১৬ আগস্ট, ২০১৬

একজন আফগান বীরের গল্প


আমরা আফগানিস্তানের রুশ আক্রমনের কথা জানি। আরো জানি আফগান মুজাহিদদের কথা। অনেকে অবশ্য ভুলভাবে জানি এই আফগান মুজাহিদরাই তালিবান। কিন্তু তা নয়। আজ আমরা জানবো এক আফগান বীরের কথা যিনি আফগানিস্তান থেকে অত্যাচারী বাদশাহ দাউদ খানকে সরানোর ব্যাপারে এবং রুশ বাহিনীকে হটানোর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পাঞ্জশিরের সিংহ খ্যাত এই আফগান বীরের নাম আহমদ শাহ মাসউদ। তিনি ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ ও সামরিক ব্যক্তিত্ব, যিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সালের সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং একই সময়ের গৃহযুদ্ধের বছরগুলোতে একজন শক্তিশালী সামরিক কমান্ডার দায়িত্বপালন করেন। কখনোই তিনি আফগানে বিদেশী হস্তক্ষেপ সহ্য করেননি। এজন্যই আল কায়েদা নামের বিদেশী চরেরা তাকে খুন করেছে ২০০১ সালে। 

কমিউনিস্টবিরোধী যুদ্ধে অসীম সাহসিকতার জন্যে তাঁকে ‘শেরে পাঞ্জশির’ বা পাঞ্জশিরের সিংহ নামে ডাকা হয়। আহমদ শাহ মাসউদ ১৯৫৩ সালের ২রা জানুয়ারি পানশিরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা দোস্ত মুহাম্মদ খান আফগান রয়্যাল আর্মিতে কর্নেল ছিলেন। আহমদ শাহ কাবুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন সয্‌মান-ই জোওয়ানান-ই মুসলমান (Organization of Muslim Youth)- এ যুক্ত হন। তখন জামায়াতে ইসলামির আমীর ছিলেন অধ্যাপক বুরহানউদ্দিন রব্বানী। ১৯৭৫ সালের দিকে জামায়াতে ইসলামি ও গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের নেতৃত্বাধীন হিয্‌বে ইসলামির মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। এসময় হিয্‌বে ইসলামির কর্মীরা আহমদ শাহ মাসুদকেকে হত্যা করার চেষ্টা করে। সেযাত্রা তারা ব্যার্থ হয়। সত্তরের দশক থেকেই বাদশাহ দাউদ খানের বিরুদ্ধে জনগন আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। দাউদ খানের অত্যাচারও বাড়তে থাকে। ১৯৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল দাউদ খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান মধ্যে দিয়ে তার দীর্ঘ অত্যাচারের অবসান হয়। সেনাবাহিনী জনগণের পক্ষে অবস্থান নেন। আফগানিস্তানের যুব নেতা আহমদ শাহ মাসুদ গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্বে আফগানিস্তানের তরুণ যুবারা দিনের পর দিন দাউদ খানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।  

এই অভ্যুত্থানের পরও আফগানিস্তানে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি। অভ্যুত্থানের পরে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে মস্কোপন্থী বাম দল পিপলস্‌ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ক্ষমতায় আসে। তারা সমাজতন্ত্রের বিস্তার এবং সেভাবে নীতি নির্ধারণ করতে চাইলে দেশের ইসলামি দলগুলোর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এসময় সমাজতন্ত্রী সেনারা প্রায় এক লাখ ইসলামপন্থী মানুষকে নির্দয়ভাবে খুন করে। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে আফগানরা নতুনভাবে সংগঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে ২৪ টি প্রদেশে আফগানরা প্রতিরোধ শুরু করে। অর্ধেকের বেশি সেনাবাহিনী সদস্য পক্ষ ত্যাগ করে। ৬ই জুলাই আহমদ শাহ মাসউদ পাঞ্জশিরে দলত্যাগী সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে এবং সাধারণ মুসলিম জনতাকে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পিছু হটতে থাকে বাম সেনাবাহিনী। তাদের সাহায্যে সে বছরই ডিসেম্বর মাসে রাশিয়া আফগানিস্তানে সেনা প্রেরণ করে। সরকারবিরোধীদের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে রুশ বাহিনী। সম্মুখ যুদ্ধে সফল না হয়ে মাসউদ গেরিলা যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। আফগানিস্তানের অন্যান্য অংশে যুদ্ধ চলতে থাকলেও রুশ প্রতিরোধ আন্দোলনের মূল কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেন আহমদ শাহ মাসউদ। 

দশ বছর ধরে চলা যুদ্ধের শেষ দিকে মুজাহিদদের সাহায্যে এগিয়ে আসে আমেরিকার মদদপুষ্ট আল-কায়েদা। তাদের আর্থিক ও অস্ত্রের সাহায্য পেয়ে অন্যান্য গেরিলা যোদ্ধারা শক্তিশালী হয়ে উঠে। রুশরা এতদিন শুধুমাত্র মাসউদ ছাড়া অন্যান্যদের খুব একটা গোনায় ধরতো না। কিন্তু পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তারা অন্যান্য দিকে নজর দিলে মাসউদ যুদ্ধে সফলতা পেতে থাকেন। একের পর এক এলাকা থেকে রুশদের বিতাড়িত করতে থাকেন। তার ক্রমাগত আক্রমনে রুশরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তারপরও পিপলস্‌ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সরকার মুজাহিদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯৯২ সালে ১৭ই এপ্রিল তাদের চুড়ান্ত পরাজয় হয়। 

২৪ শে এপ্রিল পেশোয়ারে সমাজতন্ত্রবিরোধী দলগুলোর মধ্যে শান্তি ও ক্ষমতাবন্টন চুক্তি সম্পাদিত হয়। এ-চুক্তিতে জামায়াতে ইসলামীর আমীর বুরহান উদ্দিন রব্বানী প্রেসিডেন্ট, আহমদ শাহ মাসউদকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও গুল্বুদ্দিন হেকমতিয়ারকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। কিন্তু হেকমতিয়ার এ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে আল কায়েদা প্রধান বিন লাদেনের প্ররোচনায় এবং গোপন ষড়যন্ত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মূলত তখন হেকমতিয়ার চুক্তিতে না আসলে আহমদ শাহ মাসউদের সাথে তার যুদ্ধ অবধারিত ছিল। আহমদ শাহ মাসউদ তাকে পর্যদুস্থ করে ফেলতে পারবেন। তাই বিন লাদেন তাকে সময় নিয়ে এবং সরকারি সুবিধা নিয়ে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। 

বিন লাদেনের কথামত হেকমতিয়ার সরকারি সুবিধা নিয়েই জামায়াতে ইসলামী তথা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। এদিকে চরম গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে আল কায়েদা তালিবানের উত্থান ঘটায় আফগানিস্থানে। ১৯৯৬ সালে শুরুর দিকে তালিবান-আল কায়েদা যৌথভাবে আফগানিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে হামলা করে। একদিকে হেকমতিয়ার অন্যদিকে লাদেন-মোল্লা ওমর, তাদের মাথার উপরে আবার সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা। সব মিলিয়ে ১৯৯৬ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার পরাজিত হয়। তালেবান ক্ষমতা দখল করে। 

পুরো আফগানিস্তান থেকে ক্ষমতাচ্যুত হলেও আহমদ শাহ মাসউদ পাঞ্জশিরের কর্তৃত্ব ছাড়েন নি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আমেরিকার মদদপুষ্ট আল কায়েদা এবং তালেবানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এসেছেন। ২০০১ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর (টুইন টাওয়ারে হামলার মাত্র দুই দিন আগে) উত্তর আফগানিস্তানের তাখার প্রদেশে খাজা বাহাউদ্দিন এলাকায় আত্মঘাতি হামলায় আহমদ শাহ মাসউদ শাহদাত বরণ করেন। আল কায়েদার সন্ত্রাসীরা এই মহান বীর ইসলামের মহান সৈনিককে হত্যা করে। তাকে এর আগে বহুবার কেজিবি, আইএসআই, আফগান কমিউনিস্ট কেএইচএডি, তালেবান ও আল-কায়েদা তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের সেসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাঁর জন্মস্থান বাজারাকেই তাঁকে দাফন করা হয়। তিনিই একমাত্র আফগান নেতা যিনি কখনো আফগানিস্তানের বাইরে থাকেন নি। 

আল্লাহ তায়ালা এই মহান বীরকে সম্মানিত করুন। জান্নাতে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন। আফগানিস্তানকে বিদেশী এবং ইসলামবিরোধী শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

1 টি মন্তব্য:

  1. আফগানিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান অবস্থা কীরুপ?

    উত্তরমুছুন