১৭ অক্টোবর, ২০১৬

পল্টন ট্রাজেডী, পিলখানা, হলি আর্টিজান, জামায়াত নেতাদের মৃত্যুদন্ড বিচ্ছিন্ন কিছু নয়


পবিত্র মাহে রমজানের পর ঈদ-উল ফিতরের আনন্দ উৎসবের রেশ তখনও বিদ্যমান। দেশে যে গণতান্ত্রিক সুন্দর ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় ঈদের ৩ দিন পরই চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কেয়ারটেকার সরকারের কাছে। শান্তিপ্রিয় মানুষ যখন এ ঐতিহাসিক মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করছে, সে সময়ই এক অজানা আশঙ্কা ভর করেছে সবার মনে। ঢাকা শহরে এক অদ্ভুত থমথমে নীরবতা, গ্রাম-গঞ্জে আটকেপড়া শহরমুখী মানুষ এক অবর্ণনীয় দুশ্চিন্তা নিয়ে অপেক্ষা করছে টিভি এবং রেডিওর সামনে কি অবস্থা দেশের? রেওয়াজ অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী। পরদিন সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে এম হাসানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে চারদলীয় জোট সরকার। কিন্তু সেদিন তা আর সম্ভব হলো না। ২৭ অক্টোবর রাত থেকেই পরিকল্পিতভাবে সারাদেশে সৃষ্টি করা হলো এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। 

সেই পুরনো দৃশ্য ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাট ও সড়ক অবরোধ। পরদিন ২৮ অক্টোবর, সব জায়গায় থমথমে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি, টিভি চ্যানেলে যখনই কোন সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে কী পরিস্থিতি তা জানার জন্য। অবরোধ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের নেতকর্মীরা লগি-বৈঠা-লাঠি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। ফলে হঠাৎ করেই দেশে নেমে আসে চরম নৈরাজ্য। রাজপথ ও সভাস্থল দখলের নামে আওয়ামী লীগ আক্রমণ করে জামায়াত ও জোট নেতাকর্মীদের ওপর, শুরু হয় মুখোমুখি সংঘর্ষ। অত্যন্ত সুকৌশলে দেশকে ঠেলে দেয়া হয় অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে, যার সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ জনগণ। বিকেল এবং সন্ধ্যায় প্রায় সবকটি টিভি চ্যানেলে যখন সচিত্র সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছিল কোটি কোটি মানুষের চোখ তখন স্থির। ঢাকার পল্টন মোড়ে এ কি লোমহর্ষক, হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখছে তারা? লগি, বৈঠা, কিরিচ, লাঠি ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একদল উন্মত্ত মানুষ কিভাবে নির্বিচারে অত্যাচার চালাচ্ছে আরেকদল মানুষের ওপর। কিভাবে পিটিয়ে, খুঁচিয়ে আঘাতের পর আঘাতে জীবন্ত যুবকদের হত্যা করছে, হত্যার পর মৃত লাশের উপর দাঁড়িয়ে উল্লাসনৃত্য করছে। পুলিশের সামনেই মুহুর্মুহু গুলী ও বোমা ফাটিয়ে শত শত বনি আদমকে আহত করছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাজপথ। উহ্! এ দৃশ্য দেখে মূর্ছা গেছেন অনেক মা-বোন, কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মানবিক চেতনাসম্পন্ন প্রতিটি মানুষ। গণতান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এ কেমন ভয়ঙ্কর রূপ! সদ্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া বাংলার কতিপয় মানুষের এ কেমন খোলস?

সেদিন শুধু রাজনৈতিক ভিন্নতার কারণে জামায়াত-শিবির কর্মীরা আওয়ামী লীগের বর্বোরচিত হামলার শিকার হন। অনেকের বাড়িঘর দখল করে নেয়া হয়, কারো বাড়ি আর সহায়-সম্পত্তিতে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়, কারো হাত কেটে নেয়া হয়, আবার কারো চোখ উপড়ে ফেলা হয়। আর এভাবেই জামায়াতে ইসলামীসহ জোটের ৪ সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হন। যার মধ্যে অসংখ্য সাধারণ মানুষও রয়েছে। তৈরি হয় লাশের স্তুপ। জামায়াতে ইসলামীর ১৩ জনসহ মোট ২৬টি লাশ ঝরে পড়ে।

কিন্তু কেন এই ঘটনা? এটা কি শুধুই আওয়ামী সন্ত্রাসীদের কাজ? নাকি আছে সেখানে অন্য কোন বড় পরিকল্পনা? সেটা জানতে হলে দেখতে হবে কেমন ছিল জোট সরকারের আমল। 

জনগণের জান, মাল ও সম্ভ্রম রক্ষা এবং দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে আইন-বিরোধী কার্যক্রম এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করার লক্ষে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) প্রতিষ্ঠা করা হয়। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার জন্য তাদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উন্নত সরঞ্জাম, আধুনিক অস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার উপযোগী বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলা হয়।

সমাজের সকল স্তরের এবং সব শ্রেণীর মধ্যে দুর্নীতির প্রসার ঘটেছে। এ বিষয়ে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক এবং অনেক ক্ষেত্রে অতি প্রচারণা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সৎ ও নৈতিক জীবন-যাপন করলেও বিশেষত বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং সংবিধান ও আইনের অধীনে কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা ও জনমত সৃষ্টির জন্য নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ, মিডিয়া এবং জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা নেয়া হয়

জোট সরকার অর্থনেতিক উন্নয়নের এই ধারাকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনীতি এবং শিল্প ও বাণিজ্যের অব্যাহত উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য বেসরকারি খাত ও সমবায়কে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। দেশী, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা, বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশীদেরকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। দেশের সবচেয়ে বেশী শ্রমিক বিশেষ করে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক নিয়োগকারী এবং সবচেয়ে বেশী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্টস শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ও আরও সম্প্রসারিত হতে সব ধরনের সহায়তা দেয়া হয়। দেশীয় শিল্প, বিশেষ করে পাট, চা, বস্ত্র, চিনি, ঔষধ, সিরামিক ও চামড়া শিল্পের সুরক্ষা ও অব্যাহত উন্নয়নের লক্ষ্যে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উ ন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের শিক্ষিত যুবশক্তি, নারী উদ্যোক্তা এবং সমবায়ীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণ-সহায়তা দেয়া হয়। রপ্তানি বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা এবং অধিকতর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কৃষিভিত্তিক ও রপ্তানিমুখী শিল্পস্থাপন ও প্রসারে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়া হয়

কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় যথাসম্ভব হ্রাস করে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ও দ্রুত কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন নতুন প্রযুক্তি, গবেষণা ও গবেষণালব্ধ ফলাফলকে মাঠে প্রয়োগের ব্যবস্থা নেয়া হয়। কৃষক যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় এবং ভোক্তাগণকে যাতে অতিরিক্ত মূল্যে দ্রব্যাদি কিনতে বাধ্য হতে না হয় সেই লক্ষ্যে কৃষি পণ্যের যথাযথ সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।

নানা প্রতিবন্ধকতার ভেতরেও চারদলীয় জোট সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে নকলমুক্ত পরীক্ষা, মেয়েদের বিনামূল্য পড়ালেখাসহ শতাধিক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি ও উন্নীত করে। দারিদ্র অথচ মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বৃত্ত্বির ব্যবস্থা করা হয়।

সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থানের দিকে অধিক জোর দেয়া হয়। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে উৎসাহ দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদার, সমবায় আন্দোলনকে সহায়তা প্রদান করা হয়। দেশে অধিকহারে শ্রমঘন শিল্প স্থাপন ও বন্ধ শিল্পে পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করার জন্য উৎসাহ দান করা হয়। বিদেশে দক্ষ শ্রমিকদের অধিকহারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। আত্মকর্মসংস্থানের উদ্যোগে সহয়তা দান করার মত বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী উন্নয়ন হয়। দেশের সবকটি প্রধান হাইওয়ের উন্নয়ন, বড় বড় নদীর ওপর ব্রীজ নির্মাণ, চট্টগ্রামে নিউমুরিং টার্মিনাল নির্মাণ, বাংলাদেশ রেলওয়ের আধুনিকায়ন, ভৈরবের কাছে মেঘনা সেতু নির্মাণ ও মুন্সীগঞ্জে ধলেশ্বরী সেতু নির্মাণ, কর্নফুলী নদীর ওপর তৃতীয় সেতু নির্মাণ কাজে অগ্রগতি, পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও জাপানের অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তি ও সম্ভাব্যতা যাচাই কাজের সমাপ্তি, চট্টগ্রাম ও সিলেট এয়ারপোর্টে নতুন দুটি টার্মিনাল বিল্ডিং নির্মাণ, এসবই হচ্ছে বিগত বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরে যোগাযোগ খাতে উন্নয়নের রেকর্ড।

দেশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশাসনকে জনগণের হাতের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ও গ্রাম পর্যায়ে যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে জোট সরকার কাজ করেছে। এ লক্ষ্যে নির্বাচিত সরকার প্রচলিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব বহাল রেখেই স্থানীয় উন্নয়ন ও জনকল্যাণে প্রান্তিক জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারিত করে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে প্রতিরক্ষা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পাঠানের নীতি অব্যহত রাখা হয় এবং এর ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়।

সহজে ও কম খরচে, দ্রুত বিচার পাওয়ার জন্য এবং দেশের ঘুণে ধরা বিচার ব্যবস্থাকে গতিময় এবং জনগণের আস্থাশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যে বিগত বিএনপি জোট সরকার বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক সংস্কার কার্যক্রমের সূচনা করে।

নারীদের ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসায়ে আগ্রহী ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক কর্মে নিয়োজিত নারীদের জন্য সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ প্রদান করা হয় এবং চাকরিতে নারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। যৌতুক প্রথা, এসিড নিক্ষেপ এবং নারী ও শিশু-পাচার রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার ন্যূনতম পর্যায় নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।

২০০১ সালে জোট সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ফাইবার অপটিক সাবমেরিন কেবল সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন ইনফর্মেশন হাইওয়েতে পৌঁছে গেছে। চারদলীয় জোট সরকারের ২০০১ সালে দায়িত্ব গ্রহণের সময়ে মোবাইল ফোনের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ লাখ। ২০০৬ সালের শেষে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় তিন কোটি।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে গ্রামীণ এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃব্যবস্থা প্রবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। ফলে এখন শতকরা নব্বই ভাগ গ্রামবাসী বিশুদ্ধ পানি খেতে পারছেন এবং প্রায় সকলেই অল্প খরচে তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ যথাসময়ের আগেই সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে।

পরিবেশ রক্ষায় বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকার তাদের শাসন আমলে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার এবং দুই স্ট্রোক বেবিটেক্সি নিষিদ্ধকরণ, সারা দেশে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সফল হয়েছিল।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গভীরতর করা এবং সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের সমান অধিকার নিষ্ঠার সাথে রক্ষার নীতিতে অবিচল থেকে সাম্প্রদায়ক সম্প্রীতি বিনষ্টের সকল অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমনের চেষ্টা করা হয়। অনগ্রসর পাহাড়ী ও উপজাতীয় জনগণের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা, চাকুরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সকল সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হয়।

এতসব অগ্রগতিতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিণত হচ্ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সার্ককে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে মূলত ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছিল। এটা ছাড়াও জেএমবি নামক দেশদ্রোহী বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী সন্ত্রাসীদের টোটাল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসা। জেএমবি সন্ত্রাসীদের বিচারের মুখোমুখী করা। এতেও ক্ষিপ্ত হয় প্রতিবেশী ভারত। ভারত তাদের একতরফা নীতি বাস্তবায়ন করতে অসুবিধা বোধ করছিল। বাংলাদেশ তাদের বিরুদ্ধে চালানো নির্যাতন ও শোষনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এতসব কারণে ভারতের প্রয়োজন ছিল তৎকালীন জনপ্রিয় জোট সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া। সেখানে বসানো পুতুল সরকার। আর এজন্যই শান্ত বাংলাদেশকে অশান্ত করে ফেলা ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল। আর এজন্যই পল্টন হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। তার মাধ্যমে বাংলাদেশে গনতন্ত্রকে হত্যা করা হয়, টোটাল রাজনীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। রাজনীতি সম্পর্কে ঘৃণা ছড়ানো হয়। সেই ব্যাপারটা থেকে আজ পর্যন্ত চলমান সব কিছুই প্রতিবেশী ছকের অংশ। 

ভারত তার আধিপত্য বজায় রাখার জন্য পিলখানা হত্যাকান্ডে জড়িত এই বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এটা সবাই জানেন। দেশপ্রেমিক সেনা অফিসার হত্যা মূলত আমাদের সেনাবাহিনীর মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এটি ছিল একটি বিরল ঘটনা। কোন প্রকার যুদ্ধ ছাড়াই দেশের সবচেয়ে দেশপ্রেমিক ও চৌকস ৫৭ জন সেনা অফিসারসহ ৬৪ জনকে হত্যা করা হয়। 

এরপর শুরু হয় একের পর এক জামায়াত নেতার বিচার ও হত্যা করার উতসব। চলেছে বিচারের নামে এক নজিরবিহীন অবিচার। ডিফেন্স পক্ষের সাক্ষীদের ধরে নিয়ে গুম করা হচ্ছে, রাখা হচ্ছে ভারতের কারাগারে। আজও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, অধ্যাপক গোলাম আযম, মীর কাসেম আলীর ছেলেদের গুম করে রাখা হয়েছে। ধারণা করা হয় এর পেছনে হাত রয়েছে র’ এর। 

আজকাল আবার নতুন নামে জঙ্গীদের আমদানি করা হচ্ছে। জঙ্গী নাম দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে অজ্ঞাত মানুষদের। মানুষের লাশ আজ বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজলভ্য। গুলশানের হলি আর্টিজানে বিশজন বিদেশী নাগরিককে জঙ্গী দ্বারা হত্যা করা হয়েছে। এর আগেও কয়েকজন বিদেশী নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় উল্লেখ করার মত বিষয় হলো হত্যার শিকার বিদেশী নাগরিকরা প্রায় সবাই বাংলাদেশের কোন না কোন উন্নয়ন প্রজেক্টের সাথে জড়িত। বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহায়তাকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে নিজেদের কর্মকান্ড কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছে। এগুলো যে অন্যান্য বন্ধুদেশকে বাংলাদেশ বিমুখ করে বাংলাদেশকে একক করদ রাজ্য বানানোর ষড়যন্ত্র তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

বাংলাদেশে ভারতের আগ্রাসন বিরোধী কাউকে বেঁচে থাকতে দেয়া হবে না। এটাই মূলত ভারতের বাংলাদেশ নীতি। আর অপদার্থ আওয়ামী সরকার সেই নীতি বাস্তবায়ন করেই সরকারে টিকে আছে। কিন্তু এটাই শেষ নয়। বাংলাদেশকে জাগতে হবে। জাগতে হবে এদেশের ইসলামপ্রিয় মানবতাবাদী মানুষদের। যতদিন না এদেশের মানুষ সক্রিয়ভাবে ভারতের আধিপত্যের মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হবে ততদিন এদেশের ভাগ্যাকাশে সোনালী সূর্যের উদয় বিলম্বিত হবে।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন