১৯ জুলাই, ২০২২

একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ

১৯৭১ সালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত অনেক খুব পড়ে যায়। রাজনীতি করার অধিকার হারিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। আওয়ামীলীগের পতনের পরে আস্তে আস্তে জামায়াত রাজনীতিতে ফিরে আসতে শুরু করে।

১৯৮৪ সালে জামায়াত প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলার প্রস্তাব দেয় রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে। কারন সে সময়ের ধূর্ত শাসক লে জে হু মু এরশাদের অধীনে নির্বাচন কারো পক্ষে মানা সম্ভব ছিল না। জামায়াতের এই ফর্মুলা সেসময় সরকারি দলতো গ্রহন করেইনি। বিরোধী দলের মধ্যেও কেউ গ্রহন করেনি। একই ফর্মূলা সকল বিরোধী দল গ্রহন করেছে ১৯৮৯ সালে। সকল বিরোধী দল তখন এই ফর্মূলা বাস্তবায়নের জন্য যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। তারই প্রেক্ষিতে গণঅভ্যুত্থান হয় এরশাদের পতন হয়। 


১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ফর্মুলাতে নির্বাচন হয়। বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পায় তবে অল্পের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা মিস করে। জামায়াত ১৮টি সিট পায়। এটা ছিল খুবই চমকপ্রদ ঘটনা। জামায়াত বিএনপিকে সমর্থন দেয়, বিএনপি সরকার গঠন করে। এর কিছুদিন পরই সংসদে দাবী উঠে এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার। আওয়ামীলীগ এই দাবী উত্থাপন করে। বিএনপি এই দাবী প্রত্যাখ্যান করে। এই নিয়ে জামায়াত বিএনপিকে রাজী করানোর চেষ্টা করে। সেই সময় সংসদে মাওলানা নিজামী খালেদাকে বলেন আমরা মোটেই আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে ইচ্ছুক নয়। আমরা দেশগঠনে আপনাকে সহায়তা করতে রাজি। কিন্তু আপনি জোর করে আমাদের আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে বাধ্য করবেন না। কিন্তু সেই সময়ের খালেদা জিয়া সেটা মেনে নিতে অসম্মত হয়। জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আন্দোলন করে। আওয়ামীলীগও একই দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করে। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু যতটা না আওয়ামীলীগের তার চাইতে বেশী জামায়াতের। 

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মানতে বাধ্য হয় বিএনপি। ১৯৯৬ তে দু'বার নির্বাচন হয়। ১ম বার সকল বিরোধী দল বয়কট করে। পরবর্তিতে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হয়। জামায়াত এই নির্বাচনে মাত্র ৩ টি আসন পায়। আগের ১৫ টি আসন হাতছাড়া হয়। এতে জামায়াতের মধ্যে ব্যাপক কথাবার্তা হয়। অনেকে মনে করতে থাকে জামায়াত পতনের মুখে চলে এসেছে। 

এই পরিস্থিতিতে আব্বাস আলী খান একটি বই লিখেন। তিনি সেখানে একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ কী হতে পারে এবং তা থেকে বাঁচার কী উপায় হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। বইটির নাম 'একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ : তার থেকে বাঁচার উপায়। আব্বাস আলী খান তখন ছিলেন জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমীর। 

বইটি ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয়। দলের সাফল্যের জন্য যেমন কারণ থাকে, পতনের জন্যও তেমনি কারণ থাকে। কর্মীকে জানতে হয় কি কি কারণে পতন হয় এবং কীভাবে তা থেকে বাঁচা যায়। জামায়াত একটি আদর্শিক দল বিধায় এই বইটি তাদের জন্য গাইড বুক হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

লেখক আব্বাস আলী খান প্রথমে একটি আদর্শবাদী দলের স্বরূপ কেমন হবে তা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি এখানে যেটা বুঝাতে চেয়েছেন তা হলো একটি আদর্শবাদী দলের পতন তখনই হয় যখন সেই দল তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়। রাজনৈতিক জয় পরাজয় মূখ্য বিষয় নয় বরং আদর্শের সাথে সংগতি রাখাই বেসিক ব্যাপার। এরপর লেখক জামায়াত প্রতিষ্ঠার পটভূমি আলোচনা করেন। দারুল ইসলাম ট্রাস্ট গঠন ও ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্যে দল গঠনের ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা বলেন। 

একটি দলের উন্নতি, অগ্রগতি ও সাফল্যের পেছনে যেমন কিছু কারণ থাকে, তেমনি বিকৃতি ও পতনের পিছনেও কিছু কারণ থাকে। যেহেতু কোন দলই চায় না যে, দলের বিকৃতি ও পতন ঘটুক, সেহেতু কারণগুলো ভাল করে জেনে নিয়ে তা সৃষ্টির আগেই প্রতিরোধ করতে পারলে বিকৃতি ও পতন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

আব্বাস আলী খানের মতে জামায়াতের বিকৃতি ও পতন হবে ১৩টি কারণে

১. জামায়াতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহন না করা।
২. কুরআন হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন না করা ।
৩. সময় ও আর্থিক কুরবানীর প্রতি অবহেলা ।
৪. দলীয় মূলনীতি মেনে না চলা ।
৫. দলের ভেতরে ও বাইরে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করা।
৬. ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব।
৭. পারষ্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়া
৮. জামায়াত ইসলামী দল হিসেবে তার প্রকৃত পরিচয় হারিয়ে ফেলে এবং নিষ্ক্রিয় ও প্রাণহীন হয়ে পড়া।
৯. জনশক্তির মধ্যে নৈরাশ্য ও হতাশা সৃষ্টি হওয়া।
১০. নেতৃত্বের অভিলাষ বা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া। 
১১. অর্থ-সম্পদের প্রতি লালসা তৈরি।
১২. জীবন মান উন্নত করার প্রবণতা।
১৩. সহজ সরল জীবন যাপন না করা।

লেখকের মতে জামায়াত তার পতন থেকে বাঁচতে পারে ১২ টি উপায়ে  

১. নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন।
২. অতিরিক্ত জিকির আজকার।
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কাজ করা।
৪. আত্মসমালোচনা।
৫. ক্রোধ দমন করা।
৬. মৌলিক বিষয়ে একমত পোষণ করা।
৭. বিরোধী পরিবেশ পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া।
৮. নেতৃত্বে দুর্বলতা পরিহার।
৯. নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা আন্দোলনের পতন ডেকে আনে।
১০. সমস্যার ত্বরিত ও সঠিক সমাধান।
১১. ত্যাগ ও কুরবানীর জন্য প্রস্তুত থাকা।
১২. বাইতুলমালে আমানতদারীতা ও সততা।

লেখক শেষে এসে বলেছেন নিয়মিত হকের দাওয়াত দেওয়া অপরিহার্য। এটা পতন থেকে বাঁচার কার্যকর পন্থা। আর দাওয়াত দাতার মধ্যে যেসব গুণ থাকা দরকার তা অর্জন করার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। তিনি আরো বলেন, পতনের অন্যতম কারণ হলো, নিয়মিত দ্বীনি সাহিত্য পড়াশুনা বন্ধ হওয়া। তাফহীম, সীরাতে সরওয়ারে আলম, রাসায়েল মাসায়েল, মাওলানার অন্যান্য বই না পড়ার পরিণাম। এর ফলে চিন্তার ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয় এবং ঐক্যের অভাব ঘটে। নৈরাশ্য, অবসাদ, ক্লান্তি, আন্দোলন বিমুখতা ও নিষ্ক্রিয়তা আসে।

#বুক_রিভিউ 
বই : একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ : তার থেকে বাঁচার উপায়
লেখক : আব্বাস আলী খান 
প্রকাশনী : প্রকাশনা বিভাগ, জামায়াতে ইসলামী। 
পৃষ্ঠা : ৪০
মুদ্রিত মূল্য : ১৮
জনরা : থিয়োলজি


0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন