২৬ অক্টোবর, ২০১৫

অন্যরকম ভালোবাসা



রাত পৌনে একটা। জীর্ণ একটি টিনশেড আধাপাকা ঘর। একটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো। চালক কয়েকটি পানির বোতল নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। বাড়ির সামনে পাঁচটি ছোট কবর। সেই কবরগুলো ঘিরে রয়েছে অনেকগুলো ফুলগাছ। চালক হাতের পানির বোতলগুলো থেকে প্রত্যেকটি গাছের গোড়ায় পানি দিতে লাগলেন। পানি দেয়া শেষে কবরগুলোর দিকে তাকিয়ে কাঁদতে থাকলেন। কখনো কখনো কবরগুলোতে হাত বুলাতে লাগলেন। এভাবে করতে করতে রাত শেষ হয়ে এলো। মুয়াজ্জিনের আযানে চালক সম্বিত ফিরে পেলেন। দ্রুত খালি বোতলগুলো নিয়ে আবার গাড়িতে উঠলেন। চলতে শুরু করলো গাড়ি। অন্ধকারে চিরে আসা গাড়ি আবার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। 

সায়েমের বাগান করার খুব শখ। বাড়িতে তার বাগান ছিল। কিন্তু ভার্সিটির হলে সে বাগান কই পাবে? তার উপরে সে পড়ে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। যেখানে মানুষের জায়গা হওয়াই কঠিন, বাগান তো পরের কথা। তারপরও সায়েম বাগান করার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। হোস্টেলের ছাদ তালা মারা। ছাদে যাওয়া ভীষন বারণ। কোনভাবেই সে ছাদে বাগান করার অনুমতি পেলনা। অবশেষে সে রুমের বারান্দায় কয়েকটি টব কিনে গাছ লাগায়। এতে তার বাকী রুমমেট দু’জন ভীষন বিরক্ত। তারা আগের মত বারান্দায় আরাম করে বসতে পারেনা। কাপড় শুকাতেও অসুবিধে হয়। মাঝে মাঝে সায়েম গাছগুলোতে পানি দিলে বারান্দা ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। এতসব অভিযোগের পরও নানানভাবে রুমমেটদের ম্যানেজ করে তার বাগান কার্যক্রম চালাতে থাকে। মাস দুয়েক পর যখন সবগুলো গাছে সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটতে থাকে তখন অবশ্য রুমমেটদের অবস্থান পরিবর্তন হয়। সায়েম যখন মাঝে-মধ্যে দেখে তার কোন রুমমেট গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে তখন সায়েমের মন আনন্দে নেচে উঠে। 

ফুলগাছগুলো সায়েমের কাছে শুধুমাত্র গাছ ছিলনা। বরং বলা যেতে পারে সায়েমের বেস্টফ্রেন্ড। সায়েম তাদের সাথে বসে বসে গল্প করে। তাদের গান শোনায়, নিজেও তাদের কাছ থেকে গান শুনে। হুট করে কেউ দেখে ফেললে চমকে উঠে বলে কই আমি কারো সাথে কথা বলছিনা! আমি আপন মনে গান করছিলাম। অনেকে মনে করতো সায়েম বোধহয় মাথার তার দুটা ছিঁড়া। নইলে গাছের সাথে এত কিসের মাখামাখি। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যাপারটা ধোপে টিকতো না। কারণ বাস্তবে সায়েম ছিল অত্যন্ত মেধাবী, বুদ্ধিমান, মানুষের কাছে অতিপ্রিয় সদালাপী একজন মানুষ। 

সায়েম শুধুমাত্র ফুলগাছ নিয়ে পড়ে থাকতো ব্যাপারটি সেরকম কিছু নয়। সে রাজনীতিও করে। দেশ গড়ার রাজনীতি, ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি। জালিম সরকারের কাছে জনপ্রিয় এই ছেলেটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়। একদিন রাতে পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। থানায় ভীষণ অত্যাচার চালাতে থাকে সায়েমের উপর। সায়েম অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন। সে চিন্তা করে রেখেছিলো জালিম পুলিশদের কাছে কিছু চাইবেনা। উহ আহ ও করবেনা। দাঁতে দাঁত চেপে একের পর এক নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছিল। ঘন্টা দুয়েক মার খাওয়ার পর সায়েমের মনে হচ্ছে তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাবে। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো পানি... পানি... 

তাকে যে পুলিশটি বেশী মারছিলো তার নাম ঝন্টু। সায়েম অবাক হয়ে দেখলো ঝন্টুই পানি নিয়ে আসলো। ঝন্টু ধীরে ধীরে পানি গ্লাসে ঢাললো। তারপর তাকে পানি না দিয়ে সে নিজে একটু একটু করে চুমুক দিয়ে পানি খেতে লাগলো। এতে সায়েমের তৃষ্ণা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। চোখ বন্ধ করে সে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। উপুড় করে সায়েমকে ফেলে অল্প কিছু পানি মেঝে ছড়িয়ে বলে চেটে চেটে খা। সায়েম শুধু আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কিছু বলেনা। এরপর সায়েম একটি চেয়ারে বসানো হলো। হাত-পা চেয়ারের হাতল ও পায়ার সাথে বেঁধে দুই কানে চিমটি দিয়ে বৈদ্যুতিক তার সংযোগ করে বলে। তোকে এখন কারেন্ট শক দিয়ে মেরে ফেলবো। যদি বাঁচতে চাস তবে তোর সঙ্গীদের ঠিকানা দে। সায়েম কিছু বলেনা। কেবল চোখ বন্ধ করে আল্লাহকে ডাকতে থাকে। সুইচ অন করে ঝন্টু। ঝাড়া তিরিশ সেকেন্ড। সায়েম ফুসফুস যেন ফেটে যাওয়ার উপক্রম। পুরো মুখে সব রক্ত জমে গিয়েছে। সায়েম লক্ষ্য করে তার মুখ শুকনো খটখটে হয়ে গিয়েছে। আর টিকতে পারেনা। তৃষ্ণায় ছটফট করতে করতে একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। 

হঠাত সায়েম লক্ষ্য করে তার বারান্দার প্রিয় সব ফুলগাছ। তার একান্ত বন্ধু। সবাই দৌড়ে আসছে। আলমান্ডা আর হাসনাহেনা ভীষন জোরে নড়ে নড়ে বাতাস করতে থাকে। শিউলি বেলী আর টগর মিলে কুড়ানো পাতা সব উড়িয়ে সায়েমের মুখের সামনে ধরে আর সেখান থেকে নিঃসৃত হতে থাকে পাতার রস। আহা! কি মধু কি মিষ্টি। সায়েমের সব যন্ত্রনা মুহুর্তেই বিলীন হয়ে যায়। হুট করে আবার জ্ঞান ফেরে সায়েমের। অবাক হয়ে সায়েম লক্ষ্য করে সে ভীষন ঝরঝরে। যন্ত্রনা মোটেও নেই। মুখে এখনো সেই মিষ্টি পানির স্বাদ। কোন তৃষ্ণা নেই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মহান রবের আর ভালোবাসার আবেগে বুকটা ভরে উঠে গাছগুলোর জন্য। 

থানা হাজতে এভাবে নির্যাতন চলতে থাকে দুইদিন। আর সায়েমের সেবা করে যাচ্ছে গাছগুলো। অবশেষে পুলিশ নামের পাষন্ডরা তার থেকে কোন কথা বের করতে না পেরে তার দুই পায়ে গুলি করে। তাদের ইচ্ছে ছিল পঙ্গু করে দিবে সায়েমকে। গুলিবিদ্ধ সায়েমকে হাসপাতালে ভর্তি করায়। ডাক্তাররা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানান, ক্ষতস্থান কয়েকদিন আগের। ইনফেকশন হওয়ার যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। যদি ইনফেকশন হয় তাহলে পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। কাঁদতে থাকে সায়েমের বাবা মা ভাই বোন। ডাক্তার অনেকগুলো পরীক্ষা দেয়। রাতে সায়েম ঘুমিয়ে পড়লে আবার সেই গাছগুলোর সাথে দেখা হয়। তারা সবাই কাঁদতে থাকে আর সান্তনা দিয়ে সায়েমকে বলে আমরা আমাদের মত চেষ্টা করছি। তোমার কোন ক্ষতি হবেনা। 

পরদিন সবগুলো টেস্ট রিপোর্ট দেখে ডাক্তার সিদ্ধান্ত দেন অপারেশন করে বাম পাটা কেটে ফেলতে হবে। ওটায় মারাত্মক ইনফেকশন হয়ে গিয়েছে। সায়েমের বাবা-মা রাজী না হয়ে উপায় থাকেনা। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য একটা পা কেটে ফেলতেই হবে। অপারেশন হবে আরো দুদিন পর। রাতে আবার ঘুমিয়ে পড়লে সায়েম দেখে তার প্রিয় গাছগুলো এসেছে। তারা অনেকগুলো গাছের পাতা একত্র করে লাগিয়ে দিচ্ছে। নানান ধরণের ঔষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে। আর সবাই সমানে কাঁদছে। সান্তনা দিচ্ছে। মিষ্টি রস খাওয়াচ্ছে। যাওয়ার সময় বলে গেল, ডাক্তারকে যেন রিকোয়েস্ট করে টেস্টগুলো আবার করাতে। 

ঘুম থেকে উঠে সায়েম লক্ষ্য করে তার পায়ের যন্ত্রণা অনেক কমে গিয়েছে। সে তার বাবার কানে কানে বলে বাবা আমার মনে হয় পা না কাটলেও চলবে। আপনি ডাক্তারকে একটু বুঝিয়ে বলুন যেন টেস্টগুলো আবার একটু করতে বলে। বাবা বলেন, কেন তোর এমন মনে হচ্ছে? সে বিশদ না বলে বললো, এমনিই মনে হচ্ছে তাই বললাম। ডাক্তার আসলে সায়েমের বাবা আবার টেস্ট করানোর কথা বললে অবিশ্বাসের চোখে ক্ষতস্থান দেখতে দেখতে বললেন এক রাতের মধ্যে কি আর পরিবর্তন হবে? তবুও সায়েমের বাবার পীড়াপীড়িতে আবার টেস্ট করালেন। এবার সবগুলো টেস্টেই পজেটিভ রিপোর্ট আসলো। ডাক্তার কিছু না বুজতে পেরে বললেন আগের রিপোর্টটা মনে হয় ভুল ছিল। সায়েমের বাবাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন আপনি না বললে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারতো। সায়েমের বাবা-মা খুশিতে বার বার আল্লাহকে সিজদাহ দিতে লাগলেন। সায়েমও আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় আর গাছগুলোর কথা কাউকে বলেনা। কারণ তার এই কথা কেউ বিশ্বাস করবেনা। 

প্রতি রাতেই গাছগুলো আসে সেবা করতে। মিষ্টি রস খাওয়াতে। সায়েম ঘুমের মধ্যে তাদের সাথে গল্প করে। সায়েম হাসপাতালে গ্রেফতার অবস্থায় ছিল। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। একদিন পাহারাদার পুলিশগুলোর সাথে আরো অনেক পুলিশ আসলো। তারা সায়েমকে নিয়ে যাবে কারাগারে। সায়েমের বাবা-মা পুলিশগুলোর হাতে পায়ে ধরে বলতে থাকে ছেলেটা এখনো হাঁটতে পারেনা। এই অবস্থায় কারাগারে গেলে সে কিভাবে চিকিৎসা পাবে? কিন্তু কে শোনে কার কথা! জালিমরা হাসপাতাল থেকে সায়েমকে তুলে নিয়ে যায়। সায়েম হাত নেড়ে বিদায় জানায় সবাইকে। আবার কবে দেখা হবে কে জানে! মা সায়েমকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকেন। পুলিশ হ্যাঁচকা টান দিয়ে সায়েমকে গাড়িতে তুলে। ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠে সায়েম। 

কারাগারের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। তবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও ভালো আছে সায়েম। কারণ সারা রাত যখন সে ঘুমে থাকে তখন তার সাথে আড্ডা দিতে আসে গাছগুলো। সায়েমের যেসব বন্ধু তার সাথে দেখা করতে আসে সে সবাইকে বলে যেন তার গাছগুলোতে পানি দেয়া হয়। এভাবে কিছুদিন যায়। ইতিমধ্যে পুলিশ আবার সায়েমদের হলে যায়। জঙ্গী আস্তানার ভুয়া কথা বলে হল বন্ধ করে দেয়। এই খবর সায়েমের কানে পৌঁছায়। সে তার দুইজন সহকর্মীকে খবর পাঠিয়ে বলে যেন গাছগুলোর খবর নেয়। কিন্তু সবার অবস্থায়ই বেগতিক। কে কার খোঁজ নেয়! 

সায়েম এখন সুস্থ। আগের মতই হাঁটতে পারে। কিন্তু দুঃখের কথা গাছগুলো আর আগের মত স্বপ্নে দেখা দেয়না। গত এক সপ্তাহ একবারও আসেনি। সায়েম তার বন্ধু সহকর্মীদের খবর পাঠায়। তাদের মাধ্যমে জানতে পারে তার প্রিয় গাছবন্ধুগুলো আর নেই। পানির অভাবে সব মারা গিয়েছে। ভীষন শক খায়। এ যেন পুলিশের দেয়া বৈদ্যুতিক শকের চাইতেও বেশী। এখন পানিই খেতে পারেনা সায়েম। মনে হয় যেন গলায় কাঁটার মত বিঁধে পানিগুলো। 

দীর্ঘ সাত মাস পর কারাগার হতে মুক্তি পায় সায়েম। বের হয়েই প্রথমে হলে আসে। প্রহরীতো প্রথমে খুলতে চায়না, গাছের প্রতি সায়েমের ভালোবাসার কথা সে জানতো তাই আর বেশীক্ষন বাধা না দিয়ে দরজা খুলে দেয়। জনমানবহীন হলে সায়েম দৌড়ে দৌড়ে তার রুমে আসে। কঙ্কাল হয়ে আছে তার প্রিয় গাছগুলো। মানুষহীন হলের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান হয় সায়েমের আর্তনাদে। শুকিয়ে যাওয়া ফুলগাছগুলো জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে সে। প্রহরীরাও অপরাধীর মত দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে।

সবগুলো গাছ টবসহ তুলে নিয়ে আসে হল থেকে। চলে আসে নিজেদের বাড়িতে। নিজের হাতে পাঁচটি কবর খুঁড়ে সমাহিত করে ফুলগাছগুলো। ছোট ছোট সাইনবোর্ড বানিয়ে কবরগুলোর সামনে লিখে দেয়। হাসনাহেনা, শিউলি, টগর, বেলী, আলমান্ডা। তারপর কিছুদিন পর সে বাড়িও ছাড়তে হয়। কারণ ফ্যাসিস্ট পুলিশ তার পিছু ছাড়েনা। এখন সে শহরে নাম গোপন করে বসবাস করে। এতদিনে সে সফল ব্যবসায়ীও হয়ে গিয়েছে। তবুও সে একমুহুর্ত ভুলে থাকতে পারেনা গাছগুলোকে। সেই গাছগুলো যে গাছগুলো নিজেদের রস নিংড়ে তাকে পানি খাইয়েছে। একদিন পানির অভাবেই তাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তাই এখনো সুযোগ পেলেই সায়েম তার গাড়ি নিয়ে রাতের আঁধারে বের হয়ে পড়ে। যেভাবে একসময় অনেকগুলো রাতে তাকে সময় দিয়েছে গাছগুলো। 

২টি মন্তব্য:

  1. বস ! কেঁদে ফেললাম যে ! কান্নার পানিতে সে গাছ আবার সজীব হয়ে উঠতে পারে।

    উত্তরমুছুন
  2. আমাদের সবার আঁখিজল হয়তো একদিন সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইনশাআল্লাহ

    উত্তরমুছুন