৩১ জুলাই, ২০১৯

আগা খান পুরস্কার পাওয়া একমাত্র মসজিদের গল্প



ভিডিওটা দেখে আমি অবাকই হয়েছি। সেটা যতটা না মসজিদের স্থাপত্যনকশা দেখে তার চাইতে বেশি এর স্থপতিকে দেখে। বলছি ঢাকার দক্ষিণখানের একটি মসজিদের কথা। নাম বাইতুর রউফ। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম। অবাক হওয়ার কারণ দু'টি। প্রথমত বাংলাদেশে মসজিদ পরিচালনায় মহিলাদের দেখা যায় না। মহিলা আর্কিটেক্ট তো আরো দূরের কথা। দ্বিতীয়ত মেরিনা তাবাসসুমের চাল-চলন পুরোটাই ওয়েস্টার্ন। ইসলামিক তো দূরের ব্যাপার, সাধারণ বাঙালি মহিলার মতোও না। অথচ তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত হলো অসাধারণ এক মসজিদ।

হপ্তাখানেক আগে একদিন সকালে একটি নোটিফিকেশনের সূত্র ধরে বাইতুর রউফ মসজিদের ভিডিওটি আমার সামনে আসে। গত বছর মসজিদ ভ্রমণের একটি পরিকল্পনা মাথায় আসে। চেষ্টা করতাম শুক্রবার অফিস বন্ধের সুযোগটা কাজে লাগাতে। কিন্তু এই বছর শুক্রবারগুলোতেই যেনো বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। সঙ্গী সাথীরা তাড়া দেয়, কিন্তু সময় সুযোগ হয়ে উঠে না। শুধু আমিই যে ব্যস্ত তা নয় যাদের সাথে যাবো তারাওতো কম ব্যস্ত নয়।

মসজিদের প্রোমো ভিডিও দেখার পর চিন্তা করলাম শুক্রবারের জন্য বসে থাকা উচিত হবে না। বরং সেদিনই বিকেলে রওনা হয়ে যাবো। চিন্তা অনুসারে সঙ্গী সাথীদের মেসেজ পাঠানো শুরু করি। মাত্র একজনকে পাওয়া গেলো। লাঞ্চের পর অফিসকে নিজ দায়িত্বে ছুটি দিয়ে রওনা হয়ে গেলাম বাইতুর রউফ মসজিদের উদ্দেশ্যে। অবশ্য এর আগে সারাদিনের কাজ গুছিয়ে নিয়েছিলাম।



মসজিদ বলতেই আমরা বুঝি আর্চ, গম্বুজ, মিনার ইত্যাদি। এগুলো ছাড়া অসাধারণ মসজিদ হতে পারে আমার ধারণা ছিলো না। সুলতানি আমলের স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা আর সঙ্গে মেরিনার নিজস্ব স্বকীয়তা এ দুয়ে মিলে তৈরি মসজিদটি। ৭৫৪ বর্গমিটারের ‘বাইতুর রউফ’ মসজিদটির বিশেষত্ব হলো পরিচিত আর্চ, ডোম বা মিনার নেই। কেননা ইট এখানে প্রধান কাঠামো ধারক নয়, কাঠামোটি চতুর্দিকে আটটি কলামের ওপর বসানো।

সূর্যের আলো ছাড়াও পর্যাপ্ত দিবালোক নিশ্চিত করতে ৪টি আলোক স্থল (light courts) আছে। ৮টি পেরিফেরাল কলামের উপর ভর করে মসজিদটি দাঁড়িয়ে। ছাদ থেকে এলোপাতাড়ি ও বৃত্তাকার দিনের আলো প্রবেশ পথ মেঝেতে অসাধারণ ও নান্দনিক প্যাটার্ন তৈরি করে।

মসজিদের প্ল্যানটিতে একটি স্কোয়ারের ভেতর একটি সার্কেল, তার ভেতর আরেকটি ৫০ ফুট X ৫০ ফুটের স্কোয়ার। আবার এ কক্ষটির চতুর্দিকে উপর থেকে আনা হয়েছে সূর্যের আলো। অনেকটা দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের অবস্থান পরিবর্তের সঙ্গে আলোর তীব্রতা আর বিচ্ছুরণ যেন খেলা করে ইটের বৃত্তাকার প্রকোষ্ঠে।



মসজিদের বাইরের দেয়ালে ব্যবহার করেছেন ইটের জালি, যেন বাতাস ভেতরে ঢুকতে পারে। প্রার্থনা কক্ষটির ফ্লোরে ব্যবহার করেছেন পাথরের গুঁড়ার মোজাইক, কাচের বিভাজন রেখার সমন্বয়ে। স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এ মসজিদে যেমন ঝকঝকে রোদের দেখা মেলে, তেমনি ঝম ঝম বৃষ্টি এখানে দারুণ বর্ষার আবহ তৈরি হয়। বিশেষ বাতাস চলাচল ব্যবস্থা এখানকার তাপমাত্রা রাখে নিয়ন্ত্রিত। প্রাকৃতিক আলোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকায় দিনে বৈদ্যুতিক আলোর প্রয়োজন হয় না। বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার জন্য রয়েছে সুন্দর ড্রেনেজ সিস্টেম।

শুধু কি দিনের আলো! নক্ষত্র সমৃদ্ধ চাঁদের আলো থেকেও বঞ্চিত হননা এখানকার মুসল্লিরা। এই মসজিদ শুধুই স্থাপনা নয়। প্রকৃতিক পরিবেশ ও আধুনিক স্থাপত্যকলা মিলে এক অসাধারণ আবহ। এমন পরিবেশে মহান প্রভুর ইবাদত সত্যিই মনকে প্রশান্ত করে। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ইট আর কংক্রিটের ভবনে প্রাণের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।



বাইতুর রউফ মসজিদের গল্পটা কীভাবে শুরু হয়েছে এই নিয়ে কথা আমরা সরাসরি স্থপতি মেরিনা থেকেই শুনি। ২০১৮ সালে ৫ নভেম্বর প্রথম আলোতে তিনি বলেন,

"বাইতুর রউফ মসজিদের গল্পের শুরু ২০০৫ সালে। আমার নানি তখন খুবই অসুস্থ। একদিন আমাকে চায়ের দাওয়াত দিলেন। দুই মেয়েকে পরপর হারিয়ে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। ২০০২ সালে মা মারা যান, পরের বছর এক খালা। আর নানা মারা গেছেন ১৯৭১ সালে। সাত মেয়ে, তিন ছেলেকে প্রায় একা হাতেই মানুষ করেছেন নানি।

তুরাগ নদের ধারে নানার কিছু জমি ছিল। নানি বললেন, এলাকায় ভালো কোনো মসজিদ নেই। তিনি জমি দিতে চান। আমি যেন মসজিদের নকশা করি।
সবাই মিলে জমি নির্বাচন করা হলো। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে আমরা মিলাদ পড়িয়ে ১০ কাঠা জমির ওপর মসজিদের কাজ শুরু করি। সে বছরই নানি মারা গেলেন; ডিসেম্বরে।

জরিপ, নকশা তৈরি, অর্থ জোগাড়ের কাজ চলতে থাকল। সুলতানি আমলের নকশা বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তার ওপর ভিত্তি করে নকশা হলো। ২০০৮ সালে শুরু হলো মসজিদ নির্মাণের মূল কাজ। সবাই জানত আমার নানি মসজিদের জমি দিয়েছেন। তাই কখনো কোনো অসুবিধার মুখোমুখি হইনি। ইমাম সাহেব, স্থানীয় লোকজন—সবাই খুব সাহায্য করেছেন।"

‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার-২০১৬’ লাভ করে মসজিদটি। ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার’ যে কোন স্থপতির জন্য স্বপ্ন। পুরষ্কারের মূল্যমান এ অ্যাওয়ার্ডের গুরুত্ব সম্পর্কে কিঞ্চিত ধারণা দেয় (আগা খান অ্যাওয়ার্ডের মূল্যমান $১০০০,০০০ এবং নোবেল প্রাইজের মূল্যমান $১৫০০,০০০)।



আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (একেডিএন) প্রতি তিন বছর পরপর ‘আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার’ পুরষ্কার দেওয়া হয়। পুরস্কারটিতে স্থাপত্যে শ্রেষ্ঠত্ব, পরিকল্পনা এবং ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি স্থাপত্যের মাধ্যমে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়।

২০১৬ সালের আগ পর্যন্ত তিনটি স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবন, গ্রামীণ ব্যাংক হাউজিং প্রকল্প ও রুদ্রপুর মেটিস্কুল ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার’ লাভ করে, যেখানে তিনজনই ছিলেন বিদেশী স্থপতি। বাংলাদেশের প্রথম দুজন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ও কাশেফ মাহবুব চৌধুরী স্থাপত্যে অনন্য সম্মান ‘আগা খান স্থাপত্য’ লাভ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৪৮টি প্রকল্পের মধ্য থেকে ১৯টি প্রকল্পকে চূড়ান্ত মনোনয়নের জন্য বাছাই করা হয়, যেখানে স্থাপত্যের স্বকীয়তায় স্থান করে নেয় স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের ঢাকার ‘বায়তুর রউফ মসজিদ’ এবং স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর গাইবান্ধার ‘ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার’।

আমরা যখন আসর নামাজ শেষ করলাম তখন মসজিদের একপাশে দেখলাম জিলাপির প্যাকেট। বুঝলাম মিলাদ হবে এবং শেষে তবারক হিসেবে জিলাপি দেয়া হবে। সঙ্গীকে বললাম আজকে কিন্তু তবারক খেয়েই যাবো। অতএব বিদআত বলে যাতে সে মিলাদ থেকে বেশি দূরে না থাকে। সে আমাকে ইশারা দিয়ে বুঝালো তার খুব একটা সমস্যা নেই। নামাজ শেষে বসে রইলাম। ইমাম সাহেব যার উদ্দেশ্যে দোয়া করা হবে তার সম্পর্কে বললেন। এরপর সূরা ফাতিহা ও সূরা ইখলাস তিনবার পড়ে মুনাজাত করলেন। বুঝলাম ইমাম সাহেব মিলাদ-কিয়ামের লোক নন।

স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম

যাই হোক আমি তবারক খুবই উচ্ছসিত হলাম। আসলেই ভালো ছিলো জিলাপিটি। মসজিদের বারান্দায় বসে ঠাণ্ডা বাতাসে জিলাপি খাচ্ছিলাম। এমন সময়ে একটি ছোট বাবু তার মায়ের হাত ধরে কোথাও যাচ্ছিল। আমি ভেংচি কাটলাম, সেও প্রতিউত্তর করলো। এভাবে চলছিলো। আমার সহযাত্রী আমাকে কড়াভাবে সতর্ক করলো। বললো, এটা অচেনা যায়গা। মানুষ ছেলেধরা বলে পিটুনি দিলে কিছু করার থাকবে না। সাথে সাথে অসুস্থ বাংলাদেশের কথা ভেবে চুপসে গেলাম।

কীভাবে যাবেন? 
এখনতো লোকেশন চিনা কোনো ব্যাপার না। বাইতুর রউফ বলে গুগোল ম্যাপে সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন। তারপরও সহজে লোকেশন বলে দিচ্ছি। উত্তরা আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে যাবেন। সেখানে গিয়ে কোনো রিকশাকে বললেই নিয়ে যাবে ফয়দাবাদ লাল মসজিদ। স্থানীয়রা একে লাল মসজিদ বলে জানে। আব্দুল্লাহপুর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে মসজিদটি।

মসজিদ থেকে বের হয়ে চাপের বাপ নামে একটি কাবাব হাউজে উদরপূর্তি করে বাসার দিকে রওনা হলাম।

১২ জুলাই, ২০১৯

বঙ্গকথা পর্ব-১২ : অবহেলিত বাংলা যেভাবে 'শাহী বাংলা'-তে পরিণত হলো



শাহী বাংলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৩৫২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের হাত ধরে। এর মাধ্যমে বাংলা দিল্লি সালতানাত থেকে আলাদা হয়। সমগ্র বাংলা অঞ্চল, বিহার, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, নেপাল, আরাকানের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয় বাংলা সালতানাত। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ পুনরায় সেই হারিয়ে যাওয়া শব্দ বঙ্গকে তুলে এনেছেন। বঙ্গ থেকেই তিনি সালতানাতের নাম দেন বাঙ্গালাহ। বাংলা ভাষা ও বাংলার জাতিসত্তা বিকাশে তাই শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীন সুলতানী আমলে বাংলা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সম্পদশালী অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত ছিলো। সেসময় বিশ্বের মোট উৎপাদনের (জিডিপির) ১২ শতাংশ উৎপন্ন হত সুবাহ বাংলায়, যা সে সময় সমগ্র ইউরোপের চেয়ে জিডিপির চেয়ে বেশি ছিল। সারা পৃথিবীতে থেকে এখানে ব্যবসায়ীরা আসতেন বাণিজ্য করার জন্য।

ইলিয়াস শাহ ইরানের সিজিস্তানের এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের শুরুর দিকে তিনি দিল্লির মালিক ফিরোজের অধীনে সেনানায়ক ছিলেন। পরে সাতগাঁও-এর তুগলক শাসনকর্তা ইজ্জউদ্দীন ইয়াহিয়ার অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। নিজ যোগ্যতা বলে তিনি মালিক পদে উন্নীত হন। ইজ্জউদ্দীন ইয়াহিয়ার মৃত্যুর পর তিনি ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে সাতগাঁওয়ের শাসক হন। সেখানে তার কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করে তিনি লখনৌতির আলাউদ্দীন আলী শাহ-এর বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে তিনি সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ উপাধি নিয়ে ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতির সিংহাসনে আরোহণ করেন।

লখনৌতিতে তাঁর ক্ষমতা সুদৃঢ় করে ইলিয়াস শাহ রাজ্যবিস্তারে মনোনিবেশ করেন। তিনি ১৩৪৪ খ্রিস্টাব্দে সহজেই ত্রিহুত দখল করেন এবং ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে নেপালের তরাই অঞ্চলে এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। ইতঃপূর্বে কোনো মুসলিম বাহিনী এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে নি। তিনি রাজধানী কাঠমুন্ডু পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে স্বয়ম্ভুনাথ মন্দির অধিকার করেন। অতঃপর ইলিয়াস শাহ পূর্ব বাংলায় অভিযান পরিচালনা করেন এবং ইখতিয়ারউদ্দিন গাজী শাহকে পরাজিত করে ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁও অধিকার করেন। এরূপে তিনি সমগ্র বাংলার অধিপতি হন। শামস-ই-সিরাজ আফিফ তাকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’, ‘শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান’ ও ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ’ বিশেষণে ভূষিত করেন।

ইলিয়াস শাহ উড়িষ্যা আক্রমণ করেন এবং জয়পুর ও কটকের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে চিল্কা হ্রদ পর্যন্ত পৌঁছেন। অতঃপর ইলিয়াস শাহ ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে বিহার আক্রমণ করেন। বিহারের পরেও তিনি তাঁর কর্তৃত্ব চম্পারণ, গোরখপুর এবং বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।

ইলিয়াস শাহের সাথে দিল্লির সুসম্পর্ক তখনো হয়নি সুলতান ফিরুজ শাহ তুগলক ইলিয়াস শাহকে দমন করার জন্য বাংলা অভিমুখে অভিযান করেন। ইলিয়াস শাহ তাকে রুখে দেন। পরবর্তীতে ইলিয়াস শাহের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করে ফিরুজ শাহ তুগলক দিল্লি ফিরে যান। ইলিয়াস শাহ্ সফল সেনানায়ক ছিলেন। ফিরোজ শাহকে তিনি যেভাবে প্রতিহত করেন, তা থেকেই ইলিয়াস শাহর কুশলতার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৫৫৩ সালে ৯০ হাজার অশ্বারোহী এবং এক লাখ পদাতিক সেনা ও তীরন্দাজ নিয়ে ফিরোজ বাংলা অভিযানে আসেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ একডালা দুর্গে অবস্থান নেন।

দিল্লির দরবারের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারুণীর মতে, “পাণ্ডুয়ার পার্শ্বেই ‘একডালা’ নামে একটি দুর্গ আছে, যার একদিকে নদী, অন্যদিকে জঙ্গল।’’ ফিরোজ শাহ্ এই দুর্গ অবরোধ করলে প্রথম দিনই প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। এতে ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ্ দিল্লির বাহিনীর হাতে বন্দি হন। ২২ দিন অবরোধের পরও দুর্গ দিল্লির দখলে নিতে পারলো না দিল্লির বাহিনী। তখন ফিরোজ শাহ্ একটি কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি অবরোধ প্রত্যাহারের কথা বলে পিছু হটেন। এই দেখে ইলিয়াস শাহ দশ হাজার অশ্বারোহী, ২ লাখ পদাতিক সৈন্য এবং ৫০টি হাতী নিয়ে দিল্লির বাহিনীকে আক্রমণ করেন। ফিরোজ শাহ এটিই চেয়েছিলেন। তিনিও ঘুরে আক্রমণ প্রতিহত করেন। কিন্তু তার কৌশল কাজ করলেও শেষমেশ ফিরোজ জিততে পারেননি। পিছু হটে গিয়ে ইলিয়াস আবার দুর্গে প্রবেশ করেন।

ফিরোজ শাহ্ আবার দুর্গ অবরোধ করেন। অনেকদিন অবরোধের পর যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে না চিন্তা করে ফিরোজ শাহ তুঘলক সন্ধি প্রস্তাব করেন। তাছাড়া বর্ষা ঋতু চলে আসায় তার সৈন্যরাও পড়েছিলো বিপদে।

১. ইলিয়াস শাহ্ বাংলার স্বাধীন শাসনকর্তা থাকবেন।
২. দিল্লির দরবারে বার্ষিক কর ও উপঢৌকন পাঠাবেন।
৩. পাণ্ডুয়ায় বন্দি সকল সৈন্যকে ফিরোজ শাহ্ মুক্তি দেবেন।

এর ফলে ইলিয়াস শাহ স্বাধীন সুলতান হিসেবে বাংলা শাসন করতে আর কোনো বাধা থাকলো না। পরবর্তীতে বাংলা ও দিল্লির সুলতানদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উপহার ও দূত বিনিময়ের মাধ্যমে আরও দৃঢ় হয়। তাদের মধ্যে প্রায়ই দূত ও উপহার বিনিময় হয়েছিল। দিল্লির সুলতানের সঙ্গে আপোষ ইলিয়াস শাহকে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্যের ওপর তাঁর প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ করে দেয়।

শাসন কাজেও ইলিয়াস শাহ্ দক্ষ ছিলেন। লক্ষণাবতী, সাতগাঁও ও সোনারগাঁ তিনি একীভূত করেন। অভিজ্ঞ কূটনীতিকের মতো তিনি সময় ও সুযোগকে ব্যবহার করে সমগ্র বাংলাকে একীভূত করেছিলেন। এবং তিনি রাজধানী লক্ষণাবতী থেকে সরিয়ে পাণ্ডুয়ায় আনেন। তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয় জনগণের সাহায্য নেন। স্থানীয় জনগণকে উদারভাবে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তিনি তাঁর শাসনকে গণশাসনের রূপ দেন। ইলিয়াস শাহ্ বর্ণ, গোত্র ও ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্য লোকদের চাকরিতে নিয়োগ লাভের সুযোগ দেন। তিনিই প্রথম রাজকার্যে হিন্দুদের নিয়োগ দেন। ‘ইনশাহ-ই-মাহরু’ থেকে জানা যায় যে, খান, মালিক, উমারা, সদর, আকাবির ও মারিফগণ সামরিক ও বেসামরিক শাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এদের মধ্যে সম্ভবত খান, মালিক ও আমিরগণ ছিলেন জায়গির ভূমির অধিকারী ও রাজ্যের পদস্থ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তাদের কেউ কেউ হয়তো মন্ত্রী হিসেবে সুলতানের উপদেষ্টাও ছিলেন।

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ একজন ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সাধু, দরবেশ ও সুফি ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তার রাজত্বকালে সাদত, উলামা ও মাশায়েখদের মতো হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীরাও সরকার থেকে বৃত্তি পেতেন। তাঁর দরবেশ প্রীতির একটি গল্প প্রচলিত আছে। ফিরোজ শাহ্ যখন একডালা দুর্গ অবরোধ করে রেখেছিলেন, তখন রাজা বিয়াবানি নামে এক মস্ত দরবেশ মৃত্যুবরণ করেন। ইলিয়াস শাহ্ এ খবর শুনে ছদ্মবেশে দুর্গের বাইরে যান এবং দরবেশের দাফনে অংশ নেন। ফেরার সময় ইলিয়াস তাঁর শত্রু, ফিরোজ শাহ শিবিরে প্রবেশ করেন। ফিরোজ তাঁকে চিনতে পারেননি। বরং দরবেশ ভেবে আপ্যায়ন করেন। ইলিয়াস দুর্গে ফেরার পর ফিরোজ শাহ্ আসল ঘটনা জানতে পারেন। ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন সালিম তাঁর ‘রিয়াজ-উস-সালাতীন’ গ্রন্থে এ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।

ইলিয়াস শাহ স্থাপত্য শিল্পের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি হাজিপুর শহরের প্রতিষ্ঠা করেন। সুফি সাধক আলা-উল-হকের সম্মানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এ ছাড়া দিল্লির শামসী হাম্মামখানার অনুকরণে ফিরোজাবাদে একটি হাম্মামখানা নির্মাণ করেন।

অভিজ্ঞ কূটনীতিকের মতো ইলিয়াস শাহ সমগ্র বাংলাকে একত্রিকরণের সময় ও সুযোগ তাঁর অনুকূলে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন। তিনি সুশাসন প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন এবং তা প্রবর্তন করে বাংলার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার জন্য জনসমর্থন লাভে প্রয়াসী হন। স্থানীয় জনগণকে উদারভাবে সুযোগ সুবিধা দিয়ে তিনি তাঁর শাসনকে গণশাসনের রূপ দেন। তিনি বর্ণ, গোত্র ও ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্য লোকদের চাকরিতে নিয়োগ লাভের সুযোগ দেন।

তিনিই সর্বপ্রথম স্থানীয় লোকদেরকে অধিক সংখ্যায় সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগ করেন। ইনশাহ-ই-মাহরু থেকে জানা যায় যে, খান, মালিক, উমারা, সদর, আকাবির ও মারিফগণ সামরিক ও বেসামরিক শাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এদের মধ্যে খান, মালিক ও আমীরগণ ছিলেন জায়গির ভূমির অধিকারী ও রাজ্যের পদস্থ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তাদের কেউ কেউ হয়ত মন্ত্রী হিসেবে সুলতানের উপদেষ্টাও ছিলেন।

এভাবে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ বাংলার স্বাধীন সালতানাতকে সুদৃঢ় করেন। এ সালতানাত প্রায় দুশ বছর টিকে ছিল। ষোল বছর গৌরবোজ্জ্বল রাজত্বের পর ১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়।

বঙ্গকথা পর্ব-১১ : খিলজি, তুঘলকদের শাসন ও বাংলা সালতানাতের সূচনা



খিলজী রাজবংশ হল মধ্য যুগের মুসলিম রাজবংশ যারা ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের বিশাল অংশ শাসন করত। জালাল উদ্দিন ফিরোজ খিলজী এর প্রতিষ্ঠাতা। খিলজী শাসনামল অবিশ্বাস, হিংস্রতা এবং দক্ষিণ ভারতে তাদের শক্ত অভিযানের জন্য খ্যাত হলেও খিলজী শাসনামল মূলত ভারতে বর্বর মোঙ্গলদের বারংবার অভিযান রুখে দেওয়ার জন্য সুপরিচিত।

খিলজীরা ছিল দিল্লির মামলুক রাজবংশের সামন্ত এবং দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের সেনাপতি। বলবনের উত্তরাধিকারীদের ১২৮৯-১২৯০ সালে হত্যা করা হয় এবং এর পরপরই মামলুকদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে কোন্দল শুরু হয়ে যায়। এই কোন্দলের মধ্যে জালালউদ্দিন ফিরোজ খিলজীর নেতৃত্বে বিদ্রোহ সংগঠিত হয় এবং মামলুকদের বংশের শেষ উত্তরাধিকারী ১৭ বছর বয়সী মুইজ উদ দিন কায়কোবাদকে অপসারণ করে তিনি দিল্লির সালতানাতে অধিষ্ঠিত হন।

জালালউদ্দিন খিলজী একজন প্রজাদরদি এবং বিনয়ী সুলতান ছিলেন। তুর্কি অভিজাতদের বিরুদ্ধাচরণ সত্বেও তিনি ১২৯০ সালে দিল্লির মসনদে বসেন। জালাল উদ্দিনের এই আরোহণ সবাই মেনে নিতে পারেনি। তার ৬ বছরের শাসনে বলবনের ভাইপো মামলুকদের প্রতি অনুগত সামরিক অধিনায়কদের নিয়ে বিদ্রোহ করে। জালালউদ্দিন এই বিদ্রোহ রুখে দেন। তিনি তার ভাইপো জুনা খানকে সাথে নিয়ে মধ্য ভারতের সিন্ধ নদী তীরে মঙ্গোল বাহিনীকে সফলভাবে প্রতিহত করেন।

জালালউদ্দিন খিলজির মৃত্যুর পর আলাউদ্দিন খিলজী (জুনা খান) দিল্লির মসনদে বসেন। তিনি ছিলেন জালাল উদ্দিন খিলজীর ভাইপো এবং জামাতা। আলাউদ্দিন খিলজি হিন্দু রাজ্য মহারাষ্ট্রের রাজধানী দেবগীরি অধিকার করেন।

আলাউদ্দিন খিলজী ২০ প্রায় বিশ বছর এই উপমহাদেশ শাসন করেন। তিনি ভারতের গুজরাটের রাজা কর্ণদেব, রণ-থম্ভোরের রাজপুত নেতা হামির দেব, মেবারের রাজা রতন সিং ও মালবের অধিপতি মহ্লক দেবকে পরাজিত করেন। এরপর তিনি মালিক কাফুরের নেতৃত্বে দক্ষিণ ভারতে অভিযান প্রেরণ করেন । কাফুর দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র, বরঙ্গলের কাকতীয়রাজ প্রতাপ রুদ্র, দোরসমুদ্রের হোয়্সলরাজ তৃতীয় বল্লালকে পরাজিত করবার পর ভাতৃবিরোধের সুযোগ নিয়ে পান্ড্য রাজ্য অধিকার করেন। এরপর তিনি রামেশ্বর পর্যন্ত অগ্রসর হন।

আলাউদ্দিন খিলজি অবশ্য দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি সরাসরি সাম্রাজ্যভুক্ত না করে সেখানকার রাজাদের মৌখিক আনুগত্য ও করদানের প্রতিশ্রুতি নিয়েই করদ রাজ্যে (কর দিতে স্বীকৃত) পরিণত করেন। বিজেতা হিসাবে আলাউদ্দিন খিলজি ছিলেন দিল্লির সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আলাউদ্দিনের দৃঢ়ত ও তার অসম সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধকৌশলের কারনে তিনি ইতিহাস বিখ্যাত হয়ে আছেন। এছাড়াও তিনি দু'বার ভারতের দিকে ধেয়ে আসা মঙ্গোল বাহিনীকে সফলভাবে প্রতিহত করে।

আলাউদ্দিন খিলজি কয়েকটি কারণে বিখ্যাত 
১- কেন্দ্রীয় শাসন শক্তিশালীকরণ। যে কোনো নির্দেশ বা আইন অল্প সময়ের মধ্যে সারা রাজ্যে তিনি বাস্তবায়ন করতে পারতেন। 
২- বাজারদর নিয়ন্ত্রণ। তার শাসনামলে তিনি ব্যবসায়ীদের জনগণের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করতেন। মজুতদারি ও প্রতারণা বন্ধ করেছেন। ব্যবসায়ীরা যাতে মূল্যের বেশি টাকা দাবি না করে, তার জন্য তিনি কঠোর প্রসাশনিক ব্যবস্থা গ্রহন করেছিলেন । বিষয়টির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলে ‘শাহানা-ই-মান্ডি’ ও ‘দেওয়ান-ই-রিসালাত’ -এর উপর। 
৩- জমি জরিপ ও রাজস্ব সংস্কার। দিল্লী সুলতানদের মধ্যে তিনিই প্রথম জমি জরিপ করে রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার করেছিলেন। দেশে যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে সেদিকেও তিনি নজর দেন। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির বিধান দেওয়া হত । গুপ্তচরদের মাধ্যমে তিনি দেশের সমস্ত খবরাখবর রাখতেন। তিনি এক সুদৃঢ় ও কঠোর শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে দিল্লি সালতানাতকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। 
৪- বর্বর মঙ্গোলদের রুখে দিয়েছিলেন তিনি। তাদের শোচনীয়ভাবে প্রতিহত করেছিলেন।

১৩১৫ সালের ডিসেম্বরে আলাউদ্দিন খিলজীর মৃত্যু হয়। এর পরপরই সাম্রাজ্য জুড়ে বিশৃঙ্খলা,একে অপরের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান, গুপ্তহত্যা ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি মালিক কাফুর নিজেকে সুলতান দাবি করে বসে। কিন্তু আমীরদের সম্মতি থাকায় তিনি মসনদ ধরে রাখতে পারেন নি এবং কয়েক মাসের মধ্যে তাকেও হত্যা করা হয়।

পরবর্তী তিন বছরে একের পর এক অভ্যুত্থান মধ্য দিয়ে তিনজন সুলতান দিল্লির মসনদে বসেন। নানান গোলযোগের পর সেনাপ্রধান গাজী মালিক বিশাল বাহিনী নিয়ে দিল্লিতে অভ্যুত্থান ঘটান এবং দিল্লীর মসনদ নিজ দখলে নেন। এরপর তিনি নিজের নাম বদলে গিয়াস উদ্দিন তুঘলক নাম ধারণ করেন এবং তুঘলক রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন।


সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক প্রজাহিতৈষী ছিলেন। তিনি ভূমিকর হ্রাস করে উৎপন্ন ফসলের ১০ ভাগের ১ ভাগে নামিয়ে আনলেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় কৃষিকাজে সেচের জন্য খাল খনন করেন। সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলকের অমর কীর্তি হচ্ছে তাঁরই নির্মিত তুঘলকাবাদ। পুরো শহরটি গোলাপী রঙয়ের গ্রানাইট পাথর দ্বারা তৈরি করা হয়েছিলো। নিরাপত্তার জন্য শহরটি উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিলো। এই প্রাচীরগুলোকেও দেখলে অনেকটা দুর্গের মতো মনে হয়।

১৩২৩ সালে সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক তেলেঙ্গানার কাকতীয় রাজা প্রতাপ রুদ্রের বিরুদ্ধে একটি অভিযান চালান। কাকতীয় রাজ্যের রাজধানী ওয়ারঙ্গল দখল করে এর নাম রাখা হলো সুলতানপুর। পুত্র জুনাহ খানের নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যেও তিনি একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। সে সময় বাংলায় বিভিন্ন স্বাধীন সুলতানদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো। সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাকে দিল্লী সালতানাতের অধীনে নিয়ে আসতে চাইলেন। ১৩২৪ সালে তিনি বাংলায় অভিযান চালান এবং সফল হন।

১৩২৫ সালে গিয়াসউদ্দীন তুঘলকের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র উলুগ খাঁ জুনাহ খান দিল্লির রাজসিংহাসনে বসেন। ইতিহাসে তুঘলক বংশের এই শাসক মুহাম্মদ বিন তুঘলক নামেই বেশি প্রসিদ্ধ। ‘মুহাম্মদ বিন তুঘলক’ নামের মানে হচ্ছে তুঘলকের পুত্র মুহাম্মদ। ১৩২৫ সালে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সিংহাসনে আরোহণের পর হিন্দুস্তান যেন এক নতুন যুগে প্রবেশ করলো। তিনি শাসনব্যবস্থায় অনেকগুলো সংস্কার নিয়ে আসেন, তাম্রমুদ্রা প্রচলন করেন এবং রাজধানী স্থানান্তর করেন। মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ যুক্তি, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞানে একজন পন্ডিত ছিলেন এবং শারিরীক বিজ্ঞান এবং ঔষধবিজ্ঞানে তার ভাল ধারণা ছিল । এছাড়াও তুর্কিশ, আরবি, ফার্সি এবং উর্দু ভাষা তার আয়ত্তে ছিল। মুলতানে জন্মগ্রহনকারী তুগলক বংশের এই শাসক সম্ভবত মধ্যযুগের সবচেয়ে শিক্ষিত, যোগ্য ও দক্ষ সুলতান ছিলেন। একমাত্র বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার শাসনামলের সমালোচনা করেন। আল্লামা গোলাম মর্তুজার মতো অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষের কারণেই তিনি এমনটা লিখেছেন।

তার আমলেই বাংলা দিল্লি থেকে আলাদা হয়ে যায় শাহ-ই-বাঙ্গালাহ'র নেতৃত্বে। মুহাম্মদ বিন তুঘলক ১৩৫১ সাল পর্যন্ত দিল্লির সুলতান ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার চাচাতো ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলক দিল্লির ক্ষমতায় আসীন হন। এদিকে বাংলা, বিহার, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, নেপাল, আরাকানের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয় বাংলা সালতানাত। ১৩৪২ সালে সেনাপতি শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ নিজেকে লখনৌতির সুলতান ঘোষণা করেন। তিনি অন্যান্য স্বাধীন রাজ্যসমূহও জয় করার মাধ্যমে নিজের শাসন সংহত করেন এবং ১৩৫২ সালে নিজেকে স্বাধীন বাংলার সুলতান ঘোষণা করেন। এজন্য তাকে শাহ-ই-বাঙ্গালাহ বলা হয়ে থাকে। আগামী পর্বে বাংলার স্বর্ণযুগ নিয়ে আলোচনা থাকবে।

৫ জুলাই, ২০১৯

বঙ্গকথা পর্ব-১০ : বাংলায় দিল্লীর শাসন যেভাবে শুরু হয়



বাংলায় দিল্লীর শাসন প্রতিষ্ঠা হয় ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির হাত ধরেই। তিনি বিহার, বাংলা ও তদসংশ্লিষ্ট অঞ্চলে নির্যাতিত মানুষের আহবানে সাড়া দিয়ে জয় করে নেন। এরপর তিনি দিল্লির শাসক সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের সাথে দেখা করেন এবং নিজেকে সমর্পন করেন। কুতুবুদ্দিন খুশি হন এবং এই অঞ্চলের শাসনভার তার হাতে অর্পন করেন। এরপর প্রায় একটানা ১৩৬ বছর দিল্লীর অধীনে ছিল বাংলা।

বখতিয়ার খলজী একজন সুশাসক ছিলেন। তিনি তার রাজ্যকে কয়েকটি জেলায় বিভক্ত করেন এবং সেগুলির শাসনভার তার প্রধান অমাত্য ও সামরিক প্রধানদের ওপর ন্যস্ত করেন। তাদেরকে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা, রাজস্ব আদায় করা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং জনগণের পার্থিব ও নৈতিক উন্নতির দিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি লখনৌতিতে রাজধানী স্থাপনের পর খুৎবা পাঠ করেন এবং দিল্লীর সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের নামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন। তিনি দিনাজপুর ও রংপুরের নিকট দুটি ছাউনি শহর নির্মাণ করেন। তার সময়ে প্রচলিত প্রশাসনিক বিভাগকে ইকতা এবং এর শাসনকর্তাকে মুকতা বলা হতো। তিনি বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন।

কুতুবুদ্দিন আইবেক মধ্য এশিয়ার কোনো এক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন; তার পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন তুর্কি। শিশুকালেই তাকে দাস (গোলাম) হিসেবে বিক্রি করা হয়। তাকে ইরানের খোরাসান অঞ্চলের নিসাপুরের প্রধান কাজী সাহেব কিনে নেন। কাজী তাকে তার নিজের সন্তানের মত ভালবাসতেন এবং আইবেককে তিনি ভাল শিক্ষা দিয়েছিলেন, তিনি আইবেককে ফার্সি এবং আরবি ভাষায় দক্ষ করে তোলেন। তিনি আইবেককে তীর এবং অশ্বচালনায়ও প্রশিক্ষণ দেন। আইবেকের প্রভুর মৃত্যুর পরে প্রভুর ছেলে আইবেককে আবারও এক দাস বণিকের কাছে বিক্রি করে দেন। কুতুবুদ্দিনকে এবার কিনে নেন গজনির গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ ঘুরি।

মোহাম্মদ ঘুরির কোনো সন্তান না থাকায় তার প্রিয় সন্তানের মতো কুতুবুদ্দিন আইবেকই হন দিল্লির শাসনকর্তা। তিনিই প্রথম দিল্লীকে রাজধানীতে পরিণত করেন। তিনি মামলুক সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা। মামলুক সালতানাত ১২০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্য এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক মামলুকদের উত্তর ভারতে নিয়ে আসেন। দিল্লি সালতানাত শাসনকারী পাঁচটি রাজবংশের মধ্যে মামলুক রাজবংশ প্রথম। এর শাসনকাল ছিল ১২০৬ থেকে ১২৯০ সাল পর্যন্ত। ঘুরি রাজবংশের প্রতিনিধি শাসক হিসেবে কুতুবুদ্দিন আইবেক ১১৯২ থেকে ১২০৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। এসময় তিনি গাঙ্গেয় অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেন এবং নতুন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

কুতুবুদ্দিন আইবেক দিল্লির প্রাচীন মুসলিম স্মৃতিস্থাপনাগুলোর নির্মাণ তিনি শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে কুয়াত-উল-ইসলাম মসজিদ ও কুতুব মিনার। ১২১০ সালে তিনি পোলো খেলার সময় ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যান। লাহোরের আনারকলি বাজারের কাছে তাকে দাফন করা হয়। এরপর শাসক হন আরাম শাহ। আরাম শাহ কুতুবুদ্দিনের সাথে কী সম্পর্কিত এই নিয়ে দ্বিমত আছে ঐতিহসিকদের মধ্যে। কেউ বলেছেন ভাই, কেউ বলেছেন ছেলে। যাই হোক আরাম শাহের ক্ষমতায় বেশিদিন ছিলেন না। চিহালগনি নামে পরিচিত ৪০ জন অভিজাত ব্যক্তির একটি দল আরামশাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বাদাউনের গভর্নর শামসউদ্দিন ইলতুতমিশকে আমন্ত্রণ জানায়। ১২১১ সালে ইলতুতমিশ আরামশাহকে দিল্লির নিকটে জুদের সমতল ভূমিতে পরাজিত করেন।

ইলতুতমিশ দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি মুলতানের নাসিরউদ্দিন কাবাচা ও গজনির তাজউদ্দিন ইলদুজকে পরাজিত করে। এই দুজন দিল্লির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তার শাসনামলে মঙ্গোলরা জালালউদ্দিন খোয়ারিজম শাহর খোঁজে ভারত আক্রমণ করে। ইলতুতমিশ শত হাতে মঙ্গোলদের প্রতিহত করেন। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর ইলতুতমিশ হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে উত্তর ভারতে তার নিয়ন্ত্রণ মজবুত করেন। ১২৩০ সালে তিনি মেহরাউলিতে হাউজ-ই-শামসি নামক জলাধার নির্মাণ করেন। ১২৩১ সালে তিনি দিল্লিতে প্রথম মুসলিম সমাধি 'সুলতান গারি' নির্মাণ করেন।

ইলতুতমিশ কণ্যা রাজিয়া সুলতানা ছিলেন ভারতের প্রথম মুসলিম নারী শাসক। তিনি অভিজাত ব্যক্তিদের সাথে সমঝোতায় আসতে সক্ষম হন এবং সালতানাত পরিচালনায় সফল ছিলেন।আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জামালউদ্দিন ইয়াকুতের সাথে তার সহযোগিতার কারণে মধ্য এশিয়ার তুর্কীয় বংশোদ্ভূত অভিজাতরা তার বিরূপ হয়ে পড়ে। এছাড়া নারী সম্রাজ্ঞীর শাসনকে তারা নেতিবাচক হিসেবে দেখতেন। ক্ষমতাশালী অভিজাত মালিক আলতুনিয়া তাকে পরাজিত করেছিলেন। রাজিয়া সুলতানা তাকে বিয়ে করতে সম্মত হয়েছিলেন। রাজিয়ার ভাই মুইজউদ্দিন বাহরাম চিহালগনিদের সহায়তায় সিংহাসন দখল করেন এবং রাজিয়া ও তার স্বামীর সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। পরাজিত হয়ে তারা কাইথাল পালিয়ে যান। তাদের সাথে থাকা অবশিষ্ট সৈনিকরা এরপর তাদের ত্যাগ করে। তারা দুজনেই জাটদের হাতে ধৃত হন। ১২৪০ সালের ১৪ অক্টোবর তাদের হত্যা করা হয়। এরপর কয়েক বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়।

১২৪৬ সালে ইলতুতমিশের আরেক ছেলে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ক্ষমতা দখল করেন। নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ধার্মিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অধিকাংশ সময় তিনি নামাজ এবং দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা করতেন। তার অধীনস্থ গিয়াসউদ্দিন বলবন রাষ্ট্রীয় বিষয় দেখাশোনা করতেন। তিনি ও গিয়াসউদ্দিন বলবন দিল্লি সালতানাতে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। প্রায় ২০ বছর শাসক থাকার পর নাসিরউদ্দিন মাহমুদের মৃত্যু হয়। তারপর ১২৬৬ সালে গিয়াসউদ্দিন বলবন শাসক হন। তিনি ১২৮৭ পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন।

গিয়াসউদ্দিন বলবন কঠোর হস্তে শাসন পরিচালনা করেন। তিনি চিহালগনিদের প্রভাব খর্ব করেন। ভারতে তিনি শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইচ্ছুক ছিলেন। বিশৃঙ্খল অঞ্চলগুলোতে তিনি অনেক চৌকি নির্মাণ ও সেনা মোতায়েন করেন। আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য তিনি সফল গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এরপর আর উল্লেখযোগ্য মামলুক সুলতান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেন নি। এরপর শুরু হয় দিল্লীর ২য় সালতানাত খিলজি রাজবংশ।

বঙ্গকথা পর্ব-০৯ : বাংলায় মুসলিম শাসনের সুত্রপাত হয়েছিলো যেভাবে



অনেকেই মনে করেন ইখতিয়ার উদ্দিন মাধ্যমেই এদেশে ইসলাম এসেছে। কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আমরা গত পর্বে বলেছিলাম বখতিয়ারের বিজয়ের আগেই এদেশে ইসলাম প্রচারক আলেম, দরবেশ ও মুজাহিদগণ জনগণকে সাথে নিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন-রাজত্বের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম পরিচালনা করেন।

ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বর্ণবৈষম্য ও শ্রেণিবৈষম্যে নির্যাতিত মানুষের পাশে ইসলামের দায়ীরা দাড়িয়েছিলো। তার মধ্যে দিয়ে ইসলামের প্রতি জনগণের সমর্থন গড়ে ওঠে। জনসমর্থনের সে দৃঢ় ভিত্তির ওপর ১২০৩ সালের মার্চ মাসে সম্পন্ন হয় ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর ঐতিহাসিক বিজয়। তিব্বতীয় বৌদ্ধ-ভিক্ষু লামা তারানাথ তাঁর ষোল শতকের বিবরণীতে জানান, বৌদ্ধরা মুসলমানদের বিজয়কে অভিনন্দিত করেছিল এবং ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীকে বিজয়ে সাহায্য করেছিল। শ্রীচারু বন্দোপাধ্যায় ও প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বৌদ্ধরা মুসলমান বিজেতার সাহায্যে হিন্দুদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নিয়ে কিছুটা শান্তি লাভ করেছিল। (জাতিসত্তার বিকাশধারা)

এদেশের মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বখতিয়ার খিলজি। ইদানিংকালে কিছু সাহিত্যিক ও বাহ্মণ্যবাদীরা বলতে চান বখতিয়ার কোনটা দুর্গ আর কোনটা বিশ্ববিদ্যালয় তা বুঝতেন না। তিনি দুর্গ মনে করে বৌদ্ধদের বিশ্ববিদ্যালয় বা বিহারগুলো ধ্বংস করেছিলো। অথচ বৌদ্ধ ঐতিহাসিকরাই জানিয়েছেন বৌদ্ধরা মুসলিমদের স্বাগত জানিয়েছে এদেশে। খিলজিকে বৌদ্ধরা সমগ্র বিহার ও বাংলা অঞ্চল দখল করতে সাহায্য করেছিলো। সুতরাং নালন্দা বিহারসহ অন্যান্য বিহার ধ্বংসের যে অভিযোগ খিলজির উপর আরোপ করা হয়েছে তা পুরোটাই অসত্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। মূলত সেন আমলে আর্য ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধদের উপর যে অত্যাচার চালিয়েছিলো তার দায় তারা মুসলিমদের উপর চাপাতে চেয়েছে।

ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজি ছিলেন জাতিতে তুর্কি আর পেশায় ভাগ্যান্বেষী সৈনিক। জীবনের প্রথম ভাগে তিনি ছিলেন আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক দশত-ই-মার্গের অধিবাসী। তিনি গজনির সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরির সৈন্যবাহিনীতে চাকুরিপ্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। আকারে খাটো, লম্বা হাত এবং অসুন্দর চেহারার অধিকারী হওয়ায় সেনাধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হন। গজনীতে ব্যর্থ হয়ে তিনি দিল্লিতে কুতুবউদ্দীন আইবেকের দরবারে হাজির হন। এখানেও তিনি চাকরি পেতে ব্যর্থ হন। অতঃপর তিনি বদাউনে যান। সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবর-উদ্দিন বখতিয়ার খলজিকে নগদ বেতনে সেনাবাহিনীতে চাকরি প্রদান করেন। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে অযোদ্ধায় যান। অযোদ্ধার শাসনকর্তা হুসামউদ্দিন তাকে বর্তমান মির্জাপুর জেলার পূর্ব দক্ষিণ কোণে ভগবৎ ও ভিউলি নামক দুইটি পরগনার জায়গির প্রদান করেন। ( বাংলাদেশের ইতিহাস- ড. মুহাম্মদ আব্দুর রহিম। পৃষ্ঠাঃ ১৪৯)

মুসলিমদের দুর্দশা ও ব্রাহ্মনদের অত্যাচারের প্রেক্ষিতে ১২০১ সালে বখতিয়ার মাত্র দু হাজার সৈন্য সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজ্যগুলো আক্রমণ করতে থাকেন। সেই সময়ে তার বীরত্বের কথা চারিদিক ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং অনেক মুসলিম সৈনিক তার বাহিনীতে যোগদান করতে থাকে, এতে করে তার সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি তার সেনাবাহিনী নিয়ে বিহার অধিকার করেন।

বিহার জয়ের পর বখতিয়ার খলজি কুতুব-উদ্দিন আইবকের সাথে দেখা করতে যান এবং কুতুবউদ্দিন কর্তৃক সম্মানিত হয়ে ফিরে আসেন। এর পরই তিনি বাংলা জয়ের জন্য সাহস এবং শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন। তৎকালীন বাংলার রাজা লক্ষণ সেন বাংলার রাজধানী নদিয়ায় অবস্থান করছিলেন কারণ নদিয়া ছিল সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল। বলা হয়ে থাকে যে নদিয়ায় আসার কিছু আগে রাজসভার কিছু দৈবজ্ঞ পণ্ডিত তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে এক তুর্কি সৈনিক তাকে পরাজিত করতে পারে। এতে করে লক্ষণ সেনের মনে ভীতির সঞ্চার হয় এবং নদিয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড়ের নিরাপত্তা জোরদার করেন। লক্ষণ সেনের ধারণা ছিল যে ঝাড়খণ্ডের শ্বাপদশংকুল অরণ্য দিয়ে কোনো সৈন্যবাহিনীর পক্ষে নদিয়া আক্রমণ করা সম্ভব নয় কিন্তু বখতিয়ার সেইপথেই তার সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে আসেন। নদিয়া অভিযানকালে বখতিয়ার ঝাড়খণ্ডের মধ্য দিয়ে এত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে তার সাথে মাত্র ১৮ জন সৈনিকই তাল মেলাতে পেরেছিলেন।

বখতিয়ার সোজা রাজা লক্ষণ সেনের প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হন এবং দ্বাররক্ষী ও প্রহরীদের হত্যা করে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করেন। এতে প্রাসাদের ভিতরে হইচই পড়ে যায় এবং লক্ষণ সেন দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে নৌপথে বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন। নদিয়া জয় করে পরবর্তীতে লক্ষণাবতীর (গৌড়) দিকে অগ্রসহ হন এবং সেখানেই রাজধানী স্থাপন করেন। এই লক্ষণাবতীই পরবর্তীকালে লখনৌতি নামে পরিচিত হয়। গৌড় জয়ের পর আরও পূর্বদিকে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলায় নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এলাকাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে একজন করে সেনাপতিকে শাসণভার অর্পণ করেন। বখতিয়ারের সেনাধ্যক্ষদের মধ্যে দুজনের নাম পাওয়া যায়। এদের মধ্যে আলি মর্দান খলজি বরসৌলে, হুসামউদ্দিন ইওজ খলজি গঙ্গতরীর শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। লাখনৌতিকে কেন্দ্র করে বাংলার নব প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজ্যের সীমানা ছিল উত্তরে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পুর্নিয়া শহর, দেবকোট থেকে রংপুর শহর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে তিস্তা ও কারতোয়া, দক্ষিণে গঙ্গার মূলধারা (পদ্মা) এবং পশ্চিমে কুশী নদীর নিম্নাঞ্চল থেকে গঙ্গার কিনারায় রাজমহল পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তী একশ’ বছরের মধ্যে বাংলার প্রায় সমগ্র এলাকা মুসলিম শাসনাধীনে আসে।

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসন শুরু হয়। এই আমলই ছিলো বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সময়। শিক্ষা, সভ্যতায় ও সম্পদে বাংলা হয়ে উঠেছিলো পৃথিবী বিখ্যাত স্থান। সারা পৃথিবীতে থেকে পর্যটক ও অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিরা বাংলায় আসতেন বাংলার রূপ, রস, সৌন্দর্য ও গন্ধ উপভোগ করতে। ভারতে মুসলিম বিজয় সম্পর্কে গোপাল হালদার মন্তব্য করেন, “ইসলামের বলিষ্ঠ ও সরল একেশ্বরবাদ এবং জাতিভেদহীন সাম্যদৃষ্টির কাছে ভারতীয় জীবনধারা ও সংস্কৃতির………. এ পরাজয় রাষ্ট্র-শক্তির কাছে নয়, ইসলামের উদার নীতি ও আত্ম-সচেতনতার কাছে। ………. কারণ ইসলাম কোন জাতির ধর্ম নয়, প্রচারশীল ধর্ম। ইহা অন্যকে জয় করেই ক্ষান্ত হয় না, কোলে তুলে নেয়”। (সংস্কৃতির রূপান্তর, পৃষ্ঠা ১৯৬)

ভারতে বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির ব্যর্থতা ও ইসলামী সংস্কৃতির বিজয়ের কারণ চিহ্নিত করে কমরেড এম. এন. রায় ‘ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান’ নামক গ্রন্হে লিখেছেন, “ভারতে বৌদ্ধ বিপ্লবের পরাজয় ঘটেনি বরং তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার জন্যই তা ব্যর্থ হয়েছে। সেই বিপ্লবকে জয়ের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমাজ-শক্তি তেমনভাবে দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। তার ফল হলো এই য, বৌদ্ধ মতবাদের পতনের সঙ্গে-সঙ্গেই সমগ্র দেশ অর্থনৈতিক দুর্গতি, রাজনৈতিক অত্যাচার, বিচার-বুদ্ধির স্বেচ্ছাচারিতা আর আধ্যাত্মিক স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে ডুবে গেল। বাস্তবিকপক্ষে সমগ্র সমাজ তখন ধ্বংস ও বিলুপ্তির ভয়াবহ কবলে পড়ে গেছে। এজন্য নিপীড়ত জনগণ ইসলামের পতাকার নীচে এসে ভীড় করে দাঁড়াল……….। ইসলামের সমাজ ব্যবস্থা ভারতীয় জনগণের সমর্থন লাভ করল। তার কারণ তার পিছনে জীবনের প্রতি সে দৃষ্টিবঙ্গি ছিল, হিন্দু দর্শনের চাইতে তা ছিল শ্রেয়; কেননা হিন্দু দর্শন সমাজদেহে এনেছিল বিরাট বিশৃঙ্খলা আর ইসলামই তা থেকে ভারতীয় জনসাধারণেকে মুক্তির পথ দেখায়”।(পৃষ্ঠা ৬১-৬২)

মুসলিম শাসন আমল বাংলার ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গঠনমূলক যুগ হিসেবে ঐতিহাসিকদের বিবেচনা লাভ করেছে। এ জনপদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ যুগেই একটি উন্নত ও সংহত রূপ লাভ করে। রাজনৈতিকভাবে এ যুগেই বাংলার জনগণ একটি আদর্শের ভিত্তিতে সামাজিক ঐক্যমঞ্চে সংঘবদ্ধ হয়। বাংলা ভাষা ও বাঙালির ইতিহাসের ভিত্তিও এই যুগেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রসঙ্গে ড. এম এ রহীমের মন্তব্য, “যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় ত্বরান্বিত না হতো এবং এ প্রদেশে আর কয়েক শতকের জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন অব্যাহত থাকত, তবে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত এবং অথীতের গর্ভে নিমজ্জিত হতো”। (বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, ভূমিকা)