১৮ ডিসে, ২০২৩

১৮ ডিসেম্বর || শহীদ ইমরান ও পল্টন গণহত্যা



আজ ১৮ ডিসেম্বর। শহীদ মুস্তফা শওকত ইমরান ভাইয়ের শাহদাতবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে তিনি শাহদাতবরণ করেন। মহান রাব্বুল আলামীন জানিয়েছেন তিনি শহীদদের জীবিত রাখেন ও রিজিক দেন। আজ অর্ধশত বছর পর আমরা তাঁকে স্মরণ করছি যখন তাঁর অনুসারী অনুজরাই তাঁকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল। অবশ্য তা বাধ্য হয়ে করেছিল। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতায় কালক্রমে তা হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু ঐ যে শহীদের রক্ত! এটা তো মুছা যাবে না। রক্ত কথা বলবেই!

মুস্তফা শওকত ইমরান ভাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘ, ঢাকা শহর শাখার সেক্রেটারি মনোনীত হন। সভাপতি নির্বাচিত হন শামসুল হক ভাই। ১৯৭১ সালের শেষ দিকে শামসুল হক হক ভাই নিখোঁজ হওয়াতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন ইমরান ভাই।

৭১ সালের ডিসেম্বরে মুশরিকদের সহায়তায় তাদের এদেশীয় দালাল ও সমাজতন্ত্রীরা গণহত্যা শুরু করে। প্রথমেই আঘাত আসে চীনপন্থী সমাজতন্ত্রীদের ওপর যারা ভৌগলিক রাজনীতির কারণে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে ছিল। ১৪ ডিসেম্বর তাদের একটি বড় অংশকে খুন করা হয়।

এরপর আঘাত আসে ইসলামপন্থীদের ওপর। আর এর প্রধান শিকার হয় জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘ। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে পল্টন ময়দানে নিয়ে আসা হয়। এর মধ্যে ছিলেন ঢাকা শহরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুস্তফা শওকত ইমরান ভাই।

১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের পল্টন গণহত্যার খুনীরা ইমরান ভাইকে দিয়ে তাদের রক্তখেকো চরিত্রের উন্মোচন করে। ইমরান ভাইকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। একইভাবে প্রায় তিনশত ইসলামপন্থী মানুষকে হত্যা করে। এর মধ্যে পঁচাত্তর জনের মতো ছিল জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মী।

এই গণহত্যার মাস্টার মাইন্ড ছিল ক্র্যাক প্লাটুন। ক্র্যাক প্লাটুন তৈরি হয় খালেদ মোশাররফ ও এটিএম হায়দারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। এই বাহিনীর সদস্যরা ভারতের মেলাঘর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ নেতা মায়া, বিচ্চু জালাল, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, গোলাম দস্তগীর গাজীসহ ৩৪ জন ছিল এই ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য। খালেদ মোশাররফ ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া তার সন্ত্রাসী বাহিনীকে দিয়ে ১৮ ডিসেম্বরের পল্টন গণহত্যা ঘটায়।

যেভাবে শহীদ হন মুস্তফা শওকত ইমরান ভাই!
ছাত্রসংঘের তৎকালীন সদস্য তৌফিক ইলাহী জানিয়েছেন, "তখন যুদ্ধ শেষের দিকে। একদিন ছাত্রসংঘের দপ্তরে একটা ফোন আসে। অপর পাশ থেকে কথা শুনতে শুনতে মোস্তফা শওকত ইমরান হেসে উঠলেন। জবাব দিলেন, "জনাব! মরণকে ভয় পাই না। ওকে সামনে দেখেও এভাবেই হাসি, যেভাবে আপনি শুনছেন।" ঘটনা কী, জানতে চাইলাম। জানালেন তার এক আওয়ামী আত্মীয় তাকে ফোন দিয়েছিল। বলে, "তোমার মৃত্যুর সময় খুব কাছে।"

এরপর ১৫ ডিসেম্বরের রাত এলো। যে রাত কখনো ভুলবার নয়। দশটার দিকে ঢাকা জামায়াতের আমীর খুররম জাহ মুরাদ সাহেবের ফোন আসে। তিনি বললেন, সিদ্দিক বাজার অফিসে চলে আসো। শওকত ইমরান আমাকে সাথে নিয়ে জিপে রওনা দিলেন। ওখানে পৌঁছতেই খুররম সাহেব বলেন, "সেনাবাহিনী যদিও স্বীকার করছে না, তবে আমার মনে হচ্ছে এরা নিশ্চিত অস্ত্র সমর্পণ করে দিবে।"

তার পরামর্শ নিয়ে আমরা প্রথমে এক সাবেক প্রাদেশিক সভাপতির বাড়ি গেলাম। তাঁর ছেলেমেয়েদের সুরক্ষিত স্থানে রাখার জন্য গেলাম গুলশান এলাকায়। ঘরে ফিরি রাত তিনটায়। ঘরে ফিরেই আমি বললাম, "ইমরান ভাই, আপনি খুব ক্লান্ত। কিছুক্ষণ আরাম করে নিন।" তিনি গা এলিয়ে দিলেন। একই কামরায় আল বদরের আরও কয়েকজন সাথীও ঘুমাচ্ছিল।

ফজরের আজান শুনে যেন ঘুম ভাঙলো এক মর্মান্তিক সকালের। নামাজ পড়ার পর ইমরান ভাই আর আমি কর্নেল হিজাযী সাহেবের কাছে গেলাম। তিনি সিভিল পোশাকে জায়নামাজ বিছিয়ে তসবিহ তাহলিল করছিলেন। আমরা তাকে অস্ত্র সমর্পণের খবরের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, "বাবা, ব্রিগেডিয়ার বশির বলতে পারবেন।" বশির সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, "এরকমই কথা চলছে। আপনারা চাইলে আমাদের সাথে থাকতে পারেন, আমাদের যা পরিণতি হবে তা আপনারাও সইলেন। বাকি সিদ্ধান্ত আপনাদের।"

আমরা ওখান থেকে ধানমণ্ডি আল বদর ক্যাম্পে চলে আসি। সবাইকে পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করলাম। এর মধ্যেই খবর পেলাম যে মোহাম্মদপুর থানা থেকে একটা গ্রুপ আমাকে গ্রেফতার করতে আসছে। ইমরান ভাই আমাকে বললেন, "আপনি দ্রুত জিপ নিয়ে এখান থেকে বের হোন।" আমি রাজি হচ্ছিলাম না। কারণ এই মুহূর্তে ঢাকাতে আমাদের ১১টি ক্যাম্পে এক হাজারের বেশি আল বদর ক্যাডেট অবস্থান করছে। তাদের না সরিয়ে আমি কিভাবে সরে যেতে পারি! আমার কথা যেন তিনি শুনলেনই না। বাহু ধরে টেনে জোর করে আমাকে জিপে উঠিয়ে ড্রাইভারকে হুকুম দিলেন, "দ্রুত নিয়ে যান।"

আমি চলে আসার পর ওখানে দায়িত্বশীল শুধু ইমরান ভাই ছিলেন। এরই মধ্যে সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। ইমরান ভাই পুরো দায়িত্বশীলতার সাথে সকল সাথীকে বিভিন্ন দিকে হিজরত করার জন্য পরামর্শ দিয়ে অন্য ক্যাম্পে রওনা হলেন। কিন্তু রাস্তায় একটা দুর্ঘটনায় উনার হাতে মারাত্মক জখম হয়। খুব কাছেই তার বোনের বাড়ি ছিল। কিন্তু দুলাভাই দোশ নওয়াজ ভাসানীর 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি'র কর্মী। ওখানে আশ্রয় হলো না। তিনি চলে গেলেন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। কিন্তু সেটা তার জন্য সুরক্ষিত ছিল না। কারণ তিনি মেডিকেলেরই শিক্ষার্থী ছিলেন। আর এটাই তার কাল হয়ে দাঁড়াল। হাসপাতালের এক কর্মচারী তাকে চিনে ফেলে, খবর চলে যায় দুশমনের কাছে। কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা সংগঠক (পরবর্তীতে ড. কামালের নেতৃত্বাধীন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক) সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী তাকে তুলে নেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (যা এখন সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নিয়ে যাওয়া হলো ইমরান ভাইকে। ওখানে মৌলবী ফরিদ আহমদ ও ছাত্র সংঘের কর্মী আজিজুল ইসলামের উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। দুই দিন ইমরান ভাইকে ওখানেই রাখা হলো। এ সময়ে মৌলবী ফরিদ আহমদ শহীদ হন। তার পরনে শুধু একটা গেঞ্জি আর লুঙ্গি ছিল। নামাজের জন্য যখনই পানি চাইতেন, মুক্তি বাহিনী তাকে পেশাব ভরা গ্লাস ধরিয়ে দিত। (লেখার শেষ দিকে মৌলভী ফরিদ আহমদের পরিচয় তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ।)

১৮ তারিখ দুশমনরা ইমরান ভাইকে প্রথমে টিএসসি নিয়ে যায়। সেখান থেকে আধা ঘন্টা পর জিপে তুলে নিয়ে যায় হাতিরপুল। এখানে মুক্তিবাহিনীর একটা জটলা ছিল। ইতোমধ্যেই চালানো নির্যাতনের কারণে ইমরান ভাইয়ের মাথায় ক্ষত হয়েছিল। মাথায় বাঁধা রুমালটাও তখন ভেজা, রক্তাক্ত। জিপ থেকে নামাতেই আরেক দফা নির্যাতন শুরু হয়। সর্বশেষ ওনাকে নিয়ে যাওয়া হয় পল্টন ময়দানে।

মুক্তি সন্ত্রাসীরা তাকে আঘাত করছিল আর বলছিল 'জয় বাংলা' বলতে। প্রতিটি আঘাতের জবাবেই ইমরান ভাই আরও শক্তি নিয়ে বলে উঠছিলেন 'আল্লাহু আকবার' 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ'। তার মুখ থেকে আল বদর সম্পর্কে কোন তথ্য বের করা গেল না। সন্ত্রাসীরা রাগে, উন্মত্ততায় নরপিশাচে রূপ নিল। ব্লেড দিয়ে জখম করে করে গায়ে লবণ মাখানো হলো। তবুও আমানতের হেফাজত করেছেন ইমরান। নির্যাতনের পরিমাণ এত বেড়ে গেছিল যে যেন তার নিশ্বাস কমে আসছে। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ হচ্ছিল, গলা শুকিয়ে হয়তো কাঁটা হয়ে যাচ্ছিল। 'পানি' বলে চিৎকার করে উঠলেন তিনি। তার গলার কম্পিত আওয়াজে শয়তান যেন শান্তি পেল। একজন গ্লাসে পেশাব করে তা ইমরানের মুখের কাছে ধরে। তিনি চোখ খুলেই ধাক্কা দিয়ে গ্লাস ফেলে দিলেন।

ইমরান ভাই প্রচণ্ড তৃষ্ণায় নিজের বাম হাতের আঙুল মুখে নিয়ে রক্ত চুষতে লাগলেন। কিন্তু মুহুর্তেই তা ফেলে দিলেন। তার চোখ এখন বন্ধ হয়ে আসছে। এক মহিয়ান মঞ্জিলের দিকে তিনি সফর করতে যাচ্ছেন। তার জবান বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু কোন তথ্যই তিনি দিচ্ছেন না। ফলে প্রমাণিত হচ্ছিল তার বুক ইসলাম ও পাকিস্তানের মুজাহিদদের গোপনীয়তার দুর্গ। তাই এত নিপীড়নের পরও তার এত 'সহজ' মৃত্যু সহ্য হচ্ছিল না আধিপত্যবাদী গুন্ডাদের। তাদের একজন চাকু দিয়ে ইমরান ভাইয়ের বুকে 'জয় বাংলা' খোদাই করতে উদ্যত হলো। এই যন্ত্রণায় ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করলেন মোস্তফা শওকত ইমরান। আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...

কিন্তু ম্রিয়মাণ এই কালেমার আওয়াজও ইসলাম দুশমন মুক্তিযোদ্ধাদের সহ্য হয়নি। তার কলেজেরই এক ছাত্রলীগ কর্মী বুকে চাকু দিয়ে গভীর আঘাত করে দুই হাতে বুক চিরে কলিজা বের করে আনে। ঠিক যেভাবে ইসলামের দুশমনরা শহীদ হামজা রা.-এর কলিজা চিরে বের করেছিল। পল্টন ময়দান যেন উহুদের মাঠ। ইমরান ভাই এভাবে শাহদাতের নজরানা পেশ করেছিলেন মহান রবের দরবারে। তার কর্মীদের আর আন্দোলনের গোপনীয়তা জীবন দিয়ে রক্ষা করেছেন। দ্বীন প্রতিষ্ঠার কর্মীদের জন্য দুর্গম দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন শহীদ মোস্তফা শওকত ইমরান। ইসলামের ইতিহাসে ত্যাগ আর কুরবানির যে সিলসিলা, তা রক্ষা করেই ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা আরও একবার উজ্জ্বল হলো তার রক্তে।"

[ নির্যাতনের বিস্তারিত তৌফিক ইলাহীকে জানিয়েছেন ইমরান ভাইয়ের ওপর নির্যাতনে অংশ নেওয়া মুক্তিবাহিনীর সদস্য ড. জামিল উজ জামান। তিনি আজিমপুরে থাকতেন। ইমরান ভাইয়ের শাহাদাত তাকে ইসলামী আন্দোলনের পথ দেখায়। ]

পল্টন গণহত্যা
পল্টন ময়দানের এই গণহত্যায় ক্র্যাক প্লাটুন, মুজিব বাহিনী, খালেদ মোশাররফের সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি আরেকজন সন্ত্রাসীর নাম উল্লেখযোগ্য, সে হলো যুদ্ধাপরাধী কাদের সিদ্দিকী। সে ও তার অনুসারীরা ছিল বর্বর ও হিংস্র। তারা যুদ্ধের আগে ডাকাতি করতো। ক্র্যাক প্লাটুনের লোকদের গ্রেফতার করা শত শত নিরস্ত্র ও বেসামরিক মানুষকে হিংস্র ও বর্বরভাবে খুঁচিয়ে হত্যা করে কাদের সিদ্দিকী ও তার দল।

১৮ ডিসেম্বর সারাদেশে কয়েকশত জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীকে শহীদ করা হয়। একইসাথে নেজামে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ঢাকার অনেক মসজিদের ইমাম এবং অনেক কওমী মাদ্রাসায় হাজারো শহীদের রক্তের স্রোত বইয়ে দেওয়া হয়।

১৮ ডিসেম্বরে শহীদ ইমরান ভাইদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইতালির বিখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফ্যালাসি শেখ মুজিবের সাথে দীর্ঘ বাকযুদ্ধে লিপ্ত হন।



ফ্যালাসি ১৮ ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ডকে ম্যাসাকার হিসেবে উল্লেখ করে মুজিবের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মুজিব বলে,
//- ম্যাসাকার? হোয়াট ম্যাসাকার?
- ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকান্ডটি।
- ঢাকা স্টেডিয়ামে কোন ম্যাসাকার হয়নি, তুমি মিথ্যে বলছো।
- মিঃ প্রাইম মিনিস্টার। আমি মিথ্যাবাদী নই। সেখানে আরো সাংবাদিক ও হাজার হাজার লোকের সাথে আমি হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছি। আপনি চাইলে ছবি দেখাতে পারি। আমার পত্রিকায় সে ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
- মিথ্যেবাদী, ওরা মুক্তিবাহিনী নয়।
- মিঃ প্রাইম মিনিস্টার দয়া করে মিথ্যেবাদী শব্দটা আর উচ্চারণ করবেন না, তারা মুক্তিবাহিনী তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল আবদুল কাদের সিদ্দিকী।
- তাহলে হয়তো তারা রাজাকার ছিল, যারা প্রতিরোধের বিরোধীতা করেছিল এবং কাদের সিদ্দিকী তাদের নির্মূল করতে বাধ্য হয়েছিলো।
- মিঃ প্রাইম মিনিস্টার, কেউ প্রমাণ করেনি যে, লোকগুলো রাজাকার ছিল এবং বিরোধীতা করেছিল। তারা ভীতসন্ত্রস্ত্র ছিল, হাত-পা বাঁধা ছিল তারা নড়া ছড়াও করতে পারছিলোনা।
-মিথ্যেবাদী
- শেষবারের মত বলছি, আমাকে “মিথ্যাবাদী” বলার অনুমতি আপনাকে দেবো না।
- আচ্ছা সে অবস্থায় তুমি কি করতে?
- আমি নিশ্চিত হতাম, ওরা রাজাকার এবং অপরাধী, তারপর ফায়ারিং স্কোয়াডে দিতাম এবং খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এভাবে ঘৃন্য হত্যাকাণ্ড এড়াতাম।
- ওরা এভাবে করেনি, হয়তো আমার লোকেদের কাছে বুলেট ছিলনা।
- হ্যা তাদের কাছে বুলেট ছিল। প্রচুর বুলেট ছিল, এখনো তাদের কাছে প্রচুর বুলেট রয়েছে। তা দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গুলি ছোঁড়ে। ওরা গাছে, মেঘে, আকাশে, মানুষের প্রতি গুলি ছোঁড়ে শুধু আনন্দ করার জন্য।//

যতদূর জানতে পেরেছি অর্থাৎ পুরাতন লোকদের কাছ থেকে শুনেছি বেয়নেট দিয়ে ইমরান ভাইয়ের বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করে সেই রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ড নিয়ে উল্লাস করেছে গণহত্যাকারী, যুদ্ধাপরাধী বর্বর খালেদ মোশাররফের ক্র্যাক প্লাটুন ও কাদের সিদ্দিকীর ডাকাত দল। সেই ক্র্যাক প্লাটুনের গাজী দস্তগীর এখনো খুন করে যাচ্ছে। যতদূর জানা যায় গাজী দস্তগীরের সর্বশেষ শিকার ফারদিন নামের এক সাধারণ বুয়েট শিক্ষার্থী।





ইমরান ভাইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

মোস্তফা শওকত ইমরান ভাই ফেনী শহরে এক বিত্তবান পরিবারে জন্ম নেন। শৈশব থেকেই তিনি নম্র-ভদ্র হিসাবে বেড়ে উঠেছিলেন। কিন্তু বাবা ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা। ফলে ঘরে রাজনীতি চর্চা হওয়ায় তখন থেকেই দুর্বার সাহসীও হয়ে ওঠেন শওকত ইমরান। স্কুল জীবন থেকেই বিভিন্ন বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। পরবর্তীতে মেডিকেল শিক্ষার্থী হলেও ইতিহাসের উপর তার অসামান্য দক্ষতা ছিল।

স্কুল জীবনেই ছাত্র সংঘের দাওয়াত পেয়েছিলেন তিনি। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। এখানে এসে ইসলামী ছাত্রসংঘে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৬৮ সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেন। চার মাস সদস্য প্রার্থী থাকার পর নভেম্বরে সদস্য হন। ১৯৬৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছর প্রথমে প্রাদেশিক শুরা সদস্য এবং পরের বছর কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন তিনি। সর্বশেষ ১৯৭১ সালের অক্টোবরে তিনি ঢাকা শহরের সেক্রেটারি মনোনীত হন। যুদ্ধ চলাকালে দেশ রক্ষায় ঢাকা আল বদরের তিনটি কোম্পানিতেই তিনি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শহীদ ইমরান ভাইয়ের পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকায় মাওলানা আবুল আ'লা মওদূদী ও অধ্যাপক গোলাম আযমের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন। বাবা ছেলেকে জামায়াতের থেকে কিনেও নিতে চেয়েছিলেন। একবার মোস্তফা শওকত ইমরানকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, "মোস্তফা, মাওলানা মওদূদী তোমাকে কত টাকায় কিনেছে? তুমি যদি মওদূদী আর গোলাম আযমের ক্রীতদাস হয়ে থাকো, তাহলে আমি প্রতিটি উপায়ে তোমাকে মুক্ত করতে চাই। নিজের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে, এমনকি নিজের শরীরের চামড়া দিয়ে জুতা বানিয়ে হলেও তোমাকে গোলামী থেকে মুক্ত করতে চাই।"

এসব কারণে শওকত ইমরান পরিবারের চিঠি এড়িয়ে যেতেন। ঘন ঘন বাড়ি যাওয়াও তার পছন্দ ছিল না। তৌফিক ইলাহী চিঠির ব্যাপারটা খেয়াল করে তাকে পড়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। তখন তিনি নিজেই চিঠি খুলে তৌফিক ইলাহীকে পড়তে দেন। উপরোক্ত চিঠি পড়ার পর তৌফিক বুঝতে পারেন পরিস্থিতি। শওকত ইমরান তখন বলেন, "আমি আব্বা-আম্মার সাথে বেয়াদবি করতে চাই না। এ জন্য চিঠি খুলে দেখি না। সবর করি। কারণ, মনে হয় এই চিঠিগুলো আমাকে আব্বা-আম্মার অবাধ্য করাবে অথবা সরিয়ে দিবে ইসলামী আন্দোলন থেকে।" শাহাদাতের পর মোস্তফা শওকত ইমরানের বাবা ও ছোট ভাই জামায়াতে ইসলামীর সাথে যুক্ত হন।

ইমরান ভাইয়ের ব্যাপারে শহীদ নিজামী রহ.-এর স্মৃতিচারণ
শহীদ নিজামী রহ. বলেন, "মোস্তফা শওকত ইমরান ভাই ছাত্রসংঘের জনশক্তিদের জন্য আপাদমস্তক ইখলাসের উদাহরণ ছিলেন। তার সাথে দুয়েকটি ঘটনা এখনও স্মৃতিতে আছে। এর একটি— ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে যখন দ্বিতীয় দফায় আমাকে কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করা হলো, তখন আমার সমস্যা তিনি কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন। রাত বারোটার দিকে ওষুধ নিয়ে আমার রুমে চলে আসলেন। যেহেতু উনি ডাক্তার ছিলেন, জানতেন যে আমি মানসিকভাবে পেরেশান থাকলে আমার ঘুম হয় না। তিনি সম্মেলন কেন্দ্রের ইনচার্জ ছিলেন। কিন্তু সমস্ত দায়িত্ব পূরণ করার পরও নিজে আরাম করলেন না। আমার খেয়াল না রেখে নিজে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেননি।

বিভিন্ন সম্মেলন বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব যাদের উপর অর্পিত হতো— শহীদ আব্দুল মালেক, শহীদ শাহ জামাল, শহীদ শওকত ইমরানকে দেখেছি, কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য দিনরাত কাজ করতেন। এত দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েও মেজাজের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। সব কাজ নিজে এগিয়ে এসে করতেন। শাহ জামাল ভাই মেঝেতে বসে বসে কাজ করিয়ে নিতেন। কিন্তু আব্দুল মালেক ও শওকত ইমরান সম্মেলন কেন্দ্রের ইনচার্জ কিংবা সম্মেলনের সভাপতি হয়েও ছোট ছোট কাজ নিজ হাতে সেরে ফেলতেন।"

আল্লাহ তায়ালা শহীদ মুস্তফা ইমরান ভাইকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত করুন। সেই সাথে তাঁর সাথে শহীদ হওয়া হাজারো মুসলিমের রক্তের অভিশাপ থেকে আমাদের মুক্ত করুন। আমরা যাতে মুশরিকদের ফাঁদ থেকে উদ্ধার হতে পারি সেই তাওফিক দান করুন।

শহীদ মৌলভী ফরিদ আহমদ
ফরিদ আহমদ বাংলার প্রথিতযশা আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও ইসলামী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। যিনি মৌলভী ফরিদ আহমদ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী, জাতীয় পরিষদের সদস্য, গণপরিষদের সদস্য ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের চীফ হুইপ ছিলেন।


ফরিদ আহমদ ৩ জানুয়ারি ১৯২৩ সালে কক্সবাজারের রামুর রশিদ নগরের মাছুয়াখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএ পাস করে তিনি ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএ, ১৯৪৬ সালে এমএ ডিগ্রি ও ১৯৪৭ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই ফরিদ আহমদ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৬-১৯৪৭ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালে তিনি নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দিয়ে ১৯৫৪-১৯৬৯ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তৎকালিন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খেলার রেডিও ধারাভাষ্য দিয়েছেন তিনি। তিনি কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা বার কাউন্সিলের সহসভাপতিও ছিলেন।

যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ১৯৫৪ সালে তিনি পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এম.এল.এ) এবং ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের চীফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইবরাহিম ইসমাইল চুন্দ্রিগড়ের মন্ত্রিসভায় তিনি ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৬২-১৯৬৫ মেয়াদে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সম্মিলিত বিরোধী দলের (COP) চেয়ারম্যান, ১৯৬৫ সালে তিনি পুনরায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্টের সদস্য হিসেবে আইয়ুব বিরোধী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ ভুমিকা রাখেন। নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে ফেব্রুয়ারি-মার্চ ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে ৮ দল নিয়ে গঠিত ডেমোক্রেটিক একশন কমিটি (DAC) কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পূর্ব পাকিস্তান শাখার আহবায়ক নির্বাচিত হন।

তিনি ২৪ জুন ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) নামক নতুন রাজনৈতিক গঠন হলে সহসভাপতি হিসেবে যোগ দেন। তিনি পত্রিকায় ইসলাম ও ইসলামের ইতিহাস নিয়ে লিখতেন। ইসলাম নিয়ে লেখালেখি করা ও আলেমদের রাজনৈতিক সংগঠন নেজামে ইসলামে সেক্রেটারি হওয়ার তাঁর নামের সাথে মৌলভী যুক্ত হয়ে যায়।

ফরিদ আহমদ বিভিন্ন বিষয়ে অনেক বই লিখেন। তিনি দৈনিক নাজাত পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও মাসিক পৃথিবীর উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। শহীদ মৌলভী ফরিদ আহমদের বড় ছেলে মোঃ খালেকুজ্জামান ১৯৯৬ সালে কক্সবাজার ৩ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর মৌলভী ফরিদ আহমদের ছোট ছেলে মোহাম্মদ শহীদুজ্জামান ২০০১ সালে একই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সনের নির্বাচনে সমগ্র কক্সবাজার জেলা আসনে তীব্র প্রতিদন্তিতা করে আওয়ামী লীগ নেতা (কলাগাছ প্রার্থী) নুর আহমেদ এর কাছে হেরে যান। আসলে তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়। কক্সবাজারে নূর আহমেদকে কেউ চিনতো না। ব্যাপক কারচুপি ও কেন্দ্র দখল করে ফরিদ আহমদকে হারিয়ে দেউ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা।

১৬ ডিসেম্বরের পর ১৮ ডিসেম্বর তার ঢাকায় বাসায় সন্ত্রাসীদের আক্রমণ হতে পারে এমন আশংকায় তিনি লালবাগ থানায় আশ্রয় নেন। সেখান থেকে মুজিব বাহিনী তাকে ছিনিয়ে নেয়। ইকবাল হলে টানা নির্যাতন করে তাঁকে খুন করা হয়। পরে ২৩ তারিখ সলিমুল্লাহ হলের পিছনে তাঁর লাশ পাওয়া যায়।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন