৫ নভেম্বর, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৬৩ : মুশরিকদের সাথে করা আগরতলা ষড়যন্ত্র যেভাবে ফাঁস হয়


আগরতলা ষড়যন্ত্র কোনোভাবেই একদিনের ঘটনা নয়। এটি ছিল একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা ১৯৬২ সালে নিউক্লিয়াসের সিরাজুল আলম খান শুরু করেছিলো। সেনাবাহিনীতে নিউক্লিয়াসের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন বরিশালের লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র প্রকাশ হওয়ার মাধ্যমে পুরো নিউক্লিয়াস টিম ধরা পড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিউক্লিয়াসের সবাই সবাইকে চিনতো না। ফলে বেঁচে গিয়েছে সিরাজসহ নিউক্লিয়াসের মূল কর্তারা। 


নিউক্লিয়াস লে. ক. মোয়াজ্জেমকে ভারতীয় বাহিনীর সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানের ক্যান্টনমেন্ট দখলের এসাইমেন্ট দেয়। মোয়াজ্জেম এই এসাইনমেন্ট বাস্তবায়নে যাদের যুক্ত করা দরকার শুধুমাত্র তারাই বিচ্ছিন্নভাবে নানান কমিটিতে যুক্ত ছিল। মূলত নিউক্লিয়াসের একজন সদস্যের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে এতগুলো মানুষের নাম পাকিস্তানী গোয়েন্দারা জেনে যায়। নিউক্লিয়াসের ঐ সদস্য শুধুমাত্র যাদের চিনতো কেবল তারাই আটক হয়েছে। মোয়াজ্জেম কে দিয়ে নতুন কোনো তথ্য আদায় করতে পারে নি বলে সেনাবাহিনীতে থাকা নিউক্লিয়াসের সব সদস্যের নাম জানতে পারেনি সরকার।    


সিরাজুল আলম খানের নির্দেশনায় সশস্ত্র বাহিনীর ছোট একটি গ্রুপ বাঙালি সেনা ও অফিসারদের স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যে গোপনে একটি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তোলে। করাচির মনরো দ্বীপে ১৯৬২ সালে এক কর্মকর্তার বাসায় প্রথম আনুষ্ঠানিক গোপন সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। লে. ক. মোয়াজ্জেম, স্টুয়ার্ড মুজিব, সিম্যান নুর মোহাম্মদ ও লিডিং সি-ম্যান সুলতান উদ্দিন এ সভায় ছিলেন। পরবর্তী সময়ে যাদের বিশ্বাস করা যায়, তাদেরই তারা এ সংগঠনের সদস্য করে নেন। সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেন, সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হবে। 


এ আন্দোলনের একজন উচ্চপদস্থ নেতার প্রয়োজন মনে করা হলে কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ওসমানী নৈতিক সমর্থন জানিয়ে ওই মুহূর্তে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সশস্ত্র বিদ্রোহ করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা বাঙালি রেজিমেন্টের এখনো হয়নি। আরও ১০টি বাঙালি রেজিমেন্ট গঠন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার। নিউক্লিয়াস সদস্যরা অতটা সময় অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন না। 


তারা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও মাওলানা ভাসানীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হলো। শেখ মুজিবের সঙ্গে বিদ্রোহী দলের প্রথম যোগাযোগ হয় ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে করাচিতে। মোয়াজ্জেম নিজে শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয় এবং মোয়াজ্জেম তার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। শেখ মুজিব তখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর প্রচার নিয়ে ব্যস্ত। তিনি মোয়াজ্জেমকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন এবং বলেন যে ফাতেমা জিন্নাহ নির্বাচনে জিতলে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের আর প্রয়োজন হবে না। 


১৯৬৬ সালের জুন মাসে মোয়াজ্জেম চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাসায় একটি জরুরি সভা ডাকেন। এ সভায় তিনি প্রস্তাবিত নতুন রাষ্ট্রের নাম বাংলাদেশ, জাতীয় পতাকার ডিজাইন ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলো সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন। নীতিগুলো ছিলো : 

১) গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা; 

২) যে কাজ করবে না, সে খাবে না—এ নীতি বলবৎ করা; 

৩) সকল ব্যক্তিগত সম্পত্তি সরকারের মালিকানাধীন করা; 

৪) কলকারখানা জাতীয়করণ করা; 

৫) প্রতিটি নাগরিকের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করা। 

এগুলো মূলত নিউক্লিয়াসের কেন্দ্রীয় কমান্ডের তৈরি করা। মোয়াজ্জেম শুধু তার বাহিনীর কাছে উপস্থাপন করেছে। 


অস্ত্রশস্ত্র পাওয়ার উদ্দেশ্যে মোয়াজ্জেম ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি পি এন ওঝাকে মানিক চৌধুরীর মাধ্যমে অস্ত্রের একটি তালিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ওঝা ও মানিক চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের ভার দেওয়া হয় সাবেক করপোরাল আবদুস সামাদকে। এ যোগাযোগ নিরাপদ ও সন্দেহমুক্ত রাখার জন্য স্থান হিসেবে আহমদ ফজলুর রহমানের স্ত্রী হাসিনা রহমানের ঢাকাস্থ গ্রীন ভিউ পেট্রোল পাম্প নির্ধারণ করা হয়। আবদুস সামাদকে পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজারের চাকরি দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের নিউক্লিয়াস সদস্য ডা. সাঈদুর রহমানের মাধ্যমে মোয়াজ্জেম ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ সালে ওঝার সঙ্গে পাঁচবার দেখা করেন।  


এর আগে ১৯৬৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি কর্মসূচি ছিল। একই সময় চট্টগ্রামে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠন করা হচ্ছিল। পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তার চট্টগ্রামে আসার কথা ছিল। গুপ্ত সন্ত্রাসী সংগঠন নিউক্লিয়াস এ সুযোগে সেনাপ্রধানসহ সব কর্মকর্তাকে হত্যা এবং অন্যান্য সেনানিবাসে যুগপৎ আক্রমণ করে দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু মাদারিপুরের করপোরাল আমির হোসেনের একটি ভুলে এ পরিকল্পনার তথ্য সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে চলে যায়। ফলে চট্টগ্রামের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সরকার সন্দেহভাজন কিছু কিছু গ্রেপ্তার করার কাজ শুরু করে। কিন্তু এতে নিউক্লিয়াসের কেউ গ্রেপ্তার হয় নি। ফলে নিউক্লিয়াস থাকে নিরাপদে। 


নিউক্লিয়াসের কেউ এরেস্ট না হলেও নিউক্লিয়াসের একটি বড় পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয় লে. ক. মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে আমির হোসেনের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন। এভাবে নিউক্লিয়াস তাদের বহু সদস্যকে খুন করে। যাই হোক আমীর হোসেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয় আশরাফ আলীকে। আশরাফ আমির হোসেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি আমির হোসেনকে সতর্ক করে দেন। সেই থেকে আমির পলাতক হয়ে যান। বহুদিন পলাতক জীবনে থেকে তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে প্রাণ বাঁচানোর জন্য উদ্দেশ্যে আমির হোসেন নিউক্লিয়াসের চোখ এড়িয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে চলে আসে। 


নিউক্লিয়াসের সাথে পঞ্চম বৈঠকে ওঝা জানান, ভারত সরকার অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহের আগে বিপ্লবী দলের সঙ্গে ভারত সরকারের কর্মকর্তাদের আলোচনা হওয়া দরকার বলে মনে করে। ওঝা আগরতলায় দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকের প্রস্তাব করেন। ১৯৬৭ সালের জুন মাসে এক জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত হয়, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান ও আলী রেজা প্রতিনিধি হিসেবে আগরতলায় যান। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এই নিন্মপদের অফিসারদের সাথে আলোচনা করতে রাজি হয় না। এই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষিতে ১৯৬৭ সালের শেষদিকে শেখ মুজিব, মোয়াজ্জেমসহ কিছু পদস্থ নেতা ও মূল পরিকল্পনাকারীরা ভারতে আগরতলায় যান।  


এদিকে রাওয়ালপিন্ডিতে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা অফিসে নিজেই হাজির হয়ে যা যা জানেন তার সবকিছু ফাঁস করে দেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গোয়েন্দাদের এক চৌকস দল পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তারা অভিযুক্তদের ওপর নজরদারি করেন। নিউক্লিয়াস সদস্যরা ধারণাই করতে পারেনি আমির হোসেন এমন কিছু করবে। তাই তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। পাকিস্তানী গোয়েন্দারা তদন্ত করতে গিয়ে আগরতলায় ভারতীয় মুশরিক গোয়েন্দাদের সাথে মিটিং-এর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পান। এরপর গণগ্রেপ্তার শুরু হয়। গ্রেপ্তার পর্ব প্রায় শেষ হয়ে গেলে ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর একটি প্রেসনোট দিয়ে ষড়যন্ত্রের কথা প্রকাশ করে। এর ১২ দিন পর ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র দপ্তরের আরেকটি ঘোষণায় শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুর রহমান খান সিএসপিকে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়। 


এই ষড়যন্ত্র ফাঁসে সরকারকে সহায়তা করে নিউক্লিয়াসের আমির হোসেনসহ ১১ জন সদস্য। ফলে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানা যায়। যদিও মুজিব করাচিতে মোয়াজ্জেমের বাসায় যাওয়া নিয়ে মিথ্যাচার করেছিল তবে এই প্রসঙ্গে মোয়াজ্জেমের স্ত্রী বলেন, //এটি ১৯৬৪ সালের কথা। আমার বয়স কম। ক্লাস টেনে পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায়। অনেক কিছুই বুঝতাম না। করাচিতে ড্রিগ রোডে মোহাম্মদ আলী কলোনির বাসায় তার কাছে অনেকেই আসতেন। কথা বলতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হয়তো মাঝরাতে এসে আমাকে বললেন, এতজনকে খাওয়াতে হবে। বলতাম, ঘরে তো তেমন কিছু নেই, কী খাওয়াব? উনি বলতেন, আলু ভর্তা ডিম, যা কিছু হোক, কেউ না খেয়ে যাবে না। মাঝে মাঝে বিরক্ত হতাম। 


মামলা চলার সময় আমাদের বাসায় আসা এদের অনেককে দেখে আমি চিনতে পেরেছি। একদিন সন্ধ্যায় বাসায় এসে বললেন, ভালো কিছু আয়োজন করো, একজন বিশেষ অতিথি আসবেন। আমি কয়েক পদ রান্না করলাম। তারপর কে বা কারা এলো, দেখিনি। সকালে উনি বললেন, জানো কে এসেছিল? শেখ মুজিব! বললাম, আমাকে একটু ডাকলেই পারতে, ওনাকে দেখতাম। শেখ মুজিব দুবার আমাদের বাসায় এসেছিলেন। শুনেছিলাম, রুহুল কুদুস সাহেব আর আহমদ ফজলুর রহমান সাহেব শেখ মুজিবের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। 


উনি (মোয়াজ্জেম) প্রায়ই উইকএন্ডে করাচি থেকে ঢাকায় যেতেন। শনিবার গিয়ে সোমবারে চলে আসতেন। বলতেন, অফিসের কাজ থাকে। তারপর উনি বদলি হলেন। তখন আমরা বরিশালে। উনি ডেপুটেশনে বিআইডব্লিউটিএতে। বললেন, বরিশালে থাকলে সুবিধা, প্রতি সপ্তাহে ঢাকা যাওয়া যায়। আবার একটা কথা প্রায়ই বলতেন, ভাত আর রুটি এক থালায় রাখা যায় না। পশ্চিম পাকিস্তানিদের উনি একদম দেখতে পারতেন না। এটি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি হবে হয়তো। অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম, উনি বসে দোয়া করছেন। বললাম, এত রাতে? নিজের মনেই বললেন, এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওরা বিলোনিয়া ক্রস করেছে।// 


মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষ সমর্থন করার জন্য আইনজীবী নিয়োগের প্রক্রিয়ার শুরুটা ছিল হতাশাব্যঞ্জক। আইনজীবীদের অন্যতম ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের লেখা থেকে জানা যায়, কে জেড আলম, সাখাওয়াত হোসেন, আবুল খায়ের খান ও মওদুদ এই চারজন তরুণ ব্যারিস্টার শেখ মুজিবের পক্ষ সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা কেউ আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন না। আওয়ামী লীগের নেতারা কেউ জেলে, বেশিরভাগ পলাতক। বাইরে যারা ছিলেন, তারা প্রায় সবাই নিশ্চুপ। মুজিবের সকল মিটিং ও ষড়যন্ত্র ফাঁস হওয়ার তারা বেশ বিব্রত। 


তখন এই চারজন আইনজীবী বেগম মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে তার ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসায় যান। বেগম মুজিব প্রথমে তাদের কথা বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছিলেন, আমার বাড়ির ওপর দিয়ে এখন কাক পর্যন্ত ওড়ে না। আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবেরা এই রাস্তা দিয়ে আর যায় না, আমাদের বাড়ি এড়াবার জন্য অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যায়। বন্ধুবান্ধবেরা যারা তার (মুজিবের) কাছ থেকে উপকার পেয়েছে তারাও আর আসে না, আপনাদের তো আমি চিনি না। এরপর তারা চারজন মানিক মিয়ার সঙ্গে আলাপ করে তাকে নিয়ে বেগম মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন এবং মানিক মিয়ার বাসায় কয়েকটি বৈঠক করেন। বেগম মুজিব তাদের বিশ্বাস করতে শুরু করলেন। এর প্রায় এক মাস পর তিনি তার এক আত্মীয়কে নিয়ে মওদুদের কায়েতটুলীর বাসায় মাঝরাতে এসে শেখ মুজিবের সই করা একটি ওকালতনামা দিয়ে তাদের উদ্যোগ নিতে বলেন। 


সিনিয়র আইনজীবীরা কেউ ওকালতনামায় সই দেননি। মওদুদ তখন তরুণ। তিনি লন্ডনে তার বন্ধুদের শরণাপন্ন হন। জাকারিয়া খানের নেতৃত্বে লন্ডনের বাঙালিরা স্যার টমাস উইলিয়ামের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে নিয়োগ করে। টমাস উইলিয়াম আসছে জেনে ঢাকায় অনেক আইনজীবী উৎসাহ দেখান। শেষ পর্যন্ত আবদুস সালাম খানের নেতৃত্বে আইনজীবীদের একটি ডিফেন্স কাউন্সিল গঠন করা সম্ভব হয়।  


মামলা চলাকালে ২৯ আগস্ট আকস্মিকভাবে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বিচারকক্ষে হাজির হন। তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনজীবীদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে বসেন। কাঠগড়ায় শেখ মুজিবকে দেখে তিনি দ্রুত তার কাছে যান এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। গুঞ্জন শোনা যায়, ভুট্টো শেখ মুজিবের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে নামবেন। ভুট্টো তখন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। সরকারপক্ষের প্রধান কৌসুলি মঞ্জুর কাদেরও ভুট্টোর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। 


একপর্যায়ে ভুট্টো কাঠগড়ার পাশে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবের সঙ্গে ১০ মিনিট কথা বলেন। তারা পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে কথা বলছিলেন। এরপর ভুট্টো বিচারকক্ষ ছেড়ে চলে যান। তিনি শেখ মুজিব বা অন্য কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে ওকালতনামায় সই করেননি। ধারণা করা হয় তিনি শেখ মুজিবের লোকদের আন্দোলনে যাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে চলা আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানেও যদি আন্দোলন শুরু হয় তবে বেকায়দায় পড়বে আইয়ুব খান। ভুট্টো মুজিবের পক্ষে বিদেশেও ক্যাম্পেইন করেন। মুজিবের পক্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেন। তবে পূর্ব পাকিস্তানে মুজিবের পক্ষে আন্দোলনে সক্ষম হয়নি আওয়ামী লীগ।


১৯৬৮ সালের প্রায় পুরো সময় আওয়ামী লীগ দিশেহারা ছিল। অসহায় হয়ে শেখ মুজিব মওলানা ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। মামলার কার্যবিবরণী সংগ্রহের জন্য অনেক সাংবাদিক ট্রাইব্যুনাল কক্ষে উপস্থিত থাকতেন। তাদের মাধ্যমে মুজিব ভাসানীকে বারংবার আন্দোলন তৈরি করার অনুরোধ জানান। কারণ মুজিব বুঝেছিলেন আইনী প্রক্রিয়ায় এই মামলা থেকে বাঁচার উপায় নাই। রাজনৈতিক চাপে ফেলেই এই মামলা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। ভাসানী রাজনীতিতে ভিন্নমত পোষণ করতেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন আইয়ুব খানের সমর্থক। আইয়ুবের পুরো শাসনামলে তিনি আইয়ুবকে সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। আর এখন আইয়ুব খানের খারাপ সময়ে তার বিরোধীতা করার যৌক্তিকতা ছিল না। 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন