১৮ জুলাই, ২০২০

বাংলাদেশের জন্মে ইসরাঈলের ভূমিকা



১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের একদল রুশপন্থী বাম পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে এদেশে ভারত থেকে আসা অবাঙালি মুহাজিরদের ওপর গণহত্যা চালায় ও স্বাধীনতার দাবি তুলে। তাদেরকে বুঝে ও না বুঝে সমর্থন করে প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামীলীগের অধিকাংশ নেতা-কর্মী। 

বামদের এই পরিকল্পনা ও আন্দোলন কিন্তু নির্বাচন উপলক্ষে তৈরি হয়নি। এরা আরো আগে থেকেই গোপনে পাকিস্তান ভেঙে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা চালায়। এদেশের নাম, পতাকা, সংগীত সবটাই নির্বাচনের আগেই তৈরি করা হয়। 

৬৮-তে তারা একবার চেষ্টা চালিয়েছিলো। কিন্তু পাকিস্তান সরকার তাদের হাতে নাতে ধরে ফেলে। মামলা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এই মামলায় শেখ মুজিবসহ অনেককেই আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও সেসময় আওয়ামীলীগ সেই মামলাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তবে এখন তারা স্বীকার করে তারা ভারতের সাথে ষড়যন্ত্র করে দেশ ভাগ করতে চেয়েছিলো। 
যাই হোক পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টোর নেতৃত্বে আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলন চরম জনপ্রিয়তা পায়। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা এই আন্দোলনে বড় নির্যাতনের শিকার হয়। নানান দিক থেকে চিপায় পড়ে আইয়ুব খান। অবশেষে চিপা থেকে উদ্ধার হওয়ার জন্য আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে। 

একাত্তরে যুদ্ধ যখন শুরু হয়ে যায় তখন তাজউদ্দিনরা আন্তর্জাতিকভাবে তিনটি রাষ্ট্রের সহায়তা পায়। ভারত, রাশিয়া এবং ইসরাঈল। ভারত কেন পাকিস্তান ভাঙতে চায় এটা তো একদম স্পষ্ট। রাশিয়া তাজউদ্দিনদের মোরাল সাপোর্ট দেয় কারণ তাজউদ্দিনেরা তাদের আদর্শের অনুসারী। আর বাকী রইলো ইসরাঈল। তাদের সাপোর্টের একটাই কারণ। একটি মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙা মানে মুসলিমদের ক্ষতি। আর মুসলিমদের ক্ষতি মানেই ইসরাইলের খুশি। 

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োগকৃত ভারতীয় গোয়েন্দা ডা. কালিদাস বৈদ্যের বইতে জানতে পারি তাজউদ্দিন ইসরাঈলের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব দেন হোসেন তৌফিক ইমাম বা এইচটি ইমামকে। প্রবাসী সরকারের অনেক কর্মকর্তাই এটিকে ভালো চোখে দেখে নি। সমাজতন্ত্রী ছাড়া যারা শুধু আওয়ামী লীগ তারা কেউই ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছুক ছিল না। তাই প্রবাসী সরকারের সাথে তাদের সরাসরি সম্পর্ক ভালোভাবে তৈরি হয়নি। 

সরাসরি না থাকলেও তাজউদ্দিন ও ইসরাঈলের সাথে সম্পর্কের মধ্যস্থতা করেছেন ভারতের পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার জ্যাকব। মূলত ভারত ১৯৭১ সালের যুদ্ধ করেছিলো জ্যাকবের নেতৃত্বে। ইন্দিরা গান্ধী শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ চালিয়ে বাংলাদেশকে আলাদা করার ব্যাপারে দৃঢ় ছিলো। কিন্তু সেনাপ্রধান মানেক'শ এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে যুদ্ধ জড়াতে চাইছিলো না। 

পাকিস্তানের সাথে মার্কিনীদের সমাজতন্ত্রী বিরোধী সিয়াটো চুক্তি রয়েছে। তাতে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলো যে, কোনো সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র দ্বারা তারা পরষ্পরের কেউ আক্রান্ত হলে উভয়েই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। সেই হিসেবে পাকিস্তান তাদের সমস্যাকে সমাজতন্ত্র সমস্যা হিসেবে বেশি আখ্যায়িত করেছে। এদিকে ভারতও রাশিয়াকে এই যুদ্ধে আমন্ত্রণ জানাতে চায় না। কারণ রাশিয়ার অংশগ্রহণ যুদ্ধকে জটিল করবে এবং আমেরিকা রাশিয়াকে ঠেকাতে সব ধরণের চেষ্টা করবে। 

মানেকশ তাই সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে বাঙালিদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করানোর নীতি গ্রহণ করেছে। এদিকে ইহুদী জ্যাকব ইন্দিরাকে আশ্বস্ত করেন আমেরিকাকে নিষ্ক্রিয় করার ও স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধে পাকিস্তানকে হারাবার সকল পরিকল্পনা তার আছে। জে এফ আর জ্যাকব সম্পর্কে জানতে একটু গুগল করলেই হবে। ২০১২ সালে শেখ হাসিনা তাকে পুরষ্কিত করে। 
জ্যাকব তার চেতনার রাষ্ট্র ইসরাঈলকে ব্যবহার করেন। সেসময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ছিলো গোল্ডা মেয়ার। গোল্ডা মেয়ার আমেরিকাকে নিরপেক্ষ থাকতে রাজি করায়। একইসাথে ইন্দিরা যাতে এই যুদ্ধে স্ট্রং থাকে সেজন্য অস্ত্র সাহায্য পাঠায় গোপনে। সেই গোপন আর গোপন নেই এখন। এগুলো নিয়ে অনেক আর্টিকেল হয়েছে। বইও হয়েছে। গোল্ডা মেয়ার একইসাথে ভারতে অবস্থানরত শরনার্থীদের জন্য বিপুল অর্থ সাহায্য পাঠায়। 

ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো ভারতের সাথে তখন ইসরাঈলের কোনো কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিলো না। তাছাড়া ৭১ সালে ইসরাঈল অর্থনৈতিকভাবেও দুর্বল ছিলো। তবুও গোল্ডা মেয়ার এসব সাহায্য পাঠিয়ে ভারতকে মুসলিমবিরোধী যুদ্ধে চাঙা রাখে এবং এর মাধ্যমে ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু ইন্দিরা সাহায্য গ্রহণ করলেও রাশিয়ার বিরাগভাজন হওয়ার আশংকায় সেসময় কূটনৈতিক সম্পর্কের ইসরাঈলি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। গোল্ডা মেয়ার তাতে রাগ করেনি বরং ভারতকে সাহায্য প্রদান অব্যাহত রাখে।   

এদিকে জে এফ আর জ্যাকব তার পরিকল্পনা অনুসারে ও চেতনারাষ্ট্র থেকে পজেটিভ ইঙ্গিত পেয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে নেমে পড়ে। যুদ্ধে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়। দিল্লি কিংবা মানেক'শর জন্য অপেক্ষা করে না। আত্মসমর্পনের খসড়া প্রস্তাব তার নিজেরই লেখা। সে কীভাবে অল্প সময়ে কৌশলে ব্লাফ দিয়ে আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীকে পরাজিত করেন তা নিয়ে বহু আর্টিকেল আছে। আপনারা গুগল করে পড়ে নিয়েন। এজন্য সে ব্লাফ মাস্টার খ্যাতি পায়। 

এদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে শেখ মুজিবের সামনে ইসরাঈল সম্পর্কের বিষয়টা সামনে আসে। আবার ইসরাঈলের দেওয়া স্বীকৃতি গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত সামনে আসে। তখন শেখ মুজিব ইসরাঈলের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে রাজি হননি। কৌশলী রাজনীতিবিদ শেখ মুজিব মুসলিম বিশ্বের কাছে ঘৃণিত হতে চায়নি। হয়তো তিনি নিজেও মুসলিমদের রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত ইসরাঈলকে মনে প্রাণে অপছন্দ করতেন। তাই শেখ মুজিব আরো একধাপ এগিয়ে ১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্টে লিখে দেন "THIS PASSPORT IS VALID FOR ALL COUNTRIES OF THE WHOLE WORLD EXCEPT ISRAEL"

তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে শেখ মুজিব রুষ্ট ছিলেন। এর মধ্যে এটাও ছিল যে তার ইসরাঈলপ্রীতি। যাই হোক এভাবে একটি মুশরিক রাষ্ট্র ও একটি ইহুদী রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের জন্ম হয়। 

আল্লাহ তায়ালা সূরা মায়েদার ৮২ নং আয়াতে বলেন, অবশ্যই তুমি মানুষের মধ্যে মুমিনদের বড় শত্রু হিসেবে ইহুদী ও মুশরিকদের দেখতে পাবে। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের শত্রু চিনার তাওফিক দান করুন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন