১৬ নভে, ২০১৫

সুদ নিয়ে বিভ্রান্তি


ইদানিং সুদ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। অনেকে সুদের কিছু প্রকারকে জায়েজ বলে চালানোর চেষ্টা করেন। বিশেষ করে সূরা ইমরানের ১৩০ নং আয়াতকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও অনুরূপ কথা বলেছেন, চক্রবৃদ্ধি হলে সুদ হবে, নতুবা নয়। আসুন দেখি সুদের ব্যাপারে ইসলাম কি বলে?
সুদের বিরোধীতা করে পবিত্র কুরআনে চারটি ধাপে আয়াত নাজিল হয়।

সূরা : আর-রূম 
আয়াত ৩৯: যে সূদ তোমরা দিয়ে থাকো, যাতে মানুষের সম্পদের সাথে মিশে তা বেড়ে যায়, আল্লাহর কাছে তা বাড়ে না আর যে যাকাত তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকো, তা প্রদানকারী আসলে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করে
এই আয়াতগুলো নাজিল হয় ৬১৫ খৃস্টাব্দে। তার মানে হিজরতের প্রায় ৮ বছর পূর্বে। এখানে আল্লাহ তায়ালা সুদকে নিরুৎসাহিত করেছেন। সরাসরি কোন নির্দেশনা দেননি। যাকাত এবং দানকে উৎসাহিত করেছেন। এখানে আল্লাহ তায়ালা শুধু বলেছেন, সুদের কারণে সম্পদের বৃদ্ধি হয় না, যদিও মানুষ তা মনে করে। 

সূরা : সূরা আন নিসা
আয়াত ১৬১: আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করত, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায়ভাবে। বস্তুত; আমি কাফেরদের জন্য তৈরী করে রেখেছি বেদনাদায়ক আযাব

এই আয়াতগুলো নাজিল হয় হিজরতের প্রায় তিন বছর পর। এখানে ইহুদীদের কথা বলা হয়েছে। তাদের উপর সুদ নিষিদ্ধ ছিল। আযাবের কথা উল্লেখ করে মুসলিমদের স্পষ্ট সতর্ক করে দেয়া হলো এটা নিষিদ্ধ। এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে সুদ মুসলিমদের জন্যও কড়া নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে।

সূরা : সূরা আল ইমরান 
আয়াত ১৩০ : হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো।

এরপর সূরা আলে ইমরানের এই আয়াতগুলো নাজিল হয়। এবার মুসলিমদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশ আসলো সুদ গ্রহন করা যাবেনা। এখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। এখানে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়াতে চায় যে, সরল সুদ জায়েজ শুধু চক্রবৃদ্ধি হারে খাওয়া নাজায়েজ। সরল সুদ মানে যেটা বছর বছর বাড়বে না। তার মানে কেউ যদি ১০০০ টাকা ঋণের বিনিময়ে ১১০০ টাকা নেয় তাহলে তা বৈধ। বস্তুত প্রকৃত কথা হলো
হুদ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের একটা বড় কারণ এই ছিল যে, ঠিক বিজয়ের মুহূর্তেই ধন-সম্পদের লোভ তাঁদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে বসে এবং নিজেদের কাজে পূর্ণরূপে শেষ করার পরিবর্তে তারা গনীমাতের মাল আহরণ করতে শুরু করে দেন তাই মহাজ্ঞানী আল্লাহ এই অবস্থার সংশোধনের জন্য অর্থলিপ্সার উৎস মুখে বাঁধ বাঁধা অপরিহার্য গণ্য করেছেন এবং সুদ খাওয়া পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছেন যা চক্রবৃদ্ধি হারে গ্রহন করা হয় এই সুদের ব্যবসায়ে মানুষ দিন-রাত কেবল নিজের লাভ ও লাভ বৃদ্ধির হিসেবেই ব্যস্ত থাকে এবং এই কারণে মানুষের মধ্যে অর্থ লালসা ব্যাপক ও সীমাহীন হারে বেড়ে যেতে থাকে

সূরা : সূরা আল বাক্বারাহ
 
আয়াত ২৭৫ : কিন্তু যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে তাদের এই অবস্থায় উপনীত হবার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলেঃ  ব্যবসা তো সুদেরই মতো অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম কাজেই যে ব্যক্তির কাছে তার রবের পক্ষ থেকে এই নসীহত পৌছে যায় এবং ভবিষ্যতে সুদখাওয়া থেকে সে বিরত হয়, সে ক্ষেত্রে যা কিছু সে খেয়েছে তাতো খেয়ে ফেলেছেই এবং এ ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ হয়ে গেছে আর এই নির্দেশের পরও যে ব্যক্তি আবার এই কাজ করে, সে জাহান্নামের অধিবাসী সেখানে সে থাকবে চিরকাল 

আয়াত ২৭৬ :  আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত ও বিকশিত করেন আর আল্লাহ অকৃতজ্ঞ দুষ্কৃতকারীকে পছন্দ করেন না

আয়াত
২৭৭ : অবশ্যি যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তাদের প্রতিদান নিসন্দেহে তাদের রবের কাছে আছে এবং তাদের কোন ভয় ও মর্মজ্বালাও নেই

আয়াত
২৭৮ : হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং লোকদের কাছে তোমাদের যে সুদ বাকি রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও, যদি যথার্থই তোমরা ঈমান এনে থাকো 

আয়াত
২৭৯ : কিন্তু যদি তোমরা এমনটি না করো তাহলে জেনে রাখো, এটা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এখনো তাওবা করে নাও ( এবং সুদ ছেড়ে দাও ) তাহলে তোমরা আসল মূলধনের অধিকারী হবে তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপর জুলুম করাও হবে না

চতুর্থ ধাপে এসে সূরা বাকারার ২৭৫
থেকে ২৭ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে সর্বপ্রকারের সুদকে সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ইসলামে দুই প্রকার রিবার কথা বলা হয়েছে। প্রথম প্রকার হলো, রিবা আন-নাসিয়াহ বা মেয়াদি সুদ। এটা হলো প্রকৃত সুদ বা প্রাথমিক সুদ। কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে এ ধরনের সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইমাম আবু বকর জাসসাস ও আল রাজি রিবা আন নাসিয়ার যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা হলো- যে ঋণ পরিশোধের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ দেয়া থাকে এবং মূলধনের অতিরিক্ত প্রদানের শর্ত থাকে, সেটাই রিবা আন-নাসিয়াহ।

রিবা আল ফজল হারাম হওয়ার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি রা: বলেন, একদা বিলাল রা: রাসূলে করিম সা:-এর সমীপে উন্নত মানের কিছু খেজুর নিয়ে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথা থেকে এ খেজুর আনলে? বিলাল রা: উত্তর দিলেন, আমাদের খেজুর নিকৃষ্ট মানের ছিল। আমি তার দুই সাঃ-এর বিনিময়ে এক সাঃ উন্নত মানের বারমি খেজুর বদলিয়ে নিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ওহ! এত নির্ভেজাল সুদ। এরূপ কখনো করো না। তোমরা যদি উত্তম খেজুর পেতে চাও, তাহলে নিজের খেজুর বাজারে বিক্রি করবে, তারপর উন্নত মানের খেজুর কিনে নেবে। যেহেতু বর্তমান ব্যাংকিংয়ে ঋণের বিপরীতে সময় বেঁধে দিয়ে সুদ নেয়া হয়, সেহেতু তা রিবা আন-নাসিয়ার অন্তর্গত, যা কুরআনের আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়েছে।

আবার অনেকে মনে করেন, কুরআন ও হাদিসে যে রিবার উল্লেখ আছে, তার অর্থ ব্যক্তিগত পর্যায়ে পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের জন্য দেয়া ঋণ, যাকে প্রচলিত ভাষায় মহাজনী সুদ বা উসারি বলা হয় কিন্তু আজকের দিনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কর্তৃক দেয়া ঋণ উৎপাদন ও মুনাফাভিত্তিক খাতে দেয়া হয়। এখানে ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের টাকা দিয়ে ব্যবসায় করে নিজে লাভবান হন। তা ছাড়া এ জাতীয় সুদ হলো ব্যবসায়িক বা তেজারতি সুদ যা ব্যবসায়িক লেনদেনের মতোই উভয়ের সম্মতিক্রমে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, কোনো জবরদস্তি থাকে না, সুদের হার যথেষ্ট কম, এর মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, অর্থনীতির চাকা হয় গতিশীল। তাই এ জাতীয় সুদ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তাদের এ যুক্তি একেবারেই অসার ও ভুল। কারণ, জাহেলি যুগে ব্যবসাবাণিজ্যের জন্য রীতিমতো পুঁজি লগ্নি করা হতো এবং সে জন্য সুদ আদায় করা হতো। সে সময়ে অনেকেই আজকের মতো ফার্ম খুলে এজেন্ট নিয়োগ করে সুদে পুঁজি খাটাত। এদের মধ্যে রাসূল সাঃ-এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও বনু মুগিরার বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। তাদের আদায়কৃত সুদকে আরবিতে রিবা বলা হতো। রাসূল সাঃ তাঁর চাচার সুদি কারবার বন্ধ করে দেন এবং গ্রাহকের কাছে প্রাপ্য বকেয়া সুদ রহিত করে দিয়েছিলেন।

সুতরাং সুদ সুদই। সুদ জায়েজ করার সকল চিন্তাই শয়তানী চিন্তা। এর থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে চলতে হবে। অনেকে সুদী ব্যাংকে চাকুরী করাকেও নানানভাবে জায়েজ করার চেষ্টা করেন। সেটাও স্পষ্টভাবে হারাম।

জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাদেরকে অভিশম্পাত করেছেন যারা সুদ খায়, যারা সুদ দেয়, যারা সুদের টাকার কথা লিখে রাখে এবং যারা সুদের টাকার স্বাক্ষী থাকে। তারা সবাই একই রকম
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৯৮, আবূ দাউদ/৩৩০০, তিরমীযী/১২০৯)
অতএব সুদী ব্যাংকে চাকুরী করা বৈধ নয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের আমল করার তাওফীক দান করুন। আমাদের সীরাতুল মুস্তাকীমের পথে রাখুন। আমীন।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন