২ ডিসেম্বর, ২০২০

বঙ্গকথা পর্ব-৬৮ : অপারেশন সার্চলাইট এবং এর প্রেক্ষাপট


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় দেশের সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে। এই নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ কতৃপক্ষ বলতে চায়, এখানে গণহত্যা চালানো হয়েছে, নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে সেনাবাহিনী। যদিও এই দাবি সত্য নয় তবে এটাকেই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। মূলত সেনাবাহিনী সেদিন তিনটি স্থানে অভিযান চালিয়েছে মুশরিকদের গুপ্তচর ও দেশদ্রোহীদের চিহ্নিত করার জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ও শাঁখারিবাজার।  


পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টির অব্যাহত আন্দোলন চলছিল। তারা পশ্চিম পাকিস্তান প্রায় অচল করে দিয়েছে। তাদের দাবি তাদের ছাড়া পাকিস্তানের সংবিধান রচিত হলে তা তারা মেনে নিবে না। মুজিব চেয়েছিলো একাই পাকিস্তানের সংবিধান রচনা করবে। এছাড়া ভুট্টো বিরোধী দলীয় আসনে বসতে রাজি ছিল না। তার দাবী সে যেহেতু পশ্চিমে শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই তার সাথেই সমঝোতা করেই সরকার গঠন করা লাগবে। পশ্চিমে তার সাহায্য ছাড়া কেউ পাকিস্তান যাতে চালাতে না পারে সেই ব্যবস্থা ভুট্টো করেছে। 


ভুট্টোর চাপে ইয়াহিয়া খান তার মন্ত্রীসভা ভেঙে দিতে বাধ্য হন। ইয়াহিয়া খান ভুট্টো ও মুজিবের মধ্যে সমঝোতা করে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু মুজিবের আপোষহীন অবস্থানের কারণে সমঝোতা ব্যর্থ হয়। মুজিব ভুট্টোকে ছাড় দিতে রাজি হয় না। এদিকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল ৩ মার্চ। ভুট্টো কোনো সমঝোতা ছাড়া অধিবেশন শুরু করতে নিষেধ করে যাচ্ছিলেন এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। 


ভুট্টোর চাপে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব-পাকিস্তানের সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন ১ মার্চ। ইয়াহিয়া খান কর্তৃক জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করার ঘোষণা দেয়ার এক ঘন্টার মধ্যে ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ হাজার লোক বাঁশের লাঠি, লোহার রড নিয়ে হোটেল পূর্বাণীর সামনের সকল পথ রোধ করে ভিড় জমায়। সেখানে তারা ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। পাকিস্তানের পতাকা পোড়ায় এবং জিন্নাহর ছবি ভাংচুর করে। একইসাথে রাষ্ট্রবিরোধী ও কম্যুনিজমের পক্ষে শ্লোগান দিতে থাকে। সেসময় হোটেল পূর্বাণীতে পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু নির্বাচিত সদস্য ছিলেন যারা ৩ তারিখের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য এসেছিলেন ঢাকায়। তবে তারা কেউ ভুট্টোর দলের ছিলেন না। তারা বেশিরভাগ ছেলে ন্যাপ (ওয়ালি) দলের সদস্য।   


শেখ মুজিব তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং হরতালের ঘোষণা দেন ও ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান। সাংবাদিক মাসকারেনহাস ১ মার্চের ঘটনার বর্ণনা লিখেছেন এভাবে, ..বিক্ষুদ্ধ জনতার দীর্ঘ সারি ছুটে চলছিল পল্টন ময়দানের পথে যেখানে তারা ঐতিহ্যগতভাবে সব সময় তাদের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরতো। উত্তেজিত চেহারায় হাতে বাঁশের লাঠি, লোহার রড, হকিষ্টিক নিয়ে তারা যেন প্রতিশোধ-এর উদ্দেশ্যেই যাচ্ছিল পল্টনে। বিকাল সাড়ে চারটার মধ্যেই আনুমানিক ৫০,০০০ হাজার লোক জমায়েত হয়ে গেল। 


চিৎকার, হৈচৈ আর উত্তেজনার পর সহসাই বেশ কিছু লোক ভীড়ের মধ্য থেকে বের হয়ে আসল ও জিন্নাহ এভিনিউ (বর্তমান বঙ্গবন্ধু এভিনিউ)-এর সামনের দোকানপাট, জানালার কাঁচ, দরজা ভাংচুর আর অগ্নিসংযোগের পর লুটপাট শুরু করে দিল। ওই সব দোকানের মালিকদের সকলেই ছিলেন ভারত থেকে আসা মুহাজির বা অবাঙালি। এর মধ্যদিয়ে চারদিকে গোলযোগ বিস্তৃত হতে শুরু করলো। ইতোমধ্যে হোটেল পূর্বাণী থেকে এনে একটি পাকিস্তানী পতাকা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হলো, সামনের পিআইএ অফিসের কাচের জানালাগুলো ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়া হলো। কিছু যুবক চেষ্টা চালালো হোটেল পূর্বাণীতে পশ্চিম পাকিস্তানী মালিকানায় থাকা কয়েকটি দোকান লুটের'। 


ম্যাসকারেনহাস- এর মতে, শেখ মুজিবের বক্তৃতা জনতার আবেগের পরিপূরক ছিল না। তিনি জনগণকে ভৎসনা করে লুণ্ঠিত মালামাল ফেরত দিতে বলেন, কিন্তু উত্তেজিত জনগণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক অরাজক পরিস্থিতি ও আতংক সৃষ্টি করছিল। ওই রাতে ঢাকা শহরের সর্বত্র দাঙ্গাকারী ও পুলিশের মাঝে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটে অবাঙালি ও তাদের সম্পত্তির উপর। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকরা হস্তক্ষেপ করলে তাৎক্ষণিক উগ্রজনতার দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়।...আর এভাবেই এদিন সূচনা হয় দীর্ঘ ২৫ দিনের গণজোয়ারের...। এদিকে রাস্তায় উগ্রজনতার মারমুখী মনোভাব যেন এক নিত্যনৈমিত্তিক নিয়মে পরিণত হয়। 


একদিকে মনে হচ্ছিল শেখ মুজিব উগ্রজনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন, অপরদিকে তার মৌখিক নির্দেশই ছিল আইন ও তার কথাবার্তা উৎসাহিত করছিল উগ্রবাদী আচরণকে। অনেক বাঙালির স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় ধৈর্যধারণ করার জন্য মুজিবের বাগাড়ম্বরপূর্ণ আহ্বান সত্ত্বেও বাঙালিদের বিদ্রোহ ছিল একদম খোলাখুলি, গর্বিত ও সশস্ত্র ধাঁচের। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মুজিবের ভাষণ শুনতে জনতার ঢল নামে,...“ আর এ জনতার হাতে ছিল বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র-শস্ত্র, বাঁশের লাঠি, লোহার রড, তরবারি, হাতে তৈরি হোরা, শটগান। ওই সময়ের একটা বিশেষ শ্লোগান ছিল 'বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর'। 


সেই সময়ের ঘটনাবলী স্মরণ করে অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে যে, সশস্ত্র অবস্থায় রাজনৈতিক মিছিলে যোগ দেওয়াটা যেন পরিণত হয়েছিল জনতার একটা স্বাভাবিক রীতিতে। বাঙ্গালিদের প্রতি সহানুভূতিশীল মার্কিন কনসাল জেনারেল লিখেছেন, বাঙালি বিদ্রোহীদের বিদ্রোহের কুৎসিত দিকটা খুব শীঘ্রই প্রকাশ্যে বের হয়ে এলো। পশ্চিম পাকিস্তানী ও বিদেশীদের সম্পত্তিতে লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সেনাবাহিনীর সাথে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার মধ্যদিয়ে। ঢাকার ফার্মগেটের আবাসিক এলাকায় সকল অবাঙালির দোকানপাটে ও তাদের বাড়ি ঘরেও আক্রমণ করল বাঙালিরা। ঢাকা ভ্রমণকালে বিদেশীদের পছন্দের তালিকায় তাদের আবাসস্থল ছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (শেরাটন)। একদল ছাত্র পিস্তল দিয়ে গুলিবর্ষণ করলো হোটেল ইন্টারকন্টিনন্টালের ওপর। রাস্তায় নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিনিধি ও তার স্ত্রী উঠতি বয়েসি ছেলেদের দ্বারা হলো আক্রান্ত, কিন্তু আওয়ামী লীগের একটি প্রহরী দল তাদের শেষমেষ রক্ষা করে। ছাত্রদের একটি দল যারা সম্ভবত বামপন্থী ছিল তারা বৃটিশ কাউন্সিলে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালিয়েছিল। এ সব ঘটনার প্রেক্ষিতে মার্শাল ল' কর্তৃপক্ষ সংবাদ মাধ্যমকে জানায় যে, মার্চের প্রথম সপ্তাহেই গোলযোগে ১৭২ জন মারা গেছে ও আহত হয়েছে ৩৫৮ জন। এরা প্রায় সবাই ছিলেন ভারতের বিহার থেকে আসা বিহারি। ২৪ মার্চের দিকে মার্কিন কনসুলেটের উপরও বোমাবাজি ও গুলিবর্ষণ করা হয়। 


রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে :

১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক সরকার জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে শেখ মুজিব সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের বিদ্রোহ আরো চূড়ান্ত পর্বে পৌছায় এবং ঠিক ওই সময় থেকেই পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে হারিয়ে ফেলে। শেখ মুজিব হাঁটছিলেন প্যারাডক্সের পথে, একদিকে তিনি উত্তেজনাকর বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছিলেন আর অপরদিকে তিনি জনগণকে হিন্দু, খৃস্টান ও অবাঙালিদের ভ্রাতৃতুল্য বিবেচনা করে যাতে তাদের জানমালের কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয় সে কথা বলছিলেন। তার দলের উগ্রপন্থী কর্মীরা জনসম্মুখে হাজির হচ্ছিল রাইফেল ও শটগানের মতো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সভাতেও মানুষ আসছিল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। মুজিব একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও শাসক গোষ্ঠীর সামনে বিরাট এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। 


কোনো বিকল্প সরকার গঠন না করে ও নিয়মতান্ত্রিক দায়দায়িত্ব বা জবাবদিহিতা ছাড়াই তার কর্মী সমর্থকরা সময় পূর্ব পাকিস্তানে তার নির্দেশনা আনুগত্যের সাথে মেনে চলছিল। এর মাধ্যমে একটি ত্রাসের রাজত্ব বা মগের মুল্লুক সৃষ্টি হয়েছিলো। এর কারণ সব নির্দেশ শেখ মুজিবের নামে আসলেও আসলে সব সন্ত্রাসী নির্দেশ শেখ মুজিব দিতেন না। অরাজকতা সৃষ্টির যে নির্দেশনা তার বড় অংশ আসতো নিউক্লিয়াসের পক্ষ থেকে। তারা তাদের বিপ্লব সংঘটনের জন্য এরকম একটি অরাজক পরিস্থিতির চেষ্টা করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। 


জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও চাকমা প্রধান রাজা ত্রিদিব রায় সপরিবারে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, ট্রেন আর সরকারের প্রদত্ত সময়সূচি অনুযায়ী চলছে না বরং মুজিবের নামে ইচ্ছেমতো চলছে। তার মতে মুজিবের ঘোষণা দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ও একজন অবিসংবাদিত নেতার নির্দেশ হিসেবেই যে সবকিছু এভাবে চলছিল তা নয় বরং এর পিছনে ছিল সহিংসতা ও তার দলীয় ক্যাডারদের সংহিসতার হুমকির ভয়। 


বিহারীদের ওপর নৃশংস গণহত্যা :

পয়লা মার্চ থেকে যে কার্যক্রম সবচেয়ে হৃদয়বিদারক আকারে দেখা দিয়েছে তা হলো বিহারীদের ওপর চালানো নিউক্লিয়াস ও ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের গণহত্যা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভাগের সময় ভারতের মুশরিকদের নির্যাতনের শিকার এদেশে আসেন বহু সম্বল হারানো মুসলিম। তারা ঢাকায় এসে বাঙালি মুসলিম ভাইদের থেকে যেভাবে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল সেভাবে পায়নি। বরং নিগ্রহের শিকার হয়েছে। তার ওপর ১৯৭১ সালে আওয়ামীলীগ তাদের হীন স্বার্থ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের ওপর গণহত্যা চালায়। একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা ও গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারলে ভারতের মুশরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করবে এবং পাকিস্তানকে ভাগ করে ফেলবে। 


শর্মিলা বসু তার বই ডেড রেকনিং-এ বলেছেন, ইতোমধ্যে নির্বিচারে অবাঙালি বিশেষ করে বিহারীদের হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশকে মনে হয়েছিল একরকম নিষ্ক্রিয় এবং সেনাবাহিনী অবস্থান করছিল সেনাছাউনির ভিতরে। মুজিব তার পিচ্ছিল পথেই হাঁটছিলেন ও সেই ব্যাপক প্রত্যাশিত ৭ মার্চের জনসমুদ্রে উদ্গারণ করলেন বিদ্যুৎ চমকানোর মতো বক্তৃতা যাতে স্বাধীনতার ঘোষণা করতে করতে হঠাই থেমে গিয়েছিলেন। 


এ সময় ঢাকায় বিদেশীদের মাঝেও আতংক বৃদ্ধি পায়। ১২ মার্চ মার্কিন কনসুলেটে দু'টি বোমা বিস্ফোরিত হয় ও কেউ একজন কনসুলেট লক্ষ্য করে বন্দুকের গুলি ছোড়ে। ১৫ মার্চ কনসুলেট লক্ষ্য করে আরো গুলি ছোড়া হয়। ১৯ মার্চ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও মার্কিন কনসুলেট ভবনে ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। ঢাকা ক্লাব, বৃটিশ কাউন্সিল, আলিকো এবং আমেরিকান দূতাবাসে নিক্ষেপ করা হয় বোমা। ।


প্রদেশের অন্যান্য স্থানেও চলতে থাকে অবাঙালিদের ওপর গণহত্যা, তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ। ঢাকার বাইরে যে ত্রাস ও অরাজকতা তৈরি হয়েছিল তার তুলনায় ঢাকায় বিক্ষিপ্ত ও আতংক সৃষ্টির ঘটনা বলা চলে অনেক কমই ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খুলনা টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ৪ মার্চ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছিল, ৫ মার্চ খুলনার খালিশপুর ও দৌলতপুরে ছোরা ও দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ৫৭ জন অবাঙালিকে। চট্টগ্রামে ৩-৪ মার্চ ওয়্যারলেস কলোনী ও ফিরোজশাহ কলোনীতে কয়েকশ’ অবাঙালি নারী, পুরুষ ও শিশু হত্যা করা হয় এবং তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সে সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এভিয়েশনে কর্মরত ক্যাপ্টেন ইকরাম সেহগাল (পরে মেজর) জানান, তিনি ওয়্যারলেস কলোনী ও ফিরোজশাহ কলোনীর উপর দিয়ে ৪ মার্চ উড়ে যাওয়ার সময় দেখতে পান ওই এলাকার সবকিছু পুড়ে কালো ছাই হয়ে গেছে। 


এমনকি সামরিক সরকারের কঠোর সমালোচক সাংবাদিক ম্যাসকারেনাসও পূর্ব পাকিস্তানের অবাঙালি বাসিন্দাদের আতংকের বিষয়টিকে ন্যায্য বলে স্বীকার করেছেন। অবাঙালিদের রক্ষা করার জন্য শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও দেশের ছোট ছোট শহরে হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজের মতো ঘটনা ঘটে চলছিল। প্রথম দিকে সেনাবাহিনী আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করে এবং তাতে উভয়পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু বাইরে থেকে তাদের সেনানিবাসে ফেরত আসার নির্দেশ দেয়া হয় ও তারপর থেকে তারা ভিতরেই ছিলেন। এরপর শহরের আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়ে ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয় এবং এপ্রিলে সেনাবাহিনীর দ্বারা পুনরায় শহরের নিয়ন্ত্রণ না নেয়া পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। ২ মার্চ সান্ধ্য আইন জারী করা হয় ও কয়েকজন সান্ধ্য আইন অমান্যকারীকে গুলি করা হয়েছিল। 


কিন্তু ৩ মার্চ সেনাবাহিনীকে আবার ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়। সরকারের ওই সিদ্ধান্ত মারাত্মক ভুল ছিল। এর ফলে হাজার হাজার বিহারী মুসলিম শেখ মুজিবের সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে খুন হন। তখন সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, কোনো দ্বন্দ্বে জড়ানো যাবে না, এমনকি সান্ধ্য আইন ভঙ্গকারীকে শাস্তি দেয়া যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না কোনো সেনা সদস্য শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়। ইয়াহিয়া খান ভেবেছিলো সেনাবাহিনী নৈরাজ্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি আরো বেগতিক হয়ে পড়বে। তাদের ক্ষোভ বৃদ্ধি পাবে। তিনি মুজিবের সাথে আলোচনা করে সমঝোতা করতে চেয়েছেন। পরিস্থিতি যদি শুধু মুজিবের নিয়ন্ত্রণে থাকতো তাহলে হয়তো এতোটা খারাপ অবস্থা তৈরি হতো না। কিন্তু অরাজক পরিস্থিতির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ভারতের মদদপুষ্ট নিউক্লিয়াস। এটাই ছিল বড় সমস্যা। 


কিছু গুরুত্বপূর্ণস্থানে কর্মরত বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীর প্রতি সংযত থাকার এই নির্দেশের সংবাদটি শেখ মুজিব ও নিউক্লিয়াসকে জানিয়ে দেন। ফলে পরিস্থিতি হয়েছে আরো ভয়াবহ। এতে কোনো প্রকার শাস্তির ঝুঁকি ছাড়াই বাঙালি দাঙ্গাকারীরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করা শুরু করে। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ কড়া ভাষায় বক্তৃতা দেন ও বালুচ আন্দোলন শক্ত হাতে দমনকারী জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে ঢাকায় পাঠান। পূর্ব পাকিস্তানে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় পরিচালিত অঘোষিত সমান্তরাল সরকারি প্রশাসন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে বাঙালি প্রধান বিচারপতি জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্ণর হিসেবে শপথ গ্রহণ করাতেও অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। 


শফিউদ্দিন তালুকদার তার বইতে বলেছেন, সিরাজগঞ্জ সদরের রেলওয়ে কলোনীর বিহারী পট্টির হত্যাকান্ডটি ইতিহাসের একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। যে ঘটনাটি অনাকাঙ্খিত অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। অত্যন্ত রোমহর্ষক ও বেদনাদায়ক। উনিশ'শ একাত্তরের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স মাঠে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তেজদ্বীপ্ত ও ঐতিহাসিক ভাষণের পর ২৬ মার্চের কয়েক দিন আগে সিরাজগঞ্জের সর্বস্তরের স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটায়।


সিরাজগঞ্জের মানুষের এমন ধারণার উদ্রেক হয়েছিল যে, রেলওয়ে কলোনিতে বসবাসরত পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের শত্রু, তারা বাংলাদেশকে সমর্থন করতে পারে না, তারা পাকিস্তানকেই সমর্থন করবে আর যেহেতু তারা অধিকাংশই উর্দু ভাষাভাষি সেহেতু পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে বসবাসরত পশ্চিম পাকিস্তানিরাও তাদের শত্রু - এসব ধারণার বশবর্তী হয়ে জনগণ স্বত:স্ফূর্তভাবে সিরাজগঞ্জের রেলওয়ে কলোনির বিহারী পট্টিতে হামলা চালায় এবং তিনশ থেকে চারশ লোককে বিনা দোষে নৃশংসভাবে হত্যা করে।


২৩শে মার্চ থেকেই শুরু হয় পাবনায় বাঙ্গালীর হত্যাযজ্ঞ। বাঙ্গালীরা ২৫০ জন পুরুষ, নারী ও শিশুকে একটা দালানে ঢুকিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলো। কলোনীর ভেতরে যারা ছিলো তাদের সকলকেই এভাবে ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হয়।"


পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির নেতা রইসউদ্দিন আরিফ তার বইতে বলেন ... রানু (প্রয়াত কমরেড রাশিদা) গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলো শহরে পাঞ্জাবী সেনাদের আগমনের আগেই। ২৫শে মার্চের পর পাঞ্জাবী সেনাদের হাতে জান খোয়ানোর চেয়েও বেশি, ইজ্জত খোয়ানোর ভয়ে শহর থেকে সব মেয়েমানুষ দলে দলে গ্রামে পাড়ি জমিয়েছিলো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রানুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো ভিন্নতর। আসলে রানু নিজের আজন্মলালিত শহরটিকে ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলো আর দশটি মেয়েমানুষের মতো যতটা না পাঞ্জাবীদের ভয়ে,. তার চেয়েও বেশি অন্য এক বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ঐ বিশেষ ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর এ শহরের বাতাস যেনো পাথর হয়ে চেপে বসেছিলো ওর বুকে।


'ক্রাকডাউনের' পর ঢাকা থেকে পাঞ্জাবী সেনাদের আগমনের পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত আমাদের এ মফস্বল শহরটি ছিলো পুরোপুরি মুক্ত এলাকা। বিশেষ করে ২৭-২৮ মার্চে শহরতলী এলাকায় অবস্থিত ইপিআর ক্যাম্পের সব অবাঙালি অফিসার-জওয়ান বউ-বাচ্চা সহকারে খতম হওয়ার পর গোটা শহর তখন পুরোপুরি শত্রুমুক্ত। এক অভাবিত মুক্তির স্বাদে কয়টা দিন শহরের অলিতে গলিতে আর ঘরে ঘরে আপাতমুক্তির আনন্দ-উল্লাসের কী যে জোয়ার বয়েছিল, তা স্বচক্ষে না দেখলে বোঝা যায় না। রানুর মনেও আনন্দ-উল্লাসের হয়তো কমতি ছিলো না।


কিন্তু এরই মাঝে হঠাৎ এক সকালে 'স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান চেতনা' হুমড়ি খেয়ে পড়লো শহরের বিহারী কলোনীগুলোর ওপর। হৈ হৈ রৈ রৈ করে রীতিমতো কুরুক্ষেত্র আর লংকাকান্ড চললো পুরো তিন দিন। বিহারী ছেলে, বুড়ো ও নারী-পুরুষের রক্তের স্রোত বয়ে গেলো কলোনীগুলোর ওপর। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, নিষ্ক্রিয়, অসহায় নারী-পুরুষ-শিশুর ওপর একতরফা হত্যাযজ্ঞ চললো পুরো তিনটে দিন।


রানু এই চরম লোমহর্ষক বর্বর মুহুর্তেও কাউকে না জানিয়ে একাকী কলোনীতে দৌড়ে গিয়েছিলো। তাহমিনাদের ঘরের আঙীনায় পৌঁছে ওর বাবা-মা'র লাশ দেখে আৎকে উঠলেও সে পিছ-পা হয়নি। প্রিয়তমা বান্ধবীকে উদ্ধারের আশায় অতি দু:সাহসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে তাহমিনাদের ঘরে ঢুকে পড়েছিলো এবং ঢুকেই আর্তচিৎকারে কলোনীর আকাশ প্রকম্পিত করে দিয়েছিলো। রানুর চোখের সামনে এক বীভৎস দৃশ্যের নিস্তব্ধতা। মেঝেতে তাহমিনার লাশ পড়ে আছে চিৎ হয়ে, পরনে ওর একটি সুতোও নেই। রক্তে সারা ঘর ভাসছে।


তার পরদিনই রানু শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। 'মুক্তিযুদ্ধের' পুরো ৯টি মাস রানুকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেও আমি ব্যর্থ হই। ওর মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মায় ৭১-এ এই দেশের মাটিতে অসহায় মানুষকে নির্বিচারে হত্যা, অবলা নারীর ওপর বলাৎকার ইত্যকার পাশবিক কার্যকলাপ প্রথম নাকি শুরু করে একশ্রেণীর বাঙালিরাই। রানুকে যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার দায়িত্ব দেয়া যেতো, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিশ্চয়ই শুরু হতো এই কলংকময় অধ্যায় দিয়ে।


যশোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনায় ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন সেখানে বাঙ্গালীরা প্রায় দুইশত বিহারীরে হত্যা করে। ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর বিদ্রোহীরা সমগ্র বিহারী জনগণকে সাধারণভাবে হত্যা করে। মেয়ে ও শিশুদের টেনেহিঁচড়ে নড়াইলের দিকে নিয়ে যায়। ৪০০ থেকে ৫০০'র মতো মেয়েকে অপহরণ করে নদীপথে হিন্দুস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। মানুষের কংকাল ও দেহের অন্যান্য অংশ সমস্ত এলাকায় ছড়ানো রয়েছে দেখতে পাওয়া যায়। রামনগর কলোনীতে ঝুমঝুমপুর কলোনীর লোকেরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলো। এই কলোনীতেও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ১৫০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়। দুস্থ শিবিরে আশ্রয় নেয় ৪৪৮ জন।


তারাগঞ্জ কলোনীতে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবকরা ও ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর বিদ্রোহীরা সমগ্র কলোনীতে বেপরোয়া হত্যাকান্ড চালিয়ে যায়। খুব কম লোকই বেঁচেছিল। সমস্ত বাড়িঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ৫শ'র মতো লোক নিহত হয়। নিখোঁজ লোকের সংখ্যা ৪শ'। হামিদপুর, আমবাগান, বাকাচর এবং যশোর শহরের পুরাতন কসবা। এই এলাকার অধিকাংশ জনগণকে হত্যা করে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়। ঘরবাড়ি প্রথমে লুটপাত এবং পরে তা আগুন ধ্বংস করা হয়। প্রায় ১ হাজার লোক নিহত ও নিখোঁজ হয়। ১৭৫ জন হাসপাতালে যায় এবং ১৭২ জন দুস্থ শিবিরে আশ্রয় নেয়। 


জাফর ইকবাল বলেন, ময়মনসিংহ শহরে বসবাসরত অবাঙালীরা এবং স্বাধীনতাবিরোধী কতিপয় রাজনৈতিক দলের সদস্যরা ময়মনসিংহ পতনের চেষ্টা চালায়। জনগণ এটাকে সুস্থভাবে গ্রহণ করেনি বলেই তাদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নেয়। এতে কয়েকশ' লোক নিহত হয়। এ সময় শহরে দেখা দেয় চরম বিশৃঙ্খলা। শামসুজ্জামান খান বলেন, ময়মনসিংহের ছত্রপুর এলাকার রেল কলোনীতে অনেক বিহারী ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে কলোনীতে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে মরে শিশু, নারী ও পুরুষ। আগুন-নেভার পর কোন কোন ঘরে পুড়ে যাওয়া আদম সন্তানের বিকৃত ও বীভৎস চেহারা দেখে চমকে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল এক মানুষ অন্য মানুষকে কি করে এত নিষ্ঠুরভাবে মারে! 


বদরুদ্দিন ওমর তার স্মৃতিচারণ গ্রন্থে বলেন, ... আমরা কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল আড়িয়াল খাঁ অনেক চওড়া হয়েছে। এক সময় মাঝি বললো সামনে একটা বাজার আছে। আমরা রান্নার জিনিসপত্র কিনতে চাইলে সে নৌকো ভিড়াবে। আমাদের কথায় সে নদীর ডানদিকে এক জায়গায় নিয়ে আমাদের নামালো। সেটা কোন ঘাট নয়। তবে নৌকো থেকে নেমে ডাঙ্গায় যাওয়া সহজ। মাঝি বললো বাজারের জন্য একটু ভিতরে যেতে হবে। তার কথামত এগিয়ে গিয়ে আমরা বাজার পেলাম। এক দোকানে চাল, ডাল, তেল, নুন, মশলা, আলু কিনে আমরা নৌকোয় ফিরলাম।


কাঠের ব্যবস্থা নৌকোতেই ছিল। মাঝ নদীতে গিয়ে ভাল করে হাঁড়ি ধুয়ে খিচুড়ি চড়িয়ে দেওয়া হলো। কাঠের চুলোয় নৌকার ওপর রান্নার অসুবিধে হলো না। দুটো মাটির শানকি ছিল। সেগুলো ভালোভাবে ধুঁয়ে আমরা খাওয়ার ব্যবস্থা করছি। এমন সময় নদীর বাঁ দিকে দেখলাম, পাড় থেকে নেমে কয়েকটা লোক কি যেন টানাটানি করছে। একটু লক্ষ করতেই বোঝা গেল, সেটা একটি মেয়ের লাশ। লোকদের কাজকর্ম দেখে মনে হলো, লাশ থেকে তারা কিছু নেওয়ার চেষ্টা করছে। মাঝি বললো, তারা লাশটির শরীর থেকে গয়নাগাটি খুলে নিচ্ছে।


এই দৃশ্য দেখতে থাকার সময় হঠাৎ সামনের দিকে নজর পড়ায় দেখা গেল এক ভয়াবহ দৃশ্য। একসাথে অনেকগুলো মেয়ের লাশ নদীর ওপর ভাসছে। সকলের পরনে শালোয়ার কামিজ। বোঝার অসুবিধা নেই, সেগুলো অবাঙালি মেয়েদের লাশ। সেই মেয়েদের লাশের সাথে বাচ্চাদের লাশও দেখা গেল। নৌকো লাশগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলেও লাশ কাতারবন্দী হয়ে আরও দেখা গেল। বোঝা গেল, সামনে বড় আকারে কোথাও অবাঙালী নিধন হয়েছে। আমরা খেতে বসার সময় এভাবে ভাসমান লাশগুলো দেখে সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার প্রবৃত্তি আর থাকলো না। আমরা দেখতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর সেই লাশের মিছিল শেষ হলো। আমরা খেতে বসলাম। খেতে তো হবেই। কোন রকমে খেলাম, মাঝিও আমাদের সঙ্গে খেলো, মনে হয় সোজা হাঁড়ি থেকেই।


লাশগুলো আসছিল টেকেরহাটের দিক থেকে। পরে আমরা শুনেছিলাম যে, ঐ এলাকার কাছাকাছি এক জায়গায় দুটি লঞ্চ দাঁড় করিয়ে তার যাত্রী বিহারী মেয়ে ও তাদের বাচ্চাদের বাঙালীরা খুন করে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। ঐ মেয়েরা আসছিল যশোরের নড়াইল শহর থেকে। তখন সেখানে এসডিও ছিল কামাল সিদ্দিকী। চারিদিকে বাঙালীরা খুন খারাবী করতে থাকার সময় প্রথম চোটে পুরুষদের মেরে ফেলেছিল। মেয়েদেরকে আটক করে পরে খুন করার ব্যবস্থা করেছিল। সে সময় কামাল সিদ্দিকী, যে আমার পরিচিত ও ছাত্র স্থানীয় ছিল, তাড়াতাড়ি দুটি লঞ্চ ভাড়া করে মেয়েদেরকে বরিশালের দিকে পাঠিয়ে সেখান থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়ার, হতে পারে ভারতের দিকে পাঠিয়ে দেওয়ার কোন ব্যবস্থা করছিল। পথে বাঙালীরা লঞ্চ দুটি আটক করে সেই নৃশংস হত্যাকান্ড করে। সেই নৃশংসতার বিবরণ টেকেরহাটেই শুনেছিলাম। কামাল সিদ্দিকী এরপর কলকাতায় চলে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালের পর আমার সাথে ঢাকায় দেখা হয়েছিল।


আমরা টেকেরহাট পৌঁছালাম। তখন বিকেল চারটের মত হবে। দেখলাম ঘাটে কতকগুলো লঞ্চ দাঁড়িয়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম একটা লঞ্চ বড়দিয়া যাবে। বড়দিয়া খুলনা যশোরের বর্ডারের কাছে মধুমতী নদীর ওপর। সেটা একটা বড় মোকাম এবং নদী বন্দরও বটে। আমরা লঞ্চটিতে উঠে বসলাম। লঞ্চ ছাড়ার কথা পাঁচটার দিকে। লঞ্চ ঘাটের কাছে নদীটা তেমন চওড়া নয়। লঞ্চে বসে দেখা গেল নদীর অন্য তীরে পানিতে লাশ ভাসছে। এমনকি আমাদের লঞ্চের গায়েও দুই একটা লাশ এসে লেগেছিল। ঢেউয়ের ধাক্কায় দোলা খাচ্ছিলো। সদ্য খুন করা লাশের ছড়াছড়ি এভাবে আগে কোনদিন দেখিনি।


জীবনে মানুষের করুণ মৃত্যুর অনেক চেহারা আমি দেখেছি। একেবারে প্রথম সেই ছেলেবেলায় ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ, তারপর কলকাতায় ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা, ১৯৭০ সালে দক্ষিণ বাঙলায় সাইক্লোন ও জলোচ্ছাস। তারপর ১৯৭১ সালের এই সব মৃত্যু। পরে আরও দেখেছি, ঢাকায় ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর থেকে করুণ আর কোন মৃত্যু নেই। আর গণহত্যা ও দাঙ্গায় মৃত্যুর থেকে মানুষের সামষ্টিক অমানুষিকতার বড় দৃষ্টান্ত মনে হয় আর নেই। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে এই অমানুষিকতার সাথেই আমরা বসবাস করছিলাম।"


সেনাবাহিনীকে আক্রমণ : 

আওয়ামী লীগ মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে। সেনানিবাসে খাদ্য ও জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ করে দেয় সশস্ত্র ক্যাডাররা। স্থানীয় বাজারের দোকানদাররা সেনাবাহিনীর কাছে সব ধরনের পণ্য বিক্রিতে অস্বীকৃতি জানাতে বাধ্য হয়। সেনানিবাসে তাজা খাবার, মাছ, মাংস, সবজির সংকট দেখা দেয়। এমনকি বাচ্চাদের দুধের মজুদও শেষ হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর চলাফেরা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় ও সেনাসদস্যদের ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করা ছাড়াও তাদের দিকে থুথু নিক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটে। আরো ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে কিছু কিছু স্থানে সশস্ত্র সেনাদের ওপর আক্রমণ করে তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল এবং এ সব ক্ষেত্রে হতাহতের ঘটনাও ঘটছিল। 


দুই একজন সেনা সদস্যকে প্রতিদিন হত্যা করা এক নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর মধ্যে একজন ছিলেন লে. আব্বাস। বাঙালি সেনা রক্ষীদের একটি দল নিয়ে লে. আব্বাস সেনাদের জন্য সবজি ক্রয় করতে বের হন। বাঙালি জঙ্গিরা ওই সেনাদলকে আক্রমণ করে আব্বাসকে হত্যা করে ও অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। তবে বাঙালি সৈনিকদের ফেরত পাঠায় অক্ষত অবস্থায়। লে. আব্বাসের হত্যাকান্ডের কোনো প্রতিকার করা যায়নি। তার কোর্সমেটেরা এর প্রতিশোধ নিতে চাইলে সরকার থেকে জানানো হয়েছিল, এসময় কোনো অপরাধীকে গ্রেফতার করাটা হবে অবিবেচকের মতো কাজ। সেনাদের ওই নিস্ক্রিয়তা জঙ্গিদের চাঙ্গা করে তোলে। 


মার্চের শুরু থেকেই নতুন রেশন পাওয়াটাই দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায় সেনাদের জন্যে। সেনা অফিসার ও সৈনিকদের বাধ্য হয়ে কেবল ডাল, রুটির মতো খাবার খেতে হয় বিরামহীনভাবে। একবার এক ব্যাংক ম্যানেজার লে. শাহ’র লেখা ব্যাংক চেকের বিপরীতে সমপরিমাণ টাকা দিতে অস্বীকার করে জানান যে, শেখ মুজিব সেনা অফিসারদের একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত টাকা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এক রাতে লে. শাহ অপর একজন সেনা কর্মকর্তার জরুরী বার্তা (SOS) পেয়ে একটি পশ্চিম পাকিস্তানী পরিবারকে উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে আসেন ও তাদের পশ্চিম পাকিস্তানে প্রেরণ করার ব্যবস্থা করেন। সেদিন রাতে উগ্রপন্থী বাঙালিরা ওই পরিবারটির বাড়ি-ঘর ও কারখানায় হামলা চালিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য ঢাকা বিমানবন্দরে অপেক্ষারত অবাঙালিরা ভয়ে ও আতংকে বিমানবন্দরের বাইরে না গিয়ে ভিতরেই বসে থাকতো। এ অবস্থায় তেজগাঁও বিমানবন্দরকে মনে হচ্ছিল যেন একটি উদ্বাস্তুদের ট্রানজিট ক্যাম্প। 


সেনা কর্মকর্তারা পরিস্থিতির অবনতি, আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে পড়া আর উসকানিমূলক আচরণে হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। কিন্তু কোনো অবস্থায়ই তাদের শক্তি প্রয়োগ করার অনুমতি ছিল না এবং তারা সেনানিবাসের মধ্যেই দিন পার করতেন। পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন সরওয়ার বর্ণনা করেছেন কীভাবে সেনানিবাসের সীমানার ঠিক পরেই উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী কর্মীরা নিজস্ব ব্যারিকেড তৈরি করেছিল যেখানে তারা পশ্চিম পাকিস্তানী, বিহারী, উপজাতি মোটকথা বাঙালি ছাড়া সবার তল্লাশি করতে ও এমনকি অনেক সময় মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিত। কিন্তু সেনাদের করার কিছুই ছিল না, কারণ তাদের এ ব্যাপারে যথেষ্ট ধৈর্যধারণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। 


সেনাবাহিনীর ওপর সবচেয়ে বড় আক্রমণ হয় গাজীপুরের জয়দেবপুরে। সেখানে ২ মার্চ সমরাস্ত্র কারখানা দখলের জন্য চেষ্টা চালায় নিউক্লিয়াস ও আওয়ামীলীগ। ভেতরের কিছু শ্রমিকদের সহায়তায় সেই কারখানা ও অস্ত্রের গুদাম দখল করতে আসে শত শত আওয়ামী কর্মী। তাৎক্ষনিকভাবে অনেক চেষ্টা করে হতাহত ছাড়া জঙ্গীদের থেকে অস্ত্র রক্ষা করতে সক্ষম হয় সেনাবাহিনী। 


এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গাজিপুরের সমরাস্ত্র কারখানার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য ব্রিগেডিয়ার জাহানজেবের নেতৃত্বে একদল সৈন্য সেখানে পৌঁছানোর আগে আওয়ামীলীগ কর্মীরা জয়দেবপুরে ব্যরিকেড সৃষ্টি করে। ব্যরিকেডের জন্য তারা একটি ট্রেনের বগি ব্যবহার করে। অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে জাহানজেবের নেতৃত্বে সৈন্যদল। তারা ব্যরিকেড সরিয়ে সেখানে পৌঁছায়। নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখে জাহানজেব আরবাব আবার যখন হেডকোয়ার্টারে ফিরে যাচ্ছিলেন তখন বিশৃংখলাকারীরা সৈন্যদলকে আবারো ঘিরে ফেলে। বন্দুক, শর্টগান, লাঠি, বোমা ইত্যাদি নিয়ে হামলা চালায়। জাহানজেব বাঙ্গালী অফিসার লে. ক. মাসুদকে গুলি চালাতে নির্দেশ দিলেন। মাসুদ ইতস্তত করলে অপর বাঙ্গালী অফিসার মঈন তার সৈন্যদের নিয়ে পাল্টা আক্রমন চালালে দুই জন নিহত হয় বাকীরা পালিয়ে যায়। মাসুদকে পরে ঢাকায় এসে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় আরেক বাঙ্গালী অফিসার কে এম শফিউল্লাহকে। এই কে এম শফিউল্লাহ শেখ মুজিবের আমলে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ছিলেন। 


এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কে এম শফিউল্লাহ বলেন, ১৯ মার্চ সকাল দশটায় তার ইউনিটকে জানানো হয় ব্রিগেড কমান্ডার মধ্যহ্নভোজে আসছেন এবং নিকটবর্তী গাজিপুর সমরাস্ত্র কারখানা পরিদর্শন করবেন। কিন্তু জনতা প্রায় ৫০০ ব্যরিকেড বসিয়ে সৈন্যদের আটকে দেয়। এগুলো সরিয়ে তারা আসলেও ফিরে যাওয়ার সময় জয়দেবপুরে মজবুত ব্যরিকেড সৃষ্টি করলে লে. ক. মাসুদ তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। এমন সময় দুজন বাঙ্গালী সৈনিক জাহানজেবকে জানায় তাদেরকে বেধড়ক পিটিয়েছে, অস্ত্র গোলাবারুদ ছিনিয়ে নিয়েছে। এবার জাহানজেব গুলি করার নির্দেশ দিলে মঈন তার সৈন্যদের গুলি করতে বলে। তবে বাংলায় বলে দেয় ফাঁকা গুলি করার জন্য। এরপরও পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রনে না এলে এবার জাহানজেব কার্যকরভাবে গুলি করার নির্দেশ দেন। তারাও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। দু’জন নিহত হয়। শফিউল্লাহ আরো জানান, গাজিপুরের পরিস্থিতিও ছিল উত্তেজনাকর। রাস্তায় ব্যরিকেড দেয়া হয়েছিল। সমরাস্ত্র কারখানার আবাসিক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার করিমুল্লাকে আটকে ফেলে বাঙ্গালীরা। আবাসিক পরিচালককে উদ্ধার করতে আমরা সেনা প্রেরণ করেছিলাম।


এদিকে ঢাকা ভার্সিটিতে কিছু বিদ্রোহী সেনাসদস্যের তত্ত্বাবধানে চলতে থাকে ছাত্রদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, প্যারেড ও শরীরচর্চা। ২৫ মার্চের সেদিনের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া জগন্নাথ হলের কালীরঞ্জন শীল উল্লেখ করেন ৭ মার্চের পর থেকেই তারা ঢাবির জিমন্যাসিয়ামে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তিনি নিজেও সেই প্রশিক্ষণ গ্রহন করেন। কয়েকদিন পর যখন তাদের ও মেয়েদের একটা গ্রুপের প্রশিক্ষণ শেষ হয় তখন তারা রাস্তায় বের হয় এবং মার্চ পাস্ট করেন। সেটা বিভিন্ন বিদেশী পত্রিকায় ছাপা হয়। সারা পৃথিবীকে জানানো হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন ঢাবির হলগুলোতে বহিরাগত ব্যক্তি ও ছাত্ররাও প্রশিক্ষণ নিত। ঢাকা ভার্সিটি দুইটি হল জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলে চলে নিউক্লিয়াসের জঙ্গী প্রশিক্ষণ। আর বাকীগুলোতে নিউক্লিয়াসের জঙ্গী কার্যক্রম একটিভ ছিল না। 


অরাজকতার মধ্যেই চলছে সংলাপ :

এতো এতো খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও হাল ছাড়েননি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। তিনি রাজনৈতিকভাবেই এই সমস্যার সমাধান চেয়েছেন। তাই তিনি সেনাবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছেন। তিনি ১৫ মার্চ ঢাকায় উড়ে এলেন। ১৬ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া একান্ত বৈঠক হলো এক ঘণ্টা। ১৭, ১৯ ও ২০ মার্চও দুজনের মধ্যে কথা হয়। তাঁদের দুজনের সঙ্গেই ছিল নিজ নিজ পরামর্শক টিম। তারা জানাল, কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, যার ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট একটা ফরমান জারি করবেন। ২১ মার্চ ভুট্টো ঢাকায় আসেন। এবার ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে ভুট্টো ও মুজিবের মধ্যে সমঝোতা করে দিতে চান ইয়াহিয়া। আলোচনা অনেক এগিয়েছে। শেখ মুজিব ভুট্টোর সাথে সমঝোতা করে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। 


এরপর কিছু নাটকীয় ঘটনা ঘটল। শেখ মুজিবের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেসা যুবনেতা আবদুর রাজ্জাককে (নিউক্লিয়াস প্রতিষ্ঠাতাদের একজন) ডেকে বললেন, ‘তোমরা এখনো বসে আছ? তোমাদের নেতা কিন্তু আপস করে ফেলেছে।’ এতে  নিউক্লিয়াসের মধ্যে তৎপরতা শুরু হলো। বেগম মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণকেই আপোষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ২২ মার্চ রাতে নিউক্লিয়াস নেতারা ধরনা দিলেন শেখ মুজিবের কাছে। 


শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁদের আলাপচারিতা উঠে এসেছে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজের বয়ানে:

২২ মার্চ রাতে আমরা ৩২ নম্বরে গেলাম। রাত তখন ১০টা হবে। বঙ্গবন্ধু স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে খাটে শুয়ে আছেন। আমরা মেঝের ওপর বসলাম। তিনি এক হাতের ওপর মাথা ভর দিয়ে কাত হয়ে আধশোয়া অবস্থায় কথা বলতে লাগলেন। আমি বললাম, ‘স্বাধীনতা ঘোষণা করে দ্যান।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘অনেক ভেবেছি, কোথাও সাপোর্ট নাই। ইন্ডিয়া সাপোর্ট দিতে পারে, নাও পারে। রাশিয়া দিবে কি না জানি না। আমেরিকা সাপোর্ট দিবে না। চায়না-হুজুরকে (মওলানা ভাসানী) বলছি, নেগেটিভ।’ ঠিক এই সময় সিরাজ ভাই (সিরাজুল আলম খান) উঠে বেরিয়ে গেলেন। ফিরলেন ৪০-৪৫ মিনিট পর। বললেন, ‘কনফেডারেশনের প্রস্তাব দিলে কেমন হয়? এতে পাকিস্তান থাকবে, কিন্তু ইয়াহিয়া এটা মানবে না। সুতরাং, আমাদের কাজটা হয়ে যাবে।’ বঙ্গবন্ধু মুচকি হেসে সিরাজ ভাইকে বললেন, ‘অ, তুই বুঝি মোস্তাকের (খন্দকার মোশতাক আহমদ) কাছে গেছিলি?’ 


একটা চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে ছাত্রসমাজের একটি অংশের চাপ ছিল। ছাত্রদের দাবি ছিল, গণ-আন্দোলন নিয়ে কোনো আপোস চলবে না। শেখ মুজিব কেন্দ্রের ক্ষমতা নেওয়া অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘোর বিরোধী ছিল নিউক্লিয়াস। প্রধানমন্ত্রী হওয়াটাকেই তারা আপোষ হিসেবে দেখেছে।


চরম সিদ্ধান্ত নেয় নিউক্লিয়াস। তারা মুজিবের ওপর ভরসা রাখে না। কারণ মুজিব ভুট্টোর সাথে কোয়ালিশন করে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। ২৩ তারিখ ভারত, রাশিয়া ও আমেরিকার মিডিয়ায় একটি খবর লিড নিউজ করে ছাপা হয়। বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান। প্রমাণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্র হাতে প্যারেডরত ছাত্র-ছাত্রীদের একটি ছবি প্রকাশিত হয়, যে ছবির কথা কালীরঞ্জন শীল উল্লেখ করেছেন। এই নিয়ে শুধু পাকিস্তান নয় সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তৈরি হয়। ভুট্টোর কথা সত্য প্রমাণিত হয়। ভুট্টো এতো দিন বলে আসছিল আওয়ামী লীগ গোঁয়ার্তুমি ও আলোচনা নামে সময় ক্ষেপন করছে। তারা পাকিস্তান ভেঙে দিতে চায়। তারা মুশরিকদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়।  


ইয়াহিয়া খান হতাশ হয়ে পড়লেন। ২২ তারিখের ক্ষমতা হস্তান্তরের সকল প্রক্রিয়া ২৪ তারিখে বন্ধ হয়ে গেল। ভুট্টো মুজিবের সাথে আর কোনো আলোচনা করতে রাজি না থেকে পশ্চিমে চলে যান। ২৪ মার্চ সন্ধ্যা ছয়টায় আওয়ামী লীগের আলোচক দল ইয়াহিয়ার পরামর্শক দলের সঙ্গে আবার বৈঠক করে। ওই বৈঠকে দেশের নাম ‘কনফেডারেশন অব পাকিস্তান’ হতে হবে বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটি সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই মিটিং-এ শেখ মুজিব ছিল না। ইয়াহিয়া খান ধৈর্য ধরে ঢাবির ঘটনা জানতে চান। তারা এটাকে কিছু উগ্রবাদীদের কাজ বলে উল্লেখ করেন। 


মুজিব পড়ে যায় বিপদে। নিউক্লিয়াস বিদেশি মিডিয়ার কাছে ছবি পাঠিয়ে মুজিবের সমস্ত রাজনৈতিক কাজের ইতি ঘটিয়ে দিল। মুজিব পালিয়ে না গিয়ে গ্রেফতার হওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। কারণ পালালে তার দেশদ্রোহী অপরাধ প্রমাণিত হবে। ইয়াহিয়া খান সকল আলোচনা বন্ধ করে দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। আর সেনাবাহিনী দেশদ্রোহীদের খোঁজার জন্য অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে। 


অপারেশন সার্চলাইট কী গণহত্যা ছিল? 

আমাদের শেখানো হয়েছে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে ঢাকার ঘুমন্ত মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেনাবাহিনী। এটা ঠিক নয়। মার্চের ২৫ দিন কাদের নেতৃত্বে সারাদেশে গণহত্যা চালানো হয়েছে, যুদ্ধের পরিবেশ কায়েম করা হয়েছে তা সম্পর্কে সেনাবাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছিল। ২৫ মার্চ কি এক পক্ষের হত্যাযজ্ঞ ছিল নাকি উভয় পক্ষের গোলাগুলি ছিল এটা আমরা সহজেই এখান থেকে অনুমান করতে পারি। জানুয়ারির থেকেই বাঙ্গালির কিছু অংশ উস্কানীমূলক স্লোগান দিত যা ছিল স্পষ্টত রাষ্ট্রবিরোধী। যেমন "বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর"। ঢাবির অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা যিনি ছাত্রদের রাষ্ট্রবিরোধী কাজে উস্কানী দিতেন, তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন তার স্ত্রীর লেখায় পাওয়া যায় ঢাকা ভার্সিটির কিছু ছাত্র রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতেন। বাসন্তি গুহ ঠাকুরতা বলেন, আমি প্রায় রাত সাড়ে বারোটা বা একটার দিকে গুলির শব্দে জেগে উঠি। আমি আমার স্বামীকে জাগিয়ে জিজ্ঞাসা করি যুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেল নাকি? তিনি বললেন, ও কিছু না, ছাত্ররা প্র্যাক্টিস করছে মাত্র। জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার এই কথা প্রমাণ করে ছাত্রদের কাছে যে রাইফেল রয়েছে এটা তিনি ভালোভাবেই জানতেন।


ঢাকা ভার্সিটিতে অনেকগুলো হল থাকলেও মূলত যুদ্ধ হয়েছে ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলে। অন্য সব হলের ছাত্ররা নিরাপদে ছিল। ইকবাল হল এখন যেটা জহুরুল হক হল নামে পরিচিত তার ঠিক উল্টোদিকেই মহসিন হল। ইকবাল হলে ঝামেলা হলো অথচ মহসিন হলে কিছুই হয় নি। শুধু মহসিন হল নয়, দুটি হল বাদে বাকী সব হল ছিল নিরাপদ। কারণ সেখানে কোনো অস্ত্রধারী ব্যক্তি বা ছাত্র ছিলো না। এটা দ্বারাও স্পষ্ট হয় ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট নিরস্ত্র ছাত্রদের বিরুদ্ধে ছিল না এবং এটা কোনো নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ছিলো না, গণহত্যা তো মোটেই না। এটা শুধুমাত্র একটা জঙ্গীবিরোধী অভিযান ছিল যা দেশরক্ষায় অত্যাবশ্যকীয় ছিল।


তবে আমার মনে হয় সেসময় ঢাবিতে নিউক্লিয়াসের একটা অংশ যারা সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে তারা ঘন্টাখানেকের বেশি সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়নি। সেক্ষেত্রে তারা বিদ্রোহী জঙ্গীদের পাইকারি হত্যা না করে গ্রেপ্তার করা যেত। তাহলে হয়তো পরিস্থিতি মোকাবিলা আরো সহজ হতো। কিন্তু তাই বলে ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট অযৌক্তিক বা ঘুমন্ত-নিরস্ত্র মানুষের উপর হামলা এটা বলা মোটেই যৌক্তিক নয়। বরং সারাদেশে বিহারীদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যে পাপ করেছে সে তুলনায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেক সহনশীল আচরণ করেছে। ঢাকায় ২৫ মার্চ আরেকটি স্থানে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালিত হয় সেটা হল শাঁখারিবাজার। আর্মিদের কাছে রিপোর্ট ছিল সেখানে অস্ত্র তৈরি করা ও অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। সেনাবাহিনী সেখানেও অভিযান চালায় এবং সেখানে অস্ত্র উদ্ধার করে। শাঁখারীবাজারেও সেনাবাহিনী সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সেখানেও সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত হয় ১৫-১৬ জনের মত। এই ঘটনার পরম্পরায় রাজারবাগে কিছু পুলিশ সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট তাদের কয়েকজনকে হত্যা করে ও বিদ্রোহীদের নিরস্ত্র করে।  

   

পাকিস্তানী সাংবাদিক ম্যাসকারেনাস যিনি পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানী সেনা অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন তিনিও ওই মার্চে পাকসেনাদের শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের প্রশংসা করে বলেছেন, অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ওইরূপ ধৈর্যধারণকে প্রশংসা করতেই হয়, কারণ সেনা কর্মকর্তারা এতোকিছুর পরও তাদের সৈনিকদের ২৫ দিনের দুঃস্বপ্নের ক্রান্তিকালে শান্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তার মানে ১ থেকে ২৫ মার্চ সেনাবাহিনীর ওপর যে নিদারুণ নির্যাতন করা হচ্ছিল তার একটি বহিঃপ্রকাশ ছিল অপারেশন সার্চলাইট। সেনা অভিযান শুরু হলেও রাতারাতি সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং বলা যেতে পারে তখনই এক সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতি অনুসরণ করা শুরু হয়। সম্পূর্ণ ভূখণ্ড অর্থাৎ ভারতের সাথে দেশের সীমানা ব্যাপী সরকারের কর্তৃত্ব পুন:প্রতিষ্ঠিত করতে সেনাবাহিনীর কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। 

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন