২৯ আগস্ট, ২০১৭

জামায়াত কি একটি ব্যর্থ সংগঠন?


গত ২৬ আগস্ট জামায়াতের ৭৬ বছর পূর্ণ হয়। অনেকেই দাবী করছেন এই বিশাল সময়ে জামায়াতের অর্জন সামান্য। আবার অনেকেই বলছেন জামায়াত ব্যর্থ। সাধারণত তারা নিন্মোক্ত কারণগুলো দেখিয়ে ব্যর্থ বলতে চান। 

১. বাংলাদেশের ফ্রন্টলাইনের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো দল হওয়া সত্ত্বেও তারা এখনো গণমানুষের দলে পরিণত হতে পারেনি।

২. জামায়াত তার ৭৬ বছরের রাজনীতিতে এককভাবে কখনোই ক্ষমতার স্বাদ পায় নি।

৩. ৭৬ বছরে জামায়াত তিনবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। এতে জামায়াতের অপরিপক্কতা প্রকাশিত হয়।

৪. ৭১ সালে জামায়াত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

৫. এত বছর রাজনীতি করার পর তারা এখন তাদের সব মূল নেতাদের হারিয়েছে জঘন্য সব অপরাধের দায়ে।

এরকম আরো কারণ দেখিয়ে আপনি বলতেই পারেন জামায়াত ব্যর্থ।
কিন্তু আসলে কি তাই?

বস্তুত সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ভর করে উদ্দেশ্য-লক্ষ্যের উপর। একটি দল হিসেবে জামায়াতের চূড়ান্ত লক্ষ্য কি? সেটাই বলে দিবে জামায়াত কতটুকু ব্যর্থ।

জামায়াতের মূল ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জন। আর সেই সন্তুষ্টি অর্জন হবে কুরআন হাদীস অনুসারে মানুষের সার্বিক জীবনের পূনর্বিন্যাস সাধনের মাধ্যমে।

জামায়াত যুগে যুগে উপমহাদেশে এমন সব জানবাজ মানুষ তৈরী করে যাচ্ছে যারা ইকামাতে দ্বীনের কাজে নিজের জীবন উৎসর্গকে সাফল্যের সিংহদ্বার মনে করে। জামায়াতের আছে অনন্য সাতটি বৈশিষ্ট্য যা জামায়াত কে তার লক্ষ্য অর্জনকে সহজ করে দিচ্ছে।

১. জামায়াতের বিপ্লবী দাওয়াত। জামায়াত দুনিয়াবী কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মানুষকে আহ্বান করে না। দুনিয়ার কোন সফলতার লোভ দেখায় না। একান্ত পরকালীন সাফল্যের কথা সামনে নিয়ে আসে, যেভাবে আল্লাহর রাসূল দাওয়াত দিয়েছেন।

২. ইসলামী সমাজ গঠনের উপযোগী ব্যক্তিগঠন পদ্ধতি। জামায়াত মনে করে ব্যক্তিগঠনের জন্য তিন ধরণের যোগ্যতা লাগবে।
এক, ঈমানী যোগ্যতা। 
দুই, ইলমী যোগ্যতা।
তিন, আমলী যোগ্যতা। 
যোগ্যতা হাসিলে কঠোর প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেছে সংগঠনটি।

৩. জামায়াত ইসলামীর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি একটি তাকওয়া ভিত্তিক সংগঠন। জামায়াত কোন লোককে দায়িত্ব প্রদানকালে তাকওয়ার বিষয়টি সামনে রাখে।

৪. জামায়াতের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে “নেতৃত্ব সৃষ্টির পদ্ধতি”। অসাধারণ এই পদ্ধতিতে নেতৃত্ব বা পদলোভীদের কোন স্থান নেই।

৫. ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করে না জামায়াত। জামায়াত ইসলামী সূরা নূরের ৫৫ নং আয়াতকে সামনে রেখে বিশ্বাস করে, ইসলামী সরকার চালানোর যোগ্য কর্মীবাহিনী তৈরী হলে আল্লাহ পাক সরকারী দায়িত্ব দেয়ার পথ করে দিবেন।

৬. জামায়াতের অর্থের উৎস জামায়াতের দায়িত্বশীল, কর্মী এবং শুভাকাংখীরা। জামায়াত বাইরের অন্য কারো অর্থে চলে না। কারো ক্রীয়ানক হিসেবে কাজ করে না।

৭. বিরোধীদের প্রতি জামায়াতের আচরণ। জামায়াত তার বিরোধীদের মধ্যে যারা অশালীন ও অভদ্র ভাষা প্রয়োগ করে তাদের করুণার পাত্র মনে করে। জামায়াতের দাওয়াত আদর্শ ও কর্মসুচীর বিরুদ্ধে বেচারাদের কিছু বলার সাধ্য নেই বলে বেসামাল হয়ে গালাগালি করে মনের ঝাল মেটানোর চেষ্টা করে। জামায়াত তাদের হিদায়াতের জন্য দোয়া করে।

আর যারা মিথ্যা সমালোচনা করে অপবাদ দেয়, জামায়াত প্রয়োজন মনে করলে সেই সমালোচনা যুক্তি দিয়ে খন্ডন করে।

সুতরাং যারা শুরুর কয়েকটি পয়েন্ট দেখিয়ে জামায়াতকে ব্যর্থ বলতে চাইবেন তাদের প্রতি আমাদের বিনীত বার্তা, আপনারা যেগুলোকে সফলতা মনে করেন আমরা সেগুলোকে চূড়ান্ত সফলতা মনে করি না।সেগুলো আমাদের মূল লক্ষ্যও নয়।

আর তাছাড়া আমরা এও বিশ্বাস করি, মুমিনের দুনিয়ার জীবনে ব্যর্থতা হল আল্লাহর আনুগত্য করতে না পারা। আর কোন কিছুকেই ব্যর্থতা মনে করি না। দুনিয়ার জীবনের কষ্ট, ক্ষমতা পাওয়া বা না পাওয়া সবগুলোকেই আমরা পরিক্ষা বলেই গন্য করি। পৃথিবীর অধিকাংশ নবী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পাননি। নূহ আঃ ৯৫০ বছরের দাওয়াতে মাত্র একশত ষাট জনকে ইসলামের পথে আনতে পেরেছেন। তাই বলে কি নূহ আঃ ব্যর্থ? 

হিদায়াত আল্লাহর কাছে। আমাদের কাজ হল চেষ্টা করে যাওয়া। জামায়াতের অন্যতম সফলতা হল, জামায়াত শয়তানের প্রোপাগান্ডাকে চ্যালেঞ্জ করে বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামের আবশ্যকতা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। 

বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামবিরোধীদের একটা বড় প্রোপাগান্ডা হল চৌদ্দশত বছর আগের ইসলামের বিধানগুলো এখন নাকি কার্যকর না। জামায়াতে ইসলামী এটা ইতিমধ্যে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থাসহ সকল সেক্টরে ইসলামী বিধান শুধু কার্যকর নয় বরং অত্যাবশ্যকীয়। 

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন। সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে রাখুন। আমিন।

২৬ আগস্ট, ২০১৭

একনজরে জামায়াতে ইসলামী


এই উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামী একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। এটি অনেকের কাছে যেমন ভালবাসার আবার অনেকের কাছে সমালোচনারও। জামায়াতে ইসলামী শুধুই একটি রাজনৈতিক দল নয়। এটি কেবল সামাজিক প্রতিষ্ঠানও নয়। এটি একটি পূর্ণাংগ ইসলামী আন্দোলন। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আল্লাহর বিধানের আলোকে গড়ে তোলার জন্য চার দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে কাজ করছে জামায়াতে ইসলামী।

জামায়াতে ইসলামী গঠন

১৯৪১ সনের ২৬ আগস্ট বৃটিশ শাসিত দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের লাহোর সিটিতে গঠিত হয় জামায়াতে ইসলামী। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ৭৫ জন। সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী আমীরে জামায়াত নির্বাচিত হন।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণের একাংশে সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীতে যাঁরা যোগদান করবেন তাঁদেরকে এই কথা ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে যে, জামায়াতে ইসলামীর সামনে যেই কাজ রয়েছে তা কোন সাধারণ কাজ নয়। দুনিয়ার গোটা ব্যবস্থা তাঁদেরকে পাল্টে দিতে হবে। দুনিয়ার নীতিনৈতিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি সবকিছু পরিবর্তন করে দিতে হবে। দুনিয়ায় আল্লাহদ্রোহিতার ওপর যেই ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে তা পরিবর্তন করে আল্লাহর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’

জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ও জামায়াতে ইসলামী হিন্দ

১৯৪৭ সনের ১৪ ও ১৫ই আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে দিল্লীতে বসে উপমহাদেশের সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তখন গোটা উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সংখ্যা ছিলো ৬২৫ জন। দেশ ভাগ হলে জামায়াতে ইসলামীও ভাগ হয়। মোট ২৪০ জন সদস্য নিয়ে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ এবং ৩৮৫ জন সদস্য নিয়ে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান কাজ শুরু করে।

ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সূচনা

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময় মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ এই কথা বলে প্রচার চালিয়েছেন একটি স্বাধীন দেশ হাতে পেলে তাঁরা দেশটিকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করবেন। এতে সাধারণ মুসলিম তাদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাবার পর তারা সেইসব কথা ভুলে যেতে থাকেন। শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে গিয়ে তারা আলোচনা শুরু করেন পাকিস্তানের জন্য বৃটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেম উপযোগী, না আমেরিকান প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম, তা নিয়ে। এতে ক্ষিপ্ত হয় ইসলামপন্থী মানুষরা। 

১৯৪৮ সনের এপ্রিল মাসে করাচির জাহাংগীর পার্কে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম রাজনৈতিক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান বক্তা ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপরিষদের প্রতি চারটি দফার ভিত্তিতে ‘আদর্শ প্রস্তাব’ গ্রহণ করার উদাত্ত আহ্বান জানান।
দফাগুলো হচ্ছে
১। সার্বভৌমত্ব আল্লাহর। সরকার আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দেশ শাসন করবে।
২। ইসলামী শরীয়াহ হবে দেশের মৌলিক আইন।
৩। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক আইনগুলো ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত করে ইসলামের সাথে সংগতিশীল করা হবে।
৪। ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে রাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই শরীয়াহর সীমা লংঘন করবে না।
এইভাবে জামায়াতে ইসলামী ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন শুরু করে। আরো জানতে ক্লিক করুন

কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ঘোষণার আন্দোলন

১৯৫৩ সনের জানুয়ারি মাসে জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, মাজলিসে আহরার, জমিয়তে আহলে হাদীস, মুসলিম লীগ, আনজুমানে তাহাফ্ফুযে হুকুকে শিয়া প্রভৃতি দল করাচিতে একটি সম্মেলনে মিলিত হয়। জামায়াতে ইসলামী প্রস্তাব করে যে কাদিয়ানী ইস্যুটিকে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করে নেওয়া হোক। সেই সম্মেলনে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলো না।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ফেব্রুয়ারি মাসে করাচিতে সর্বদলীয় নির্বাহী পরিষদের মিটিং ডাকা হয়। এই মিটিংয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনের’ পক্ষে প্রবল মত প্রকাশ পায়। জামায়াতে ইসলামী গোড়া থেকেই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলো বিধায় ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশনের’ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সর্বদলীয় নির্বাহী পরিষদ থেকে বেরিয়ে আসে।

১৯৫৩ সনের মার্চ মাসে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে কতিপয় দলের ডাইরেক্ট এ্যাকশনের ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এই অবনতি পাঞ্জাবেই ঘটেছিলো বেশি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মার্শাল ল’ ঘোষণা করা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসে যায়।

মাওলানা মওদুদীর গ্রেফতার ও ফাঁসির আদেশ

যদিও ডাইরেক্ট এ্যাকশনের বিপক্ষে ছিল জামায়াত তারপরও ১৯৫৩ সনের ২৮শে মার্চ মার্শাল ল’ কর্তৃপক্ষ সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী ও আরো কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করে। আরো বিস্ময়ের ব্যাপার, সামরিক ট্রাইব্যুনাল ১৯৫৩ সনের ৮ই মে সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদুদীকে ফাঁসির হুকুম দেয়। জামায়াতে ইসলামীর জনশক্তি এবং সকল শ্রেণীর ইসলামী ব্যক্তিত্ব এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক ও বলিষ্ঠ আন্দোলনে নেমে পড়ে। ফলে সরকার মৃত্যুদণ্ড রহিত করে সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদীর চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের কথা ঘোষণা করে।

তবে দুই বছর একমাস জেলে থাকার পর ১৯৫৫ সনের ২৯শে এপ্রিল সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদুদী মুক্তি লাভ করেন। তাঁকে মেরে ফেলার চক্রান্তের আসল লক্ষ্য ছিলো ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের বলিষ্ঠতম কণ্ঠটিকে স্তব্ধ করে দেওয়া। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছা ছিলো ভিন্ন। তিনি মুক্তি পান। আর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বহুগুণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। গণদাবির মুখে গণপরিষদ ১৯৫৬ সনের ২৯শে ফেব্রুয়ারি একটি শাসনতন্ত্র পাস করে।


শাসনতন্ত্র বাতিল ও পুনরায় আন্দোলন

১৯৫৮ সনের ২০শে সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খান সরকারের প্রতি আস্থা ভোটের জন্য পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসে। অধিবেশনে স্পিকার আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়। স্পিকারের দায়িত্ব লাভ করেন ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পাটোয়ারী। পরিষদে হট্টগোল চলতে থাকে। উত্তেজিত সদস্যদের আঘাতে শাহেদ আলী পাটোয়ারী মারাত্মক আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তিনি হাসপাতালে মারা যান।

১৯৫৮ সনের ৭ই অকটোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কানদার আলী মির্যা দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। জাতীয় পরিষদ, প্রাদেশিক পরিষদসমূহ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা ও প্রাদেশিক মন্ত্রীসভাগুলো ভেঙ্গে দেন। নয় বছরের চেষ্টাসাধনার ফসল শাসনতন্ত্রটি বাতিল করে দেন।

প্রধান সামরিক প্রশাসক নিযুক্ত হন সেনাপ্রধান জেনারেল মুহাম্মাদ আইউব খান। ২৭ অক্টোবর আইউব খান প্রেসিডেন্ট পদটিও দখল করেন। চলতে থাকে এক ব্যক্তির স্বৈরশাসন। ১৯৬২ সনের ১লা মার্চ প্রেসিডেন্ট আইউব খান দেশের জন্য একটি নতুন শাসনতন্ত্র জারি করেন। এটি না ছিলো ইসলামিক, না ছিলো গণতান্ত্রিক। এতে বিধান রাখা হয়, দেশের প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পরিষদের সদস্যগণ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’দের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। আর ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ হবেন পূর্ব পাকিস্তানের ইউনিয়ন পরিষদসমূহের চেয়ারম্যান ও মেম্বার মিলে ৪০ হাজার জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ইউনিয়ন পরিষদসমূহের চেয়ারম্যান ও মেম্বার মিলে ৪০ হাজার জন। অর্থাৎ ৮০ হাজার ব্যক্তি ছাড়া দেশের কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।এই আজগুবী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আওয়াজ তোলে জামায়াতে ইসলামী।

১৯৬২ সনে রাওয়ালপিন্ডির লিয়াকতবাগ ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী এই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এতে প্রেসিডেন্ট আইউব খান ক্ষেপে যান। তাঁরই নির্দেশে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ১৯৬৪ সনের ৬ই জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনী ঘোষণা করে। আমীরে জামায়াত সহ মোট ৬০ জন শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

বন্দিদের মধ্যে ছিলেন- আমীরে জামায়াত সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী, মিয়া তুফাইল মুহাম্মাদ, নাঈম সিদ্দিকী, নাসরুল্লাহ খান আযিয, চৌধুরী গোলাম মুহাম্মাদ, মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ, মাওলানা আবদূর রহীম, অধ্যাপক গোলাম আযম, জনাব আবদুল খালেক, ইঞ্জিনিয়ার খুররম জাহ মুরাদ, অধ্যাপক হেলালুদ্দীন, মাস্টার শফিকুল্লাহ, মাওলানা এ.কিউ.এম. ছিফাতুল্লাহ, অধ্যাপক ওসমান রময্, মাস্টার আবদুল ওয়াহিদ (যশোর), আবদুর রহমান ফকির, জনাব শামসুল হক, মাওলানা মীম ফজলুর রহমান প্রমুখ।

জনাব আব্বাস আলী খান, জনাব শামসুর রহমান ও মাওলানা এ.কে.এম. ইউসুফ জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন বিধায় গ্রেফতার হননি। এবারও জামায়াতে ইসলামীর জনশক্তি উচ্চমানের ধৈর্যের উদাহরণ পেশ করেন।

জামায়াতে ইসলামী সরকারের অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। স্বনামধন্য আইনজীবী মি. এ.কে. ব্রোহীর নেতৃত্বে একটি টিম মামলা পরিচালনা করে। পশ্চিম পাকিস্তান হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে এবং পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে রায় দেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে যায়। সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে রায় দেয়। ১৯৬৪ সনের ৯ই অকটোবর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।

‘কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টিজ’

১৯৬৪ সনের ২০শে জুলাই ঢাকায় খাজা নাজিমুদ্দীনের বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইউব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। এই জোটের নাম দেওয়া হয় ‘কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টিজ’। এতে শরীক ছিল কাউন্সিল মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও নেযামে ইসলাম পার্টি।

১৯৬৪ সনের সেপ্টেম্বর মাসে ‘কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টিজ’ ১৯৬৫ সনের ২রা জানুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইউব খানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মি. মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর বোন মিস ফাতিমা জিন্নাহকে নমিনেশন দেয়।

এই সময় জামায়াতে ইসলামী ছিলো বেআইনী ঘোষিত। নেতৃবৃন্দ ছিলেন জেলখানায়। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মাজলিসে শূরার যেইসব সদস্য জেলের বাইরে ছিলেন, তাঁরা ১৯৬৪ সনের ২ অক্টোবর একটি মিটিংয়ে একত্রিত হন। তার আগে পাকিস্তানের মুফতি শফি (মা'রেফুল কুরআনের লেখক) থেকে ফতোয়া নেয় জামায়াত। 

‘আলোচনা শেষে মাজলিসে শূরা অভিমত ব্যক্ত করে যে স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মহিলাকে রাষ্ট্রপ্রধান করা সমীচীন নয়। কিন্তু এখন দেশে চলছে এক অস্বাভাবিক অবস্থা। স্বৈরশাসক আইউব খানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে মিস ফাতিমা জিন্নাহর কোন বিকল্প নেই। এমতাবস্থায় সার্বিক অবস্থার নিরিখে জামায়াতে ইসলামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিস ফাতিমা জিন্নাহকেই সমর্থন করবে।’


স্বৈরাচারী আইয়ুবের কবলে জামায়াতে ইসলামী

আইয়ুবের শাসনামলে জামায়াতের আমীর মাওলানা মওদুদীকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়। ১৯৬৪ সালে জাময়াতে ইসলামীকে হঠাৎ বেআইনী ঘোষণা করা হলো। জামায়াতে ইসলামী ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রে মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের দাবিতে সমগ্র দেশব্যাপী স্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা করে। এ অভিযানের ফলে মৌলিক অধিকারের দাবি তারা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু আইনের খসড়া বিল পরিষদে গৃহীত হওয়া সত্ত্বে ও প্রেসিডেন্ট ইচ্ছাপূর্বক তাতে স্বাক্ষর দিতে বিলম্ব করেন। 

১৯৬৪সালের ৬ই জানুয়ারী জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং নেতাদের গ্রেফতার করে তারপর ১০ই জানুয়ারী প্রেসিডেন্ট উক্ত বিলে স্বাক্ষর করে। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে তার এ পদক্ষেপও জামায়াতকে খতম করতে সক্ষম হয়নি। হাইকোর্ট জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারী এবং সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের নিষিদ্ধকরণের নিদের্শকে বাতিল ঘোষণা করে। এর আগে ১৯৫৮ সালেও সামরিক আইনে জামায়াত ৪৫ মাস নিষিদ্ধ ছিলো। 

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ 

১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ভারত পাকিস্তানের উপর স্থল ও আকাশ পথে হামলা চালায়। দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়। এমন সময় মাওলানার প্রতি চিরদিন বিরূপ-মনোভাবাপন্ন আইয়ুব খান তার কাছে যুদ্ধে সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন। মাওলানা জিহাদের উপর ক্রমাগত ছ'দিন রেডিও পাকিস্তান থেকে উদ্দীপনাময় ভাষণ দান করেন-জামায়াত কমীগণকে দেশ রক্ষার খেদমতে মাঠে নামিয়ে দেন। জামায়াতে ইসলামীর এ সময়ের নিঃস্বার্থ জাতীয় খেদমত সেনাবাহিনী ও জনগণের মন জয় করে। 

সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫১ আসনে প্রার্থী দেয় জামায়াত। এর মধ্যে ৪ টি আসন জিতে নেয়। সবচেয়ে বেশি আসনে প্রার্থী দেয় আওয়ামীলীগ এবং তারা সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভও করে । তৃতীয় সর্বোচ্চ আসনে (১২০) প্রার্থী দেয় ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আওয়ামীলীগের সবগুলো আসনই ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। 

১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা 

১৯৭১ সালে পূর্ব-পাকিস্তানে যা হয়েছে তা মূলত সমাজতন্ত্রী ও ভারতীয় ষড়যন্ত্রের মিলিত ফসল। তারা পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ গ্রহণ করেছিল। জামায়াত সেসময় একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে অবস্থান নিয়েছে, কোন সশস্ত্র গ্রুপ হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেনি। জামায়াত যুদ্ধ বন্ধে কয়েকবার চেষ্টা করেছিল, শান্তি আনার চেষ্টা করেছিল, সরকার এবং স্বাধীনতাকামীদের মধ্যে সমজোতার চেষ্টা করেছিল কিন্তু দু-পক্ষের বাড়াবাড়িতে সেটা সম্ভব হয়নি। হত্যা খুন, অনাচার উভয়পক্ষ করেছে। জামায়াত উভয়পক্ষের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করেছে আর বিচ্ছন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে যারা ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ

একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য হয়েছিল, তার শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি মেনে না নিতে পারলেও দেশের স্বাধীন সত্তাকে জামায়াত কর্মীগণ তখনই মেনে নিয়েছে। শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি ও শাসন পদ্ধতি সদা পরিবর্তনশীল। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এদেশে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার সংগ্রাম করছে এবং করতে থাকবে। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের জন্যেও জামায়াত দৃঢ়সংকল্প।

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয় তার অধীনে মুসলমানী জীবন-যাপন সম্ভব ছিল না। এ সম্পর্কে বিভিন্ন বিদেশী সংবাদ সংস্থাও মন্তব্য করে। ইসলামের নামে দল গঠন ও ইসলামী আন্দােলন ও তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। গণতন্ত্রকে হত্যা করে এক দলীয় শাসন কায়েম হয়। ইসলামের জাতীয় শ্লোগান “আল্লাহু আকবর’ এর স্থানে ‘জয়বাংলা”। জাতীয় শ্লোগান হয়ে পড়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াত তার কার্যক্রম গোপনে পরিচালনা শুরু করে। ভারপ্রাপ্ত আমির ছিলেন আব্বাস আলী খান। 


আবারো প্রকাশ্যে রাজনীতি 

৭৫ এর পটপরিবর্তনের পর জামায়াত আবারো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকা অধ্যাপক গোলাম আযম দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৯ সালে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নামে এ দলটি পুনরায় রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় হয় এবং মওলানা আব্বাস আলী খানকে দলের ভারপ্রাপ্ত আমীর নির্বাচন করা হয়। ১৯৭৯ সালে এক সাধারণ সভায় জামায়াত পুনরায় প্রকাশ্যে কাজ করার ঘোষণা দেয়। ১৯৮০ সালে প্রথমবারের মত বায়তুল মোকাররমের সামনে জামায়াতের সভা হয়। প্রকাশ্যে এটাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সম্মেলন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। স্বৈরাচারী এরশাদের অধীনে কোন বিরোধীদল নির্বাচনে যেতে আস্থাবান না হওয়ায় জামায়াত ১৯৮৪ সালে এক অসাধারণ নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রস্তাব দেয়। কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা। ১৯৮৪ সাল থেকেই কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে আন্দোলন করে আসছে জামায়াত। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ১০টি আসনে জয়লাভ করে। জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কৌশল হিসেবে জামায়াতের ১০ জন সংসদ সদস্য ১৯৮৭ সালের ৩ ডিসেম্বর সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।  ১৯৮৯ সালে সকল বিরোধীদল কেয়ারটেকার পদ্ধতিকে স্বাগত জানিয়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। 

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। জামায়াত রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে আসীন হয়। ১৯৯১ সালে নির্বাচনে ১৮টি আসনে জিতে নেয় জামায়াত। জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। অধ্যাপক গোলাম আজম আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের আমির ঘোষিত হন।

১৯৯২ সালে জামায়াতের বিরুদ্ধে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। তারা জামায়াতকে অবৈধ ঘোষণার জন্য এবং গোলাম আযমকে অবৈধ নাগরিক হিসেবে শাস্তি দাবী করে সারাদেশে প্রচারণা চালায়। কয়েক স্থানে জামায়াতের সাথে ঘাদানিকের সংঘর্ষ হয়। ঘাদানিকের চাপে গোলাম আযম গ্রেফতার হন। ১৯৯৪ সালে উচ্চ আদালতের রায়ে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব পুনঃস্থাপিত হয়। সে বছরই কার্যত ঘাদানিকের পতন হয়। 

১৯৯৬ সালে জামায়াত পুনরায় কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে আন্দোলন করে বিএনপির বিরুদ্ধে। বিএনপি একদলীয় নির্বাচন করে। তীব্র প্রতিবাদের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। বিএনপির হটকারিতায় ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। 

ক্ষমতার অংশীদার 

১৯৯৯ সালে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। ২০০১ সালে নির্বাচনে চারদলীয় জোট বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। স্বাধীন বাংলাদেশে এই বছরই প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পায় জামায়াত। তিনটি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পায় জামায়াত। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের কথিত সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে যোগ দেয় নি জোট সরকার। তাই বাংলাদেশেও জঙ্গী লেলিয়ে দেয় সাম্রাজ্যবাদীরা। ২০০৫ সালে জঙ্গী বিরোধী ভূমিকায় জামায়াত ব্যাপক সফলতা পায়।    

পুনরায় ক্ষমতাছাড়া এবং নির্যাতন শুরু 

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ক্ষমতা ছাড়ার দিন আওয়ামীলীগ ব্যাপক আক্রমণ করে জামায়াতের উপর। এতে প্রায় ১০ জনের মত জামায়াত কর্মী নিহত হয়।  ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি সেনাবাহিনী অবৈধভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করে কেয়ারটেকার সরকারকে পুতুল বানিয়ে রাখে। দুই বছর সেনাশাসনে রাজনীতিবিদরা চরম অপদস্থ হয় দূর্নীতির দায়ে। জামায়াত এসময় সারাদেশে একটি নির্লোভ ও সৎ দল হিসেবে স্বীকৃত হয়। 

২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সেনা কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির অঙ্গিকার করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ২০১০ সালে জামায়াতের সকল শীর্ষনেতা গ্রেফতার হন। শুরু হয় তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচার। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে থাকে জামায়াত। ২০১৩ সালে রায় আসতে শুরু হয়। অবৈধ রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জামায়াত কর্মীরা। সারাদেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। নিহত হন শতাধিক কর্মী।

২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের বিরুদ্ধে গণজাগরণ মঞ্চ গঠিত হয়। এর বিরুদ্ধে হেফাযতে ইসলাম তৈরী হয়। হেফাযতের গনজোয়ারে অল্প কয়েকমাসের মধ্যেই গণজাগরণ মঞ্চ ভেসে যায়।

১২ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা শাহদাতবরণ করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একদলীয় নির্বাচন করে আওয়ামীলীগ। নজিরবিহীনভাবে ১৫৪ জন বিনা ভোটেই নির্বাচিত হয়। স্বৈরাচারী এরশাদের জাতীয় পার্টি ছাড়া সকল দল নির্বাচন বয়কট করে।

২৩ অক্টোবর ২০১৪ সালে জামায়াতের প্রবীণ নেতা, বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক গোলাম আযম কারান্তরীন অবস্থায় শাহদাতবরণ করেন।  ১১ এপ্রিল ২০১৫ সালে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান শাহদাতবরণ করেন। ২২ নভেম্বর ২০১৫ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোঃ মুজাহিদ শাহদাতবরণ করেন।        

১১ মে ২০১৬ সালে জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার। সারা মুসলিম জাহানে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়। তুরস্ক তাদের দূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে শাহদাতবরণ করেন জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলী।

মূলত ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি নির্যাতনের স্টিমরোলার চলছে। এই কয় বছরে জামায়াতের শতাধিক নেতাকর্মীকে শাহদাতবরণ এবং লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে কারাবরণ করতে হয়। বর্তমানে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

সহায়ক সূত্র
১। জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস/ আব্বাস আলী খান
২। প্রবন্ধ/ রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী/ এ কে এম নাজির আহমাদ/ ছাত্রসংবাদ/ জুলাই-আগস্ট ২০১৩
৩। জামায়াতে ইসলামীর ঊনত্রিশ বছর/ সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী
৪। জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য ইতিহাস এবং কর্মসূচী/ সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী  

পাকিস্তান আমলে জামায়াতে ইসলামীর শাসনতন্ত্র আন্দোলন



১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতে শুরু করে ১৯৪৮ সাল থেকে। আর সেটি ছিল ইসলামী শাসনতন্ত্রের দাবী নিয়ে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময় মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ এই কথা বলে প্রচার চালিয়েছেন একটি স্বাধীন দেশ হাতে পেলে তাঁরা দেশটিকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করবেন। এতে সাধারণ মুসলিম তাদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাবার পর তারা সেইসব কথা ভুলে যেতে থাকেন। শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে গিয়ে তারা আলোচনা শুরু করেন পাকিস্তানের জন্য বৃটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেম উপযোগী, না আমেরিকান প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম, তা নিয়ে। এতে ক্ষিপ্ত হয় ইসলামপন্থী মানুষরা। 

১৯৪৮ সনের এপ্রিল মাসে করাচির জাহাংগীর পার্কে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম রাজনৈতিক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান বক্তা ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপরিষদের প্রতি চারটি দফার ভিত্তিতে ‘আদর্শ প্রস্তাব’ গ্রহণ করার উদাত্ত আহ্বান জানান।

দফাগুলো হচ্ছে
১। সার্বভৌমত্ব আল্লাহর। সরকার আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দেশ শাসন করবে।
২। ইসলামী শরীয়াহ হবে দেশের মৌলিক আইন।
৩। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক আইনগুলো ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত করে ইসলামের সাথে সংগতিশীল করা হবে।
৪। ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে রাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই শরীয়াহর সীমা লংঘন করবে না।
এই দাবীগুলো নিয়েই জামায়াতে ইসলামী ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন শুরু করে।

‘ইসলামী শাসনতন্ত্রের ২২ দফা মূলনীতি’ প্রণয়ন

১৯৪৮ সনের ১১ই সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের স্থপতি মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। গভর্ণর জেনারেল হন ঢাকার নওয়াব পরিবারের সন্তান খাজা নাজিমুদ্দিন। প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকেন লিয়াকত আলী খান। লিয়াকত আলী খান সরকার ১৯৪৮ সনের ৪ঠা অক্টোবর ইসলামী শাসনতন্ত্রের অন্যতম বলিষ্ঠ কণ্ঠ সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদীকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে। প্রায় ২০ মাস জেলে রাখার পর ১৯৫০ সনের ২৮শে মে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৫০ সনের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন যে দেশের আলিম সমাজ যদি সর্বসম্মতভাবে কোন শাসনতান্ত্রিক প্রস্তাব উপস্থাপন করে, গণপরিষদ তা বিবেচনা করে দেখবে। প্রধানমন্ত্রী আস্থাশীল ছিলেন যে বহুধাবিভক্ত আলিম সমাজ এই জটিল বিষয়ে কখনো একমত হতে পারবে না এবং কোন সর্বসম্মত প্রস্তাবও পেশ করতে পারবে না।

১৯৫১ সনের জানুয়ারি মাসে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে করাচিতে সারা দেশের সকল মত ও পথের ৩১ জন শীর্ষ আলিম একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে একত্রিত হন। সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ সুলাইমান নদভী। সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী একটি খসড়া পেশ করেন। আলাপ-আলোচনার পর চূড়ান্ত হয় একটি মূল্যবান দলীল “ইসলামী শাসনতন্ত্রের ২২ দফা মূলনীতি।”

দফাগুলো ছিলো নিন্মরুপ:
১. দেশের সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ।
২. দেশের আইন আল-কুরআন ও আসসুন্নাহ ভিত্তিতে রচিত হবে।
৩. রাষ্ট্র ইসলামী আদর্শ ও নীতিমালার উপর সংস্থাপিত হবে।
৪. রাষ্ট্র মা‘রুফ প্রতিষ্ঠা করবে এবং মুনকার উচ্ছেদ করবে।
৫. রাষ্ট্র মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সাথে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য সম্পর্ক মজবুত করবে।
৬. রাষ্ট্র সকল নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের গ্যারান্টি দেবে।
৭. রাষ্ট্র শারীয়াহর নিরিখে নাগরিকদের সকল অধিকার নিশ্চিত করবে।
৮. আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না।
৯. স্বীকৃত মাযহাবগুলো আইনের আওতায় পরিপূর্ণ দ্বীনি স্বাধীনতা ভোগ করবে।
১০. অমুসলিম নাগরিকগণ আইনের আওতায় পার্সোনাল ল’ সংরক্ষণ ও পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে।
১১. রাষ্ট্র শারীয়াহ কর্তৃক নির্ধারিত অমুসলিমদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করবে।
১২. রাষ্ট্রপ্রধান হবেন একজন মুসলিম পুরুষ।
১৩. রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হবে।
১৪. রাষ্ট্রপ্রধানকে পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি মাজলিসে শূরা থাকবে।
১৫. রাষ্ট্রপ্রধান দেশের শাসনতন্ত্র সাসপেন্ড করতে পারবেন না।
১৬. সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে রাষ্ট্রপ্রধানকে পদচ্যুত করা যাবে।
১৭. রাষ্ট্রপ্রধান তার কাজের জন্য মজলিসে শূরার নিকট দায়ী থাকবেন এবং তিনি আইনের ঊর্ধ্বে হবেন না।
১৮. বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন হবে।
১৯. সরকারী ও প্রাইভেট সকল নাগরিক একই আইনের অধীন হবে।
২০. ইসলামবিরোধী মতবাদের প্রচারণা নিষিদ্ধ হবে।
২১. দেশের বিভিন্ন অঞ্চল একই দেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিট বলে গণ্য হবে।
২২. আলকুরআন ও আসসুন্নাহর পরিপন্থী শাসনতন্ত্রের যেই কোন ব্যাখ্যা বাতিল বলে গণ্য হবে।

এই নীতিমালা বিপুল সংখ্যায় মুদ্রণ করে সারা দেশে ছড়ানো হয়। এর পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য সারা দেশে বহুসংখ্যক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামী শাসনতন্ত্রের পক্ষে প্রবল জনমত সৃষ্টি হতে থাকে। গণদাবির মুখে গণপরিষদ ১৯৫৬ সনের ২৯ ফেব্রুয়ারি একটি শাসনতন্ত্র পাস করে।

পুরোপুরি ইসলামী না হলেও ১৯৫৬ সনের শাসনতন্ত্রে ইসলামের যথেষ্ট প্রতিফলন ছিলো। ঐ বছরের ২৩শে মার্চ পাকিস্তানের তৃতীয় গভর্নর জেনারেল মালিক গোলাম মুহাম্মাদকে অব্যাহতি দিয়ে প্রণীত শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতে ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট বানানো হয় মেজর জেনারেল ইস্কানদার আলী মির্যাকে।

এই আন্দোলনের মূল সফলতা ছিলো পাকিস্তান সেক্যুলার না হয়ে ইসলামিক রিপাবলিক হয়েছে। এর প্রভাবে পর্যায়ক্রমে সুদ, মদ এগুলো নিষিদ্ধ হয়। সকল সেক্টরে ইসলামী ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত হয়।

সূত্র:
রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী/ এ কে এম নাজির আহমদ/ ছাত্রসংবাদ, জুলাই ২০১৩

১৯ আগস্ট, ২০১৭

হযরত আইয়ুব আঃ এবং কিছু প্রচলিত গল্প


নবীদের (আঃ) সম্পর্কে সমাজে বিভিন্ন বর্ণনা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে আমরা ততটাই গ্রহন করবো যতটা আমাদের আল্লাহ তায়ালা এবং রাসূল সাঃ জানিয়েছেন। আল কুরআনে ৪টি সূরার ৮টি আয়াতে আইয়ূব (আঃ)-এর কথা এসেছে। যথা- সূরা নিসা ১৬৩, সূরা আন‘আম ৮৪, সূরা আম্বিয়া ৮৩-৮৪ এবং সূরা সোয়াদ ৪১-৪৪। আর একটি হাদীস সহীহ হাদীস গ্রন্থে পাওয়া যায়। সেগুলো নিম্নরূপ। 

আল্লাহ সুবহানাল্লাহু তায়ালা বলেন,
হে মুহাম্মাদ ! আমি তোমার কাছে ঠিক তেমনিভাবে অহী পাঠিয়েছি, যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীদের কাছে পাঠিয়ে ছিলাম ৷ আমি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইয়াকুব সন্তানদের কাছে এবং ঈসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন ও সুলাইমানের কাছে অহী পাঠিয়েছি৷ আমি দাউদকে যবূর দিয়েছি। (নিসা ১৬৩)

তারপর আমি ইবরাহীমকে ইসহাক ও ইয়াকূবের মতো সন্তান দিয়েছি এবং সবাইকে সত্য পথ দেখিয়েছি, ( সে সত্য পথ যা) ইতিপূর্বে নূহকে দেখিয়েছিলাম৷ আর তারই বংশধরদের থেকে দাউদ, সুলাইমান, আইউব, ইউসুফ, মূসা ও হারুণকে (হেদায়াত দান করেছি)৷ এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে তাদের সৎকাজের বদলা দিয়ে থাকি। 
(আন'আম ৮৩)

‘আর স্মরণ কর আইয়ূবের কথা, যখন তিনি তার পালনকর্তাকে আহবান করে বলেছিলেন, আমি কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি সর্বোচ্চ দয়াশীল’। ‘অতঃপর আমরা তার আহবানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিলাম। তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমাদের পক্ষ হ’তে দয়া পরবশে। আর এটা হল ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ’ (আম্বিয়া ৮৩-৮৪)।

‘আর স্মরণ করো আমার বান্দা আইয়ূবের কথা। যখন সে তার রবকে ডাকলো এই বলে যে, শয়তান আমাকে কঠিন যন্ত্রণা ও কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। (আমি তাকে হুকুম দিলাম) তোমার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করো, এ হচ্ছে ঠাণ্ডা পানি গোসল করার জন্য এবং পান করার জন্য। আমি তাকে ফিরিয়ে দিলাম তার পরিবার পরিজন এবং সেই সাথে তাদের মতো আরো, নিজের পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ এবং বুদ্ধি ও চিন্তাশীলদের জন্য শিক্ষণীয় হিসেবে। (আর আমি তাকে বললাম) এক গুচ্ছ তৃণশলা নাও এবং তা দিয়ে আঘাত করো এবং নিজের প্রতিশ্রুতি ভংগ করো না। আমি তাকে সবরকারী পেয়েছি, কতই না চমৎকার বান্দা ছিল সে, নিশ্চয়ই সে ছিল নিজের রবের অভিমুখী। (সোয়াদ ৪১-৪৪)

অতঃপর আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আইয়ূব একদিন নগ্নাবস্থায় গোসল করছিলেন (অর্থাৎ বাথরুম ছাড়াই খোলা স্থানে)। এমন সময় তাঁর উপরে সোনার ফড়িংসমূহ এসে পড়ে। তখন আইয়ূব সেগুলিকে ধরে কাপড়ে ভরতে থাকেন। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাকে ডেকে বলেন, হে আইয়ূব! আমি কি তোমাকে এসব থেকে মুখাপেক্ষীহীন করিনি? আইয়ূব আঃ বললেন, তোমার ইযযতের কসম! অবশ্যই তুমি আমাকে তা দিয়েছ। কিন্তু তোমার বরকত থেকে আমি মুখাপেক্ষীহীন নই’।

প্রচলিত গল্প: 
আইয়ুব একজন বড়ই সত্যনিষ্ঠ, খোদাভীরু ও কুকর্ম ত্যাগকারী সিদ্ধ পুরুষ ছিলেন৷ এই সংগে তিনি এতই ধনাঢ্য ছিলেন যে, "পূর্ব দেশের লোকদের মধ্যে তিনি ই ছিলেন সর্বাপেক্ষা বড়লোক৷একদিন আল্লাহ তাঁর বান্দা আইয়ুবের জন্য গর্ব করেন৷ শয়তান বলে, আপনি তাকে যা কিছু দিয়ে রেখেছেন তারপর সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে আর কে করবে? তার প্রতি যেসব অনুগ্রহ করেছেন সেগুলো একবার ছিনিয়ে নেন তারপর দেখুন সে যদি ‌আপনার মুখের ওপর আপনাকে অস্বীকার না করে থাকে তাহলে আমার নাম শয়তান নয়। 

আল্লাহ বলেন, ঠিক আছে তার সব কিছু তোমার হস্তগত করে দেয়া হচ্ছে, শুধুমাত্র তার শারীরিক কোন ক্ষতি করো না৷ শয়তান গিয়ে আইয়ুবের সমস্ত ধন-দওলত ও পরিবার পরিজন ধবংশ করে দেয়৷আইয়ুব সবকিছু থেকে বঞ্চিত হয়ে শুধুমাত্র একাই থেকে যান। কিন্তু এতে আইয়ুবের মনে কোন দুঃখ ও ক্ষোভ জাগেনি৷ তিনি আল্লাহকে সিজদা করেন এবং বলেন, "আমি মায়ের গর্ভ থেকে উলংগ এসেছি এবং উলংগই ফিরে যাবো; খোদাই দিয়েছেন আবার খোদাই নিয়েছেন, খোদার নাম ধন্য হোক। 

আল্লাহ শয়তানকে বলেন, আইয়ুব কেমন সত্যনিষ্ঠ প্রমাণিত হয়েছে দেখে নাও। শয়তান বলে, আচ্ছা, এবার তার শরীরকে একবার বিপদগ্রস্ত করে দেখুন সে আপনার মুখের ওপর আপনার কুফরী করবে৷ আল্লাহ বলেন, ঠিক আছে যাও, তাকে তোমার হাতে দেয়া হচ্ছে, তবে তার প্রাণটি যেন সংরক্ষিত থাকে৷ অতপর শয়তান ফিরে যায়৷ সে আইয়ুবকে মাথার চাঁদি থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক ফোড়ায় ভরে দেয়৷ তার স্ত্রী তাকে বলে, "এখনো কি তুমি তোমার সত্যনিষ্ঠার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে? আল্লাহকে অমান্য করো এবং প্রাণত্যাগ করো৷তিনি জবাব দেন, তুমি মুঢ়া স্ত্রীর মতো কথা বলছো৷ আমরা কি আল্লাহর কাছ থেকে শুধু সুখ পাবো, দুঃখ পাবো না? 

হযরত ইয়াযিদ ইবনু মাইসারা (রাঃ) বলেন, যখন হযরত আইয়ুবের (আঃ) পরীক্ষা শুরু হয় তখন তার সন্তান সন্ততি মারা যায়, ধন- সম্পদ ধ্বংস হয় এবং তিনি সম্পূর্ণরূপে রিক্ত হস্ত হয়ে পড়েন। এতে তিনি আরো বেশী আল্লাহর যিকরে লিপ্ত থাকেন। তিনি বলতে থাকেনঃ “হে সকল পালনকারীদের পালনকর্তা! আমাকে আপনি বহু ধন মাল ও সন্তান সন্ততি দান করেছিলেন। ঐ সময় আমি ঐগুলিতে সদা লিপ্ত থাকতাম। অতঃপর আপনি ঐগুলি আমার থেকে নিয়ে নেয়ার ফলে আমার অন্তর ঐ সবের চিন্তা থেকে মুক্ত হয়েছে। এখন আমার অন্তরের মধ্যে ও আপনার মধ্যে কোনই প্রতিবন্ধকতা নেই। যদি আমার শত্রু ইবলীস আমার প্রতি আপনার এই মেহেরবানির কথা জানতে পারতো তবে সে আমার প্রতি হিংসায় ফেটে পড়তো।” ইবলীস তাঁর এই কথায় এবং তার ঐ সময়ের ঐ প্রশংসায় জ্বলে পুড়ে মরে। তিনি নিম্নরূপ প্রার্থনাও করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে ধন সম্পদ, সন্তান সন্ততি এবং পরিবার পরিজনের অধিকারী করেছিলেন। এবং আপনি ভালো করে জানেন যে, ঐ সময় আমি কখনো অহংকার করি নি এবং কারো প্রতি জুলুম ও অবিচারও করি নাই। হে আল্লাহ! এটা আপনার অজানা নেই যে, আমার জন্যে নরম বিছানা প্রস্তুত থাকতো। কিন্তু আমি তা পরিত্যাগ করে আপনার ইবাদতে রাত কাটিয়ে দিতাম এবং আমার নাফসকে ধমকের সুরে বলতামঃ তুমি নরম বিছানাতে আরাম করার জন্যে সৃষ্ট হও নি। হে আমার পালনকর্তা! আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আমি সুখ শান্তি ও আরাম আয়েশ বিসর্জন দিতাম।”।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই বিপদে জড়িত ছিলেন। হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত কাতাদা (রাঃ) বলেন যে, তিনি সাত বছর ও কয়েক মাস এই কষ্ট ভোগ করেছিলেন। বনী ইসরাঈলের আবর্জনা ফেলার জায়গায় তাকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার দেহ পোকা হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর মহান আল্লাহ তার প্রতি দয়াপরবশ হন এবং তাকে সমস্ত বিপদ ও কষ্ট হতে মুক্তি দান করেন। আর তাকে তিনি পুরস্কৃত করেন ও তার উত্তম প্রশংসা করেন। অহাব ইবনু মুনাববাহ (রাঃ) বলেন যে, তিনি পূর্ণ তিন বছর এই কষ্টের মধ্যে পতিত ছিলেন। তার দেহের সমস্ত মাংস খসে পড়েছিল। শুধু অস্থি ও চর্ম অবশিষ্ট ছিল। তিনি ছাই এর উপর পড়ে থাকতেন। তার কাছে শুধু তার একজন স্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘযুগ এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর একদা তিনি তার স্বামীকে বলেনঃ “হে আল্লাহর নবী (আঃ)! আপনি মহান আল্লাহর নিকট কেন প্রার্থনা করেন না যাতে তিনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন?” উত্তরে তিনি বলেনঃ "দেখো, আল্লাহ তায়ালা আমাকে সত্তর বছর সুস্থ শরীরে রেখেছিলেন। সুতরাং তিনি যদি আমাকে সত্তর বছর এই অবস্থায় রাখেন এবং আমি ধৈর্য ধারণ করি আল্লাহর জন্যে। তবে এটা তো আল্লাহর জন্যে খুবই অল্প।" একথা শুনে তার স্ত্রী কেঁপে ওঠেন। 

এভাবে আরো কিছু বর্ণনা আছে কুরতুবি ও ইবনে কাসীরে। কেন আইয়ুব আঃ তাঁর স্ত্রীর উপর বিরক্ত হয়েছেন এই নিয়েও রয়েছে অনেক চমকপ্রদ কাহিনী। এর মধ্যে আছে দুই ব্যক্তির ঝগড়ার কাহিনী, জান্নাতি পোষাক, রুটি সংক্রান্ত ইত্যাদি। ইবনে কাসীরে এসব বর্ণনা দূর্বল বলা হয়েছে। 

আসলে আইয়ুব আঃ এর সাথে কী হয়েছে? 
১. সূরা সোয়াদের ৪১ নং আয়াত থেকে অনেকে মনে করেন শয়তান আইয়ুব আঃ কে দুঃখ কষ্টে পতিত করেছে। বস্তুত এই দাবিটি সঠিক নয়। শয়তানের এমন ক্ষমতা নেই। শয়তান আমাকে কঠিন যন্ত্রণা ও কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছে এর সঠিক অর্থ হচ্ছে, রোগের প্রচণ্ডতা, ধন-সম্পদের বিনাশ এবং আত্মীয় - স্বজনদের মুখ ফিরিয়ে নেবার কারণে আমি যে কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছি তার চেয়ে বড় কষ্ট ও যন্ত্রণা আমার জন্য এই যে , শয়তান তার প্ররোচনার মাধ্যমে আমাকে বিপদগ্রস্ত করছে৷ এ অবস্থায় সে আমাকে আমার রব থেকে হতাশ করার চেষ্টা করে , আমাকে আমার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ করতে চায় এবং আমি যাতে অধৈর্য হয়ে উঠি সে প্রচেষ্টায় রত থাকে৷ 

হযরত আইয়ূব আঃ এর ফরিয়াদের এ অর্থটি দু'টি কারণে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এক, কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে আল্লাহ শয়তানকে কেবলমাত্র প্ররোচণা দেবার ক্ষমতাই দিয়েছেন। আল্লাহর বন্দেগীকারীদেরকে রোগগ্রস্ত করে এবং তাদেরকে শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে বন্দেগীর পথ থেকে সরে যেতে বাধ্য করার ক্ষমতা তাদেরকে দেননি ৷ দুই, সূরা আম্বিয়ায় যেখানে হযরত আইয়ূব আঃ আল্লাহর কাছে তাঁর রোগের ব্যাপারে অভিযোগ পেশ করছেন সেখানে তিনি শয়তানের কোন কথা বলেন নি রবং তিনি কেবল বলেন, আমি রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছি এবং তুমি পরম করুণাময়।

২. আইয়ুব আঃ কেমন রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, দেহের সর্বত্র কেমন পোকা ধরেছিল? জিহবা ও কলিজা ব্যতীত দেহের সব মাংস তার খসে পড়েছিল, পচা দুর্গন্ধে সবাই তাকে নির্জন স্থানে ফেলে পালিয়েছিল, ইত্যাকার বিভিন্ন রকমের কাল্পনিক কাহিনী যা বিভিন্ন মুফাসসিরগণ তাদের তাফসীরে স্থান দিয়েছেন, সে সবের কোন ভিত্তি নেই বরং সেগুলো স্রেফ ইসরাঈলী উপকথা মাত্র। 

৩. পায়ের আঘাতে পানির ধারা সৃষ্টি এটি অলৌকিক মনে হলেও বিষ্ময়কর নয়। ইতিপূর্বে শিশু ইসমাঈলের ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে। পরবর্তীকালে হোদায়বিয়ার সফরে রাসূলের হাতের বরকতে সেখানকার শুষ্ক পুকুরে পানির ফোয়ারা ছুটেছিল, যা তাঁর সাথী ১৪০০ সাহাবীর পানির কষ্ট নিবারণে যথেষ্ট হয়। মূলত এগুলি নবীগণের মু‘জেযা। নবী আইয়ূবের আঃ জন্য তাই এটা হয়েছে আল্লাহর হুকুমে।
তবে কতদিন তিনি কষ্ট ভোগ করেছেন এই হিসাব সম্পর্কে কোন সহীহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। যেগুলো পাওয়া যায় তা সবই ইসরাঈলীয়াত। 

৪. আল্লাহ বলেন, ‘আমরা তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথে সমপরিমাণ আরও দিলাম আমাদের পক্ষ হতে দয়া পরবশে। এখানে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তার বিপদে ধৈর্য ধারণের পুরস্কার দ্বিগুণভাবে পেয়েছিলেন দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। বিপদে পড়ে যা কিছু তিনি হারিয়েছিলেন, সবকিছুই তিনি বিপুলভাবে ফেরত পেয়েছিলেন। অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন, ‘এভাবেই আমরা আমাদের সৎকর্মশীল বান্দাদের পুরস্কৃত করে থাকি’ (আন‘আম ৮৪)। 

এখানে তাঁর মৃত সন্তানাদি পুনর্জীবিত হয়েছিল, না-কি হারানো গবাদি পশু সব ফেরৎ এসেছিল, এসব কল্পনার কোন প্রয়োজন নেই। এগুলো বাহুল্যতা। এতটুকুই বিশ্বাস রাখা যথেষ্ট যে, তিনি তাঁর ধৈর্য ধারণের পুরস্কার ইহকালে ও পরকালে বহুগুণ বেশী পরিমাণে পেয়েছিলেন। যুগে যুগে সকল ধৈর্যশীল ঈমানদার নর-নারীকে আল্লাহ এভাবে পুরস্কৃত করে থাকেন।

৫. পুরস্কার দেয়ার পর আল্লাহ বলেন, رَحْمَةً مِّنْ عِنْدِنَا ‘আমাদের পক্ষ হতে দয়া পরবশে’ (আম্বিয়া ৮৪)। এর দ্বারা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ কারও প্রতি অনুগ্রহ করতে বাধ্য নন। তিনি যা খুশী তাই করেন, যাকে খুশী যথেচ্ছ দান করেন। তিনি সবকিছুতে একক কর্তৃত্বশীল। কেউ এই আয়াতে বর্ণিত ‘রাহমাতান’ (رَحْمَةً) থেকে আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রীর নাম ‘রহীমা’ কল্পনা করেছেন। যা নিতান্তই মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়। 

বিবি রহিমার নামে আইয়ুব আঃ এর স্ত্রীকে নির্দেশ করে আমাদের দেশে বহু গল্প প্রচলিত আছে। সেগুলোর প্রকৃতপক্ষে সহীহ কোন ভিত্তি নাই। গল্প উপন্যাস গানের মাধ্যমে তা প্রচারিত হয়েছে। 

৬. সহীহ বুখারীতে আইয়ূব আঃ এর উপর এক ঝাঁক সোনার ফড়িং এসে পড়ার যে কথা বর্ণিত হয়েছে, সেটা হল আউয়ূব আঃ এর সুস্থতা লাভের পরের ঘটনা। এর দ্বারা আল্লাহ বিপদমুক্ত আইয়ূবের উচ্ছ্বল আনন্দ পরখ করতে চেয়েছেন। আল্লাহর অনুগ্রহ পেয়ে বান্দা কত খুশী হ’তে পারে, তা দেখে যেন আল্লাহ নিজেই খুশী হন। এজন্য আইয়ূবকে খোঁচা দিয়ে কথা বললে অনুগ্রহ বিগলিত আইয়ূব বলে ওঠেন, ‘আল্লাহর বরকত থেকে আমি মুখাপেক্ষীহীন নই’। অর্থাৎ বান্দা সর্বদা সর্বাবস্থায় আল্লাহর রহমত ও বরকতের মুখাপেক্ষী। নিঃসন্দেহে উক্ত ঘটনাটিও একটি মু‘জেযা। 

৭. আল্লাহ আইয়ূব আঃ কে বলেন,‘আর তুমি তোমার হাতে একমুঠো তৃণশলা নাও। অতঃপর তা দিয়ে আঘাত কর এবং তোমার শপথ ভঙ্গ করো না’ (সোয়াদ ৪৪)। এই আয়াতে আরেকটি ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, রোগ অবস্থায় আইয়ূব আঃ শপথ করেছিলেন যে, সুস্থ হলে তিনি স্ত্রীকে একশ’ বেত্রাঘাত করবেন। রোগ তাড়িত স্বামী কোন কারণে স্ত্রীর উপর ক্রোধবশে এরূপ শপথ করেও থাকতে পারেন। কিন্তু কেন তিনি এ শপথ করলেন, তার স্পষ্ট কোন কারণ কুরআন বা হাদিসে বলা হয়নি। ফলে তাফসীরের গ্রন্থগুলোতে নানা কল্পনার ফানুস উড়ানো হয়েছে, যা আইয়ূব আঃ এর পুণ্যশীলা স্ত্রীর উচ্চ মর্যাদার একেবারেই বিপরীত। আইয়ূবের আঃ এর স্ত্রী ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দীদের অন্যতম। তাকে কোনরূপ কষ্টদান আল্লাহ পছন্দ করেননি। 

আল্লাহ যখন আইয়ুব আঃ কে সুস্থতা দান করলেন এবং যে রোগগ্রস্ত অবস্থায় ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি এ কসম খেয়েছিলেন এ ক্রোধ স্তিমিত হয়ে গেলো তখন তিনি একথা মনে করে অস্থির হয়ে পড়লেন যে কসম পুরা করতে গেলে অযথা একজন নিরপরাধকে মারতে হয় এবং কসম ভেঙে ফেললেও গোনাহগার হতে হয়। এ উভয় সংকট থেকে আল্লাহ তাঁকে উদ্ধার করলেন। আল্লাহ তাঁকে হুকুম দিলেন, একগুচ্ছ তৃণশলা নাও। তাতে তুমি যে পরিমাণ কোড়া মারার কসম খেয়েছিলে সে পরিমাণ কাঠি থাকবে এবং সে ঝাড়ু দিয়ে কথিত অপরাধীকে একবার আঘাত করো এর ফলে তোমার কসমও পুরা হয়ে যাবে এবং সেও অযথা কষ্টভোগ করবে না।

কোন কোন ফকীহ ও রেওয়ায়াতটিকে একমাত্র হযরত আইয়ূবের জন্য নির্ধারিত মনে করেন। আবার কতিপয় ফকীহের মতে অন্য লোকেরাও এ সুবিধাদান থেকে লাভবান হতে পারে৷ প্রথম অভিমতটি উদ্ধৃত করেছেন ইবনে আসাকির হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে এবং আবু বকর জাসসাস মুজাহিদ থেকে ৷ ইমাম মালেকেরও অভিমত এটিই ৷ ইমাম আবু হানীফা , ইমাম আবু ইউসুফ , ইমাম মুহাম্মাদ , ইমাম যুফার ও ইমাম শাফেঈ দ্বিতীয় অভিমতটি অবলম্বন করেছেন ৷ তাঁরা বলেন , কোন ব্যক্তি যদি তার খাদেমকে দশ ঘা কোড়া মারার কসম খেয়ে বসে এবং পরে দশটি কোড়া মিলিয়ে তাকে এমনভঅবে কেবলমাত্র একটি আঘাত করে যার ফলে কোড়াগুলোর প্রত্যেকটি কিছু অংশ তার গায়ে ছুঁড়ে যায় তাহলে তার কসম পুরো হয়ে যাবে। 

বিভিন্ন হাদীস থেকে জানা যায় , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশী রোগগ্রস্ত বা দুর্বল হবার কারণে যে যিনাকারী একশো দোরবার আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা রাখতো না তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি প্রয়োগ করার ব্যাপারে এ আয়াতে বিবৃত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন৷ আল্লামা আবু বকর জাসসাস হযরত সাঈদ ইবনে সা'দ ইবনে উবাদাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, বনী সা 'য়েদে এক ব্যক্তি যিনা করে। সে এমন রুগ্ন ছিল যে, তাকে অস্থি-চর্মসার বলা যেতো। এ কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুকুম দিলেনঃ
"খেজুরের একটি ডাল, নাও, যার একশোটি শাখা রয়েছে এবং তা দিয়ে একবার এ ব্যাক্তিকে আঘাত করো।" (আহকামুল কুরআন )

মুসনাদে আহমাদ , আবু দাউদ , নাসাঈ ইবনে মাজাহ , তাবারানী , আবদুল রাজ্জাক ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থসমূহেও এ ঘটনাকে সমর্থন করে এমন কতিপয় হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে ৷ সেগুলোর মাধ্যমে একথা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় যে , নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোগী ও দুর্বলের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতিই অবলম্বন করেছিলেন ৷ তবে ফকীহগণ এ ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করেছেন যে , প্রত্যেকটি শাখা বা পাতার কিছু না কিছু অংশ অপরাধীর গায়ে অবশ্যই লাগা উচিত এবং একটি আঘাতই যথেষ্ট হলেও অপরাধীকে তা যেন কোন না কোন পর্যায়ে আহত করে৷ অর্থাৎ কেবল স্পর্শ করা যথেষ্ট নয় বরং আঘাত অবশ্যই করতে হবে৷

এখানে এ প্রশ্ন দেখা দেয় যে , যদি কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে কসম খেয়ে বসে এবং পরে জানা যায় যে , সে বিষয়টি অসংগত, তাহলে তার কি করা উচিত৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেকে এ ব্যাপারে হাদীস বর্ণিত হয়েছে৷ তিনি বলেছেন, এ অবস্থায় মানুষের পক্ষে যা ভালো, তাই করা উচিত এবং এটিই তার কাফফারা অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, এ অসংগত কাজের পরিবর্তে মানুষের ভাল কাজ করা এবং নিজের কসমের কাফফারা আদায় করে দেয়া উচিত। এ আয়াতটি এ দ্বিতীয় হাদীসটিকে সমর্থন করে৷ কারণ একটি অসংগত কাজ না করাই যদি কসমের কাফফরা হতো তাহলে আল্লাহ আইয়ুবকে একথা বলতেন না যে, তুমি একটি ঝাড়ু দিয়ে আঘাত করে নিজের কসম পুরা করে নাও। বরং বলতেন, তুমি এমন অসংগত কাজ করো না এবং এটা না করাই তোমার কসমের কাফফরা। 

এ আয়াত থেকে একথাও জানা যায় যে, কোন ব্যক্তি কোন বিষয়ে কসম খেলে সংগে সংগেই তা পুরা করা অপরিহার্য হয় না। হযরত আইয়ূব আঃ রোগগ্রস্ত অবস্থায় কসম খেয়েছিলেন এবং তা পূর্ণ করেন পুরোপুরি সুস্থ হবার পর এবং সুস্থ হবার পরও তাও সংগে সংগেই পুরা করেননি।

কেউ কেউ এ আয়াতকে শরয়ী বিধান বাস্তবায়নের বিপক্ষে বাহানার জন্য যুক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন ৷ সন্দেহ নেই, হযরত আইয়ুবকে যা করতে বলা হয়েছিল তা একটি বাহানা ও ফন্দি এ ছিল কিন্তু তা কোন ফরয থেকে বাঁচার জন্য করতে বলা হয়নি বরং বলা হয়েছিল একটি খারাপ কাজ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। কাজেই শরীয়াতে একমাত্র এমন বাহানা ও ফন্দি জায়েয যা মানুষের নিজের সত্তা থেকে অথবা অন্য কোন ব্যক্তি থেকে জুলুম , গোনাহ ও অসৎ প্রবণতা দূর করার জন্য করা হয়ে থাকে। নয়তো হারামকে হালাল বা বাতিল অথবা সৎকাজ থেকে রেহাই পাবার জন্য বাহানাবাজি করা বা ফন্দি আঁটা অন্যায়। 

শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ :
(১) বড় পরীক্ষায় বড় পুরস্কার লাভ হয়। আর দুনিয়াতে দ্বীনদারীর কঠোরতা ও শিথিলতার তারতম্যের অনুপাতে পরীক্ষায় কমবেশী হয়ে থাকে। আর সে কারণে নবীগণ হলেন সবচেয়ে বেশী বিপদগ্রস্ত।

(২) প্রকৃত মুমিনগণ আনন্দে ও বিষাদে সর্বাবস্থায় আল্লাহর রহমতের আকাঙ্ক্ষী থাকেন। আর বিপদে পড়লে তারা আরও বেশী আল্লাহর নিকটবর্তী হন। কোন অবস্থাতেই নিরাশ হন না।

(৩) প্রকৃত সবরকারীর জন্যই দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা। আইয়ূব আঃ ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

(৪) শয়তান প্রতি মুহূর্তে নেককার মানুষের দুশমন। শিরকী চিন্তাধারার জাল বিস্তার করে সে সর্বদা মুমিনকে আল্লাহর পথ হতে সরিয়ে নিতে চায়।

তথ্যসূত্র
১. তাফহীমুল কুরআন
২. নবীদের কাহিনী/ ড. আসাদুল্লাহ আল গালিব
৩. হাদিসের নামে জালিয়াতী/ ড.আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর
৪. তাফসীরে ইবনে কাসির
৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খন্ড