২১ নভেম্বর, ২০১৭

শহীদ মুজাহিদের কালজয়ী কিছু উক্তি


আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন কবি। অমর কবি। কালজয়ী কবি। লিখে গিয়েছেন তিনি সাবলীল ভঙ্গীতে রাজনীতির কবিতা, বিপ্লবের কবিতা। একটি আন্দোলন, একটি সংগঠন, একটি ইতিহাস, একটি আপসহীন সংগ্রামের কবিতা। এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম, জাতির উত্থান-পতন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে জনাব মুজাহিদ একটি অকুতোভয় নাম। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর মধ্যরাতে তাকে প্রহসনের মাধ্যমে খুন করে ভারতের পা-চাটা স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার। 

শহীদ মুজাহিদ তার দুনিয়াবী জীবনের শেষদিকে কিছু কালজয়ী উক্তি করেছেন। সেগুলো উল্লেখ করা হল। 

১- সবার ভাগ্যে শাহদাতের মৃত্যু জোটে না। আল্লাহ তায়ালা যদি আমাকে পছন্দ করেন এবং শহীদি মৃত্যু দেন সে মৃত্যু আলিঙ্গনের জন্য আমি প্রস্তুত আছি। 

Shahadat is not in the fate of everyone. If Allah loves me and gives martyr death, I am ready to embrace death.

২- আমার স্পষ্ট ঘোষণা ছিল যেদিন আমার মন্ত্রীত্ব দুর্নীতির সাথে আপোষ করবে বা আমাকে নীতিচ্যুত করবে সেদিন মন্ত্রীত্বকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিব।

I had a clear declaration that if the day my ministerial compromise with corruption or dislocated me, I would throw cabinet minister into dustbin. 

৩- আমি আল্লাহর দ্বীনের উদ্দেশ্যে আমার জীবন কুরবান করার জন্য সবসময় প্রস্তুত আছি।

I am always ready to sacrifice my life for the sake of Allah

৪- আমি দরখাস্ত করে মন্ত্রী হইনি। মন্ত্রী থাকার জন্য তোষামদির রাস্তাও গ্রহণ করিনি বরং চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।

I have never desired to be minister. I have never chosen the path of flattery and indulgence to remain minister. I took the responsibility as a big challenge

৫- মন্ত্রিত্বের জন্য আমি আমার চিরস্থায়ী জীবন আখিরাতকে বরবাদ করতে পারিনা। আমার এই ঘোষণা ও ভূমিকা খুবই স্পষ্ট ছিল। তাই অন্যায় আবদার নিয়ে কেউ আমার মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করতে পারেনি।

I can't ruin my everlasting hereafter for the job of a minister. my such declaration was very specific, obvious and bold. So nobody did have that dare to enter into my room with illegal demands

৬- এই জালিম সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। আমি নির্দোষ, নির্দোষ এবং নির্দোষ।

There is no ground of seeking mercy from this tyrannical government. I am innocent, innocent and innocent

৭- আমার জানামতে শহীদের মৃত্যুতে কষ্টের হয়না। তোমরা দোয়া করবে যাতে আমার মৃত্যু আসানের সাথে হয়। আমাকে যেন আল্লাহর ফেরেশতারা পাহারা দিয়ে নিয়ে যান।

As per as I know, the martyr does not suffer during his death. All of you pray for me, so that I can embrace death with compassion and tenderness. May the angels of Almighty Allah take me in escort

৮- আমার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন ছাড়া বাকি সবাই দরিদ্র। তারা মূলত অভাবের তাড়নায় এবং বিপদে পড়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম।


Whoever have given testimony, except two of them, rest of the witnesses are poor and impoverished. They became compelled to give false testimonies because of their extreme poverty and security threat. I am forgiving them all.

৯- আমার শাহাদাত এই দেশে ইসলামী আন্দোলনকে সহস্রগুন বেগবান করবে এবং এর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে ইনশাল্লাহ।

My martyrdom will mobilize and facilitate the Islamic movement in this country and simultaneously it will bring positive changes in our lives from national perspective

১০- আজ আমার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর এই অন্যায় বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিচার আল্লাহর দরবারে শুরু হয়ে যাবে, বিচার শুরু হয়ে গেছে।

Who were involved with this unjustifiable trial process, their trial will begin in the court of Almighty Allah immediate after my execution

১১- আজ যদি আমার ফাঁসি কার্যকর করা হয় তাহলে তা হবে ঠান্ডা মাথায় একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা।

If I am executed today, it would be similar to murder an innocent man 

১২- কত বড় স্পর্ধা তাদের যে তারা মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করার দাবী করে। অথচ তাদের নিজেদের ভেতর মানবতা নেই।

How dare they are! They are claiming to carry out the trial of crimes against humanity, but actually they don’t have minimum level of humanity within themselves 

১৩- শহীদ মুজাহিদের পরিবারের প্রতি শেষ ওসিয়ত
- নামাজের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস থাকবে
- সব সময় হালাল রুজির উপর থাকবে
- আত্মীয়দের হক আদায় করবে  
- প্রতিবেশীর হক আদায় করবে
- বেশী বেশী করে রাসুল (সা) এর জীবনী ও সাহাবীদের জীবনী পড়বে

Last advices of Shaheed Mujaheed to his family: 
-Be serious about Salat (prayer) 
-Always be firm about honest income
-Try to secure the rights of your relatives 
-Try to secure the rights of your neighbours. 
-Try to read the Sirat books, the life of the holy Prophet (pbuH) and His companions regularly

১৪- ফাঁসী দেয়া হোক আর যাই হোক বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন চলবে এবং এদেশে ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হবেই ইনশাআল্লাহ্‌।

If there is a hanging me or not, Islamic movement will continue in Bangladesh and in this country Islamic movement will be victorious InshaAllah. 

৩ নভেম্বর, ২০১৭

১ম বিশ্বযুদ্ধ, বেলফোর ঘোষণা ও ইসরাঈল রাষ্ট্রের সৃষ্টি


উসমানী খিলাফতের পতন ছিল মুসলিম বিশ্বের জন্য এক বড় দুঃসংবাদ। মুসলিম শাসনের বিপরীতে জাতিরাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা। উসমানী খিলাফত ছিল একটি বিশাল বহুজাতিক রাষ্ট্র, যার কেন্দ্র ছিল ইস্তানবুল। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কিছু রাজনৈতিক ঘটনা উসমানী খিলাফতের পতন এবং নতুন জাতিয়তাবাদী রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটায়। নবসৃষ্ট এসব রাষ্ট্রের নিজস্ব সীমানা ছিল যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত এবং মুসলিমদেরকে একে অন্যের থেকে আলাদা করে ফেলে। এই ঘটনার পেছনে বৃটেনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই সময়ে বৃটেনের বিবাদমান ৩ পক্ষের সাথে সই করা ৩ টি আলাদা চুক্তিতে পরস্পর বিরোধী অঙ্গীকার ছিল। চুক্তিগুলোর ফলে মুসলিম বিশ্বের একটি বিশাল অংশ বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ:
১৯১৪ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, ঔপনিবেশিক বাসনা ও সরকারগুলোর উচ্চপর্যায়ে অব্যবস্থাপনা প্রভৃতি মিলিয়ে এই প্রয়লংকারী যুদ্ধের সূচনা ঘটায়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে প্রায় ১.২ কোটি লোক প্রাণ হারান। যুদ্ধে এক পক্ষে ছিল বৃটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং অন্য পক্ষে ছিল তুরস্ক, জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি।

প্রথমদিকে উসমানী খিলাফত নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা তারা নানা আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল। ১৯০৮ সালে শেষ শক্তিশালী খলীফা আব্দুল হামিদ দ্বিতীয় কে “৩য় পাশা”(তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যুদ্ধমন্ত্রী, নৌমন্ত্রী) উৎখাত করে এবং সামরিক শাসন জারি করে। এরপর থেকে খলীফা পদটি শুধুমাত্র প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হত। এই “৩য় পাশা” ছিল ধর্মনিরপেক্ষ এবং পশ্চিমা ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী “তরুণ তুর্কী” গ্রুপের সদস্য। অন্যদিকে, উসমানীরা ইউরোপের নানা শক্তির কাছে বিরাট অঙ্কের ঋণের জালেও আবদ্ধ ছিল, যা তারা পরিশোধে অক্ষম ছিল। এই ঋণ থেকে মুক্তি পবার লক্ষ্যে শেষপর্যন্ত উসমানীয়রা এই বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯১৪ সালের অক্টোবরে জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে।

এর ফলশ্রুতিতে, বৃটেন তৎক্ষণাৎ উসমানী খিলাফতকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের নীলনকশা করতে শুরু করে। বৃটেন ১৮৮৮ সাল থেকে মিশর এবং ১৮৫৭ সাল থেকেই ভারতকে দখল করে নিয়েছিল। উসমানী খিলাফতের অবস্থান ছিল ব্রিটেনের এই দুই উপনিবেশ এর ঠিক মাঝখানে। ফলে বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে উসমানী খিলাফতকে উচ্ছেদ করতে বৃটেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।

আরব বিদ্রোহ:
ব্রিটেনের অন্যতম বড় পরিকল্পনা ছিল উসমানী খিলাফতের আরব জনগণকে উস্কে দেয়া। এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে। আগে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিল আরবরা। উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমীয় এই শাসনব্যবস্থাগুলো ছিল আরবদের। সারা পৃথিবীর মুসলিমরা আরবদের আনুগত্য করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো। কিন্তু আরবদের অন্তঃকোন্দল তুর্কিদের এগিয়ে দেয়। তুর্কিরা একের পর এক আরব শাসন দখল করে মুসলিম বিশ্বে উসমানিয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে। এর কারণে আরবদের মধ্যে তুর্কি বিদ্বেষ ছিল। 

বৃটেনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরব উপদ্বীপের পশ্চিমের এলাকা হিজাযের একজন ব্যক্তিকে তারা তৎক্ষণাৎ পেয়েও যায়। মক্কার গভর্নর শরীফ হুসেইন বিন আলী উসমানী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শর্তে বৃটেনের সাথে চুক্তি করে।  বৃটেনের সাহায্যপুষ্ট হয়ে শরীফ হুসেইন উসমানীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নিলেন। অন্যদিকে, বৃটেন বিদ্রোহীদেরকে টাকা ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়, কেননা টাকা ও অস্ত্র ছাড়া উসমানীদের সুসংগঠিত বাহিনীর সাথে পেরে ওঠা কষ্টকর ছিল। ব্রিটেন তাদের এও প্রতিশ্রুতি দেয় যে, যুদ্ধের পর শরীফ হুসেইনকে ইরাক ও সিরিয়া সহ গোটা আরব উপদ্বীপ মিলিয়ে একটি বিশাল আরব রাজ্য শাসন করতে দেয়া হবে। দুইপক্ষ (বৃটেন ও শরীফ) এর মধ্যকার এ সম্পর্কীয় আলাপ-আলোচনা ও দর কষাকষি বিষয়ক চিঠিগুলো ইতিহাসে McMahon-Hussein Correspondence (ম্যাকমেহন-শরীফ পত্রবিনিময়) নামে পরিচিত। এই ম্যাকমেহন হলেন মিশরের তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমেহন, যার সাথে শরিফের গোপন আঁতাত চলছিল।

১৯১৬ এর জুনে, শরীফ হুসেইন তার সশস্ত্র আরব বেদুঈনদের নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়েন। কয়েক মাসের মধ্যেই বৃটিশ সেনা ও নৌবাহিনীর সহায়তায় আরব বিদ্রোহীরা মক্কা ও জেদ্দা সহ হিযাজের বেশ কয়েকটি শহর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। ব্রিটেন সৈন্য, টাকা, অস্ত্র, পরামর্শদাতা (যার মধ্যে অন্যতম ছিল বিখ্যাত “লরেন্স অফ এ্যারাবিয়া”), এবং একটি পতাকা দিয়ে বিদ্রোহীদের সহায়তা করে। মিশরে অবস্থানরত বৃটিশরা বিদ্রোহীদের একটি পতাকা বানিয়ে দেয় যা “আরব বিদ্রোহীদের পতাকা” নামে পরিচিত ছিল।

১৯১৭ থেকে ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, আরব বিদ্রোহীরা উসমানীদের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। একদিকে বৃটেন বাগদাদ ও জেরুজালেম দখল করে ইরাক ও ফিলিস্তিনে তাদের অবস্থান জোরদার করে, অন্যদিকে আরব বিদ্রোহীরা আম্মান ও দামেস্ক দখল করে বৃটেনকে তাদের কাজে সাহায্য করতে থাকে।

আরব বিদ্রোহ শুরু হবার আগেই এবং শরীফ হুসেইন তার আরব রাজ্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে বৃটেন ও ফ্রান্সের অন্য পরিকল্পনা করা ছিল। ১৯১৫-১৬ এর শীতকালে, বৃটেনের মার্ক সাইকস ও ফ্রান্সের ফ্রান্সিস জর্জেস পিকোট উসমানী খিলাফত পরবর্তী আরব বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করতে গোপনে মিলিত হন।

বৃটেন ও ফ্রান্স পুরো আরব বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়ার ব্যাপারে চুক্তি করে, যা পরবর্তীতে সাইকস-পিকোট চুক্তি নামে পরিচিতি লাভ করে। বৃটেন বর্তমানে জর্ডান, ইরাক, কুয়েত নামে পরিচিত এলাকাগুলোর দখল নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। ফ্রান্স পায় বর্তমান সিরিয়া, লেবানন ও দক্ষিন তুরস্ক। জায়োনিস্টদের (ইহুদীবাদী) ইচ্ছাকে এখানে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ফিলিস্তিনের দখল নেয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে ঠিক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৃটেন ও ফ্রান্সের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর কিছু কিছু জায়গায় আরবের সীমিত মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন দেয়ার কথা থাকলেও, ইউরোপীয় শাসন ব্যবস্থাই তাদের উপর কর্তৃত্বশীল থাকবে। চুক্তি অনুযায়ী, অন্যান্য এলাকায় বৃটেন ও ফ্রান্স সম্পূর্ণ নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব করার অধিকার পায়।

যদিও এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে করণীয় বিষয়ক একটি গোপন চুক্তি ছিল, কিন্তু ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বলশেভিক সরকার একে সবার সামনে উন্মোচন করে দেয়। এই সাইকস-পিকোট চুক্তি ও শরীফ হুসেইনকে দেয়া ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে, বৃটেন ও আরব বিদ্রোহীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এটিই বৃটেনের করা সর্বশেষ পরস্পর বিরোধী চুক্তি ছিল না, নাটকের চিত্রনাট্যের এখনো কিছু অংশ বাকি ছিল।

বেলফোর ঘোষণা:
আরেকটি সম্প্রদায়েরও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের দিকে শ্যেনদৃষ্টি ছিল এবং তারা হল জায়নবাদীরা (ইহুদী)। জায়োনিজম হল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন যা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতো। এই আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯ শতকে এবং এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য (যারা ছিল মূলত পোল্যান্ড, জার্মানি, রাশিয়ার বাসিন্দা) ইউরোপের বাইরে একটি আবাসভূমি খুঁজে বের করা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ইহুদীবাদীরা বৃটেন সরকারের কাছে যুদ্ধ পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের ব্যাপারে সাহায্য চায় আর এর বিনিময়ে যুদ্ধে ব্রিটিশদের গোয়েন্দা সহায়তা ও সামরিক সহায়তা দিতে চায়। অন্যদিকে, বৃটিশ সরকারের ভিতরেও এমন অনেক কর্মকর্তা ছিলেন যারা এই রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব আরথার বেলফোর। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বরে, বেলফোর (ইহুদিবাদি) জায়োনিস্ট সম্প্রয়দায়ের নেতা ব্যারন রসথচাইল্ডকে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। এই চিঠিতে তিনি ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের সরকারী সমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।


“বৃটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় বসতি স্থাপনের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এবং এই লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্যে তার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, এমন কিছুই করা হবে না যাতে ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি (অন্যান্য ধর্মাবলম্বী) সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, অথবা অন্য কোনো দেশে বসবাসকারী ইহুদীদের উপভোগকৃত অধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষতিসাধন হয়”

তিনটি প্রতারণামূলক চুক্তি:
ফলে দেখা গেল, বৃটেন ১৯১৭ সালের মধ্যেই তিন তিনটি ভিন্ন পক্ষের সাথে তিনটি আলাদা চুক্তি করলো এবং এই তিনটি ভিন্ন চুক্তিতে আরব বিশ্বের ভবিষ্যতের ব্যাপারে তিনটি ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হল।

(১) বৃটেন আরবদেরকে আশ্বাস দিল, তারা শরীফ হুসেইনের মাধ্যমে আরব রাজ্যের কর্তৃত্ব পাবে। 

(২) অন্যদিকে ফ্রান্স এবং বৃটেন চুক্তি করলো, ঠিক ঐ এলাকাগুলোই বৃটেন এবং ফ্রান্স ভাগ করে নিবে।

(৩)আবার বেলফোর ঘোষণা অনুযায়ী জায়োনবাদীরা ( ব্রিটেন তথা ইউরোপিয়ানদের সাহায্যে) ফিলিস্তিন পাওয়ার আশা করলো।

১৯১৮ সালে মিত্রশক্তির বিজয়ের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং ফলশ্রুতিতে উসমানী খিলাফতের ধ্বংস ঘটে। যদিও উসমানীরা ১৯২২ পর্যন্ত নামে মাত্র টিকে ছিল এবং খলীফার পদটি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত নামমাত্র ভাবে টিকে ছিল, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে উসমানীদের অধীনে থাকা সব অঞ্চল ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশে পরিণত হয়। যদিও যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য তিন পক্ষের পরস্পরবিরোধী বিতর্কের মধ্যে আটকা পড়ে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা করা হয়। লিগ অব নেশনস সম্পূর্ণ আরব বিশ্বকে অনেক ভাগে বিভক্ত করে ফেলে (যাকে মেন্ডেট বলা হয়)। এসব মেন্ডেট বৃটেন ও ফ্রান্স এর হাতে তুলে দেয়া হয় এবং মেন্ডেটগুলো ব্রিটেন ও ফ্রান্স দ্বারা শাসিত হবে যতদিন না ঐ ছোট অঞ্চলটি বা মেন্ডেটটি নিজেই নিজের দায়িত্ব নেবার ব্যাপারে সামর্থ্যবান হয়। এই লিগ অব নেশন-ই সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন সীমানা আরোপ করে দেয়, যা আমরা বর্তমানে মানচিত্রে দেখতে পাই। এই সীমানাগুলো স্থানীয় জনগণের কোনপ্রকার মতামত ছাড়াই আরোপ করা হয়।

জাতিগত, ভৌগলিক অথবা ধর্মীয় কোন পরিচয়ই বিবেচনায় আনা হয় নি, অর্থাৎ তা ছিল সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী একটি সিদ্ধান্ত। এটা জেনে রাখা জরুরি যে, আরব বিশ্বের এই রাজনৈতিক সীমানা কোনভাবেই বিভিন্ন জাতির উপস্থিতি নির্দেশ করে না। ইরাকি, সিরিয়, জর্ডানি ইত্যাদি পার্থক্যসমূহ সম্পূর্ণরূপে ইউরোপীয় ঔপনিবেশবাদীদের কর্তৃক তৈরি করা হয় আরবদেরকে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত করে ফেলার পদ্ধতি হিসেবে। এই মেন্ডেট সিস্টেমের মাধ্যমে বৃটেন এবং ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের উপর তার কাঙ্ক্ষিত দখল বুঝে পায়। অন্যদিকে শরীফ হুসেইনের ক্ষেত্রে, তার ছেলেরা বৃটিশদের ছায়াতলে থেকে শাসনকাজ পরিচালনার সুযোগ পায়। প্রিন্স ফয়সালকে সিরিয়া ও ইরাকের রাজা করা হয় এবং প্রিন্স আব্দুল্লাহকে করা হয় জর্ডানের রাজা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বৃটেন এবং ফ্রান্স-ই এইসব এলাকার প্রকৃত কর্তৃত্বে ছিল।

অন্যদিকে, বৃটেন সরকার জায়োনবাদীদেরকে কিছু শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিনে বসতি গড়ার অনুমতি দেয়। বৃটেন সেখানে আগে থেকে বসবাসকারী আরবদের রাগান্বিত করতে চায় নি, তাই তারা ফিলিস্তিনে আসা দেশান্তরিত ইহুদীদের সংখ্যাসীমা বেঁধে দেয়। এর ফলে জায়োনবাদীরা ক্ষেপে ওঠে, ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ইহুদীরা বৃটেনের শর্ত না মেনেই ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা বাড়াতে থাকে। এসব ঘটনা আরবদের ক্ষোভও বাড়িয়ে দেয়, কেননা তাদের কাছে ফিলিস্তিন ছিল এমন একটি ভুমি যা ১১৮৭ সালে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়্যুবির বিজয়ের পর থেকে তাদের নিজেদের ছিলো এবং এখন তা বসতি স্থাপনের ফলে ইহুদীদের বলপূর্বক দখলে চলে যাচ্ছিল। ইহুদিরা বিভিন্ন ছল-চাতুরির আশ্রয় নিয়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড খরিদ করার জন্য চেষ্টা চালায়। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা যেহেতু জানত, তাই তারা জমি বিক্রয় করতো না। ফলে বিভিন্ন যোগাযোগ ও মাধ্যম প্রয়োগ করে তারা কেবল ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ১ থেকে ৩ শতাংশ জমি ক্রয় করতে পেরেছিল। 

তারপর যখন ইসরাইলের ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায় তখন সমগ্র ফিলিস্তিন জমি বিক্রয় নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং নির্দেশ জারি করে "যদি কেউ ইহুদিদের কাছে জমি বিক্রয় করে তাহলে তার রক্ত (অর্থাৎ তাকে হত্যা করা) বৈধ হয়ে যাবে"। এ কারণে আর কোন জমি বিক্রয়ের ঘটনা ঘটেনি। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যখন ফিলিস্তিন ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে ছিল তখন সমগ্র ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের মাত্র আড়াই শতাংশ ইহুদীবাদীদের মালিকানায় ছিল। 

ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা:
বৃটেন ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের সমর্থনে নানা স্টেটমেন্ট জারি করা এবং গ্রন্থ রচনার কাজ জোরেশোরে চালায়। এসব তৎপরতার বেশিরভাগই ব্রিটিশ ম্যান্ডেটরি সরকারের আমলে সম্পন্ন হয় এবং ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। পরে ইহুদি ও ব্রিটিশদের যোগসাজশে তা আরও সুসংগঠিত হয়।

বৃটিশরা একদিকে ইহুদিদের জন্য খুলে দেয় ফিলিস্তিনের দরজা, অন্যদিকে বৃটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদিরা ফিলিস্তিনদের বিতাড়িত করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য গড়ে তোলে অনেক প্রশিক্ষিত গোপন সন্ত্রাসী সংগঠন। তার মধ্যে তিনটি প্রধান সংগঠন ছিল হাগানাহ, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং। যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর গণহত্যার কথা যখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হচ্ছিল তখন পরিস্থিতকে নিজেদের অনুকূলে আনার জন্য গুপ্ত সংগঠন হাগানাহ বেছে নেয় আত্মহনন পন্থা। ১৯৪০ সালে এসএস প্যাট্রিয়া নামক একটি জাহাজকে হাইফা বন্দরে তারা উড়িয়ে দিয়ে ২৭৬ জন ইহুদিকে হত্যা করে। 

১৯৪২ সালে আরেকটি জাহাজকে উড়িয়ে ৭৬৯ জন ইহুদিকে হত্যা করে৷ উভয় জাহাজে করে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে আসছিল আর বৃটিশরা সামরিক কৌশলগত কারণে জাহাজ দুটিকে ফিলিস্তিনের বন্দরে ভিড়তে দিচ্ছিল না। হাগানাহ এভাবে ইহুদিদের হত্যা করে বিশ্ব জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করলো। পাশাপাশি ইহুদিদের বসতি স্থাপন ও আরবদের উচ্ছেদকরণ চলতে থাকে খুব দ্রুত। এর ফলে ২০ লাখ বসতির মধ্যে বহিরাগত ইহুদির সংখ্যা দাড়ালো ৫ লাখ ৪০ হাজার। 

১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘ মারফত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ভাগাভাগির প্রস্তাব পাশ করানো হয় যা ১৮১ নং প্রস্তাব নামে খ্যাত। তাতে ৩৩টি রাষ্ট্র পক্ষে, ১৩টি বিরুদ্ধে এবং ১০টি ভোট দানে বিরত থাকে।  ব্রিটিশ ও মার্কিনিদের চাপেই জাতিসংঘ এ প্রস্তাব পাশ করতে বাধ্য হয়। উক্ত প্রস্তাবের মাধ্যমে ফিলিস্তিন বিভাজিত হয়ে দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রায় ৫৬ শতাংশ ভূখণ্ডবিশিষ্ট। আরেকটি ফিলিস্তিনি আরব রাষ্ট্র প্রায় ৪৪ শতাংশ ভূখণ্ডবিশিষ্ট। আর বাইতুল মুকাদ্দাস ঘোষিত হলো নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক এলাকারূপে। অথচ এ সময়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মাত্র ৬ শতাংশ ইহুদিদের হাতে ছিল। এমতাবস্থায় জাতিসংঘ কি তার ১৮১ নং প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে পারত, নাকি এতে অনেক আইনগত বিতর্ক চলে আসে? প্রস্তাব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ হয়েও ইহুদিরা পেল ভূমির ৫৭% আর ফিলিস্তিনরা পেল ৪৩% তবে প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রটির উত্তর-পশ্চিম সীমানা ছিল অনির্ধারিত যাতে ভবিষ্যতে ইহুদিরা সীমানা বাড়াতে পারে। 

ফলে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা চূড়ান্ত হলেও উপেক্ষিত থেকে যায় ফিলিস্তিন। জাতিসংঘের মাধ্যমে পাস হয়ে যায় একটি অবৈধ ও অযৌক্তিক প্রস্তাব। প্রহসনের নাটকে জিতে গিয়ে ইহুদিরা হয়ে ওঠে আরো হিংস্র। তারা হত্যা সন্ত্রাসের পাশাপাশি ফিলিস্তিনদের উচ্ছেদ করার উদ্দেশে রাতে তাদের ফোন লাইন, বিদ্যুৎ লাইন কাটা, বাড়িঘরে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ, জোর করে জমি দখল এবং বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতন করে মৃত্যু বিভীষিকা সৃষ্টি করতে লাগলো। ফলে লাখ লাখ আরব বাধ্য হলো দেশ ত্যাগ করতে।  

নিঃসন্দেহে আইনগত দিকে দিয়ে জাতিসংঘ কখনোই এরূপ প্রস্তাব পাশ করতে পারত না। কারণ নির্দিষ্ট সীমারেখাবিশিষ্ট একটি দেশকে সেখানকার অধিবাসীদের ইচ্ছার বিপরীতে অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করার কোন আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি নেই। তাই ঐ সময় থেকেই ইহুদিদের মুখেই ফিলিস্তিন ভাগাভাগির গুঞ্জন শুরু হয় এবং ব্রিটিশদের সহযোগিতায় তাদের অস্ত্রসজ্জিত করা হয়। ১৮১ নং প্রস্তাব পাশ হওয়ার সাথে সাথে ইংরেজদের মাধ্যমে এমন দমন নিপীড়ন চালানো হয় যে, কোন ফিলিস্তিনির হাতে একটি চাকু থাকার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। অথচ খোদ ইংরেজরাই ইহুদিদের প্রকাশ্যে সমরাস্ত্র সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করত। অতঃপর যখন স্থির হলো যে,ইহুদিরা আরবদের বসত এলাকা থেকে অপসারিত হবে তখন তারা চুক্তি ভঙ্গ করল এবং উক্ত এলাকা থেকে সরে গেল না। কিন্তু ফিলিস্তিনের আরব মুসলমানরা ইহুদি বসতি এলাকা থেকে সরে এল। 

এভাবেই ১৯৪৮ সালের ১২ মে রাত ১২টা এক মিনিটে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করলো ইহুদিরা। ১০ মিনিটের ভেতর যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিল, অতঃপর সোভিয়েত ইউনিয়ন-বৃটেন। 

১ নভেম্বর, ২০১৭

ভাষা সৈনিকদের জবানে বাঙালিদের অবস্থান


ইতিহাস পরিবর্তনশীল। বর্তমানের সাথে সাথে ইতিহাস পাল্টায়। বর্তমানের চোখ দিয়েই মানুষ ইতিহাস যাচাই করে। তাতে ঘটনার বর্ণনা শুদ্ধ হয় না। সেখানে বিকৃতি হানা দেয়। ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমাদের জানা ইতিহাস এই লাইনে যদি বলতে চাই তবে সেটা হল "পশ্চিম পাকিস্তানীরা আমাদের উপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, কিন্তু বাঙালি জাতি তা মেনে নেয় নি। অবশেষে ভাষার জন্য বাঙালি লড়াই করে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় সমুন্নত করেছে"। আমি আমার পূর্বের লেখায় এই একপেশে ইতিহাসের বর্ণনার অসারতা তুলে ধরেছি। ভাষা আন্দোলন আমার কাছে বাঙালি জাতির সংকীর্ণতা।  

সে যাই হোক। ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালীর কিছু অংশের দাবী। বাঙালিরাই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ছিলেন না। আজ এই বিষয় নিয়ে লিখছি। ভাষা আন্দোলন নিয়ে এটা আমার দ্বিতীয় লিখা। এটাকে লিখা বললে ভুল হবে। এটা মূলত সংকলন। যারা ভাষা সৈনিক ছিলেন তাদের জবানীতেই আমরা দেখবো ঐ সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আসলে কী চেয়েছিল?  

ভাষা আন্দোলনের আলোচনায় যার কথা সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হওয়া উচিত তার নাম প্রিন্সিপ্যাল আবুল কাসেম। তিনি ১৯৪৭ সালে ঢাবির তরুণ অধ্যাপক। তার নেতৃত্ব এবং কর্মতৎপরতায় প্রতিষ্ঠিত হয় তমুদ্দুনে মজলিশ। তমুদ্দুনে মজলিশ ছিল মূলত রাজনৈতিক দল খেলাফতে রব্বানীর সাংস্কৃতিক উইং। আবুল কাসেম সাহেব ভাষা আন্দোলনের মূল সংগঠক। তাকে যখন প্রশ্ন করা হল, দেশ বিভাগের পর রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত চিন্তা ভাবনা ও পরিবেশ কেমন ছিল? 

জবাবে তিনি বলেন, দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হতে পারে কিনা এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মত খুব কম লোকই ছিল। শুধু তাই নয়, অনেকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে উর্দুর সমর্থক ছিলেন। তার ঐতিহাসিক কারণও ছিল। অখণ্ড ভারতে বর্ণহিন্দুরা কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার মাধ্যমে হিন্দীকে যেমন ভবিষ্যত রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার সব রকমের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন- তেমনি মুসলমানরাও হিন্দীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের যুক্তি ও দাবী পেশ করে সোচ্চার হয়ে উঠেন। এ ব্যাপারে কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দের হিন্দীর প্রতি সমর্থন মুসলমানদেরকে উর্দুর প্রতি ঠেলে দেওয়া ত্বরান্বিত করে। দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের শাসক মহল হতে একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে অবহেলা করা হয়। অপর দিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে প্রথমে পূর্ব-পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) শিক্ষিত সমাজ চরম উদাসীন থাকে। 

আবুল কাসেম সাহেব বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রচারণার জন্য একটি বই লিখেছেন। যেখানে তিনি যুক্তি দিয়ে লিখার চেষ্টা করেছেন কেন রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া জরুরী? বইটি ক্যাম্পাসে কেমন সাড়া জাগিয়েছিল? 

এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সত্যিকারে বলতে কি, এ বইটি কেনার মত ৫ জন লোকও প্রথমে ক্যাম্পাসে পাওয়া যায় নি। মজলিসের কর্মীদের সঙ্গে করে বইটি নিয়ে অনেক জায়গায় ছুটে গিয়েছি কিন্তু দু'এক জায়গায় ছাড়া প্রায় সব জায়গা হতেই নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছি। পাকিস্তান লাভের সফলতা তখন সারা জাতিকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এ সময় রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে একাধিক ভাষার প্রশ্ন তোলা যে কত মারাত্মক ক্ষতিকর', আর বিশেষ করে পাকিস্তানের জন্য ২টি রাষ্ট্রভাষা যে কত বড় “অবাস্তব” প্রস্তাব তাই যেন সেদিন সকলে বুঝাবার চেষ্টা করতেন। কেউ বলতে চাইতেন এটা ‘পাগলামী’ ছাড়া আর কিছু নয়।

ক্যাম্পাসে তখনকার শ্রেষ্ঠ শিক্ষা কেন্দ্র “মুসলিম হল” ও “ফজলুল হক হলেও” আমরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার ব্যাপারে বৈঠক করার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি। শুধু তাই নয়, আমরা রুমে রুমে গিয়েও ব্যক্তিগত আলোচনা চালিয়েছি, কিন্তু দু’একজন ছাড়া প্রায় ছাত্রই এ বিষয়ে বিরূপ ভাব দেখিয়েছেন। "উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলেই বা কি, এ নিয়ে মাথা ঘামাবার কিছু নেই।' এই ছিল তখনকার সাধারণ মনোভাব। 

সত্য কথা বলতে কি সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্র ও কর্মীদের এত চেষ্টা সত্ত্বেও জনসাধারণ এ আন্দোলনের বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকে। তার সংগে যোগ হয় সরকারী প্রচার। অতিপ্রগতিশীলদের কয়েকটি গোপন পোস্টারকে ভিত্তি করে নির্লজ্জভাবে সরকার প্রচার করতে থাকে যে এটা রাষ্ট্রের শত্রুদের কাজ। ফলে জনসাধারণ আরো ক্ষেপে উঠে। এ সময়ে ইউনিভার্সিটির নিকটস্থ তমদ্দুন মজলিসের অফিসটি স্থানীয় লোকেরা লুট করে-প্রকাশ্যভাবে ভীতিপ্রদর্শন করে অফিসটি উঠিয়ে দেয়। বলাবাহুল্য যে, এ মজলিস অফিসই ছিল সংগ্রাম পরিষদের তথা ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় অফিস। 

ঢাকার জনসাধারণ ভাষা আন্দােলনের ফলে খুবই ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। তারা ভাষা আন্দোলনকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। মজলিস কর্মীদের ও ছাত্রদের তখন শহরে প্রবেশ একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। মজলিস কর্মী মোঃ সিদ্দিকুল্লা (সলিমুল্লা হলের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারী) ছদ্মবেশে বলিয়াদি প্রেসে হ্যাণ্ডবিল ছাপাতে গিয়ে কসাইটুলীতে বন্দী হন এবং তাঁকে কেটে ফেলার মুহুর্তে জনৈক দয়াশীল লোকের দ্বারা মুক্ত হয়ে পলায়ন করতে সমর্থ হন। আমার নিজের উপর কয়েকবার হামলা হয়। ঢাকা কলেজের অধ্যাপক এ,কে,এম, আহসান সাহেবকেও মারপিট করা হয়। এইভাবে ছাত্র ও কর্মীরা রমনাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

যদিও প্রিন্সিপ্যাল কাসেম সাহেব বলেছেন, নির্লজ্জভাবে সরকার প্রচার করেছে ভাষা রাষ্ট্রের শত্রুদের কাজ। কিন্তু কাসেম সাহেব সেই গোপন পোস্টারগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন নি। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সেসব পোস্টারে ইসলাম ও পাকিস্তানকে কটাক্ষ করা হয়েছে। কমিউনিস্টদের প্রচারণা চালানো হয়েছে। কাসেম সাহেব যদিও ইসলামবিরোধী নন তারপরও তিনি তার আন্দোলনকে জমানোর জন্য হিন্দুত্ববাদী, কমিউনিস্ট ও ইসলামবিরোধীদের সহায়তা নিয়েছেন। যার দরুণ ঢাকার জনসাধারণের কাছে ভাষা আন্দোলনের আবেদন নষ্ট হয়ে যায়। এটি স্পষ্ট ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রতীয়মান হয়।   

বাঙলার পক্ষের লোকেরা কয়েকশো স্বাক্ষর জড়ো করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের নিকট তাদের দাবীর পক্ষে জনমত আছে তা বোঝাতে চেয়েছেন। এর বিপরীতে বাঙলা বিরোধী আন্দোলনও তখন জমে উঠে। এই প্রসঙ্গে আবুল কাসেম বলেন, এদিকে উর্দু সমর্থক আন্দোলন গড়ে উঠে। স্বনামখ্যাত মৌলানা দীন মোহাম্মদ সাহেব প্রমুখকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল্লায় ও মফস্বলের বহুস্থানে উর্দুকে সমর্থন করে বহু সভা করা হয়। এঁরা কয়েক লাখ দস্তখত যোগাড় করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এক মেমোরেণ্ডাম পেশ করেন। পথেঘাটে ইস্টিমারে এ স্বাক্ষর সংগ্রহের কাজ চলে। স্বাক্ষর সংগ্রহের পর কয়েকজন নাম করা ব্যক্তি করাচীতে গিয়ে সরকারের কাছে পেশ করে আসেন। 

মিডিয়া সাপোর্টও খুব একটা ছিল না বাংলার পক্ষে। আবুল কাসেমের ভাষায়, তখনকার ঢাকার “মর্নিং নিউজ" ও সিলেটের “যুগভেরী” জঘন্যতমভাবে ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে লিখতে থাকে। ‘মর্নিং নিউজ’ সম্পাদকীয়তে ও চিঠিপত্র বিভাগে মজলিসকে রাষ্ট্রদ্রোহী প্রতিষ্ঠান বলে ঘোষণা করা হয়। 'যুগভেরী’ একদিন এমনও লিখে যে, তমদ্দুন মজলিস একটি ভয়ঙ্কর বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান। ভাষা আন্দোলনের এ সংগঠন ঢাকাতে সমান্তরাল সরকার (Porollel Government) প্রতিষ্ঠা করে ট্যাক্স আদায় করছে। 

ঢাকা ভার্সিটির ছাত্রদের মধ্যেও বাঙলা-বিরোধী আন্দোলন জমে উঠে। এই প্রসঙ্গে কাসেম সাহেব বলেন, বাঙালি ছাত্র সমাজের একটা অংশও তখন উর্দু সমর্থক আন্দােলনে যোগ দেয়। রায় সাহেব বাজার হতে এরূপ এক ছাত্র মিছিল বের হয়ে ঢাকা কলেজে আসে। আন্দোলনের সময় ফজলুল হক হল হতেও ছাত্রনেতা শামছুল হুদা সাহেবের নেতৃত্বে বাংলা বিরোধী এক ছাত্র মিছিল বের করা হয়। এক সময় ঢাকার নবাব সাহেব ফুলতলায় (ঢাকা স্টেশন) আমাদের এক মিছিলে লোক লেলিয়ে দিয়ে লাঠিপেটা করান। এ হামলায় বিখ্যাত সমাজকমী নাজির আহমদ সহ আমরা বহুজন আহত হই।

ভাষা আন্দোলনে তমুদ্দুনে মজলিশ জনসাধারণের সমর্থন পাওয়াতো দূরের ব্যাপার ঢাবির ছাত্রনেতাদের কাছে পেলেও ছাত্রদের নিরঙ্কুশ সমর্থন পায়নি। এর মধ্যে কবি হাসান হাফিজুর বহু উর্দু সমর্থক ছাত্রকে মারধর করেন। এতে পরিস্থিতি আরো বিরূপ হয়। ভাষা নিয়ে প্রথম সহিংসতা শুরু করে ভাষা আন্দোলনকারীরা এই ব্যাপারে কাসেম সাহেবের জবানীতেই শুনুন,

"১৯৪৮ সনের প্রথম দিক। এত বিপত্তি সত্বেও আন্দোলন চলতে থাকে। ধর্মঘটে যোগ দেয়ার জন্য রেল শ্রমিকের সংগে ও কেন্দ্রীয় কর্মচারী সমিতির সাথে আমি যোগাযোগ করি। নির্দিষ্ট দিনে ২২শে মার্চ ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গনে মিটিং হয়। মিটিং-এর পর মিছিল বের হয়। মিছিলকে হাইকোর্ট পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নেয়া হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে মন্ত্রীত্বলোভীদের সমর্থকেরা অন্যান্য স্যাবোটিয়ারদের সঙ্গে মিলে কতকগুলো অশোভন কাজ করে বসে।

বহু ঘন্টা ধরে সেক্রেটারিয়েট ঘিরে রাখা হয়। জনৈক মন্ত্রীকে সেক্রেটারিয়েট হতে বের করা হয় এবং তিনি বাঙলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে না পারলে পদত্যাগ করবেন বলে লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হন ও আগাম পদত্যাগ পত্র লিখে দেন। সে পদত্যাগ পত্র আমার কাছে দেয়া হয়। আমি নিজে এগিয়ে গিয়ে সেক্রেটারিয়েটের সামনের প্রাঙ্গন হতে তাকে রক্ষা করি।ইতিমধ্যে এই খবর শহরে ছড়িয়ে পড়ে। খবর আসে যে কিছু লুংগি পরা শহরের গুণ্ডা সেক্রেটারিয়েটে ঢুকে পড়েছে। তখন তাদের আক্রমণের ভয়ে ছাত্ররা সেক্রেটারিয়েট ছেড়ে চলে যায়। এ সময়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মন্ত্রী জনাব আবদুল হামিদ সাহেবের বাগান নষ্ট করা হয়। আর একজন মন্ত্রীর দাড়ি ধরে অপমান করা হয়। সেক্রেটারিয়েটের জনৈক নিরীহ পুলিশকে আধমরা করে রাখা হয়। এর ফলে জনসাধারণের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তারা ছাত্রদের মারার জন্য সলিমুল্লা হল ও ফজলুল হক হল আক্রমণ করবে বলে খবর আসতে থাকে। ছাত্রদের নিয়ে আমরা সারা রাত গোট বন্ধ করে ছাদে উঠে পাহারা দিতে থাকি। এক বিভীষিকাময় অবস্থার মধ্যে কয়েক দিন সকলকে সময় কাটাতে হয়।
- ভাষা আন্দোলনঃ সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন/ পৃঃ ৩২-৩৩, ৩৬-৩৭, ৪৫-৪৭

ভাষা আন্দোলনে কমরেড তোয়াহা এক উজ্জ্বল নাম। তিনি যদিও সেসময়ে প্রকাশ্যে মুসলিম লীগ করতেন তবে অনেকেই তাকে কমিউনিস্ট হিসেবে সন্দেহ করতো। সেই সন্দেহকে মিথ্যে হতে দেন নি তোয়াহা। পরবর্তিতে সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। জনবিচ্ছিন্ন ভাষা আন্দোলন পরবর্তিতে ঢাবির ছাত্রদের ভালো সমর্থন পেয়েছিল। এর কৃতিত্ব কমরেড তোয়াহার।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবী ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল? এই প্রশ্নের জবাবে কমরেড তোয়াহা বলেন, 
জনসাধারণকে এমন একটা ধারণা দেয়া হচ্ছিল যে, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী তুলে ছাত্ররা পাকিস্তান ও ইসলামিক আদর্শের খেলাপ কাজ করছে। বিশেষ করে তৎকালীন মহল হতে ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানাভাবে ঢাকার স্থানীয় জনসাধারণকে উত্তেজিত করা হচ্ছিল। ফলে সিদ্দিক বাজার, নাজিরা বাজার প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় জনগণ একদিন মারমুখো হয়ে এসে তমদ্দুন মজলিস অফিসে হামলা চালায় এবং সব কিছু তছনছ করে দেয়। এ ঘটনার পর পরই আমি অন্যান্য তমদ্দুন মজলিস কর্মীদের সাথে অফিসের কাগজ-পত্র সরিয়ে আনি।

এসময় একদিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে ইশতেহারবিলি করতে গিয়ে ছাত্ররা একদিন চকবাজারে জনতা কর্তৃক ঘেরাও হয়। তখন পরিস্থিতি খুবই প্রতিকূল ছিল। ছাত্ররা উত্তেজিত জনতার সামনে অসহায় অবস্থার সম্মুখীন হয়। এসময় গোলাম আযম সাহস করে এগিয়ে যান। তিনি চিৎকার করে জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, “আরে ভাই আমরা কি বলতে চাই তা একবার শুনবেন তো।” এই বলেই তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলে পূর্বপাকিস্তানের জনগণের কি উপকার হবে তার ওপর ছােট-খাট বক্তৃতা দিয়ে উপস্থিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
- ভাষা আন্দোলনঃ সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন/ পৃঃ ৫৬- ৫৭ 

অধ্যাপক শাহেদ আলী তমুদ্দুন মজলিসের অন্যতম সংগঠক। সেই সাথে ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিককার অগ্রগামী যোদ্ধা। ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র "সৈনিক" পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবী প্রশ্নে তখন যে প্রতিকূল পরিবেশ বিরাজ করছিল সে সম্পর্কে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ একেবারেই প্রতিকূল ছিল। সাধারণ ছাত্ররাও প্রথমে ততটা গভীরভাবে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নটি ভেবে দেখেনি। আর মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ তো রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীটি প্রথম থেকেই ভালো চোখে দেখেন নি। পুরোনো ঢাকাতে ভাষার দাবী নিয়ে কোন আলাপই করা যেতো না। আর পুরোনো ঢাকার কথাই বা বলি কেন? আমার নিজের জেলা সিলেটের অবস্থাও ছিল তার চেয়ে সঙ্গীন। সেখানে ভাষার দাবী নিয়ে মুখ খোলার কোন উপায় ছিল না। সবাই তখন পাকিস্তান নিয়ে বিভোর! নতুন বিতর্ক শুনতে কেউ রাজী নয়। ’৪৮ সালে আমি সিলেটের এম, সি, কলেজে গেলাম মজলিসের উদ্যোগে ভাষা প্রশ্নে কিছু আলাপ-আলোচনা করতে। কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী নিয়ে অনেকে রীতিমত উপহাস করলেন। এসব গুণী ব্যক্তিগণ এখন অতি উচ্চ সরকারী পদে অধিষ্ঠিত আছেন। তারা তখন বাংলা যে রাষ্ট্রভাষা হতে পারে এটা কল্পনাও করতে পারেন নি।
সিলেটে তমদ্দুন মজলিসের সেক্রেটারী জনাব দেওয়ান মোহাম্মদ ওহিদুর রেজা চৌধুরীর উদ্যোগে রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বপক্ষে মিটিং আহবান করা হয়। কিন্তু জনমত এত প্রতিকূল ছিল যে মিটিং থেকে জোর করে মাইক কেড়ে নেয়া হলেও আমাদের কিছু করার ছিল না। 

তিনি আরো বলেন, সারা দেশে (ভাষা আন্দোলন) বিস্তৃতি লাভ করাতাে দূরের কথা ঢাকাতেও অনেক স্থানে রাষ্ট্রভাষার স্বপক্ষে প্রচার চালাতে গেলে নাজেহাল হতে হতো। পুরোনো ঢাকার চকবাজার, সিদ্দিকবাজার, কলতাবাজার প্রভৃতি এলাকায় সবসময় রাষ্ট্রভাষার দাবী নিয়ে কথা বলা যেতো না। কলতাবাজার, রায়সাহেব বাজার দিয়ে ছাত্রদের নিরাপদে আসার উপায় ছিলনা। ছাত্র দেখলেই তারা এইসব আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে মারধর করতো। তাই আমরা নবাবপুর রোড দিয়ে না এসে শাখারী পট্টির ভেতর দিয়ে নয়া বাজার, বংশাল হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আসতাম। 
- ভাষা আন্দোলনঃ সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন/ পৃঃ ১০৪, ১১৮

অধ্যাপক গোলাম আযম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনুজ্জ্বল ব্যাক্তি। যদিও ভাষা আন্দোলন শুরুর সময়ে তিনি ডাকসুর জিএস ছিলেন এবং জিএস হিসেবে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তথাপি পরবর্তিতে ৭১ এ তিনি পাকিস্তানপন্থী ছিলেন বলে তার এই কর্মকান্ড চাপা পড়ে। তৎকালীন ঢাকার সাধারণ বাঙ্গালিদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, 

পাকিস্তান আন্দোলনের সময় থেকেই সিদ্দিক বাজার, বংশাল ও চকবাজার এলাকা মুসলিম প্রধান বিধায় যে কোন আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থনের জন্য সেখানে যেতে হতো। তাই একদল ছাত্র নিয়ে মিছিল সহকারে একদিন চকে গিয়েছিলাম। চুংগা ফুঁকে রাষ্ট্রভাষার স্বপক্ষে শ্লোগান দিচ্ছি। জেলের প্রধান ফটক অতিক্রমকালে জেলের ভেতর থেকেও আমাদের গ্রেফতারকৃত সাথীরা শ্লোগানে সাড়া দিয়ে আমাদের সমর্থন জানালো। চক পর্যন্ত যেতে যেতে আমরা তাদের শ্লোগান শুনলাম।

চকবাজার মসজিদের পাশে যখন ভাষার দাবীতে চুংগার মাধ্যমে বক্তৃতা দিচ্ছিলাম, তখন সরকার সমর্থক এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার কিছু বিরোধী লোক হামলা করে, আমার হাত থেকে চুংগা কেড়ে নিয়ে মাথায় ও গায়ে চুংগা দ্বারা মারতে থাকে। আমরা বুঝিয়ে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করি।

টিনের চুংগা ফুকে পুরোনাে ঢাকার আরো অনেক জায়গায় বক্তৃতা করেছি। শ্লোগান দিয়েছি-“বাংলা উর্দু ভাই ভাই, উর্দুর সাথে বাংলা চাই'। ভাষা প্রশ্নে তাদের সমর্থন পাওয়া যায়নি। তবে বাংলার বিপক্ষে সব জায়গা থেকে হামলা হয়নি। পুরোনো ঢাকায় মাওলানা দীন মুহাম্মদ (মরহুম), মাওলানা জাফর আহমদ ওসমানী, মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী প্রমুখের প্রভাব থাকায় এখানকার অধিবাসীরা উর্দুর পক্ষে ছিল।

তদানীন্তন প্রাদেশিক সরকার রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটিকে ভারতের উস্কানী ও হিন্দুদের আন্দোলন বলে প্রচার করায় জনমনে এ সম্বন্ধে সন্দেহ ছিল। এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, এ আন্দোলনে সবাই একই উদ্দেশ্যে শামিল হয়নি। আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। পূর্ব-পাক সাহিত্য সংসদের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে সৈয়দ আলী আহসানের সাথে আমার খানিক পরিচয় ছিল। সে সূত্রে তার সাথে পুরোনো রেডিও অফিসে (বর্তমান বোরহান উদ্দীন কলেজ) রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে একবার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিরোধী ছিলেন। এমনি ধরনের আরো অনেকে ছিলেন। এতে প্রমাণিত হয় অনেক বুদ্ধিজীবী এবং সুধীমহলের সমর্থন তখনও বাংলার পক্ষে ছিল না।

কারা ভাষা আন্দোলনের বিরোধীতা করেছিল? এমন কথার জবাবে অধ্যাপক গোলাম আযম বলেন, এঁদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লোক ছিলেন। কেউ কেউ কায়েদে আযমের অন্ধ অনুরাগী। কায়েদে আযম যা বলেছেন এর বিরোধিতা করার কথা এঁরা চিন্তা করতেও পারতেন না।  

এ দেশের ওলামা সমাজ উর্দুর পক্ষে ছিলেন। এর কারণ হয়ত তাদের পরিচিতি বাংলার চেয়ে উর্দুর সাথে ছিল ঘনিষ্ঠতর। এ প্রসংগে পল্টনে মাওলানা দীন মোহাম্মদ সাহেবের এক জনসভার কথা মনে পড়ে, তিনি সভায় উর্দুতে বক্তৃতা শুরু করলে আমরা ছাত্ররা 'বাংলায় বলুন' বলে ধ্বনি তুলি। তখন তিনি বলে উঠেন, “সিনেমা হলে উর্দু ছবি না হলে মন ভরে না, এখন চান বাংলায় বক্তৃতা’। আমরা চুপ করে যাই। আমাদের তেমন সমর্থকও ছিল না। তখন তিনি উর্দুতেই বক্তৃতা করেন।

খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেবের সমর্থকরা উর্দুর পক্ষে ছিলেন। কারণ পাকিস্তানের সংহতির জন্য তারা একটা রাষ্ট্রভাষার প্রয়োজনীয়তা বোধ করতেন এবং এজন্য ভাষা আন্দােলনকারীদের তারা হিন্দু কমিউনিষ্টদের এজেন্ট মনে করতেন।

আর একটা শ্রেণীও বাংলা ভাষার বিরোধিতা করেছেন। এরা সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে উর্দুকে হিন্দির বিরুদ্ধে মুসলিম জাতির সাধারণ ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইতেন।
- ভাষা আন্দোলনঃ সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন/ পৃঃ ১২৩ - ১২৫ 

কাজী গোলাম মাহবুব ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের তিনিই ছিলেন আহবায়ক। জনগণের মাঝে ভাষা আন্দোলনের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

উত্তরে তিনি বলেন, জনগণের মাঝে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঢাকার অধিবাসীরা এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে ছিল। তাদের মনোভাব ছিল, পাকিস্তান সবেমাত্র দুধের বাচ্চা, আর তোমরা এর মুখের দুধের বোতল নিয়ে টানাটানি শুরু করেছো? তাই ছাত্রদের রাষ্ট্রভাষার স্বপক্ষে তৎপরতাগুলো তারা ভালো চোখে দেখতো না। অনেক শিক্ষিত লোকের মাঝেও এ ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল।
- ভাষা আন্দোলনঃ সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন/ পৃঃ ১৬৬

ডাঃ সাঈদ হায়দার ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেলের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মেডিকেলের ছাত্রদের মধ্যে তিনিই নেতৃত্ব দেন। 
ভাষা আন্দোলনের সময়কার ঘটনার কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালের শেষের দিকের ঘটনা। সম্ভবত ডিসেম্বরের দিকে। দিনক্ষণ সঠিক মনে করতে পারছি না। আমাদের পলাশী ব্যারাকের ছাত্রাবাসের সামনের রাস্তায় ভাষা প্রশ্নে প্রথম প্রতিরোধ দ্বন্দ্ব সংঘটিত হলো। ছাত্রাবাসের সামনের সেই রাস্তাটি লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে সোজা সলিমুল্লাহ হলের সামনে এসে মিশেছিলো। সেদিন এ রাস্তা দিয়ে জন পঞ্চাশেক লোকের এক মিছিল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার স্বপক্ষে শ্লোগান দিতে দিতে নাজিরাবাজার ও মৌলভীবাজারের দিক থেকে এসে হাজির হয়। এদের অধিকাংশই ছিল পুরোনো ঢাকার স্থানীয় অধিবাসী এবং নবাবদের সমর্থক। প্রতিরোধ এলো, তাদের অগ্রগতিকে বাধা দিতে বেরিয়ে এলো ছাত্ররা। সে এক খণ্ড যুদ্ধ। 
- ভাষা আন্দোলনঃ সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন/ পৃঃ ২৬৪


তৎকালীন সময়ে শিল্পী কাজী আবুল কাসেমের অংকিত একটি কার্টুন। এই কার্টুন দেখেও আন্দাজ করা যায় ভাষা আন্দোলন ইসলামের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নিয়েছে। সদ্য জন্ম নেয়া মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র।

পাঠক আপনি এখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এটা কি আসলে বাঙালিদের আন্দোলন ছিল? না কি বাঙালিদের মধ্যকার একটি ক্ষুদ্র অংশের? এর বিরোধীতা কি পাকিস্তানীরা করেছিল? নাকি বাঙালিরাই এর বিরোধীতা করেছিল? আজ যদি চট্টগ্রামের লোকেরা বলে চট্টগ্রামের সব অফিসিয়াল কাজকর্ম চাটগাঁর ভাষায় হবে যেভাবে রোহিঙ্গাদের ভাষা চাটগাঁ। চাটগাঁকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে। সিলেটিরা যদি বলে তাদের ওখানে তাদের ভাষা চলবে। এভাবে নোয়াখালী, বরিশালরাও যদি ঝামেলা সৃষ্টি করে? তখন কি আর বাংলাদেশ থাকবে? 

২৮ অক্টোবর, ২০১৭

২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার তান্ডবের শিকার যারা

আজ সেই রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর। লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যার দিন। ২০০৬ সালের এই দিনে এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক কলংকজনক অধ্যায় রচিত হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে তরতাজা ১৪ জন মানুষকে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে নারকীয় উল্লাস চালানো হয়েছিল। 

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সেদিন জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উপর পৈশাচিক হামলা চালিয়েছে ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। লগি, বৈঠা, লাঠি, পিস্তল ও বোমা হামলা চালিয়ে যেভাবে মানুষ খুন করা হয়েছে তা মনে হলে আজও শিউরে ওঠে সভ্য সমাজের মানুষ। সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ মেরে লাশের উপর নৃত্য উল্লাস করার মতো ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব থেকে শুরু করে সারাবিশ্বে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। 

আটাশে অক্টোবরে সারাদেশে ১৪জন নিরীহ মানুষ শাহদাতবরণ করেছিলেন। সেই শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া হল। 


শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপন (২১)
জন্ম- ১৯৮০ সালের ১৪ আগস্ট মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
শহীদ : ১২৭তম
পিতা : মো: তাজুল ইসলাম
মাতা : মোছা: মাহফুজা বেগম
স্থায়ী ঠিকানা : ১১৯/১/খ, পূর্ব বাসাবো,ঢাকা-১২১৪
ভাইবোন : তিন ভাই ও এক বোন

শিক্ষাজীবন : কুরআনে হাফেজ, শাহাদাতের সময় তিনি ঢাকা কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

সাংগঠনিক জীবন : সংগঠনের সাথী ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড বায়তুলমাল সম্পাদক ছিলেন।
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে লগি বৈঠাধারীদের হামলায় আহত হয়ে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে শহীদ হন।

শহীদ গোলাম কিবরিয়া শিপন সদালাপি বিনয়ী ছাত্র হিসেবে এলাকায় সমধিক পরিচিত ছিলেন। শিপন ছিলেন কুরআনে হাফেজ, দাখিল পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন, পাশাপাশি IELTS পরীক্ষা দিয়ে ৫.৫ স্কোর করেছিলেন উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে। কিন্তু লগি বৈঠাধারী হায়েনারা তার সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। 

তার মা জানান, শিপন ২৭ অক্টোবর রাতে বাইরে যেতে চাইলেও তাকে যেতে দেয়া হয়নি। তাই পরদিন সকালে শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম (যিনি একই ঘটনায় শাহাদাতবরণ করেন) এসে ডাক দিলে সে আর বিলম্ব না করে বলে, আম্মা আমাকে রাতে যেতে দেন নাই কিন্তু আজ আর আমাকে নিষেধ করতে পারবেন না। এরপর সে হালকা একটু সেমাই খেয়ে ঘর হতে বের হয়ে যান। চলে আসেন পল্টন এলাকায়।


শহীদ মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম (২২)
জন্ম- ১৯৮৫ সালের ২৬ নভেম্বর, মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
শহীদ শিবির তালিকা -১২৬ তম
পিতাঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন
মাতা: মাহমুদা দেলোয়ার মুন্নি

স্থায়ী ঠিকানাঃ গ্রামঃ কুলশ্রী,ডাকঘরঃ দরগাবাজার,উপজেলাঃ চাটখিল,জেলাঃ নোয়াখালী
ভাই-বোনঃ দুই ভাই এক বোন, মুজাহিদ সবার বড়।

শিক্ষাজীবনঃ শাহাদাতের সময় তিনি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
সাংগঠনিক জীবনঃ সংগঠনের সদস্য ও মিরপুর ১০ নং ওয়ার্ড সভাপতি ছিলেন।

শহীদ মুজাহিদের পুরো নাম মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম ফাহিম। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন এলাকায় লগি বৈঠা বাহিনী একের পর এক পিটিয়ে হত্যা করে তাকে। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা মুজাহিদকে লগি বৈঠা দিয়ে আঘাত করতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ রাজপথে তার লাশ পড়ে ছিল পরে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে শহীদ হন।



শহীদ সাইফুল্লাহ মুহাম্মদ মাসুম (১৬)
শাহদাত- ২ নভেম্বর ২০০৬
শহীদ : ১৩১তম
পিতা : মাহতাব উদ্দিন আহমদ
মাতা : শামছুন নাহার রুবি
স্থায়ী ঠিকানা : ১৩০/১৬, বাগানবাড়ি, মাদারটেক, বাসাবো, সবুজবাগ, ঢাকা।
ভাইবোন : দুই ভাই ও তিন বোন

শিক্ষাজীবন : শাহাদাতের সময় তিনি সরকারি তিতুমীর কলেজে ইংরেজি বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
সাংগঠনিক জীবন : সংগঠনের সাথী ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ সভাপতি ছিলেন।
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে ১৪ দলের হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ নভেম্বর ২০০৬ ভোর ৪টায় ইবনে সিনা হাসপাতালে শহীদ হন।

ভয়াল আটাশের সকালে শহীদ মাসুম ও শহীদ শিপন একসাথে বাড়ি থেকে বের হয়। কিন্তু তারা আর জীবিত ফিরে আসেনি, এসেছে লাশ হয়ে। তারা বাসা থেকে বের হয়ে সরাসরি চলে আসে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে। সেখানেই লগি বৈঠা বাহিনীর ইটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম। ৫ দিন সংজ্ঞাহীন থাকার পর ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর ভোর ৪টায় মহান আল্লাহর শাশ্বত আহ্বানে সাড়া দিয়ে শাহাদাতবরণ করেন সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম। জীবন্ত মাসুমের চেহারা আর মৃত মাসুমের চেহারার মাঝে তফাত ছিল অনেক। তার সুন্দর, নিষ্পাপ চেহারাটি যেন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছিল। শহীদ মাসুমকে কেউ কোনদিন রাগ কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখেনি।



শহীদ রফিকুল ইসলাম (১৫)
মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
শহীদ : ১২৮তম
পিতা : মো: আমির হোসেন
মাতা : মোছা: রোকেয়া খাতুন
স্থায়ী ঠিকানা : চরযাত্রাপুর, যাত্রাপুর, কুড়িগ্রাম
ভাইবোন : ২ ভাই ও ২ বোন

শিক্ষাজীবন : শাহাদাতের সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।

সাংগঠনিক জীবন : সংগঠনের সাথী ও যোগদাহ ইউনিয়ন সেক্রেটারি ছিলেন।
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের লগি-বৈঠার পৈশাচিক আঘাতে আহত হয়ে বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শহীদ হন।


শহীদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সল (২৪)
মৃত্যু- ২৯ অক্টোবর ২০০৬
শহীদ : ১২৯তম
পিতা মো: আহসানুল হাই
মাতা : সাইয়্যেদা হাসনা বানু
স্থায়ী ঠিকানা : পাইনাদী, মোস্তফানগর, সানারপাড়া, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
ভাইবোন : ৫ ভাই ও ২ বোন

শিক্ষাজীবন : শাহাদাতের সময় তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় হাজী শামসুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন।

সাংগঠনিক জীবন : সংগঠনের কর্মী ও অধ্যয়নরত বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

শাহাদাতের তারিখ ও স্থান : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সিদ্ধিরগঞ্জ চিটাগাং রোডে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলায় মারাত্মক আহত হয়ে ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে শহীদ হন।

শহীদ আবদুল্লাহ আল ফয়সাল হত্যাকারীদের বিচার তো হয়ই নি, উল্টো বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক মামলা বলে মামলাটিই প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোডে ছাত্রশিবিরের মিছিলে হামলা চালায় লগি বৈঠা বাহিনী। উল্লাসের সাথে লগি বৈঠা সন্ত্রাসীরা আগাত করতে থাকে নেতাকর্মীদের উপর। এ সময় শহীদ আবদুল্লাহ আল ফয়সালের বড় ভাই ফাহাদ বিন আহসানকে ঘিরে ফেলে সন্ত্রাসীরা। কাছেই ছিল ফয়সাল। ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে যান তিনি। লগি বৈঠার আঘাত এসে পড়তে থাকে তার উপর। এক পর্যায় মাথায় আঘাত পেয়ে মাটিতে লুটয়ে পড়েন তিনি। দুই ভাই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। পরদিন রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় পরপারে পাড়ি জমান ফয়সাল।


শহীদ মোঃ শাহজাহান আলী 
পিতাঃ মৌলভী সিরাজুল ইসলাম 
৬ ভাই ২ বোন 
বয়স ২৫ 
সাংগঠনিক মানঃ শিবিরের সদস্য, নাঙ্গলকোট থানা দক্ষিণ সভাপতি।
গ্রামঃ উত্তর দুর্গাপুর, পোঃ দুর্গাপুর বাজার, উপজেলাঃ নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা 
৩১ অক্টোবর নাঙ্গলকোট কলেজ মাঠের সন্নিকটে সন্ত্রাসীদের হামলায় শাহদাতবরণ করেন।  



শহীদ জসিম উদ্দিন
জন্ম- ১৯৮৬ সালের এপ্রিল ,মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
ঠিকানা; লালবাগের মিটফোর্ড রোডে বাসা।
সাংগঠনিক জীবন : জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও ৬৬ নং ওয়ার্ডের মিটফোর্ড ইউনিটের সভাপতি ছিলেন। 

২৮ অক্টোবরে লগি-বৈঠা বাহিনীর নির্মম শিকার লালবাগের শহীদ জসিম উদ্দিন। সেদিন লগি-বৈঠাধারী সন্ত্রাসীরা তাকে শুধু সাপের মতো পিটিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, লাশের ওপর উঠে পৈশাচিক নৃত্য উল্লাস করেছে, করেছে আনন্দ উল্লাস। কী অপরাধ ছিল জসিমের? কেন তাকে মরতে হলো? এ প্রশ্নের জবাব আজো খুঁজে পায়নি তার বাবা-মা।

২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা বাহিনীর তান্ডবে যারা প্রাণ হারান তাদের মধ্যে জসিম উদ্দিন শাহাদাতবরণ করেন নির্মমভাবে। বিভিন্ন ভিডিওফুটেজ থেকে দেখা যায়, লগি-বৈঠা বাহিনী জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিনকে দীর্ঘক্ষণ ধরে পিটায়। মাঝে-মাঝে সে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করে। আবার টেনে ধরা হয়। পুরো শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। এক পর্যায়ে তার শরীরের জামা ছিঁড়ে ফেলা হয়। লগি-বৈঠা দিয়ে তাকে পিটানোর পর মৃত্যু নিশ্চিত হলে লাশের ওপর উঠে নৃত্য করতে থাকে নরপিশাচরা।


শহীদ আরাফাত হোসেন সবুজ
পিতাঃ ওয়ালিয়ার রহমান 
মাতাঃ সালেহা খাতুন (জামায়াতের রুকন)
ভাই-বোনঃ ২ ভাই ২ বোন 
বয়সঃ ২৩ 
সাংগঠনিক মানঃ জামায়াত কর্মী 
ঠিকানাঃ গ্রাম-দরি, পোঃ- পলিতা, সদর, মাগুরা 
২৮ অক্টোবর ২০০৬ বেলা ১১ টায় আওয়ামীলীগের হামলায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহদাত বরন করেন।


শহীদ আব্বাস আলী 
পিতাঃ জহুরুল হক
পেশাঃ ব্যবসা 
বয়সঃ ২৬ 
সাংগঠনিক মানঃ জামায়াত কর্মী। 
ঠিকানাঃ গ্রাম- হিজুলি, পোঃ আমঝুপি, সদর, মেহেরপুর। 
মেহেরপুর শহরে আওয়ামী লীগের গুলিতে বিকেল পাঁচটায় শাহদাতবরণ করেন।


শহীদ জাবিদ আলী 
পিতাঃ হোসেন আলী 
স্ত্রীঃ আম্বিয়া খাতুন 
ছেলেঃ ৩ মেয়েঃ ৩ 
পেশাঃ ব্যবসা 
বয়সঃ ৫৫
সাংগঠনিক মানঃ জামায়াতের রুকন, খাজুরা ইউনিয়ন সভাপতি। 
ঠিকানাঃ গ্রাম- কাপসন্ধা, ইউনিয়ন- খাজুরা, উপজেলা- আশাশুনি, সাতক্ষীরা 
আটাশে অক্টোবর সন্ধ্যায় সমাবেশ থেকে ফেরার পথে আওয়ামী লীগের হামলায় শাহদাত বরণ করেন।


শহীদ সাবের হোসেন 
পিতাঃ আতিয়ার রহমান
স্ত্রীঃ ফেন্সী বেগম 
ছেলেঃ ৩ মেয়েঃ ১ 
বয়সঃ ৩২ 
সাংগঠনিক মানঃ জামায়াত কর্মী 
ঠিকানাঃ গ্রাম- পূর্ববালা, পোঃ বালাগ্রাম, উপজেলা- জলঢাকা, জেলাঃ নীলফামারী 
তিরিশ অক্টোবর ২০০৬ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হন। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্ধ্যায় শাহদাতবরণ করেন।    



শহীদ রুহুল আমিন 
পিতাঃ আবু জাফর
স্ত্রীঃ সুলতানা রাজিয়া 
ছেলেঃ ২ মেয়েঃ ৩ 
বয়স ৪৫ 
সাংগঠনিক মানঃ রুকন, জেলা অফিস সম্পাদক 
ঠিকানাঃ গ্রাম- লক্ষ্মীপুর, ডাকঘর- জয়দেবপুর, সদর, গাজীপুর। 
এশার নামাজ আদায় করে ফেরার পথে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় শাহদাতবরণ করেন।  



শহীদ জসিম উদ্দিন।
জন্ম-১৯৭২ মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬ 
শিক্ষা: ১৯৯৩ সালে তিনি স্নাত্বক সম্পন্ন করেন।
ঠিকানা: শহীদ জসিম উদ্দিন ১৯৭২ সালে চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার সুদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস।
শহীদ জসিম উদ্দিন ৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন।

শহীদ জসিম উদ্দিন ১৯৯৬ সালে সিঙ্গাপুর যান। সেখানে তিনি ২ বছর অবস্থান করেন। ২০০১ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০০২ সালে সৌদি আরব ও ২০০৫ সালে পুনরায় দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। পিতার মৃত্যুর সংবাদ শুনে ২০০৬ সালের মার্চে তিনি দেশে আসেন। ১২ নবেম্বর পুনরায় দক্ষিণ আফ্রিকা চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২৮ অক্টোবর সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। লগিবৈঠা বাহিনীর বুলেটের আঘাতে লাশ হতে হলো শহীদ জসিম উদ্দিনকে।


শহীদ হাবিবুর রহমান (৪০)
জন্ম- মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
পিতা: আবদুল মুকিম মৃধা
মাতা: সাহেরা বেগম
ঠিকানা: গ্রামের বাড়ী মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায় মৃধা কান্দি গ্রামে।পরবর্তীতে জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন ঢাকায়।
এসবের মাঝেও বেশি সময় ব্যস্ত থাকতেন মানুষকে কুরআন ও হাদীসের কথা বলার জন্য। 

শিক্ষা: মাত্র ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়া হাবিবুর রহমান আয়ত্ত করেছিলেন কুরআন হাদীসের অনেক বিষয়। 

প্রথমে তারা হাবিবুর রহমানকে গুলী করে। তারপর লগিবৈঠা দিয়ে উল্লাসের সাথে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর তার লাশ দীর্ঘক্ষণ রাস্তার উপরে পড়ে থাকে। পরে তারা লাশটি গুম করার উদ্দেশ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ উদ্ধার করে লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও চলে লাশ ছিনিয়ে নেয়ার নানা চেষ্টা। তার নাম মনির হোসেন এবং দলীয় কর্মী দাবি করে আওয়ামী লীগ।

স্ত্রী আছিয়া বেগম স্বামীকে হারিয়ে ১ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছে ।এখন কান্নাই তার এখন একমাত্র সঙ্গী।

২৪ অক্টোবর, ২০১৭

ইসলামী আন্দোলনে হীনমন্যতাবোধের সুযোগ নেই


ইসলামী আন্দোলন নিছক রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। নয় নিছক ক্ষমতার রাজনীতি। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় পাঠাবার আন্দোলনও নয় এটি বরং আল্লাহর দ্বীন বা ইসলামী আদর্শকে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসাবে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল দিক ও বিভাগে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠাই ইসলামী আন্দোলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ক্ষমতা লাভের পথ দীর্ঘ মনে হবার কারণে অথবা বিপদসংকুল ও বাধা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হবার কারণে ইসলামী আদর্শ তথা সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কাজ আপাতত: বাদ দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষমতার রাজনীতির নিয়ামক শক্তিসমূহের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কৌশল অবলম্বনের পথ বেছে নেয়ার যুক্তি বাস্তবে কতটা টেকসই হতে পারে গভীরভাবে তা তলিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। অবশ্য ইসলামী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টদের একটা পথ বন্ধ হলে দশটা পথ খোলার মত যোগ্যতা-দক্ষতা অবশ্যই থাকতে হবে। তবে বাস্তবে পথ বন্ধ হবার আগে কৃত্রিমভাবে নিজেদের পক্ষ থেকে পথ বন্ধ করে কোন কৌশল অবলম্বনের চিন্তা-ভাবনা হীনমন্যতারই পরিচয় বহন করে এতে কোন সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে চতুর্মুখী চক্রান্ত ষড়যন্ত্র চলছে। তথ্য সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থেকে বিচারিক সন্ত্রাসের আয়োজন চলছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিন্তার ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় থাকা অপরিহার্য। তার চেয়েও বেশি অপরিহার্য হল আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের ভিত্তিতে প্রতিকূলতার মোকাবিলায় অসীম ধৈর্য ও ছাবেতে কদমীর সাথে ময়দানে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে অকুতোভয়ে টিকে থাকার, বরং সামনে অগ্রসর হবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।’ পক্ষান্তরে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিপক্ষের এ সময়ের কৌশল হয়ে থাকে নানা কাল্পনিক, তাত্ত্বিক বিভ্রান্তির গুজব ছড়িয়ে চিন্তার ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্যে তথ্য সন্ত্রাস জোরদার করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কখনও কোন ব্যক্তি বিশেষের অপরিনামদর্শী কথা বা কার্যক্রমকে এরা সূত্র বা তথ্য উপাত্ত হিসাবে ব্যবহার করে এ ধরনের সুযোগ নিয়ে থাকে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে মহল বিশেষের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রচারণা বেশ সুকৌশলে চালানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে তারা কতিপয় ব্যক্তির একটি অপরিণামদর্শী ও অপরিপক্ব পদক্ষেপজনিত একটি বৈঠককে এবং পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধকে তথ্য উপাত্ত হিসাবে ব্যবহার করছে। যদিও তাদের সকল জল্পনা-কল্পনাকে ভুল প্রমাণ করে তাদের পরিকল্পিত প্রচারণার মুখে ছাই নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের যুবক ও ছাত্রকর্মী তথা নতুন প্রজন্মই রাজপথে শক্ত অবস্থান নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের উপর সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করে যাচ্ছে। অকুতোভয়ে জীবন দিতেও কুণ্ঠা বোধ করছে না এরপরও মহল বিশেষের পক্ষ থেকে ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে চিন্তার বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে অব্যাহতভাবে।

ইসলামী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নবীন ও প্রবীণ সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সামনে বর্তমানে মিসরের ইসলামী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের উপর যে গণহত্যা চালানো হচ্ছে তা থেকে দুটো বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। এক, তথাকথিত দেশী-বিদেশী সোস্যাল এলিটদের সমর্থন পাওয়ার জন্যে বা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার জন্যে দলের ইসলামী পরিচিতি বর্জন করেও কোন লাভ হয় না, দুই, ইসলামের সংগঠিত শক্তি হওয়াটাই মূল অপরাধ।

মিসরের ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে তো স্বাধীনতা বিরোধিতার কোন অভিযোগ আনার সুযোগ নেই। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বরং তাদেরই ছিল সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা। তারপরও তাদের দেশের প্রথমবারের মত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে কেন ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

ইতিপূর্বে ১৯৯১ সনে আলজিরিয়ায় ইসলামী সলভেশন ফ্রন্ট প্রথমবারের মত নির্বাচনে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতেই সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলকে গণতন্ত্রের প্রবক্তা বিশ্ব মোড়লেরা অকুণ্ঠ সমর্থন দেয় নিছক ইসলাম ঠেকাবার জন্যে। তাদের বিরুদ্ধেও আলজিরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধিতার কোন অভিযোগের সুযোগ ছিল না। ইসলামের পক্ষের সংগঠিত শক্তি হওয়াই তাদের অপরাধ। অতএব বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের অবস্থান যে নিছক ইসলামী আদর্শের পক্ষের শক্তির ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি রোধ করার জন্যেই এতে কোন বিবেকবান ব্যক্তির মনেই সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ থাকতে পারে না। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে মুসলিম ব্রাদারহুড তার নাম পরিচয় পালটিয়ে অন্য নামে ইসলামী পরিচিতি বাদ দিয়ে সংসদ ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাফল্য অর্জন করেছে, বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের কবে শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। আসলে কি মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের নাম পরিবর্তন করেছে নাকি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে একটা ফ্রন্ট করেছে। ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় এর আগেও তারা ওয়াকদ পার্টির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এবারেও তাদের একই কৌশল আমরা দেখতে পাই একটু ভিন্ন আংগিকে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতির মোকাবিলা তাদের করতে হচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকেই। ভিন্ন নামে নির্বাচনের পরও তাদের ক্ষমতায় টিকতে দেয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্বে তাদের সংগঠনের সুনামেই ইনশাআল্লাহ আগামীতে মিসরে একই সাথে ইসলাম ও গণতন্ত্রের বিজয় হবে একটি সফল ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে চিন্তার বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল হিসেবে একটা গোপন বৈঠক ও একই প্রবন্ধকে ব্যবহার করা হয়েছে। উক্ত প্রবন্ধে নাকি এও বলা হয়েছে যে, ভারতের জামায়াতে ইসলামী তাদের অতীতের ভুল শুধরিয়ে দলের নাম পরিবর্তন করে একটা প্লাটফরম করেছে যাতে নেতৃত্বের পর্যায়ে একজন হিন্দু, একজন খৃস্টানও আছে। আসলে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ তার নাম পরিবর্তন করেনি। তারা অতীতে নির্বাচনে কোন ভূমিকাই রাখতো না। ভোটও দিত না। তারা মূলত: একটা “সামাজিক, সাংস্কৃতিক ধর্র্মীয়” প্রতিষ্ঠান হিসাবেই কাজ করে আসছিল। মুসলিম পার্সনাল ল’-এর সংরক্ষণের ব্যাপারে তারা সকল ইসলামী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে কাজ করেছে। এর পর নির্বাচনী রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্যে একটা প্লাটফরম দাঁড় করিয়েছে, এটা তাদের কার্যক্রমের একটা নতুন অগ্রগতি বলতে পারি। কিন্তু অতীতের ভুল শুধরে তারা নাম পরিবর্তন করেছে, এমন কথা যদি কেউ বলে থাকেন বা লিখে থাকেন তা হলে তিনি তথ্য বিচ্যুতির আশ্রয় নিয়েছেন। এই তো সেদিনও জামায়াতে ইসলামী হিন্দের আমীর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের ব্যাপারে সরকারের উদ্দেশে উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছেন। তার বিবৃতি বিবিসিতেও প্রচারিত হয়েছে।

এটা ঐতিহাসিক বাস্তব ঘটনা যে ’৭১ সালে পাকিস্তানের অখ-ত্বের পক্ষে শুধু জামায়াতে ইসলামীই অবস্থান নেয়নি। বরং সকল ইসলামী ও মুসলিম সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এবং সুপরিচিত সব ইসলামী ব্যক্তিত্ব পাকিস্তানের অখ-নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, সেই কারণেই মুসলিম লীগের সকল গ্রুপসহ পিডিপি, কৃষক শ্রমিক প্রজাপার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ও জামায়াতে ইসলামকে একযোগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া ঐসব দলের আর কোনটাই সংগঠিত শক্তি হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় নাই বলেই তাদের নিয়ে বর্তমান সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই। তাছাড়া জামায়াতে ইসলামী বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার রাজনীতিতে ফ্যাক্টর হওয়াও একটা বড় কারণ। সেই সাথে প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী ভূমিকার ক্ষেত্রে জামায়তই প্রধান প্রতিবাদী শক্তি হওয়ার ফলেই আজ সরকারের কোপানলের শিকার হতে হচ্ছে। ১৯৯১ সালে এবং ২০০১ সালে জামায়াতের কারণে বিএনপি ক্ষমতায় আসা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসতে না পারাটাই জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ক্ষোভের প্রথম ও প্রধান কারণ। না হলে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পুনর্গঠিত হওয়ার পর থেকে ’৯১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বর্তমানে যে অভিযোগ এনেছে, সে অভিযোগ কোন দিনই আনেনি। ’৯২ সালে ‘ঘাদানিকের’ মাধ্যমে জামায়াতের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক অভিযান পরিচালনার মূল কারণ ছিল, জামায়াত কেন সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন দিল? কিন্তু পরবর্তীতে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামায়াতকে সাথে পেয়ে বা সাথে নিয়ে তাদের কোন আপত্তি তো ছিলই না, বরং অনেক তোয়াজ করে জামায়াতকে সাথে রাখার চেষ্টা করতে তাদের কোন কুণ্ঠা ছিল না। জামায়াতকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রেস ব্রিফিং দিতে তখন কোন সংকোচ বোধ করেননি। তাই আজ একথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায়, দেশের রাজনীতিতে জামায়াতের ফ্যাক্টর হওয়া এবং ভারতীয় এজেন্ডা ও ডিজাইন বাস্তবায়নের পথে প্রধান অন্তরায় হওয়াই জামায়াতের একমাত্র অপরাধ। জামায়াতের এই ভূমিকা আওয়ামী ঘরানা ও বাম ঘরানার কাছে যতই অগ্রহণযোগ্য হোক না কেন দেশবাসী এটাকে ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করবে সেদিন বেশি দূরে নয়। অতএব কোন মহলের প্রচারণায় বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের মনে হীনস্মন্যতা বোধের বা চিন্তার বিভ্রান্তির শিকার হবার প্রশ্নই ওঠে না।

ইসলামী আন্দোলনের মূল পথিকৃত শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁকেও আল্লাহ তায়ালাসহ বিভিন্ন সময়ের, তার পূর্বের নবী রাসূলদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার সাথী-সঙ্গীদের ছবর ও ইস্তেকামাতের সাথে ময়দানে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে সামনে অগ্রসর হবার তাকিদ দিয়েছেন। বর্তমানে আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন করে ওহীর মাধ্যমে কোন পথ নির্দেশ আসার সুযোগ নেই। তবে ময়দানের বাস্তবতাকে সামনে রেখে কোরআন ও সিরাতে রাসূল অধ্যয়ন করলে মনের সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও হতাশা কাটিয়ে উঠে পূর্ণ আস্থা নিয়ে ময়দানে টিকে থাকার এবং সামনে এগুবার প্রেরণা পাওয়া অবশ্যই সম্ভব।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের ইসলাম বিরোধী শক্তির নাস্তিক্যবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমে দ্বীন হাজার হাজার আলেমে দ্বীনের ওস্তাদ হযরত আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে গড়ে উঠা হেফাজতে ইসলামের রাজপথ কাঁপানো প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহেেণর পর থেকে সরকার এবং সরকারের দোসর ধর্মহীন রাজনীতির প্রবক্তা ও বাম ঘরানার রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের নানামুখী প্রচারণা ও জুলুম নির্যাতন আমাদর সকলের জন্যে একটি জীবন্ত নজির। হযরত আল্লামা আহমদ শফী এবং তার সহকর্র্মীদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা উত্তর ৪২ বছরে আওয়ামী ঘরানারা বাম ঘরানা বা পক্ষ থেকে এমন কোন অভিযোগ বা অপবাদ শোনা যায়নি যা বর্তমানে শোনা যাচ্ছে। কারণ একটাই এখন তারা সরকারের এবং সরকারের দোসরদের ন্যক্কারজনক ইসলাম বিরোধী ভূমিকায় মাঠে-ময়দানে সবর এবং সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। ইসলামের বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলন সংগ্রামের বিরুদ্ধে ঐ মহল বিশেষের আক্রোশ ও বিদ্বেষ মজ্জাগত। ইসলামের পক্ষে যারাই ইতিবাচক, সক্রিয় এবং শক্ত ভূমিকা রাখবে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের তুফান স্থায়ী করা অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানোই তাদের ইতিহাস। কাজেই এসব দেখে ইসলামের পক্ষের লোকদের আত্মবিশ্বাস এবং আস্থা আরো বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক। এটাই ইসলামী আন্দোলনের মূল ধারার যথার্থতার ও সঠিক পথে থাকার মহা সনদ যা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কর্তৃক সত্যায়িত বা অনুমোদিত।

সম্প্রতি মিসরের ঘটনার প্রতি গোটা বিশ্বের দৃষ্টি নিবন্ধ হয়ে আছে। মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা চলছে। এটা হলে নাকি সেখানে ইসলামী রাজনীতি বা তাদের ভাষা, রাজনৈতিক ইসলাম শেষ হয়ে যাবে, এই মর্মে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকের উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে। মন্তব্যকারী এই নিবন্ধ লেখার সময় মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে বিগত প্রায় ৬০ বছর নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন যা তাদের ভাষায় রাজনৈতিক ইসলাম শেষ হয়ে যায়নি। মিসরের জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রথম সুযোগেই মুসলিম ব্রাদারহুড মনোনীত প্রার্থীদের সংসদে বিজয়ী করেছে, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকেও বিজয়ী করেছে, একই সাথে গণতন্ত্র ও ইসলামী আদর্শের জন্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। এর পর যারা মনে করে গণতন্ত্র থাকলে ইসলামের জয় সুনিশ্চিত, তারাই চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কু’দাতার মাধ্যমে প্রথম বারের মতো জনগণের ভোটে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, গ্রেফতারও করেছে। এ প্রসঙ্গে তুরস্কের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়েব এরদোগান স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন। মিসরের সামরিক কু’দাতার পেছনে ইসরাইলের হাত থাকার ব্যাপারে তাদের কাছে প্রমাণ আছে। এতে প্রমাণিত হয় কোরআনে ঘোষিত ইসলাম ও মুসলমানদের কট্টরতম দুশমন জায়নবাদী গোষ্ঠীই তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মাধ্যমে দেশে দেশে ইসলামের অগ্রযাত্রা রুখে দেবার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে।

- শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী রহঃ
(২৭/০৮/১৩ তারিখে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত)

২ অক্টোবর, ২০১৭

মাহদী আকিফ: ইসলামী আন্দোলনের উজ্জ্বল নক্ষত্র


মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সাবেক মুর্শিদে আ’ম মুহাম্মদ মাহদী আকিফের মৃত্যুই তাকে মুক্তি দিয়েছে শিকল থেকে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা স্বৈরশাসক সিসির কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন মুক্তির সিংহদরজায়। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। শহীদ হিসেবে কবুল করুন। 

২০১৩ সালে মিশরের জনগণের নির্বাচিত ১ম প্রেসিডেন্ট মোঃ মুরসিকে যখন সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে তখন হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় অগণিত মানুষকে। তার মধ্যেই একজন ছিলেন ৮৯ বছরের বর্ষিয়ান নেতা মাহদী আকিফ। ২০০৪ সালে তিনি ইখওয়ানের প্রধান বা মুর্শিদে আ’ম হন। ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালেই তিনি স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। নেতৃত্ব তুলে দেন উত্তরসূরীদের কাছে। এ যেন উপমহাদেশের সেরা মুজাদ্দিদ মাওলানা মওদুদীর অনুসরণ। এরকম নজির আরো দেখা যায় এদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের প্রাণের স্পন্দন, ইসলামী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক গোলাম আযমের মধ্যেও। মাহদী আকিফের পর মুর্শিদে আ’ম হন মুহাম্মদ ব’দি। 

গ্রেফতারের পর পরই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন মাহদী আকিফ। জালিম সিসি সরকার তার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থাই করেনি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আইনজীবীরা তার মুক্তির জন্য বহু চেষ্টা করলেও জালিমদের কাছে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। বরং তাকে আদালত অবমাননার কথা বলে কারাগারে বন্দী করে রাখে। তিনি ২০১৩ সালের আগষ্টে তাঁর আইনজীবিদের তাঁর বার্ধক্য ও অসুস্থ শরীরের কারণ দেখিয়ে তাঁর জন্য মুক্তির আবেদন করতে নিষেধ করে দিয়ে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই দায়ের করা হয় নি যে, আমার মুক্তির জন্য আবেদন করতে হবে। বরং জরুরি অবস্থার অধীন আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কোন অমীমাংসিত মামলার কারণে আমি গ্রেফতার নই। বৈধ সরকার ফিরিয়ে আনার জন্য আমি শহীদি মৃত্যু বরণ করতে ইচ্ছুক।” ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এক পর্যায়ে বিনা চিকিৎসায় গত ২২ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। 

মাহদী আকিফ জন্মগ্রহন করেন ১৯২৮ সালে। সেই বছরই কিংবদন্তী ঈমাম হাসান আল বান্না প্রতিষ্ঠা করেন ইখওয়ানুল মুসলিমিন যা মুসলিম ব্রাদারহুড নামেও পরিচিত। ১৯৪০ সালে মাহদী আকিফ মাত্র ১২ বছর বয়সেই ইখওয়ানে যোগদান করেন। জীবনের ছোটবেলা থেকেই তিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। সেই থেকে একেবারে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় ৭৭ বছর তিনি ইসলামী আন্দোলনে যুক্ত থেকেছেন। সংগ্রাম করেছেন। পথ দেখিয়েছেন। সামনে থেকে লড়াই করতে শিখিয়েছেন সারাবিশ্বের অগণিত মুক্তিকামী মানুষকে। 

মাহদী আকিফের জন্ম ছিল ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাকালীন বছরেই, ১৯২৮ সালে। বেশ স্বচ্ছল পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেন তিনি। যেখানে দশ ভাই-বোনের সাথে একসাথে বেড়ে উঠেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন নিজ শহর মনসুরাতেই। এরপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হন, কিন্তু পরবর্তীতে ইমাম হাসান আল বান্নার (রহঃ) পরামর্শে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে ‘শারীরিক শিক্ষা’ উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। হাসান আল বান্নার ইচ্ছা ছিল মিশরের প্রতিটি স্কুলে ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ফ্যাকাল্টিতে ইখওয়ানের উপস্থিতি নিশ্চিত করা; তার ওপর মাহদী আকিফেরও ছিল শারীরিক কসরতের প্রতি আলাদা একটি ভালোবাসা। সব মিলিয়েই হাসান আল বান্না মাহদী আকিফকে এই পরামর্শ দেন। এরপর ১৯৫১ সালে তিনি ইবরাহীম ইউনিভার্সিটির (বর্তমান নাম আইন শামস ইউনিভার্সিটি) আইন বিভাগে ভর্তি হন উচ্চ শিক্ষা লাভ করার জন্য।

মাহদী আকিফ ঈমাম হাসান আল বান্নার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। যখন ইখওয়ান প্রতিষ্ঠাতা তার সাথে প্রথম পরিচিত হন তখন তিনি তরুণ মাহদী আকিফের মেধাদীপ্ত চেহারা ও যোগ্যতা দেখে মুগ্ধ হন। তিনি তাকে খেলাধূলায় ও শরীর গঠনে উৎসাহিত করেন। মাহদী আকিফ ছিলেন সুঠামদেহী এবং একজন উদ্যমী খেলোয়াড়। যখন তার বয়স মাত্র সতের তখন হাসান আল বান্না তাকে একটা বিশেষ প্যারামিলিটারি বাহিনীর জন্য নির্বাচন করেন। এটি ছিল গোপন বিশেষ সংগঠন। এই বিশেষ বাহিনী কাজ করতো মিশরে দখলদার ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এবং ফিলিস্তিনে দখলদার ইহুদীবাদীদের বিরুদ্ধে। 

ইখওয়ানের এই বিশেষ শাখা ছিল অনেকটা আধা সামরিক সংগঠনের মত, যা গঠিত হয়েছিল মিশরে দখলদার ব্রিটিশ বাহিনী এবং ফিলিস্তিনে দখলদার জায়োনিষ্টদের বিরুদ্ধে স্পেশাল সামরিক অপারেশন চালানোর জন্য। ১৯৪৮ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইখওয়ানের পাঠানো স্বেচ্ছাসেবক মুজাহিদ দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তিনি। এছাড়াও ইখওয়ানের বিশেষ শাখার দায়িত্বের অংশ হিসেবেই ১৯৫২ সালের ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট কর্তৃক সামরিক ক্যু সংঘটিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ইবরাহীম ইউনিভার্সিটিতে গঠিত সামরিক ক্যাম্পগুলোর নেতৃত্ব দেন, যেগুলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিত। এরপরে তিনি ইখওয়ানের ছাত্রশাখা এবং শারীরিক শিক্ষা বিভাগের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন।

মাহদী আকিফ মিশরের প্রায় সকল সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন। ১৯৪৮ সালে যখন তার বয়স ২০ বছর তখন তিনি ১ম গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালে স্বৈরাচারী জামাল আব্দেল নাসের প্রায় ১০০ জন ইখওয়ান নেতাকর্মীকে আটক করেন যাদেরকে নাসের তার ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করতো। সেই ১০০ জনের মধ্যে একজন ছিলেন মাহদী আকিফ। সেই একশ জনের মধ্যে অল্প কয়েকজনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। মাহদী আকিফ তার মধ্যেও একজন ছিলেন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তার মৃত্যুদন্ডাদেশ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে রূপ নেয়। 

তিনি দীর্ঘ বিশ বছর কারাগারে ছিলেন। মুক্তি পান ১৯৭৪ সালে। তিনি ছিলেন একজন ধৈর্য্যশীল মানুষ। কারাগারে কঠিন নির্যাতন তার জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেললো। তারপরও তিনি ছিলেন স্থির এবং শান্ত। তার কারাগারে থাকাকালীন যখন কেউ তার সাথে কথা বলতো তখন তার মধ্যে কোন দুশ্চিন্তা, হতাশা, অসন্তোষ কিছুই লক্ষ্য করা যেত না। আল্লাহর উপর ভরসা করা এই মহান মানুষ কখনোই আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে হতাশ ছিলেন না। বরং সবসময় আশাবাদী ছিলেন। 

মুক্তি পাওয়ার তিনবছর পর ১৯৭৭ সালে তিনি সৌদী আরবে ভ্রমণ করেন। সেখানে তিনি যুক্ত হন বিশ্বখ্যাত মুসলিম এনজিও ওয়ামীর (WAMY) সাথে। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি ওয়ামীর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ওয়ামীর হয়ে বিশ্বব্যাপী মুসলিম ইয়ুথ ক্যাম্পের অর্গানাইজার ছিলেন।

১৯৮৩ সালে মাহদী আকিফ ইউরোপ গমন করেন। তিনি কিছুদিন জার্মানিতে ইসলামিক সেন্টার ইন মিউনিখের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। জার্মানিতে থাকাকালে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের ইন্টারন্যশনাল এফেয়ার্সের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিটির সাথে ও বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের সাথে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখেন। 

মাহদী আকিফ মিশরে প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৮৭ সালে। একই বছর তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসেন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই সময়ে তিনি একটি সংসদীয় আসনে বিজয় লাভ করেন এবং ৩৭ জন সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ব্রাদারহুডের সংসদীয় ব্লকের অংশ হিসেবে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। ইখওয়ানের সেসময় সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহনের অনুমতি ছিল না কিন্তু সমাজতান্ত্রিক লেবার পার্টির সাথে একটা বিশেষ এলায়েন্সের মাধ্যমে ইখওয়ান নির্বাচনে অংশ নেয়। 

১৯৯৬ সালে সেনা সরকার আবারো মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। একের পর এক গ্রেপ্তার করতে থাকে ইখওয়ানের নেতাদের। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা শ্রমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে বিদ্রোহ করতে চেয়েছিলেন। মাহদী আকিফ সেসময় গ্রেফতার হন। মিলিটারি কোর্ট সেসময় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি ঘোষণা করে। মাহদী আকিফ তিনবছর সশ্রম কারাদন্ড শেষে ১৯৯৯ সালে মুক্তি পান। 

২০০৪ সালে জানুয়ারিতে মা’মুন আল হুদায়বির মৃত্যুর পর মাহদী আকিফ ইখওয়ানুল মুসলিমিনের মুর্শিদে আ’ম নির্বাচিত হন। একই সালের মার্চ মাসে তার নেতৃত্বে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রথমবারের মতো একটি রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। যা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করা দল ও গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হয়। ইখওয়ানের এই সংস্কার আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয় যা সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দেয়। এটি ছিল শান্তিপ্রিয় ও জনপ্রিয় আন্দোলন। তাই অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলনের মত এই আন্দোলনকে দমিয়ে দেয়া এবং নিষিদ্ধ করা ছিল সরকারের জন্য বিব্রতকর। 

মাহদী আকিফের সময়কালে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে। মিশরের মুসলিমদের প্রিয় সংগঠনে পরিণত হতে থাকে ইখওয়ান। মাহদী আকিফ মনে প্রাণে একজন বিপ্লবী ছিলেন। যখন তার বয়স আশি পেরিয়েছে তখনও তিনি কথা বলতেন একজন উদ্যমী যুবকের মত। তার চিন্তাভাবনা ছিল সবসময় আধুনিক। এজন্য তিনি যুবকদের কাছে ছিলেন ভীষণ প্রিয়। এর অন্য কারণ ছিল তিনি সবসময় যুবকদের চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা বুঝতেন। তাদের অভিযোগগুলো এবং পরামর্শগুলো মন দিয়ে শুনতেন। তিনি সবসময় নেতৃত্বের আধুনিকতা এবং পরিবর্তনের দিকে গুরুত্ব দিতেন। 

চার বছর আগে তিনি যখন আটক হন তখন তার বয়স ছিল ৮৫। শেষ দিনগুলো তার স্বাস্থ্যের অবস্থা ক্রমশ খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুতে সারা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলন বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুড অনেকটা ইয়াতিম হয়ে গেছে, অভিভাবকহারা হয়েছে। মাহদী আকিফকে চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে খুন করার মাধ্যমে মিশরসহ সারা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে সেই ক্ষোভ থেকে জন্ম নিবে হাজারো আকিফ। ইনশাআল্লাহ্‌। 

শহীদেরা মরে না। তারা জীবিত। দুনিয়ায় থাকা মাহদী আকিফের চাইতে শহীদ মাহদী আকিফ আরো শক্তিশালী হবে ইনশাআল্লাহ্‌।

তথ্যসূত্রঃ
১। আল জাজিরা 
২। মিডল ইস্ট মনিটর  

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

অবশ্যই বিশ্ব ৫ এর চাইতে বড়



একই সঙ্গে এত সঙ্কটময় পরিস্থিতি বিশ্ব এর আগে দেখেনি এবং এর বিপরীতে জাতিসংঘের এতটা অক্ষমতাও আগে কখনো দেখা যায়নি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের হামলা, ইরাক, সিরিয়া, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া, কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ইউক্রেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সহিসংতা বা সংঘর্ষ এড়াতে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে জাতিসংঘ। কেন এমন হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো। 

শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অভাব আছে, তেমনটি হয়তো সরাসরি বলা যাবে না। জাতিসংঘের এমন ব্যর্থতার মূল কারণ এর নিরাপত্তা কাউন্সিলের দেশগুলোর মধ্যে অসহযোগিতামূলক আচরণ। জাতিসংঘ হচ্ছে কতগুলো অংশ বিশেষের সমষ্টি। কিন্তু এই অংশগুলো যখন একে অন্যের বিরুদ্ধে কাজ করে, তখন অচলাবস্থা ও অকার্যকর অবস্থা অবশ্যম্ভাবী। 

“জাতিসংঘ” সংগঠনটির দায়মুক্তির মানসিকতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ত্রুটি বাইরে ফাঁসকারীকে হতে হয় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি। সাবেক আমেরিকান কূটনৈতিক জেমস ওয়াসারসট্রম কসোভোর এক সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনলে তাকে গ্রেপ্তার করে জাতিসংঘ পুলিশ। তাকে চাকরিচ্যুতও করা হয়। এছাড়া তার অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালানো হয়। ওয়াসারসট্রম এক সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'জাতিসংঘের উচিত ছিল মানবাধিকার, আইনের শাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ধরে রাখা। কিন্তু নিজেদের ভেতরেই তারা এগুলো মানে না।'

জাতিসংঘ এমনই একটি সংগঠন, যা সব সময় ত্রুটিযুক্ত থেকেই যাবে। তারা একই সঙ্গে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রকে এর শক্তি এবং দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। বড় কোনো ইস্যুতে জাতিসংঘে প্রয়োজন হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার। এছাড়া আছে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোদানকারী ক্ষমতার অপপ্রয়োগও। সমালোচনা আছে সংস্থাটির নেতৃত্বের প্রশ্নেও। ৭২ বছর বয়সী জাতিসংঘের বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু সংগঠনটির প্রয়োজনীয় চৌকস নেতৃত্ব কিংবা সংস্কারের বিষয়টিতে কারো নজর নেই। 

জাতিসংঘের ব্যর্থতার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বিশ্বপরাশক্তিরা। সামরিক বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর হাতেই আছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব। আর বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সবকিছুতেই মেরুকরণের প্রবণতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ জটিল করে তুলছে। বিভিন্ন দেশে বিশৃঙ্খলায় বিশ্বশক্তিরা সংঘর্ষে লিপ্ত দুই বা ততোধিক গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে বা গোপনে অস্ত্র বা অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছে। নিরাপত্তা পরিষদের ৫ পরাশক্তি ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় জাতিসংঘ এক্ষেত্রে অথর্ব। তাই ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের বর্বর হামলায় বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব উত্থাপনে আমেরিকা যখন বাদ সাধে, জাতিসংঘের তখন নির্বাক না থেকে আর উপায় নেই। আবার রোহিঙ্গাদের উপরে মিয়ানমার গণহত্যা চালালে জাতিসংঘের নিন্দা বিবৃতিও আটকে যায় চীনের ভেটোর কারণে। 

মূলত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী দেশগুলোর সমন্বয়ে। সেক্ষেত্রে তারা নিজেদের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে বিশ্ব তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সারাবিশ্বে বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় লাগিয়ে দিয়ে সেই ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত পরাশক্তিরা। শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৫ রাষ্ট্রকেই দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ লাগিয়ে রাখতে। 

জাতিসংঘের জন্মের পর থেকেই দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত-সংঘর্ষ দেখা দিতে থাকে। জাতিসংঘের ব্যর্থতার প্রথম উদাহরণ হচ্ছে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে প্যালেস্টাইন ভূমিতে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল জাতিসংঘেরই একটি প্রস্তাবে। সেই রাষ্ট্রটিকে দ্রুত স্বীকৃতিও দিল জাতিসংঘ। ইসরাইল এখন জাতিসংঘের একটি সদস্যরাষ্ট্র। কিন্তু সদস্যরাষ্ট্র নয় প্যালেস্টাইন!! মধ্যপ্রাচ্যে এ সংকটটি সৃষ্টির পেছনে জাতিসংঘেরও একটি প্রবল ভূমিকা রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে সঙ্গে নিয়ে প্যালেস্টাইনকে ভাগ করল, ইসরাইলকে বানাল, আর আমেরিকানরা তখন থেকেই এ ইসরাইলের গডফাদার হিসেবে দুনিয়ার জনমতকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করেও চলেছে।

তারপর কোরীয় যুদ্ধ, কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকার হুমকি-হামলা, ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, আরব-ইসরাইল যুদ্ধ এবং সর্ব সাম্প্রতিক আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে সংঘাত-সংঘর্ষ, আরাকানে গণহত্যা। জাতিসংঘ এসব দেশে শান্তি স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, পারছেও না। 

১৯৯৪-এ রুয়ান্ডাতে ১০০ দিনে ১০ লাখ টুটসিকে হত্যা করল হুটিরা, জাতিসংঘ তা থামাতে পারল না। জাতিসংঘের এ ব্যর্থতাটিকে কেউ কেউ সংস্থাটির কলংক হিসেবে দেখে থাকেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অগ্রগতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও কেমন বাড়ছে, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনে তা স্পষ্ট। প্যালেস্টাইনিদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। যেমনিভাবে সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়া হয়েছিল নেলসন ম্যন্ডেলাকে।

জাতিসংঘে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন যে, বিশ্বে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব শেষ হবে। তিনি আরও যোগ করেন যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ প্রবণতা এবং অভিবাসন সংকট শেষ হওয়ার জন্য জাতিসংঘের ভূমিকা প্রয়োজন।ইউএন মহাসচিব বান কি মুন জোর দিয়ে বলেছিলেন যে বিশ্বব্যাপী চলমান নিরাপত্তা সমস্যা এবং চরমপন্থী সহিংসতা শেষ হতে চলেছে। কিন্তু মোটেই তা হচ্ছে না। হেইট ক্রাইম, জাতিগত বিদ্বেষ, সংখ্যালঘুদের নির্মূলকরণ ইত্যাদি বেড়েই চলেছে। 

তার্কি প্রেসিডেন্ট রিসেফ তায়িপ এরদোয়ান এসব টোটাল বিষয়কে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, “জাতিসংঘের কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে, এটি কোন কাজের না। বিশ্বের পাঁচটি দেশের তুলনায় বিশ্ব অনেক বড়”।

পাঁচটি রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠানের নাম ইউনাইটেড নেশন হতে পারেনা। ইউনাইটেড নেশন স্বার্থ রক্ষা করবে সমগ্র পৃথিবীর। আমাদের আবার নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। পাঁচটি রাষ্ট্রের কাছে সারাবিশ্ব জিম্মি থাকতে পারে না। বিশ্ব অবশ্যই পাঁচটি রাষ্ট্রের চাইতে বড়। আমাদের ৭২ বছরের ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের বিকল্প চিন্তা করার সময় এসে গেছে।

#WorldIsBiggerThan5