১৩ এপ্রিল, ২০২১

পর্ব : ১২ - দ্বীন কায়েমের জন্য সবচেয়ে প্রায়োগিক ইবাদত সালাত



সালাত মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর মাধ্যমে ইকামাতে দ্বীনের কর্মীদের জন্য অর্থাৎ মুসলিমদের জন্য সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণ সবার জন্য অত্যাবশ্যক করা হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সা. সালাতকে ঈমানদার ও কাফিরের মধ্যে পার্থক্যকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহর রাসূল সা. যখন আরববাসী থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে মন খারাপ করেছিলেন তখনই আল্লাহ তায়ালা নবিজী সা.-কে সালাতের মতো প্রায়োগিক ইবাদত ফরজ করে ধন্য করেছেন। এই ইবাদত ফরজ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা নবিজী সা.-কে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন।

এছাড়াও পবিত্র কুরআনে সবচেয়ে বেশি যে ইবাদতের কথা এসেছে তা হলো সালাত। এই সালাতের মাধ্যমে মুসলিমদের তাওহিদ, সাম্য, শৃঙ্খলা, আনুগত্য, নেতা নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় শেখানো হয়। যা একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে আল্লাহর রাহে সঁপে দেওয়া শেখানো হয়। আমি আল্লাহর আনুগত্যের মধ্যে আছি একথা যাতে ভুলে না যাই তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন মুসলিমকে সালাত সবসময় রিমাইন্ডার দেয়, আল্লাহ আমাকে কেন পাঠিয়েছেন? আমি কী করছি? এজন্যই আল্লাহ তায়ালা সূরা আনকাবুতের ৪৫ নং আয়াতে বলেছেন নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে অন্যায় এবং অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে সালাত। সালাত দ্বীন প্রতিষ্ঠার গুণগুলো অর্জনে সহায়তা করে একইসাথে আমাদের আত্মিক মান উন্নয়ন ও রবের সাথে আমাদের সম্পর্ক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

‘কায়েম করা’ কথাটির অর্থ হচ্ছে, প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বারংবার সালাত প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। কুরআনে নানানভাবে নামাজের কথা এসেছে প্রায় ১০৪ বার এবং প্রায় ১৮ বার আল্লাহ তায়ালা আদেশ সূচকভাবে নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। নামাজ কায়েম বলতে আমরা সাধারণত নামাজের অনুষ্ঠান বাস্তবায়নকে বুঝি। অর্থাৎ আমরা সাধারণত যা বুঝি নিজে নামাজ পড়া অন্যদেরকে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করাই হচ্ছে আকিমুস সালাহ বা নামাজ কায়েম। আসলে আকিমুস সালাহ বলতে কী বুঝায় তা আমরা আজ আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

সালাত প্রতিষ্ঠা দুই ধরণের হতে পারে
১- ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠা
২- সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠা

ব্যক্তির মধ্যে নামায প্রতিষ্ঠা আবার দুই ধরণের হতে পারে
ক- নামাজকে ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা
আমরা প্রায় সবাই স্মার্ট ফোন ইউজ করি। আপনারা জানেন এসব স্মার্ট ফোনে কিছু এপস বা কিছু প্রোগ্রাম প্রথম থেকেই ইন্সটল করা থাকে আবার কিছু প্রোগ্রাম পরবর্তীতে আমাদের প্রয়োজন অনুসারে ইন্সটল করি। ঠিক তেমনি আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেহে কিছু প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার বা এপস শুরু থেকেই ইন্সটল করে দিয়েছেন। যেমন আমরা নিঃশ্বাস নেই, ক্ষুদা লাগলে খাই, ক্লান্তি লাগলে ঘুমাই ইত্যাদি। এরপর আমরা যখন আস্তে আস্তে বড় হই তখন কিছু কিছু ব্যাপার আমরা নিজেরা নিজেদের খুশিমত ইন্সটল করে নিই যেমন কেউ গান শোনা ছাড়া থাকতে পারি না, কেউ গল্পের বই পড়তে পড়তে প্রচুর সময় ব্যয় করি, কেউ প্রচুর খেলাধুলা করি, কেউ প্রচুর টিভি দেখি ইত্যাদি। আমরা যারা যেগুলো ইন্সটল করে নিয়েছি সেগুলো ছাড়া আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। কোন কারণে টিভি না দেখলে বা না গান শুনলে বা না বই পড়লে আমাদের কাছে সব এলোমেলো লাগে। এটাই হচ্ছে আপনি বা আমি এই বিষয়গুলোকে নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছি। ঠিক তেমনি নামাজও এইভাবে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয় আছে। কেউ যদি নামাযকে তার নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে নেয় তখন নামাজের সময় হওয়া মাত্রই সে অস্থির হয়ে পড়বে। নামায পড়ার জন্য তার মন আনচান করবে। তাদের অন্তর থাকবে মসজিদের সাথে লাগোয়া।

আল্লাহর রাসূল সঃ বলেছেন, আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেছেন যেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। এর মধ্যে এক ধরণের ব্যক্তি যার ক্বলব মসজিদের সাথে লেগে রয়েছে।

নামাজকে নিজের মধ্যে ইন্সটল বা প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতি হচ্ছে বার বার নামাজ পড়া। নামাজের প্রতি সচেতন থাকা। নামাজ না পড়ার শাস্তি এবং আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার শাস্তি স্মরণ করা। এভাবে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নামাজ আমাদের শরীরে এবং ক্বলবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইনশাআল্লাহ্‌।

খ- নামাজের শিক্ষাকে ব্যক্তির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা
শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক নামাজ আদায় করলেই নামাজ কায়েমের হক আদায় হয় না। বরং নামাজ থেকে শিক্ষাগ্রহন করে সেই শিক্ষা নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করাও নামাজ কায়েম তথা নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই ব্যাপারে রাসূল সঃ এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে, আবু হুরায়রা রা. বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুক মহিলা নামাজ ও যাকাতে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তবে সে নিজের মুখ দ্বারা তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, সে জাহান্নামী। লোকটি আবার বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, অমুক মহিলা সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে কম (নফল) রোজা রাখে, কম (নফল) সদকা করে এবং নামাজও (নফল) কম পড়ে। তার দানের পরিমাণ হলো পনিরের টুকরাবিশেষ। কিন্তু সে নিজের মুখ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। রাসূল সা. বললেন, সে জান্নাতী।
(আহমাদ ও বায়হাকী, শু’আবুল ঈমান)

এই হাদীস থেকে যে বিষয়টা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো নামাজ নিয়মিত পড়েও যদি কোন ব্যক্তি নামাজের শিক্ষাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে না পারেন, নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন তাহলে তিনি নামাজ কায়েম করতে পারেন নি। তার নামাজ পড়া কোন কাজে আসবে না। তাই আমাদের নামাজ আদায়ের সাথে সাথে নিজের জীবনে নামাজের শিক্ষা কায়েম করা একান্ত কর্তব্য। এটি আকিমুস সালাহর অংশ।

আসুন আমরা নামাজ থেকে যে শিক্ষাগুলো পাই সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি।

১. সকল কাজে আল্লাহকে স্মরণ করা।
সূরা ত্বোয়াহ’র ১৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমিই আল্লাহ আমি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম করো। আমরা যে কাজই করি না কেন আমরা অবশ্যই সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করবো। প্রতিটা কাজ করার পূর্বে চিন্তা করবো আল্লাহ আমাকে দেখছেন, এই কাজের জন্য আমাকে জবাবাদিহি করতে হবে। এভাবে আল্লাহকে স্মরণ করে যদি আমরা চলতে পারি তাহলে আমাদের দ্বারা পাপ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এটাই নামাজের শিক্ষা। আর এই শিক্ষাটাই দ্বীন প্রতিষ্ঠার বেসিক শিক্ষা। আল্লাহ ও তাঁর বিধানকে সার্বভৌম মনে করা। আমাদের আকিদা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এর মানে হলো আমি আল্লাহ ব্যাতীত আর কারো বিধান মানবো না।

২. আল্লাহর আদেশ মানার মানসিকতা সৃষ্টি করা
সূরা বাকারার ১৭৭ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা মুখ পূর্ব দিক করলে না পশ্চিম দিক করলে, এটি কোন সওয়াব বা কল্যাণের কাজ নয়। বরং সওয়াব বা কল্যাণের কাজ সে-ই করে, যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীদের বিশ্বাস করে বা মান্য করে। আর শুধু আল্লাহর ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর ধনসম্পদকে আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন, পথিক, সাহায্যপ্রার্থী ও ক্রীতদাস মুক্তির জন্যে ব্যয় করে এবং নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে, ওয়াদা করলে তা পূরণ করে, দারিদ্র্য, বিপদ-আপদ ও হক বাতিলের দ্বন্দ্বের সময় ধৈর্য ধারণ করে। এরাই (ঈমানের ব্যাপারে) সত্যবাদী এবং এরাই মুত্তাকী।

এখানে আল্লাহ তায়ালা নামাজে আমরা কোনদিক ফিরে দাঁড়াবো সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছেন, মূল কথা হলো আল্লাহ যা বলেছেন তা করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। একজন মু’মিনের কাজের মানদণ্ড হবে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সা.। তাদের কথার বা আদেশের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। এটাই আমাদের আকিদা। দ্বীনের ভিত্তি। আই থিওরি দিয়েই আমরা সমাজকে সাজাবো। সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবো। এটাই আমাদের দায়িত্ব।

৩. সতর ঢাকা বা পর্দার শিক্ষা
নামাজে সতর ঢাকা পূর্বশর্ত। এর মাধ্যমে আমাদের পর্দা শেখানো হয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের বিধান অত্যন্ত যৌক্তিক ও উপকারী। শরীয়ত বিশেষ কোনো পোশাক সুনির্দিষ্ট করে দেয়নি এবং কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন বা আকৃতিও বলে দেয়নি যে, এ ধরনের পোশাকই তোমাদের পরতে হবে; বরং বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল, আবহাওয়া ও মৌসুম ভেদে পোশাক পরিধানের স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে কিছু মৌলিক নীতি ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, এ ধরনের পোশাক গ্রহণীয় ও এ ধরনের পোশাক বর্জনীয়। একটি ইসলামী রাষ্ট্রের পোষাকের সংস্কৃতি কেমন হবে তার শিক্ষা এখান থেকে পাওয়া যায়।

এক. পোশাক এমন আঁটসাঁট ও ছোট মাপের হতে পারবে না, যা পরলে শরীরের সাথে লেপ্টে থাকে এবং দৈহিক গঠন ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফুটে ওঠে।

দুই. পোশাক এমন পাতলা ও মিহি হতে পারবে না যাতে শরীর দেখা যায় এবং সতর প্রকাশ পেয়ে যায়।

তিন. পোশাকের ক্ষেত্রে কাফের-মুশরিক ও ফাসেক লোকদের অনুসরণ-অনুকরণ ও সাদৃশ্য অবলম্বন করা যাবে না। বিশেষত সেইসব পোশাকের ক্ষেত্রে যা অমুসলিমদের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।

চার. পোশাকের মাধ্যমে অহংকার ও লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ উদ্দেশ্য হওয়া যাবে না।

পাঁচ. পুরুষদের জন্য মেয়েলী পোশাক এবং নারীদের জন্য পুরুষদের পোশাক পরা এবং একে অন্যের সাদৃশ্য গ্রহণ করা নিষেধ।

ছয়. পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে অপচয় ও অপব্যয় করা, বিলাসিতা করার জন্য বা শখের বশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক ক্রয় করা অথবা মাত্রাতিরিক্ত উচ্চমূল্যের পোশাক ক্রয় করা নিষেধ।

সাত. গায়রে মাহরাম ও পর পুরুষের সামনে অলংকার ও পোশাকের সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে না, যাতে তারা সেদিকে আকৃষ্ট হয়।

আট. পুরুষের জন্য টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে কাপড় নিষেধ এবং তা কবীর গুনাহ।

৪. সময়ানুবর্তিতা শিক্ষা
নামায সময়মত পড়তে হয়। সময়মত না পড়লে নামাজ হয় না। এই ব্যাপারে সূরা মাউনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ঐসব মুসল্লিদের জন্য ধ্বংস যারা তাদের নামাজের (সময়ের) ব্যাপারে গাফেল। এই সময়ানুবর্তিতার ব্যাপারে শুধু নামাজে নয় নামাজের বাহিরেও সকল কাজে সচেতন থাকা নামাজের শিক্ষা। একজন মুসলিম তার দায়িত্বের ব্যাপারে কখনোই বেখেয়াল থাকবে না।

সালাতকে সমাজে প্রতিষ্ঠা

সমাজে সালাত প্রতিষ্ঠা দুইভাবে হতে পারে

ক. নামাজের অনুষ্ঠানকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
খ. জামায়াতে নামাজের সামাজিক শিক্ষা

ক- ফরজ নামাজ জামায়াতের সাথে পড়ে নামাজের অনুষ্ঠানকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
নামাজের অনুষ্ঠানটির আরকান-আহকামসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানুষকে শিক্ষা দিয়ে, মসজিদ নির্মান করে সেখানে নামাজ পড়তে পারার ব্যবস্থা করা। যখনই নামাজের আহ্বান হবে তখন সকল কাজ বাদ দিয়ে নামাজে অংশগ্রহন করার ব্যবস্থা করা। ইসলামিক সমাজে সকল মুসলিমের জন্য নামাজের জামায়াতে শরিক হওয়া বাধ্যতামূলক করা। এই প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামীন সূরা জুমআ'র ৯ নং আয়াতে বলেন, হে ঈমানদারগণ, জুমআর দিন যখন নামাজের জন্যে (আজানের মাধ্যমে) ডাকা হয়, তখন বেচা-কেনা রেখে আল্লাহর স্মরণের দিকে (নামাজের দিকে) দ্রুত চলে যাও। এটি তোমাদের জন্যে উত্তম যদি জানতে।

সূরা বাকারার ৪৩ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।

এই ধরনের অনুষ্ঠান নিয়মিত পালন এবং এর ব্যবস্থা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধানেরও। সূরা হজ্জের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘তারাই ঐসব লোক, যাদেরকে যদি আমি দুনিয়াতে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করি, তারা নামায কায়েম করে, যাকাত চালু করে, ভালো কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। আর সকল বিষয়ের শেষ ফল আল্লাহরই হাতে”। ইসলামী সরকার কর্তৃক যে কাজগুলো করা জরুরী-

ক. সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত জামাআতে নামাযের ব্যবস্থা করতে হবে। সকল মুসলমান কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জামাআতে শরীক হওয়ার ব্যবস্থা করা।
খ. সরকারি হুকুমের ফলে দেশে সকল প্রতিষ্ঠানে জামাআতে নামাযের সুব্যবস্থা থাকবে।
গ. জামাআতে নামায আদায় করার জন্য সব স্থানে মসজিদ তৈরী হবে।
ঘ. ছোট বয়স থেকে সকল মুসলিম ছেলেমেয়েকে শুদ্ধভাবে নামায শেখানোর সুব্যবস্থা করতে হবে।
ঙ. নামায যে শুধু একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয় এবং নামাযের উদ্দেশ্য যে উন্নত চরিত্র গঠন করা, সে বিষয়ে সবাই সচেতন হবে।
চ. এমন পরিবেশ গড়ে তোলা, যাতে সবাই নিয়মিত জামাআতে হাজির হওয়ার জন্য তৎপর হবে।

এই জামায়াতে নামাজের অনুষ্ঠানটি কতটা জরুরী এই প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসূল সঃ এর হাদীস থেকে পাই, আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, আল্লাহর কসম, আমার ঐ সব মুসলমানের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে যারা (বিশেষ ওজর ছাড়া) আযানের পর জামায়াতে নামাজ পড়তে না এসে, ঘরে একা নামাজ পড়ে।

উপরে বর্ণিত কুরআন ও হাদীসের বক্তব্য থেকে অতি সহজে বুঝা যায় যে, ইসলাম জামায়াতে নামাজ পড়াকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। নামাজের সময় হলে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি কাজ বন্ধ রেখে জামায়াতে নামাজ পড়তে আসা জরুরি।

খ- জামায়াতে নামাজের সামাজিক শিক্ষা:

১. ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, ভালবাসা ইত্যাদি সামাজিক গুণ সৃষ্টি করা
পবিত্র কুরআনের সূরা হুজুরাতের ১০ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, মুমিনরা পরস্পরের ভাই। আল্লাহ এখানে বলছেন, এক ভাইয়ের অন্তরে অন্য ভাইয়ের জন্যে যেমন সহানুভূতি, সহমর্মিতা, স্নেহ-শ্রদ্ধা, ভালবাসা ইত্যাদি থাকে, একজন মুমিনের অন্তরেও ঠিক অন্য মুমিনের জন্যে অনুরূপ অনুভূতি থাকবে। রাসূল সা. বলেছেন, মুসলমানদের সমাজ একটি দেহের মত। দেহের কোথাও কোন ব্যথা বা কষ্ট হলে সমস্ত দেহে তা অনুভূত হয়। আবার দেহের কোথাও সুখ অনুভূত হলে তাও সমস্ত শরীরে অনুভূত হয়। মুসলমানদের সমাজও হতে হবে অনুরূপ। অর্থাৎ তাদের সমাজের কোন ব্যক্তির উপর কোন দুঃখ-কষ্ট আসলে সমাজের সকলের উপরও তার ছাপ পড়তে হবে এবং সবাইকে সেটি দূর করারও চেষ্টা করতে হবে। আবার সমাজের কারো কোন সুখের কারণ ঘটলেও সমাজের সকলের উপর তার ছাপ পড়তে হবে।

‘মুমিনরা পরস্পরের ভাই’ কথাটি বলেই আল্লাহ ছেড়ে দেন নাই। ভাইয়ের অন্তরে ভাইয়ের জন্যে যেমন স্নেহ-শ্রদ্ধা, মমতা, ভালবাসা, সহমর্মিতা ইত্যাদি থাকে তেমন মুসলমানদের সমাজের সদস্যদের পরস্পরের অন্তরেও অনুরূপ গুণাবলী সৃষ্টি করার জন্যে, তিনি ব্যবস্থা দিয়েছেন জামায়াতে নামাজের। আর এটি জামায়াতে নামাজ পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বর্ণ, গোত্র, আকৃতি নির্বিশেষে একটি জাতি (মুসলিম উম্মাহ) গঠনে এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ কথা সবাই স্বীকার করবেন যে, পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ, ওঠা-বসা যত বেশি হয়, ততই একজনের প্রতি আর একজনের মায়া-মহব্বত, স্নেহ-মমতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা ইত্যাদি বেশি হয়। আর তা না হলে ঐ সবগুলো বিষয়ই ধীরে ধীরে কমে যায়। জামায়াতে নামাজ মুসলমানদের সমাজের একজনের সঙ্গে আর একজনের সেই দেখা-সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

২. শৃঙ্খলার শিক্ষা
সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যতীত কোন জাতি উন্নতি করতে পারে না। জামায়াতে নামাজের মাধ্যমে মুসলমানদের সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অপূর্ব শিক্ষা দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার মুসলমানও যদি জামায়াতে দাঁড়ায়, তবুও দেখবেন, সোজা লাইনে দাঁড়িয়ে, কী সুন্দর শৃঙ্খলার সঙ্গে তারা একটি কাজ করছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের শিক্ষা দিতে চাচ্ছেন, তারা যেন ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি কাজ সুশৃঙ্খলভাবে করে। এত সুন্দর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের সামাজিক শৃঙ্খলার অবস্থা দেখলে সত্যিই দুঃখ হয়। সালাতকে উপলব্ধি করে আমাদের এইগুণ অর্জন করতে হবে। একটি ইসলামী রাষ্ট্রের জনগণ কখনোই বিশৃঙ্খল হবে না এটা নামাজের শিক্ষা।

৩. সাম্যের শিক্ষা
পবিত্র কুরআনের সূরা হুজরাতের ১৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, হে মানুষ, আমি তোমাদের একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সেই সব থেকে বেশি সম্ভ্রান্ত, যার অন্তরে আল্লাহভীতি সব থেকে বেশি।

আল্লাহ এখানে বলছেন, তিনি মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একজন পুরুষ ও একজন মহিলা থেকে। এরপর তিনি তাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন। তবে এই বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করার পেছনে তাঁর উদ্দেশ্য পরস্পর সম্মান ও মর্যাদা নির্ণয় করা নয় বরং পরস্পরকে সহজে চেনার ব্যবস্থা করা। এরপর আল্লাহ বলেছেন, তাঁর নিকট মানুষের সম্মান-মর্যাদার মাপকাঠি হচ্ছে আল্লাহভীতি। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় যার অন্তরে যত বেশি, আল্লাহর নিকট সে তত বেশি মর্যাদাশীল। আল্লাহর ভয়ই মানুষকে অন্যায় কাজ থেকে দূরে রাখে এবং ন্যায় কাজ করতে বাধ্য করে। তাহলে আল্লাহ বলছেন, ন্যায় কাজ করা বা বাস্তবায়ন করা এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকা বা তা প্রতিরোধ করাই হচ্ছে মানুষের মর্যাদাশীল হওয়ার মাপকাঠি।

বংশ, জাতি, ধনী-গরীব, কালো-সাদা, মনিব-চাকর ইত্যাদি নিয়ে যেন অহংকার সৃষ্টি না হতে পারে, সে জন্যে তিনি কর্মপদ্ধতিও তৈরি করে দিয়েছেন। সেই কর্মপদ্ধতি হচ্ছে ‘জামায়াতে নামাজ’। একজন মুসলমান দিনে পাঁচবার জামায়াতে নামাজের সময় তার বংশ, ভাষা, গায়ের রং, অর্থনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি পরিচয় ভুলে গিয়ে অন্য মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে এক লাইনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এ সময় মনিবের পাশেই তাঁর ভৃত্য দাঁড়াতে পারে বা মনিবের মাথা যেয়ে লাগতে পারে সামনের কাতারে দাঁড়ানো তাঁর ভৃত্যের পায়ের গোড়ালিতে। এভাবে দিনে পাঁচবার বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মুসলমানদের অন্তর থেকে বংশ, বর্ণ, ভাষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ভিত্তিক অহংকার সমূলে দূর করার অপূর্ব ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি মুসলিম উম্মাহ গঠনে সাম্যের এই জরুরি প্রশিক্ষণ আল্লাহ তায়ালা সালাতের মাধ্যমে ব্যবস্থা করেছেন।

৪. সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতির বাস্তব শিক্ষা
মানবসমাজের সুখ, শান্তি, উন্নতি, প্রগতি ইত্যাদি নির্ভর করে সুষ্ঠুভাবে সমাজ পরিচালনার ওপর। সুষ্ঠুভাবে সমাজ পরিচালনা করতে হলে কী কী বিষয় দরকার, জামায়াতে নামাজ পড়ার মাধ্যমে আল্লাহ প্রতিদিন পাঁচ বার তা মুসলমানদের মনে করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। সেই বিষয়গুলো হচ্ছে-

ক. নেতা নির্বাচন করা
জামায়াতে নামাজের সময়, একের অধিক লোক হলেই একজন ইমাম বা নেতা বানাতে হয়। এখান থেকে আল্লাহ শিক্ষা দিচ্ছেন, কোন সামাজিক কর্মকাণ্ড, যেখানে একের অধিক লোক জড়িত, তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে হলে একজন নেতা অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে।

খ. পুরুষ না মহিলা নেতা
জামায়াত যদি শুধু পুরুষের হয় বা পুরুষ ও মহিলা মিশ্রিত হয়, তাহলে পুরুষ ইমাম হবে। কিন্তু জামায়াত যদি শুধু মহিলাদের হয়, তবে সেখানে মহিলা ইমাম হতে পারবে। এ থেকে আল্লাহ শিক্ষা দিতে চাচ্ছেন, যে সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড পুরুষ ও মহিলা অধ্যুষিত বা শুধু পুরুষ অধ্যুষিত, সেখানে পুরুষই নেতা হবে। আর যে সকল সামাজিক কর্মকাণ্ড শুধু মহিলা অধ্যুষিত, সেখানে মহিলা নেতা হতে পারবে।

এর কারণ হল, পুরুষ ও মহিলা মিশ্রিত সামাজিক কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে চালাতে হলে, একটি বিশেষ দৈহিক, বুদ্ধি-বৃত্তিক ও মানসিক গঠন দরকার। যিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই সব থেকে ভাল জানেন, ঐ ধরনের সামাজিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যে ঐ তিনটি গুণের প্রয়োজনীয় সমন্বয় কার মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভাল আছে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে তিনি পুরুষকেই সে দায়িত্ব দিয়েছেন। আর এটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে আল্লাহ বলেছেন, সূরা নিসার ৩৪ নং আয়াতে। পুরুষেরা হচ্ছে নারীর পরিচালক। কারণ, আল্লাহ তাদের একজনকে অপরের উপর বিশিষ্টতা দান করেছেন।

গ. নেতা হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাগুণ
যে গুণাবলী থাকলে কোন ব্যক্তি নেতা হতে পারবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুণগুলো রাসূল সা. সুন্দরভাবে মুসলমানদের জানিয়ে দিয়েছেন, নামাজের ইমাম হওয়ার গুণাবলী বর্ণনাকারী নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে-

হযরত আবু মাসউদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : মানুষের ইমামতি করবে সে-ই, যে কুরআন ভাল পড়ে। যদি কুরআন পড়ায় সকলে সমান হয়, তবে যে সুন্নাহ বেশি জানে। যদি সুন্নাহেও সকলে সমান হয়, তবে যে হিজরত করেছে সে। যদি হিজরতেও সকলে সমান হয়, তবে যে বয়সে বেশি। কেউ যেন অপর ব্যক্তির অধিকার ও সেইস্থলে ইমামতি না করে এবং তার বাড়িতে তার সম্মানের স্থলে অনুমতি ব্যতীত না বসে। (মুসলিম)

এ হাদীসটিতে রাসূল সা. ইমাম হওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় গুণাগুণ বা যোগ্যতাগুলো যে ক্রম অনুযায়ী উল্লেখ করেছেন, তা হচ্ছে-
ক. শুদ্ধ করে পড়াসহ কুরআনের জ্ঞান থাকা,
খ. সুন্নাহ তথা হাদীসের জ্ঞান থাকা,
গ. হিজরত করা এবং
ঘ. বেশি বয়স।

হযরত আবু সায়ীদ খুদরী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : যখন তিন ব্যক্তি হবে, তখন যেন তাদের মধ্য হতে একজন ইমামতি করে এবং ইমামতির অধিকার তার, যে কুরআন অধিক ভাল পড়ে। (মুসলিম)

কুরআনের জ্ঞান ও হাদীসের জ্ঞান থাকা খুব সহজে বুঝা গেলেও হিজরত আমাদের সাধারণত বুঝাটা একটু কষ্টকর। মদীনার প্রাথমিক সময়ে হিজরত ছিল সবচেয়ে বড় আমল যা করতে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। হিজরত করেছেন তারা যারা দ্বীন কায়েমের জন্য তাদের সকল সহায় সম্পত্তি আত্মীয় স্বজন বিসর্জন দিয়েছেন। এখনো আমাদের দেশে যারা দ্বীন কায়েমের পথে নিয়োজিত আছেন, শ্রম দিচ্ছেন, ত্যাগ স্বীকার করছেন তারা নেতা হওয়ার জন্য অধিকতর যোগ্য।

ঘ. নেতা নির্বাচন পদ্ধতির শিক্ষা
মুসলিম সমাজ বা দেশের নেতা তথা কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার পরিষদের নেতা কী পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচন করতে হবে সেটি মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন নামাজের ইমাম নির্বাচনের পদ্ধতির মাধ্যমে, যা প্রত্যেক নামাজীকে প্রতিদিন পাঁচবার অনুশীলন করতে হয়। নামাজের ইমাম নির্বাচনের ঐ পদ্ধতি রাসূল সা. জানিয়ে দিয়েছেন নিম্নের হাদীসগুলোর মাধ্যমে,

ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ কবুল হবে না। যে কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয়েছে অথচ তারা তাকে পছন্দ করে না, যে নামাজ পড়তে আসে দিবারে। আর দিবার হল- নামাজের উত্তম সময়ের পরের সময়কে এবং যে কোন স্বাধীন নারীকে দাসীতে পরিণত করে। (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।

আবু উমামা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের কানের সীমা অতিক্রম করে না (অর্থাৎ কবুল হয় না) পলাতক দাস যতক্ষণ না সে ফিরে আসে, যে নারী রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট এবং গোত্র বা জাতির ইমাম কিন্তু মানুষ তাকে পছন্দ করে না। (তিরমিযী, তবে হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী গরীব বলেছেন)

ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তির নামাজ তাদের মাথার উপর এক বিঘতও ওঠে না অর্থাৎ কখনই কবুল হয় না। ক. যে ব্যক্তি কোন গোত্র বা জাতির ইমাম হয় কিন্তু তারা তাকে পছন্দ করে না, খ. সেই নারী যে রাত্রি যাপন করেছে অথচ তার স্বামী সঙ্গত কারণে তার ওপর নাখোশ এবং গ. সেই দুই ভাই যারা পরস্পরে বিচ্ছিন্ন। (ইবনে মাজাহ)

উপরিউক্ত হাদীসগুলো থেকে একথা স্পষ্ট কোন ব্যক্তির ইমামতির যোগ্যতা থাকার পরও মুক্তাদী বা অনুসারী বা জনগনের ভোট বা সমর্থন জরুরী। অধিকাংশ জনগনের সমর্থন না থাকলে তিনি ইমামতি তথা নেতা হওয়ার যোগ্যতা হারান।

এই সকল হাদীসের আলোকে স্পষ্টভাবে নামাজের ইমাম নির্বাচনের ব্যাপারে যে বিধি-বিধান বের হয়ে আসে এবং যা প্রতিটি মুসলমান বাস্তব আমলের ভিত্তিতে দিনে পাঁচবার অনুসরণ করছে, তা হচ্ছে-

ক. সমর্থনের মাধ্যমে সকল বা অধিকাংশ মুক্তাদি যাকে পূর্বোল্লিখিত গুণাগুণসমূহের ভিত্তিতে অধিকতর যোগ্য মনে করবেন তিনি নামাজের ইমাম হবেন। আর এই সমর্থন দিতে হবে সকল রকম অন্যায় প্রভাব মুক্ত হয়ে।

খ. ঐ পদ্ধতি অনুসরণ করে ইমাম নির্বাচন করা ইসলামের একটি মৌলিক বিধান। কারণ, রাসূল সা. বলেছেন, ঐ পদ্ধতি অনুসরণ না করে যে ইমাম হবে, তার নামাজ কবুল হবে না। সুতরাং তাকে জাহান্নামে যেতে হবে অর্থাৎ তার সকল কর্মকাণ্ড ব্যর্থ হবে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, নামাজের অনুষ্ঠান থেকে আল্লাহ মুসলমানদের বিভিন্ন শিক্ষা দিতে চেয়েছেন। আর নামাজের ইমাম নির্বাচনের বিধি-বিধানের মাধ্যমে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, সমাজের নেতা নির্বাচন করার বিধি-বিধান। তাহলে সমাজের নেতা নির্বাচনের সেই বিধি-বিধানগুলো হবে,

১. নেতা নির্বাচিত করতে হবে সকল বা অধিকাংশ ঈমানদার মুসলমানের সমর্থন তথা ভোটের মাধ্যমে।
২. সকল বা অধিকাংশ ঈমানদার মুসলমান ঐ ভোটের মাধ্যমে জানাবেন কোন ব্যক্তি তাদের মতে নেতা হওয়ার জন্যে পূর্বোল্লিখিত গুণাগুণের ভিত্তিতে অধিকতর যোগ্য।
৩. ঐ ভোটগ্রহন হতে হবে সকল প্রকার অন্যায় প্রভাবমুক্তভাবে।

ঙ. নেতার আনুগত্য :
সালাতের মাধ্যমে নেতার আনুগত্য দারুণভাবে শেখানো হয়। নেতাকে পরিপূর্ণভাবে আনুগত্য করতে হয়। নেতা ভুল করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ থাকে। নেতার নির্দেশের আগে আগ বাড়িয়ে কাজ করলে নামাজ যেভাবে বাতিল হয়ে যায় সেভাবে নামাজের বাইরের জীবনে নেতার নির্দেশের আগে আগ বাড়িয়ে কোন কাজ নিষেধ।

মহান রাব্বুল আলামীন সূরা আন নিসার ৫৯ নং আয়াতে বলেছেন,
হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং সেসব লোকেরও যারা তোমাদের মধ্যে সামগ্রিক দায়িত্বসম্পন্ন, অতঃপর তোমাদের মধ্যে কোন ব্যাপারে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় তবে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা প্রকৃতই খোদা ও পরকালের প্রতি ঈমানদার হয়ে থাক। এটাই সঠিক কর্মনীতি এবং পরিণতির দিক দিয়েও এটাই উত্তম।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, মুসলমানদের উপর নেতার আদেশ শোনা ও মানা অপরিহার্য কর্তব্য। চাই সে আদেশ তার পছন্দনীয় হোক, আর অপছন্দনীয় হোক। তবে হ্যাঁ, যদি আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোন কাজের নির্দেশ হয় তবে সেই নির্দেশ শোনা ও মানার কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত আবু অলিদ ওবাদা ইবনে ছামেত (রা.) বলেন, আমরা নিম্নোক্ত কাজগুলোর জন্যে রাসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেছিলাম: ১. নেতার আদেশ মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে- তা দুঃসময়ে হোক,আর সুসময়ে হোক। খুশীর মুহূর্তে হোক, আর অখুশীর মুহূর্তে হোক। ২. নিজের তুলনায় অপরের সুযোগ-সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ৩. ছাহেবে আমরের সাথে বিতর্কে জড়াবে না, তবে হ্যাঁ, যদি নেতার আদেশ প্রকাশ্য কুফরীর শামিল হয় এবং সে ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে যথেষ্ঠ দলিল প্রমাণ থাকে, তাহলে ভিন্ন কথা। ৪. যেখানে যে অবস্থাতেই থাকি না কেন হক কথা বলতে হবে। আল্লাহর পথে কোন নিন্দুকের ভয় করা চলবে না। (বুখারী ও মুসলিম)

রাসূল সঃ বলেন, যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করলো সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো। যেই ব্যক্তি আমাকে অমান্য করলো সে আল্লাহকে অমান্য করলো। আর যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করলো সে আমারই আনুগত্য করলো। যে ব্যক্তি আমীরকে অমান্য করলো সে আমাকে অমান্য করলো। (বুখারী)

আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সঃ বলেন কঠিন অবস্থায়, সহজ অবস্থায়, সন্তুষ্টিতে, অসন্তুষ্টিতে, তোমার উপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও তোমার কর্তব্য হচ্ছে নেতার নির্দেশ শোনা ও মানা। (মুসলিম)

আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, যে আনুগত্যের গন্ডি থেকে বের হয়ে যায় এবং জামায়াত থেকে বিছিন্ন হয়ে যায় অতঃপর মৃত্যুবরণ করে, তার মৃত্যু হয় জাহেলিয়াতের মৃত্যু। (মুসলিম)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) রাসূলে (সঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আনুগত্যের বন্ধন থেকে হাত খুলে নেয়, সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় হাজির হবে যে, নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনে তার বলার কিছুই থাকবে না। আর যে ব্যক্তি বাইয়াত ছাড়া মারা যাবে তার মৃত্যু হবে জাহেলীয়াতের মৃত্যু।(মুসলিম)

এখানে আল কুরআন এবং হাদিসের আলোকে আনুগত্যের গুরুত্ব এবং অপরিহার্যতা আমরা বুঝতে পারি। ক্ষুদ্র একটা পরিবার থেকে শুরু করে বিভিন্নমুখী প্রতিষ্ঠানের গঠনমূখী কার্যক্রম প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ঠ লোকদের আনুগত্যের উপরই নির্ভরশীল। বিশেষ যে কোন আন্দোলনের, সংগঠনের জন্যে আনুগত্যই চালিকাশক্তি বা প্রাণশক্তির ভূমিকা পালন করে। আনুগত্যই রাষ্ট্রীয় শৃংখলার মূল উপাদান। নামাজের মাধ্যমে ইকামাতে দ্বীনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় 'নেতার আনুগত্য' শেখানো হয়।

মিরাজে আল্লাহর রাসূল সা.কে আল্লাহ তায়ালা সালাতের নির্দেশ দান করার মাধ্যমে এই কথা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সহসাই মুহাম্মদ সা.-কে একটি জাতি গঠন করতে হবে। একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই জাতির মূলনীতি, আকিদা, শৃঙ্খলা, সাম্য, সংস্কৃতি, আনুগত্য, সমৃদ্ধির জন্য নিয়মিত যে প্রশিক্ষণ দরকার তা আছে সালাতে। এজন্যই সালাত ইকামাতে দ্বীনের সবচেয়ে প্রায়োগিক ইবাদত।

0 comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন