২৩ মার্চ, ২০২১

৫০ বছরের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

১৯৭১ সালের দেশভাগের ৫০ বছর হতে চলেছে। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে বহু লেখা হচ্ছে এবং হবে। অনেকে আলোচক এই নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। দুঃখজনক হলো এখানে তারা নিজেদের প্রত্যাশাকে বাংলাদেশের প্রত্যাশা বলে ভুল করছেন। গতকাল এক বক্তব্যে আমার দলের সাধারণ সম্পাদক মিয়া গোলাম পরওয়ারও তাঁর নিজের প্রত্যাশাকে দেশের প্রত্যাশা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে বহু প্রত্যাশা ও বহু প্রাপ্তি ছিল। এদেশে বহু মানুষ বহুরূপ, বহুধা বিভক্ত। তাই তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি বহুরূপ ও সাংঘর্ষিক।

১৯৭২ সালে দেশভাগ পরবর্তী জনগণকে মোটাদাগে তিনভাগে ভাগ করা যায়
১. দেশভাগের পক্ষের শক্তি 
২. দেশভাগের বিপক্ষের শক্তি 
৩. দেশভাগ নিয়ে নিরপেক্ষ শক্তি 

১. দেশভাগের পক্ষের শক্তি 
দেশভাগ নিয়ে যারা পক্ষের শক্তি তাদের মধ্যে যারা তাদের মধ্যে দুইটি পক্ষ 
ক) মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী পক্ষ 
খ) নেতৃত্বদানকারীর মূল উদ্দেশ্য না জেনে যারা যুদ্ধে এটেইন করেছেন অথবা পক্ষে থেকেছেন 

ক পক্ষের প্রত্যাশা ছিল  
- বাংলাদেশকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা (রাশিয়ার আদলে)
- এই দেশ থেকে ধর্মীয় ভাবধারা বা ধর্মের প্রভাব নিশ্চিহ্ন করে নাস্তিকতা প্রতিষ্ঠিত করা 
- ধনী-গরীবের ব্যবধান দূর করা (পুঁজিবাদ দূর করা)
- দেশের সকল সম্পত্তি জাতীয়করণ করা 

ক পক্ষের প্রাপ্তি 
- ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতিতে সমাজতন্ত্র যুক্ত করা। কিছুদিন পর তা বাতিল হলেও এখন আবার সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে যুক্ত হয়েছে। 
- ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধ করা, কওমী মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া।  
- দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বোরকা ও হিজাব নিষিদ্ধ করা। যেসব স্থানে ইসলাম ও মুসলিম শব্দ আছে তা মুছে ফেলা। ইসলামপন্থী নেতাদের কারাগারে আবদ্ধ করা। তাদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া। বহু ইসলামপন্থীকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা। 
- অবাঙ্গালি মালিকদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা ও তাদের কলকারখানা জাতীয়করণ করে তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা।
- ১০০ বিঘার বেশি জমি একজনের কাছে থাকবে না। এই আইন প্রতিষ্ঠা।  

ক পক্ষের অপ্রাপ্তি 
- দেশ ও জনগণের মধ্যে সমাজতন্ত্রের প্রভাব তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়া। সমাজতন্ত্রকে আদর্শ হিসেবে যারা নিয়েছে নিতান্তই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র।  
- নাস্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা যায় নি। ৫০ বছর পরে আজ বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রভাব অনেক বেড়েছে। রাজনীতিতে সবাইকে এখানে ধর্ম নিয়েই চলতে হয়। 
- ধনী গরীবের মধ্যে ব্যবধান দূর হয়নি। বরং তা আরো প্রকট হচ্ছে। গত দশবছরে ধনী বৃদ্ধি ও গরীব বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বে সামনের সারিতে। 
- অবাঙ্গালিদের সম্পদ ছাড়া আর কারো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হয়নি। 

খ পক্ষের প্রত্যাশা 
- মুসলিম জাতীয়তাবাদের (উম্মাহ চেতনা) উৎখাত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করা 
- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা  
- গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা  
- বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করা (সোনার বাংলা গঠন)

খ পক্ষের প্রাপ্তি 
- সর্বক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে 

খ পক্ষের অপ্রাপ্তি 
- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। 
- লুটপাট চুরি ডাকাতি সামাজিক অনাচার বৃদ্ধি পেয়েছে
- গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার নাই বললেই চলে 
- বাংলাদেশ দিন দিন ঋণের ভারে জর্জরিত হচ্ছে। 
- মানুষের নিরাপত্তা নাই বললেই চলে 

২. দেশভাগের বিপক্ষ শক্তি 
যারা দেশভাগের বিপক্ষ শক্তি তারাও দুইভাগে বিভক্ত 
ক) পক্ষের শক্তির সাথে মিশে যাওয়া  
খ) নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখা 

ক পক্ষের প্রত্যাশা 
- পক্ষের শক্তির সাথে কোনোরকম মিশে গিয়ে নিজের জীবন বাঁচানো ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা 

ক পক্ষের প্রাপ্তি 
- বেশিরভাগই পক্ষের শক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে সক্ষম হয়েছে। অনেকেই নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। 

ক পক্ষের অপ্রাপ্তি 
- এই পক্ষের কোনো অপ্রাপ্তি নেই। 

খ পক্ষের প্রত্যাশা 
- নিজেদের সংগঠিত করা 
- ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক ধারা চালু করা 
- মুসলিম উম্মাহ চেতনা জাগ্রত করা  
- মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ভাবধারা ফিরিয়ে আনা 
- ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, বিপুলভাবে মসিজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা 
- ইসলামকে আবারো দেশের মূলনীতিতে ফিরিয়ে আনা 
- স্বৈরাচার প্রতিরোধ করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা 

খ পক্ষের প্রাপ্তি
- নিজেদের সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছে 
- ইসলামভিত্তিক রাজনৈতিক ধারা চালু হয়েছে 
- মানুষের মধ্যে দিনে দিনে ধর্মের প্রভাব বাড়াতে সক্ষম হয়েছে 
- ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রনয়ণ, সে অনুসারে প্রতি জেলায় স্কুল প্রতিষ্ঠা 
- ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু এবং তা দিনে দিনে জনপ্রিয় হওয়া 
- স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থানে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হওয়া 
- ব্যাপকভাবে মসজিদ মাদ্রাসার চাহিদা বেড়ে যাওয়া 

খ পক্ষের অপ্রাপ্তি
- স্বৈরাচারী শাসন রুখতে না পারা 
- জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে উম্মাহ চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে না পারা 
- ইসলামকে মূলনীতিতে নিয়ে আসতে না পারা 
- ইসলামবিরোধী নীতিগুলো (শিরক, সুদ, জেনা) প্রতিরোধ করতে না পারা 
- ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি জনমত তৈরিতে ব্যর্থ হওয়া। যারা বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় তাদের সংখ্যা ১৫% এর কম। 

 ৩. দেশভাগ নিয়ে নিরপেক্ষ শক্তি 
দেশভাগ নিয়ে যারা নিরপেক্ষ ছিল তাদের প্রত্যাশা আর না বুঝে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা লোকদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি একইরকম। তাই আবার উল্লেখ করলাম না।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন