৩০ অক্টোবর, ২০১৬

জন্মদিনের কান্না


বার বার বলার পরও মেয়েটা মনযোগী হচ্ছেনা। উদাস দৃষ্টি নিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। খুব বিরক্ত হচ্ছেন শিক্ষিকা শিরিন শবনম। এই বয়সের মেয়েদের এই হচ্ছে সমস্যা। হুটহাট অভিমান, মন খারাপ করে থাকবে। তারা মনে করে তারাই জগতের সবচাইতে বেশী বুঝে। কেউ একটু পরামর্শ দিলে, আদেশ দিলে কোন কিছু করতে বারণ করলে এই শুরু হয় তাদের পাকামো। আজ প্রায় একযুগের মত মেয়েদের এসব কান্ডকারখানা তিনি দেখে আসছেন। বালিকা বিদ্যানিকেতনের ইংরেজী শিক্ষক তিনি। 

নাওফি মেয়েটাকে ভালোই জানতেন। পড়ালেখায় খুব মনোযোগী। এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজেও দারুণ। উপস্থিত বক্তব্য আর বিতর্কে মেয়েটার জুড়ি নেই। তার বহুদিনের আশা মেয়েটাকে ইংলিশ ডিবেটর বানাবেন। এমন চটপটে মেয়েও যদি আরো আট দশটা মেয়েদের মত আবেগী হয়ে পড়ে, অমনযোগী হয়ে পড়ে ব্যপারটা দুঃখজনকই বটে! তিনি দেখলেন মেয়েটি যে শুধুমাত্র বাইরে আকাশের দিকে বার বার তাকায় তা নয়, বার বার বইয়ের নিচে একটি খাতা দেখছে। শিরিন ম্যাডাম পড়ানোর পাশাপাশি চোখ রাখছেন নাওফির উপর। এবার আর দৃষ্টি আকর্ষন করছেন না। মনে মনে বললেন, থাক! মেয়েটা কিছুক্ষন নিজের মত থাক। 

অল্পকিছু পর ম্যাডাম মূল বিষয়টা ধরতে পারলেন, মেয়েটি একটি খাতায় লিখা কিছু একটা পড়ছে আর চোখ মুছছে। তার কান্না ঠেকানোর জন্য সে বার বার বাইরে তাকাচ্ছে। নিজেকে ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ম্যাডামের ভয়ানক রাগ হলো, বুঝতে পারলেন প্রেম ঘটিত ব্যাপার। এতটুকুন মেয়ে পড়ে ক্লাস সেভেনে। এখনই এসবে জড়িয়ে পড়েছে। এগুলোকে প্রশ্রয় দিতে নেই। কড়া ধমক দিয়ে ডাক দিলেন, নাওফি! 

ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে উঠলো নাওফি! থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। ম্যাডাম নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে বললেন, নাওফি তোমার বইয়ের নিচে খাতাটা নিয়ে আসো। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নাওফি। ম্যাডাম আবারো বললেন, কথা কি তোমার কানে যায় না? নাওফি এবার আস্তে আস্তে বলে, ম্যাডাম স্যরি, আমি আর অমনযোগী হবোনা। ম্যাডাম গর্জে উঠলেন তোমাকে কি স্যরি বলতে বলেছি? যা বলেছি তাই করো। পুরো ক্লাসে থমথমে পরিস্থিতি। ম্যাডাম আরেকটি মেয়ে রাশিদাকে বললো, যাও ওর খাতাটি নিয়ে আসো। প্রাণপনে খাতাটি চেপে ধরে নাওফি। কিছুতেই সে খাতাটি হাতছাড়া হতে দিবেনা। এবার ম্যাডাম নিজেই হস্তক্ষেপ করলেন। জোর করে কেড়ে নিলেন খাতাটি নাওফি থেকে। 

সুন্দর মলাট করা একটা খাতা। খাতার উপরে লিখা “আমার প্রিয় মানুষ”। ম্যাডাম শিরিনের ঠোঁটের কোনায় হালকা হাসির রেখা। তিনি ভুল ধারণা করেননি। তারপর মলাট উল্টাতেই একজন ত্রিশোর্ধ মানুষের আঁকা ছবি। ম্যাডাম কড়া করে জিজ্ঞাসা করলেন কে এই লোক? ছবিটা এঁকেছেই বা কে? কোন জবাব দেয় না নাওফি। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আর চোখ দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে অশ্রুমালা। ম্যাডাম একটু ভালো করে ছবি দেখতে গিয়েই দেখলেন কোণায় নাওফির স্বাক্ষর করা। মানে নাওফিই এঁকেছে এই ছবি। ভালোই আঁকতে পারে মেয়েটি। তার এই গুণের কথা জানতেন না ম্যাডাম। 

একটু খটকাও লাগছে ম্যাডামের। এমন বয়স্ক মানুষ কিভাবে প্রিয় মানুষ হয় বুঝতে পারছেন না। পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন। একটা বিয়ের ছবি, সেখানে এই মানুষটার বিয়ে হচ্ছে বুঝা যাচ্ছে। পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন, ঐ লোকটার রক্তাক্ত ছবি, একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাচ্ছেন ম্যাডাম। ঐ লোকটার অনেক রক্তাক্ত ছবি, লোকটাকে অনেকগুলো মানুষ পেটাচ্ছে এমন ছবিও অনেক। আরো পৃষ্ঠা উল্টালেন, এবার লোকটার কফিনের ছবি, দাফনের ছবি, জানাজার ছবি। ম্যাডাম অবাক হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন কে এই ব্যাক্তি? তোমার কি হয়? কিন্তু নাওফি নিরুত্তর। কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেঁদে যাচ্ছে। 

ম্যাডাম পরের পৃষ্ঠা উল্টালেন, সেখানে একটি পুরাতন ডায়েরির একটা পাতা সাঁটা রয়েছে, সেই পাতায় লিখা রয়েছে কয়েকটি লাইন, 
“আজ আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন। আজ আমার জান্নাত, আমার বেহেশত, আমাদের ঘর আলো করেছে। বাচ্চার মা ও বাচ্চা দুজনই আল্লাহর মেহেরবানীতে সুস্থ আছে। বাবুটা আমার মত কালো হয়নি। কি সুন্দর তার চেহারা। আমি শুরুতেই বাবুর মাকে বলেছিলাম আমাদের মেয়েই হবে। আল্লাহর কাছে আমি মেয়েই চেয়েছি। আগে থেকেই ঠিক করেছি মেয়ে হলেই নাম রাখবো নাওফি। আমার বাবুটা শুরু থেকেই আমাকে চিনতে পেরেছে। আমি যখন হাত বাড়িয়েছি প্রায় উড়ে আমার কোলে এসেছে। সবার কোলে গেলে কাঁদে। আর আমার কোলে একদম ঠান্ডা। আজকে প্রথম দিনই বুঝেছি আমার মেয়ে আমাকে খুব ভালবাসে” 

এইবার ম্যাডাম তার ভুল বুঝতে পারলেন, এই ব্যক্তি নাওফির বাবা! তিনি খুব আপসেট হয়ে পড়লেন, উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলেন নাওফিকে। এতক্ষন যে কান্নাকে বহুকষ্টে হজম করে শুধু চোখ দিয়ে পানি ছেড়েছিলো সেই কান্না আর কোন বাধা মানেনি। হুড়মুড় করে বের হয়ে পড়লো। উচ্চস্বরে কেঁদে উঠলো নাওফি। ম্যাডাম মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিছুটা শান্ত হলে ম্যাডাম জানতে চাইলেন কিভাবে কি হলো? কেন তার বাবাকে ওরা মেরে ফেললো? 

নিজেকে একটু স্থির করে নাওফি বলতে শুরু করলো, সেদিন ছিল আমার পঞ্চম জন্মদিন। বাবা জিজ্ঞাসা করেছিলেন তোমার কি লাগবে? আমি বলেছিলাম, আব্বু আমার জন্য একটা প্লেন লাগবে! আমি প্লেন চালিয়ে আকাশে উড়বো। বাবা সারাদিন বের হতে পারেননি, বাইরে খুব মারামারি হচ্ছিল। কিন্তু আমি ছিলাম নাছোড়বান্দা। প্লেন না নিয়ে আসা পর্যন্ত কিছু কান্না থামাচ্ছিলাম না। আমার কান্না আর জেদ দেখে এই মারামারির পরিবেশের মধ্যেও আব্বু বের হয়ে পড়লেন। আব্বু আসেনাতো আসেই না। আমি কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকাল বেলা দেখি সবাই কাঁদছে। আম্মু বার বার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। খালা-ফুফুরাও আমাকে কোলে নিয়ে কাঁদছে। কিছুসময় পরে দেখি আব্বু বারান্দায় পড়ে আছে... রক্ত আর রক্ত... 

আমি জড়িয়ে ধরে ডাকি, বাবা কথা বলেনা। আমি বলি বাবা আমার প্লেন লাগবেনা, তুমি কথা বলো... বাবা আর কোনদিন কথা বলেনা। ক্লাসের সবাই কাঁদছে। ম্যডাম জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে থাকলো নাওফিকে। কিছুটা শান্ত হলে নাওফি আবারো বলে, ম্যাম, আজ আটাশে অক্টোবর, নয় বছর আগে এইদিন আমি আমার বাবাকে হত্যা করেছি। আমি আমার বাবাকে হাসিনার লগি বৈঠার কবলে ফেলে দিয়েছি।
২৯/১০/২০১৫

১৭ অক্টোবর, ২০১৬

পল্টন ট্রাজেডী, পিলখানা, হলি আর্টিজান, জামায়াত নেতাদের মৃত্যুদন্ড বিচ্ছিন্ন কিছু নয়


পবিত্র মাহে রমজানের পর ঈদ-উল ফিতরের আনন্দ উৎসবের রেশ তখনও বিদ্যমান। দেশে যে গণতান্ত্রিক সুন্দর ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় ঈদের ৩ দিন পরই চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কেয়ারটেকার সরকারের কাছে। শান্তিপ্রিয় মানুষ যখন এ ঐতিহাসিক মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছে, সে সময়ই এক অজানা আশঙ্কা ভর করেছে সবার মনে। ঢাকা শহরে এক অদ্ভুত থমথমে নীরবতা, গ্রাম-গঞ্জে আটকেপড়া শহরমুখী মানুষ এক অবর্ণনীয় দুশ্চিন্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে টিভি এবং রেডিওর সামনে কি অবস্থা দেশের? রেওয়াজ অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে এম হাসানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে চারদলীয় জোট সরকার। কিন্তু সেদিন তা আর সম্ভব হলো না। ২৭ অক্টোবর রাত থেকেই পরিকল্পিতভাবে সারাদেশে সৃষ্টি করা হলো এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। 

সেই পুরনো দৃশ্য ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাট ও সড়ক অবরোধ। পরদিন ২৮ অক্টোবর, সব জায়গায় থমথমে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, টিভি চ্যানেলে যখনই কোন সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কী পরিস্থিতি তা জানার জন্য। অবরোধ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের নেতকর্মীরা লগি-বৈঠা-লাঠি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। ফলে হঠাৎ করেই দেশে নেমে আসে চরম নৈরাজ্য। রাজপথ ও সভাস্থল দখলের নামে আওয়ামী লীগ আক্রমণ করে জামায়াত ও জোট নেতাকর্মীদের ওপর, শুরু হয় মুখোমুখি সংঘর্ষ। অত্যন্ত সুকৌশলে দেশকে ঠেলে দেয়া হয় অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে, যার সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ জনগণ। বিকেল এবং সন্ধ্যায় প্রায় সবকটি টিভি চ্যানেলে যখন সচিত্র সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছিল কোটি কোটি মানুষের চোখ তখন স্থির। ঢাকার পল্টন মোড়ে এ কি লোমহর্ষক, হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখছে তারা? লগি, বৈঠা, কিরিচ, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একদল উন্মত্ত মানুষ কিভাবে নির্বিচারে অত্যাচার চালাচ্ছে আরেকদল মানুষের ওপর। কিভাবে পিটিয়ে, খুঁচিয়ে আঘাতের পর আঘাতে জীবন্ত যুবকদের হত্যা করছে, হত্যার পর মৃত লাশের উপর দাঁড়িয়ে উল্লাসনৃত্য করছে। পুলিশের সামনেই মুহুর্মুহু গুলী ও বোমা ফাটিয়ে শত শত বনি আদমকে আহত করছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাজপথ। উহ্! এ দৃশ্য দেখে মূর্ছা গেছেন অনেক মা-বোন, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মানবিক চেতনাসম্পন্ন প্রতিটি মানুষ। গণতান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এ কেমন ভয়ঙ্কর রূপ! সদ্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া বাংলার কতিপয় মানুষের এ কেমন খোলস?

সেদিন শুধু রাজনৈতিক ভিন্নতার কারণে জামায়াত-শিবির কর্মীরা আওয়ামী লীগের বর্বোরচিত হামলার শিকার হন। অনেকের বাড়িঘর দখল করে নেয়া হয়, কারো বাড়ি আর সহায়-সম্পত্তিতে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়, কারো হাত কেটে নেয়া হয়, আবার কারো চোখ উপড়ে ফেলা হয়। আর এভাবেই জামায়াতে ইসলামীসহ জোটের ৪ সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হন। যার মধ্যে অসংখ্য সাধারণ মানুষও রয়েছে। তৈরি হয় লাশের স্তুপ। জামায়াতে ইসলামীর ১৩ জনসহ মোট ২৬টি লাশ ঝরে পড়ে।

কিন্তু কেন এই ঘটনা? এটা কি শুধুই আওয়ামী সন্ত্রাসীদের কাজ? নাকি আছে সেখানে অন্য কোন বড় পরিকল্পনা? সেটা জানতে হলে দেখতে হবে কেমন ছিল জোট সরকারের আমল। 

জনগণের জান, মাল ও সম্ভ্রম রক্ষা এবং দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে আইন-বিরোধী কার্যক্রম এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করার লক্ষে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার জন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উন্নত সরঞ্জাম, আধুনিক অস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার উপযোগী বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলা হয়।

সমাজের সকল স্তরের এবং সব শ্রেণীর মধ্যে দুর্নীতির প্রসার ঘটেছে। এ বিষয়ে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক এবং অনেক ক্ষেত্রে অতি প্রচারণা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সৎ ও নৈতিক জীবন-যাপন করলেও বিশেষত বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং সংবিধান ও আইনের অধীনে কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা ও জনমত সৃষ্টির জন্য নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ, মিডিয়া এবং জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা নেয়া হয়

জোট সরকার অর্থনেতিক উন্নয়নের এই ধারাকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনীতি এবং শিল্প ও বাণিজ্যের অব্যাহত উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য বেসরকারি খাত ও সমবায়কে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। দেশী, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা, বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশীদেরকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। দেশের সবচেয়ে বেশী শ্রমিক বিশেষ করে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক নিয়োগকারী এবং সবচেয়ে বেশী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্টস শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ও আরও সম্প্রসারিত হতে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হয়। দেশীয় শিল্প, বিশেষ করে পাট, চা, বস্ত্র, চিনি, ঔষধ, সিরামিক ও চামড়া শিল্পের সুরক্ষা ও অব্যাহত উন্নয়নের লক্ষ্যে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উ ন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের শিক্ষিত যুবশক্তি, নারী উদ্যোক্তা এবং সমবায়ীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণ-সহায়তা দেয়া হয়। রপ্তানি বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা এবং অধিকতর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কৃষিভিত্তিক ও রপ্তানিমুখী শিল্পস্থাপন ও প্রসারে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়া হয়

কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় যথাসম্ভব হ্রাস করে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ও দ্রুত কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন নতুন প্রযুক্তি, গবেষণা ও গবেষণালব্ধ ফলাফলকে মাঠে প্রয়োগের ব্যবস্থা নেয়া হয়। কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় এবং ভোক্তাগণকে যাতে অতিরিক্ত মূল্যে দ্রব্যাদি কিনতে বাধ্য হতে না হয় সেই লক্ষ্যে কৃষি পণ্যের যথাযথ সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।

নানা প্রতিবন্ধকতার ভেতরেও চারদলীয় জোট সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে নকলমুক্ত পরীক্ষা, মেয়েদের বিনামূল্য পড়ালেখাসহ শতাধিক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি ও উন্নীত করে। দারিদ্র অথচ মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বৃত্ত্বির ব্যবস্থা করা হয়।

সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থানের দিকে অধিক জোর দেয়া হয়। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে উৎসাহ দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার, সমবায় আন্দোলনকে সহায়তা প্রদান করা হয়। দেশে অধিকহারে শ্রমঘন শিল্প স্থাপন ও বন্ধ শিল্পে পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করার জন্য উৎসাহ দান করা হয়। বিদেশে দক্ষ শ্রমিকদের অধিকহারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। আত্মকর্মসংস্থানের উদ্যোগে সহয়তা দান করার মত বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নয়ন হয়। দেশের সবকটি প্রধান হাইওয়ের উন্নয়ন, বড় বড় নদীর ওপর ব্রীজ নির্মাণ, চট্টগ্রামে নিউমুরিং টার্মিনাল নির্মাণ, বাংলাদেশ রেলওয়ের আধুনিকায়ন, ভৈরবের কাছে মেঘনা সেতু নির্মাণ ও মুন্সীগঞ্জে ধলেশ্বরী সেতু নির্মাণ, কর্নফুলী নদীর ওপর তৃতীয় সেতু নির্মাণ কাজে অগ্রগতি, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও জাপানের অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তি ও সম্ভাব্যতা যাচাই কাজের সমাপ্তি, চট্টগ্রাম ও সিলেট এয়ারপোর্টে নতুন দুটি টার্মিনাল বিল্ডিং নির্মাণ, এসবই হচ্ছে বিগত বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরে যোগাযোগ খাতে উন্নয়নের রেকর্ড।

দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশাসনকে জনগণের হাতের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ও গ্রাম পর্যায়ে যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে জোট সরকার কাজ করেছে। এ লক্ষ্যে নির্বাচিত সরকার প্রচলিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব বহাল রেখেই স্থানীয় উন্নয়ন ও জনকল্যাণে প্রান্তিক জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারিত করে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে প্রতিরক্ষা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পাঠানের নীতি অব্যহত রাখা হয় এবং এর ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়।

সহজে ও কম খরচে, দ্রুত বিচার পাওয়ার জন্য এবং দেশের ঘুণে ধরা বিচার ব্যবস্থাকে গতিময় এবং জনগণের আস্থাশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে বিগত বিএনপি জোট সরকার বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক সংস্কার কার্যক্রমের সূচনা করে।

নারীদের ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসায়ে আগ্রহী ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক কর্মে নিয়োজিত নারীদের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ প্রদান করা হয় এবং চাকরিতে নারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। যৌতুক প্রথা, এসিড নিক্ষেপ এবং নারী ও শিশু-পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার ন্যূনতম পর্যায় নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।

২০০১ সালে জোট সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ফাইবার অপটিক সাবমেরিন কেবল সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন ইনফর্মেশন হাইওয়েতে পৌঁছে গেছে। চারদলীয় জোট সরকারের ২০০১ সালে দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে মোবাইল ফোনের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ লাখ। ২০০৬ সালের শেষে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিন কোটি।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে গ্রামীণ এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃব্যবস্থা প্রবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। ফলে এখন শতকরা নব্বই ভাগ গ্রামবাসী বিশুদ্ধ পানি খেতে পারছেন এবং প্রায় সকলেই অল্প খরচে তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ যথাসময়ের আগেই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে।

পরিবেশ রক্ষায় বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকার তাদের শাসন আমলে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার এবং দুই স্ট্রোক বেবিটেক্সি নিষিদ্ধকরণ, সারা দেশে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সফল হয়েছিল।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গভীরতর করা এবং সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমান অধিকার নিষ্ঠার সাথে রক্ষার নীতিতে অবিচল থেকে সাম্প্রদায়ক সম্প্রীতি বিনষ্টের সকল অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমনের চেষ্টা করা হয়। অনগ্রসর পাহাড়ী ও উপজাতীয় জনগণের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা, চাকুরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সকল সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়।

এতসব অগ্রগতিতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত হচ্ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সার্ককে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে মূলত ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছিল। এটা ছাড়াও জেএমবি নামক দেশদ্রোহী বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী সন্ত্রাসীদের টোটাল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা। জেএমবি সন্ত্রাসীদের বিচারের মুখোমুখী করা। এতেও ক্ষিপ্ত হয় প্রতিবেশী ভারত। ভারত তাদের একতরফা নীতি বাস্তবায়ন করতে অসুবিধা বোধ করছিল। বাংলাদেশ তাদের বিরুদ্ধে চালানো নির্যাতন ও শোষনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এতসব কারণে ভারতের প্রয়োজন ছিল তৎকালীন জনপ্রিয় জোট সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া। সেখানে বসানো পুতুল সরকার। আর এজন্যই শান্ত বাংলাদেশকে অশান্ত করে ফেলা ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। আর এজন্যই পল্টন হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। তার মাধ্যমে বাংলাদেশে গনতন্ত্রকে হত্যা করা হয়, টোটাল রাজনীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। রাজনীতি সম্পর্কে ঘৃণা ছড়ানো হয়। সেই ব্যাপারটা থেকে আজ পর্যন্ত চলমান সব কিছুই প্রতিবেশী ছকের অংশ। 

ভারত তার আধিপত্য বজায় রাখার জন্য পিলখানা হত্যাকান্ডে জড়িত এই বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এটা সবাই জানেন। দেশপ্রেমিক সেনা অফিসার হত্যা মূলত আমাদের সেনাবাহিনীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এটি ছিল একটি বিরল ঘটনা। কোন প্রকার যুদ্ধ ছাড়াই দেশের সবচেয়ে দেশপ্রেমিক ও চৌকস ৫৭ জন সেনা অফিসারসহ ৬৪ জনকে হত্যা করা হয়। 

এরপর শুরু হয় একের পর এক জামায়াত নেতার বিচার ও হত্যা করার উতসব। চলেছে বিচারের নামে এক নজিরবিহীন অবিচার। ডিফেন্স পক্ষের সাক্ষীদের ধরে নিয়ে গুম করা হচ্ছে, রাখা হচ্ছে ভারতের কারাগারে। আজও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, অধ্যাপক গোলাম আযম, মীর কাসেম আলীর ছেলেদের গুম করে রাখা হয়েছে। ধারণা করা হয় এর পেছনে হাত রয়েছে র’ এর। 

আজকাল আবার নতুন নামে জঙ্গীদের আমদানি করা হচ্ছে। জঙ্গী নাম দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে অজ্ঞাত মানুষদের। মানুষের লাশ আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজলভ্য। গুলশানের হলি আর্টিজানে বিশজন বিদেশী নাগরিককে জঙ্গী দ্বারা হত্যা করা হয়েছে। এর আগেও কয়েকজন বিদেশী নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় উল্লেখ করার মত বিষয় হলো হত্যার শিকার বিদেশী নাগরিকরা প্রায় সবাই বাংলাদেশের কোন না কোন উন্নয়ন প্রজেক্টের সাথে জড়িত। বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহায়তাকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের কর্মকান্ড কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছে। এগুলো যে অন্যান্য বন্ধুদেশকে বাংলাদেশ বিমুখ করে বাংলাদেশকে একক করদ রাজ্য বানানোর ষড়যন্ত্র তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

বাংলাদেশে ভারতের আগ্রাসন বিরোধী কাউকে বেঁচে থাকতে দেয়া হবে না। এটাই মূলত ভারতের বাংলাদেশ নীতি। আর অপদার্থ আওয়ামী সরকার সেই নীতি বাস্তবায়ন করেই সরকারে টিকে আছে। কিন্তু এটাই শেষ নয়। বাংলাদেশকে জাগতে হবে। জাগতে হবে এদেশের ইসলামপ্রিয় মানবতাবাদী মানুষদের। যতদিন না এদেশের মানুষ সক্রিয়ভাবে ভারতের আধিপত্যের মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হবে ততদিন এদেশের ভাগ্যাকাশে সোনালী সূর্যের উদয় বিলম্বিত হবে।

১১ অক্টোবর, ২০১৬

নামায পড়ি বুঝে বুঝে



সালাত কিভাবে আদায় করতে হবে এই বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়াল বলেন, ‘মুমিন তারাই আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর ভীত বিহবল হয়, কুরআনের আয়াত শুনলে ঈমান বৃদ্ধি হয়, আল্লাহরই ওপর ভরসা করে, জীবনে সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহর অনুমোদিত পন্থায় আয় ও ব্যয় করে।’ (সূরা আনফাল : ২)
তিনি আরো বলেন, ‘আপনি শুধু তাদেরকেই সতর্ক করতে পারেন যারা না দেখে তাদের রবকে ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে।’ (সূরা রফাতির : ১৮)
তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের সত্যিকার বন্ধু একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং ঐসব মুমিন, যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে ও আল্লাহর সামনে নত হয়।’ (সূরা মায়িদা : ৫৫)
তিনি আরো বলেন, ‘সফলতা লাভ করবে সে সকল মুমিন; যারা সালাতের মধ্যে বিনীত ও নম্র।’ (সূরা মু’মিনুন : ১)
হযরত আবু আইউব আনসারি (রা) এর বর্ণনায় এক সাহাবীর উপদেশ প্রার্থনার জবাবে রাসূল (সা) বলেন, ‘যখন তুমি সালাতে দাঁড়াবে ঐ ব্যক্তির ন্যায় দাঁড়াবে যে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে।’ (মেশকাত)
মুমিনের অন্তরকে গর্ব, অহঙ্কার ও উদাসীনতা থেকে মুক্ত করে কৃতজ্ঞ ও বিনীত করার উত্তম মাধ্যমই হচ্ছে সালাত। আবু হুরায়রা (রা) বলেন, আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি সালাতকে আমার ও বান্দার মধ্যে ভাগ করে নিয়েছি। বান্দা আমার কাছে যা চায় তা সে পাবে। বান্দা যখন বলে ‘আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন’ আল্লাহ তখন বলেন : আমার বান্দা আমার প্রশংসা করল। …আমার বান্দার জন্য তাই যা সে চাইল।’
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন সালাতে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের সাথে গোপনে কথা বলে এবং তার ও কেবলার মাঝেই তার রব বিরাজ করেন।’ (বুখারী)
এ হাদিস দু’টি থেকে বুঝা যায়, সালাত হচ্ছে আল্লাহর সাথে বান্দার কথোপকথন। ইমাম অথবা নিজের উচ্চারণে তার বাণী শোনা, তার কাছে প্রার্থনা করা, অনুতপ্ত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া, অঙ্গীকার করা ইত্যাদি।

কিন্তু এই বিষয়গুলো আমরা অনুভব করতে পারি না, কারণ আমরা আরবী বুঝি না। আরবী না বুঝার কারণে আমরা কি বলি তা আমরা নিজেই বুঝি না। আমরা যদি একটু কষ্ট করে জেনে নিতে পারি নামাজে আমরা কি বলছি তাহলে আমাদের জন্য আল্লাহর সাথে কথা বলা এবং ভয় পাওয়া, ক্ষমা চাওয়ার বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে পারবো। সেই সাথে নামাজে মনযোগ ধরে রাখতে পারবো। নামাজে বিনয়াবত হতে পারবো। ইনশাআল্লাহ্‌। 

রাসূল (সা) সালাত শুরুর মুহূর্তে দাঁড়িয়ে যে দোয়া পড়তেন:
‘আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁরই দিকে নিবিষ্ট হলাম যিনি এ বিশ্ব ও মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছেন। যারা শিরক করে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার সালাত ও কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু তারই জন্য যিনি এ মহাবিশ্বের মালিক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। এ কথা মেনে নেয়ার নির্দেশই আমাকে দেয়া হয়েছে। আর সবার আগে আমিই তা মেনে নিলাম।’ (সূরা আনয়াম : ৭৯)
তাকবিরে তাহরিমা :
আল্লাহু আকবার।
অর্থ: আল্লাহ তা’য়ালা সর্বশ্রেষ্ঠ

সানা :
সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাস্’মুকা ওয়া তায়া’লা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।.

অর্থ : হে আল্লাহ! তুমি পাক, তোমারই জন্য সমস্ত প্রশংসা, তোমার নাম পবিত্র এবং বরকতময়, তোমার গৌরব অতি উচ্চ, তুমি ছাড়া অন্য কেউ উপাস্য নাই ।

তাআউয (আউযুবিল্লাহ):
আউযু বিল্লাহি মিনাশ্ শাইত্বোনির রাজীম।
অর্থ: বিতাড়িত শয়তান হইতে আল্লাহ তা’য়ালার আশ্রয় প্রার্থনা করিতেছি ।

তাসমিয়াহ্ (বিসমিল্লাহ্):
বিসমিল্লাহির রহ্’মানির রহিম
অর্থঃ শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুনাময়,অসীম দয়ালু।

সুরা ফাতিহা :

১) (بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ)-[শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুনাময়, অতি দয়ালু]।

২) (الْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ)-[যাবতীয় প্রশংশা আল্লাহ তা’আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা]।

৩) (الرَّحْمـنِ الرَّحِيمِ)-[যিনি নিতান্ত্ মেহেরবান ও দয়ালু]।

৪) (مَـالِكِ يَوْمِ الدِّينِ)-[যিনি বিচার দিনের মালিক]।

৫) (إِيَّاكَ نَعْبُدُ وإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ)-[আমরা শুধুমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি]।

৬) (اهدِنَــــا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ)-[আমাদের সরল পথ দেখাও],

৭) (صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيهِمْ غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ)-[তাদের পথ যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয় যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে]।


রুকুর তাসবীহ্:
সুবহানা রব্বিয়াল আযীম ।(আমার মহান প্রভু পবিত্র)।

রুকু হইতে উঠিবার তাসবিহ্
সামিআল্লাহু লিমান হামিদা (যে আল্লাহর প্রসংশা করে, আল্লাহ তা শোনেন)।

রুকু হইতে উঠে সোজা হয়ে দাড়িয়ে পড়ার তাসবিহ্
রব্বানা লাকাল হাম্’দ্ (হে আমাদের রব ! তোমার জন্যই সকল প্রশংসা)। 
এর সাথেঃ হামদান্ কাছী-রান্ তাইয়্যেবাম্ মুবা-রাকান ফি-হ। (তোমার প্রশংসা অসংখ্য, উত্তম ও বরকতময়) 

অথবাঃ
রাব্বানা- ওয়া লাকাল হামদ্, হামদান্ কাছী-রান্ তাইয়্যেবাম্ মুবা-রাকান ফি-হ, মিল্আস্ সামা-ওয়া-তি ওয়া মিল্আল্ ‘আরদি, ওয়া মিল্আ মা বাইনাহুমা, ওয়া মিল্আ মা শি’তা মিন শাইয়িম বা’দু। 

অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার জন্যই সমস্ত প্রশংসা। তোমার প্রশংসা অসংখ্য,উত্তম ও বরকতময়, যা আকাশ ভর্তি করে দেয়, যা পৃথিবী পূর্ণ করে দেয়,উভয়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে এবং এগুলো ছাড়া তুমি অন্য যা কিছু চাও তাও পূর্ণ করে দেয়।

সিজদার তাসবিহ্
সুবহানা রব্বিয়াল আ’লা (আমার সর্বোচ্চ প্রতিপালকের প্রশংসা করছি।)।

সিজদা থেকে উঠে বসে তাসবিহ্ (দুই সিজদার মাঝে) 
রব্বিগ্ফিরলী-,রব্বিগ্ফিরলী-,রব্বিগ্ফিরলী-,আল্লাহুম্মাগফিরলী-,ওয়ারহামনী-,ওয়াহদিনী-, ওয়ারযুকনী-,ওয়া ‘আ-ফিনী-,ওয়াজবুরনী-।

অর্থঃ হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর। হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে রহম কর, আমাকে হেদায়াত দান কর, আমাকে রিযিক দান কর, আমাকে সুস্থ্যতা দান কর এবং আমার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ কর।

অথবা শুধু এইটুকুঃ 
আল্লাহুম্মাগফিরলী-,ওয়ারহামনী-,ওয়াহদিনী-, ওয়ারযুকনী। 
অর্থঃ হে আল্লাহ্! আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে রহম কর, আমাকে হেদায়াত দান কর, আমাকে রিযিক দান কর। 

তাশাহ্’হুদ (আত্তাহিয়্যাতু):
আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াচ্ছালাওয়াতু ওয়াত্’ত্ব্ইয়্যিবাতু (সমস্ত্ তা’যীম,সমস্ত্ ভক্তি,নামায,সমস্ত্ পবিত্র ইবাদত বন্দেগী আল্লাহর জন্য্,আল্লাহর উদ্দেশ্যে),

আস্’সালামু আ’লাইকা আইয়্যুহান্’নাবিয়্যু ওয়া রহ্’মাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু (হে নবী! আপনাকে সালাম এবং আপনার উপর আল্লাহর অসীম রহমত ও বরকত)

আস্’সালামু আ’লাইনা ওয়া আলা ই’বদিল্লাহিছ্ ছ্বালিহীন (আমাদের জন্য এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি অবতীর্ন হোক)।

আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নাই এবং মোহাম্মদ (দঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল) ।

দরুদ শরীফঃ
আল্লাহুম্মা ছাল্লি আ’লা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আ’লা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আ’লা ইব্রাহীমা ওয়া আ’লা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্ মাজীদ

অর্থঃ আল্লাহ্! হযরত মোহাম্মদ (দঃ) এবং মোহাম্মদ (দঃ)-এর আওলাদগনের উপর তোমার খাস রহমত নাযিল কর,যেমন ইবরাহীম (আঃ) এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর আওলাদগনের তোমার উপর খাস্ রহমত নাযিল করেছ,নিশ্চয়ই তুমি প্রসংশার যোগ্য এবং সর্বোচ্চ্ সম্মানের অধিকারী।

আল্লাহুম্মা বারিক আ’লা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আ’লা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাক্’তা আ’লা ইব্রাহীমা ওয়া আ’লা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্ মাজীদ

অর্থঃ আল্লাহ্! হযরত মোহাম্মদ (দঃ) এবং মোহাম্মদ (দঃ)-এর আওলাদগনের উপর তোমার খাস বরকত নাযিল কর,যেমন ইবরাহীম (আঃ) এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর আওলাদগনের তোমার উপর খাস্ বরকত নাযিল করেছ,নিশ্চয়ই তুমি প্রসংশার যোগ্য এবং সর্বোচ্চ্ সম্মানের অধিকারী

দরুদের পর সালাম ফিরানোর পূর্বের দোয়াঃ
আল্লাহুম্মা ইন্নি যালামতু নাফসি যুলমান কাছ্বীরাও ওয়ালা ইয়াগফিরুদ্বুনুবা ইল্লা আনতা ফাগফিরলী মাগফিরাতাম্ মিন ইনদিকা ওয়ারহামনী, ইন্নাকা আন্তাল গাফুরুর রাহীম (আরেক বর্ণনায়ঃ ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়াবুর রাহীম)।

অর্থঃ হে আল্লাহ, আমি আমার নিজের উপর অনেক বেশী যুলুম করেছি, আর তুমি ছাড়া আমার গুনাসমুহ আর কেহই মাফ করতে পারে না; সুতরাং তুমি তোমার নিজ গুনে আমাকে মার্জনা করে দাও এবং আমার প্রতি রহম কর। তুমিতো মার্জনাকারী ও দয়ালু।
আল্লা-হুম্মা ইন্নী- আ’ঊযুবিকা মিন আযা-বি জাহান্নাম, ওয়া মিন আযা-বিল ক্বাবরি, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহ্ইয়া- ওয়ালমামা-তি ওয়া মিন ফিতনাতিল মাসী-হি দ্দাজ্জাল। 

অর্থঃ আমি আল্লাহর নিকট আশ্রয় কামনা করি জাহান্নামের আযাব থেকে, কবরের শাস্তি থেকে, জীবন ও মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফেৎনা থেকে।

রব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুনিয়া- হাসানাতান, ওয়া ফিল আখেরাতি হাসানাতান, ওয়াক্বিনা- আযা-বান্নার। 

অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।

পিতামাতার জন্য দোয়া এবং আরও যত দোয়া এবং মুনাজাত আছে তা এখানে করা যেতে পারে। 

সালাম ফিরানোর পরের তাসবীহ সমুহ 
আস্তাগফিরুল্লাহ্ (আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি)
আল্লা-হুম্মা আনতাস্ সালা-মু, ওয়ামিনকাস্ সালা-মু, তাবা-রাকতা ইয়া-যাল জালা-লি ওয়াল ইকরা-ম।

অর্থঃ হে আল্লাহ্, তুমি প্রশান্তি দাতা, আর তোমার কাছেই শান্তি, তুমি বরকতময়, হে মর্যাদাবান এবং কল্যাণময়।

سبحان الله (সোবহানাল্লাহ্) (আল্লাহ্ মহাপবিত্র) ৩৩ বার,
الحمد لله (আল-হামদুলিল্লাহ্) (সকল প্রশংসা আল্লাহর) ৩৩ বার এবং
الله أكبر ( আল্লাহু আকবার) (আল্লাহ্ সবচেয়ে বড়) ৩৩ বার পড়বে আর একশত পূর্ণ করতে নিম্নের দো’আটি পড়বেন।

(لاَإِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَعَلىكُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ )

উচ্চারণঃ (লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু লা-শারী-কালাহু,লাহুল মুলকু, ওয়ালাহুল হামদু,ওয়া হুয়া ‘আলা- কুল্লি শাইইন ক্বাদী-র।)

অর্থঃ আল্লাহ্ ছাড়া (সত্য) কোন মা’বূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনিই সব কিছুর উপর ক্ষমতাশালী।

এছাড়াও বিতর নামাজে আমাদের আয়াতুল কুরসী পড়তে হয়।
আয়াতুল কুরসীঃ
আল্লাহু লা- ইলাহা ইল্লা- হুওয়া, আল হাইয়্যুল কাইয়্যু-ম, লা-তা’খুযুহু ছিনাতুউঁ- ওয়ালা- নাউ-ম, লাহু- মা- ফিচ্ছামা-ওয়া-তি ওয়ামা- ফিল ‘আরদি; মান্ যাল্লাযী- ইয়াশফা’উ ‘ইন্দাহু- ইল্লা- বিইয্ নিহি, ই’য়ালামু মা-বাইনা আইদী-হিম ওয়ামা- খালফাহুম, ওয়ালা- ইউহী-তূ-না বিশাইয়িম্ মিন ‘ইলমিহী-, ইল্লা- বিমা-শা-আ, ওয়াছি’আ কুরছিয়্যুহুচ্ছামা-ওয়া-তি, ওয়াল ‘আরদা, ওয়ালা- ইয়াউ-দুহু হিফজুহুমা- ওয়াহুয়াল ‘আলিয়্যুল আযী-ম।

অর্থঃ আল্লাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোন (সত্য) মাবূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক, তাঁকে তন্দ্রা এবং নিদ্রা স্পর্শ করতে পারে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে এমন যে, তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত আছেন। যতটুকু তিনি ইচ্ছে করেন,ততটুকু ছাড়া তারা তাঁর জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসী সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করা তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি মহান শ্রেষ্ঠ। [সূরা আল-বাকারাহঃ ২৫৫]

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে নামাজ বুঝে, পূর্ণ মনযোগ নিয়ে এবং খুশুখুজুর সাথে পড়ার তাওফীক দান করুন। আমীন 

৭ অক্টোবর, ২০১৬

শহীদ মুজাহিদ, ইসলামী রাজনীতির এক কালজয়ী কবি


আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন কবি। অমর কবি। কালজয়ী কবি। লিখে গিয়েছেন তিনি সাবলীল ভঙ্গীতে রাজনীতির কবিতা, বিপ্লবের কবিতা। একটি আন্দোলন, একটি সংগঠন, একটি ইতিহাস, একটি আপসহীন সংগ্রামের কবিতা। এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রাম, জাতির উত্থান-পতন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচার বিরোধী সংগ্রামে জনাব মুজাহিদ একটি অকুতোভয় নাম। তিনি আধিপত্যবাদ বিরোধী চেতনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। বাংলার জমিনে নাস্তিকতাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের রক্তচক্ষু মোকাবিলা করে তৃণমুল থেকে গড়ে উঠে আসা একজন সংগ্রামী প্রাণপুরুষ। হাসিনা সরকার শুধুমাত্র আদর্শিক কারণেই ইসলামী আন্দোলনের এই জনপ্রিয় নেতাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার পাঁয়তারা করছে। কিন্তু শহীদদের দুনিয়া থেকে সরানো যায় না। তাঁরা জীবিত। তাদের মরণ নাই। মানুষকে যুগ যুগ ধরে প্রেরণা দেবার জন্যই জন্ম। 

ব্যক্তি জীবনে অল্পে তুষ্ট, নির্লোভ, পরোপকারী, দৃঢ়চেতা, সংগ্রামী জননেতা মোহাম্মদ মুজাহিদ খুব অল্প সময়ে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই জনপদের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। নিজের কর্ম তৎপরতায় সদা তৎপর তিনি। তিনি মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার রায় শুনে আইনজীবীদের কাছে বললেন- ‘সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শাস্তির জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই। আমি পত্রিকার মাধ্যমে অবহিত হয়েছি যে, আপিল বিভাগে আমার পক্ষে আইনজীবীরা যথেষ্ট বলিষ্ঠভাবে এবং দৃঢ়তার সাথে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ঐসব মিথ্যা অভিযোগে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপক্ষ আমার বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি। এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ট্রাইব্যুনালে জেরার সময় স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশের কোথাও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত কোনো অপরাধের সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। এমনকি আমি আদৌ আল বদর, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল শামস বা এই ধরনের কোনো সহযোগী বাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম এমন কোনো তথ্য তিনি তার তদন্তকালে পাননি। এর পরও আমার মৃত্যুদণ্ড বহাল। আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

আমি আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে বলছি, আমার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ শতভাগ মিথ্যা ও বানোয়াট। ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন সময়ে কোন ধরনের অপরাধের সাথে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে এত বছর পরে আমার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগ সাজানো হয়েছে।

প্রতিদিন বাংলাদেশে শত শত লোক স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে। এসব মৃত্যুর সাথে ফাঁসির আদেশের কোনো সম্পর্ক নেই। কখন, কার, কিভাবে মৃত্যু হবে সেটা একমাত্র আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেন। আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সাধ্য কারো নেই। সুতরাং ফাঁসির আদেশে কিছু যায় আসে না। আমি মৃত্যুদন্ড বহাল রাখার ঘোষণায় উদ্বিগ্ন নই।
অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা গোটা মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে তার জন্য আমি মোটেই বিচলিত নই। আমি আল্লাহর দ্বীনের উদ্দেশ্যে আমার জীবন কুরবান করার জন্য সব সময় প্রস্তুত আছি।’

শিক্ষা: আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি। তিনি তার পিতা, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুল আলীর কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। একজন ধর্মীয় নেতা ও আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসেবে মাওলানা আব্দুল আলীকে আজও ফরিদপুরসহ গোটা অঞ্চলের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তিনি শুধু ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না বরং জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬২-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যও (এমপিএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন।

পরবর্তীতে, জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ফরিদপুর ময়জুদ্দিন স্কুলে ভর্তি হন এবং তারও পরে তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন। মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশুনা সুসম্পন্ন করার পর তিনি ফরিদপুরে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক ডিগ্রী শেষ করার পর তিনি ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় আগমন করেন। জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাত্র দুই-আড়াই মাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ক্লাস করার পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় জনাব মুজাহিদ আর সেখানে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন।


ছাত্র রাজনীতি: ছাত্র জীবন থেকেই জনাব মুজাহিদ রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। শুরুতে রাজেন্দ্র কলেজে কিছুদিন এনএসএফ এ কাজ করার পর তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে যুক্ত হন। ১৯৭০ এর ডিসেম্বরে যখন তিনি ফরিদপুর ছাড়েন তখন তিনি ফরিদপুর জেলায় ছাত্রসংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঢাকায় এসে তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের ঢাকা জেলার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭১ সালের জুলাইতে ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক সেক্রেটারি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মনোনীত হন এবং এর মাত্র দুই মাস পর অক্টোবরে তিনি ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক সভাপতি নির্বাচিত হন। 

জামায়াতে যোগদান: ছাত্রজীবন শেষ করার পরপরই আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮২-১৯৮৯ পর্যন্ত ঢাকা মহানগরী জামায়াতের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। 

প্রাথমিক কর্মজীবন: জনাব আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ তার পেশাগত জীবন শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে। এর আগে ১৯৭৩-১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠায় তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। স্কুলের জন্য আর্থিক সংস্থান ও ছাত্র সংগ্রহে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তার ঐকান্তিক চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের কারণে আদর্শ স্কুল আজও নারায়ণগঞ্জ জেলায় সর্বশ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি নারায়ণগঞ্জের আদর্শ স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে সাংগঠনিক প্রয়োজনে তিনি ঢাকায় স্থানান্তরিত হন। গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি দৈনিক সংগ্রামের চেয়ারম্যান এবং সাপ্তাহিক সোনার বাংলার পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। গ্রেফতার হওয়ার কিছু দিন পূর্বে তিনি ’রাইজিং সান’ নামক একটি ইংরেজি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছিলেন। পত্রিকাটির ডামি ভার্সন তখন প্রকাশিত হচ্ছিল। জনাব মুজাহিদ গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় পত্রিকাটি আজও আলোর মুখ দেখেনি।

জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ বরাবরই দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র আন্দোলনে, ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে, ১৯৯৪-১৯৯৬ কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, ২০০০ সালে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলনে এবং ২০০৭ সালে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর পাশাপাশি, জনগনের মৌলিক সমস্যা ও জাতীয় সমস্যা নিরসনেও তিনি সক্রিয় অবদান রাখেন। 

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং মন্ত্রী হিসেবে সফলতার সাথে ৫ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন তিনি নিন্মোক্ত সরকারি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিটিগুলো হচ্ছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, নির্বাহী কমিটি-জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক), জাতীয় নারী উন্নয়ন কাউন্সিল, অর্থনীতি সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটি, নারী উন্নয়ন এবং নারী অধিকার বিষয়ক জাতীয় কমিটি, কারা সংস্কার কমিটি, এসিড ও মাদক নিয়ন্ত্রন জাতীয় কমিটি, ক্ষুদ্র ঋণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি, বয়স্ক ভাতা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং কিশোর অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকালীন সময়ে তিনি মাদারীপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সামাজিক কার্যক্রম: নিঃস্বার্থ একজন সমাজ সেবক হিসেবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ব্যাপক সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দেশজুড়ে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং মসজিদ ও এতিমখানা বিনির্মাণে তার সক্রিয় ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তার নিজ জেলা ফরিদপুরে তিনি ৫০ টিরও বেশি মসজিদ নির্মাণে ভূমিকা পালন করেন। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তিনি এই ব্যাপক সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মাদ্রাসা ছাত্রদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন।

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কারণে ২০০২ সালে তৎকালীন চার দলীয় জোট সরকার ফাজিলকে বিএ সমমানের এবং কামিলকে মাস্টার্স মানে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণেও তার ভূমিকা সক্রিয় ছিল। তার প্রচেষ্টা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে ফরিদপুর ও মাদারীপুরের মত অবহেলিত জেলা দুটিতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালিত হয়। অগণিত রাস্তা, সড়ক ও মহাসড়ক, মাদরাসা, ব্রীজ, কালভার্ট ও মসজিদ এই সময় এই এলাকাগুলোতে নির্মিত হয়। তিনি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় বিভাগীয় সমাজ সেবা কেন্দ্র এবং হাজী শরীয়তউল্লাহ ব্রীজ উদ্বোধন করেন। 

মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে জনাব মুজাহিদ দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তিনি নিয়মিতভাবেই তার মন্ত্রণালয়ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে সারপ্রাইজ ভিজিটে যেতেন। এর মাধ্যমে তিনি মন্ত্রণালয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করেছেন এবং তাতে তিনি অনেকটা সফলও হয়েছেন। তার মেয়াদে তিনি বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলায় ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শিশু সদন (সরকারি এতিমখানা) নির্মাণ করেন। যা সমাজের ভাগ্যহত ও অনগ্রসর কিশোর কিশোরীদের উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসতে ব্যপকভাবে সাহায্য করে।
২০০১ সালে যখন জনাব আলী আহসান মো: মুজাহিদ সমাজকল্যান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন, তখন তা একটি দুর্বল বা লো প্রোফাইল মিনিস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু তার ৫ বছরের মেয়াদের শেষে এটি হাই প্রোফাইল তথা আলোচিত মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়। মন্ত্রণালয়ের বাজেট মাত্র ৫ বছরে ৫ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। এগুলো সবই হয় মন্ত্রী হিসেবে তার একনিষ্ঠ ও সফলতার কারণে। 

তিনি তার মন্ত্রিত্বের ৫ বছরে ছোট খাট নানা অনুষ্ঠান ছাড়াও ৪০টিরও বেশি আলোচিত প্রোগ্রাম করেন যেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যোগ দেন। তার নেতৃত্বে ২০০৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম প্রতিবন্ধী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ’মুক্তা’ নামক একটি মিনারেল ওয়াটারেরও প্রবর্তন করেন। যা প্রতিবন্ধীদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত এবং বাজারজাতকৃত। তার এই উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশের নাম তখন বিশ্ব দরবারে ভিন্নভাবে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়। তার সময় প্রতিবন্ধী অলিম্পিকেও বাংলাদেশ সফলতা অর্জন করে। এছাড়া সুদ মুক্ত ঋণ ও এসিডদগ্ধদের মধ্যে ব্যপকভাবে ভাতা প্রদান করা হয় তার সময়ে। জনাব মুজাহিদ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে ঘুরে নিজে এই ভাতা বিতরণ করতেন। তাই তার সময়ে গ্রামের অভাবী মানুষ সুদখোর মহাজন এবং বেসরকারি সংস্থার হাত থেকে মুক্ত হয়ে সরকারের কাছ থেকে বিশেষত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হাত থেকে ঋণ নিতে শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে এই উন্নয়নমূলক কার্যক্রমগুলো বন্ধ হয়ে যায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে।

প্রকাশনা: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন জনপ্রিয় এবং স্বনামধন্য লেখক। তার ৩টি বই ভীষণভাবে পাঠক সমাদৃত হয়। বইগুলো হলো, আজকের মুসলমান: ইসলামের দাবী, বিশ্বব্যপী ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামী এবং তুরস্ক সফর। জনাব মুজাহিদ ইসলামী শিক্ষা, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুর উপরও নিয়মিতভাবে লেখালেখি করেছেন।


ভ্রমণ: জনাব মুজাহিদ ২০টিরও বেশি দেশে ভ্রমণ করেছেন। এই সব দেশে তিনি গণ্যমান্য, প্রভাবশালী এবং ইসলামী নেতৃবৃন্দের সাথেও সাক্ষাৎ করেন। তার ভ্রমণকৃত উল্লেখযোগ্য দেশের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমীরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, জাপান,থাইল্যান্ড এবং তুরস্ক।


বৈবাহিক অবস্থা: আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৭৩ সালের ১৮ অক্টোবর বেগম তামান্না-ই-জাহানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তামান্না-ই-জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মহানগরী মহিলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তামান্না-ই-জাহান একজন গৃহিণী এবং পড়ুয়া মানসিকতার একজন নারী যিনি নিয়মিতভাবে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করেন।
জনাব মুজাহিদ ৩ পুত্র ও এক মেয়ে সন্তানের জনক।

শহীদ মুজাহিদের শেষ কথাঃ আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া। জেল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা এই সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন। জেল কর্তৃপক্ষ আসলে অসহায়। তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই পর্যন্ত আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহার করেছেন। তারা আমাকে একটি লিখিত আবেদনের জন্য যথেষ্ট পীড়াপীড়ি করেন এবং বলেন এটা না হলে তাদের অসুবিধা হয়ে যাবে। এক পর্যায়ে তারা বলেন, আপনার যা বক্তব্য আছে তাই লিখে দেন। আর সেই কারনেই এটা বলার পর আমি কনসিকুয়েন্স বুঝেও আমি তাদের সুবিধার জন্য একটি লিখিত আবেদন দিয়েছি। 

আমি রাষ্ট্রপতিকে লিখেছি, আইসিটি এ্যাক্ট, যদিও এটা অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তারপরও এই বিচারের সময় আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সীমিত সুযোগ দেয়া হয়েছে। আমার ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন, সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য ছিলনা। সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

আমাকে ট্রাইবুনাল ৬ নং চার্জে মৃত্যুদন্ড দেয়নি। তারা চার্জ ১ কে চার্জ ৬ এর সাথে মিলিয়ে চার্জ ৬ এ মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। আপীল বিভাগ আমাকে চার্জ ১ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। চার্জ ৬ এ তারা আমার মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে। অথচ ট্রাইবুনাল শুধু চার্জ ৬ এর জন্য আমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়নি।

এই চার্জে স্বাক্ষী মাত্র একজন। সে বলেনি, যে কোন বুদ্ধিজীবিকে আমি হত্যা করেছি। কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারের সন্তানও এসে বলতে পারেনি যে আমি কোন বুদ্ধিজীবিকে মেরেছি। এবং কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারও আমার রায়ের পরও দাবী করেনি যে তারা তার পিতা হত্যার বিচার পেয়েছেন। আমার অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে যে আমি নাকি আর্মী অফিসারদের সাথে বসে পরামর্শ দিয়েছি। কিন্তু যে স্বাক্ষী এসেছে সেও বলেনি যে আমি কবে কোন আর্মি অফিসারের সাথে কোথায় বসে এই পরামর্শ করলাম?

সাক্ষী বলেছে আমাকে, নিজামী সাহেব ও অধ্যাপক গোলাম আযমকে দেখেছে। সে আমাদের চিনতো না। পরে আমাদের নাম শুনেছে। অথচ এই অভিযোগটি গোলাম আযমের সাহেবের বিরুদ্ধে আনাই হয়নি। নিজামী ভাইকে যাবজ্জীবন দিয়ে শুধু আমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে আমার মৃত্যুদন্ডের রায় কনফার্ম করে তারপর আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন শুরু করা হয়েছে। 

আমাকে আমার পরিবার, সংগঠন ও দেশবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য, কাপুরুষ প্রমান করার জন্য দিনভর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মিথ্যাচারের নাটক করা হয়েছে। এই জালিম সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসেনা। আমি নির্দোষ, নির্দোষ এবং নির্দোষ। আমাদের আজ তারা অন্যায় ভাবে হত্যা করতে যাচ্ছে।

কত বড় স্পর্ধা তাদের যে তারা মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করার দাবী করে। অথচ তাদের নিজেদের ভেতর মানবতা নেই। তারা ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষকে মধ্যরাতে তুলে তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বলে এই তাদের শেষ সাক্ষাত এবং এরপরও তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হবে।

তোমরা শুনে রাখো, আজ যদি আমার ফাঁসি কার্যকর করা হয় তাহলে তা হবে ঠান্ডা মাথায় একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা। তোমরা প্রতিহিংসাপরায়ন হবানা। তোমাদের কিছুই করতে হবেনা। আজ আমার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর এই অন্যায় বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিচার আল্লাহর দরবারে শুরু হয়ে যাবে, বিচার শুরু হয়ে গেছে। তোমাদের কারও কিছু করতে হবেনা। 

আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মত এত বড় নেয়ামত দুনিয়াতে আর একটিও নেই। আমার জানামতে এই সংগঠন দুটি পৃথিবীর মধ্যে সেরা সংগঠন। এই সংগঠনের ব্যপারে আমি সন্তুষ্ট। গত কয়েক বছরে অনেক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে, হাজার হাজার নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, আমার মত জেলখানায় আছে কয়েক হাজার মানুষ। বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির বিগত ৫ বছরে যে ভুমিকা রেখেছে, যে স্যাক্রিফাইস করেছে তা অতুলনীয়। আমার শাহাদাত এই দেশে ইসলামী আন্দোলনকে সহস্রগুন বেগবান করবে এবং এর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে ইনশাল্লাহ।

তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যারা স্বাক্ষী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন ছাড়া বাকি সবাই দরিদ্র। তারা মূলত অভাবের তাড়নায় এবং বিপদে পড়ে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য হয়েছেন। আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম, তোমরাও কোন ক্ষোভ রাখবা না।

পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেনঃ তোমরা নামাজের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস থাকবা। তোমরা সব সময় হালাল রুজির উপর থাকবা। কষ্ট হলেও হালাল রুজির উপর থাকবা। আমি ৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম, ফুল কেবিনেট মন্ত্রী ছিলাম। আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে আমি সেখানে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে, পরিশ্রম করে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। কেউ আমার ব্যপারে বলতে পারবেনা যে আমি অন্যায় করেছি। অনেক দুর্নীতির মধ্যে থেকেও আমার এই পেটে (নিজের শরীরের দিকে ইংগিত করে) এক টাকার হারামও যায়নি। তোমরাও হালাল পথে থাকবা। তাতে একটু কষ্ট হলেও আল্লাহ বরকত দিবেন।

আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক সিলাই রেহীমি। আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে মিলে মিশে চলবে। আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই নামাজ পড়বে, অনেকেই কম। কেউ কেউ হালাল উপার্জনের ব্যপারে অত্যধিক কড়া হবে আবার কেউ কেউ একটু দুর্বল থাকবে। শরীয়তে দুই রকম। আজিমাত এবং রুকসাত। আজিমাত হলো খুবই কড়া, কোন অবস্থাতেই সে হারামের কাছে যাবেনা। আর রুকসাত হলো পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য একটু ঢিল দেবে। তাই আত্মীয়দের মধ্যে কারও আয়ে সমস্যা থাকবে, কারও নামাজে দুবর্লতা থাকবে। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো তাদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য সবার সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে মিলে মিশে চলা। আমি সব সময় এভাবে চলেছি এবং তাতে ভাল ফল পেয়েছি। হাদীসে আছে, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা।

প্রতিবেশীর হক আদায় করবে। আমার ঢাকার বাসা, ফরিদপুরের বাড়ীর প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। আমার উত্তরার বাসার ব্যাপারে তো আমি আগেই লিখে দিয়েছি। মৌলিক কোন চেঞ্জ দরকার নেই। শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী মূল ভিত্তি ঠিক রেখে তোমরা সুবিধা মতো এদিক ওদিক চেঞ্জ করে নিও। ফরিদপুরের বাড়ী নিয়েও যেভাবে বলে দিয়েছি, সেভাবেই তোমরা কাজ করবে। আমরা ভাই ভাইদের মধ্যে কোন সম্পত্তি নিয়ে কখনো ঝামেলা হয়নাই। তোমরাও মিলেমিশে থাকবে। এসব নিয়ে কোন সমস্যা করবানা। শান্তির জন্য কাউকে যদি এক হাত ছাড়তেও হয়, তাও কোন ঝামেলা করবেনা, মেনে নিবে।

বেশী বেশী করে রাসুল (সা) এর জীবনী ও সাহাবীদের জীবনী পড়বে। আমি জানি তোমরা পড়েছো, কিন্তু তাও বার বার পড়বে। বিশেষ করে পয়গম্বর-এ-মোহাম্মাদী, মানবতার বন্ধু হযরত মোহাম্মাদ (সা:), সীরাতে সারওয়ারে আলম, সীরাতুন্নবী, সীরাতে ইবনে হিশাম, রাসুলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন। আর সাহাবীদের জীবনীর উপরও ভাল বই আছে। আগে পড়েছো জানি, তাও তোমরা পড়ে নিও।আমি আমার সন্তানদের উপর সন্তুষ্ট। তোমাদের ভুমিকার ব্যপারে সন্তুষ্ট। 

আইনজীবীদেরকে আমার ধন্যবাদ ও দোয়া দেবে। তারা অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাদের ভুমিকার ব্যপারে আমি সন্তুষ্ট। আইনজীবীরা যেভাবে পরিশ্রম করেছে, অবিশ্বাস্য। ওনারা যদি টাকা নিতো তাহলে ৫-১০ কোটি টাকার কম হতোনা। কিন্তু তারা অলমোস্ট বিনা পয়সায় তারা সাহসিকতার সাথে এই আইনী লড়াই চালিয়ে গেছেন।

আমার জানামতে শহীদের মৃত্যুতে কষ্টের হয়না। তোমরা দোয়া করবে যাতে আমার মৃত্যু আসানের সাথে হয়। আমাকে যেন আল্লাহর ফেরেশতারা পাহারা দিয়ে নিয়ে যান।