১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

অবশ্যই বিশ্ব ৫ এর চাইতে বড়



একই সঙ্গে এত সঙ্কটময় পরিস্থিতি বিশ্ব এর আগে দেখেনি এবং এর বিপরীতে জাতিসংঘের এতটা অক্ষমতাও আগে কখনো দেখা যায়নি। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যা, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের হামলা, ইরাক, সিরিয়া, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান, লিবিয়া, কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ইউক্রেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সহিসংতা বা সংঘর্ষ এড়াতে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বরাবরই ব্যর্থ হচ্ছে জাতিসংঘ। কেন এমন হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো। 

শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অভাব আছে, তেমনটি হয়তো সরাসরি বলা যাবে না। জাতিসংঘের এমন ব্যর্থতার মূল কারণ এর নিরাপত্তা কাউন্সিলের দেশগুলোর মধ্যে অসহযোগিতামূলক আচরণ। জাতিসংঘ হচ্ছে কতগুলো অংশ বিশেষের সমষ্টি। কিন্তু এই অংশগুলো যখন একে অন্যের বিরুদ্ধে কাজ করে, তখন অচলাবস্থা ও অকার্যকর অবস্থা অবশ্যম্ভাবী। 

“জাতিসংঘ” সংগঠনটির দায়মুক্তির মানসিকতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ ত্রুটি বাইরে ফাঁসকারীকে হতে হয় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি। সাবেক আমেরিকান কূটনৈতিক জেমস ওয়াসারসট্রম কসোভোর এক সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনলে তাকে গ্রেপ্তার করে জাতিসংঘ পুলিশ। তাকে চাকরিচ্যুতও করা হয়। এছাড়া তার অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালানো হয়। ওয়াসারসট্রম এক সাক্ষাৎকারে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'জাতিসংঘের উচিত ছিল মানবাধিকার, আইনের শাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ধরে রাখা। কিন্তু নিজেদের ভেতরেই তারা এগুলো মানে না।'

জাতিসংঘ এমনই একটি সংগঠন, যা সব সময় ত্রুটিযুক্ত থেকেই যাবে। তারা একই সঙ্গে ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রকে এর শক্তি এবং দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। বড় কোনো ইস্যুতে জাতিসংঘে প্রয়োজন হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার। এছাড়া আছে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোদানকারী ক্ষমতার অপপ্রয়োগও। সমালোচনা আছে সংস্থাটির নেতৃত্বের প্রশ্নেও। ৭২ বছর বয়সী জাতিসংঘের বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু সংগঠনটির প্রয়োজনীয় চৌকস নেতৃত্ব কিংবা সংস্কারের বিষয়টিতে কারো নজর নেই। 

জাতিসংঘের ব্যর্থতার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বিশ্বপরাশক্তিরা। সামরিক বা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোর হাতেই আছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব। আর বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সবকিছুতেই মেরুকরণের প্রবণতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ জটিল করে তুলছে। বিভিন্ন দেশে বিশৃঙ্খলায় বিশ্বশক্তিরা সংঘর্ষে লিপ্ত দুই বা ততোধিক গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে বা গোপনে অস্ত্র বা অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছে। নিরাপত্তা পরিষদের ৫ পরাশক্তি ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হওয়ায় জাতিসংঘ এক্ষেত্রে অথর্ব। তাই ফিলিস্তিনের ওপর ইসরাইলের বর্বর হামলায় বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব উত্থাপনে আমেরিকা যখন বাদ সাধে, জাতিসংঘের তখন নির্বাক না থেকে আর উপায় নেই। আবার রোহিঙ্গাদের উপরে মিয়ানমার গণহত্যা চালালে জাতিসংঘের নিন্দা বিবৃতিও আটকে যায় চীনের ভেটোর কারণে। 

মূলত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ী দেশগুলোর সমন্বয়ে। সেক্ষেত্রে তারা নিজেদের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে বিশ্ব তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সারাবিশ্বে বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় লাগিয়ে দিয়ে সেই ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত পরাশক্তিরা। শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৫ রাষ্ট্রকেই দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ লাগিয়ে রাখতে। 

জাতিসংঘের জন্মের পর থেকেই দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত-সংঘর্ষ দেখা দিতে থাকে। জাতিসংঘের ব্যর্থতার প্রথম উদাহরণ হচ্ছে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে প্যালেস্টাইন ভূমিতে ইসরাইল নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল জাতিসংঘেরই একটি প্রস্তাবে। সেই রাষ্ট্রটিকে দ্রুত স্বীকৃতিও দিল জাতিসংঘ। ইসরাইল এখন জাতিসংঘের একটি সদস্যরাষ্ট্র। কিন্তু সদস্যরাষ্ট্র নয় প্যালেস্টাইন!! মধ্যপ্রাচ্যে এ সংকটটি সৃষ্টির পেছনে জাতিসংঘেরও একটি প্রবল ভূমিকা রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানকে সঙ্গে নিয়ে প্যালেস্টাইনকে ভাগ করল, ইসরাইলকে বানাল, আর আমেরিকানরা তখন থেকেই এ ইসরাইলের গডফাদার হিসেবে দুনিয়ার জনমতকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করেও চলেছে।

তারপর কোরীয় যুদ্ধ, কিউবার বিরুদ্ধে আমেরিকার হুমকি-হামলা, ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ, আরব-ইসরাইল যুদ্ধ এবং সর্ব সাম্প্রতিক আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে সংঘাত-সংঘর্ষ, আরাকানে গণহত্যা। জাতিসংঘ এসব দেশে শান্তি স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি, পারছেও না। 

১৯৯৪-এ রুয়ান্ডাতে ১০০ দিনে ১০ লাখ টুটসিকে হত্যা করল হুটিরা, জাতিসংঘ তা থামাতে পারল না। জাতিসংঘের এ ব্যর্থতাটিকে কেউ কেউ সংস্থাটির কলংক হিসেবে দেখে থাকেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অগ্রগতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও কেমন বাড়ছে, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনে তা স্পষ্ট। প্যালেস্টাইনিদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। যেমনিভাবে সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়া হয়েছিল নেলসন ম্যন্ডেলাকে।

জাতিসংঘে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন যে, বিশ্বে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব শেষ হবে। তিনি আরও যোগ করেন যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ প্রবণতা এবং অভিবাসন সংকট শেষ হওয়ার জন্য জাতিসংঘের ভূমিকা প্রয়োজন।ইউএন মহাসচিব বান কি মুন জোর দিয়ে বলেছিলেন যে বিশ্বব্যাপী চলমান নিরাপত্তা সমস্যা এবং চরমপন্থী সহিংসতা শেষ হতে চলেছে। কিন্তু মোটেই তা হচ্ছে না। হেইট ক্রাইম, জাতিগত বিদ্বেষ, সংখ্যালঘুদের নির্মূলকরণ ইত্যাদি বেড়েই চলেছে। 

তার্কি প্রেসিডেন্ট রিসেফ তায়িপ এরদোয়ান এসব টোটাল বিষয়কে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, “জাতিসংঘের কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে, এটি কোন কাজের না। বিশ্বের পাঁচটি দেশের তুলনায় বিশ্ব অনেক বড়”।

পাঁচটি রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠানের নাম ইউনাইটেড নেশন হতে পারেনা। ইউনাইটেড নেশন স্বার্থ রক্ষা করবে সমগ্র পৃথিবীর। আমাদের আবার নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। পাঁচটি রাষ্ট্রের কাছে সারাবিশ্ব জিম্মি থাকতে পারে না। বিশ্ব অবশ্যই পাঁচটি রাষ্ট্রের চাইতে বড়। আমাদের ৭২ বছরের ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের বিকল্প চিন্তা করার সময় এসে গেছে।

#WorldIsBiggerThan5

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন