৪ জুলাই, ২০২০

রাসূল সা. এর দাম্পত্য জীবনের কিছু তিক্ত ঘটনা



ঘটনাগুলো রাসূল সা. এর ব্যক্তিগত। কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যাপারটা আল্লাহ তায়ালা উন্মুক্ত করে দিলেন। যাতে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ্ সা. মিষ্টি ও মধু খুব ভালবাসতেন। আসরের নামাযের পর সাধারণত তিনি তাঁর স্ত্রীদের সাক্ষাত করতেন। 

একদিন তিনি হযরত হাফসা রা.-এর রুমে প্রবেশ করেন এবং অন্যান্য দিনের চাইতে একটু বেশি সময় সেখানে অবস্থান করলেন। এতে নারীসুলভ ইর্ষা জেগে উঠে হযরত আয়েশা রা.-এর মনে। তিনি খবর নিয়ে জানলেন যে, হাফসা রা.-এর এক আত্মীয়া এক মশক মধু তার কাছে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে ঐ মধুর শরবত পান করিয়েছেন। আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ্ সা. তাঁর ঘরে এতটা বিলম্ব করেছেন।

এই প্রসঙ্গে আয়েশা রা. বলেন, //আমি মনে মনে বললাম যে, ঠিক আছে, কৌশল করে আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে মধু খাওয়া হতে বিরত রাখবো। সুতরাং আমি হযরত সাওদাহ্ বিনতু যামআহ্ রা.-কে বললাম, তোমার ঘরে যখন রাসূলুল্লাহ সা. আসবেন এবং তোমার নিকটবর্তী হবেন তখন তুমি তাকে বলবে,
“আজ কি আপনি মাগাফির খেয়েছেন?”
তিনি জবাবে বলবেন, “না।”
তখন তুমি বলবে, তাহলে এই গন্ধ কিসের?”
তিনি তখন বলবেন, “হাফসা রা. মধু পান করিয়েছেন।”
তুমি তখন বলবে, “সম্ভবত মৌমাছি ‘আরফাত’ নামক কন্টকযুক্ত গাছ হতে মধু আহরণ করেছে। তাই আপনার মুখ থেকে মাগাফিরের গন্ধ আসছে ”
আমার কাছে যখন আসবেন তখন আমিও তাই বলবো। হে সফিয়া রা.! তোমার কাছে যখন আসবেন তখন তুমিও তাই বলবে।//

এই ব্যাপার নিয়ে হযরত সাওদাহ রা. বলেন, “যখন রাসূলুল্লাহ সা. আমার ঘরে আসলেন, তখন তিনি দরজার ওপরই ছিলেন, তখন আমি ইচ্ছা করলাম যে, আয়েশা রা. আমাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে দিই, কেননা, আমি আয়েশা রা.-কে খুবই ভয় করতাম। কিন্তু ঐ সময় আমি নীরব থাকলাম। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ সা. আমার কাছে আসলেন তখন আমি ঐ কথাই বললাম যা আয়েশা শিখিয়েছিল। তারপর তিনি হযরত সফিয়া রা.-এর নিকট গেলে তিনিও ঐ কথাই বলেন। এই দিনের পরে হযরত হাফসা রা. পুনরায় রাসূলুল্লাহ্ সা.-কে মধু পান করাতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার এর প্রয়োজন নেই, আমি খাবো না।” আমি তখন আফসোস করে বলতে লাগলাম, “আফসোস! আমরা এটাকে হারাম করিয়ে দিলাম!” আমার কথা শুনে আয়েশা রা. বললো, চুপ থাকো।

রাসূলুল্লাহ সা. দুর্গন্ধকে খুবই ঘৃণা করতেন এবং একইসাথে স্ত্রীদের পছন্দ অপছন্দের দিকে নজর রাখতেন। এজন্যেই ঐ স্ত্রীগণ বলেছিলেন, “আপনি মাগাফির খেয়েছেন কি?” কেননা, মাগাফিরে কিছুটা দুর্গন্ধ রয়েছে। যখন তিনি উত্তর দিলেন যে, না, তিনি মাগাফীর খাননি বরং মধু খেয়েছেন, তখন তাঁরা বললেন, “তাহলে মৌমাছি ‘আরফাত' গাছ হতে মধু আহরণ করে থাকবে, যার গাঁদের নাম হলো, মাগাফির এবং ওরই ক্রিয়ার প্রভাবে এই মধুতে মাগাফিরের গন্ধ রয়েছে। তাই রাসূল সা. কসম করে সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি আর মধু খাবেন না।

পুরো ঘটনায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, রাসূল সা.-এর স্ত্রীদের প্রতি তো বটেই, রাসূল সা.-এর প্রতিও। এই ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে সূরা আত তাহরিমের ১ম আয়াতে তিনি বলেন, হে নবী, আল্লাহ যে জিনিস হালাল করেছেন তা তুমি হারাম করছো কেন? (তা কি এ জন্য যে,) তুমি তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাও? আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।

আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত দ্বারা সতর্ক করেছেন রাসূল সা.-কে। আল্লাহর হালালকৃত জিনিসকে নিজের জন্য হারাম করে নেয়ার যে কাজ রাসূল সা. দ্বারা হয়েছে, তা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। এ থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে বুঝা যায় যে, আল্লাহর হালালকৃত জিনিস হারাম করার অধিকার কারো নেই, এমন কি স্বয়ং নবী সা.-এর নিজেরও এ ইখতিয়ার নেই। নবী সা. ঐ জিনিসটিকে যদিও আকীদাগতভাবে হারাম মনে করেছিলেন না কিংবা শরীয়াতসম্মতভাবে হারাম বলে সাব্যস্ত করেছিলেন না বরং নিজের জন্য তা ব্যবহার করা হরাম করে নিয়েছিলেন। 

কিন্তু তাঁর মর্যাদা যেহেতু সাধারণ একজন মানুষের মত ছিল না বরং তিনি আল্লাহর রসূলের মর্যাদায় অভিসিক্ত ছিলেন। তাই তাঁর নিজের পক্ষ থেকে নিজের ওপর কোন জিনিস হারাম করে নেওয়াতে এই আশংকা ছিল যে, তাঁর উম্মতও ঐ জিনিসকে হারাম অথবা অন্তত মাকরূহ বলে মনে করতে শুরু করবে অথবা উম্মতের লোকেরা মনে করতে শুরু করবে যে, আল্লাহর হালালকৃত কোন জিনিস নিজের জন্য হারাম করে নেয়াতে কোনো দোষ নেই।

এর পরের আয়াতে অর্থাৎ আত তাহরিমের ২য় আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.-কে কসমের কাফফারা দিয়ে কসম ভাঙতে পরামর্শ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য কসমের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হওয়ার পন্থা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তোমাদের অভিভাবক এবং তিনি মহাজ্ঞানী ও মহাকৌশলী। কসমের কাফফারা কী হবে তা আল্লাহ সূরা মায়েদার ৮৯ নং আয়াতে বর্ণিত করেছে। দশজন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো অথবা তাদের পোষাক দেওয়া অথবা একজন দাস মুক্ত করা। এগুলোর সামর্থ না থাকলে তিনদিন রোজা রাখা।

এর পরে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা.-এর স্ত্রীদের প্রসঙ্গে তিনটি আয়াত নাজিল করলেন। সূরা আত তাহরিমের ৩ নং আয়াতে তিনি বলেন,
//নবী তাঁর এক স্ত্রীকে (হাফসা রা.) গোপনে একটি কথা বলেছিলেন। পরে সেই স্ত্রী যখন সেই গোপনীয় বিষয়টি অন্যের (আয়েশা রা.) কাছে প্রকাশ করে দিল এবং আল্লাহ নবীকে এই ব্যাপারটি জানিয়ে দিলেন তখন নবী (হাফসা রা.-কে) কিছুটা সাবধান করলেন এবং কিছুটা মাফ করে দিলেন। নবী যখন তাকে (গোপনীয়তা প্রকাশের) এই কথা জানালেন তখন সে জিজ্ঞেস করলো : কে আপনাকে এ বিষয়ে অবহিত করেছে? নবী বললেন : আমাকে তিনি (আল্লাহ) অবহিত করেছেন যিনি সবকিছু জানেন এবং সর্বাধিক অবহিত।//

এটি আরেকটি ঘটনার ইঙ্গিত। বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সা. হাফসা রা.-কে একটি গোপন কথা বলেছেন সেটি সামহাউ তিনি আয়েশা রা.-এর কাছে প্রকাশ করে দেন। যা অপছন্দনীয় ঘটনা। এই বিষয়কে আমরা অনেক সময় হালকাভাবে দেখি। কিন্তু আল্লাহ মোটেই হালকাভাবে নেননি। কুরআনে উল্লেখ করে তিনি আমাদের জন্য বিষয়টি শিক্ষা হিসেবে রেখে দিলেন। আমরা যাতে কারো গোপনীয় কথা প্রকাশ না করি।

৪র্থ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা দু’জন যদি আল্লাহর কাছে তাওবা করো (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম), কেননা, তোমাদের মন বেঁকে গিয়েছে। আর যদি তোমরা নবীর বিরুদ্ধে পরস্পর সংঘবদ্ধ হও, তা হলে জেনে রাখো, আল্লাহ তার অভিভাবক, তাছাড়া জিবরাঈল, নেক্‌কার ঈমানদারগণ এবং সব ফেরেশতা তার সাথী ও সাহায্যকারী।

এই দুইজন স্ত্রী কারা এই প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস রা. বলেন তারা হলেন হজরত হাফসা রা. ও হজরত আয়েশা রা.। তিনি হজরত উমার ফারুক রা. থেকে জেনে নিয়েছেন। তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল সা.-এর সাথে বাদানুবাদ ও জিদ করতেন। এই কারণে দুইটি ঘটনা ঘটতো। এক তারা আল্লাহর রাসূল সা.-এর উপর রাগ করে থাকতেন। অন্যদিকে আল্লাহর রাসূল সা.ও তাদের উপর রাগ করে থাকতেন। মাঝে মাঝে আল্লাহর রাসূল সা. তাদের বিছানা আলাদা করে দিতেন। এই বিষয়গুলো আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেননি। এমনিতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ভালো নয়। তার উপর ইনি মুহাম্মদ সা.। সারাক্ষণ দ্বীন প্রতিষ্ঠার হাজারো ব্যস্ততা, হাজারো পেরেশানী, নবুয়্যতের কঠিন দায়িত্ব পালনের পর স্ত্রীদের কাছে শান্তি না পাওয়া আল্লাহ তায়ালা ভালোভাবে নেন নি। তাই তিনি তাদের তওবা করতে বলেছেন।

৫ম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, নবী যদি তোমাদের মত সব স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন তাহলে অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের পরিবর্তে তাকে এমন সব স্ত্রী দান করবেন যারা তোমাদের চেয়ে উত্তম হবে। তারা হবে সত্যিকার মুসলমান, ঈমানদার, অনুগত, তাওবাকারিনী, ইবাদাতকারী এবং রোজাদার। তারা পূর্বে বিবাহিত বা কুমারী যাই হোক না কেন।

এই আয়াত থেকে জানা যায় যে, হযরত আয়েশা রা. এবং হাফসা রা. শুধু ভুল করেছিলেন না বরং নবীর সা.-এর অন্য স্ত্রীগণও কিছু না কিছু ভুল করেছিলেন। এ কারণেই আয়াতে তাঁদের দু'জনকে ছাড়াও নবীর সা.-এর অন্যসব স্ত্রীদেরকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। নবী সা.-এর স্ত্রীদের পারস্পরিক ঈর্ষা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নবীকে সা.-কে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।

বিরক্ত হয়ে হজরত মুহাম্মদ সা. যখন সাময়িকভাবে তাঁর স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা বন্ধ করলেন তখন উমার রা. দেখলো লোকজন চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে বসে নুড়ি পাথর তুলছে এবং নিক্ষেপ করেছে এবং পরস্পর বলাবলি করছে যে, রসূলুল্লাহ সা. তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। এরপর হযরত উমার রা. রাসূলের স্ত্রীদের কাছে গিয়ে বললেন, তোমরা রসূলুল্লাহ সা.-কে অতিষ্ঠ করা থেকে বিরত থাকো। তা না হলে আল্লাহ তা'আলা নবীকে সা.-কে তোমাদের পরিবর্তে উত্তম স্ত্রী দান করবেন।

এরপর উমার রা. রাসূল সা.-এর কাছে হাজির হয়ে বললেন, আপনি স্ত্রীদের ব্যাপারে চিন্তিত হচ্ছেন কেন? আপনি যদি তাঁদের তালাক দেন তাহলে আল্লাহ তা'আলা আপনার সাথে আছেন, সমস্ত ফেরেশতা, জিবরাঈল ও মিকাঈল আপনার সাথে আছেন। আর আমি, আবু বকর এবং সমস্ত ঈমানদার আপনার সাথে আছি। এরপর আমি নবী সা.-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন? তিনি বললেন, না। এ কথা শুনে মসজিদে নববীর দরজায় দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করলাম যে, নবী সা. তাঁর স্ত্রীদের তালাক দেন নাই।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের আলোচ্য আলোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমাদের দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর করুন। আমরা যাতে আল্লাহর অনুগত থাকি, হালালকে হারাম বানিয়ে না নিই এবং হারামকে হালাল বানিয়ে না নিই। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের কবুল করুন।


- তাফহীমুল কুরআন (সূরা আত তাহরিম ১-৫)
- তাফসীরে ইবনে কাসীর (সূরা আত তাহরিম ১-৫) 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন