৮ অক্টোবর, ২০১৫

সাক্ষী হয়ে থাকা কিছু ঘটনাঃ আমাদের প্রেরণা


দাদাজান মৃত্যুবরণ করলেন। তখন আমার মিডটার্ম পরিক্ষা চলছিলো। দ্রুত বিভাগীয় প্রধানকে জানালাম। তিনি আমকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন যাও, বাড়ি যাও। তোমার পরীক্ষা আমি দেখবো। দাদাজানের পাশে আসলাম। অনেক চেষ্টা করেও কাঁদতে পারলাম না। কেমন যেন সব স্বাভাবিক মনে হয়।
নিজেকে আগে থেকেই কাঠখোট্টা বলে জানতাম। কিন্তু তাই বলে এতটা!! এই ঘটনার পর নিজেকে পাষান মনে হতে থাকে। অনেকের নাটক সিনেমা দেখেও চোখ ভিজে। আমার তো সেরকম হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু আমি সাক্ষী হয়ে গিয়েছি এমন সব ঘটনার যেগুলো মনে হলে এখনো কাঁদি। চোখ থেকে অবিরল পানি পড়ে।
পাঁচলাইশ থানায় এক মধ্যবয়সী মা পা জড়িয়ে আছে ওসির। স্যার, স্যার, স্যারগো, আমার পোলাটারে আর মারিয়েন না। আপনার পায়ে পড়ি। স্যার আপনি যেমনে বলেন সেভাবে হবে আমি পোলারে আর শহরে রাখুম না। স্যার, স্যারগো আর মারবেন না। আমারে মারেন, আমারে মারেন। পোলাটারে ছাড়ি দেন।
বিরক্ত পুলিশ পা ঝাড়া দেয়, মা ছুটে পড়ে তিন হাত দূরে। মায়ের দেরী হয় না। আবার উঠে দৌড়ে যায়। লক্ষ্য পুলিশের পা। স্যারগো আপনে আমার পোলারে বাঁচান। ওরা মেরে ফেলতেছে। মা কান্না করছে নিচতলায়। তিনতলায় ছেলের উপর অমানুষিক নির্যাতন চলছে। মা – ছেলের কান্নায় জাহান্নাম হয়ে গেলো সব।
..................
আব্বু, তুমি আমাকে বলতা, মিথ্যা বলা খুব খারাপ, আল্লাহ শাস্তি দেন। আর তুমি সমানে মিথ্যা বলছো। তুমি বলেছো আমার পরীক্ষার সময় বাসায় আসবে, আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে। তুমি আসোনি। এরপর বলেছো, রোযায় আসবে, আসোনি। তারপর বলেছো ঈদে আসবে, তুমি এতটাই খারাপ হয়েছো, তুমি ঈদেও আসোনি। আমরা সবাই খুব কান্না করেছি...।
তুমি এখানে কি কর? আমাদের কথা মনে পড়ে না?
ছোট্ট মেয়ে বাবাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছে, দুজনের মাঝখানে হাসিনার জিন্দানখানার লোহার মোটা মোটা শিক।
বাবা বলছে, আম্মু তুমি আমাকে মাফ করে দাও, আমি আর মিথ্যা বলবো না। ছোট্ট মেয়েটির মা কোন কথা বলেন না। শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। এক সময় বাবা মেয়ের কথাগুলো কান্নায় রূপান্তরিত হয়। তিনজনেই কাঁদছেন। কে কাকে সান্ত্বনা দিবে? সান্ত্বনা দেয়ার কেউ নেই।
..................
ছেলেকে কোর্টে তুলেছে তাই মা বাসা থেকে খাবার নিয়ে এলেন ছেলেকে একটু নিজ হাতে খাইয়ে দিবেন বলে। কিন্তু পুলিশ কিছুতেই তা হতে দিচ্ছে না। মা পুলিশের পিছ পিছ দৌড়াচ্ছেন। ছেলেকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ছেলে মায়ের দূর্দশা দেখে বললো, মা আমার পেট জ্যাম। খেতে পারবো না। জেলখানা থেকে আসার সময় অনেক খেয়ে এসেছি।
মা হাল ছাড়েন না। দৌড়াতেই থাকেন। একবার এর কাছে একবার ওর কাছে। ছেলে দূর থেকে মাকে বারণ করে। মা বলেন, বাবা তোর পছন্দের কাচ্চি নিয়ে আসছি। ছেলে মাকে থামানোর জন্য বলে কাচ্চি খাবো না, গ্যাষ্ট্রিক হবে। মা আর্তনাদ করে উঠেন, বাবা তোরে ওরা খেতে দেয় না? তোর তো গ্যাষ্ট্রিকের সমস্যা ছিল না। ছেলে কি বলবে, বুঝে উঠতে পারে না।
মায়ের ক্রমাগত বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে কয়েকজন পুলিশ। গালি দিয়ে তারা মায়ের হাত থেকে কেড়ে নেয় খাবার। দূরে নিক্ষেপ করে। সব বিরিয়ানি ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। কয়েকটা কুকুর দৌড়ে এসে খাবার খাওয়া শুরু করে। মা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে যান। একবার কুকুরগুলোর দিকে আরেকবার ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর কাঁদতে থাকেন।
ছেলে লজ্জায় অপমানে ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে থাকে। চিৎকার করে বলতে থাকে, মা তুমি আর কোনদিন কোর্টে আসবা না। কোনদিন না। কখনো না।
...........................
কোর্ট থেকে ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে জেলখানায়। মা ছেলের বিদায় হল। ছেলে মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। কিন্তু মায়ের মন কিছুই মানছে না। কাঁদতে থাকেন, আর বলতে থাকেন, আমার ছেলে কোন অপরাধ করে নি। সে চোর ও না ডাকাতও না, তবে কেন তাকে বন্দি করা হল?
হাতকড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে প্রিজন ভ্যানে তোলা হল। মা-ছেলের কথা তবু শেষ হয় না। এক পর্যায়ে গাড়ি চলতে শুরু করে। মাও দৌড়াতে থাকেন। ছেলে মা কে বারণ করে কিন্তু কে শোনে কার কথা!!
মা দৌড়াতে থাকেন। হোঁচট খেয়ে আছড়ে পড়েন রাস্তায়। উঠে আবার দৌড়াতে থাকেন কিছুদূর গিয়ে আবার আছড়ে পড়েন। আর উঠতে পারেন না। ততক্ষনে গাড়ি অনেকদূর। মা তাকিয়ে থাকেন। রাস্তায় বসে কাঁদতে থাকেন মা। আর প্রিজন ভ্যানে কাঁদতে থাকেন ছেলে।
.........................
এইরকম দুই চারটা নয়, শত শত ঘটনা আছে। তবে আমরা হতাশ নই। জানি একদিন জুলুমের অবসান হবে। ইনশাল্লাহ। আসুন আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ দিয়ে চেষ্টা করি। বাংলাদেশের মানুষকে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার আহবান করি। বিজয় আমাদেরই। মুমিনদের কোন পরাজয় নেই।

২টি মন্তব্য:

  1. আসলে কি লিখব বুঝতে পারছিনা....
    তবে ইনশাহ্-আল্লাহ এদেশে একদিন কালেমার পতাকা উড়বেই
    এবং সবাই এ পতাকা তলে সমাবেত হবে

    উত্তরমুছুন