জুলাই বিপ্লব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জুলাই বিপ্লব লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২৩ জুল, ২০২৫

জুলাই ডায়েরি : ১৮ জুলাই

আজ ১৮ জুলাই।

২০২৪ সালের এই দিনে সারা দেশের আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। ঢাবিতে ছাত্রদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে সারাদেশের ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে আসে। প্রায় ২৭ জন মানুষ শাহদাতবরণ করে। হাজার হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়।

# ঢাকায় ১৯ জন ও ঢাকার বাইরে ৮ জন শাহদাতবরণ করে। ২৭ জনের মধ্যে ১১ জন ছাত্র।
# রাজধানী সারাদেশ থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন। ঢাকার ১৯ জনের মধ্যে উত্তরায় ১১ জন শহীদ। উত্তরার একটি মসজিদ থেকে বিপ্লবীরা নামাজের আজানের সময় ঘোষণা দেয় 'হাইয়া আলাল জিহাদ'
# সারাদেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট
# বিক্ষুব্ধ জনতা বিটিভি-তে আগুন ধরিয়ে দেয়
# জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন, আন্দোলনের সমর্থনে ৫ দফা দাবি উত্থাপন
# দেশজুড়ে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
# দীপ্ত দে, ফাইয়াজ, তাহমিদ ভুঁইয়া শাহদাতবরণ করে।
# ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ছাত্রদের ওপর হামলা করে।
# মেরুল বাড্ডায় হেলিকপ্টার দিয়ে পুলিশদের উদ্ধার
# জাবি থেকে ছাত্রলীগ ও পুলিশদের হটিয়েছে ছাত্ররা
# পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলের বৈঠক।

১৮ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কমপ্লিট শাটডাউন (সর্বাত্মক অবরোধ) কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকাসহ সারা দেশ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। রাজধানী ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় গতকাল দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, পুলিশের হামলা-গুলি ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ২৭ জন শহীদ হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার।

কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের, আবার কোথাও সরকার–সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পর বুধবার রাতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। ‘শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও সোয়াটের ন্যক্কারজনক হামলা, খুনের প্রতিবাদ, খুনিদের বিচার, সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা এবং কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে’ বৃহস্পতিবার কমপ্লিট শাটডাউন (সর্বাত্মক অবরোধ) কর্মসূচি ঘোষণা করেন তাঁরা। এর সমর্থনে গতকাল দলে দলে রাস্তায় নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা।

কোটা সংস্কারের দাবিতে এবার আন্দোলন শুরু হয় গত ৫ জুন। বিরতি দিয়ে জুন মাসে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এরপর টানা আন্দোলন শুরু হয় ১ জুলাই। এটি চলে মূলত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ১৫ জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার পর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। এদিন হামলা-সংঘর্ষে সারা দেশে নিহত হন ছয়জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। তবে বুধবার সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীরা মেনে নেননি। এর আগে মঙ্গলবার সব স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। বন্ধ করা হয় সিটি করপোরেশন এলাকার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ও।

গতকাল সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের সময় সংঘাত–সংঘর্ষে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, গুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে রাজধানীর মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় সরকারি স্থাপনা ভাঙচুর, পরিবহনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। ঢাকার সড়কে সকালের দিকে কিছু পরিবহন থাকলেও দুপুরের পর ফাঁকা হতে থাকে সব সড়ক। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১১টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ চলছিল।

গতকাল সারা দেশে নিহতদের অনেকে শিক্ষার্থী। তাঁদের শরীরে গুলির চিহ্ন এবং কারও কারও মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় মারা গেছেন একজন সাংবাদিক। একই এলাকায় মারা গেছেন আরও পাঁচজন। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী গুলির আঘাতে মারা গেছে ধানমন্ডি এলাকায়।

সকালে উত্তরা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক অবরোধ করতে গেলে আন্দোলনকারীদের বাধা দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর শুরু হয় সংঘর্ষ, যা চলে দিনভর। এতে রাজধানীর উত্তরার তিনটি হাসপাতাল থেকে ১১ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। রামপুরায় একজন ও আজিমপুরে একজন মারা গেছেন। এ ছাড়া গত বুধবার রাজধানীর দনিয়া এলাকায় সংঘর্ষের মধ্যে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন ইমরান বাবুর্চি (২৬)। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল মারা যান তিনি। এদিকে গতকাল রাত ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপুরার ফরাজী হাসপাতালে আরও কয়েকজনের লাশ এসেছে। তবে তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি।

আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি সংঘাত-সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, পথচারী ও সরকার-সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। ঢাকার বাইরে সংঘর্ষে সহস্রাধিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকায় এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

১০ জেলায় শান্তিপূর্ণভাবে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ছয় জেলায় সরকারি কার্যালয়, থানা এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলা-সংঘর্ষে ৩১ জেলায় পুলিশ-ছাত্রলীগসহ ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংঘর্ষে ১ হাজার ১১১ জন আহত হয়েছেন। ২৭ জনের মধ্যে ছয় জেলায় নিহত হয়েছেন ৮ জন, আটক হয়েছেন ২৪৭ জন।

বিক্ষোভ দমাতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তুতি নিয়ে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য। লাঠিসোঁটা, দেশীয় অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অনেক জায়গায় অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। লাঠিসোঁটা নিয়ে নামেন আন্দোলনকারীরাও। দুপুর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বড় সংঘাতের খবর আসতে থাকে।

রাজধানীর উত্তরা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, ধানমন্ডি, মিরপুর, নীলক্ষেত, আজিমপুর, তেজগাঁও, শান্তিনগর, মহাখালী, শনির আখড়া, কাজলা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। দিনভর এসব এলাকা ছিল রণক্ষেত্রের মতো। একপর্যায়ে মেরুল বাড্ডায় কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির মধ্যে আশ্রয় নেন পুলিশের সদস্যরা। বিকেলে তাঁদের হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হয়। সন্ধ্যার সময়ও বিভিন্ন জায়গায় ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে।

কয়েক দফায় হামলা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভির কার্যালয়ে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে এখানে। সন্ধ্যা সাতটায় বন্ধ হয় বিটিভির সম্প্রচার। সেতু ভবন, দুর্যোগ ভবন, বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানীজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন মারা গেছেন। গতকাল সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে আহত ১২০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন জায়গায় আরও অনেকে চিকিৎসা নেন বলে জানা গেছে।

রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করতে দেখা যায়।

চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লার শহরের কোটবাড়ী, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে চট্টগ্রামে ২ জন নিহত ও ৬৩ জন আহত হয়েছেন। কুমিল্লায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তিন ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ, হামলা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে সাত জেলায় অন্তত ৩১০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ২০২ জনকে আটক করা হয়।

বরিশাল সদর, পটুয়াখালীর দুমকি ও বাউফল, জামালপুর সদর, নেত্রকোনার মদন, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী সদর ও সৈয়দপুর এবং লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ৫ জন গুলিবিদ্ধসহ ৩২০ জন আহত হন।

রাজশাহীর বাগমারা, নাটোর সদর, পাবনা সদর, জয়পুরহাট, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জ ও বগুড়ায় কয়েক ঘণ্টা সংঘর্ষ হয়েছে। কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের লোকজন হামলা চালিয়েছেন। এতে পুলিশের ১৬ সদস্যসহ ৩৭৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বগুড়ায় ৩২ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ সময় নাটোরে ১০, পাবনায় ১৫ ও মৌলভীবাজারে কয়েকজন আটক হয়েছেন।

ঢাকার বাইরে অবরোধ ঘিরে সংঘর্ষের জেরে বিভিন্ন স্থাপনায় তাণ্ডব চালিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। সাতক্ষীরা সদর, ময়মনসিংহের ফুলপুর, মাদারীপুর শহর, রংপুর, বগুড়া শহর ও হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, থানা, সরকারি কার্যালয় এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

হবিগঞ্জ শহরে পুলিশের সঙ্গে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের প্রায় চার ঘণ্টার সংঘর্ষে পুলিশের ১৬ সদস্যসহ দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চোখে গুলিবিদ্ধ একজনকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

কুষ্টিয়া, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে পুলিশের ২ সদস্যসহ অন্তত ৪১ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঝিনাইদহ-১ (শৈলকুপা) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নায়েব আলী জোয়ারদারের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সাতক্ষীরায় থানা ঘেরাওয়ের সময় ১৫ জনকে আটক করে পুলিশ।

যশোরের কেশবপুরে যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়ক, রাজবাড়ীতে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ী-ফরিদপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক, ঝালকাঠির রাজাপুরে খুলনা-বরিশাল মহাসড়ক, গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, বরিশালে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক, পঞ্চগড় শহরে পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক এবং কক্সবাজারে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক এবং রাঙামাটি ও লক্ষ্মীপুর শহরে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা।

#জুলাই_ডায়েরি

১৭ জুল, ২০২৫

জুলাই ডায়েরি : ১৭ জুলাই

আজ সতেরো জুলাই

২০২৪ সালের এই দিনে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র বিক্ষোভ, সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, গায়েবানা জানাজা, কফিনমিছিল এবং দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে আগের দিন রংপুরের ছাত্রনেতা আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের ছাত্রনেতা শান্ত ও ওয়াসিমসহ ৬ জন নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

১. ঢাবিতে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল
২. ঢাবিতে হল বন্ধের ঘোষণা দেয় ভার্সিটি প্রশাসন
৩. রাতে শিবিরের নেতৃত্বে ঢাবি'র ১৭ টি হল থেকে ছাত্রলীগকে বহিষ্কার
৪. জাবিতে ছাত্রলীগ ও পুলিশের সাথে ছাত্রদের ভয়াবহ সংঘর্ষ
৫. বহু ছাত্রলীগ নেতার পদত্যাগ
৬. আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করার আহবান হাসিনার ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা
৭. ১৮ জুলাই কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা আন্দোলনকারীদের
৮. আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রশক্তি নেতা আখতারের গ্রেপ্তার

১৭ জুলাই বুধবার ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন জোরদার হয়। পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের মুখে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কফিনমিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হল বন্ধের ঘোষণা ও পুলিশের তৎপরতার মুখে অনেক শিক্ষার্থী সন্ধ্যা নাগাদ ক্যাম্পাস ছেড়ে যান। তবে হল বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে রাতেও অনেক ছাত্রছাত্রী হল ও ক্যাম্পাসে অবস্থান করছিলেন।

এর আগে হল ত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও ছাত্র হত্যায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের কর্মসূচিতে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও দিনভর বিক্ষোভ ও গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। সকাল থেকে আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নামলে পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

‘শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ-বিজিবি-র‍্যাব ও সোয়াটের ন্যক্কারজনক হামলা, খুনের প্রতিবাদ, খুনিদের বিচার, সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা এবং কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে’ আজ বৃহস্পতিবার কমপ্লিট শাটডাউন (সর্বাত্মক অবরোধ) পালন করবেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এই কর্মসূচি চলাকালে শুধু হাসপাতাল, গণমাধ্যমসহ অন্যান্য জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।

গতকাল রাত আটটার দিকে ফেসবুকে কর্মসূচির ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। সারা দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই লড়াইটা শুধু ছাত্রদের নয়, দলমত-নির্বিশেষে দেশের আপামর জনসাধারণের। আন্দোলনকারীদের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম প্রথম আলোকে বলেন, কমপ্লিট শাটডাউন বলতে তাঁরা ‘সর্বাত্মক অবরোধ’ বুঝিয়েছেন।

১৭ তারিখ দিনভর উত্তপ্ত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে মোড়ে মোড়ে অবস্থান ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। দুপুর থেকে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির বিপুলসংখ্যক সদস্য সাঁজোয়া যান নিয়ে ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন। শিক্ষার্থীরা পূর্বঘোষিত কফিনমিছিল শুরু করা মাত্র হামলা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় দুই পাশ থেকে সম্মিলিত আক্রমণের মধ্যে পড়ে আহত হন কয়েকজন নারীসহ অন্তত ২০ শিক্ষার্থী। আহত হয়েছেন ১০ জন সাংবাদিকও। এর বাইরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হামলায় আহত হয়ে গতকাল রাত ১১টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন আরও ৩৫ জন।

ঢাকা বিশ্ববিদালয়ে আন্দোলনকারীদের ক্যাম্পাস ছাড়া করতে টানা অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দুপুরের পর তাদের টানা দুই ঘণ্টার অভিযানে ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। সেখানেও দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।

পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় গতকাল বেলা দুইটায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘গায়েবানা জানাজা ও কফিনমিছিল’ কর্মসূচি ছিল আন্দোলনকারীদের। কিন্তু পুলিশের বাধায় সেখানে গায়েবানা জানাজা হয়নি। পরে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে ক্যাম্পাসে কফিন নিয়ে মিছিল শুরু করলে একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা আবার সূর্য সেন হলের সামনে জড়ো হন।

এরপর ঘণ্টাখানেক পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ চলে। পুলিশ সদস্যরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। অপরদিকে শিক্ষার্থীরা মাস্টারদা সূর্য সেন হলের সামনে অবস্থান নেন। পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের জবাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন তাঁরা। পুলিশের সঙ্গে টিকতে না পেরে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ওই এলাকার হলগুলোর ভেতরে চলে যান শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে সূর্য সেন হলের সামনে এসে অবস্থান নেয় পুলিশ। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল হক সেখানে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ বন্ধ করে পুলিশ।

এরপর হলগুলো থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত মোড়ের দিকে চলে যান। সেখানে তাঁরা অবস্থান নিলে পুলিশ আবারও তাঁদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। জবাবে শিক্ষার্থীরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। আধা ঘণ্টা পর সেখান থেকে চলে যান শিক্ষার্থীরা। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তাঁরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান নেন।

রাত পৌনে ১০টার দিকে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আরেক দফা পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু টাওয়ারের সামনে থেকে ঘটনার শুরু। সেখান থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চানখাঁরপুল মোড় পর্যন্ত দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। প্রায় আধা ঘণ্টা সংঘর্ষ চলার পর আন্দোলনকারীরা পুরান ঢাকার দিকে চলে যান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ১৯টি। এর মধ্যে ১৩টি ছাত্রদের, ৫টি ছাত্রীদের এবং বাকি ১টি আন্তর্জাতিক হল। বিজ্ঞান অনুষদের তিনটি হলে সোমবার বিকেল থেকেই যেতে পারেনি সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ছাত্রীদের পাঁচটি হল এবং ছাত্রদের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বের করে দেওয়া হয়। সকালে একে একে ছাত্রদের আটটি হলে একই ঘটনা ঘটে।

ঘটনার শুরু হয় রোকেয়া হল থেকে। মঙ্গলবার রাত ১১টার পর রোকেয়া হলের ছাত্রলীগ নেত্রীদের অবরুদ্ধ করে মারধর ও পরে হলছাড়া করা হয়। গভীর রাতে ছাত্রীদের বিক্ষোভের মুখে প্রাধ্যক্ষ রাজনীতি নিষিদ্ধের বিজ্ঞপ্তিতে সই করেন। এরপর শামসুন নাহার হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, কবি সুফিয়া কামাল হল ও বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রীরা বের হয়ে এসে প্রাধ্যক্ষের কাছ থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে সই নেন।

রাতে জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগকে বের করে দিয়ে ফটকের ভেতরে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষার্থীরা প্রাধ্যক্ষের কাছ থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়ে সই নেন। এরপর একে একে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, মাস্টারদা সূর্য সেন হল, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলসহ সব হল থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বের করে দেওয়া হয়। শুধু জগন্নাথ হলে প্রাধ্যক্ষের কাছ থেকে বিজ্ঞপ্তির সই নেওয়া হলেও হলটিতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রয়েছেন।

হলগুলোতে জারি করা বিজ্ঞপ্তির ভাষা মোটামুটি একই ছিল। মুহসীন হলের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১. হলে সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলো। ২. হলকে তাৎক্ষণিক নিরস্ত্রীকৃত ও সন্ত্রাসমুক্ত ঘোষণা করা হলো এবং ভবিষ্যতেও এই অভিযান অব্যাহত থাকবে, ৩. কোনো বহিরাগত হলে অবস্থান করতে পারবেন না, ৪. হলের কোনো শিক্ষার্থী শারীরিক, মানসিকভাবে কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন হলে হল প্রশাসন দায় নেবে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, ৫. গণরুম ও গেস্টরুম (অতিথিকক্ষে হাজিরা দেওয়া) সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা হলো। ৬. যদি কোনো ছাত্রসংগঠন হল দখল করার অপচেষ্টা করে, তৎক্ষণাৎ সেই ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এসব কাজে জড়িত সবাইকে বহিষ্কার করা হবে। ৭. ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার এবং শান্তির আওতায় আনা হবে। ৮. প্রথম বর্ষ থেকে মেধা ও চাহিদার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বৈধ সিট বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

স্যার এ এফ রহমান হলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও বিজয় একাত্তর হলে সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের কক্ষ, সূর্য সেন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির (শয়ন), কবি জসীমউদ্‌দীন হলে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান হলের কক্ষসহ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অনেক কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের মঞ্চ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম গতকাল ভোর চারটার দিকে ফেসবুকে লিখেছেন, এখন থেকে হল পরিচালনা করবেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বাধা আসলে বাধবে লড়াই।’

পুলিশের হামলার মুখে সন্ধ্যার দিকে আন্দোলনকারী অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে যান। এ সময় শাহবাগ এলাকা দিয়ে বের হওয়া বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর ও হয়রানি করার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র ও জনতার ব্যানারে গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি পালন করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। জানাজার পর ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মীরা সেখানে অবস্থান নেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ছাত্রী হলের অনেক শিক্ষার্থী গতকাল রাতে হলে অবস্থান করছিলেন। তাঁরা জানান, হামলাকারীদের বিচার না করে তাঁরা হল ছেড়ে যাবেন না।

রাজধানীর শনির আখড়ায় গতকাল দিনভর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যার দিকে পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এখানে পুলিশের ছররা গুলিতে ছয়জন আহত হন। রাজধানীর শনির আখড়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক গতকাল দিনভর অবরোধ করে রাখার পর সন্ধ্যায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। সর্বশেষ রাত ১১টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলছিল। শনির আখড়ার কাজলায় হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় আগুন দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। সন্ধ্যায় সেখানে সংঘর্ষের সময় পুলিশের শটগানের গুলিতে আহত ছয়জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

১৭ জুলাই রাজধানীসহ দেশের অন্তত আট জেলায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া অন্তত ১০টি জায়গায় সড়ক ও মহাসড়ক এবং দুই জায়গায় রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এসব ঘটনায় ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দিনভর সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

মাদারীপুরে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের মস্তফাপুর বাসস্ট্যান্ডে এ ঘটনা ঘটে। ফরিদপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা হামলা করেছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির উপাধ্যক্ষ এ কে এম হাসিবুল হাসানসহ পাঁচজন আহত হন। আহতদের মধ্যে দুজন ছাত্রী ও দুজন ছাত্র রয়েছেন।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বাজারে গতকাল কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে হাজীগঞ্জ পশ্চিম বাজারে সড়কে অবস্থানরত কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগ মাইকিং করে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। পরে তাঁদের ধাওয়া করলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। এতে দুই পক্ষের অন্তত পাঁচজন আহত হন।

জামালপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়েতে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টাকালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ হয়। এতে পাঁচ আন্দোলনকারী আহত হন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। এতে আন্দোলনকারী কয়েকজন আহত হয়েছেন। ময়মনসিংহে আনন্দ মোহন কলেজ এলাকায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে দুই শিক্ষার্থী আহত হন।

শেরপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের ১০ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

বরিশালে মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। সরকারি ব্রজমোহন কলেজ ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেন। বেলা দেড়টার দিকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিতে নগরের চৌমাথা এলাকায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন এলাকায়। সেখানে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত অবরোধ চলছিল।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা ও আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশের প্রতিবাদে বিকেল চারটার দিকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করেন। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী গতকাল সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের উজিরপুরের ইচলাদী এলাকা অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।

টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব প্রান্তে মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এ ছাড়া কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এবং ঘাটাইল কলেজ মোড় এলাকায় শিক্ষার্থীরা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। মুন্সিগঞ্জ শহর ও লৌহজংয়ে পদ্মা সেতু উত্তর থানার সামনে সকাল ১০টা থেকে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এখানে বাধা দেয় ছাত্রলীগ ও পুলিশ। এখানে আহত হন ১০-১২ জন।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। খুলনা শহরের জিরো পয়েন্ট এলাকা অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জিরো পয়েন্ট এলাকার চারটি সড়ক বন্ধ করে এ কর্মসূচি শুরু করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিকেল চারটা পর্যন্ত তাঁরা এলাকাটি অবরোধ করে রাখেন। পরে কর্মসূচিতে যোগ দেন খুলনার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। জিরো পয়েন্ট অবরোধের ফলে সাতক্ষীরা, যশোর, ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

বগুড়ার শেরপুরে বেলা ১১টা থেকে ৮০০ থেকে ৯০০ শিক্ষার্থী জড়ো হন। মহাসড়কের অন্তত তিন কিলোমিটার পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল ছড়িয়ে পড়ে এ সময়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন।

যশোর শহরের রেলগেট এলাকায় রাজশাহীগামী মহানন্দা এক্সপ্রেস ট্রেন থামিয়ে রেলপথ অবরোধ করেছেন আন্দোলনকারীরা। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তাঁরা জাতীয় পতাকা দেখিয়ে ও ইট-পাথর ছুড়ে ট্রেনটি থামিয়ে দেন। ট্রেনের চালক ট্রেন থামিয়ে পালিয়ে যান। এরপর যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে আন্দোলনকারীরা ট্রেনের ছাদে উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ান। এ সময় যশোরের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

গাইবান্ধা শহরে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে পৌর পার্কে সমবেত হন। তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে রেলগেটের সামনে অবস্থান নিয়ে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন।

#জুলাই_ডায়েরি

১৬ জুল, ২০২৫

জুলাই ডায়েরি : ১৬ জুলাই

 আজ ১৬ জুলাই।


গতবছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই দিন ছিল হিজরি ১০ মহররম। কারবালার দিন। বাংলাদেশেও সেদিন কারবালা শুরু হয়।

১৫ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে সারা বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষোভে ফেটে পড়ে।

# রংপুরে ১ম শহীদ আবু সাঈদের শাহদাত
# সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে চট্টগ্রামে তিনজন, ঢাকায় দুজন ও রংপুরে একজন নিহত হয়েছেন। আহত চার শতাধিক।
# স্কুল–কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা, বৃহস্পতিবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত। বিজিবি মোতায়েন
# জুলাই বিপ্লবের পক্ষে স্ট্যাটাস দেওয়ায় টেন মিনিট স্কুলের ৫ কোটি টাকার অনুদান বন্ধ করেছে পলক
# ছাত্রদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় অ্যামনেস্টির নিন্দা
# সরকারি হামলার প্রতিবাদে অর্ধশতাধিক ছাত্রলীগ নেতার পদত্যাগ

রংপুরে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক শিক্ষার্থী। নিহত আবু সাঈদ (২২) রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন। তিনিই জুলাই বিপ্লবের ১ম শহীদ।

১৫ জুলাই রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ দমনে লাঠিসোঁটা, কোথাও কোথাও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সক্রিয় ছিলো ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ঢাকার অন্তত ১৬ টি জায়গায় শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। বেলা দুইটার পর থেকে রাজধানীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর মধ্যে ঢাকা কলেজ থেকে সায়েন্স ল্যাব, পুরান ঢাকা, নতুন বাজার ও মিরপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকার সমর্থকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ, গুলি ও হামলার ঘটনা ঘটে।

১৫ জুলাই ছাত্রশিবির ব্যানার ছাড়া মাঠে নামলেও ১৬ জুলাই ছাত্রশিবির ঢাকার কয়েকটি স্থানে মিছিল করেন এবং ঢাবিতে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকা কলেজের সামনে আহত একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা সিটি কলেজের সামনে আহত আরেকজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়। ঢাকায় শহীদ হওয়া দুইজনই ছিলেন শ্রমিক। সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত আহত ১২৬ জন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর বাইরে আহত কেউ কেউ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুবলীগ-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। শহরের মুরাদপুরে শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্রধারীরা গুলি ছুড়লে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ছাত্রশিবির নেতা ফয়সল আহমেদ শান্ত, ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম ও একজন কাঠমিস্ত্রী শহীদ হন।

গতকালও দিনভর উত্তপ্ত ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে নেতা-কর্মীদের নিয়ে গতকাল ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। জঙ্গী সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের হাতে ছিল হকিস্টিক, লাঠি, স্টাম্পসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র। শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, ঢাকা মেডিকেল, কার্জন হল, চানখাঁরপুল এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ঢাকার কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন। ঢাকার বাইরে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এতে ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতা-কর্মীরা ও পুলিশ হামলা চালায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সোমবার সন্ধ্যায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। পরে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। গভীর রাতে উপাচার্যের বাসভবন চত্বরে শিক্ষার্থীদের ওপর পেট্রলবোমা ও দেশি অস্ত্র নিয়ে হামলা এবং মারধর করে স্বাধীনতা বিরোধী ছাত্রলীগ। পরে পুলিশ এসে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ছররা গুলি ছোড়ে। এ ঘটনায় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত চার-পাঁচজন শিক্ষক ও সাতজন সাংবাদিক আহত হন। চোখে ছররা গুলি লেগে গুরুতর আহত হয়েছেন এক শিক্ষক। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর গুরুতর আহত ব্যক্তিদের সাভারের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জুলাই বিপ্লবীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের প্রভোস্টের কক্ষ, ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষসহ অন্তত ১০টি কক্ষে ভাঙচুর চালান। একপর্যায়ে তাঁরা ১৫টি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেন। ছাত্রলীগের রাবিতে ছাত্রদের ধাওয়া খেয়ে ক্যাম্পাস ছাড়ে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্তত দেড় হাজার শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে আসেন। আড়াইটায় ক্যাম্পাস থেকে লাঠি হাতে নানা স্লোগান দিয়ে মিছিল করেন তাঁরা।

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে আন্দোলনকারীদের ওপর অন্তত সাতটি জেলায় ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে। ফরিদপুর, বরিশাল, ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, দিনাজপুর, রাজশাহী কলেজ ও নওগাঁ সরকারি মেডিকেল কলেজে সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন আহত হয়েছেন।

বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মিছিলে ছাত্রলীগের জঙ্গীরা হামলা চালিয়েছে। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত সাতজনকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বেলা ১১টার দিকে ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ। এ সময় আহত হয়েছেন ছয়জন আন্দোলনকারী।

রাজশাহী কলেজে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বেলা ১১টা থেকে কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীরা কিশোরগঞ্জ শহরে জড়ো হতে থাকেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জেলা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক ও রড নিয়ে কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। পরে আন্দোলনকারীরাও লাঠিসোঁটা নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া করেন। পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

ঝিনাইদহ শহরের উজির আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে শহর থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে ছাত্রলীগের একটি মিছিল থেকে অতর্কিত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। দিনাজপুরে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের দুজন ক্যামেরা পারসনসহ অন্তত আটজন আহত হয়েছেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী ইটপাটকেল নিক্ষেপ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার পর পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। নওগাঁ সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন চার শিক্ষার্থী।

বগুড়া সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা বেলা একটায় শহরের সাতমাথা-বনানী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হামলার চেষ্টা করলে লাঠিসোঁটা হাতে তাঁরা ছাত্রলীগকে ধাওয়া করেন। ছাত্রলীগ নেতাদের মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ ও শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। নরসিংদীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জেলখানার মোড়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন। চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বেলা ১১টার দিকে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল সড়কের প্রবেশমুখ নগরের টাউন হল মোড় এলাকা অবরোধ করেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। সকাল নয়টা থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের একাডেমিক ভবন থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থায়ী ক্যাম্পাস খড়খড়ি বাইপাসে ক্যাম্পাসের সামনে রাজশাহীর বেসরকারি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন।

সকাল ১০টায় রংপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ ও বেসরকারি কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। একই সময় বেসরকারি প্রাইম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা তাঁদের ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন।

গতকাল বিকেলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। মিছিলে সংহতি জানিয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাভার মডেল কলেজ, মির্জা গোলাম হাফিজ কলেজ, সাভার ল্যাবরেটরি কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। বিক্ষোভ মিছিল বের করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। মুন্সিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে মানববন্ধন করেন সরকারি হরগঙ্গা কলেজ, মুন্সিগঞ্জ কলেজ ও রামপাল ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীরা। নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। জেলার সোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।

#জুলাই_ডায়েরি

১৫ জুল, ২০২৫

জুলাই ডায়েরি : ১৫ জুলাই



আজ ১৫ জুলাই।

২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। বেলা তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল থেকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এরপর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালায় ছাত্রলীগ। রাত নয়টা পর্যন্ত চলা সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

হামলা ও সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের পাশাপাশি সংগঠনটির ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন শাখার নেতা–কর্মীরা অংশ নেয়। তাঁদের হাতে ছিল হকিস্টিক, লাঠি, রড, জিআই পাইপসহ বিভিন্ন দেশি অস্ত্র। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে পিস্তল দিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা যায় অন্তত পাঁচজন অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি গতকাল হামলার ঘটনা ঘটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এসব হামলার ঘটনাতেও ছাত্রলীগের নাম এসেছে। তবে মূল সংঘর্ষ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৫ জুলাই বেলা তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের সামনে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর আন্দোলনকারীদের খুঁজে খুঁজে পেটায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। পরে বিভিন্ন হলের কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে আন্দোলনকারীদের খুঁজতে থাকেন তারা। হামলার মুখে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বড় অংশ ক্যাম্পাস ছেড়ে আশপাশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন।

হামলায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। এ ছাড়া হামলার ছবি তুলতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আহত ও তাঁদের সঙ্গে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপরও হামলা করে ছাত্রলীগের জঙ্গীরা। সন্ধ্যার পর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ভেতরেও মারধরের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুরো হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা ছোটাছুটি করতে থাকেন।

১৫ জুলাই সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকেও আন্দোলনকারীরা বের হয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেন। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিপুলসংখ্যক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থান নেন। তখন খবর আসে, বিভিন্ন হলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বের হতে বাধা দিচ্ছে ছাত্রলীগ। এ সময় বিজয় একাত্তর হল, জিয়াউর রহমান হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ও জসীমউদ্‌দীন হল থেকে রাজু ভাস্কর্যে থাকা শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়।

বেলা ২টা ২৫ মিনিটে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ টিএসসি থেকে মিছিল নিয়ে পাশাপাশি থাকা ওই হলগুলোর দিকে যান। অন্য অংশটি টিএসসিতে অবস্থান করেন। আন্দোলনকারীরা প্রথমে মিছিল নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান হল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। হলের ভেতরের ফটকের সামনে গিয়ে তাঁরা রিকশায় থাকা মাইকে ‘বঙ্গবন্ধু হলের ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন। কয়েকজন হলের ভেতরে ঢুকে কক্ষে থাকা শিক্ষার্থীদের আনতে যান। মিনিট কয়েক পর মিছিলটি বের হয়ে আসে।

বঙ্গবন্ধু হল থেকে বের হয়ে আন্দোলনকারীদের মাইক থেকে বলা হয়, তাঁরা খবর পেয়েছেন যে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে পার্শ্ববর্তী মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে আটকে রাখা হয়েছে। এরপর তাঁরা যান জিয়াউর রহমান হলে। হলের সামনে গিয়ে তাঁরা ‘দালালদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ নানা স্লোগান দেন। আন্দোলনকারীদের কয়েকজন ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীদের আনতে হলের ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় বাইরে নানা স্লোগান দেওয়া হয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আন্দোলনকারীদের মিছিলটি জিয়াউর রহমান হল থেকে বের হয়ে বিজয় একাত্তর হলের ফটকের দিকে যায়। মিছিলটি হলের ফটকে যাওয়ার পর মাইকে বলা হয়, আন্দোলনকারীদের কয়েকজনকে বিজয় একাত্তর হল সংসদের কক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। একপর্যায়ে মাইকে শিক্ষার্থীদের একাত্তর হলের ভেতরে ঢোকার আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, সন্ত্রাসীদের ধরে নিয়ে আসুন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা হলের বাগানে ঢুকে পড়েন। তখন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ওপর থেকে প্লাস্টিকের বোতল ও ঢিল ছুড়ছিলো। আন্দোলনকারীরাও নিচ থেকে ইট ও পাথরের টুকরা, ছেঁড়া জুতা হলের বিভিন্ন তলায় থাকা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের প্রতিহত করতে থাকেন।

এর মধ্যে বিজয় একাত্তর হলের বাগানে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মারামারি বেঁধে যায়। এ সময় ছাত্রলীগের কিছু নেতা আন্দোলনকারীদের দিকে এগিয়ে এলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। পরে ছাত্রলীগের আরও কিছু নেতা-কর্মী হলের বিভিন্ন তলা থেকে লাঠিসোঁটা, কাঠ, লোহার পাইপ ও বাঁশ নিয়ে দল বেঁধে নিচে নেমে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেন। আন্দোলনকারীরা তখন ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। অনেকে দৌড়ে জসীমউদ্‌দীন হলের ভেতরে প্রবেশ করেন, অনেকে মল চত্বরের দিকে দৌড় দেন। এরপর ছাত্রলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিজয় একাত্তর হলে ঘটনার শুরু হলে ছাত্রলীগের আশপাশের হলগুলোর (বঙ্গবন্ধু হল ও জিয়াউর রহমান হল) নেতা-কর্মীরাও সংঘর্ষে যোগ দেয়। মল চত্বরে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয় মাস্টারদা সূর্য সেন হল শাখা ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। সংঘর্ষ চলাকালে দুই পক্ষ পরস্পরের দিকে ইট ও পাথরের টুকরা ছুড়তে থাকে।

বেলা সোয়া তিনটার দিকে টিএসসি থেকেও আন্দোলনকারীরা এসে সংঘর্ষে যোগ দেন। তাঁরা একজোট হয়ে ইট-পাথর নিক্ষেপসহ ধাওয়া দিলে ছাত্রলীগ হলের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ সময় উত্তেজিত আন্দোলনকারীরা বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বিজয় একাত্তর হলের ফটকে নিরাপত্তা প্রহরীদের বসার কক্ষের জানালার কাচ ভাঙচুর করেন।

এরপর জসীমউদ্‌দীন হলের ছাদে থাকা ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও আন্দোলনকারীদের পাল্টাপাল্টি ইট-পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কিছুক্ষণের জন্য থেমে সাড়ে তিনটার দিকে আবার পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারীদের বেশ কয়েকজনকে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে বেদম পেটান। কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধু হলের কিছু ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী হলের ফটকে লাঠিসোঁটাসহ অবস্থান নেন। তাঁদের লক্ষ্য করে আন্দোলনকারীরা ইট-পাথরের টুকরা নিক্ষেপ করেন, তাঁরাও দু–একবার ইট ছোড়েন আন্দোলনকারীদের দিকে। এরপর আরও দুবার দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। পরে বিকেল পৌনে চারটার দিকে আন্দোলনকারীরা পিছু হটেন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু হলের পেছনের পকেট গেট দিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কিছু ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ প্রবেশ করতে দেখা যায়।

বিকেল চারটার দিকে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও নেতা–কর্মীকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আনে ছাত্রলীগ। তাঁরা দেশি অস্ত্রসহ পুরো ক্যাম্পাসে মহড়া দিতে থাকে। উপাচার্যের বাসভবন এলাকা (ভিসি চত্বর), মল চত্বর, ফুলার রোড, নীলক্ষেত সড়ক, টিএসসি, কলাভবন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁরা শিক্ষার্থীদের খুঁজে খুঁজে মারধর করতে থাকে।

ভিসি চত্বর এলাকায় শতাধিক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে আহত করেন ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। যাঁদের পিটিয়ে আহত করা হয়েছে, তাঁদের বড় অংশই ছিলেন নারী শিক্ষার্থী। হামলায় যাঁরা অংশ নেন, তাঁদের বড় অংশই ছিলেন বহিরাগত। এখানে ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের একাধিক ক্যামেরা ও মুঠোফোন ভাঙচুর করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। মারধর করে বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে।

বিকেল পাঁচটার কিছু আগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে গিয়ে অবস্থান নেন। আর হলের বাইরে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা। দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থান থেকে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পাঁচটার দিকে ওই এলাকায় অন্তত পাঁচটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য দোয়েল চত্বর হয়ে শহীদুল্লাহ হলের সামনে আসেন। পুলিশের সামনেই ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলতে থাকে। পৌনে নয়টার দিকে ছাত্রলীগ চলে যাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যেতে চাইলে পুলিশ তাঁদের আটকে দেয়।

নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘অপমানজনক’ বক্তব্য প্রত্যাহার ও কোটার যৌক্তিক সংস্কারের এক দফা দাবিতে আগামীকাল (আজ) বেলা তিনটায় সারা দেশের সব ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বৃহত্তর গণ–আন্দোলনে যেতে হবে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারীরা যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ঢুকতে না পারে, সে জন্য হলে হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।’

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আরও অন্তত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চালানো এসব হামলার জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া যশোরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছেন হেলমেটধারীরা। আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল রাতে এক ছাত্রকে মারধর করেছেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা–কর্মী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল দিবাগত রাত ১২টার পর দ্বিতীয় দফায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়েছে। এ হামলায় বহিরাগতসহ ছাত্রলীগের দেড় শতাধিক নেতা–কর্মী অংশ নেন বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। তাঁরা বলেন, হামলাকারী ব্যক্তিদের অধিকাংশের মাথায় হেলমেট ও হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল। এ সময় দুটি পেট্রলবোমা ছুড়তে দেখা যায়। হামলা থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীরা ফটক খুলে উপাচার্যের বাসভবনে আশ্রয় নেন। রাত সোয়া ১২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।

২০২৪ সালের এই দিন সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও আপামর সাধারণ ছাত্র পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে যায়।

#জুলাই_ডায়েরি




জুলাই ডায়েরি : ১৪ জুলাই


আজ ঐতিহাসিক ১৪ জুলাই। 

২০২৪ সালের এই দিন আমার স্বাভাবিক ব্যস্ততার দিন। অফিসেই কাজ শেষে সারাদিনের আলোচিত ঘটনা নিয়ে ডিটেইল পড়ছিলাম, ভিডিও দেখছিলাম। সেদিন ট্রাম্প গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। এটাই ছিল ঐদিনের বড় সংবাদ। 


কয়েকটা আন্তর্জাতিক মিডিয়া থেকে বুঝার চেষ্টা করলাম, আমেরিকায় কী হতে যাচ্ছে। কয়েকজন সহকর্মী সাথে ছিল। সন্ধ্যার পর তাদের সাথে এই নিয়ে জ্ঞানগর্ভ :) আলোচনা করছি। 


দেশের বিষয়ও আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তুতে ছিল। হাসিনা দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করলো বিকেলে। কিন্তু বরাবরের মতোই হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে হাসিনার চীন সফর নিয়ে আমরা কৌতুহলী ছিলাম। 


চীন বিষয়ে হাসিনা থেকে কোনো ঘোষণা আসে নাই বিধায় এই সফরে হাসিনার কোনো প্রাপ্তি নেই এটাই ধরে রেখেছিলাম। তাছাড়া ভারতের বাম হাতের জন্য চীন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে সরে গিয়েছে এমন খবরও আমরা আলোচনা করছিলাম।  


কোটা আন্দোলন নিয়ে হাসিনার করা মন্তব্যে আমরা নতুনত্ব পাই নি বিধায় এটা আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে নি। আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল আরেকটি ঘটনা। হাসিনা প্রথম আলোর রোজিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে,  


‘সাংবাদিকদের তথ্য জোগাড় করা এক জিনিস আর ফাইল চুরি আরেক জিনিস। আমি ভ্যাকসিন কিনব, আমার সেখানে নেগোসিয়েশন হচ্ছে। জরুরি পেপার। আপনাদের স্বনামধন্য পত্রিকার এক সাংবাদিক ঢুকে সেই কাগজ চুরি করতে গেল। অফিসার এসে ধরল। ফাইল চুরি করতে গেলে এটা কোনো অপরাধ নয়?’  সেদিন হাসিনা আরো জানিয়েছে তার পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। এটা আলোচনায় এসেছে।  


 চা-চু খেতে খেতে রাত ১০ টা বেজে গেছে। অফিস ক্লোজ করতে যাবো এমন সময় কল করেছে শিবিরের তৎকালীন সোশ্যাল মিডিয়া দায়িত্বশীল। তিনি একটি ভিডিও পাঠিয়ে বললেন, ভাই ঢাবির ছেলেরা শ্লোগান দিচ্ছে, তুমি কে? আমি কে? রাজাকার! রাজাকার!!


ব্যস! অফিস কীভাবে আর ক্লোজ করি? ল্যাপটপ আবার ওপেন করলাম। যুক্ত হয়ে গেলাম ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনে। রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছড়িয়ে গেলো এই শ্লোগান। বারুদের মতো কাজ করলো তা। সারা রাত সেই বারুদে স্পার্ক চালিয়ে গেলাম। 


আমরা জামায়াত শিবির করার কারণে 'রাজাকার' শুনে অভ্যস্ত। এটা আমার মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। কিন্তু জেনজি এটা মেনে নিতে পারে নাই। তাই তারা ক্ষেপে গিয়েছে। বিদ্রোহাত্মক মনোভাব নিয়ে বলেছে আমরাই রাজাকার, যা ইচ্ছা করো!! 


বন্ধুবর কবি আতিফ আবু বকর পার্ফেক্টলি বলেছেন,  


তোমরা কজন 'সাহস' হলে, আমরা হলাম অংশ তার

ফ্যাসিবাদের ধ্বংস লেখার শ্লোগান হলো- রাজাকার।


#জুলাই_ডায়েরি