১১ অক্টোবর, ২০১৫

রুপকথা নয় সত্যকথাঃ ০১


দানশীলতার জন্য তাঁর ছিল বেশ সুনাম। একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন একস্থানে উটের দুধ আর অন্যস্থানে বিষ্ঠা। এর মাঝামাঝি স্থানে কে যেন কোদাল দিয়ে খনন করছে। তাতে একটা কূপ দেখা গেল। সেখানে কেবল পানি আর পানি। তিনি ঘুম থেকে উঠলেন কিন্তু স্বপ্নের আগাগোড়া কিছুই বুঝলেন না। একই ভাবে তিনদিন স্বপ্নে দেখলেন।
তারপর তিনি এক গণকের কাছে গেলেন। গণক বললেন তোমার জন্য সম্মান অপেক্ষা করছে। তুমি সম্মানিত হবে। এর কিছুদিন পর তিনি উটের পাল নিয়ে বরাবরের মত মাঠে গেলেন। হঠাৎ একটা তীর কোথা থেকে এসে একটা উটের ওলানে গিয়ে পড়লো। দুধে ভেসে গেলো ঐ স্থান। কে তীর মারলো তিনি আর সেই চিন্তা করতে গেলেন না। তার মনে পড়ে গেলো স্বপ্নের কথা।
তিনি খেয়াল করলেন কিছুদূরে বিষ্ঠা রয়েছে। যা ঐ উট একটু আগে ত্যাগ করেছে। তিনি বুঝলেন স্বপ্নই সত্য। এখানেই পানি পাওয়া যাবে। তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে স্থানটি চিহ্নিত করে তিনি ছুটলেন বাড়ির দিকে। কোদাল নিয়ে এসে খনন করতে লাগলেন। অল্প কিছু খনন করার পরই পাওয়া গেলো কূপটি। তিনি চিৎকার করে জানিয়ে দিলেন সবাইকে। তোমাদের আর চিন্তার কিছু নেই। আমাদের পানি সমস্যা দূর হয়ে গেলো।
এই সম্মানিত ব্যাক্তির নাম আব্দুল মুত্তালিব। আর কূপটি ইসমাইল আঃ এর জমজম কূপ। যা এতদিন পাথর দ্বারা ঢাকা পড়ে ছিল। আব্দুল মুত্তালিব কূপটিকে সুন্দর করে বাঁধিয়ে দিলেন। কূপটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন যাতে সবাই পানি নিতে পারে।
এদিকে কিছু স্বার্থবাদী কুরাইশ নেতা কূপের মালিকানা দাবী করে বসলো। এই নিয়ে অনেক ঝগড়া-বাকবিতন্ডা শুরু হলো। পরে সবাই সিদ্ধান্ত নিলো ইরাকের বনু সা’দ গোত্রের এক মহিলা জ্যোতিষীর কাছে যাবে। তিনি যা সিদ্ধান্ত দিবেন তাই সবাই মেনে নিবেন।
আব্দুল মুত্তালিব সহ মালিকানা দাবীদাররা রওনা হলো। কিছুদূর যাওয়ার পর তারা মুরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেললো। তাদের কাছে ছয় দিনের খাবার ছিল। দশ দিনে সব খাবার শেষ হলো। এরপর একজন প্রস্তাব করলো আমাদের তো মৃত্যু ছাড়া অন্যকোন গতি নেই। আসো সবাই কবর খুঁড়ে শুয়ে পড়ি। সবাই কবর খুঁড়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলো।
আব্দুল মুত্তালিব তাদের বোঝালো, এভাবে শেষ হওয়া যাবেনা। আমাদের যতক্ষন পর্যন্ত শক্তি থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত বাঁচার চেষ্টা করবো। তাছাড়া আমাদের কাছে তো উট রয়েছেই। আমরা তো সেগুলো খেয়েও বাঁচতে পারবো। তারপর তারা নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান করে প্রত্যেকে আলাদাভাবে পানি খুঁজতে লাগলো। এভাবে দুদিন যাওয়ার পর আব্দুল মুত্তালিব একটি পরিত্যাক্ত কূপের সন্ধান পায়।
তাদের প্রত্যেকটি উটই ছিল মৃতপ্রায়। উটগুলো ও তারা পানি পেয়ে আবার কর্মক্ষমতা ফিরে পায়। নতুন করে বাঁচার আশা দেখতে পায়। এই সময় সব কুরাইশ নেতা জমজম কূপের ব্যাপারে নিজেদের দাবী ছেড়ে দেয়। তারা বলে হে আবদুল মুত্তালিব, খোদাই আমাদের বিরুদ্ধে এবং তোমার স্বপক্ষে ফয়সালা দিয়েছেন। খোদার কসম এখন আর জমজম নিয়ে তোমার সাথে ঝগড়া করবোনা। যে খোদা এই মুরুভূমিতে তোমাকে পানি দিয়েছেন, সেই খোদাই তোমাকে জমজম দিয়ছেন।
এরপর তারা এক বানিজ্য কাফেলার সন্ধান পায় ও মক্কায় ফিরে আসে। এই ঘটনার পর আব্দুল মুত্তালিব আল্লাহকে খুশি করার জন্য নিজের এক ছেলেকে কোরবানী করার মানত করেন। তিনি তার দশ ছেলের সবাইকে কথাটা জানালেন। সবাই মেনে নিলো। এরপর তিনি দশ জনের নাম লিখে হোবাল মুর্তির তত্ত্বাবধায়কের কাছে দিলেন। তিনি লটারী করলেন দেখলেন ৪র্থ ছেলে আবদুল্লাহর নাম উঠেছে। 
আবদুল্লাহ ছিলেন আব্দুল মুত্তালিবের ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে দানশীল, সজ্জন, পরোপকারী। মক্কাবাসীরা সবাই তাকে ভালোবাসতো। তারা ওর কোরবানী মেনে নিতে পারে নি। সবাই আবারো লটারী করতে বললো, ২য় এবং ৩য় বারেও আবদুল্লাহর নাম উঠলো। সবাই আবারো বাধা দিল। সবচেয়ে বেশী বাধা দিল সহোদর আবু তালিব।

এরপর আব্দুল মুত্তালিব এক খ্রীস্টান মহিলা সাধকের কাছে গেলেন এবং সব খুলে বললেন। তিনি তাকে বললেন তুমি আবদুল্লাহর নাম ও দশটি উট লিখে লটারী কর। যদি আবদুল্লাহর নাম না উঠে তাহলে দশটি উট উঠে তবে দশটি উট আবদুল্লাহর বদলে কোরবানী করবে। আর যদি আবদুল্লার নাম উঠে তবে দশটি করে উট বাড়াতে থাকবে। যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহ তায়ালা খুশি হন।
দশটি উটে কাজ হলোনা। বিশটি কিংবা পঞ্চাশটিতেও না। যখন আবদুল্লাহর নামের সাথে একশো উট লিখে লটারী করা হলো তখনই কেবল লটারীতে একশ উট উঠলো। মক্কাবাসীরা খুশীতে উল্লাস করতে লাগলো। আবদুল্লাহ নিশ্চিত যবাইয়ের হাত হতে আল্লাহর ইচ্ছায় বেঁচে গেলেন।
আব্দুল মুত্তালিব একশো উট জবাই করে সবার উদ্দেশ্যে রেখে দেন। সবাই যার যার ইচ্ছেমত নিয়ে যায়। তারপরও শেষ হয়নি। অন্যান্য মাংশাসী পশুরও ভুরিভোজের ব্যবস্থা হয়েছিল।
সেদিন হতে রক্তঋনের পরিমাণ হিসেবে একশো উট নির্ধারিত হলো। এর আগে ১০ টি উট ছিল। ইসলামেও এটি অব্যাহত আছে। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সঃ) বলতেন আমি দুই যবীহর (যবাইকৃত) সন্তান।
তথ্যসূত্রঃ 
১. ইবনে হিশাম
২. মুখতাছার সীরাতে রাসূল 
৩. আর রাহীকূল মাখতুম 
৪. সীরাতে সরওয়ারে আলম

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন