১১ ফেব, ২০২০

ইরানি বিপ্লব কেন হয়েছিলো? কতটুকু সফল?



আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। ১৯৭৯ সালে এই দিনে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফলতার মুখ দেখে। সেই থেকে ৪১ বছর ধরে পাশ্চাত্য সভ্যতার হুমকি হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইরানিরা। এই বিপ্লবকে ইসলামী বিপ্লব বলতে রাজি হন না আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারীরা। তারা এটাকে ইরানি বিপ্লব বা শিয়া বিপ্লব বলেই অভিহিত করেন। 

বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন এক নাম ইরানি সভ্যতা বা পারসিক সভ্যতা। একসময় মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশটি। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শাহী ঐতিহ্যবাহী রাজবংশের একজন ধারক ছিল ইরানের সর্বশেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী। প্রায় আড়াই হাজার বছরের এই রাজবংশের বিলুপ্তি ঘটে গেলো ১৯৭৯ সালে। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানি বিপ্লব ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমাজের বিদ্রোহ। ইসলামকে জিন্দা করা, পাশ্চাত্য সভ্যতাকে প্রতিরোধ করা, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক মুক্তি ছিলো যার মূল চাওয়া। 

বিংশ শতকের প্রথম দিকে, প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বই ইউরোপিয়ান শক্তির উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উসমানীয় খিলাফতের পতন ঘটে যা ছিল ক্লাসিক ইসলামি সভ্যতার সর্বশেষ প্রতিনিধি। সুতরাং বিংশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলিম বিশ্ব তাদের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ শুরু করে। 

ধর্মনিরপেক্ষ-জাতীয়তাবাদী, পশ্চিমা, শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি, যারা বিশ্ব বিপ্লবের প্রথম এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব অর্জনের তাগিদ থেকেই। এই নেতারা সমাজ ও রাজনীতিতে খ্রিস্টানদের দৃঢ়তা কমাতে ইউরোপের প্রগতিশীলতাকে অনুকরণ করতে চেয়েছিলেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে, মুসলিম সমাজে যদি সংস্কার আনা সম্ভব হয় এবং সমাজের ওপর থেকে ধর্মের প্রভাব এমনকি ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয় তাহলে মুসলিম সমাজ অগ্রগতি লাভ করতে সক্ষম হবে। 

সংস্কারবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো তুরস্কের নতুন ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র গঠন। ১৯২৪ সালে উসমানীয় খিলাফতের পতন ঘটেছিল যা সমগ্র মুসলিম বিশ্বে একটি ধাক্কা সৃষ্টি করেছিল। এই ধাক্কার ফলে আলেম-উলামাদের নেতৃত্বে বিকল্প তৃণমূল ইসলামী তাজদিদ আন্দোলনের উত্থান ঘটায়, যারা মনে করতো ইসলামের অস্তিত্ব বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে। এই আন্দোলনগুলির সূচনা অরাজনৈতিক ছিল এবং মুসলমান জনগণের কাছে আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল বলেই জনসমর্থন অর্জন করেছিল। সময়ের স্রোতে তারা সমাজে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছিল এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তারা সক্রিয় হয়ে উঠলো। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্বে ক্ষমতার মেরুকরণে একটা বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা যায়, মুসলিম বিশ্বগুলো ইউরোপিয়ান উপনিবেশের হাত থেকে মুক্ত হতে শুরু করে, শুধুমাত্র ইরান ও তুরস্ক স্নায়ুযুদ্ধে প্রভাবিত হয়। ইরান ও তুরস্ক এমন দুটি দেশ ছিল যেখানে সোভিয়েত সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা তীব্রতর হয়েছিল। প্রতিক্রিয়ায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক পশ্চিম ব্লকের সদস্য হওয়ার জন্য  উভয় দেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা প্রদান করেছিল। তুরস্ক ও ইরান তাদের এই সহায়তা গ্রহণ করে এবং যথাক্রমে ১৯৫০ সালে এবং ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। 

১৯৫১ সালে ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম সরকার নির্বাচিত হয় মোহাম্মাদ মোসাদ্দেকের ন্যাশনাল ফ্রন্ট। মোসাদ্দেক ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ নেতা। তিনি একইসঙ্গে পশ্চিমা, ইসলামি উলামা ও ধর্মনিরপেক্ষ সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জন করতে পেরেছিলেন। সম্রাট রেজা শাহ পাহলভির রাজত্বকালীন তাদের তেল ক্ষেত্রের শোষণের কারণে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মধ্যে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠা ক্রোধ থেকেও তিনি বেনিফিট পেয়েছেন। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি আক্রমণের হাত থেকে বেঁচে থাকার জন্য ব্রিটেন ও রাশিয়া পার্সিয়ান তেল ব্যবহার করেছিল যা ব্রিটিশ অর্থনীতির উন্নতিতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছিল। তবে, ইরানিরা কেবল লাভের ২০ শতাংশই পেয়েছিল। ঠিক এমন সময়ে এই ইস্যুকে সামনে এনে ব্রিটিশ মালিকানাধীন অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করার মাধ্যমে মোসাদ্দেক একটি দৃঢ় ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। যদিও এটা তার জন্য হিতের বিপরীতই হলো, ব্রিটিশ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার শিকার হতে হয়েছে যা ইরানি অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করতে শুরু করে। 

১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ও মার্কিন সিআইএর সংগঠিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়েছে। রেজা শাহ পাহলভীর নিকট ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া হলো এবং অ্যাংলো-ইরানিয়ান তেল কোম্পানিটি ৫০-৫০ মুনাফায় হলো বিপি বা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম।

এই হস্তক্ষেপটিই শুধুমাত্র ইরানিদেরই আঘাত করেনি বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এটি এই মেসেজ মুসলিম বিশ্বকে দিয়েছিলো যে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে পশ্চিমা স্বার্থের সাথে মানানসই না হলে এটি বাতিল করা হবে। এই চিত্রটি আজ পর্যন্ত চালু রয়েছে। মিশরেও কিছুদিন আগে ইখওয়ানকে একইভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। 

১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৭৭, এই সময়ে ইরানের বিকাশের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে কী চরমভাবে শাহ মার্কিনদের ওপর নির্ভর করেছিল। মার্কিনদের প্রচেষ্টানুযায়ী এই সময়কালে ইরানি সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ, ইরানি সমাজব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে নির্মাণ করেন শাহ, যাকে তিনি শ্বেত বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করেন। 

যদিও তার অর্থনৈতিক কর্মসূচি ইরানে সমৃদ্ধি ও শিল্পায়ন এনেছিল এবং শিক্ষাগত উদ্যোগের ফলে সাক্ষরতার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল, কিন্তু এসবই ছিল বেশ ব্যয়বহুল। সম্পদ সমানভাবে বিভক্ত হয়নি, কৃষকদের মধ্যে নগরায়নের প্রভাব লক্ষণীয় ছিল। ভিন্নমত পোষণকারীদের  রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক দমনপীড়ন করা হয়েছিল। আলেম-উলামারা ইরানি জাতির ওপর পশ্চিমা জীবনধারা চাপানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করতেন। তারা মনে করতেন যে, ইসলামকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরানো হচ্ছে। 

শাহের রাজনৈতিক সহিংসতামূলক দমন ইরানি সাধারণ জনগণকে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে বাধ্য করে। ১৯৬০ এর দশকে মার্কসবাদী ফাদাইয়ান-ই-খালক ও ইসলামী বামপন্থী মুজাহিদীন-ই-খালক নামক দুইটি জঙ্গি গোষ্ঠী বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ চালাতে শুরু করে। আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং আলী শরিয়তীর নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী থেকে আরো কার্যকর ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিরোধিতা আসতে শুরু করে।

আলী শরীয়াতি, একজন ফরাসি থেকে শিক্ষার্জন করা বুদ্ধিজীবী যিনি আলজেরীয় এবং কিউবান বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। তিনি সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য সক্রিয় সংগ্রামের আহ্বান জানান এবং সমাজের পশ্চিমা মডেলের পরিবর্তে ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি শিয়া পণ্ডিতদের সমালোচনা করেছিলেন তাদের শতাব্দী-পুরাতন রাজনৈতিক শান্তির মতবাদে আটকে থাকার জন্যে যা বিপ্লবী প্রগতিতে একটি উল্লেখযোগ্য বাধা হিসাবে দেখা যায়।

আয়াতুল্লাহ খোমিনির মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতাটি ভেঙে যায়, যিনি ১৯৬৩ সালের বিক্ষোভে স্পষ্ট ভূমিকা পালন করার জন্য অগ্রসর হন এবং ফলস্বরূপ নির্বাসিত হন। শাহকে খোলাখুলিভাবে সমালোচনা করা তাঁর রেকর্ডকৃত উপদেশ ইরানে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। ঔপনিবেশিক পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রের নতুন ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলে খোমেনি যুক্তি দেন। কুরআনের ওপর ভিত্তি করে ইসলামিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, উদাহরণস্বরূপ নবী মুহাম্মাদ সা.-এর মদিনা রাষ্ট্রকে তিনি সামনে নিয়ে আসেন। 

তার বিখ্যাত বই 'উইলিয়াত-ই ফকিহ : হুকুমাত-ই ইসলামি'তে খোমেনী জোর দিয়ে বলেছেন যে সত্য ইমামের (শিয়া মাজহাবে মুহাম্মদ সা.-এর বংশধর থেকে একমাত্র বৈধ নেতা) অনুপস্থিতিতে আলেমরা ইসলামী ধর্মগ্রন্থগুলির জ্ঞান অর্জনের দ্বারা তাদের শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য দায়িত্বরত। এই ধারণাটি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো কারণ সুফীবাদের কারণে ইরানি আলেমরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন। তিনি এর মাধ্যমে আলেমদের রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার শুধু বৈধতাই দেননি বরং তা অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছেন।

খোমেনির জ্বালাময়ী বক্তব্য ও লেখনী দ্বারা ইরানিরা ব্যাপকভাবে উদ্দিপ্ত হন। শাহের বিরুদ্ধে তার অনুসারীদের বিক্ষোভগুলি ইরানের সব প্রধান প্রধান শহরে ছড়িয়ে পরেছিল। ১৯৭৯ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি যখন নির্বাসিত খোমেনি বিজয়ী হয়ে ইরানে ফিরে আসে তখনই বিপ্লব পূর্ণতা পায়। এর দশদিন পর যখন আন্দোলন তীব্রতা চরমে পৌঁছায় তখন রেজা শাহ পাহলভি পদত্যাগ করেন এবং পালিয়ে যান। 

ইরানি বিপ্লব এমন একটি ঘটনা যা কেবল ইরানকেই সম্পূর্ণরূপে রূপান্তরিত করেনি, বরং বিশ্বের জন্যও এর প্রভাব ছিলো ব্যাপক। এটি স্নায়ু যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির রূপান্তর ঘটিয়েছিল। আমেরিকা কমিউনিস্ট হুমকির বিরুদ্ধে কেবলমাত্র একটি কৌশলগত সহযোগীকেই হারায়নি বরং তারা নতুন এক শত্রুও অর্জন করেছে।

বিপ্লবের শুরুর প্রহরেই আমেরিকা এর বিনাশে সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখে। ১৯৮০ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের উত্থান ঘটে, যা নতুন ইরানি শাসনকে আরো সুসংহত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছিল, ইরাককে বিশ্বে শক্তিশালী ক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করেছিল। 

এছাড়াও ইরানি বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেও নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন ঘটায়। এটি ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি আঞ্চলিক সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় স্নায়ূযুদ্ধকে উস্কে দেয়। এই বিপ্লব সৌদি আরবের রাজতন্ত্র এবং মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের দাবির প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে ধর্মীয় ও মতাদর্শিক যুদ্ধ আজও বিদ্যমান। রাজনৈতিক ইসলামের পুনরুত্থানের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে ইরানি বিপ্লবের প্রভাব দেখা যায়। ইরানের সফলতা দেখায় যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শুধু একটি স্বপ্ন নয়। পশ্চিমা ও তাদের সহযোগী সম্রাট / স্বৈরশাসকদের ওপর জয় লাভ করা যে সম্ভব তাও ইরান প্রমাণ করেছে।

১৯৮০ ও ৯০র দশকে, পৃথিবীর সব ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলি (শিয়া ও সুন্নি) সব মুসলিম দেশেই উৎসাহিত হয়েছিলো ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায়। তাদের আহ্বানের মূল কথা ছিলো, ধর্মনিরপেক্ষতার পশ্চিমা মডেল অগ্রগতি এবং জনগণের স্বাধীনতা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে যেখানে ইসলামি মডেল একমাত্র বিকল্প ছিল। এটা যে বাস্তবায়ন হতে পারে তার প্রমাণ ছিলো ইরানি বিপ্লব।

ইরানি বিপ্লব এখনও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান রয়েছে। ৮ বছর ধরে ইরান-ইরাক যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ এটি চার দশক ধরে টিকে রয়েছে। বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শক্তি দিনে দিনে দৃঢ় হচ্ছে। তবে এর বিপরীত দিকও আছে। এই বিপ্লব ইরানিদের একটি স্বাধীনচেতা জাতি হিসেবে সম্মান এনে দিয়েছে তবে ঠিক যে কারণে এই বিপ্লব জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে তা এখনো অর্জিত হয়নি। খোমেনি ও তার সমর্থকরা ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যকার পার্থক্য দূর করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। বর্তমানে ইরানের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, তেলের রাজস্ব পতন রোধ করা থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চ বেকারত্বের হার এবং  মুদ্রাস্ফীতির মানুষের মনে অসন্তুষ্টির সৃষ্টি করেছে। অর্থনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের আশা অতি ক্ষীণ। বেশিরভাগ ইরানি নাগরিকরাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অসমাপ্ত নিষেধাজ্ঞাকেই বিপ্লবের ব্যর্থতা হিসেবে দোষারোপ করে। যদিও ইরান ইউরোপীয় শক্তি, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করছে, তবুও তারা বিশ্বাস করে যে, পশ্চিমারা তাদের সফল হতে দিতে চায়না।

ইরানের বিপ্লবের যে লক্ষ্য ছিল তা বাস্তবে এখন কোন অবস্থানে রয়েছে তা নিরুপণ করা বেশ কঠিন। একবিংশ শতকে এসেও ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। বিশ্ব ভূ-রাজনীতির জঘন্য রোষানলের ফলে দেশটিতে এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে ইউরোপের পরে মার্কিন আগ্রাসনের সঙ্গে শত্রুতা করে কোন দেশই এখন পর্যন্ত সফল হতে পারেনি, ইরান সেখানে এখনও এমন এক মুসলিম রাষ্ট্র যারা বিগত ৪০ বছর ধরে মার্কিন আগ্রাসনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে টিকে আছে। 

৯ ফেব, ২০২০

শহীদ এ কে এম ইউসুফ : এক ক্ষণজন্মা হাদীস বিশারদ



শহীদ মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ছিলেন একাধারে স্বনামধন্য মুহাদ্দিস, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও মুহাক্কিক। তিনি একজন দক্ষ সংগঠকও ছিলেন। তিনি তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন এদেশের ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি চাষী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষের খেদমত করে গেছেন। তার এই সমাজসেবামূলক কর্মের মাধ্যমে অমুসলিমরাও উপকৃত হয়েছেন। তিনি বলেন, জুলুমবাজ সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের জন্য কথিত বিচারের নামে প্রহসন করে তাকে কারারুদ্ধ করে তিলে তিলি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।

জন্ম :
১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাগেরহাটের শরণখোলায় মা-বাবার ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান ব্যক্তিত্ব। আবার পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন ৮৭ বছর বয়সে আরেক ফেব্রুয়ারি মাসে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে বেলা এগারোটা তিরিশ মিনিটে রাজধানীর পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়।

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার :
মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলা শরণখোলার বাসিন্দা। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা তার গ্রামের স্কুল এবং পরে রায়েন্দার একটি স্কুল থেকে সম্পন্ন করেন। তিনি শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে মাধ্যমিক স্তরের পড়ালেখা শেষ করেন। 

শহীদ এ কে এম ইউসুফ ফাজিল এবং কামিল পড়াশোনা করেন ঢাকা আলিয়া থেকে। ১৯৫০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ফাজিল (সম্মান) পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে দেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপরেই তিনি ১৯৫২ সালে স্নাতক (কামিল) পরীক্ষা শেষ করেন, মমতাজ আল-মুহাদ্দেসিন হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করেন, দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের পন্ডিতদের কাছে এটি সর্বোচ্চ সুনাম ।

তিনি ১৯৫২ সালে মাদ্রাসা শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৫৮ সালে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হন। তিনি মথবাড়িয়ার (বরিশাল) একটি সিনিয়র মাদ্রাসায়ও শিক্ষকতা করেছিলেন, যেখানে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নয় বরং উপমহাদেশের অন্যতম হাদীস বিশারদ। হাদীসের মশহুর কিতাব “হাদীসের আলোকে মানব জীবন” তাঁর অনন্য কীর্তি। বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ অথচ জীবনঘনিষ্ঠ হাদীসসমূহ এবং সেই সাথে সংক্ষিপ্ত প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা সন্নিবেশিত করে তিনি যে অনন্য সাধারণ হাদীস গ্রন্থ সংকলন করেছেন- এই একটি মাত্র কারণেই তিনি আমাদেরকে ঋণী করে গিয়েছেন অনাগত কালের জন্য।

পারিবারিক জীবন :
মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ১৯৪৯ সালে রাবেয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে আছে ৩ ছেলে ৫ মেয়ে। সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। 

ইসলামী আন্দোলনে যোগদান :
শহীদ আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ ১৯৫২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তাঁর জামায়াতে যোগদানের মূল কারণ ছিলো আরেক মুমতাজুল মুহাদ্দেসীন মাওলানা আব্দুর রহীম। তাছাড়া তিনি মাওলানা মওদূদীর লেখার ভক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি জামায়াতের খুলনা বিভাগের আমীর ছিলেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে আইয়ুব খানের দ্বারা পাকিস্তানে সামরিক আইন ঘোষণার পরে সমস্ত দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সামরিক আইন প্রত্যাহারের পরে শহীদ ইউসুফ জামায়াতের পূর্ব পাকিস্তানের নায়েব-ই-আমীর (সহসভাপতি) পদে নিযুক্ত হন।

একাত্তরের পরে, একেএম ইউসুফ জামায়াতের সিনিয়র নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সক্ষমতা নিয়ে কাজ করেছিলেন। আমীর মাওলানা আবদুর রহিমের অধীনে তিনি এক মেয়াদে সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। তিনি আবারও একই দায়িত্বে জামায়াত আমীর গোলাম আযমের সাথে টানা তিনবার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সাথে তিনি বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েব-আমির হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দায়িত্বে অব্যাহত ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবন :
১৯৬২ সালের নির্বাচনে মাওলানা এ কে এম ইউসুফ নির্বাচনী এলাকা খুলনা ও বরিশালের প্রার্থী হওয়ার জন্য জামায়াত থেকে মনোনীত হয়েছিলেন। আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা থেকে ছুটি নিয়ে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। ৩৫ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলেন।

তিনি ১৯৬০-এর দশকে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭১ সালে তিনি মালেক মন্ত্রীসভার একজন মন্ত্রী ছিলেন।

অন্যান্য সামাজিক কাজ
জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শহীদ এ কে এম ইউসুফ শরীয়াহ কাউন্সিল, দারুল আরাবিয়া, কেন্দ্রীয় ওলামা-মাশায়েখ কমিটি প্রভৃতি সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য সামাজিক কাজ হলো চাষী কল্যাণ সমিতি। তিনি ছিলেন এদেশের লক্ষ লক্ষ চাষিদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ চাষি কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি। এদেশের গ্রামীণ জনপদের চাষিদের সংগঠিত করা, তাদের মাঝে আদর্শিক চেতনা জাগ্রত করা, তাদের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেয়া এইসব লক্ষ্য নিয়ে তিনি চাষী কল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমল থেকে বাগেরহাট ও খুলনায় অসংখ্য ইয়াতিমখানা, স্কুল, মাদরাসা ও মসজিদ স্থাপন করেন।

অসিয়ত
২০১৩ সালের ৪ মে তিনি তাঁর সন্তান, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে অসিয়ত করে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
“আমার বয়স এখন ৮৭ বছরে উপনীত হয়েছে। আমার সমবয়সী সাথী ও বন্ধুদের অধিকাংশই এখন দুনিয়া ত্যাগ করে পরপারের যাত্রী। যেহেতু আমার বয়স অধিক; উপরন্তু আমি নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত যে কোন সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরপারের আহ্বান আসতে পারে। আমি পরম করুণাময় আল্লাহর একজন ক্ষুদ্র বান্দা ও দাস। মহান রাব্বুল আলামীন আমার নিজের ও সন্তান-সন্ততি ও নাতী-নাতনীদের ওপরে করুণার যে ধারা প্রবাহিত রেখেছেন, আমার কামনার চেয়ে তা অনেক অধিক, যার শুকরিয়া আদায় করা আমার সাধ্যের অতীত। আমি আমার সন্তান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই যে, দেশ ও দেশের বাইরে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য যারা কাজ করেছেন, আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা নিয়ে আমি তাদের কাতারে শামিল ছিলাম। পরম করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার ওপরে অনুগ্রহ ছিল, ফলে আমি দেশ-বিদেশের কতিপয় নেক বান্দাহ ও দাতা সংস্থার সাহায্যে আমার মাতৃভূমির সব এলাকায় বেশ কিছু সদকায়ে জারিয়াহর কাজ করেছি। সাধ্যের মধ্যে থেকে তোমরাও কিছু সদকায়ে জারিয়াহর কাজ করবে। আমার প্রাণাধিক সন্তান-সন্ততির জন্য আমার অসিয়ত হলো, তোমরা আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত ফরয ইবাদতসমূহ যেমন নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্জ নিয়মিত আদায়ের ব্যাপারে কোন গাফলতি করবে না। ওপরে যে অছিয়ত আমি আমার সন্তান-সন্ততিদের উদ্দেশ্যে করলাম, ঐ একই অছিয়ত আমার আন্দোলনের সাথী প্রবীণ ও তরুণদের জন্যও রইল।”

সাহিত্য :
মাওলানা এ কে এম ইউসুফ একজন সুপরিচিত আলেম এবং কোরআন অধ্যয়ন ও হাদিস সম্পর্কিত শিরোনাম সহ বেশ কয়েকটি বহুল পঠিত বই লিখেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহাগ্রন্থ আল কুরআন কি এবং কেন?, হাদীসের আলোকে মানব জীবন, দর্পন, দেশ হতে দেশান্তরে, কুরআন হাদীসের আলোকে জিহাদ, জামায়াতে ইসলামী বিরোধীতার অন্তরালে।



শাহদাত :
ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্দ করে দিতে মরিয়া পাশের দেশের মুশরিকরা ও তাদের পদলেহনকারী স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার। এরই অংশ হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। কাল্পনিক সব অভিযোগ আনে দেশের সবচেয়ে উত্তম মানুষগুলোর প্রতি। এর মধ্যে পাঁচজন নেতাকে ফাঁসী দিয়ে হত্যা করে। শহীদ এ কে এম ইউসুফ ছিলে অত্যন্ত বৃদ্ধ ও অনেক রোগের রোগী। তাঁকে বিনা চিকিৎসায় কারাগারে আটকে রাখা হয়। তিনি স্ট্রোক করার পরও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। চিকিৎসা না দিয়ে তাঁকে খুন করে সন্ত্রাসীরা। মুমতাজ আল মুহাদ্দিসীন নিজের জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ইসলামের উপর টিকে ছিলেন। কোনো আপোষ করেননি সরকারের সাথে। ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে তিনি শাহদাতের নজরানা পেশ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শাহদাতের মর্যাদা দান করুন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আদ্যোপান্ত



সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পর খালেদা জিয়া হলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সরকারপ্রধান, যার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি মামলার রায় ও সাজা হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে এরশাদের মতো জেলও খাটতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। তবে ব্যবধান হলো খালেদা জিয়ার মামলাটি বানোয়াট। এখানে যা ঘটনা এর সাথে দুর্নীতির সম্পর্ক নেই। মূল ঘটনা জানলে আপনি অবাকই হবেন।  

মামলা : 
প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২.৫৫ লাখ মার্কিন ডলার আসে যা বাংলাদেশি টাকায় তৎকালীন ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অর্থ দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে অস্তিত্ববিহীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন। অথচ কোনো নীতিমালা তিনি তৈরি করেননি, করেননি কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থাও। অথচ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা অস্তিত্ববিহীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে পাঠান। পরে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন যার জন্য তিনি দায়ী। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থেকে নিজের পদমর্যাদা বলে সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে দণ্ডবিধির ৪০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ করেছেন।

আসামি যারা :
দুর্নীতি দমন কমিশনের  তখনকার উপ সহকারী পরিচালক  হারুন-অর রশিদ (বর্তমানে উপ-পরিচালক) এ মামলার এজাহারে খালেদা জিয়াসহ মোট সাতজনকে আসামি করেন। বাকি ছয়জন হলেন- খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমান, জিয়াউর রহমানের বোনের ছেলে মমিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সাংসদ কাজী সালিমুল হক (ইকোনো কামাল), সে সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের দায়িত্বে থাকা (পরে মুখ্য সচিব হন) কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ ও সৈয়দ আহমেদ ওরফে সায়ীদ আহমেদ।

দুদক কর্মকর্তা হারুন-অর রশিদ ২০০৯ সালের  ৫ অগাস্ট আদালতে যে অভিযোগপত্র দেন, সেখান থেকে গিয়াস উদ্দিন ও সায়ীদ আহমেদের নাম বাদ দেওয়া হয়। তাদের অব্যাহতির কারণ হিসেবে বলা হয়, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ অনেক আগে থেকে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। অভিযোগে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমান পাওয়া যায়নি। আর সায়ীদ আহমেদ নামে কারও অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।  সাবেক সাংসদ কামাল জালিয়াতি করে ট্রাস্টের কাজে ওই দুই জনের নাম ব্যবহার করেছেন।

অভিযোগে যা রয়েছে :
এজাহারে বলা হয়, খালেদা জিয়া তার প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম মেয়াদে ১৯৯১-১৯৯৬ সময়কালে এতিম তহবিল নামে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় একটি হিসাব খোলেন। একটি বিদেশি সংস্থা ১৯৯১ সালের ৯ জুন ওই হিসাবে ইউনাইটেড সৌদি কর্মাশিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে অনুদান হিসেবে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা দেয়। ওই টাকা দীর্ঘ দুই বছর কোনো এতিমখানায় না দিয়ে জমা রাখা হয়। এরপর জিয়া পরিবারের তিন সদস্য তারেক রহমান, তার ভাই আরাফাত রহমান এবং তাদের ফুপাতো ভাই মমিনুরকে দিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করে ওই টাকা তাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওই ট্রাস্ট গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা মানা হয়নি। এছাড়া ট্রাস্টের ঠিকানা হিসেবে খালেদা জিয়ার সেনানিবাসের ৬ নম্বর মইনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। পরে ওই টাকা দুইভাগে ভাগ করে ট্রাস্টের বগুড়া ও বাগেরহাট শাখার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫’শ টাকা ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে বরাদ্দ দেওয়া হয় বগুড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে। ওই অর্থ থেকে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ট্রাস্টের নামে বগুড়ার দাঁড়াইল মৌজায় ২.৭৯ একর জমি কেনা হয়।

কিন্তু অবশিষ্ট টাকা এতিমখানায় ব্যয় না করে ব্যাংকে জমা রাখা হয়। ২০০৬ সনের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত তা সুদে আসলে বেড়ে ৩ কেটি, ৩৭ লাখ ৭ শ ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা হয়। এজাহারে বলা হয়, ২০০৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা তার ছেলে তারেক রহমান ও মমিনুর রহমানকে দিয়ে তিন কিস্তিতে ছয়টি চেকের মাধ্যমে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থায়ী আমানত (এফডিআর) করেন। এরপর ওই টাকা কাজী সালিমুল হক কামাল ও অন্যদের মাধ্যমে সরিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়। মামলায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ‘নাম সর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। 

কার দায় কতটুকু?
খালেদা জিয়া: অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসৎ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের নামে পাওয়া টাকা দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে, কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে নিজের পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে প্রধানমন্ত্রীর পরিচালিত তহবিলের টাকা ওই ট্রাস্টে দেন। পরে বিভিন্ন উপায়ে ওই টাকা আত্মসাত করা যায়, যার জন্য খালেদা জিয়াই দায়ী।

তারেক রহমান: প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহায়তায় তার ছেলে তারেক তাদের বাসস্থানের ঠিকনা ব্যবহার করে ‘অস্তিত্বহীন’ জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট সৃষ্টি করেন। ওই ট্রাস্টের নামে সোনালী ব্যাংকের গুলশান নর্থ সার্কেল শাখায় হিসাব খুলে সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা জমা করেন। পরে ট্রাস্ট ডিডের শর্ত ভেঙে ওই টাকা তিনি ট্রাস্টের সঙ্গে সম্পর্কহীন সালিমুল হক কামালকে দেন। পরে সেখান থেকে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা বিভিন্ন  প্রক্রিয়ায় আত্মসাত করা হয়।

মমিনুর রহমান: তারেকের ফুপাতো ভাই মমিনুর রহমানও একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাতে সহযোগিতা করে অপরাধ করেছেন।

কাজী সালিমুল হক কামাল: সাবেক সাংসদ সালিমুল হক কামালের সঙ্গে ওই ট্রাস্টের কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও তিনি তারেক রহমানের কাছ থেকে পাঁচটি চেক নিয়ে এফডিআর করেন এবং পরে তা ভাঙান। সে সময় প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শাখা ব্যবস্থাপকদের দিয়ে সৈয়দ আহমেদ ও গিয়াস উদ্দিন আহমেদ নামের দুই ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে এফডিআর ভাঙিয়ে সেই টাকা শরফুদ্দিন আহমেদের অ্যাকাউন্টে জমার ব্যবস্থা করেন।

কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তখনকার সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল গঠন ও পরিচালনার জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি না করে, কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা না করে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অনুমোদন নিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অস্তিত্বহীন ট্রাস্ট সৃষ্টি করে সেখানে এতিম তহবিলের টাকা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মূল নথি সংরক্ষণ না করে তা তিনি গায়েব করে দেন। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি ওই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় খালেদা জিয়া ও তার পরিবারকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন।

শরফুদ্দিন আহমেদ: ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন এই আত্মসাতে সহযোগিতা করে ব্যংকে তার নিজের নামের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

মূল ঘটনা : 
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা খরচই হয়নি। সব টাকা ব্যাংকে আছে। অতএব এখানে আত্মসাতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের আশুলিয়ার জমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকায় বিক্রির জন্য কথাবার্তা হয়। সে বছরই একটি চুক্তির আওতায় তিনি সোয়া ২ কোটি টাকা অগ্রিম নেন। ২০০৭ সালের ৩১ মের মধ্যে জমি বিক্রির দলিল সম্পাদনের তারিখ থাকলেও তা সেনা সরকারের হস্তক্ষেপে হয়নি। শরফুদ্দিন আহমেদ আদালতকে এ তথ্য দিয়ে আরও বলেন, ‘২০১২ সালের জানুয়ারিতে একটি টাকার মোকদ্দমা মামলায় আমি নোটিশপ্রাপ্ত হই যে ট্রাস্টকে ওই টাকা ফেরত দিতে হবে। আদালত ওই সোয়া ২ কোটি টাকা ২০১৩ সালে টাকা ফেরত দিতে ডিক্রি জারি করেন। এরপর আমি প্রাইম ব্যাংক নিউ ইস্কাটন ও গুলশান শাখা থেকে ১৩টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ট্রাস্টকে হস্তান্তর করি।’ এই হচ্ছে মূল ঘটনা। এখানে দুর্নীতির কোনো ঘটনাই ঘটেনি। 

আরেকটি অভিযোগ ছিলো প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের টাকা কেন জিয়া অরফানেজ নামে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ হবে। এই প্রসঙ্গে ২০১৫ সালে কুয়েত দূতাবাস পত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে তারা। ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীকে ঢাকার কুয়েত দূতাবাসের দেওয়া এক পত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘উক্ত অনুদান '১২ লাখ ৫৫ হাজার ডলার' (৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা) জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে দেওয়া হয়েছিল এবং তা কোনো ব্যক্তি কিংবা সরকার বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি।’ অতএব এই টাকার বৈধ মালিক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট। এটা বাংলাদেশ সরকারের টাকা নয়। কুয়েতের আমীর এই টাকা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে পাঠাননি।  

এখানে একটা কথা বলা যেতে পারে শুধু এতোদিন পর্যন্ত এই টাকা ব্যবহার করা হয়নি কেন? কিন্তু এতিমের টাকা মেরে দিয়েছে বলে যে কথা চালু করেছে তা নিতান্তই মিথ্যা ও বানোয়াট। টাকা এখনো ব্যাংকেই আছে। শুধু শরফুদ্দিন আহমেদ থেকে ট্রাস্টের নামে জমি ক্রয় করার কথা ছিলো। পরবর্তীতে ক্রয় করতে পারেনি তত্ববধায়ক সরকারের সময়ে। এবং তারাই এই মামলা করে বিএনপি'র শীর্ষ নেতৃত্বকে ফাঁসানোর জন্য।  

মঈন ফখরুদ্দিনের আমলে ভারতের নির্দেশে বিএনপিকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে খালেদা ও তারেককে দুর্নীতিবাজ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য তারা এই মামলা সাজায়। আর এই মামলাকে পুঁজি করে স্বৈরাচারী হাসিনা খালেদা জিয়াকে ফাঁসিয়ে দেয়।