৩১ আগস্ট, ২০২১

বাংলাদেশে গুম সংস্কৃতির এক যুগ


আজ থেকে এক যুগ আগে বাংলাদেশে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসে। এর পরই এদেশেরে নাগরিকদের গুম করে ফেলার এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতি চালু হয়েছে গত এক যুগে। গুমের এই বিভীষিকা বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগে। গত বারো বছরে ৬৪৭ জন মানুষ বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছেন। গুম হয়েছেন। এদের কেউ কেউ ফিরে আসলেও বেশিরভাগেরই কোন হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার, আসক এবং বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা বিশ্লেষন করে পেয়েছি ২০০৯ সালে ৩ জন, ২০১০ সালে ১৮ জন, ২০১১ সালে ৩১ জন, ২০১২ সালে ২৬ জন, ২০১৩ সালে ৫৪ জন, ২০১৪ সালে ৮৮ জন, ২০১৫ সালে ৬৬ জন, ২০১৬ সালে ৯৭ জন, ২০১৭ সালে ৮৬ জন, ২০১৮ সালে ৯৭ জন, ২০১৯ সালে ৩৪ জন, ২০২০ সালে ৩১ জন ও ২০২১ সালে জুন পর্যন্ত ১৬ জন মানুষ গুম হয়েছেন।

এদের বেশিরভাগের পরিবার দাবি করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তুলে নিয়ে গেছে। এরপরে আর হদিস পাওয়া যায় নি। ৬৪৭ জনের মধ্যে অল্প কয়েকজন ছাড়া বাকীদের সবাইকে সরকারি বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। শতাংশের হিসেবে সেটা প্রায় ৯৩%।

গুমের পর নির্যাতন ভোগ করে অল্প কয়েকজন যারা ফিরে এসেছেন তারা চুপ হয়ে গেছেন। কারা গুম করেছিল, কেন গুম করা হয়েছিল, গুম করে কোথায় তাদের রাখা হয়েছিল সে ব্যাপারে ভয়ে কোনো কথা বলতে রাজি না। এর সর্বশেষ উদাহরণ ধর্মীয় আলোচক আবু ত্বহা আদনান। গুগলের 'ফাইন্ড মাই ডিভাইস' এপ ব্যবহার করে তার আইটি টিম জানতে পারে আবু ত্বহার ব্যবহৃত সেলফোন ডিজিএফআই কার্যালয়ে রয়েছে। এটা ব্যাপক প্রচারের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে আজ পর্যন্ত আবু ত্বহা গুমের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের হিসাবে দেশে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজের সংখ্যা আরো বেশি। গুম হওয়া ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনের অভিযোগ, এর সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই জড়িত। এর মধ্যে কেউ কেউ টাকার জন্যও গুম ও খুনের শিকার হচ্ছে।

যারা গুম হয়েছে তাদের বেশিরভাগই রাজনীতির সাথে জড়িত। এর বাইরেও বাংলাদেশে টাকার জন্য অপহৃত হওয়া বা গুম হওয়া নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রায় প্রতিদিনই অনেক মানুষ হারিয়ে যায়। কিছুদিন গুম করে রাখার পর তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই কাজটা আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যেমন করছে তেমনি করছে থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশ।

গুম ও ক্রসফায়ার নিয়ে করা অনুসন্ধানে জানা যায় বাংলাদেশের এমন কোন থানা অবশিষ্ট নেই, যে থানার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি কাউকে গ্রেফতার করে তাহলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে উপস্থাপন করার কথা। অথচ গত দশ বছরে যেসব রাজনৈতিক ব্যাক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের বেশিরভাগকেই তিন-চারদিন গুম করে রেখে তারপর আদালতে হাজির করা হয়েছে। এই সংখ্যা লক্ষাধিক। আর যেসব ব্যক্তি গুম হয়েছেন বা ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন তাদের কথাতো বাদই।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০১৮ সালের ১২ জুলাই আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায় অভিযোগ করেছেন, ২০০৯ সালের পর বিভিন্ন সময় বিএনপির নিখোঁজ হওয়া ৫০০ নেতা-কর্মীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া ১০ হাজারের বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য অনুষ্ঠানে বিএনপি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের হারিয়ে যাওয়া ২৯ নেতা কর্মীর তালিকা প্রকাশ করেছে।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ গুম হওয়ার বেশ কিছু দিন পর তাকে ভারতের শিলংয়ে উদ্ধার করা হয়। কে বা কারা তাকে সেখানে রেখে আসে। তিনি প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। বর্তমানে ভারতে তিনি অবৈধ অনুপ্রবেশের একটি মামলা মোকাবেলা করছেন। অথচ প্রত্যক্ষদর্শীরা দেখেছেন বাংলাদেশের র‍্যাব তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যেতে। জামায়াত নেতা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার একজন সাক্ষীর ব্যাপারেও এমন ঘটনা ঘটেছে।

সুখরঞ্জন বালি নামে এক সাক্ষীকে ডিবি পুলিশ একেবারে প্রকাশ্যে আদালতের সামনে থেকে একটি সাদা গাড়িতে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। এর বহুদিন পর তাকে পাওয়া যায় ভারতের দমদম কারাগারে। ভারতীয় আদালত তাকে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ১১০ দিনের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের উপরের নির্দেশে তার শাস্তির মেয়াদ শেষ হলেও তাকে ছাড়া হয়নি।

এমন ঘটনা বাংলাদেশের মানুষকে ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। একটি জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে এদেশে রাজনৈতিক গুমের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) জড়িত। তাদের মর্জি মতো এদেশের বিরোধীদলীয় রাজনৈতিকদের গুম, ক্রসফায়ার ও গ্রেপ্তার করা হয়।

বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল গুম করা হয়। এটা বেশ আলোচিত গুম। আজ পর্যন্ত তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আলী ও সালাহউদ্দিন আহমেদের গুম হওয়ার আগে বিএনপির মহানগর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম গুম হন। ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল রাজধানীর উত্তরা থেকে গুম হন সিলেটের ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমেদ ও জুনেদ আহমেদ। সাদা পোশাকে একদল লোক তাদের তুলে নিয়ে যায়। আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের গুমও বেশ আলোচিত ঘটনা।

তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকা সফরকালে বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার আমিনুল ইসলাম ও ইলিয়াস আলীর গুমের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। গুমের পর নিহত আশুলিয়ার শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের লাশ পাওয়া গেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের। তাদের ভাগ্যে যে কী ঘটেছে কেউ তা জানে না।

২০১২ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে ‘হানিফ পরিবহন’ বাস থেকে নামিয়ে গুম করে র‍্যাব। দুই ছাত্র ওয়ালীউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের আজ পর্যন্ত কোন খোঁজ নেই। ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল ছাত্রশিবিরের আদাবর থানার সভাপতি হাফেয জাকির হোসেনকে পুলিশ তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত কোন খবর পাওয়া যায়নি।

২০১৬ সালে গুম হওয়া ৯৭টি ঘটনার মধ্যে জামায়াত নেতা গোলাম আযম ও মীর কাসেম আলী এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে যথাক্রমে আমান আজমী, মীর আহমেদ বিন কাসেম ও হুম্মাম কাদের চৌধুরীর কথা বেশ আলোচিত। এই তিনজনকে নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া বহু প্রতিবেদন তৈরি করে। এর মধ্যে হুম্মাম ‘নিখোঁজ হওয়ার’ সাত মাস পর বাড়ি ফেরেন, যাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনিও মুখ বন্ধ করে আছেন।

বিএনপি কর্মী সাজেদুল ইসলাম সুমন, যিনি ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন। ২০১৪ সালের ২৮ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজনৈতিক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে গুম হন ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের ৫ কর্মী। তারা হলেন- সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট মোল্লা, ৭৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি খালেদ হাসান সোহেল, ৭৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি আনিসুর রহমান খান, একই ওয়ার্ডের সহসাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব ও ৮০ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দল সম্পাদক মিঠু। ১১ দিন পর মুন্সীগঞ্জে নিয়ে আনিসুর রহমান, বিপ্লব ও মিঠুকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু এখনও খোঁজ মেলেনি সম্রাট ও খালেদের।

২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর রাজধানীর শিশুপার্ক এলাকা থেকে মাহফুজুর রহমান সোহেল সরকার, বংশাল থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি হাবিবুল বাশাল জহির, ৭১নং ওয়ার্ডের সভাপতি পারভেজ হোসাইন ও ছাত্রদল কর্মী হোসাইন চঞ্চলকে সাদা পোশাকে কে বা কারা তুলে নিয়ে যায়। তারা এখনও নিখোঁজ। একই বছর ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা থেকে ছয়জন নিখোঁজ হন। তারা হলেন- ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন, সুমনের খালাতো ভাই জাহিদুল করিম তানভীর, মাজহারুল ইসলাম রাসেল, মো. আল আমিন ও আসাদুজ্জামান রানা, আবদুল কাদের ভুঁইয়া মাসুম। এদের মধ্যে তিনজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই তালিকা অনেক বড়। শেষ হবার নয়।

২০১৭ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ৩ জুলাই রাজধানীর শ্যামলীর আদাবরের নিজ বাড়ি থেকে ভোর পাঁচটার দিকে প্রখ্যাত কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারকে অপহরণ করা হয়। এর ১৮ ঘণ্টা পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে যশোরের অভয়নগরে একটি বাস থেকে উদ্ধার করে।

এদেশের মানুষ বাঁচতে চায়। এই অসভ্য বর্বর সংস্কৃতি থেকে মুক্তি চায়! এর একমাত্র উপায় হলো স্বৈরাচার হটানো এবং জনগণের মনোনীত শাসন প্রতিষ্ঠা।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন