৭ এপ্রিল, ২০১৬

চলচ্চিত্র একটি শিক্ষার মাধ্যম


হাদীসে জিবরাঈল নামে একটি প্রসিদ্ধ হাদীস রয়েছে। সেটি দিয়েই শুরু করেছি। উমার ইবনুল খাত্তাব (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একদিন রসূলুল্লাহ (সা:) এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি দরবারে আত্মপ্রকাশ করলেন। ধবধবে সাদা তাঁর পোশাক। চুল তার কুচকুচে কালো। না ছিল তাঁর মধ্যে সফর করে আসার কোন চিহ্ন, আর না আমাদের কেউ তাকে চিনতে পেরেছেন। এসেই তিনি রসূলুল্লাহ (সা:) এর নিকট বসে পড়লেন। রসূলুল্লাহ (সা:) এর হাটুর সাথে তার হাটু মিলিয়ে দিলেন। তার দু’হাত তার দুই উরুর উপর রেখে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলুন অর্থাৎ ইসলাম কি? 

উত্তরে রসূল (সাঃ) বললেন, ইসলাম হচ্ছে- তুমি সাক্ষ্য দিবে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমাদান মাসের সিয়াম পালন করবে এবং পথ পাড়ি দেবার বা রাহা খরচের সামর্থ্য থাকলে বাইতুল্লাহর হাজ্জ আদায় করবে। আগুন্তক বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমরা বিস্মিত হলাম তিনি একদিকে রসূলকে প্রশ্ন করলেন, আবার অপরদিকে রসূলের বক্তব্যকে সঠিক বলে আখ্যায়িত করছেন। 

এরপর তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আমাকে ঈমান সম্পর্কে কিছু বলুন। রসূলুল্লাহ (সা:) এর উত্তর দিলেন, ঈমান হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালা, তার ফেরেশতাগণ, তার কিতাবসমূহ, তার রসূলগণ এবং আখিরাতকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এ ছাড়া জীবন ও জগতে কল্যাণ-অকল্যাণ যা কিছু ঘটছে, সবই আল্লাহর ইচ্ছায় হচ্ছে অর্থাৎ তাক্বদীরের ভাল মন্দ- এ কথার উপরও বিশ্বাস করা। উত্তর শুনে আগুন্তক বললেন, “আপনি ঠিকই বলেছেন। 

অত:পর তিনি আবার নিবেদন করলেন, ‘আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন’। রসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, ইহসান হচ্ছে, “তুমি এমনভাবে ইবাদাত করবে যেন তুমি তাকে দেখছো। আর তুমি যদি তাকে না-ও দেখো, তিনি তোমাকে অবশ্য দেখছেন”। আগুন্তক এবার বললেন, “আমাকে ক্বিয়ামত সম্পর্কে বলুন”। উত্তরে রসূল (সা: ) বললেন, ক্বিয়ামাত সম্পর্কে যাকে জিজ্ঞেস কা হচ্ছে তিনি প্রশ্নকারীর চাইতে বেশী কিছু জানেন না”। 

আগুন্তক বললেন, “তবে ক্বিয়ামাতের নিদর্শন সম্পর্কে বলুন”। রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “ক্বিয়ামতের নিদর্শন হল, দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে, তুমি আরো দেখতে পাবে-খালি পায়ের উলঙ্গ কাঙ্গাল-রাখালরা বড় বড় অট্টালিকায় গর্ব ও অহংকার করবে”। উমার (রাযিঃ) বললেন, অত:পর আগুন্তক চলে গেলেন আর আমি কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করলাম। পরে রাসূল (সাঃ) আমাকে বললেন, “উমার, প্রশ্নকারীকে চিনতে পেরেছো”? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, “ইনি জিবরাঈল আমীন। তিনি তোমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেবার জন্যই এসেছেন” (সহীহ মুসলিম)।

আপনারা হয়তো অবাক হচ্ছেন এই হাদীসের সাথে চলচ্চিত্র অথবা নাটকের সম্পর্ক কোথায়? এখানে তো ইসলামের মৌলিক বিষয় শিক্ষা দেয়া হয়েছে। হ্যাঁ এখানে ইসলামের মৌলিক বিষয়ই শিক্ষা দেয়া হয়েছে। একটু খেয়াল করুন, এখানে জিবরাইল আঃ একজন বেদুইন মানুষের রূপ ধরে এসেছিলেন। হযরত মুহাম্মদ সঃ তাকে চিনতে পারলেন, কিন্তু তিনি এমন ভূমিকা করেছেন যেন আসলেই জিবরাইল আঃ আসলেই আগন্তুক। তিনি তাকে চিনেননা। আরো লক্ষ্য করুন এখানে যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে বিষয়গুলো তারা দুজনেই জানতেন অথচ তারা একজন অপরজনকে জিজ্ঞাসা করার মাধ্যমে অভিনয় করেছেন যাতে সাহাবারা এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারেন। এটাই নাটক, এই নাটকের সেলুলয়েড ও ইলেক্ট্রনিক্স রুপই তো চলচ্চিত্র। 

শিক্ষা প্রদানের নানানরকম কৌশল আছে। একেকজন একেকভাবে শিক্ষাকে আত্মস্থ করতে পারে। কেউ বই পড়ার মাধ্যমে, কেউ বক্তব্য শোনার মাধ্যমে, কেউ কাউওকে করতে দেখে ইত্যাদি নানানভাবে মানুষ শিক্ষাগ্রহণ করে। নাটক বা চলচ্চিত্র হচ্ছে এমনি একটি শিক্ষার মাধ্যম। সত্যিই তাই, আল্লাহর রাসূল স্বয়ং তা বলেছেন। হাদীসে জিবরাঈলের শেষে আল্লাহর রাসূল সঃ বলেছেন, “ইনি জিবরীল আমীন। তিনি তোমাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেবার জন্যই এসেছেন”

দেশ সমাজ ও জাতি গঠনে চলচ্চিত্রের ভূমিকা অপরিসীম। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে একটি জাতির প্রকৃত চরিত্র প্রতিফলিত হয়। সেই সাথে জাতির চরিত্রের উপরও চলচ্চিত্র বিশেষ প্রভাব ফেলে। চলচ্চিত্র দিয়েই ধীরে ধীরে মানুষের আচার-আচরণ, অভ্যাস, মূল্যবোধ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রিত হয়। এর মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব যেমন সৃষ্টি হয় ঠিক তেমনি নেতিবাচক প্রভাবও সৃষ্টি হয়। তাই বর্তমানে আমরা দেখতে পাই নাটক, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও সাহিত্যের মাধ্যমে অসত্য, অশ্লীল কিছু কার্যক্রম সমাজে ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে চলছে। অসাধু মানুষেরা এই শিল্পটিকে সমাজ ও ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এসব অশ্লীল ও অনৈতিক প্রভাবের কারণে ধর্মপ্রাণ কিছু মানুষ পুরো চলচ্চিত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চান এবং এই শিল্পটিকে মুসলমানদের জন্য অবৈধ বলে প্রচার করেন। 

ফলশ্রুতিতে নিষ্ঠাবান মুসলিম সমাজ চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে ক্রমেই দূরে সরে এসেছে এবং নিজেদেরকে এর থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। কিছু মানুষ গতিশীল, সমাজ গতিশীল। মানুষ যখন ভালো কিছু পাবে না তখন সে খারাপের পথে পা বাড়াবেই। নৈতিকতাসম্পন্ন মুসলিমরা চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে আসার কারণে এই অঙ্গন পুরোটাই অশ্লীল ও নৈতিকতা জ্ঞানহীন মানুষের করায়ত্তে চলে যায়। তাই আজ এই সমাজে ভালো কোন চলচ্চিত্র দেখতে পাওয়া যায় না। সেখানে তো শিক্ষার কিছুই নেই বরং সমাজ ধ্বংসের যাবতীয় উপাদান রয়েছে। এখন তাই চলচ্চিত্র মানেই অশ্লীল ও অনৈতিক বিষয়। 

শুধু চলচ্চিত্র নয় সমগ্র সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমরা আজ লক্ষ্য করছি অপসংস্কৃতির আগ্রাসন। এটার কারণ এই নয় যে আমাদের বিপরীত আদর্শের মানুষেরা অনেক মেধাবী, অনেক জ্ঞানী। আমরা তাদের সাথে পেরে উঠছি না বরং মূল বিষয় হলো আমাদের কূপমণ্ডূকতা, সংকীর্ণতা, ইসলামের সঠিক জ্ঞান ও বার্তা উপলব্ধি করতে না পারা। আমরা আমাদের ইসলামকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে বারবার আমাদের নানান সেক্টরে আমাদের পরাজয় নিশ্চিত করে চলেছি। সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। চলচ্চিত্রকে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে পরিণত করা শুধুই উচিত নয় বরং অত্যন্ত জরুরী। 

তাই চলচ্চিত্র অঙ্গনে ইসলামের বিজয় সুনিশ্চিত করতে হলে ইসলামী সংস্কৃতির ব্যাপক বিকাশ প্রয়োজন। শক্তিশালী একটি ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে ঈমানের অপরিহার্য দাবি। এ দাবি পূরণ করতে হলে কেবল সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা নয় বরং একটি সুপরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করা জরুরী। সাংস্কৃতিক চর্চা আর সাংস্কৃতিক আন্দোলন এক জিনিস নয়। আমাদের প্রয়োজন সংস্কৃতিক চর্চার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রতিটি মানুষ যেন নিজেকে ইসলামের রঙে রাঙিয়ে তোলার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও অব্যাহত গতিতে প্রাণিত হয় তার জন্য যে প্রচেষ্টা তারই নাম ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ইসলামী আন্দোলন যেমন জনগণকে ইসলামের দিকে প্রভাবিত করার মধ্যেই তার কাজকে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং সর্বস্তরে ইসলামের বিজয় চায়, তেমনি ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনও কেবলমাত্র কিছুসংখ্যক সাংস্কৃতিক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

আজকের শিশুরাই নেতৃত্ব দেবে আগামীর পৃথিবীকে। শিশুরা গাছের সবুজ চারার মতো। যদি আমরা সবচাইতে সুন্দর ও সতেজ চারা রোপণ করি তাহলে পৃথিবী হবে সুন্দর বাসযোগ্য। আর যদি আমরা তা না পারি তবে তা হবে ভবিষ্যত পৃথিবীর জন্য ভয়ঙ্কর বিষয়। শিশুরা দেখে দেখে শিখে। এই শিখাটাই তাদের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। যখন বড় হয় তখন এই শিক্ষাটাকেই তারা প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। গ্রিক বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো তার বিখ্যাত বই রিপাবলিকে লিখেছেন, আমাদের সর্বপ্রথম দায়িত্ব হলো গল্প লেখকদের ব্যাপারে খুব সতর্কতা অবলম্বন করা। তারা যদি ভালো গল্প লেখেন তাহলে আমরা গ্রহণ করব কিন্তু যদি খারাপ হয় তাহলে পরিহার করব। তারপর মায়েদের বা অভিভাবকদের কর্তব্য হলো যেসব গল্প ভালো এবং বিজ্ঞদের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য কেবল সেগুলোই শিশুদেরকে শোনানো। মনে রাখতে হবে গল্পের মাধ্যমে শিশুদের যে মন তৈরি হয় তা খেলাধুলা বা শারীরিক অনুশীলনের প্রশিক্ষণের চেয়ে বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মনে রাখতে হবে শিশুরা যাতে ভালো জিনিস শেখে সেভাবেই যেন চলচ্চিত্রের গল্প নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে ইরানী মুভি “দ্যা চিল্ড্রেন অব হ্যভেন” খুব সুন্দর মডেল হতে পারে। এরকম ইউনিক গল্প ছাড়াও সাহাবাদের অসাধারণ সব জীবনী নিয়ে নির্মিত মুভি শিশুদের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

শিশুরা সবসময় কার্টুন পছন্দ করে। সম্প্রতি সময়ে শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ছোটদের সিনেমা কার্টুনের ভয়ঙ্কর চরিত্রগুলো শিশুদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী প্রভাব বিস্তার করছে, বিশেষ করে শিশুরা রাগী মেজাজের হচ্ছে, যা চাচ্ছে তা পেতেই হবে এমন অসহিষ্ণু মানসিকতা তারা ধারণ করে। কারণ কার্টুনের চরিত্রগুলো এরকমই। বর্তমান সময়ে বাবা-মার পরিবর্তে সিনেমা বা কার্টুনের চরিত্রগুলো শিশুদের বেশি প্রিয়। শিশুদের ধর্ম হচ্ছে যার সান্নিধ্যে বেশি থাকবে তাকেই অনুকরণ করবে, তাকেই ভালোবাসবে। শিশুরা কার্টুনের সান্নিধ্যে বেশি থাকায় কার্টুনের চরিত্রগুলো ওদের আদর্শ। তাই এসব কার্টুন চরিত্রগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা দরকার যাতে শিশুরা আদর্শবান মানুষে পরিণত হতে পারে। 

সমাজ গঠনে চলচ্চিত্র ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। চলচ্চিত্রে উদ্ভট গল্প না হয়ে যদি বাস্তবজীবনের সাথে মিল রেখে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয় তবেই তা হবে সবচেয়ে বেশী ইফেক্টিভ। বাংলাদেশের আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা চলচ্চিত্রকে শুধুমাত্র বিনোদন হিসেবে নেয়া হয়েছে। অথচ চলচ্চিত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো “শিক্ষা”। শিক্ষার পাশাপাশি বিনোদন হলে মানুষ যে কোন জিনিস ভালোভাবে আত্মস্থ করতে পারে। তাই নিষ্ঠাবান মুসলিমদের উচিত খুব দ্রুতই আল্লাহর রাসূল সঃ প্রদর্শিত এই শিক্ষার মাধ্যমকে ব্যবহার করে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা রাখা। এটা শুধু উচিত নয় বরং অতিশয় জরুরী।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন