১৬ আগস্ট, ২০১৬

মুমিনের সাংগঠনিক গুণাবলী, পর্ব ০১


সংগঠন শব্দের সাধারণ অর্থ সংঘবদ্ধ করণ। এর বিশেষ অর্থ দলবদ্ধ বা সংঘবদ্ধ জীবন। ইকামাতে দ্বীনের কাজ আঞ্জাম দেয় যে সংগঠন তাকেই বলা হয় ইসলামী সংগঠন। ইসলামী সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ইকামাতে দীনের সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য ফরয। সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন কায়েম হতে পারে না। সংগঠিত উদ্যোগ ছাড়া ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্য বিকাশ সাধন সম্ভবপর নয়।

সংগঠন সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ, তোমরা সংঘবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে (অর্থাৎ ইসলামকে) আঁকড়ে ধর”-আল ইমরান ১০৩
সংগঠন সর্ম্পকে আল্লাহর রাসূলের (সা) বাণী, ‘আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিচ্ছি আল্লাহ আমাকে ঐগুলোর নির্দেশ দিয়েছেন। (বিষয়গুলো হচ্ছে) সংগঠন, নেতার নির্দেশ শ্রবণ, নেতার নির্দেশ পালন, আল্লাহর অপছন্দনীয় সবকিছু বর্জন এবং আল্লাহর পথে জিহাদ। যেই ব্যক্তি ইসলামী সংগঠন ত্যাগ করে এক বিঘৎ পরিমাণ দূরে সরে গেছে সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলেছে, তবে সে যদি সংগঠনে প্রত্যাবর্তন করে তো স্বতন্ত্র কথা। 

“আর যে ব্যক্তি জাহিলিয়াতের দিকে আহবান জানায় সে জাহান্নামী” সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম এবং সাওম পালন করা সত্ত্বেও?” আল্লাহর রাসূল বললেন, “সালাত কায়েম, সাওম পালন এবং মুসলিম বলে দাবী করা সত্ত্বেও। ” -আহমাদ ও হাকেম 

“তিনজন লোক কোন নির্জন প্রান্তরে থাকলেও একজনকে আমীর না বানিয়ে থাকা জায়েয নয়।”“তিনজন লোক সফরে বের হলে তারা যেন তাদের একজনকে আমীর বানিয়ে নেয়।”-সুনানু আবী দাউদ

“যে ব্যক্তি জান্নাতের আনন্দ উপভোগ করতে চায় সে যেন সংগঠনকে আঁকড়ে ধরে”। -সহীহ মুসলিম

“যেই ব্যক্তি জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু”। -সহীহ মুসলিম

সংগঠন সর্ম্পকে হযরত উমারের (রা) উক্তি, “সংগঠন ছাড়া ইসলাম নেই। নেতৃত ছাড়া সংগঠন নেই। আনুগত্য ছাড়া নেতৃত্ব নেই।”

এ সব আয়াত, হাদিস এবং উক্তি থেকে প্রমাণিত হয় যে-

(১) মুমিনদের সংঘবদ্ধ জীবন যাপন করতে হবে। 
(২) এককভাবে জীবনযাপন করার অধীকার তাদের নেই। 
(৩) একক জীবস যাপনকারী শয়তানের শিকারে পরিণত হয়। 
(৪) ইসলামী সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া জাহিলিয়াতে প্রত্যাবর্তনের শামিল। 
(৫) সংঘবদ্ধভাবে জীবন যাপন জান্নাত প্রাপ্তির অন্যতম পূর্বশর্ত। 

ইসলামী সংগঠনের অর্ন্তভুক্ত হওয়া কোন শখের ব্যাপার নয়। ইসলামী সংগঠনের অর্ন্তভুক্ত না হওয়া আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের(সা) নির্দেশের সুস্পষ্ট লংঘন। পক্ষান্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমানের অনিবার্য দাবী হচ্ছে সংঘবদ্ধ জীবন যাপন। এই সংঘবদ্ধ জীবন যাপনে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা অতিশয় জরুরী। 

১। নেতৃত্ব বা পদের প্রতি লোভী হওয়া যাবে না 
কিয়ামতের দিন যেদিন বিচারক হবেন স্বয়ং আল্লাহ সুহবাহানাল্লাহু তায়ালা সেদিন নেতার জবাবদিহি একজন সাধারণ মুমিনের জবাবদিহীর চেয়ে কঠোরতর হবে। এই জবাবদিহি সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে সচেতন কোন ব্যক্তি নেতৃত্ব-পদ লাভের আকাংখা পোষণ করবে, এটা স্বাভাবিক নয়। যদি কোন ব্যক্তির কথা আচরণ থেকে প্রমাণিত হয় যে নেতৃত্ব পদের প্রতি তার লোভ রয়েছে তাহলে বুঝতে হবে যে সেই ব্যক্তি ব্যাধিগ্রস্থ। একমাত্র আত্মপুজারী বা স্বার্থান্ধ ব্যক্তিই ইসলামী সংগঠনের নেতৃত্ব পদ লাভের জন্য প্রার্থী হতে পারে। এই ধরনের কোন ব্যক্তি যাতে ইসলামী সংগঠনের কোন পদ পেতে না পারে সেই ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল(সা) সদা-সতর্ক ছিলেন। 

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, “হে আবদুর রহমান ইবনু সামুরাহ, নেতৃত্ব পদ প্রার্থী হয়ো না। কারণ প্রার্থী না হয়ে নেতৃত্ব প্রদত্ত হলে তুমি এই ব্যাপারে সহযোগীতা পাবে। আর প্রার্থী পয়ে নেতৃত্ব পদ পেলে তোমার ওপরই যাবতীয় দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হবে। ” সহীহ মুসলীম

তিনি আরো বলেছেন, “আল্লাহর শপথ, আমরা এমন কোন লোকের ওপর এই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করবো না যে এর জন্য প্রার্থী হয় বা অন্তরে এর আকাংখা পোষণ করে।” সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম

পদ লোভী ব্যক্তি দল বা রাষ্ট্রের নেতৃত্ব পদ লাভ করলে সে তা বিনাশই করে ছাড়ে। তদুপরি সে তার আখিরাতেও বরবাদ করে। এই সম্পর্কেই আল্লাহর রাসুল(সা)বলেছেন, 

“অচিরেই তোমরা নেতৃত্ব পদের অভিলাষী হয়ে পড়বে। আর কিয়ামাতের দিন এটা তোমাদের জন্য লজ্জা ও দু:খের কারণ হবে।” -(সহীহুল বুখারী)

২। নেতৃত্বের জন্য যোগ্য ব্যক্তিকে বাছাই করা। 
সূরা আন নিসায় ৫৮ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে হে মুসলিমগণ ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমানত তার হকদারদের হাতে ফেরত দেবার নির্দেশ দিচ্ছেন। নেতৃত্ব প্রদানের দায়িত্বও একটি আমানত। নেতা বাছাইয়ের নিয়ম বা প্রক্রিয়া আমরা সালাত থেকে পেয়ে থাকি। সালাতেও ইমাম বা নেতা নির্বাচন করতে হয়। 

যে গুণাবলী থাকলে কোন ব্যক্তি নেতা হতে পারবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুণগুলো রাসূল সা. সুন্দরভাবে মুসলমানদের জানিয়ে দিয়েছেন, নামাজের ইমাম হওয়ার গুণাবলী বর্ণনাকারী নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে-

হযরত আবু মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : মানুষের ইমামতি করবে সে-ই, যে কুরআন ভাল পড়ে। যদি কুরআন পড়ায় সকলে সমান হয়, তবে যে সুন্নাহ বেশি জানে। যদি সুন্নাহেও সকলে সমান হয়, তবে যে হিজরত করেছে সে। যদি হিজরতেও সকলে সমান হয়, তবে যে বয়সে বেশি। কেউ যেন অপর ব্যক্তির অধিকার ও সেইস্থলে ইমামতি না করে এবং তার বাড়িতে তার সম্মানের স্থলে অনুমতি ব্যতীত না বসে। (মুসলিম)

হযরত আবু সায়ীদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যখন তিন ব্যক্তি হবে, তখন যেন তাদের মধ্য হতে একজন ইমামতি করে এবং ইমামতির অধিকার তার, যে কুরআন অধিক ভাল পড়ে। (মুসলিম)যে গুণাবলী থাকলে কোন ব্যক্তি নেতা হতে পারবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুণগুলো রাসূল সা. সুন্দরভাবে মুসলমানদের জানিয়ে দিয়েছেন, নামাজের ইমাম হওয়ার গুণাবলী বর্ণনাকারী নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে-

১. শুদ্ধ করে কুরআন পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকা,
২. হাদীসের জ্ঞান থাকা,
৩. হিজরত করা এবং
৪. বয়স। 

কুরআনের জ্ঞান ও হাদীসের জ্ঞান থাকা খুব সহজে বুঝা গেলেও হিজরত আমাদের সাধারণত বুঝাটা একটু কষ্টকর। মদীনার প্রাথমিক সময়ে হিজরত ছিল সবচেয়ে বড় আমল যা করতে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। হিজরত করেছেন তারা যারা দ্বীন কায়েমের জন্য তাদের সকল সহায় সম্পত্তি আত্মীয় স্বজন বিসর্জন দিয়েছেন। এখনো আমাদের দেশে যারা দ্বীন কায়েমের পথে নিয়োজিত আছেন। শ্রম দিচ্ছেন ত্যাগ স্বীকার করছেন তারা নেতা হওয়ার জন্য অধিকতর যোগ্য। 

মুসলিম সমাজ বা দেশের নেতা তথা কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার পরিষদের নেতা কী পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচন করতে হবে সেটি মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন নামাজের ইমাম নির্বাচনের পদ্ধতির মাধ্যমে, যা প্রত্যেক নামাজীকে প্রতিদিন পাঁচবার অনুশীলন করতে হয়। নামাজের ইমাম নির্বাচনের ঐ পদ্ধতি রাসূল সা. জানিয়ে দিয়েছেন নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে,

ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ কবুল হবে না। যে কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয়েছে অথচ তারা তাকে পছন্দ করে না, যে নামাজ পড়তে আসে দিবারে। আর দিবার হল- নামাজের উত্তম সময়ের পরের সময়কে এবং যে কোন স্বাধীন নারীকে দাসীতে পরিণত করে। (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।

আবু উমামা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের কানের সীমা অতিক্রম করে না (অর্থাৎ কবুল হয় না) পলাতক দাস যতক্ষণ না সে ফিরে আসে, যে নারী রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট এবং গোত্র বা জাতির ইমাম কিন্তু মানুষ তাকে পছন্দ করে না। (তিরমিযী)

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের মাথার উপর এক বিঘতও ওঠে না অর্থাৎ কখনই কবুল হয় না। ক. যে ব্যক্তি কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয় কিন্তু তারা তাকে পছন্দ করে না, খ. সেই নারী যে রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী সঙ্গত কারণে তার ওপর নাখোশ এবং গ. সেই দুই ভাই যারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন। (ইবনে মাজাহ)

উপরিউক্ত হাদীসগুলো থেকে একথা স্পষ্ট কোন ব্যক্তির ইমামতির যোগ্যতা থাকার পরও মুক্তাদী বা অনুসারী বা জনগনের ভোট বা সমর্থন জরুরী। অধিকাংশ জনগনের সমর্থন না থাকলে তিনি ইমামতি তথা নেতা হওয়ার যোগ্যতা হারান। 

এই সকল হাদীসের আলোকে স্পষ্টভাবে ইমাম নির্বাচনের ব্যাপারে যে বিধি-বিধান বের হয়ে আসে এবং যা প্রতিটি মুসলমান বাস্তব আমলের ভিত্তিতে দিনে পাঁচবার অনুসরণ করছে, তা হচ্ছে-

ক. ভোট বা সমর্থনের মাধ্যমে সকল বা অধিকাংশ মুক্তাদি যাকে পূর্বোল্লিখিত গুণাগুণসমূহের ভিত্তিতে অধিকতর যোগ্য মনে করবেন তিনি নামাজের ইমাম হবেন। আর এই সমর্থন দিতে হবে সকল রকম অন্যায় প্রভাব মুক্ত হয়ে।

খ. ঐ পদ্ধতি অনুসরণ করে ইমাম নির্বাচন করা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান। কারণ, রাসূল সা. বলেছেন, ঐ পদ্ধতি অনুসরণ না করে যে ইমাম হবে, তার নামাজ কবুল হবে না। সুতরাং তাকে জাহান্নামে যেতে হবে অর্থাৎ তার সকল কর্মকাণ্ড ব্যর্থ হবে।

নামাজের অনুষ্ঠান থেকে আল্লাহ মুসলমানদের বিভিন্ন শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। আর নামাজের ইমাম নির্বাচনের বিধি-বিধানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, সমাজের নেতা নির্বাচন করার বিধি-বিধান। তাহলে সমাজের নেতা নির্বাচনের সেই বিধি-বিধানগুলো হবেঃ

ক. নেতা নির্বাচিত করতে হবে সকল বা অধিকাংশ ঈমানদার মুসলমানের সমর্থন তথা ভোটের মাধ্যমে।

খ. সকল বা অধিকাংশ ঈমানদার মুসলমান ঐ ভোটের মাধ্যমে জানাবেন কোন ব্যক্তি তাদের মতে নেতা হওয়ার জন্যে পূর্বোল্লিখিত গুণাগুণের ভিত্তিতে অধিকতর যোগ্য।

গ. ঐ ভোটগ্রহন হতে হবে সকল প্রকার অন্যায় প্রভাবমুক্তভাবে।

৩। কার্যকরী কমিটি গঠনে নেতার পছন্দকে গুরুত্ব দেয়া 
সূরা ত্বহার ২৯ থেকে ৩২ নম্বর আয়াতে এবং সূরা আল ফুরকানের ৩৫ নং আয়াতে এই বিষয়ে মুমিনদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। মূসা আঃ আল্লাহর তায়ালার কাছে আবেদন জানালেন আমার বংশের লোকদের মধ্যে একজনকে, আমার ভাই হারুনকে, আমার সহযোগী বানিয়ে দিন। তার দ্বারা আমার হাতকে শক্তিশালী করুন এবং তাকে আমার কাজে শরীক বানিয়ে দিন। আল্লাহ তায়ালা তার এই আবেদন কবুল করে বললেন, 
হে মুসা তুমি যা চেয়েছো তা তোমাকে দেয়া হলো।

নেতা যাদের নিয়ে কাজ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবেন অথবা যাদের নিয়ে কাজ করতে কমফোর্ট ফীল করবেন তাদের নিয়ে কাজ করলে নেতার কাজ করা সহজ হয়। মুসা আঃ যা চেয়েছেন আল্লাহ তায়ালা সে ইচ্ছা কবুল করেছেন। কার্যকরী কমিটি গঠনের ব্যাপারে তাই নেতার পছন্দকে গুরুত্ব দেয়া দরকার। 

৪। পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা 
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন,“এবং তারা নিজেদের সব কাজ পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে চালায়।”(সূরা শূরাঃ৩৮)

এ বিষয়টিকে এখানে ঈমানদারদের সর্বোত্তম গুণাবলীর মধ্যে গণ্য করা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানে (আয়াত ১৫৯) এর জন্য আদেশ করা হয়েছে। এ কারণে পরামর্শ ইসলামী জীবন প্রণালীর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পরামর্শ ছাড়া সামষ্টেক কাজ পরিচালনা করা শুধু জাহেলী পন্থাই নয়, আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের সুস্পষ্ট লংঘন। ইসলামে পরামর্শকে এই গুরুত্ব কেন দেয়া হয়েছে? এর কারণসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করলে আমাদের সামনে তিনটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়ঃ

এক. যে বিষয়টি দুই বা আরো বেশী লোকের স্বার্থের সাথে জড়িত সে ক্ষেত্রে কোনো এক ব্যক্তির নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের উপেক্ষা করা যুলুম। যৌথ ব্যাপারে কারো যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার নেই। ইনসাফের দাবী হচ্ছে, কোনো বিষয়ে যতো লোকের স্বার্থ জড়িত সে ব্যাপারে তাদের সবার মতামত গ্রহণ করতে হবে এবং তাতে যদি বিপুল সংখ্যক লোকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে তাহলে তাদের আস্থাভাজন প্রতিনিধিদেরকে পরামর্শের মধ্যে শামিল করতে হবে।

দুই. যৌথ ব্যাপারে মানুষ স্বেচ্ছাচারিতা করার চেষ্টা করে অন্যদের অধিকার নস্যাত করে নিজের ব্যক্তিস্বার্থ লাভ করার জন্য, অথবা এর কারণ হয় সে নিজেকে বড় একটা কিছু এবং অন্যদের নগণ্য মনে করে। নৈতিক বিচারে এই দুটি জিনিসই সমপর্যায়ের হীন। মু’মিনের মধ্যে এ দুটির কোনেটিই পাওয়া যেতে পারেনা। মু’মিন কখনো স্বার্থপর হয়না। তাই সে অন্যদের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে নিজে অন্যায় ফায়দা চাইতে পারেনা এবং অহংকারী বা আত্মপ্রশংসিতও হতে পরেনা যে নিজেকেই শুধু মহাজ্ঞানী ও সবজান্তা মনে করবে।

তিন, যেসব বিষয় অন্যদের অধিকতর ও স্বার্থের সাথে জড়িত সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ একটি বড় দায়িত্ব। যে ব্যক্তি আল্লহ্কে ভয় করে এবং একথা জানে যে এর জন্য তাকে তার প্রভুর কাছে কতো কঠিন জবাবদিহি করতে হবে সে কখনো একা এই শুরুভার নিজের কাঁধে উঠিয়ে নেবার দুঃসাহস করতে পারেনা। এ ধরনের দুঃসাহস কেবল তারাই করে যারা আল্লাহর ব্যাপারে নির্ভিক এবং আখিরাত সম্পর্কে চিন্তাহীন। খোদাভীরু ও আখিরাতের জবাবদিহির অনুভূতি সম্পন্ন লোক কোনো যৌথ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কিংবা তাদের নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধিদেরকে পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই ইনসাফ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত কিংবা তাদের নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধিদেরকে পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই শরীফ করার চেষ্টা করবে যাতে সর্বাধিক মাত্রায় সঠিক, নিরপেক্ষ এবং ইনসাফ ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে যদি অজ্ঞাতসারে কোনো ত্রুটি হয়েও যায় তাহলে কোনো এক ব্যক্তির ঘাড়ে তার দায়দায়িত্ব এসে পড়বেনা।

এ তিনটি কারণ এমন, যদি তা নিয়ে কেউ গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করে তাহলে অতি সহজেই সে একথা উপলব্ধি করতে পারবে যে, ইসলাম যে নৈতিক চরিত্রের শিক্ষা দেয় পরামর্শ তার অনিবার্য দাবী এবং তা এড়িয়ে চলা একটি অতি বড় চরিত্রহীনতার কাজ। ইসলাম কখনো এ ধরনের কাজের অনুমতি দিতে পারেনা। ইসলামী জীবন পদ্ধতি সমাজের ছোট বড় প্রতিটি ব্যাপারেই পরামর্শের নীতি কার্যকরী হোক তা চায়। পারিবারিক ব্যাপার হলে সে ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী পরামর্শ করে কাজ করবে এবং ছেলেমেয়ে বড় হলে তাদেরকেও পরামর্শে শরীফ করতে হবে। খান্দান বা গোষ্ঠীর ব্যাপার হলে সে ক্ষেত্রে গোষ্ঠীর সমস্ত বুদ্ধিমান ও বয়ঃপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। যদি একটি গোত্র বা জাতিগেষ্ঠী কিংবা জনপদের বিষয়াদি হয় এবং তাতে সব মানুষের অংশগ্রহণ সম্ভব না হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব পঞ্চায়েত বা সভা পালন করবে যেখানে কোনো সর্বসম্মত পন্থা অনুসারে সংশিষ্ট আস্থাভাজন প্রতিনিধিরা শরীফ হবে। গোটা জাতির ব্যাপার হলে তা পরিচালনার জন্য সবার ইচ্ছানুসারে তাদের নেতা নিযুক্ত হবে জাতীয় বিষয়গুলোকে সে এমন সব ব্যক্তিবর্গের পরামর্শ অনুসারে পরিচালনা করবে জাতি যাদেরকে নির্ভরযোগ্য মনে করে এবং সে ততক্ষণ পর্যন্ত নেতা থাকবে যতক্ষণ জাতি তাকে নেতা বানিয়ে রাখতে চাইবে।

২য় পর্ব পড়ুন

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন