২ জুলাই, ২০২০

আমার করোনা অভিজ্ঞতা



ঈদের পর অফিস কর্তৃপক্ষ অফিস খোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। যদিও এখনো ফুল স্কেলে আমাদের অফিস চালু হয়নি তবে চালু হওয়া যে দরকার তা কর্তৃপক্ষের চাইতে চাকুরেরা বেশি অনুভব করছে। 

যাই হোক ঈদের পর অফিসের আহ্বানে দীর্ঘ দু'মাসের ছুটি শেষ করে কর্মস্থলে এলাম। যেদিন এলাম তার দু'দিন পর দেখলাম মেসের এক সদস্য ক্লেইম করলো তার জ্বর। কিন্তু ভাবগতিক আর চেহারা দেখে কেউ তার কথাকে পাত্তা দিলনা। আমি টেম্পারেচার চেক করে দেখলাম তাপমাত্রা স্বাভাবিক। এভাবে চললো তিনদিন। সেই কলিগ আবারো বললেন, রাতে তার জ্বর আসে। গা ব্যাথা করে। শীত লাগে। 

এদিকে আমরা মেসের সদস্যরা জামায়াতের সাথে শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা শুরু করেছি। কলিগের জ্বর আসার তৃতীয় দিন সেহেরি করতে উঠে বুঝলাম শরীরটা আমার ভালো না। মাথা ব্যাথা করছে খুব। পাত্তা না দিয়ে গোসল করে ফেললাম এরপর সেহেরি করলাম। এরপর আর ঘুমাতে পারছি না। জ্বর চলে এলো, সাথে গা ব্যাথা। নয়টার দিকে সবাই ঘুম থেকে উঠলে মশারির ভেতর থেকে এনাউন্স করলাম, আমার জ্বর শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা হেতু আমাকে আইসোলেশনে থাকতে হবে।

প্রতিবছর মোটামোটি আমার জ্বর হয়। সো খুব একটা গুরুত্ব দিলাম না। তবে সতর্কতা যেগুলো নেয়া দরকার তা নিতে থাকলাম। গরম পানি, মশলা চা ইত্যাদি নিতে থাকলাম। আর জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল খেতে থাকলাম তিন বেলা। জ্বর একবার আসে একবার ছাড়ে। তবে কখনোই ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট অতিক্রম করেনি। 

জ্বর হয়েছিল ১৭ সালে। চিকুনগুনিয়ার সময়। জ্বর আর গায়ের ব্যথা কান্না করিয়ে ছেড়েছে। মারাত্মক ছিল সেটা। তবে এবারের জ্বর একেবারেই হালকা। জ্বর হওয়ার দ্বিতীয় দিন কোভিডের জন্য প্রস্তুত জামায়াতে ইসলামীর ডাক্তারদের থেকে অনলাইন চিকিৎসাপত্র গ্রহণ করলাম। তাঁরা যখন শুনলেন আমার কাশি, সর্দি, গলাব্যাথা ইত্যাদি কোনো বিষয় নেই তাই তাঁরা আমাকে প্যারাসিটামল আর এন্টিহিস্টামিন খেতে দিয়েছেন। গরম পানি, র চা, আইসোলেশনে থাকতে বলেছেন। তবে এও বলেছেন আমরা আশা করছি এটা কোভিড নয়। 

তৃতীয় দিন থেকে বেশ ফ্রেশ লাগছিলো। জ্বর ছেড়ে গেল মনে হলো। রাতে শরীরটা আবার একটু গরম হলো। আমি কোভিডের যত ঘরোয়া চিকিৎসা আছে তা নিতে থাকলাম। চতুর্থ দিন পুরোপুরি সুস্থ বোধ করলাম। এতদিন প্যানিকড হবে বলে বাসায় খবর দেই নি যে, আমার জ্বর হয়েছে। পঞ্চম দিন সকালে জানালাম আমার জ্বর হয়েছিল চারদিন আগে। এখন ছেড়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌। 

তারপরও বাসায় প্যানিক তৈরি হয়ে গেছে। নির্দেশ আসলো এখনই যেন বাড়িতে ফিরে যাই। যাই হোক এটা সেটা বলে ম্যানেজ করে অফিসের কাজে মনযোগ দিলাম। দুপুরের পর থেকে শুরু হলো বিপত্তি। বুকটা যেন ভারী ভারী লাগছিলো। আমাকে লম্বা শ্বাস নিতে হচ্ছে। 

যত সময় যাচ্ছে ততই শ্বাসের বিপত্তি বাড়ছে। আসরের পর মনে হচ্ছে বুকটা বুঝি ফেটেই যাবে। মেস মেম্বারদের বললাম আমার পরিস্থিতি মনে হয় ভালো না, অক্সিজেন ও হাসপাতালের ব্যবস্থা করতে হতে পারে। তাদের এগুলো ম্যানেজ করার জন্য বললাম। এর মধ্যে যে ডাক্তার থেকে সেবা নিয়েছিলাম এখন আর তাঁকে পাচ্ছি না। পরে আরেকজন পরিচিত ডাক্তার যিনি কোভিড থেকে সেরে উঠেছেন তাকে নক করলাম। তিনি আমাকে কিছু পরামর্শ দিলেন। 

এদিকে গরম পানির ভাপ নিতে থাকলাম। গরম পানির ভাপ শ্বাসকষ্টে রিলিফ দিচ্ছিল। সন্ধ্যায় কিছুটা উন্নতির দিকে যেতে থাকলো। তবে শ্বাস একেবারে স্বাভাবিক হয়নি। আমাকে যিনি প্রথম ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন (জামায়তের নির্ধারিত ডাক্তার) তিনি ফোন দিয়েছেন। সব শুনে আমাকে ইনহেলার একটা দিলেন। ভাপ নিতে বললেন। আর কষ্ট লাগলে উপুড় হয়ে থাকতে বললেন। আর বেশি সমস্যা হলে হাসপাতালে যেতে বললেন। 

অনেকেই শুরু থেকে টেস্ট করাতে বললেও আমি অনেকগুলো যুক্তি দিয়ে টেস্ট করানো থেকে বিরত থাকলাম। কিন্তু পঞ্চম দিনের পরিস্থিতি হেতু খোঁজখবর করে জানা গেল টেস্ট বাধ্যতামূলক। টেস্ট ছাড়া চিকিৎসা মিলবে না। হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে হলে কোভিড/নন কোভিড নিশ্চিত হতে হবে। পঞ্চম দিন রাতে বুক ভারী হয়ে থাকলো। কিছুক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন কিছুক্ষণ ভাপ এভাবে রাতটি পার হলো। সকালে বাদ ফজর একটু ভালো ঘুম হলো। 

অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম ইবনে সিনায় টেস্ট করাবো। সেখানে অনলাইনে নাকি আগে এপ্লিকেশন করতে হয়। এরপর কবে স্যাম্পল কালেকশন করবে তার ডেট দেয়। কিন্তু আমার তো জরুরি লাগবে। তাই আরেকটি পদ্ধতি এপ্লাই করলাম। আউটডোরে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দেখালাম। সব কথা বললাম। তিনি জরুরী ভিত্তিতে কিছু টেস্ট দিলেন এর মধ্যে করোনা টেস্টও ছিলো। ইবনে সিনায় চাকুরী করা ভাইদের আন্তরিক সহায়তায় সবগুলো ব্যাপার সহজ হয়ে গেল। মাত্র আধাঘন্টায় স্যাম্পল জমা দিয়ে বের হলাম হাসপাতাল থেকে। 
এটি হলো ষষ্ঠ দিনের ঘটনা। 

স্যাম্পল কালেকশন মানে হলো লম্বা একটি কটনবাড মুখ দিয়ে ঢুকিয়ে গলা থেকে সম্ভবত কিছু টিস্যু কালেশন করেছে। কটনবাড দিয়ে যখন গলায় গুতোগুতি হচ্ছিল তখন মনে হলো বমি হয়েই যাবে কিনা! আল্লাহ রক্ষা করেছেন। তেমন বিপত্তি হয় নি। আলহামদুলিল্লাহ্‌। নিজেকে করোনা রোগী ভেবে নিয়ে খুবই সতর্ক ছিলাম। জীবাণুনাশক স্প্রে নিয়েই বের হয়েছিলাম। যেখানে হাত লেগেছে, যেখানে বসেছি সব স্থানে স্প্রে করে দিয়ে এসেছি। বিশেষ করে সিএনজিতে ভালোভাবে স্প্রে করেছি। সেদিন হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। পরিবেশ নির্মল ছিলো। বড় বড় শ্বাস টেনে ফুসফুসকে রিলিফ দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পর শ্বাস স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। তবে কিছু সময় পর পর চাপ অনুভব করতাম। এর মধ্যে ইবনে সিনার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ আমাকে আইভেরা ১২ একবার একটা ট্যাবলেট খেতে বললেন। বাসায় আসার পর আমার প্রথম ডাক্তারের পূর্ণ সাজেশন পেলাম কীভাবে চলতে হবে। তিনি আমাকে দিনে পাঁচবার দশ মিনিট করে ভাপ নিতে বলেছেন। এইদিন রাতেই জ্বিহবার টেস্ট ও নাকের ঘ্রাণক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। 

এরপর টেস্টের রেজাল্ট যাই আসুক না কেন মোটামোটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গেছি। সপ্তম দিন থেকে আর খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে মাথা ব্যাথা, বুকে হঠাৎ হঠাৎ চাপ অনুভব করা চলতে থাকে। জ্বর সর্দি ও কাশি না থাকায় ইনহেলার ছাড়া আর কোন মেডিসিন নিচ্ছি না। তবে গরম পানি, র চা, পানির ভাপ, ভিটামিন সি, ফল-ফলাদি, মধু, কালোজিরা ইত্যাদি চলতে থাকে। 

আমি আবার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতিতেও আস্থা রাখি। একজন অভিজ্ঞ হোমিও ডাক্তারকে ফোন দিলাম। তিনি সব শুনে বললেন, আপনি রিকোভারি করে ফেলেছেন। অসুবিধা নেই, ওষুধ খেতে হবে না। 

দশম দিন সকালে বেলা মোবাইলে মেসেজ আসলো আমার করোনা পজেটিভ এসেছে। এর কিছুক্ষণ পর IEDCR এর রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে একজন ডাক্তার ফোন করলেন। সব কিছু জেনে নিলেন। সবাই যে পরামর্শগুলো দেন তিনিও সেই পরামর্শগুলো দিলেন। ইবনে সিনায় পরিচিত মানুষ থাকার সুবাদে বাসায় খবর চলে যায়। স্বজন ও বন্ধু মহলে হাহাকার পড়ে যায়। 
স্বাদ-গন্ধহীন এক বোরিং আইসোলেশন জীবন চলতে থাকে। মাঝে মাঝে বুকে চাপ ও মাথা ব্যাথা অনুভব হয়। তেরতম দিন থেকে স্বাদ গন্ধ ফিরে পেতে শুরু করি। পনেরতম দিন থেকে আল্লাহর অশেষ রহমতে সুস্থতা লাভ করি। স্বাদ-গন্ধ ফিরে পাই, শ্বাস একদম স্বাভাবিক হয়ে যায়। 

২৪ তম দিনে IEDCR আমাকে অফিসিয়ালি সুস্থ ঘোষণা করে। এখানে একটা বিষয় না বললেই নয়, IEDCR যেভাবে খোঁজ খবর রেখেছে, আন্তরিকভাবে কথা শুনেছে, কাউন্সিলিং করেছে তাতে আমি মুগ্ধ। ১০-২৪ এই পনের দিনে দুজন ডাক্তার পাঁচবার ফোন করেছেন। আমাদের হিস্ট্রিগুলো লিখে রেখেছেন। সাহস দিয়েছেন। সতর্ক রেখেছেন। IEDCR এর প্রতি কৃতজ্ঞতা। 

এর আগে একবার মৃত্যর বিভীষিকা তৈরি হয়েছিল যখন চট্টগ্রামে ওসি প্রদীপ আমাকে গুলি করেছিলো, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সারা জীবনের সামারি রিভিউ করে নিয়েছিলাম। সমস্ত অপরাধ স্মরণ করে তাওবা ইস্তেগফার পাঠ করছিলাম। করোনার এই সময়েও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রায় ছয় ঘন্টা আমার মনে হচ্ছিল এখনই আমি মারা যাবো। লেনদেনের ফিরিস্তি তৈরি করলাম, কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওসিয়ত তৈরি করলাম। যাই হোক এগুলো কাউকে সাবমিট করতে হয়নি। মহান প্রভু আল্লাহ তায়ালা আমাকে সুস্থ করে তুলেছেন।    

অসীম দোয়া, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা আমার মেস মেম্বারদের জন্য। যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটুও হেজিটেশন না করে আমাদের সেবা করেছেন। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো যিনি প্রথমে আক্রান্ত হয়েছে তিনি কিন্তু আমার রুমমেট নন। অথচ আমি ছাড়া মেসের আর কেউ আক্রান্ত হয়নি। ওনার রুমমেটরাও না। এগুলো আসলে আল্লাহর ইচ্ছা। তিনি যাকে ইচ্ছে বিপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। যাকে ইচ্ছে বিপদ না দিয়ে পরিক্ষা করেন। আমরা কতটুকু পাশ করেছি জানিনা তবে আমার মেস মেম্বাররা শতভাগ মার্ক নিয়ে আল্লাহর কাছে উর্ত্তীর্ণ হয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস। 

বহু ভাই, বন্ধু ও আত্মীয় সারাক্ষণ ফোন করে সাথে ছিলেন, দোয়া করেছেন। তাদের জন্য দোয়া ও ভালোবাসা। আল্লাহ তায়ালা এই করোনার কঠিন বিপদ থেকে সবাইকে হিফাযত করুন। মহামারী থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমার রক্তের গ্রুপ বি পজেটিভ। কারো যদি একান্ত প্লাজমা লাগে আমি দিতে প্রস্তুত ইনশাআল্লাহ। সমস্যা একটু আছে, সেটা হলো আমি ডায়াবেটিস আক্রান্ত বেশ কিছু বছর ধরে। এ ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। ইমারজেন্সি সময়ে ডাক্তারের পরামর্শে ডায়াবেটিসকে উপেক্ষা করা যেতে পারে।

1 টি মন্তব্য:

  1. আপনার কষ্টে আমিও ব্যথিত। অাল্লাহর অশেষ মেহেরবানে অাপনি সুস্থ।

    উত্তরমুছুন