১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

অবশ্যই বিশ্ব ৫ এর চাইতে বড়



একই সঙ্গে এত সঙ্কটময় পরিস্থিতি বিশ্ব এর আগে দেখেনি এবং এর বিপরীতে জাতিসংঘের এতটা অক্ষমতাও আগে কখনো দেখা যায়নি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের হামলা, ইরাক, সিরিয়া, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া, কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ইউক্রেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সহিসংতা বা সংঘর্ষ এড়াতে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে জাতিসংঘ। কেন এমন হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো। 

শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অভাব আছে, তেমনটি হয়তো সরাসরি বলা যাবে না। জাতিসংঘের এমন ব্যর্থতার মূল কারণ এর নিরাপত্তা কাউন্সিলের দেশগুলোর মধ্যে অসহযোগিতামূলক আচরণ। জাতিসংঘ হচ্ছে কতগুলো অংশ বিশেষের সমষ্টি। কিন্তু এই অংশগুলো যখন একে অন্যের বিরুদ্ধে কাজ করে, তখন অচলাবস্থা ও অকার্যকর অবস্থা অবশ্যম্ভাবী। 

“জাতিসংঘ” সংগঠনটির দায়মুক্তির মানসিকতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ত্রুটি বাইরে ফাঁসকারীকে হতে হয় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি। সাবেক আমেরিকান কূটনৈতিক জেমস ওয়াসারসট্রম কসোভোর এক সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনলে তাকে গ্রেপ্তার করে জাতিসংঘ পুলিশ। তাকে চাকরিচ্যুতও করা হয়। এছাড়া তার অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালানো হয়। ওয়াসারসট্রম এক সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'জাতিসংঘের উচিত ছিল মানবাধিকার, আইনের শাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ধরে রাখা। কিন্তু নিজেদের ভেতরেই তারা এগুলো মানে না।'

জাতিসংঘ এমনই একটি সংগঠন, যা সব সময় ত্রুটিযুক্ত থেকেই যাবে। তারা একই সঙ্গে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রকে এর শক্তি এবং দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। বড় কোনো ইস্যুতে জাতিসংঘে প্রয়োজন হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার। এছাড়া আছে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোদানকারী ক্ষমতার অপপ্রয়োগও। সমালোচনা আছে সংস্থাটির নেতৃত্বের প্রশ্নেও। ৭২ বছর বয়সী জাতিসংঘের বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু সংগঠনটির প্রয়োজনীয় চৌকস নেতৃত্ব কিংবা সংস্কারের বিষয়টিতে কারো নজর নেই। 

জাতিসংঘের ব্যর্থতার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বিশ্বপরাশক্তিরা। সামরিক বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর হাতেই আছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব। আর বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সবকিছুতেই মেরুকরণের প্রবণতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ জটিল করে তুলছে। বিভিন্ন দেশে বিশৃঙ্খলায় বিশ্বশক্তিরা সংঘর্ষে লিপ্ত দুই বা ততোধিক গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে বা গোপনে অস্ত্র বা অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছে। নিরাপত্তা পরিষদের ৫ পরাশক্তি ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় জাতিসংঘ এক্ষেত্রে অথর্ব। তাই ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের বর্বর হামলায় বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব উত্থাপনে আমেরিকা যখন বাদ সাধে, জাতিসংঘের তখন নির্বাক না থেকে আর উপায় নেই। আবার রোহিঙ্গাদের উপরে মিয়ানমার গণহত্যা চালালে জাতিসংঘের নিন্দা বিবৃতিও আটকে যায় চীনের ভেটোর কারণে। 

মূলত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী দেশগুলোর সমন্বয়ে। সেক্ষেত্রে তারা নিজেদের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে বিশ্ব তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সারাবিশ্বে বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় লাগিয়ে দিয়ে সেই ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত পরাশক্তিরা। শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৫ রাষ্ট্রকেই দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ লাগিয়ে রাখতে। 

জাতিসংঘের জন্মের পর থেকেই দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত-সংঘর্ষ দেখা দিতে থাকে। জাতিসংঘের ব্যর্থতার প্রথম উদাহরণ হচ্ছে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে প্যালেস্টাইন ভূমিতে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল জাতিসংঘেরই একটি প্রস্তাবে। সেই রাষ্ট্রটিকে দ্রুত স্বীকৃতিও দিল জাতিসংঘ। ইসরাইল এখন জাতিসংঘের একটি সদস্যরাষ্ট্র। কিন্তু সদস্যরাষ্ট্র নয় প্যালেস্টাইন!! মধ্যপ্রাচ্যে এ সংকটটি সৃষ্টির পেছনে জাতিসংঘেরও একটি প্রবল ভূমিকা রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে সঙ্গে নিয়ে প্যালেস্টাইনকে ভাগ করল, ইসরাইলকে বানাল, আর আমেরিকানরা তখন থেকেই এ ইসরাইলের গডফাদার হিসেবে দুনিয়ার জনমতকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করেও চলেছে।

তারপর কোরীয় যুদ্ধ, কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকার হুমকি-হামলা, ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, আরব-ইসরাইল যুদ্ধ এবং সর্ব সাম্প্রতিক আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে সংঘাত-সংঘর্ষ, আরাকানে গণহত্যা। জাতিসংঘ এসব দেশে শান্তি স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, পারছেও না। 

১৯৯৪-এ রুয়ান্ডাতে ১০০ দিনে ১০ লাখ টুটসিকে হত্যা করল হুটিরা, জাতিসংঘ তা থামাতে পারল না। জাতিসংঘের এ ব্যর্থতাটিকে কেউ কেউ সংস্থাটির কলংক হিসেবে দেখে থাকেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অগ্রগতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও কেমন বাড়ছে, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনে তা স্পষ্ট। প্যালেস্টাইনিদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। যেমনিভাবে সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়া হয়েছিল নেলসন ম্যন্ডেলাকে।

জাতিসংঘে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন যে, বিশ্বে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব শেষ হবে। তিনি আরও যোগ করেন যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ প্রবণতা এবং অভিবাসন সংকট শেষ হওয়ার জন্য জাতিসংঘের ভূমিকা প্রয়োজন।ইউএন মহাসচিব বান কি মুন জোর দিয়ে বলেছিলেন যে বিশ্বব্যাপী চলমান নিরাপত্তা সমস্যা এবং চরমপন্থী সহিংসতা শেষ হতে চলেছে। কিন্তু মোটেই তা হচ্ছে না। হেইট ক্রাইম, জাতিগত বিদ্বেষ, সংখ্যালঘুদের নির্মূলকরণ ইত্যাদি বেড়েই চলেছে। 

তার্কি প্রেসিডেন্ট রিসেফ তায়িপ এরদোয়ান এসব টোটাল বিষয়কে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, “জাতিসংঘের কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে, এটি কোন কাজের না। বিশ্বের পাঁচটি দেশের তুলনায় বিশ্ব অনেক বড়”।

পাঁচটি রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠানের নাম ইউনাইটেড নেশন হতে পারেনা। ইউনাইটেড নেশন স্বার্থ রক্ষা করবে সমগ্র পৃথিবীর। আমাদের আবার নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। পাঁচটি রাষ্ট্রের কাছে সারাবিশ্ব জিম্মি থাকতে পারে না। বিশ্ব অবশ্যই পাঁচটি রাষ্ট্রের চাইতে বড়। আমাদের ৭২ বছরের ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের বিকল্প চিন্তা করার সময় এসে গেছে।

#WorldIsBiggerThan5

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

জামায়াতে ইসলামী কেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙ্গনের বিরোধীতা করেছিল?



জামায়াতে ইসলামীর অতীত ও বর্তমানের ভূমিকা থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী আপোসহীন। দুনিয়ার কোন স্বার্থে জামায়াত কখনও আদর্শ বা নীতির বিসর্জন দেয়নি। এটুকু মূলকথা যারা উপলব্ধি করে, তাদের পক্ষে ৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা বুঝতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়।

প্রথমত
মানুষের বেঁচে থাকার, বিশ্বাস অনুযায়ী চলার, পছন্দমত কাজ করার এবং ন্যায় বিচার পাওয়ার স্বাধীনতাই হচ্ছে প্রকৃত স্বাধীনতা।১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তখন অন্য অনেকের মতই জামায়াতে ইসলামীও চিন্তা করেছিল এই সংগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা আনার পরিবর্তে বিশ্বাস ও কাজের যতটুকু স্বাধীনতা ৪৭ এর পাকিস্তান অর্জনের মাধ্যমে এসেছিল, তাও হাতছাড়া হয়ে যায় কিনা। এই আশংকা থেকেই জামায়াত ওই সময়ের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেনি। শুধু জামায়াত নয়, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামীসহ অনেক দল এবং জনগণের বড় একটি অংশও স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারেনি। বলাই বাহুল্য, পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াত সে সময় অতি ক্ষুদ্র একটি দল ছিল।

দ্বিতীয়ত
বস্তুত বাংলাদেশ নামক যে জনপদে বর্তমানে আমরা বাস করছি, এই জনপদকে শুধু ১৯৭১ থেকে চিন্তা করলে হবেনা, এর ইতিহাস হাজার বছরের। সেই আর্য, পাল, সেন, সুলতানী, শাহী থেকে শুরু করে শায়েস্তা খান, ইসলাম খান, সিরাজুদ্দৌলা, ইংরেজ অতঃপর ৪৭ এর পাকিস্তান হয়ে বর্তমানের বাংলাদেশ। এর প্রতিটি ধাপেই বহুবার এই ভূখন্ডের মানচিত্র পরিবর্তন হয়েছে, নামের পরিবর্তন হয়েছে, শাসকের পরিবর্তন হয়েছে, মানুষ কখনো স্বাধীনতা পেয়েছে, কখোনো বঞ্চিত হয়েছে।
৪৭ এর পাকিস্তান-ভারত বিভাজনের আগে এই অঞ্চলের মানুষগুলো চরমভাবে নিষ্পেষিত ছিল ব্রিটিশ শাসক আর হিন্দু শেঠ ও জমিদারদের হাতে। ৭১ এ বহু মানুষ বেঁচে ছিলেন যাদের স্মৃতিতে তখনও বৃটিশ-হিন্দুদের নিষ্পেষণ জ্বলজলে ছিল। ৭১ এ ভারতের সহায়তায় যুদ্ধ করে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দূর্বল পূর্ব পাকিস্তান আদৌ পৃথক একটি রাষ্ট্র গঠিত হতে পারবে নাকি ভারতের মত চানক্যবাদী রাষ্ট্রের করাল গ্রাসে বিলিন হতে হবে তা নিয়ে আশংকা ছিল সচেতন মানুষের মনে।

জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ ৪৭ এর অর্জন নস্যাত হয়ে ভারতের গোলামীতে পুনরায় ফিরে যাবার আশংকা থেকেই ৭১এর স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিতে পারেনি। যে ইসলামী আন্দোলন এ ভূখন্ডে ইসলামী রাষ্ট্র দেখতে চায় তা ব্রাহ্মণবাদী ভারতের সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব তা পাগলেও বিশ্বাস করবে না।

তৃতীয়ত
জামায়াত মনে করেছিল শেখ মুজিব যেমন পশ্চিম পাকিস্তানের আস্থা অর্জন করতে পারেনি তেমনি ভূট্টোও পূর্ব পাকিস্তানের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। সুতরাং সমগ্র পাকিস্থানের একক কোন গ্রহনযোগ্য ব্যক্তি না থাকায় দুই দেশ পার্লামেন্টের মাধ্যমে এমনিতেই ভাগ হয়ে যেত। অনেক দেশই শান্তিপূর্নভাব স্বাধীন হয়ে গিয়েছে। ভারত-পাকিস্থান তার প্রকৃত উদাহরণ। জামায়াত মূলত এটাই চেয়েছিল। তাদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ছিল ভারতের সহায়তায় এদেশ স্বাধীন হলে এদেশ অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণভাবে ভারতের বাজারে পরিণত হবে যাকে কখনোই প্রকৃত স্বাধীন বলা যাবে না। এ কারনেই কিছুদিন আগে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন “জামায়াত যে আশঙ্কায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেনি, দেশ এখন সেদিকেই যাচ্ছে।”

চতুর্থত 
আদর্শগত কারণেই জামায়াতের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের ধারক ও বাহকগণের সহযোগী হওয়া সম্ভব ছিল না। যারা ইসলামকে একটি পূর্ণাংগ জীবন বিধান বলে সচেতনভাবে বিশ্বাস করে, তারা এ দুটো মতবাদকে তাদের ঈমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী মনে করতে বাধ্য। অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেস দলের আদর্শ ছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। জামায়াতে ইসলামী তখন থেকেই এ মতবাদের অসারতা বলিষ্ঠ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশে যারা ভাঙ্গনের পক্ষে কাজ করেছিল তাদের অধিকাংশই ছিল সমাজতন্ত্রের ধারক ও বাহক। আর সমাজতন্ত্রের ভিত্তিই হলো ধর্মহীনতা।

পঞ্চমত 
পাকিস্তানের প্রতি ভারত সরকারের অতীত আচরণ থেকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীকে এদেশের এবং মুসলিম জনগণের বন্ধু মনে করাও কঠিন ছিল। ভারতের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে সঙ্গত কারণেই তাদের যে আধিপত্য সৃষ্টি হবে এর পরিণাম মংগলজনক হতে পারে না বলেই জামায়াতের প্রবল আশংকা ছিল।

ষষ্ঠত 
জামায়াত একথা বিশ্বাস করত যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বেশি হওয়ার কারণে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হলে গোটা পাকিস্তানে এ অঞ্চলের প্রাধান্য সৃষ্টি হওয়া সম্ভব হবে। তাই জনগণের হাতে ক্ষমতা বহাল করার আন্দোলনের মাধ্যমেই জামায়াত এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার অর্জন করতে চেয়েছিল।

সপ্তমত 
জামায়াত বিশ্বাস করত যে, প্রতিবেশী সম্প্রসারণবাদী দেশটির বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচতে হলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্রভুক্ত থাকাই সুবিধাজনক। আলাদা হয়ে গেলে ভারত সরকারের আধিপত্য রোধ করা পূর্বাঞ্চলের একার পক্ষে বেশি কঠিন হবে। মুসলিম বিশ্ব থেকে ভৌগলিক দিক দিয়ে বিচ্ছিন্ন এবং ভারত দ্বারা বেষ্টিত অবস্থায় এ অঞ্চলের নিরপত্তা প্রশ্নটি জামায়াতের নিকট উদ্বেগের বিষয় ছিল।

অষ্টমত 
জামায়াত একথা মনে করত যে, বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে ভারতের সাথে সমমর্যাদায় লেনদেন সম্ভব হবে না। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যে সব জিনিস এখানে আমদানি করা হতো, আলাদা হবার পর সে সব ভারত থেকে নিতে হবে। কিন্তু এর বদলে ভারত আমাদের জিনিস সমপরিমাণে নিতে পারবে না। কারণ রফতানির ক্ষেত্রে ভারতের আমাদের প্রয়োজন নেই। ফলে আমরা অসম বাণিজ্যের সমস্যায় পড়ব এবং এদেশ কার্যত ভারতের বাজারে পরিণত হবে।

নবমত 
জামায়াত পূর্ণাংগ ইসলামী সমাজ কায়েমের মাধ্যমেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সমাজিক ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা এবং সকল বৈষম্যের অবসান করতে চেয়েছিল। জামায়াতের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে,আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসন কায়েম হলে বে-ইনসাফী, যুলুম ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে এবং অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের সত্যিকার মুক্তি আসবে।

এসব কারণে জামায়াতে ইসলামী তখন আলাদা হবার পক্ষে ছিল না। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে এদেশে যারাই জামায়াতের সাথে জড়িত ছিল, তারা বাস্তত সত্য হিসাবে বাংলাদেশকে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র বলে মেনে নিয়েছে। যে জামায়াত বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য, বাংলাদেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য, ইসলামের আদর্শকে উচ্চকিত রাখার জন্য পাকিস্তান ভাঙ্গনের বিরোধীতা করেছে সে জামায়াত কখনোই বাংলাদেশবিরোধী হতে পারে। এই ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করেছে জামায়াত। এই ভূখণ্ডকে সব ধরণের অকল্যাণ থেকে রক্ষার জন্য জামায়াতের কর্মীরা জীবনবাজী রাখতে প্রস্তুত। 

স্বাধীনতার বিরোধিতা আর যুদ্ধাপরাধ এক জিনিস নয়
মনে রাখতে হবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করা আর যুদ্ধের সময় অপরাধ করা এক জিনিস নয়। যে কোন একটি কাজের বিরোধিতা করার অধিকার সকলেরই আছে। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ৪৭ এ ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন অনেকেই, কিন্তু পাকিস্তান হয়ে যাবার পর তা মেনে নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে তারা পাকিস্তানের শাষন ক্ষমতায়ও এসেছেন, তারা মনে করেছিলেন পাকিস্তান ভাগ না হওয়াটাই ভাল হবে। এ ধরণের বিরোধিতা চিন্তা ও মত প্রকাশ স্বাধীনতারই অংশ। শেরে বাংলা লাহোর প্রস্তাব করলেও ৪৬ এর নির্বাচনে পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছেন, পরবর্তীতে সেই পাকিস্তানেরই মন্ত্রী হয়েছেন।

জনাব সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম বড় নেতা ছিলেন। কিন্তু শেষ দিকে যখন বঙ্গদেশ ও আসামকে মিলিয়ে “গ্রেটার বেংগল” গঠন করার উদ্দেশ্যে তিনি শরৎ বসুর সাথে মিলে চেষ্টা করেন। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতো না। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোক। পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক মুসলমানের স্বার্থরক্ষা এবং কোলকাতা মহানগরীকে এককভাবে হিন্দুদের হাতে তুলে না দিয়ে বাংলা ও আসামের মুসলমানদের প্রাধান্য রক্ষাই হয়তো তাঁর উদ্দেশ্যে ছিল। কিন্তু পরে যখন তিনি পূর্ববঙ্গে আসেন, তখন তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে পাকিস্তানের দুশমন বলে ঘোষণা করা হয় এবং চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কোলকাতায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। অবশ্য তিনিই পরে পাকিস্তানের উজিরে আযম (প্রধানমন্ত্রী) হবারও সুযোগ লাভ করেন। বলিষ্ঠ ও যোগ্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার প্রয়োজনে দুর্বল নেতারা এ ধরনের রাজনৈতিক গালির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের গালি দ্বারা কোন দেশপ্রেমিক জননেতার জনপ্রিয়তা খতম করা সম্ভব হয়নি।

তাই ’৭১-এর ভূমিকাকে ভিত্তি করে যে সব নেতা ও দলকে “স্বাধীনতার দুশমন” ও “বাংলাদেশের শত্রু” বলে গালি দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে যতই বিষেদাগার করা হোক, তাদের দেশপ্রেম, আন্তরিকতা ও জনপ্রিয়তা ম্লান করা সম্ভব হবে না।

*অধ্যাপক গোলাম আযমের লিখিত "পলাশী থেকে বাংলাদেশ" বই থেকে সংকলিত

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

অন্ধকারের গল্প



রহিমা... রহিমা... 
ঘুম থেকে উঠেই এই ডাকটিই ডাকতে হয় ছেরাজ মিয়াকে। বাবা মা নামটা সিরাজ রাখলেও সময়ের সাথে বিবর্তিত হয়ে এখন এটা ছেরাজে পরিণত হয়েছে। ছেরাজের চোখে আলো নেই। উঠেই স্ত্রীকে ডাকে সে। স্ত্রী রহিমা যেখানেই থাকে এই ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে আসে। ছেরাজের হাত ধরে বিছানা থেকে নামায়। টয়লেটে পৌঁছে দেয়, নাস্তা করায়। শীতের দিনে বাইরে হালকা রোদে একটি পিঁড়ি পেতে বসিয়ে দেয়। আর গরমের দিনে গাছের ছায়ায়। বৃষ্টির দিনে ক্ষয়ে যাওয়া বারান্দায়। সারাদিন ছেরাজ নীরবে বসে থাকে। কারো সাথে কথা বলে না। সত্য বলতে কি কেউ তার সাথে কথা বলতে আসে না। একটু দূরে স্টেশনে রহিমা চা বিক্রি করে। 

আমি এই স্টেশনের নিয়মিত যাত্রী। এই স্টেশনে নেমেই আমাকে কলেজে যেতে হয়। রহিমার দোকানের কোন নাম বা কোন সাইনবোর্ড না থাকলেও কলেজের সব ছাত্র রহিমা খালার দোকান বললে এক নামেই চেনে। ভালো চা বানায় রহিমা খালা। ট্রেন আসা পর্যন্ত আমি ঠায় বসে থাকি রহিমা খালার দোকানে। পুনঃ পুনঃ চা খাওয়া আমার অভ্যাস। চা এর সুবাধে খালার সাথে ভালো পরিচয় থাকলেও কোনদিন জানতে চাই নি খালার বৃত্তান্ত। রেললাইনের পাশে শত রহিমা খালার বসবাস। কে কার খবর রাখে? 

একদিন পড়ন্ত বিকেলে বসে চা খাচ্ছি অলসভাবে। হঠাৎ এক রহিমা বলে আর্ত চিৎকার! তাকিয়ে দেখি এক প্রায় বৃদ্ধ লোক হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। রহিমা খালা ছুটে গেল। হাত ধরে নিয়ে বস্তির একটি ঘরের ভেতর ঢুকে গেল । বুঝলাম, লোকটা অন্ধ। একটা হাহাকার সৃষ্টি হলো মনে। আমার কাছে মনে হয় অন্ধ লোকরাই পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায়। অন্ধ লোক দেখলেই শিউরে উঠি। অজান্তেই নিজের চোখে হাত চলে যায়। স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ হই, আমার চোখে তিনি আলো দিয়েছেন। খালা বেরিয়ে এলেন বস্তি থেকে। আবার দোকানের কাজ করতে থাকলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, খালা উনি কে? সলজ্জ মুখে খালা বললেন, সোয়ামী। 

কলেজের বেতন, পরীক্ষার ফি বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। দ্বিগুণের চাইতেও বেশি। আমাদের মত টিউশনি করে চলা ছাত্রদের জন্য এটা ছিল বড় ধরণের ধাক্কা। ছাত্ররা সবাই বললো আন্দোলন হবে। এভাবে চললে আমাদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হবে। কলেজের কোন হোস্টেল নেই। থাকতে হয় মেস করে। সেখানেও ভাড়া বাড়ায় বাড়িওয়ালা। দ্রব্যমূল্যেতো হু হু করে বাড়ছে। এর মধ্যে বেতন বাড়ানো আমাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে গেল। নির্দিষ্ট দিনে সবাই ক্লাস বর্জন করলো। ছাত্ররা সবাই মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হলো। সবার সাথে আমিও বের হলাম। 

পুলিশ অতর্কিতে আমাদের উপর আক্রমণ করলো। টিয়ার শেল নিক্ষেপ হচ্ছে। ভীষণ ধোঁয়া। চারদিকে অন্ধকার। চোখ জ্বলছে। হঠাৎ আমার কপালে ভীষণ আঘাত পেলাম। পড়ে গেলাম রাস্তায়। এরপর আর মনে নেই। 

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখি এক মাঝবয়সি লোক আমার মাথার পাশে বসা। আমার কপাল তিনি ভিজা রুমাল দিয়ে মুছে দিচ্ছেন। লোকটি কালো সানগ্লাস পরা। আরেকটু ভালো করে খেয়াল করতে যেই মাথা একটু তুলেছি বুঝতে পেরেছি মাথায় ভীষণ চোট। উহ শব্দ করে উঠলাম। লোকটি বললো, তুমি জেগেছ বাবা? জ্ঞান ফিরেছে বাবা? রহিমা... রহিমা... 

চট করে বুঝে ফেললাম, লোকটা রহিমা খালার অন্ধ স্বামী। রহিমা খালা তখন উচ্চস্বরে কারো সাথে ঝগড়া করছে বলে মনে হচ্ছে। কান পেতে বুঝার চেষ্টা করলাম। পুলিশ সন্দেহ করছে রহিমা খালার ঘরের মধ্যে কোন প্রতিবাদকারী ছাত্র লুকিয়ে আছে। তারা সেই লুকিয়ে থাকা প্রতিবাদকারীকে গ্রেপ্তার করতে চায়। কিন্তু রহিমা খালা মিথ্যা বলে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। অবশেষে সফল হলেন রহিমা খালা। পুলিশদের সাথে ঝগড়া করে তাদের ফিরিয়ে দিলেন। ঢুকতে দিলেন না ঘরে। 

রহিমা খালা আমাকে লুকিয়ে ফেললেন চৌকির ওপাশে ছোট্ট একটু জায়গা করে। জানতে পারলাম গোলাগুলি দেখে রহিমা খালা ছুটে যান। দেখেন আমি পড়ে আছি রাস্তায়। তিনি আরো কয়েকজনের সহায়তায় আমাকে তার বাড়িতে টেনে নিয়ে আসলেন। এভাবে ছিলাম দুই দিন। এই দুই দিনে আমার একান্ত সঙ্গি ছিলেন ছেরাজ মিয়া। স্বল্পভাষী ছেরাজ মিয়ার সবচেয়ে বেশি যে শব্দটা উচ্চারণ করেন তা হল “রহিমা”। দুদিন পর আমি অনেকটা সুস্থ। ছেরাজ মিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি চোখ হারালেন কী করে? 

বলতে শুরু করলেন ছেরাজ মিয়া। সেদিন ছিল শুক্রবার। রহিমার বাবা দাওয়াত দিলেন আমাদের। দুপুরের খানা খেতে। আমি তখন ছোট্ট মুদি দোকান করি টাঙ্গাইলে। শ্বশুর বাড়ি পাশের গ্রামেই। সকালে রওনা হই শ্বশুর বাড়ি। আমি রহিমা আর আমাদের ছোট্ট মেয়ে শরিফা। বিকালে ফিরতে চাইলে শাশুড়ি জোর করে বললো একদিন থেকে যেতে। অগত্যা থেকে গেলাম। সন্ধ্যায় রহিমা বললো শরিফার জন্য দুধ কিনে আনতে। বাড়িতে দুধ নাই। 

বের হতে যাব এমন সময় দেখলাম একদল পুলিশ আসছে। তারা বহুদিন ধরেই আমার শ্বশুরের কাছে চাঁদা চেয়ে আসছে। সেই চাঁদা নিতেই রহিমাদের বাড়ি আসলো। শ্বশুর তাদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন, তাদের দাবীকৃত এত টাকা দেয়ার সামর্থ নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তারা আমার শ্বশুরকে এরেস্ট করতে চাইলো। আমি বাধা দিলাম। প্রতিবাদ করলাম তাদের এই ডাকাতির। 

তারা অবশেষে আমাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেল। এবার টাকার অংক আরো বেড়ে গেল। পাঁচ লাখ টাকা চাইলো। আমরা গরীব মানুষ পাঁচ লাখ টাকা দূরের কথা এক লাখ টাকা দেয়ারও সামর্থ ছিল না। রহিমা এর ওর কাছ থেকে ধার করে পঞ্চাশ হাজার টাকা পুলিশকে দিয়েছিল। কিন্তু আমি প্রতিবাদ করে যে অপরাধ করেছি তার কোন প্রায়শ্চিত্য এই টাকায় হবে না। 

সারারাত ধরে চললো নির্যাতন। মার খেতে খেতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আবার জ্ঞান ফিরে। আমার মার খাই। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলেই শুনি বাইরে রহিমা আর আমার মেয়ে শরিফা কান্না করছে। মাফ চাই পুলিশের পা ধরে। আর কোনদিন পুলিশের সাথে বেয়াদবি করবো না এসব কথা বার বার বলি। তবুও মাফ হয় না আমার অপরাধের। অবশেষে শেষরাতে থানার ওসি আসলো। আমি ভাবলাম পা ধরে মাফ চাইলে তিনি হয়তো আমাকে মাফ করে দিবেন। আমি আমার দোকান বিক্রি করে সব টাকাও দিতে চাইলাম। 

কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ওসি একটা স্ত্রু ড্রাইভার নিয়ে এলেন। নিজ হাতেই গেলে দিলেন আমার ডান চোখ। ভীষণ যন্ত্রনায় চিৎকার করলাম। গগনবিদারী সেই চিৎকারে থানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রহিমা আর মেয়ে শরিফা ছুটে এলো। একনজর তাদের দেখলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। তিনি আমাকে অন্ধ হয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে রহিমা আর শরিফার চেহারা দেখালেন। এই দু’টি চেহারাই আমার দুনিয়াতে সবচেয়ে প্রিয়। বাবা-মাকে কবে হারিয়েছি মনে নেই। বড় হয়েছি এতিমখানায়। আমার স্বজন বলতে এই রহিমা আর শরীফাই।

ডান চোখের ভয়ংকর যন্ত্রনা সামলাতে না সামলাতেই ওসির সেই ভয়ানক স্ক্রু ড্রাইভার এবার আক্রমণ করলো আমার বাম চোখ। দপ করে আমার আলো নিভে গেল। সেদিন থেকে অন্ধকার। ভীষণ অন্ধকার। আজ বাংলাদেশে শুধু আমি অন্ধ নই, স্বৈরাচারের দেশে গোটা দেশই যে আজ অন্ধ।