৫ ডিসেম্বর, ২০২১

খিলাফত পর্ব-০৬ : যেমন ছিল আবু বকর রা.-এর শাসননীতি



সমগ্র আরব ইসলামের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার পর খলিফা আবু বকর রা. এবার সুশাসন নিশ্চিতের দিকে মনোনিবেশ করেন। যদিও তাঁর সময়ে মজলিশে শুরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গঠন হয়নি তবুও তিনি পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতেন। যেসব বিষয়ে রাসূল সা.-এর রায় থাকতো সেসব ব্যাপারে তিনি কম্প্রোমাইজ করতেন না। মজলিশে শুরা বা আধুনিক নাম পার্লামেন্টের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয় উমার রা.-এর শাসনামল থেকে। মুহাম্মদ সা. ও আবু বকর রা. অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞ সাহাবীদের কাছ থেকে পরামর্শ নিলেন। এসময় তাঁদের কিছু কমন পরামর্শদাতা থাকতো আর কিছু আলোচ্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতা থাকতো।  

আবু বকর রা.-এর নিয়মিত পরামর্শ দাতাদের মধ্যে উমার রা. আলী রা. উসমান রা. আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা., মুয়াজ বিন জাবাল রা. উবাই ইবনু কা'ব রা. ও জায়েদ বিন সাবিত রা. ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রায় সকল ক্ষেত্রে তাদের সর্বসম্মত মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রা.-এর খিলাফাত কাল ছিল খুবই অল্প সময়।  দু বছর তিন মাস দশ দিন। এ অল্পসময়ের মধ্যে তিনি বহু বিদ্রোহ দমন ও ইসলামী রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছেন। তাকে পুরো সময় ইসলামী রাষ্ট্রকে সুদৃঢ়করণ এবং বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহের মধ্যে অতিক্রান্ত হতে হয়েছে। 

তারপরেও তিনি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ব্যাপারে ছিলেন পূর্ণ ওয়াকিবহাল। আবু বকর রা. সমগ্র রাষ্ট্রকে বিভিন্ন প্রদেশে ভাগ করে প্রত্যেকটির জন্যে পৃথক পৃথক শাসনকর্তা নিয়োগ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। তিনি ইসলামী হুকুমাতকে ১৯ টি প্রদেশে ভাগ করেন। সেই প্রদেশগুলোতে যোগ্যতা ও পরামর্শের ভিত্তিতে প্রশাসক বা গভর্নর নিযুক্ত করেন। গভর্নরদের নির্দিষ্ট কাজ নির্ধারণ করে দেন এবং নিজেই তাদের কাজের তদারক করতেন।   

১. মদিনা : এটি ছিল রাজধানী। খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রা. নিজেই এখানকার শাসক ছিলেন।  
২. মক্কা : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আত্তাব ইবনু আসিদ রা.। রাসূল সা. তাঁকে নিযুক্ত করেন। আবু বকর রা. তা বহাল রাখেন।   
৩. তায়িফ : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন উসমান ইবনু আবুল আস রা.। তিনিও রাসূল সা. কর্তৃক নিযুক্ত ছিলেন। 
৪. সানা (ইয়েমেন) : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন মুহাজির ইবনু আবু উমাইয়্যাহ রা.। তিনি এ রাজ্য জয় করেন এবং রিদ্দা যুদ্ধ শেষে তাকে এ অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়। 
৫. হাদরামাওত : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন যিয়াদ ইবনু লাবীদ রা.
৬. যাবিদ ও রিমা (ইয়ামান) : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আবু মূসা আল আশ'আরি রা. 
৭. খাওলান : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আ'লা ইবনু আবি উমাইয়্যাহ রা. 
৮. আল-জুন্দ : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন মু'আয ইবনু জাবাল রা. 
৯. নাজরান : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন জারির ইবনু আবদুল্লাহ রা. 
১০. জারাশ : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনু সাওর রা.
১১. বাহরাইন : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আলা ইবনুল হাদরামী রা.
১২. ইরাক : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন মুসান্না ইবনু হারিছাহ রা. 
১৩. হিমস (সিরিয়া) : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা. 
১৪. জর্ডান : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন শুরাহবীল ইবনু হাসানাহ রা.
১৫. দামেশক (সিরিয়া) : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন ইয়াযীদ ইবনু আবু সুফইয়ান রা.
১৬. ফিলিস্তিন : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আমর ইবনুল আস রা. 
১৭ ওমান : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন হুযাইফাহ ইবনু মুহসিন রা.
১৮. ইয়ামামা : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন সালীত ইবনু কায়স রা.
১৯. দুমাতুল জান্দাল : এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন ইয়াদ ইবনু গাম আলফিহরী রা. 

প্রাদেশিক শাসকগণের দায়িত্ব-কর্তব্য :
খলিফাতুর রাসূল আবু বকর রা.-এর শাসনামলে প্রাদেশিক শাসকগণের নিম্নোক্ত দায়িত্ব ছিল 
১. নামায প্রতিষ্ঠা ও ইমামাত। বিশেষ করে জুম'আর দিন নামাযের ইমামাত ও খুতবা প্রদান। 
২. ইসলামী রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং এই সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা যেমন- সেনাবাহিনী গঠন, যোদ্ধাদের মধ্যে গনিমত বন্টন এবং কেন্দ্রে
এক পঞ্চমাংশ প্রেরণ। বন্দী বিনিময় ও সমঝোতা চুক্তি সম্পাদন প্রভৃতি। 
৩. খালীফার পক্ষে বাই'আত গ্রহণ করা। 
৪. প্রয়োজনে বহিঃরাজ্যের সাথে চুক্তি নবায়ন করা। 
৫. রাজ্যে ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার প্রসারের চেষ্টা চালানো। এটি শাসনকর্তাদের একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল। তারা বিজিত রাজ্যসমূহে ইসলাম প্রসার ও ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেন। উল্লেখ্য, অধিকাংশ শাসকই মাসজিদে বসে লোকদের কুরআন ও দ্বীনের বিধি-বিধান শিক্ষা দিতেন। আবার কোথাও কোথাও শাসকগণ এ কাজের জন্য বিভিন্ন লোক নিয়োগ করতেন। 
৬. অভ্যন্তরীণ শাসনকার্য পরিচালনা করা এবং বিচার ও শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করা। 
৭. সাদাকাহ, যাকাত, উশর, খারাজ ও জিজিয়া প্রভৃতি সংগ্রহ ও বন্টন এবং ব্যবসায়িক মালামাল আমদানী-রফতানীর ব্যবস্থাপনা। যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করা 
৮. জনসাধারণের চরিত্র সংশোধনের চেষ্টা করা। 
৯. আল্লাহর বিধান অনুযায়ী দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি প্রদান। হদ জারি করা।  
১০. প্রতি বছর হজ্জে গমনকারী কাফিলার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। 
১১. অধিক বয়স্ক সৈন্যদের বয়স্ক ভাতা এবং তাদের পরিবারবর্গের জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা করা। একইসাথে যুদ্ধাহত ও বিধবা নারীদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা।  
১২. কৃষকদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা এবং যতটুকু সম্ভব এলাকার কৃষির উন্নতির চেষ্টা করা।

রাষ্ট্রের যেকোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যাপারে আবু বকর রা. যেসব বিষয় খেয়াল রাখতেন :
১. রাসূল সা. যাদেরকে যে পদে নিয়োগ দিয়েছেন আবু বকর রা. তা বহাল রাখেন। 
২. যারা রাসূল সা.-এর কাছে বেশি সময় ধরে শিক্ষা নিতে সক্ষম হয়েছেন তাদের প্রাধান্য দিতেন। অর্থাৎ আদর্শিক যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতেন। 
৩. যে পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সেই পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতেন। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিতেন না। যেমন সিরিয়ার একটি যুদ্ধে সাঈদ ইবনে খালিদ রা.-কে তিনি সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। পরামর্শদাতা সাহাবীরা আবু বকর রা.-কে বলেন, সাঈদ আপনার খিলাফতের বিরুদ্ধে থাকা লোক। সে বনু হাশিমকে উত্তেজিত করেছে। আবু বকর রা. এই পরামর্শকে গ্রহণ করেননি। 
৪. রাষ্ট্রের দায়িত্বে নিয়োগের ব্যাপারে তিনি কখনো স্বজনপ্রীতি করেননি। বলাবাহুল্য নিকটাত্মীয় তো দূরের কথা তাঁর গোত্রের কেউ এই সময় রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পায়নি।  
৫. কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সময় আবু বকর রা. বিজ্ঞ সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে দিতেন এবং যাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তার সাথেও আলোচনা করে নিতেন। 
৬. যারা দায়িত্ব পালনের সময় বিশ্বাসভঙ্গ করেছে তাদের ক্ষমা করে দিলেও পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতেন না।      
 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন