২৮ অক্টোবর, ২০১৭

২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার তান্ডবের শিকার যারা

আজ সেই রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর। লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যার দিন। ২০০৬ সালের এই দিনে এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক কলংকজনক অধ্যায় রচিত হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে তরতাজা ১৪ জন মানুষকে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে নারকীয় উল্লাস চালানো হয়েছিল। 

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সেদিন জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উপর পৈশাচিক হামলা চালিয়েছে ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। লগি, বৈঠা, লাঠি, পিস্তল ও বোমা হামলা চালিয়ে যেভাবে মানুষ খুন করা হয়েছে তা মনে হলে আজও শিউরে ওঠে সভ্য সমাজের মানুষ। সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ মেরে লাশের উপর নৃত্য উল্লাস করার মতো ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব থেকে শুরু করে সারাবিশ্বে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। 

আটাশে অক্টোবরে সারাদেশে ১৪জন নিরীহ মানুষ শাহদাতবরণ করেছিলেন। সেই শহীদদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া হল। 


শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপন (২১)
জন্ম- ১৯৮০ সালের ১৪ আগস্ট মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
শহীদ : ১২৭তম
পিতা : মো: তাজুল ইসলাম
মাতা : মোছা: মাহফুজা বেগম
স্থায়ী ঠিকানা : ১১৯/১/খ, পূর্ব বাসাবো,ঢাকা-১২১৪
ভাইবোন : তিন ভাই ও এক বোন

শিক্ষাজীবন : কুরআনে হাফেজ, শাহাদাতের সময় তিনি ঢাকা কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

সাংগঠনিক জীবন : সংগঠনের সাথী ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড বায়তুলমাল সম্পাদক ছিলেন।
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে লগি বৈঠাধারীদের হামলায় আহত হয়ে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে শহীদ হন।

শহীদ গোলাম কিবরিয়া শিপন সদালাপি বিনয়ী ছাত্র হিসেবে এলাকায় সমধিক পরিচিত ছিলেন। শিপন ছিলেন কুরআনে হাফেজ, দাখিল পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন, পাশাপাশি IELTS পরীক্ষা দিয়ে ৫.৫ স্কোর করেছিলেন উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে। কিন্তু লগি বৈঠাধারী হায়েনারা তার সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। 

তার মা জানান, শিপন ২৭ অক্টোবর রাতে বাইরে যেতে চাইলেও তাকে যেতে দেয়া হয়নি। তাই পরদিন সকালে শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম (যিনি একই ঘটনায় শাহাদাতবরণ করেন) এসে ডাক দিলে সে আর বিলম্ব না করে বলে, আম্মা আমাকে রাতে যেতে দেন নাই কিন্তু আজ আর আমাকে নিষেধ করতে পারবেন না। এরপর সে হালকা একটু সেমাই খেয়ে ঘর হতে বের হয়ে যান। চলে আসেন পল্টন এলাকায়।


শহীদ মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম (২২)
জন্ম- ১৯৮৫ সালের ২৬ নভেম্বর, মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
শহীদ শিবির তালিকা -১২৬ তম
পিতাঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন
মাতা: মাহমুদা দেলোয়ার মুন্নি

স্থায়ী ঠিকানাঃ গ্রামঃ কুলশ্রী,ডাকঘরঃ দরগাবাজার,উপজেলাঃ চাটখিল,জেলাঃ নোয়াখালী
ভাই-বোনঃ দুই ভাই এক বোন, মুজাহিদ সবার বড়।

শিক্ষাজীবনঃ শাহাদাতের সময় তিনি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
সাংগঠনিক জীবনঃ সংগঠনের সদস্য ও মিরপুর ১০ নং ওয়ার্ড সভাপতি ছিলেন।

শহীদ মুজাহিদের পুরো নাম মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম ফাহিম। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন এলাকায় লগি বৈঠা বাহিনী একের পর এক পিটিয়ে হত্যা করে তাকে। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা মুজাহিদকে লগি বৈঠা দিয়ে আঘাত করতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ রাজপথে তার লাশ পড়ে ছিল পরে ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে শহীদ হন।



শহীদ সাইফুল্লাহ মুহাম্মদ মাসুম (১৬)
শাহদাত- ২ নভেম্বর ২০০৬
শহীদ : ১৩১তম
পিতা : মাহতাব উদ্দিন আহমদ
মাতা : শামছুন নাহার রুবি
স্থায়ী ঠিকানা : ১৩০/১৬, বাগানবাড়ি, মাদারটেক, বাসাবো, সবুজবাগ, ঢাকা।
ভাইবোন : দুই ভাই ও তিন বোন

শিক্ষাজীবন : শাহাদাতের সময় তিনি সরকারি তিতুমীর কলেজে ইংরেজি বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
সাংগঠনিক জীবন : সংগঠনের সাথী ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ সভাপতি ছিলেন।
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে ১৪ দলের হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ নভেম্বর ২০০৬ ভোর ৪টায় ইবনে সিনা হাসপাতালে শহীদ হন।

ভয়াল আটাশের সকালে শহীদ মাসুম ও শহীদ শিপন একসাথে বাড়ি থেকে বের হয়। কিন্তু তারা আর জীবিত ফিরে আসেনি, এসেছে লাশ হয়ে। তারা বাসা থেকে বের হয়ে সরাসরি চলে আসে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে। সেখানেই লগি বৈঠা বাহিনীর ইটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম। ৫ দিন সংজ্ঞাহীন থাকার পর ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর ভোর ৪টায় মহান আল্লাহর শাশ্বত আহ্বানে সাড়া দিয়ে শাহাদাতবরণ করেন সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম। জীবন্ত মাসুমের চেহারা আর মৃত মাসুমের চেহারার মাঝে তফাত ছিল অনেক। তার সুন্দর, নিষ্পাপ চেহারাটি যেন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছিল। শহীদ মাসুমকে কেউ কোনদিন রাগ কিংবা ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখেনি।



শহীদ রফিকুল ইসলাম (১৫)
মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
শহীদ : ১২৮তম
পিতা : মো: আমির হোসেন
মাতা : মোছা: রোকেয়া খাতুন
স্থায়ী ঠিকানা : চরযাত্রাপুর, যাত্রাপুর, কুড়িগ্রাম
ভাইবোন : ২ ভাই ও ২ বোন

শিক্ষাজীবন : শাহাদাতের সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন।

সাংগঠনিক জীবন : সংগঠনের সাথী ও যোগদাহ ইউনিয়ন সেক্রেটারি ছিলেন।
শাহাদাতের তারিখ ও স্থান : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের লগি-বৈঠার পৈশাচিক আঘাতে আহত হয়ে বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শহীদ হন।


শহীদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সল (২৪)
মৃত্যু- ২৯ অক্টোবর ২০০৬
শহীদ : ১২৯তম
পিতা মো: আহসানুল হাই
মাতা : সাইয়্যেদা হাসনা বানু
স্থায়ী ঠিকানা : পাইনাদী, মোস্তফানগর, সানারপাড়া, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
ভাইবোন : ৫ ভাই ও ২ বোন

শিক্ষাজীবন : শাহাদাতের সময় তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় হাজী শামসুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন।

সাংগঠনিক জীবন : সংগঠনের কর্মী ও অধ্যয়নরত বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

শাহাদাতের তারিখ ও স্থান : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সিদ্ধিরগঞ্জ চিটাগাং রোডে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলায় মারাত্মক আহত হয়ে ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৯ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে শহীদ হন।

শহীদ আবদুল্লাহ আল ফয়সাল হত্যাকারীদের বিচার তো হয়ই নি, উল্টো বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক মামলা বলে মামলাটিই প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোডে ছাত্রশিবিরের মিছিলে হামলা চালায় লগি বৈঠা বাহিনী। উল্লাসের সাথে লগি বৈঠা সন্ত্রাসীরা আগাত করতে থাকে নেতাকর্মীদের উপর। এ সময় শহীদ আবদুল্লাহ আল ফয়সালের বড় ভাই ফাহাদ বিন আহসানকে ঘিরে ফেলে সন্ত্রাসীরা। কাছেই ছিল ফয়সাল। ভাইকে বাঁচাতে এগিয়ে যান তিনি। লগি বৈঠার আঘাত এসে পড়তে থাকে তার উপর। এক পর্যায় মাথায় আঘাত পেয়ে মাটিতে লুটয়ে পড়েন তিনি। দুই ভাই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। পরদিন রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় পরপারে পাড়ি জমান ফয়সাল।


শহীদ মোঃ শাহজাহান আলী 
পিতাঃ মৌলভী সিরাজুল ইসলাম 
৬ ভাই ২ বোন 
বয়স ২৫ 
সাংগঠনিক মানঃ শিবিরের সদস্য, নাঙ্গলকোট থানা দক্ষিণ সভাপতি।
গ্রামঃ উত্তর দুর্গাপুর, পোঃ দুর্গাপুর বাজার, উপজেলাঃ নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা 
৩১ অক্টোবর নাঙ্গলকোট কলেজ মাঠের সন্নিকটে সন্ত্রাসীদের হামলায় শাহদাতবরণ করেন।  



শহীদ জসিম উদ্দিন
জন্ম- ১৯৮৬ সালের এপ্রিল ,মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
ঠিকানা; লালবাগের মিটফোর্ড রোডে বাসা।
সাংগঠনিক জীবন : জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও ৬৬ নং ওয়ার্ডের মিটফোর্ড ইউনিটের সভাপতি ছিলেন। 

২৮ অক্টোবরে লগি-বৈঠা বাহিনীর নির্মম শিকার লালবাগের শহীদ জসিম উদ্দিন। সেদিন লগি-বৈঠাধারী সন্ত্রাসীরা তাকে শুধু সাপের মতো পিটিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, লাশের ওপর উঠে পৈশাচিক নৃত্য উল্লাস করেছে, করেছে আনন্দ উল্লাস। কী অপরাধ ছিল জসিমের? কেন তাকে মরতে হলো? এ প্রশ্নের জবাব আজো খুঁজে পায়নি তার বাবা-মা।

২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা বাহিনীর তান্ডবে যারা প্রাণ হারান তাদের মধ্যে জসিম উদ্দিন শাহাদাতবরণ করেন নির্মমভাবে। বিভিন্ন ভিডিওফুটেজ থেকে দেখা যায়, লগি-বৈঠা বাহিনী জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিনকে দীর্ঘক্ষণ ধরে পিটায়। মাঝে-মাঝে সে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করে। আবার টেনে ধরা হয়। পুরো শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। এক পর্যায়ে তার শরীরের জামা ছিঁড়ে ফেলা হয়। লগি-বৈঠা দিয়ে তাকে পিটানোর পর মৃত্যু নিশ্চিত হলে লাশের ওপর উঠে নৃত্য করতে থাকে নরপিশাচরা।


শহীদ আরাফাত হোসেন সবুজ
পিতাঃ ওয়ালিয়ার রহমান 
মাতাঃ সালেহা খাতুন (জামায়াতের রুকন)
ভাই-বোনঃ ২ ভাই ২ বোন 
বয়সঃ ২৩ 
সাংগঠনিক মানঃ জামায়াত কর্মী 
ঠিকানাঃ গ্রাম-দরি, পোঃ- পলিতা, সদর, মাগুরা 
২৮ অক্টোবর ২০০৬ বেলা ১১ টায় আওয়ামীলীগের হামলায় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহদাত বরন করেন।


শহীদ আব্বাস আলী 
পিতাঃ জহুরুল হক
পেশাঃ ব্যবসা 
বয়সঃ ২৬ 
সাংগঠনিক মানঃ জামায়াত কর্মী। 
ঠিকানাঃ গ্রাম- হিজুলি, পোঃ আমঝুপি, সদর, মেহেরপুর। 
মেহেরপুর শহরে আওয়ামী লীগের গুলিতে বিকেল পাঁচটায় শাহদাতবরণ করেন।


শহীদ জাবিদ আলী 
পিতাঃ হোসেন আলী 
স্ত্রীঃ আম্বিয়া খাতুন 
ছেলেঃ ৩ মেয়েঃ ৩ 
পেশাঃ ব্যবসা 
বয়সঃ ৫৫
সাংগঠনিক মানঃ জামায়াতের রুকন, খাজুরা ইউনিয়ন সভাপতি। 
ঠিকানাঃ গ্রাম- কাপসন্ধা, ইউনিয়ন- খাজুরা, উপজেলা- আশাশুনি, সাতক্ষীরা 
আটাশে অক্টোবর সন্ধ্যায় সমাবেশ থেকে ফেরার পথে আওয়ামী লীগের হামলায় শাহদাত বরণ করেন।


শহীদ সাবের হোসেন 
পিতাঃ আতিয়ার রহমান
স্ত্রীঃ ফেন্সী বেগম 
ছেলেঃ ৩ মেয়েঃ ১ 
বয়সঃ ৩২ 
সাংগঠনিক মানঃ জামায়াত কর্মী 
ঠিকানাঃ গ্রাম- পূর্ববালা, পোঃ বালাগ্রাম, উপজেলা- জলঢাকা, জেলাঃ নীলফামারী 
তিরিশ অক্টোবর ২০০৬ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত হন। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্ধ্যায় শাহদাতবরণ করেন।    



শহীদ রুহুল আমিন 
পিতাঃ আবু জাফর
স্ত্রীঃ সুলতানা রাজিয়া 
ছেলেঃ ২ মেয়েঃ ৩ 
বয়স ৪৫ 
সাংগঠনিক মানঃ রুকন, জেলা অফিস সম্পাদক 
ঠিকানাঃ গ্রাম- লক্ষ্মীপুর, ডাকঘর- জয়দেবপুর, সদর, গাজীপুর। 
এশার নামাজ আদায় করে ফেরার পথে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলায় শাহদাতবরণ করেন।  



শহীদ জসিম উদ্দিন।
জন্ম-১৯৭২ মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬ 
শিক্ষা: ১৯৯৩ সালে তিনি স্নাত্বক সম্পন্ন করেন।
ঠিকানা: শহীদ জসিম উদ্দিন ১৯৭২ সালে চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ উপজেলার সুদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস।
শহীদ জসিম উদ্দিন ৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন।

শহীদ জসিম উদ্দিন ১৯৯৬ সালে সিঙ্গাপুর যান। সেখানে তিনি ২ বছর অবস্থান করেন। ২০০১ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০০২ সালে সৌদি আরব ও ২০০৫ সালে পুনরায় দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। পিতার মৃত্যুর সংবাদ শুনে ২০০৬ সালের মার্চে তিনি দেশে আসেন। ১২ নবেম্বর পুনরায় দক্ষিণ আফ্রিকা চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২৮ অক্টোবর সবকিছু তছনছ হয়ে যায়। লগিবৈঠা বাহিনীর বুলেটের আঘাতে লাশ হতে হলো শহীদ জসিম উদ্দিনকে।


শহীদ হাবিবুর রহমান (৪০)
জন্ম- মৃত্যু- ২৮ অক্টোবর ২০০৬
পিতা: আবদুল মুকিম মৃধা
মাতা: সাহেরা বেগম
ঠিকানা: গ্রামের বাড়ী মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায় মৃধা কান্দি গ্রামে।পরবর্তীতে জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন ঢাকায়।
এসবের মাঝেও বেশি সময় ব্যস্ত থাকতেন মানুষকে কুরআন ও হাদীসের কথা বলার জন্য। 

শিক্ষা: মাত্র ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়া হাবিবুর রহমান আয়ত্ত করেছিলেন কুরআন হাদীসের অনেক বিষয়। 

প্রথমে তারা হাবিবুর রহমানকে গুলী করে। তারপর লগিবৈঠা দিয়ে উল্লাসের সাথে পিটিয়ে হত্যা করে। এরপর তার লাশ দীর্ঘক্ষণ রাস্তার উপরে পড়ে থাকে। পরে তারা লাশটি গুম করার উদ্দেশ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ উদ্ধার করে লাশটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও চলে লাশ ছিনিয়ে নেয়ার নানা চেষ্টা। তার নাম মনির হোসেন এবং দলীয় কর্মী দাবি করে আওয়ামী লীগ।

স্ত্রী আছিয়া বেগম স্বামীকে হারিয়ে ১ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছে ।এখন কান্নাই তার এখন একমাত্র সঙ্গী।

২৪ অক্টোবর, ২০১৭

ইসলামী আন্দোলনে হীনমন্যতাবোধের সুযোগ নেই


ইসলামী আন্দোলন নিছক রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। নয় নিছক ক্ষমতার রাজনীতি। কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় পাঠাবার আন্দোলনও নয় এটি বরং আল্লাহর দ্বীন বা ইসলামী আদর্শকে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসাবে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল দিক ও বিভাগে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠাই ইসলামী আন্দোলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। ক্ষমতা লাভের পথ দীর্ঘ মনে হবার কারণে অথবা বিপদসংকুল ও বাধা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হবার কারণে ইসলামী আদর্শ তথা সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কাজ আপাতত: বাদ দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্ষমতার রাজনীতির নিয়ামক শক্তিসমূহের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কৌশল অবলম্বনের পথ বেছে নেয়ার যুক্তি বাস্তবে কতটা টেকসই হতে পারে গভীরভাবে তা তলিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। অবশ্য ইসলামী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টদের একটা পথ বন্ধ হলে দশটা পথ খোলার মত যোগ্যতা-দক্ষতা অবশ্যই থাকতে হবে। তবে বাস্তবে পথ বন্ধ হবার আগে কৃত্রিমভাবে নিজেদের পক্ষ থেকে পথ বন্ধ করে কোন কৌশল অবলম্বনের চিন্তা-ভাবনা হীনমন্যতারই পরিচয় বহন করে এতে কোন সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে চতুর্মুখী চক্রান্ত ষড়যন্ত্র চলছে। তথ্য সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস থেকে বিচারিক সন্ত্রাসের আয়োজন চলছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চিন্তার ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা সুদৃঢ় থাকা অপরিহার্য। তার চেয়েও বেশি অপরিহার্য হল আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের ভিত্তিতে প্রতিকূলতার মোকাবিলায় অসীম ধৈর্য ও ছাবেতে কদমীর সাথে ময়দানে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে অকুতোভয়ে টিকে থাকার, বরং সামনে অগ্রসর হবার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।’ পক্ষান্তরে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিপক্ষের এ সময়ের কৌশল হয়ে থাকে নানা কাল্পনিক, তাত্ত্বিক বিভ্রান্তির গুজব ছড়িয়ে চিন্তার ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্যে তথ্য সন্ত্রাস জোরদার করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কখনও কোন ব্যক্তি বিশেষের অপরিনামদর্শী কথা বা কার্যক্রমকে এরা সূত্র বা তথ্য উপাত্ত হিসাবে ব্যবহার করে এ ধরনের সুযোগ নিয়ে থাকে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে মহল বিশেষের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রচারণা বেশ সুকৌশলে চালানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে তারা কতিপয় ব্যক্তির একটি অপরিণামদর্শী ও অপরিপক্ব পদক্ষেপজনিত একটি বৈঠককে এবং পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধকে তথ্য উপাত্ত হিসাবে ব্যবহার করছে। যদিও তাদের সকল জল্পনা-কল্পনাকে ভুল প্রমাণ করে তাদের পরিকল্পিত প্রচারণার মুখে ছাই নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের যুবক ও ছাত্রকর্মী তথা নতুন প্রজন্মই রাজপথে শক্ত অবস্থান নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের উপর সরকার পরিচালিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করে যাচ্ছে। অকুতোভয়ে জীবন দিতেও কুণ্ঠা বোধ করছে না এরপরও মহল বিশেষের পক্ষ থেকে ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে চিন্তার বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে অব্যাহতভাবে।

ইসলামী আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নবীন ও প্রবীণ সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সামনে বর্তমানে মিসরের ইসলামী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের উপর যে গণহত্যা চালানো হচ্ছে তা থেকে দুটো বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। এক, তথাকথিত দেশী-বিদেশী সোস্যাল এলিটদের সমর্থন পাওয়ার জন্যে বা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবার জন্যে দলের ইসলামী পরিচিতি বর্জন করেও কোন লাভ হয় না, দুই, ইসলামের সংগঠিত শক্তি হওয়াটাই মূল অপরাধ।

মিসরের ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে তো স্বাধীনতা বিরোধিতার কোন অভিযোগ আনার সুযোগ নেই। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বরং তাদেরই ছিল সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা। তারপরও তাদের দেশের প্রথমবারের মত গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে কেন ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

ইতিপূর্বে ১৯৯১ সনে আলজিরিয়ায় ইসলামী সলভেশন ফ্রন্ট প্রথমবারের মত নির্বাচনে ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতেই সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলকে গণতন্ত্রের প্রবক্তা বিশ্ব মোড়লেরা অকুণ্ঠ সমর্থন দেয় নিছক ইসলাম ঠেকাবার জন্যে। তাদের বিরুদ্ধেও আলজিরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধিতার কোন অভিযোগের সুযোগ ছিল না। ইসলামের পক্ষের সংগঠিত শক্তি হওয়াই তাদের অপরাধ। অতএব বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের অবস্থান যে নিছক ইসলামী আদর্শের পক্ষের শক্তির ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি রোধ করার জন্যেই এতে কোন বিবেকবান ব্যক্তির মনেই সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ থাকতে পারে না। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে মুসলিম ব্রাদারহুড তার নাম পরিচয় পালটিয়ে অন্য নামে ইসলামী পরিচিতি বাদ দিয়ে সংসদ ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাফল্য অর্জন করেছে, বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের কবে শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। আসলে কি মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের নাম পরিবর্তন করেছে নাকি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে একটা ফ্রন্ট করেছে। ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় এর আগেও তারা ওয়াকদ পার্টির হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এবারেও তাদের একই কৌশল আমরা দেখতে পাই একটু ভিন্ন আংগিকে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতির মোকাবিলা তাদের করতে হচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুডের পক্ষ থেকেই। ভিন্ন নামে নির্বাচনের পরও তাদের ক্ষমতায় টিকতে দেয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্বে তাদের সংগঠনের সুনামেই ইনশাআল্লাহ আগামীতে মিসরে একই সাথে ইসলাম ও গণতন্ত্রের বিজয় হবে একটি সফল ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে চিন্তার বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল হিসেবে একটা গোপন বৈঠক ও একই প্রবন্ধকে ব্যবহার করা হয়েছে। উক্ত প্রবন্ধে নাকি এও বলা হয়েছে যে, ভারতের জামায়াতে ইসলামী তাদের অতীতের ভুল শুধরিয়ে দলের নাম পরিবর্তন করে একটা প্লাটফরম করেছে যাতে নেতৃত্বের পর্যায়ে একজন হিন্দু, একজন খৃস্টানও আছে। আসলে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ তার নাম পরিবর্তন করেনি। তারা অতীতে নির্বাচনে কোন ভূমিকাই রাখতো না। ভোটও দিত না। তারা মূলত: একটা “সামাজিক, সাংস্কৃতিক ধর্র্মীয়” প্রতিষ্ঠান হিসাবেই কাজ করে আসছিল। মুসলিম পার্সনাল ল’-এর সংরক্ষণের ব্যাপারে তারা সকল ইসলামী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে কাজ করেছে। এর পর নির্বাচনী রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার জন্যে একটা প্লাটফরম দাঁড় করিয়েছে, এটা তাদের কার্যক্রমের একটা নতুন অগ্রগতি বলতে পারি। কিন্তু অতীতের ভুল শুধরে তারা নাম পরিবর্তন করেছে, এমন কথা যদি কেউ বলে থাকেন বা লিখে থাকেন তা হলে তিনি তথ্য বিচ্যুতির আশ্রয় নিয়েছেন। এই তো সেদিনও জামায়াতে ইসলামী হিন্দের আমীর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের ব্যাপারে সরকারের উদ্দেশে উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতিবাদ করে বিবৃতি দিয়েছেন। তার বিবৃতি বিবিসিতেও প্রচারিত হয়েছে।

এটা ঐতিহাসিক বাস্তব ঘটনা যে ’৭১ সালে পাকিস্তানের অখ-ত্বের পক্ষে শুধু জামায়াতে ইসলামীই অবস্থান নেয়নি। বরং সকল ইসলামী ও মুসলিম সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এবং সুপরিচিত সব ইসলামী ব্যক্তিত্ব পাকিস্তানের অখ-নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, সেই কারণেই মুসলিম লীগের সকল গ্রুপসহ পিডিপি, কৃষক শ্রমিক প্রজাপার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ও জামায়াতে ইসলামকে একযোগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া ঐসব দলের আর কোনটাই সংগঠিত শক্তি হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় নাই বলেই তাদের নিয়ে বর্তমান সরকারের কোন মাথা ব্যথা নেই। তাছাড়া জামায়াতে ইসলামী বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার রাজনীতিতে ফ্যাক্টর হওয়াও একটা বড় কারণ। সেই সাথে প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসী, আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী ভূমিকার ক্ষেত্রে জামায়তই প্রধান প্রতিবাদী শক্তি হওয়ার ফলেই আজ সরকারের কোপানলের শিকার হতে হচ্ছে। ১৯৯১ সালে এবং ২০০১ সালে জামায়াতের কারণে বিএনপি ক্ষমতায় আসা এবং আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসতে না পারাটাই জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ক্ষোভের প্রথম ও প্রধান কারণ। না হলে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পুনর্গঠিত হওয়ার পর থেকে ’৯১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বর্তমানে যে অভিযোগ এনেছে, সে অভিযোগ কোন দিনই আনেনি। ’৯২ সালে ‘ঘাদানিকের’ মাধ্যমে জামায়াতের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক অভিযান পরিচালনার মূল কারণ ছিল, জামায়াত কেন সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন দিল? কিন্তু পরবর্তীতে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামায়াতকে সাথে পেয়ে বা সাথে নিয়ে তাদের কোন আপত্তি তো ছিলই না, বরং অনেক তোয়াজ করে জামায়াতকে সাথে রাখার চেষ্টা করতে তাদের কোন কুণ্ঠা ছিল না। জামায়াতকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রেস ব্রিফিং দিতে তখন কোন সংকোচ বোধ করেননি। তাই আজ একথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা যায়, দেশের রাজনীতিতে জামায়াতের ফ্যাক্টর হওয়া এবং ভারতীয় এজেন্ডা ও ডিজাইন বাস্তবায়নের পথে প্রধান অন্তরায় হওয়াই জামায়াতের একমাত্র অপরাধ। জামায়াতের এই ভূমিকা আওয়ামী ঘরানা ও বাম ঘরানার কাছে যতই অগ্রহণযোগ্য হোক না কেন দেশবাসী এটাকে ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করবে সেদিন বেশি দূরে নয়। অতএব কোন মহলের প্রচারণায় বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর কারণে ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের মনে হীনস্মন্যতা বোধের বা চিন্তার বিভ্রান্তির শিকার হবার প্রশ্নই ওঠে না।

ইসলামী আন্দোলনের মূল পথিকৃত শেষ নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁকেও আল্লাহ তায়ালাসহ বিভিন্ন সময়ের, তার পূর্বের নবী রাসূলদের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার সাথী-সঙ্গীদের ছবর ও ইস্তেকামাতের সাথে ময়দানে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে সামনে অগ্রসর হবার তাকিদ দিয়েছেন। বর্তমানে আল্লাহর পক্ষ থেকে নতুন করে ওহীর মাধ্যমে কোন পথ নির্দেশ আসার সুযোগ নেই। তবে ময়দানের বাস্তবতাকে সামনে রেখে কোরআন ও সিরাতে রাসূল অধ্যয়ন করলে মনের সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও হতাশা কাটিয়ে উঠে পূর্ণ আস্থা নিয়ে ময়দানে টিকে থাকার এবং সামনে এগুবার প্রেরণা পাওয়া অবশ্যই সম্ভব।

অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের ইসলাম বিরোধী শক্তির নাস্তিক্যবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমে দ্বীন হাজার হাজার আলেমে দ্বীনের ওস্তাদ হযরত আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে গড়ে উঠা হেফাজতে ইসলামের রাজপথ কাঁপানো প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহেেণর পর থেকে সরকার এবং সরকারের দোসর ধর্মহীন রাজনীতির প্রবক্তা ও বাম ঘরানার রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের নানামুখী প্রচারণা ও জুলুম নির্যাতন আমাদর সকলের জন্যে একটি জীবন্ত নজির। হযরত আল্লামা আহমদ শফী এবং তার সহকর্র্মীদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা উত্তর ৪২ বছরে আওয়ামী ঘরানারা বাম ঘরানা বা পক্ষ থেকে এমন কোন অভিযোগ বা অপবাদ শোনা যায়নি যা বর্তমানে শোনা যাচ্ছে। কারণ একটাই এখন তারা সরকারের এবং সরকারের দোসরদের ন্যক্কারজনক ইসলাম বিরোধী ভূমিকায় মাঠে-ময়দানে সবর এবং সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। ইসলামের বিরুদ্ধে ইসলামী আন্দোলন সংগ্রামের বিরুদ্ধে ঐ মহল বিশেষের আক্রোশ ও বিদ্বেষ মজ্জাগত। ইসলামের পক্ষে যারাই ইতিবাচক, সক্রিয় এবং শক্ত ভূমিকা রাখবে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের তুফান স্থায়ী করা অত্যাচার, জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানোই তাদের ইতিহাস। কাজেই এসব দেখে ইসলামের পক্ষের লোকদের আত্মবিশ্বাস এবং আস্থা আরো বৃদ্ধি পাওয়াটাই স্বাভাবিক। এটাই ইসলামী আন্দোলনের মূল ধারার যথার্থতার ও সঠিক পথে থাকার মহা সনদ যা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা কর্তৃক সত্যায়িত বা অনুমোদিত।

সম্প্রতি মিসরের ঘটনার প্রতি গোটা বিশ্বের দৃষ্টি নিবন্ধ হয়ে আছে। মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা চলছে। এটা হলে নাকি সেখানে ইসলামী রাজনীতি বা তাদের ভাষা, রাজনৈতিক ইসলাম শেষ হয়ে যাবে, এই মর্মে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকের উপ-সম্পাদকীয় নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে। মন্তব্যকারী এই নিবন্ধ লেখার সময় মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে বিগত প্রায় ৬০ বছর নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন যা তাদের ভাষায় রাজনৈতিক ইসলাম শেষ হয়ে যায়নি। মিসরের জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রথম সুযোগেই মুসলিম ব্রাদারহুড মনোনীত প্রার্থীদের সংসদে বিজয়ী করেছে, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকেও বিজয়ী করেছে, একই সাথে গণতন্ত্র ও ইসলামী আদর্শের জন্যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। এর পর যারা মনে করে গণতন্ত্র থাকলে ইসলামের জয় সুনিশ্চিত, তারাই চক্রান্ত, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কু’দাতার মাধ্যমে প্রথম বারের মতো জনগণের ভোটে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, গ্রেফতারও করেছে। এ প্রসঙ্গে তুরস্কের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়েব এরদোগান স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন। মিসরের সামরিক কু’দাতার পেছনে ইসরাইলের হাত থাকার ব্যাপারে তাদের কাছে প্রমাণ আছে। এতে প্রমাণিত হয় কোরআনে ঘোষিত ইসলাম ও মুসলমানদের কট্টরতম দুশমন জায়নবাদী গোষ্ঠীই তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মাধ্যমে দেশে দেশে ইসলামের অগ্রযাত্রা রুখে দেবার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে।

- শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী রহঃ
(২৭/০৮/১৩ তারিখে দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত)

২ অক্টোবর, ২০১৭

মাহদী আকিফ: ইসলামী আন্দোলনের উজ্জ্বল নক্ষত্র


মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সাবেক মুর্শিদে আ’ম মুহাম্মদ মাহদী আকিফের মৃত্যুই তাকে মুক্তি দিয়েছে শিকল থেকে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা স্বৈরশাসক সিসির কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন মুক্তির সিংহদরজায়। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। শহীদ হিসেবে কবুল করুন। 

২০১৩ সালে মিশরের জনগণের নির্বাচিত ১ম প্রেসিডেন্ট মোঃ মুরসিকে যখন সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে তখন হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করা হয়। গ্রেফতার করা হয় অগণিত মানুষকে। তার মধ্যেই একজন ছিলেন ৮৯ বছরের বর্ষিয়ান নেতা মাহদী আকিফ। ২০০৪ সালে তিনি ইখওয়ানের প্রধান বা মুর্শিদে আ’ম হন। ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালেই তিনি স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। নেতৃত্ব তুলে দেন উত্তরসূরীদের কাছে। এ যেন উপমহাদেশের সেরা মুজাদ্দিদ মাওলানা মওদুদীর অনুসরণ। এরকম নজির আরো দেখা যায় এদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের প্রাণের স্পন্দন, ইসলামী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক গোলাম আযমের মধ্যেও। মাহদী আকিফের পর মুর্শিদে আ’ম হন মুহাম্মদ ব’দি। 

গ্রেফতারের পর পরই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন মাহদী আকিফ। জালিম সিসি সরকার তার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থাই করেনি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আইনজীবীরা তার মুক্তির জন্য বহু চেষ্টা করলেও জালিমদের কাছে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। বরং তাকে আদালত অবমাননার কথা বলে কারাগারে বন্দী করে রাখে। তিনি ২০১৩ সালের আগষ্টে তাঁর আইনজীবিদের তাঁর বার্ধক্য ও অসুস্থ শরীরের কারণ দেখিয়ে তাঁর জন্য মুক্তির আবেদন করতে নিষেধ করে দিয়ে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগই দায়ের করা হয় নি যে, আমার মুক্তির জন্য আবেদন করতে হবে। বরং জরুরি অবস্থার অধীন আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কোন অমীমাংসিত মামলার কারণে আমি গ্রেফতার নই। বৈধ সরকার ফিরিয়ে আনার জন্য আমি শহীদি মৃত্যু বরণ করতে ইচ্ছুক।” ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এক পর্যায়ে বিনা চিকিৎসায় গত ২২ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। 

মাহদী আকিফ জন্মগ্রহন করেন ১৯২৮ সালে। সেই বছরই কিংবদন্তী ঈমাম হাসান আল বান্না প্রতিষ্ঠা করেন ইখওয়ানুল মুসলিমিন যা মুসলিম ব্রাদারহুড নামেও পরিচিত। ১৯৪০ সালে মাহদী আকিফ মাত্র ১২ বছর বয়সেই ইখওয়ানে যোগদান করেন। জীবনের ছোটবেলা থেকেই তিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করেন। সেই থেকে একেবারে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় ৭৭ বছর তিনি ইসলামী আন্দোলনে যুক্ত থেকেছেন। সংগ্রাম করেছেন। পথ দেখিয়েছেন। সামনে থেকে লড়াই করতে শিখিয়েছেন সারাবিশ্বের অগণিত মুক্তিকামী মানুষকে। 

মাহদী আকিফের জন্ম ছিল ইখওয়ানুল মুসলিমিনের প্রতিষ্ঠাকালীন বছরেই, ১৯২৮ সালে। বেশ স্বচ্ছল পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেন তিনি। যেখানে দশ ভাই-বোনের সাথে একসাথে বেড়ে উঠেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন নিজ শহর মনসুরাতেই। এরপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হন, কিন্তু পরবর্তীতে ইমাম হাসান আল বান্নার (রহঃ) পরামর্শে ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে ‘শারীরিক শিক্ষা’ উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। হাসান আল বান্নার ইচ্ছা ছিল মিশরের প্রতিটি স্কুলে ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ফ্যাকাল্টিতে ইখওয়ানের উপস্থিতি নিশ্চিত করা; তার ওপর মাহদী আকিফেরও ছিল শারীরিক কসরতের প্রতি আলাদা একটি ভালোবাসা। সব মিলিয়েই হাসান আল বান্না মাহদী আকিফকে এই পরামর্শ দেন। এরপর ১৯৫১ সালে তিনি ইবরাহীম ইউনিভার্সিটির (বর্তমান নাম আইন শামস ইউনিভার্সিটি) আইন বিভাগে ভর্তি হন উচ্চ শিক্ষা লাভ করার জন্য।

মাহদী আকিফ ঈমাম হাসান আল বান্নার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। যখন ইখওয়ান প্রতিষ্ঠাতা তার সাথে প্রথম পরিচিত হন তখন তিনি তরুণ মাহদী আকিফের মেধাদীপ্ত চেহারা ও যোগ্যতা দেখে মুগ্ধ হন। তিনি তাকে খেলাধূলায় ও শরীর গঠনে উৎসাহিত করেন। মাহদী আকিফ ছিলেন সুঠামদেহী এবং একজন উদ্যমী খেলোয়াড়। যখন তার বয়স মাত্র সতের তখন হাসান আল বান্না তাকে একটা বিশেষ প্যারামিলিটারি বাহিনীর জন্য নির্বাচন করেন। এটি ছিল গোপন বিশেষ সংগঠন। এই বিশেষ বাহিনী কাজ করতো মিশরে দখলদার ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এবং ফিলিস্তিনে দখলদার ইহুদীবাদীদের বিরুদ্ধে। 

ইখওয়ানের এই বিশেষ শাখা ছিল অনেকটা আধা সামরিক সংগঠনের মত, যা গঠিত হয়েছিল মিশরে দখলদার ব্রিটিশ বাহিনী এবং ফিলিস্তিনে দখলদার জায়োনিষ্টদের বিরুদ্ধে স্পেশাল সামরিক অপারেশন চালানোর জন্য। ১৯৪৮ সালে আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইখওয়ানের পাঠানো স্বেচ্ছাসেবক মুজাহিদ দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তিনি। এছাড়াও ইখওয়ানের বিশেষ শাখার দায়িত্বের অংশ হিসেবেই ১৯৫২ সালের ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট কর্তৃক সামরিক ক্যু সংঘটিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ইবরাহীম ইউনিভার্সিটিতে গঠিত সামরিক ক্যাম্পগুলোর নেতৃত্ব দেন, যেগুলো ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিত। এরপরে তিনি ইখওয়ানের ছাত্রশাখা এবং শারীরিক শিক্ষা বিভাগের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেন।

মাহদী আকিফ মিশরের প্রায় সকল সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন। ১৯৪৮ সালে যখন তার বয়স ২০ বছর তখন তিনি ১ম গ্রেফতার হন। ১৯৫৪ সালে স্বৈরাচারী জামাল আব্দেল নাসের প্রায় ১০০ জন ইখওয়ান নেতাকর্মীকে আটক করেন যাদেরকে নাসের তার ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করতো। সেই ১০০ জনের মধ্যে একজন ছিলেন মাহদী আকিফ। সেই একশ জনের মধ্যে অল্প কয়েকজনকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। মাহদী আকিফ তার মধ্যেও একজন ছিলেন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তার মৃত্যুদন্ডাদেশ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে রূপ নেয়। 

তিনি দীর্ঘ বিশ বছর কারাগারে ছিলেন। মুক্তি পান ১৯৭৪ সালে। তিনি ছিলেন একজন ধৈর্য্যশীল মানুষ। কারাগারে কঠিন নির্যাতন তার জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেললো। তারপরও তিনি ছিলেন স্থির এবং শান্ত। তার কারাগারে থাকাকালীন যখন কেউ তার সাথে কথা বলতো তখন তার মধ্যে কোন দুশ্চিন্তা, হতাশা, অসন্তোষ কিছুই লক্ষ্য করা যেত না। আল্লাহর উপর ভরসা করা এই মহান মানুষ কখনোই আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে হতাশ ছিলেন না। বরং সবসময় আশাবাদী ছিলেন। 

মুক্তি পাওয়ার তিনবছর পর ১৯৭৭ সালে তিনি সৌদী আরবে ভ্রমণ করেন। সেখানে তিনি যুক্ত হন বিশ্বখ্যাত মুসলিম এনজিও ওয়ামীর (WAMY) সাথে। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি ওয়ামীর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ওয়ামীর হয়ে বিশ্বব্যাপী মুসলিম ইয়ুথ ক্যাম্পের অর্গানাইজার ছিলেন।

১৯৮৩ সালে মাহদী আকিফ ইউরোপ গমন করেন। তিনি কিছুদিন জার্মানিতে ইসলামিক সেন্টার ইন মিউনিখের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। জার্মানিতে থাকাকালে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের ইন্টারন্যশনাল এফেয়ার্সের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন কমিউনিটির সাথে ও বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের সাথে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখেন। 

মাহদী আকিফ মিশরে প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৮৭ সালে। একই বছর তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আসেন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। একই সময়ে তিনি একটি সংসদীয় আসনে বিজয় লাভ করেন এবং ৩৭ জন সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ব্রাদারহুডের সংসদীয় ব্লকের অংশ হিসেবে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন। ইখওয়ানের সেসময় সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহনের অনুমতি ছিল না কিন্তু সমাজতান্ত্রিক লেবার পার্টির সাথে একটা বিশেষ এলায়েন্সের মাধ্যমে ইখওয়ান নির্বাচনে অংশ নেয়। 

১৯৯৬ সালে সেনা সরকার আবারো মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। একের পর এক গ্রেপ্তার করতে থাকে ইখওয়ানের নেতাদের। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা শ্রমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে বিদ্রোহ করতে চেয়েছিলেন। মাহদী আকিফ সেসময় গ্রেফতার হন। মিলিটারি কোর্ট সেসময় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি ঘোষণা করে। মাহদী আকিফ তিনবছর সশ্রম কারাদন্ড শেষে ১৯৯৯ সালে মুক্তি পান। 

২০০৪ সালে জানুয়ারিতে মা’মুন আল হুদায়বির মৃত্যুর পর মাহদী আকিফ ইখওয়ানুল মুসলিমিনের মুর্শিদে আ’ম নির্বাচিত হন। একই সালের মার্চ মাসে তার নেতৃত্বে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রথমবারের মতো একটি রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। যা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করা দল ও গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হয়। ইখওয়ানের এই সংস্কার আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয় যা সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দেয়। এটি ছিল শান্তিপ্রিয় ও জনপ্রিয় আন্দোলন। তাই অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলনের মত এই আন্দোলনকে দমিয়ে দেয়া এবং নিষিদ্ধ করা ছিল সরকারের জন্য বিব্রতকর। 

মাহদী আকিফের সময়কালে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে। মিশরের মুসলিমদের প্রিয় সংগঠনে পরিণত হতে থাকে ইখওয়ান। মাহদী আকিফ মনে প্রাণে একজন বিপ্লবী ছিলেন। যখন তার বয়স আশি পেরিয়েছে তখনও তিনি কথা বলতেন একজন উদ্যমী যুবকের মত। তার চিন্তাভাবনা ছিল সবসময় আধুনিক। এজন্য তিনি যুবকদের কাছে ছিলেন ভীষণ প্রিয়। এর অন্য কারণ ছিল তিনি সবসময় যুবকদের চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা বুঝতেন। তাদের অভিযোগগুলো এবং পরামর্শগুলো মন দিয়ে শুনতেন। তিনি সবসময় নেতৃত্বের আধুনিকতা এবং পরিবর্তনের দিকে গুরুত্ব দিতেন। 

চার বছর আগে তিনি যখন আটক হন তখন তার বয়স ছিল ৮৫। শেষ দিনগুলো তার স্বাস্থ্যের অবস্থা ক্রমশ খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুতে সারা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলন বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুড অনেকটা ইয়াতিম হয়ে গেছে, অভিভাবকহারা হয়েছে। মাহদী আকিফকে চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে খুন করার মাধ্যমে মিশরসহ সারা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে সেই ক্ষোভ থেকে জন্ম নিবে হাজারো আকিফ। ইনশাআল্লাহ্‌। 

শহীদেরা মরে না। তারা জীবিত। দুনিয়ায় থাকা মাহদী আকিফের চাইতে শহীদ মাহদী আকিফ আরো শক্তিশালী হবে ইনশাআল্লাহ্‌।

তথ্যসূত্রঃ
১। আল জাজিরা 
২। মিডল ইস্ট মনিটর