বিবিধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিবিধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৭ মে, ২০২৫

'ডাকাতের গ্রাম' থেকে সভ্যতার পথে ঢাবি'র অগ্রগতি কতদূর?


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেশের ইতিহাস ও socio-political প্রেক্ষাপটে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাঙ্গন কেবল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রই নয়, বরং এটি বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই হিন্দুত্ববাদের আগ্রাসনের কবলে পড়েছে। পাশাপাশি বাম আদর্শের শিক্ষকদের দৌরাত্মে ঢাবি অনৈতিকতার তীর্থস্থানেও পরিণত হয়েছে। ইংরেজ আমলে এখানে মুশরিকদের আগ্রাসন বেশি পরিলক্ষিত হয়। এই হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগের ছাত্রনেতা শহীদ নজির আহমদকে নির্মমভাবে খুন করে হিন্দু ছাত্ররা। নাজির আহমদকে স্মরণ করে কবি জসিম উদ্দিন লিখেন  

নজীরের বাপ ফিরিয়া যাইবে আবার আপন ঘরে
নজীরের সেই শূন্য বিছানা বাক্স সঙ্গে ক'রে।
অর্দ্ধেক পড়া বইগুলি তার লেখা ও অলেখা খাতা,
পাতায় পাতায় স্মৃতি তার কত আখরের মত পাতা।

পাকিস্তান আমলে মুশরিকদের দৌরাত্ম কিছুটা কমলেও শুরু হয় বাম-নাস্তিকদের দৌরাত্ম। একইসাথে শুরু হয় শেখ মুজিবের নেতৃত্ব গড়ে ওঠা ছাত্রলীগের সন্ত্রাস। তারা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্যায়ের আখড়া বানিয়ে দেয়। বিশেষত মাদকের সয়লাব ঘটায়। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট বামপন্থী সন্ত্রাসীরা ছাত্রসঙ্ঘের ছাত্রনেতা শহীদ আব্দুল মালেককে হত্যা করে। 

এরপর দেশ তথাকথিত স্বাধীন হলো। স্বাধীনতার পর ঢাবিতে একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয় ছাত্রলীগ ও তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হুয়া জাসদ ছাত্রলীগ। ১৯৭২ থেকে এখন পর্যন্ত ৭৬ জন মানুষ খুন হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু বিচার হয়নি কোনো ঘটনারই। এর মধ্যে সবচেয়ে লোমহর্ষক ঘটনা হলো ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ভোরে মহসিন হলে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে ছাত্রলীগ সেক্রেটারি শফিউল আলম প্রধান একে একে সাত ছাত্রলীগ কর্মীকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। এতে শফিউল আলম প্রধানের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়। কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলে সে মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পায়। 

স্বাধীনতার পর আর ঢাবি স্থিতিশীল ছিল না। রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ ছিল নিয়মিত ঘটনা। এছাড়া খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজি, শিক্ষকদের হেনস্তা, এমনকি দেহব্যবসার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আশির দশকে ঢাবি জাহান্নামে পরিণত হয়। কবি আল মাহমুদ তাই তাঁর কবিতায় বলেন,

এই মহানগরীর ভদ্রবেশী বেশ্যা, লম্পট, হিরোইনসেবী ও ছিনতাইকারীর
প্রাত্যহিক পাপের দেনায় 'আমরা এমনিতেই অতিষ্ঠ, 
এর সাথে যোগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মহান পণ্ডিতেরা। 
শিক্ষার প্রতিটি প্রাঙ্গণ কিশোর হত্যার মহাপাপে এখন রক্তাক্ত, পঙ্কিল।
প্রকৃত পাপীদের বিনাশ ত্বরান্বিত করতে তুমি কি বাংলাদেশের
প্রতিটি বিদ্যাপীঠকেই বিরাণ করে ফেলবে? 

একমাত্র শহুরে পড়ুয়া মেয়েটির গলার চেন ও হাতের বালা 
জগন্নাথ হলের পাশের রাস্তা থেকে ছিনতাই হলো। বুকের ওপর ছুরি রেখে
খুলে দে হারামজাদী, চুপ্।

আমরা তো চুপ করেই আছি, তবু হে পরোয়ারদিগার
জানতে সাধ জাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?

প্রভু
ডাকাত, ছিনতাইকারী, পন্ডিত ও বেশ্যাদের হাত থেকে
তুমি কি ইলমকে রক্ষা করবে না? -রাব্বি যিদনী ইলমা- 
প্রভু, আমাদের জ্ঞানদান করো।
  
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের একক দৌরাত্মে গত এক যুগ ঢাবি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এখানে যোগ্য নাগরিক তৈরির বদলে পাকা সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। দৈনিক প্রথম আলো, যুগান্তর ও সাপ্তাহিক সোনার বাংলার রিপোর্ট ও কেস স্টাডিতে দেখা যায় গত ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ একাই খুন করেছে অন্তত ২৫৩ জনকে। এর মধ্যে একটা বড় অংশ নিজ দলের নেতাকর্মী। 

প্রতি বছরেই তারা খুন করেছে প্রায় ১৮ জনকে। প্রকাশ্যে বিশ্বজিৎ হত্যাকান্ড, ঢাবির মেধাবী ছাত্র আবু বকর হত্যাকান্ডে দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়। তাছাড়া ২০১০ সালে বরিশাল পলিটেকনিকে দু’পক্ষের সংঘর্ষের সময় নজরুল ইসলামকে ধরে রেখে চুরি দিয়ে মুহুর্মুহু কোপানির দৃশ্য মানুষের মনে বীভৎসতার নতুন চিত্র তুলে ধরে। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি শিশু ও সাংবাদিকও। ছাত্রলীগ নেতা তপুর নির্দেশে এসপি ফজলুল করিমকে হত্যা করা হয়। সারাদেশে ছাত্রলীগের এই হত্যা ও খুনের রাজনীতি আবর্তিত হয় ঢাবি ছাত্রলীগের মাধ্যমে। 

বিষফোঁড়া সোহরাওয়ার্দি 
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ জনতার নিরাপদ বিনোদনকেন্দ্র হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি অপরাধীদের আনাগোনা ও মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। পার্কের নির্জন কোণে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্য বিক্রি ও সেবন হয়ে আসছে। রাতে উদ্যানের বিভিন্ন বিনোদনাঞ্চল যেমন মুক্তমঞ্চ, কালী মন্দির এলাকা, চারুকলার গেট সংলগ্ন স্থান ইত্যাদিতে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা হয়। তবে শুধু মাদকই নয়, সন্ধ্যার পর উদ্যানটিতে ছিনতাই, ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজিসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। মাদকচক্রের কিছু সদস্য তরুণ-তরুণী ও হিজড়া নিয়ে গোষ্ঠী গঠন করে সাধারন দর্শনার্থীদের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। 

সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে খুন ও সহিংস ঘটনা। ১৩ মে ২০২৫ তারিখ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই উদ্যানের পাটিতে ৩০ বছর বয়সী বিল্লাল হোসেনকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। ২০২১ সালের ১ জুন উদ্যানের ভিতরে মারধরের পর হাসপাতালে নেওয়ার পর আবুল হাসানের মৃত্যু হয়েছে; এ ঘটনায় তখন মাস্টার দা সূর্যসেন হলে ছাত্রলীগের এক নেতা জড়িত ছিলেন বলে খোঁজ পাওয়া যায়। মানবজমিনের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের লাশ উদ্যান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

মাদকের ‘আস্তানা’ 
সোহরাওয়ার্দি উদ্যান মাদকের আস্তানা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। মাঠের নির্জন কোণগুলোতে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা এমনকি ইনজেকশন-ভিত্তিক নেশাজাত দ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। যুগান্তর পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, উদ্যানের মাদক সিন্ডিকেটে অন্তত ১০ জনের নেতৃত্বে ৬০–৭০ জন সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের একটি চক্রের সদস্য জানান, এর আগে উদ্যানের মাদক ব্যবসা ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করত; ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন চাঁদাবাজরা নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছে। মুক্তমঞ্চ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন রাতে গাঞ্জা সেশন বসে; নগদ বাজারমূল্য অনুযায়ী ‘এক পুরিয়া’ গাঁজার দাম প্রায় ১০০ টাকা। এখানকার রিকশাচালকরা বলছেন, প্রতিদিন বিভিন্ন পেশার লোকজন (শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক) মাদক কেনার উদ্দেশ্যে উদ্যানে আসে। 

এখানে গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের অবাধ বেচাকেনা চলে । উদ্যানের মুক্তমঞ্চ (শিল্পকলা একাডেমির নির্মিত উন্মুক্ত নাট্যমঞ্চ) বিশেষভাবে গাঁজার আসর হিসেবে পরিচিত, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মাদক সেবন করতে আসে । শুধু মুক্তমঞ্চ নয়, পুরো উদ্যান জুড়েই মাদক সেবনের দৃশ্য দেখা যায় ।   

মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে নারী মাদক বিক্রেতারাও উল্লেখযোগ্য, যাদের মধ্যে পারুল নামের একজন বিশেষভাবে পরিচিত। সে বিভিন্ন ছদ্মবেশে ঘুরে ঘুরে ৫০ থেকে ১০০ টাকায় গাঁজা বিক্রি করে এবং প্রায়শই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যায় । মাদক ব্যবসার কারণে উদ্যানে বিভিন্ন সময়ে অঘটন ঘটেছে, এমনকি খুনের ঘটনাও ঘটেছে । মাদক নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীদের সংঘর্ষের ঘটনা প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনা।

অসামাজিক কার্যকলাপ
মাদক ব্যবসার পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিনতাই, মারামারি এবং অন্যান্য অসামাজিক কার্যকলাপও দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে । সন্ধ্যার পর থেকেই অপরাধীরা এখানে ভিড় করে এবং রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে তাদের আড্ডা আরও জমে ওঠে । উদ্যানের অন্ধকারাচ্ছন্ন স্থানগুলি অপরাধীদের জন্য নিরাপদ মনে করা হয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যৌন অপরাধ ও অসামাজিক কার্যকলাপের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। মন্দিরের পাশ, গ্লাস টাওয়ার ও চারুকলার গেট এলাকায় সন্ধ্যার পর তরুণ-তরুণী ও হিজড়াচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে। এসব স্থানে চলে অসামাজিক কার্যকলাপ। উদ্যানের ভেতরে কয়েকটি স্পটে দেহ ব্যবসাও চলে। মূলত উদ্যানের ভেতর কয়েকটি স্পট রয়েছে- মুক্তমঞ্চ, ফুড কিওস্ক ক্যান্টিন, স্মৃতিস্তম্ভ, ছবিরহাট, রমনার পুকুর পাড়, শিখা চিরন্তনের পেছনে, হাইকোর্টের গেট, মাঠ। এই প্রতিটি স্পটেই দিনে রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। 

প্রশাসনের ব্যর্থতা ও অপরাধীদের সাথে আঁতাত
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অপরাধের ব্যাপক বিস্তারের পেছনে প্রশাসনের ব্যর্থতা ও অপরাধীদের সাথে আঁতাত একটি বড় কারণ। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও পুলিশ না দেখার ভান করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, উদ্যানের অপরাধচক্রে জড়িত রয়েছে কতিপয় শিক্ষার্থীও। ২০২৫ সালের আগস্টের পর নতুন চাঁদাবাজরা উদ্যান নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। তাদের চাঁদা দিয়েই ব্যবসা চলছে। স্থানীয়দের মতে, আনসার সদস্যরাই এইসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। তাদেরকে বখরা দিয়ে রমনার গেট দিয়ে ঠিকই সকলে মাঠের মধ্যে ঢোকে। 

ঢাবি ডাকাতের গ্রাম হওয়ার সাথে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের কানেকশন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সোহরাওয়ার্দি কেন্দ্রীক অপরাধীরা মূলত তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে ঢাবি'র ছাত্রনেতাদের শেল্টারে। এতোদিন ছাত্রলীগ এই ব্যাপারগুলো নিয়ন্ত্রণ করতো। ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর নতুন ছাত্রনেতারা এই বিষয়গুলোর সাথে যুক্ত হয়েছে। তবে এটা এখনো সেটেলড নয়। তাই নিয়মিতই নারী, মাদক, ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে চাঁদা কালেকশন নিয়ে মারামারি হচ্ছে। সম্প্রতি গভীর রাতে ছাত্রদল নেতা সাম্য মাদকসেবীদের দ্বারা নিহত হলে নড়ে বসে প্রশাসন। 

যদিও ঢাবি প্রশাসন আগেই উদ্যানের অপরাধমূলক বিষয়গুলো থেকে ঢাবিকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বামপন্থী ছাত্র শিক্ষক ও ছাত্রদলের একাংশ এই প্রক্রিয়ায় বিশেষভাবে বহিরাগতদের গভীর রাতে আড্ডা বন্ধ করার ব্যাপারে ঢাবি প্রশাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ডাকাতের গ্রাম থেকে সভ্য হয়ে ওঠার জন্য ঢাবি প্রশাসনকে অবশ্যই উদ্যোগ নিতে হবে। তবে জুলাই বিপ্লবের পর কিছু অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, আদু ভাইদের বিশ্ববিদ্যালয় হল ত্যাগ, রাজনৈতিক সিট বন্ধ, গেস্ট রুম কালচার বন্ধ, গণরুম বন্ধ ইত্যাদি উদ্যোগ ভালো ভূমিকা রাখছে। 

সাম্য হত্যাকাণ্ডের পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অবস্থা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর উদ্যানকে 'আতঙ্কের স্থান' থেকে ধীরে ধীরে নিরাপদ ও 'স্বস্তিদায়ক স্থানে' রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ।

সরকার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে :
১. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ
২. মাদক কারবারি বন্ধ এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে যৌথ অভিযান চালানো
৩. উদ্যানে পর্যাপ্ত আলো ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সেগুলোর নিয়মিত মনিটরিং করা
৪. উদ্যানে একটি ডেডিকেটেড পুলিশ বক্স স্থাপন করা
৫. রাত ৮টার পর উদ্যানে জনসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা
৬. নিয়মিত মনিটরিং ও অভিযানের জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি কমিটি গঠন
৭. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রমনা পার্কের মতো সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা চালু করা

যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু এর স্থায়ী সমাধানের জন্য আরও কঠোর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আমরা আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে ঢাবি হলগুলো যেভাবে সন্ত্রাসমুক্ত হয়েছে, পুরো ঢাবি এলাকা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ঢাবি কবি আল মাহমুদের 'ডাকাতের গ্রাম' তকমা থেকে মুক্তি পাবে। 

২৩ ফেব, ২০২১

ফতওয়ার কিতাবের শেষ পাতা



এক গ্রামে এক কৃষক ছিলেন। তিনি সকাল বেলা তার ক্ষেতে চারা লাগাচ্ছিলেন। যোহরের আজান হলো। আজান শুনে তিনি বাড়ি গেলেন। গোসল করে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পথে দেখলেন তার ক্ষেতে ঢুকে একটি গরু সব চারা খেয়ে ফেলেছে। তিনি অত্যন্ত কষ্ট পেলেন। যাই হোক তিনি গরুটিকে তাড়িয়ে নামাজে গেলেন। নামাজ শেষে তিনি ইমাম সাহেবকে বললেন,
 
- হুজুর একটা বিষয়ে ফতওয়া দরকার। আপনি মেহেরবানী করে ফতওয়া দিন। 
- কী বিষয়ে ফতওয়া? বলো।
- হুজুর, কারো গরু যদি অন্য কারো ক্ষেতে ঢুকে ফসল খেয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে বিচার কী হবে?
- ওহ এইটা? এটা তো সহজ ব্যাপার! যার গরু সে ক্ষতিপূরণ দিবে।
- হুজুর, তাহলে শুনুন। আপনার গরু আমার সব চারা খেয়ে ফেলেছে। আমি সকাল থেকে অনেক পরিশ্রম করে এগুলো লাগিয়েছি।
- ওহ তাই নাকি। একটু অপেক্ষা করুন। আমি একটু ফতওয়ার কিতাব খুলি। আমার এখনো শেষ পাতা পড়ার বাকী আছে।
(হুজুর উঠে দাঁড়ালেন। আলমিরা থেকে ফতওয়ার আরবি কিতাব বের করে পাতা ওল্টাতে লাগলেন। অবশেষে এক পাতায় এসে বললেন)
- পেয়েছি! পেয়েছি! এখানে শর্তসাপেক্ষ ব্যাপার আছে।
- হুজুর, এখানে আবার কী শর্ত?
- শোনো মিয়া! শর্ত হলো ক্ষেতের ফসল খেয়ে যদি গরু অসুস্থ হয় তবে ক্ষেতের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর যদি অসুস্থ না হয় তবে মামলা শেষ। আর গরুর মালিক কখনোই ক্ষেতের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। কারণ গরু অবুঝ প্রাণী। তার কোনো হিসাব-নিকাশ নাই। ক্ষেতের নিরাপত্তা বিধান করা কৃষকের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কারো কিছু করার নেই।
- (হতভম্ব হয়ে) আমি এখন কী করবো হুজুর?
- তুমি আল্লাহর কাছে দোয়া করো আমার গরু যাতে সুস্থ থাকে। নইলে গরুর দাম দিতে হবে।
 
এটা একটা গল্প। যারা নিজেদের ব্যাপারে আসলে রায় উলটে দেয় তাদের জন্য। এই গল্পটা ছোটবেলায় আমার মাতৃভাষায় খুব শুনতাম। আমি এখানে প্রমিত উচ্চারণে লিখিত রূপ দিলাম। যাই হোক এই গল্প হুজুরদের বিরুদ্ধে। হুজুররা নিজেদের ইচ্ছেমত ইসলামকে তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। অথবা শাসকদের দালালি করার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে। আজকে এমন একজন হুজুর সম্পর্কে আলোচনা করবো।
 
তখন কোটা আন্দোলন চলছিল। সারাদেশের ছাত্ররা উত্তাল। সেসময় একদিন এক হুজুরের ভিডিও ভাইরাল হলো। তিনি ঘোষণা করলেন ছাত্র আন্দোলন হারাম। এই ফতওয়া দিলেন বাংলাদেশ আহলে হাদিস জামায়াতের নেতা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ। তিনি ইমাম বুখারির একটি মন্তব্য নিয়ে এই ফতওয়া দিলেন। ওনার ভাষ্যমতে ইমাম বুখারি বলেছেন কথা ও কর্মের পূর্বে বিদ্যা। এটা খুবই জরুরি কথা। আমি যে বিষয়ে কথা বলবো ও কাজ করবো সে বিষয়ে যদি আমার জ্ঞান না থাকে তবে কেমনে হবে?
 
কিন্তু এর মানে তো এই না, ছাত্র অবস্থায় সে দ্বীনের দাওয়াত দিতে পারবে না। ছাত্র অবস্থায় সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না। ন্যায় অন্যায় বুঝতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়া শেষ করতে হবে এটা কেমন কথা! আর বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেও তো অনেকে ন্যায় অন্যায় বুঝে না। ইমাম বুখারির এই কথা বৃহত্তর অর্থে। এক কথায় বলতে গেলে যে বিষয়ে আমি জানিনা সে বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রজীবন শেষ করলে একজন ব্যক্তি সব বিষয় জেনে ফেলবেন ও মতামত দিতে পারবেন এটা মহা ভুল কথা।
 
যাই হোক তিনি মসজিদে দাঁড়িয়ে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করলেন, "যে কোনো ছাত্র আন্দোলন হারাম"। এই কথা তিনি তিনবার বললেন। পরে এই কথাও বললেন "ছাত্র আন্দোলন মানুষ করে না, পশু করে"। আব্দুর রাজ্জাকের এই ফতওয়া সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ব্যক্তিত্ব ও ভুঁইফোঁড় পেইজ ফেসবুকে ডলার খরচ করে সেই বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। আব্দুর রাজ্জাক এভাবে জুলুমের প্রতিবাদকে বন্ধ করে দিতে চেয়েছেন মাফিয়ার মা হাসিনার হয়ে।
 
অথচ তিনি সংগঠন করেন সেই সংগঠনের ছাত্র আন্দোলন আছে। সেই ছাত্র আন্দোলনের নাম বাংলাদেশ আহলে হাদিস ছাত্র সমাজ। এছাড়াও তার ছেলে ছাত্র অবস্থায় থেকেই ওয়াজ মাহফিল করে বেড়াচ্ছে। এই বিষয়টা তার ফতওয়ার বিপরীতে যাচ্ছে। তার ছেলে কেন বিদ্যা শেষের পূর্বে কথা বলছে। তাদের ছাত্র সংগঠন কেন বিদ্যের পূর্বে সংগঠিত হলো।
 
ভোলায় আল্লাহর নবী সা.-এর বিরুদ্ধে কটুক্তি হয়েছে। এর প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে তৌহিদী জনতা। এই সমাবেশকে কটাক্ষ করেছেন আব্দুর রাজ্জাক। ওনার দাবি কটুক্তির শাস্তি দিবে সরকার, এর দায়িত্ব সরকারের। যদি সরকার দায়িত্ব পালন না করে তবে আমাদের কিছু করার নাই। এর জন্য সমাবেশ করা যাবে না। তিনি ভোলার তৌহিদী জনতাকে কটাক্ষ করে বলেছেন, এই যুবক তুমি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠো কেন? তোমার সমস্যা কী? অর্থাৎ নবী সা.-এর অপর আঘাত এলে ক্ষিপ্ত হওয়ার দরকার নেই। উনি আরো বলেছেন, যে সমাবেশে পুলিশ বাধা দেবে সে সমাবেশে যাওয়াই হারাম।
 
এর আগেও তিনি ইকামাতে দ্বীন, মিছিল, হরতাল ইত্যাদি নিয়ে জামায়াতে ইসলামকে কটাক্ষ করেছেন। অথচ তাকে ইসলামী নেতৃবৃন্দকে খুন, ক্রসফায়ার, গণহত্যা, গুম, লুটপাট ইত্যাদি বিষয়ে জোরালে ভূমিকা রাখতে দেখি নি।
 
কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে ওনার ওপর হামলা হলো সিলেটে। এরপর দেখলাম তার প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবাধীন মাদ্রাসার ছাত্ররা তার ওপর হামলার প্রতিবাদে মিছিল করছে, সমাবেশ করছে। ছাত্ররা ক্ষিপ্ত হয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, রাজশাহীতে এই ধরণের ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবাদী সমাবেশের ছবি ও ভিডিও আমি দেখলাম।
 
উপরে যে গল্প উল্লেখ করেছি, আমি ভেবেছি এগুলো শুধু গল্পেই হয়! অথচ দেখুন আহলে হাদীসদের আইকন হয়ে এই হুজুর কীভাবে নিজের প্রয়োজনে ইসলামকে ব্যবহার করছে। এরা সুবিধাবাদী ও অত্যাচারী শাসকদের দালাল। এদের থেকে সাবধান থাকুন। এরা নবীর ওপরে আঘাত এলে ক্ষিপ্ত হতে নিষেধ করে আর নিজের ওপরে আঘাত এলে ছাত্রদের লেলিয়ে দিচ্ছে। এদের থেকে সাবধান থাকুন।


৭ ফেব, ২০২১

ইসলামী ছাত্রশিবিরে আমার অভিজ্ঞতা

 

বাবা-মা আমার বুঝজ্ঞান হওয়ার আগে থেকে জামায়াতের সাথে জড়িত ছিলেন। ঘরভর্তি ছিল ইসলামী সাহিত্য ও তাফসীর। আর আব্বু আম্মুর নসীহত তো আছেই। বাসার পাশেই ছিল শিবির মেস। শিবিরের আঙ্কেলরা আদর করতেন, চকোলেট খাওয়াতেন। স্টিকার ও ভিউকার্ড দিতেন। এভাবে এতো মানুষের প্রভাবে কখন যে ছাত্রশিবিরে যুক্ত হয়ে গেছি বুঝতে পারি নাই। শৈশব থেকেই আমি শিবির করি বলা চলে। আব্বুর সাথে, শিবিরের আঙ্কেলদের সাথে প্রাইমারি থেকেই শিবিরের প্রোগ্রামগুলোতে যাতায়াত হতো। 

তবে যখন সেভেন এইটে উঠেছি তখন শিবিরের ভাইদের থেকে দূরে থাকতে চাইতাম। তখন শিবির দায়িত্বশীলদের আঙ্কেল বলা ছেড়ে দিয়েছি। শুধু মাসের শুরুর দিকে যখন তারা কিশোর কন্ঠ নিয়ে আসতেন তখন তাদের থেকে সেটা কালেকশন করতাম। এছাড়া ওদের মিটিং-এ এটেইন করা ছেড়ে দিয়েছি। কারণ তারা যেসময় মিটিং করে ওটা আমার খেলার টাইম। আর শুধু ১৫ মিনিটের মিটিং হলে না হয় হতো, কিন্তু তারা আমাকে 'সাথী' হতে বলে। 'সাথী' হলে আমার খেলাধূলা চাঙে উঠবে। তাই মিটিং-এ যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। 

কিন্তু সেসময়ের কিছু দায়িত্বশীল আমাকে এমনভাবে চেপে ধরলেন যে, ক্লাস নাইনে আমাকে 'সাথী' হতেই হলো। সাথী হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করামাত্র আমার বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি, বিকেলের খেলা সব লিমিটেড হয়ে গেল। প্রতিদিন কিছু না কিছু পড়া মুখস্ত করা লাগতো। প্রতিদিন কোন না কোন বই পড়া লাগতো। দায়িত্বশীল এসে আবার সে বই থেকে পড়া ধরতেন। এভাবে লাইফটা একেবারে টাইট হয়ে গেল। এরপর সাথী হলাম। সাথী শপথ নেওয়ার পর দায়িত্বের বোঝা বাড়তে লাগলো। তখন অবশ্য সাংগঠনিক পড়ালেখার চাপ কিছুটা কমেছে। দায়িত্বের চাপে আমার খেলাধূলা সত্যিই চাঙে উঠে গেল। 

যাই হোক এভাবে আমি শিবির হয়ে গেলাম। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার থেকে শুরু হলো সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া আরো কঠিন, আর পেইনফুল। প্রতিটি ঘন্টার হিসাব দিতে হতো উর্ধ্বতনকে। কুরআন যা একটু মুখস্ত হয়, হাদিস তো মোটেই মুখস্ত হয় না। আমি আমার একাডেমিক পড়াশোনাও মুখস্ত রাখতে পারতাম। সারাজীবন পরীক্ষায় যা বুঝতাম তা বানিয়ে লিখে আসতাম। কিন্তু এক্ষেত্রে তো আর সেটা সম্ভব না, কারণ আমি আরবি ব্যাকরণ বাক্যগঠন কিছু বুঝি না। সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়ায় হাদিস মুখস্ত করা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের। যেদিন সদস্য হয়েছি সেদিন ফাইনাল ভাইবাতে তৎকালীন অফিস সম্পাদক রেজাউল ভাই ধরছিলেন ইতিহাস ও সাধারণ জ্ঞান থেকে। আল্লাহ রক্ষা করেছে। এটা আমার ছিল ফেবারিট। উনি আমার থেকে বঙ্গভঙ্গ, ঢাবি প্রতিষ্ঠা ও দ্বিজাতিতত্ত্ব জানতে চেয়েছেন। সে যাত্রা রক্ষা পেয়ে গেলাম। কেন্দ্রীয় সভাপতি মাসুদ ভাই শুধু আমার নামের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন। আর বলেছেন ছোট মানুষ আপনি! কেন সদস্য হবেন?          

এরপর একটি প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। ভার্সিটিতে তখন নতুন। হলে রুমমেট দুজনই ছিল সিনিয়ার। আমি পুরোদস্তুর ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হওয়ায় আমাদের রুমে বেশীরভাগ আড্ডা রাজনৈতিক আড্ডায় পরিণত হতো। রুমমেটদের একজন ছিল বিএনপি ঘেঁষা অন্যজন কট্টর লীগ সমর্থক। একদিন লীগ সমর্থক সিনিয়র ভাইটি কথায় কথায় বললেন “তুমি বেশি ফাল পাইড়ো না, তোমার আর কীসের ইসলামী আন্দোলন, তুমি বাপ-দাদার গোলামিই করতাছো। তোমার বাপ-মাও জমাতি তুমিও জমাতি।”

ঐ কথা শুনে আমি থমকে গিয়েছিলাম। চিন্তা করে দেখলাম, কথাটা ভুল বলেননি। আমি তো অন্য ইসলামী সংগঠনগুলো নিয়ে চিন্তা করিনি। আমার সামনে নতুন ভাবনার দুয়ার খুলে গেলো। অন্যকোন সংগঠন শিবিরের চাইতেও সহীহ হতে পারে। প্রথমে দায়িত্বশীলদের সাথে আলোচনা করলাম। তারা কিছু ইনফরমেশন দিলেন অন্য ইসলামী দল সম্পর্কে। সব নেগেটিভ ইনফরমেশন।

সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। মনে মনে ভাবলাম ইনফরমেশনগুলোতো ভুলও হতে পারে। অতঃএব ঐ দলগুলোর সাথে মিশতে হবে। তাদের বই পড়তে হবে তাদের জানতে হবে। একটি নোটবুক ক্রয় করলাম। একে একে সব দলগুলোর নাম লিখলাম। টার্গেট সত্যানুসন্ধান। প্রতিটি দল সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি। প্রতিটি দলের বৈশিষ্ট্য লিখি। সর্বশেষ মন্তব্য করি কেন আমি এই দলের সাথে যুক্ত হতে পারছি না।

মোটামুটি সব দল সম্পর্কে নোট করা শেষ। ২০১১ সালে অনুসন্ধান মোটামুটি শেষ বলে ঘোষনা করি। আলহামদুলিল্লাহ সারা বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরের চাইতে অধিকতর ভালো কোনো সংগঠন পাই নি। সেই সাথে প্রশান্তি অনুভব করি। ইনশাআল্লাহ, অন্তত আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা আমাকে এই মর্মে পাকড়াও করবেন না যে, আমি বাপ-দাদার গোলামি করেছি। প্রত্যেকটি সংগঠনের ব্যাপারে উত্তর তৈরী করেছি কেন আমি তাদের সাথে নেই।

এই কাজটি করতে গিয়ে শিবির সম্পর্কে আস্থা আরো বেড়েছে। দারুণ একটি ব্যাপার আবিষ্কৃত হয়েছে। শিবির আসলে একটি মধ্যমপন্থী দল। তাই বলে আমি এই দাবী করছি না শিবিরই একমাত্র সহীহ দল কিংবা শিবিরের কোন ভুল নাই। আমার বিবেচনায় দ্বীন প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে এর চাইতে ভালো অথবা এর কাছাকাছি কোনো সংগঠনকে আমি পাইনি।

আমি আমার অনুসন্ধানে তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেছি। 
১. আকীদা। 
২. বিপ্লবের পদ্ধতি। 
৩. নেতৃত্ব কাঠামো।

আকীদার ক্ষেত্রে আমার বিবেচনায় পাশ করেছে অনেকগুলো সংগঠন। যাদের আকীদা আমার কাছে সহীহ মনে হয় নি, তাদের পরবর্তী দুটো বিষয় নিয়ে আমি আর জানার চেষ্টা করি নি।

বিপ্লবের পদ্ধতি মানে ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে নির্মিত হবে এই প্রশ্নে আমি আদর্শ হিসেবে গ্রহন করেছি রাসূল সা.-এর সীরাতকে। রাসূল সা. তিনটি কাজ করেছেন।

১. অগ্নি পরীক্ষার মাধ্যমে ১৩ বছর ধরে যোগ্য লোক তৈরি করেছেন যারা ইসলামী রাষ্ট্রকে ইসলামী আদর্শ মোতাবেক চালাতে পারবেন।
২. দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে গনমানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন, যাতে তারা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়। ইসলামের সুমহান আদর্শ মেনে নেয়।
৩. নেতা হিসেবে নিজেকে আদর্শের মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। অর্থাৎ নিজেকে ইসলামের জীবন্ত রূপ দিয়েছেন।

এই বিপ্লবের পদ্ধতির ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে অন্যান্য দলগুলো কোন না কোন অংশে চরমপন্থা অবলম্বন করেছে। যেমন কেউ শুধু দাওয়াত নিয়ে চরমপন্থি হয়ে আছে, কেউ সেক্টরগুলোর মধ্যে সেনাবাহিনী নিয়ে চরমপন্থা করছে, কেউ সামাজিক কাজ নিয়ে চরমপন্থা করছে। কেউ আবার নেতা নিয়ে চরমপন্থা করছে। একমাত্র ভারসাম্য দল পেলাম শিবির, যে সব সেক্টর নিয়ে কাজ করছে। ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ না করে সামগ্রিক জীবনের পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করেছে।

নেতা আদর্শের মডেল হবেন, এই ব্যাপারে সব দলেই ঘাটতি আছে, এমনকি শিবিরেও এই ঘাটতি আমার চোখে পড়েছে।

তৃতীয় যে বিষয় নেতৃত্ব কাঠামো। অসাধারণ একটা সিস্টেম ডেবেলপ করেছে শিবির। যাতে নেতৃত্বের প্রতি লোভীদের অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর অন্যান্য দলের ক্ষেত্রে এই বিষয়ে একেবারেই হ-য-ব-র-ল অবস্থা। সর্বস্তরের নেতৃত্ব নিয়ে আস্থাহীনতা জামায়াত-শিবির ছাড়া প্রায় সব দলেরই প্রধান সমস্যা। আর প্রায় সব দলেই নেতৃত্বলোভীরাই নেতা হওয়ার সুযোগ পায়। আর্থিক সচ্ছতা মেইন্টেইন করতে পেরেছে এমন সংগঠন খুব কম।

তাছাড়া শিবিরের আছে অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য যা শিবিরকে তার লক্ষ্য অর্জন সহজ করে দিচ্ছে।

১. শিবিরের বিপ্লবী দাওয়াত। 
শিবির দুনিয়াবী কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মানুষকে আহ্বান করে না। দুনিয়ার কোন সফলতার লোভ দেখায় না। একান্ত পরকালীন সাফল্যের কথা সামনে নিয়ে আসে, যেভাবে আল্লাহর রাসূল দাওয়াত দিয়েছেন।

২. ইসলামী সমাজ গঠনের উপযোগী ব্যক্তিগঠন পদ্ধতি। 
শিবির মনে করে ব্যক্তিগঠনের জন্য তিন ধরণের যোগ্যতা লাগবে। এক, ঈমানী যোগ্যতা। দুই, ইলমী যোগ্যতা। তিন, আমলী যোগ্যতা। যোগ্যতা হাসিলে কঠোর প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেছে সংগঠনটি।

৩. ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি একটি তাকওয়া ভিত্তিক সংগঠন। শিবির কোন লোককে দায়িত্ব প্রদানকালে তাকওয়ার বিষয়টি সামনে রাখে।

৪. শিবিরের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে “নেতৃত্ব সৃষ্টির পদ্ধতি”। অসাধারণ এই পদ্ধতিতে নেতৃত্ব বা পদলোভীদের কোন স্থান নেই।

৫. শিবিরের অর্থের উৎস শিবিরের দায়িত্বশীল, কর্মী এবং শুভাকাংখীরা। শিবির বাইরের অন্য কারো অর্থে চলে না। তাই কারো ক্রীয়ানক হিসেবে কাজ করে না।

৬. বিরোধীদের প্রতি শিবিরের আচরণ। 
শিবির তার বিরোধীদের মধ্যে যারা অশালীন ও অভদ্র ভাষা প্রয়োগ করে তাদের করুণার পাত্র মনে করে। শিবিরের দাওয়াত আদর্শ ও কর্মসুচীর বিরুদ্ধে বেচারাদের কিছু বলার সাধ্য নেই বলে বেসামাল হয়ে গালাগালি করে মনের ঝাল মেটানোর চেষ্টা করে। শিবির তাদের হিদায়াতের জন্য দোয়া করে।

আর যারা মিথ্যা সমালোচনা করে অপবাদ দেয়, শিবির প্রয়োজন মনে করলে সেই সমালোচনা সত্য উপস্থাপন করে খন্ডন করে। আর তাছাড়া শিবির এও বিশ্বাস করে, মুমিনের দুনিয়ার জীবনে ব্যর্থতা হলো আল্লাহর আনুগত্য করতে না পারা। দুনিয়ার জীবনের কষ্ট, নির্যাতন, অত্যাচার অথবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতিকূলে থাকা সবগুলোকেই শিবির পরীক্ষা বলেই গণ্য করে।

গতকাল শিবিরের ৪৪ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী গেল। বাংলার হাজার হাজার মানুষের চরিত্র গঠনে ছাত্রশিবিরের অবদান অপরিসীম। ইসলাম কায়েমকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নেয়ার ক্ষেত্রে আর কোনো সংগঠন এমন বিশাল ভূমিকা রেখেছে তা আমার জানা নেই। শিবির থেকে বিদায় নিয়েছি প্রায় তিন বছর হলো। এখনো প্রাণভরে রোমান্থন করি সেই প্রেরণাদায়ক স্মৃতিগুলো।  

আমার এই লেখা যেসব ছাত্রভাইরা পড়বেন, আপনাদের প্রতি আমার আহবান থাকবে ছাত্রশিবিরের সাথে সম্পর্ক তৈরি করুন। ইনশাআল্লাহ আপনার সময়গুলো বৃথা যাবে না। কিয়ামতের কঠিন দিনে এগুলো আপনার নাজাতের উসিলা হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে রাখুন। আমিন।

৩ নভে, ২০২০

হাসাসিন : এক ভয়ংকর গুপ্তহত্যাকারী বাহিনী

ছবি : মাসিয়াফ দুর্গ 

১১৭৬ সালের সালের কথা। অপরাজেয় সেনানায়ক সালাউদ্দিন আইয়ুবি। একের পর এক ক্রুসেডে ইউরোপিয়ানদের পরাজিত করে এবার নিজ দেশের দিকে মনযোগ দিয়েছেন। প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে মিশর থেকে সিরিয়ার পথে রওনা করলেন সালাউদ্দিন আইয়ুবি। ঝড়ের মতো ঢুকে পড়লেন সিরিয়ার আন-নুসারিয়া পার্বত্য অঞ্চলে। গোটা এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলেন ১৫/২০ দিনে। কিন্তু একটা দূর্গও দখল করতে পারলেন না। প্রত্যেকটা দূর্গ পাহাড়ের মাথায়, চারদিক থেকে আক্রমণ সম্ভব না, অবরোধ না করে উপায় নেই। আর ৯ টা দূর্গ আলাদা আলাদা করে অবরোধ করতে হবে। মাসিয়াফ দূর্গ অবরোধ করতে হবে আগে, খবর আছে ওদের নেতা, রাশিদ আদ-দিন সিনান মাসিয়াফেই আছে।

মাসিয়াফ দূর্গটা খুব বিশাল না, কিন্তু দুর্ভেদ্য। কারণ পেছনে খাড়াই, দুপাশে খাদ, শুধু সামনে থেকে আক্রমণ করা যাবে। চতুর্দিক আগুন জ্বালিয়ে তাঁবুর চারপাশে শুকনো পাতা বিছানো, শব্দ গোপন করে কারো আসার কোন সুযোগ নেই, নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন সালাউদ্দিন। হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলো, আচমকা। পেশাদার যোদ্ধার প্রশিক্ষিত সতর্কতা সালাউদ্দিনের। চোখ মেলেই দেখলেন, একটা ছায়ামূর্তি তাঁবুর পাশ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলো। মাথার পাশে বালিশে ছুরি দিয়ে গাঁথা একটা ত্রিকোন প্রতীক, হাসাসিনদের প্রতীক, মানে ওটা বিষাক্ত ছুরি। তাতে একটা চিঠি আটকানো:

//মহামান্য খলিফা, ইচ্ছা করলেই ছুরিটা বিছানায় না গেঁথে, আরো নরম কোথাও গাঁথা যেত। কিন্তু আপনাকে বোঝানোটাই জরুরি ছিলো। আপনাকে মেরে ফেলার কোন ইচ্ছা আমাদের নেই। আমাদেরকে আমাদের মত থাকতে দিন, নিজেও সুস্থ থাকুন। আমরা আপনার বন্ধু না হলেও শত্রু নই। আমি নিজে না এসে অন্য কাউকেও পাঠাতে পারতাম। কিন্তু আপনার সম্মানার্থে, আমি নিজেই প্রস্তাব রেখে গেলাম। চলে যান এখান থেকে, আমাদের তরফ থেকে আপনার উপরে আর কোন হামলা হবে না। 

– রাশিদ আদ-দিন সিনান, আমির-ই-হাসাসিন, সিরিয়া//

সালাউদ্দিন দুদিন পরেই মিশরের পথে ফিরতি যাত্রা করেন। ১১৭৬ সাল ছিলো ৩০০ বছরেরও বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি করা হাসাসিনদের যৌবনকাল বলা যায়। ১১৭৩ থেকে ৩ বছরে সালাউদ্দিনকে অন্তত ৫ বার খুন করার চেষ্টা করেছিলো তারা। এই ৩০০ বছরের মধ্যে ওরা অন্তত দুই জন খলিফা, আর অসংখ্য উজির, সুলতান আর ক্রুসেড নেতাদের খুন করেছে। আর ছোটখাটো গুপ্তহত্যা তো ছিলোই। গুপ্তঘাতকের ল্যাটিন পরিভাষা, Assassin, এই হাসাসিনদের থেকেই এসেছে।

এই গুপ্তহত্যাকারী বাহিনীর শুরু ১০৭০ এর দিকে। মিশর এবং আরব তখন শিয়া ফাতিমিয় খিলাফত এবং খলিফা ছিলেন একজন ইসমাইলি শিয়া, আল-মুস্তান। পারস্য, ইরাক ও সিরিয়া তখন সুন্নী সেলজুকদের দখলে। পারস্য শাসন করছে প্রধান উজির নিজাম-উল-মুলক, চরম শিয়া বিদ্বেষী। পারস্যের (ইরান) ১৭ বছরের তরুণ স্কলার হাসান-ই-সাব্বাহ একজন ইসমাইলি শিয়া। সে ফাতিমিয় খলিফার আনুগত্য স্বীকার করলো। কয়েক বছরেই ফিদাই (সাধারণ সমর্থক) থেকে দায়িই (আদর্শ প্রচারক) তে পদোন্নতি হলো। সে শিয়া মতবাদের প্রচার করে যাচ্ছিল এবং মুসলিমদের মিশরের খলিফা আল মুস্তানের আনুগত্য করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। পারস্যের মানুষ অনেকে হাসানের অনুসারী হচ্ছিলেন। ক্রমান্বয়ে হাসানের দল ভারি হচ্ছিল। মুসলিমরা তার আহ্বানে সাড়া দিচ্ছিল। 

এই অবস্থায় হাসান নিজাম-উল-মুলকের কোপানলে পড়ে গেলো। তার সমাবেশগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। শিয়াদের এরেস্ট করা হচ্ছিল। হাসানকে আটক করার জন্য তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালানো হয়। পালিয়ে থেকে দাওয়াতী কাজ করে যাচ্ছিলেন হাসান। নিজাম উল মুলক শক্তি দিয়ে হাসানের অগ্রযাত্রা থামাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইরানে যুবক হাসানের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। সরকারের বিরূপ আচরণ তাকে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছিলো। এক পর্যায়ে তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হয় রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে। আর টিকতে পারলেন না হাসান। হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন।  

হাসান ফাতিমিয় শাসনের কেন্দ্র কায়রোতে হিজরত করার প্ল্যান করলেন। কায়রো তখন জ্ঞান বিজ্ঞানের এক বড় কেন্দ্র। তিনি ভাবলেন সেখানে জ্ঞানও অর্জন হবে, খলিফাকেও দেখা হবে। আর কায়রোর খলিফাই তো শিয়াদের ইমাম। ১০৭৬ এ রওনা দিয়েও পারস্য থেকে কায়রো যেতে দুই বছরের বেশি লেগে গেলো হাসানের। কারণ পথে যতগুলো বড় শহর পড়েছে সবখানেই কিছুদিন থেকে মানুষের চিন্তাভাবনা, পলিটিকাল ধারণা, ধর্মীয় নেতাদের ভাবনা, এগুলো স্টাডি করছিলো হাসান। অবশেষে হাসান যখন ১০৭৮ এ কায়রো পৌঁছালো, সেখানে তখন প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলছে। মুস্তানের বড় ছেলে নাজির, স্বাভাবিকভাবেই পিতার মৃত্যুর পরে তার খলিফা হবার কথা। কিন্তু প্রধান সেনাপতি বদর আল-জামালির ইচ্ছা পুরোই ভিন্ন কিছু। 

হাসানের খবর সবাই আগেই জানতো। তার পাণ্ডিত্যের সাথে শিয়ারা আগেই পরিচিত ছিল। তাই মিশরে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলো হাসান। কিন্তু মিশরেও ভালো অবস্থান হয়নি হাসানের। খলিফা আল মুস্তানের ছেলে নাজিরকে সমর্থন দেওয়ার কারণে সেনাপতি বদর তাকে এরেস্ট করলো। নিজাম উল মুলকের আসামীকে তার হাতে তুলে দিয়ে সেনাপতি বদর নিজামের সাথে সুসম্পর্ক করতে চেয়েছে। যাতে পরবর্তীতে শাসক হতে পারলে নিজামের সাথে তার কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো থাকে। হাসানকে বন্দী হিসেবে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর থেকে পারস্যের জাহাজে উঠিয়ে দেওয়া হলো।   

জাহাজ যখন দামাস্কাস বন্দরের কাছাকাছি তখন ঝড়ে পড়ে জাহাজ বিদ্ধস্ত হয় এবং হাসান সিরিয়ার কোন এক উপকূলে ভেসে যায়। সিরিয়ায় নিজেকে মুক্ত অবস্থায় পায় হাসান। আগে হাসান চেষ্টা করেছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞানে ভালো পণ্ডিত হওয়ার জন্য। কিন্তু কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় সে বুঝতে পারলো, শক্তি না থাকলে জ্ঞান-বিজ্ঞান কাজে আসছে না। হাসান নিজের জীবন বিপন্ন দেখে নতুন সিদ্ধান্ত নিল। পরের ১০ বছরে হাসানের একটাই উদ্দেশ্য ছিলো, শিয়াদের মধ্যে যারা তার অনুসারী তাদের সংগঠিত করা এবং একটি দক্ষ ও দুর্দান্ত সেনাবাহিনী তৈরি করা। সিরিয়া পারস্য আর ইরাকের সমস্ত এলাকা ঘুরে ডেডিকেটেড লোকদের নিয়ে বড় আকারে হাসাসিন (কোড অফ হাসান) নামে একটা বাহিনী তৈরি করে এবং তাদেরকে যোগ্যতা অনুসারে তিনটে ইউনিটে ভাগ করে।

১) দায়ি (প্রচারক)
২) রফিক (সঙ্গী)
৩) লাসিক (অনুগত নির্বাহক)।

এবার নিজাম উল মুলকের টনক নড়েছে, তার মাথা খারাপ হবার দশা। একা হাসানই যথেষ্ট মাথা ব্যাথার কারণ ছিলো ১২ বছর আগে, এবারে সে দলবল নিয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। সেনাবাহিনী পাঠায় নিজাম, হাসানকে দলবলসহ চিরতরে বিনাশ করতে। হাসান তার দল নিয়ে আল বুর্জ পার্বত্য অঞ্চলের এত গভীরে ঢুকে যায়, যে গোটা পারস্য ফোর্স দিয়েও হয়তো ওদের খুঁজে বের করা সম্ভব না। ওখানে গা ঢাকা দিয়ে থাকা অবস্থায় হাসান ভাবতে থাকে, নিজেদের একটা শক্তিশালী আস্তানা দরকার, যেখান থেকে নিজেদের কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা যাবে। তার মনে পড়ে বেশ কিছুদিন আগে দেখা, আলামুত নামে একটা পার্বত্য দূর্গের কথা।

তৎকালীন পারস্যের রুদবার নামে পার্বত্য এলাকায়, পর্বতশ্রেণীর মাঝে ৫০ কিলোমিটার লম্বা ও ৫ কিলোমিটার চওড়া একটা উপত্যকার মাথায় অবস্থিত আলামুত দূর্গ, প্রাকৃতিক সুরক্ষায় সুরক্ষিত। জানা যায়, প্রায় বিনা রক্তপাতে দখল করেছিলো আলামুত। প্রথমে ঐ এলাকায় দাইই এবং রফিকদের পাঠানো হয়, যারা আলামুত উপত্যকার সাধারণ মানুষের মন জয় করে তাদের ইসমাইলি আদর্শে দীক্ষিত করে। এরপরে ১০৯০ এর দিকে সাধারণের সাথে ভিড়িয়ে দেয়া হয় লাসিকদের এবং লাসিকরা দূর্গে অনুপ্রবেশ করেই দূর্গাধিপতি এবং তার কাছের লোকজনকে জিম্মি করে ফেলে। ফলাফল, প্রায় বিনা রক্তপাতে দূর্গ দখল। এরপরে আরো ৩৫ বছর জীবিত ছিলো হাসান-ই-সাব্বাহ, কিন্তু একদিনের জন্যেও আলামুত ছেড়ে বের হয় নি। ব্যস্ত ছিলো দর্শন, স্থাপত্য, জ্যোতির্বিদ্যা, এলকেমি, চিকিৎসা শাস্ত্র ও গণিত নিয়ে গবেষনায় এবং অবশ্যই হাসাসিনদের প্রশিক্ষন ও ইসমাইলি দর্শন প্রচার, প্রসার এবং নীতি নির্ধারণে।

হাসাসিনিদের প্রশিক্ষন শুরু হতো ১০/১২ বছর বয়স থেকে। ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক আচরণ এবং পাশাপাশি অস্ত্রকৌশল বিশেষ করে নাইফ ফাইটিং, ছদ্মবেশ, আত্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সমরকৌশলের শিক্ষা দেয়া হতো। ৭/৮ বছরের মধ্যেই ওরা হয়ে উঠতো লিভিং উইপন, ফিদায়ান (আত্ম নিবেদিত যোদ্ধা)। যে কোনো মূল্যে সিভিলিয়ানদের উপরে কোন আঘাত নয়, এই ছিলো ওদের কৌশল। যে কোনো নতুন এলাকায় গেলে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে একদম মিশে যেত একজন হাসাসিন। টার্গেটের সাইকোলজি স্টাডিও ওদের কৌশলের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। শোনা যায় একটা এসাসিনেশন প্রচেষ্টার শারীরিক ও মানসিক শক্তিবৃদ্ধি ও স্থিরতার জন্য শেষ ধাপের আগ মুহুর্তে ওরা হাশিশ (গাঁজা) ব্যবহার করতো। যদিও এটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা, নিশ্চিত নয়। খুন করার জন্য তারা সচরাচর বিষ মাখানো ছুরিই ব্যবহার করতো এবং খুনগুলো করা হতো সর্বসম্মুখে, যেন লোকে বোঝে এটা হাসাসিনদের কাজ। আতঙ্ক সৃষ্টি করা হাসাসিনদের রাজনৈতিক কৌশল। পারস্য এবং সিরিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের আলাদা আলাদা এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠে ইসমাইলি রাষ্ট্র এবং পুরোটাই হাসাই-ই-সাব্বাহ'র জীবনকালে।

হাসাসিন রাষ্ট্র গঠনের প্রধান পদক্ষেপ ছিলো নিজাম-উল-মুলক'কে হত্যা এবং হত্যাকান্ড ঘটানো হয় প্রকাশ্য দরবারে। নিজাম-উল-মুলকই প্রথম হাই প্রোফাইল খুন। সেলজুকেরা প্রথম থেকেই হাসাসিনদের উচ্ছেদের প্রচেষ্টা চালায়, ফলশ্রুতিতে ওদের অন্তত ৫ জন সুলতান খুন হয় এদের হাতে। মিশরের ফাতিমিয় খিলাফতকে উচ্ছেদ করার পরে সুন্নি খলিফারা ইসমাইলিদের উপরে অত্যাচার শুরু করে, সে সময় অন্তত দুই জন খলিফা খুন হয় হাসাসিনদের হাতে। গ্রান্ড মাস্টার রাশিদ আদ-দিন সিনানের সময়ে হাসাসিন এবং ইসমাইলিদের কমন শত্রু হয়ে দাঁড়ায় ক্রুসেডাররা। শোনা যায়, কিং রিচার্ডের সাথেও একটা সময় সন্ধি চুক্তি হয় রাশিদের। রাশিদের মধ্যস্ততায়ই সালাউদ্দিন ও রিচার্ড সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে। 

সাইকোলজিকাল ওয়ারফেয়ারও হাসাসিনদের পছন্দের কৌশল ছিলো, খুন করার ঝামেলায় না গিয়ে ভয় দেখিয়ে সাবমিশনে বাধ্য করা। সেলজুক সুলতান মোহাম্মদ তাপারকে খুন করার পরে ওর ছেলে আহমেদ সাঞ্জার যখন সুলতান। সে হাসাসিন দূতকে তার দরবার থেকে চাবুক মেরে বের করে দেয়। পরে সাঞ্জারকে সালাউদ্দিন আইয়ুবির মতো ভয় দেখানো হয়। সাঞ্জার ভয় পেয়ে শুধু হাসাসিন এলাকার কর আদায় বন্ধ করেনি, ঐ এলাকার সমস্ত কর আদায়ের অধিকারও হাসাসিনদের দিয়ে দেয়। পারস্য থেকে তুরস্ক, সিরিয়া থেকে মিশর, যখনই যেখানে শিয়াদের উপরে আঘাত এসেছে, হাসাসিনরা সেখানেই অপারেট করে গেছে প্রায় দুইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে।

১২৫০ এর দিকে হাসাসিনরা একটা মারাত্মক সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে বসে। ভয়ংকর মোঙ্গল শাসক মোংকে খানকে খুন করে তারা। তার ভাই হালাকু খান ছিলো আরো বেশি ভয়ংকর। ক্ষমতায় বসেই প্রধান সেনাপতি কিতুবাকে নিযুক্ত করে হাসাসিনদের সমূলে বিনাশ করতে। ১২৫৩ থেকে কিতুবা হাসাসিনদের ৯ টা দূর্গে উপর্যুপরি হামলা চালায়। হাসাসিনরা তাদের অঞ্চলে নিরাপত্তা খুবই শক্তিশালী করে রাখে। হাসাসিনরা তাই সংখ্যায় কম হলেও কেউ তাদের দুর্গ দখলে নিতে পারেনি। মোঙ্গল সেনানায়ক কিতুবা লক্ষাধিক সৈন্য নিয়েও সুবিধা করতে পারলো না। উপরন্তু বহু সৈন্য হারাতে হয়েছে। 

অবশেষে হালাকু খান স্বয়ং তার ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে আসে। সে নিজেই হাসাসিনদের দুর্গ আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে আসে ১২৫৬ সালে। মরণপণ যুদ্ধ করার পর অবশেষে ১২৫৬ সালের ডিসেম্বরে আলামুত দূর্গ অবরোধ করে মোঙ্গলরা। হাসাসিনরা দুর্গের ভেতরে চলে যায়। প্রায় ৩/৪ মাসের অবরোধে থাকার পরে হাসাসিনরা গোপন পথে আলামুত ছেড়ে চলে যায়। এই সময় হাসাসিনদের নেতা ছিলো রুকন উদ্দিন। হালাকু খান দুর্গ দখল করে। এই প্রথম ১৬৬ বছর পর আলমুত দুর্গ হাসাসিনদের হাতছাড়া হয়ে গেল। তবে ১৯ বছর পর রুকন উদ্দিনের ছেলে শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে ১২৭৫ সালে ফের আলামুত দখল করে হাসাসিনরা। তবে দুর্গ উদ্ধার হলেও তারা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা কিংবা কর আদায় করার মতো পরিস্থিতিতে যেতে পারে নি। তবে তাদের মূল কাজ ছিল শিয়াদের শত্রুদের তটস্থ রাখা। সেই কাজ তারা আরো প্রায় একশ বছর চালিয়ে গেছে। এসময় তারা ভাড়াটে খুনি হিসেবে নিজেদের ব্যবহার করতো।   

মামলুকরা হাসাসিনদের নিজেদের কাজে লাগাতো। শামসুদ্দিনের পর হাসাসিনরা আর কোনো ভালো নেতা না পাওয়ায় ধীরে ধীরে তাদের শক্তি খর্ব হতে থাকে। তাদের অনেকেই অপেক্ষা করতে থাকে, কবে তাদের মধ্য থেকে একজন গ্রান্ড মাস্টার উঠে আসবে এবং ফের তারা পূর্বের গৌরবে ফিরবে। এভাবেই মোটামুটি ৩০০ বছরের মধ্যেই সে যুগের সব থেকে দুধর্ষ ও আতঙ্ক জাগানিয়া হাসাসিন গোষ্ঠী ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে।

১২ মে, ২০২০

আব্দুল লতিফ নেজামী এবং নেজামে ইসলামী পার্টি



আমরা ওনার একটা পরিচয় ভুলেই গেছি। আব্দুল লতিফ নেজামী গতকাল ইন্তেকাল করেছেন। ওনার যে পরিচয়টা উচ্চারিত হচ্ছে না তা হলো তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি। নেজামে ইসলাম পার্টির রয়েছে দীর্ঘ ও গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস। এদেশের ইসলামপন্থীদের একটি বড় ছাতা ছিলো নেজামে ইসলাম। 

বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের পর বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের এক পর্যায়ে উপমহাদেশের উলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখদের সংগঠন হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২০সালে । কিন্তু উলামায়ে হিন্দ অবিভক্ত ভারতে বিশ্বাসী ছিল এবং কংগ্রেসকে সমর্থন দেয়। তাই মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর পরামর্শে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্যে পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যে ১৯৪৫ সালে কলকাতা মোহাম্মদ আলী পার্কে অনুষ্ঠিত উপমহাদেশের উলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখদের এক সমাবেশে আল্লামা শিব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠিত হয়। এই জমিয়ত উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্যে পৃথক আবাসভুমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মুসলিম লীগকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করে।

১৯৪৫ সালের ২৮ ও ২৯ অক্টোবর কলকাতার মুহাম্মদ আলী পার্কে মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সমর্থনে একটি উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম’ নামে একটি নতুন সংগঠন। এই নতুন জমিয়ত পাকিস্তান প্রশ্নে মুসলিম লীগের পক্ষ নেয়। ব্রিটিশ শাসনামলে পাকিস্তান গঠনের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। পাকিস্তানে যোগ দেয়ার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত সিলেট গণভোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তারা। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের এই ভূমিকার জন্য ভোটের ফলে আসাম থেকে সিলেট বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যোগ দেয়।

দেশভাগের পর মুসলীম লীগ নেতৃবৃন্দের ইসলামী রাষ্ট্র করার ওয়াদা ভঙ্গের ফলে নবগঠিত পাকিস্তানে ‘নেজামে ইসলাম’ তথা ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া সুদূর পরাহত দেখে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতৃবৃন্দ নিরাশ হয়ে পড়েন। এক প্রকার প্রতারিত হয়েই ১৯৫২ সালে নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগের সঙ্গ ত্যাগ করে ‘নেজামে ইসলাম পাটি’ নামে পৃথক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এসময়ে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী’র (রহ.) জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পাকিস্তানের অনুসারী আলেমরাও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে সম্পৃক্ত হন।

নেজামে ইসলামের প্রচেষ্টায় ‘১৯৫২ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার হযরত নগরে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনেই মাওলানা আতহার আলী (রহ.) কে সভাপতি, চরমোনাই পীর মাওলানা সৈয়দ ইসহাক (রহ.) কে সহ সভাপতি, মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক এবং মাওলানা আশরাফ আলী ধর্মন্ডলীকে সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত করে ‘নেজামে ইসলাম পার্টি’র কার্যক্রম শুরু হয়। যে কোন মূল্যে পাকিস্তানে নেজামে ইসলাম তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে এই পার্টির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়।

মুসলিম লীগের তুলনায় এই দলের নেতৃত্বে বিজ্ঞ ও শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম থাকায় অল্প দিনেই নেজামে ইসলাম পার্টি একটি শক্তিশালী বৃহৎ দলে পরিণত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে নেজামে ইসলামের রাজনীতির প্রভাব বেশি বিস্তার লাভ করে। মুসলিম লীগের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগের, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক কৃষক শ্রমিক পার্টি গড়ে তুলেন। এগুলোও পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এমন সময়েই ১৯৫৪ সালের জাতীয় নির্বাচন চলে আসে। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে তখনই প্রথম রাজনৈতিক জোটের জন্ম হয় যুক্তফ্রন্ট নামে।

১৯৫৪ সালে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল নেজামে ইসলাম পার্টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। এই নির্বাচনে তাদের এককালের পৃষ্ঠপোষক ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে অপরাপর বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচন করা হয়। এই ফ্রন্টে নেজামে ইসলাম পার্টি সাথে ঐক্য করে ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের দলীয় প্রতিক ‘নৌকা’। যা বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পরিচয়চিহ্নে পরিণত হয়েছে। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ২১-দফা দাবি সম্বলিত একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। এর ভূমিকায় বলা হয় : ‘কুরআন ও সুন্নাহ-বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করা হবে না।’

যুক্তফ্রন্টের নমিনেশন নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। যখন যুক্তফ্রন্টের দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছিল তখন নেজামে ইসলামের সভাপতি মাওলানা আতহার আলী রহ. এর প্রস্তাব ছিল যুক্তফ্রন্ট থেকে কোন কমিউনিস্ট ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। মাওলানা আতাহার আলী রহ. ১২ জনের তালিকা দিয়ে বলেলেন এরা বর্ণচোরা কমিউনিস্ট, এদের মনোনয়ন দেয়া যাবে না। আবার এই বারোজন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। বলাই বাহুল্য নেজামে ইসলাম পার্টির অভিযোগ মিথ্যা ছিলো না। তাঁরা সকলেই গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন এবং এটা শহীদ সোহরাওয়ার্দীও খুব ভালোভাবেই জানতেন। 

সোহরাওয়ার্দী এগিয়ে এলেন উদ্ধার করতে, তিনি বললেন, আমি বিলেতে কমিউনিস্ট দেখেছি, আমি কমিউনিস্ট চিনি, কমিউনিজম বুঝি। ‘এ মুসলিম ক্যান নেভার বি এ কমিউনিস্ট, এট মোস্ট দে ক্যান বি কল্ড লালমিয়া। যাই হোক শেষ পর্যন্ত মাওলানা আতাহার আলীর তালিকা ১২ থেকে কমে মাত্র একজনে এল। তিনি হাজি দানেশকে কিছুতেই নমিনেশন দেবেন না। 
সোহরাওয়ার্দী আর আতাহার আলী নমিনেশন বোর্ডে বসেছেন। হাজী দানেশ ঢুকবেন। আগেই সোহরাওয়ার্দী তার শিষ্য শেখ মুজিবকে বলে দিয়েছেন হাজী দানেশকে যেন ভালো করে ব্রিফ করে দেয়া হয়। হাজী দানেশ ঢুকলেন রুমে, টুপি দাঁড়ি নিয়ে, ঢুকেই লম্বা করে বলে উঠলেন, “আচ্ছালামু আলাইকুম”। 

সোহরাওয়ার্দি বলে উঠলেন, দেখেন মাওলানা সাহেব, কমিউনিস্টদের মুখে দাড়ি আর মাথায় টুপি থাকে? ওরা কখনো, “আচ্ছালামু আলাইকুম” বলে? ওরা বলে “লাল সালাম”। মাওলানা আতাহার সাহেব মাথা নাড়েন, তিনি বলেন, না স্যার, আপনি জানেন না, সে পাক্কা কমিউনিস্ট আমার কাছে খবর আছে। সোহরাওয়ার্দী বলেন, আরে দেখেন তাঁর দাঁড়ি আছে টুপি আছে। মাওলানা সাহেব ছাড়বেন কেন? তিনিও বলেন, মার্ক্স-লেনিনেরও টুপি দাঁড়ি দুটাই ছিল স্যার, আপনি তো জানেন। এবার বিরস বদনে সোহরাওয়ার্দী প্রশ্ন করলেন। হাজী সাহেব, নমিনেশন দিলে পাশ করবেন তো? হাজী সাহেব ঘর কাপিয়ে উত্তর দিলেন, ইনশাল্লাহ স্যার পাশ করবো। এইবার সোহরাওয়ার্দী লাফিয়ে উঠলেন, এই দেখেন মাওলানা সাহেব, “একজন কমিউনিস্ট কখনো আল্লাহ বলতে পারে না। কমিউনিস্ট আল্লাহ বললে সে কমিউনিস্ট থাকে না। যান, হাজী সাহেব আপনাকে নমিনেশন দেয়া হলো”

প্রার্থী চুড়ান্ত করে শুরু হলে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের প্রচারণা। জনসভা গুলোতে নেমে এসেছিল সর্বস্তরের জনগণের ঢল। মুসলিম লীগের বিপর্যয় ঘটিয়ে যুক্তফ্রন্ট অল পাকিস্তানে সরকার গঠন করলো। যুক্তফ্রন্ট সরকারে নেজামে ইসলাম পার্টি অংশ নেয় এবং মন্ত্রীত্ব লাভের সুবাদে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারনী ভূমিকা পালন করে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে দলটির ৩৬ জন নেতা নির্বাচিত হন।
জাতীয় পরিষদে সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন দলীয় সভাপতি মাওলানা আতহার আলী (রহ.)। এডভোকেট মৌলভী ফরিদ ছিলেন কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী। প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকার ছিলেন আবদুল ওহাব খান। এছাড়া আইন, ভূমি ও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ও ছিল নেজামে ইসলাম পার্টির মন্ত্রীদের দায়িত্বে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মুহাম্মদ আলী পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দিলে তাকে দলের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়। যে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েমের স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়ে লড়াই করেছিল ওলামা ও তৌহিদী জনতা সে মলিন স্বপ্নে নেজামে ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে সরকারে থাকার কারণে প্রাণ লাভ করে।

আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের জন্যে গঠিত ৯-নেতার বিবৃতি থেকে শুরু করে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ), পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম),) ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটি (ড্যাক), কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি (কপ) ও পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)গঠনে নেজামে ইসলাম পার্টি প্রধান ভূমিকা পালন করে।

১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় নেজামে ইসলাম অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। যুদ্ধ বন্ধে গঠিত হওয়া সিভিল কমিটি 'শান্তি কমিটিতে' নেজামে ইসলামের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। কেন্দ্রীয় কমিটিসহ প্রতিটি জেলা কমিটিতে তাদের সদস্য সংখ্যা ছিলো মুসলিম লীগের কাছাকাছি। মুশরিক ও তাদের দালালদের কাছে পরাজিত হয় এদেশের ইসলামপন্থীরা। 

এরপর শেখ মুজিবের শাসনামলে নেজামী ইসলাম অন্যান্য ইসলামী দলের মতো নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এই নিষিদ্ধ হওয়াটাই কাল হয় নেজামে ইসলামের জন্য। জামায়াতে ইসলাম নেজামে ইসলামের মতো উদার সংগঠন ছিলো না। এখানে কোন বড় আলেম যোগ দিলে ছোট পরিসর থেকে ধীরে ধীরে নেতা হতে হতো। কিন্তু নেজামে ইসলামে নতুন যোগ দেওয়া আলেমকে বড় দায়িত্ব দেওয়া হতো। এই প্রসঙ্গে শহীদ আমীরে জামায়াত মাওলানা নিজামী বলেন আমাদের কাছে অনেকে এই অভিযোগ করতো, বলতো আমরা এই সমস্যার কারণে জামায়াতে যোগ দিতে পারি না। 

মাওলানা নিজামী বলেন, এটাই জামায়াতের শক্তি। এই ধীরে ধীরে লোক প্রস্তুত করার নীতি স্বয়ং রাসূলের। তাই এখানের লোকেরা সহজে মচকাবে না। কারণ একটি দীর্ঘ পক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এখানের নেতা তৈরি হয়। আর তাছাড়া এটা বড় আলেমদের অহংবোধকেও নষ্ট করে আল্লাহর জন্য কাজ করার প্রতি উৎসাহ যোগায়। জামায়াত এই সুবিধা পেয়েছে স্বৈরাচার মুজিবের শাসনামলে। ঐ সময় নেজামী ইসলামী তার সাংগঠনিক শক্তি হারিয়ে ফেললেও জামায়াত অপরিবর্তিত থাকে। ফলশ্রুতিতে জামায়াত এখন ইসলামপন্থীদের সবচেয়ে বড় মিলনমেলায় পরিণত হয়। 

৭৫এ মুশরিকের দাস শেখ মুজিবের পতন হলে ইসলামী রাজনীতির দ্বার উন্মুক্ত হয় জিয়ার হাত ধরে। এরপর জামায়াতের তত্ত্বাবধানে নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা মাওলানা ছিদ্দিক আহমদের নেতৃত্বে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) গঠিত হয়, ইত্তেহাদুল উম্মাহ এবং এডভোকেট সৈয়দ মঞ্জুরুল আহসানের সহযোগিতায় ন্যাশনাল ফ্রণ্ট,ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। এ সবগুলোতে নেজামে ইসলামের অংশগ্রহণ ছিলো। 

১৯৯১ সালে তৎকালীন ছয়টি ইসলামি দল নিয়ে গঠন করা হয় ইসলামী ঐক্যজোট। দলগুলো হচ্ছে- খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলামী পার্টি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন (বর্তমান ইসলামী আন্দোলন), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও ফরায়েজী আন্দোলন। জোট গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, চরমোনাইর পীর মাওলানা ফজলুল করিম, মাওলানা আবদুল করিম শায়খে কৌড়িয়া, মাওলানা আশরাফ আলী ধর্মান্ডুলি, মাওলানা মুহিউদ্দিন খান ও মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ। আব্দুল লতিফ নেজামী এই ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ছিলেন। এটাই এখন ওনার বড় পরিচয় হিসেবে প্রকাশ পায়। যদিও সবগুলো দল এখন ঐক্যজোটে নেই। 

নেজামে ইসলাম পূর্বের শক্তি হারিয়ে ফেললেও এরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত হননি। তাদের সবচেয়ে বড় ও একক সাফল্য ছিলো মুশরিকদের সংগঠন কংগ্রেসের পক্ষে থাকা কওমী আলেমদের প্রচণ্ড বিরোধীতা সত্ত্বেও সিলেটকে আসাম থেকে কেটে পূর্ব-পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত করা। এই বিশাল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার হলেন আব্দুল লতিফ নেজামী। দল হিসেবে শক্তিশালী না হওয়ায় আওয়ামীলীগ তাঁকে হেনস্তা করেনি, ফাঁসী দেয়নি। তবে প্রচণ্ড চাপে রেখেছে। বৃদ্ধ বয়সে জেলে নিয়েছে কয়েকবার এবং আওয়ামী বিরোধী জোট থেকে লতিফ নেজামীকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। 

আল্লাহ তায়ালা এই মরহুমকে জান্নাত দান করুন।

৯ ফেব, ২০২০

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আদ্যোপান্ত



সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পর খালেদা জিয়া হলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সরকারপ্রধান, যার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি মামলার রায় ও সাজা হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে এরশাদের মতো জেলও খাটতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। তবে ব্যবধান হলো খালেদা জিয়ার মামলাটি বানোয়াট। এখানে যা ঘটনা এর সাথে দুর্নীতির সম্পর্ক নেই। মূল ঘটনা জানলে আপনি অবাকই হবেন।  

মামলা : 
প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২.৫৫ লাখ মার্কিন ডলার আসে যা বাংলাদেশি টাকায় তৎকালীন ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অর্থ দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে অস্তিত্ববিহীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন। অথচ কোনো নীতিমালা তিনি তৈরি করেননি, করেননি কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থাও। অথচ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা অস্তিত্ববিহীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে পাঠান। পরে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন যার জন্য তিনি দায়ী। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থেকে নিজের পদমর্যাদা বলে সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে দণ্ডবিধির ৪০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ করেছেন।

আসামি যারা :
দুর্নীতি দমন কমিশনের  তখনকার উপ সহকারী পরিচালক  হারুন-অর রশিদ (বর্তমানে উপ-পরিচালক) এ মামলার এজাহারে খালেদা জিয়াসহ মোট সাতজনকে আসামি করেন। বাকি ছয়জন হলেন- খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমান, জিয়াউর রহমানের বোনের ছেলে মমিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক (ইকোনো কামাল), সে সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্বে থাকা (পরে মুখ্য সচিব হন) কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ ও সৈয়দ আহমেদ ওরফে সায়ীদ আহমেদ।

দুদক কর্মকর্তা হারুন-অর রশিদ ২০০৯ সালের  ৫ অগাস্ট আদালতে যে অভিযোগপত্র দেন, সেখান থেকে গিয়াস উদ্দিন ও সায়ীদ আহমেদের নাম বাদ দেওয়া হয়। তাদের অব্যাহতির কারণ হিসেবে বলা হয়, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ অনেক আগে থেকে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। অভিযোগে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমান পাওয়া যায়নি। আর সায়ীদ আহমেদ নামে কারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।  সাবেক সাংসদ কামাল জালিয়াতি করে ট্রাস্টের কাজে ওই দুই জনের নাম ব্যবহার করেছেন।

অভিযোগে যা রয়েছে :
এজাহারে বলা হয়, খালেদা জিয়া তার প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম মেয়াদে ১৯৯১-১৯৯৬ সময়কালে এতিম তহবিল নামে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় একটি হিসাব খোলেন। একটি বিদেশি সংস্থা ১৯৯১ সালের ৯ জুন ওই হিসাবে ইউনাইটেড সৌদি কর্মাশিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে অনুদান হিসেবে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা দেয়। ওই টাকা দীর্ঘ দুই বছর কোনো এতিমখানায় না দিয়ে জমা রাখা হয়। এরপর জিয়া পরিবারের তিন সদস্য তারেক রহমান, তার ভাই আরাফাত রহমান এবং তাদের ফুপাতো ভাই মমিনুরকে দিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করে ওই টাকা তাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওই ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা মানা হয়নি। এছাড়া ট্রাস্টের ঠিকানা হিসেবে খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের ৬ নম্বর মইনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। পরে ওই টাকা দুইভাগে ভাগ করে ট্রাস্টের বগুড়া ও বাগেরহাট শাখার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫’শ টাকা ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে বরাদ্দ দেওয়া হয় বগুড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে। ওই অর্থ থেকে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ট্রাস্টের নামে বগুড়ার দাঁড়াইল মৌজায় ২.৭৯ একর জমি কেনা হয়।

কিন্তু অবশিষ্ট টাকা এতিমখানায় ব্যয় না করে ব্যাংকে জমা রাখা হয়। ২০০৬ সনের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত তা সুদে আসলে বেড়ে ৩ কেটি, ৩৭ লাখ ৭ শ ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা হয়। এজাহারে বলা হয়, ২০০৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা তার ছেলে তারেক রহমান ও মমিনুর রহমানকে দিয়ে তিন কিস্তিতে ছয়টি চেকের মাধ্যমে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করেন। এরপর ওই টাকা কাজী সালিমুল হক কামাল ও অন্যদের মাধ্যমে সরিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়। মামলায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ‘নাম সর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। 

কার দায় কতটুকু?
খালেদা জিয়া: অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের নামে পাওয়া টাকা দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে, কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে নিজের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে প্রধানমন্ত্রীর পরিচালিত তহবিলের টাকা ওই ট্রাস্টে দেন। পরে বিভিন্ন উপায়ে ওই টাকা আত্মসাত করা যায়, যার জন্য খালেদা জিয়াই দায়ী।

তারেক রহমান: প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহায়তায় তার ছেলে তারেক তাদের বাসস্থানের ঠিকনা ব্যবহার করে ‘অস্তিত্বহীন’ জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট সৃষ্টি করেন। ওই ট্রাস্টের নামে সোনালী ব্যাংকের গুলশান নর্থ সার্কেল শাখায় হিসাব খুলে সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা জমা করেন। পরে ট্রাস্ট ডিডের শর্ত ভেঙে ওই টাকা তিনি ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন সালিমুল হক কামালকে দেন। পরে সেখান থেকে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা বিভিন্ন  প্রক্রিয়ায় আত্মসাত করা হয়।

মমিনুর রহমান: তারেকের ফুপাতো ভাই মমিনুর রহমানও একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাতে সহযোগিতা করে অপরাধ করেছেন।

কাজী সালিমুল হক কামাল: সাবেক সাংসদ সালিমুল হক কামালের সঙ্গে ওই ট্রাস্টের কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও তিনি তারেক রহমানের কাছ থেকে পাঁচটি চেক নিয়ে এফডিআর করেন এবং পরে তা ভাঙান। সে সময় প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শাখা ব্যবস্থাপকদের দিয়ে সৈয়দ আহমেদ ও গিয়াস উদ্দিন আহমেদ নামের দুই ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে এফডিআর ভাঙিয়ে সেই টাকা শরফুদ্দিন আহমেদের অ্যাকাউন্টে জমার ব্যবস্থা করেন।

কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তখনকার সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল গঠন ও পরিচালনার জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অনুমোদন নিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে সেখানে এতিম তহবিলের টাকা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মূল নথি সংরক্ষণ না করে তা তিনি গায়েব করে দেন। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি ওই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন।

শরফুদ্দিন আহমেদ: ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন এই আত্মসাতে সহযোগিতা করে ব্যংকে তার নিজের নামের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

মূল ঘটনা : 
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা খরচই হয়নি। সব টাকা ব্যাংকে আছে। অতএব এখানে আত্মসাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের আশুলিয়ার জমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য কথাবার্তা হয়। সে বছরই একটি চুক্তির আওতায় তিনি সোয়া ২ কোটি টাকা অগ্রিম নেন। ২০০৭ সালের ৩১ মের মধ্যে জমি বিক্রির দলিল সম্পাদনের তারিখ থাকলেও তা সেনা সরকারের হস্তক্ষেপে হয়নি। শরফুদ্দিন আহমেদ আদালতকে এ তথ্য দিয়ে আরও বলেন, ‘২০১২ সালের জানুয়ারিতে একটি টাকার মোকদ্দমা মামলায় আমি নোটিশপ্রাপ্ত হই যে ট্রাস্টকে ওই টাকা ফেরত দিতে হবে। আদালত ওই সোয়া ২ কোটি টাকা ২০১৩ সালে টাকা ফেরত দিতে ডিক্রি জারি করেন। এরপর আমি প্রাইম ব্যাংক নিউ ইস্কাটন ও গুলশান শাখা থেকে ১৩টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ট্রাস্টকে হস্তান্তর করি।’ এই হচ্ছে মূল ঘটনা। এখানে দুর্নীতির কোনো ঘটনাই ঘটেনি। 

আরেকটি অভিযোগ ছিলো প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের টাকা কেন জিয়া অরফানেজ নামে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ হবে। এই প্রসঙ্গে ২০১৫ সালে কুয়েত দূতাবাস পত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে তারা। ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীকে ঢাকার কুয়েত দূতাবাসের দেওয়া এক পত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘উক্ত অনুদান '১২ লাখ ৫৫ হাজার ডলার' (৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা) জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দেওয়া হয়েছিল এবং তা কোনো ব্যক্তি কিংবা সরকার বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি।’ অতএব এই টাকার বৈধ মালিক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট। এটা বাংলাদেশ সরকারের টাকা নয়। কুয়েতের আমীর এই টাকা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে পাঠাননি।  

এখানে একটা কথা বলা যেতে পারে শুধু এতোদিন পর্যন্ত এই টাকা ব্যবহার করা হয়নি কেন? কিন্তু এতিমের টাকা মেরে দিয়েছে বলে যে কথা চালু করেছে তা নিতান্তই মিথ্যা ও বানোয়াট। টাকা এখনো ব্যাংকেই আছে। শুধু শরফুদ্দিন আহমেদ থেকে ট্রাস্টের নামে জমি ক্রয় করার কথা ছিলো। পরবর্তীতে ক্রয় করতে পারেনি তত্ববধায়ক সরকারের সময়ে। এবং তারাই এই মামলা করে বিএনপি'র শীর্ষ নেতৃত্বকে ফাঁসানোর জন্য।  

মঈন ফখরুদ্দিনের আমলে ভারতের নির্দেশে বিএনপিকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে খালেদা ও তারেককে দুর্নীতিবাজ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তারা এই মামলা সাজায়। আর এই মামলাকে পুঁজি করে স্বৈরাচারী হাসিনা খালেদা জিয়াকে ফাঁসিয়ে দেয়।  

১৫ মে, ২০১৯

নারী নির্যাতন রোধে করণীয়



আমাকে কারাগারে প্রথম নিয়ে যে ভবনে রাখা হয় তাকে 'আমদানি' বলা হয়। আমদানি ভবন থাকলেও সেখানে রপ্তানি ভবন ছিল না। যাদের বের করা হবে তাদেরও আমদানিতেই রাখা হয়। আমদানিতে ভদ্র চেহারার বা দেখতে ছাত্রের মত কাউকে দেখলেই অন্যরা জিজ্ঞাসা করতেন কি মামলা? শিবির মামলা নাকি? আর সকল মাদক মামলার নাম ছিল 'বাবা'।

জেলখানায় আলাদা আলাদা পরিভাষা ছিল প্রায় সবগুলো বিষয়ের। যেমন রান্নাঘরকে বলা হত 'চৌকা'। মামলাগুলোর নামও ছিল আলাদা আলাদা। যেমন আমাদের সংগঠনের যে কেউ ভাংচুর, বিস্ফোরক, অস্ত্র যে মামলায় এরেস্ট হোক না কেন তার মামলার নাম ছিল শিবির মামলা।

যাই হোক, সেখানে 'খাট ভাঙ্গা কেইস' নামে একটা কেইস আছে। প্রথমে বুঝতে পারতাম না 'খাট ভাঙ্গা কেইস' এটা কী জিনিস? পরে জানতে পারলাম নারী নির্যাতন কেইস। বর্তমানে এটা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। নারী নির্যাতন বেড়েই চলেছে। মহামারী আকার লাভ করেছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে মানুষ এক লাইনে সমাধান টানতে চাইছেন। ব্যাপারটা মোটেই এরকম কিছু নয়। এটা এক লাইনে সমাধানে আসার মত কিছু নয়। এটা একটা টোটাল সমাজব্যবস্থার ব্যাপার। সামাজিক মূল্যবোধের ব্যাপার।

কারাগারে আমি বিভিন্ন আসামীদের সাথে আলোচনা করতাম। তাদের সাইকোলজি বুঝার চেষ্টা করতাম। বেশ কয়েকজন ধর্ষকের সাথে আমার কথা হয়েছে। একজন বলেছেন স্রেফ প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে ধর্ষণ করেছে। মেয়েটির ভাই তার বন্ধু ছিল। সেই বন্ধু তার লাখখানেক টাকা মেরে দিয়েছে। টাকা দিতে না পেরে উল্টো বোনকে উত্যক্ত করে বলে অভিযোগ দিয়ে সামাজিকভাবে অপমান করেছে। বিনিময়ে সে প্রতিশোধ নিয়েছে।

আরেকজনকে পেয়েছি সে মধ্যবয়স্ক। একটি বাড়ির দারোয়ান ছিলেন। তার কথা হলো ধনীরা খারাপ। গবীরদের সম্পত্তি লুট করা ছাড়া কেউ ধনী হতে পারে না। তাই সুযোগ পেলেই সে ধনীদের ক্ষতি করবে। তার এই চিন্তার প্রতিফলন আমি কারাগারেই দেখেছি। সে পয়সাওয়ালা বন্দিদের বিরুদ্ধে লেগেই থাকতো। প্রায়ই প্রশাসনের কাছে তাদের নামে অভিযোগ করতো কারাবিধি লঙ্ঘনের।

একজনকে পেয়েছি টেম্পো চালক। সে বলেছে প্রতিদিন সিনেমা না দেখলে আমার ঘুম আসে না। আর প্রতিটা সিনেমা শেষেই তার এমন আচরণ করতে ইচ্ছে হয়। সে আরো বলেছে প্রতিদিন রাস্তাঘাটে কত রঙঢং দেখি। আমারও কি এমন করতে ইচ্ছে করে না? সে সেদিন আমার কাছে প্রশ্ন করেছে।

আরেক গ্রুপ পেয়েছি। তারা মাত্র অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। তিনজন। বান্ধবীর সাথে আড্ডা দিতে দিতে নির্যাতন করেছে। গ্রুপ স্টাডির নাম করে একজনের বাসায় বান্ধবীদেরও ডাকে। তাদের দাবী বিষয়টা মিউচুয়াল ছিল। তাদের কথাবার্তায় বুঝলাম তারা ইংলিশ, হিন্দি ও নীল ছবি আসক্ত।

আরেকটা ছিল পারিবারিক পর্দা না থাকার কারণে। বউয়ের ছোট বোনকে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিল তার চাকুরীর ইন্টারভিউ এর জন্য। ব্যাস... শয়তান জয়ী হয়েছে।

আমি কয়েকটা কেইস স্টাডি উল্লেখ করেছি। এখানে নানান বিষয় উঠে এসেছে। পাঠক মাত্রই তা অনুধাবন করতে পারবেন। বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।

আবার আসুন এবার সরকারের ভূমিকা নিয়ে কিছু কথা বলি। যেমন ছাত্রশিবির আটাশ বছর চট্টগ্রাম কলেজে প্রাভাবশালী ছিল। সেখানে নারী নির্যাতন তো অনেক দূরের বিষয় তার কাছাকাছি বিষয়ও হয়নি। কিন্তু ছাত্রশিবিরের প্রভাব নষ্ট হওয়ার দুই বছরের মধ্যেই অভিযোগ আসা শুরু হয়েছে।

এর কারণ কী?

এর কারণ হলো যারা ক্ষমতাসীন তারাই বিকৃত মানসিকতার। সুতরাং তাদের এই গর্হিত কাজের শাস্তির বিধান কার্যকর হবে না। আগে যে কোন কারণে (সিনেমা, নীল ছবি, নারীদের রঙ-ঢং, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত) বিকৃত হয়ে যাওয়া পুরুষরা এই কাজে সাহস পেতো না কারণ তারা জানতো এর শক্ত বিচার হবে।

আর এখন চট্টগ্রাম কলেজের বিকৃতরা জানে ক্ষমতাসীনদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারলে তার অপরাধের বিচার হবে না। তাহলে সুষ্ঠু ও ন্যায়পরায়ন সমাজব্যবস্থা না থাকা ধর্ষণের সবচেয়ে বড় কারণ।
আমি মোটাদাগে ধর্ষণের কয়েকটি কারণ উল্লেখ করতে চাই 
১- সমাজের সীমাহীন বৈষম্য ও অপরাধের বিস্তার 
২- উপযুক্ত ও নৈতিক শিক্ষার অভাব
৩- অপসংস্কৃতির প্রভাব
৪- ব্যাক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে পর্দার বাস্তবায়ন না থাকা
৫- বিয়ে কঠিন হওয়া এবং জেনা সহজ হওয়া
৬- সর্বোপরি একটি সুষ্ঠু ও ন্যায়পরায়ণ শাসনব্যবস্থা না থাকা।

অশালীন পোষাক কি সমস্যা?

জ্বি অশালীন পোষাক সমস্যা। তবে পোষাক একমাত্র সমস্যা না। অনেকগুলো সমস্যার মধ্যে একটি। আমিও পুরুষ। আমি জানি অশালীন পোষাক আমার মধ্যে সুড়সুড়ি তৈরী করে। উদ্বুদ্ধ করে অন্যায় কাজের। যেখানে ছোট শিশু ধর্ষণের শিকার হয় সেখানে হয়তো পোষাক ভূমিকা রাখে না, আবার রাখে।

যেমন কেউ সামাজিকভাবে পর্দা প্রতিষ্ঠিত না থাকার কারণে বিকৃত হয়ে গেছে। এমন ঘটনার খবর পাওয়া যায়, যাকে দেখে সে উত্তেজিত হয়েছে তা তার নাগালের বাইরে তখন নাগালের মধ্যে থাকা শিশু অথবা অন্য কেউ তার জঘন্য আচরণের শিকার হয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিকৃতদের মানসিকতা নষ্ট হয় সিনেমার নায়িকাদের দেখে। শুধু দেশী নয়, বিদেশী নায়িকারাও এর মধ্যে আছেন। কিন্তু ধর্ষকরা তাদের নাগালে পায় না। নাগালে যাকে পায় তাকেই নির্যাতন করে।

আমাদের একটা ব্যাপার হলো আমরা ইফেক্ট নিয়ে আলোচনা করি। কারণ অনুসন্ধান করি না। কারণ অনুসন্ধান করলে ধর্ষণ শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসা সম্ভব।

তাহলে করণীয় কী?

করনীয় দুই ধরণের এক. ব্যাক্তিগতভাবে, দুই. সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে

ব্যক্তিগতভাবে করণীয় :

১- পর্দার ব্যবস্থা করা। এই পর্দা শুধু সতর ঢাকা নয়। পর্দার বিধান মেনে নেয়া। ১৪ শ্রেণীর মাহরাম ছাড়া কারো সাথে (পুরুষ এবং নারী) দেখা না দেয়া। পরিবারে ও ব্যাক্তিগতভাবে পর্দা মেইন্টেইন করা। অবৈধ কোন কিছু না দেখা। পরিবারের সদস্যদের শালীন পোষাকে অভ্যস্ত করা। এতে সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়।

২- ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় সন্তানদের সুশিক্ষিত করা।

৩- অপসংস্কৃতি থেকে নিজে ও পরিবারকে রক্ষা করে সেখানে সুস্থ সংস্কৃতির বিস্তার করা। সন্তানরা কার সাথে মিশছে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে এগুলো খেয়াল করা। অসৎ সঙ্গ থেকে সন্তানকে রক্ষা করা। শুধু পড়ালেখা নয় অন্য কোন এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজে সন্তানদের আগ্রহী করা ও ব্যস্ত রাখা।

৪- ইন্টারনেট কানেকশনে প্যারেন্টিং সফটওয়্যার ইউজ করা।

রাষ্ট্রীয়ভাবে করণীয় :

আপনি ব্যাক্তিগতভাবে যত পদক্ষেপই নেন না কেন তা কেবল সামান্যই ভূমিকা রাখবে। বলা চলে আপনি কিছুটা হিফাযত হবেন। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান কোনভাবেই হবে না। সমস্যার সমাধান হতে পারে রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত পদক্ষেপে।

১- পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে  ধর্মীয় অনুশাসন কার্যকর করতে হবে। 
২- বস্তুবাদী শিক্ষাব্যবস্থা পরিহার করে নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। 
৩- বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। 
৪- নারী নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। 
৫- অশ্লীল ও উদ্দেশ্যহীন টিভি সিরিয়াল, নাটক, সিনেমা ইত্যাদি বন্ধ করে শিক্ষামূলক বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। 
৬- অশ্লীল বিদেশী সিনেমা ও সিরিয়াল নিষিদ্ধ করতে হবে। 
৭- পুরুষ ও নারী উভয়কে পর্দার বিধান জানা ও মানার ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তুলতে হবে। 
৮- বিয়ে সহজ করে তুলতে হবে এবং বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। 
৯- নারীদের সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। 
১০- যৌতুক বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। 
১১- ইন্টারনেট থেকে অশ্লীল কন্টেন্ট মুছে ফেলতে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। 
১৩- নারী নির্যাতন বন্ধে ধর্মীয় ইমামদের নিয়মিত নসিহত করতে হবে। 
১৪- স্কুল ও মাদ্রাসায় সহশিক্ষা বন্ধ করতে হবে। 
১৫- নারীদের জন্য আলাদা ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। 
১৬- পুরুষ ও নারী উভয়কে উগ্র ও আঁটোসাঁটো পোশাক পরিহার করে শালীন ও মার্জিত পোশাক পরিধান করতে হবে।  
১৭-  বেকার যুবক ও বখাটেদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। 
১৮- নারী নির্যাতনকারীদের সঠিক শিক্ষা, চিকিৎসা ও মোটিভেশনের মাধ্যমে সুস্থ করে তুলতে হবে। 
১৯- নারী নির্যাতন বন্ধে সরকারকে আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। 
২০- তামাক ও মাদক নির্মূলে সরকারকে আরো কঠোরভাবে আইনপ্রয়োগ করতে হবে।

এক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করতে পারলে শাস্তি দেয়ার মত লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইনশাআল্লাহ।

যদি একলাইনে সমাধান চান তবে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী সমাজ প্রতিষ্ঠা করলেই এর সমাধান সম্ভব। আসুন বিচ্ছিন্ন কথা না বলি, বিচ্ছিন্ন কাজ না করি। সবাই মিলে ইকামাতে দ্বীনের কাজ করি। আমরা আমাদের জাতিকে এই ভয়ানক ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবো ইনশাআল্লাহ।

২ মে, ২০১৯

ঘূর্ণিঝড়ের সময় আমাদের যা করতে হবে।




আমাদের প্রথমে ঘূর্ণিঝড়ের মোকাবেলায় করণীয় কাজগুলো করতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে নিরাপত্তার জন্য কায়মনোবাক্যে দোয়া করতে হবে। আল্লাহ যাতে আমাদের রক্ষা করেন। করণীয় কাজ ও রাসূল সা.-এর শেখানো দোয়াগুলো নিচে উল্লেখ করছি। 

ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে অথবা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ঘূর্ণিঝড়ের আগেই আমাদের কিছু করনীয় আছে। সেগুলো নিচে উল্লেখ করছি 


১. দূর্যোগের সময় কোন এলাকার লোক কোন আশ্রয়ে যাবে, গরু, ছাগল, মহিষ কোথায় থাকবে তা আগে ঠিক করে রাখুন এবং জায়গা চিনে রাখুন।

২. নিজের কাছে ব্যাটারীচালিত রেডিও রাখুন বা মোবাইলে রেডিও শুনুন। নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস শোনার অভ্যাস করুন।

৩. সম্ভব হলে বাড়িতে কিছু প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম (ব্যান্ডেজ, তুলা, ডেটল প্রভৃতি) রাখুন।

৪. জলোচ্ছ্বাসের পানির প্রকোপ থেকে রক্ষায় নানারকম শস্যের বীজ উত্তমভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিন।

৫. ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে বা অন্য আশ্রয়ে যাবার সময় কি কি জরুরি জিনিস সঙ্গে নেয়া যাবে এবং কি কি জিনিস মাটিতে পুঁতে রাখা হবে তা ঠিক করে সে অনুসারে প্রস্তুতি নেয়া উচিত।

৬. আর্থিক সামর্থ থাকলে ঘরের মধ্যে একটি পাকা গর্ত করুন। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বে এই পাকা গর্তের মধ্যে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখতে পারবেন।

৭. ডায়ারিয়া মহামারীর প্রতি সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। শিশুদের ডায়ারিয়া হলে কিভাবে খাবার স্যালাইন তৈরি করতে হবে সে বিষয়ে পরিবারের সকলকে প্রশিক্ষণ দিন।

৮. ঘূর্ণিঝড়ের মাসগুলোতে বাড়িতে মুড়ি, চিড়া, বিস্কুট জাতীয় শুকনো খাবার রাখুন।

৯. নোংরা পানি কিভাবে ফিটকারি বা ফিল্টার দ্বারা খাবার ও ব্যবহারের উপযোগী করা যায় সে বিষয়ে আপনার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিন।

১০. বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করুন। মাটির বড় হাঁড়িতে বা ড্রামে পানি রেখে তার মুখ ভালভাবে আটকিয়ে রাখতে হবে যাতে পোকা-মাকড়,ময়লা- আবর্জনা ঢুকতে না পারে।

ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস পাবার পর দুর্যোগকালে করণীয় :

১. আপনার ঘরগুলোর অবস্থা পরীক্ষা করুন, আরও মজবুত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। যেমন মাটিতে খুঁটি পুঁতে দড়ি দিয়ে ঘরের বিভিন্ন অংশ বাঁধা।

২. দুর্যোগকালীন স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রস্তুতি নিন।

৩. বিপদ সংকেত পাওয়া মাত্র বাড়ির মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধাদের আগে নিকটবর্তী নিরাপদ স্থানে বা আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে প্রস্তুত হোন এবং আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশের পরে সময় নষ্ট না করে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে যান।

৪. বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাবার সময় অবশ্যই আগুন নিভিয়ে যাবেন।

৫. আপনার অতি প্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যসামগ্রী যেমন- ডাল, চাল, দিয়াশলাই, শুকনো কাঠ, পানি, ফিটকিরি, চিনি, নিয়মিত ব্যবহৃত ঔষধ, বইপত্র, ব্যান্ডেজ, তুলা, ওরস্যালাইন ইত্যাদি পানি নিরোধন পলিথিন ব্যাগে ভরে গর্তে রেখে ঢাকনা দিয়ে পুঁতে রাখুন।

৬. আপনার গরু-ছাগল নিকটস্থ উঁচু বাঁধে অথবা উঁচুস্থানে রাখুন। কোন অবস্থায়ই গোয়াল ঘরে বেঁধে রাখবেন না। কোন উঁচু জায়গা না থাকলে ছেড়ে দিন, বাঁচার চেষ্টা করতে দিন।

৭. আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া সম্ভব না হলে শক্ত গাছের সাথে কয়েক গোছা লম্বা মোটা শক্ত রশি বেঁধে রাখুন। রশি ধরে অথবা রশির সাথে নিজেকে বেঁধে রাখুন যাতে প্রবল ঝড়ে ও জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিতে না পারে।

৮. আশ্রয় নেয়ার জন্য নির্ধারিত বাড়ির আশেপাশে গাছের ডালপালা আসন্ন ঝড়ের পূর্বেই কেটে রাখুন, যাতে ঝড়ে গাছগুলো ভেঙে বা উপড়িয়ে না যায়।

৯. রেডিওতে আবহাওয়া আপডেট নিয়মিত শুনুন। 

১০. দলিলপত্র ও টাকা-পয়সা পলিথিনে মুড়ে নিজের শরীরের সঙ্গে বেঁধে রাখুন অথবা সুনির্দিষ্ট স্থানে পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখুন।

১১. টিউবওয়েলের মাথা খুলে পৃথকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং টিউবওয়েলের খোলা মুখ পলিথিন দিয়ে ভালভাবে আটকে রাখতে হবে যাতে ময়লা বা লবনাক্ত পানি টিউবওয়েলের মধ্যে প্রবেশ না করতে পারে।

দূর্যোগ পরবর্তী করণীয় :

১. রাস্তা-ঘাটের উপর উপড়ে পড়া গাছপালা সরিয়ে ফেলুন যাতে সহজে সাহায্যকারী দল আসতে পারে এবং দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হয়।

২. আশ্রয়কেন্দ্র হতে মানুষকে বাড়ি ফিরতে সাহায্য করুন এবং নিজের ভিটায় বা গ্রামে অন্যদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিন।

৩. অতি দ্রুত উদ্ধার দল নিয়ে খাল, নদী, পুকুর ও সমুদ্রে ভাসা বা বনাঞ্চলে বা কাদার মধ্যে আটকে পড়া লোকদের উদ্ধার করুন।

৪. ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণ যাতে শুধু এনজিও বা সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজে যেন অন্যকে সাহায্য করে সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে।

৫. দ্বীপের বা চরের নিকটবর্তী কাদার মধ্যে আটকে পড়া লোকদের উদ্ধারের জন্য দলবদ্ধ হয়ে দড়ি ও নৌকার সাহায্যে লোক উদ্ধারের কাজ শুরু করুন। 

৬. ঝড় একটু কমলেই ঘর থেকে বের হবেন না। পরে আরও প্রবল বেগে অন্যদিক থেকে ঝড় আসার সম্ভাবনা থাকে।

৭. পুকুরের বা নদীর পানি ফুটিয়ে পান করুন। বৃষ্টির পানি ধরে রাখুন।

ঘূর্ণিঝড়ের সময় বেশি বেশি দোয়া পড়ুন ও আল্লাহর কাছে সাহায্য চান :

১- আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকা মিন খাইরি হাজিহির রিহি ওয়া খাইরি মা ফিহা ওয়া খাইরি মা উমিরাত বিহি, ওয়া নাউজুবিকা মিন শাররি হাজিহির রিহি ওয়া শাররি মা ফিহা ওয়া শাররি মা উমিরাত বিহি’ (তিরমিজি, মিশকাত)
অর্থ : হে আল্লাহ! আমরা তোমার নিকট এ বাতাসের ভালো দিক, এতে যে কল্যাণ রয়েছে তা এবং যে উদ্দেশ্যে তা নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে এসেছে তার উত্তম দিকটি প্রার্থনা করছি। এবং তোমার নিকট এর খারাপ দিক হতে, এতে যে অকল্যাণ রয়েছে তা হতে এবং এটা যে উদ্দেশ্যে আদেশপ্রাপ্ত হয়ে এসেছে তার মন্দ দিক হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

২- সুবহানাল্লাজি ইউসাব্বিহুর রা`দু বিহামদিহি ওয়াল মালাইকাতু মিন খিফাতিহি। (মুয়াত্তা)
অর্থ :পাক-পবিত্র সেই মহান সত্তা- তাঁর প্রশংসা  সভয়ে পাঠ করে বজ্র এবং সব ফেরেশতা। 

৩- আল্লাহুম্মা লা তাক্বতুলনা বিগজাবিকা ওয়া লা তুলহিকনা বিআ’জাবিকা, ওয়া আ’ফিনা ক্ববলা জালিকা। (তিরমিজি)
অর্থ : হে আমাদের প্রভু! তোমার ক্রোধ দিয়ে আমাদের মেরে ফেলো না আর তোমার আযাব দিয়ে আমাদের ধ্বংস করো না। বরং এর আগেই আমাদেরকে ক্ষমা ও নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে নিও।

৪- আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা। (বুখারি)
অর্থ : হে আল্লাহ! আমাদের থেকে ফিরিয়ে নাও, আমাদের ওপর দিয়ো না।

৫- আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্আলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা ফিহা- ওয়া খাইরা মা উরসিলাতবিহি; ওয়া আউযুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা ফিহা ওয়া শাররি মা উরসিলাতবিহি। (তিরমিজি)
অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট এর মঙ্গল, এর মধ্যকার মঙ্গল ও যা নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে, তার মঙ্গলসমূহ প্রার্থনা করছি এবং আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি এর অমঙ্গল হতে, এর মধ্যকার অমঙ্গল হতে এবং যা নিয়ে তা প্রেরিত হয়েছে, তার অমঙ্গলসমূহ হতে।