১৭ এপ্রিল, ২০২২

খিলাফত পর্ব-২০ : উমার রা.-এর ইরাক অভিযান


আবু বকর রা. ইরাক থেকে খালিদ রা.-কে প্রত্যাহার করে সিরিয়ায় রোমানদের বিরুদ্ধে  পাঠান। খালিদ রা. দায়িত্ব দিয়ে যান মুসান্না রা.-কে। মুসান্না রা.-এর সাথে থাকা সৈন্য ছিল নিতান্ত কম। অন্যদিকে পারসিকদের আক্রমণের আশংকা ছিল খুব বেশি। তাদের রাজার পরিবর্তনের ঝামেলা না থাকলে তারা অবশ্যই আক্রমণ করতো। খলীফা আবু বকর সিদ্দীক রা.-এর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন যাবত মুসান্না রা-এর নিকট কোনো সংবাদ যাচ্ছিল না। তাই তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তিনি এসে দেখলেন, আবু বকর রা. অসুস্থ। তিনি জীবন সায়াহ্নে। তিনি খলীফাকে ইরাক পরিস্থিতি জানালেন। 

খলিফা আবু বকর রা. উমার রা.-কে নির্দেশ করলেন তিনি যেন জনসাধারণকে পারসিকদের বিরুদ্ধে জিহাদে আহবান করেন । আবু বকর রা. ইন্তেকাল করলেন। উমার রা. নতুন  খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করলেন। এরপর উমার রা. আরবের মুসলিমদেরকে ইরাকের জিহাদে অংশগ্রহণের আহ্বান জানালেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যে উৎসাহিত করলেন। এর সওয়াব ও পুরস্কার সম্পর্কেও জানালেন।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে তার আহ্বানে তেমন কেউ সাড়া দিল না। কারণ পারসিকদের শক্তির দাপট এবং যুদ্ধ-নৈপুণ্যের প্রেক্ষিতে কেউই ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে চাইতো না। তিনি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় দিনও যুদ্ধে অংশ নেবার আহ্বান জানান। যথাযথ সাড়া পাওয়া গেল না। সেনাপতি মুসান্না রা. বক্তব্য রাখলেন। তিনি ইরাকের জয় সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করলেন। চতুর্থ দিনের আহ্বানের পর সর্বপ্রথম সাড়া জোরালোভাবে সাড়া দেন এবং যুদ্ধে যেতে সম্মতি দেন আবু উবাইদ ইবনে মাসউদ সাকাফী। এরপর একের পর এক লোকজন সাড়া দিতে শুরু করেন।

অবশেষে ইরাকের জন্য বাহিনী গঠিত হলো। সেনাপতির দায়িত্ব দেন আবু উবাইদ আস সাকাফিকে। তিনি কিন্তু সাহাবী ছিলেন না। তাই কেউ কেউ উমার রা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো সাহাবীকে আপনি প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করলেন না কেন? তিনি বললেন, সর্বপ্রথম যে সাড়া দিয়েছে আমি তাকেই প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেছি। আপনারা তো দ্বীনের সাহায্যে সবার আগে এগিয়ে এসেছেন। আর এই ঘটনায় এই লোক আপনাদের সবার আগে এগিয়ে এসেছে। সবার আগে সাড়া দিয়েছে। এরপর খলীফা উমার রা. আবু উবাইদা সাকাফীকে ডেকে ব্যক্তিগতভাবে তাকওয়া অবলম্বন ও সাথী মুসলিম সৈন্যদের কল্যাণ কামনার উপদেশ দিলেন। সকল কাজে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ দিলেন। সালিত ইন বাশিরের সাথেও পরামর্শ করার কথা বললেন। কারণ তাঁর রয়েছে যুদ্ধ সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা। তিনি সরাসরি বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবু উবাইদ আস সাকাফি সাত হাজারের একটি বাহিনী নিয়ে ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। 

এদিকে ইরাকের যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে উমার রা. খালিদ রা.-এর সাথে সিরিয়ায় যাওয়া সৈন্যদের আবার ইরাকে ফেরত পাঠানোর জন্য আবু উবাইদা রা.-কে চিঠি লিখলেন। আবু উবাইদা রা. হাশিম ইবন উতবাকে নেতা মনোনীত করে দশহাজার সৈন্যের একটি বাহিনী ইরাকে প্রেরণ করেন। মুসলিম বাহিনী যখন ইরাক পৌঁছে তখন পারসিকগণ তাদের রাজা-রাণী মনোনয়ন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। অবশেষে বুরান বিনতে কিসরাকে ক্ষমতায় বসায়। রাণী বুরান সেনাপতি রুস্তমের নিকট দশ বছরের জন্যে রাজত্ব হস্তান্তর করে এই শর্তে যে, সে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। এরপর রাজত্ব ফিরে আসবে কিসরার বংশধরদের নিকট। রুস্তম তা মেনে নেয়। 

এই রুস্তম ছিল একজন জ্যোতিষি। জোত্যিষ ও জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে তার ছিল পর্যাপ্ত জ্ঞান । একদিন তাকে বলা হয়েছিল, আপনি জানতেন যে, এই রাজ আর পূর্ণতা পাবে না, স্থায়ী হবে না। তবু এটি গ্রহণে কীসে আপনাকে উৎসাহিত করলো? তিনি বলেলেন, ‘লোভ-লালসা এবং মর্যাদা লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাকে এটি গ্রহণে উৎসাহিত করেছে। 

সেনাপতি রুস্তম কমান্ডার জাবানকে সেনাপতির দায়িত্ব প্রদান করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করেছিল। পারসিকরা নামারিক নামক স্থানে সেনাপতি আবু উবাইদ আস সাকাফির মুখোমুখি হয়। নামারিক হলো হীরা ও কাদেসিয়া নগরীর মধ্যবর্তী একটি স্থান। মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন মুসান্না ইবন হারিস। নামারিকে উভয়পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। অবশেষে আল্লাহর সাহায্যে মুসলিমদের বিজয় আসে। 

পরাজিত মুশরিক বাহিনী কাসকায় আশ্রয় গ্রহণ করে। ওখানের শাসক ছিল কিসরার আত্মীয়। তার নাম নারসি। নারসির নেতৃত্বে মুশরিকরা আবারো মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। আবু উবাইদ তাদের ওপর আক্রমণ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। এই যুদ্ধে প্রচুর ধন-সম্পদ মুসলিমদের হস্তগত হয়। এর এক পঞ্চমাংশ মদিনায় পাঠানো হয়। 

নামারিকের দুর্দশার খবর পেয়ে রুস্তম জালিনুসের নেতৃত্বে আরেকটি সেনাদল পাঠায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে। জালিনুস আসার আগেই কাসকায় নারসি পরাজিত হয়। এরপর বারুসমা নামক স্থানে জালিনুসের সাথে আবু উবাইদের নেতৃত্বে মুসলিমদের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে জালিনুস পরাজিত হয়ে মাইনে পালিয়ে যায়। নারসিও মাইনে গিয়ে পৌঁছে। আবু উবাইদ সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে সীমান্তে প্রেরণ করেন। তাঁরা অবস্থাভেদে আশে পাশের সমস্ত মুশরিক গোষ্ঠীকে নতি স্বীকারে বাধ্য করলো। কেউ কেউ যুদ্ধ না করে সন্ধি করলো। সবাই জিজিয়া দিতে সম্মত হলো। 

এভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে পারসিক মুশরিকদের তিনটি বাহিনী পরাজিত হয়। এতে তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে মুসলিমরা আল্লাহর সাহায্য পেয়ে উজ্জীবিত হয়ে উঠলো। 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন