২৬ আগস্ট, ২০২১

জামায়াত প্রতিষ্ঠার ইতিহাস (২য় পর্ব)


পাঞ্জাবের চৌধুরি নিয়াজ আলী খান তার বিপুল সম্পত্তি দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি তার বন্ধুদের সাথে অনেক আলোচনা করেছেন। তারা সবাই তাকে আল্লামা ইকবালের কাছে যেতে বলেছেন। তিনি আল্লামা ইকবালের সাথে দেখা করে তার ইচ্ছে ও পরিকল্পনার কথা জানান।

এদিকে আল্লামা ইকবাল মাওলানা মওদূদীর তর্জুমানুল কুরআন নিয়মিত পড়েন। তিনি তর্জুমানুল কুরআন ও মাওলানা মওদূদীর ভক্ত হয়ে ওঠেন। আল্লামা ইকবালের কাছে নিয়াজ আলী খান আসলে তিনি মাওলানা মওদূদীকে দেখিয়ে দেন। মাওলানা মওদূদী কারো চাকুরি বা অনুগ্রহে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। কারণ এতে স্বাধীন সত্ত্বা থাকে না। ফরমায়েশি কাজ করতে হয়।

তাই নিয়াজ আলী খানের অনুরোধে আল্লামা ইকবাল মাওলানা মওদূদীকে পত্র লিখে পাঞ্জাবে আসতে বলেন। ১৯৩৮ সালে চিঠিটি নিয়াজ আলী খান নিজেই দিল্লী গিয়ে মাওলানার হাতে দেন। আল্লামা ইকবালের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তি মাওলানাকে চিঠি দেয়ায় মাওলানা হতবাক হয়ে যান। আল্লামা তাকে হায়দারাবাদ পরিত্যাগ করে পাঞ্জাবে চলে আসার আহ্বান জানান। মাওলানা মওদূদী কিছুদিন পরে আল্লামা ইকবালের সাথে সাক্ষাত করেন এবং বিষয়টির নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।

নিয়াজ আলী খানের সম্পত্তি ছিল পাঞ্জাবের গ্রামে। সেই সম্পত্তি দিয়ে মাওলানা দারুল ইসলাম ট্রাস্ট গঠন করেন। যদিও শহর ছেড়ে গ্রামে আসা কষ্টকর তারপরও নিরাপদে গবেষণা করার জন্য দারুল ইসলাম ছিল একটি দারুণ স্থান। এই দারুল ইসলাম থেকে বের হয়েছে মাওলানা মওদূদীর দুটি শক্তিশালী বই। একটি 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' অন্যটি ‘মুসলমান আওর মওজুদা সিয়াসী কাশমকাশ'। এগুলো বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। বাংলায় এগুলো 'ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ' অন্যটি 'রাজনৈতিক সংঘাতের কবলে মুসলমান' নামে অনুবাদ হয়েছে। দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাওলানার জীবিকা নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। তিনি নিবিষ্ট মনে কাজ করতে পেরেছেন।

এই বই দুটি তৎকালীন মুসলিমদেরকে রাজনৈতিকভাবে দিক নির্দেশনা দিয়েছিল। কংগ্রেসের সর্বগ্রাসী আক্রমণ থেকে মুসলিমদের বিশেষত আলেমদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছিল। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের আলেমরা যখন হিন্দু মুসলিম এক জাতি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেছিল তখন এর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করেন।

১৯৩৮ সালে হুসাইন মাদানী ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত আওর ইসলাম’ বা ‘যুক্ত জাতীয়তা ও ইসলাম’ শিরোনামে একটি বই লিখেন। তিনি যুক্ত জাতীয়তার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে পুস্তিকায় লেখেন, “যুক্ত জাতীয়তার বিরোধীতা ও তাকে ধর্ম বিরোধী আখ্যায়িত করা সংক্রান্ত যে সব ভ্রান্ত ধারণা প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে, তার নিরসন করা অত্যাবশ্যক বলে বিবেচিত হলো।

১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেস ভারতের জনগণের কাছে স্বাদেশিকতার ভিত্তিতে জাতিগত ঐক্য গড়ার আবেদন জানিয়ে অব্যাহতভাবে জোরদার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। আর তার বিরোধী শক্তিগুলি সেই আবেদন অগ্রহণযোগ্য, এমনকি অবৈধ ও হারাম সাব্যস্ত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জন্য এ জাতিগত ঐক্যের চাইতে ভয়ংকর আর কিছুই নেই, এ কথা সুনিশ্চিত। এ জিনিসটা ময়দানে আজ নতুন আবির্ভূত হয়নি, বরং ১৮৮৭ সাল বা তার পূর্ব থেকে আবির্ভূত। বিভিন্ন শিরোনামে এর ঐশী তাগিদ ভারতীয় জনগণের মন মগজে কার্যকর করা হয়েছে। তিনি আর এক ধাপ এগিয়ে বলেন,“ আমাদের যুগে দেশ থেকেই জাতির উৎপত্তি ঘটে থাকে। এতএব হিন্দু মুসলিম এক জাতি, আমরা সবাই ভারতীয়”

ওনার এই বই প্রকাশিত হওয়ার পর মুসলিমদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। একদিকে তাদের মন সায় দিচ্ছে পাকিস্তানের প্রতি অন্যদিকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় আলেম বলছেন হিন্দুদের সাথে থাকার কথা। তার এই বইয়ের বিপরীতে কিছু দেওবন্দী নেতা বক্তব্য দিলেও তার যুক্তি খণ্ডন করে কেউ কিছু করতে পারে নি। অন্যদিকে আলিয়া মাদ্রাসার আলেমদেরকে তো দেওবন্দীরা পাত্তাই দিত না।

অবশেষে তাত্ত্বিক দিক দিয়ে জাতীয়তাবাদের বিষয়ে আদ্যোপান্ত গবেষণানির্ভর বই 'মাসয়ালায়ে কওমিয়াত' লিখেন মওলানা মওদূদী রহ.। সেই বইটি বাংলায় “ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” নামে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সেই বইতে হিন্দু-মুসলিম এক জাতি এই ধারণার সব যুক্ত খণ্ডন করে দেখিয়েছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর গোটা মানব বসতিতে মাত্র দু’টি দলের অস্তিত্ব রয়েছে; একটি আল্লাহর দল অপরটি শয়তানের দল। তাই এই দুই দল মিলে কখন এক জাতি হতে পারে না, যেমন পারে না তেল ও পানি মিশে এক হয়ে যেতে। মওলানার এই বই তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে।

মাওলানা মওদূদী রহ. বলেন, অমুসলিম জাতি সমূহের সাথে মুসলিম জাতির সম্পর্কের দু’টি দিক রয়েছে। প্রথমটি এই যে মানুষ হওয়ার দিক দিয়ে মসলিম-অমুসলিম সকলেই সমান। আর দ্বিতীয়টি এই যে, ইসলাম ও কুফরের পার্থক্য হেতু আমাদেরকে তাদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র করে দেয়া হয়েছে। প্রথম সম্পর্কের দিক দিয়ে মুসলিমরা তাদের সাথে সহানুভূতি, দয়া ঔদার্য ও সৌজন্যের ব্যবহার করবে।

কারণ মানবতার দিক দিয়ে এরূপ ব্যবহারই তারা পেতে পারে। এমনকি তারা যদি ইসলামের দুশমন না হয়, তাহলে তাদের সাথে বন্ধুত্ব, সন্ধি এবং মিলিত উদ্দেশ্যের (Common Cause) সহযেগিতাও করা যেতে পারে। কিন্তু কোন প্রকার বস্তুগত ও বৈষয়িক সম্পর্ক তাদেরকে ও আমাদেরকে মিলিত করে ‘একজাতি’ বানিয়ে দিতে পারেনা।

তিনি আরো বলেন, যেসব গন্ডীবদ্ধ, জড় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও কুসংস্কারপূর্ণ ভিত্তির উপর দুনিয়ার বিভিন্ন জাতীয়তার প্রাসাদ গড়ে উঠেছে আল্লাহ ও তাঁর রসুল তা চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেন। বর্ণ, গোত্র, জন্মভূমি, অর্থনীতি ও রাজনীতিক অবৈজ্ঞানিক বিরোধ ও বৈষম্যের ভিত্তিতে মানুষ নিজেদের মূর্খতা ও চরম অজ্ঞতার দরুণ মানবতাকে বিভিন্ন ও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র খন্ডে বিভক্ত করেছিল, ইসলাম তার সবগুলোকে আঘাতে চূর্ণ করে দেয় এবং মানবতার দৃষ্টিতে সমস্ত মানুষকে সমশ্রেণীর সমমর্যাদাসম্পন্ন ও সমানাধিকার প্রধান করেছে।

ইসলামী জাতীয়তায় মানুষে পার্থক্য করা হয় বটে, কিন্তু জড়, বৈষয়িক ও বাহ্যিক কোন কারণে নয়। করা হয় আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে। মানুষের সামনে এক স্বাভাবিক সত্য বিধান পেশ করা হয় যার নাম ইসলাম। আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য, হৃদয়মনের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা, কর্মের অনাবিলতা, সততা ও ধর্মানুসরণের দিকে গোটা মানব জাতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

যারা এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে,তারা এক জাতি হিসাবে গণ্য হবে আর যারা তা অগ্রাহ্য করবে, তারা সম্পুর্ণ ভ্ন্নি জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ মানুষের একটি হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের জাতি এবং তার সমস্ত ব্যক্তিসমষ্টি মিলে একটি উম্মাহ। অন্যটি হচ্ছে কুফর ও ভ্রষ্টতার জাতি। মুসলিম ও মুশরিক কখনো এক জাতি হতে পারে না।

দ্বি-জাতি তত্ত্ব হঠাৎ করে তৈরি হওয়া কোন তত্ত্ব নয়। এ তত্ত্ব মানুষের সৃষ্টি থেকে, বিশেষ করে ইসলামের আবির্ভাব থেকে সমাজে সুস্পষ্ট ছিল। রসুল সা. বলেছেন “আল কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহেদা”- সমস্ত কুফর জাতি এক জাতি এবং “আল মুসলেমু আখুল মুসলিম” এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। এ এক চরম সত্য।

যেহেতু মুসলিম ধর্মের মূল শিরক বিবর্জিত ওহদানিয়াতের প্রতি বিশ্বাস ও তদানুযায়ী জীবনাচার। এই বিশ্বাসের রূপরেখা প্রতিফলিত হয় মুসলিম সংস্কৃতিতে ও এরই সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ চরিত্র দিয়ে। কুরআন ধর্মের একত্বের উপরে জোর দিয়ে একে ঈমানের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত করেছে। যে কারণে দেশের, ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও গোটা বিশ্বের মুসলিম সংস্কৃতিতে ঐক্যের সুর বিরাজমান। সব মুসলমান এক জাতি।

মাওলানা মওদূদীর এই বই মুসলিম সমাজে ব্যাপক সাড়া তৈরি করে। দেওবন্দী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতি মুসলিমদের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এই বইয়ের প্রভাবে জমিয়তে উলামায় হিন্দ থেকে বের হয়ে আসেন মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানীর নেতৃত্বে একটি দল। তারা জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নামে নতুন দল করেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবিও এই নতুন দলের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।

মাওলানার এই বইগুলো পাকিস্তান আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন সভা সেমিনারে মাওলানার বক্তব্যও পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে যায়। মাওলানা মওদূদী সফলভাবে মুসলিম লীগের নিছক রাজনৈতিক দাবিকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে সক্ষম হন। কিন্তু তারপরও মাওলানা কখনোই মুসলিম লীগে যোগ দেননি। মুসলিমদের জন্য আলাদা আবাসভূমি জরুরি মনে করলেও যাদের নেতৃত্বে এই কাজটি হচ্ছে তারা ইসলামকে ধারণ করতেন না বলেই মাওলানা মনে করতেন।

মুসলিম লীগ নেতা মাওলানা জাফর আহমদ আনসারী বলেন, .

এ বিষয়বস্তুর উপরে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী সাহেব মাসয়ালায়ে কওমিয়াত শীর্ষক এক ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। অকাট্য যুক্তি-প্রমাণাদি ও শক্তিশালী প্রকাশভঙ্গির দরুণ প্রবন্ধটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুততার সাথে মুসলমানদের মধ্যে এ এক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে পড়ে। এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফলে একজাতীয়তার ধারণা বিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় এবং স্বতন্ত্র জাতিতত্ত্বের অনুভূতি মুসলমানদের মধ্যে বিদ্যুত বেগে সঞ্চারিত হয়।

জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে এ একটা নিছক আদর্শিক বিতর্ক-আলোচনা ছিল না, বরং এ কংগ্রেস ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের স্বপ্ন প্রাসাদ ভেঙ্গে দিয়েছিল। মুসলমানদের অন্তর থেকে স্বতন্ত্র জাতিতত্ত্বের অনুভূতি কোন প্রকারে বিদূরিত করে তাদের জাতীয় অস্তিত্বের মূলকে অন্তঃসারশূন্য করে দেয়াই ছিল হিন্দুদের সর্বাপেক্ষা মারাত্মক কৌশল। স্বয়ং মুসলিম লীগ এ বিতর্ক আলোচনায় ধর্মীয় দিকটা বেশি করে ফুটিয়ে তুলবার চেষ্টা করছিল, যাতে জনসাধারণ কংগ্রেসের খেলা ধরে ফেলতে পারে এবং তাদের দ্বীন ও ঈমানের দবি পূরণের জন্য প্রবৃত্ত হতে পারে।”

লাহোর থেকে প্রকাশিত ইকদাম পত্রিকার সাংবাদিক মিয়া মুহাম্মদ শফি বলেন,

“মাওলানা মওদূদী তো প্রকৃতপক্ষে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের দুশমন ছিলেন। আমি পূর্ণ দায়িত্বের সাথে একথা বলছি যে, আমি আল্লামা ইকবালকে একথা বলতে শুনতাম, “মওদূদী এসব কংগ্রেসী মুসলমানদের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বে।” আল্লামা ইকবাল আযাদ (মাওলানা আবুল কালাম আযাদ) ও মাদানির (মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী) সুস্পষ্ট ভাষায় সমালোচনা করতেন।

1 টি মন্তব্য: