২৫ নভেম্বর, ২০১৬

জামায়াতের আমীরঃ একটি লোমহর্ষক অপরাধের নাম



ধরুন আপনার বাড়ির পাশে ডাকাতি হচ্ছে অথবা দু'দল মানুষ মারামারি করছে অথবা রাস্তায় স্কুল কলেজে যাওয়ার পথে বখাটেরা ছাত্রীদের উত্যক্ত করে আপনি এসব দেখে পুলিশ স্টেশনে ফোন দিয়ে বললেন দয়া করে আসুন এখানে সমস্যা হচ্ছে। একবার, দু'বার কিংবা তিনবার আপনি ফোন করে কেবল ক্লান্তই হবেন পুলিশের সাহায্য পাওয়া আর আপনার হবে না। কিন্তু একবার যদি আপনি ফোন করে বলেন এখানে জামায়াতের কয়েকজন লোক বসে চা খাচ্ছে। আপনার ফোন রাখতে দেরী হবে, পুলিশের আসতে দেরী হবে না। 

এবার আপনি বুঝতেই পারেন, জামায়াতের কর্মীরা কী পরিমাণ ভয়ংকর! আর তাদের আমীর যে ড্রাকুলা কিংবা রক্তখেকো জঘন্য হবে তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশে যে অপরাধই হোক না কেন তা করবে ওই জামায়াতের আমীর বা কর্মীরাই। এরা ছাড়া বাংলাদেশে আর অন্যায়কারী কেউ নেই। একাত্তরে রাজাকারদের শাস্তি দেয়া হবে। ভালো কথা। রাজাকারের তালিকা তালিকার জায়গায় পড়ে আছে। তাদের বিনিময়ে একের পর এক খুন করা হলো জামায়াতের নেতাদের। দেশে প্রায় সাইত্রিশ হাজার রাজাকার ইউনিট কমান্ডার ছিলেন, তাদের প্রত্যেকের অধীনে আরো চার পাঁচ জন করে রাজাকার সদস্য ছিল। সমস্ত রাজাকারের দায় নিয়ে খুন হয়েছেন বা শাস্তি পাচ্ছেন রাজাকারের তালিকায় যারা ছিলেন না এমন আট দশজন মানুষ। কারণ তারা জামায়াত করেন। 

আর যে পালের গোদা মানে যিনি ছিলেন রাজাকার প্রধান সে ডি আই জি আবদুর রহীমকে পুরস্কিত করেছেন স্বয়ং শেখ মুজিব। শেখ মুজিব স্বাধীনতা যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণের জন্য ১২ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির প্রধান ও পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র সচিব করেছিলেন। এরকম কোন রাজাকার কমান্ডারেরই বিচার হয়নি। বিচার হয়নি এমন মানুষের যারা স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহন করেছেন স্বাধীনতার বিপক্ষেই এমন সেনা সদস্যদের। তারাও পুরস্কিত হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের মাধ্যমে। 

টিক্কা খানের কথা আপনারা শুনে থাকবেন। বার বার উচ্চারিত হয় এই সেনা অফিসারের নাম। তার সাথে গোলাম আযম একটা মিটিং করেছেন কিভাবে দেশে যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায় সেজন্য। এই অপরাধে গোলাম আযম যুদ্ধাপরাধী। অথচ তার পি এস, তার সকল কর্মকান্ডের সাক্ষী এবং অনেক কর্মকান্ডের উদ্যোক্তা, যোগানদাতা সেই  নুরুল ইসলাম অনু যিনি এখন স্বাধীনতার স্বপক্ষের বড় নেতা। তিনি কোন শাস্তি পাওয়াতো দূরস্থান বরং শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট হয়ে তাকে তার পি এস বানিয়ে নেন।  এখন তিনি ব্যংক এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আওয়ামীলীগ নেতা। তিনি এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক। 

এভাবে বহু মানুষ স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন, স্বাধীনতাপন্থীদের অত্যাচার নির্যাতন করেছেন কিন্তু তারা সবাই এখন খুব নির্দোষ, নিষ্পাপ, মাসুম বাচ্চা। বলা হয় একাত্তরে খুন হয়েছে তিরিশ লাখ। এত সব খুনের সব দায় একা জামায়াত নেতাদের। তারা সব মানুষকে টিপে টিপে হত্যা করেছে! একাত্তরে যারা স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন তাদের সাথে পরিচিত হোন ১ম পর্ব২য় পর্ব।  

এবার আসি জামায়াতের সদ্য নির্বাচিত আমীর মকবুল আহমাদ প্রসঙ্গে। প্রথমবারের মতো দলের শীর্ষ নেতৃত্বে একাত্তরে সংঘটিত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে মুক্ত হলো’ এমন আলোচনা এবং সংবাদ পরিবেশন হওয়ার মধ্যেই হঠাৎ ‘হত্যার নির্দেশদাতা’ হিসেবে অভিযুক্ত হলেন জামায়াতে ইসলামীর নতুন আমির মকবুল আহমাদ। পাশাপাশি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার কমান্ডার ছিলেন বলে অভিযোগ এনেছেন ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মীর আবদুল হান্নান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন মকবুল আহমাদ রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তারই নির্দেশে ফেনীর স্থানীয় রাজাকার, আলবদর বাহিনীর সদস্যরা ফেনী কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা ওয়াজ উদ্দিনকে চট্টগ্রামে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।’ 

ঢাকা টাইমস নামক একটি সংবাদ মাধ্যম থেকেই উদাহরণ দেই তারা ১৭ অক্টোবর রিপোর্ট করেছে, স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী যাদেরকে তাদের নেতা বানিয়েছে তাদের মধ্যে মকবুল আহমাদই প্রথম নেতা যার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা বা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নেই। তবে জামায়াত একান্ত বাধ্য হয়েই তাকে নেতা নির্বাচিত করেছে। কারণ দলটির যারা আলোচিত নেতা ছিলেন ইতোমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধে তাদের পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করছেন একজন। ফাঁসির রায়ের পর দুইজনের শুনানি অপেক্ষায় আছে আপিল বিভাগে। এই অবস্থায় মকবুল আহমাদই সবচেয়ে ‘জ্যেষ্ঠ’ জামায়াত নেতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল হান্নানের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘জামায়াত নেতা মকবুল আহমাদের বিষয়ে আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ পাইনি। যেহেতু অভিযোগ পাইনি সুতরাং তদন্তের প্রশ্নই উঠে না।

আবার সেই পত্রিকাই ১৪ নভেম্বর ২০১৬ রিপোর্ট করেছে জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের কিছু তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান। সোমবার ধানমন্ডিতে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে মৌলভীবাজারের তিন জনের বিরু্দ্ধে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। হান্নান খান বলেন, পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মকবুল আহমাদর বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে তদন্ত সংস্থা। তদন্তে অগ্রগতিও হয়েছে। কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার বিষয়টি জানানো হবে।

জনাব মকবুল আহমাদ প্রায় ছয় বছর ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আমীরের দায়িত্ব পালন শেষে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমীর নির্বাচিত হয়ে দলের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছেন এবং শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত তার ভাষণ দেশে-বিদেশে জামায়াতের নেতাকর্মীদের যেমন উজ্জীবিত করেছে তেমনি আলেম-ওলামা এবং সহযোগী রাজনীতিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এটি সহ্য করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। কাজেই জনাব মকবুলকে ঠেকানো নয়, জামায়াতকে ঠেকানো তারা জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছে। এখন তারা তাকে রাজাকার বানাচ্ছেন এবং কোনো প্রকার সাক্ষী সাবুদ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বা পরিবারসমূহের অভিযোগের ভিত্তিতেও নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মিথ্যা ও বানোয়াট কল্পকাহিনীর ভিত্তিতে তাকে ফাঁসানোর অপচেষ্টা চলছে।

আইসিটির একজন কর্মকর্তা ইতোমধ্যে বলেছেন যে, রাজাকারদের তালিকায় নাকি তার নাম পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী বিষয়টিকে হাস্যস্পদ বলে অভিহিত করেছেন। জনাব মকবুল আহমাদের পিতা একজন অবস্থাসম্পন্ন দানশীল ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। মাসিক নব্বই টাকা বেতনের জন্য তিনি অথবা তার ভাই রাজাকারের চাকরি গ্রহণ করেছিলেন এটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। তার বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে তার গ্রাম বা ইউনিয়ন অথবা পার্শ্ববর্তী গ্রামের কোনোও লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন নজির নেই। সৎ জীবন-যাপনের অংশ হিসেবে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকতার জীবন বেছে নিয়েছিলেন।

তার বিরুদ্ধে খুশিপুর গ্রামের আহসান উল্লাহকে হত্যার নির্দেশ দানের যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে তাও মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। আহসান উল্লাহর স্ত্রী সালেহা বেগম এবং তার ভাই মুজিবল হক এই অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন যে, আহসান উল্লাহ তার সাত মাস বয়সী ছেলের অসুস্থতার খবর পেয়ে তাকে দেখার জন্য বাড়ি এসেছিলেন এবং পরে তিনি বাড়ি থেকে ছিলনিয়া বাজারে যান এবং সেখান থেকে ফেরত আসেননি। ধরে নেয়া হয়েছে যে তিনি মারা গেছেন; কিন্তু তার লাশ কোথাও পাওয়া যায়নি। এর সাথে জনাব মকবুল আহমাদের কোনো সংশ্লিষ্ট ছিল না।

একইভাবে লালপুর গ্রামের হিন্দু পাড়ার আগুন দেয়া এবং ১১ ব্যক্তিকে হত্যা করার যে অভিযোগ এখন তার বিরুদ্ধে আনা হচ্ছে লালপুরের হিন্দু পাড়ার বাসিন্দারাও তাকে সর্বৈব মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। তারা বলেছেন যে, জনাব মকবুল আহমাদ ও তার দল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাদের সহযোগিতা করেছেন; বিপদে-আপদে সাহায্য করেছেন। তাদের পাড়ায় আগুন লাগানো অথবা হিন্দুদের হত্যা করার সাথে তার কোনো সংশ্রব নেই। তারা এও অভিযোগ করেছেন যে, জনাব মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য কিছু কিছু লোক ও দল তাদের বিভিন্নভাবে ভয় ও প্রলোভন দেখাচ্ছে, কিভাবে সাক্ষ্য দিতে হবে বাতলিয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য এটি একটি নির্লজ্জ প্রচেষ্টা।

গত শনিবার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ‘জামায়াত আমীর মকবুলের চিঠিতেই একাত্তরে হত্যার প্রমাণ’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্টটিতে জামায়াতে ইসলামীর ফেনী মহকুমার প্যাড ব্যবহার করে মহকুমা আমীর হিসেবে জনাব মকবুল আহমাদ কর্তৃক রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামে ভারপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসার জনাব ফজলুল হককে স্বহস্তে ইংরেজিতে একটি চিঠি লিখেছেন বলে দেখানো হয়েছে। চিঠিটি রহস্যজনক। চিঠিতে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ)-এর নেতা মাওলানা ওয়াজ উদ্দিনের চট্টগ্রাম যাবার তথ্য দিয়েতাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তার গতিবিধি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে ... ইত্যাদি ইত্যাদি।

এখানে অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। 
এক. ১৯৭১ সালে ফেনী মহকুমা জামায়াতের কোনো আমীর ছিলেন না, এই পদও ছিল না। তখন পদটির নাম ছিল নাজেম এবং জনাব মকবুল আহমাদ নাজেম পদেও ছিলেন না, অন্য এক স্থানীয় ব্যক্তি নাজেম ছিলেন। 

দুই. প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের কিছু কালচার বা সংস্কৃতি থাকে এবং তা শুরু থেকেই গড়ে উঠে। জামায়াতে ইসলামীর কালচার হচ্ছে সরকারি, বেসরকারি অথবা আধা-সরকারি, যে ধরনের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক পত্রই হোক না কেন ‘আসসালামু আলাইকুম’ দিয়ে তা শুরু করা হয়। এক্ষেত্রে তা নেই।

তিন. রেডিও পাকিস্তান, চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসারকে তিনি পত্র লিখতে যাবেন কেন? চট্টগ্রামে কি তার সংগঠনের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি ছিলেন না?’ আরো কথা আছে ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে রেডিও পাকিস্তানের কোনো আঞ্চলিক দফতর ছিল না। চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়ে নোঙ্গর করা জাপানী একটি জাহাজের ট্রান্সমিশন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রথমত এবং পরে কোলকাতা থেকে আরো যন্ত্রপাতি এনে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রাথমিক অবস্থায় মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ব্যাপক গোলাগুলির কারণে মে মাসের ২৫ তারিখে বেতার কেন্দ্রটি কোলকাতায় স্থানান্তরিত হয় এবং যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা সেখানেই থাকে। কাজেই আগস্ট মাসে ফজলুল হকের রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসার হিসেবে থাকার প্রশ্নটি অবান্তর।

চার. তথাকথিত চিঠিটির হাতের লেখার সাথে আমীরে জামায়াত জনাব মকবুল আহমাদের হাতের লেখা, বাক্য গঠনপ্রণালী এবং নামের বানান কোনোটারই মিল নেই।

ফেনীর মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার  মীর আব্দুল হান্নান ফেনীর বাসিন্দা। মকবুল সাহেবও ফেনীর বাসিন্দা। অথচ হান্নান সাহেব এতদিন জানতেন না মকবুল আহমাদ নামে এতবড় একজন একাত্তরের খুনী আছেন। বিগত ছয়টি বছর মকবুল সাহেব ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে ছিলেন, তার নাম বহুবার পত্র পত্রিকায় নাম এসেছে তারপরও হান্নান সাহেব তাকে চিনতে পারে নাই। অথচ এই মকবুল সাহেবের বিরুদ্ধেই সে অসীম সাহসীকতার সাথে যুদ্ধ করেছে ফেনীতে। বিগত চল্লিশ বছরে একবারের জন্যও তার মনে পড়ে নাই মকবুল সাহেবের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথা। কোন মামলা বা কোথাও সে অভিযোগ করেনি। বক্তব্য বিবৃতিও দেয়নি। হঠাৎ করে তিনি যখন জামায়তের আমীর হলেন তখন সহসা তার সব বাঁধ খুলে যায়। চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর আগের স্মৃতি মনে পড়ে যায় হড় হড় করে। অবলীয়ায় বলতে লাগলেন মকবুল আহমাদের নৃশংস সব হত্যাযজ্ঞের কথা! 

ঘটনা যখন এরকম তখন আমরা যারা আম পাবলিক আছি তাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, জামায়াতের আমীর, এটিই একটি লোমহর্ষক অপরাধের নাম। এখানে মকবুল আহমাদ বলে কিছু নেই! আজকে আমাকে কিংবা আপনাকে যদি জামায়াতের আমীর বানিয়ে দেয়া হয় তাহলে দেখবেন কালই আমি কিংবা আপনি হয়ে পড়বেন এক অবমৃশ্যকারী শয়তান! শত শত মেয়ের ইজ্জত হরণকারী, বাংলা মায়ের বহু দামাল ছেলের হত্যাকারী। 

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি... 

১৮ নভেম্বর, ২০১৬

রোহিঙ্গা সমস্যাঃ ঐতিহ্য এবং দূর্দশা


পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষ প্রায় দুহাজার বছর আগে থেকে বিভিন্ন সময়ে ধর্ম প্রচার, বাণিজ্য ও যুদ্ধবিগ্রহের শিকার হয়ে পূর্ব এশিয়ার সমুদ্র তীরবর্তী ‘রোসাঙ্গ’ বা আরাকান রাজ্যে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। রোসাঙ্গ বা আরাকান বর্তমান মায়ানমার রাষ্ট্রের একটি প্রদেশ বা রাজ্য। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, এটা মিয়ানমার স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করলেও সারাবিশ্বে সর্বজনস্বীকৃত বিষয়। বাংলায় ইসলাম আগমনের সময়কাল থেকেই আরাকানে ইসলামের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চল দীর্ঘকালব্যাপী আরাকানের অংশ হিসেবে শাসিত হওয়ার কারণে চট্টগ্রাম থেকেই আরাকানের বিভিন্ন স্থানে ইসলামের সুমহান বাণী সম্প্রসারিত হতে থাকে।

পরবর্তীতে ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দে মিঙসুয়ামুঙ ওরফে নরমিখলা যার মুসলিম নাম ছিল মুহাম্মদ সুলায়মান শাহ কর্তৃক আরাকান পুনরুদ্ধারের পর থেকে আরাকানে মুসলমানদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। এমনকি আরাকানের রাজধানী লংগ্রেত থেকে ম্রোহঙ এ স্থনান্তর করা হলে সেখানকার প্রায় সকল অধিবাসীই মুসলিম ছিলেন এবং ম্রোহংয়ের অধিবাসীদেরকেই রোহিঙ্গা নামে আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে। বর্তমানে রোহিঙ্গা বলতে আরাকানের মুসলমানদেরকেই ধরে নেয়া হয়। কেননা রোহিঙ্গারাই ছিলেন আরাকানের প্রধান মুসলিম জনগোষ্ঠী। ব্রিটিশ আমল থেকে রাজ্যটি বার্মার অংশ থাকার কারণে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে বার্মা স্বাধীনতা লাভের সময় বার্মার অংশ হিসেবে থেকে যায়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আরাকান রাজ্যটি কখনো বার্মার, কখনো আরব ও বাঙালির স্বাধীন রাজ্য হিসেবে শাসিত হয়েছে। দুহাজার বছরের ইতিহাসে মুসলিম, বৌদ্ধ, মগ ও বাঙালিদের শাসনকাল ছিল অনেক বেশি। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু। বেঁচে থাকা ও নিজভূমিতে অবস্থান সব মানুষের জন্মগত অধিকার। এ অধিকার থেকে বঞ্চিত রোহিঙ্গাদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার করুণ আর্তি ও অতীত ইতিহাস বিশ্ববিবেকের সামনে তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন।

১. আরাকানে মুসলমানদের আগমন : আরাকান চন্দ্রবংশীয় রাজবংশের সংরক্ষিত ইতিহাস ‘রাদ জাতুয়ে’র বর্ণনা মতে রাজা মহত ইং চন্দ্রের রাজত্ব কালে (৭৮৮-৮১০) একটি আরবীয় বাণিজ্য বহর আরাকানের রামব্রী উপকূলে আঘাত খেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। জাহাজের আরোহীরা ভাসতে ভাসতে উপকূলে এসে ভিড়লে পর রাজা মহত ইং চন্দ্র তাদের স্থায়ীভাবে আরাকানে বসবাসের অনুমতি দেন। পরবর্তীতে এসব মুসলিম নাবিক পেশা ত্যাগ করে আরাকানি রমণী বিয়ে করে স্থায়ীভাবে আরাকানে বসবাস শুরু করেন। ধারণা করা যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাণিজ্য বহর থেকে ভেসে আসা আরবীয় মুসলমানদের এই বড় দলটির মাধ্যমেই আরাকানে মুসলিম আধিপত্যের বিস্তার ঘটে। তবে কেউ কেউ মনে করেন ইসলামের আবির্ভাবের আগে থেকে পর্তুগিজ বণিকদের পাশাপাশি আরব বণিকরা চট্টগ্রাম ও আরাকানে তাদের বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলেন। তখন থেকেই আরাকানে আরবি ও মুসলিম প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে আরাকান ও পার্শ্ববর্তী দ্বীপসমূহে মুসলমানদের প্রভাব-প্রতিপত্তি এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, তারা আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র করেছিল বলে অনেক গবেষকদের ধারণা। খ্রিস্টীয় সপ্তম ও অষ্টম শতকের আরবীয় ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকরা বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী ‘রুহমী’ নামক একটি রাজ্যের পরিচয় তুলে ধরেছেন। ‘রুহমী’ রাজ্যের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান আরাকান রাজ্যই আরবীয়দের কাছে ‘রুহমী’ নামে পরিচিত ছিল। ‘রুহমী’ দেশের বাদশার সঙ্গে বাগদাদে আব্বাসীয় খলিফাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের উল্লেখও ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে রয়েছে।

মুসলিম শাসনের সূত্রপাতঃ খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা করায়ত্বের দুশ বছর পর গৌরাধীপতি হন সুলতান জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ। এ সময় আরাকানে রাজ্যত্ব করছিলেন ম্রাউক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মেং সোয়া মউন নামান্তরে নরমিখলা। ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দে চব্বিশ বছর বয়সে নরমিখলা সিংহাসনে আরোহণ করেন। তৎকালীন বার্মার সামন্ত রাজারা একজোট হয়ে বার্মার রাজা মেং-শো-আইকে আরাকান আক্রমণ করার জন্য আমন্ত্রণ করেন। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে রাজা মেং-শো-আই ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান আমন্ত্রণ করেন। এতে নরমিখলা পরাজিত হয়ে প্রাণ ভয়ে বাংলার রাজধানী গৌরে এসে সুলতান জালাল উদ্দিন শাহের আশ্রয় গ্রহণ করেন। আরাকান বার্মার অধিকারভুক্ত হয়। সুদীর্ঘ চব্বিশ বছর গৌরে অবস্থান করে তিনি মুসলমান ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, বিজ্ঞান প্রভৃতিতে প্রচুর জ্ঞান অর্জন করেন। 

স্বদেশ উদ্ধারের জন্য নরমিখলার সাহায্য প্রার্থনার অনুরোধে গৌরের সুলতান জালাল উদ্দিন শাহ ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে ওয়ালী খানের নেতৃত্বে এক সৈন্য বাহিনী পাঠান। ওয়ালী খান বর্মি বাহিনীকে বিতারিত করে আরাকান পুনরুদ্ধার করার পর বিশ্বাসঘাতকতা করে আরাকান রাজ নরমিখলাকে বন্দি করে নিজেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বন্দিদশা থেকে কোনোক্রমে পালিয়ে নরমিখলা গৌরে এসে সুলতান জালাল উদ্দিন শাহকে সব কথা খুলে বলেন। পরবর্তী বছর ১৪৩১ খ্রিস্টাব্দে জালাল উদ্দিন শাহ, সিন্দিখান নামক অপর এক সেনাপতির নেতৃত্বে পুনরায় একটি সৈন্যবাহিনী দিয়ে নরমিখলাকে স্বদেশ উদ্ধারে সাহায্য করেন। এটিই ছিল ইতিহাসে প্রথম বাংলা-বার্মা যুদ্ধ। ১৪৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে গৌরের করদ রাজ্য হিসেবে নরমিখলা আরাকানের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করে ম্রউক-উ রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৪৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একশ বছর আরাকান বাংলার করদ রাজ্য হিসেবে নিয়মিত কর প্রদান করত। যুদ্ধের সময় গৌর থেকে আগত সব সৈন্যকে আরাকান রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য স্থায়ীভাবে রাখা হয়। তারা কোনোদিন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেনি। এরা আরাকানে আগত মুসলমানদের একটি বৃহৎ অংশ।

মোঘলদের আগমন ও চট্টগ্রামে আধিপত্যঃ আরাকানে মুসলমানদের আগমনের অন্যতম তৃতীয় কারণ ছিল মুগল সম্রাট শাহজাহান ১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে অসুস্থ হয়ে পড়লে পুত্রদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে উত্তরাধিকার যুদ্ধ। যুদ্ধে প্রথম মুরাদ আওরঙ্গজেবকে সহযোগিতা করলেও পরে বন্দি হন। দিল্লি থেকে বিতারিত হন দারাশিকো। সিংহাসন দখলের জন্য বাংলা থেকে দিল্লি অভিমুখী শাহ সুজার সঙ্গে ১৫৫৯ খ্রিস্টাব্দে সাজুয়া নামক স্থানে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শাহ সুজা বাংলার দিকে পলায়ন করেন। মুগল সেনাপতি মীর জুমলা তাকে ধাওয়া করলে শাহ সুজা চট্টগ্রামের পথে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে সপরিবার ও দলবল অনুচর বাহিনী নিয়ে আরাকানে পালিয়ে যান। আরাকানের তৎকালীন রাজা সান্দা-থু ধর্ম্মা প্রথম তাকে রাজকীয় সম্মান দেখিয়ে গ্রহণ করেন। শাহ সুজার মূল্যবান সম্পদ ও অপূর্ব সুন্দরী কন্যা আমেনাকে দেখে সান্দা-থু ধর্ম্মা পাগল হয়ে ওঠেন। আমেনাকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠালে মুগল বংশীয় শাহ সুজা ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেন। এ নিয়ে শাহ সুজার সঙ্গে সান্দা-থু ধর্ম্মার যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে শাহ সুজা পরাজিত হলে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ মর্মান্তিক ঘটনায় ক্ষিপ্ত মুসলমানদের সঙ্গে শুরু হয় রাজার সংঘাত। নিজ ভ্রাতার মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদ সম্রাট আওরঙ্গজেবকেও বিচলিত করে তোলে। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খানকে নির্দেশ দেন চট্টগ্রাম দখল করার জন্য। চট্টগ্রাম ছিল আরাকান রাজার অধীন। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম দখল করেন। নবাব শায়েস্তাখান কক্সবাজারের রামু পর্যন্ত অধিকার করে আর অগ্রসর হননি। অগ্রসর হয়ে গোটা আরাকান দখল করলে আজ আরাকান থাকত চট্টগ্রামের মতো বাংলাদেশের অংশ।

বর্মী রাজের আরাকান দখল, নির্যাতন অতঃপর মুক্তিসংগ্রাম : চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে চলে আসা দীর্ঘদিনে আরাকানি সামন্ত রাজাদের মধ্যে দেখা দেয় মতবিরোধ। একে অপরের ক্ষমতা দখল সহ্য করতে পারেনি। কতিপয় সামন্ত রাজা একত্রিত হয়ে ঘা-থান-ডির নেতৃত্বে বার্মায় গিয়ে বার্মার রাজা বোদা পায়াকে আরাকান আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। সামন্ত রাজা ঘা-থান-ডি ও বার্মার রাজার মধ্যে চুক্তি ছিল যে, বার্মার রাজা বোদা পায়া আরাকানের স্বাধীন সত্ত্বা অক্ষুন্ন রাখবেন এবং ঘা-থান-ডিকে আরাকানের স্বাধীন রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দিবেন। বিনিময়ে ঘা-থান-ডি বার্মার রাজাকে বার্ষিক কর প্রদান করবেন। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বার্মার রাজা এক শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে আরাকান আক্রমণ করে দখল করেন। বোদা পায়া আরাকান দখল করে সব চুক্তি অস্বীকার করে আরাকানকে বার্মার অংশে পরিণত করেন। ঘা-থান-ডিকে রাজা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পরিবর্তে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ করা হয়। অতি অল্প দিনের মধ্যেই আরাকানিরা দেখতে পেল বর্মী সৈন্যদের নির্মম বর্বর ও পাশবিক অত্যাচার। তের বছরের মধ্যে রাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ অধিবাসী পালিয়ে সীমান্তবর্র্তী পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। বর্মীদের অত্যাচার ও নির্যাতনে তখন নাফ নদীর পানি আরাকানিদের মৃতদেহে ভরে ওঠে। তখন থেকেই শুরু হয় আরাকানি রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা ও শরণার্থী সমস্যা। এ থেকেই শুরু হয় আরাকানি বা রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম। বর্মী সৈন্যদের অত্যাচারে ঘা-থান-ডি এক বিরাট অনুচর বাহিনী নিয়ে সপরিবারে আরাকান ত্যাগ করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেন। ঘা-থান-ডির আগমনের পর আরাকানি বিদ্রোহীদের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং মুক্তিযুুদ্ধ জোরদার হয়। ঘা-থান-ডির মৃত্যুর পর তৎপুত্র সিনপিয়া মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। তুমুল সংগ্রামের মাধ্যমে একমাত্র রাজধানী ম্রোহং ছাড়া সমগ্র আরাকান সিনপিয়া বাহিনী দখল করে নেন। রাজধানী ম্রোহং অবরোধ করার পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অসহযোগিতা ও চরম বিশ্বাসঘাতকতা, গোলাবারুদের ঘাটতি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আমন্ত্রণ স্তিমিত হয়ে আসে। এতে পরাজয় বরণ করে সিনপিয়া পুনরায় পালিয়ে কোম্পানির অধিকৃত পর্বত এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। বিপদসংকুল পরিবেশে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে সিনপিয়া মৃত্যুবরণ করেন।

ব্রিটিশদের আরাকান ও বার্মা দখল : বিদ্রোহী নেতা সিনপিয়ার মৃত্যুর পর ব্রিটিশ বার্মার দুই মিত্র শক্তি অভিন্ন স্বার্থের কারণে শত্রু শক্তিতে পরিণত হয়। সত্তর বছরের ইতিহাসে ব্রিটিশ বার্মার মধ্যে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ ছাড়াও বড় ধরনের যুদ্ধ হয় তিনটি। প্রথম যুদ্ধেই ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ বাহিনী আরাকান দখল করে নেন। অবশেষে ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে সমগ্র বার্মা ব্রিটিশ দখলে চলে আসে। পরাজিত রাজা থিব আত্মসমর্পণ করলে ব্রিটিশ সরকার তাকে ভারতে নির্বাসিত করে।

রাজনৈতিক মূল্যায়নে রোহিঙ্গাদের অধিকার : গত প্রায় দুই হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় ব্রিটিশ শাসনের আগে বার্মা আরাকান শাসন করেছে দু-দফায় মাত্র ৬৬ বছর (১৪০৬-১৪৩০ খ্রি. ও ১৭৮৪-১৮২৬ খ্রি.) পক্ষান্তরে আরাকান স্বাধীন রাজশক্তি বার্মা শাসন করেছে প্রায় একশ বছর। আরাকান বাংলার করদ রাজ্য ছিল একশ বছর। (১৪৩০-১৫৩১ খ্রি.) ব্রিটিশ কর্তৃক একশ বাইশ বছর। বাকি সময় স্বাধীনভাবে শাসিত হয়েছে মুসলিম, বৌদ্ধ ও মগ রাজবংশের মাধ্যমে। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে বার্মার স্বাধীনতার পরবর্তী সময় ছাড়া আরাকানের ওপর বার্মার একাধিপত্য ও সুশাসনের প্রমাণ নেই। আরাকানিদের ওপর বার্মার শাসন মানেই হত্যা, লুণ্ঠন, নিপীড়ন ও নির্যাতনের ইতিহাস।

ভাগ্যের চরম নির্মমতায় আরাকানের এক সময়কার মুসলিম বাঙালি রাজশক্তির বড় অংশ এখন রোহিঙ্গা শরণার্থী। এ সমস্যার শুরু ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বার্মা কর্তৃক আরাকান দখলের পর থেকে। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে আরাকান স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী নেতা সিনপিয়ার মৃত্যুর দুশ বছর পরেও আরাকানি রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো সুরাহা হয়নি। মায়ানমারের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আরাকানি জনগণ ও রোহিঙ্গা শরণার্থীর ওপর যে নির্যাতন ও নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে তা বিশ্ব ইতিহাসে এক করুণ অধ্যায়। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা পূর্বপুরুষদের ভিটেবাড়ি থেকে বিতারিত হয়ে এখন অনাহার পুষ্টিহীনতা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। 

রোহিঙ্গারা জন্মসূত্রে আরাকানের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের জীবনে এ দূর্ভোগের পিছনে নিন্মোক্ত কারণ উল্লেখ করা যায়-

প্রথমত, রোহিঙ্গারা দীর্ঘ হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় আরাকানের রাজসভাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অধিকার করে থাকলেও তারা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র কোন ধারা সৃষ্টি করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে বর্মীরাজ বোদা পায়া কর্তৃক ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান দখলের পর আরাকানের সর্বময় ক্ষমতা বর্মীদের হাতে চলে যায়। তারা পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাসহ আরাকানী নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে হত্যা করে। অবশিষ্টদের অনেকেই প্রাণভয়ে বাংলায় পালিয়ে আসে এবং ১৮২৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধের মাধ্যমে আরাকান দখল পর্যন্ত এ দীর্ঘ সময়ে দেশের বাইরে অবস্থান করে। এ সময়ে সিনপিয়াসহ অনেক আরাকানী নেতা স্বদেশ পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করলেও বিভিন্ন কারণে তারা ব্যর্থ হয়। ফলে বাংলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা নেতৃত্বের দিক থেকে আরো পিছিয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, ১৮২৬ সালে আরাকানে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তারা রোহিঙ্গাদেরকে বাহ্যিক কিছু সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করে। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রয়োজনেই আরাকানের প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্র ছাড়াও কৃষি, ব্যবসায় প্রভৃতি কাজের জন্য বাংলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ আরাকানীদেরকে স্বদেশে বসবাসের সুযোগ প্রদান করে। এ সময় রোহিঙ্গাদের নেতৃস্থানীয় শিক্ষিত শ্রেণীর অনেকেই আরাকানে ফিরে না গিয়ে বাংলার কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত শ্রেণীসহ কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে গেলেও নেতেৃত্বের ক্ষেত্রে নতুন করে কোন অবস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। 

তৃতীয়ত, রোহিঙ্গারা কখনোই নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। শিক্ষা এবং প্রোপার গাইডেন্সের অভাবে তারা তাদের ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়নি।  

রোহিঙ্গারা আরাকানের স্বাধিকার আন্দোলন শুরু করলে তাদের উপর নিপীড়ন শুরু হয়। এর ফলশ্রুতিতে একটা গ্রুপ সশস্ত্র হয়ে পড়ে। অতঃপর তাদের উপর চালানো হয় ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮-৭৯ সালে প্রায় তিন লক্ষ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বালাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের চাপ ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতায় বিষয়টির বাহ্যিক সমাধান নিশ্চিত হয়। তাই রোহিঙ্গাদের নিঃশেষ করে দেবার জন্য কৌশল অবলম্বন করে ১৯৮২ সালে বিতর্কিত বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইন ঘোষণা করেন। এ আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রোহিঙ্গাদের কাছে কালো আইন হিসেবে বিবেচিত এ আইন তাদের সহায়-সম্পত্তি অর্জন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সার্ভিসে যোগদান, নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা সভা-সমিতির অধিকারসহ সার্বিক নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাসহ প্রচার মাধ্যমগুলো তাদেরকে সেখানকার স্থায়ী নাগরিক হিসেবে সম্বোধন করে।

১৯৭৮ এবং ১৯৯১ সালে রোহিঙ্গাদেরকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন অপারেশনের নামে আরাকানে এক অমানবিক নির্যাতন চালায়। তবে তাদের এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ অপারেশনে তারা হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং দুইপর্বে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে তাদের পৈতৃক বসতবাড়ী থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ সরকার সীমিত সামর্থ্য নিয়েই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ত্রাণ কার্যক্রমসহ আশ্রায়ন ক্যাম্প তৈরী করে আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতায় বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তথাপিও রোগ-শোক, অনাহার-অর্ধাহারে নাফ নদী পেরিয়ে আসা অসংখ্য লোক প্রাণ হারায়; যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও কৌশল অবলম্বন করে দ্বি-পক্ষীয় ভিত্তিতে এ সমস্যার সমাধান করেন।

যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশকেও উদ্যোগ নিতে হবে। আরাকানী মুসলমানদের সাথে বাংলাদেশের সহস্র বছরের বন্ধন ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয়সহ বহুমাত্রিক বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে দেশের স্বার্থে; মানবতার জন্য বাংলাদেশেরই এগিয়ে আসা উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যাকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের নিকট গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরতে হবে; এক্ষেত্রে বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলিকে সমস্যা সমাধানের জন্য উৎসাহিত করে ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাগুলো মিলে জাতিসংঘের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। সেইসাথে মিয়ানমার সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও করা উচিত।

মূলত আরাকানে মুসলিম জাতিসত্তা বিনাশ করে এককভাবে মগ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়েই রোহিঙ্গাদেরকে বসতবাড়ী থেকে উচ্ছেদ করে দেশের বিভন্ন স্থান থেকে মগদের এনে প্রত্যাবাসন করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে স্বাধীন আবাসভূমি ছাড়া রোহিঙ্গাদের মুক্তির বিকল্প কোন পথ খোলা নেই বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু স্বাধীকার আন্দোলনের নিমিত্তে কিছু কিছু সংগঠন কাজ করলেও মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গানীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মত সাংগঠনিক ও বৈপ্লবিক শক্তি কোনটিই তাদের নেই। এ প্রেক্ষিতে অসহনীয় নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে মানবাধিকারের মমত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে এসে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

একনজরে শহীদ মুজাহিদের অপরাধের পর্যালোচনা



আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি। তিনি তার পিতা, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল আলীর কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে, জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ফরিদপুর ময়জুদ্দিন স্কুলে ভর্তি হন এবং তারও পরে তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশুনা সুসম্পন্ন করার পর তিনি ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক ডিগ্রী শেষ করার পর তিনি ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আগমন করেন। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাত্র দুই-আড়াই মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ক্লাস করার পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় জনাব মুজাহিদ আর সেখানে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনীর রাজনৈতিক সহযোগী আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন আলী আহসান মুজাহিদ। তিনি এই বাহিনীকে বাঙালি নিধনের নির্দেশ দেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এমন অভিযোগ দাখিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এটিসহ জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ৩৪টি অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে অভিযোগ গঠন হয়েছে সাতটি অভিযোগের ভিত্তিতে। 

বিচার প্রক্রিয়ার টাইমলাইন 

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার- ২৯ জুন ২০১০
৩৪ টি অভিযোগ দাখিল- ১৬ জানুয়ারি ২০১২
৭ টি অভিযোগ গঠন- ২১ জুন ২০১২
ট্রাইব্যুনালের রায়- ১৭ জুলাই ২০১৩
আপিলের রায়- ১৬ জুন ২০১৫
রিভিউ আবেদন খারিজ- ১৮ নভেম্বর ২০১৫
রায় কার্যকর- ২২ নভেম্বর ২০১৫ [১]

আসুন আমরা দেখি কী ছিল শহীদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে গঠিত সাতটি অভিযোগ  [২]
প্রথম অভিযোগ:
পাকিস্তানের বাঙালি সহযোগীদের বিরুদ্ধে একটি দৈনিকে প্রবন্ধ লেখার অপরাধে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ৩টার দিকে ৫ নম্বর চামেলীবাগের ভাড়া করা বাসা থেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয় ইত্তেফাকের সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে। এর পর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
রায়ঃ ফাঁসী

দ্বিতীয় অভিযোগ:
একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানায় বৈদ্যডাঙ্গি, মাঝিডাঙ্গি ও বালাডাঙ্গি গ্রামে হিন্দুদের প্রায় সাড়ে তিনশ’ বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা। হামলাকারীদের গুলিতে ৫০ থেকে ৬০ জন নরনারী নিহত হন। ওই ঘটনায় ফরিদপুর শহরের হামিদ মাওলানা ছাড়াও ৮/১০ জন অবাঙালি অংশ নেন।
রায়ঃ খালাস 

তৃতীয় অভিযোগ:
মুজাহিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় অভিযোগটি নির্যাতনের। অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের যে কোন একদিন ফরিদপুর শহরের খাবাসপুর মসজিদের সামনে থেকে রাজাকাররা ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি থানার গোয়ালচামট (রথখোলার) মৃত রমেশ চন্দ্র নাথের পুত্র রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে আটক করে। বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে তাঁকে ফরিদপুর পুরনো সার্কিট হাউসে আসামি আলী আহসান মুজাহিদের সামনে পাকিস্তানি সেনা অফিসার মেজর আকরাম কোরাইশীর কাছে হাজির করা হয়। তখন মুজাহিদ ওই মেজরের সঙ্গে কথা বলার পর বাবু নাথের ওপর অমানষিক নির্যাতন চালানো হয়। তার একটি দাঁত ভেঙ্গে ফেলা হয়। নির্যাতনের পর হত্যা করার উদ্দেশে মুজাহিদের ইশারায় তাকে বিহারি ক্যাম্পের উত্তর পাশে আব্দুর রশিদের বাড়িতে আটকে রাখে রাজাকাররা। রাতে রণজিৎ নাথ বাবু তার জানালার শিক বাঁকা করে ওই ঘর থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচান।
রায়ঃ পাঁচ বছর কারাদন্ড 

চতুর্থ অভিযোগ:
এ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৬ জুলাই সকাল বেলা ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থেকে স্থানীয় রাজাকাররা মোঃ আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে (পিতা- মৃত মোঃ জয়নাল আবেদীন, গ্রাম-পূর্ব গোয়ালচামট খোদাবক্সপুর, থানা-কোতোয়ালি, জেলা-ফরিদপুর) মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে আটক করা হয়। এরপর তাকে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। আটক বন্দিদের মধ্যে পাখিকে দেখে মুজাহিদ সঙ্গে থাকা পাকিস্তানি মেজরকে কিছু একটা বলেন। এর পরই তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। সেখানে ১ মাস ৩ দিন আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনে আবু ইউসুফ পাখির বুকের ও পিঠের হাড় ভেঙ্গে যায়। পরে তাকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হয়।
রায়ঃ খালাস 

পঞ্চম অভিযোগ:
রাষ্ট্রপক্ষের পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট রাত ৮টায় পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি আসামি মুজাহিদ পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীসহ ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে তারা আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল ও আজাদকে দেখে তাদের গালিগালাজ করেন। এসময় তারা পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন, প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আদেশের আগেই তাদের হত্যা করতে হবে। মুজাহিদ অন্যদের সহায়তায় আটকদের একজনকে ছাড়া অন্যান্য নিরীহ-নিরস্ত্র বন্দীদের অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে লাশ গুম করেন। 
রায়ঃ যাবজ্জীবন 

ষষ্ঠ অভিযোগ:
একাত্তরের ২৭ মাচের্র পর দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ক্যাম্প তৈরি করে। পরে রাজাকার ও আল-বদর বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারাও ওই স্থানে ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ অপরাধমূলক নানা কার্যক্রম চালায়। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি হওয়ার সুবাদে আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। ছাত্রসংঘের ও আল-বদর বাহিনীর সুপিরিয়র নেতা হিসেবে তিনি আর্মি ক্যাম্পের ঊর্ধতন সেনা অফিসারের সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী নানা অপরাধের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করতেন। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়েছে, এ ধরনের পরামর্শ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আসামি মুজাহিদ ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী নিধনে অভিযান চালায়। দখলদার পাক সেনাদের সহযোগী বাহিনী নিয়ে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতনসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন।
রায়ঃ ফাঁসী 

সপ্তম অভিযোগ:
রাষ্ট্রপক্ষের এ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১৩ মে মুজাহিদের নির্দেশে রাজাকার বাহিনী ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করে। শান্তি কমিটির বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বকচর গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হামালা চালিয়ে বীরেন্দ্র সাহা, উপেন সাহা, জগবন্ধু মিস্ত্রি, সত্যরঞ্জন দাশ, নিরদবন্ধু মিত্র, প্রফুল্ল মিত্রকে আটক করা হয়। উপেন সাহার স্ত্রী রাজাকারদের স্বর্ণ ও টাকা দিয়ে তার স্বামীর মুক্তি চান। রাজাকাররা সুনীল কুমার সাহার কন্যা ঝুমা রানীকে ধর্ষণ করে। পরে আটক হিন্দু নাগরিকদের হত্যা করে তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুজাহিদের নির্দেশে অনিল সাহা দেশত্যাগে বাধ্য হন।
রায়ঃ ফাঁসী 

শহীদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে ১ নম্বর অভিযোগকে ৬ নম্বর অভিযোগের সঙ্গে সমন্বিত করে দুটি অভিযোগের একসঙ্গে ফাঁসীর রায় দেওয়া হয়। ১ নম্বর অভিযোগে ছিল, শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেন হত্যা ও ৬ নম্বর অভিযোগে ছিল গণহত্যায় নেতৃত্ব দেয়া, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা, হত্যা, নির্যাতন, বিতাড়ন ইত্যাদির ঘটনা। প্রথম অভিযোগে শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হত্যার ঘটনায়ও তার সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব) দায় ছিল বলে উল্লেখ করা হয় রায়ে। ৭ নম্বর অভিযোগে ছিল, ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ ও গণহত্যার ঘটনা। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে মুজাহিদকে ফাঁসির আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

আমরা এখন দেখবো স্পেসেফিক যে তিনটি অভিযোগে ফাঁসী দেয়া হয়েছে সে অভিযোগগুলোর পর্যালোচনা। 


পর্যালোচনা-১ (১ নং অভিযোগ)
১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে, পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক সিরাজউদ্দিন হোসেনের ‘ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড়’ নামক একটি প্রবন্ধের প্রতিক্রিয়ায় মুজাহিদ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দৈনিক সংগ্রামে ‘অতএব ঠগ বাছিও না’ নামে একটি কলাম লিখেন। অভিযোগে বলা হয়, সিরাজউদ্দিন হোসেন মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষের মানুষ হওয়ায় তিনি বরাবরই পাকিস্তানী সেনাদের বর্বরতার সমালোচনা করতেন। তাই তিনি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি রাজাকার, আল বদর ও শান্তি কমিটির লোকদের বিরাগভাজন হন। এমনই এক অবস্থায় ১৯৭১-এর ১০ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে মাংকি ক্যাপ পরিহিত ৭-৮ জন যুবক কাঁধে রাইফেল নিয়ে সিরাজউদ্দিন হোসেনের ৫ চামেলীবাগস্থ বাসায় আসে এবং তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এই চার্জের আলোকে মুজাহিদকে সিরাজউদ্দিন হোসেনের অপহরণ ও হত্যার পেছনে প্ররোচণা, সহায়তা ও অবদান রাখার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।

# এই অভিযোগটি প্রমাণের জন্য এই ট্রাইব্যুনালে একজন মাত্র সাক্ষী হাজির করে প্রসিকিউশন। তিনি হলেন, অপহৃত বুদ্ধিজীবী শহীদ সিরাজউদ্দিনের ছেলে শাহীন রেজা নূর। সাক্ষী  শাহীন রেজা নূর স্বীকার করেন দৈনিক সংগ্রামের তথাকথিত কাউন্টার কলাম ‘অতএব ঠগ বাছিও না’ এর লেখক কে তা তিনি জানে না। ‘অতএব ঠগ বাছিওনা’ এই নিবন্ধের লেখক কে ছিলেন তা আমার জানা নেই। অথচ লেখার অভিযোগ মুজাহিদের বিরুদ্ধে, যা আদালতে প্রমাণ হয়নি। আর কারো লেখার জবাবী লিখা লিখলেই তার খুনের দায় নিতে হবে কি? 

# ট্রাইব্যুনোলে জেরার এক পর্যায়ে সাক্ষী শাহীন রেজা নূর স্বীকার করেন, তার পিতাকে অপহরণের পর পর তিনি ১৯৭২ সালে রমনা থানায় দালাল আইনে একটি মামলা করেছিলেন। তিনি ঐ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। ঐ মামলায় একজন আসামী ছিল যার নাম ছিল খলিল। আদালতে আসামী খলিল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছিল এবং বিচারে তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। ঐ বিচারের রায় সম্পর্কিত সংবাদ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তখন প্রকাশিত হয়েছিল। যদিও ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদের বিরুদ্ধে সিরাজউদ্দিন হোসেনের অপহরণ ও হত্যার দায়ে অভিযোগ এনেছে। অথচ এই ব্যাপারটি বহু আগেই, একেবারে ঘটনার পরপরই আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে। এক অপরাধের বিচার কয়বার হবে? কেন ৭২ সালের মামলায় মুজাহিদ অভিযুক্ত ছিলেন না? এটা কি সাজানো অভিযোগ নয়?

# পরবর্তীতে সাক্ষী জেরায় আরও স্বীকার করেন যে, তিনি তার মা এবং তার ভাইদের কেউ কেউ শহীদ সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেনের অপহরণ এবং তাকে হত্যা সংক্রান্ত স্মৃতিচারণমূলক লেখা লিখেছেন কিন্তু তার কোন লেখাতেই মুজাহিদকে এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করেননি। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের স্ত্রী নূরজাহান সিরাজী তার স্বামীর অপহরণের স্মৃতিচারণ করে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ বইতে প্রবন্ধ লিখেছেন সেখানে তিনি তার স্বামীর অপহরণ বা হত্যাকারী হিসাবে মুজাহিদের নাম উল্লেখ করেননি। সর্বশেষ সাক্ষী শাহীন রেজা নূর জেরায় স্বীকার করেন, এই ট্রাইব্যুনাল ছাড়া ইতিপূর্বে মুজাহিদ সাহেবের বিরুদ্ধে তিনি কোথাও কোন অভিযোগ করেননি এবং এই ট্রাইব্যুনাল ব্যতীত অন্য কোথাও মুজাহিদকে আলবদর বা তার কমান্ডার হিসেবে আখ্যায়িত করে কোন বক্তব্যও রাখেননি। শুধু জামায়াত করার কারনেই কি তাহলে এত বছর পর এই অভিযোগ! আর বিচারকেরা গড্ডলিকার প্রবাহে গা ভাসিয়ে ফাঁসীর রায় দিয়েছেন। [৩]

পর্যালোচনা-২ (৬ নং অভিযোগ)
# মুজাহিদ সাহেব যে কখনো আলবদর নেতা বা কমান্ডার ছিলেন না, এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ দিয়েছেন এই মামলার সরকারপক্ষের তদন্ত কর্মকর্তা (আবদুর রাজ্জাক খান) নিজেই। তিনি ট্রাইব্যুনালে জেরার জবাবে খুবই স্পষ্ট করে বলেছেন, এই মামলার পুরো তদন্তকালে রাজাকার, আলবদর, আল শামস বা শান্তি কমিটির কোনো তালিকাতেই মুজাহিদের নাম ছিল না বা পাওয়া যায়নি। এছাড়া অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা আরও স্বীকার করেছেন যে, মুজাহিদ রাজাকার বা আলবদরই ছিলেন না। 

# এছাড়া সরকারপক্ষের অন্য একটি ডকুমেন্ট ‘আলবদর’ নামক বইতেও কোথাও মুজাহিদের নাম নেই। যেখানে আলবদর বইটিই লেখা হয়েছে, আলবদরদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সেখানে কমান্ডার হিসেবে মুজাহিদের নাম থাকবে না, এটা কীভাবে সম্ভব? মূলত আলবদর ছিলো তখন সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত একটি শাখা। এটি সম্পূর্নরুপে সেনাবাহিনীর তথা এ কে নিয়াজীর আওতাধীন ছিলো। রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপন করা মুনতাসির মামুনের বইয়ে এ কে নিয়াজীর ইন্টারভিউতেই সেটি উল্লেখ রয়েছে। তাহলে কীভাবে শহীদ মুজাহিদকে আল বদর কমান্ডার হিসেবে শাস্তি দেয়া যেতে পারে? [৪]

# ১৯৭১ সালে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের গার্ডের দায়িত্বে থাকা রহম আলী এখনো জীবিত।  তাকে আদালতে সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েও উপস্থাপন করা হয়নি। কারণ তিনি মিথ্যে বলতে রাজি হননি। তাকে সাক্ষী না বানিয়ে এই অভিযোগের সাক্ষী বানানো হয় তার ছেলে রুস্তম আলীকে। রুস্তম সেসময় ছিল নাবালক। এই রুস্তমই সাক্ষ্য দেয়ার কিছুদিন আগে বিটিভির সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি কোন বাঙ্গালিকে এখানে আসতে দেখেননি। তাহলে সে কিছু পরই কিভাবে শহীদ মুজাহিদকে দেখার দাবী করে?

# মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের তৎকালীন প্রিন্সিপ্যালও জীবিত। ইনস্টিটিউটের বর্তমান প্রিন্সিপ্যাল তৎকালীন প্রিন্সিপ্যালের সন্তান। তিনিও জানিয়েছেন তিনি এখানে কখনোই নিজামী বা মুজাহিদ কাউকেই দেখেন নি। প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন প্রিন্সিপ্যাল, তৎকালীন গার্ড, বর্তমান প্রিন্সিপ্যালের সাক্ষ্য না নিয়ে সাক্ষ্য নেয়া হলো গার্ডের ছেলের। তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় স্বীকার করেছেন সেসময় ইনস্টিটিউটের কোয়ার্টারে থাকা কোন স্টাফ, কোন শিক্ষক/ কর্মকর্তা/ কর্মচারী অথবা কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। তিনি কথা বলেছেন কেবল নাবালক রুস্তমের সাথে।

# একমাত্র সাক্ষী রুস্তম স্বীকার করেছে, সে কোন বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেনি। তবে সে চাকুরী পাওয়ার জন্য অবৈধভাবে পঞ্চম শ্রেণীর সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছে। সে বলতে পারেনি মুজাহিদ ছাড়া অন্য একজনেরও নাম, যে এখানে এসেছে এবং নির্যাতন করেছে। অথচ সে বলেছে মাত্র একদিন সে বাজারে যাওয়ার সময় গেইটে মুজাহিদ সাহেবকে দেখেছে। তাহলে সেখানে প্রতিদিন নির্যাতন করতো কারা? এরকম একটি মিথ্যেবাদী ও আইন লঙ্ঘনকারী লোকের সাক্ষ্যে কীভাবে একজন মানুষের শাস্তি হতে পারে?
  
পর্যালোচনা-৩ (৭ নং অভিযোগ) 
# প্রথমত এমন একটি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ফরিদপুরের কোন  ইতিহাস বইতেই পাওয়া যায় না। প্রসিকিউশন কর্তৃক যে কয়টি বই দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তার একটিতেও এই হত্যাকাণ্ডের ব্যপারে কোন কিছু উল্লেখ নেই। ফরিদপুরের শহীদদের তালিকায় এই গ্রামের মানুষদের নাম নেই। এই ঘটনায় নিহতদের স্মরণে কোন স্মৃতিস্তম্ভও পাওয়া যায় না।

# এই ঘটনার সাক্ষী শক্তি সাহা ভারতে অবস্থান করেন। এই অভিযোগটি প্রথমে ছিল না। আবুল কালাম আযাদের মামলা তদন্তে সেই তদন্তকারী কর্মকর্তা এই অভিযোগটি খুঁজে পান। মূলত তিনি ভারতে থাকা শক্তি সাহাকে খুঁজে পান এবং তাকে নিয়েই চক্রান্ত করেন। বিস্তারিত দেখুন ভারত থেকে আসা অভিযোগে শহীদ মুজাহিদের বিচার। 

# শক্তি সাহা দাবী করে তার বয়স ৫৭ বছর। সে অনুসারে ৭১ সালে তার বয়স ১৩ বছর। সে নিজেকে হিরো প্রমাণ করতে গিয়ে বলে সে নাকি ৭০ এ ভোট দিয়েছে। তাহলে কি সে সত্তর সালে ১২ বছর বয়সে ভোট দিয়েছে? হয় সে বয়স নিয়ে মিথ্যে বলেছে। অথবা সে ভোট নিয়ে মিথ্যা বলেছে অথবা সে বেআইনিভাবে জাল ভোট দিয়েছে। এমন একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য কি গ্রহণযোগ্য?

# সাক্ষী স্বীকার করে সে তিনবার ভারত গিয়েছে। জেরায় সাক্ষী শক্তি সাহা স্বীকার করেন তিনি ভারতে থাকতেন এবং কোনো প্রকার পাসপোর্ট এবং ভিসা ছাড়াই ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে এসেছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতে গেছেন বলেও সাক্ষী স্বীকার করেন। ডিফেন্স আইনজীবীর এক প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, তার স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তার সৎকারও ভারতেই সম্পন্ন করা হয়েছে। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নূর হোসেন ভারতে গিয়েই তার জবানবন্দী রেকর্ড করেছেন বলেও তিনি স্বীকার করেছেন। তাহলে একজন আইন অমান্যকারী হিসেবে যেখানে তাকে শাস্তি দেয়ার কথা উল্টো তার কথা বিবেচনায় এনে শহীদ মুজাহিদকে ফাঁসীর মত বড় শাস্তি দেয়া হয়েছে! [৫]

# জেরায় সাক্ষী শক্তি সাহা বলেন, সে ভারতে কোন চাকরী করে না। আবার একটু পরই সে তার জবানীতে বলে তদন্তকারী ভিডিওর মাধ্যমে আমার কর্মস্থল চব্বিশ পরগনার দমদম থানাধীন হলদিরামে রাজলক্ষী বেডিংএ ধারণ করে। সে বাংলাদেশে থাকাকালীন সুদীর্ঘ সময়ে তার বাবার হত্যার বিষয়ে কোন মামলা/ অভিযোগ দায়ের করেনি। তার বড় ভাই গোপিনাথ সাহা ফরিদপুরেই আছেন এবং তাকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি জানিয়েছেন এই হত্যাকান্ডে মুজাহিদ সাহেব জড়িত ছিলেন না।   

# সাক্ষী শক্তি সাহা দাবী করেছে তার মেঝো ভাই ক্ষীরোদ সাহা মুজাহিদ সাহেবের ছোট ভাইয়ের সাথে রাজেন্দ্র কলেজে পড়তো। সে সুবাদে শক্তি সাহা মুজাহিদ সাহেবকে চিনতেন। অথচ পর্যালোচনায় জানা যায় ক্ষীরোদ সাহা এখনো জীবিত এবং তিনি জানিয়েছেন তিনি ম্যট্রিকের পর আর পড়াশোনা করেন নি। তাহলে কলেজে পড়ার তো প্রশ্নই আসে না। ক্ষীরোদ সাক্ষী থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা বলতে রাজি না হওয়ায় প্রসিকিউশন তাকে আদালতে হাজির করেনি।

# হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে শক্তি বলে সে বাকচরে তার বোনের বাড়িতে গাবগাছে উঠে গাব খাওয়ার সময় মুজাহিদ সাহেবকে দেখেছে খুনের নেতৃত্ব দিতে। সরেজমিনে দেখা যায় তার বোনের বাড়ি থেকে তাদের বাড়ি দেখা যায় না। সে যা বলেছে তা সর্বৈব মিথ্যা। যেখানে তার বড় ভাই ও মেঝো ভাই বলেছে, তাদের বাবার হত্যাকাণ্ডের সাথে মুজাহিদ সাহেব জড়িত নন সেখানে ভারতে অবস্থানরত শক্তি সাহার সাক্ষ্য কীভাবে মুজাহিদ সাহেবকে ফাঁসীর রায় দেয়ার জন্য উপযুক্ত হতে পারে।

যেখানে সকল স্বাক্ষীর বক্তব্যই অসংযত, যেখানে স্বাক্ষীদের বিশ্বাসহীনতা আর মিথ্যা কথায় পরিপূর্ণ জালিয়াতী বার বার ধরা পড়েছে সেখানে এহেন নিন্মমানের সাক্ষ্যের উপরে নির্ভর করে ফাঁসী দেয়াতো দূরের কথা একদিনের শাস্তি দেয়াও বেআইনি। আর সেই বেআইনি কাজটিই করেছে হাসিনার পদলেহন করা সিনহার নেতৃত্বাধীন আপীল বিভাগ।

আরো দেখুন শহীদ মুজাহিদের প্রহসনের বিচার

তথ্যসূত্রঃ
১- সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর  
২- মুজাহিদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ 
৩- মুজাহিদের আপিলে ডিফেন্সের যুক্তিতর্ক শুরু 
৪- আমরা আশাবাদী মুজাহিদ খালাস পাবেন -খন্দকার মাহবুব হোসেন 
৫- মুজাহিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন ভারতীয় নাগরিক শক্তি সাহা