২৯ জুন, ২০১৬

আকিমুস সালাহ বলতে আসলে কী বুঝায়?


‘কায়েম করা’ কথাটির অর্থ হচ্ছে, প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বারংবার নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। কুরআনে নানানভাবে নামাজের কথা এসেছে প্রায় ১০৪ বার এবং প্রায় ১৮ বার আল্লাহ তায়ালা আদেশ সূচকভাবে নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। নামাজ কায়েম বলতে আমরা সাধারণত নামাজের অনুষ্ঠান বাস্তবায়নকে বুঝি। অর্থাৎ আমরা সাধারণত যা বুঝি নিজে নামাজ পড়া অন্যদেরকে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করাই হচ্ছে আকিমুস সালাহ বা নামাজ কায়েম। আসলে আকিমুস সালাহ বলতে কী বুঝায় তা আমরা আজ আলোচনা করার চেষ্টা করবো। 

নামায প্রতিষ্ঠা দুই ধরণের হতে পারে 
১- ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠা 
২- সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা 

ব্যক্তির মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠা আবার দুই ধরণের হতে পারে 
ক- নামাজকে ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা
আমরা অনেকেই স্মার্ট ফোন ইউজ করি। আপনারা জানেন এসব স্মার্ট ফোনে কিছু এপস বা কিছু প্রোগ্রাম প্রথম থেকেই ইন্সটল করা থাকে আবার কিছু প্রোগ্রাম পরবর্তীতে আমাদের প্রয়োজন অনুসারে ইন্সটল করি। ঠিক তেমনি আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেহে কিছু প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার বা এপস শুরু থেকেই ইন্সটল করে দিয়েছেন। যেমন আমরা নিঃশ্বাস নেই, ক্ষুদা লাগলে খাই, ক্লান্তি লাগলে ঘুমাই ইত্যাদি। এরপর আমরা যখন আস্তে আস্তে বড় হই তখন কিছু কিছু ব্যাপার আমরা নিজেরা নিজেদের খুশিমত ইন্সটল করে নিই যেমন কেউ গান শোনা ছাড়া থাকতে পারি না, কেউ গল্পের বই পড়তে পড়তে প্রচুর সময় ব্যয় করি, কেউ প্রচুর খেলাধুলা করি, কেউ প্রচুর টিভি দেখি ইত্যাদি। আমরা যারা যেগুলো ইন্সটল করে নিয়েছি সেগুলো ছাড়া আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। কোন কারণে টিভি না দেখলে বা না গান শুনলে বা না বই পড়লে আমাদের কাছে সব এলোমেলো লাগে। এটাই হচ্ছে আপনি বা আমি এই বিষয়গুলোকে নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছি। ঠিক তেমনি নামাজও এইভাবে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয় আছে। কেউ যদি নামাযকে তার নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে নেয় তখন নামাজের সময় হওয়া মাত্রই সে অস্থির হয়ে পড়বে। নামায পড়ার জন্য তার মন আনচান করবে। তাদের অন্তর থাকবে মসজিদের সাথে লাগোয়া। 

আল্লাহর রাসূল সঃ বলেছেন, আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেছেন যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। এর মধ্যে এক ধরণের ব্যক্তি যার ক্বলব মসজিদের সাথে লেগে রয়েছে। 
সহীহ বুখারীঃ ৬২৭ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) 

নামাজকে নিজের মধ্যে ইন্সটল বা প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতি হচ্ছে বার বার নামাজ পড়া। নামাজের প্রতি সচেতন থাকা। নামাজ না পড়ার শাস্তি এবং আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার শাস্তি স্মরণ করা। এভাবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নামাজ আমাদের শরীরে এবং ক্বলবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইনশাআল্লাহ্‌। 

খ- নামাজের শিক্ষাকে ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা 
শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক নামাজ আদায় করলেই নামাজ কায়েমের হক আদায় হয় না। বরং নামাজ থেকে শিক্ষাগ্রহন করে সেই শিক্ষা নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করাও নামাজ কায়েম তথা নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই ব্যাপারে রাসূল সঃ এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে, আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুক মহিলা নামাজ ও যাকাতে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তবে সে নিজের মুখ দ্বারা তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, সে জাহান্নামী। লোকটি আবার বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুক মহিলা সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে কম (নফল) রোজা রাখে, কম (নফল) সদকা করে এবং নামাজও (নফল) কম পড়ে। তার দানের পরিমাণ হলো পনিরের টুকরাবিশেষ। কিন্তু সে নিজের মুখ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। রাসূল সা. বললেন, সে জান্নাতী।
(আহমাদ ও বায়হাকী, শো’আবুল ঈমান)

এই হাদীস থেকে যে বিষয়টা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো নামাজ নিয়মিত পড়েও যদি কোন ব্যক্তি নামাজের শিক্ষাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে না পারেন, নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন তাহলে তিনি নামাজ কায়েম করতে পারেন নি। তার নামাজ পড়া কোন কাজে আসবে না। তাই আমাদের নামাজ আদায়ের সাথে সাথে নিজের জীবনে নামাজের শিক্ষা কায়েম করা একান্ত কর্তব্য। এটি আকিমুস সালাহর অংশ। 

আসুন আমরা নামাজ থেকে যে শিক্ষাগুলো পাই সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি। 
১. সকল কাজে আল্লাহকে স্মরণ করা। 
সূরা ত্বোয়াহ’র ১৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমিই আল্লাহ আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার এবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। আমরা যে কাজই করি না কেন আমরা অবশ্যই সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করবো। প্রতিটা কাজ করার পূর্বে চিন্তা করবো আল্লাহ আমাকে দেখছেন, এই কাজের জন্য আমাকে জবাবাদিহি করতে হবে। এভাবে আল্লাহকে স্মরণ করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে আমাদের দ্বারা পাপ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এটাই নামাজের শিক্ষা। 

২. আল্লাহর আদেশ মানার মানসিকতা সৃষ্টি করা
সূরা বাকারার ১৭৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা মুখ পূর্ব দিক করলে না পশ্চিম দিক করলে, এটি কোন সওয়াব বা কল্যাণের কাজ নয়। বরং সওয়াব বা কল্যাণের কাজ সে-ই করে, যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদের বিশ্বাস করে বা মান্য করে। আর শুধু আল্লাহর ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর ধনসম্পদকে আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন, পথিক, সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাস মুক্তির জন্যে ব্যয় করে এবং নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে, ওয়াদা করলে তা পূরণ করে, দারিদ্র্য, বিপদ-আপদ ও হক বাতিলের দ্বন্দ্বের সময় ধৈর্য ধারণ করে। এরাই (ঈমানের ব্যাপারে) সত্যবাদী এবং এরাই মুত্তাকী।
এখানে আল্লাহ তায়ালা নামাজে আমরা কোনদিক ফিরে দাঁড়াবো সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন, মূল কথা হলো আল্লাহ যা বলেছেন তা করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। একজন মু’মিনের কাজের মানদণ্ড হবে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সঃ। তাদের কথার বা আদেশের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। 

৩. আল্লাহর আদেশ-নিষেধ আল-কুরআন থেকে জানার মানসিকতা তৈরি করা: নামাজে কুরআন পড়তে হয় যা থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হলো আমাদের আদেশ নিষেধ জানা তথা জ্ঞানের উৎস হলো আল কুরআন। 

৪. সতর ঢাকা বা পর্দার শিক্ষা 
নামাজে সতর ঢাকা পূর্বশর্ত। এর মাধ্যমে আমাদের পর্দা শেখানো হয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত যৌক্তিক ও উপকারী। শরীয়ত বিশেষ কোনো পোশাক সুনির্দিষ্ট করে দেয়নি এবং কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন বা আকৃতিও বলে দেয়নি যে, এ ধরনের পোশাকই তোমাদের পরতে হবে; বরং বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল, আবহাওয়া ও মৌসুম ভেদে পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে কিছু মৌলিক নীতি ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, এ ধরনের পোশাক গ্রহণীয় ও এ ধরনের পোশাক বর্জনীয়।

এক. পোশাক এমন আঁটসাঁট ও ছোট মাপের হতে পারবে না, যা পরলে শরীরের সাথে লেপ্টে থাকে এবং দৈহিক গঠন ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুটে ওঠে।

আবু ইয়াযীদ মুযানী রাহ. বলেন, হযরত ওমর রা. মহিলাদেরকে কাবাতী (মিসরে প্রস্ত্ততকৃত এক ধরনের সাদা কাপড়) পরতে নিষেধ করতেন। লোকেরা বলল, এই কাপড়ে তো ত্বক দেখা যায় না। তিনি বললেন, ত্বক দেখা না গেলেও দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুটে ওঠে।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ২৫২৮৮

দুই. পোশাক এমন পাতলা ও মিহি হতে পারবে না যাতে শরীর দেখা যায় এবং সতর প্রকাশ পেয়ে যায়। যেমন পাতলা সুতির কাপড়, নেটের কাপড় ইত্যাদি। অবশ্য পাতলা কাপড়ের নিচে সেমিজ জাতীয় কিছু ব্যবহার করলে তা জায়েয হবে। হযরত আলকামা ইবনে আবু আলকামা তার মা থেকে বর্ণনা করেন যে, একবার হাফসা বিনতে আবদুর রহমান তার ফুফু উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর নিকটে এল। তখন তার পরনে ছিল একটি পাতলা ওড়না। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং একটি মোটা ওড়না পরিয়ে দিলেন।-মুয়াত্তা মালেক ২/৯১৩, হাদীস : ৬

তিন. পোশাকের ক্ষেত্রে কাফের-মুশরিক ও ফাসেক লোকদের অনুসরণ-অনুকরণ ও সাদৃশ্য অবলম্বন করা যাবে না। বিশেষত সেইসব পোশাকের ক্ষেত্রে যা অমুসলিমদের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে‘উসফুর’ (ছোট ধরনের লাল বর্ণের ফুল গাছ) দ্বারা রাঙানো দুটি কাপড় পরতে দেখে বললেন,‘এগুলো হচ্ছে কাফিরদের পোশাক। অতএব তুমি তা পরিধান করো না।’-সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২০৭৭; নাসায়ী, হাদীস : ৫৩১৬

তাছাড়া অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-যে ব্যক্তি অন্য কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই দলভুক্ত। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০২৭

চার. পোশাকের মাধ্যমে অহংকার ও লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ উদ্দেশ্য হওয়া যাবে না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-যে ব্যক্তি দুনিয়াতে সুখ্যাতি ও প্রদর্শনীর পোশাক পরবে আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন।-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৬২৪৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০২৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি অহংকারবশত মাটিতে কাপড় টেনে টেনে চলে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৭৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২০৮৭

পাঁচ. পুরুষদের জন্য মেয়েলী পোশাক এবং নারীদের জন্য পুরুষদের পোশাক পরা এবং একে অন্যের সাদৃশ্য গ্রহণ করা নিষেধ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সব পুরুষের উপর লানত করেছেন, যারা নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে (তাদের মতো আকৃতি, তাদের পোশাক ও তাদের চাল-চলন গ্রহণ করে)। আর সেই সব নারীর উপরও লানত করেছেন, যারা পুরুষের সাদৃশ্য গ্রহণ করে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩৮৮৫

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নারীর পোশাক পরিধানকারী পুরুষকে এবং পুরুষের পোশাক পরিধানকারিনী নারীকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০৯২

ছয়. পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে অপচয় ও অপব্যয় করা, বিলাসিতা করার জন্য বা শখের বশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক ক্রয় করা অথবা মাত্রাতিরিক্ত উচ্চমূল্যের পোশাক ক্রয় করা নিষেধ।

হযরত আমর ইবনে শুআইব তার পিতা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা খাও, পান কর, অন্যদের দান কর এবং কাপড় পরিধান কর যে পর্যন্ত অপচয় ও অহংকার করা না হয়।-সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২৫৫৯; ইবনে মাজাহ,হাদীস : ৩১০৫

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, যা মনে চায় খাও, যা মনে চায় পরিধান কর যে পর্যন্ত দুটি বিষয় না থাকে : অপচয় ও অহংকার।-সহীহ বুখারী ১০/১৫২

সাত. গায়রে মাহরাম ও পর পুরুষের সামনে অলংকার ও পোশাকের সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে না, যাতে তারা সেদিকে আকৃষ্ট হয়।

ولا يبدين زينتهن الا ما ظهر منها

তারা যেন নিজেদের ভূষণ প্রকাশ না করে।

উক্ত আয়াতে নারীদেরকে হুকুম করা হয়েছে তারা যেন গায়রে মাহরাম বা পর পুরুষের সামনে নিজেদের পুরো শরীর বড় চাদর বা বোরকা দ্বারা আবৃত করে রাখে। যাতে তারা সাজ-সজ্জার অঙ্গসমূহ দেখতে না পায়।

ইমাম যাহাবী রাহ. বলেন, যে সব কর্ম নারীর উপর লানত করে তা হল অলংকার ও আকর্ষণীয় পোশাকের সৌন্দর্য প্রকাশ করা। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার ...। আলকাবায়ের পৃ. ১০২

وقرن فى بيوتكن ولا تبرجن تبرج الجاهلية الاولى

নিজ গৃহে অবস্থান কর সাজ-সজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না। যেমন প্রাচীন জাহেলী যুগে প্রদর্শন করা হত।

প্রাচীন জাহেলী যুগে নারীরা নির্লজ্জ সাজ-সজ্জার সাথে নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াত। আজকের নব্য জাহেলিয়াতের অশ্লীলতা এতটাই উগ্র যে, তার সামনে প্রাচীন জাহেলিয়াত ম্লান হয়ে গেছে।

আট. পুরুষের জন্য টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে কাপড় নিষেধ এবং তা কবীর গুনাহ।

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কাপড়ের যে অংশ টাখনুর নীচে যাবে তা (টাখনুর নীচের অংশ) জাহান্নামে জ্বলবে।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৭৮৭

হযরত আবু হুবাইব ইবনে মুগাফফাল গিফারী রা. মুহাম্মাদ কুরাশীকে লুঙ্গি টেনে চলতে দেখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন-আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘যে অহংকারবশত পায়ের নীচে কাপড় ফেলে চলবে সে জাহান্নামে গিয়ে এভাবে চলবে।’-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৫৫৪২

৫. সময়ানুবর্তিতা শিক্ষা 
নামায সময়মত পড়তে হয়। সময়মত না পড়লে নামাজ হয় না। এই ব্যাপারে সূরা মাউনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ঐসব মুসল্লিদের জন্য ধ্বংস যারা তাদের নামাজের (সময়ের) ব্যাপারে গাফেল। এই সময়ানুবর্তিতার ব্যাপারে শুধু নামাজে নয় নামাজের বাহিরেও সকল কাজে সচেতন থাকা নামাজের শিক্ষা। 

৬. শরীর সুস্থ ও সবল রাখার শিক্ষা
আল্লাহ তায়ালা সূরা মায়েদায় বলেন, হে মুমিনগণ, যখন তোমরা সালাতে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা (ধৌত কর)। আর যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে ভালোভাবে পবিত্র হও। আর যদি অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাক অথবা যদি তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে অথবা তোমরা যদি স্ত্রী সহবাস কর অতঃপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম কর। সুতরাং তোমাদের মুখ ও হাত তা দ্বারা মাসেহ কর। (নামাজের আগে ওজু গোসল করার শর্ত আরোপের দ্বারা) তোমাদের অহেতুক অসুবিধায় ফেলা (কষ্ট দেয়া) আল্লাহর ইচ্ছা নয়, বরং এর মাধ্যমে তিনি তোমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন (পবিত্র) করতে চান (বা করার শিক্ষা দিতে চান) এবং তোমাদের জন্যে তাঁর নেয়ামত (কল্যাণ কামনা) পরিপূর্ণ করে দিতে চান, যাতে তোমরা (কল্যাণপ্রাপ্ত ও খুশি হয়ে) তাঁর গুণগান করতে পার। (মায়েদাহ : ০৬)

ক. নামাজের আগে শরীর, কাপড় ও জায়গা পাক তথা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার শর্তের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মানুষকে তাদের শরীর, পোশাক-পরিচ্ছদ ও পরিবেশকে ঘন ঘন ধোয়া-মোছার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার শিক্ষা দিয়েছেন। আর এভাবে তিনি তাদের নানা ধরনের রোগের হাত থেকে মুক্ত থাকার এক সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন।

খ. ব্যায়াম করা ও ব্যায়ামে কী কী অঙ্গভঙ্গি করতে হবে তা শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে রোগমুক্ত রাখার ব্যবস্থা

গ. মেসওয়াক করার মাধ্যমে শরীর সুস্থ রাখার শিক্ষা। পাঁচবার ওজুর সময় কেউ যদি নিয়মিত মেসওয়াক করে তার দাঁত ও মুখের রোগ অনেক কম হবে।

নামাজকে সমাজে প্রতিষ্ঠা: সমাজে নামাজকে প্রতিষ্ঠা দুইভাবে হতে পারে 

ক- ফরজ নামাজ জামায়াতের সাথে পড়ে নামাজের অনুষ্ঠানকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা। 
নামাজের অনুষ্ঠানটির আরকান-আহকামসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানুষকে শিক্ষা দিয়ে, মসজিদ নির্মান করে সেখানে নামাজ পড়তে পারার ব্যবস্থা করা। যখনই নামাজের আহ্বান হবে তখন সকল কাজ বাদ দিয়ে নামাজে অংশগ্রহন করার ব্যবস্থা করা। ইসলামিক সমাজে সকল মুসলিমের জন্য নামাজের জামায়াতে শরিক হওয়া বাধ্যতামূলক করা। এই প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামীন বলেন, হে ব্যক্তিগণ, যারা ঈমান এনেছ, জুমআর দিন যখন নামাজের জন্যে (আজানের মাধ্যমে) ডাকা হয়, তখন বেচা-কেনা রেখে আল্লাহর স্মরণের দিকে (নামাজের দিকে) দ্রুত চলে যাও। এটি তোমাদের জন্যে উত্তম যদি জানতে।
(জুমআ : ৯)
সূরা বাকারার ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। 
এই ধরনের অনুষ্ঠান নিয়মিত পালন এবং এর ব্যবস্থা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধানেরও। সূরা হজ্জের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘তারাই ঐসব লোক, যাদেরকে যদি আমি দুনিয়াতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করি, তারা নামায কায়েম করে, যাকাত চালু করে, ভালো কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। আর সকল বিষয়ের শেষ ফল আল্লাহরই হাতে”। ইসলামী সরকার কর্তৃক যে কাজগুলো করা জরুরী-

ক. সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত জামাআতে নামাযের ব্যবস্থা করতে হবে। সকল মুসলমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জামাআতে শরীক হওয়ার ব্যবস্থা করা। 

খ. সরকারি হুকুমের ফলে দেশে সকল প্রতিষ্ঠানে জামাআতে নামাযের সুব্যবস্থা থাকবে।

গ. জামাআতে নামায আদায় করার জন্য সব স্থানে মসজিদ তৈরী হবে।

ঘ. ছোট বয়স থেকে সকল মুসলিম ছেলেমেয়েকে শুদ্ধভাবে নামায শেখানোর সুব্যবস্থা করতে হবে।

ঙ. নামায যে শুধু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয় এবং নামাযের উদ্দেশ্য যে উন্নত চরিত্র গঠন করা, সে বিষয়ে সবাই সচেতন হবে।

চ. এমন পরিবেশ গড়ে তোলা, যাতে সবাই নিয়মিত জামাআতে হাজির হওয়ার জন্য তৎপর হবে।

এই জামায়াতে নামাজের অনুষ্ঠানটি কতটা জরুরী এই প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সঃ এর হাদীস থেকে পাই, আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, আল্লাহর কসম, আমার ঐ সব মুসলমানের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে যারা (বিশেষ ওজর ছাড়া) আযানের পর জামায়াতে নামাজ পড়তে না এসে, ঘরে একা নামাজ পড়ে।

উপরে বর্ণিত কুরআন ও হাদীসের বক্তব্য থেকে অতি সহজে বুঝা যায় যে, ইসলাম জামায়াতে নামাজ পড়াকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি কাজ বন্ধ রেখে জামায়াতে নামাজ পড়তে আসা অনেক উত্তম। 

খ- জামায়াতে নামাজের সামাজিক শিক্ষা:
১. সমাজের সদস্যদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, ভালবাসা ইত্যাদি সামাজিক গুণ সৃষ্টি করা
পবিত্র কুরআনের সূরা হুজুরাতের ১০ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, মুমিনরা পরস্পরের ভাই। আল্লাহ এখানে বলছেন, এক ভাইয়ের অন্তরে অন্য ভাইয়ের জন্যে যেমন সহানুভূতি, সহমর্মিতা, স্নেহ-শ্রদ্ধা, ভালবাসা ইত্যাদি থাকে, একজন মুমিনের অন্তরেও ঠিক অন্য মুমিনের জন্যে অনুরূপ অনুভূতি থাকবে।
রাসূল সা. বলেছেন, মুসলমানদের সমাজ একটি দেহের মত। দেহের কোথাও কোন ব্যথা বা কষ্ট হলে সমস্ত দেহে তা অনুভূত হয়। আবার দেহের কোথাও সুখ অনুভূত হলে তাও সমস্ত শরীরে অনুভূত হয়। মুসলমানদের সমাজও হতে হবে অনুরূপ। অর্থাৎ তাদের সমাজের কোন ব্যক্তির উপর কোন দুঃখ-কষ্ট আসলে সমাজের সকলের উপরও তার ছাপ পড়তে হবে এবং সবাইকে সেটি দূর করারও চেষ্টা করতে হবে। আবার সমাজের কারো কোন সুখের কারণ ঘটলেও সমাজের সকলের উপর তার ছাপ পড়তে হবে।

‘মুমিনরা পরস্পরের ভাই’ কথাটি বলেই আল্লাহ ছেড়ে দেন নাই। ভাইয়ের অন্তরে ভাইয়ের জন্যে যেমন স্নেহ-শ্রদ্ধা, মমতা, ভালবাসা, সহমর্মিতা ইত্যাদি থাকে তেমন মুসলমানদের সমাজের সদস্যদের পরস্পরের অন্তরেও অনুরূপ গুণাবলী সৃষ্টি করার জন্যে, তিনি ব্যবস্থা দিয়েছেন জামায়াতে নামাজের। আর এটি জামায়াতে নামাজ পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ, ওঠা-বসা যত বেশি হয়, ততই একজনের প্রতি আর একজনের মায়া-মহব্বত, স্নেহ-মমতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি বেশি হয়। আর তা না হলে ঐ সবগুলো বিষয়ই ধীরে ধীরে কমে যায়। জামায়াতে নামাজ মুসলমানদের সমাজের একজনের সঙ্গে আর একজনের সেই দেখা-সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। 

২. শৃঙ্খলার শিক্ষা
সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যতীত কোন জাতি উন্নতি করতে পারে না। জামায়াতে নামাজের মাধ্যমে মুসলমানদের সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অপূর্ব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার মুসলমানও যদি জামায়াতে দাঁড়ায়, তবুও দেখবেন, সোজা লাইনে দাঁড়িয়ে, কী সুন্দর শৃঙ্খলার সঙ্গে তারা একটি কাজ করছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের শিক্ষা দিতে চাচ্ছেন, তারা যেন ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি কাজ সুশৃঙ্খলভাবে করে। এত সুন্দর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সামাজিক শৃঙ্খলার অবস্থা দেখলে সত্যিই দুঃখ হয়।
৩. সাম্যের শিক্ষা
পবিত্র কুরআনের সূরা হুজরাতের ১৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, হে মানুষ, আমি তোমাদের একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সেই সব থেকে বেশি সম্ভ্রান্ত, যার অন্তরে আল্লাহভীতি সব থেকে বেশি।

আল্লাহ এখানে বলছেন, তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একজন পুরুষ ও একজন মহিলা থেকে। এরপর তিনি তাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন। তবে এই বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করার পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য পরস্পর সম্মান ও মর্যাদা নির্ণয় করা নয় বরং পরস্পরকে সহজে চেনার ব্যবস্থা করা। এরপর আল্লাহ বলেছেন, তাঁর নিকট মানুষের সম্মান-মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে আল্লাহভীতি। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় যার অন্তরে যত বেশি, আল্লাহর নিকট সে তত বেশি মর্যাদাশীল। আল্লাহর ভয়ই মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে দূরে রাখে এবং ন্যায় কাজ করতে বাধ্য করে। তাহলে আল্লাহ বলছেন, ন্যায় কাজ করা বা বাস্তবায়ন করা এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকা বা তা প্রতিরোধ করাই হচ্ছে মানুষের মর্যাদাশীল হওয়ার মাপকাঠি। বংশ, জাতি, ধনী-গরীব, কালো-সাদা, মনিব-চাকর ইত্যাদি নিয়ে যেন অহংকার সৃষ্টি না হতে পারে, সে জন্যে তিনি কর্মপদ্ধতিও তৈরি করে দিয়েছেন। সেই কর্মপদ্ধতি হচ্ছে ‘জামায়াতে নামাজ’। একজন মুসলমান দিনে পাঁচবার জামায়াতে নামাজের সময় তার বংশ, ভাষা, গায়ের রং, অর্থনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি পরিচয় ভুলে গিয়ে অন্য মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে এক লাইনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় মনিবের পাশেই তাঁর ভৃত্য দাঁড়াতে পারে বা মনিবের মাথা যেয়ে লাগতে পারে সামনের কাতারে দাঁড়ানো তাঁর ভৃত্যের পায়ের গোড়ালিতে। এভাবে দিনে পাঁচবার বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুসলমানদের অন্তর থেকে বংশ, বর্ণ, ভাষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ভিত্তিক অহংকার সমূলে দূর করার অপূর্ব ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৪. সমাজ পরিচালনা পদ্ধতির বাস্তব শিক্ষা
মানবসমাজের সুখ, শান্তি, উন্নতি, প্রগতি ইত্যাদি নির্ভর করে সুষ্ঠুভাবে সমাজ পরিচালনার ওপর। সুষ্ঠুভাবে সমাজ পরিচালনা করতে হলে কী কী বিষয় দরকার, জামায়াতে নামাজ পড়ার মাধ্যমে আল্লাহ প্রতিদিন পাঁচ বার তা মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সেই বিষয়গুলো হচ্ছে-

ক. নেতা নির্বাচন করা
জামায়াতে নামাজের সময়, একের অধিক লোক হলেই একজন ইমাম বা নেতা বানাতে হয়। এখান থেকে আল্লাহ শিক্ষা দিচ্ছেন, কোন সামাজিক কর্মকাণ্ড, যেখানে একের অধিক লোক জড়িত, তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে হলে একজন নেতা অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে।

খ. পুরুষ না মহিলা নেতা
জামায়াত যদি শুধু পুরুষের হয় বা পুরুষ ও মহিলা মিশ্রিত হয়, তাহলে পুরুষ ইমাম হবে। কিন্তু জামায়াত যদি শুধু মহিলাদের হয়, তবে সেখানে মহিলা ইমাম হতে পারবে। এ থেকে আল্লাহ শিক্ষা দিতে চাচ্ছেন, যে সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড পুরুষ ও মহিলা অধ্যুষিত বা শুধু পুরুষ অধ্যুষিত, সেখানে পুরুষই নেতা হবে। আর যে সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড শুধু মহিলা অধ্যুষিত, সেখানে মহিলা নেতা হতে পারবে।

এর কারণ হল, পুরুষ ও মহিলা মিশ্রিত সামাজিক কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে চালাতে হলে, একটি বিশেষ দৈহিক, বুদ্ধি-বৃত্তিক ও মানসিক গঠন দরকার। যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সব থেকে ভাল জানেন, ঐ ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে ঐ তিনটি গুণের প্রয়োজনীয় সমন্বয় কার মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভাল আছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে তিনি পুরুষকেই সে দায়িত্ব দিয়েছেন। আর এটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে আল্লাহ বলেছেন, সূরা নিসার ৩৪ নং আয়াতে। পুরুষেরা হচ্ছে নারীর পরিচালক। কারণ, আল্লাহ তাদের একজনকে অপরের উপর বিশিষ্টতা দান করেছেন।

গ. নেতা হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাগুণ
যে গুণাবলী থাকলে কোন ব্যক্তি নেতা হতে পারবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুণগুলো রাসূল সা. সুন্দরভাবে মুসলমানদের জানিয়ে দিয়েছেন, নামাজের ইমাম হওয়ার গুণাবলী বর্ণনাকারী নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে-
হযরত আবু মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : মানুষের ইমামতি করবে সে-ই, যে কুরআন ভাল পড়ে। যদি কুরআন পড়ায় সকলে সমান হয়, তবে যে সুন্নাহ বেশি জানে। যদি সুন্নাহেও সকলে সমান হয়, তবে যে হিজরত করেছে সে। যদি হিজরতেও সকলে সমান হয়, তবে যে বয়সে বেশি। কেউ যেন অপর ব্যক্তির অধিকার ও সেইস্থলে ইমামতি না করে এবং তার বাড়িতে তার সম্মানের স্থলে অনুমতি ব্যতীত না বসে। (মুসলিম)

এ হাদীসটিতে রাসূল সা. ইমাম হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাগুণ বা যোগ্যতাগুলো যে ক্রম অনুযায়ী উল্লেখ করেছেন, তা হচ্ছে-
ক. শুদ্ধ করে পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকা,
খ. সুন্নাহ তথা হাদীসের জ্ঞান থাকা,
গ. হিজরত করা এবং
ঘ. বেশি বয়স।
হযরত আবু সায়ীদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যখন তিন ব্যক্তি হবে, তখন যেন তাদের মধ্য হতে একজন ইমামতি করে এবং ইমামতির অধিকার তার, যে কুরআন অধিক ভাল পড়ে। (মুসলিম)

আমর ইবনে সালেমা রা. বলেন, আমরা লোক চলাচলের পথে একটি কূপের নিকট বাস করতাম, যেখান দিয়ে আরোহীগণ চলাচল করত। আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করতাম, মানুষের কী হল? তারা যে লোকটি সম্বন্ধে বলে তিনি কে? তারা উত্তর করত, লোকটি মনে করে তাকে আল্লাহ রাসূল করে পাঠিয়েছেন এবং তার প্রতি এইরূপ ওহী নাযিল করেছেন। তখন আমি ওহীর বাণীটি এমনভাবে মুখস্থ করে নিতাম যে তা আমার অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে যেত। আরবগণ যখন ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে মক্কা বিজয়ের অপেক্ষা করছিল, তখন তারা বলত তাকে (মুহাম্মাদকে) তার গোত্রের সাথে বুঝতে দাও। যদি সে তাদের উপর জয়লাভ করে তখন বুঝা যাবে, সে সত্য নবী। যখন মক্কা বিজয়ের ঘটনা ঘটল, তখন সকল গোত্রই ইসলাম গ্রহণে তাড়াহুড়ো করল এবং আমার পিতা গোত্রের অন্য সকলের আগে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি গোত্রে ফিরে এসে বললেন, আল্লাহর কসম আমি তোমাদের নিকট এক সত্য নবীর নিকট থেকে ফিরে এসেছি। তিনি বলে থাকেন, এই নামাজ এই সময় পড়বে এবং ঐ নামাজ ঐ সময় পড়বে। যখন নামাজের সময় উপস্থিত হবে, তখন তোমাদের মধ্য হতে কেউ যেন আযান দেয় এবং তোমাদের মধ্যে ইমামতি যেন সেই ব্যক্তি করে যে অধিক কুরআন জানে। তখন লোকেরা দেখল, আমার অপেক্ষা অধিক কুরআন জানে এমন কেউ নেই। কেননা আমি পথিকদের নিকট হতে পূর্বেই তা মুখস্থ করে নিয়েছিলাম। তখন তারা আমাকেই তাদের আগে বাড়িয়ে দিল অথচ তখন আমি ছয় কি সাত বছরের বালকমাত্র।  (বুখারী)

এ হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, নামাজের ইমাম হওয়ার জন্যে কুরআনের জ্ঞান থাকা বয়সের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল সা. এর হিজরতের পূর্বে যখন প্রথম মুহাজির দল মদীনা পৌঁছলেন, তখন আবু হুযায়ফার গোলাম সালেম রা. তাদের ইমামতি করতেন। অথচ তাদের মধ্যে তখন ওমর এবং আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদের ন্যায় লোকও বিদ্যমান ছিলেন। (বুখারী)

হযরত সালেহ একদিকে যেমন কুরআনের বড় জ্ঞানী ছিলেন, অপরদিকে তিনি বড় কারীও ছিলেন। রাসূল সা. যে চার ব্যক্তির নিকট থেকে কুরআন শিখতে বলেছিলেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। এ হাদীসটি থেকে বুঝা যায়, ইমাম হওয়ার যোগ্যতার মধ্যে শুদ্ধ করে পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকার গুরুত্ব বংশ, গোত্র, দেশ অথবা মনিব, গোলাম ইত্যাদির চেয়ে ওপরে।
উল্লিখিত হাদীসগুলো থেকে নিশ্চয়তা দিয়েই বলা যায়, নামাজের ইমাম হওয়ার যোগ্যতা বা গুণাগুণগুলোর প্রথম চারটিকে গুরুত্বের ক্রম অনুযায়ী রাসূল সা. যেভাবে সাজিয়ে দিয়েছেন বা উল্লেখ করেছেন, তা হচ্ছে-
১. শুদ্ধ করে কুরআন পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকা,
২. হাদীসের জ্ঞান থাকা,
৩. হিজরত করা এবং
৪. বয়স। 

কুরআনের জ্ঞান ও হাদীসের জ্ঞান থাকা খুব সহজে বুঝা গেলেও হিজরত আমাদের সাধারণত বুঝাটা একটু কষ্টকর। মদীনার প্রাথমিক সময়ে হিজরত ছিল সবচেয়ে বড় আমল যা করতে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। হিজরত করেছেন তারা যারা দ্বীন কায়েমের জন্য তাদের সকল সহায় সম্পত্তি আত্মীয় স্বজন বিসর্জন দিয়েছেন। এখনো আমাদের দেশে যারা দ্বীন কায়েমের পথে নিয়োজিত আছেন। শ্রম দিচ্ছেন ত্যাগ স্বীকার করছেন তারা নেতা হওয়ার জন্য অধিকতর যোগ্য। 

ঘ. নেতা নির্বাচন পদ্ধতির শিক্ষা
মুসলিম সমাজ বা দেশের নেতা তথা কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার পরিষদের নেতা কী পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচন করতে হবে সেটি মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন নামাজের ইমাম নির্বাচনের পদ্ধতির মাধ্যমে, যা প্রত্যেক নামাজীকে প্রতিদিন পাঁচবার অনুশীলন করতে হয়। নামাজের ইমাম নির্বাচনের ঐ পদ্ধতি রাসূল সা. জানিয়ে দিয়েছেন নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে,
ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ কবুল হবে না।  যে কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয়েছে অথচ তারা তাকে পছন্দ করে না, যে নামাজ পড়তে আসে দিবারে। আর দিবার হল- নামাজের উত্তম সময়ের পরের সময়কে এবং যে কোন স্বাধীন নারীকে দাসীতে পরিণত করে। (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।

আবু উমামা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের কানের সীমা অতিক্রম করে না (অর্থাৎ কবুল হয় না) পলাতক দাস যতক্ষণ না সে ফিরে আসে, যে নারী রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট এবং গোত্র বা জাতির ইমাম কিন্তু মানুষ তাকে পছন্দ করে না। (তিরমিযী, তবে হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী গরীব বলেছেন)

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের মাথার উপর এক বিঘতও ওঠে না অর্থাৎ কখনই কবুল হয় না। ক. যে ব্যক্তি কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয় কিন্তু তারা তাকে পছন্দ করে না, খ. সেই নারী যে রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী সঙ্গত কারণে তার ওপর নাখোশ এবং গ. সেই দুই ভাই যারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন। (ইবনে মাজাহ)

উপরিউক্ত হাদীসগুলো থেকে একথা স্পষ্ট কোন ব্যক্তির ইমামতির যোগ্যতা থাকার পরও মুক্তাদী বা অনুসারী বা জনগনের ভোট বা সমর্থন জরুরী। অধিকাংশ জনগনের সমর্থন না থাকলে তিনি ইমামতি তথা নেতা হওয়ার যোগ্যতা হারান। 

এই সকল হাদীসের আলোকে স্পষ্টভাবে নামাজের ইমাম নির্বাচনের ব্যাপারে যে বিধি-বিধান বের হয়ে আসে এবং যা প্রতিটি মুসলমান বাস্তব আমলের ভিত্তিতে দিনে পাঁচবার অনুসরণ করছে, তা হচ্ছে-

ক. ভোট বা সমর্থনের মাধ্যমে সকল বা অধিকাংশ মুক্তাদি যাকে পূর্বোল্লিখিত গুণাগুণসমূহের ভিত্তিতে অধিকতর যোগ্য মনে করবেন তিনি নামাজের ইমাম হবেন। আর এই সমর্থন দিতে হবে সকল রকম অন্যায় প্রভাব মুক্ত হয়ে।

খ. ঐ পদ্ধতি অনুসরণ করে ইমাম নির্বাচন করা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান। কারণ, রাসূল সা. বলেছেন, ঐ পদ্ধতি অনুসরণ না করে যে ইমাম হবে, তার নামাজ কবুল হবে না। সুতরাং তাকে জাহান্নামে যেতে হবে অর্থাৎ তার সকল কর্মকাণ্ড ব্যর্থ হবে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, নামাজের অনুষ্ঠান থেকে আল্লাহ মুসলমানদের বিভিন্ন শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। আর নামাজের ইমাম নির্বাচনের বিধি-বিধানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, সমাজের নেতা নির্বাচন করার বিধি-বিধান। তাহলে সমাজের নেতা নির্বাচনের সেই বিধি-বিধানগুলো হবে

১. নেতা নির্বাচিত করতে হবে সকল বা অধিকাংশ ঈমানদার মুসলমানের সমর্থন তথা ভোটের মাধ্যমে।
২. সকল বা অধিকাংশ ঈমানদার মুসলমান ঐ ভোটের মাধ্যমে জানাবেন কোন ব্যক্তি তাদের মতে নেতা হওয়ার জন্যে পূর্বোল্লিখিত গুণাগুণের ভিত্তিতে অধিকতর যোগ্য।
৩. ঐ ভোটগ্রহন হতে হবে সকল প্রকার অন্যায় প্রভাবমুক্তভাবে।

আমরা যাতে নামাজকে ব্যক্তিগতভাবে এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি সেজন্য জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। শুধু নিয়মিত নামাজ আদায় নয় এর শিক্ষাও বাস্তবায়ন করতে হবে নতুবা আমাদের নামাজ কায়েমের হক আদায় হবে না। আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবো। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রকৃতভাবে নামাজ কায়েমের তাওফীক দান করুন। 

১৭ জুন, ২০১৬

জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং আমেরিকায় সমকামী হত্যা


জামায়াত একটা মুনাফিক টাইপ দল। কারণ জামায়াত একবার জোট বাঁধে আওয়ামীলীগের সাথে আন্দোলন করে বিএনপির বিরুদ্ধে। আবার কিছুদিন পর বিএনপির সাথে ঘর সংসার করে আন্দোলন করে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে। এদের চরিত্রের ঠিক নাই। এরা নিজেদের মত করে ইসলামকে ব্যবহার করে। এরা ধর্মব্যবসায়ী। এই ধরণের অভিযোগ আপনি করতেই পারেন। কারণ আপনার ইনফো সঠিক, তবে সকল ইনফো আপনার জানা নেই অথবা আপনি জানা থাকলেও গোপন করেছেন। তাই ইনফরমেশনের যে ব্যাখ্যা আপনি করেছেন তা সম্পূর্ণ ভুল। 

১৯৮৪ সালে জামায়াত প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলার প্রস্তাব দেয় রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে। কারন সে সময়ের ধূর্ত শাসক লে জে হু মু এরশাদের অধীনে নির্বাচন কারো পক্ষে মানা সম্ভব ছিল না। জামায়াতের এই ফর্মুলা সেসময় সরকারি দলতো গ্রহন করেইনি। বিরোধী দলের মধ্যেও কেউ গ্রহন করেনি। একই ফর্মূলা সকল বিরোধী দল গ্রহন করেছে ১৯৮৯ সালে। সকল বিরোধী দল তখন এই ফর্মূলা বাস্তবায়নের জন্য যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। তারই প্রেক্ষিতে গণঅভ্যুত্থান হয় এরশাদের পতন হয়। 

১৯৯১ সালে তত্ত্বাবধায়ক ফর্মুলাতে নির্বাচন হয়। বিএনপি অল্পের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা মিস করে। জামায়াত ১৮টি সিট পায়। জামায়াত বিএনপিকে সমর্থন দেয়, বিএনপির সরকার গঠন করে। এর কিছুদিন পরই সংসদে দাবী উঠে এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার। আওয়ামীলীগ এই দাবী উত্থাপন করে। বিএনপি এই দাবী প্রত্যাখ্যান করে। এই নিয়ে জামায়াত বিএনপিকে রাজী করানোর চেষ্টা করে। সেই সময় সংসদে মাওলানা নিজামী খালেদাকে বলেন আমরা মোটেই আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে ইচ্ছুক নয়। আমরা দেশগঠনে আপনাকে সহায়তা করতে রাজী। কিন্তু আপনি জোর করে আমাদের আপনার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে বাধ্য করবেন না। কিন্তু সেই সময়ের অহংকারী খালেদা জিয়া সেটা মেনে নিতে অসম্মত হয়। জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আওয়ামীলীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে। কারণ তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু যতটা না আওয়ামীলীগের তার চাইতে বেশী জামায়াতের। 

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা মানতে বাধ্য হয় বিএনপি। ১৯৯৬ তে দু'বার নির্বাচন হয়। ১ম বার সকল বিরোধী দল বয়কট করে। পরবর্তিতে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হয়। আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামীলীগ তার পূর্বের আচরণ মতই ধর্মনিরপেক্ষ হতে গিয়ে ইসলাম বিরোধী হয়ে উঠে। ভারতকে খুশি রাখার জন্য একের একের পর এক কালো অসম চুক্তি করতে থাকে। কয়েকটি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়। দাড়িটুপি নির্যাতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হকের মত মানুষও তাদের হাতে লাঞ্চিত হয়। 

এই পরিস্থিতিতে জামায়াত আওয়ামীলিগের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এর মধ্যে পার্বত্য শান্তিচুক্তির মত দেশকে ভাগ করে দেয়ার চুক্তি করে সরকার। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখে বিএনপি ও জামায়াত। এই আন্দোলনই দুই শক্তিকে আবার একই মঞ্চে আনে। সেখানে এরশাদও ছিল। পরবর্তিতে চার দলীয় জোট গঠন হয়। প্রথমে এরশাদ জোটে ছিল, পরবর্তিতে সে বের হয়ে যায়। জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের ভারতপন্থীদের অত্যাচার হতে রক্ষা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। সেই জোট এখনো বিদ্যমান। এখনো এই জোটের মূল দাবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ঘটনা কি দাঁড়ালো? জামায়াত তার প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবীতে সবসময় অটল ছিল। কোন কোন রাজনৈতিক দল তাদের ইচ্ছেমত জামায়াতের সাথে আন্দোলন করেছে বা প্রতিহত করার চেষ্টা করেছে। এবার পরিস্থিতি বিবেচনায় আপনি নিশ্চয়ই জামায়াতকে এই ইস্যুতে মুনাফিক বলতে চাইলেও বলতে পারবেন না।

এবার আসুন সমকামী ইস্যুতে। জামায়াত আমেরিকায় সমকামী হত্যায় নিন্দা জানিয়েছে। এতে উৎপুল্ল হয়ে আপনি জামায়াতকে সমকামী আখ্যা দিতে আপনার বাধে না। আপনি জামায়াতকে গে জামায়াত বলে উল্লাস করছেন আর বলছেন দেখ দেখ আগেই বলেছিলাম জামায়াত ইহুদী-নাসারা কওমে লুতের অনুসারী। এখন তো প্রমাণ হলো। 

এখানেও আপনার সমস্যা ওটাই। আপনার যে তথ্যের উপর ভিত্তি করে জামায়াতকে দোষারোপ করছেন সেটা সত্য। তবে হয় সব তথ্য আপনার কাছে নেই অথবা আপনি কিছু তথ্য গোপন করেছেন। 

আমেরিকায় এই ধরণের সাইকো হামলা নতুন নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে জামায়াতের বিবৃতি প্রদানের প্রয়োজন পড়ে নি। কারণ আগের প্রত্যেকটি ঘটনায় খুনী ছিল অমুসলিম। আর বিষয়টা নিয়ে রাজনীতিও হয়নি। সবাই ঐসব খুনীকে অপ্রকৃতস্থ বলেছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে আলোচনা হয়েছে তা হয়েছে অস্ত্র আইন সংশোধন করা দরকার। যারা প্রায়ই মাতাল হয় তাদের অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের দাবী উঠেছিল। কোন পক্ষ থেকেই দাবী জানানো হয় নি এটি একটি সাম্প্রদায়িক হত্যা। 

কিন্তু সমকামীদের হত্যাকারী হিসেবে যখনই একজন মুসলিম নাম এসেছে তখনই সারা বিশ্বে হইচই শুরু হয়েছে। তখন আর কেউ উমর মতিন নামে লোকটিকে কেউ মাতাল বলতে রাজী না, সমকামী বলতে রাজী না এখন তার পরিচয় সে একজন মুসলিম। ব্যাস সকল সন্ত্রাসী ঘটনার দায় নিতে হচ্ছে ইসলামকে। পুরো বিশ্বের মিডিয়া ইসলামকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। আর এই ঘটনায় তাল দেয়ার জন্য আছে CIA এবং মোসাদের যৌথ প্রযোজনার আই এস। কোন কিছু বিবেচনা করার আগেই তারা এই ঘটনার দায় স্বীকার করে। শুধু এই ঘটনা নয় সারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে যে কোন যায়গায় কোন মুসলিম নামধারী কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করলেই তারা সেই ঘটনার দায় স্বীকার করে ইসলামকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে। এটা তাদের এজেন্ডা। 

এই ধরণের প্রতিটি ঘটনায় বিপদে পড়েন মুসলিমরা। তারা অমুসলিম দেশে তাদের স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। অযথা হয়রানির শিকার হন। সবচেয়ে বড় কথা হলো ক্ষতিগ্রস্থ হয় ইসলাম। ইসলাম তখন বিবেচিত হয় সন্ত্রাসীদের ধর্ম হিসেবে। অনেক নালায়েক আছেন যারা ভুল প্রয়োগের মাধ্যমে কুরআন হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে জায়েজ করার চেষ্টা করেন। 

জামায়াত সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা নিয়োজিত। সাধারণত তারা যে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার সেটা যদি তাদের শত্রুর সাথেও হয়ে থাকে। আর সেই অন্যায় যদি ইসলামের বিরুদ্ধে হয়ে থাকে তবে সেখানে জামায়াত সবসময় সোচ্চার। এটা জামায়াত ঈমানের দাবী মনে করে। জামায়াতের বিবৃতি যতটা না ছিল নিহতদের প্রতি সংহতি বরং তার চাইতেও বেশী হচ্ছে ইসলামকে সমুন্নত করা। ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা। জামায়াত তার বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছে এমন কোন হত্যাকান্ডকে ইসলাম সমর্থন করে না, করতে পারে না। এই হত্যাকান্ডের সাথে ইসলামপন্থীদের সংযোগ নেই। 

অবশ্যই ইসলামে সমকাম একটি ফৌজদারি অপরাধ। তবে এটা অবশ্যই ইসলামিক রাষ্ট্রে, যেখানের অধিকাংশ মানুষ সতঃস্ফুর্তভাবে ইসলামকে গ্রহন করবে। ইসলামিক কানুন মেনে চলবে। তবে ইসলাম কখনোই কোন ব্যক্তিকে কোন শাস্তি বিধানের অনুমতি দেয় না। বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড মেনে নেয় না। কুরআনে মুশরিকদের হত্যা করার জন্যও বলা হয়েছে তাই বলে কি আপনার অনুমতি আছে পাশের বাড়িতে শিরক করা কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বি মানুষকে হত্যা করা? অথচ শিরক করা আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অপরাধ। হাদীসে সমকামীদের হত্যা করার জন্য বলা হয়েছে এর মানে এই নয় যে আপনি কোন সমকামীকে হত্যা করতে পারবেন বরং এই হাদীসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো সমকাম ঘৃণিত জিনিস, প্রকৃতি বিরুদ্ধ এবং ফৌজদারী অপরাধ। রাষ্ট্র শাস্তির ব্যবস্থা করবে, সাধারণ নাগরিকদের সেই অধিকার ইসলাম দেয়নি। 

এজন্য কুরআন, হাদীস যাই ব্যখ্যা করবেন সাবধানে করবেন। কোন সময় কি পরিস্থিতিতে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা এবং মুহাম্মদ সঃ এই কথাগুলো বলেছেন সেটা বিবেচনা করবেন। আর জামায়াতের ব্যাপারে নতুন করে কিছু বললাম না। জামায়াত সবসময় প্রস্তুত আপনাদের সমালোচনা গ্রহন করার জন্য। এটলিস্ট জামায়াত এই কাজটা ভালো পারে :)

১ জুন, ২০১৬

অপদার্থ প্রজন্ম, ফেরাউন এবং আমাদের করণীয়


ভবিষ্যত প্রজন্মকে মূর্খ ও অপদার্থ হিসেবে তৈরী করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা নতুন কোন পদ্ধতি নয়। ফেরাউনও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। এদেশে ইংরেজরাও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বামপন্থি নাহিদও সে পথই অনুসরণ করেছে। আপনারা একটা ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখেছেন যেখানে ছাত্ররা খুব কমন কিছু প্রশ্নের উত্তর জানেনা। অথচ তারা সর্বোচ্চ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এটা দুঃখজনক। শিক্ষার মান ক্রমেই কমছে। এটা বড় একটা ষড়যন্ত্রের অংশ। 

অনেক আগে ফেরাউন যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো, তখন সে তার মন্ত্রী হামানকে তার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছিল। হামান তাকে ধৈর্য্য ধরতে বলেছিল এবং পরামর্শ দিয়ে বলেছিল আপনি এখনি যদি নিজেকে সর্বশক্তিমান দাবী করেন তাহলে জনগণ তা মেনে নিবে না। কারণ তারা অনেক কিছু জানে। আপনি প্রথমে সকল বিদ্যালয় বন্ধ করে দিন। তাহলে এখনকার কিশোরেরা সব মূর্খ হয়ে বড় হবে। কিছু বছর পর তারা যুবক হবে। তখন তারা আপনি যা বলবেন তাই শুনবে।

ফেরাউন তাই করলো। মন্ত্রী হামানের পরামর্শ মতো ফেরাউন সমগ্র রাজ্যের মাতব্বর প্রজাদের ডেকে একটা বড় সভা করলেন। সেই সভাতে তিনি তাদের বুঝিয়ে দিলেন যে, লেখাপড়া শিখে মিছামিছি সময় নষ্ট করবার আর প্রয়োজন নেই। কারণ, লোকের পরমায়ু অতি অল্পকাল। এই সংকীর্ণ সময়ের মধ্যে জীবনের বেশির ভাগ দিনই যদি মক্তবে এবং পাঠশালায় গমনাগমন করে এবং পড়ার ভাবনা ভেবে ভেবে কাটিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আমোদ আহলাদ এবং স্ফুর্তি করবার অবসর পাওয়া যাবে না। সুতরাং সারাজীবন ভরে আমোদ করো, মজা করো। তাহলে মরবার সময়ে মনে বিন্দুমাত্র অনুতাপ আসবে না।

প্রজারা ফেরাউনের ও হামানের এই উপদেশ সানন্দে গ্রহণ করলো এবং বংশধরদের কাউকে আর বিদ্যালয়ে প্রেরণ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলো।অতঃপর হামান পাঠশালা ও মক্তব রাজ্য থেকে উঠিয়ে ঢাক পিটিয়ে দেশময় প্রচার করে দিলো যে, কেউ আর লেখাপড়া শিখতে পারবে না। রাজার আদেশ অমান্য করলে সবংশে তার গর্দান যাবে।

প্রজারা ফেরাউনের আদেশ মতো চলতে লাগলো। লেখাপড়া আর কেউ শিখতে চেষ্টা করলো না। সারাদেশে কিছুকালের মধ্যে একেবারে গণ্ডমুর্খতে পূর্ণ হয়ে গেল। মূর্খের অশেষ দোষ। কোন ধর্মাধর্ম, হিতাহিত জ্ঞান তার থাকে না। তারা হয় কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন। দুনিয়ার এমন কোন অসৎ কাজ নেই যা মূর্খরা না করতে পারে! যখন তার রাজ্যের প্রজাদের এই অবস্থা ফেরাউন মনে মনে হাসতে লাগলো। তার উদ্দেশ্য এতদিনে সিদ্ধ হয়েছে। তিনি প্রত্যেককে একটা করে নিজের প্রতিমূর্তি দিয়ে তাকে সৃষ্টিকর্তা এবং উপাস্য বলে পূজা করতে হুকুম দিলেন। মূর্খ ও অপদার্থ প্রজন্ম ফেরাউনের আনুগত্য করতে লাগলো।

বাম আদর্শে বড় হওয়া নাহিদরা ভালো করেই জানে এদেশবাসী যখন ভালো শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠবে তখন তাদের বস্তাপঁচা আদর্শ তারা গ্রহন করার প্রশ্নই আসে না। বরং তাই হচ্ছে। এদেশে যখন বাম আদর্শ বিস্তার শুরু করছিলো তখন তাদের চটকদার কথা শুনে অনেক জ্ঞানী মানুষ তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেছিলো। কিন্তু কালক্রমে তাদের আদর্শের অসারতা বড় হয়ে ধরা পড়ে সকলের সামনে। বড় দলগুলো ক্রমেই ছোট হয়ে আসতে শুরু করে।

নতুন করে তারা আবার দলভারী করতে চায়। বস্তাপঁচা আদর্শ গিলাতে চায় এই জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মের মগজে। তাই তাদের দরকার একটা অপদার্থ প্রজন্ম। সেটাই নাহদ তৈরী করতে সক্ষম হচ্ছে। এজন্য তারা পলিসি গ্রহন করেছে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন না দেয়া। ভালো ও খারাপের ক্যাটাগরি সমান করে দিয়েছে। ছেলেরা আরো ভালো কিছু করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ আরো এমনসব পলিসি গ্রহন করেছে যাতে একটা নির্বোধ জাতির সৃষ্টি হয়। 

এর বিপরীতে আমাদের করণীয় কি হওয়া উচিত এই বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ইসলামের প্রথম নির্দেশ পড়। ইসলামিক সমাজে একজন মূর্খ ব্যক্তি অবশ্যই অপরাধী। মূর্খ ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পারে না এমনকি স্রষ্টাকেও চিনতে পারেনা। তাই জ্ঞানঅর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। নিজের শিশুসন্তানকে সুশিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। 

পিতা-মাতা তাঁদের সন্তানের সাথে জীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে জীবনের দর্শন কী তা সন্তানকে বুঝিয়ে থাকেন। জীবন কেন? জীবনের উদ্দেশ্য কি? দুনিয়ার জীবনে আমাদের করণীয় কি? আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি হওয়া উচিত এসব বিষয়ে যথাযথ শিক্ষা দিবেন। এক্ষেত্রে সাধারণ বাঙ্গালী সমাজে যা শিক্ষা দেয়া হয় তা হলো এই সমাজে পয়সা উপার্জন করে সুখে শান্তিতে থাকাই জীবনের সঠিক পথ। কিন্তু পিতা মাতাদের উচিত এই ধারণা থেকে বের হয়ে আল্লাহর দেয়া বিধি-নিষেধ এবং আল্লাহ কর্তৃক পরীক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া।   

পরিবার যথাযথ ভূমিকার মাধ্যমে সন্তানকে একজন সামাজিক ব্যক্তিত্বরূপে গড়ে উঠতে এবং বিভিন্ন নৈতিক গুণ অর্জন করতে সহায়তা করবে। সন্তানকে একজন ভালো নাগরিক তৈরীর উদ্দেশ্যে পরোপকারের শিক্ষা দিতে হবে। এই সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা। প্রতিবেশীদের অধিকার, অন্যান্য মুসলিমদের অধিকার শিক্ষা দিতে হবে। ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের আলোর পথে আসার জন্য যোগ্য দায়ী হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।  

পরিবার থেকেই সন্তান সম্পদ উৎপাদন, জীবিকা বণ্টন এবং সম্পদের ব্যবহার বিষয়ে জ্ঞানলাভ করবে এবং দারিদ্র্য ও সচ্ছলতার অর্থ অনুধাবন করতে পারবে। ভাই বোন পিতা মাতাসহ সকল আত্মীয়ের প্রতি আর্থিকভাবে যত্নবান হতে শিখবে।  

শিশুরা প্রকৃতিগতভাবে অজ্ঞতা নিয়েই জন্মলাভ করে। সকল শিশুই প্রথমে দুনিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকে। মানুষের মাঝে যে সকল সমস্যা রয়েছে এবং পৃথিবীতে যে সকল কর্মকান্ড সংঘটিত হয় সে সম্পর্কে শিশুরা অনেক কিছুই জানে না। শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে এ সকল বিষয়ে জানতে শুরু করে। তার মাঝে জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। জীবন ও জগৎ সম্পর্ক যতই সে প্রশ্নের সম্মুখীন হয় ততই তার মাঝে জানার আগ্রহ বাড়তে থাকে; ভালো-মন্দ সম্পর্কে সে বিচার করতে শুরু করে। এই সময়ে শিশুর পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন। পিতামাতাই কেবল এই পর্যায়ে শিশুকে যথোপযুক্ত জ্ঞানদানের জন্য এগিয়ে আসতে পারেন। বরং বলা উচিত এ সময়ে শিশুর জ্ঞান বিকাশে সহায়তা করা মাতাপিতার অবশ্যকর্তব্য। শিশুর প্রতিটি প্রশ্নের পেছনে একটি প্রবল শক্তি কাজ করে যা তার জ্ঞানার্জনের পথকে উন্মোচিত করে দেয়। শিশুর অন্তর্নিহিত কৌতুহলই তাকে জীবন পথে চলার প্রাণশক্তি যোগায়।

পৃথিবীর জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য শিশুর প্রয়োজন পৃথিবীকে ভালোভাবে জানা। এই পৃথিবীর সভ্যতার সত্যিকারের ইতিহাস শিশুর জানা উচিত যাতে ঘটে যাওয়া পুরনো ঘটনা থেকে সে শিক্ষা নিতে পারে। জীবন পথে চলার জন্য তার কোন দর্শন অবলম্বন করা উচিত, কোন লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া উচিত। এছাড়া কিভাবে তার পথ চলা উচিত তাও শিশুর জানা দরকার। এই বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন পরিবারের গুরুজনেরা। 

নিজে নিজে প্রতিভার বিকাশ ঘটানো শিশুর পক্ষে সম্ভব নয়। পৃথিবীর লোভ-লালসা থেকে বেঁচে থাকাও তার জন্য খুব কঠিন। তাই পিতা-মাতাই কেবল পারেন তার শিশুকে সঠিক পথে নিয়ে গিয়ে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে, পিতামাতারা তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তম বিষয়গুলো সন্তানদের শিখিয়ে দিতে পারেন।

শিশুর জীবনের প্রথম বছরগুলোতে পিতামাতাই হবেন একজন জ্ঞানী অভিভাবক। শিশুর নানা প্রশ্নের জবাব দিতে হয় এসময়। পিতাকে অকপটে এবং অবলীলাক্রমে শিশুর এ সকল কৌতুলহল মেটাতে হবে। কারণ, শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করার দায়িত্ব তো পিতামাতার। তার ক্রমাগত প্রশ্নকে উপেক্ষা না করে বিরক্ত না হয়ে যথাযথ উত্তর করার চেষ্টা করা উচিত। মা-বাবা যদি শিশুদেরকে এসকল বিষয় জানা থেকে বঞ্চিত করেন তাহলে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়; শিশু অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। এ জন্য বাবা-মার উচিত তার সন্তানের সাথে যতটা সম্ভব আন্তরিক এবং খোলামেলা হওয়া। পিতার আচার-ব্যবহার এমন হবে যাতে শিশু বুঝতে পারে যে, পিতা-মাতাই হলো তার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। একটি পরিবারে অভিভাবকরা যতটা উপকারী ভূমিকা পালন করতে পারে অন্যরা তা পারে না। 

আমাদের অনেকেরই একটি ভুল ধারণা যে, সাংস্কৃতিক ভূমিকা শুধু স্কুলই পালন করে। আমাদের এটা জানা উচিত শিশুর জ্ঞানার্জনের ভিত্তি স্থাপিত হয় পরিবারের দ্বারা। পরিবারেই একটি শিশু প্রথম বিশ্বজগতের বিশাল পরিমন্ডলে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। পরিবারেই শিশু তার ভবিষ্যত জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে পৌঁছার ব্যাপারে দিকনির্দেশনা পেয়ে থাকে। 

শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য পিতামাতার পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা দরকার। সেই সাথে পিতামাতার দৃষ্টিভঙ্গিও প্রসারিত হওয়া উচিত। পিতামাতা যদি শুধু সন্তানের দৈহিক চাহিদা মেটানোর প্রতিই মশগুল থাকেন তাহলে তাঁদের দায়িত্ব সম্পূর্ণ হয় না। শিশুসন্তানদের প্রতি মাতাপিতার অন্যতম দায়িত্ব হলো শিশুকে জ্ঞান শিক্ষা দেয়া। অর্থাৎ জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া। পিতা-মাতা সাধারণত জীবন ও জগত সম্পর্কে যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন শিশুরা তারই অনুসরণ করার চেষ্টা করে। তাই শিশুদের সামনে সঠিক এবং যথাযথ জীবন দর্শন উপস্থাপন করতে হবে।

শিশুর প্রশিক্ষণে সাহিত্যের গুরুত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, প্রবাদবাক্য প্রভৃতির মাধ্যমে সাহিত্য নৈতিকতা ও সভ্যতার জ্ঞান শিক্ষা দেয়, মানুষকে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে। এ কারণে প্রত্যেক পিতারই উচিত তার সন্তানের পড়ালেখার জন্য এবং তার জ্ঞান বিকাশের জন্য উপযুক্ত বই-পুস্তক নির্বাচন করা। এমন অনেক বই-পুস্তক রয়েছে যা ধ্বংসাত্মক জ্ঞানের উৎস। যে সকল বইয়ে নৈতিক গুণাবলি শিক্ষার কিছু থাকে না সে সকল বই-পুস্তক শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। এ নীতিজ্ঞান বিবর্জিত এবং সুশিক্ষার অভাব সম্বলিত বই শিশুকে কোন জ্ঞানই দেয় না; বরং তার ভবিষ্যত জীবনকে মূর্খতা ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। তাই শিশু কী পাঠ করছে এবং তাকে কী পড়তে দেয়া উচিত সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। খেয়াল রাখতে হবে শিশু যেন আজেবাজে বই-পুস্তকের দিকে আকৃষ্ট হয়ে না পড়ে।

সাহিত্যের মতো শিল্পকলাও শিশুর জ্ঞান বিকাশে বিরাট ভূমিকা পালন করে। শিল্পচর্চার প্রতি শিশুদের উতসাহিত করা উচিত। কারণ, শিল্পকলা মানুষের মেধাশক্তিকে প্রখর করে মানসিকতাকে উন্নত করে। শিশুর মাঝে একাগ্রতা, সুনির্বাচন এবং ভালো কিছু করার আকাক্সক্ষা বৃদ্ধিতে শিল্পচর্চার বিকল্প নেই। তাই স্বল্প বয়স থেকেই সন্তানদেরকে শিল্পকলার সাথে পরিচিত করে তোলা উচিত। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই অংকন, হস্তলিপি প্রভৃতির চর্চা করতে পারে। এভাবে শিশু তার অবসর সময়টাকে গঠনমূলক কোন কিছুতে ব্যয় করতে পারে। পরিবার অবশ্যই শিশুদের সুকুমার বৃত্তি উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

আমাদের সবার সন্তান, ছোট ভাই-বোন, ভাগ্নে-ভাগ্নী, ভাস্তে-ভাস্তি রয়েছে। তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিরোধে আমরা যদি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারি তাহলে আমাদের ভবিষ্যতে অবশ্যই উজ্জল। এজন্যে প্রতিটা পরিবারেই আন্দোলন প্রয়োজন। আমাদের প্রতিটা পরিবারকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি তাহলে শয়তানের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য। আল্লাহ তায়ালা ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবেলায় আমাদের দৃঢ় করুন। আমিন।