২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মাওলানা আবদুর রহীম কেন জামায়াত ছেড়েছেন?

মাওলানা আব্দুর রহীম
সময়টা ১৯৭৬ সাল। শেখ মুজিবের ভূমিধ্বস পতনে এদেশের মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সবচেয়ে বেশি উপকার হয় ৭১ সালের পরাজিত শক্তি এদেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর। ১৯৭২ সালে মুজিব সবগুলো ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করে দেয়। এর মধ্যে একমাত্র জামায়াত ছাড়া আর কেউই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সমর্থ হয়নি। দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলো যথাক্রমে নেজামে ইসলামী পার্টি, খেলাফতে রব্বানী ও জামায়াতে ইসলামী। 

চার-পাঁচ বছর নিষিদ্ধ থাকার পর দেখা গেলো দলগুলো নামসর্বস্ব দলে পরিণত হয়েছে একমাত্র জামায়াত ছাড়া। জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হওয়া এবং রাজনীতির বাইরে অন্যান্য এজেন্ডা থাকায় তারা গোপনে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বেগ পেতে হয়নি। 

মুজিবের পতনের পর ইসলামী দলগুলোর মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে উঠে জামায়াত। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতেই তাদের কার্যক্রম অব্যাহত ছিলো। জামায়াতের গোপনে তাদের প্রতিটি ইউনিটকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে নেজামে ইসলামী ছিলো আলেম ওলামা ভিত্তিক রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরে দাওয়াত, লোক গঠন বা ইসলামী আদর্শের জন্য লোক প্রস্তুতির কোনো এজেন্ডা তাদের ছিলো না। ফলশ্রুতিতে দেখা গেলো মুজিবের পতনের পর তাদের কোনো কর্মী আর অবশিষ্ট নেই। 

আবার খেলাফতে রব্বানী ছিলো জ্ঞানী ও পণ্ডিতদের সংগঠন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে তারা প্রচুর সেমিনার ও পাঠচক্র করতেন। কিন্তু ইসলামের জন্য জীবন দেয়ার উপযোগী লোক তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ায় তারাও কর্মীশূন্য হয়ে পড়ে। তারা ইসলামী কম্যুনিজম নামে একটি জগাখিচুড়ী টাইপের আদর্শ দাঁড় করার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। 

এবার ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগের (IDL) প্রসঙ্গে আসা যাক। মাওলানা আব্দুর রহীম ছিলেন এর রূপকার। ১৯৭৬ সালে মে মাসে সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ধর্মীয় রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। ঐ বছরই আগস্ট মাসে আইডিএল গঠিত হয়। 

১৯৭৬ সালের ২৪ আগষ্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি, নেযামে ইসলাম পার্টি, খেলাফতে রব্বানী পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (IDL) নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম গড়ে তোলেন। কেন্দ্রীয় কমিটি ছিলো নিম্নরূপ। 

চেয়ারম্যান - মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (নেজামে ইসলাম) 
ভাইস চেয়ারম্যান - মাওলানা আব্দুর রহীম (জামায়াত) 
ভাইস চেয়ারম্যান - এড. সা'দ আহমদ (জামায়াত) 
ভাইস চেয়ারম্যান - মাওলানা আব্দুস সুবহান (জামায়াত) 
সেক্রেটারি - এড. শফিকুর রহমান (ডেমোক্রেটিক পার্টি) 

(সা'দ আহমদ ছিলেন কুষ্টিয়ার জামায়াত নেতা। এর আগে তিনি মুসলিম লীগ, অতঃপর আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ৬২ সালে কারাবরণের সময় তিনি সেখানে জামায়াত নেতাদের সাক্ষাত লাভ করেন। মাওলানা মওদূদীর বইগুলো তার চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনে। অবশেষে ১৯৬৬ সালে তিনি জামায়াতে যোগ দেন। ৭১-এ তিনি কট্টর স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। এই কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়। তিনি একটি বই লিখেন মুজিবের কারাগারে পৌনে সাতশ দিন। ইতিহাস অনুসন্ধানীদের জন্য বইটি পড়া আবশ্যক।) 

এর মধ্যে ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জামায়াত আইডিএলের ব্যানারে অংশগ্রহণ করে। আইডিএল ২০ টি আসন লাভ করে। এর মধ্যে জামায়াতের ছিলো ৬ জন। যাই হোক আইডিএলের সাফল্য আইডিএলের নেতাদের ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করে। 

সেই ছয়জন হলেন,
১। মাওলানা আবদুর রহীম, এম.এম (বরিশাল)
২। অধ্যাপক সিরাজুল হক, এম.এ (কুড়িগ্রাম)
৩। মাওলানা নুরুন্নবী ছামদানী, এম.এম (ঝিনাইদহ)
৪। মাষ্টার মোঃ শফিক উল্লাহ, বি.এ বিএড (লক্ষ্মীপুর)
৫। এএসএম মোজাম্মেল হক, আলিম (ঝিনাইদহ) 
৬। অধ্যাপক রেজাউল করিম, এম.এ (গাইবান্ধা) 

মাওলানা আব্দুর রহীম ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমীর নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তিনি নিখিল পাকিস্তানের নায়েবে আমীর মনোনীত হন। আর এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের আমীর হন অধ্যাপক গোলাম আযম। ১৯৭১-এ পট পরিবর্তনের ফলে মাওলানা আব্দুর রহীম আর এদেশে আসতে পারেননি। আর তাছাড়া তিনি নায়েবে আমীরের দায়িত্বও পালন করছিলেন। 

১৯৭৪ সালে তিনি পাকিস্তান জামায়াত থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজ দেশ বাংলাদেশে ফিরে আসেন ও বাংলাদেশ জামায়াতে যোগ দেন। তখন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান। জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে একটিভ ছিলো। 

১৯৭৬ সালে মাওলানা আব্দুর রহীম জামায়াতের হয়ে আইডিএল গঠন করেন। আইডিএল কোনো দল ছিলো না, এটি ছিলো একটি জোট। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর সুবাদে জামায়াত আবারো প্রকাশ্যে কাজ করার চেষ্টা শুরু করে। 

জামায়াত যখন নিজ নামে আবার আত্মপ্রকাশ করতে যায় তখন মাওলানা আব্দুর রহীমসহ জামায়াতের মধ্যকার একটি পক্ষ চান নতুন করে আর দল না করার জন্য। জামায়াত যেনো আইডিএল হয়ে যায়। তাদের যুক্তি ছিলো জামায়াতের বিরুদ্ধে কিছু আলেম ওলামাদের অবস্থান যা ছিলো তা আর থাকবে না। এছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে যত প্রকার অভিযোগ আছে সেগুলো আর কাঁধে নিতে হবে না। এছাড়া আইডিএলের প্রধান শক্তি জামায়াত তাই আইডিএলকে সহজেই জামায়াতিকরণ করা যাবে। 

অন্যদিকে অন্যান্য শুরা সদস্যরা এই প্রস্তাবটিকে সমর্থন জানান নি। তারা দাবি ছিলো আইডিএল থাকবে জোট হিসেবে (যেভাবে আছে)। আর জামায়াত তার নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হবে। জামায়াতের এজেন্ডা কখনোই আইডিএলে বাস্তবায়ন করা যাবে না। কারণ জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের চাইতেও বেশি রয়েছে লোক গঠনের এজেন্ডা। অতএব শুরায় জামায়াত নিজ নামে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ শুরা মেম্বার মত দেন। 

জামায়াতের শুরার এই মতামত মেনে নিতে পারেননি মুমতাজুল মুহদ্দিসীন খ্যাত মাওলানা আব্দুর রহীম। তিনি আইডিএলকে একটি দলে পরিণত করার চেষ্টা করে গিয়েছেন। ওনার সহযোগী হিসেবে ছিলেন এড. সা'দ আহমদ। এভাবেই তিনি জামায়াত থেকে চলে যান। তিনি ভেবেছেন আইডিএলের মাধ্যমে সহজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। ইদানিং অনলাইনে বিভিন্ন লেখকের লেখায় দেখলাম বলা হচ্ছে মাওলানা আব্দুর রহীম জামায়াতের কর্মকান্ড ও লক্ষ্য উদ্দেশ্যের সাথে বিরোধ করে বেরিয়ে গেছেন। অনেকে বলছেন মাওলানা মওদূদীর সাথে বিরোধে জড়িয়ে জামায়াত ত্যাগ করেছেন। অনেকে আবার শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযমের চরিত্র হনন করে বলতে চান মাওলানাকে অধ্যাপক সাহেব জামায়াত থেকে বের করে দিয়েছেন। এ সবই অবান্তর, বিদ্বেষপ্রসূত ও অজ্ঞতাপ্রসূত।

৪টি মন্তব্য:

  1. মাশা আল্লাহ। কনফিউশানটা দূর করার জন্য আন্তরিক মোবারকবাদ

    উত্তরমুছুন
  2. জাজাকাল্লাহু খাইরান। ভাই অজানা তথ্য জানানোর জন্য ।

    উত্তরমুছুন
  3. আচ্ছা?? সত্যিই কি তাই?? মাওলানার কিন্তু আরও বই আছে সেগুলো পড়লে বোঝা যায় তিনি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নয় পুর্নাঙ্গ ইসলামি বিপ্লবে বিশ্বাস রাখতেন, এটা কি তার জামায়াত ছাড়ার কারনগুলোর মধ্যে একটি নয় কি??

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. না, কারণ তিনি জামায়াত থেকে চলে যাওয়ার পরও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইলেকশন করেছেন।

      মুছুন