৮ নভেম্বর, ২০২০

কতিপয় শিষ্টাচার

আমার বাড়ি কুমিল্লায় হলেও আব্বু আম্মুর চাকুরির সুবাদে বড় হয়েছি নোয়াখালীতে। পড়াশোনা করার নিমিত্তে নোয়াখালী থেকে যখন বের হলাম তখন নোয়াখালীর মানুষজন সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পেরেছিলাম। যা অবশ্য নোয়াখালী থাকাকালে আমার জানার সুযোগ হয়নি। এমনি একটি তথ্য হলো নোয়াখালীর মানুষ নাকি কোনো অনুষ্ঠানে খাবার শেষ করেই চলে যায়। একটু হাই হ্যালো বা গল্প গুজব করে না।  


আসলে আমি নোয়াখালী থাকতে বিষয়টা টের পাইনি। তবে যখন থেকে জানলাম এটা নোয়াখাইল্যাদের বৈশিষ্ট্য এবং এটা নিয়ে অন্যান্য জেলার মানুষ আমাদের ট্রল করে তখন থেকে বেশ সতর্ক থাকি। কোনো স্থানে খাবার খেতে গেলে বা দাওয়াতে গেলে নিজে উঠে আসার প্রস্তাব করতাম না। বসে থাকতাম। যখন অন্যরা উঠতো তবেই উঠতাম। কিন্তু একদিন সূরা আহযাব পড়তে গিয়ে নতুন চমকপ্রদ তথ্য পেলাম। আল্লাহ তায়ালা সূরা আহযাবে বলেছেন, যদি তোমাদের খাবারের জন্য দাওয়াত করা হয়, তাহলে অবশ্যই এসো। কিন্তু খাওয়া হয়ে গেলে চলে যাও, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না। এই আয়াত পড়ে চমৎকৃত হয়ে তার শানে নুজুল জেনে নিলাম। এরপর থেকে কোনো দাওয়াতে গেলে খাওয়া শেষেই মেজবান থেকে বিদায় নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব চলে আসি। 


সূরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আরো কয়েকটি শিষ্টাচারের ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করেছেন। আল্লাহর রাসূল সা.-এর সময়ে আরবের লোকেরা নিসংকোচে একজন অন্যজনের ঘরে ঢুকে পড়তো। কেউ যদি কারো সাথে দেখা করতে চাইতো তাহলে দরোজায় দাঁড়িয়ে ডাকার বা অনুমতি নিয়ে ভেতরে যাবার নিয়ম ছিল না। বরং ভেতরে গিয়ে গৃহকর্তা গৃহে আছে কি নেই স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের কাছে জিজ্ঞেস করে তা জানতে চাইতো। এ জাহেলী পদ্ধতি বহু ক্ষতির কারণ হয়ে পড়েছিল অনেক সময় বহু নৈতিক অপকর্মেরও সূচনা এখান থেকে হতো। মুসলিমদের মধ্যেও তখন পর্দার বিধান নাজিল হয়নি। তাই অনেক সাহাবীর মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যেত। 


পর্দার বিধানের সূচনা হিসেবে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ! নবী গৃহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করো না। সাধারণ নিয়ম হওয়ার আগে প্রথমে নবী সা.-এর গৃহে এ নিয়ম জারি করা হয়। যে কোনো নিকটতম বন্ধু বা দূরবর্তী আত্মীয়-স্বজন হলেও বিনা অনুমতিতে তার গৃহে প্রবেশ করতে পারবে না। তারপর সূরা নূরে এ নিয়মটি সমস্ত মুসলমানের গৃহে জারী করার সাধারণ নির্দেশ দিয়ে দেয়া হয়। 


কিছু কিছু মানুষ এমন ছিল যারা খাবারের সময় অন্যের বাড়িতে যেতেন। এরকম লোক এখানো দেখা যায়, কোনো বন্ধু বা পরিচিত লোকের গৃহে তারা পৌঁছে যেতো ঠিক খাবার সময় তাক করে। অথবা তার গৃহে এসে বসে থাকতো এমনকি খাবার সময় এসে যেতো। তারপরও উঠতো না। এরকম আচরণে গৃহকর্তা অধিকাংশ সময় বেকায়দায় পড়ে যেতো। মুখ ফুটে যদি বলে এখন আমার খাবার সময় মেহেরবানী করে চলে যান, তাহলে বড়ই অসভ্যতা ও রুঢ়তার প্রকাশ হয়। আর যদি খাওয়ায়, তাহলে হঠাৎ আগত কতজনকে খাওয়াবে? যখনই যতজন লোকই আসুক সবসময় সংগে সংগেই তাদের খাওয়াবার ব্যবস্থা করার মতো সামর্থ সবাই রাখে না। 


অনেক সাহাবীকে দেখা যেত তাঁরা আল্লাহর রাসূল সা.-এর ঘরের দাওয়ায় এসে বসে থাকতেন। খাবার সময় হয়ে গেলেও উঠতেন না। আল্লাহ এ অসৌজন্যমূলক আচরণ করতে তাদেরকে নিষেধ করেন এবং হুকুম দেন, কোন ব্যক্তির গৃহে খাওয়ার জন্য তখনই যেতে হবে যখন গৃহকর্তা খাওয়ার দাওয়াত দেবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, নবীর ঘরে খাবার সময়ের অপেক্ষায় থেকো না। 


কোনো কোনো লোক খাওয়ার দাওয়াতে এসে খাওয়া দাওয়া সেরে এমনভাবে বসে চুটিয়ে আলাপ জুড়ে দেয় যেন আর উঠবার নামটি নেই, মনে হয় এ আলাপ আর শেষ হবে না। গৃহকর্তা ও গৃহবাসীদের এতে কি অসুবিধা হচ্ছে তার কোন পরোয়াই তারা করে না। ভদ্রতা জ্ঞান বিবর্জিত লোকেরা তাদের এ আচরণের মাধ্যমে নবী সা.-কে কষ্ট দিতো। মহানবী সা. তিনি নিজের ভদ্র ও উদার স্বভাবের কারণে এসব বরদাশত করতেন। 


কিন্তু যেদিন আল্লাহর নির্দেশে তিনি জয়নব রা.-কে বিয়ে করলেন সেদিন ওয়ালিমার সময় এ কষ্টদায়ক আচরণ সীমা ছাড়িয়ে যায়। তারই প্রেক্ষিতে সূরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াত নাজিল। এই শিষ্টাচার শেখানোর সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা আরো কিছু শিষ্টাচারের দিকেও আলোকপাত করেন। 


হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জয়নব রা.-এর সাথে রাসূলুল্লাহ সা.-এর বিবাহে হযরত উম্মে সালিম রা. মালীদা (এক প্রকার খাদ্য) তৈরী করেন এবং পাত্রে রেখে আমাকে বলেন, “এটা নিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে পৌঁছিয়ে দাও এবং বলো, এ সামান্য উপঢৌকন উম্মে সালীম রা.-এর পক্ষ হতে। তিনি যেন এটা কবুল করে নেন। আর তাকে আমার সালাম জানাবে।” 


ঐ সময় জনগণ খুব অভাবী ছিল। আমি খাবার নিয়ে গিয়ে রাসূলুল্লাহ সা.-কে সালাম বললাম ও হযরত উম্মে সালীমেরও রা. সালাম জানালাম এবং খবরও পৌঁছালাম। তিনি বললেন, “আচ্ছা, ওটা রেখে দাও। আমি তখন ঘরের এক কোণে ওটা রেখে দিলাম। 


অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, “অমুক অমুককে ডেকে নিয়ে এসো।” তিনি বহু লোকের নাম করলেন। তারপর আবার বললেন, “তাছাড়া যে মুসলমানকেই পাবে ডেকে নিয়ে আসবে।” আমি তাই করলাম। যাকেই পেলাম তাকেই রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট খাবারের জন্যে পাঠাতে লাগলাম। ফিরে এসে দেখলাম যে ঘর, বৈঠকখানা ও আঙ্গিনা লোকে পূর্ণ হয়ে গেছে। প্রায় তিনশত লোক এসে গেছে। 


অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, “যাও, ঐ খাবারের পাত্রটি নিয়ে এসো।” আমি সেটা নিয়ে আসলে তিনি তাতে হাত লাগিয়ে দু'আ করলেন। অতঃপর বললেন, “দশজন লোকের দল করে বসিয়ে দাও।” 


সবাই বিসমিল্লাহ বলে খেতে শুরু করলো। এভাবে খাওয়া চলতে লাগলো। সবাই খাওয়া শেষ করলো। তখন তিনি আমাকে বললেনঃ “পাত্রটি উঠিয়ে নাও।” আমি তখন পাত্রটি উঠালাম। আমি সঠিকভাবে বলতে পারবো না যে, যখন আমি পাত্রটি রেখেছিলাম তখন তাতে খাবার বেশী ছিলো, না এখন বেশী আছে! (সুবহানআল্লাহ) 


বেশকিছু লোক তখনো বসে বসে গল্প করছিল। উম্মুল মুমিনীন জয়নব রা. দেয়ালের দিকে মুখ করে বসেছিলেন। লোকগুলোর এতক্ষণ ধরে বসে থাকা এবং চলে না যাওয়া রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে খুবই কঠিন ঠেকছিল। কিন্তু তিনি লজ্জার কারণে ও স্বভাবজাত ভদ্রতার কারণে কিছুই বলতে পারছিলেন না। রাসূলুল্লাহ সা.-এর এই মানসিক অবস্থার কথা জানতে পারলে লোকগুলো অবশ্যই উঠে চলে যেতো। কিন্তু তারা কিছুই জানতে পারেনি বলে নিশ্চিন্তে গল্পে মেতেছিল। 


নবী সা. বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেন এবং পবিত্র স্ত্রীদের ওখান থেকে এক চক্কর দিয়ে এলেন। ফিরে এসে দেখলেন তারা যথারীতি বসেই আছেন। তিনি আবার উঠে গেলেন এবং হযরত আয়েশা রা.-এর কামরায় বসলেন। অনেকটা রাত অতিবাহিত হয়ে যাবার পর যখন তিনি জানলেন তারা চলে গেছেন তখন তিনি হযরত জয়নবের রা. কক্ষে গেলেন।


এই ঘটনাকে উপজীব্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ তায়ালা সূরা আহযাবে বলেছেন, যদি তোমাদের খাবারের জন্য দাওয়াত করা হয়, তাহলে অবশ্যই এসো। কিন্তু খাওয়া হয়ে গেলে চলে যাও, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না। তোমাদের এসব আচরণ নবীকে কষ্ট দেয় কিন্তু তিনি লজ্জায় কিছু বলেন না, তবে আল্লাহ হককথা বলতে লজ্জা করেন না।


হজরত উমার রা. রাসূল সা.-এর স্ত্রীদের ব্যাপারে পর্দার বিষয়টা অনেক গুরুত্বের সাথে দেখতেন। কিন্তু তখন পর্দার বিধান নাজিল হয়নি। ইমাম ইবনে জারীর রহ. বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সা.-এর সতী-সাধ্বী সহধর্মিণীরা প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে বাইরের দিকে চলে যেতেন। কিন্তু হযরত উমার রা. এটা পছন্দ করতেন না। তিনি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতেন, ‘এভাবে তাদেরকে যেতে দিবেন না।' রাসূলুল্লাহ সা. কোনো নির্দেশনা দেননি। একদা হযরত সাওদা বিনতে জামআ রা. বাড়ী হতে বের হলেন। এদিকে হযরত উমার রা. চাচ্ছিলেন যে, এ প্রথা রহিত হয়ে যাক। তিনি তার দেহের গঠন দেখেই তাকে চিনতে পারলেন এবং উচ্চস্বরে তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি।” 


এর প্রেক্ষিতে সূরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা শিষ্টাচারের নির্দেশ জুড়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, নবীর স্ত্রীদের কাছে যদি তোমাদের কিছু চাইতে হয় তাহলে পর্দার পেছন থেকে চাও। এটা তোমাদের এবং তাদের মনের পবিত্রতার জন্য বেশী উপযোগী। তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া মোটেই জায়েয নয় এবং তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীদেরকে বিয়ে করাও জায়েয নয়, এটা আল্লাহর দৃষ্টিতে মস্তবড় গুনাহ।

  

এ আয়তটি নাযিল হবার পূর্বে কয়েকবার নবী করীমের সা. কাছে উমার রা. নিবেদন করেছিলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার এখানে ভালোমন্দ সব রকমের লোক আসে। যদি আপনি আপনার পবিত্র স্ত্রীদেরকে পর্দা করার হুকুম দিতেন! অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, একবার হযরত উমর রা. নবী করীমের সা. স্ত্রীদের বলেন, যদি আপনাদের ব্যাপারে আমার কথা মেনে নেয়া হয় তাহলে আমার চোখ কখনোই আপনাদের দেখবে না। কিন্তু রাসূল সা. যেহেতু আইন রচনার ক্ষেত্রে স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না, তাই তিনি আল্লাহর ইশারার অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত এ হুকুম এসে গেলো যে, মাহরাম পুরুষরা ছাড়া অন্য কোন পুরুষ নবী করীমের সা. গৃহে প্রবেশ করবে না। আর সেখানে মহিলাদের কাছে যারই কিছু কাজের প্রয়োজন হবে তাকে পর্দার পেছনে থেকেই কথা বলতে হবে। 


এ নির্দেশের পরে পবিত্র স্ত্রীদের ঘরে দরোজার ওপর পর্দা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। যেহেতু নবী করীম সা.-এর ঘর সকল মুসলমানের জন্য আদর্শ ঘর ছিল তাই সকল মুসলমানের গৃহের দরোজায়ও পর্দা ঝোলানো হয়। আয়াতের শেষ অংশ আল্লাহ তায়ালা এদিকে ইংগিত করছেন যে, যারাই পুরুষ ও নারীদের মন পাক পবিত্র রাখতে চায় তাদেরকে অবশ্যই এ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। কুরআন নারী পুরুষকে সামনা সামনি কথা বলতে বাধা দেয়। পর্দার আড়াল থেকে কথা বলার বিষয়ে এজন্য আদেশ করা হয়েছে যে, তোমাদের ও তাদের অন্তরের পবিত্রতার জন্য এ পদ্ধতিটি বেশী উপযোগী। 


এবার আমরা জেনে নিই আল্লাহ তায়ালা সূরা আহযাবের ৫৩ নং আয়াতের পুরোটাতে কী বলেছেন! আল্লাহ তায়ালা বলেন,   

হে ঈমানদারগণ! নবী গৃহে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করো না এবং খাবার সময়ের অপেক্ষায়ও থেকো না। তবে যদি তোমাদের খাবার জন্য ডাকা হয়, তাহলে অবশ্যই এসো। কিন্তু খাওয়া হয়ে গেলে চলে যাও, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে পড়ো না। তোমাদের এসব আচরণ নবীকে কষ্ট দেয় কিন্তু তিনি লজ্জায় কিছু বলেন না, তবে আল্লাহ হককথা বলতে লজ্জা করেন না। 

নবীর স্ত্রীদের কাছে যদি তোমাদের কিছু চাইতে হয় তাহলে পর্দার পেছন থেকে চাও। এটা তোমাদের এবং তাদের মনের পবিত্রতার জন্য বেশি উপযোগী। তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেওয়া মোটেই জায়েয নয় এবং তার পরে তার স্ত্রীদেরকে বিয়ে করাও জায়েয নয়। এটা আল্লাহর দৃষ্টিতে মস্তবড় গুনাহ।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন