাহায্যে তিনি কোটালীপাড়া থানার জহরের কান্দি হাই স্কুলে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিন মাসে প্রায় চার হাজার যুবককে প্রশিক্ষণ দান করা হয়। এদের মধ্যে দেড় হাজার গরীব শ্রেণীর মুক্তিযোদ্ধাকে মাসিক ৯৫ টাকা হিসেবে বেতনও দেওয়া হতো। বিভিন্ন বাজার থেকে তারা চাঁদা কালেকশন করতেন।

সরকারী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা

১৯৭১ সনে প্রায় ২০০ জন সিএসপি ছিলেন যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র ১৩ জন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া ইপিসিএস ৬২ জন অন্যান্য বিভাগের ৫১ জন উচ্চপদস্থ বেসামরিক কর্মকর্তা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

১৩ ডিসে, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৭১ : ১৯৭১ সালে দেশভাগের বিরুদ্ধে যারা ছিলেন


নিজ সেনাবাহিনীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা লাগামহীনভাবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু হরে। অবাঙ্গালি ও সেনাসদস্য কাউকে পেলেই হত্যা করেছে। এমনকি ভুলবশত বহু বাঙালি সেনাসদস্য যারা নিজ বাহিনীর সাথে বিদ্রোহ করেছে তারাও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছে। পুলিশ প্রায় নিষ্ক্রিয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সেনাবাহিনী শুধুমাত্র ঢাকা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছিল। বিভাগীয় শহরগুলোতে ক্যান্টনমেন্ট ও তার সংশ্লিষ্ট এলাকা ছাড়া বাকী সবস্থানে অরাজক পরিস্থিতি কায়েম হয়েছিল। 

১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী তাদের এরিয়া বাড়াতে থাকে। দেশকে মোটামুটি স্থিতিশীল অবস্থায় আনতে সেনাবাহিনীর প্রায় দুইমাস সময় লেগেছিল। এই সময় সেনাবাহিনী বিদ্রোহ দমনে কৌশলী ভূমিকার চাইতে বর্বর চরিত্র প্রকাশ করেছে বেশি। যেসব এলাকা থেকে বা গ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ও অবাঙালিদের ওপর আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে সেখানে সেনাবাহিনীও পাল্টা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। এপ্রিল-মে মাসে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রায় সবাই ভারতে পালিয়ে গেছে। সেখানে তারা ভারতীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে অস্ত্র ও স্বল্প প্রশিক্ষন লাভ করেছে। সেনাবাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে বহু বাঙালি ভয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। 

ঘটনা প্রবাহে একটি যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যা নিউক্লিয়াস, ভারত ও কম্যুনিস্টরা চেয়েছিলো। যুদ্ধের সময় যারা স্বাধীনতা তথা দেশভাগের বিরোধী ছিলেন তারা ছিল বাঙালিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের একটা অংশ, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী, জামায়াতে ইসলামী, ওলামায়ে ইসলাম, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, জাতীয় দল, কৃষক-শ্রমিক পার্টি, পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (চীনপন্থী), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি ইত্যাদি দল স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এ ছাড়াও ইসলামপন্থী মানুষ, মুসলিম জাতীয়তাবোধ সম্পন্ন মানুষ এবং চীনপন্থী সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী মানুষেরা স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেন। রাজা ত্রিদিব রায়ের সকল চাকমা প্রজাসহ অন্যান্য প্রায় সকল উপজাতি পাকিস্তান রক্ষার ভূমিকা রাখেন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সকল মানুষ পাকিস্তানের ভাঙ্গন ঠেকাতে তৎপর ছিলেন।

স্বাধীনতার বিপক্ষে তাদের অবস্থানের কারণ : 
১- স্বৈরাচার বিরোধী ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে দেশভাঙ্গার আন্দোলনে পরিণত হতে দিতে চাননি। 
২- যেখানে শেখ মুজিব পুরো পাকিস্তানের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রাখে সেখানে দেশ ভেঙ্গে নিজেদের ক্ষমতাকে ছোট করা অযৌক্তিক। 
৩- গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেই সকল সমস্যা ও সংকটের অবসান হয় সেখানে চিরশত্রু ভারতের প্ররোচনায় যুদ্ধ লাগিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাননি। 
৪- পাকিস্তান বৃহত্তম ও শক্তিশালী মুসলিম দেশ। বিশ্ব মুসলিমের নেতৃত্ব এই দেশ দিচ্ছে। তারা দেশকে ছোট করতে চাননি। 
৫- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও সামরিক দিক দিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের চাইতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। 
৬- পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে ভারতের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে এদেশের মুসলিমদের অবস্থা বিপন্ন হবে। 
৭- ভারতের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র তৈরী হলে সেই রাষ্ট্র হবে ভারতের আজ্ঞাবহ একটি রাষ্ট্র, যার জাতীয় পতাকা থাকবে, সরকার থাকবে কিন্তু কোন সার্বভৌমত্ব থাকবে না। 

যারা স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন তাদেরকে আমরা ছয়টি ভাগে ভাগ করতে পারি
১. রাজনৈতিক শক্তি : পাকিস্তান সরকার, মালেক মন্ত্রীসভা, শান্তি কমিটি, সামরিক সরকারের মুখপাত্র, রাজনৈতিক দলসমূহ। 
২. সামরিক শক্তি : পাকিস্তান সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনীসমূহ, বাংলাভাষী পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও রেজাকার বাহিনী। 
৩. ধর্মীয় শক্তি : ইসলামপন্থী ও মুসলিম জাতীয়তাবোধসম্পন্ন সকল দল ও গোষ্ঠী, ইসলামী ব্যক্তিত্ব, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। 
৪. বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি : বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং অন্যান্য পেশাজীবী। 
৫. প্রশাসনিক শক্তি : সরকারি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা 
৬. অন্যান্য সহায়ক শক্তি : বিহারী, আলবদর, আশশামস ও মুজাহিদ বাহিনী। 

পাকিস্তান সরকার 
তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে তাদের ভাষায় সকল ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ দমন করতে চেয়েছেন। তারা অভিন্ন পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সামরিক দিক দিয়েও পূর্ব-পাকিস্তানের খুব প্রয়োজন ছিল সামরিক বাহিনীর। 
ক- Geo- Military strategic point এ পূর্ব পাকিস্তান একটি গুরুত্বপুর্ণ স্থান 
খ- পূর্ব-পাকিস্তানের জনসংখ্যার হিসেবকে কাজে লাগিয়ে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা সহজ। 
গ- চিরশত্রু ভারতকে সামরিক দিক থেকে কাবু রাখার জন্য দ্বিমুখী আক্রমনের কৌশলের জন্য পূর্ব-পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ। 

মালেক মন্ত্রীসভা
দেশে স্থিতবস্থা কায়েম হলে সামরিক সরকার ধীরে ধীরে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা বেসামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে থাকে। তারই অংশ হিসেবে আগস্টে গভর্নর টিক্কা খানকে প্রত্যাহার করে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মালেককে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশেষ গভর্ণর ছিলেন ডাঃ আব্দুল মোত্তালেব মালেক। যদিও তিনি মুসলিম লীগ করতেন তবে তিনি বাম ভাবাপন্ন ছিলেন। তার নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করা হয়। তিনি এবং তার ১৪ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রীসভাই মালেক মন্ত্রীসভা হিসেবে পরিচিত। এই মন্ত্রীসভায় ইসলামী ও মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল ছাড়াও আওয়ামীলীগের তিনজন সংসদ সদস্য ছিলেন। নিচে তাদের নাম ও দলের নাম উল্লেখ করা হলো। 
১- ডাঃ আব্দুল মোত্তালেব মালেক/ মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) 
২- আবুল কাশেম/ মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) 
৩- নওয়াজেশ আহমেদ/ মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) 
৪- আখতার উদ্দিন আহমেদ/ মুসলিম লীগ (কনভেনশন) 
৫- মুজিবুর রহমান/ মুসলিম লীগ (কাইয়ুম)
৬- ওবায়দুল্লাহ মজুমদার/ আওয়ামী লীগ (জাতীয় পরিষদ সদস্য)
৭- শামসুল হক/ আওয়ামীলীগ (প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য)
৮- আউং শু প্রু চৌধুরী/ আওয়ামীলীগ (প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য) 
৯- এ এস এম সোলায়মান/ কৃষক শ্রমিক পার্টি 
১০- মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক/ নেজামে ইসলামী 
১১- জসিম উদ্দিন আহমদ/ পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি 
১২- এ কে মোশারফ হোসেন/ পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি
১৩- এ কে এম ইউসুফ/ জামায়াতে ইসলামী 
১৪- আব্বাস আলী খান/ জামায়াতে ইসলামী 

শান্তি কমিটি
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন থেকে যুদ্ধাবস্থা তৈরী হলে এদেশের রাজনৈতিক নেতারা যুদ্ধ থামানো এবং পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা করার জন্য শান্তি কমিটি গঠন করেন। এতে মুসলিম লীগের তিনটি অংশ, আওয়ামীলীগের একাংশ, নেজামে ইসলামী, জামায়াতে ইসলামী এবং উপজাতিরা এই কমিটিতে অংশগ্রহন করেন। এই কমিটি গঠনে মূল উদ্যোক্তা ছিলেন পিডিপির নুরুল আমীন। প্রথমে ২৭ সদস্য বিশিষ্ট এবং পরে ১৪০ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি গঠিত হয়। ৪ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে নূরুল আমিনের নেতৃত্বে মৌলভী ফরিদ আহমদ, সৈয়দ খাজা খয়েরুদ্দিন, এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা নুরুজ্জামান সহ ১২ জন রাজনৈতিক নেতা গভর্নর টিক্কা খানের সাথে দেখা করেন। সেখানে তারা সেনাবাহিনীকে সহযোগীতা করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং সেনাবাহিনীকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ ধরার অজুহাতে সাধারণ মানুষদের উপর জুলুম অত্যাচার বন্ধের প্রতিশ্রুতি আদায় করেন। উপরোক্ত নেতারা ছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটিতে মুসলিম লীগের নুরুল হক, আবুল কাশেম, ব্যারিস্টার আখতার উদ্দিন, আওয়ামী লীগের আব্দুল জব্বার খদ্দর, এ কে এম রফিকুল হোসেন, পিডিপির মাহমুদ আলী, ব্যারিস্টার আফতাব উদ্দিন, জমিয়তে উলামার পীর মোহসেন উদ্দিন দুদু মিয়া প্রমুখ নেতা ছিলেন। পরবর্তিতে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত শান্তি কমিট বিস্তৃতি লাভ করে। 

সরকারের মুখপাত্র
তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের মুখপাত্র হিসেবে কিছু বাঙ্গালী নেতা অংশগ্রহন করেন। তারা বহির্বিশ্বে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাকে আভ্যন্তরীণ ইস্যু এবং এই ইস্যুতে প্রতিবেশী ভারতের ষড়যন্ত্রের বিষয়গুলো প্রাচারণার দায়িত্বে ছিলেন। পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় বহির্বিশ্বের সহযোগিতা কামনা করেন। এদের তালিকা নিন্মে দেয়া হল

১- হামিদুল হক চৌধুরী/ মালিক, পাকিস্তান অবজার্ভার
২- মাহমুদ আলী/ পিডিপির ভাইস চেয়ারম্যান 
৩- শাহ আজিজুর রহমান/ মুসলিম লীগ নেতা/ পরবর্তিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী (১৯৮৩) 
৪- জুলমত আলী খান/ মুসলিম লীগ নেতা/ পরবর্তিতে এরশাদ আমলের মন্ত্রী
৫- মিসেস রাজিয়া ফয়েজ/ মুসলিম লীগ নেতা/ পরবর্তিতে এরশাদ আমলের মন্ত্রী 
৬- ড. ফাতিমা সাদিক/ অধ্যাপক, ঢাকা ভার্সিটি 
৭- এডভোকেট এ কে সাদী/ আইনজীবী, ঢাকা হাইকোর্ট 
৮- মৌলভী ফরিদ আহমদ/ পিডিপি নেতা/ সৌদী ও মিশরের দায়িত্বে ছিলেন 
৯- তবারক হোসেন/ চীনের দায়িত্বে ছিলেন/ সর্বশেষে বাংলাদেশ আমলে পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন
১০- বিচারপতি নুরুল ইসলাম/ বিশেষ দূত, জেনেভা/ পরবর্তিতে এরশাদ আমলে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
১১- ড. সাজ্জাদ হোসাইন/ বিশেষ দূত, মধ্যপাচ্য এবং ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ/ ভিসি, ঢাবি। 

রাজনৈতিক দল
পাকিস্তান গঠনের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। উপরন্তু এই মুসলিম লীগ তিন ভাগে ভাগ হয়ে তাদের শক্তি আরো হারিয়ে ফেলে। কাউন্সিল, কনভেনশন এবং কাইয়ুম এই তিন ভাগে তারা ভাগ হয়। মুসলিম লীগের তিন পক্ষই স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা করে। এছাড়া ন্যাপ (মুজাফফর), ন্যাপ (ভাসানী), মনি সিং এর কমিউনিস্ট পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, জাতীয় দল, কৃষক শ্রমিক পার্টি, পূর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি, কৃষক শ্রমিক সমাজবাদী দল এবং আওয়ামী লীগের একাংশ অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করে। 

আওয়ামী লীগের একাংশ 
২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট এবং ২৬ মার্চ মেজর জিয়ার ক্যু এর পর আওয়ামী লীগের একটা অংশ খুব দ্রুত ভারতে সশস্ত্র অবস্থায় পাড়ি জমায়। কারণ তাজউদ্দিন আহমদের সাথে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত সরকারের সঙ্গে আগেই সমঝোতা হয়েছিল এবং তাজউদ্দিন আহমদ দেশবিক্রীর চুক্তি করেছে। আর এর ফলেই বেসামরিক লোকের সাথে মিশে গিয়ে সশস্ত্র আওয়ামী কর্মীরা ভারত পাড়ি দেয়। এই ধরণের ষড়যন্ত্রের সাথে একমত না হয়ে অনেক আওয়ামী লীগ থেকে মনোনীত হয়ে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যসহ বহু নেতা কর্মী স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করা থেকে শুধু বিরত থাকেননি বরং পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রীত্ব গ্রহন, শান্তি কমিটিতে নেতৃত্ব প্রদান, রেজাকার বাহিনীতে সহায়তাসহ সব ধরণের স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মেয়ে আক্তার সোলায়মান অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালান এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেন। এই ব্যাপারে তিনি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘অধিকাংশ আওয়ামীলীগের সদস্যরা আওয়ামিলীগের একটা অংশের বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিকল্পনার কথা জানতেন না। আমরা জানি জনগণ নির্বাচনের সময় অধিকতর শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ পাকিস্তান গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল’। এছাড়াও আওয়ামীলীগ নেতা ড. কামাল হোসেনও যুদ্ধে যোগ না দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান এবং সেখানে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। আওয়ামীলীগ নেতাদের মধ্যে জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের যারা স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন এমন বহু নেতার তালিকা পাওয়া যায় আখতার মুকুল এবং সামছুল আরেফীন সাহেবের লেখা বইয়ে। নির্বাচিত সদস্যের বাহিরে খন্দকার নূর হোসেন, তার ছেলে খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মুসা বিন শমসের এবং মীর্জা কাশেম মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। 

চীনপন্থী সমাজতান্ত্রিক দল
সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের কারণেই চীন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। চীনের এই নীতির প্রভাব পড়ে এদেশের চীনপন্থী দলগুলোর উপর। আর ভারতের জন্যও সমস্যা ছিল চীনপন্থী বামেরা। তারা পূর্ব বাংলায় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সব মিলিয়ে এদেশের চীনপন্থীরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করেনি। বরং পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। 

মুক্তিযোদ্ধাদের মোটিভেশন ক্লাসে এরকম বলা হত যে, “একজন রাজাকারকে যদি তোমরা ধর, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, তাকে নানাভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবে। বার বার এইরকম করবে। তাকে নানাভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবে। এতেও যদি কাজ না হয়, প্রয়োজনে শারিরীক নির্যাতন করবে এবং এভাবে যত পারো তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করবে। এরপর এদের কারাগারে নিক্ষেপ করবে। আর যদি একজন চীনা কমিউনিস্টকে ধর সাথে সাথে তার প্রাণ সংহার করবে”।

রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি ৩১.০৮.১৯৭১ তারিখে তাদের যে রাজনৈতিক নীতিমালা প্রকাশ করে তাতেও চীনা নেতাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী ও শত্রুদের সাহায্যকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের থেকে সাবধান থাকতে বলা হয়েছে। “মনে রাখতে হবে চীনের নেতারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করিতেছে ও আমাদের শত্রুদের সাহায্য করিতেছে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী চীনপন্থীদের সম্পর্কে হুশিয়ার থাকতে হবে।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও চীনপন্থীদের উপর মুজিববাদীদের হুমকির কথা বর্ণনা দিয়ে শেখ হাসিনার স্বামী ওয়াজেদ মিয়া বলেন, “ঐদিন(১৫ জানুয়ারী ১৯৭২) ড. ইসহাক তালুকদার আমাকে আরো জানান যে, কাজী জাফর ও রাশেদ খান মেননদের দলসহ পিকিংপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের নিধন করা হবে বলে মুজিব বাহিনী হুমকি দিয়েছে। যার ফলে সম্ভাব্য হানাহানি ও রক্তপাত এড়ানোর জন্য ঐ দলগুলোর নেতা ও কর্মীরা লুকিয়ে আছেন”

এম আর আখতার মুকুল বলেন, “পিকিংপন্থী পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় আগ্রাসন বলে আখ্যায়িত করলো যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলে এদের নেতৃত্ব দেন কমরেড আবদুল হক, কমরেড সত্যেন মিত্র, কমরেড বিমল বিশ্বাস, কমরেড জীবন মুখার্জী প্রমুখ। এসব অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের সময় পিকিংপন্থী হক গ্রুপের সাথে মুক্তি বাহিনীর বেশ কয়েক দফা সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়।”

ইসলামী দলসমূহ
ইসলামী দলসমূহের মধ্যে সাংগঠনিক শক্তি জামায়াতের থাকলেও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে নেজামী ইসলামী ভালো অবস্থানে ছিল। সব ইসলামী দলগুলো তাদের নিজেদের মধ্যকার বিভেদকে অতিক্রম করে ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষায় এবং ভারতের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জাতিকে সচেতন করার জন্য একত্রে কাজ করেন এবং বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে ও বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং ভারতীয় ক্রীয়ানকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। 

মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল 
কাউন্সিল মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মুসলিম লীগের অন্য দুটি অংশ, পিডিপিসহ সকল মুসলিম জাতীয়তাবাদী দল তাদের বিভেদ সত্ত্বেও পাকিস্তান রক্ষায় একাট্টা হয়ে যায়। স্বাধীনতা বিরোধী প্রায় সকল প্লাটফর্মের নেতৃত্বে তারা ছিলেন। 

সামরিক শক্তি 
পাকিস্তান সেনাবাহিনী, আধাসামরিক বাহিনীসমূহ, বাংলাভাষী পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, পুলিশ বাহিনী ও রেজাকার বাহিনী।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী 
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে যারা বাঙ্গালী ছিলেন না তারা পুরোদস্তুর পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। আর যেসব সেনা অফিসার বাঙ্গালী ছিলেন তাদের মধ্যেও অধিকাংশ অফিসার তাদের শপথের ব্যাপারে ও দেশের প্রতি কমিটমেন্টের ব্যাপারে বিশ্বাসী ছিলেন। বিপুল সংখ্যক বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে পাকিস্তান রক্ষার জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে গুরুত্বপুর্ণ অবদান রেখেছেন এমন ১০৪ জন সেনা অফিসারের তালিকা পাওয়া যায় সামছুল আরেফীনের লিখা 'মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান' বইয়ে। এর মধ্যে মেজর ফরিদ উদ্দিন, ক্যপ্টেন ফখরুল আহসান, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ইমদাদ হোসেন, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাছির উদ্দিন, স্কোয়ার্ড্রন লিডার হাসানুজ্জামান মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর আক্রমনে মৃত্যুবরণ করেন। মজার বিষয় হলো যুদ্ধ শেষে শেখ মুজিব সেনাবাহিনীর এই অফিসারদের প্রায় সকলকেই বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। শুধু তাই নয় যেসব বাঙ্গালী সেনা অফিসার পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন তাদেরও তিনি সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। জিয়াউর রহমানও একই নীতি বজায় রেখে এসব অফিসারদের প্রমোশন দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের আক্রোশের কবলে পড়েন। 

পুলিশ বাহিনী 
পুলিশ বাহিনী যুদ্ধাবস্থায় সামরিক বাহিনীর কমান্ডের অধীনে পরিচালিত হয়। তৎকালীন পুলিশের অল্প কয়েকজন হাতে গোণা অফিসার ছাড়া বাকী সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং এরজন্য তাদেরকে মূল্যও দিতে হয়। মুক্তিবাহিনীর বেশিরভাগ আক্রমণের শিকার হয়েছে পুলিশ বাহিনী এবং প্রচুর হতাহত হয়েছে তাদেরকে। সেসময় যারা পুলিশের অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং স্বাধীনতা বিরোধী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাদের তালিকাও সামছুল আরেফীন সাহেবের বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এখানেও মজার কাজ করেছেন শেখ মুজিব। মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থানকারী কোন শীর্ষ পুলিশ অফিসারকে দায়িত্ব থেকে অপসারন তো করেননি বরং তাদের অনেককে সচিব বানিয়ে পুরষ্কিত করেন। আইজি টি আহমেদ, অতিরিক্ত আইজি আহমেদ ইব্রাহীম, ডিআইজি আবদুর রহীম এরা সবাই শেখ মুজিবের আমলে পর্যায়ক্রমে স্বরাষ্ট্র সচিব হন। এখানে আরো ইন্টারেস্টিং বিষয় রেজাকার বাহিনী গঠন করার পর পুলিশ থেকে ডি আইজি আব্দুর রহীমকে নিয়ে রেজাকার বাহিনীর প্রধান করা হয়। রেজাকার বাহিনীর প্রধানও শেখ মুজিব কর্তৃক পুরষ্কিত হন। 

রেজাকার বাহিনী 
“রেজাকার” শব্দটির অর্থ হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবক। ১৯৭১ সনে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার “আনসার আইন ১৯৪৮” বাতিল করে “রেজাকার অধ্যাদেশ ১৯৭১” অনুযায়ী এ বাহিনী গঠন করে। জেনারেল নিয়াজী এক সাক্ষাৎকারে মুনতাসীর মামুনকে বলেছিলেন যে, রেজাকার বাহিনীর তিনিই স্রষ্টা। বিলুপ্ত আনসার বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যরা সয়ংক্রিয়ভাবে নবগঠিত রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ও রাজাকার সদস্য হিসেবে গণ্য হন। 
এর বাইরে রাজনৈতিক কর্মী, স্থানীয় বখাটে, বেকার যুবকদের মধ্য থেকে প্রায় ৩৭০০০ জনকে এ বাহিনীতে কমান্ডার হিসেবে রিক্রুট করা হয়। প্রতিটি কমান্ডারের অধীনে কমপক্ষে দশজন রেজাকার সদস্য ছিলেন। এ বিপুল সংখ্যায় রাজাকার রিক্রুট হওয়ার পিছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করেছিল। বাংলাদেশের সবগুলো ইসলামপন্থী ও মুসলিম জাতীয়তাবাদী দলের কোনটিই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। ফলে তাদের সমর্থকদের মধ্য থেকে একটা অংশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রেজাকার বাহিনীতে শামিল হয়। তবে এ বাহিনীতে আদর্শবাদী লোকদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। প্রকৃতপক্ষে নিয়মিত ভাতা, রেশন, স্থানীয় ক্ষমতার ব্যবহার এবং সর্বোপরি হিন্দু সম্প্রদায় ও স্বাধীনতার পক্ষের সদস্যদের ঘরবাড়ী ও বিষয়-সম্পত্তি অবাধে লুটপাট ও ভোগ দখল করার লোভে সমাজের সুযোগ-সন্ধানী এক শ্রেণীর লোক ব্যাপকহারে রেজাকার বাহিনীতে যোগদান করেন। 

কামরুদিন আহমদ তার “স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয়” বইতে এ বিষয়ের একটা প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, বাঙ্গালীদের রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি হবার কতকগুলো কারণ ছিল তা হলো, 
১. দেশে তখন দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছিল । সরকার সে দুর্ভিক্ষের সময় ঘোষণা করল, যারা রেজাকার বাহিনীতে যোগ দেবে, তাদের দৈনিক নগদ তিন টাকা ও তিন সের চাউল দেয়া হবে। এর ফলে বেশ কিছু সংখ্যক লোক, যারা এতদিন পশ্চিমা সেনার ভয়ে ভীত হয়ে সন্ত্রস্ত দিন কাটাচ্ছিল, তাদের এক অংশ এ বাহিনীতে যোগদান করল। 
২. এতদিন পাক সেনার ভয়ে গ্রামে-গ্রামাঞ্চলে যারা পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, আত্মরক্ষার একটি মোক্ষম উপায় হিসেবে তারা রেজাকারদের দলে যোগ দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। 
৩. এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী জোর করে মানুষের সম্পত্তি দখল করা এবং পৈতৃক আমলের শক্রতার প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ গ্রহণের জন্যেও এ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

রেজাকার বাহিনীতে ভর্তি হবার পর তাদের বুঝানো হলো যে, যুদ্ধে পাক সেনারা হারলে, পাক সেনাদের সঙ্গে সহযোগিতা করার অপরাধে মুক্তি বাহিনী তাদের সকলকে হত্যা করবে। সুতরাং জীবন রক্ষা করার জন্য মুক্তি বাহিনীর গুপ্ত আশ্রয়স্থলের সংবাদ তারা পাক সেনাদের জানিয়ে দিতে শুরু করে। 

খন্দকার আবুল খায়ের বলেন আমি যে জেলার লোক সেই জেলার ৩৭ টি ইউনিয়নের থেকে জামায়াত আর মুসলিম লীগ মিলে ৭০ এর নিবাচনে ভোট পেয়েছিল দেড়শতের কাছাকাছি আর সেখানে রেজাকারের সংখ্যা ১১ হাজার যার মাত্র ৩৫ জন জামায়াতে ইসলামের ও মুসলিম লীগারদের। বাকীদের মধ্যে অধিকাংশ ছিল আওয়ামীলীগের ও সাধারণ মানুষ। 

তিনি আরো বলেন, আমার কিছু গ্রামের খবর জানা আছে, যেখানে ৭১ এর ত্রিমুখী বিপর্যয়ের হাত থেকে বাচার জন্য গ্রামে মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, দুই দিকেই ছেলেদের ভাগ করে দিয়ে বাঁচার ব্যবস্থা করতে হবে । এই সিদ্ধান্ত মুতাবিক যে গ্রামের শতকরা ১০০ জন লোকই ছিল নৌকার ভোটার, তাদেরই বেশ কিছু সংখ্যক ছেলেদের দেয় রাজাকারে। যেমন কলাইভাঙা গ্রামের একই মায়ের দুই ছেলের সাদেক আহমদ যায় রাজাকারে আর তার ছোট ভাই ইজহার যায় মুক্তিফৌজে। 

রাজাকার বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী আবু সাইয়িদের মূল্যায়ন প্রায় একই; তিনি বলেন, বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে প্রাপ্ত প্রমাণাদি হতে একথা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয় যে, রাজাকার রাজাকারই; তবে সব রাজাকার এক মাপের ছিলো না । প্রাথমিকভাবে রাজাকার বাহিনীতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের যুবক অন্তৰ্ভূক্ত হলেও তাদেরকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়

১. যারা নিজেদের ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষা করার লক্ষ্যে পাক সামরিক বাহিনীকে সহায়তা, বাঙালী হত্যা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধ করাকে কর্তব্য মনে করেছিলো। যারা পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদ বা মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলো। 
২. যারা হিন্দু সম্পত্তি দখল লুটপাট, ব্যক্তিগত গ্রামীণ রেষারেষিতে প্রাধান্য বিস্তার ও প্রতিশোধ গ্রহণ এবং নানান অপকর্ম করার সুযোগ গ্রহণ করেছিলো। 
৩. যাদের দেশ ছেড়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল তাদের বেশিরভাগ পেটের তাড়নায় কর্মসংস্থানের জন্য এবং একই সাথে ভয়ভীতি এবং প্রলুব্ধ হয়ে রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখাতে বাধ্য হয়।

রাজাকার বাহিনী সুশৃঙ্খল বাহিনী ছিলো না। বরং এদেরকে পাক বাহিনী দাবার ঘুটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। অধিকাংশই হয়েছে বলির পাঠা। তাদেরকে সামনে রেখেই পাকবাহিনী সর্বত্র অগ্রসর হয়েছে। রাজাকার বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ছিলেন পুলিশের ডিআইজি আবদুর রহিম যাকে শেখ মুজিব স্বাধীনতা যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণের জন্য ১২ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির প্রধান ও পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র সচিব করেছিলেন। রাজাকার বাহিনীর মূল পরিচালক, জেলা ও মহকুমা কমান্ডারদের তালিকা পাওয়া যায় সামছুল আরেফীনের 'মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান' বইয়ে। 

ধর্মীয় ব্যাক্তিত্ব 
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিপক্ষে শুধু ইসলামপন্থী ও মুসলিম জাতীয়তাবাদী দলসমূহ ছিল তা নয়, প্রায় সকল ধরণের ইসলামী ব্যাক্তিত্ব স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন। যারা কোন রাজনীতি করেননি এমনকি ইসলামে রাজনীতি হারাম বলে মনে করতেন সে ধরণের আলেম, পীর মাশায়েখ পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে ছিলেন। চরমোনাই এর পীর, শর্ষীনার পীর থেকে শুরু করে ফুলতলীর পীর মাওলানা আবদুল লতিফ ফুলতলী, মাওলানা সৈয়দ মোস্তফা আলী মাদানী, মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর, মাওলানা মুফতি দ্বীন মোহাম্মদ খান, মাওলানা আনিসুর রহমান, মাওলানা আশ্রাফ আলী, মাওলানা আমিনুল হক, মাওলানা মাসুম, মাওলানা নূর আহমদ, মাওলানা আব্দুল মান্নান (জমিয়াতুল মোদারেছীন), মাওলানা সিদ্দীক আহমদ, মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুস, মাওলানা আজিজুল হক সহ শত শত আলিম পাকিস্তান ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ করার বিপক্ষে ছিলেন। 

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী
ইসলামপন্থীদের মতই এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের অনুরাগীরা পাকিস্তানের অখন্ডতায় বিশ্বাসী ছিলেন। এই ধর্মের ধর্মীয় গুরু ও বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের নেতা বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো বলেন, পাঁচ লাখ বৌদ্ধের প্রিয় মাতৃভূমি পাকিস্তান চিরদিন পাকিস্তান বৌদ্ধদের পবিত্র স্থান হয়েই থাকবে। বৌদ্ধরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দেশকে দুস্কৃতিকারীদের হাত থেকে রক্ষা করবে। বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো, প্রফেসর ননী গোপাল বড়ুয়া এবং অন্যান্য নেতারা যখন কোন সফরে যেতেন তাদের নিরাপত্তার জন্য সবসময় পুলিশ ও কমান্ডো বাহিনী থাকতো। সে সময় চট্টগ্রাম জেলার অনেক বৌদ্ধ গ্রামে ‘চীনা বৌদ্ধ’ বলে বড় বড় ব্যানার রাখা রাখা হতো। ডিসেম্বরে পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ শুরু হলে বিশুদ্ধানন্দ মহাথেরো অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে থাকা আওয়ামী বুদ্ধিজীবী পিজি হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক প্রফেসর নূরুল ইসলামের কৃপায় হাসপাতালে ভর্তি হন। পরিস্থিতি একেবারে শান্ত না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালেই ছিলেন। 

বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য পেশাজীবী 
যুদ্ধের সময় প্রায় সকল বুদ্ধিজীবী সুবিধাভোগীর ভূমিকায় অবস্থান নেন। বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে নিয়িমিত ক্লাস হয়। প্রায় সকল শিক্ষক পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে ক্লাস চালু রাখেন। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বেশ কিছু শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের আবাসিক ভবন থেকে অপহৃত হওয়াই প্রমাণ করে তারা মূলত পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছেন। আবার বাংলাদেশ হওয়ার সাথে সাথেই দল বদল করে বিপরীত শিবিরে তাদের জোরালো অবস্থান মোটামুটি বেশ চমকপ্রদ এবং বিরল। ১৪ ডিসেম্বর খুন হওয়া মুনীর চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৭ মে পাকিস্তানের পক্ষে ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে বিবৃতি দেন ৫৫ জন প্রথিতযশা শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। 

শিবনারায়ন দাস যিনি নিউক্লিয়াস সদস্য ছিলেন, তিনি বলেছেন, “কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা কম ছিল না, কিন্তু তারা ব্যস্ত ছিলেন পাকিস্তানের সংহতি এবং তমুদ্দুনকে বাঁচিয়ে রেখে আদমজী, ইস্পাহানীর পুরষ্কার নেবার প্রতিযোগীতায়”। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডঃ এম এন হুদা, ডঃ এ বি এম হাবিবুল্লাহ, ডঃ এম ইন্নাস আলী, ডঃ এ কে এম নাজমুল করিম, ডঃ মফিজুল্লাহ কবীর, অধ্যাপক আতিকুজ্জামান খান, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ডঃ কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হক, ডঃ নীলিমা ইব্রাহীম, ডঃ এস এম আজিজুল হক, ডঃ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ডঃ এ কে রফিকুল্লাহ সহ সকল শিক্ষক কাজে যোগদান করেছেন।

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীসহ রাবির প্রায় সকল শিক্ষক কাজে যোগদান করেছেন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, “আমরা আমাদের প্রিয়ভূমি পাকিস্তানকে খন্ড করার অভিসন্ধির তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি। রাজনৈতিক চরমপন্থীদের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষনায় আমরা দুঃখ পেয়েছি ও হতাশ হয়েছি।”

বিচারপতি কে এম সোবহান, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ও কবি শামসুর রাহমান যারা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন বজায় রেখে যুদ্ধের পর বড় বড় মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন তাদের সম্পর্কে ড. মাহবুবুল্লাহ বলেন, “কে এই কে এম সোবহান? যিনি ৭১ সালে সেনা শাসকের অধীনে পূর্ব-পাকিস্তানের বিচারক হিসেবে শপথ নিয়েছেন, সেই কে এম সোবহানের মুখে স্বাধীনিতার স্বপক্ষ উচ্চারণ শোভা পায় না। কে এই কবীর চৌধুরী? তার কাজ হচ্ছে প্রত্যেকটি সরকারের সেবা করা। আইয়ুব খাঁ থেকে শুরু করে ইয়াহিয়া খাঁ, মোনেম খাঁ পর্যন্ত প্রত্যেককে তিনি সেবাদান করেছেন। তিনি আজ যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে কথা বলেন তখন প্রশ্ন করতে হয় কেন তখন তিনি বাংলা একাডেমীর দায়িত্ব পালন করেছেন? আজকে যখন শামসুর রাহমান তালেবানী হামলার শিকার হন বলে দাবী করেন, মিথ্যাচার করেন, তখন প্রশ্ন করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের সময় শামসুর রাহমানকে যখন আমি বলেছিলাম সীমান্তের ওপারে যেতে এবং আমি তাকে সাহায্য করব, কেন তিনি ঢাকার মাটিকে আঁকড়ে ধরে ‘দৈনিক পাকিস্তানে’ মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় রচনা করেছেন?”। 

মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের ওয়েবসাইট অনুসারে “হাইকোর্টের ৩৮ জন আইনজীবী এক যুক্ত বিবৃতিতে পাকিস্তানের ঘরোয়া বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপকে নগ্ন ও নির্লজ্জ অভিহিত করে এর প্রতিবাদ জানায় এবং সম্ভাব্য সকল উপায়ে দুষ্কৃতিকারীদের বাধাদানের জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান”।

সংবাদপত্র
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলায় প্রকাশিত সকল পত্রিকা পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে ছিল দৈনিক আযাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক পূর্বদেশ উল্লেখযোগ্য। দৈনিক আযাদ এবং দৈনিক পূর্বদেশ ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদী, দৈনিক সংগ্রাম ছিল জামায়াতের মুখপত্র, দৈনিক পাকিস্তান ছিল সরকারি আর দৈনিক ইত্তেফাক ছিল আওয়ামীলীগের মুখপত্র। সবচেয়ে বেশী অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে এবং ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ বিরুদ্ধে জাতীয় শত্রু হিসেবে গণ্য করে প্রচারণা চালায় দৈনিক পূর্বদেশ। ইত্তেফাক পত্রিকার ভূমিকা, স্বাধীনতার বিরোধীতা, তাজউদ্দিনের বিমাতাসুলভ আচরণ, শেখ মুজিবের ক্ষমা ইত্যাদি নিয়ে লিখেছেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী।

যাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধীতার বড় অভিযোগ তারা হলেন পূর্বদেশ ও Pakistan observer এর মালিক হামিদুল হক চৌধুরী, Pakistan observer এর সম্পাদক মাহবুবুল হক, পূর্বদেশ সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী, দৈনিক পাকিস্তান সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন, দৈনিক আযাদ সম্পাদক সৈয়দ শাহদাত হোসেন এবং দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আখতার ফারুক। 

সরকারী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা 
১৯৭১ সালে প্রায় দু’শ জন সি এস পি ছিলেন যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ড. আকবর আলী খানের মতে তাদের মধ্যে মাত্র তের জন স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। এছাড়া ই পি সি এস ৬২ জন এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে মাত্র ৫১ জন স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। যারা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন এবং স্বাধীনতার বিপক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে তিন শতাধিক কর্মকর্তার তালিকা পাওয়া যায় এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র বইতে। মজার বিষয় হলো এদের মধ্যে কেউ পরবর্তী জীবনে এই কারণে কোন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় নি। এই তালিকার প্রায় সবাইকে শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের সচিব বানিয়েছে। এর মধ্যে নুরুল ইসলাম অনু যিনি টিক্কা খানের পি এস ছিলেন শেখ মুজিব তাকে নিজের পি এস বানিয়ে নেন। পরবর্তিতে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যাংক এশিয়ার ভাইস চেয়ারম্যান হন। 

পার্বত্য উপজাতি 
সকল উপজাতি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সরাসরি বিরোধীতা করে। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্যই শুধু দেখাননি, তিনি পাক সামরিক বাহিনীকে পার্বত্য অঞ্চলে নিয়ে যান। তিনি বাংলাদেশ হওয়ার পর পাকিস্তানে চলে যান এবং পাকিস্তানের মন্ত্রীসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামীলীগের উপজাতি এমপি আউং শু প্রু চৌধুরী পাকিস্তানের অখন্ডতায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনি মালেক মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন। পার্বত্য জেলা সমূহের সকল উপজাতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এতটাই বিরোধী ছিল যে, পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী ও সহায়তাকারী বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলেও তারা এই ঘটনায় তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি। তারা যে সকল শর্তে আত্মসমর্পন করে তা হলো,

১- স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতার জন্য উপজাতিদের কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবেনা 
২- বাঙ্গালীরা যাতে তাদের আক্রমন করতে না পারে সেজন্য ভারতীয় বাহিনীকে তাদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। 
৩- তাদের রাজ পরিবার সমূহের উপর কোন আক্রমন করা যাবেনা বা তাদের মর্যাদা বিনষ্ট করা যাবে না। 
৪- নাগা ও মিজো দমনের নামে ভারতীয় বাহিনী কোন উপজাতি সদস্যকে হয়রানী করতে পারবে না।