২৬ আগস্ট, ২০১৬

আপন আলোয় শেখ মুজিব



শেখ সাহেব নিজের মূল্যায়ন যেভাবে করেছেন বা নিজের সম্পর্কে যা বলেছেন বা যা লিখেছেন তার কিছু সংকলন করা হয়েছে এখানে।

ঘটনা #০১
"... দুই দলের নেতৃবৃন্দের একজায়গায় বসা হল, উদ্দেশ্য আপোষ করা যায় কিনা? বগুড়ার ফজলুল বারীকে (এখন পূর্ব বাংলার গভর্ণর মোনেম খান সাহেবের মন্ত্রী হয়েছেন) সভাপতি করে আলোচনা চললো। কথায় কথায় ঝগড়া, তারপর মারামারি হল, শাহ সাহেব অনেক গুন্ডা জোগাড় করে এনেছিলেন। আমরা বলেছিলাম, যদি গুন্ডামি করা হয় তবে কলকাতায় তাকে থাকতে হবে না। শেষ পর্যন্ত আপোষ হল না॥" - (অসমাপ্ত আত্মজীবনী / পৃ: ৩০)

ঘটনা #০২
"... আমি কিছু সংখ্যক ছাত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। খবর যখন রটে গেল লীগ মন্ত্রিত্ব নাই , তখন দেখি টুপি ও পাগড়ী পরা মাড়োয়ারিরা বাজি পোড়াতে শুরু করেছে এবং হৈচৈ করতে আরম্ভ করেছে। সহ্য করতে না পেরে , আরো অনেক কর্মী ছিল, মাড়োয়ারিদের খুব মারপিট করলাম, ওরা ভাগতে শুরু করলো। জনাব মোহাম্মাদ আলী বাইরে এসে আমাকে ধরে ফেললেন এবং সকলকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন॥" - (অসমাপ্ত আত্মজীবনী / পৃ: ৩৩)

ঘটনা #০৩
"... কাউন্সিল সভা যখন শুরু হল, মওলানা আকরম খাঁ সাহেব কিছু সময় বক্তৃতা করলেন। তারপরই আবুল হাশিম সাহেব সেক্রেটারি হিসেবে বক্তৃতা দিতে উঠলেন। কিছু সময় বক্তৃতা দেওয়ার পরই নাজিমুদ্দিন সাহেবের দলের কয়েকজন তার বক্তৃতার সময় গোলমাল করতে আরম্ভ করলেন। আমরাও তার প্রতিবাদ করলাম, সাথে সাথে গন্ডগোল শুরু হয়ে গেল। সমস্ত যুবক সদস্যই ছিল শহীদ সাহেবের দলে, আমাদের সাথে টিকবে কেমন করে! নাজিমুদ্দিন সাহেবকে কেউ কিছু বললো না। তবে তার দলের সকলেরই কিছু কিছু মারপিট কপালে জুটেছিল।

আমি ও আমার বন্ধু আজিজ সাহেব দেখলাম, শাহ আজিজুর রহমান সাহেব ছাত্রলীগের ফাইল নিয়ে নাজিমুদ্দিন সাহেবের পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ও আজিজ পরামর্শ করছি শাহ সাহেবের কাছ থেকে এই খাতাগুলি কেড়ে নিতে হবে, আমাদের ছাত্রলীগের কাজে সাহায্য হবে। নাজিমুদ্দিন সাহেব যখন চলে যাচ্ছিলেন, শাহ সাহেবও রওয়ানা করলেন, আজিজ তাঁকে ধরে ফেলল। আমি খাতাগুলি কেড়ে নিয়ে বললাম, কথা বলবেন না, চলে যাবেন॥" - (অসমাপ্ত আত্মজীবনী / পৃ: ৪৪)

ঘটনা #০৪
"... শহীদ সাহেব আসছেন, তাকে সংবর্ধনা দিব, যদি কেউ পারে যেন মোকাবেলা করে। আমি রাতে লোক পাঠিয়ে দিলাম। যেদিন দুপুরে শহীদ সাহেব আসবেন সেদিন সকালে কয়েক হাজার লোক সড়কি, বল্লম, দেশী অস্ত্র নিয়ে হাযির হল। সালাম সাহেবের লোকজনও এসেছিল। তিনি বাঁধা দেবার চেষ্টা করেন নাই। তবে, শহীদ সাহেব, হাশিম সাহেব ও লাল মিয়া সাহেবের বক্তৃতা হয়ে গেলে সালাম সাহেব যখন বক্তৃতা করতে উঠলেন তখন 'সালাম সাহেব জিন্দাবাদ' দিলেই আমাদের লোকেরা 'মূর্দাবাদ' দিয়ে উঠল। দুই পক্ষে গোলমাল শুরু হল। শেষ পর্যন্ত সালাম সাহেবের লোকেরা চলে গেল। আমাদের লোকেরা তাদের পিছে ধাওয়া করল। শহীদ সাহেব মিটিং ছেড়ে দুই পক্ষের ভিতর ঢুকে পড়লেন। তখন দুই পক্ষের হাতেই ঢাল, তলোয়ার রয়েছে। কতজন খুন হবে ঠিক নাই। শহীদ সাহেব এইভাবে খালি হাতে দাঙ্গাকারী দুই দলের মধ্যে চলে আসতে পারেন দেখে সকলে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল॥" - (অসমাপ্ত আত্মজীবনী / পৃ: ৪৬)

ঘটনা #০৫
"... একদিন নুরুদ্দিন, নুরুল আলম ও কাজী ইদ্রিস সাহেব আমাকে ডেকে পাঠালেন বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে, আমার বাসার কাছে। জিজ্ঞাসা করলাম, 'ব্যাপার কি?' ওরা আমাকে বলল, 'সর্বনাশ হয়ে গেছে, আবুল হাশিম সাহেব প্রেস বিক্রি করে ফেলতে চান, আমরা চাঁদা তুলে প্রেস করেছি, মুখ দেখাব কি করে?' আমি বললাম, 'আমি কি করব?' সকলে বলল, 'তোমাকে বাঁধা দিতে হবে।' বললাম, 'আমি কেন বাঁধা দেব? আমি পাকিস্তানে চলে যাব আর কবে দেখা হবে ঠিক নাই। আমার প্রয়োজন কি? তোমরা হাশিম সাহেবের খলিফা, আমার নাম তো পূর্বেই কাটা গেছে, আর কেন?' সকলে বলল, 'তুমি বললেই আর ভয়েতে বিক্রি করবে না।' বললাম, 'ঠিক আছে আমি অনুরোধ করতে পারি।'

পরের দিন মিল্লাত প্রেসে গিয়ে হাশিম সাথে দেখা করি। পাশের ঘরে আমার সহকর্মীরা চুপ করে আছে, শুনবে আমাদের কথা। আমি খুব শান্তভাবে তাকে বললাম, 'প্রেসটা নাকি বিক্রি করবেন?' বললেন, 'উপায় কি? প্রত্যেক মাসেই লোকসান যাচ্ছে, কি করি? আর চালাবে কে?' আমি বললাম, 'খন্দকার নুরুল আলম তো ম্যানেজার হয়ে এতকাল চালাল। খরচ কমিয়ে ফেলল। প্রেসটা বিক্রি করে দিলে কর্মচারীদের থাকবে কি? আর আমরা মুখ দেখাতে পারব না। সমস্ত বাংলাদেশ থেকে চাঁদা তুলেছি, লোকে আমাদের গালি দিবে।' হাশিম সাহেব হঠাৎ রাগ করে ফেললেন এবং বললেন, 'আমাকে বেচতেই হবে, কারণ দেনা শোধ করবে কে?' আমি বললাম, 'কয়েকমাস পূর্বে যে প্রেসটা বিক্রি হল তাতে দেনা শোধ হয় নাই?' তিন ভীষণ রেগে গেলেন, আমারও রাগ হল। উঠে আসার সময় বলে এলাম, 'প্রেস বিক্রি করতে গেলে আমি বাঁধা দেব, দেখি কে আসে এই মিল্লাত প্রেসে?' হাশিম সাহেব খুব দু:খ পেলেন আমার কথায়।

পরের দিন ঐ বন্ধুরা আবার আমার কাছে এসে বলল, 'হাশিম সাহেব খানা খান না। শুধু বলেন, মুজিব আমাকে অপমান করল। তুই আবার দেখা কর, আর বলে দে, যা ভাল বোঝেন করেন।' আমি বললাম, 'তোমরা খেলা পেয়েছ?" - (অসমাপ্ত আত্মজীবনী / পৃ: ৭৯)

ঘটনা #০৬
"... শামসুল হক সাহেব ও আমি দুইজনই একগুঁয়ে ছিলাম। দরকার হলে সমানে হাতও চালাতে পারতাম আর এটা আমার ছোটকাল থেকে বদ অভ্যাস ছিল॥" - (অসমাপ্ত আত্মজীবনী / পৃ: ৯৫)

ঘটনা #০৭
"... আমি মনকে কিছুতেই সান্ত্বনা দিতে পারছি না। কারণ, শহীদ সাহেব আইনমন্ত্রী হয়েছেন কেন? রাতে পৌঁছে আমি তার সাথে দেখা করতে যাই নাই। দেখা হলে কি অবস্থা হয় বলা যায় না। আমি তার সাথে বেয়াদবি করে ফেলতে পারি। পরের দিন সকাল নয়টায় আমি হোটেল মেট্রোপোলে তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। তিনি বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, 'গতরাতে এসেছ শুনলাম, রাতেই দেখা করা উচিত ছিল।' আমি বললাম, 'ক্লান্ত ছিলাম আর এসেই বা কি করব, আপনি তো এখন মোহাম্মদ আলী সাহেবের আইনমন্ত্রী।' তিনি বললেন, 'রাগ করছ, বোধহয়।' বললাম, 'রাগ করব কেন স্যার? ভাবছি সারা জীবন আপনাকে নেতা মেনে ভুলই করেছি কি না?' তিনি অমার দিকে চেয়ে বললেন, 'বুঝেছি, আর বলতে হবে না, বিকেল তিনটায় এস, অনেক কথা আছে॥" - (অসমাপ্ত আত্মজীবনী । পৃ: ২৮৫)

Kumar Parveen ভাই এর সংকলন থেকে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন