২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বঙ্গকথা পর্ব-১৭ : বাংলায় মোগল শাসনের সূত্রপাত, বারো ভুঁইয়া ও ঢাকার গোড়াপত্তন



১৫৭৬ সালে বাংলার আফগান সুলতান দাউদ খান কররানী পরাজয়ের পর বাংলা মোগল সম্রাট আকবরের অধীনে চলে আসে। সম্রাট আকবর বারো সুবাহর একটি হিসেবে বাংলার নাম ঘোষণা করেন। এরপর থেকে বাংলার নাম হয়ে যায় সুবাহ বাংলা। যার সীমানা ছিল বর্তমান বিহার, ওড়িশা, বাংলা হয়ে আরাকান পর্যন্ত।

১৫৭৬ সাল থেকে ১৭১৭ সাল পর্যন্ত বাংলা মোগলদের অধীনে ছিলো। ১৭শ শতাব্দীতে মোগলগণ বারো-ভুইয়া ভুস্বামীদের বিরোধিতার সম্মুখীন হোন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ঈসা খান। মোগল আমলে বাংলা একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যে পরিণত হয় এবং বহুত্ববাদী সরকারের নীতির কারণে তা শক্ত অবস্থান লাভ করে। মোগলেরা ১৬১০ সাল থেকে ঢাকায় নতুন মহানগরী গড়ে তোলে, যেখানে ছিল সুবিন্যস্ত বাগান, দুর্গ, সমাধি, প্রাসাদ এবং মসজিদ। সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে শহরটি তার নামে নামকরণ করা হয়। ঢাকা মোগল সাম্রাজ্যের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হয়, জানা যায় সাম্রাজ্যের সর্ববৃহৎ রপ্তানি কেন্দ্র ছিল মসলিন বস্ত্রকে ঘিরে। ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামে মোগলেরা যুদ্ধে জয় লাভ করে আরাকান রাজ্য দখল করে এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিয়ে নেয়, যার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল ইসলামাবাদ। 

দাউদ খান কররানীর পরাজয়ের পর হোসেন কুলি বেগ খান জাহান উপাধি নিয়ে সুবাহ বাংলার শাসক নিযুক্ত হন। তিনি ১৫৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলার শাসক ছিলেন। এরপর ১৫৭৮ থেকে ১৫৯৪ সাল পর্যন্ত ছয়জন সুবাহদার বাংলা শাসন করেছেন। এরপর ১৫৯৪ থেকে ১৬০৬ সাল পর্যন্ত বাংলার সুবাহদার নিযুক্ত হন। 

মানসিংহ ছিলেন রাজা ভগবান দাসের পালক পুত্র। আম্বরে জন্মগ্রহণকারী মির্জা রাজারূপে পরিচিত মানসিংকে সম্রাট আকবর ফরজন্দ খেতাবে ভূষিত করেন। ভগবান দাস পাঞ্জাবের সুবাহদার নিযুক্ত হলে মানসিংহ সিন্ধু নদের তীরবর্তী জেলাগুলি নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রদেশের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে কাবুলে পাঠানো হয় এবং ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিহারের সুবাহদার নিযুক্ত হন। তখন পর্যন্ত কুনওয়ার রূপে পরিচিত মানসিংহকে ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজা’ উপাধি এবং পাঁচ হাজারি মনসব প্রদান করা হয়। ১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ তাঁকে বাংলার সুবাহদার নিয়োগ করা হয়। ১৫৯৪-১৫৯৮, ১৬০১-১৬০৫ এবং ১৬০৫-১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি তিন মেয়াদে সুবাহদারের দায়িত্ব পালন করেন।

আফগান নেতাদের এবং ঈসা খানের নেতৃত্বাধীন ভূঁইয়াদের দমন করা ছিল বাংলায় রাজা মানসিংহের প্রধান কাজ। তান্ডা থেকে প্রস্ত্ততিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তিনি চারদিকে কয়েকটি পরীক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করেন এবং ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর তান্ডা থেকে রাজমহলে রাজধানী স্থানান্তর করেন। নতুন রাজধানীর তিনি নামকরণ করেন আকবরনগর। মানসিংহের পুত্র হিম্মত সিংহের নেতৃত্বে এক পরীক্ষামূলক অভিযানে ঈসা খানের মিত্র কেদার রায়ের নিকট থেকে ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল ভূষণা দুর্গ দখল করা হয়। ঈসা খানের নিকট থেকে ভাটি জয়ের উদ্দেশ্যে ১৫৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর মানসিংহ নিজেই নতুন রাজধানী থেকে যাত্রা করেন। মানসিংহ নিকটবর্তী হলে ঈসা খান ব্রহ্মপুত্রের অপর তীরে পশ্চাদপসরণ করেন। মানসিংহ শেরপুর মোর্চায় (বগুড়া জেলায়) শিবির স্থাপন করেন এবং সেখানে একটি মাটির দুর্গ নির্মাণ করেন। তিনি এই স্থানের নামকরণ করেন সেলিমনগর এবং বর্ষাকালটা তিনি সেখানেই কাটান। ইতোমধ্যে ঈসা খানের মিত্র খাজা সুলায়মান খান নুহানী এবং কেদার রায় মুগলদের কাছ থেকে ভূষণা দুর্গ পুনর্দখল করেন। মানসিংহ তাঁর পুত্র দুর্জন সিংহের নেতৃত্বে এক অভিযান প্রেরণ করেন এবং প্রচন্ড লড়াইয়ের পর ১৫৯৬ সালের ২০ জুন তিনি দুর্গটি পুনর্দখল করতে সক্ষম হন। ১৫৯৬ সালে মানসিংহ ঘোড়াঘাটে তাঁর শিবির স্থাপন করেন। তিনি সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঈসা খান ও তাঁর মিত্রদের বিরুদ্ধে হিম্মত সিংহের নেতৃত্বে একটি ছোট সৈন্যদল পাঠান। হিম্মত সিংহ নিকটবর্তী হলে ঈসা খান এগারসিন্ধুর এর দিকে পশ্চাদপসরণ করেন।

১৫৯৭ সালে সেপ্টেম্বরে মানসিংহ স্থল ও জলপথে ঈসা খানের বিরুদ্ধে দুটি বিরাট বাহিনী পাঠান। দুর্জন সিংহের অধিনায়কত্বে মোগল সেনাবাহিনী প্রথম দিকে কিছুটা সাফল্য লাভ করে, এমনকি তারা ঈসা খানের রাজধানী কাত্রাবোও (নারায়ণগঞ্জ) আক্রমণ করে। কিন্তু শেষে ৫ সেপ্টেম্বর বিক্রমপুর থেকে ২০ কি.মি. দূরে এক নৌ-যুদ্ধে দুর্জন সিংহ নিহত হন এবং মুগল বাহিনী বিধ্বস্ত হয়। এভাবে ঈসা খানের বিরুদ্ধে মানসিংহের অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং হতোদ্যম সুবাহদার ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে আজমীরের উদ্দেশে বাংলা ত্যাগ করেন।

১৬০১ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে মানসিংহ দ্বিতীয়বার সুবাহদার হিসেবে বাংলায় আসেন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি শেরপুর আতাই-এর যুদ্ধে আফগান বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন। পরের বছর তিনি ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হন এবং শ্রীপুরের জমিদার কেদার রায়কে মোগলদের পক্ষে আনার চেষ্টা করেন। উত্তরবঙ্গের মালদহ পর্যন্ত এলাকায় হামলাকারী জালাল খান ও কাজী মুমিনের মতো আফগান দলপতিদের বিরুদ্ধে মানসিংহ ঘোড়াঘাট থেকে তাঁর পৌত্র মহাসিংহের অধীনে এক বাহিনী প্রেরণ করেন। মানসিংহ সে অঞ্চল থেকে আফগান দলপতিদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হন। ইতোমধ্যে বোকাইনগরের খাজা উসমান খান নুহানী ময়মনসিংহের মুগল থানাদার বজ বাহাদুর কলমাককে ভাওয়ালে বিতাড়িত করেন। ঘটনার এ গতি পরিবর্তনে মানসিংহ দ্রুত ঢাকা থেকে ভাওয়াল অভিমুখে অগ্রসর হয়ে উসমান খানকে পরাজিত করেন। এর অল্পকাল পরেই ইছামতি নদীর তীরে মানসিংহের সঙ্গে মুসা খান ও তাঁর ভাই দাউদ খান, উসমান খান ও কেদার রায়ের সম্মিলিত বাহিনীর আরেকটি যুদ্ধ হয়। ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহ বহু কষ্টে ত্রিমোহিনীর মোগল দুর্গে মগ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করেন। মগদের সহায়তায় কেদার রায় শ্রীনগরে মোগল ঘাঁটি আক্রমণ করেন। মানসিংহ উসমান খানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভাওয়ালে ফিরে এলে উসমান খান পালিয়ে যান। ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে মানসিংহ আগ্রার উদ্দেশে বাংলা ত্যাগ করেন। এরপর কুতুবুদ্দিন কোকা ও জাহাঙ্গীর কুলি বেগ কিছুদিন বাংলা শাসন করেন। এরপর বাংলা শাসন করেন সুবাহদার ইসলাম খান।

ইসলাম খান চিশতি পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ের জন্য বাংলার মুগল সুবাহদার ছিলেন। তার মূল নাম নাম শেখ আলাউদ্দীন চিশতি। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে ইসলাম খান উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। আগের মোগল সেনানয়কেরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেখানে চট্টগ্রাম ছাড়া সমগ্র বাংলা জয় করে মোগলদের নিয়ন্ত্রণে আনার সাফল্য লাভ করায় বাংলার সুবাহদার হিসেবে ইসলাম খান খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৫৭৬ থেকে ১৬০৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আকবর প্রায় বারোজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে বাংলা জয় করার জন্য পাঠালেও রাজধানী নগরী তান্ডা এর আশে পাশের কিছু অংশ মাত্র দখল করতে সফল হয়েছিলেন। স্থানীয় রাজা, ভূঁইয়া, জমিদার ও আফগান নেতা তখন বাংলাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে শাসন করছিলেন। আকবরের মৃত্যুর পর সম্রাট জাহাঙ্গীর তরুণ ও উদ্যমী ইসলাম খানকে তিনি বাংলা জয়ের জন্য নির্বাচিত করেন ও সুবাহদার হিসেবে ১৬০৮ সালে বাংলায় প্রেরণ করেন।

ইসলাম খান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাংলার ভূ-রাজনীতি পরীক্ষা করে দেখেন এবং সম্রাটের প্রবীণ যোদ্ধাদের সহযোগিতায় তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তৈরি করেন। বিদ্রোহী বাংলা প্রদেশে মোগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সুসজ্জিত, সুপ্রশিক্ষিত, অনুগত, বিশ্বাসী ও কর্তব্যপরায়ণ সামরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। ভাটি অঞ্চলে বারো ভূঁইয়া এবং খাজা উসমান ও তার ভাইদের নেতৃত্বাধীন আফগানরা মোগল কর্তৃক বাংলা বিজয়ে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল বলে তিনি মনে করতেন। আফগানরা বুকাইনগর দখল করে নিয়েছিল। ফলে ইসলাম খান সর্বপ্রথম ভাটি ও বারো ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করেন। তিনি ছোট-বড় নদী ও খালে পরিপূর্ণ ভাটির নিম্নাঞ্চলে যুদ্ধে কার্যকর ফললাভের জন্য শক্তিশালী নৌ-বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সুতরাং ইসলাম খান মুগল নৌ-বাহিনীকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি এটাও উপলব্ধি করেন যে, তদানীন্তন রাজধানী রাজমহল ছিল বাংলা প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এবং গোলযোগপূর্ণ পূর্ব বাংলা থেকে রাজমহলের দূরত্বও ছিল অনেক। সুতরাং তিনি ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। কারণ ঢাকা ছিল ভাটি অঞ্চলের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং বারো ভূঁইয়াদের সদর দফতরের সঙ্গে নদী দ্বারা উত্তম যোগাযোগের জন্য সুবিধাজনক স্থান।

সৈন্যবাহিনী ও নৌ-বাহিনী পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ইসলাম খান সম্রাটের কাছ থেকে সহায়তা লাভ করেন। মোগল সম্রাট ইতিমাম খানকে মীর বহর (নৌ-সেনাপতি) এবং মুতাকিদ খানকে দিউয়ান নিযুক্ত করেন। এ দুজনই ছিলেন অভিজ্ঞ এবং স্ব স্ব বিভাগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ইসলাম খান তাদের অকুণ্ঠ সহযোগিতা লাভ করেন। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ইসলাম খান রাজমহল থেকে যাত্রা শুরু করে ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ঘোড়াঘাট পৌঁছেন। বর্ষাকালটা সেখানে কাটিয়ে তিনি অক্টোবর মাসে ভাটির দিকে অগ্রসর হন। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের জুন-জুলাই মাসের দিকে ঢাকা পৌঁছার আগে তিনি সে বছরের প্রথম কয়েক মাস বারো ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কাটান। ঈসা খাঁ'র পুত্র মুসা খান ছিলেন বারো ভূঁইয়াদের নেতা। তাঁর নেতৃত্বে বারো ভূঁইয়াগণ প্রতিটি দুর্গে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে ব্যর্থ হন। ইসলাম খান ঢাকা দখল করে সেখানে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন এবং সম্রাটের নামানুসারে এ স্থানের নতুন নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। তখনো পর্যন্ত ভূঁইয়াদের সম্পূর্ণরূপে দমন করা সম্ভব হয় নি। তারা শীতলক্ষ্যা নদীর উভয় তীরে তাদের অবস্থানগুলিকে সুরক্ষিত করে রেখেছিলেন। ইসলাম খান ঢাকাকে সুরক্ষিত করে তিনি ভূঁইয়াদের সব অবস্থানের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন এবং ১৬১১ খ্রিস্টাব্দেই মুসা খানসহ বারো ভূঁইয়াদের সবাই ইসলাম খানের নিকট বশ্যতা স্বীকার করেন। সুবাহদার যশোরের প্রতাপাদিত্য, বাকলার (বরিশাল) রামচন্দ্র এবং ভুলুয়ার (নোয়াখালী) অনন্তমাণিক্যকেও পরাজিত করেন এবং তাদের রাজ্যগুলি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।

এরপর তিনি খাজা উসমানের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন আফগানদের বুকাইনগরে (ময়মনসিংহ) পরাজিত করেন। আফগানরা উহারে (মৌলভীবাজারে) পালিয়ে যায়, তবে তারা তাদের প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। ইসলাম খানের অনুরোধে উসমানের বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে সুজ্জাত খানকে সম্রাট প্রেরণ করেন। আফগানদের সঙ্গে এ যুদ্ধের ফলাফল প্রায় অনিশ্চিত হতে যাচ্ছিল। কিন্তু উসমানের আকস্মিক মৃত্যু মোগলদের অপ্রত্যাশিত বিজয় এনে দেয়। রাতের অন্ধকারে আফগানরা পালিয়ে গেলেও পরবর্তীকালে তারা মুগলদের বশ্যতা স্বীকার করে। সিলেটে বায়েজীদ কররানী এর নেতৃত্বাধীন আফগাদেরও বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। এভাবে সমগ্র বাংলা মুগলদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বাংলার দক্ষিণ পূর্ব সীমান্ত নির্ধারিত হয় ফেনী নদী, যার পরেই ছিল আরাকান রাজ্য।

এরপর ইসলাম খান কুচবিহার, কামরূপ এবং কাছাড় রাজ্যের দিকে মনোযোগ দেন। কুচবিহারের রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ সর্বদাই ছিলেন মুগলদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন, কিন্তু রাজা পরীক্ষিৎ নারায়ণ মুগলদের অগ্রগতির বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পর তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এবং তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীকালে তাঁকে সম্রাটের দরবারে প্রেরণ করা হয় এবং কামরূপ মুগল সাম্রাজ্যের অধিকারভুক্ত হয়। কাছাড়ের পরাজিত রাজাও মোগলদের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন।

ইসলাম খান সমগ্র বাংলা জয় করতে এবং সীমান্তরাজ্য কামরূপ দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এক এক করে প্রতিপক্ষদের পরাজিত করে তিনি তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেন নি। ভূঁইয়া ও সামন্ত রাজাদের দ্বিধাবিভক্ত করে শাসন করা ছিল তার রাজনৈতিক কৌশল। পরাজিত জমিদার, ভূঁইয়া এবং সামন্তরাজাদের তিনি তাঁদের স্ব স্ব এলাকায় বিনা শর্তে ফিরে যেতে অনুমতি প্রদান করেন নি। তাদের এলাকা ফিরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে তিনি তাদের সৈন্যদেরকে মোগল সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করেন এবং রণতরীগুলি বাজেয়াপ্ত করেন। মোগল সৈন্যবাহিনীতে যোগদান করে তাদের সমগোত্রীয় জমিদার ও ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে হতো। এ ভাবে কৌশলগত পরিকল্পনা ও অব্যাহত প্রচেষ্টার দ্বারা ইসলাম খান সাফল্য অর্জন করেন এবং সম্রাট কর্তৃক তাঁর ওপর ন্যস্ত কর্তব্য ও দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। দাউদ খান কররানীর পতনের বত্রিশ বছর পরেও আকবরের বিখ্যাত সেনাপতিগণ যে কাজ করতে পারেন নি ইসলাম খান পাঁচ বছরের কম সময়েই তা সুসম্পন্ন করেতে সক্ষম হন। এরপর ভূঁইয়া, জমিদার এবং আফগান দলপতিগণ আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেন নি। আফগানশক্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং ভূঁইয়া, জমিদার ও স্থানীয় রাজাগণ মোগলদের অধীনস্থ জমিদারে পরিণত হন।

ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করা ছিল ইসলাম খানের আরেকটি বড় কৃতিত্ব। ইসলাম খান ছিলেন প্রথম সুবাহদার যিনি মোগলদের সৈন্য ও যুদ্ধ পরিচালনায় পূর্ব বাংলার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। এ জন্যই তিনি সে এলাকার কেন্দ্রস্থলে রাজধানী স্থানান্তর করেন। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ইসলাম খানই প্রকৃতপক্ষে মোগলদের জন্য বাংলা জয় করেছিলেন। তার দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি বাংলায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাকে মোগল সাম্রাজ্যের একজন নির্মাতা এবং বাংলা প্রদেশের শ্রেষ্ঠ সুবাহদার হিসেবে গণ্য করা হয়। 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন